Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    অবিশ্বাস্য বিবেকানন্দ – শংকর

    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়) এক পাতা গল্প392 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ০৫. শ্রাবণের শেষ দিনে কাশীপুর উদ্যানে

    শ্রাবণের শেষ দিনে কাশীপুর উদ্যানে

    রসগোল্লার লোভে শিষ্যের দক্ষিণেশ্বরে প্রথম আগমন। তারপর মাত্র কয়েক বছর, এরই মধ্যে পরস্পরকে প্রথম আবিষ্কার এবং ভাবের আদানপ্রদান। এরই মধ্যে দুরারোগ্য ব্যধির আক্রমণ, তবু যাবার আগে প্রিয় শিষ্যের প্রতি নিঃশেষে ঢেলে দিয়েছিলেন তাঁর সমস্ত শক্তি ও উপলব্ধি। শেষ পর্ব কাশীপুরে ১২৯৩ সালে শ্রাবণমাসের শেষ দিনে।কৃষ্ণাপ্রতিপদেনরেন্দ্রনাথের আচার্য যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণ কলকাতার কাশীপুর উদ্যানবাটী থেকে মহাপ্রস্থানের পথে পা দিয়েছিলেন। তারপর বহু বছর ধরে তার অন্ত্যলীলা সম্পর্কে সর্বস্তরে অন্তহীন আলোচনা চলেছে। কবি, পুঁথিকার, সন্ন্যাসীসন্তান, গৃহীভক্ত এবং অনুরাগীরা যেসব ইতিবৃত্ত রেখে গিয়েছেন তা বিশ্লেষণ করে বিশিষ্ট শ্রীরামকৃষ্ণ গবেষকরা নিরন্তর লিখে চলেছেন নানা ভাষায়। সেবিষয়ে তথ্যানুসন্ধানীদের প্রধান অবলম্বন স্বামী সারদানন্দের অমর সৃষ্টি শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ নামক পাঁচ খণ্ডের সুবিশাল গ্রন্থ।

    স্বামী সারদানন্দের এই বইটি বাংলা জীবনীসাহিত্যে এক দিকচিহ্ন, তবু যা সাবধানী পাঠকের দৃষ্টি এড়ায় না তা হ’ল কাশীপুর উদ্যানবাটীপর্বের কিছু উল্লেখ পঞ্চম খণ্ডে থাকলেও শ্রীরামকৃষ্ণের অন্তিমকালের কোনও বর্ণনা এই বইতে নেই।

    লীলাপ্রসঙ্গকে যাঁদের কাছে অসমাপ্ত বলে মনে হয়েছে তাদের কাছে অনুরোধ সম্প্রতি বেদান্ত সোসাইটি অফ সেন্ট লুইস, ইউ. এস. এ. থেকে লীলাপ্রসঙ্গের যে পূর্ণাঙ্গ ইংরিজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে সেখানে অনুবাদক স্বামী চেতনানন্দের মহামূল্যবান ভূমিকাটি পড়ে দেখুন। স্বামী চেতনানন্দ সবিনয়ে আমাদের জানিয়েছেন, শ্রীরামকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণের তেইশ বছর পরে স্বামী সারদানন্দ পরমপূজ্য ঠাকুরের জীবনকথা সম্পর্কে অনুসন্ধান শুরু করেন। ১৯০৯ সালে বাংলা উদ্বোধন পত্রিকায় যে ধারাবাহিক জীবনকথা প্রথম প্রকাশিত হয় তার পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯১৯ সালে। লীলাপ্রসঙ্গ সম্বন্ধে যে সংবাদটি কৌতূহলোদ্দীপক তা হলো প্রথমে লেখা হয় তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ড, তারপর দ্বিতীয়, প্রথম এবং সর্বশেষে পঞ্চম খণ্ড। লীলাপ্রসঙ্গের পঞ্চম খণ্ড যে অসম্পূর্ণ তা স্বামী সারদানন্দের অজানা ছিল না, তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের দেহাবসানের বিবরণ লিপিবদ্ধ করার অনুপ্রেরণা তিনি অন্তর থেকে অনুভব করেননি, তাই ওই পথে আর এগনো হয়নি।

    শেষজীবনের এই শূন্যস্থানটি পূরণের জন্য রামকৃষ্ণ পুঁথির কবি অক্ষয়কুমার সেন থেকে শুরু করে এক শতাব্দী পরে স্বামী প্রভানন্দ পর্যন্ত অনেকে যথেষ্ট ধৈর্যপূর্ণ গবেষণা করেছেন, তবু এইসব রচনায় অনুসন্ধিৎসুর মন পরিপূর্ণ হয় না। অন্য সমস্যা আছে, বিভিন্ন স্মৃতিকথার বিবরণে কিছু কিছু সংঘাতও রয়েছে। সময়ের দীর্ঘদূরত্বে, বিভিন্ন বিবরণের মধ্যে কোনটা সত্য এবং কোনটা অনিচ্ছাকৃত প্রমাদ তা ঠিকভাবে বলা ইদানিং কঠিন হয়ে উঠেছে।

    যেমন ধরুন শ্রাবণসংক্রান্তির রবিবার ১৫ আগস্ট মধ্যরাত্রে শ্রীরামকৃষ্ণের মহাসমাধিলগ্নে নরেন্দ্রনাথ কি তার শয্যাপার্শ্বে উপস্থিত ছিলেন? পরের দিন ১৬ আগস্ট কাশীপুর উদ্যানবাটীতে শ্মশানযাত্রার আগে দ্য বেঙ্গল ফটোগ্রাফার্স দুটি গ্রুপ ফটো নিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক এই ছবির একটিতে অর্ধশত শোকার্তজনের উপস্থিতি, কেন্দ্রস্থলে নরেন্দ্রনাথ। কিন্তু পুঁথিতে বলছে, ঠাকুরের যাতে ঘুম আসে তার জন্য পদসেবায় স্বয়ং শ্রীনরেন্দ্র নরবর। প্রভুকে অতঃপর সুস্থ দেখে নরেন্দ্র দোতলা থেকে একতলায় নেমে গেলেন বিশ্রামের জন্যে। ঘরে সেবকের তীক্ষ্ণদৃষ্টি নিয়ে জেগে রইলেন শশী যিনি পরবর্তীকালে সব গুরুভাইদের মত অনুযায়ী স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ নামের জন্য যোগ্যতম বিবেচিত হয়েছিলেন।

    এই শশী যে স্বামী সারদানন্দের সম্পর্কে খুড়তুতো ভাই তা ভক্তমহলে সবাই জানেন। কাশীপুরে তখন রাত্রি ১টা বেজে ২ মিনিট। এক বিদেশিনী কুমারী লরা এফ গ্লেন (ভগিনী দেবমাতা), ১৯০৯ সালে মাদ্ৰাজমঠে এসে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দের সঙ্গে কাশীপুর সম্পর্কে বিস্তারিত কথা বলেন। শশী মহারাজ তাকে জানান, “অকস্মাৎ রাত একটার সময় শ্রীরামকৃষ্ণ একপাশে ঢলে পড়লেন। তার গলা থেকে ক্ষীণ শব্দ বেরুতে থাকে।…নরেন্দ্র চট করে ঠাকুরের পা দুখানি বিছানার ওপর রেখে দৌড়ে নিচে নেমে গেল, যেন ঠাকুরের দেহের এই পরিণতি সে সইতে পারছিল না।”

    তা হলে শেষমুহূর্তে নরেন্দ্রর উপস্থিতি সম্পর্কে দুটো মতামত পাওয়া যাচ্ছে। সময় সম্পর্কেও রয়েছে কিছু মতপার্থক্যরাত একটা, একটা দুই এবং ডাক্তার রামচন্দ্র দত্ত (ঠাকুরের নিতান্ত ঘনিষ্ঠ, কঁকুড়গাছি যোগোদ্যানের স্রষ্টা, নরেন্দ্রনাথের দিদিমা রঘুমণিদেবীর মামাতো ভাই) তার শ্রীরামকৃষ্ণ বৃত্তান্তে জানিয়েছেন, তখন রাত্রি ১টা বেজে ৬ মিনিট। মহাসমাধির সময় রামদাদা কাশীপুরে উপস্থিত ছিলেন না, সুতরাং তার বর্ণনা ঠিক প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ নয়।

    শ্রাবণের শেষ রবিবারে কাশীপুরের ঘটনাবলী সম্পর্কে যেখানে যতটুকু জানা যায় তা একত্রিত করার সবচেয়ে কঠিন কাজটি করেছেন স্বামী প্রভানন্দ তার শ্রীরামকৃষ্ণের অন্ত্যলীলা গ্রন্থে। এই বইয়ের প্রধান তথ্যসূত্র কথামৃত রচনাকার শ্রীম’র অপ্রকাশিত ডায়েরি যা এই লেখক দেখবার ও ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছিলেন।

    কিন্তু তারপরেও কিছু অনুসন্ধানকার্য চালু রয়েছে। যেমন গবেষক শ্ৰীনির্মলকুমার রায়, প্রমাণ করেছেন ঠাকুরের চিকিৎসক দুর্গাচরণ ব্যানার্জি বিখ্যাত সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির পিতৃদেব নন। ঐসময়ে একই নামে তালতলায় আর একজন চিকিৎসক ছিলেন। এঁর বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণ চিকিৎসার জন্যে যেতেন, কিন্তু তাঁর বাড়ির হদিশ পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানকর্মে অশেষ ধৈর্য ছিল প্রয়াত নির্মলকুমার রায়ের। তাঁর মতে, কলকাতায় অন্তত ১৪টি বাড়ি, যেখানে শ্রীরামকৃষ্ণ কোনও না কোনও সময়ে গিয়েছিলেন তার কোনও অস্তিত্ব নেই। খোদ কলকাতায় রামকৃষ্ণস্মৃতিধন্য আরও ১৭টি বাড়ির হদিশ পাওয়া যায়নি, এরই মধ্যে রয়েছে তালতলায় ডাক্তার দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি।

    মহাপুরুষদের শরীর ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে নির্ভরযোগ্য অথচ রুদ্ধশ্বাস গ্রন্থ রচনার রেওয়াজ রয়েছে পাশ্চাত্যে। এদেশে কয়েকবছর আগে শ্রীরামকৃষ্ণের বিভিন্ন অসুখ সম্বন্ধে সুদীর্ঘ একটি প্রবন্ধ রচনা করেন ডাঃ তারকনাথ তরফদার। এই লেখককে না দেখলেও তার ছবি দেখেছি, তরুণ এই গবেষকের প্রবন্ধের নাম ‘অন্তিমশয্যায় শ্রীশ্রীঠাকুর’। ডাঃ তরফদার বলেছেন, দুর্গাচরণ ব্যানার্জির চেম্বারে রোগী শ্রীরামকৃষ্ণের আগমন ঘটেছিল ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৮৮৫।

    ইদানীং আরও কিছু সংবাদ এসেছে বিদেশ থেকে। মার্কিন দেশের সন্ন্যাসী স্বামী যোগেশানন্দর ইংরিজি বই (প্রথম প্রকাশ ১৯৯৫) সিক্স লাইটেড উইনডোজ’ এদেশে বিক্রি হয় না, কিন্তু অনুসন্ধানীদের অবশ্যপাঠ্য। যোগেশানন্দ সাবধানী লেখক, তাঁর স্মৃতিকথায় প্রথমেই সাবধান করে দিয়েছে, ভারতীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী সন্ন্যাসীরা আত্মজীবনী রচনা করেন না, কারণ সন্ন্যাসপূর্ব জীবনের মৃত্যু ঘটিয়ে, আত্মশ্রাদ্ধ সম্পন্ন করে, বিরজা হোমের শেষে সন্ন্যাসীরা নবজীবনে প্রবেশ করেন, পূর্বাশ্রমের সঙ্গে তারা সম্পর্কহীন। পশ্চিমে যেসব খ্রিস্টীয় সন্ন্যাসী এই ধরনের কাজ করেছেন, তাদের অনেকে বইয়ের শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছেন, চার্চের প্রবীণতরদের নির্দেশেই সঙ্রে প্রয়োজনে তারা নিজেদের জীবনকথা রচনায় হাত দিয়েছেন। রামকৃষ্ণ মঠের এই সন্ন্যাসী তাঁর স্মৃতিকথার শুরুতে বলেছেন, পূর্ব ও পশ্চিমের ক্ৰশকালচারাল মিলনের প্রথমপর্বে কী ধরনের অভিজ্ঞতা হয় তার কিছু কিছু লিখিত নিদর্শন থাকলে পরবর্তীকালের প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যবাসী উভয়েরই কাজে লাগতে পারে।

    স্বামী যোগেশানন্দ তাঁর ইংরিজি বইতে দীর্ঘকাল আমেরিকা প্রবাসী প্রাণবন্ত সন্ন্যাসী স্বামী নিখিলানন্দের মুখে কাশীপুরে রবিবারের সেই রাত্রি সম্পর্কে যা শুনেছেন তা লিপিবদ্ধ করেছেন। স্বামী নিখিলানন্দ এই কাহিনি শুনেছিলেন রামকৃষ্ণ মঠ-মিশনের অধ্যক্ষ, ঠাকুরের পরমপ্রিয় এবং স্বামী বিবেকানন্দর আমৃত্যু অনুরাগী স্বামী অখণ্ডানন্দের কাছ থেকে। এঁকেই আদর করে স্বামী বিবেকানন্দ ডাকতেন ‘গ্যাঞ্জেস’ বলে (ওঁর ডাকনাম গঙ্গাধর) এবং ভগ্নী নিবেদিতা তার কালজয়ী দুর্ভিক্ষ ত্ৰাণকার্যের জন্য ডাকতেন ‘দ্য ফেমিন স্বামী’ বলে। স্বামী অখণ্ডানন্দ বিবেকানন্দর দেহত্যাগের পরও পঁয়ত্রিশ বছর (১৯৩৭ সাল পর্যন্ত) বেঁচেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের মহাসমাধির তারিখের এই কাহিনিটি বাংলা কোনও পত্রিকা বা বইতে আজও আমার নজরে পড়েনি। স্বামী নিখিলানন্দ যখন তার আপনজনদের কাছে এই কথা বলে গিয়েছেন তখন তা অবিশ্বাস করার কথা ওঠে না।

    ১৮৮৫ রবিবার ১৫ আগস্ট পরমহংসদেবের শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ, কোনও কিছুই ক্যানসার রোগাক্রান্ত গলা দিয়ে প্রবেশ করতে চায় না। আগেকার নিয়মকানুন না মেনে ঠাকুর কিছুদিন আগে ডাক্তারের নির্দেশে কচি পাঁঠার মাংসের সুরুয়া পান করতে রাজি হয়েছে। শর্ত একটি ছিল, “যে দোকান থেকে মাংস কিনে আনবি সেখানে যদি কালীমুর্তি না থাকে তবে কিনবি না।” একজন সেবক প্রতিদিন সকালে গিয়ে সেই অনুযায়ী মাংস কিনে আনতেন। পরবর্তীকালে শ্রীশ্রীসারদামণির স্মৃতিকথায় পাওয়া যাচ্ছে : “কাশীপুরে কঁচা জলে মাংস দিতুম, কখনও তেজপাতা ও অল্প মশলা দিতুম, তুলোর মতন সিদ্ধ হলে নামিয়ে নিতুম।..মাংসের জুস হ’ত। দুটো কুকুর তার ছিবড়ে খেয়ে এই মোটা হ’ল।” কাশীপুর উদ্যানবাটিতে যে একটি রাঁধুনি বামুন আনানো হয়েছিল তার উল্লেখ আছে মাস্টারমশাই মহেন্দ্রনাথ গুপ্তর দিনলিপিতে। আরও জানা যায়, রাঁধুনিটি এসেছিল ঠাকুরের গ্রাম থেকে, কিন্তু রান্নাবাড়া সে প্রায় কিছুই জানত না।

    স্বামী যোগেশানন্দের ইংরাজি বইতে ঠাকুরের শেষদিনের বর্ণনা : মর্তলীলার শেষদিনে শ্রীরামকৃষ্ণ হঠাৎ ইচ্ছা প্রকাশ করলেন তিনি ডিম সেদ্ধ খাবেন। (অবশ্যই হাঁসের ডিম, মুরগী তখন বাঙালির ঘরে নিষিদ্ধ।) অবাক কাণ্ড, কারণ এই ধরনের ইচ্ছে আগে তিনি কখনও প্রকাশ করেননি। সেই মতো দুটো ডিম সেদ্ধও করা হয়েছিল, কিন্তু সারাদিন ধরে যেসব বিপর্যয় গেল তার পরে এই ডিম তার খাওয়া হয়নি। এরপরেই স্বামী অখণ্ডানন্দের স্মৃতিকথন, মধ্যরাতে যখন সব শেষ হয়ে গেল, তখন নরেন্দ্র বললেন, আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে, কী করা যায়? এই বিবরণ শুনে স্বামী নিখিলানন্দ পরে বলেছিলেন, এই সময়ে তো খিদে পাবার কথা নয়। স্বামী অখণ্ডানন্দর উত্তর : ”যা হয়েছিল তা বলছি। ডিম সিদ্ধর খবর পেয়ে খিদেয় পাগল নরেন্দ্রনাথ ডিম দুটি খেয়ে ফেলে নিজেকে সামলালেন।” অখণ্ডানন্দের মতে, নরেন ও রামকৃষ্ণ যে একাত্ম হয়ে গিয়েছে, এইভাবে ডিম খাওয়াটা তারই নিদর্শন।

    কাশীপুরে দীর্ঘদিন ধরে বিরতিহীন সেবাকার্যে নিয়ত জর্জরিত হয়ে বারোজন ত্যাগী সন্তানের শরীরে তখন কিছুই ছিল না। কে কতক্ষণ রোগীর পাশে ডিউটি দেবে, কে কলকাতায় ডাক্তারের কাছে যাবে, কে পথ্য সংগ্রহ করে এনে কীভাবে তা প্রস্তুত করবে তা বুঝিয়ে দেবে, এসবই ঠিক করে দিতেন নেতা নরেন্দ্রনাথ। ঘড়ির কাঁটার মতন কাজ হ’ত, কিন্তু সময়ের নির্দেশ মানতে চাইতেন না শশী ও তার ভাই শরৎ (সারদানন্দ)।

    ঠাকুরের সেবার সময় শশীর খাওয়াদাওয়ার কথা মনেই থাকত না, বারবার ছুটে আসতেন অমৃতপথযাত্রীর শয্যাপার্শ্বে। এই প্রসঙ্গে স্বামী প্রভানন্দ আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ঠাকুর’ কথাটি তাঁর দেহাবসানের পরে সৃষ্টি হয়, ভক্তগণ জীবিতকালে বলতেন ‘পরমহংসদেব’, অন্যেরা ‘পরমহংসমশাই’, অনেকে ব্যাঙ্গ করে ‘গ্রেটগুজ্‌’!

    কাশীপুর থানার ডেথ রেজিস্টারেও ইংরিজিতে লেখা, রাম কিষ্টো প্রমোহংস’, নিবাস: ৪৯ কাশিপুর রোড, জাতি : ব্রাহ্মণ, বয়স ৫২, পেশা : ‘প্রিচার’ অর্থাৎ প্রচারক। মৃত্যুর কারণ : গলায় আলসার, অর্থাৎ ক্ষত। সংবাদদাতা গোপালচন্দ্র ঘোষকে ‘বন্ধু’ বলে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এই ‘বন্ধু’টি আসলে ভক্তমহলের সুপরিচিত বুড়োগোপাল, যিনি পরে স্বামী অদ্বৈতানন্দ নামে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন।

    শ্রাবণের শেষ রাতে ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত ত্যাগী সন্তানদের আর একটি মর্মস্পর্শী বর্ণনা রেখে গিয়েছেন স্বামীজির মধ্যমভ্রাতা শ্রীমহেন্দ্রনাথ দত্ত তার ‘শ্রীমৎ সারদানন্দ স্বামীজির জীবনের ঘটনাবলি’ গ্রন্থে।

    শোকার্ত সময়ে চা খাওয়া সম্বন্ধে শরৎ মহারাজ (স্বামী সারদানন্দ) একটি গল্প বলতেন, “ওহে, শিবরাত্রির উপোস করে, আমাদের চা খেতে কোনও দোষ নেই। কেন জান? যেদিন তাঁর (শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের) দেহত্যাগ হয় সকলেই বিষণ্ণ, খাওয়া-দাওয়া কিছুই হল না। কেই বা উনোন জ্বালে। আর কেই বা রান্না করে। অবশেষে দরমা জ্বালিয়ে কেটলি করে জল গরম করে চা হ’ল আর ঢক ঢক করে খাওয়া গেল। অমন শোকর দেহত্যাগের দিনেও চা খেয়েছিলুম, তা শিবরাত্রির উপোস করে চা কেন খাওয়া চলবে না বল?”

    প্রসঙ্গত বলি, স্বামীজির ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত একবার প্রিয় শরৎ মহারাজকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুমি এত চা খেতে শিখলে কোথা থেকে?” স্বামী সারদানন্দ হাসতে হাসতে উত্তর দিয়েছিলেন, “তোমার ভাইয়ের পাল্লায় পড়ে। তোমাদের বাড়িতে যে চায়ের রেওয়াজ ছিল সেইটা মঠে ঢুকিয়ে দিলে আর আমাদের চা-খোর করে তুললে! তোমরা হচ্ছ একটা নারকটিক’ ফ্যামিলি!”

    কঠিন সময়ে মাথা ঠাণ্ডা রেখে কঠিনতম দুঃখের মোকাবিলার দুর্লভ শিক্ষা পেয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের মানসপুত্ররা। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পরম অবজ্ঞাভরে তারা তাই বলতে পেরেছেন, আমার তো জন্মই হয়নি, সুতরাং মৃত্যু হবে কী করে?

    তবু দুরন্ত দুঃখ এবং প্রিয়জনের বিয়োগব্যথা, হৃদয়বান সন্ন্যাসীকেও ক্ষণকালের জন্য অশ্রুভারাক্রান্ত করে তোলে, স্বামীজি নিজেই একবার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, “কী বলেন মশাই, সন্ন্যাসী হয়েছি বলে হৃদয় থাকবে না?”

    বৈরাগ্য ও ভালবাসার, আকর্ষণ ও বিকর্ষণের পরস্পরবিরোধী শক্তি, রামকৃষ্ণতনয়দের ব্যক্তিজীবন ও সন্ন্যাসজীবনকে এক আশ্চর্য রঙিন আভায় বারবার আলোকিত রেখেছিল। এই জন্যেই বোধ হয় যখন আমরা শুনি, ঠাকুরের দেহাবসানের পর শোকার্ত নরেন্দ্রনাথ আত্মহননে উদ্যত হয়েছিলেন, তখন আশ্চর্য হই না। প্রেমের ঠাকুর এবং সর্বস্বত্যাগী সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ দু’জনেই আমাদের বোধের ঊর্ধ্বে থেকে যান।

    .

    শুরুতেই আরও কয়েকটা সহজ কথা বলে রাখা ভাল। দক্ষিণেশ্বরে অনেকদিন শ্রীরামকৃষ্ণের শরীর-স্বাস্থ্য বেশ ভালই ছিল। ব্রহ্মচারী অক্ষয়চৈতন্য জানিয়েছেন, সুস্থ অবস্থায় তিনি আধসের থেকে দশ ছটাক চালের ভাত খেতেন। ব্যাধি বলতে আমাশয়, প্রায়ই পেট গোলমাল হত। আরও রিপোর্ট, একবার বায়ুবৃদ্ধি রোগে কাতর হলে, আগরপাড়ার বিশ্বনাথ কবিরাজ তার চিকিৎসা করেন। শ্রীরামকৃষ্ণের প্রশ্ন, “হারে তামুক খেলে কী হয়?” কবিরাজ শেষপর্যন্ত পরামর্শ দেন, ছিলিমের ওপর ধানের চাল ও মৌরী দিয়ে তামাক খেও। ঠাকুর সেই পরামর্শ মেনে চলতেন। কিন্তু ধূমপানের সঙ্গে ক্যান্সারের নিবিড় সম্পর্ক সম্বন্ধে ডাক্তার ও নাগরিক তখনও সচেতন হননি।

    যথেচ্ছ ধূমপানটা হয়ে উঠেছিল সেকালের বঙ্গীয় জীবনের অঙ্গ। প্রিয় শিষ্য নরেন্দ্রনাথ যে প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়েই ধূমপান শুরু করেন তার ইঙ্গিত রয়েছে বৈকুণ্ঠনাথ সান্যালের শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-লীলামৃত নামক গ্রন্থে। “পাঠাগারদ্বার আবদ্ধ থাকিত, অর্থাৎ যখন-তখন তামাক খাইতেন বলিয়া পিতা (বিশ্বনাথ দত্ত) কহিতেন বাবাজি বুঝি ঠাকুরকে ধূপধুনা দিতেছেন, তাই দ্বার বন্ধ। কিন্তু লেখাপড়ায় উন্নতি দেখিয়া কিছু বলিতেন না।”

    ঠাকুরের ধূমপানপ্ৰীতিকে ভক্ত জনেরা তাঁর দেহাবসানের পরেও নতমস্তকে স্বীকার করে নিয়েছেন। আজও বেলুড়মঠে সন্ধ্যায় ঠাকুরের শেষ সেবাটির নাম হুঁকোভোগ। সুগন্ধী তামাক প্রজ্জ্বলিত কলকেতে স্থাপন করে ঠাকুরের কক্ষে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে রাতের বিশ্রামের জন্য দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

    কাশীপুর উদ্যানবাটীতেও হুঁকো কলকের অন্য ব্যবহার হয়েছিল। নরেন্দ্রনাথ ও তাঁর ত্যাগী ভাইরা যখন ধুনি জ্বালিয়ে সন্ন্যাসীদের মতন অঙ্গে ভস্ম লেপন করতেন তখন অন্য ছাইয়ের অভাবে হুঁকোর টিকের ছাই ব্যবহার করতেন। এই অবস্থায় নরেন্দ্রনাথের যে ফটোগ্রাফটি কালের অবহেলা সহ্য করে আজও টিকে আছে তা বিশেষজ্ঞদের মতে কাশীপুরে গৃহীত হয় ১৮৮৬ সালে। এইটাই এখনকার সংগ্রহে নরেন্দ্রনাথের প্রথম ছবি, কিন্তু কোন পরিস্থিতিতে কে এই ছবি তোলার ব্যবস্থা করেছিলেন, ফটোগ্রাফার কে–তা আজও স্পষ্ট নয়।

    শ্রীরামকৃষ্ণের ছবির সংখ্যা হাতে গোনা হলেও ছবির বিস্তারিত বিবরণ আমাদের জানা নেই। ঠাকুরের যে ছবিটি এখন সারা বিশ্বে বন্দিত তা যে ভক্ত ভবনাথ চট্টোপাধ্যায়ের উদ্যোগে দক্ষিণেশ্বরে বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ডের শিক্ষানবিশ অবিনাশচন্দ্র দাঁয়ের তোলা এবং স্বয়ং নরেন্দ্রনাথ বিশেষ সাহায্য না করলে সমাধিমগ্ন শ্রীরামকৃষ্ণের এই অমূল্য ছবিটি আমরা পেতাম না তা গ্রন্থিত হয়েছে।

    আমরা জানি, অসাবধানতাবশতঃ অবিনাশ দায়ের হাত থেকে কাঁচের নেগেটিভাটি পড়ে তা ফেটে যায়, কিন্তু ফটোগ্রাফার খুব সাবধানে পিছনের অংশটি গোলাকৃতিতে কেটে ফেলে মূল ছবিটি রক্ষা করেন। পিছনের অর্ধ গোলাকার দাগটি ভারি সুন্দর মানিয়ে গিয়ে ছবিটিকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে।

    শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলামৃত লেখক বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল কাশীপুর পর্বে এই পদ্মাসনাস্থ ধ্যানমূর্তি সম্পর্কে ঠাকুরের নিজস্ব মন্তব্য আমাদের জন্য সংগ্রহ করে রেখে গিয়েছেন। ঠাকুর বলছেন, “ভবনাথের জেদে ছবি তোলাতে বিষ্ণুঘরের রকে বসে এমন সমাধিস্থ হই যে, ফটো উঠালেও ধ্যানভঙ্গ হ’ল না দেখে, আমি মরে গেছি ভেবে ফটোওয়ালা অবিনাশ যন্ত্রপাতি ফেলে পালায়।”

    কাশীপুরে শ্রাবণের শেষরাতে শ্রীরামকৃষ্ণ মৃত না গভীর সমাধিমগ্ন তা স্থির করতে সেবকরা অক্ষম হন। বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল লিখেছেন, “তাই আমরা আশায় বুক বাঁধিয়া, এই জাগিবেন, এই উঠিবেন, ভাবিয়া সারারাত্রি প্রভুকে ঘিরিয়া তাহার অপূর্বভাব দেখিতে লাগিলাম।”

    অন্তিমশয্যায় শ্রীশ্রীঠাকুর প্রবন্ধে ডাঃ তারকনাথ তরফদার শ্রীরামকৃষ্ণের একটা মেডিক্যাল হিস্ট্রি খাড়া করার চেষ্টা চালিয়েছেন। কথামৃতে এই অসুখের প্রথম উল্লেখ ২৪ এপ্রিল ১৮৮৫ : গলায় বিচি, শেষ রাত্রে কষ্ট হচ্ছে, মুখ শুকনো লাগছে। ডাক্তার তরফদারের আন্দাজ, অসুখের সূত্রপাত সম্ভবত বেশ কিছু আগে। অন্তিম রোগের প্রথম লক্ষণ, গলায় বিচি, ১৫-১৬ মাস পরে জীবনাবসান।

    কথামৃত ও অন্যান্য সূত্র থেকে ডাক্তার গবেষকের রচনা থেকে আরও কয়েকটি উদ্ধৃতি।

    ২৬মে ১৮৮৫ : পানিহাটি মহোৎসবে মাতামাতির পর রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি।

    ১৩ জুন ১৮৮৫ : ফের গলায় বিচির উল্লেখ, সেই সঙ্গে সর্দি গয়েরে ‘বিশ্রী গন্ধ’।

    ২৮ জুলাই ১৮৮৫ : কথামৃত অনুযায়ী শ্রীরামকৃষ্ণের কণ্ঠে শেষ গান। কিন্তু কাশীপুরে তিনি দু’এককলি গেয়েছেন।

    আগস্ট ১৮৮৫: গলা থেকে প্রথম রক্তক্ষরণ শুরু। খেতে বা গিলতেও কষ্ট।

    ১১ আগস্ট ১৮৮৫ : ধর্মপ্রচারে অত্যধিক কথা বলায় এই রোগ। ডাক্তারি ভাষায়, ক্লার্জিম্যানস থ্রোট’,এই দিন কিছুক্ষণের জন্যে মৌনীভাব।

    ৩১ আগস্ট ১৮৮৫ : রাত্রে সুজির পায়েস খেতে কোনো কষ্ট হ’ল না। অর্থাৎ খাবার খেতে কষ্ট শুরু হয়েছে। খেয়ে ঠাকুরের আনন্দ : “একটু খেতে পারলাম, মনটায় বেশ আনন্দ হল।” তবে রাত্রে গায়ে ঘাম।

    ১ সেপ্টেম্বর ১৮৮৫ : ডাক্তার রাখালদাস ঘোষ ল্যারিনজোসকোপ দিয়ে পরীক্ষা করলেন।

    ২ সেপ্টেম্বর ১৮৮৫ : প্রখ্যাত ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার দেখলেন।

    ২৩ সেপ্টেম্বর ১৮৮৫ : ডাক্তার দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

    ২৬ সেপ্টেম্বর ১৮৮৫ : শ্রীরামকৃষ্ণ কলকাতায় এলেন। কাশির প্রকোপ বৃদ্ধি।

    ২৮ সেপ্টেম্বর ১৮৮৫ : রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি।

    ১ অক্টোবর ১৮৮৫ : রাত্রে যন্ত্রণা বৃদ্ধি, ঘুম নেই।

    ২ অক্টোবর ১৮৮৫ : শ্যামপুকুরের বাড়িতে এলেন।

    ৪ অক্টোবর ১৮৮৫ : রক্তপাত, প্রথমে কাঁচা, পরে কালো ঘন।

    ১২ অক্টোবর ১৮৮৫ : ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার নিয়মিত চিকিৎসা শুরু করেন।

    ১৫-১৭ অক্টোবর ১৮৮৫: এর মধ্যে কোনো একদিন ডাঃ সরকার ও তার বন্ধু সমাধির সময় শ্রীরামকৃষ্ণকে পরীক্ষা করেন।

    ৪ নভেম্বর ১৮৮৫ : ঠাকুর গুরুতর পীড়িত।

    ৮ নভেম্বর ১৮৮৫ : রক্তমেশা কফ পরীক্ষা–এই রিপোর্টের বিবরণ কারও কাছে নেই।

    ২৯ নভেম্বর ১৮৮৫ : ডাক্তার সরকারের সিদ্ধান্ত, রোগ ক্যানসার। এর আগে সেপ্টেম্বরে কবিরাজরা বলেছেন ‘রোহিণী’ রোগ।

    রোগ লক্ষণ বিচার করে ডাঃ তরফদারের অনুমান, “রামকৃষ্ণদেবের অসুখ প্রাথমিকভাবে ‘হাইপোফ্যারিস’ (অথবা তার পরে ‘অরোফ্যারিন্‌কস’) অংশে শুরু হয়েছিল, স্বরযন্ত্রে নয়।”

    .

    শ্যামপুকুরের বাড়ি ছাড়বার জন্যে বাড়িওয়ালা প্রবল তাগাদা লাগাচ্ছিল। নতুন বাড়ির খোঁজ হচ্ছে। ঠাকুরকে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি বললেন, আমি কি জানি? কাশীপুরনিবাসী ভক্ত মহিমাচরণ চক্রবর্তী একটা বাড়ির খবর দিলেন। রানী কাত্যায়নীর জামাই গোপালচন্দ্র ঘোষের উদ্যানবাটী, ঠিকানা : ৯০ কাশীপুর রোড, মাসিক ভাড়া ৮০।

    যে তথ্যটি অস্বস্তিকর ও অপ্রচলিত, শ্রীরামকৃষ্ণ শ্যামপুকুর থেকে দক্ষিণেশ্বর ফিরে গিয়ে জীবনের শেষ ক’টি দিন সেখানে অতিবাহিত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মন্দিরের পরিচালকদের অনুমতি মেলেনি।

    কাশীপুর উদ্যানবাটির বাড়ি ভাড়া শ্রীরামকৃষ্ণকে বেশ চিন্তিত করেছিল, ভক্তরা প্রতিমাসে চাদা তুলুক তা তাঁর পক্ষে অস্বস্তিকর। তখন গৃহীভক্ত সুরেন্দ্রনাথ মিত্রর ডাক পড়ল। ঠাকুর তাকে ‘সুরেন্দর’বা সুরেশ বলতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, “দেখ সুরেন্দ্র, এরা সব কেরানি-মেরানি ছাপোষা লোক, এরা এত টাকা চাঁদা তুলতে পারবে কেন?…বাড়ি ভাড়ার টাকাটা তুমি দিও।”

    সুরেন্দ্র সানন্দে রাজি হয়ে যান এবং বাড়ির মালিকের সঙ্গে চুক্তিপত্রে ছ’মাসের গ্যারান্টর হন। ৮০ টাকা ছাড়াও কাশীপুরপর্বে তিনি মাসে ২৩০ দিতেন। মদ খেয়ে রাত্রে গোলমাল করতেন বলে সুরেন্দ্রকে এক সময় দক্ষিণেশ্বরে পাঠানো হয়েছিল। বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল লিখেছেন, “দক্ষিণেশ্বর যাইয়া দেখেন, ঠাকুর নহবখানার নিকট বকুলতলায় দণ্ডায়মান। প্রণাম করিবামাত্র কহেন, ও “সুরন্দর! খাবি, খা, বারণ করিনে, তবে পা না টলে, আর জগদম্বার পাদপদ্ম হতে মন না টলে; আর খাবার আগে নিবেদন করে বলিস, মা তুমি এর বিষটুকু খাও, আর সুধাটুকু আমাকে দাও, যাতে প্রাণভরে তোমার নাম করতে পারি।”

    মাসিক টাকা ছাড়াও কাশীপুরে শ্রীরামকৃষ্ণের শোয়ার ঘরের খসখস পর্দা, ফুলের মালা, ফল প্রভৃতির খরচও বহন করতেন সুরেন্দ্র। মহাসমাধির পর ব্রাহনগরে বাড়িভাড়া (১১ টাকা) এবং খাওয়াদাওয়া বাবদ মাসিক ১০০ সুরেন্দ্রনাথই দিতেন।

    কাশীপুরের উদ্যানবাটীতে যে প্রচুর মশা ছিল তা জানা যাচ্ছে। দোতলার ঘরে ঠাকুর শায়িত, লণ্ঠন জ্বলে ও একটা মশারি টাঙানো। গিরিশ ও শ্ৰীমকে ঠাকুর বললেন, “কাশি কফ বুকের টান এসব নেই। তবে পেট গরম। ঘরেই পায়খানার ব্যবস্থা করতে হবে। বাইরে যেতে পারব বলে মনে হয় না।” সামনে দাঁড়িয়েছিলেন সেবক লাটু (পরে স্বামী অদ্ভুতানন্দ) তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “যে আজ্ঞা মশাই, হামি ত আপনার মেস্তর হাজির আছি।”

    লাটুর (পূর্বনাম রাখতুরাম) মাধ্যমে আমরা জানি, একদিন টাকা পয়সার হিসেব রাখা নিয়ে কথা উঠল। নরেন বললেন, এত হিসেব রাখারাখি কেন? এখানে কেউ তো চুরি করতে আসেনি? লাটু বললেন, হিসেব রাখা ভাল।

    গোপালদার ওপর হিসেব রাখার দায়িত্ব পড়ল। লাটু (স্বামীজি এঁকে প্লেটো বলে ডাকতেন) জানিয়েছেন, গেরস্তর পয়সা ঠাকুর বেফজল খরচ হতে দিতেন না। একবার দক্ষিণেশ্বরে একটা প্রদীপ জ্বালাতে গিয়ে কেউ তিন-চারটে কাঠি নষ্ট করেছিল। তক্তা থেকে নেমে ঠাকুর নিজেই দেশলাই ধরালেন এবং বললেন, “ওগো, গেরস্থরা অনেক কষ্টে পয়সা বাঁচিয়ে তবে সাধুকে দেয়, সে পয়সার বাজে খরচ হতে দেওয়া উচিত কি?”

    ঠাকুরের গলার অসুখ সম্পর্কে লাটু মহারাজ আরও দুটি কথা বলেছেন। একবার দেশে ঠাকুরের দাদার বিকার হয়েছিল, ঠাকুর তাঁকে জল খেতে দিতেন না। তাই তিনি বলেছিলেন, মরবার সময় তোমার গলা দিয়ে জল গলবে না। দেখো। আর একবার কাকা কানাইরামের বড় ছেলে হলধারী (রামতারক চট্টোপাধ্যায়) দাদার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে, মুখ দিয়ে রক্ত উঠবে এই অভিশাপ দিয়েছিলেন। হলধারী ঠাকুরের অবতার রূপ বিশ্বাস করতেন না।

    .

    কাশীপুর উদ্যানবাটিতে অনেক মজার ঘটনা ঘটেছে। একটা শুনুন কালীর (পরে স্বামী অভেদানন্দ) মুখে।

    “নরেন্দ্রনাথ আমার অপেক্ষা প্রায় চারি বৎসরের বড় ছিল। আমি নরেন্দ্রনাথকে সেই অবধি আপনার জ্যেষ্ঠভ্রাতার ন্যায় দেখিতাম ও ভালবাসিতাম। নরেন্দ্রনাথও আমায় আপনার সহোদরতুল্য ভালবাসিত। তাহা ছাড়া আমি যে তাহাকে শুধু ভালবাসিতাম তাহা নহে, তাহার আজ্ঞানুবর্তী হইয়া সকল কাজই করিতাম। বলিতে গেলে আমি ছায়ার মতো সর্বদা নরেন্দ্রনাথের সঙ্গে-সঙ্গে থাকিতাম ও নরেন্দ্রনাথ যাহা করিত আমিও নির্বিবাদে তাহা করিতাম। তাহা ছাড়া নরেন্দ্রনাথ যাহা করিতে বলিত অকুণ্ঠিত হৃদয়ে তৎক্ষণাৎ তাহা করিতাম।

    “আত্মজ্ঞান লাভ করা-সম্বন্ধে বিচার করিতে করিতে একদিন নরেন্দ্রনাথ হিন্দুদিগের আহারাদি-সম্বন্ধে যে সকল কুসংস্কার (prejudice) আছে তাহার বিরুদ্ধে জোর করিয়া আমাদিগকে বলিতে লাগিল। শরৎ, যোগেন, তারকদাদা ও আমি এই বিষয় লইয়া তাহার সহিত বিচার করিতে লাগিলাম। নরেন্দ্রনাথ বলিল, ব্রহ্মজ্ঞান হলে সকলের হাতে খাওয়া চলে। তখন কেউ কাকেও ঘৃণা করে না। যতদিন কুসংস্কার থাকবে ততদিন ঠিক ঠিক ব্রহ্মজ্ঞান হয় না।”

    স্বামী অভেদানন্দ লিখেছেন, “আমরা কেহই মুসলমানের হাতের রান্নাকরা খাদ্য পূর্বে কখনও খাই নাই। কিন্তু নরেন্দ্রনাথ ব্রাহ্মদিগের ন্যায় জাতিবিচার মানিত না। তাহার মত ছিল উদার, তাই সে সকলের হাতের রান্না খাদ্য খাইয়াছে। সেইদিন নরেন্দ্রনাথ আমাদের বলিল : ‘চলো, আজ তোমাদের কুসংস্কার ভেঙে আসি। আমি তৎক্ষণাৎ নরেন্দ্রনাথের প্রস্তাবে রাজি হইলাম এবং শরৎ ও নিরঞ্জন আমার কথায় সায় দিল। সন্ধ্যার সময়ে কাশীপুর বাগান হইতে পদব্রজে নরেন্দ্রনাথ আমাদের লইয়া বিডন স্ট্রিটে (বর্তমানে যেখানে মিনার্ভা থিয়েটার হইয়াছে) পীরুর রেস্টুরেন্টে উপস্থিত হইল। নরেন্দ্রনাথ ফাউলকারীর অর্ডার দিল এবং আমরা সকলে বেঞ্চিতে নীরবে বসিয়া অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। ফাউলকারী আসিলে আমরা সকলে নরেন্দ্রনাথের সঙ্গে কুসংস্কার ভাঙিতেছি ও ঘৃণা দূর করিতেছি এই ধারণা হৃদয়ে রাখিয়া তাহার অল্পমাত্র গ্রহণ করিলাম। নরেন্দ্রনাথ মহানন্দে প্রায় সমস্তটাই আহার করিল। আমরা একটুতেই সন্তুষ্ট। নরেন্দ্রনাথের কাণ্ডকারখানা নিরীক্ষণ করিতে লাগিলাম এবং তাহার খাওয়া শেষ হইলে সকলে মহানন্দে পুনরায় কাশীপুরের বাগানে ফিরিয়া আসিলাম।

    “তখন রাত্রি প্রায় দশটা। কলিকাতা হইতে ফিরিয়া আমি শশব্যস্তে শ্রীশ্রীঠাকুরের সেবা করিবার জন্য তাঁহার নিকট উপস্থিত হইলাম। শ্রীশ্রীঠাকুর বহুক্ষণ আমাদের কাহাকেও কাশীপুরের বাগানে দেখিতে না পাইয়া উদ্বিগ্ন ছিলেন দেখিলাম। আমাকে সম্মুখে দেখিয়া তিনি আগ্রহের সহিত জিজ্ঞাসা করিলেন : ‘কিরে, কোথায় সব গিয়েছিলি?’

    আমি বলিলাম : কলকাতায় বিডন স্ট্রিটে পীরুর দোকানে।

    –‘কে কে গিছলি?’

    আমি সকলের নাম করিলাম। তিনি সহাস্যে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘সেখানে কি খেলি?’

    আমি বলিলাম : মু–র ডালনা।

    তিনি বলিলেন : ক্যামন লাগলো তোদের?

    আমি : আমার ও শরৎ প্রভৃতির খুব ভাল লাগেনি। তাই একটুখানি মুখে দিয়ে কুসংস্কার ভাঙলাম।

    শ্রীশ্রীঠাকুর উচ্চহাস্য করিয়া বলিলেন, ‘বেশ করেছিস। ভাল হ’ল, তোদের সব কুসংস্কার দূর হয়ে গেল।’

    আমি শ্রীশ্রীঠাকুরের অভয়বাণী শুনিয়া আশ্বস্ত হইলাম।”

    .

    ঠাকুরের ডাক্তারি বিবরণের দিকে আবার নজর দেওয়া যাক।

    ১২ ডিসেম্বর ১৮৮৫ : ঠাকুরের কাশি নেই, কিন্তু পেট গরম। কচি পাঁঠার সুরুয়া খেলেন।

    ২৭ ডিসেম্বর ১৮৮৫ : ডাক্তারি ওষুধ ছাড়াও দৈব ওষুধের প্রয়োগ।

    ।এই ওষুধ এসেছিল শ্রীরামপুর থেকে। শ্ৰীমকে “দেখিয়ে” ঠাকুর বলেন, ইনি দাম দেবেন। কিন্তু নবগোপাল ঘোষ ও চুনীলাল ইতিমধ্যেই দাম দিয়ে দিয়েছেন।

    ভক্ত রামচন্দ্র দত্ত এই পর্যায়ে লিখেছেন, ব্যাধির বিভীষিকা দেখালে রামকৃষ্ণ হেসে উঠতেন, বলতেন, “দেহ জানে, দুঃখ জানে, মন তুমি আনন্দে থাক।”

    চণ্ডীগড় থেকে প্রকাশিত স্বামী নিত্যাত্মানন্দের বহুখণ্ডের বই শ্ৰীম দর্শনে, কাশীপুরের যে বর্ণনা আছে তা এইরকম : পশ্চিমের জানলার তিন চার হাত পূর্বে ঠাকুরের বিছানা। তার শিয়র থাকত দক্ষিণ দেওয়ালের গায়ে। বাঁদিকে তিন হাত দূরে খড়খড়ির জানলা। মেঝেতে মাদুরের ওপর পাতা শতরঞ্চি, তার ওপর শ্রীরামকৃষ্ণের বিছানা।

    ১লা জানুয়ারি ১৮৮৬ : সকালে শ্রীরামকৃষ্ণ দোতলা থেকে নিচেয় নেমে এসে অকাতরে যে আশীর্বাদ বিলিয়েছিলেন তা কল্পতরু উৎসব মারফত এখন লিজেন্ডে পরিণত হয়েছে। মঠ ও মিশনে এই অভাবনীয় ঘটনাকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। যে যা চেয়েছে তা দেওয়া ছাড়াও যে কিছু চায়নি তাকেও রামকৃষ্ণ বলেছেন, তোমার চৈতন্য হোক।

    লীলাপ্রসঙ্গে এর ব্যাখ্যা : “রামচন্দ্র প্রমুখ কোনো কোনো ভক্ত এই ঘটনাটিকে ঠাকুরের কল্পতরু হওয়া বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। কিন্তু আমাদিগের বোধ হয়, উহাকে ঠাকুরের অভয়-প্রকাশ অথবা আত্মপ্রকাশপূর্বক সকলকে অভয়প্রদান বলিয়া অভিহিত করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। প্রসিদ্ধি আছে, ভাল বা মন্দ যে যাহা প্রার্থনা করে কল্পতরু তাহাকে তাহাই প্রদান করে। কিন্তু ঠাকুর তো ওইরূপ করেন নাই, নিজ দেব-মানবত্বের এবং জনসাধারণকে নির্বিচারে অভয়াশ্রয় প্রদানের পরিচয় ওই ঘটনার সুব্যক্ত করিয়াছিলেন।”

    আশ্চর্য বিষয় ঠাকুরের যেসব ভক্ত পরে সন্ন্যাসী হয়েছিলেন তাদের একজনও কল্পতরুর দিনে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। নরেন্দ্রনাথ আগেরদিন অনেক রাত পর্যন্ত ঠাকুরের সেবা করে ক্লান্ত হয়ে উদ্যানবাটির এক তলায় ঘুমোচ্ছিলেন।

    পরের দিন ২ জানুয়ারি ১৮৮৬ শনিবার যে ঠাকুরের শরীরের অবস্থার প্রবল অবনতি হয়েছিল তা ডাক্তার গবেষকরা খুঁজে বার করেছেন। পরের দিন রবিবার অন্তত দু’বার রক্তক্ষরণ। এর ক’দিন আগে তিনি কবিরাজের দেওয়া হরিতালভস্ম সেবন করেন, কিন্তু তা বমি হয়ে যায়।

    ১১ই জানুয়ারি ১৮৮৬ : কবিরাজ নবীন পালের ওষুধ প্রয়োগ। বাগবাজারের এই কবিরাজ শ্যামপুকুরেও এসেছিলেন এবং মর্তলীলার শেষ দিনে (১৫ আগস্ট) কাশীপুরে এসে তার অসহনীয় শারীরিক যন্ত্রণার কথা শোনেন।

    ১৩ জানুয়ারি ১৮৮৬ : ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখেন, গলা থেকে কাঁধ পর্যন্ত সমস্ত ডান দিক ফুলে গিয়েছে। ওজন বেশ কমেছে। একমাত্র ‘কোনিয়াম’ প্রয়োগে সুফল।

    ২৮ জানুয়ারি ১৮৮৬ : ধর্মতত্ত্ব পত্রিকায় রিপোর্ট : ‘গলার স্বর একেবারে বন্ধ’, প্রায় দু-আড়াই সের রক্তক্ষরণ ও বাড়াবাড়ি হয় এদিন রাত্রে।

    শ্যামপুকুরে এসে খরচের ব্যাপারে চিন্তিত হয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্ত বলরাম বসুকে বলেছিলেন, “তুমি আমার খাবার খরচটা দিও। আমি চাঁদার খাওয়া পছন্দ করি না।” বলরাম বসু কৃতার্থ হয়েছিলেন।

    .

    এরপরের বিবরণ শোনা যাক স্বামী অভেদানন্দের ‘আমার জীবনকথা’ থেকে। “কাশীপুর বাগানে ক্রমশ সেবকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতে লাগিল।…রামবাবু প্রভৃতি গৃহস্থ ভক্তরা খাইবার খরচ কমাইবার জন্য সেবকের সংখ্যা যাহাতে অল্প হয় সেই বিষয়ে আলোচনা করিতে লাগিলেন। তাঁহারা বলিলেন, দুইজন সেবক থাকিলেই যথেষ্ট হইবে, অপর সকলে নিজ নিজ বাড়িতে থাকিবে।

    “এই সংবাদ যখন শ্রীশ্রীঠাকুরের কর্ণে উপস্থিত হইল তখন তিনি বিরক্ত হইয়া বলিলেন, আমার এখানে আর থাকবার ইচ্ছে নেই। ইন্দ্রনারায়ণ জমিদারকে টানবো নাকি?-না, বড়বাজারের মাড়ওয়ারীটাকে ডেকে আনব। সেই মাড়োয়ারী অনেক টাকা নিয়ে একবার এসেছিল, কিন্তু সে টাকা আমি গ্রহণ করিনি। তাহার পর বলিলেন, না, কাকেও ডাকার প্রয়োজন নেই। জগন্মাতা যা করেন তাই হবে।

    “তখন নরেন্দ্রনাথ প্রভৃতি আমরা সকলে বসিয়া আছি, তিনি আমাদিগকে বলিলেন, ‘তোরা আমাকে নিয়ে অন্যত্র চল। তোরা আমার জন্য ভিক্ষে করতে পারবি? তোরা আমাকে যেখানে নিয়ে যাবি, সেখানেই যাব। তোরা ক্যামন ভিক্ষে করতে পারিস দ্যাখা দেখি। ভিক্ষার অন্ন বস্ত্র শুদ্ধ। গৃহস্থের অন্ন খাবার আর আমার ইচ্ছে নেই।”

    ভিক্ষেতে বেরিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের ত্যাগী সন্তানদের নানা অভিজ্ঞতা হয়েছিল। কেউ চাল, আলু, কাঁচকলা ভিক্ষা দিল, কেউ বলল, “হোঁকা মিনসে, চাকরি করতে পারিনি, আবার ভিখিরি সেজে ভিক্ষে করতে বার হয়েছিস।” কেউ বলল,”এরা ডাকাতের দল, সন্ধান নিতে এসেছে।” কেউ গুণ্ডার লোক বলে তাড়া করল। শ্রীমা ভিক্ষার চাল থেকে তরল মণ্ড বেঁধে শ্রীশ্রীঠাকুরকে দিলেন, “ভিক্ষান্ন খেয়ে আমি পরমানন্দ লাভ করলাম”, তিনি বললেন।

    ফেব্রুয়ারি মাসে শ্রীরামকৃষ্ণের স্বাস্থ্যবিবরণও অনুসন্ধানী ডাক্তার তারকনাথ তরফদার পরম যত্নে সাজিয়েছেন।

    ৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৮৬ : বৈদ্য মহাফেজের নির্দেশ বুড়িগোপানের পাতা চিবনো, সাতপুরু কলাপাতা দিয়ে ঘা বাঁধতে হ’ল।

    ৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৮৬ : কানের দিকে ফুলো বেড়েছে। নিত্য আহার পাঁচ-ছটাক বার্লি।

    ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৮৬ : গাঁদা পাতার পুলটিস লাগানো হল।

    ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৮৬ : ঘায়ের মুখ নীচের দিকে।

    ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৮৬ : ঠাকুরের জামরুল খাবার ইচ্ছে, কিন্তু খেতে পারলেন না।

    ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৮৬ : ঘি দিয়ে ক্ষতের ড্রেসিং।

    মার্চ মাসের ২৫ তারিখে অপরাহে ডাক্তার রামচন্দ্র দত্ত কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের নবম অধ্যক্ষ ডাক্তার জে এম কোর্টুসকে সঙ্গে নিয়ে কাশীপুরে এলেন।

    পরবর্তী বর্ণনাটুকু স্বামী প্রভানন্দের রচনা থেকে : “অপরাহুঁকাল। ভক্ত রামচন্দ্র দত্ত মেডিকেল কলেজের প্রধান চিকিৎসক ও অধ্যক্ষ ডাঃ কোর্ট সাহেবকে নিয়ে কাশীপুর বাগানবাড়িতে উপস্থিত হয়েছেন।”

    এর যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল লিখেছেন, “যদিচ প্রসিদ্ধ ডাক্তার দ্বারা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা হইতেছে, তথাপি প্রায় আট মাস হইতে যায় আশামতো উপশম না দেখিয়া ভক্তগণ বড়ই উদ্বিগ্ন হন; এবং কি রোগ, বা কি উপায়ে শান্তি হইতে পারে, এই আশায় মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ বিজ্ঞ ডাক্তার কোটস সাহেবকে আনয়ন করেন।”

    ডাঃ কোটুসের পুরো নাম Dr. J. M. Coates। চিকিৎসাবিদ্যায় তার পরিচায়ক উপাধি M.B.B.S., M.D., L.FP.S.G.। তিনি মেডিকেল কলেজের নবম অধ্যক্ষ। ১৮৮০ থেকে ১৮৯০ পর্যন্ত তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। একাজে যোগদানের পূর্বে তিনি ছিলেন মিলিটারিতে এবং সেখানে তিনি Brigadier Surgeon-এর পদে উন্নীত হয়েছিলেন।

    ডাঃ কোট্র জবরদস্ত সাহেব। তিনি রামবাবুর সঙ্গে বাগানবাড়ির দোতলার হলঘরের সামনে উপস্থিত হয়েছে। জুতো-পায়ে গটমট করে তিনি ঘরে ঢুকে পড়লেন। নিকটে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেবক শশী। তার হাতে ডাক্তারি ব্যাগটি তিনি ধরবার জন্য এগিয়ে দেন। শশী আচারনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ। খ্রিস্টান সাহেবের ব্যাগ স্পর্শ করতে তাঁর দ্বিধা লক্ষ্য করে কোস সাহেব রেগে অগ্নিশর্মা হন। তিনি চেঁচিয়ে বলতে থাকেন : You go from here. you ullu. উপস্থিত অন্য একজন ডাক্তারের ব্যাগ ধরেন। এদিকে শশীর প্রতি সাহেব ডাক্তারের রূঢ় আচরণ লক্ষ্য করে শ্রীরামকৃষ্ণ গভীর মর্মাহত হন। শ্রীরামকৃষ্ণ বাধা দিয়ে বলতে থাকেন, ‘আহা! থাক্ থাক্।

    ডাঃ কোক্স মাদুরের উপর বসেছিলেন। ঠাকুরের ব্যবহার্য তাকিয়া ডাক্তারকে দেওয়া হয়েছিল ঠেসান দিয়ে বসবার জন্য। এদিকে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন দেখে মাস্টারমশাই তাকিয়া নিয়ে ঠাকুরের পিঠের পিছনে স্থাপন করেন। শ্রীরামকৃষ্ণ কিছুক্ষণ তাতে হেলান দিয়ে বসেন। তারপর তাকিয়া সরিয়ে দেন। শ্রীরামকৃষ্ণ ডাক্তারের হাত ধরে বলেন, তাকিয়ার উপর হেলান দিয়ে বসতে। ঠাকুরের মিষ্ট আচরণ দেখে ডাক্তারের মন প্রসন্ন হয়ে ওঠে। হৃষ্টচিত্ত ডাক্তার কোট্‌স বলেন : He (Sri Ramakrishna) is naturally a gentleman.

    অতঃপর ডাক্তারসাহেব গলদেশ চাপিয়া পরীক্ষা করিতে প্রয়াস পাইলে, ঠাকুর যেন শিহরিয়া উঠেন এবং ক্ষণকাল অপেক্ষা করিতে বলিয়া তার স্বভাবসমাধিতে নিমগ্ন হন। ডাক্তার তখন ইচ্ছামত পরীক্ষা করিয়া কহেন-ইহাকে ক্যান্সার অর্থাৎ কণ্ঠনালীর ক্ষতরোগ বলে। বহুদিন ব্যাপিয়া

    অবিরাম ঐশ্বরিক কথায় গলমধ্যস্থ সূক্ষ্ম শিরা ও ঝিল্লীর উত্তেজনায় ইহার উৎপত্তি। আমাদের দেশে ইহাকে ধর্মযাজকের কণ্ঠরোগ কহে। আমাদের উগ্র ঔষধ এ-অবস্থায় ক্লেশদায়ক, সুতরাং বর্তমান চিকিৎসাই শুভ।

    আর ডাক্তারের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল সম্বন্ধে রামচন্দ্র দত্ত লিখেছেন, ‘তিনি (ডাক্তার কোটু) তাহার অবস্থা দেখিয়া চিকিৎসাতীত বলিয়া ব্যক্ত করেন।’ শ্রীরামকৃষ্ণের মুখে ভাগবৎ-প্রসঙ্গ শুনবেন। তার অনুরোধে শ্রীরামকৃষ্ণ ইঙ্গিতে বুঝিয়ে বলেন যে ঈশ্বর এক বৈ দুই নন। তিনিই সর্বভূতে বিরাজ করছেন।

    স্বামী সারদানন্দের স্মৃতিকথায় পাওয়া যায় আরও এক টুকরো তথ্য। তিনি বলেছিলেন, কোনো বিলাতফেরত ডাক্তার অসুখের সময় তার কাছে এসেছেন। ঠাকুরের শরীর বিশেষ অসুস্থ দেখে তিনি বললেন, “আপনার শরীর অসুস্থ, তা না হলে আমি আপনার কাছে অনেক শিখতে পারতুম, আপনিও আমার কাছে অনেক শিখতে পারতেন।” কথাপ্রসঙ্গে পুনঃ পুনঃ তিনবার এই কথাটি আবৃত্তি করাতে ঠাকুর উত্তর দেন, “তোমার কাছে আমার কিছুই শিখবার নাই।” ডাক্তার কোটস বিদায় নেবার পর ঠাকুরের নির্দেশে তার বিছানাপত্রে গঙ্গাজল ছিটিয়ে দেওয়া হয়! শ্রীরামকৃষ্ণ বিছানা স্পর্শ করে ‘ওঁ তৎ সৎ মন্ত্র জপ করেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণের ক্রিয়াকলাপ দেখে উপস্থিত ভক্ত ভোলানাথ মুখোপাধ্যায় হেসে ওঠেন। উপস্থিত মাস্টারমশাই প্রমুখ ভক্তগণও হাসতে থাকেন।

    সাহেব ডাক্তারের ফি নিয়ে তিনটি লোকশ্রুতি। প্রথম মত, কল্পতরুর দিনে ঠাকুরের কৃপাধন্য ভূপতিনাথ মুখোপাধ্যায় (ভাই ভূপতি) ডাক্তার কোটসকে বত্রিশ টাকা দেন। স্বামী প্রভানন্দর ফুটনোট :”৪ মার্চ ১৮৮৬ তারিখের বিবরণী থেকে জানা গেছে ভূধর চাটুজ্যে এই টাকা দিতে চেয়েছিলেন। ইনি শশধর তর্কচূড়ামণির শিষ্য, এঁদের কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের বাড়িতে (২০৩/১/১ বিধান সরণি) ঠাকুর গিয়েছিলেন। তৃতীয় মতে ডাক্তার কোট্র ভিজিট নেননি, তিনি এই অর্থ ঠাকুরের সেবার জন্য ব্যয় করতে বলেছিলেন।

    ডাক্তার কোটস যেদিন কাশীপুরে এলেন সেই রাত্রে কিন্তু বেশ বাড়াবাড়ি হ’ল। রোগীর দম বন্ধ হবার উপক্রম। ডাঃ কোটস অবশ্য বলেই গিয়েছিলেন, রোগ চিকিৎসাতীত।

    শনিবার ৮ মার্চ, ১৮৮৬ দোলপূর্ণিমার দিনে কাশীপুর উদ্যানবাটির এক হৃদয়গ্রাহী ছবি এঁকেছেন স্বামী প্রভানন্দ। রামচন্দ্র দত্তের স্ত্রী এলেন ঠাকুরের পায়ে আবির দিতে, বসে বসে পাখার হাওয়া করলেন। কোন্নগর থেকে হাজির হলেন মনোমোহন মিত্র। এঁরই বোন বিশ্বেশ্বরীর সঙ্গে রাখালচন্দ্র ঘোষ (পরে স্বামী ব্রহ্মানন্দের) বিবাহ হয়। পরবর্তীকালে মনোমাহন আমার জীবনকথা’ নামে স্মৃতিকথা লিখতে শুরু করেন, কিন্তু সম্পূর্ণ করতে পারেননি। দোলের দিন ঠাকুরের জন্য মনোমাহন এনেছিলেন, পুন্নাগের ডাল। ঠাকুর কয়েকটি ডালপালা নাকের কাছে ধরেন, কিন্তু এর রুক্ষ গন্ধ সহ্য করতে পারেননি। মনোমোহনের দলে সেদিন ভগ্নী বিশ্বেশ্বরীও ছিলেন।

    সেদিনের আরও এক ঘটনা নজর এড়ানো উচিত নয়। বড়বাজারের ব্যবসায়ী মাড়োয়ারি ভক্তরা সদলে এসেছিলেন। বড়বাজারেই শ্রীরামকৃষ্ণ এক সময় সংবর্ধিত হয়েছিলেন, আজও তারা প্রণাম করলেন এবং জয় সচ্চিদানন্দ’ বলতে বলতে বিদায় নেন।

    গিরিশচন্দ্র ঘোষের ভাই হাইকোর্টের উকিল অতুলচন্দ্র মাঝে-মাঝে ঠাকুরের নাড়ি দেখতেন। অতুলের নাড়িজ্ঞানের প্রশংসা করতেন ঠাকুর। নাড়িজ্ঞান ব্যাধিজ্ঞান এত অতুলের। যেন তেঁহ ধন্বন্তরি বেশে মানুষের।

    বৈকুণ্ঠনাথ সান্যালের লীলামৃতে লেখা হয়েছে, অতুল একসময় ঠাকুরকে বলেন, “নরেন এখনও ওকালতি পরীক্ষায় সচেষ্ট, অথচ উকিল ও ডাক্তারদের সম্বন্ধে ঠাকুরের ধারণা তেমন ভাল নয়।” অতুলের অনুযোগের দু’চারদিন পরে হঠাৎ একদিন নরেন্দ্রনাথ পাগলের মতো এক বস্ত্রে নগ্নপদে গিরিশ-ভবনে উপস্থিত। কারণ জিজ্ঞাসা করায় বলেন অবিদ্যামাতার মৃত্যু ও বিবেক পুত্রের জন্ম-অশৌচে এই অবস্থা। এরপর কাশীপুর উদ্যানে যাইয়া চিরদিনের মতো আত্মনিবেদনছলে প্রভুর শ্রীপাদপদ্মে নিপতিত হইলেন।

    বিখ্যাত হোমিওপ্যাথ ডাঃ রাজেন্দ্রনাথ দত্ত এই পর্বে ঠাকুরকে দেখেন। ঠাকুর তার ক্ষতস্থান দেখিয়ে বলেন, “দেখ দেখি, এইটা ভাল করে দাও না।” ডাঃ দত্ত ওষুধপত্র দেন, তিনি ঠাকুরের রোগকে ক্যান্সার মনে করেননি।

    ডাক্তার মহেন্দ্রনাথ সরকারের ডাইরি অনুযায়ী শ্রীরামকৃষ্ণকে লাইকোপোডিয়াম ২০০ দিয়ে ভাল ফল পাওয়া যাচ্ছে। ২২ মার্চ রাত্রে ভারমিশেলি সেদ্ধ দুধ খেলেন। ৩০ মার্চ তিনি শীতবোধ করতে লাগলেন। এরপরেই সেই বিখ্যাত ঘটনা। নরেন্দ্রনাথ, তারকনাথ ঘোষাল (পরে স্বামী শিবানন্দ) ও কালীপ্রসাদ চন্দ্র (পরে স্বামী অভেদানন্দ) কাউকে কিছু না বলে কাশীপুর থেকে বুদ্ধদেবের সিদ্ধিলাভের পুণ্যক্ষেত্র বোধগয়ায় চলে গেলেন।

    অভেদানন্দ তাঁর ‘আমার জীবনকথায়’ এপ্রিল মাসের উল্লেখ করেছেন, কিন্তু প্রাসঙ্গিক তথ্যদির বিশ্লেষণ করে স্বামী প্রভানন্দের সিদ্ধান্ত, ৩১ মার্চ ১৮৮৫ সন্ধ্যায় এঁরা চলে যান।– বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল তখনকার পরিস্থিতির একটি সুন্দর ছবি এঁকেছেন। এই সময় ঠাকুর বিমর্ষভাবে কোনো যুবককে বলেন-”দ্যাখ, নরেন্দ্র এতই নিষ্ঠুর যে, এই অসুখের সময় আমাকে ছেড়ে কানাই ঘোষালের (পূর্ববন্ধু) ছেলে, যাকে নরেন্দ্র এখানে আশ্রয় দিল, সেই তারকের সঙ্গে কোথায় গেছে, বা তারক তাকে সরিয়ে নিয়ে গেছে, আর কালীও সঙ্গে গেছে।” [বলিয়া রাখা ভাল যে, প্রভুর কৃপা পাইয়াও তারকদাদা কর্মবিপাকে ইতিপূর্বে ছায়ার মতন নিত্যগোপালের (পরে জ্ঞানানন্দ অবধূত) সঙ্গে ফিরিতেন।]

    ঠাকুরকে প্রবোধ দেবার জন্য একজন যুবক বললেন, “কোথা যাবে নরেন্দ্র? হট্‌ করিয়া যাইলেও আপনাকে ছাড়িয়া ক’দিন থাকবে?” তখন প্রভু হাসিমুখে কহেন–ঠিক বলেছিস। যাবে কোথায়? এ তলা বেল তলা, সেই বুড়ীর পোঁদ তলা। আমার কাজের জন্যে মহামায়া যখন তাকে এনেছেন, তখন আমারই পিছনে তাকে ঘুরতে হবে। বলাবাহুল্য, দু’চারদিন পরে নরেন্দ্রনাথ যেন অপরাধীর মতো প্রভুসমীপে উপস্থিত হ’ল।” (৮ এপ্রিল, ১৮৮৬ সন্ধ্যায় তারা ফেরেন)।

    ব্যাপারটা কী ঘটেছিল তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে আমার জীবনকথায়’ (স্বামী অভেদানন্দ)।

    “নরেন্দ্রনাথ, তারকদাদা (স্বামী শিবানন্দ) ও আমি প্রায়ই বুদ্ধদেবের জীবনী পাঠ করিতাম এবং তাঁহার ত্যাগ ও কঠোর সাধনার বিষয় আলোচনা করিতাম। তখন আমরা ললিতবিস্তরের গাথাগুলি বেশ মুখস্থ করিয়াছিলাম। মধ্যে মধ্যে ইহাসনে শুষ্যতু মে শরীরম’ ইত্যাদি আবৃত্তি করিয়া ধ্যান করিতাম। ক্রমে আমাদের তিনজনেরই বুদ্ধদেবের তপস্যার স্থান দেখিবার ইচ্ছা বলবতী হইল।

    “একদিন নরেন্দ্রনাথ, তারকদাদা ও আমি কলিকাতা হইতে নগ্নপদে হাঁটিতে হাঁটিতে সন্ধ্যার পূর্বে কাশীপুরের বাগানে উপস্থিত হইলাম। ইচ্ছা এত বলবতী হইল যে, আমরা আর থাকিতে পারিলাম না।

    “নরেন্দ্রনাথ বলিল, ‘চ, কাকে কিছু না বলেই আমরা বুদ্ধগয়ায় চলে যাই। শ্রীশ্রীঠাকুরকে আমরা বুদ্ধগয়ায় যাওয়ার কোনো কথা বলিলাম না। নরেন্দ্রনাথ আমাদের তিনজনের জন্য রেলভাড়া সংগ্রহ করিয়া প্রস্তুত হইল। আমরা কৌপীন, বহির্বাস ও কম্বল লইয়া প্রস্তুত হইলাম।

    ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে বরানগর-খেয়াঘাট হইতে গঙ্গা পার হইয়া আমরা তিনজনে বালির দিকে যাত্রা করিলাম। রাস্তার ধারে একটি মুদির দোকানের রকে সেই রাত্রি কাটাইলাম। তার পরদিন অতি প্রত্যুষে উঠিয়া বালি স্টেশনে গিয়া রেলগাড়িতে উঠিলাম। পরদিন গয়াধাম দর্শন করিয়া বুদ্ধগয়ায় উপস্থিত হইলাম।

    “বুদ্ধগয়ায় উপস্থিত হইয়া আমরা মন্দিরে প্রবেশ করিলাম, পরে বুদ্ধমূর্তি দর্শন করিয়া আনন্দে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিলাম।

    মন্দিরের অভ্যন্তরে গম্ভীর শান্ত পরিবেশ। মন অমনি সমাধি-সাগরে ডুবিয়া যায়। আমরা ধ্যানের সময়ে অপূর্ব-নির্বাণসুখের আভাস ও আনন্দ অনুভব করিতে লাগিলাম।

    “পরে মন্দিরের বাহিরে বোধিদ্রুমের সম্মুখে সম্রাট অশোক-নির্মিত বজ্রাসনে বসিয়া আবার তিনজনে ধ্যান করিতে লাগিলাম। নরেন্দ্রনাথ অপূর্ব এক জ্যোতিঃ দর্শন করিল। আমার সর্বশরীরেও যেন শান্তিস্রোত প্রবাহিত হইতে লাগিল। তারক দাদাও গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হইয়া রহিলেন।

    দুই ঘণ্টা ধ্যানের পর আমরা তিনজনে নিরঞ্জনা নদীতে স্নান করিয়া মাধুকরি করিলাম এবং কিছু জলযোগ করিয়া তথাকার ধর্মশালায় বিশ্রাম করিতে লাগিলাম। ওই ধর্মশালায় রাত্রিযাপনও করিলাম। আমাদের সঙ্গে কোনো গরম কাপড় ছিল না, সুতরাং রাত্রিতে শীতের জন্য আর নিদ্রা হইল না। তাহাতে আবার মধ্যরাত্রে নরেন্দ্রনাথের পেটের অসুখ হইল। যাহা আহার করিয়াছিল তাহা সম্ভবতঃ হজম হয় নাই। দুই-চারিবার দাস্ত হইল এবং পেটের যন্ত্রণায় সে কষ্ট পাইতে লাগিল।

    “আমরা বিশেষ চিন্তিত হইয়া পড়িলাম। কি করিব কিছুই স্থির করিতে পারিলাম না। তখন কাতর হইয়া শ্রীশ্রীঠাকুরের নিকট প্রার্থনা করিতে লাগিলাম। কিছুক্ষণ পরে দেখি নরেন্দ্রনাথ একটু সুস্থ বোধ করিল। তখন শ্রীশ্রীঠাকুরকে কিছু বলিয়া আসা হয় নাই, তাহার অসুখের সময়ে আমরা তাঁহাকে ছাড়িয়া চলিয়া আসিয়াছি এবং তাহার অনুমতি না লইয়া আসা অন্যায় হইয়াছে–এই সকল কথাই ক্রমাগত মনে হইতে লাগিল।

    “ক্রমশই আমাদের মন অস্থির হইয়া উঠিল। যেন এক আকর্ষণ অনুভব করিতে লাগিলাম। নরেন্দ্রনাথের পেটের অসুখ তখনও সম্পূর্ণ সারে নাই অথচ কাহারও নিকট কোনোরূপ সাহায্য পাইবার উপায় নাই। দেখিলাম রেলভাড়াও সঙ্গে নাই। কাজেই আমরা বিষম বিভ্রাটে পড়িলাম, কিছু স্থির করিতে পারিলাম না। সুতরাং শীঘ্র কাশীপুরে ফিরিয়া যাওয়া কর্তব্য মনে করিলাম। কিন্তু ফিরিয়া যাইবার কোন পাথেয় তো আমাদের কাছে ছিল না।

    “তখন নরেন্দ্রনাথ বলিল : চল্, আমরা বুদ্ধগয়ার মোহন্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি ও কিছু অর্থ ভিক্ষা করি।আমি ও তারকদাদা তাহাতে সম্মত হইলাম।

    “প্রাতঃকালে নিরঞ্জনা নদীর বালির চর পার হইলাম। নদীর বালি এত ঠাণ্ডা ছিল যে, আমাদের খালি-পা যেন পুড়িয়া যাইতে লাগিল। ঠাণ্ডায় আগুন পোড়ার ন্যায় পা জ্বালা করে তাহা পূর্বে আমরা জানিতাম না। অতিকষ্টে হাঁটিয়া নিরঞ্জনা নদী পার হইয়া মোহন্তের মঠে উপস্থিত হইলাম। মঠের দশনামী সন্ন্যাসীদের সহিত আমাদের আলাপ হইল। সেখানে সাধুদের পঙ্গদে বসিয়া মধ্যাহ্নভোজন করিয়া বিশ্রাম করিলাম। “নরেন্দ্রনাথ সঙ্গীতের অত্যন্ত ভক্ত শুনিয়া মঠের মোহন্ত মহারাজ তাহাকে গান শুনাইতে অনুরোধ করিলেন। নরেন্দ্রনাথ যদিও পেটের অসুখে অত্যন্ত দুর্বল হইয়াছিল, তথাপি তাহার গলার তেজস্বিতা কমে নাই। সে কয়েকটি ভজন-গান গাহিল। তাহার অপূর্ব সঙ্গীত-পরিবেশনে মোহন্ত মহারাজ অত্যন্ত প্রীত হইলেন। পরে আমরা বিদায় লইবার সময়ে আমাদের পাথেয় নাই শুনিয়া তিনি কিছু পাথেয় দিলেন।

    “আমরা পুনরায় নিরঞ্জনা নদী পার হইয়া বুদ্ধগয়ায় আসিলাম এবং গয়াধামে বাঙালি ভদ্রলোক উমেশবাবুর বাড়িতে অতিথি হইলাম। সেখানে সন্ধ্যার পর নরেন্দ্রনাথ আবার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ও ভজনগান করিল। তথায় অপূর্ব সঙ্গীত পরিবেশনে সকলে মুগ্ধ হইলেন। উমেশবাবু আমাদের বিশেষ যত্ন করিয়া রাত্রে থাকিবার স্থান দিলেন। পরদিন প্রাতে রেলে চড়িয়া আমরা কলিকাতা-অভিমুখে যাত্রা করিলাম ও পরদিন সন্ধ্যার সময় কাশীপুরের বাগানে উপস্থিত হইলাম।

    “এইদিকে শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের জন্য বিশেষ চিন্তিত ছিলেন এবং ফিরিয়া আসিতে দেখিয়া মহানন্দে সাগ্রহে জিজ্ঞাসাবাদ করিতে লাগিলেন। আমরা বুদ্ধগয়ার সমস্ত ঘটনাই আনুপূর্বিক তাহাকে নিবেদন করিলাম। সকল ঘটনা শুনিয়া তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইলেন এবং প্রশান্তভাবে বলিলেন, বেশ করেছিস।”

    শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ সবদিক থেকে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বই। নরেন্দ্রনাথ সম্বন্ধে স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণই বলেছিলেন, “কেন ভাবছিস? কোথায় যাবে সে? ক’দিন বাইরে থাকতে পারবে? দেখ না এল বলে।” তারপর তিনি হাসতে হাসতে বলেন : “চারখুট ঘুরে আয়, দেখবি কোথাও কিছু নেই; যা কিছু আছে সব (নিজের শরীর দেখিয়ে) এইখানে।”

    বাবুরাম মহারাজ (পরে স্বামী প্রেমানন্দ) এই প্রসঙ্গে বলে গিয়েছেন, “পরমহংসদেব কেঁদেছিলেন তিনি বললেন যে, ও (নরেন্দ্র) যেরকম উঠে-পড়ে লেগেছে যা চাচ্ছে তা শীঘ্র পেয়ে যাবে।”

    ৬ এপ্রিল ১৮৮৬ : ডাক্তার রাজেন্দ্রনাথ দত্ত এলেন কাশীপুরে, পরে শ্ৰীমকে ডাক্তার বলেন, প্রথম টের পেলুম যে ওঁর ছেলেবেলায় গলায় গণ্ডমালা (স্ক্রোফুলা) ছিল।

    ঠাকুরের পেটে পোড়া দাগ দেখে ডাঃ দত্ত জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি?

    মাস্টারমশাই বলেন, পিলের চিকিৎসা হয়েছিল।

    শ্রীরামকৃষ্ণ ইঙ্গিতে বলেন, সে বড় ছোটবেলায়।

    ডাক্তার দত্ত : কর্তা দেখছি সবরকমই করে বসে আছেন।

    .

    অসুখ যতই থাক, আনন্দকে কখনও বিসর্জন দেওয়া হয়নি কাশীপুর থেকে। তারক (পরে স্বামী শিবানন্দ) একদিন পাঁচক অসুস্থ হওয়ায় সবার জন্য রান্না করছিলেন–ডাল, ভাত, রুটি আর চচ্চড়ি। “চচ্চড়িতে তখন ফোড়ন দিয়েছি, ঠাকুর উপর হতে সে ফোড়নের গন্ধ পেয়ে জনৈক সেবককে জিজ্ঞাসা করলেন-”হাঁরে, কি রান্না হচ্ছে রে তোদের? বাঃ! চমৎকার ফোড়নের গন্ধ ছেড়েছে তো! কে রাঁধছে?” আমি রাঁধছি শুনে তিনি বললেন-”যা, আমার জন্যে একটু নিয়ে আয়।” সেই চচ্চড়ি ঠাকুর একটু খেয়েছিলেন।

    ২৯ এপ্রিল ১৮৮৬ : কোনো কোনো চিকিৎসকের আশা রামকৃষ্ণ সম্পূর্ণ আরোগ্যের পথে। ভক্ত নাগ মশাই ঐদিন অনেক খুঁজে ঠাকুরের জন্যে টাটকা আমলকী এনেছেন। নাগমশাইকে ভাত বেড়ে দেওয়া হ’ল, তিনি জানালেন, আজ একাদশী।

    এর পরের ঘটনা শ্রীশ্রীমায়ের কথা থেকে স্বামী প্রভানন্দ উদ্ধৃতি দিয়েছেন। মাকে ঠাকুর বললেন, “ঝাল দিয়ে একটু চচ্চড়ি বেঁধে দাও। ওরা পূর্ববঙ্গের লোক, ঝাল বেশি খায়।” ঠাকুর আরও বললেন, “একখানা থালায় সব বেড়ে দাও। ও প্রসাদ না হলে খাবে না।” ঠাকুর তা প্রসাদ করে দিতে বসলেন। সেসব দিয়ে ভাত প্রায় এত কটা খেলেন।

    মা বললেন, “এই তো বেশ খাচ্ছ, তবে আর সুজি খাওয়া কেন? ভাত দুটি দুটি খাবে।” ঠাকুর বললেন, “না, না, শেষ অবস্থায় এই আহারই ভাল।” মে মাসের ১৭ তারিখে শারীরিক অবস্থার অবনতি। দুদিন পরের রিপোর্ট, শরীরে অসহ্য জ্বালা। পরের সপ্তাহে তিনি ইঙ্গিতে ফিসফিস কথা বলছেন। দেহ কঙ্কালসার।

    .

    এরপর থেকেই বেশ কয়েক মাস ধরে কাশীপুর সংবাদের অপ্রতুলতা। রোগে জর্জরিত হয়েও শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর অনুগত সেবকদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। যোগীন (পরে স্বামী যোগানন্দ) অসুস্থ শুনে তিনি বললেন, “সেবার ত্রুটি হবে বলে, তোমরা শরীরের যত্ন নিচ্ছ না। তোমাদের শরীর ভেঙে গেলে আমার যত্ন করবে কে? তোমরা বাপু অসময়ে খাওয়াদাওয়া করো না।”

    এরপর থেকেই কাশীপুরের বিস্তারিত বিবরণের ভাটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ডাক্তার সরকারও অনেকদিন অনুপস্থিত, ডাক্তার রাজেন দত্তের ভিজিটও অনিয়মিত। শ্রীরামকৃষ্ণের চিকিৎসার কি হবে ভেবে উপস্থিত সবাই বেশ চিন্তিত।

    কথামৃতের কথক মাস্টারমশাই মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত সম্ভবত এই সময় কম আসতেন। তার তখন খুব বিপদ, চাকরি গিয়েছে। বিদ্যাসাগরের ইস্কুলে তিনি প্রধান শিক্ষক। প্রবেশিকা পরীক্ষায় ছাত্রদের ফল আশানুরূপ না হওয়ায় বিদ্যাসাগর তাকে ডেকে অপমানকর কথাবার্তা বলেছেন। বিদ্যাসাগর মুখের ওপর বলেছেন, পরমহংসদেবের কাছে অত্যধিক যাতায়াতের ফলেই এ ধরনের অবহেলা ঘটেছে।

    অপমানিত মাস্টারমশাই পরেরদিন (শুক্রবার) রেজিগনেশন চিঠি পাঠিয়ে দিলেন। সংসার চলবে কিভাবে তা না চিন্তা করেই পদত্যাগ। কাশীপুরে শয্যাশায়ী ঠাকুর সব শুনলেন, তারপর সাড়ে তিনটে পাশ’ ভক্তকে তিনবার বললেন, বেশ করেছ, বেশ করেছ, বেশ করেছ।

    রবিবারও মাস্টারমশাই কাশীপুর বাগানবাড়িতে এসেছিলেন। ওইদিন একসময় গঙ্গাধর নরেন্দ্রনাথকে বললেন, রাজ চ্যাটার্জি বলেছে, ছাত্রেরা মাস্টারমশাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল। মাস্টারমশাই নাকি একথা শুনে বিমর্ষ ও চিন্তিত হয়ে পড়েন।

    “নরেন্দ্রনাথ ফোঁস করে ওঠেন। তিনি বলেন : কি বলছিস, মাস্টারমশাই কি কেয়ার করেন? তোর বিদ্যাসাগর বুঝি মনে করলে মাস্টারমশাইয়ের পরিবার ছেলেপুলে আছে, তিনি আর চাকরি ছাড়তে পারবেন না।”

    .

    এর পরেই প্রায় লক্ষ্য দিয়ে ১৮৮৬ আগস্ট মাসে এসে পড়া। এবার আমরা শ্রীরামকৃষ্ণলীলামৃতের লেখক বৈকুণ্ঠনাথ সান্যালের ওপর একটু বেশি নির্ভর করব।

    ঠাকুর “ক্ষুধা সত্ত্বেও অনুমাত্র তরল পদার্থ গ্রহণে অসমর্থ হন। কোনোমতে যদি কিঞ্চিৎ পান করিলেন, অমনি দ্বিগুণমাত্রায় ক্লেদ নির্গত হওয়ায় আরও ক্লেশ বোধ করেন।…একদিন শ্রীমুখ-বিগলিত ক্লেদমিশ্রিত পায়স হস্তে নরেন্দ্রনাথ কাতরভাবে কহেন–প্রভুর সুব্যবস্থায় তাঁহার প্রসাদ ধারণে আমাদের চিত্তপ্রসাদ হইয়াছে, কিন্তু এখন বিধি বিরূপ। আইস, তাহার সত্তাস্বরূপ ইহা পান করিয়া আমাদের অস্থিমজ্জায় যেন তাহার অবাধ অধিষ্ঠান বোধ করিতে পারি। এই বলিয়া কিয়দংশ স্বয়ং পান করিলেন এবং আমাদিগকেও করাইলেন।…”

    রসিক চূড়ামণি ঠাকুর। তিনি বলছেন : “দেখছি সাগরপারে অনেক শ্বেতকায় ভক্ত আছে, তাদের সঙ্গে মিশতে হলে তাদের মত পোশাকের দরকার। তাই ইচ্ছে হয় ইজের পরে ডিশবাটিতে খাই। কহিবামাত্র সকলই সংগ্রহ হইল এবং প্রভুও উহা ব্যবহারে আনন্দ করিলেন। প্রভুর প্রেরণায় পাশ্চাত্য দেশে তাঁহার মহিমা প্রচারকালে, নরেন্দ্রনাথ তাঁহারই কথা স্মরণ করিয়া ওই দেশের উপযোগী পরিচ্ছদ ব্যবহার করেন। নচেৎ সন্ন্যাসী হইয়া সাহেব সাজিবার বাসনায় নহে।”

    স্বামী সারদানন্দের ‘শ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ’ ঠাকুরের বিষয়ে আমাদের কাছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আকর গ্রন্থ। এই গ্রন্থে কাশীপুর পর্বটি যে প্রায় অনুপস্থিত তা গ্রন্থকার নিজেও অনুভব করতেন। স্বামী নির্লেপানন্দ এ বিষয়ে মূল্যবান তথ্য দিয়েছেন : “শেষ জীবনে শ্রীরামকৃষ্ণের চরিতকথার বাকিটুকু (কাশীপুর বাগানের ঘটনাবলী) লিখিয়া লীলাপ্রসঙ্গ-কে পূর্ণ অবয়ব ও সম্পূর্ণ গঠন দিবার জন্য অনুরুদ্ধ হইলে, একদিন তিনি বলিয়াছিলেন-”দ্যাখো, এখন দেখছি, ঠাকুরের সম্বন্ধে কিছুই বোঝা হয়নি। তার ইচ্ছা হয়, লেখা হবে।”

    সে প্রত্যাশা থেকে অনুরাগীরা বঞ্চিত হলেও, ছড়িয়ে ছিটিয়ে লীলাপ্রসঙ্গের এখানে ওখানে যা আছে তাও মন্দ নয়। কিন্তু সে সবের খোঁজখবর করার আগে দ্রুত গোটা কয়েক টুকরো খবর দেওয়া যাক। যেমন শ্রীরামকৃষ্ণ কখনই তার কর্তব্য ভুলতে চাইতেন না। নিজের দিদি কাত্যায়নীর সন্তানদের সম্বন্ধে দাদার ছেলে রামলালকে বললেন, “ওদের খবর নিসরে রামলাল, নয়তো ওরা বলবে আমাদের মামার বাড়িতে কেউ নেই। পুজোর সময় এক একখানা কাপড় দিস।” এই ভাইপোকে ঠাকুর আদর করে রামনেলো’ বলে ডাকতেন।

    শ্রীশ্রীসারদামণিকে ঠাকুর বলেছিলেন, “তুমি কামারপুকুরে থাকবে, শাক বুনবে, শাকভাত খাবে আর হরিনাম করবে।” বরং পরতী ভাল, পরঘরী ভাল নয়, কামারপুকুরে নিজের ঘরখানি কখনও নষ্ট কোরো না। কারও কাছে একটি পয়সার জন্যে চিতহাত কোরো না, তোমার মোটা ভাত কাপড়ের অভাব হবে না। সারদামণিকেই ব্যধিযুক্ত কণ্ঠে তিনি যে গানটি গেয়েছিলেন, তা তাৎপর্যপূর্ণ :

    ‘এসে পড়েছি যে দায়, সে দায় বলব কায়।
    যার দায় সে আপনি জানে, পর কি জানে পরের দায়।’

    শেষ গানও শুনেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ এই কাশীপুরে ভবিষ্যৎ স্বামী বিবেকানন্দের উদাত্ত কণ্ঠে। ভক্ত সেবকরা গানের মধ্য দিয়ে প্রায়ই দুঃখকে ভুলবার চেষ্টা চালাতেন কাশীপুরে।

    স্বামীজির মধ্যমভ্রাতা মহেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন, মহাপ্রয়াণের কদিন আগেও চলতো নরেন্দ্রনাথের গানের মহড়া। রাত্রে তারা “উদ্দাম কীর্তন শুরু করলেন। চীৎকার ধ্বনিতে বাড়ি কাপিতে লাগিল। শ্রীরামকৃষ্ণ কীর্তনের দলের ভিতর থেকে একজনকে ডেকে বললেন, তোরা বেশ রে, কেউ মরে, কেউ হরিবোল বলে…পরক্ষণেই আহ্লাদ করে বললেন, ওর সুরটা এইরকম, অমুক জায়গায় এক কলি তোরা ভুলেছিলি। ঐখানে ঐ কলিটা দিতে হয়।”

    কাশীপুরে শেষ পর্ব সম্বন্ধে ভক্তপ্রবর রামচন্দ্র তার ‘জীবনবৃত্তান্তে’ লিখেছেন : “অবস্থার দিন দিন পরিবর্তন হইতে লাগিল। যখন… উত্থান শক্তি রহিত হইল, একেবারে স্বরভঙ্গ হইয়া গেল, তখন অনেকেই হতাশ হইয়া পড়িলেন। ডাক্তারি, কবিরাজি, আধিভৌতিক, টোটকা প্রভৃতি সকলেরই সাহায্য লওয়া হইয়াছিল, কিন্তু কিছুই হইল না। কোনো কোনো ভক্ত স্ত্রীলোক তারকনাথের সোমবার করিতেন এবং নারায়ণের চরণে তুলসী দিতেন, কোন ভক্ত তারকনাথের চরণামৃত ও বিল্বপত্র আনাইয়া ধারণ করাইলেন, কেহ কেহ (শ্রীমা) হত্যা দিয়াছিলেন। কিন্তু সকলই বিফল।”

    অসুস্থ অবস্থায় ভাবসমাধি সম্পর্কে একালের বিশ্লেষক ডাক্তার তরফদারের ব্যাখ্যা : “ভাব বা সমাধি হলে গলায় ব্যথা বাড়ে। সম্ভাব্য কারণ : সমাধিকালে কুম্ভক’ বা শ্বাসবন্ধ থাকে। হয়তো এসময় তোকাল কর্ড দুটি পরস্পর চেপে লেগে গ্লটিসকে সজোরে বন্ধ করে রাখে। ফুসফুস থেকে নিশ্বাসবায়ু তাতে ধাক্কা মারে।” সমাধিকালে ক্যান্সার কোষ থেকে যন্ত্রণাদায়ক রাসায়নিক বের হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। তবুও রামকৃষ্ণের সমাধি বাধা মানেনি কোনো। শেষদিনেও প্রায় দু’ঘণ্টা তিনি ছিলেন গভীর সমাধিমগ্ন।”

    ডাক্তারি বিশ্লেষণে রবিবার ৩১শে শ্রবণ ১২৯৩ (১৫ আগস্ট ১৮৮৬) সকালে কাশীপুরে শ্রীরামকৃষ্ণ “বেশ ভালো”।

    অন্য বিবরণ :”এইদিন সকাল থেকেই ঠাকুরের ব্যাধি সর্বাপেক্ষা বৃদ্ধি পায় এবং তিনি যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকেন। তাঁকে বালিশে ঠেস দিয়ে বসিয়ে রাখা হয় যন্ত্রণা লাঘবের জন্যে।”

    শ্রীশ্রীমা একবার কাছে যেতেই তিনি বলেন, “এসেচ? দেখ, আমি যেন কোথায় যাচ্ছি–জলের ভিতর দিয়ে—অ-নেক দূর।”

    শ্রীশ্রীমা কাঁদতে থাকায় ঠাকুর বলেন, “তোমার ভাবনা কী? যেমন ছিলে, তেমন থাকবে। আর এরা আমায় যেমন করচে, তোমায়ও তেমনি করবে।”

    বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল লিখেছেন, “প্রিয়তম নরেন্দ্রনাথকে পরমতত্ত্ব উপদেশ-মানসে তগতপ্রাণ শশিভূষণকেও নিম্নতলে যাইতে বলিয়া নরেন্দ্রনাথকে কহেন–ভালো করে দেখ যেন উপরে কেহ না থাকে। এইবার প্রভু তাহাকে অতিনিকটে বসাইয়া, যে ব্রহ্মতান সৃষ্টিকাল হইতে গুরু পরম্পরায় উপদিষ্ট হইয়াছে, তাহাই উদ্দেশ করিয়া কহিলেন–যদিও আমাতে তোমাতে অভেদাত্মা তথাপি বাহ্যদৃষ্টিতে গুরু-শিষ্যরূপে পৃথক ছিলাম। আজ তোমাকে আমার যথাসর্বস্ব অর্পণ করে ভিখারি হয়ে নামে রামকৃষ্ণ রহিলাম; তুমি রাজরাজেশ্বর হয়ে দ্বিতীয় রামকৃষ্ণ হলে।”

    আরও বর্ণনা রয়েছে। বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল লিখছেন : “আজ ধারা শ্রাবণের শেষদিন, অথবা ভাগ্যহীন আমাদের অশ্রুধারার প্রথম দিন।…কিছু না খাওয়ায় সেবকগণ ভাবিলেন-বোধহয় বেদনা বৃদ্ধিতে আহারে অনিচ্ছা।” আজ ভাতের পায়স খাব, শুনিয়া সকলে আশ্বস্ত। পায়স আনিলে বলিলেন, বসে খাব।

    এই খাওয়া প্রসঙ্গে বর্ননা চাররকম খাবারের প্রসঙ্গ পাওয়া যাচ্ছে : ভাতের পায়েস, ভাতের মণ্ড, সুজির মণ্ড ও খিচুড়ি। বৈকুণ্ঠনাথের বর্ণনা অনুযায়ী গলা দিয়ে কিছুই যখন ঢুকছে না তখন ঠাকুর তার সেবকদের বলেন, “ভিতরে এত ক্ষিধে যে হাঁড়ি-হাঁড়ি খিচুড়ি খাই; কিন্তু মহামায়া কিছুই খেতে দিচ্ছেন না।”

    “আজীবন কার্যকলাপ যার সবই নতুন, তাঁর খিচুড়ি খাইবার ইচ্ছাও এক নতুন ব্যাপার। অনুশীলনে দেখা যায়, অবতার পুরুষমাত্রেই এক এক প্রকার ভোজ্য প্রিয় ছিল। অযোধ্যানাথের রাজভোগ, বৃন্দাবনচন্দ্রের ক্ষীরসর, অমিতাভের ফাণিত (এক প্রকার মিষ্টান্ন), শঙ্করের প্রিয় ভোজ্য কি জানা যায় না; তবে তার সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের ভোজে পুড়ীলাড়ুর সমাদর হয়। নিমাইচাঁদের মালসাভোগ (মৃৎপাত্র-পূরিত চিড়া মুড়কি দধি) …দক্ষিণেশ্বর-ভূষণ প্রভু এক অভিনব সুখসাধ্য খেচরান্ন ভোজনের ইচ্ছা করিলেন। তাই প্রিয়তম নরেন্দ্রনাথ প্রভুর জন্মোৎসবে তাহারই অভীপ্সিত খেচরান্ন দ্বারা তাহার বিরাট রূপের এরূপ বিরাট ভোগের ব্যবস্থা করেন, যাহা ভারতের কেন, জগতের কোনো প্রদেশেই দেখা যায় না।”

    শেষের সেই রবিবারে কাশীপুরে খিচুড়ি নিয়ে আরও গোলোযোগ। সেবকদের জন্য শ্রীমা খিচুড়ি রাঁধছিলেন, তার নিচের অংশ ধরে গেল। ছেলেরা তাই খেল। তার একটা শাড়ি ছাদে শুকতে দেওয়া হয়েছিল। সেটা আর পাওয়া গেল না। তুলবার সময় পড়ে একটা জলের কুঁজো চুরমার হয়ে গেল।

    রবিবারের অপরাহে জনৈক ব্যক্তি ঠাকুরের কাছে এসেছিলেন। যোগ সম্বন্ধে আলোচনা করতে। ঠাকুর তার সঙ্গে পুরো দু’ঘণ্টা কথা বললেন। বুদ্ধের ইহ-জীবনের শেষ দিনটিতে নাকি এরূপ ঘটেছিল। একজন সেবক শশী (পরে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ) কয়েক মাইল দৌড়ে গিয়ে ডাক্তার নবীন পালকে ধরে নিয়ে, গাড়িতে চড়িয়ে তাকে কাশীপুরে নিয়ে আসেন।

    ঠাকুর তখন ডাক্তারকে বললেন, “আজ আমার বড্ড কষ্ট হচ্ছে। নাড়ী পরীক্ষা করে ডাঃ পাল তেমন কিছু বুঝতে পারলেন না।

    ডাক্তারকে ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন, “সারবে?” ডাক্তার নিরুত্তর।

    ঠাকুর : “কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। রোগ দুঃসাধ্য হয়েছে?”

    “তাই তো” বলে ডাক্তার পাল মাথা নিচু করে রইলেন।

    ভক্ত দেবেন্দ্রনাথ মজুমদারকে লক্ষ্য করে ঠাকুর বললেন, “বলে কি গো? এরা এতদিন পরে বলে সারবে না।”

    গিরিশের ভ্রাতা অতুলকৃষ্ণ ঘোষ নাড়ী পরীক্ষা করে আশঙ্কা করলেন, ক্ষয় নাড়ি। ঠাকুর ভক্তদের বললেন, একেই নাভিশ্বাস বলে।

    তাঁর কথায় ভক্তদের বিশ্বাস হল না, তারা সুজির বাটি নিয়ে এল। অন্য মতে, সেবকরা শ্রীরামকৃষ্ণকে ভাতের মণ্ড খেতে দেন।

    পারিপার্শ্বিক বিবেচনা করে স্বামী প্রভানন্দের সিদ্ধান্ত, তখন প্রায় রাত ন’টা। এই সময় আবার সমাধি। নরেন্দ্রনাথ সবাইকে হরি ওঁ তৎ সৎনাম কীর্তন করতে বললেন।

    যখন সমাধি ভঙ্গ হল তখন রাত প্রায় এগারোটা। সেবকগণ তাকে উঠে বসিয়ে পথ্য খাওয়াবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। “উঠব? ভিরমি খাব যে,” ঠাকুর বললেন।

    শ্ৰীম : “মাথায় একটু জল ও বাতাস দিলে হয় না?”

    শশীকে ঠাকুর বললেন, “নাড়ছিস কেন?” তখন তুলো ভিজিয়ে মুখে জল দেওয়া হচ্ছিল।

    ঠাকুর এখন ক্ষুধার্ত। সুজির পায়েস পথ্য হিসেবে নিলেন। অন্য মতে ভাতের মণ্ড। সেবক শশীর ইংরিজিতে রাখা নোট অনুযায়ী, “খাবার হিসেবে পুরো এক গেলাস পায়সম পান করেন। তার পর নাকি ঠাকুর বললেন, “আঃ শান্তি হল। এখন আর কোনও রোগ নাই।”

    বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল এই পর্বে নৈষ্ঠিক পূজারী ব্রাহ্মণ রামকৃষ্ণের একটি ছবি এঁকেছেন, যাকে স্বামী প্রভানন্দ ‘বিবৃতি নির্ভরযোগ্য নয়’ বলেছেন।

    বৈকুণ্ঠনাথের লেখাটি এইরকম : ঠাকুর পায়স গ্রহণোদ্যত, এমতকালে দেখেন দুই অব্রাহ্মণ সেবক শয্যা ধারণ করে আছেন।

    “ওদের বিছানা ছেড়ে দিতে বল।”

    “কেন করবে?” নরেন্দ্রর এই প্রশ্নে শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, “ওরে ভাত যে রে।”

    “আপনি তো বিধি-নিষেধের পার, তথাপি এ আদেশ কেন?”

    নরেন্দ্রকে ঠাকুর বললেন, “ওরে ব্রাহ্মণ-শরীর যে রে। তাই ব্রাহ্মণ সংস্কার যাবার নয়।”

    বৈকুণ্ঠনাথের ব্যাখ্যা, “ঠাকুর সকলের আলয়ে অনুগ্রহণ করেন নাই। বলতেন, “লুচি-তরকারি খেতে পারা যায়, কিন্তু অন্ন নহে।”

    কাশীপুরের সবদিক সাবধানে বিচার করে স্বামী প্রভানন্দের সঙ্গে একমত এই লেখক, এই বিবৃতি নির্ভরযোগ্য নয়।

    ঠাকুরের শেষ পর্ব সম্পর্কে স্বামী অভেদানন্দের ‘আমার জীবনকথা একটি নির্ভরযোগ্য রচনা। “সেইদিন রাত্রে ১টার সময় আমরা তাঁহার নিকট বসিয়াছিলাম। সাধারণত যেমন সমাধি হইত, সেইরূপ হইল। তাঁহার দৃষ্টি নাগ্রের উপর স্থির হইয়া রহিল। নরেন্দ্রনাথ উচ্চৈঃস্বরে ‘ওঁকার উচ্চারণ করিতে আরম্ভ করিল। আমরাও সমবেত স্বরে ওঁকার ধ্বনি করিতে লাগিলাম।…সমস্ত রাত্রি কাটিয়া গেল, শ্রীশ্রীঠাকুরের বাহ্যজ্ঞান আর ফিরিয়া আসিল না।”

    শ্রাবণের শেষদিনে কাশীপুরে ঠাকুরের মহাপ্রস্থানের বর্ণনা দিতে গিয়ে রোমাঁ রোঁলা স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। “শেষ দিন রামকৃষ্ণ শেষপর্যন্ত আমাদের সহিত আলাপ করেন।… তিনি আমার দেহের উপর পাঁচ ছয়টি বালিশে ভর করিয়া বসেন। আমি বাতাস করিতেছিলাম। নরেন্দ্র তাহার পা লইয়া টিপিয়া দিতেছিলেন। রামকৃষ্ণ তাহার সহিত কথা বলিতেছিলেন। কহিতেছিলেন, কি করিতে হইবে। তিনি বারে বারে বলেন, এ ছেলেদের সাবধানে দেখো’.. তারপর তিনি শুইতে যান। একটা বাজিলে অকস্মাৎ তিনি একপাশে গড়াইয়া পড়েন। তাহার গলায় ঘড় ঘড় শব্দ হইতে থাকে।… নরেন তাড়াতাড়ি তাহার পা লেপে ঢাকিয়া ছুটিয়া সিঁড়ি বাহিয়া নীচে নামিয়া যান। এ দৃশ্য তিনি সহিতে পারিতেছিলেন না। ডাক্তার নাড়ী দেখিতেছিলেন। তিনি দেখিলেন, নাড়ী বন্ধ হইয়া গিয়াছে। আমরা সকলে ভাবিলাম উহা সমাধি।”

    রোলাঁর নিজস্ব সংযোজন : ১৫ আগস্ট ১৮৮৬-”সেদিন অপরাহেও তার যথেষ্ট শক্তি ছিল। তিনি ক্ষত-পীড়িত কণ্ঠ নিয়েও শিষ্যদের সঙ্গে দু’ঘণ্টা কাল আলাপ করেন যোগ সম্বন্ধে। সন্ধ্যার দিকে তার চৈতন্য বিলুপ্ত হয়। সকলেই ভাবেন, মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু দুপুর রাত্রে পুনরায় তাকে জীবিত দেখা যায়। শিষ্য রামকৃষ্ণানন্দের দেহের উপর পাঁচ-ছ’টি বালিশ হেলান দিয়ে তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রিয় শিষ্য নরেনের সঙ্গে আলাপ করেন এবং অনুচ্চস্বরে তাঁর শেষ উপদেশগুলো দিয়ে যান। তারপর তিনি উচ্চৈঃস্বরে তিনবার তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু ‘কালী’র নাম উচ্চারণ করেন এবং এলিয়ে পড়েন।… পরদিন মধ্যাহ্নের পূর্বে আধঘণ্টা পর্যন্ত এই সমাধিস্থ অবস্থায় থাকে। তারপর মৃত্যু ঘটে। তার নিজের কথায়–তিনি এক গৃহ থেকে অন্য গৃহে চলে যান।

    শ্মশানে শবদেহ নিয়ে যাওয়ার সময় ভক্তরা বলতে থাকেন : জয় ভগবান রামকৃষ্ণের জয়।

    নরেন্দ্রনাথ সেই রাত্রেই দক্ষিণেশ্বরে লোক পাঠালেন ঠাকুরের ভাইপো রামলালকে খবর দিতে। রামলাল তৎক্ষণাৎ এসে দেহ পরীক্ষা করে বললেন, “এখনও ব্রহ্মতালু গরম আছে, তোমরা একবার কাপ্তেন উপাধ্যায়কে খবর দাও। নেপালের কাপ্তেন বিশ্বনাথ উপাধ্যায়…তাড়াতাড়ি আসিয়া উপস্থিত হইল এবং শ্রীশ্রীঠাকুরের মেরুদণ্ডে গব্যঘৃত মালিশ করিলে চৈতন্যোদয় হইবে বলিল।”

    শশিভূষণ, শরৎচন্দ্র ও বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল যথাক্রমে গ্রীবায়, বক্ষে এবং পদমূলে ঘৃত মালিশ করতে লাগলেন, কিন্তু তিন ঘণ্টারও বেশি মালিশ করে কোনও ফল হ’ল না।

    এরপরে ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকারের কাশীপুরে আবির্ভাব। কিন্তু ক’টার সময়? ঠাকুরকে এই মহেন্দ্রলাল ‘তুমি’ বললেও, সমধিক শ্রদ্ধা-ভক্তি করতেন। বৈকুণ্ঠনাথের রচনা অনুযায়ী : “পরদিন প্রত্যুষে ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার সর্বপ্রথম উদ্যানে উপস্থিত হন; এবং প্রভুর আনন্দপূর্ণ আনন, রোমাঞ্চিত তনু এবং অঙ্গ জ্যোতিতে গৃহপূর্ণ দর্শনে মুগ্ধ হইয়া কহেন-এই দিব্যাবস্থার প্রতিকৃতি গ্রহণ আমি বাঞ্ছনীয় বোধ করি। অতএব কলিকাতায় যাইয়া আমি এখনই ইহার ব্যবস্থা করিতেছি।”

    মা-ঠাকরুণ “প্রাণের আবেগে ‘মা কালী গো! তুমি কি দোষে আমায় ছেড়ে চলে গেলে গো’ বলিয়া ভূপতিত হইয়া উচ্চরোলে ক্রন্দন ও বিলাপ করিতে লাগিলেন।”

    গ্রুপ ছবি সম্বন্ধে বৈকুণ্ঠনাথের মন্তব্য : “পরিতাপের বিষয়, অত্যধিক বিলম্ববশতঃ প্রাতঃকালের সে জ্যোতির্ময় প্রাণটি তখন অন্তর্হিত হইয়াছিল।”

    স্বামী অভেদানন্দের বর্ণনা অনুযায়ী, ডাক্তার সরকার “বেলা দশঘটিকায় এসে নাড়ী দেখে বলেন, ঠাকুরের প্রাণবায়ু নির্গত হয়েছে।”

    অনেক বিচারবিবেচনার পর স্বামী প্রভানন্দের সিদ্ধান্ত : ডাক্তার সরকার “কাশীপুরে পৌঁছান বেলা একটায়।”

    ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের দিনলিপি। খাওয়াদাওয়ার পর প্রথমে ডাফ স্ট্রিটে যাই এক রোগিণীকে দেখতে, তারপর পরমহংসের কাছে। তিনি মৃত। গত রাত্রে একটার সময় তাঁর দেহাবসান হয়েছে, He was lying on the left side legs drawn up, eys open, mouth partly open.” এরপরে লেখা, মহেন্দ্রলাল ছবি তোলার পরামর্শ দিলেন এবং নিজের চাদা হিসেবে দশ টাকা রেখে গেলেন।

    বেঙ্গল ফটোগ্রাফার্সের ছবি তোলা সম্বন্ধে স্বামী অভেদানন্দের বর্ণনা : “রামবাবু নিজে খাটের সম্মুখে দাঁড়াইয়া নরেন্দ্রনাথকে তাঁহার পার্শ্বে দাঁড়াইতে বলিলেন। আমরা পশ্চাতে সকলে নির্বাক হইয়া সিঁড়ির উপর দাঁড়াইলাম। বেঙ্গল ফটোগ্রাফার কোম্পানি দুইখানা গ্রুপ ফটো তুলিয়া লইলেন।”

    কাশীপুর মহাশ্মশানের উদ্দেশে শবযাত্রা শুরু হয়েছিল বিকাল ছ’টার পর।

    লাহোরের ট্রিবিউন পত্রিকার সম্পাদক নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত শেষ দর্শনের এক চমৎকার বিবরণ রেখে গিয়েছেন। তাঁর পূতদেহ শ্মশানঘাটে নিয়ে যাবার জন্য দিনের তাপমাত্রা কমার অপেক্ষায় বসেছিলাম, সে সময় একখণ্ড মেঘ থেকে বড় বড় দানার বৃষ্টি ঝরে পড়ল। উপস্থিত সকলে বলতে থাকল এই হচ্ছে পুরাণকথিত স্বর্গ থেকে ঝরে পড়া পুষ্পবৃষ্টি। অমর দেবতাগণ স্বৰ্গমর্ত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির নশ্বরতা থেকে অমরতায় উত্তরণকালে অভিনন্দন জানাচ্ছে।”

    স্বামীজির পূজনীয় আচার্য, পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণের অন্তিমযাত্রার বিবরণ এখনও সম্পূর্ণ সংগৃহীত হয়নি, তবু তার শেষ জীবনের শেষ মুহূর্তগুলির বর্ননায় গুরু রামকৃষ্ণ ও পরবর্তী নেতা নরেন্দ্রনাথ দু’জনেই বেশ কিছুটা নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছেন।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleআশা-আকাঙ্ক্ষা – শংকর
    Next Article অচেনা অজানা বিবেকানন্দ – শংকর

    Related Articles

    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)

    জন-অরণ্য – শংকর

    November 20, 2025
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)

    অচেনা অজানা বিবেকানন্দ – শংকর

    November 20, 2025
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)

    আশা-আকাঙ্ক্ষা – শংকর

    November 20, 2025
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)

    চৌরঙ্গী – শংকর

    November 20, 2025
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)

    নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি – শংকর

    November 20, 2025
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)

    কত অজানারে – শংকর

    November 20, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Our Picks

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }