Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    অরণ্য – হুমায়ূন আহমেদ

    হুমায়ূন আহমেদ এক পাতা গল্প93 Mins Read0
    ⤷

    ০১-০৫. মশারির ভেতর একটা মশা

    অরণ্য – উপন্যাস – হুমায়ূন আহমেদ

    ০১.

    মশারির ভেতর একটা মশা ঢুকে গেছে।

    পাতলা ছিপছিপে বুদ্ধিমান একটা মশা। কোথাও বসলেই তাকে মরতে হবে এটি জানে বলেই কোথাও বসছে না। ক্রমাগত উড়ছে।

    সোবাহান তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকাল। নিশ্চয়ই একসময় সে বসবে। কিন্তু বসছে না, অসম্ভব জীবনীশক্তি। সোবাহানের মাথায় আজগুবি ভাবনা আসতে লাগল–এই মশাটির বয়স কত? এ কি বিবাহিত? এর ছেলেমেয়ে আছে কি? ওদের একা ফেলে সে মরবার জন্যে মশারির ভেতর ঢুকল? মৃত্যুর পর ওর আত্মীয়স্বজন কাঁদবে কি? নাকি প্রেম ভালোবাসা এসব শুধু মানুষের জন্যেই? বোধহয় না। একবার সোবাহানের ছোটচাচা একটা কাক মেরে গাবগাছে ঝুলিয়ে রেখেছিল। ঘণ্টাখানিকের মধ্যে কাকটির মৃত্যুসংবাদ। প্রচারিত হয়ে গেল। হাজার হাজার কাক বাড়ির চারপাশে কা কা করতে লাগল। ভয়াবহ। ব্যাপার।

    এই মশাটির মৃত্যুসংবাদও কি অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে? অযুত নিযুত মশা পিন পিন শব্দে উড়ে আসবে? খুব সম্ভব না। নিচুস্তরের কীটপতঙ্গের মধ্যে প্রেম ভালোবাসা

    নেই, আর থাকলেও তাতে মৃত্যুর কোনো ভূমিকা নেই।

    একসময় মশাটি মশারির এক কোনায় স্থির হয়ে বসল। তার গায়ের রঙ হালকা নীল। পাখার নিচের দিকটা চকচকে খয়েরি। মশারা এমন বাহারি হয় তা সোবাহানের জানা ছিল না। সোবাহান মনে মনে বলল, তুমি মরতে যাচ্ছ। মরবার আগে তোমার কি কিছু বলার আছে?

    মশাটি পাখা নাড়ল। মনের কথা বুঝতে পারে নাকি? টেলিপ্যাথি? ‘নিম্নশ্রেণীর কীটপতঙ্গরা ভাবের আদানপ্রদান টেলিপ্যাথির মাধ্যমে করিয়া থাকে। কোথায় যেন পড়েছিল কথাটা। সাপ্তাহিক কাগজেই বোধহয়। সাপ্তাহিক কাগজগুলিতে অদ্ভুত সব খবর ছাপা হয়। একবার এক কাগজে ধর্মপ্রাণ একটা খেজুরগাছের ছবি ছাপা হলো। এই গাছটা নাকি নামাজের সময় হলেই পশ্চিমদিকে হেলে সেজদা দেয়। গাছগাছালির মধ্যেও ধর্ম প্রচারিত হচ্ছে? ইসলাম ধর্মের অনুসারী এই গাছটি খুব দেখার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু মানুষের অধিকাংশ ইচ্ছাই অপূর্ণ থাকে।

    মশাটি সম্ভবত স্বেচ্ছামৃত্যুর জন্যে তৈরি হয়েছে। একটুও নড়ছে না। সোবাহানকে দু’হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে দেখে তার ছাইবর্ণের একটি পাখা শুধু কাপল। নিম্নশ্রেণীর কীটপতঙ্গরা মানুষকে কীভাবে গ্রহণ করে এটি কোনোদিন জানা হবে না। ঈষৎ অন্যমনস্কতার পর মশাটিকে সোবাহান দু’হাতে পিষে ফেলল।

    পিন পিন শব্দ হচ্ছে নাকি? অযুত নিযুত মশা কি উড়ে আসছে? যাদের রঙ নীলাভ, পাখার নিচটায় নরম খয়েরি রঙ।

    .

    ০২.

    ঢাকা শহরে মোট কতজন সোবাহান আছে! সোবাহান আলি, সোবাহান মোল্লা, আহমেদ সোবাহান। দশ-পনেরো হাজার তো হবেই। এদের কেউ কেউ ঘুমোতে যায় অনেক রাতে। ঘুম আসে না। রাত জেগে নানান রকম স্বপ্ন দেখতে এদের বড় ভালো লাগে। যে সমস্ত মশা পিন পিন শব্দে এদের স্বপ্নে বাধা সৃষ্টি করে, এরা উৎসাহের সঙ্গে তাদের পিষে মেরে ফেলে। হাতে রক্তের দাগ নিয়ে ঘুমোতে গেলে এদের সুন্দ্রিা হয়।

    কিন্তু আমাদের সোবাহান নীল রঙের মশাটি মেরে মন খারাপ করে বসে রইল। আগামীকাল সাড়ে দশটায় একটা চাকরির ব্যাপারে তার এক জায়গায় যাওয়ার কথা। চাকরিটি হলেও হতে পারে। এরকম অবস্থায় মন দুর্বল থাকে। অকারণ প্রাণিহত্যায় চাপা একটি অপরাধ বোধ হয়। সোবাহান মশারির ভেতর উবু হয়ে থাকে। পাশের বেডের। জলিল সাহেব তখন কথা বলেন, ঘুমান না কেন?

    বড় মশা।

    মশারির ভেতর আবার মশা কী?

    সোবাহান কিছু বলে না। জলিল সাহেব মশা নিয়ে একটা বস্তাপচা ছড়া বলেন—দিনে মাছি রাতে মশা, আমাদের স্বর্গে যাওয়ার দশা। সোবাহান বিরক্তি বোধ করে। কোনো উত্তর দেয় না।

    ঘুমিয়ে পড়েন ভাই, ঘুমিয়ে পড়েন। মশার আদমশুমারি করে কোনো ফায়দা নাই। ঠিক কি না বলেন?

    জি, তা ঠিক।

    গরমটাও আজ কম, ভালো ঘুম হবে।

    জি।

    শেষরাতের দিকে বৃষ্টি হবে। এই ধরেন তিনটা সাড়ে তিনটা।

    কীভাবে বুঝলেন?

    বুঝি বুঝি, বয়স তো কম হয় নাই।

    জলিল সাহেব দীর্ঘ সময় ধরে গলা টেনে টেনে হাসেন। এর মধ্যে হাসির কী আছে সোবাহান বুঝতে পারে না। সে শুয়ে পড়ে, কিন্তু তার ঘুম আসে না। মাথার ওপর ষাট পাওয়ারের একটা বাল্ব। ঝকঝক করে চারদিক। যত রাত বাড়ছে আলো তত বাড়ছে। ঘুম আসার প্রশ্ন ওঠে না। তার চোখ কড়কড় করে।

    বাতি জ্বালিয়ে রাখলে অসুবিধা হয় নাকি সোবাহান সাহেব?

    জি-না।

    চোর আর বেশ্যা। হা হা হা।

    সোবাহান বহু কষ্টে রাগ সামলায়। রাতদুপুরে এ ধরনের কথাবার্তার কী মানে থাকতে পারে? শুয়ে পড়লেই হয়।

    বেশ্যাগুলি অন্ধকারে বসে কী করে জানেন নাকি সাহেব?

    জি-না। জানি না।

    জলিল সাহেব অঙ্গভঙ্গিসহ একটা কুৎসিত কথা বলে গলা টেনে টেনে হাসতে থাকেন। পঞ্চাশের ওপর বয়স হলেই লোকজন অশ্লীল কথা বলতে ভালোবাসে। জলিল সাহেবের বয়স পঞ্চাশ এখনো হয়নি। অবশ্যি জুলপির সমস্ত চুল পেকে গেছে। মানুষের জুলপি কি আগে বুড়ো হয়ে যায়? হয়তো যায়। সোবাহানের জানতে ইচ্ছে করে।

    একটা বেশ্যা মাগি আর একটা রেগুলার মাগি—এদের মধ্যে ডিফারেন্সটা কী বলেন

    দেখি?

    সোবাহান চুপ করে থাকে।

    পারবেন না? আপনি দেখি সাহেব কিছুই জানেন না। হা হা হা।

    ডিফারেন্সটা সম্পর্কে একটা রসালো জিনিস জলিল সাহেব আধা ঘণ্টা ধরে বলার পর বাতি নিভিয়ে ঘুমোতে গেলেন। বাতি নেভাবার সঙ্গে সঙ্গে একটা মশা সোবাহানের কানের কাছে পিন পিন করতে লাগল। মশার আত্মা নাকি? সেই মৃত মশাটিই কি ফিরে এসেছে? জগতে অনেক অমীমাংসিত রহস্য আছে। ঘুম এল না। মশাটি বিরক্ত করতে লাগল। একবার উঠে বাতি জ্বালাল। মশারির ভেতর কিছুই নেই। কিন্তু ঘুমোতে গেলেই তাকে পাওয়া যাচ্ছে–পি পি পিন পিন। পিঁ পিঁ পিন পিন।

    ঘুম আসছে না, ঘুম আসছে না। অসহ্য গুমট। হাওয়া নেই, এক ফোঁটা হাওয়া নেই। সোবাহান একসময় দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল। কোথাও হাওয়া নেই। আকাশে মেঘ আছে কি? সে তাকাল আকাশের দিকে। মেঘশূন্য আকাশ। ভালো লাগে না। কিছু ভালো লাগে না। ভেতরের বাড়ি থেকে কান্নার শব্দ আসছে। কে কাঁদছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। মনসুর সাহেবের স্ত্রী? না তার ছোট শালী? এ বাড়িতে মাঝে মাঝে এরকম অস্বস্তিকর কান্না শোনা যায়। কে কাঁদে কে জানে?

    সোবাহান! সোবাহান সাহেব!

    জি।

    একটু আসেন ভিতরে।

    কী হয়েছে?

    আরে ভাই আসেন না। বিনা কারণে কেউ ডাকে না।

    সোবাহান ঘরে ঢুকে দেখল, জলিল সাহেব বমি করে তার বিছানার একাংশ ভাসিয়ে চোখ বড় বড় করে বসে আছেন। ঘরময় কটু ঝাঁঝালো গন্ধ। বাতাস ভারী হয়ে আছে।

    কী হয়েছে?

    কিছু না।

    আপনার কি শরীর খারাপ নাকি?

    না।

    বমি করে তো ঘর ভাসিয়ে ফেলেছেন।

    সন্ধ্যার পর এক ঢোক খেয়েছিলাম। সস্তার জিনিস। সস্তার তিন অবস্থা। প্রথম অবস্থায় নেশা। দ্বিতীয় অবস্থায় বমি। তৃতীয় অবস্থায় আবার বমি।

    বলতে বলতেই মুখ ভর্তি করে আবার বমি করলেন। তার হিক্কা উঠতে লাগল। সোবাহান কী করবে বুঝে উঠতে পারল না।

    সোবাহান সাহেব।

    জি।

    পানি আনেন। হা করে দাঁড়িয়ে থাকবেন না। ভয় নাই, আমি নিজেই পরিষ্কার করব। নিজের গা নিজেই পরিষ্কার করতে হয়। এটা কপালের লিখন। একটা ঝাটা জোগাড় করেন।

    সব পরিষ্কার টরিষ্কার করে তারা যখন ঘুমোতে গেল তখন কেঁপে বৃষ্টি নামল। জলিল উফুল্ল স্বরে বললেন, বৃষ্টি নামল–দেখলেন তো?

    জি দেখলাম।

    বলেছিলাম না বৃষ্টি হবে?

    হুঁ বলেছিলেন।

    জলিল সাহেব গলা টেনে হাসতে লাগলেন।

    সোবাহান সাহেব!

    জি।

    ঠিক আছে ঘুমান। আমি একটু বসি বারান্দায়।

    জলিল সাহেব মশারি থেকে বের হয়ে এলেন। ভেতরবাড়ি থেকে কান্না শোনা যাচ্ছে। সোবাহান মৃদুস্বরে বলল, কে কাঁদে জানেন?

    জলিল সাহেব উত্তর দিলেন না। সোবাহান বলল, প্রায়ই শুনি।

    জলিল সাহেব ঠান্ডাস্বরে বললেন, যার ইচ্ছা সে কাঁদুক, কিছু যায় আসে না। আমাদের একটা ঘর সাবলেট দিয়েছে আমরা আছি। মাসের শেষে দেড়শ টাকা ফেলে দেই, ব্যস। যার ইচ্ছা কাঁদুক, কী যায় আসে বলেন? কিছুই আসে যায় না।

    .

    জলিল সাহেব দরজা খুলে বারান্দায় বসে রইলেন। ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। শীতল হাওয়া দিচ্ছে। কানের কাছে মশা পিন পিন করছে না। কিন্তু ভেতর বাড়িতে কেউ একজন কাঁদছে। প্রায়ই সে কাঁদে। কেন কাঁদে কে জানে। শুনতে ভালো লাগে না। মেয়েদের কান্নায় ঘুমপাড়ানি কিছু আছে। সোবাহানের ঘুম পেতে থাকে। ঘুম আসার সময়টা বেশ সুন্দর। গভীর কোনো নির্জন দিঘিতে ডুবে যাওয়ার সঙ্গে এর একটা মিল আছে। মিলটি সোবাহান ধরতে পারে, কারণ সে একবার সত্যি সত্যি ডুবে যেতে বসেছিল। শুরুটাই ভয়ের। তারপর কোনো ভয় নেই–আলো কমে যেতে শুরু করে, শব্দ কমে যেতে শুরু করে।

    ব্রাদার, ঘুমিয়ে পড়লেন? এই সোবাহান সাহেব!

    না, ঘুমাইনি। কেন?

    বমি করার পর পেটে আর কিছু নাই। ক্ষিদে লেগে গেছে।

    আমাকে বলে কী লাভ?

    তা ঠিক। ঘুমান। আমি বরং এক গ্লাস পানি খেয়ে শুয়ে পড়ি, কী বলেন?

    খান। ইচ্ছে হলে খান।

    খালিপেটে পানি খেলে আবার বমি হবে না তো?

    সোবাহান জবাব দিল না। এই লোকটির সঙ্গে আর থাকা যাচ্ছে না। আগের মেসটিতেই ফিরে যেতে হবে। অসহ্য! সোবাহান ঠিক করল কাল ভোরে প্রথম যে কাজটি করবে সেটা হচ্ছে–কুমিল্লা বোর্ডিং-এ ফিরে যাবে।

    কিন্তু সে নিশ্চিত জানে এটা করা হবে না। কারণ সকালে তাকে যেতে হবে চাকরির ব্যাপারে। তারপর আর উৎসাহ থাকবে না। তাছাড়া কারও সঙ্গে বেশি দিন থাকলেই একটা মায়া জন্মে যায়। ছেড়ে যেতে কষ্ট হয়। জলিল সাহেবের সঙ্গে সোবাহান আছে প্রায় পাঁচ বছর ধরে। প্রথম দু’বছর বেঙ্গল মেস হাউসে। বাকি তিন বছর কুমিল্লা বোর্ডিং এ। এবং এখন শ্যামলীর এই বাড়িতে। জলিল সাহেবের ব্যবস্থা। সোবাহান আসতে। চায়নি। জলিল সাহেব মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে ভুলিয়েছেন।

    মেসে সারা জীবন পড়ে থাকবেন নাকি! একটা ফ্যামিলির সঙ্গে এ্যাটাচড থাকা ভালো। ঘরের রান্না খাবেন। তার টেস্টই অন্যরকম। অসময়ে এক কাপ চা খেতে চাইলেন, জাস্ট গিয়ে বলবেন–ভাবি, এক কাপ চা। ওমনি চা এসে যাবে। সঙ্গে একটা বিসকিট কিংবা এক প্লেট মুড়ি ভাজা।

    জলিল সাহেবের মিষ্টি কথার কোনোটি সত্যি হয়নি। তিনি অবশ্যি অনেক চেষ্টা করেছিলেন পেইংগেস্ট হতে। কিন্তু বাড়িওয়ালা মনসুর সাহেবের স্ত্রী খুব পর্দানশীন। এই যে দু’টি লোক বাড়ি সাবলেট নিয়ে আছে, তাদের সঙ্গে এখনো এই মহিলাটির কোনো কথা হয়নি। একবার শুধু এক বড় জামবাটি ভর্তি পায়েস পাঠিয়েছিলেন। সেই পায়েস খেয়ে জলিল সাহেবের পেট নেমে গেল। তিনি গম্ভীর গলায় ঘোষণা করলেন–পায়েসটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ফেলে দেওয়ার বদলে আমাদের ধরিয়ে দিয়েছে। মহা হারামি! এখানে থাকা যাবে না রে ভাই। কুমিল্লা বোর্ডিংই ভালো। সেখানে ফিরতে হবে। কপালের লিখন।

    কিন্তু ফিরে যাওয়া হচ্ছে না। দেখতে দেখতে এখানেও তিন মাস হয়ে গেল। আরও কিছুদিন গেলে এ জায়গাটার ওপরও একটা মায়া পড়ে যাবে। ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করবে না। মায়া বড় সাংঘাতিক জিনিস।

    .

    ০৩.

    দশটায় আসার কথা সোবাহান নটায় এসেছে। বসার জায়গাটা ভালো। বেতের গদিওয়ালা চেয়ার ইউ আকৃতিতে সাজানো। মাঝখানে বেমানান আধুনিক একটা কাঁচের টেবিল। টেবিলের ওপর দু’টি অ্যাশট্রে–এত সুন্দর দেখতে যে, গোপনে পকেটে ঢুকিয়ে ফেলার ইচ্ছা বহু কষ্টে দমন করতে হয়। দেয়ালে তিনটি বিভিন্ন মাপের তেলরঙ ছবি। প্রতিটিই দেখতে কুৎসিত। ফ্রেমগুলির জন্যেই বোধ করি ওদের সহ্য করা যায়। সোবাহান মাঝখানের একটি চেয়ারে দুপুর বারোটা পর্যন্ত বসে রইল। এর মধ্যে তিনবার। উঠে বারান্দায় গেল থুথু ফেলতে। আজ কেন জানি মুখে ক্রমাগত থুথু জমছে। বারোটার। সময় জানা গেল যার জন্যে বসা থাকা সেই এস. রহমান সাহেব আজ আসবেন না। তার। শরীর খারাপ। সোবাহান ইনকোয়ারিতে বসে থাকা বেঁটে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল, কাল আসব? মেয়েটি হাসিমুখে বলল, প্রয়োজন থাকলে নিশ্চয়ই আসবেন।

    রহমান সাহেব কি কাল আসবেন?

    শরীর ভালো হলে আসবেন। আপনি কি চা খেয়েছেন?

    সোবাহান চমকায়। চায়ের কথা আসছে কোত্থেকে? মেয়েটি শান্তস্বরে বলল, যে সব গেস্ট এখানে অপেক্ষা করেন তাদের চা দেওয়ার নিয়ম আছে, আপনাকে দেয় নাই?

    জি-না। তাছাড়া আমি গেস্ট না। আমি চাকরির খোঁজে এসেছি।

    মেয়েটি কৌতূহলী হলো। ফোন বাজছিল সে সেদিকে লক্ষ না করে বলল, রহমান সাহেব আপনাকে চাকরি দেবেন এমন কিছু বলেছেন?

    না, দেখা করতে বলেছেন।

    মেয়েটি টেলিফোন তুলে কাকে যেন ইশারা করল। এক কাপ চা এবং এক পিস ফুট কেক এসে পড়ল। চমৎকার ফুট কেক। চা-টাও বেশ ভালো। চিনি কম। কিন্তু চিনি দিতে বলাটা নিশ্চয়ই ঠিক হবে না। মেয়েটি টেলিফোন নামিয়ে খুব মিষ্টি করে বলল, খান, কেক খান। কাল কি আসবেন?

    জি।

    উনি অবশ্যি ইচ্ছা করলে চাকরি দিতে পারেন। আপনি এখন কোনো চাকরি টাকরি করছেন?

    না।

    থাকেন কোথায়?

    শ্যামলী।

    কথাবার্তা আর হলো না। আবার একটি টেলিফোন এল। মেয়েটি অবিকল ইংরেজদের মতো গলায় ইংরেজি বলতে লাগল। মাঝে মাঝে চাপা হাসি। যে চা কেক। খাইয়েছে তাকে কিছু না বলে চলে যাওয়া যায় না। সোবাহান অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু কথা শেষ হচ্ছে না। সোবাহান আন্দাজ করতে চেষ্টা করল যার সঙ্গে কথা হচ্ছে সে ছেলে না মেয়ে। মেয়েই হবে। ছেলেরা এত সময় কথা বলতে পারে না।

    বাথরুমে যাওয়া প্রয়োজন। জিজ্ঞেস করবে কাকে? রিসিপশনের মেয়েটির চেহারা মন্দ নয়। ফর্সা মেয়েরা একটু বেঁটে হলেও খারাপ লাগে না। কিন্তু কালো ও বেঁটে এ দুয়ের কম্বিনেশন ভয়াবহ। কালো মেয়েদের লম্বা হতে হয় এবং লম্বা চুল থাকতে হয়।

    মেয়েটি টেলিফোন নামিয়ে রেখে তরতর করে দোতলায় উঠে গেল। আর নামার নাম নেই। সোবাহান আরও পঁচিশ মিনিটের মতো অপেক্ষা করল। রাতে ভালো ঘুম হয়নি। সেজন্যেই মাথায় এখন চাপা যন্ত্রণা হচ্ছে। বাসায় ফিরে টেনে একটা ঘুম দিতে হবে। রিসিপশনিস্ট মেয়েটির নাম কী কে জানে। মাঝে মাঝে সুন্দরী মেয়েদের কুৎসিত সব নাম থাকে। মুন্সিগঞ্জের এসডিও সাহেবের একটি মেয়ে ছিল জলপরীর মতো। নাম তাসকিন। কোনো মানে হয় না। একজন সুন্দরী মেয়ের সুন্দর একটা নাম থাকা দরকার। তাসকিন ফাসকিন নয়, ওর নাম হওয়া উচিত বিপাশা কিংবা জরী।

    রিসিপশনিস্ট মেয়েটি নেমে এসে ভ্রূ কুঁচকে বলল, আপনি এখনো যাননি?

    জি-না। আপনার জন্যে অপেক্ষা করছি।

    কেন? আমার জন্যে অপেক্ষা করছেন কেন?

    আপনি যত্ন করে চা খাওয়ালেন। না বলে চলে যাই কীভাবে?

    যত্ন করে চা খাওয়ালেন মানে? এখানে যে আসে তাকেই চা খাওয়ানো হয়।

    সোবাহান বিস্মিত হয়ে বলল, আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন?

    মেয়েটি কোনো উত্তর দিল না। সুন্দরী মেয়েরা অকারণে রাগে। এই মেয়েটি যদি কালো, রোগা হতো এবং তার মুখে যদি বসন্তের দাগ থাকত তাহলে সোবাহানের কথায় সে খুশিই হতো। খুশি হওয়ার মতোই কথা।

    একজন মোটামুটি সুদর্শন যুবক অপেক্ষা করছিল। হতে পারে যুবকটি চাকরিপ্রার্থী। কাপড়চোপড় ভালো নয়। সারা রাত অঘুমো থাকায় চোখেমুখে ক্লান্তি, তাতে কিছু যায় আসে কি? কিছুই যায় আসে না।

    .

    সোবাহানকে দেখেই জলিল সাহেব চেঁচিয়ে উঠলেন, কোথায় ছিলেন সারা দিন? আপনার ভাই এসে বসে আছেন সকাল থেকে।

    সোবাহান উৎসাহ দেখাল না। তার ভাই মাসে একবার করে আসেন। তার আসা এমন কোনো বড় ব্যাপার নয়।

    ভাত খেতে গেছেন রশীদের হোটেলে। ওইখানে দেখা পাবেন।

    সোবাহান ধীরেসুস্থে জামা কাপড় খুলল। গা ঘামে চট চট করছে। জলিল সাহেব বললেন, পানি নাই, গোসল করতে পারবেন না।

    পানি নাই?

    এক বালতি ছিল–আপনার ভাই শেষ করেছেন। গ্রামের মানুষ বেশি পানি ছাড়া গোসল করতে পারে না। আমি বলেছিলাম আধা বালতি খরচ করতে।

    আপনি আজ অফিসে যান নাই?

    নাহ। ঘুম থেকেই উঠলাম সাড়ে এগারোটায়। নাস্তা টাস্তা কিছুই করি নাই। একবার ভাবলাম আপনার ভাইর সঙ্গে যাই, চারটা খেয়ে আসি।

    গেলেন না কেন?

    ভাতের কথা মনে উঠতেই বমি ভাব হলো, বুঝলেন।

    কিছুই খান নাই?

    পানি খেয়েছি দু’গ্লাস।

    সোবাহান গা-ভর্তি ঘাম নিয়ে চৌকির ওপর বসে রইল। এ বাড়িতে পানির বড় কষ্ট। রাত আটটার আগে পানি পাওয়ার আজ আর আশা নাই।

    সোবাহান সাহেব।

    জি।

    খাওয়াদাওয়া করবেন না?

    নাহ।

    সোবাহান সিগারেট ধরাল। ঘামে ভেজা শরীর। গুমোট গরম। জিভে জ্বালা ধরানো সিগারেট। কী কুৎসিত! কী কুৎসিত!

    সোবাহান সাহেব।

    বলেন।

    আপনি যাওয়ার পরপরই আপনার বন্ধু এসেছিল। বুলু সাহেব। বেশিক্ষণ বসেনি।

    বলেছে কিছু?

    টাকা দিয়ে গেছে পাঁচটা। আপনার কাছ থেকে নাকি ধার নিয়েছিল। টেবিল ক্লথের নিচে রেখে দিয়েছি, দেখেন।

    সোবাহান ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলল। বুলু নিশ্চয়ই এই পাঁচ টাকা ফেরত দেওয়ার জন্যে ছ’মাইল হেঁটে এসেছে। এবং হেঁটেই ফিরে গেছে। বাড়তি পয়সা খরচ করার মতো অবস্থা বুলুর না। বুলুর অবস্থা তার চেয়েও খারাপ। সোবাহান হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল, বড় ক্লান্তি লাগছে।

    সোবাহানের বড়ভাই ফরিদ আলির বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। লোকটির চেহারা ও চালচলন নির্বোধের মতো। নির্বোধ লোকদের প্রচুর বন্ধু-বান্ধব থাকে। তারও আছে। সাগর রেস্টুরেন্ট এন্ড হোটেলের মালিক রশীদ মিয়ার সঙ্গে তাঁর খুব খাতির। তার জন্যে গতবার দু’টা আমগাছের কলম নিয়ে এসেছিলেন। এবারো কিছু এনেছেন নিশ্চয়ই। সোবাহান দেখল ঘরের এক কোনায় একটা পাকা কাঁঠাল, পলিথিনের ব্যাগ-এ ভর্তি কাঁচা আম। এইসব কার জন্যে এনেছেন কে জানে।

    কাঁচা আম কার জন্যে?

    আমাদের বাড়িওয়ালার জন্যে। তিনি নাকি গতবার কাঁচা আমের কথা বলে দিয়েছিলেন। কাশ্মিরি আচার হবে। আপনার বড়ভাই কিন্তু মাইডিয়ার লোক। খুব মাইডিয়ার।

    জলিল সাহেব টেনে টেনে হাসতে শুরু করলেন। এর মধ্যে হাসির কী আছে কে জানে। বড়ভাইরা মাইডিয়ার হতে পারেন না?

    কাঁঠালটা এনেছেন আমার জন্যে।

    কাঁঠালের কথা বলেছিলেন নাকি?

    না। কাঁঠাল আমি সহ্য করতে পারি না। কাঁঠাল হচ্ছে শিয়ালের খাদ্য। জ্যাকফুট। আপনার ভাই বললেন–এই কাঁঠালের নাম নাকি দুধসাগর। কাঁঠালের এরকম বাহারি নাম থাকে জানতাম না।

    থাকে, অনেক রকম নাম থাকে। যা-ই থাকুক। কাঁঠাল কাঁঠালই, কী বলেন? কাঁঠাল তো আর আপেল না? সোবাহান কিছু বলল না। জলিল সাহেব বললেন, কি, খাওয়াদাওয়া করবেন না? নাহ। কোনো কাজ হয় নাই আজ? নাহ।

    ভদ্রলোক কি স্ট্রেট নো বলে দিল? উনার সঙ্গে দেখা হয় নাই।

    চাকরি দেনেওয়ালারা হচ্ছে ভগবানের মতো। এদের সহজে দেখা পাওয়া যায় না। এরা প্রায় অদৃশ্য। হা হা হা।

    সোবাহান শুয়ে পড়ল। ঘামে ভেজা গা। অসহনীয় গরম। তবু এর মধ্যেই সে দিব্যি ঘুমিয়ে পড়ল। শুধু ঘুম নয়, ছোটখাটো একটা স্বপ্নও দেখল। একটা নদীর পারে সে বসে আছে। নদীতে একহাঁটু মাত্র পানি। ইচ্ছা করলেই পার হওয়া যায়। কিন্তু সে পার হতে পারছে না। তার কেমন যেন ভয় ভয় লাগছে। অন্যান্য অর্থহীন স্বপ্নের মতো একটা। অর্থহীন স্বপ্ন। দারুণ অস্বস্তি নিয়ে সে জেগে উঠে দেখে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। জলিল সাহেব নেই। তার বড়ভাই ফরিদ আলি জায়নামাজ পেতে চোখ বন্ধ করে গম্ভীর হয়ে বসে। আছেন। তিনি মাথা ঘুরিয়ে বললেন, কিরে শরীর খারাপ?

    না।

    অসময়ে ঘুমাচ্ছিস?

    সোবাহান গম্ভীর স্বরে বলল, দাড়ি রাখলেন কবে!

    ফরিদ আলি মনে হলো লজ্জা পেলেন। মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।

    ভাবি লিখেছিলেন আপনি ধর্ম নিয়ে মেতেছেন। দাড়ি রাখার কথা লেখেন নাই।

    ধর্মকর্ম করা কি দোষের?

    দাড়িতে আপনাকে মানায় না।

    মানামানির তো কিছু নাই। দাড়ি তো আর গয়না না।

    সোবাহান দেখল তার পোশাক-আশাকও বদলেছে। লম্বা একটা পাঞ্জাবি পরেছেন। চোখে হয়তো সুরমাও আছে। কথাবার্তার ধরন ধারণও অন্যরকম। বেশ জোরের সঙ্গে কথা বলছেন। নামাজ শেষ করতে তার অনেক সময় লাগল। তারপরও দীর্ঘ সময় চোখ বন্ধ করে জায়নামাজের ওপর বসে রইলেন। পীর-ফকির হয়ে গেলেন নাকি? সোবাহান। বারান্দায় গিয়ে একটা সিগারেট ধরাল। পীর ফকির হয়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু না। তাদের বংশে এটা আছে। তাঁর বাবা নিজেই একচল্লিশ বছর বয়সে কী একটা স্বপ্ন দেখে অন্যরকম হয়ে গেলেন। স্কুল মাস্টারি ছেড়ে দিয়ে এক সন্ধ্যাবেলা ঘোষণা করলেন, বাংলাদেশে যত মাজার আছে তার প্রতিটিতে এক রাত করে কাটাবেন। তার ওপর নাকি এরকম একটা নির্দেশ আছে। নির্দেশ কে দিয়েছেন কিছুই জানা গেল না, তবে এক সকালবেলা তিনি সত্যি সত্যি বেরিয়ে পড়লেন। গৌতম বুদ্ধের গৃহত্যাগ নয়, গৃহী মানুষের গৃহত্যাগ। বহু লোকজন এল। রীতিমতো রোমাঞ্চকর ব্যাপার। সোবাহান তখন পড়ে ক্লাসে ফাইভে। তার বাবাকে নিয়েই এমন উত্তেজনা, এটা তাকে অভিভূত করে ফেলল। এবং আরও অনেকের সঙ্গে সেও এগারো মাইল হেঁটে তাঁকে ট্রেনে তুলে দিয়ে এল।

    তিনি ফিরে এলেন তিন সপ্তাহের মাথায়। দেখা গেল খালি হাতে আসেননি। সবার জন্যেই কিছু না কিছু এনেছেন। মার জন্যে টাঙ্গাইলের শাড়ি। (সে শাড়ি মার পছন্দ হয়নি। জমিন মোটা)। সোবাহানের জন্যে একটা পিস্তল যা টিপতেই প্রচণ্ড একটা শব্দ হয় এবং নল দিয়ে খানিকটা ধোয়া বের হয়। ফরিদ আলির জন্যে বার্মিজ লুঙ্গি। রীতিমতো একটি উৎসব। সেবার তিনি প্রায় মাসখানিক থাকলেন। তারপর আবার। গেলেন। আর ফেরার নাম নেই। সংসারে নানান অশান্তি। ফরিদ আলি আইএ ফেল করেছে। শুধু তাই নয়, যে বাড়িতে জায়গির থেকে পড়ত সে বাড়ির একজন বিধবা। মহিলার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। মহিলাটি তার মায়ের বয়েসী। গল্প-উপন্যাসের জেদি প্রেমিকদের মতো একদিন সে ঘুমের ওষুধও খেয়ে ফেলল। বিশ্রী অবস্থা। হাসপাতালে দিন সাতেক কাটানোর পর তাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হলো এবং বারো বছরের একটি কিশোরীর সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে দেওয়া হলো। মেয়েটির নাম ময়না।

    সোবাহানের বাবা ছেলের বিয়ের পরদিন এসে উপস্থিত হলেন। তাঁকে চেনার উপায় নেই। মুখভর্তি দাড়ি গোঁফ। ঘাড় পর্যন্ত লম্বা বাবরি চুল। চিরুনি দিয়ে আঁচড়ালে টপ টপ করে সেখান থেকে উকুন পড়ে। সেসব উকুনের সাইজও প্রকাণ্ড। উকুন মারার ব্যাপারে তিনি খুব উৎসাহিত হয়ে পড়লেন। ঠিক কতগুলি উকুন মারা পড়েছে তার। হিসাব রাখতে লাগলেন। যেমন একদিন সর্বমোট সাতাত্তরটি উকুন মারা পড়ে। এটিই সবচেয়ে বড় রেকর্ড। তিনি এই খবরটি হাসিমুখে অনেককেই দিলেন, যেন এটা তাঁর। বিরাট একটা সাফল্য।

    বড় ছেলের বিয়ের ব্যাপারেও তিনি দারুণ উৎসাহ প্রকাশ করতে থাকেন। মেয়েটি যে অত্যন্ত সুলক্ষণা এই কথা অসংখ্যবার বলতে লাগলেন। তিনি নাকি ইস্তেখারা করে এই বিয়ের কথা জানতে পেরেই ছুটে এসেছেন। তাঁকে সময় অসময়ে বালিকা পুত্রবধূটির সঙ্গে গল্পগুজব করতে দেখা গেল। প্রায় বছর খানিক তিনি থাকলেন, তারপর আবার গেলেন এবং তাঁর আর কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না। ফরিদ আলি আইএ পাশ করলেন। বিএ ক্লাসে ভর্তি হলেন এবং বিএ পরীক্ষায় যথাসময়ে ফেল করলেন। সোবাহান আইএ পাশ করল। ঢাকা শহরে চাকরির চেষ্টা করতে লাগল। কলেজে ভর্তি হয়ে তেমন কোনো পড়াশোনা ছাড়াই একসময় বিএ পাস করে ফেলল।

    সোবাহান।

    জি।

    বারান্দায় বসে আছিস কেন? ভেতরে আয়।

    সোবাহান নড়ল না। বেশ বাতাস দিচ্ছে। ভালোই লাগছে বসে থাকতে। ফরিদ আলি আবার ডাকলেন, আয়, ভেতরে আয়, কথা বলি।

    সোবাহান ভেতরে এসে ঢুকল।

    খালি গায়ে বারান্দায় বসাটা ঠিক না। মেয়েছেলে আছে।

    সোবাহান কিছু বলল না। ভেতরে চলে এল।

    কী বলবেন।

    তোদের বাড়িওয়ালা ভদ্রলোক আমাকে রাতে খেতে বলেছেন।

    সোবাহান ভ্রূ কুঁচকাল।

    খেতে বলল কেন?

    অসুবিধা কী? আদর করে বলেছে।

    যান, খেয়ে আসেন। তার জন্যে কাঁচা আম এনেছেন দেখলাম।

    আমের কথা বলেছিলেন গতবার।

    বলেছিল বলেই ঘাড়ে করে এক বস্তা আম নিয়ে আসবেন?

    ঘাড়ে করে আনব কেন? তুই এরকম করছিস কেন? ভদ্রলোকের সঙ্গে খাতির নাই?

    বাড়িওয়ালার সাথে বাড়তি খাতির কিসের?

    এটা ঠিক না। সবার সাথে মিল মহব্বত থাকা দরকার।

    সোবাহান চুপ করে গেল। কথা বলতে আর ভালো লাগছে না।

    তোর ভাবি যেতে বলেছে। অনেকদিন দেশে যাস না।

    যাব।

    আমার সঙ্গে চল। আমি কাল সকালে রওনা হব।

    না। এখন যাওয়া যাবে না।

    অসুবিধা কী?

    একটা চাকরির ব্যাপারে খোঁজখবর করছি।

    তোর ভাবি বলল চাকরি-বাকরি না হলে ব্যবসা-বাণিজ্য দেখতে।

    টাকা আসবে কোত্থেকে?

    উত্তর বন্দের জমিটা বিক্রি করে দেব। এখন জমির খুব দাম।

    জমি বিক্রি করার দরকার নাই।

    ফরিদ আলি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর নিচুগলায় বললেন–জমিটা এমনিতেই বিক্রি করতে হবে। আমার নিজের কিছু টাকা দরকার। বিশেষ দরকার।

    কেন?

    একটা নামাজঘর। ধর্মীয় বইপুস্তক থাকবে। ঘরটা পাকা করার ইচ্ছা।

    ও।

    এইজন্যেই এলাম। তোর মত ছাড়া তো জমি বিক্রি হবে না। কাগজপত্র নিয়ে এসেছি। সই করে দিস। রেজিস্ট্রেশনের সময় তোর যাওয়ার দরকার হবে।

    কতটা জমি?

    ফরিদ আলি তার উত্তর দিলেন না। এরকম ভাব করলেন যেন শুনতে পাননি। তিনি বদলে যাচ্ছেন। কথাবার্তা যা বলার স্পষ্টভাবে বলছেন। ভাষাটাও শহুরে। তার মানে ইদানীং প্রচুর কথা বলছেন। নানা ধরনের লোকজনের সঙ্গে কথা বলছেন। সোবাহান বলল, আপনার কাছে এখন লোকজন আসে বোধহয়। আসে না?

    আসে কেউ কেউ।

    কী জন্যে আসে?

    ধর্মের কথা শুনতে চায়। পরকালের কথা শুনতে চায়।

    পরকালের কথা আপনি জানেন?

    যা জানি তা-ই বলি।

    সারা দিন কি ধর্মকর্ম করেন?

    আরে না। আমি সংসারী মানুষ। এত সময় কই?

    ভাব ভঙ্গি তো সেরকম দেখি না।

    ফরিদ আলি প্রসঙ্গ বদলাতে চেষ্টা করলেন। হালকা গলায় বললেন, তোর এখানে বড় গরম।

    হুঁ।

    নীলগঞ্জেও গরম, তবে সন্ধ্যার পর আমগাছটার নিচে বসি। বেশ বাতাস। ভালোই লাগে।

    লোকজনদের বাণী-টাণী যা দেন সব আমগাছের নিচে বসেই দেন?

    ফরিদ আলি একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন।

    .

    ০৪.

    মনসুর সাহেবকে বাড়িওয়ালা বলা ঠিক না, কারণ তিনি বাড়িওয়ালা নন। বাড়ি সরকারের। মনসুর সাহেব ফুড ইন্সপেক্টর হিসেবে একটা পরিত্যক্ত বাড়ি কীভাবে যেন পেয়ে গেছেন। ইদানীং তিনি এ বাড়িটিকে নিজের বাড়ির মতো দেখেন। সরকার এইসব। বাড়ি নাকি এলটিদের মধ্যে বিক্রি করবেন এরকম গুজব শোনা যাচ্ছে। তবে যাদের দেওয়া হবে তাদের শহীদ পরিবার কিংবা মুক্তিযোদ্ধা হতে হবে। মনসুর সাহেব এর কোনোদলেই পড়েন না, তবু তিনি বহু হাঙ্গামা করে কিছু সার্টিফিকেট যোগাড় করেছেন। যার ভাবার্থ হচ্ছে–তার বাড়িটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের লুকিয়ে থাকার একটি আদর্শ স্থান। তিনি নিজের জীবন বিপন্ন করে তাঁর ঘরে বিস্ফোরক লুকিয়ে রাখতেন। এ করতে গিয়ে মে মাসে তিনি গ্রেফতার হন এবং আট দিন সীমাহীন নির্যাতনের শিকার হন। তার বা পা-টি প্রায় অকর্মণ্য হয়ে পড়ে।

    এসব সার্টিফিকেটের কপি তিনি সরকারের কাছে জমা দিয়েছেন। সেক্রেটারিয়েটে তাঁর ধরাধরির কোনো লোক নেই। এ জন্যে কাগজপত্র এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নড়াতে তার প্রচুর পরিশ্রম হচ্ছে। অর্থ ব্যয়ও হচ্ছে। মাসে দুতিন দিন তিনি সেক্রেটারিয়েটে সারা দিন কাটান। এক অফিস থেকে অন্য অফিসে যাওয়ার সময় পা টেনে টেনে হাঁটেন।

    খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, আজকাল সত্যি সত্যি বাঁ পায়ে তিনি জোর পান না। পা-টা যেন অচল হয়ে পড়ছে। তাতে কিছু আসে যায় না। আসল কথা–বাড়িটার বন্দোবস্ত নেওয়া। একতলা বাড়ি। দোতলায় দুটি ঘর তোলা শুরু হয়েছিল, শেষ হয়নি। তিনি ইচ্ছা করলে শেষ করে ভাড়া দিতে পারেন, কিন্তু তাঁর সাহসে কুলায় না। ভাড়াটেরা একটা ঝামেলা করতে পারে। হয়তো দেখা যাবে ভাড়াটেরা একটা শহীদ পরিবার। তারা। সরকারের কাছ থেকে এলটমেন্ট জোগাড় করে ফেলবে–তিন ঝামেলা।

    বাইরের একটা ঘর তিনি জলিল সাহেবকে ভাড়া দিয়েছেন। চেনা লোক। সে আবার আরেকজনকে নিয়ে এসেছে। মাসের শেষে দেড়শ টাকা আসছে। এমন কিছু বড় এমাউন্ট না, কিন্তু দুটি পুরুষমানুষ থাকলে মনের মধ্যে সাহস থাকে। পরিত্যক্ত বাড়িগুলির নানা ফ্যাকড়া। হুটহাট করে পার্টি বের হয়ে পড়ে, যারা দাবি করে এই বাড়ি তাদের কেনা। দখল নিতে আসে। তবে এ বাড়ি নিয়ে এখনো তেমন কিছু হয়নি। সবকিছু খুব সহজভাবে এগুচ্ছে। তবু একটা অশান্তি থাকেই। সবসময় ভয় হয় শেষ। পর্যন্ত একটা কিছু ঝামেলা লেগে যাবে।

    মনসুর সাহেব আছেন?

    আসেন ভাই, আসেন।

    তিনি হাসিমুখে দরজা খুলে দিলেন–আপনার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম।

    ফরিদ আলি ইতস্তত করতে লাগলেন, কারণ ঘরে শাড়ি পরা একটা অল্পবয়স্কা মেয়ে বসে আছে।

    ও হচ্ছে যূথি। আমার শ্যালিকা। যূথি, সালাম করো।

    যুঁথি স্নামালিকুম বলে ব্ৰিত ভঙিতে উঠে দাঁড়াল। জব্বার সাহেব বিরক্ত ভঙিতে বললেন, পা ছুঁয়ে সালাম করো। এইসব শিখিয়ে দিতে হয়?

    মেয়েটি ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ফরিদ আলি গম্ভীর গলায় বললেন, না না, সালাম করতে হবে না। পা ছুঁয়ে সালাম করা ঠিক না। এতে মাথা নিচু করতে হয়। আমরা মুসলমানরা আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে মাথা নিচু করি না। ( যূথি তাকিয়ে রইল। মেয়েটা সুন্দর, তবে বড় রোগা। দেখলেই মনে হয় অসুস্থ। ফরিদ আলি বললেন, তুমি কী পড়? জবাব দিলেন মনসুর সাহেব, মেট্রিক পাস করে। বসে আছে। থার্ড ডিভিশনে পাস করেছিল। কলেজে ভর্তি করতে পারি নাই। সেকেন্ড ডিভিশন ছাড়া কোনো কলেজে নেয় না। বিয়ে দিয়ে দিব, ছেলে খুঁজছি। আমার শ্বশুর শাশুড়ি নাই, আমিই গার্জিয়ান। যূথি, যাও, খাবারটাবার দিতে বলো। দাঁড়িয়ে আছ কেন?

    মনসুর সাহেব অকারণে রেগে গেলেন। ফরিদ আলি বললেন, আপনার বাড়ি খুব সুন্দর। ভেতরে অনেক জায়গা মনে হয়।

    তা জায়গা আছে। তবে বাড়ি এখনো আমার হয় নাই। চেষ্টা করছি কেনার। হাজার রকমের ফ্যাকড়া।

    তাই নাকি?

    আর বলেন কেন? আপনারা সুফি মানুষ, দুনিয়ার হালচাল তো জানেন না।

    মনসুর সাহেব দীর্ঘ সময় ধরে পরিত্যক্ত বাড়ি সম্পর্কে বলতে লাগলেন। ফরিদ আলি তাকিয়ে রইলেন আগ্রহ নিয়ে।

    সেক্রেটারিয়েটের চেয়ার টেবিলগুলি পর্যন্ত টাকা খায়।

    এইসব কেয়ামতের নিশানা। কেয়ামতের আগে আগে পৃথিবী থেকে আল্লাহপাক সমস্ত সৎ মানুষ তুলে নিবেন। মা তার ছেলেকে বিশ্বাস করবে না। স্ত্রী বিশ্বাস করবে না স্বামীকে!

    মনসুর সাহেব ধর্মীয় আলোচনায় বিশেষ উৎসাহ দেখালেন না। তাকিয়ে রইলেন ভাবলেশহীন চোখে। খাবারদাবার যূথি নিয়ে এল। ঘরে কোনো কাজের লোক নেই। যূথিকেই বারবার আসা-যাওয়া করতে হচ্ছে। ডালের বাটি আনার সময় খানিকটা ডাল ছলকে পড়ল। মনসুর সাহেব ধমকে উঠলেন, দেখেশুনে হাঁটো! অন্ধ নাকি? একটা কাজও ঠিকমতো হয় না।

    ফরিদ আলি বললেন, আপনার স্ত্রী কোথায়?

    ও অসুস্থ, শুয়ে আছে।

    অসুখবিসুখের মধ্যে ঝামেলা করলেন কেন?

    অসুখবিসুখ লেগেই আছে, ওটা বাদ দেন।

    একটিই শালী আপনার?

    জি-না! তিনজন। দু’জনকে বিয়ে দিয়েছি। এইটি বাকি। শালী পার করতে গিয়ে মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে বুঝলেন?

    ফরিদ আলি অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে পাশেই। এটা সেটা এগিয়ে দিচ্ছে।

    দেখেন না ভাই, একটা ছেলে জোগাড় করতে পারেন কিনা। কিছু খরচপাতি করব। উপায় কী বলেন?

    ফরিদ আলি তাকালেন মেয়েটির দিকে। এ জাতীয় কথাবার্তা শুনে বোধহয় তার। অভ্যাস আছে। সে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। মেয়েটা সুন্দর তবে রোগা, বেশ রোগা। মনসুর সাহেব ক্লান্তগলায় বললেন, একটু দেখবেন। আমার খুব উপকার হয়।

    জি, আমি দেখব।

    ছেলে ভালো হলেই হবে, আর কিছু লাগবে না। ভদ্র ফ্যামিলির ভদ্র ছেলে। ব্যস, আর কোনো ডিমান্ড নাই।

    আমি দেখব।

    ফরিদ আলি আবার তাকালেন মেয়েটির দিকে। বাচ্চা মেয়ে। মিষ্টি চেহারা। বড় মায়া লাগে। ফরিদ আলি ভাত মাখাতে মাখাতে বললেন, আমার ছোটভাইকে কি আপনার পছন্দ হয়? ও বিএ পাশ করেছে। চাকরিবাকরি অবশ্যি এখনো কিছু পায় নাই। বলেই তিনি তাকালেন মেয়েটির দিকে। মেয়েটি খুবই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

    পছন্দ হলে আমাকে বলবেন। কালকের মধ্যে বলবেন। আমি পরশু দিন সকালে চলে যাব।

    সে বিয়ে করতে রাজি হবে?

    আমি বললে হবে।

    ফরিদ আলি খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন। মেয়েটি তখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।

    খুব ভালো খেলাম ভাই। শুকুর আলহামদুলিল্লাহ।

    মনসুর সাহেব ধমকে উঠলেন–যূথি, হাত ধোয়ার পানি দাও। দাঁড়িয়ে আছ কেন?

    যূথি যেমন দাঁড়িয়েছিল তেমনি রইল, নড়ল না। এই প্রথম বোধহয় তার দুলাভাইয়ের কথার অবাধ্য হলো। ভেতরে থেকে মেয়েলি গলায় ডাকল, যূথি, ও যূথি।

    যূথি নিঃশব্দে ভেতরে চলে গেল। ফরিদ আলি বললেন, আপনার স্ত্রীর কী অসুখ?

    মনসুর সাহেব বিরক্তিতে ভ্রূ কুঁচকালেন।

    মাথা খারাপ। মাথার দোষ।

    তাই বুঝি?

    জি। খুব অশান্তিতে আছি।

    কথাটা বলেই মনসুর সাহেবের মনে হলো এটা ঠিক হলো না। তিনি শুকনো গলায় বললেন, তবে ভাই বংশগত নয়। টাইফয়েডের পর এরকম হয়েছে। তাদের বংশে পাগল নাই।

    অসুখবিসুখের ওপর মানুষের হাত নাই।

    পান খাবেন ফরিদ সাহেব?

    জি-না, আমি পান-তামাক কিছু খাই না।

    সুফি মানুষ আপনারা।

    মনসুর সাহেব একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। বাড়ির ভেতর থেকে কান্নার শব্দ শোনা যেতে লাগল। বড় বিরক্তিকর ব্যাপার। মনসুর সাহেব গলাখাঁকারি দিলেন।

    কোনো লাভ হলো না। কান্নার শব্দ বাড়তে লাগল। ফরিদ আলি বসে আছেন চুপচাপ। যেন তাঁর উঠবার কোনো তাড়া নেই। বসে থাকবার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে সহজে উঠবেন না।

    ফরিদ সাহেব!

    জি।

    রাত কত হয়েছে?

    জানি না, আমার কাছে ঘড়ি নাই।

    মনসুর সাহেব বিরক্তিতে ভ্রূ কুঁচকালেন। এই লোক সহজ ইংগিতও ধরতে পারছে। খাল কেটে কুমির আনা একেই বলে। দিব্যি পা উঠিয়ে চেয়ারে বসে আছে। অবিবেচক মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে এত বেশি কেন? মনসুর সাহেব কর্কশ গলায় বললেন, যূথি, পান দিতে হবে না? ফরিদ আলি বললেন, পান আমি খাই না।

    আপনার জন্যে না। আমার নিজের জন্যে।

    ও আচ্ছা।

    ফরিদ আলি আবার নিঃশব্দ হয়ে গেলেন। তিনি কি আজ সারা রাতই এভাবে বসে কাটাবেন?

    .

    যুঁথি ঘুমোতে যায় অনেক রাতে। এ বাড়িতে কোনো কাজের লোক নাই। রান্নাঘর গুছিয়ে উঠতেই অনেক সময় লাগে। সে দ্রুত কিছু করতে পারে না। তার ওপর তার পরিষ্কারের বাতিক আছে। সবসময় মনে হয় ঠিকমতো ধোয়া হলো না বুঝি। প্লেটের কোথাও বুঝি সাবানের ফেনা লেগে আছে।

    আজও সব কাজ সারতে সারতে রাত একটা বেজে গেল। যূথি ঘুমোতে যাওয়ার আগে একবার খোঁজ নিতে গেল মনসুর সাহেবের কিছু লাগবে কিনা। মনসুর সাহেবের অনিদ্রা রোগ আছে। তিনি অনেক রাত পর্যন্ত জাগেন। আজও জেগে ছিলেন। যূথিকে ঢুকতে দেখে চোখ তুলে তাকালেন।

    দুলাভাই, কিছু লাগবে?

    না, কিছু লাগবে না। ঘুমাও নাই এখনো?

    যূথি সরু চোখে তাকিয়ে রইল। মনসুর সাহেবের গলার স্বর অনেকখানি নেমে এসেছে। যূথি অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। মাঝে মাঝে মনসুর সাহেব এরকম নরম স্বর বের করেন। সেটা হয় মধ্যরাতের দিকে।

    যূথি!

    জি।

    তোমার আপা ঘুমাচ্ছে নাকি?

    জি।

    আমার জীবনটাই নষ্ট হয়ে গেল, বুঝলে যূথি। সংসার করা কাকে বলে জানলামই না।

    যুঁথি উঠে দাঁড়াল। মনসুর সাহেব বললেন, বসো না আরেকটু।

    যুঁথি দাঁড়িয়ে রইল। কী করবে সে বুঝতে পারছে না। দুলাভাই অন্যরকমভাবে তাকাচ্ছেন।

    রাত হয়ে গেছে। আমি যাই দুলাভাই।

    যুঁথি ঘুমায় তার বড় বোন কদমের সঙ্গে। মনসুর সাহেব তার স্ত্রীর সঙ্গে ঘুমান না। সোজাসুজিই বলেন–মাথার ঠিক নাই তার, কোন সময় কী করবে ঠিক আছে? হয়তো ঘুমের মধ্যেই চোখ গেলে দিবে। তখন?

    তার ভয়টা অমূলক। কদমের অসুস্থতা সে পর্যায়ের নয়। সে প্রায় সময়ই কাঁদে। এবং বাকি সময়টা সিডেটিভের কল্যাণে ঘুমায়। যূথি এসে ডাকল–আপা, ঘুমিয়েছ?

    না।

    ক্ষিধে লেগেছে? কিছু খাবে?

    না।

    মাথায় হাত বুলিয়ে দেব আপা?

    দে।

    যুঁথি বাতি নিভিয়ে কদমের পাশে এসে বসল। চুল টেনে টেনে দিতে লাগল। কদম বলল, দাড়িওয়ালা লোকটা কে? কী জন্যে এসেছিল?

    দাওয়াত খেতে এসেছিল।

    দাওয়াত খেতে এল কেন?

    যুঁথি জবাব দিল না। কদমও জবাবের অপেক্ষা করল না। ঘুমিয়েও পড়ল না। যূথির ঘুম আসছিল না। সে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে রইল। বারান্দায় দুলাভাই হাঁটাহাঁটি করছেন। তিনি একবার দরজার পাশে এসে ডাকলেন–বৃথি, বৃথি। যূথি জবাব দিল না। বেশ গরম, তবু সে একটা কাঁথা পর্যন্ত টেনে দিল। তার মনে হলো সেও বোধহয় আপার মতো একসময় পাগল হয়ে যাবে। এটা তার প্রায়ই মনে হয়।

    .

    ০৫.

    সোবাহান ঘুমিয়ে ছিল। বুলু এসে তাকে ডেকে তুলল–কিরে, অবেলায় ঘুমাচ্ছিস কেন?

    সোবাহান কিছু বলল না। বুলু বলল, ওইদিন সাতসকালে কোথায় গিয়েছিলি?

    চাকরির ব্যাপারে।

    কী রকম বুঝলি, আশা আছে?

    হুঁ।

    বুলুর মুখ উজ্জ্বল হলো মুহূর্তেই। হাসিমুখে বলল, তোরটা হলেই আমারটা হবে। রাশির একটা ব্যাপার আছে। আমাদের দুজনের সবকিছু একসঙ্গে হয়। ঠিক না?

    সোবাহান জবাব দিল না। বুলু বলল, এরকম গম্ভীর হয় আছিস কেন? শরীর খারাপ?

    না, শরীর ঠিকই আছে।

    অবেলায় ঘুমোচ্ছিলি কেন?

    এ ছাড়া করবটা কী?

    সোবাহান কাপড় পরতে শুরু করল। লুঙ্গি বদলে প্যান্ট পরল। বুলু বিস্মিত হয়ে বলল, বেরুচ্ছিস নাকি?

    হ্যাঁ।

    কোথায়?

    চা খেতে। ওই মোড়ের দোকানে চা খাব। মাসকাবারি ব্যবস্থা আছে। চল যাই।

    চা খাব নারে। ভাত খাব। ক্ষিধে লেগেছে।

    সোবাহান কিছু বলল না। বুলু বলল, খাওয়া হয় নাই। মামার সঙ্গে একটা ফাইটিং হয়ে গেল।

    তাই নাকি?

    হুঁ। চোর টোর বলল। মামিকে বলে গেছে–আমাকে ভাত দিলে তিন তালাক হয়ে যাবে। চিন্তা কর অবস্থা!

    বলিস কী?

    কেলেংকারি কাণ্ড। মামি কাঁদছে। বাচ্চাগুলি কাঁদছে।

    বাচ্চারা কাঁদছে কেন?

    সবচেয়ে ছোটটাকে মামা একটা কিক বসিয়ে দিয়েছে। রাগলে তার মাথা ঠিক থাকে না। মহা ছোটলোক। একদিন শুনবি শালাকে আমি খুন করে ফেলেছি।

    বুলু তিন প্লেট ভাত খেয়ে ফেলল। সোবাহান বলল, আর কিছু খাবি? দৈ মিষ্টি?

    বুলু মাথা নাড়ল।

    খা, অসুবিধা কিছু নাই। এখন টাকা দিতে হবে না।

    না, আর কিছু না। সিগারেট দে। আছে?

    আছে।

    বুলু চোখ বন্ধ করে সিগারেট টানতে লাগল। বুলুর চেহারাটা চমৎকার। ফর্সা গায়ের রঙ। মেয়েদের মতো চিবুক। বড় বড় চোখ। তাকে দেখলেই মনে হয় সিনেমার কোনো নায়ক বেকার যুবকের ভূমিকায় পার্ট করছে।

    বুঝলি সোবাহান, মামির জন্যে টিকে আছি। মামির দিকে তাকিয়েই ওই শালাকে খুন করতে পারছি না।

    তুই এখন কী করবি?

    কিছু করব না। সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরব। এর মধ্যে মামা কিছুটা ঠান্ডা হবে আশা করা যায়।

    সন্ধ্যা হতে তো দেরি আছে।

    এতক্ষণ কী করবি? আমার সঙ্গে চল।

    না, তোর ওখানে যাব না। ঘরটা ভালো না। ঢুকলেই দম বন্ধ হয়ে আসে। আসি। আমি কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করব।

    টাকাপয়সা আছে তোর কাছে?

    না।

    দশটা টাকা নে আমার কাছ থেকে।

    আরে না, টাকা থাকলেই খরচ হয়ে যাবে। তুই বরং এক প্যাকেট সিগারেট কিনে দে। আমার একটা বাকির দোকান ছিল। ব্যাটার ভগ্নিপতি মারা গেছে। দোকান বন্ধ করে গেছে দেশে।

    বুলু উঠে দাঁড়াল। সোবাহান তাকে এগিয়ে দিতে গেল। বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত তারা হাঁটল নিঃশব্দে। বুলুর মুখে গাঢ় দুশ্চিন্তার রেখা। হাঁটছে মাথা নিচু করে। সোবাহান বলল, আমার সঙ্গে এসে কিছুদিন থাকতে পারিস। থাকবি?

    আরে না।

    আমার সঙ্গে দেশে যাবি? কয়েকদিন থেকে আসব।

    বুলু জবাব দিল না।

    জায়গাটা ভালো। তোর পছন্দ হবে।

    বুলু সিগারেট ধরাল। তার সম্ভবত কথা বলতে ইচ্ছা করছে না।

    ⤷
    1 2 3 4
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleদাঁড়কাকের সংসার কিংবা মাঝে মাঝে তব দেখা পাই – হুমায়ূন আহমেদ
    Next Article অমানুষ – হুমায়ূন আহমেদ

    Related Articles

    হুমায়ূন আহমেদ

    বোতল ভূত – হুমায়ূন আহমেদ

    January 3, 2026
    হুমায়ূন আহমেদ

    নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ – হুমায়ূন আহমেদ

    January 3, 2026
    হুমায়ূন আহমেদ

    রং পেন্সিল – হুমায়ূন আহমেদ

    January 3, 2026
    হুমায়ূন আহমেদ

    বিবিধ / অগ্রন্থিত লেখা – হুমায়ূন আহমেদ

    January 3, 2026
    হুমায়ূন আহমেদ

    আজ হিমুর বিয়ে – হুমায়ূন আহমেদ

    January 3, 2026
    হুমায়ূন আহমেদ

    কৃষ্ণপক্ষ – হুমায়ূন আহমেদ

    January 3, 2026
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }