Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মহাভারতের নারী – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

    August 30, 2025

    মহাভারতের একশোটি দুর্লভ মুহূর্ত – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

    August 30, 2025

    যখন নায়ক ছিলাম – ধীরাজ ভট্টাচার্য

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    অলাতচক্র – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এক পাতা গল্প277 Mins Read0

    ১৮. শুকনো পাতার ওপর মচমচ শব্দ

    শুকনো পাতার ওপর মচমচ শব্দ ক্রমেই কাছে এগিয়ে আসছে। সূর্যালোকিত দিনে, চারদিকে মানুষের গলার শব্দ আর পাখির ডাকের মধ্যে এই পায়ের আওয়াজ বেশ। কাব্যিক বলে মনে হয়, কিন্তু লোকালয় থেকে দূরে এমন মেঘচাপা আলো আর শোঁ শো হাওয়া বওয়া দুর্যোগের দিনে বুকের ভেতর নাম-না-জানা ভয়ের জন্ম দেয়।

    আমাদের উৎকণ্ঠিত আশঙ্কাকে মিথ্যা প্রমাণিত করে জঙ্গলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল বিশুয়া–আমাদের জিপের ড্রাইভার।

    অসিতবাবু অবাক হয়ে বলেলেন—আরে, এ তো বিশুয়া! তুমি ছিলে কোথায়?

    আমি বললাম-কী ব্যাপার বিশুয়া? কোথায় গিয়েছিলে?

    বিশুয়ার চোখমুখে কেমন একটা হতচকিত ভাব। সে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বটে, কিন্তু পুরোপুরি যেন এখানে নেই। গভীর ঘুম থেকে হঠাৎ কাউকে ডেকে তুললে যেমন হয়।

    অসিতবাবু আবার জিজ্ঞেস করলেন-কোথায় ছিলে এতক্ষণ?

    হাতের তালু দিয়ে মুখটা একবার মুছে নিয়ে বিশুয়া বলল—ওদিকে ওই বনের মধ্যে একটু গিয়েছিলাম, ইয়ে–ঘোট বাইরে করতে। কেন বাবু, কী হয়েছে?

    বললাম—এত সময় লাগল? প্রায় তিন কী চার ঘণ্টা। বেড়াচ্ছিলে নাকি?

    বিশুয়ার মুখে অকৃত্রিম বিস্ময় এবং না-বোঝার ভাব ফুটে উঠল। একবার আকাশের দিকে এবং চারধারে তাকিয়ে সে বোধহয় আন্দাজ করবার চেষ্টা করল এখন কতটা বেলা, কিন্তু মেঘলা দিনে সময় বোঝা খুব কঠিন। সে বলল—আমি তত বেশিক্ষণ যাইনি বাবু, এই—পাঁচ কী সাত মিনিট। বেড়ানোর সময় আর পেলাম কোথায়?

    অসিতবাবু বললেন—ঠিক আছে। যাও, তুমি খেয়ে নাও গিয়ে। পরে কথা হবে–

    বিশুয়া অবাক হয়ে বলল—সে কী, এর মধ্যে রান্নাও হয়ে গিয়েছে! এই তো সবে সকাল।

    আমি কথা বলতে যাচ্ছিলাম, অসিতবাবু আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন–হ্যাঁ, আজকে একটু তাড়াতাড়ি রান্না হয়ে গিয়েছে। যাও তুমি–

    বিশুয়া চলে যেতে আমরা পরস্পরের মুখের দিকে তাকালাম। অসিতবাবু বললেন কী বলতে যাচ্ছিলেন আপনি? তখন থামালাম বলে কিছু মনে করবেন না–

    বললাম—বিশুয়ার জীবনে কোনো আশ্চর্য উপায়ে চারঘণ্টা সময় উপে গিয়েছে। ও ভাবছে এখনো বুঝি সকাল। এ আবার কী ব্যাপার?

    –জানি না। কিন্তু ওর ভুল এখনই ধরিয়ে দেবার দরকার নেই। ঘাবড়ে যাবে। দুতিনদিন এই নির্জনে আমরা ক-জন মাত্র আছি, এর মধ্যে বিশুয়ার কিছু হলে খুব মুশকিল।

    কিন্তু বিশুয়া অত সহজে বুঝলো না। সে সরল বটে, কিন্তু বোকা নয়। ডহরুর কাছে ঘড়ি নেই, বিশুয়া আমাদের কাছে বারবার এসে জিজ্ঞাসা করতে লাগল, এখন ক’টা বাজে। মেজকর্তা আর নির্মল কাঞ্জিলাল ব্যাপারটা শুনেছেন। যেহেতু তারাই কর্তা, আমরা শেষপর্যন্ত বিশুয়াকে তাদের কাছে পাঠিয়ে দিলাম। মেজকর্তা বললেন—কী বিশুয়া, তোমার নাকি কী অসুবিধে হচ্ছে, কী ব্যাপার!

    বিশুয়াকে দেখলে মনে হয় তার যেন ঘোর লেগে রয়েছে। চোখ-ভাসা-ভাসা, মুখ ঈষৎ হাঁ। প্রশ্নের উত্তরে সে বলল—কর্তা, এখন বেলা কটা হল?

    —কেন, সে খোঁজে তোমার কী দরকার?

    –বলুন না কর্তা। আমাকে খেতে দেওয়া হল, অথচ এত বেলা তো হবার কথা নয়–

    মেজকর্তা একটুখানি ভাবলেন, বুঝলাম তিনি মনে মনে স্থির করছেন কতখানি সত্যকথা বিশুয়া একবারে নিতে পারবে। তারপর বললেন—তা বেশ বেলা হয়েছে, দুটো কী আড়াইটে তো হবেই–

    বিশুয়া যেন কেমন হয়ে গেল, বলল—তা কী করে হবে কর্তা? এই তো সবে ওদিককার বনে ঢুকেছিলাম, জলধরা চলে যাবার পরে পরেই। তখন সকাল নটা। এরমধ্যেই বেলা দুটো হয়ে গেল!

    –কী করে জানলে জলধর যখন গেল তখন বেলা নটা?

    বিশুয়া বলল—আমি আর কী করে জানব বাবু? আপনারাই তো বলাবলি করছিলেন।

    মেজকর্তা হেসে বললেন–আসলে কী হয়েছে জানো বিশুয়া, তুমি বনের মধ্যে কোথাও বসে বিশ্রাম করতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলে। তাইতে বেলা হওয়া বুঝতে পারোনি–

    বিশুয়া বুদ্ধিমান না হোক, বোকা নয়। সে বলল–তাই বলছেন কর্তা? তা হবে হয়ত। কিন্তু তাহলে তো আমার খুব খিদে পেত, তাই না? খিদে পায়নি কিন্তু–

    বাচ্চা ছেলেকে সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে মেজকর্তা বললেন—এক একদিন অমন হয়, কিছুতেই আর খাওয়ার ইচ্ছে হয় না। এই তো, আমারই পরশু হয়েছিল।

    ভাল কর্মচারীর লক্ষণ যদি প্রশ্নহীন আজ্ঞাবহতা হয় তাহলে বিশুয়া একজন গুণী কর্মচারী। মুখের ওপর কোনো কথা না বলে সে চলে গেল বটে, কিন্তু তার ভাবভঙ্গি দেখে বুঝতে পারলাম তার মনে ধাঁধা রয়েই গেল।

     

    বেলা এগুবার সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার ক্রমেই চারদিক থেকে আরও ঘনিয়ে আসতে লাগল। বৃষ্টি কখনও টিটিপ করে পড়ছে। কখনও বা ঝরঝর করে বেশ এক পশলা বর্ষণ হয়ে যাচ্ছে। বিকেলের চা আমরা কাজের তাঁবুর ভেতরে বসেই খেলাম। ছোটবেলায় ইস্কুলে পড়বার সময়ে ‘আদিম পৃথিবীর ইতিহাস’ নামে একখানি বই পড়েছিলাম। পাঠ্যতালিকার বাইরেও ভালো সাহিত্য আর সাধারণ জ্ঞানের বই বাবা ডাকমারফৎ আনিয়ে আমাকে উপহার দিতেন। তাতে পড়েছিলাম সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে, যখন কৃষিকাজ, সভ্যতা বা বিজ্ঞান কিছুই ছিল না, তখন আদিম মানুষেরা দুর্যোগের দিনে গুহার মধ্যে একজায়গায় জড়াজড়ি করে বসে বাইরে প্রাকৃতিক শক্তির মাতামাতি দেখতে। আমাদের সেই পূর্বপুরুষদের কাছ থেকেই আমরা রক্তের গভীরে অন্ধকারের প্রতি ভয় ও বিস্ময়ের ভার বহন করে চলেছি। অসময়ে অন্ধকার হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের মনের মধ্যে সেই আদিম, যুক্তিহীন ভয় ফিরে এল। মুখে হয়তো কেউই কিছু বললাম না, কিন্তু সকলেই বুঝতে পারলাম ভেতরে আমরা ভালো নেই।

    সেই রাত্তিরে বড় অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতার মুখখামুখি হলাম। সেই দু’দিন দু’রাত্তিরের কথা ভাবলে এখনো গা শিউরে ওঠে, মনে হয়—যা দেখেছিলাম তা সব সত্যি তো?।

    বিকেলে চা খাওয়ার সময়েই মেজকর্তা আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন—জলধর না ফেরা পর্যন্ত আপাতত কাজকর্ম বন্ধ রইল বলেই মনে হচ্ছে। এই আবহাওয়ায় ঘুরে ফিরে কাজের প্ল্যান তৈরী করারও উপায় নেই।

    নির্মলবাবু বললেন—আজ আর কিছুই করা সম্ভব ছিল না। এই বৃষ্টিতে থিওডোলাইটই খাড়া করা যেত না। তবে কাল যদি মেঘ কেটে যায় তবে সাইট সার্ভে একটু এগিয়ে রাখবো। শিখিয়ে দিলে বিশুয়া বা ডহরু আয়না চমকাবার কাজ চালিয়ে দিতে পারবে। দেখা যাক কী হয়—

    তাঁবুর দরজা দিয়ে বাইরের জলে ভেজা ঝোপঝাড় আর গাছেদের কালো কালো গুঁড়ি দেখতে পাচ্ছি। জলকণা তাঁবুর ভেতরে ঢুকছে। সেই হাওয়ার দাপটেই তাঁবুর দরজার ভেজা ক্যানভাসের পর্দাটা পতপত্ শব্দ করছে। সেদিকে তাকিয়ে যেন কিছু আত্মগত ভাবেই অসিত বিশ্বাস বললেন—এমন জলে ভেজা বাদলার দিনে ছোটবেলার একটা পুরনো ঘটনা মনে পড়ে গেল। আপনাদের শোনাতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু সে-সব সেকেলে পেঁয়ো গল্প—যাকে বলে ওল্ড ওয়াইভস টেল—তা কি আপনাদের ভাল লাগবে? থাক বরং–

    মেজকর্তা চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন। এতক্ষণ তিনি নিতান্ত ঝিমিয়ে ছিলেন, এবার গল্পের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় তাঁর চোখে উৎসাহের জ্যোতি ফিরে এসেছে। অসিতবাবুর দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন—পেঁয়ো গল্প আবার কী? অমন কিছু হয় না। গল্প দু রকম হতে পারে—ভাল আর খারাপ। আপনার গল্প ভাল হলেই হল।

    অসিতবাবু বললেন—এসব গল্পের বোধহয় ঠিক ভাল বা খারাপ হয় না। ছোটবেলার কথা মনে পড়লে মনটা একটু কেমন যেন হয়ে পড়ে, আনন্দও হয়, বিষণ্ণও লাগে। আনন্দটা বেশি হয়। কাজেই আমার তত ভাল লাগবেই। কিন্তু আপনাদের—যাক্, ঘটনাটা বলি।

    আমি মেদিনীপুরের মানুষ। দেশের বাড়ি হচ্ছে পানিপারুল গ্রামে, সেখানেই আমাদের বহুপুরুষের বাস। বাবা কাজ করতেন মহিষাদল রাজ এস্টেটে। আমার জন্মও মহিষাদলেই। আবছা আবছা সেখানকার কথা মনে পড়ে। বিশেষ করে তালগাছের সারি দিয়ে ঘেরা একটা জলে ভরা দীঘির ছবি চোখে ভাসে, তার পাড়ে আমি খেলা করতাম। বেশি বড় দীঘি নয়, কিন্তু তার চারদিকের লতাপাতা আর নির্জনতা জায়গাটিকে কেমন নিভৃত স্বপ্নময় করে তুলেছে। ছবিটা মনে পড়লেই আবার একবার মহিষাদল বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আর কি হবে?

    আমার যখন দশ বছর বয়েস, সে সময় বাবা মহিষাদলের কাজ ছেড়ে পানিপারুল ফিরে আসেন। বাবা খুব স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলেন, হয়ত নিয়োগকর্তার আচরণ তার ভাল লাগেনি। এর পরে আর কখনো উনি পরের চাকরি করেন নি, বাড়িতে থেকেই নিজেদের যা জমিজমা ছিল তার চাষের কাজ দেখতেন আর সকাল-বিকেল গ্রামের ছেলেমেয়েদের দলবেঁধে বারান্দায় বসিয়ে পড়াশুনো দেখিয়ে দিতেন। এর জন্য কারো কাছে টাকাপয়সা কিছু নিতেন না। গ্রামের লোকেরা তাকে মাস্টারমশাই বলে ডাকত।

    আমাদের শৈশবে প্রায় সব পরিবারই ছিল একান্নবর্তী। বাড়ির কোনো ছেলে বড় হয়ে বৌ-ছেলেপিলে নিয়ে আলাদা থাকবে, এমন স্বার্থপরতার কথা কেউ সেকালে ভাবতেই পারত না। জ্যাঠামশাই, বাবা আর দুই কাকা ছাড়া আমাদের পরিবারে ছিলেন জ্যাঠাইমা, মা, দুই কাকিমা আর জ্যাঠতুতো-খুড়তুতো ভাইবোনেরা। চাষের কাজ দেখবার জনাদুই কৃষাণও বাইরের দালানে ঘুমোত। আর ছিল বাড়ির পুরনো কাজের লোকেরা। তারা অবশ্য বহুদিন থেকে থেকে বাড়ির লোেকের মতই হয়ে গিয়েছিল। এদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্কা ছিল অমিয়বালা, সে দেখেছি জ্যাঠামশাইকেও রীতিমত ধমকধামক করত। তাকে নাকি সে ছোট দেখেছে। জ্যাঠামশাইও মাথা নিচু করে তা মেনে নিতেন। এমনই চমৎকার ছিল সে সমাজ।

    আমার যখন বছর বারো বয়েস তখন আমার জ্যাঠতুতো দিদি সিন্ধুলতার বিয়ে ঠিক হল। পাত্রের বাড়ি শোলপাট্টায়, নামকরা পরিবারের ছেলে, দানধ্যানের বিষয়ে সমাজে খ্যাতি আছে। পাত্রের বাবা উদারপন্থী মানুষ, এ বিয়েতে কিছু গ্রহণ করবেন না। তিনি নাকি বলেছেন-বাড়িতে আমার মা আসছেন, মাকে একখানা লালপেড়ে শাড়ি আর দুমুঠো ডালভাত দেবার ক্ষমতা এ পরিবারের আছে। খামোকা জিনিসপত্র চাইতে গেলে লোকে যে ‘বিষ্টু মাইতি ছেলে বিক্রি করল’ বলে খ্যাপাবে—তখন কী হবে?

    কথাটার পেছনে শুধুই সারল্য বা উদারতা নয়, কিছুটা প্রচ্ছন্ন ধনগর্বও ছিল। কিন্তু বিষ্ণু মাইতি মানুষ এমনিতে খুব ভাল, তাছাড়া এটুকু সামান্য গৌরব করার অধিকার মানুষকে ছেড়ে দিতেই হয়। আর এ কথা তো ঠিক যে, নেহাৎ আমার দিদি খুব সুন্দরী। ছিলেন বলে এখানে বিয়ে ঠিক হয়েছে, নইলে আমাদের মত অতি সাধারণ ঘর থেকে মাইতি মশায় মেয়ে নিতেন কিনা সন্দেহ।

    দেশেঘরে যেমন হয়, দল বেঁধে পাড়ার মেয়ে-বৌয়েরা দিদিকে এসে দেখে যেতে লাগলেন। নেমন্তন্ন করে আইবুড়ো ভাত খাওয়াবার ধুম পড়ে গেল। ভালমন্দ খেয়ে দিদি আর পারে না। এমন সময় একদিন এলেন গ্রামের কুঞ্জকামিনী দেবী—সকলের কুঞ্জমাসি। গ্রামের একেবারে প্রান্তে শ্বশুরের ভিটেয় বাস করেন, নিঃসন্তান বালবিধবা। সবাই তার মিষ্টি আর অমায়িক ব্যবহারের জন্য তাকে ভালবাসত। কুঞ্জপিসিমা বাড়িতে ঢুকে উঠোন। থেকে জ্যাঠামশাইয়ের নাম ধরে জোরে ডাক দিলেন কই গোলোক কোথায় গেলে? শুনলাম নাকি মেয়ের বিয়ে দিচ্ছ? তা আমরাও নেমন্তন্ন পাব তো, না কি?

    ডাক শুনে মা আর জ্যাঠাইমা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বারান্দায় মাদুর পেতে কুঞ্জপিসিকে বসতে দিলেন। পুজো সেরে জ্যাঠামশাই এলেন, বললেন—আসুন দিদি, আজ বিকেলেই তো আপনার কাছে যাব ভেবে রেখেছি। একটু দেরি হয়ে গেল–

    কুঞ্জকামিনী বললেন—ওসব জানা আছে। আসলে আমাকে নেমন্তন্নর লিস্টি থেকে বাদ দেবার ইচ্ছে, আমি কি বুঝি না? তা কুঞ্জ কায়েনীকে অত সহজে বাদ দেওয়া যাবে না ভাই, সে কথাটা বলতে নিজে চলে এলুম।

    জ্যাঠামশাই হাতজোড় করে বললেন—ও কী কথা দিদি, সত্যিসত্যিই আজ বিকেলে আমি যেতাম। আপনাকে বাদ দিয়ে এ গ্রামের কোনো শুভ উৎসব সম্ভব নাকি!

    দিদিকে ভেতরবাড়ি থেকে এনে প্রণাম করানো হল। কুঞ্জকামিনী দিদির চিবুক ছুঁয়ে চুমু খেয়ে বললেন—তোমার ভাল নাম তো সিন্ধুলতা, না খুকি?

    মাথা নেড়ে দিদি জানাল-হ্যাঁ।

    কুঞ্জপিসি বললেন–যাও মা, ভেতরে যাও। এই তো আর কদিন বাকি, এখন খুব সাবধানে থাকবে। বাড়ির বাইরে একদম বেরুবে না। বিয়ের আগে খুব সাবধানে থাকতে হয় জান তো? যাও

    দিদি ভেতরে গেলে কুঞ্জপিসি জ্যাঠামশাইকে ডেকে কাছে বসিয়ে বললেন-গোলোক, তোমার সঙ্গে একটু জরুরি কথা আছে। বস্তুতঃ সেই কথা বলতেই আসা। নইলে আজকে তুমি নেমন্তন্ন করতে যাবে সে তো আমি জানতামই—

    জ্যাঠামশাই কুঞ্জপিসির দিকে একমুহূর্ত স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে বললেন—নেমন্তন্ন করতে যাবো, সেটা যে জানতেন তাতে আমার সন্দেহ নেই, কিন্তু আজই যে যাবো তা কী করে জানলেন?

    কুঞ্জকামিনী সামান্য হাসলেন, বললেন—আমি জানতে পারি।

    কুঞ্জকামিনীর বিচিত্র চরিত্র সম্বন্ধে আমাদের গ্রামের লোকেদের মধ্যে নানারকম মত প্রচালিত ছিল। কুঞ্জপিসি নিখুঁতভাবে মানুষের আসন্ন বিপর্যয়ের কথা বলে দিতে পারতেন, অনেকে বলে তিনি নাকি পশুপাখির ডাক শুনেও অনেক কিছু বুঝতে পারতেন—এবং সবক্ষেত্রেই দুর্বিপাক থেকে মুক্তি পাওয়ার একটা উপায়ও বলে দিতেন। এই কারণেই তাকে সকলে শ্রদ্ধা করতো, মানতো। অমঙ্গলের থার্মামিটার বলে মনে করার চেয়ে সবাই তাঁকে স্নেহময়ী পরিত্রাণকত্রী হিসেবে ভালবাসত। গ্রামর বয়স্ক মানুষেরা বলতেন কুঞ্জপিসীর ছোটবেলায় হিমালয় থেকে একজন সাধু এসে পিসির বাপের বাড়ির গ্রামে কয়েকদিন বাসা বেঁধেছিলেন। কুঞ্জপিসীকে কোলে নিয়ে তাঁর বাবা গিয়েছিলেন সাধুকে প্রণাম করতে। পিসিকে দেখে সাধু অবাক হয়ে বলেছিলেন—এ তো খুব উচ্চদশার মেয়ে তোমার ঘরে জন্ম নিয়েছে। একটা কথা বলি, মনখারাপ কোরো না। তোমার এ মেয়ের বিয়ে হবে বটে, কিন্তু সংসারধর্ম এর কপালে লেখা নেই। তার বদলে এক সুন্দর, দিব্য জীবন তোমার মেয়ে লাভ করবে। কিছু ক্ষমতা এ নিয়েই জন্মেছে, কিছু ক্ষমতা আমি দিয়ে যাচ্ছি। বহু মানুষের উপকার করতে পারবে তোমার এই মেয়ে।

    আর ঠিক এই কারণেই কুঞ্জকামিনী আমাদের গ্রামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। কারো কোনো দুঃসময়ে তিনি খবর না দিলেও এসে দাঁড়াতেন, একটা অদ্ভুত কিছু ভবিষ্যৎবাণী করতেন, এবং তা অবধারিতভাবে ফলে যেত। সিদ্ধবাক হিসেবে কুঞ্জপিসির একটা খ্যাতি রটে গিয়েছিল। মাধবখুড়ো জব্বলপুর যাবার জন্য বাক্সবিছানা গুছিয়ে বের হচ্ছিলেন, গরুর গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাতে মালপত্র তুলে তিনি দরজায় তালা লাগাচ্ছেন, এমন সময় কুঞ্জকামিনী বামুনপাড়া যাবার পথে থমকে দাঁড়ালেন। বললেন—কী ব্যাপার মাধব? কোথাও যাচ্ছ বলে মনে হচ্ছে–

    মাধবখুড়ো তালাতে চাবি ঘুরিয়ে একবার টেনে দেখে ফিরে দাঁড়ালেন। বললেন–হ্যাঁ দিদি। জব্বলপুরে বড়ছেলেটা কাজ করে, বহুদিন থেকে তার কাছে যাব যাব ভাবছি। যাওয়া আর হয়ে ওঠে না। তা এবার একটু সুযোগ পেয়ে বেরিয়ে পড়েছি। এমন সময়ে এলেন দিদি, একটু বসতেও বলতে পারলাম না, বড় খারাপ লাগছে–

    কুঞ্জকামিনী একবার আকাশের দিকে তাকালেন, চোখ বুজে কী ভাবলেন, তারপর বললেন-না মাধব, তোমার এখানে একটু বসেই যাই। দরজা খোলো—

    মাধবখুড়ো অস্বস্তিতে পড়লেন। এ কেমন কথা বলছেন কুঞ্জকামিনী? এক্ষুণি না রওনা হলে বারো মাইল দূরের শহরে গিয়ে বাস ধরতে পারবেন না, আর বাস না পেলে জংশনে গিয়ে মেল ট্রেন পাবেন না। এদিকে কুঞ্জকামিনীর কথাও অমান্য করা যায় না। অসাধারণ ব্যক্তিত্ব তার, যা বলেন তা খেটে যায় বলেও নামডাক আছে। মাধবখুড়ো বিব্রত হয়ে বললেন—আমার বাড়িতে বসবেন এ তোত আমার সৌভাগ্য। কিন্তু দিদি, অপরাধ নেবেন না, এখনই না বেরুলে যে আমি ট্রেন পাবো না—

    হিমশীতল গলায় কুঞ্জকামিনী বললেন—তোমাকে ট্রেন পেতে হবে না। তোমার যাওয়া বাতিল। কেন খামোকা বকাচ্ছ মাধব? দরজা খুলে দাও, বসি—

    এবার মাধববুড়ো ভয় পেয়ে গেলেন। কুঞ্জকামিনীর চোখে কী এক অনির্দেশ্য রহস্যের ছায়া। এ মানুষের কথা অমান্য করা যায় না। তিনি আবার দরজা খুলে বাড়ির ভেতরে। ঢুকলেন, তালপাতার চাটাই এনে বসতে দিলেন কুঞ্জকামিনীকে। বললেন—কী ব্যাপার, দিদি।

    –কীসের কী ব্যাপার?

    —আমাকে যেতে বারণ করলেন কেন?

    কুঞ্জকামিনী একটু রাগত স্বরে বললেন–বেশ করেছি বারণ করেছি। গুরুজন মানুষের কথা না হয় শুনলেই। অত কৈফিয়ৎ চাইছ কী জন্যে? আর যদি একান্তই যেতে ইচ্ছে করে তাহলে বেরিয়ে পড়, গাড়ি তো দাঁড়িয়েই আছে—

    গাড়োয়ান নিবারণ ঘরামি এসে উঠোনে দাঁড়িয়ে বলল—-খুড়োমশাই, বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু, এর পরে হলে আর বাস ধরাতে পারব না–

    মাধববুড়ো একটু ইতস্তত করলেন, একবার কুঞ্জকামিনীর দিকে তাকালেন, তারপর বললেন–ইয়ে, নিবারণ, আজ আর আমার যাওয়া হবে না। তুমি বরং মালপত্রগুলো গাড়ি থেকে নামিয়ে দাওয়ায় এনে রাখ–

    নিবারণ অবাক হয়ে বলল—যাবেন না বাবু?

    —না নিবারণ, একটু অসুবিধে ঘটেছে। তুমি মালগুলো নিয়ে এস—

    মাধবখুড়ো শেষপর্যন্ত আর সত্যিই যাচ্ছেন না দেখে কুঞ্জকামিনী একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন–ভাল করলে মাধব, নইলে তোমার ক্ষতি হত। বাধা আছে। উঠি তাহলে। পরশু বা তরশু তোমার সঙ্গে দেখা হবে

    –পরশু বা তরশু? কেন বলুন তো? দেখা করতে বলছেন আমাকে?

    -আমি কিছুই বলছি না, তুমি আপনিই যাবে—

    মাধবখুড়ো আর কথা বাড়াতে সাহস করলেন না। কুঞ্জকামিনী যেতে গিয়ে উঠোনের মাঝখানে থেমে পেছন ফিরে বললেন–সাতষট্টি হত, কিন্তু এখন ছেষট্টি হবে।

    এই শেষের কথাটা মাল এনে নামিয়ে রাখবার সময় নিবারণ ঘরামিও শুনে ফেলেছিল, সে-ই পরে ব্যাপারটা সবাইকে বলে। নইলে কেবল মাধবখুড়োর কথা লোকে বিশ্বাস করতে সময় নিত। মাধবখুড়োর যাত্রা স্থগিত হবার তিনদিন পর গ্রামের একমাত্র মণিহারী দোকানের মালিক সুদর্শন আদক উত্তেজিত অবস্থায় কালীতলার পাশার আড্ডায় এসে হাজির হল। অনেকখানি পথ হহ করে হেঁটে আসায় সে হাঁপাচ্ছে। বিধু নন্দ বললেন—কী হল সুদর্শন? কী হয়েছে?

    সে কথার উত্তর না দিয়ে সুদর্শন জিজ্ঞাসা করল—আচ্ছা, মাধবখুড়া কি গ্রামে রয়েছে? তার তত ছেলের কাছে যাবার কথা, গিয়েছে কি?

    তার কথায় রহস্যের গন্ধ পেয়ে গ্রামবৃদ্ধেরা পাশা ছেড়ে তাকে ঘিরে ধরল। বিধু নন্দ বললেন—কেন, তুমি জানো না?

    সুদর্শনের মুখ শুকিয়ে গেল। সে বলল—আমি কিছুই জানি না, দোকানের জন্য মাল কিনতে কলকাতায় গিয়েছিলাম, পাঁচদিন পর এই বাড়ি ফিরছি। মাল আসছে পেছনে পার্সেলে। মাধবখুড়ো কেমন আছেন? তার তো ছেলের কাজের জায়গায় যাবার কথা ছিল জব্বলপুরে, গিয়েছে নাকি?

    ধীরেন দলুই বললেন—সে এক মজার ব্যাপার হয়েছে বাপু। না, তার যাওয়া হয়নি। কুঞ্জদিদি তাকে আটকে দিয়েছেন।

    —কুঞ্জদিদি? কীভাবে?

    –বেরুবে বলে মাধবখুড়ো গাড়ি ডেকে তাতে মালপত্র তুলে দরজায় তালা লাগিয়ে ফেলেছিল। সে সময় কুঞ্জদিদি বুঝি যাচ্ছিলেন সামনে দিয়ে। তিনি মাধবখুড়োকে যেতে বারণ করেন। জানো তো, কুঞ্জদিদির কথা গায়ে কেউ অমান্য করতে সাহস পায় না। মাধবখুড়োও যাওয়া বন্ধ করেছে। কেন বল তো?

    উত্তরে বগলের তলা থেকে একটা খবরের কাগজ বের করে মেলে ধরল সুদর্শন আদক।

    সকলে ঝুঁকে পড়ল কাগজখানার ওপর।

    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleতারানাথ তান্ত্রিক – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    Next Article রম্যরচনা ৩৬৫ – তারাপদ রায়

    Related Articles

    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    তারানাথ তান্ত্রিক – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 22, 2025
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    কাজল – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 22, 2025
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    তৃতীয় পুরুষ – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 22, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    মহাভারতের নারী – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    মহাভারতের নারী – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    মহাভারতের নারী – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

    August 30, 2025

    মহাভারতের একশোটি দুর্লভ মুহূর্ত – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

    August 30, 2025

    যখন নায়ক ছিলাম – ধীরাজ ভট্টাচার্য

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.