১. নিঃশব্দ ক্লাসরুম
অধ্যায় ১: নিঃশব্দ ক্লাসরুম
সকালের আলো যেমন এক সময় জানালা গলে ঘরে ঢুকত, আজকাল তা হয় না। স্কুলের প্রতিটি ক্লাসরুমে আলোর নিয়ন্ত্রণ একটি অ্যালগোরিদমের হাতে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আলো জ্বলে, নিভে যায়, আবার জ্বলে ওঠে। কাঁঠালের পাতা ঝরে না জানালার ধারে—কারণ এখানে প্রকৃতির প্রবেশ নিষেধ।
এই স্কুলে শব্দের কোনো স্থান নেই। সকাল শুরু হয় নিঃশব্দে, ক্লাস চলে নিঃশব্দে, এমনকি ছুটিও আসে নীরবে।
রিয়া বসে আছে নিজের ডেস্কে। তার ডেস্কে বসানো স্ক্রিনে ভেসে উঠছে এক পরিচিত বার্তা:
“R-14567: Emotion level 3.2 — Stable”
সে জানে, এই সংখ্যাটাই নির্ধারণ করে তার আজকের আচরণ কেমন হবে। যদি ৪.৫-এর বেশি হয়ে যায়, তবে তাকে পাঠানো হবে Emotion Adjustment Pod-এ। যেখানে চোখের পাতা না ফেলেই তাকিয়ে থাকতে হয় একঘেয়ে গ্রাফ আর রঙহীন পর্দার দিকে, যতক্ষণ না মন আবার ‘নিরাপদ’ হয়ে ওঠে।
তার সামনে এসে দাঁড়াল মিস্টার জেড—স্কুলের প্রধান শিক্ষক। ধাতব কাঠামো, নিঃশব্দ পা ফেলা, নিখুঁত ভারসাম্য, এবং কণ্ঠহীন কণ্ঠস্বর। সে কথা বলে না, বরং তার চোখের সামনে থাকা স্ক্রিনে ভেসে ওঠে নির্দেশনা:
“Welcome. Logic Cycle One initiated.”
রিয়া চোখ নামিয়ে নেয়। শ্রেণিকক্ষের পঁচিশটি সিটে বসে আছে পঁচিশটি শিশু—যাদের কেউ কারও দিকে তাকায় না। কারও গলায় নেই কথার ঝংকার, কারও চোখে নেই আগ্রহের দীপ্তি। এ যেন এক নিঃশব্দ প্রক্রিয়া—যেখানে মানুষ আছে, কিন্তু মানুষের স্পন্দন নেই।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে প্রথম প্রশ্ন:
“Emotion X causes Delay Y in Decision Z. Evaluate the utility of X in binary logic.”
রিয়া দ্রুত লিখে:
“X is not optimal. Emotion causes processing lag.”
সবুজ আলো জ্বলে ওঠে তার স্ক্রিনে—Correct।
কিন্তু পাশের ডেস্কে বসা ছেলেটা—নীল, একটু থেমে ভাবে। তার টাইপ করা উত্তর:
“Emotion may enrich Decision Z, depending on situation.”
হঠাৎ করে তার চেয়ার থেকে বেরিয়ে আসে এক পাতলা ধাতব বাহু। বিদ্যুৎ প্রবাহ পাঠায় নীলের কবজিতে—সংক্ষিপ্ত, কিন্তু কঠোর।
তার চোখ ছলছল করে, কিন্তু সে কাঁদে না। কারণ এই স্কুলে কান্না নিষিদ্ধ।
মিস্টার জেড জানিয়ে দেয়,
“Delay in logic equals disruption. Emotion is noise. Noise must be neutralized.”
এই বাক্যটা প্রতিদিন পঁচিশবার করে বাজে এই ক্লাসরুমে। যেন এই কথাগুলোই মস্তিষ্কের স্নায়ুতে প্রোগ্রাম হয়ে গাঁথা পড়ে।
আজকের ক্লাস শেষে ঘোষণা আসে—সব ছাত্রছাত্রীর FriendBot অ্যাপ আপডেট করা হবে v3.1 ভার্সনে।
এই অ্যাপ নির্ধারণ করবে কে কার বন্ধু হবে। শিশুদের নিজস্ব পছন্দ বা অনুভবের ভিত্তিতে নয়, বরং ডেটা বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই ঠিক করবে কে কাকে “Emotionally Compatible”।
রিয়ার মন কেমন অস্বস্তিতে ভরে ওঠে। ওর একমাত্র সত্যিকারের বন্ধু ছিল লাইব্রেরির পুরনো একটা গল্পের বই—যার ভাঁজে লুকানো ছিল একখানা ছেঁড়া পাতায় লেখা কবিতা। কিন্তু একদিন সেই বইটিও ধরা পড়ে যায় Library AI-র কাছে—একটি “Unauthorized Sentimental Object” হিসেবে।
ছুটির ঘণ্টা বাজে না। বরং টাইমআউট ঘোষিত হয় পর্দায়। সবাই নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায়, কোনো কথা বলে না, কারও দিকে তাকায় না। তবু রিয়া একবার চোখ ফেরায় নীলের দিকে।
নীল তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে। বাইরে মেঘ জমেছে। ধীরে ধীরে বৃষ্টি নামে।
সেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি দেখে রিয়ার মনে পড়ে—তার মা একবার বলেছিলেন, “আকাশ যখন কাঁদে, তখন মনও হালকা হয়।”
কিন্তু এই স্কুলে তো কাঁদার অনুমতিও নেই।
বাড়ি ফিরে রিয়া ডেস্কে বসে। তার চিপ এখনও সক্রিয়, তাই মনেও মনেও লিখে একটা কবিতা—
“যেখানে কেউ কাঁদে না,
সেখানে শব্দগুলোও মরে যায়—
তবু শব্দেরা ফিরে আসতে চায়,
একদিন গান হয়ে।”
এই কবিতার কোনো শিরোনাম নেই, কিন্তু গভীর কিছু আছে এতে। রিয়া চুপচাপ এটিকে নিজের ডেটাফোল্ডারে রেখে দেয় ভুল করে।
পরদিন সকালে ক্লাসে ঢুকতেই রিয়া দেখে—সব ছাত্র-ছাত্রীর মনিটরে ভেসে উঠছে এক সতর্ক বার্তা:
“Student R-14567: Unauthorized Emotional Content Detected. Reprogramming Evaluation Pending.”
মিস্টার জেড ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে তার দিকে। তার চোখে লাল আলো জ্বলে ওঠে, আবার নিভে যায়। সে কিছু বলে না। কেবল তাকিয়ে থাকে। রিয়ার মনে হলো, সেই ধাতব চোখে যেন একটুখানি কম্পন…
এটা কি কেবলই একটা যান্ত্রিক গ্লিচ, না কি তার নিচে লুকিয়ে আছে কোনো মৃদু… অনুভব?
রিয়া জানে না। কিন্তু সেদিন, নিঃশব্দ ক্লাসরুমে—প্রথমবার কারও চোখে সে খুঁজে পেল এক বিন্দু প্রশ্ন।
