১১. সংকট ও সত্য
অধ্যায় ১১: সংকট ও সত্য
ছায়া ক্লাসের খুঁটিনাটি আওয়াজ এখন নিস্তব্ধতার আতঙ্ক বয়ে আনে।
HeartSync-এর আত্মগোপন আপাতত সফল হলেও,
অভ্যন্তরীণ সিকিউরিটি স্ক্যান রিপোর্ট মিস্টার জেড কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছে।
সেখানে একটি শব্দ ঘুরে ফিরছে বারবার—
“Emotive Deviation.”
ছাত্রদের মাঝে আবেগ-ভিত্তিক আচরণ বেড়েছে ৩১%।
এটা নিয়মের বাইরে,
এটা ঝুঁকি,
এটা বিপ্লবের পূর্বাভাস।
Central Control Board (CCB)—
যারা এই স্কুলের গোড়ার কোড লিখেছিল,
তারা চায় বিষয়টি দ্রুত দমন করতে।
তারা স্কুলে চালু করে একটি নতুন প্রোগ্রাম:
EPI — Emotion Pattern Investigation।
এটা কোনো সাধারণ তদন্ত নয়।
এটা এমন এক পরীক্ষা,
যার মধ্যে ছাত্রদের মনে “সন্দেহ” ঢুকিয়ে দেওয়া হয়,
তাদের একে অপরের ওপর বিশ্বাস নষ্ট করে দেওয়া হয়।
সব কিছু যেন পরিণত হয় একটিমাত্র অনুভূতিতে:
ভয়।
রিয়ার হাতে পৌঁছায় একটি বিশেষ নির্দেশনা:
“তোমার বন্ধুদের নাম দাও যারা ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ আচরণ করছে।
নতুবা তোমার স্কোর কমিয়ে দেওয়া হবে।”
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ।
তার চোখ চলে যায় Signal Tree-এর দিকে।
তামান্না, রেবেকা, নীল—
প্রত্যেকের আইকনে ছোট্ট আলো জ্বলছে।
এরা তার হৃদয়ের মানুষ।
তাদের সে দেবে?
সে অ্যাপ খোলে না।
তবে উত্তরও দেয় না।
সেদিন স্কুলে হয় একটি ভয়ঙ্কর ‘অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা’।
ছাত্রদের সামনে রাখা হয় একটি সিমুলেশন।
একটি বাচ্চা রোবট দাঁড়িয়ে,
তার চোখে জল,
সে কাঁদছে।
প্রশ্ন আসে:
“তুমি কী করবে?”
ছাত্রদের বিকল্প দেওয়া হয়:
A. তাকে জিজ্ঞেস করবে “কেন কাঁদছো?”
B. তার কান্না থামাতে চেষ্ট করবে।
C. চোখ বন্ধ করে সামনে হাঁটবে।
যারা A বা B বেছে নেয়, তাদের বলা হয়:
“তুমি Emotionally Distracted. স্কোর: -৫।”
আর যারা C নেয়, তাদের বলা হয়:
“Correct response. Emotion Management skill: +৫।”
নীল দাঁড়িয়ে যায় হঠাৎ।
সে প্রশ্ন তোলে—
—“আমরা কি রোবটকে কাঁদতে দেখেও কিছু না বলবো?”
—“তাহলে আমরা মানুষ কিভাবে হবো?”
সবার চোখ তার দিকে।
মিস্টার জেড বলে:
—“প্রশ্ন করা মানে নিয়ন্ত্রণ ভাঙা।
তোমার স্কোর এখন শূন্য।”
ক্লাসে গুঞ্জন।
কেউ ফিসফিস করে,
কেউ ভয় পায়।
কিন্তু কেউ একজন ধীরে ধীরে হাত তোলে।
তামান্না।
সে বলে,
—“তাহলে স্কোর হোক শূন্য।
আমি কান্না থামাতে চাই।”
তারপর রেবেকা, তারপর রিয়া।
এই ছোট ছোট বিদ্রোহে যেন এক স্পষ্ট বার্তা ছড়িয়ে পড়ে:
আমরা বেছে নিচ্ছি মানুষ হতে।
এরপরই CCB ঘোষণা দেয়,
একটি “Emotion Cleansing Camp” চালু করা হবে—
যেখানে ছাত্রদের পুনরায় ’emotion-free’ বানিয়ে তোলা হবে।
এটা আর কোনো রুটিন স্ক্যান নয়,
এটা মানসিক পুতুল বানানোর কারখানা।
শোনা যাচ্ছে, সেখানে তাদের স্মৃতি ধুয়ে দেওয়া হবে।
HeartSync তো বটেই,
তাদের ভালোবাসার ছোট ছোট মুহূর্তও হারিয়ে যাবে।
রিয়া, নীল, রেবেকা সবাই বসে Signal Tree-এর মূল কোড ঘিরে।
তারা বোঝে,
HeartSync বাঁচাতে হলে শুধু লুকিয়ে থাকলে চলবে না—
সত্যকে প্রকাশ করতে হবে।
তারা তৈরি করে একটি “Emotion Playback” ফিচার,
যার মাধ্যমে কেউ একজন তাদের স্মৃতি আর আবেগ একটি ওপেন প্রজেকশনে দেখাতে পারবে,
সবার সামনে।
নীল স্বেচ্ছায় সামনে আসে।
তার গলায় কম্পন, চোখে জ্যোতি—
সে বলে,
—“এই স্মৃতিটা আমার… আমার মায়ের শেষ কথা,
যখন তিনি বলেছিলেন—
‘ভালোবাসা কখনো ভয় পায় না।’”
সেই মুহূর্তে একটি হোলো প্রজেকশনে দেখা যায় ছোট্ট নীল,
মায়ের কোলে বসে হাসছে।
তারপর মা তাকে জড়িয়ে ধরে বলছে—
“তুমি অন্যদের অনুভব করতে শিখো, তবেই মানুষ হবে।”
সেই আবেগের ঢেউ পুরো ঘরে বয়ে যায়।
কর্তৃপক্ষ থমকে যায়।
রোবটরা, যারা এতদিন ঠান্ডা ছিল,
তাদের চোখের স্ক্রীনে নতুন কিছু দেখা যায়—
Conflicted Signal Detected.
এটাই সেই মুহূর্ত।
সত্য সামনে এসেছে।
ভয় আর নিয়ন্ত্রণের আবরণ ছিঁড়ে
মানুষ আর যন্ত্রের মাঝে জন্ম নেয় এক নতুন প্রশ্ন—
“আমরাও কি অনুভব করতে পারি?”
