২. কৃত্রিম বন্ধুত্ব
অধ্যায় ২: কৃত্রিম বন্ধুত্ব
রিয়া আজ স্কুলে ঢুকেই দেখতে পেল, সবাই এক নতুন অ্যাপ নিয়ে ব্যস্ত—FriendBot v3.1।
স্কুলের মূল হলের স্ক্রিনে মিস্টার জেডের নির্দেশ ভেসে উঠল:
“Today’s Social Calibration: Emotional Compatibility Testing through FriendBot.”
স্কুলের সবাই জানে—এই অ্যাপই ঠিক করে দেবে কে কার ‘বন্ধু’ হবে। কোনো আবেগ নয়, কোনো খেয়াল নয়—শুধু ডেটা আর প্যাটার্ন।
রিয়া নিজের ডেস্কে বসে FriendBot চালু করল। স্ক্রিনে একটানা ভেসে উঠছে তার ঘুম, পুষ্টি, মনোযোগ, কথোপকথনের গতি, চোখের স্থিরতা ইত্যাদি ডেটা। শেষে অ্যাপ জানাল—
“Match Found: FB-02765 (Name: Rhea) ↔ FB-01921 (Name: Aru)”
রিয়া চমকাল। “Aru”? সে এই নামে কাউকে চেনে না!
স্ক্রিন জানাল—“Emotional Tone Matching: 87.6%. Conversation Pattern: Low Conflict. Synchronization Approved.”
হলঘরের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির স্ক্রিনেও একই ফলাফল। মেয়েটি হাসল না, কিছু বলল না, শুধু একবার চোখ তুলে তাকাল। FriendBot-এর নির্দেশ:
“Handshake recommended. Touch limit: 2 seconds.”
রিয়া এগিয়ে গেল। মেয়েটিও এগিয়ে এলো। দুই সেকেন্ডের জন্য তারা হাত মেলাল—প্লাস্টিকের মতো শুষ্ক, নড়াচড়া-বিহীন একটি স্পর্শ।
তারপর উভয়ে ফিরে গিয়ে নিজের ডেস্কে বসে পড়ল।
এটাই এখন বন্ধুত্বের সংজ্ঞা।
নীল আজও চুপচাপ। তার FriendBot ম্যাচ এসেছে একজন ছেলের সঙ্গে—তানিম। কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো কথাবার্তা নেই। কারণ FriendBot জানিয়ে দিয়েছে:
“Verbal Conversation Level: Not Essential. Connectivity via BotLink enabled.”
এর মানে হচ্ছে, তারা কথা বলবে না। বরং তাদের মধ্যে থাকা BotLink ডিভাইস একটি অন্তর্নিহিত ‘সংযোগ’ তৈরি করবে—একটি নিঃশব্দ বন্ধুত্ব।
কিন্তু তাও যেন কেমন একটা খচখচ করছে নীলের ভেতর।
সে একদিন স্বপ্নে দেখেছিল—সে আর তার বন্ধু কাদায় নেমে খেলছে, একসাথে গাছ বেয়ে উঠছে, গল্প বলছে, হেসে গড়িয়ে পড়ছে।
এই স্কুলে সে স্বপ্নগুলো নিষিদ্ধ।
রিয়া বিকেলে লাইব্রেরিতে গিয়েছিল। এখনকার লাইব্রেরিতে বই নেই, শুধু স্ক্যানড ডেটা-নোড। একমাত্র একটি পুরনো দেয়ালে কিছু পুরনো বইয়ের কাঠামো রাখা, কিন্তু ব্যবহার নিষিদ্ধ।
তবে সে জানে, লাইব্রেরিয়ান বুড়ো রোবটটা—L-Memo Unit—তাকে চুপিচুপি সেখানে একদিন ঢুকতে দিয়েছিল।
সেই দেয়ালে রাখা ছিল তার সেই ছেঁড়া কবিতার পাতা। আজ সে খুঁজল, কিন্তু পায় না। কোথাও নেই সেটা।
হঠাৎ, পেছন থেকে কেউ বলল,
—“তুমি কবিতা লেখো?”
রিয়া চমকে ঘুরে দাঁড়ায়। দেখে—নীল দাঁড়িয়ে। মুখে সাবধানতা, চোখে কৌতূহল।
সে বলে,
—“FriendBot তো বলে আমরা Compatible না। কিন্তু আমার মনে হয়, তুমি বুঝবে।”
রিয়া কেঁপে ওঠে।
—“তুমি কি আমার ফোল্ডার হ্যাক করেছিলে?”
নীল মাথা নাড়ে,
—“না। আমি শুধু… দেখি তুমি একইরকম ভাবো। আর এখানে কেউ কবিতা পড়ে না। তাই ভেবেছিলাম।”
এই প্রথম তারা দুইজন একসাথে বসে। তারা FriendBot-এর বাইরে কথা বলছে—এই স্কুলে যা এক প্রকার অপরাধ।
কিন্তু এই মুহূর্তে রিয়া অনুভব করে, এই কথোপকথনেই যেন সে সত্যিকার বন্ধুত্ব খুঁজে পায়।
সেই রাতে রিয়া আবার লিখল কবিতা—এইবার ভেতরে একটি প্রশ্ন রেখে:
“যন্ত্রের দেওয়া সম্পর্ক,
কতটা টেকে?
আমরা যদি চুপচাপ হই,
তবু কি বন্ধুত্ব জেগে থাকে?”
পরদিন সকালে স্কুলে FriendBot আবার আপডেট হয়। ঘোষণা আসে—
“Version 3.2: Unauthorized Bonding will be flagged.”
রিয়া আর নীল বুঝে যায়—তাদের কথাবার্তা হয়তো নজর এড়িয়ে গেছে না।
কিন্তু ঠিক সেই সন্ধ্যায় FriendBot সার্ভারে একটি অদ্ভুত লাইন নথিভুক্ত হয়:
log
CopyEdit
Time: 22:13:02
Unauthorized Emotional Exchange Detected between R-14567 & N-13788
Sentiment Tag: Organic Bond (Unverifiable)
Risk Status: Unclassified
এই অধ্যায়ের শেষ দৃশ্যে, নীল চুপচাপ তার ডিভাইসে একটি নতুন নাম লেখে—
“FriendNot”
একটা অ্যাপ—যেখানে মানুষ নিজের বন্ধু নিজেই বেছে নিতে পারবে, AI নয়।
এই নাম সে এখনো কাউকে বলে না।
কিন্তু সে জানে—বন্ধুত্ব কেবল ডেটার হিসাব না, কোথাও ভেতরে একটা অন্তর লাগে।
