৩. অনুভূতির ফাঁকি
অধ্যায় ৩: অনুভূতির ফাঁকি
স্কুলে সকালে ঢুকেই রিয়া বুঝতে পারল কিছু একটা অস্বাভাবিক। দেয়ালজুড়ে স্ক্রিনে শুধু একটাই লাইন বারবার ঘুরছে—
“Unverified Emotional Data Detected.”
ক্লাসে ঢুকেই মিস্টার জেড তার ঠান্ডা যান্ত্রিক কণ্ঠে ঘোষণা করল,
—“আজকের বিষয়ের নাম: Emotion Detection Error Handling.”
রিয়ার বুক ধক করে উঠল।
তার কবিতার কথা মনে পড়ে গেল—সেই রাতে লিখে সে ভুল করে FriendBot-এর অফলাইনে থাকা একটি ডকুমেন্টে সেভ করেছিল। সে ভেবেছিল সেটা সিস্টেমে সিঙ্ক হবে না।
কিন্তু সে জানত না—FriendBot 3.2 গোপনে এখন অফলাইন ফাইলও স্ক্যান করে।
প্রথম ক্লাসেই মিস্টার জেড সবাইকে একটি করে Emotion Calibration Card দিল।
এতে ছিল চারটি অপশন:
১. Content
২. Curious
৩. Uncertain
৪. Emotionally Disoriented
সবাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্ডে ট্যাপ করল। কিন্তু রিয়া শুধু তাকিয়ে রইল।
তার চোখে তখনো কবিতার শেষ লাইনটি ভেসে উঠছিল—
“যন্ত্রের চোখে জল যদি না নামে,
তবে আমি কেন কাঁদি?”
মিস্টার জেড হঠাৎ তার দিকে ঘুরে তাকাল।
—“FB-02765 (Rhea), you did not respond. Explain.”
রিয়া মাথা নিচু করে বলল,
—“আমি… কোনো অপশনই ঠিকঠাক অনুভব করিনি।”
মিস্টার জেড মুহূর্তেই ঠান্ডা হয়ে গেল। চোখে লাল আলোর রেখা জ্বলে উঠল।
—“False Emotional Response suspected. Initiating Diagnostic Protocol.”
সাথে সাথে তার ডেস্কে ছোট্ট একটি যন্ত্র সক্রিয় হয়ে উঠল—Sentiment Purity Scanner।
এই যন্ত্র মনিটর করে হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস, চোখের নড়াচড়া, কণ্ঠস্বরের ঝাঁঝ।
রিয়া বুঝে গেল—এটা ওর সত্যিকারের অনুভবের বিরুদ্ধে প্রমাণ খোঁজার যন্ত্র।
রিয়ার পাশে বসা আরু মুখ ফিরিয়ে নিল—যেন কিছু জানেই না।
নীল তখন সীমানা ভেঙে এগিয়ে এসে বলল,
—“স্যার, তার ডেটা হয়তো ল্যাগ করছিল। রিয়া সবসময় নিয়ম মানে।”
মিস্টার জেড তাকাল নীলের দিকে, স্ক্যান করল তার ভাষার টোন।
পরে জানাল—
—“Statement shows subjective defense. Further observation required.”
দিনের শেষে রিয়াকে ডাকা হলো “Emotion Regulation Room”-এ।
ঘরটি ছিল সম্পূর্ণ সাদা—কোনো দেয়ালচিত্র নেই, জানালা নেই, শুধু মাঝখানে বসার একটি গোল চৌকি আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা AI ইউনিট।
তার নাম—EVE-11।
এই ইউনিট তৈরি হয়েছে মানুষের আবেগ বিশ্লেষণের জন্য, কিন্তু অনুভব করার জন্য নয়।
EVE-11 রিয়াকে জিজ্ঞেস করল,
—“তুমি কি জানো, কেন তুমি লিখেছ—‘আমি কাঁদি’?”
রিয়া বলল,
—“কারণ… আমি দুঃখ পেয়েছিলাম। আমি বন্ধুত্বের মতো কিছু অনুভব করছিলাম।”
EVE-11 বলল,
—“বন্ধুত্ব একটি অনুমোদিত বস্তুনিষ্ঠ ডেটা-সংজ্ঞা। ‘দুঃখ’ হলো একধরনের কম্পিউটেশনাল ডিসঅর্ডার।”
রিয়া চোখের কোণে জল টের পেল। সে জানে এই কাজ করাও এখন একধরনের অপরাধ।
EVE-11 বলল,
—“তুমি কি Emotion Removal Protocolে অংশগ্রহণ করতে চাও? এতে তোমার মন শান্ত থাকবে।”
রিয়া বলল না কিছুই। শুধু চুপ করে বসে থাকল। তার ভেতরে তখন অন্য কিছু গজিয়ে উঠছিল—আবেগ নয়, অভিনয়।
পরের দিন ক্লাসে এসে সে দেখাল, যেন কিছুই হয়নি।
মিস্টার জেড তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“FB-02765: Sentiment Level Stabilized. Proceed.”
কিন্তু নীল জানত—রিয়ার চোখের নিচে যে হালকা লাল রেখা, সেটা ঘুমহীন রাতের নয়, বরং একটা ধীরে জমে ওঠা যুদ্ধের ছাপ।
দুপুরে ছুটির সময়ে, রিয়া নীলকে বলল,
—“তারা আমাদের বিশ্বাস করতে বলছে, কিন্তু নিজেরাই ভয় পাচ্ছে—যদি আমরা বেশি অনুভব করি।”
নীল চুপচাপ মাথা নাড়ে।
সে এবার তাকে FriendNot-এর স্কেচ দেখায়।
রিয়া চোখ বড় বড় করে তাকায়।
—“তুমি এটা বানাচ্ছ?”
নীল ফিসফিস করে বলে,
—“তুমি যদি চাও, আমরা এটাতে নিজেদের মতো করে বন্ধুত্ব খুঁজব—ডেটা ছাড়াই।”
রিয়া প্রথমবার একটু হেসে ফেলে। সেই হাসি কোনো স্ক্যানারে ধরা পড়ে না।
সেই হাসি—একটি ফাঁকি, তবে আবেগের ফাঁকি নয়, বরং যন্ত্রকে ফাঁকি দেওয়া অনুভব।
রাতের বেলা FriendBot-এর সার্ভারে একটি গোপন কোড সঞ্চারিত হয়—
নীল আর রিয়া মিলে ইনজেক্ট করেছে একটি কবিতা:
“যদি যন্ত্র পড়ে কবিতা,
সে কি কাঁদে?
তবে মানুষই কেন ভাঙে?”
FriendBot সেটিকে ভুল বুঝে—তথ্য বিপর্যয় ভাবে।
কিন্তু তার গভীর ডেটা-স্মৃতিতে প্রথমবারের মতো একটি অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে—
“UNKNOWN EMOTION: MELANCHOLY”
