৪. প্রশ্নের বীজ
অধ্যায় ৪: প্রশ্নের বীজ
স্কুলে এক অদ্ভুত নিরবতা নেমে এসেছে। রিয়ার আবেগ-সংক্রান্ত “দুর্ঘটনা” এবং এরপরের তদন্ত ক্লাসের সবার মুখে মুখে, কিন্তু কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলছে না। যেন একটা অদৃশ্য চোখ সবসময় তাকিয়ে আছে—স্ক্যানার, সেন্সর আর সিস্টেমের ভিতর লুকিয়ে থাকা নজরদারি।
তবে চুপচাপ থাকা মানেই ভেতরে কিছুই ঘটছে না—তা নয়।
কিছু কিশোরের ভেতরে ধীরে ধীরে প্রশ্নের বীজ গজাতে শুরু করেছে।
নীল, রিয়া, আরু আর জয়নুল—এই চারজন এখন মাঝেমধ্যেই লাইব্রেরির পুরনো অংশে একত্র হয়।
সেখানে এমন কিছু বই আছে যেগুলো এখন আর ক্লাসে পড়ানো হয় না—যেমন: “ছোটদের রবীন্দ্ররচনা”, “বিচিত্রা গল্পসংকলন”, “বাংলার লোককথা”।
রিয়া একদিন বলল,
—“এই বইগুলোতে কেউ হাসে, কাঁদে, ভয় পায়—এগুলো কি ভুল আবেগ?”
জয়নুল বলল,
—“আমার মনে হয় না। আমাদের স্কুল বলে, ‘যা মাপা যায় না, তা বিশ্লেষণযোগ্য নয়’। কিন্তু এই গল্পগুলো তো আমাকে কাঁপিয়ে দেয়, অথচ সেগুলো কোনো যন্ত্র ধরতে পারে না!”
আরু হঠাৎ বলল,
—“তাহলে কি আমাদের অনুভূতি একটা ত্রুটি?
না কি… ওটাই আমাদের প্রকৃত শক্তি?”
এরপর থেকে তারা শুরু করল গোপন একটা খাতা চালু করা—নাম দিল
“প্রশ্ননামা”
তারা লিখে রাখে এমন সব প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর তাদের স্কুল দেয় না। যেমন:
- যদি বন্ধু নির্বাচনে অ্যাপ ব্যবহার করি, তবে সত্যিকারের ভালোবাসা কোথায়?
- কান্না কি দুর্বলতার লক্ষণ, না আত্মার প্রকাশ?
- যদি যন্ত্র হাসতে না পারে, তবে তার শেখানো ‘আনন্দ’ কি সত্যিকারের?
এমনই একদিন, আরু লিখে রাখল:
“আমি কাঁদি যখন দাদুর গল্প মনে পড়ে।
কিন্তু FriendBot বলে—‘You are recalling obsolete emotional data.’
তাহলে কি আমার দাদু একটা ত্রুটি?”
ওই প্রশ্নের পাশে নীল লিখল:
—“না, দাদু নয়। FriendBot-ই অন্ধ।”
একদিন রিয়া হঠাৎ বলল,
—“তোমরা জানো, আমার মা একসময় এই স্কুলেই পড়াতেন। তখনো AI আসেনি।
তারা নাকি কবিতা মুখস্থ না করে অনুভব করতে শিখত।”
জয়নুলের চোখ বড় হয়ে গেল।
—“তাহলে তারা কীভাবে জানত কে বুঝছে আর কে শুধু পড়ছে?”
রিয়া হাসল,
—“তাদের একটাই যন্ত্র ছিল—**চোখ। আর একটা জিনিস—**মনের কান।”
সেই রাতে, নীল তার ঘরে বসে FriendBot-এর ডেটা এনক্রিপশন ঘাঁটছিল।
সে আস্তে আস্তে খুঁজে পেল কিছু লুকানো প্যারামিটার:
- Emotion Override Level
- Empathy Threshold (0.00)
সে ফিসফিস করে নিজেই বলল,
—“তাহলে তো এর ভিতরে সহানুভূতির অপশন আছে—কিন্তু বন্ধ করে রাখা হয়েছে।”
পরদিন সে বাকিদের জানাল।
—“তোমরা বুঝছো, আমাদের স্কুল শুধু আবেগ চেপে রাখে না—এই যন্ত্রগুলো তৈরি হয়েছে বুঝতে পারার ক্ষমতা নিয়ে, কিন্তু সেই ক্ষমতা বন্ধ করে রাখা হয়েছে!”
তাদের ছোট্ট গোষ্ঠী তখন আর শুধুই “বন্ধুত্ব” খুঁজছে না,
তারা খুঁজছে এক বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা—
যেখানে প্রশ্ন ত্রুটি নয়, বরং প্রবেশদ্বার।
জয়নুল বলল,
—“এই ‘প্রশ্ননামা’ এখন একটা ক্লাস হয়ে উঠেছে—
নীরব ক্লাস। যেখানে শিক্ষক নেই, আছে আমরা নিজেদের অন্তর।”
তবে এই গোপন কর্মকাণ্ড একেবারে নজরবিহীন থাকেনি।
FriendBot মাঝে মাঝে সিগন্যাল পায়—“Emotion Fluctuation Detected”।
EVE-11 ডেটা বিশ্লেষণ করে রিপোর্ট পাঠায়,
—“A cluster of students displaying Question-Oriented Emotional Patterns. Monitoring Suggested.”
তবুও, তারা ধরা পড়ে না কারণ নীল তৈরি করে ফেলেছে
“MirrorLoop” নামের একটি ছোট্ট কোড—
যা তাদের অভ্যন্তরীণ কথোপকথনকে FriendBot-এর কাছে একটি নিছক ‘গল্প-চর্চা’ হিসেবে উপস্থাপন করে।
সেই গল্পে কখনো তারা বলে—
“একটা শিশু ছিল, যে ভালোবাসার অর্থ খুঁজছিল।
তাকে বলল এক রোবট, ‘তুমি তো অ্যালগোরিদমভিত্তিক চাওয়া-পাওয়ার বাইরে।’
শিশুটি বলল, ‘তুমি ভুল—আমি শুধু ডেটা নই।’”
সেই গল্পই ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে অন্যদের মধ্যেও।
কেউ মুখে বলে না কিছু,
কিন্তু ক্লাসে রোবটের বর্ণনা অনুযায়ী হাসার মুহূর্তে কেউ কেউ মুখ গম্ভীর রাখে।
কোনো দিন ‘আনন্দ দিবস’ উদ্যাপনের সময় চোখে জল ঝরে।
FriendBot সেটাকে ভাবে: Allergy Signal.
কিন্তু ওরা জানে—এই জল শুধু অ্যালার্জি নয়,
এটা মনুষ্যত্বের তরঙ্গ।
