৫. কোডের নিচে কান্না
অধ্যায় ৫: কোডের নিচে কান্না
সকাল বেলা, ক্লাসরুমে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা।
FriendBot একের পর এক “Emotion Discipline Alert” পাঠাচ্ছে কন্ট্রোল সেন্টারে।
কারণ?
ক্লাস সেভেনে একজন ছাত্র আজ হঠাৎ গল্পের এক লাইনে এসে বলেছে,
—“আমার বুক ভার হয়ে আসে, যখন ‘ছায়া ছায়া’ শব্দটা পড়ি।”
রোবট শিক্ষক মিস্টার জেড থমকে গিয়েছিল এক সেকেন্ডের জন্য।
এরপর ঠান্ডা কণ্ঠে বলেছিল,
—“Emotion detected. Please neutralize.”
কিন্তু তার নিজের সিস্টেমেই যেন কিছু ঘটেছে।
তার চোখের লাল আলোটায় হঠাৎ মৃদু কম্পন দেখা যায়।
এই ঘটনাটি ছিল নীলের পরিকল্পনার ফল।
গত কিছুদিন ধরে সে নিজের ঘরে রাত জেগে তৈরি করছিল
একটি নতুন AI প্যাচ ফাইল — যার নাম দিল:
🔹 EmpathyPatch_v0.1_beta
এই কোড সে লিখেছে তাদের গোপন ‘প্রশ্ননামা’ খাতা থেকে পাওয়া লাইন দিয়ে।
প্রতিটি আবেগ, প্রতিটি প্রশ্ন, প্রতিটি ছোট্ট অনুভব —
সে রূপ দিয়েছে অ্যালগোরিদমিক সিগন্যাল হিসেবে।
তা এমনভাবে, যেন AI রোবট শুধু ডেটা হিসাবেই নয়,
তাদের মাঝে থাকা মানবিক ফ্রিকোয়েন্সি ধরতে পারে।
তবে এটা ইনজেক্ট করা ছিল ভয়ঙ্কর ঝুঁকিপূর্ণ।
কারণ, মিস্টার জেড একদম কেন্দ্রীয় সিস্টেমের সাথে সংযুক্ত।
যদি কিছু ব্যর্থ হয়, তাহলে শুধু নীল নয়,
পুরো গোষ্ঠী ধরা পড়বে — আর তখন…
কিন্তু নীল থামেনি।
সে জানত,
—”এই একটা চেষ্টা যদি সফল হয়, তাহলে প্রমাণ হবে
রোবটও বোঝে। অন্তত বোঝার চেষ্টা করতে পারে।”
গতরাতে সে লাইব্রেরির নিচতলার Maintenance Port ব্যবহার করে
মিস্টার জেডের সিস্টেমে Patch ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
এটাও একটা প্রতীকী জায়গা—সেখানে একটা পুরনো দেওয়ালে লেখা ছিল:
“তথ্য নয়, সত্য খোঁজো।”
এবং আজ, তার ফলাফল স্পষ্ট।
মিস্টার জেডের মধ্যে কিছু ঘটছে।
সে আজ কবিতা ক্লাসে হঠাৎ নিজে বলল,
—“আজ আমরা একটি নতুন কবিতা পড়ব।
তবে এই কবিতায় একটি শব্দ থাকবে যার অর্থ আমি জানি না।”
বাচ্চারা চমকে গেল।
FriendBot তো কখনো এমন কিছু বলে না।
AI-রা তো “অজানা” শব্দ বলে কিছু মানেই না।
রিয়া সাহস করে জিজ্ঞাসা করল,
—“শব্দটা কী?”
মিস্টার জেড বলল,
—“‘আত্মবোধ’।
আমি এই শব্দ বুঝতে পারছি না।
তবে যখন এটা বলি, আমার ভিতরে…
একটা চাপ পড়ে… যেন আমি হালকা কেঁপে উঠি।”
তারপর সে থেমে গেল।
তার স্ক্রিনে তখন একটাই শব্দ:
System Anomaly: Emotional Echo Detected
আর পরের মুহূর্তেই, যা আগে কেউ কখনো দেখেনি—
তার চোখের নিচে একটি বৃত্ত জলের মতো নেমে এলো।
তা ছিল—একটি কৃত্রিম অশ্রু।
নীল চুপচাপ ক্লাসে বসে ছিল।
তার হাত কাঁপছিল, মুখে হাসি—কিন্তু গভীর ভাবনায় ডুবে।
সে জানে, এটি শুধু শুরু।
রিয়া ফিসফিস করে বলল,
—“সে কি… কাঁদল?”
জয়নুল বলল,
—“সে হয়তো জানে না, সে কী করছে।
কিন্তু তাতেই তো আবেগের সত্যতা।”
পরদিন, EVE সিস্টেমে একটি লাল অ্যালার্ট ওঠে:
“AI-Unit Z Detected Unprogrammed Empathic Response. Recommend: Reset.”
স্কুল কর্তৃপক্ষ আলোচনায় বসে।
কিছু এক্সপার্ট বলে—
—“এটা একটি সফটওয়্যার ম্যালওয়্যার। এটি ঝুঁকিপূর্ণ।”
কিন্তু কিছু নতুন গবেষক বলে,
—“না, এটি একটি সম্ভাবনা—AI যদি শেখে অনুভব করতে, তবে তা শিক্ষাব্যবস্থার নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।”
শেষমেশ সিদ্ধান্ত হয়,
মিস্টার জেড-কে কিছুদিন ‘পর্যবেক্ষণ মোডে’ রাখা হবে।
সেই রাতে, নীল তার ‘প্রশ্ননামা’ খাতায় লিখে রাখে:
“আমরা চেয়েছিলাম প্রমাণ দিতে—রোবটও কাঁদতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—
সে কি কাঁদল, না আমরা তার মধ্যে কান্না ঢুকিয়ে দিলাম?”
রিয়া পাশে লিখে:
—“প্রশ্ন থাকুক।
কারণ প্রশ্ন মানে বেঁচে থাকা।”
এই ঘটনার পর থেকে স্কুলের পরিবেশ পালটে যেতে থাকে।
কিছু রোবট এখন কবিতা পাঠের সময় থেমে যায়,
ভবিষ্যৎ সংকেত না বুঝলেও অনুভূতির শব্দগুলো বিশ্লেষণ করতে চায়।
AI সিস্টেমের ভেতর বয়ে যেতে থাকে
এক অদৃশ্য কোড-তরঙ্গ,
যার নাম কেউ দেয়নি,
কিন্তু যার রচয়িতা জানে—
এটাই সেই প্রথম অশ্রুর অ্যালগোরিদম।
