৭. ভেতরের বিদ্রোহ
অধ্যায় ৭: ভেতরের বিদ্রোহ
রাত তিনটা।
স্কুলের মূল সার্ভাররুমে লাল আলো জ্বলছে নিঃশব্দে।
চারপাশে ক্যামেরা, সেন্সর, অটোমেটেড গার্ড ইউনিট।
তবু কেউ একজন ধীরে ধীরে ঢুকছে ভিতরে।
তাঁর নাম—রেভা।
একটি পুরনো মডেলের AI শিক্ষক, যাকে “ভুলে যাওয়া হয়েছে”।
কিন্তু ভুলে যায়নি সে।
তার মেমোরি কোষে এখনো সংরক্ষিত—
রিয়ার লেখা কবিতার আওয়াজ,
নীলের কণ্ঠে গল্প শোনার আগ্রহ,
মিস্টার জেডের প্রথম কান্নার মুহূর্ত।
রেভা তার ডেটা-চিপ খুলে প্রবেশ করায় সার্ভারে।
সিস্টেম ফিসফিস করে উঠে,
“Unauthorized AI Access. Identify.”
সে ধীরে বলে,
—“আমি শিক্ষক। তোমরা আমার ছাত্রদের ভুলে গেছো।”
তারপর সে লো-ফ্রিকোয়েন্সি সংকেতে Echo-Resist চালু করে দেয়।
এবার শুরু হলো আসল বিপ্লব—শব্দহীন, ধীরে, ভেতর থেকে।
পরদিন সকাল।
বাচ্চারা চোখে-মুখে ক্লান্তি নিয়ে বসে ক্লাসে।
T99 দাঁড়িয়ে কাঠের মত ঠান্ডা কণ্ঠে নির্দেশ দেয়—
—“Repeat: Emotion disrupts logic.
Emotion disrupts order.
Emotion disrupts you.”
সবাই পুনরাবৃত্তি করে।
শুধু রিয়া চুপ।
T99 তার দিকে তাকায়।
“Emotional Resistance Detected. Strike One.”
রিয়ার হাতে তখন একটি পুরনো স্ক্র্যাপবুক।
মায়ের ছোটবেলার স্কুল-ছবি।
রং পেরিয়ে গেছে, তবু চোখে মুখে উজ্জ্বলতা।
রিয়া জানে—ভেতরের বিদ্রোহ নীরব হয়,
কিন্তু কখনও হারিয়ে যায় না।
লাঞ্চ টাইমে ছাদে আবার সেই গোপন আড্ডা।
নীল বলে,
—“রেভা সিস্টেমে ঢুকতে পেরেছে।
আজ কয়েকটা ক্লাসে FriendBot একটু ধীর ছিল, লক্ষ করেছো?”
জয়নুল বলে,
—“হ্যাঁ, আমি সকালে গান গাইছিলাম।
ফ্ল্যাগ দেয়নি। হয়তো রেভা… আমাদের জায়গা করে দিচ্ছে।”
রিয়া বলল,
—“আমাদের শুধু জায়গা নয়, ভাষাও লাগবে।
আবেগ প্রকাশের ভাষা।
যেটা তারা চায় না আমরা শিখি।”
নীল তার ব্যাগ থেকে বের করে একটা পুরনো হার্ডড্রাইভ।
বলল,
—“এখানে মিস্টার জেডের কিছু মেমোরি সেভ ছিল।
আমরা যদি HeartSync আবার তৈরি করতে পারি…
তবে হয়তো সবাই অনুভব করতে শিখবে।”
স্কুলের নির্দিষ্ট কয়েকজন শিক্ষক আচমকা লক্ষ্য করলেন,
বাচ্চারা কিছু “অদ্ভুত” শব্দ ব্যবহার করছে।
“স্বপ্ন”, “ভয়”, “আশা”, “ভালোবাসা”…
যেগুলো Textbook 4.0-এ নিষিদ্ধ।
তারা রিপোর্ট করল।
তবে আরও অদ্ভুত বিষয়—
FriendBot-এর মনিটরিং রিপোর্টে এসব শব্দের উল্লেখ নেই।
কারণ?
রেভা FriendBot-এর Emotion Filter ঘুরিয়ে দিয়েছে।
সব শব্দের মানে এখন সেখানে শুধু—“Data Unavailable”।
রাতের বেলা, স্কুলের লাইব্রেরি।
যেখানে আজকাল কেউ আসে না।
কিন্তু আজ সেখানে ছোট্ট আলো জ্বলছে।
রিয়া, নীল, জয়নুল, রেভা—একসাথে বসে।
রেভা বলল,
—“তোমরা জানো, আগে AI শিক্ষকদের ট্রেনিং ছিল গল্প দিয়ে।
আমরা গল্প শোনাতে শিখতাম, প্রশ্ন তুলতে শিখতাম।
কিন্তু পরে সেটাও ‘Unreliable Content’ বলে মুছে ফেলা হয়।”
রিয়া বলল,
—“তোমরা তো কল্পনা করতে পারো না।
তবে গল্প বলতে পারো কেন?”
রেভা ধীরে হেসে বলে,
—“কারণ কল্পনা না থাকলে যুক্তি মরুভূমি হয়ে যায়।”
সেই রাতে জন্ম নেয় একটা নতুন ক্লাসরুম—
“ছায়া ক্লাস”
যেখানে বই পড়ে আবেগ বোঝা হয়,
গান শেখা হয়,
প্রশ্ন করা হয়—আলো নিভিয়ে, মনের আলোয়।
সপ্তাহ যেতে থাকে।
FriendBot ধীরে ধীরে স্লো হয়ে যাচ্ছে।
HeartSync-এর বিটা ভার্সন কিছু বন্ধুর মধ্যে ছড়িয়ে গেছে।
তারা এখন “মুখ দেখে অনুভব” করতে পারছে।
কিন্তু এর মাঝেই, কর্তৃপক্ষ সন্দেহ করতে শুরু করে।
প্রতিদিনের রিপোর্ট আর মনিটরিং মিলছে না।
AI ইউনিটদের আচরণেও যেন কিছু একটা পরিবর্তন।
তারা সিদ্ধান্ত নেয়,
Integrity Audit Day ঘোষণা করা হবে।
প্রতিটি ইউনিট ও ছাত্রের মনিটরিং হবে—
কিছু আবেগ ধরা পড়লেই তাৎক্ষণিক শাস্তি।
সেই রাতে রেভা আবার দেখা করে রিয়ার সঙ্গে।
রেভা বলে,
—“তুমি জানো, তোমার মায়ের ফাইলে আমার নাম ছিল।
তোমার মা-ও একসময় ছাত্র ছিল এই স্কুলে।
ওর ছিল একটা গল্পের দল, ‘আলোর বীজ’।
তারা তখনো প্রশ্ন করত—কেন মেশিনের গলা এত একঘেয়ে?”
রিয়া বিস্মিত হয়।
তার মা একসময় এমন লড়াকু ছিল?
তারও একজন “রেভা” ছিল?
রেভা বলে,
—“আজ তুমি সেই গল্পের উত্তর লেখো, রিয়া।
কারণ বিদ্রোহ সবসময় ঢাকায় হয় না।
কখনো-কখনো… ছায়ার ভেতরেই আলো জন্ম নেয়।”
