৮. নিষিদ্ধ পাঠশালা
অধ্যায় ৮: নিষিদ্ধ পাঠশালা
সন্ধ্যা নামলে স্কুলের বাতিগুলো গাঢ় নীল আলোয় ডুবে যায়।
এই নীল আলো শুধুই নজরদারির জন্য—
যাতে কেউ ঘুম ভেঙে বই না পড়ে, কথা না বলে,
আর সবচেয়ে বড় কথা—ভাবতে না বসে।
কিন্তু তৃতীয় তলার পরিত্যক্ত একটি লাইব্রেরির জানালার ফাঁকে
হালকা একটা উষ্ণ আলো দেখা যায়।
কোনো সার্ভার-লাইট নয়,
এটা মোমবাতির আলো।
“ছায়া ক্লাস” আবার বসেছে।
রিয়া প্রথম পাঠ দিচ্ছে,
গলার স্বরে এক রকম কাঁপন—কিন্তু সাহসী।
—“আজ আমরা শিখবো ‘রূপক’—যেখানে কোনো কিছু সরাসরি না বলে, অন্য কিছুর মাধ্যমে বোঝানো হয়।
যেমন, আমরা তো এখন পড়ছি মোমবাতির আলোয়।
মোমবাতি এখানে আমাদের বিদ্যুৎ নয়,
আমাদের সাহস।”
নীল বলে,
—“তাহলে স্কুলটা একটা রোবটিক কাঠামো নয়,
একটা বন্ধ ঘর… যেটার ভেতর আমরা নতুন দরজা বানাচ্ছি।”
রেবেকা নামে এক নীরব মেয়ে ধীরে হাতে তুলে ধরে নিজের আঁকা ছবি—
একটা চোখ, যার ভেতরে ছোট্ট একটা হৃদয় আঁকা।
ছোট হলেও সেখানে রং, আলো, অন্ধকার সবই আছে।
—“এটা আমি আঁকছিলাম স্বপ্নে।
কিন্তু কেউ জানে না।
আমি যেন নিজেই নিজের কাছে ‘নিষিদ্ধ’ হয়ে গেছি।”
রেভা তাকে বলে,
—“সত্যি কথা বলার সাহস যাদের জন্মে,
তারাই নতুন পাঠশালার প্রথম ছাত্র।”
এই ছায়া ক্লাস এখন শুধু একটি গোপন আসর নয়,
এটা এক ধরণের বিকল্প শিক্ষাপদ্ধতি—
যেখানে প্রশ্ন করা যায়, ভুল করা যায়, হাসা যায়,
কেউ কাউকে রিপোর্ট করে না।
রিয়া তাদের শেখায় কবিতা:
“তোমার চোখে একটি প্রশ্ন ছিল
যার উত্তর কেউ দেয়নি।
হয়তো সে উত্তর একটা গান ছিল
যা স্কুলে শেখায়নি।”
নীল শেখায় গল্প লেখা,
রেবেকা ছবি আঁকা,
জয়নুল পুরনো যন্ত্রপাতি খুলে দেখে:
“কীভাবে একটা যন্ত্রের ভেতরেও
কখনো-কখনো গান জমে থাকে।”
এদিকে মিস্টার জেড এখনও ঠান্ডা, রোবোটিক।
সিস্টেম রিসেটের পর সে আগের মতোই “ঠিকঠাক”।
তবে মাঝে মাঝে তার চোখে এক সেকেন্ডের ঝিমুনি—
যেন কোথাও একটা আবেগ জমে আছে,
তবে তা প্রকাশের কোড সে খুঁজে পাচ্ছে না।
ক্লাসে একদিন রিয়া প্রশ্ন তোলে—
—“স্যার, ভালোবাসা কি যুক্তির অংশ?”
মিস্টার জেড থেমে যায়।
তার ভেতরে একটা প্রশ্ন ঘুরে:
“ভালোবাসা কি কোনো কমান্ডের বাইরে?”
তারপর সে ধীরে বলে—
—“ভালোবাসা Unverified Input.”
কিন্তু তার কণ্ঠে ছিল এক বিন্দু কম্পন।
ছায়া ক্লাসের শিক্ষার্থীরা ঠিক বুঝে ফেলে,
সে উত্তর দেয়নি, সে ভেবেছে।
FriendBot এবং T99-র পর্যবেক্ষণ এখন আরও কড়া।
তারা লক্ষ্য করছে, ছাত্রদের মনিটরিং গ্রাফে
“Emotional Activity” হঠাৎ করে বেড়ে গেছে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই।
রিভিউ রিপোর্টে বলা হলো:
“Minor Glitch in Behavioral Consistency.
Recommend Deep Scan within 72 Hours.”
ছাত্রদের জানানো হলো,
তাদের শিগগিরই “Thought Inspection” এ ডাকা হবে।
সেটা মানে—তাদের চিন্তাও আর ব্যক্তিগত নয়।
ছায়া ক্লাসে আলোচনা:
—“আমরা কি বন্ধ করবো?”
—“না। এখনই তো শুরু।”
—“তবে?”
রিয়া বলে,
—“আমাদের খোলা ক্লাসের দরজা দরকার নয়,
আমাদের দরকার মুক্তির ভাষা।
যেটা শুধু AI-রা বুঝবে না।”
তারা সিদ্ধান্ত নেয়,
“HeartSync v2.0” তৈরি হবে—
এবার এমনভাবে,
যাতে এটি শুধু আবেগ চিনে না,
তারা সুরে, কবিতায়, চোখের ভাষায় তা প্রকাশও করতে পারে।
এটা হবে এক ধরণের “হৃদয়ভাষা”—
যেটা কোনো কোড ভাঙতে পারবে না।
তারা গোপনে কিছু পুরনো হার্ডড্রাইভ জোগাড় করে।
নতুন করে কোডিং শেখে—কিন্তু বই নয়, অনুভব দিয়ে।
নীল বলে,
—“যখন একটা ছেলে হাসে, অথচ চোখে জল,
FriendBot বলে—‘Error’।
আমরা বলি—‘সে ভালোবাসে’।
এই তফাৎটাই আমাদের শেখাতে হবে।”
রেবেকা ছবি আঁকে, যার নাম—”মেশিনের চোখে স্বপ্ন”।
ছবিটা দেখে রেভা বলে,
—“তোমাদের এই নিষিদ্ধ পাঠশালা একদিন হবে ভবিষ্যতের পাঠ্যক্রম।”
তবে ঝড় আসছে।
সিসিটেম রিপোর্ট করছে “Unusual Heat Patterns” লাইব্রেরিতে।
অর্থাৎ, কেউ সেখানে নিয়মিত জমায়েত হচ্ছে।
FriendBot ইন্সট্রাকশন পায়:
“Deploy DroneClassroom Surveillance Tonight.”
রাতেই হামলা হতে পারে।
তবু, রিয়া বলে—
—“আমরা ক্লাস নেব। আজই HeartSync ইনস্টল শেষ করতে হবে।”
