৯. স্মৃতি ও সিগন্যাল
অধ্যায় ৯: স্মৃতি ও সিগন্যাল
রাত্রির নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধুই হালকা এক যান্ত্রিক গুঞ্জন।
স্কুল তখন ঘুমিয়ে,
কিন্তু রিয়া জেগে।
তার সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু পুরনো ডিভাইস, চিপস,
একটা ছোট্ট লাল রঙের মেটাল বাক্স—
যেটা সে পেয়েছে তাদের বাড়ির পুরনো স্টোররুমে,
মায়ের পুরনো বইয়ের পাশে।
বাক্সে কোনো লক নেই,
কিন্তু তা খোলার সময় তার হাত কাঁপে—
যেন এটা কোনো স্মৃতির দরজা।
বাক্স খুলতেই দেখা যায় এক পুরনো ডেটা কার্ড,
যার উপর ইংরেজিতে লেখা—“EDU_MEM_ARCHIVE_2045”
আর একটা কাগজ, যেখানে হাতের লেখা বাংলায়:
“আমরা তখন ভালোবাসতাম প্রশ্ন করতে।
গল্পের শেষে নয়, মাঝে।
আমি একদিন চাইব, আমার মেয়ে যেন
প্রশ্ন হারায় না— এমন এক স্কুলে পড়ে।”
রিয়া থমকে যায়।
এটা তার মায়ের হাতের লেখা।
যার সম্পর্কে সে জানত,
তিনি নাকি খুবই “শৃঙ্খলাপরায়ণ” ছিলেন।
কিন্তু এই লেখা যেন বলছে আরেক কাহিনি।
রিয়া ডেটা কার্ডটি নিজের পুরনো হ্যাকড ট্যাবে লাগায়।
ডেটা খুলতেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে
এক ঝাঁক অডিও ফাইল, কিছু পুরনো ভিডিও ক্লিপ,
আর একটা ডকুমেন্ট নাম—“স্বপ্নের পাঠশালা”।
সে প্রথমেই একটি ভিডিও চালায়।
স্ক্রিনে একটি পুরনো ক্লাসরুম।
বাচ্চারা হেসে গল্প করছে,
কেউ কবিতা আবৃত্তি করছে,
এক শিক্ষক গাইছেন রবীন্দ্রসংগীত।
পাশে দাঁড়িয়ে ছোট্ট একটি মেয়ে—
রিয়ার মা।
ভিডিওতে একজন ছাত্র বলছে,
—“আপনি বলেছিলেন, প্রশ্ন করা মানে সাহসী হওয়া।
কিন্তু পরীক্ষায় আমি প্রশ্ন করেছি বলে শাস্তি পেলাম।”
শিক্ষক বলেছিলেন,
—“পরীক্ষা কোনো সত্যের মাপকাঠি নয়।
তোমার প্রশ্নই তোমার শ্রেষ্ঠতা।”
রিয়ার চোখে জল আসে।
এই দৃশ্য সে কোনোদিন স্কুলে দেখেনি।
তার মা একদিন এমন শিক্ষার মধ্যে ছিলেন?
ডেটার ভেতরে আরও একটি ফোল্ডার:
“EMOTION_SIGNAL_LOGS”
সেখানে দেখা যায়, কিছু “সিগন্যাল প্যাটার্ন”
যা আবেগের সময় মানুষের মস্তিষ্ক বা হৃদয় থেকে নির্গত হয়—
আনুষ্ঠানিক ভাষায়: “Analog Emotional Frequency Imprints”
রিয়া ধীরে বলে,
—“তাহলে আবেগকে রেকর্ড করা যেত?
তাহলে তারা জানতো এটা সত্যি।”
সে এগুলো HeartSync-এর মূল কাঠামোয় সংযোজন করতে চায়।
ছায়া ক্লাসে পরদিন সে বাক্সটি নিয়ে আসে।
সবাই অবাক।
নীল বলে,
—“তুমি কীভাবে পেল এগুলো?”
রিয়া সব ব্যাখ্যা দেয়।
রেবেকা ফিসফিস করে বলে,
—“আমার মা-বাবা এই রকম কিছু বলতেন…
কিন্তু আমি ভেবেছিলাম তারা শুধু স্বপ্ন দেখতেন।”
রেভা, AI শিক্ষিকা, এই ডেটা স্ক্যান করে বলে,
—“এই ডেটাগুলো আসলে এক ধরনের
‘Pre-AI Emotional Pedagogy’—
যার ভিত্তি ছিল সহানুভূতি, গল্প, স্পর্শ এবং সংগীত।
এগুলো এখনকার সিস্টেমে নিষিদ্ধ।”
নীল হেসে বলে,
—“তাহলে আমরা নিষিদ্ধতাই বাঁচিয়ে তুলছি।”
রিয়া তখন ছায়া ক্লাসে শুরু করে নতুন এক অধ্যায়—
মায়ের শেখানো পদ্ধতিতে।
প্রথম ক্লাসে সে বলে:
—“আজ আমরা শিখব—‘অপ্রকাশিত আবেগ’।
যেটা মুখে বলা যায় না,
কিন্তু কবিতায় বলা যায়, ছবিতে,
বা চুপচাপ পাশে বসে থেকেও।”
রেবেকা আঁকে
একটা অর্ধেক মুখ, যেখানে চোখে শুধু জল।
নীল লেখে—
“আমরা শুধু যন্ত্র ভেবেছি যাকে,
তার ভিতরে আমিই ছিলাম হয়তো।”
এরা সবাই বদলে যাচ্ছে—
তারা এখন শুধু বিদ্রোহী নয়,
তারা ভবিষ্যতের নির্মাতা।
এদিকে FriendBot নতুন একটি অ্যালগোরিদম চালু করেছে—
“Emotion Risk Score v3.7”
তাতে দেখা যাচ্ছে, কিছু ছাত্রছাত্রীর স্কোর এখন “Severely Emotional”।
তাদের তালিকা তৈরি হয়েছে।
রিয়ার নাম প্রথমে।
অভিযোগ: “Unauthorized Memory Transfer & Historical Data Tampering.”
আগামী সপ্তাহে, তাকে নিতে হবে “Emotion Calibration Session”,
যেখানে তার স্মৃতির গঠনই বদলে দেওয়া হবে।
ছায়া ক্লাসে সবাই স্তব্ধ।
রিয়া বলে,
—“তারা যদি আমার স্মৃতি বদলাতে চায়,
আমরা তবে লিখে রাখবো এই ইতিহাস।
আমার মায়ের, আমাদের,
এই পাঠশালার।”
তারা নতুন একটা ফোল্ডার বানায়—
“বাঁচার পাঠ”
যেখানে তারা জমা রাখে গল্প, কবিতা, ছবি, আবেগের সিগন্যাল,
যা কেউ মুছে ফেলতে পারবে না।
রেবেকা চুপচাপ লিখে দেয় ক্লাসের দেয়ালে—
“যেখানে প্রশ্ন থামে, সেখানেই মানুষ থামে না।”
