Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    নচিকেতা ঘোষ এক পাতা গল্প1852 Mins Read0

    ৩. ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ়

    ১১.

    ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে পড়েছিলাম আমি। জ্যাক রেনাল্ড তার বাবাকে খুন করেছে, মন থেকে মেনে নিতে পারছিলাম না।

    আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, জ্যাক রেনাল্ডের সমর্থনে সহসা তাকে সওয়াল করতে দেখে।

    জিরয়েডের কাছে পোয়ারো জানতে চাইল জ্যাককে গ্রেপ্তার করার যুক্তিগুলো কি কি?

    কিছুটা অপ্রস্তুত অবস্থাতেই সৌজন্যের খাতিরে জিরয়েড আমাদের অন্য একটা ঘরে নিয়ে এলো। জ্যাক রেনাল্ড রইল দুজন রক্ষীর হেফাজতে।

    -দেখুন মঁসিয়ে পোয়ারো, আমাদের গোয়েন্দাদের কাজ যে কত আধুনিক আমার ব্যাখ্যা শুনলেই বুঝতে পারবেন।

    –আমি শুনছি, আপনি বলে যান। ভাববেন না, আমি ঘুমিয়ে পড়ব না।

    –প্রথমেই স্বীকার করে নিচ্ছি, দুজন বিদেশী লোকের কথাই আমি ভেবেছিলাম। কিন্তু পরে বুঝতে পারলাম, তারা বিদেশী নয়।

    খুবই প্রশংসনীয়, বলে উঠল পোয়ারো, আপনি সেই দেশলাই কাঠি আর পোড়া সিগারেটের চালাকিটা ভেদ করতে পেরেছেন।

    জিরয়েড এক মুহূর্ত থমকাল। পরে বলতে লাগল, কবর খোঁড়ার ব্যাপারটা চিন্তা করলে বোঝা যায়, এমন একজন পুরুষই এই কেসে জড়িত, যার লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

    আমি খবর নিয়ে জেনেছি জ্যাক রেনাল্ড আর তার বাবারমধ্যে তুমুল ঝগড়া হয়েছে। খুনের মোটিভ এখানেই পাওয়া যাচ্ছে।

    দ্বিতীয়তঃ খুনের রাতে জ্যাক রেনাল্ড মারলিনভিলেতেই ছিল। অথচ সে ঘুণাক্ষরেও আমাদের তা জানতে দেয়নি। এটা তার বিরুদ্ধে একটা বড় পয়েন্ট।

    তারপর আসুন খুনের হাতিয়ারের কথায়। দেখা গেছে, দুটো খুনের ক্ষেত্রেই একই অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ছুরিটা চুরি যাওয়াতেই আমরা ব্যাপার জানতে পেরেছি। ক্যাপ্টেন হেস্টিংস ছুরিটা চুরি যাওয়ার সঠিক সময়টা জানেন। এই চুরির ব্যাপারটাও একই ব্যক্তির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে।

    –এতটা নিশ্চিত হওয়া কি ঠিক হচ্ছে, পোয়ারো বলে উঠল, ছুরিটা অন্য লোকও তো চুরি করতে পারে।

    –আপনি নিশ্চয়ই মঁসিয়ে স্টোনারের কথা বলবেন। কিন্তু আমি ভালোভাবেই বাজিয়ে দেখেছি, এ কেসের সঙ্গে তিনি কোনোভাবেই জড়িত নন। স্টোনার এখানে এসে পৌঁছনোর একঘণ্টা পরে পৌঁছেছিলেন মঁসিয়ে জ্যাক রেনাল্ড।

    ভিলায় পৌঁছনোর মুখেই যে তিনি মঁসিয়ে হেস্টিংস ও তার সঙ্গিনীকে শেষ থেকে বেরতে দেখতে পান, এবিষয়ে আমি নিশ্চিত। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়েন। তারপর শেডের ভেতরে ঢুকে তার সঙ্গীকে ছুরিবিদ্ধ করেন।

    –সঙ্গী মানে, আগেই যার মৃত্যু হয়েছিল? শ্লেষের সুরে বলল পোয়ারো।

    –লোকটা যে মৃত সম্ভবতঃ তিনি বুঝতে পারেননি। ঘুমন্ত ভেবেই কাজটা সারতে চেয়েছেন তিনি।

    একটু থেমে পোয়ারোর মুখে সগর্ব দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে জিরয়েড আবার বলতে লাগল, তাদের দুজনের যে এই জায়গাতেই মিলিত হবার কথা ছিল, এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। জ্যাক নিশ্চিত জানত, দ্বিতীয় খুনের ঘটনাটা মূল কেসে জটিলতার সৃষ্টি করবে। আর বাস্তবিক, হয়েছেও তাই।

    –হ্যাঁ, মঁসিয়ে জিরয়েডের চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি। বলে উঠল পোয়ারো।

    –মঁসিয়ে পোয়ারো, আমার কথাটাকে এত হাল্কা ভাবে না নিলেই বাধিত হব। আমার হাতে বাস্তব প্রমাণেরও অভাব নেই। আপনি জানেন, মাদাম রেনাল্ড আমাদের যে কাহিনী শুনিয়েছেন, তা আগাগোড়া কাল্পনিক। তিনি নিঃসন্দেহে তার স্বামীকে ভালোবাসতেন এবং স্বামীর হত্যাকারী কে তা-ও তিনি জানতেন। তবু কেন তিনি খুনীকে আড়াল করবার জন্য কল্পিত কাহিনীর অবতারণা করলেন?

    তার কারণ, একটাই কারণ হল, প্রকৃত জননী তার সন্তানকে ভালোবাসেন। সন্তানকে বাঁচাবার জন্যই তার এই প্রয়াস।

    মঁসিয়ে পোয়ারো, এর চাইতে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে, বলুন? আমার কেসের নিষ্পত্তি এখানেই। আশা করি আপনার বলার কিছু নেই।

    –আমার মনে হয় মঁসিয়ে জিরয়েড, একটা ঘটনা আপনার ব্যাখ্যায় বাদ পড়ে গেছে। সেটা হল, জ্যাক রেনাল্ড জানতেন মৃতদেহ অনাবিষ্কৃত থাকবে না, এই অবস্থায় তিনি কবর খুঁড়বার চেষ্টা করলেন কেন?

    জিরয়েড কেমন থতমত খেল, দেবার মতো কোনো উত্তরই তার ঝুলিতে ছিল না।

    পোয়ারো ততক্ষণে উঠে দরজার দিকে এগিয়েছে, আমিও তাকে অনুসরণ করছি। ঘুরে দাঁড়িয়ে সে বলল, আরও একটা বিষয় আপনি বিবেচনা করতে ভুলে গেছেন

    –সেটা কি?

    –সীসের সেই ছোট্ট নলটা।

    আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। জ্যাক রেনাল্ড একইভাবে হলে দাঁড়িয়ে ছিল। বোবা দৃষ্টি তুলে আমাদের দিকে তাকালো।

    এই সময় মাদাম রেনাল্ডকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসতে দেখা গেল। জ্যাককে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি আকুল কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন, জ্যাক, এসব কি শুনছি?

    -মা, ওরা আমাকে গ্রেপ্তার করেছে। শুষ্ক কণ্ঠে বলল জ্যাক।

    –কি বললে—

    বলতে বলতে সংজ্ঞা হারিয়ে লুটিয়ে পড়লেন তিনি। তাকে ভোলার জন্য আমরা দুজনই ছুটে গেলাম। চেঁচামেচি শুনে ডেনিস আর ফ্রাঙ্কেইসও ছুটে এলো। মনিবপত্নীর যত্ন নেবার ভার তাদের দুজনের ওপর দিয়ে পোয়ারো আমাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

    জিরয়েড অবশ্য রয়ে গেল মাদাম রেনাল্ডের জবানবন্দী নেওয়ার জন্য।

    পাশাপাশি চলতে চলতে আমি জানতে চাইলাম, জ্যাকের বিরুদ্ধে অনেক পয়েন্ট দাঁড় করিয়েছে জিরয়েড–তুমিও তাকে অপরাধী মনে করছ?

    এক মিনিট কি চিন্তা করল পোয়ারো। পরে বলল, ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে হবে। জিরয়েড আগাগোড়াই ভুল করে চলেছে–জ্যাক নির্দোষ একথা জানলেও সব প্রমাণ এখুনি হাজির করা যাচ্ছে না।

    আমি অবাক হয়ে তাকাতে চিন্তিতভাবে বলল, চল, সমুদ্রের ধারে গিয়ে বসা যাক–ধূসর কোষগুলির গায়ে একটু হাওয়া লাগানো যাক।

    সমুদ্রের ধারে গিয়ে পোয়ারো বলল, হেস্টিংস, তোমার ধূসর কোষগুলো নাড়াচাড়া কর, তাহলেই দেখবে প্রকৃত সত্য নিজেই জেনে গেছ। তবে চিন্তাকে পরিচালনা করতে হবে সঠিক পদ্ধতিতে

    আমি পোয়ারোর পাশে বসে তার পরামর্শ মতো কেসের সমস্ত ঘটনা পর্যালোচনা করতে গিয়ে সহসা বিদ্যুৎচমকের মতো একটা কথা মনে পড়ে গেল। মনে হলো যেন আলো দেখতে পেলাম।

    -দেখো পোয়ারো, উৎসাহের সঙ্গে আমি বললাম, আমার মনে হচ্ছে একটা ব্যাপার আমরা দুজনেই ভুলে বসে আছি। একটা লোকের কথা আমাদের বিবেচনা করা উচিত।

    –কে? কার কথা বলছ? সাগ্রহে বলে উঠল পোয়ারো।

    –সেই জর্জেস কনিউ।

    .

    ১২.

    প্রবল উত্তেজনায় পোয়ারোর চোখ দুটি ঘোর সবুজবর্ণ ধারণ করল।

    –চমৎকার হেস্টিংস। দুহাত বাড়িয়ে পোয়ারো আমাকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করল; তুমি নিজেই ঠিক পয়েন্টে আলোকপাত করতে পেরেছ। আমি স্বীকার করছি, জর্জেস কনিউ-এর ব্যাপারে আমরা খুবই অমনোযোগী হয়ে পড়েছিলাম।

    পোয়ারোর নির্ভেজাল উচ্ছ্বাস দেখে আমি অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম। উৎসাহের সঙ্গে বলতে লাগলাম, কুড়ি বছর আগের ঘটনা, বর্তমান কেসে টেনে আনতে হচ্ছে। জর্জেস উধাও হয়ে গিয়েছিল। সে জীবিত কি মৃত, কিছুই জানা নেই। তবে এখন বলা চলে, কয়েকদিন আগে পর্যন্ত সে জীবিত ছিল।

    -তোমার সঙ্গে আমি একমত হেস্টিংস, বলল পোয়ারো, আমরা ধরে নিতে পারি সে অপরাধের জগৎ থেকে নিজেকে টেনে তুলতে পারেনি। এক সময় দাগী আসামী হয়ে উঠেছিল। তারপর ঘটনাক্রমে মারলিনভিলে উপস্থিত হয়ে একটি মহিলাকে দেখে স্বভাববশতঃই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।

    ইতিমধ্যে কুড়ি বছরে পার হয়ে গেলেও মহিলাকে চিনতে তার ভুল হয়নি।

    হেস্টিংস, আমি সম্ভাবনাগুলো খতিয়ে দেখে ঘটনা পর পর সাজিয়ে যাচ্ছি বটে, আমি কতটা সঠিক কতটা ভুল বুঝতে পারছি না।

    যাই হোক, মারলিনভিলে মহিলাটির অন্য নাম, অন্য পরিচয়। লোকটি দেখতে পায় এখানে একজন ইংরেজ প্রেমিকও মহিলার জুটেছে।

    জর্জেস যথারীতি রেনাল্ডের মুখোমুখি হয়। দুজনের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায়। রাগের মাথায় সে রেনাল্ডের পিঠে ছুরি বসিয়ে দেয়।

    খুন করার পর নিজের অবস্থাটা উপলব্ধি করতে পারে সে। আতঙ্কে কবর খুঁড়তে শুরু করে দেয়।

    অনুমান করতে পারছি, মাদাম ডওব্রেয়ুইল ঠিক সেই সময়েই এসেছিল তার প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে।

    কিন্তু তার জন্য অপেক্ষা করছিল এক ভয়াবহ দৃশ্য। জর্জেস আর মাদাম ডওব্রেইল দুজনেই এই দৃশ্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে পড়ে।

    জর্জেস তৎপর হয়ে ওঠে। প্রবল উত্তেজনায় সে তাকে টেনে শেডে নিয়ে যায়। আর তখনই দুর্ঘটনা ঘটে–সে জ্ঞান হারিয়ে মেঝেয় লুটিয়ে পড়ে।

    -এরপর কি হতে পারে পোয়ারো? ধরা যাক আকস্মিকভাবেই জ্যাক রেনাল্ড ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। মাদাম ডওব্রেয়ুইল তাকে কজা করে ফেলে মাদাম রেনাল্ড আর জর্জেসের কল্পিত অবৈধ সম্পর্কের কথা বলে।

    এই কুৎসা প্রচারিত হয়ে পড়লে তার মেয়ের পক্ষেও যে তা হানিকর হবে সেকথাও জানায়। তারপর পরামর্শ দেয়, তার বাবার খুনী যখন মৃত, তখন ব্যাপারটা জানাজানি হবার আগে মৃতদেহ সরিয়ে ফেলাই ভালো।

    জ্যাক রাজি হয়ে যায়। পোয়ারো, সব ঠিক আছে? কি মনে হয় তোমার?

    পোয়ারো হেসে বলল, বন্ধু, এটা জমাটি সিনেমার গল্প হয়ে গেল। বাস্তবের সঙ্গে এই ঘটনার মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। দুটি অদ্ভুতভাবে ঘটা ঘটনার সূক্ষ্ম দিকগুলো বিবেচনা করতে পারনি।

    যেমন ধর, কনিউ আর মঁসিয়ে রেনান্ডের পোশাকের কথা। প্রতিপক্ষকে ছুরিবিদ্ধ করার পর জর্জেস নিশ্চয়ই মৃতদেহের সঙ্গে তার পোশাক বদল করে ফেলেনি? ছুরিটাও কি বদল করে ফেলেছ বলবে?

    জর্জেস হয়তো আগের দিন মাদাম ডওব্রেয়ুইলকে ভয় দেখিয়ে টাকা আর পোশাক সংগ্রহ করেছিল। তার মেয়ের বিয়ের বিষয়টা টোপ করেই কাজটা সহজে করে থাকতে পারে সে।

    -না হেস্টিংস, এ যুক্তি আমি মানতে পারছি না। জর্জেস নিজেই ছিল খুনের অপরাধী, এই অবস্থায় ভয় দেখিয়ে মাদাম ডওব্রেইলকে কজা করা তার পক্ষে অসম্ভব। কেন না সে জানত, মাদাম ডওব্রেয়ুইল ইচ্ছে করলেই তাকে যে কোনো মুহূর্তে ফাঁসিকাঠে ঝোলার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে দিতে পারে।

    –হ্যাঁ। তোমার কথায় যুক্তি আছে। স্বীকার করে নিরস্ত হলাম আমি, তাহলে তোমার সিদ্ধান্ত কি?

    –আমার সিদ্ধান্ত হল সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত এবং নির্ভুল। তোমার ব্যাখ্যা শোনা গেল, এবারে আমার কিছু পয়েন্ট তোমাকে শোনাচ্ছি।

    নিশ্চয়ই। বল।

    -তুমি জর্জেস কনিউ-এর ঘটনা থেকে শুরু করেছিলে। আমিও সেখান থেকেই শুরু করছি। এটা বোঝা গিয়েছিল যে মাদাম বেরোণ্ডি নিখুঁত একটি গল্প ফেঁদে আদালতকে ধোঁকা দিয়ে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করেছিলেন। বর্তমান কেসের ক্ষেত্রেও একই কাহিনীর মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাদের।

    সম্ভবতঃ জর্জেসের মাথা থেকেই বেরিয়েছিল কাহিনীটি। তাকে প্রেরণা জুগিয়েছিল মাদাম ডওব্রেয়ুইল আর সহযোগিতা করেছিলেন মাদাম রেনাল্ড। কিন্তু ঘটনাচক্রে কেবল তাকেই আমরা সামনে দেখতে পাচ্ছি।

    যাইহোক, তুমি বরং তোমার নোটবুকে পয়েন্টগুলো টুকে নাও। আমি শুরু থেকেই আরম্ভ করছি।

    –শুরু বলতে তোমাকে লেখা মঁসিয়ে রেনাল্ডের চিঠির কথা বলছ তো?

    –আমরা প্রথমে এই চিঠি থেকেই কেসটা জানতে পারি বটে, কিন্তু আসলে এর শুরু আরো আগে থেকে–যখন থেকে মঁসিয়ে রেনাল্ড মারলিনভিলেয় এসে বসবাস শুরু করেন। মাদাম ডওব্রেয়ুইলের সঙ্গে তার সম্পর্কের সূত্রপাত…যার পরিণতি রেনাল্ডের কাছ থেকে মহিলার কয়েক দফায় মোটা অর্থলাভ।

    এমনি কিছু টুকরো ঘটনার পর আমরা চলে আসব সরাসরি ২৩শে মে তারিখের ঘটনায়।

    পোয়ারোর ইঙ্গিত পেয়ে আমি তার বক্তব্য লিখে নিতে লাগলাম।

    ২৩শে মে জ্যাক রেনাল্ড তার বাবার নির্দেশ পেয়ে প্যারিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়। সেদিনই যাত্রার আগে মার্থা ডওব্রেয়ুইলকে বিয়ে করার প্রশ্ন নিয়ে জ্যাকের সঙ্গে মঁসিয়ে রেনাল্ডের তুমুল ঝগড়া হয়ে যায়।

    ২৪শে মে মঁসিয়ে রেনাল্ড তার আগের উইল পরিবর্তন করেন। নতুন উইলে জ্যাক রেনাল্ডের নামের উল্লেখ পর্যন্ত থাকে না। তিনি তাঁর মৃত্যুর পর সমস্ত বিষয়-সম্পত্তির মালিকানা দিয়ে যান স্ত্রীকে।

    এরপর, ৭ই জুন, জর্জেস আর মঁসিয়ে রেনাল্ডের মধ্যে বাগানে ঝগড়া হয়। ঝোপের আড়াল থেকে মার্থা ডওব্রেয়ুইল এই ঘটনার সাক্ষী হয়।

    এই ঘটনার পরেই মঁসিয়ে রেনাল্ড পোয়ারোকে চিঠি লেখেন তার সাহায্য চেয়ে। জ্যাক রেনাল্ডকে তারবার্তা পাঠিয়ে বুয়েনস এয়ার্স যাবার কথা জানানো হয়। তারপর সোফার মাস্টার্সকে ছুটিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেদিন রাতেই মঁসিয়ে রেনাল্ডের ভিলায় একজন মহিলার আগমন ঘটে। তাকে বিদায় জানাবার সময় মঁসিয়ে রেনাল্ডকে বলতে শোনা যায়, হ্যাঁ…হ্যাঁ…তুমি এখন বিদেয় হও…

    এই পর্যন্ত বলে থামল পোয়ারো, পরে বলল, হেস্টিংস, মূল ব্যাপারগুলোই তুমি লিপিবদ্ধ করলে। চেষ্টা করে দেখো ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে নতুন কিছু আলোকপাত করতে পার কিনা।

    আমি জানতে চাইলাম, কোন দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটাকে আমরা বিচার করব–ব্ল্যাকমেল না নারীর প্রতি আসক্তি

    -অবশ্যই ব্ল্যাকমেল, বলল পোয়ারো। কেননা, মহিলার সম্পর্কে বলতে গিয়ে স্টোনর কথাটা স্পষ্টই উচ্চারণ করেছিল।

    –কিন্তু মাদাম রেনাল্ডের কথায় তো স্টোনরের কথার সমর্থন পাওয়া যায়নি, আমি বললাম, অবশ্য এটা ঠিক যে তিনি সব মিথ্যা কথা শুনিয়েছিলেন আমাদের।

    যাই হোক, এই প্রসঙ্গে বেলা নামের মেয়েটির কথা আমরা আনতে পারি। তার সঙ্গে মঁসিয়ে রেনাল্ডের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা আমরা জানতে পেরেছি। এই সম্পর্ক সত্ত্বেও তিনি এখানে মাদাম ডওব্রেয়ুইলের সঙ্গে জড়িত হয়েছিলেন। এই সূত্রেই হুঁশিয়ারি দিয়ে মেয়েটি মঁসিয়ে রেনাল্ডকে চিঠি লিখেছিল।

    –একটা প্রশ্ন এখানে হেস্টিংস, এই চিঠিতে প্রাপকের কোনো নাম ছিল না, আর সেটা পাওয়া গিয়েছিল মৃতদেহের পকেট থেকে। এই কারণে আমরা ধরে নিয়েছি যে চিঠিটা মঁসিয়ে রেনান্ডের উদ্দেশ্যেই লেখা হয়েছে। কিন্তু সত্যিই সেটা তাকে লেখা হয়েছিল কিনা এ সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই।

    এই বিষয়ে প্রথম আমার মনে সন্দেহ দেখা দেয় তার গায়ের ওভারকোটটা দেখে। সেটা তার দেহের তুলনায় বড় মাপের ছিল। কাজেই এই কোটটা তার না-ও হতে পারে। এই বিষয়টাও বিবেচনা করা উচিত।

    তুমি দেখেছ, আমি পরে, জ্যাক রেনাল্ডের ওভারকোটেরও মাপ নিয়ে দেখেছি। সেটা তার দেহের তুলনায় ছোটই ছিল। এই দুটো ব্যাপারের যোগৃসত্র হিসেবে তোমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছি, সেদিন পিতা-পুত্রের ঝগড়ার মধ্যে প্যারিসে যাওয়ার ট্রেন ধরার সময় হয়ে গিয়েছিল বলে জ্যাক তাড়াহুড়ো করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। আশাকরি, ব্যাপারটা তোমার কাছে পরিষ্কার হয়েছে।

    বুঝতে পেরেছি, আমি বললাম, চিঠিটা লেখা হয়েছিল জ্যাক রেনাল্ডকে, তার বাবাকে নয়। সেটা তার পকেটেই ছিল। উত্তেজনার মুখে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় জ্যাক ভুল ওভারকোট পরেছিল।

    মাথা নেড়ে আমাকে সমর্থন জানাল পোয়ারো।

    ওসব বিষয় নিয়ে পরে আমি আলোচনা করব। এখন ধরে নেওয়া যাক, ওই চিঠির সঙ্গে মঁসিয়ে রেনাল্ডের কোনো সম্পর্ক ছিল না। যাক এবারে তুমি এগিয়ে যেতে থাক।

    পোয়ারোর পূর্ববর্তী নোট দেখে নিয়ে আমি বললাম, এর পর মার্থা ডওব্রেইলকে বিয়ে করার ব্যাপার নিয়ে পিতা-পুত্রের ঝগড়া, জ্যাকের প্যারিস যাত্রা, তারপর মঁসিয়ে রেনাল্ডের উইল পরিবর্তন–এসব নিয়ে আমার বলার কিছু নেই। তারপরেই সেই ভয়ঙ্কর দিনের কথা–দেখা যাচ্ছে সেদিন সকালের সমস্ত ঘটনা পর পর সাজানো হয়েছে

    -হ্যাঁ। তবে প্রথম ঘটনাটা হবে, বাগানে জর্জেস আর মঁসিয়ে রেনান্ডের বিবাদ। সেই থেকেই তার বিপদের আশঙ্কা যার জন্য আমাকে চিঠি লেখেন, ছেলেকে তারবার্তা পাঠান আর সোফারকে ছুটি দেন।

    -হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। বললাম আমি।

    –মঁসিয়ে রেনাল্ডের চিঠিতে কয়েকটা বিষয় পাওয়া যায়। যে কোনো মুহূর্তে তিনি বিপদের আশঙ্কা করেছেন, স্যান্টিয়াগোর নামও উল্লেখ করেছিলেন। সেখান থেকে যদি কোনো বিপদের আশঙ্কা তার থাকতো, তাহলে সে-নাম উল্লেখ করলেন কেন? আবার ছেলেকেও সেখানে পাঠালেন-ব্যাপারটা যে অদ্ভুত তা নিশ্চয় তুমিও স্বীকার করবে। আবার এই যে বিপদের আশঙ্কা–যে কোনো মুহূর্তে জীবনহানির ভয়–ভেবে দেখো এসবেরই যেন অভিব্যক্তি ঘটেছে মাদাম রেনাল্ডের বলা কাহিনীর মধ্যে।

    –সমস্ত ব্যাপারটাই কেমন পরস্পরবিরোধী। যাইহোক, এগুলো নিয়ে পরে না হয় চিন্তা করা যাবে। এখন দুর্ঘটনার রাতে যে মহিলা অতিথিকে মঁসিয়ে রেনাল্ড বিদায় জানাতে এসে বিরক্তিসূচক মন্তব্য করেছিলেন, সেই প্রসঙ্গে আলোচনা করা যাক।

    ফ্রাঙ্কেইস বলেছে, সেই রহস্যময়ী মহিলা হলো মাদাম ডওব্রেয়ুইল। আবার ডেনিস বলেছে সে অন্য মহিলা।

    মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে পোয়ারো বলল, এবারে তাহলে সেই ছেঁড়া চেকটার কথা মনে করবার চেষ্টা কর। স্টোনর বেলা ডুবিন নামটা সনাক্ত করেছিল কিন্তু তার ধারণা স্পষ্ট ছিল না। তাহলে ভিলা জেনেভিয়েভে মেয়েটি এসেছিল কার কাছে? বাড়িতে পুরুষ বলতে দুজন, জ্যাক ও তার বাবা। এদের কার কাছে মেয়েটি এসেছিল আমরা এ বিষয়টা কেবল অনুমান করতে পারি।

    এমন হতে পারে, মেয়েটি জ্যাকের কাছেই তার ভালোবাসার দাবি নিয়ে এসে থাকতে পারে। মঁসিয়ে রেনাল্ড হয়তো তাকে টাকা নিয়ে খুশি থেকে ফিরে যেতে বলে থাকবেন। মেয়েটি অপমানিত বোধ করে এবং চেকটা টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে।

    যাইহোক, তাকে তাড়াতাড়ি বিদায় করার জন্য তিনি বলেছিলেন ঠিক আছে বিদেয় হও, তখন তিনি এরকম করেছিলেন কেন? তার হাতে কি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল? তার সময়ের অপচয় হচ্ছিল? সেই কব্জিঘড়ির ক্ষেত্রেও দেখ দুঘণ্টার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ফারাক রাখা হয়েছে।

    আমরা জানতে পেরেছি, মঁসিয়ে রেনাল্ড রাত বারোটার আগেই খুন হয়েছিলেন। অবশ্য ডাক্তারে অভিমত, মৃতদেহ পরীক্ষা করার সময় থেকে অন্ততঃ চব্বিশ ঘন্টা আগে তার মৃত্যু হয়ে থাকবে।

    -তুমি আমার মাথা গুলিয়ে দিচ্ছ পোয়ারো, নতুন নতুন তথ্য এভাবে হাজির না করে মঁসিয়ে রেনাল্ডকে কে খুন করেছিল তাই বল। তুমি তো বলেছিলে খুনীর পরিচয় জানতে পেরেছ।

    –বলতে হয় তাই ওকথা বলা হেস্টিংস। খুনীর ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি। খুন দুটো ভুলে যেও না। প্রথম খুনের কারণ হিসেবে দুটি কারণ দাঁড় করানো চলে।

    প্রথম ধরো, মাদাম ডওব্রেয়ুইলের সঙ্গে মঁসিয়ে রেনান্ডের ঘনিষ্ঠতা, দ্বিতীয় মার্থা ডওব্রেয়ুইলকে জ্যাক রেনাল্ডের বিয়ে করার ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া। আমার অনুমান আরও একটা কারণ থাকা সম্ভব, আমি সেটাই নির্ধারণ করার চেষ্টা করছি। আচ্ছা হেস্টিংস, এই খুনের পরিকল্পনাটা কার বলে তোমার ধারণা হয়?

    –পরিকল্পনা…জর্জেস কনিউ কি?

    একটু দ্বিধার সঙ্গেই বললাম আমি।

    –জিরয়েডেরও তাই মত। মহিলা তার পুত্রও ভালোবাসেন এমন কোনো পুরুষকে আড়াল করবার জন্য মিথ্যা কাহিনী শুনিয়েছিলেন। তবে ওপরের কারণগুলো পর্যালোচনা করে অনুমান করতে পারছি মহিলা জর্জেসের জন্যই এবং জর্জেসের নির্দেশেই মিথ্যা গল্পের অবতারণা করেছিলেন।

    –হ্যাঁ, তোমার কথায় যুক্তি আছে। স্বীকার করলাম আমি।

    –তাহলে এই জর্জেস কনিউ কোনো লোকটি?

    -কেন, সেই ভবঘুরে লোকটি

    -ধরেছ ঠিক, কিন্তু মাদাম রেনাল্ড যে এই লোকটিকেই ভালোবাসতেন তার কোনো প্রমাণ কি আছে?

    -প্রমাণ? না নেই

    -কেন নেই? তুমি তো জান লোকটিকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন বলেই তো তার মৃতদেহ দেখার সঙ্গে সঙ্গেই সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলেন।

    –তিনি তো স্বামীর-তবে কি তার স্বামীই জর্জেস কনিউ?

    হতভম্ব হয়ে আমি তাকিয়ে রইলাম পোয়ারের দিকে।

    –তাঁর স্বামী কিংবা জর্জেস কনিউ যা কিছু সম্বোধন করতে পার।

    –কিন্তু তা কি করে হয়?

    -কেন নয়? কিছুক্ষণ আগেই তো আমরা দেখলাম জর্জেস কনিউকে ব্ল্যাকমেল করার পূর্ণ সুযোগ ছিল মাদাম ডওব্রেয়ুইলের। মঁসিয়ে রেনাল্ডের ক্ষেত্রেও একই সুযোগ ছিল তার।

    –তা ছিল কিন্তু তাহলে তো নতুন একটা পয়েন্ট সামনে এসে যাচ্ছে।

    –কোনো পয়েন্ট? মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল পোয়ারো।

    -খুনের পরিকল্পনাটা ছিল জর্জেসের একথা আমরা মেনে নিয়েছি, তাহলে দাঁড়াচ্ছে কি-জর্জেস নিজেই নিজের খুনের পরিকল্পনা করেছিল?

    –এতক্ষণে মূল পয়েন্টে পৌঁছলে। সেটাই সে করেছিল। অবিশ্বাস্য হলেও কথাটা সত্য।

    .

    ১৩.

    আমি বোবা চোখে পোয়ারোর দিকে তাকিয়ে রইলাম।

    এবারে আমার ব্যাখ্যা শোন, বলতে লাগল পোয়ারো, মানুষ কি করে নিজের খুনের পরিকল্পনা নিজে করে, একথাটা মেনে নিতে পারছ না, তাই না? কিন্তু মঁসিয়ে রেনাল্ড ঠিক তাই করেছিলেন।

    তবে তিনি কিন্তু মরতে চাননি। আর যে খুনের পরিকল্পনা তিনি করেছিলেন তার জন্য কোনো খুনীর প্রয়োজন ছিল না। কেবল প্রয়োজন ছিল একটা মৃতদেহ।

    দেখ, কুড়ি বছর আগের সেই কুখ্যাত বেরোণ্ডি মামলার পর জর্জেস কনিউ ঘুরতে ঘুরতে শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আমেরিকায় উপস্থিত হয়। সেখানেই তার ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে। প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হয় সে, বিয়ে থাও করে সেখানে। দীর্ঘ কুড়ি বছরে তার চেহারাও যথেষ্ট পরিবর্তন হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ কর্মফল তার পেছনেই লেগে ছিল। তাই একসময় কি করে সে মারলিনভিলে উপস্থিত হয়।

    চেহারা জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ পাল্টে গেলেও ফ্রান্সে তাকে একজন ঠিক চিনতে পেরেছিল। সেই ব্যক্তি হল মাদাম ডওব্রেয়ুইল। এমন শাঁসালো শিকারের সন্ধান পেয়ে সে-ও মনের সুখে দোহন শুরু করে।

    নিয়তির প্রহসনে এর পরেই সেই অভাবনীয় ঘটনা ঘটল। মঁসিয়ে রেনাল্ডের ছেলে জ্যাক ভালোবাসল মাদাম ডওব্রেয়ুইলের মেয়ে মার্থাকে। এই মেয়েকে বিয়ে করবে বলেই সে স্থির করে।

    মঁসিয়ে রেনাল্ডের অতীতের কলঙ্কজনক ইতিহাস তার ছেলে জ্যাক জানত না। কিন্তু মাদাম রেনাল্ড তা জানতেন। অত্যন্ত রাশভারী প্রকৃতির এই মহিলা ছিলেন স্বামীর অত্যন্ত অনুগত। এই দুজনের কারোরই ইচ্ছা ছিল না তাদের ছেলে মার্থাকে বিয়ে করে। তাই বিয়েটা ঠেকানোর জন্য দুজনে মিলে পরামর্শ করে স্থির হয়, মঁসিয়ে রেনাল্ড মৃতের অভিনয় করে এখান থেকে অন্যত্র সরে থাকবেন।

    তার আগে তিনি উইল করে তার ধনসম্পদ স্ত্রীকে দিয়ে যাবেন। পরে নির্দিষ্ট সময়ে মাদাম রেনাল্ড তার স্বামীর সঙ্গে মিলিত হবেন।

    এই পরিকল্পনা রূপায়ণের জন্য দরকার হয়ে পড়ল একটি মৃতদেহ। ঘটনাক্রমে তাও জোগাড় হয়ে গেল। এক ভবঘুরে তোক একদিন তাদের ভিলায় এসে উপস্থিত হয়। বাগানে তার সঙ্গে ঝগড়া হয় মঁসিয়ে রেনাল্ডের।

    দুজনে ধস্তাধস্তির ফলে লোকটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এবং মারা যায়। রেনাল্ড দম্পত্তি পরামর্শ করে লোকটির মৃতদেহ শেডের ভেতরে নিয়ে যান। লোকটা ছিল ফরাসি, আর মাঝবয়সী। তার মত দেখতে না হলেও তাকে দিয়েই কার্যসিদ্ধির মতলব করেন মঁসিয়ে রেনাল্ড।

    স্বামী-স্ত্রী পরামর্শ করে উপায়ও বার করে ফেলেন। ছুরির আঘাতে লোকটার মুখ বিকৃত করে দেওয়া হবে, মাদাম রেনাল্ড তাকে মঁসিয়ে রেনাল্ড বলে সনাক্ত করবেন।

    সোফার মাস্টারস এবং মঁসিয়ে জ্যাক রেনাল্ডকে নিয়ে ছিল সমস্যা। তারা উপস্থিত থাকলে আগের মৃতদেহটিকে মঁসিয়ে রেনাল্ড বলে সনাক্ত করা অসম্ভব হয়ে উঠবে। সেই বাধা অপসারণ করা হবে সোফারকে ছুটিতে পাঠিয়ে আর জ্যাককে ব্যবসার কাজে বুয়েনস এয়ার্সে পাঠিয়ে।

    পরামর্শে এই সিদ্ধান্ত স্থির হলে সাহায্য চেয়ে আমাকে একটা চিঠি লিখলেন। এই চিঠি লেখার উদ্দেশ্য হল, পুলিসকে নিঃসন্দেহ করা যে সত্যিই তার জীবন বিপন্ন ছিল।

    এরপর মৃতদেহের গায়ের পোশাক বদল করে তার পোশাকগুলো শেডের ভেতরেই কোথাও রেখে দিন মঁসিয়ে রেনাল্ড।

    মাদাম রেনান্ডের কাছে জ্যাকের দেওয়া যে ছুরিটা ছিল এরপর সেটা মৃতদেহের পিঠে বিদ্ধ করে খুনটাকে নিখুঁত রূপ দেওয়া হল।

    সেই সঙ্গে লোকটার মুখও বিকৃত করে দেওয়া হল। আর সেই রাতেই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মঁসিয়ে রেনাল্ড বাড়ির সংলগ্ন জমিতে একটা কবরও খুঁড়ে ফেললেন। অবশ্য তার আগে বেলা ডুবিনের ব্যাপারটা আছে।

    প্রতিবেশিনী মাদাম উওব্রেযুইলের যাতে কোনোরকম সন্দেহ না জাগে সেজন্য রেনাল্ড দম্পতি চেয়েছিলেন ভবঘুরে লোকটির মৃতদেহ যাতে তাদের চোখে পড়ে।

    সব ব্যবস্থা হয়ে যাবার পর মঁসিয়ে রেনাল্ড অপেক্ষা করতে থাকেন রাতের অন্ধকারে স্টেশন থেকে বারোটা দশের শেষ ট্রেনটা ধরবেন বলে।

    এই অবস্থায় রাতে ভিলায় উপস্থিত হয় বেলা নামে একটি মেয়ে। শেষ ট্রেনটা ধরার তাগিদ ছিল বলে মঁসিয়ে রেনাল্ড কোনো রকমে মেয়েটির হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। তার সেই মনোভাবই প্রকাশ পায় ওই কথায়, ঠিক আছে…এখন তুমি যাও।

    মেয়েটি চলে গেলে ঘরের দরজাটা ইচ্ছে করেই একটু ফাঁক করে ভেজিয়ে রাখেন। উদ্দেশ্য, পরদিন যাতে পুলিস বুঝতে পারে খুনী এই পথেই পালিয়ে গেছে।

    এরপরই ঘটল সেই অবিশ্বাস্য ভয়ঙ্কর ঘটনাটা। গলফ লিঙ্কে যখন মঁসিয়ে রেনাল্ড কবর খোঁড়েন সেই সময় অদৃশ্য মহাবিচারকের শেষ আঘাত অলক্ষ্যে নেমে আসে তার ওপর। একটা অজানা হাত পেছন থেকে তার পিঠে ছুরি গেঁথে দিল…।

    একটু থেমে পরে পোয়ারো জিজ্ঞেস করল। হেস্টিংস, দুটো খুনের কথা তোমাকে বলেছিলাম, কেন বলেছিলাম এবারে নিশ্চয় বুঝতে পেরেছ?

    প্রথম খুন বা অপরাধের তদন্তের জন্য মঁসিয়ে রেনাল্ড আমাকে আগ বাড়িয়ে চিঠি লিখেছিলেন, তার সমাধান পেয়ে গেলে। নিখুঁত পরিকল্পনা সম্পূর্ণ করবার জন্য যিনি নিজের কবর নিজেই আগে থেকে খুঁড়ে রেখেছিলেন, অদৃশ্য নিয়ন্তার কী নিদারুণ ব্যবস্থা, সেই তিনিই অজ্ঞাত হাতের ছুরিকাঘাতে শেষ পর্যন্ত সত্যি সত্যিই খুন হলেন। হেস্টিংস এমন এক রহস্যময় খুনের ঘটনা যে তার সমাধান বড় সহজ কথা নয়।

    –তোমার তুলনা হয় না পোয়ারো। অভিভূত স্বরে বলে উঠলাম আমি, এমন দুরূহ জট মোচন করা তুমি ছাড়া অন্য কারো পক্ষে সম্ভব নয়।

    –বেচারা জিরয়েডের জন্য দুঃখ হয় আমার, আমার প্রশংসা হজম করে নির্বিকার কণ্ঠে বলল পোয়ারো, সত্যকে জানবার সুযোগ কয়েকবারই পেয়েছে সে বিশেষ করে ছুরির বাঁট থেকে চুলটা নিজের হাতে তুলে এনেছে, তবু আত্মবিশ্বাসের অভাবে সে সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি।

    –হ্যাঁ, ভালো কথা মনে করছ, ওই চুলটা কার ছিল বলে তুমি মনে করো?

    –নিঃসন্দেহে মাদাম রেনাল্ডের। ওই একটি বিষয় নিয়েই অপরাধীকে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করতে পারত জিরয়েড। কিন্তু পারেনি সঠিক ভাবে বিশ্লেষণ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেনি বলে।

    মাদাম রেনান্ডের কথাটা একবার ভেবে দেখ, হেস্টিংস, কী অপরিসীম ধৈর্যের সঙ্গে তিনি নিজেকে ধরে রেখেছেন, তার মনের খবর বাইরের কেউ বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারছে না। তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি তার ছেলে জ্যাক খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে। কেন না তিনি নিশ্চিত ছিলেন, বিদেশে নিরাপদ দূরত্বেই তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। জ্যাককে ফিরে আসতে দেখেও তিনি বিচলিত হননি, কেননা তার ধারণা ছিল এ কেসে জ্যাকের জড়িয়ে পড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

    সেকারণেই তিনি তখন বলেছিলেন, এখন তাতে কিছু এসে যায় না। কথাটার অর্থ কেউ উপলব্ধি করতে পারেনি।

    মাদাম রেনান্ডের নার্ভের বিস্ময়কর ক্ষমতা স্বীকার না করে উপায় নেই। ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে জর্জেস কনিউর মৃতদেহ নিজের স্বামী বলে সনাক্ত করতে গিয়ে তিনি যখন দেখতে পান, মৃতদেহটা সত্যি সত্যিই মঁসিয়ে রেনাল্ডের–এটা সত্যিই যে, ওই অভাবনীয় মর্মান্তিক দৃশ্য তিনি সইতে পারেননি, জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু জ্ঞান ফিরে আসার পর থেকে তার আচরণে কোনো ভাবে প্রকাশ পায়নি যে তার স্বামী মঁসিয়ে রেনাল্ড ছিলেন অতীতের পলাতক অপরাধী জর্জেস কেনিউ।

    উপরন্তু তিনি প্রকারান্তরে প্রকাশ করেন মাদাম ডওব্রেয়ুইল ছিলেন তার স্বামীর রক্ষিতা–মহিলার পক্ষে তার স্বামীকে ব্ল্যাকমেল করা অসম্ভব নয়।

    এই অসাধারণ মহিলার প্রশংসা না করে উপায় নেই। কোনো অপরাধীকেও যখন ভালোবাসেন, আন্তরিকভাবেই বাসেন।

    পোয়ারোর বিশ্লেষণ আমার কাছে ছিল চমকপ্রদ। রহস্যের জট ছাড়ানোয় কী নিপুণ দক্ষতা তার।

    –এবারে তোমার সেই সীসের পাইপের রহস্যটা পরিষ্কার কর। বললাম আমি।

    –সেটা ধরতে পারনি? বলল পোয়ারো, মঁসিয়ে রেনাল্ড ভবঘুরের মৃতদেহটাকে নিজের বলে চালাবার মতলবে তার মুখটা বিকৃত করেছিলেন ওই বস্তুটা ব্যবহার করে। অকিঞ্চিৎকর হলেও ব্রুটা ছিল খুবই গুরুত্বপুর্ণ। কিন্তু হাতের কাছে পেয়ে জিরয়েড সেটা কাজে লাগাতে পারেনি। বুঝলে হেস্টিংস, অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে প্রমাণ বা ঘটনা যত সামান্যই হোক না কেন, তার যথাযথ বিশ্লেষণ করতে হয়।

    যাইহোক, এবারে গোটা কেসটা নতুন করে আমাদের পর্যালোচনা করতে হবে। প্রথমে খুঁজে বার করতে হবে, মঁসিয়ে রেনাল্ডকে কে খুন করে থাকতে পারে? এই ব্যক্তিটি কি ভিলার কাছাকাছি থাকে এমন কেউ, মঁসিয়ে রেনাল্ডের মৃত্যু যার স্বার্থ চরিতার্থ করবে? এরকম যে ব্যক্তিটিকে আমরা পাচ্ছি সে হল জ্যাক রেনাল্ড। কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই ছুরিটা ব্যবহার করে কাজটা করেছিল সে।

    যদিও পোয়ারোর বক্তব্য বুঝতে পারছিলাম না, তবুও বললাম হ্যাঁ, মাদাম রেনাল্ডের ছুরি। সেটাকেই দ্বিতীয়বার ভবঘুরে লোকটার বুকে বিধে থাকতে দেখেছি আমরা। ছুরি তাহলে দুটি না একটি?

    -অনেক ভাবতে হয়েছে আমাকে ছুরির বিষয়টা নিয়ে। ছুরি দুটি। তবে মালিক একজন জ্যাক রেনাল্ড। অথচ হেস্টিংস, সত্যিকথাটা হল, জ্যাক রেনাল্ডকে অভিযুক্ত করা এক মস্ত বড় ভুল। যদিও জর্জেস কনিউ-এরই ছেলে সে, ছেলে বাপের মতো হবে বংশানুক্রমিক ধারার এমন কথা লোককে বলতে শোনা যায়–কিন্তু

    আমি হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন করলাম, এ আবার কি কথা বলছ তুমি

    আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে পোয়ারো জানতে চাইল, ক্যালাইনে যাওয়ার জাহাজ কটায় বলতে পার?

    –বিকেল পাঁচটায় বলে মনে হয়। বললাম আমি।

    –তাহলে এখনো সময় পাওয়া যাবে। একজন সাক্ষীর খোঁজে ইংলন্ড যেতে হবে।

    –সাক্ষী? কে সে? জানতে চাইলাম আমি।

    রহস্যময় হাসি হেসে পোয়ারো বলল, মিস বেলা ডুবিন। রেনাল্ড পরিবারের সঙ্গে মেয়েটির অবশ্য কোনো সম্পর্ক ছিল না। তবে স্টোনর নামটা শুনেছে। ভুলে যেও না বন্ধু, জ্যাক রেনাল্ড বিত্তবান তার ওপর কুড়ি বছরের যুবক।

    একজন তরুণীর প্রেমের পক্ষে আদর্শ পাত্র। মোটা টাকার চেক দিয়ে মেয়েটিকে মঁসিয়ে রেনাল্ড কেনার চেষ্টা করেছিলেন–এই বিষয়টাকে আমি অবহেলা করতে পারি না। যে করে হোক মেয়েটিকে খুঁজে বার করতে হবে।

    তোমার মনে থাকার কথা, জ্যাক রেনাল্ডের ঘরে কাগজপত্রের ভেতর থেকে একটা ফোটোগ্রাফ এনেছিলাম, তাতে লেখা ছিল আমার ভালোবাসা জেনো-বেলা। এই যে দেখে রাখো।

    কোটের পকেট থেকে ছবিটা বার করে আমার হাতে দিল।

    স্তম্ভিত হয়ে গেলাম ছবির মুখটা দেখে– আমার সিনডেরেলা।

    .

    ১৪.

    চকিতে পোয়ারোর দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম আমার মুখভাব লক্ষ্য করেনি সে। নির্বিকার মুখে ছবিটা ফিরিয়ে দিলাম।

    –চল, এখুনি বেরিয়ে পড়া যাক।

    অগত্যা তাড়াহুড়ো করেই বেরিয়ে পড়তে হল।

    পোয়ারোর পর্যবেক্ষণ মাথায় ঘুরছিল। সেই সঙ্গে সিনডেরেলা জুড়ল। জাহাজে ওঠার পর এসব নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম।

    পোয়ারো সাক্ষী খুঁজতে চলেছে। পোয়ারো কি ভাবছে মেয়েটি জ্যাক রেনাল্ডকে খুনের অবস্থায় দেখেছে?

    না কি তাকেই খুনী বলে ভাবছে? কিন্তু তা কি করে সম্ভব? মঁসিয়ে রেনাল্ডকে খুন করার কোনো মোটিভ তার থাকতে পারে না।

    কিন্তু মেয়েটি খুনের জায়গায় উপস্থিত হল কি করে? ক্যালাইনে দুজনেই ট্রেন ছেড়েছি। জাহাজে উঠে থাকলে আমার চোখে পড়ত নিশ্চয়। এক হতে পারে যদি ট্রেনে চেপে মারলিনভিলে ফিরে আসে। তাহলে ফ্রাঙ্কেইস যে সময়টা বলেছে, ভিলা জেনেভিয়েভে তার ফিরে আসা সম্ভব হতে পারে।

    কিন্তু বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছিল রাত দশটার পর…তারপর? এরপর কি সে হোটেলে কিংবা ক্যালাইনে ফিরে গিয়েছিল?

    খুনটা হয় মঙ্গলবার। তার সঙ্গে আমার দেখা হয় বৃহস্পতিবার সকালে। আদৌ সে ফ্রান্স ছেড়ে গিয়েছিল বলে আমার মনে হয় না।

    মেয়েটি কি জ্যাক রেনাল্ডের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল? কিন্তু আমি তো তাকে বলেছিলাম, জ্যাক ঘটনাস্থলে নেই, বুয়েনস এয়ার্সে চলে গেছে। সম্ভবতঃ সে জানত জ্যাক মারলিনভিলেই রয়েছে…সমুদ্রযাত্রা করেনি। জ্যাকের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল কিনা বোঝা যাচ্ছে না। পোয়ারোর সম্ভবতঃ সেটাই জানা উদ্দেশ্য।

    এমন হওয়াও অসম্ভব নয় মার্থা উওব্রেয়ুইলের সঙ্গে দেখা করতে এসে বেলা ডুবিনের মুখোমুখি হয়েছিল জ্যাক। অথচ তাকে অবহেলা করেই মার্থা ডওব্রেয়ুইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল।

    এটা খুবই স্বাভাবিক যে বিত্তবান পরিবারের ছেলে জ্যাক কিছুতেই কপর্দকহীন মেয়েকে নিজের যোগ্য বলে মনে করতে পারে না।

    ভাবনাচিন্তার ছাঁকুনি দিয়ে নিজের কর্তব্য নিরূপণ করবার চেষ্টা করছিলাম। পোয়ারোর কথায় সম্বিৎ ফিরল।

    –গ্রেপ্তারের খবরটা ইংরাজি কাগজগুলোতে ছাপা হবে আগামী পরশু, পোয়ারো বলল, তার আগেই আমাদের কাজ শেষ করতে হবে।

    পোয়ারোর পরিকল্পনা বোঝা দুষ্কর। তাই আমি জানতে চাইলাম, ইংলন্ডের জনারণ্যে কেবল একটি ছবি সম্বল করে মেয়েটিকে খুঁজে বার করবে তুমি?

    পোয়ারো হাসল। বলল, থিয়েটারের এজেন্ট সেই জোসেফ অ্যারোসকে নিশ্চয়ই মনে আছে তোমার? একজন কুস্তিগিরের ব্যাপারে একবার আমাকে সাহায্য করেছিল সে। তার সাহায্যেই মেয়েটিকে খুঁজে বার করব।

    .

    ফটোগ্রাফ দেখেই মিঃ অ্যারোস বলে উঠল, এতো ডুলসিবেলা বোনেদের একজন। দুই বোনই গায়িকা ও নর্তকী। ঠিক আছে আপনারা আজ চলে যান আমি খবর পাঠিয়ে দেব।

    পরদিন সকালেই ভদ্রলোক একটা চিরকূট পাঠিয়ে আমাদের জানাল, ডুলসিবেলা বোনেদের কভেন্ট্রির প্যালেসে পাওয়া যাবে।

    সঙ্গে সঙ্গেই আমরা কভেন্ট্রির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম।

    থিয়েটারে কোনোরকম খোঁজখবর না নিয়ে সেদিনের প্রোগ্রাম দেখে পোয়ারো টিকিট কেটে ফেলল।

    শো-এর সর্বশেষ প্রোগ্রাম ছিল ডুলসিবেলা বোনেদের গান ও নাচ।

    ঘোষকের ঘোষণা শেষ হতেই দুই বোন মঞ্চে উপস্থিত হল। বুক কাঁপছিল আমার। স্থির চোখে তাকিয়ে রইলাম।

    দেখে দুই বোনকে যমজ বলেই মনে হল। অবশ্য একজনের চুলের রঙ হালকা হলুদ, আরেকজনের ঘন কাল। দুজনেরই মিষ্টি সুন্দর চেহারা। গানের গলাও সুন্দর। গানের সঙ্গে মানানসই নাচও করল তারা।

    একসময় শো শেষ হল। দর্শক-শ্রোতার আনন্দোচ্ছ্বাস আর করতালিধ্বনিতে হল মুখরিত হয়ে উঠল।

    আমার কেমন অস্বস্তি বোধ হতে লাগল। দমফাটা হৈ-হট্টগোল অসহনীয় হয়ে উঠল। বাইরে গিয়ে বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে না পারলে স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। পোয়ারোকে রেখে বাইরে বেরিয়ে এলাম।

    আমাদের হোটেলের কাছেই থিয়েটার। ঘরে এসে খানিকটা হুইস্কি নিয়ে বসলাম।

    হঠাৎ দরজা ঠেলে ঘরে যে ঢুকল, তার দিকে চোখ পড়তেই লাফিয়ে উঠলাম।

    সিনডেরেলা দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে।

    –হলে সামনের সারিতে তোমাকে আর তোমার বন্ধুকে দেখতে পেলাম। এই তোমার সেই গোয়েন্দা বন্ধু? কভেন্ট্রিতে তোমরা কেন এসেছ বলো তো?

    থেমে থেমে কথাগুলো বলল মেয়েটি।

    মঞ্চের পোশাক তখনো গায়ে চাপানো ছিল। একটা ক্রোক দিয়ে ঢেকে রেখেছিল। আমি ভাবছি, একটু কি ভয়ার্ত শোনাল তার স্বর? যেজন্য সে ভয় পাচ্ছে নিশ্চয় তা জানে পোয়ারো-বুঝতে পারছি।

    কিন্তু আমার সিনডেরেলা…আমার হৃদয়ও তো আকুল হয়ে উঠেছে। কিন্তু কেবল তাকিয়ে থাকা ছাড়া কোনো কথা আমি বলতে পারছি না।

    -তোমার গোয়েন্দা বন্ধু কি আমার খোঁজ করছে? অস্ফুটে বলল সে।

    আমি তেমনি বাক্যহারা। সে এগিয়ে এসে চেয়ারে বসল, তারপর দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

    আমি হাঁটু মুড়ে বসে তার দুহাত জড়িয়ে ধরলাম। হৃদয়ের সমস্ত আবেগ জড়ো করে বলতে লাগলাম, কেঁদো না প্রিয়তমা, তোমার কোনো ভয় নেই, আমি তোমাকে রক্ষা করব। সব কিছুই আমি জানি।

    কান্না থামিয়ে সে আমার চোখে চোখ রাখল। জল টলটল করছে।

    সেদিন তুমিই তো ছুরিটা নিয়ে এসেছিলে? বললাম আমি।

    –হ্যাঁ। অস্ফুটে উচ্চারণ করল সে।

    –কেন এনেছিলে?

    –আমার ভয় ছিল ওটার গায়ে হাতের ছাপ যদি পাওয়া যায়?

    –কিন্তু তুমি তো গ্লাভস পরেছিলে। তবু ভয় ছিল?

    –তুমি কি আমাকে পুলিসের হাতে দেবে?

    –না।

    –দেবে না কেন?

    –সিনডেরেলা–আমি তোমাকে ভালোবাসি।

    কোনোদিন কাউকে ভালোবাসার কথা চিন্তাও করিনি আমি। কিন্তু আজ এই অদ্ভুত পরিবেশ আর পরিস্থিতিতে সেই কথাটাই না জানি কেন না বলে পারলাম না তাকে।

    সে মুখ নিচু করল। বিড়বিড় করে বলল, ওহ না। আমাকে ভালোবাসা যায় না–আমার সম্পর্কে কিছুই জান না তুমি

    –জানি সবই। সে-রাতে তুমি মঁসিয়ে রেনাল্ডের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলে। তোমাকে খুশি করার জন্য তিনি মোটা অঙ্কের একটা চেক দিয়েছিলেন। তুমি ঘৃণাভরে সেটা টুকরো করে ছিঁড়ে ফেল। তারপর তুমি তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আস। জ্যাক রেনাল্ড সমুদ্রযাত্রা না করে ফিরে এসেছিল–সেকথা তুমি জানতে কিনা বলতে পারব না। বিষাদাচ্ছন্ন মনে ফেরার পথে গলফ খেলার মাঠে রাত বারোটা নাগাদ একটি লোককে তোমার চোখে পড়ে। পেছন থেকে দেখলেও তাকে তুমি সম্ভবতঃ চিনতে পেরেছিলে। আগেই জ্যাক রেনাল্ডকে হুমকি দিয়ে একটা চিঠি লিখেছিলে। লোকটাকে সামনে দেখতে পেয়ে পেছন থেকে তুমি তাকে আঘাত করেছিলে। তাকে খুন করেছিলে।

    দুহাতে মুখ ঢাকল সে। অস্ফুটে বলতে লাগল, ওহঃ তুমি সব বলেছে।

    একটু পরে আমার দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ স্বরে বলে উঠল, আমি খুনী–একথা জেনেও তুমি আমাকে ভালোবাসবে?

    -ভালোবাসা বড় অবুঝ সিনডেরেলা। বললাম আমি, জানি না কেন, প্রথম দেখা হওয়ার দিন থেকেই আমি নিজের কাছে বড় অসহায় হয়ে পড়েছি–তোমাকে ভালো না বেসে পারিনি।

    আমার কথাগুলোতে কি ছিল জানি না। এমনভাবে হৃদয়ের গভীর আবেগ কখনো কারো কাছে প্রকাশ করিনি।

    সিনডেরেলা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে মুখ ঢাকল। স্খলিত কণ্ঠে বলতে লাগল-ওহ, আমি কি করব…কি করব…কে আমাকে বলে দেবে

    -শান্ত হও বেলা, তার চুলে বিলিকেটে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি প্রতিদান চাই না কিছু, কেবল তাকে ভালোবেসে আমাকে সাহায্য কর।

    জ্যাক রেনাল্ডকে আমি ভালোবাসি তুমি তাই মনে করো?

    ঠোঁটের কোণে হাসবার চেষ্টা করে সে আবার বলল, কিন্তু তোমাকে যেভাবে ভালোবাসি তাকে সেভাবে কখনো ভালোবাসতে পারব না।

    বলতে বলতে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল আমাকে। আমার ঠোঁট লিপ্ত হল তার উপর্যুপরি উষ্ণ চুম্বনে। তার আন্তরিক ভালোবাসার বন্য প্রকাশ আমাকে অভিভূত করল।

    ঠিক এই সময় দরজার দিকে চোখ পড়তে চমকে উঠলাম। পোয়ারো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখছে।

    –এখুনি এখান থেকে চলে যাও তুমি, আমি ওকে আটকে রাখছি। পোয়ারোকে আমি আগলে রাখলাম। সিনডেরেলা আমাদের পাশ দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

    –তাকে যেতে দিয়ে ভালোই করলে, বলল পোয়ারো, তবে ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য। এখন শান্ত হয়ে বসো।

    আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি তাকে ধরবার চেষ্টা করবে না?

    –আমি তো জিরয়েড নই, হেস্টিংস। কিন্তু পুরনো বন্ধুর প্রতি তোমার এই ব্যবহার খুবই অস্বস্তিকর। ফটোগ্রাফ দেখে মেয়েটিকে যে তুমি চিনতে পেরেছ, সেকথা আমাকে বলনি। কিন্তু তুমি জানতে না, আমি জানতাম সেকথা। এখন আমার সামনেই তাকে তুমি পালিয়ে যেতে সাহায্য করলে।

    তোমার কাছে একটা কথা আমি জানতে চাই হেস্টিংস, তুমি কি আমার সঙ্গে কাজ করবে না বিরুদ্ধাচরণ করবে?

    সংযত কণ্ঠে শান্ত ভঙ্গিতে কথাগুলো কে করল পোয়ারো। প্রতিটি শব্দ যেন আমার বুকে তীরের মতো বিদ্ধ হল। পোয়ারো আমার বন্ধু।

    –তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করার জন্য আমি দুঃখিত পোয়ারো, আমি বললাম, আমি নিজের ওপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমাকে মার্জনা কর। কথা দিচ্ছি, ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।

    বন্ধু, মনে হয় মেয়েটিকে তুমি ভালোবাস, একথা নিজেও জানতে না। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এই মেয়েটিই ছুরিটা নিয়েছিল। তোমাকে আমি সতর্ক করে দিয়েছিলাম। যাই হোক, এখন আমাকে কিছু বল, যদি আমার চেয়ে বেশি কিছু জেনে থাক–

    –চমকে দেওয়ার মতো কোনো খবর তোমার ঝুলিতে নেই পোয়ারো। মিস ডুবিনকে সন্ধানের চেষ্টা করে বৃথা সময় ব্যয় করো না। সেদিন রাতে মঁসিয়ে রেনাল্ডের সঙ্গে যে মেয়েটি দেখা করেছিল, সে এ নয়। এই অপরাধের সঙ্গেও এই মেয়েটি জড়িত নয়, তোমাকে আমি নিশ্চিত বলতে পারি। ফ্রান্স থেকে বাড়ি পর্যন্ত ট্রেন ভ্রমণে সেদিন সে আমার সঙ্গে ছিল। ভিক্টোরিয়ায় তার সঙ্গে আমার ছাড়াছাড়ি হয়। সেদিন রাতে তার পক্ষে মারলিনভিলে যাওয়া কোনো মতেই সম্ভব নয়।

    –একথা তুমি আদালতে শপথ নিয়ে বলতে পারবে? চিন্তিতভাবে আমার দিকে তাকাল পোয়ারো।

    -নির্দ্বিধায়।

    -হেস্টিংস, উঠে দাঁড়িয়ে বলল পোয়ারো, তোমার ধারণা খুবই বিস্ময়কর, আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি।

    .

    ১৫.

    আমার গল্পটা পোয়ারো কতটা বিশ্বাস করল বুঝতে পারছিলাম না। বেলাকে আর কোনো ভাবে অভিযুক্ত করা যায় কিনা তাও বুঝতে পারছিলাম না। তবে পোয়ারো যে নিরস্ত হবে না সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না।

    পরদিন সকালে একসঙ্গেই ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসলাম। ওকে জানালাম, একটা কাজে একবার বাইরে যেতে হবে।

    অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো পোয়ারো। বলল, যে খবর জানবার জন্য বাইরে যাবার কথা ভাবছ, যদি জানতে চাও তোমাকে আমি তা জানাতে পারি।

    আমি অবাক হয়ে তাকালাম তার দিকে।

    –শোন হেস্টিংস, ডুলসিবেলা বোনেরা কভেন্ট্রি ছেড়ে চলে গেছে। থিয়েটারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেই অজ্ঞাতবাসে যাত্রা করেছে তারা।

    -তুমি খবর নিয়েছিলে?

    –হ্যাঁ। এবং এটাই সত্য খবর। এছাড়া আর কি করতে পারত তারা?

    আমিও তা বুঝতে পারছিলাম। আমার দুর্বলতার সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে পোয়ারোর নাগালের বাইরে সরে পড়েছে সে। কিন্তু নতুন পরিস্থিতিতে বিব্রত হতে হবে আমাকেই।

    বুঝতে পারছিলাম না, সে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে কিনা। পোয়ারো নিশ্চয়ই কোনো পথ খুঁজে বার করার চেষ্টা করছে। সেটা তার অতি নম্র সৌজন্যমূলক ব্যবহার দেখেই বুঝতে পারছিলাম।

    আপাতঃ শান্ত মূর্তির আড়ালেই সে বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। সবদিকে নজর রেখে সতর্ক থাকতে হবে আমাকে।

    চোখের কোণে আমাকে লক্ষ্য করে পোয়ারো বলল, তাকে কেন খোঁজ করলাম না নিশ্চয় বুঝতে পারছ হেস্টিংস?

    –দয়া দেখিয়েছ।

    –আমার জায়গায় তুমি হলে যা করতে আমিও তাই করেছি। ছুটোছুটি করে হয়রান হবার প্রয়োজন দেখি না। বেলা ডুবিনকে যেতে যাও। প্রয়োজন হলে যথাসময়ে নিশ্চয়ই তার খোঁজ পেয়ে যাব।

    পোয়ারো অভাবিত ভাবে শান্ত আর নির্লিপ্ত। আমার কাছে যা খুবই অস্বস্তিকর বোধ হতে লাগল।

    –তোমার পরিকল্পনার কথা জানতে ইচ্ছে হলেও, আর জিজ্ঞেস করব না। সে অধিকার আমি হারিয়েছি পোয়ারো। মেয়েটিকে আমি পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছি।

    -না, বন্ধু, তোমাকে গোপন করার মতো কিছুই নেই আমার। আমরা ফ্রান্সে ফিরে যাচ্ছি।

    পোয়ারোর কথা শুনে আমি বিস্ময়াহত। আমাকে পোয়ারো ত্যাগ করেনি, সর্বক্ষেত্রে তার সহচর হবার অধিকার থেকে চ্যুত করেনি আমাকে।

    আমার মনোভাব বুঝতে পেরে পোয়ারো বলল, হ্যাঁ, বন্ধু। আমি জানি, তোমার পোয়ারোকে কখনোই ত্যাগ করতে পার না তুমি। তবে ইচ্ছে করলে ইংলন্ডে থেকে যেতে পার তুমি।

    জবাবে আমি কেবল মাথা নাড়লাম। আমার চেতনার আলোকে নতুন করে যেন পোয়ারোকে আবিষ্কার করলাম। তবু নিঃসংশয় হতে পারছিলাম না, এমন একটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তার বিশ্বাস ফিরে পাব।

    তবে যাই ঘটুক আমাকে সতর্ক থাকতে হবে। পোয়ারোর কাছাকাছি থেকে তার গতিবিধির ওপর নজর রাখতে হবে। পোয়ারো যতক্ষণ আছে, বেলা বিপদমুক্ত নয়।

    আমি বললাম, তুমি যেভাবে খুশি নিতে পার, সবকাজ আমরা দুজনে মিলেই করতে চাই।

    -আমিও একমত, বলল পোয়ারো, তবুও তোমাকে সতর্ক করে দেওয়া আমি কর্তব্য বলে মনে করি।

    -তোমাকে আমার শত্রুর ভূমিকা নিতে দেখলে কিছুমাত্র বিচলিত হব না পোয়ারো। তবু আমি

    আমাকে বাধা দিয়ে পোয়ারো বলল, তবু তুমি যে কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছ তা নিয়েই সন্তুষ্ট। কিন্তু বন্ধু, আমি আপাততঃ জ্যাক রেনাল্ডকে নিয়েই ভাবতে চাই।

    নামটা শুনে মনে হল আমি যেন এতক্ষণ কল্পনার জগতে ছিলাম। এ কেসের বিন্দুমাত্র ছায়া চিন্তার জগত থেকে সরে গিয়েছিল।

    জ্যাক রেনাল্ড আমাকে বাস্তবের মাটিতে নিয়ে এল। বেচারা জ্যাক। সে এখন জেলে বন্দি। ফাঁসির সম্ভাবনায় প্রতিটি মুহূর্তে শঙ্কিত হচ্ছে।

    এই মুহূর্তে আমার ভূমিকাটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। জ্যাক রেনাল্ড নিরপরাধ। বেলাকে আমি বাঁচাতে পারি, কিন্তু তার বিনিময়ে ওই নিরপরাধ মানুষটির গলায় ফাঁসির দড়ি হয়তো ঝুলিয়ে দিতে হবে।

    কিন্তু এমন জঘন্য কাজ আমি কি করে করব? অসম্ভব। যে করেই হোক নিরপরাধ জ্যাক রেনাল্ডকে জেলের দরজার বাইরে মুক্ত আকাশের তলায় বার করে নিয়ে আসতে হবে। যে কোনো মূল্যে।

    পরমুহূর্তেই শঙ্কায় দুলে উঠল বুক। যদি সে খালাস না পায়? তাহলে? তাহলে অভিযুক্ত হবে বেলা? যেকোন মূল্যে আমি যাকে ভালোবাসতে চাই?

    কি সিদ্ধান্ত আমি নেব? আমি কি বেলাকে বাঁচাবার চেষ্টা করব না?

    সম্ভবতঃ বেলা এখনো জানে না, জ্যাক রেনাল্ড গ্রেপ্তার হয়েছে। আমি তাকে কিছুই প্রকাশ করিনি। কিন্তু যখন সে জানবে, তখন সে কি করবে? সে কি নিজের জীবনের বিনিময়ে তার প্রাক্তন প্রেমিককে বাঁচাবার চেষ্টা করবে?

    এমনও তো হতে পারে, সব বাধা অতিক্রম করে জ্যাক রেনাল্ড খালাস পেয়ে যাবে। তা হলে তো সবদিকই রক্ষা হয়। যদি তা না হয়–সেই সঙ্কট মোচন করবে কে?

    আমাকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হবে যাতে বেলাকে আড়ালে রাখা যায় এবং জ্যাককেও বাঁচানো যায়। যদিও জানি না, কি করে তা সম্ভবপর হবে।

    পোয়ারো কোনো অন্যায় হতে দেবে না। যেকোনো ভাবেই হোক, নিরপরাধীকে সে মুক্ত করে আনবে। আমি জানি, যত কঠিনই হোক, সে কাজে সে ব্যর্থ হতে পারে না। যদি এমন হয়, বেলা সব সন্দেহের বাইরে আর জ্যাক রেনাল্ড অভিযোগমুক্ত–এমন সন্তোষজনক সমাধান কি সম্ভব হবে? কোনো পথে সম্ভব?

    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44 45 46 47 48 49 50 51 52 53 54 55 56 57
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleমহাভারতের নারী – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    Next Article আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.