Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    আগামী রাত্রির উপাখ্যান

    উপাখ্যান এক পাতা গল্প380 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    তৃষ্ণাভূমি – নিক উড। অনুবাদ : রাজর্ষি গুপ্ত

    মূল গল্প: Thirstlands

    একটা কথা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। এখানেও বর্ষা দূর অস্ত্। বাঁদিকে খাড়া উঠে যাওয়া উঁচু পাহাড়ের পাথুরে গায়ে চোখ চালালাম। কোথায় সেই খাদের মাথা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়া পাঁচ বছর আগে দেখা বিপুল, অনন্ত জলরাশি? এখন তার জায়গায় খাদের মাথা থেকে আমার পায়ের শ’খানেক মিটার নীচে প্রায় মজতে-বসা শ্যাওলাসবুজ নদীটার খাত পর্যন্ত জলের একটা সরু ঝিরঝিরে পাতলা পর্দা কেবল দুর্বল ভাবে দুলছে। সেই হুহু-বেগে ছুটে আসা জল অনন্ত শূন্য থেকে আছড়ে পড়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়া জলকণার বৃষ্টি, সেই জলপ্রপাতের উপর আকাশ জুড়ে ছেয়ে থাকা হাতির মতো কালো মেঘ—ও সব এখন সুদূর অতীত। ও-ই দূরে নীচে বাটোকো গিরিখাতের মধ্যে গাছপালার আড়ালে কোনোরকমে নিজের দেহকে টেনে নিয়ে চলেছে নদীটা। বুড়ি রানি ভিক তো কবেই মরে ফৌত হয়েছেন, আর এখানে এই জাম্বিয়ায় তাঁর নামতুতো বোন তাঁরই মতো নামকরা এই জলপ্রপাতও ধুঁকছে। আগেকার সেই ‘মোসি-ওয়া-তুনিয়া’—মানে ‘গর্জনশীল ধোঁয়া’ আর নেই।

    অনিচ্ছার গলায় ‘রেকর্ড’ বলে ডান চোখটা টিপতেই আমার নার্ভে বসানো নিউরাল ক্যামেরা চালু হয়ে গেল।

    দু প্রিজ-এর এই দৃশ্য একটুও ভালো লাগবে না।

    কালো পোশাক পরে কাঁধে একে ঝুলিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডটি তার হাতের ছোট্ট চৌকো ডিজিটাল স্লেটের উপর টোকা মারতেই আমার কানের পর্দায় পেমেন্ট রিকুয়েস্টের ‘বিপ’ শব্দ ভেসে এল। যত টাকা চাইল, চাইনিজ কারেন্সি ইউয়ানে সেটা বিড়বিড় করে বলে মাথার ভিতরের অফিস অ্যাকাউন্ট থেকে পাঠিয়ে দিলাম।

    নাহ্, দু প্রিজ একেবারে বজ্রাহত হয়ে যাবে! পুরো ক্ষেপে লাট হয়ে যাবে রে!

    একটি কালো ছোকরা আদ্যিকালের ফোন-ক্যামেরা বাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখে গার্ড তার দিকে এগিয়ে গেল। আমি ছাড়া এই ভিউয়িং প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আর মোটে পাঁচজন। কোনো ধাক্কাধাক্কি নেই আগেকার মতো। জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটলাম। তেষ্টায় সব সময়ই আমার গলা শুকিয়ে থাকে আজকাল।

    <অ্যাঁ! আজকাল এই হাল হয়েছে? ধ্যাত্তোর বাঁ*! এই জন্য এত পয়সা খরচা করলাম? সময় নষ্ট খালি!>

    মনের মধ্যে শিকড় গেড়ে বসা পরগাছার মতো বসের কোলাব্যাং-সুলভ গলাখানা আমার কানের পর্দায় ইলেক্ট্রনিক স্বরে ঘ্যানঘ্যান করে উঠল। এই মেরেছে! বস আবার কখন এসে জুটল? ব্যাটা আমারই চোখ দিয়ে সব দেখছে।

    চোখ বুজলাম। বন্ধ চোখের পাতার তলার আঁধারে ডানদিকে মিটমিট করে জ্বলছে সিরিল দ্য রিগ-এর নিউরাল সাইবারনেটিক্সের জ্বালানো একটা সবুজ বিন্দু। অফিস তার মানে অনলাইন আছে। আর ওই হতচ্ছাড়া বসও তাই।

    কিন্তু বাঁ চোখের নীচে তো কিছু জ্বলছে না—শুধুই অন্ধকারের কালচে-লালচে আভা। কোথায় তুমি লিজেট, কোথায়? কী করছ? কেমন আছো? তোমাকে ছেড়ে আসতে আমার ভালো লাগে না, তুমি তো জানো। কিন্তু কী করব বলো? এতগুলো বিল তো মেটাতে হবে, তাই না? বিশেষ করে ওই জলের বিল…

    <কই হে? কী হল তোমার আকাশ ভেঙে বৃষ্টির ফোরকাস্ট আর ভিক জলপ্রপাতের বন্যার? তার জন্যই তো এত কাঠখড় পুড়িয়ে প্লেনের ভাড়া দিয়ে তোমাকে পাঠানো হল ওখানে, নাকি?>

    “উবে গেছে বোধ হয় গরমে।”

    প্রবল বিরক্তি-মাখা শব্দগুলো বেরোতে বেরোতে আমার গলা আরো শুকিয়ে দিচ্ছিল। চোখ বন্ধই ছিল। ঝর্না থেকে দুএকটা জলের ফোঁটা এসে পড়ল আমার মুখের উপর, আমার বেরিয়ে থাকা জিভের উপর। উফ্, কী শিহরণ! জলের ফোঁটাটা রোদে পুড়ে ঝামা হয়ে যাওয়ার আগেই জিভটা সড়াৎ করে ভিতরে টেনে নিলাম। প্রাণপণে হিপ-ফ্লাস্কে থাকা জলের খানিকটা টেনে নিলাম—উষ্ণ কিন্তু মিষ্টি তরল জিভের উপর খেলা করল—তারপর আবার যে কে সেই জলতেষ্টার খসখসে যন্ত্রণা। শেষবারের মতো ঢোক গিলে চোখ মেললাম। আঙুল আর হাত প্ল্যাটফর্মের কাঠের রেলিংয়ের উপর রাখা, কিন্তু তাতে আর কোনো জলের ফোঁটার স্পর্শ পাচ্ছি না। চকচকে ঘন নীল আকাশে কালচে রং ধরছে, ফোলা বেলুনের মতো লাল টকটকে সূর্য অস্ত যাচ্ছে।

    নাঃ! এখানে কোনো ‘গর্জনশীল ধোঁয়া’, কোনো উত্তুঙ্গ জলপ্রপাত নেই! আছে শুধু এক রক্তাল্পতায় ভোগা তিরতিরে জলধারা, আমি আর আমারই মতো জলপ্রপাতের খাদের দিকে হাপিত্যেশ করে তাকিয়ে থাকা একদল মানুষ। কিন্তু যে বন্যার অপেক্ষায় আমরা হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছি তা কোনোদিনই আসবে না।

    এপাশে ওপাশে জিএম জৈবজ্বালানীর দিগন্তপ্রসারী ক্ষেত জোঁকের মতো নদীর রক্ত শুষে সবুজ হয়ে ফুলেফেঁপে ছড়িয়ে রয়েছে। ওদিকে লিভিংস্টোনের বাইরের বস্তিতে শুনছি নাকি লাখো লাখো বুভুক্ষু মানুষের ভিড় জড়ো হয়েছে। তারা ধুঁকতে ধুঁকতে দেখছে তাদের খাবার বাক্সবন্দী হয়ে চলে যাচ্ছে সমুদ্রের পারে এসইউভি আর ট্যাঙ্কদের খাদ্য হতে। আমি অবশ্য অন্য পথ দিয়ে ঘুরে এসেছি ওই দৃশ্য এড়াব বলেই—কাজেই জানি না ব্যাপারটা সত্যি নাকি ওয়েবে ভেসে বেড়ানো আরও একটা ভুয়ো খবর। সিরিলও সেটা জানাতে পারবে না, কারণ শুনছি নাকি ফুয়েলকর্পস ওভারহেড স্যাটেলাইটগুলোকে সেন্সর করেছে। আর তাছাড়া এই সব খবরের আজকাল বাজারে কোনো দামও নেই। এমন কী শেষ অফিশিয়াল নিউজ এজেন্সিগুলো পর্যন্ত এসবকে পাত্তা দেয় না।

    <ধ্যার! আমি বঙ্গানিকে বলছি আমাদের অনলাইন খদ্দেরদের মধ্যে কাউকে মুর্গি করে তোমার ওই গুষ্টির পিণ্ডি ছবি আর ক্লিপিংসগুলো গেলানো যায় কি না দেখতে! এ যা ছাল ছাড়ানো কাকের ছানার মতো লিভিংস্টোনের ছবি হয়েছে, আমাদের চীনে স্ট্যানলিরা অন্তত এর মুখদর্শন করতে চাইবে না। আমি গেলাম। দু প্রিজ আউট।

    বস বেরিয়ে গেলেন। তাঁর তীক্ষ্ণ গলা শুনে আমার মুখ কুঁচকে উঠল। কিন্তু উত্তর দেয়ার মতো আর এনার্জি নেই আমার। অবশ্য বস কারো উত্তর শোনার জন্য অপেক্ষাও করেন না কখনও। দোষ যেন আমারই। আর এক ঢোক জল খেলাম। কানের মধ্যে আবার বিপবিপ। কে আবার নিউরাল ওয়াইফাই দিয়ে কানেক্ট করতে চাইছে? না, লিজেট না। ধুর—মরুক গে যাক, এখন ধরব না।

    ‘আপনার লেটেস্ট সি-২০ মডেল নাকি?’

    প্রশ্নটা করেছে স্মার্ট খাকি সাফারি স্যুট পরা একজন লোক। গায়ে চাপড়া করে ফ্যাক্টর ১০০ সান ব্লক ক্রিম লাগানোর পরও তার চামড়া ঝলসে লাল হয়ে গিয়েছে। উচ্চারণ মোটামুটি গোটা ইয়োরোপের স্ট্যান্ডার্ড উচ্চারণ। ঘামে ভেজা পিথ হেলমেটের নিচ থেকে উঁকি মারা কয়েকগাছি পাতলা কাঁচাপাকা চুল থেকে চুলের আসল রঙ বোঝা যায় না। দাঁত বের করে হেসে লোকটা আবার বলল, ‘আমি লেটেস্ট সি-২০ ইনস্টল করে নিয়েছি। পুরোটা চিন্তাভাবনা দিয়েই নিয়ন্ত্রণ করা যায়, বুঝলেন—মুখে বলে কম্যান্ড দেয়ার দরকারই পড়ে না। ’

    ‘আমার পুরোনো সি-১২,’ কথাটা বলেই আমার চোখ চলে গেল লোকটার পিছনে খাড়া পাহাড় আর নীচে পূর্বদিকে আদিগন্ত ছড়িয়ে থাকা সবুজ ভুট্টাক্ষেতের দিকে। ক্ষেতগুলো যেন সবুজ নদীখাত আর জঙ্গলকে গলা টিপে ধরতে চাইছে। এই জায়গাটা পরে এডিট করে দেব না হয়। এখন এই লোকটার সামনে মুখে নির্দেশ দিয়ে শুট এডিট করতে একটু কেমন কেমন যেন লাগছে। আর লোকটাও বকর-বকর করে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই! মুখ থেকে বিয়ার আর মাংসের গন্ধ বেরোচ্ছে। আমার মনে হল লোকটা যে প্রাণীটার মাংস খেয়েছে সেটাকে নিশ্চয় আগে ওষুধ দিয়ে বুঁদ করে তারপর শিকার করেছিল। সাফারিতে তো এ জিনিসের ব্যবস্থা আকছারই হচ্ছে।

    “আমার রিগ চীনের লেটেস্ট ওয়েব ডিজাইনগুলোর সঙ্গে কম্প্যাটিব্ল, বুঝলেন? আর তার সঙ্গে চোখের নার্ভে সিক্স ফ্যাক্টর জুম ফাউ।”

    “বাঃ! দারুণ। আমারটা ওই মোটামুটি কোনো রকমে চলে যায়।”

    ঠিক তখনই আমি দেখতে পেলাম ওদের। জঙ্গলের গাছপালার একদম ধারে—যেন এগিয়ে আসা ইলেক্ট্রিক তারের হাত থেকে বাঁচতেই ওই ওখানে মুখ লুকিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে ওরা। জানি বস এসব চায় না—বস মেরে ফেলবে আমাকে এসব ‘ছাইপাঁশের’ ভিডিও তুলতে দেখলে—কিন্তু এত বড়ো হাতিদের সমাধিস্থান আমি জীবনে কোনোদিন দেখিনি। জ্যান্ত হাতিই যে শেষ কবে দেখা গিয়েছে তাই-ই কেউ মনে করতে পারে না। ভেঙে ফেলা বৃদ্ধ জাহাজের পাটাতন আর মাস্তুলের মতো ছড়িয়ে আছে বিপুল হাড়ের স্তূপ। সাদা অর্ধচন্দ্রাকৃতি হাড়গুলো অনেকটা জায়গা জুড়ে পড়ে আছে। মহান মৃত্যুকে হাতির যোগ্য শান্ত রাজকীয়তায় আবাহন করে আনার এর চেয়ে ভালো জায়গা বোধ হয় আর কিছু হতে পারে না।

    দু প্রিজ তো নড়েচড়ে বেড়ানো ‘জ্যান্ত শিকার’ ছাড়া ভিডিও নেবে না—কিন্তু আমার অত বাছবিচার করলে চলবে না।

    আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘুরে তাকিয়ে লোকটা বলল, “আরে ধুর! আমি ভাবলাম আপনি সত্যিকারের জ্যান্ত কোনো জন্তুজানোয়ার দেখতে পেলেন বুঝি। একটু একঘেয়েমি কাটত তাহলে। যা বলছিলাম—জানেন কি, সি-২০ অ্যামিগডালা-হিপ্পোক্যাম্পাসের সঙ্গে এমন ওয়্যারিং করা থাকে যে আপনার সব অনুভূতির তিরানব্বই পার্সেন্ট পর্যন্ত আবার নতুন করে মগজের মধ্যে ফিরে দেখতে পারবেন আপনি। হুঁ হুঁ বাবা!”

    “বটে?”

    গত কয়েক বছর ধরে আমার মনে হয় যেন আমার নিজেরই সব অনুভূতিগুলো গলে গলে খসে পড়ে যাচ্ছে। আমার সঙ্গে রয়ে গিয়েছে শুধু তাদের পড়ে থাকা খোসাগুলো। সেই আমাদের পুরোনো ভিডিও ক্লিপিংগুলো—তাজা কাঁচা আবেগে ভরপুর সেই ছবিগুলো, তারুণ্যের চনমনে রক্তে দৌড়াচ্ছে যাদের শিরা বেয়ে —সেগুলো আবার বের করে খুলে বসলে হয় না একদিন? গত বিশ বছর হল বোধ হয় আমি আর লিজ আমাদের পুরোনো হ্যান্ড-হেল্ড ভিডিওগুলো দেখি না… আমি, লিজ আর মার্ক… মার্ক অ্যাকাউন্টেন্সির চাকরি নিয়ে ওজ-এ চলে গিয়েছে সেও তো আজ তিন বছর হয়ে গেল… তিন বছর… তার আগে সেই হাইজ্যাক যাতে মার্কের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটা গেল। মার্ক হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে কেবল ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছিল অক্ষতদেহে বেঁচে ফেরার জন্য। তিন বছর… এই তিন বছরে বাড়ির বাইরে পায়ে হেঁটে বেড়াতে বললে আমার প্রাণে বিকট ভয় উপস্থিত হয়, কিন্তু কাজের সুবাদে দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়ানোয় কোনো ভয় হয় না… অদ্ভুত ব্যাপার, তাই না? আর দু প্রিজ নিজের খরচে আমার মাথায় সিরিল নামের রিগটা বসিয়ে দিয়েছে সে তো এই সবে বছরদুয়েক হল। সিরিলের কাজ আমার সব চেয়ে নতুন স্মৃতিগুলোকে ঝকঝকে তকতকে করে রাখা। আর, ইন্সটলেশনের পর থেকেই আমার এই অনন্ত জলতেষ্টা। রিগ বসানোর নিউরোসার্জারি করার সময়ে ওরা আমার জলতেষ্টার নার্ভটায় নিশ্চয় কিছু গড়বড় করে দিয়েছে। কিন্তু কী করব? এখন সার্জনরা সে কথা ..মানতে ..চায় না। আমারও বলার কিছু নেই। বারো পাতা লম্বা ইনশিওরেন্সের কাগজ কে পড়ে?

    লোকটা আবার মুখ খুলল। তার নাকের ডগায় ঘাম টলমল করছে। বোঝাই যাচ্ছে স্মার্ট স্যুট তার দেহের গরম কমানোর নিদারুণ চেষ্টা করে যাচ্ছে, কিন্তু পারছে না। ফিক করে হেসে ফেললাম দৃশ্যটা দেখে। তারপর কিছু না বলে—বিদায়টুকুও না জানিয়ে—মুখ ঘুরিয়ে চলে এলাম। পুরোনো অনুভূতিগুলোকে খসে পড়া পাতার মতো শুকিয়ে যাওয়ার জন্য একা ফেলে যাওয়াই ভালো। বিড়বিড় করে বললাম—‘কম্যান্ড—কাট!’

    ওর রিগটা তাহলে আমার চেয়ে ভালো। আমার চেয়ে বড়ো। বাঃ! দারুণ! তাতে পৃথিবী কিনে নিয়েছে একেবারে! লোকটা আফ্রিকান তো নয়। ফ্যান্সি টুরিস্ট কোথাকার! গায়ের চামড়ার উপর যে দেশের রোদটাও সহ্য করতে পারে না সেখানে এসেছে চকচকে জামা পরে কেত মারতে! হালফ্যাশনের ইমপ্ল্যান্ট বসিয়ে ফুটানি মারছে! পয়সা দেখাচ্ছে শালা!… আর আমি কী করছি?

    চোখ বন্ধ করলাম। দু’চোখের তলাতেই লাল আলোর বিন্দু। বেশ। সিরিল চোখের উপর দিয়ে কী সব ব্লগ-টগ গড়িয়ে দিল, পার্কিং লটের দিকে হেঁটে যেতে যেতে আমি খেয়ালও করলাম না। কার-পার্কিং, পাবলিক টয়লেট, এয়ারপোর্ট হোটেল, আর তারপর কাল সকালের ফ্লাইটে বাড়ি।

    বাড়ি… আর লিজ…

    ***

    বাড়ি ফেরার পথে এই শেষ অংশটাই সব থেকে লম্বা আর ক্লান্তিকর, তাই গাড়ি থেকে যতখানি পারা যায় স্পিড আদায় করে নিতে হয় এই অংশটুকুতেই। রাস্তার ধারের ঢেউ খেলানো করোগেটেড শিটের চালের পাশের রাস্তা বেয়ে অনন্ত সময় বয়ে চলেছে। ডানদিকের পথ দিয়ে ডিংগানে স্টেডিয়ামের মুখের দিকে হুড়হুড় করে চলেছে জনস্রোত। বেশির ভাগই পুরুষ। দিনের কাজে বেরোনোর সময় ফ্লাইওভারের নীচে জটলা পাকাচ্ছে—চলন্ত বাক্কি কিংবা ট্রাক যদি তুলে নিয়ে যায় তবে খানিকটা সময় বাঁচে। একটা বুড়ো লোক ফ্যাকাশে হাতের পাতা খুলে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরল—কিন্তু আমার এসব ভিক্ষেটিক্ষে আর পরনির্ভরশীলতা কোনোকালে পোষায় না। এটা আফ্রিকা বাবা! গাড়ির দরজা এঁটে, জানালা তুলে দিয়ে বসে রইলাম।

    রাস্তার ধারে পাহাড় জমি খরখরে শুকনো খয়েরি। হাড়জিরজিরে গোরুছাগলের দল ঘাস খেয়ে খেয়ে ধুলো ছাড়া আর কিছু রাখেনি। চরে বেড়ানো পশুগুলোর উপর নজরদারী করতে থাকা একই রকম হাড্ডিসার ছেলেগুলোর হাতে লাঠি। পিঠের সঙ্গে বাঁধা চীনে পিএলএ টি-৭৪ উঁচিয়ে রেখেছে বটে, কিন্তু ওগুলো ফাটলে ছেলেগুলোই উড়ে যাবে।

    উঁহু, বৃষ্টির নামগন্ধও নেই এদিকে—পোড়া কপাল রে আমার! লিজেট, আমাদের কপাল তো তবু কিছুটা ভালো, বুঝলে?—একটু জল অন্তত লুকিয়ে জমিয়ে রাখতে পেরেছি। আগুন দরে বিকোবে প্রাইভেট মালিকানার জল—তার সামনে অন্তত কিছুদিন তো ওই জমানো জল দিয়ে কাটানো যাবে। স্রোতের মুখে খড়কুটো অন্তত…

    কাউন্সিল ইলেক্ট্রিক কম্পানির পাইলন আর ট্রান্সফর্মার থেকে বিদ্যুৎবাহী তারের ঝাঁক মাথার উপর দিয়ে গিয়ে ঢুকেছে রাস্তার ধারে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কুঁড়েঘরগুলোয়। সবই চুরি করা বিদ্যুৎ, তারগুলো মাথার উপর জট পাকিয়ে জঙ্গল বানিয়ে রেখেছে। রোজ সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে কম্পানির লোকেরা তারগুলো কেটে দেয়, আবার সূর্য ওঠা মাত্রই ম্যাজিকের মতো তারগুলো নিজের জায়গায় ফিরে আসে। মজার ব্যাপার বটে! কোনোই মাথামুণ্ডু নেই! ক্ষিদের জ্বালায় ভুঁয়ে-মুয়ে হয়ে যাওয়া একদল লোক—তাদের বিদ্যুতের টোপ গেঁথে গেঁথে তুলছে, আর তারা বুঝতেও পারছে না? ওরে গাড়লের দল, এদিকে বিনেপয়সায় এত এত রোদের আলো মেলে, সেটা তোদের নজরে পড়ে না? কোনো মানে হয়?

    দু’পাশের আখের ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে এবড়োখেবড়ো রাস্তা চলে গিয়েছে। অটো-মোডে দিয়ে রাখা গাড়ি নাচতে নাচতে চলেছে আমাদের বাড়ির দিকে। ‘কোপ্স ফলি’ নামের ফার্মহাউসটা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে ছিল, এককালে আমাদের হাতে একটু পয়সা জমতেই ওটা কিনে ফেলেছিলাম… ‘সাধারণ গ্রামের বুকে ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড়’-এর লোভে… হুঁ!

    চোখ বন্ধ করে আবার মেসেজ পাঠালাম— একপ্রকার কাতর আকূতিই বলা চলে—

    <লিজেট! আমি বাড়ি ফিরে এসেছি!>

    কোনো উত্তর নেই। বাঁ চোখের নীচে লাল আলোর বিন্দুটা দপদপ করে ..জ্বলতে.. জ্বলতে.. মাথা ..ধরিয়ে ..দিচ্ছে। ..তারপর হঠাৎ করেই লাল

    আলোটা সবুজ হয়ে গেল।

    <এতক্ষণে সময় হল তাহলে, মিস্টার গ্রাহাম মেসন? হতচ্ছাড়া কোথাকার!>

    হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এখনও রেগে আছে আমার উপর তাহলে। যাক গে, নাই মামার চেয়ে কানা মামা তো ভালো।

    গাড়ির দেয়া পাসওয়ার্ড পৌঁছাতেই কালো ইলেক্ট্রিক গেট দুপাশে হাট করে খুলে গেল।

    লিজ বুকের উপর আড়াআড়ি হাত রেখে কটমট করে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। পায়ে গামবুট, পরনে ঢোলা মলিন জামা, সর্বাঙ্গে ময়লা লেগে আছে। পাশে এক ঠেলাগাড়ি ভর্তি গাজর। বেশ ‘সুস্বাদু দেখতে’ গাজরগুলো, নির্ঘাৎ ওপাশের টাউনশিপের কো-অপারেটিভে বেচতে যাচ্ছে। যেদিন থেকে আমরা এখানে এসেছি সেই থেকেই ও সবজি ফলাতে শুরু করেছে আর কো-অপে যাচ্ছে। গালে গাল ঠেকিয়ে যেটা হল আমাদের সেটাকে আর যাই হোক চুমু বলা চলে না। ওর চোখে চোখ রাখতে অস্বস্তি হচ্ছিল আমার, বুকের ভিতরে কেমন যেন মিশ্র একটা অনুভূতি কাজ করছিল। লিজের লম্বাচওড়া চেহারা, রং ঘন কালো। মুখের উপর ঝামড়ে এসে পড়া কোঁকড়া চুলের অবাধ্যতা লাল অ্যালিস ব্যান্ড দিয়ে শক্ত করে শাসন করে রেখেছে। ইদানীং চুল পাকছে লিজের—তাতে ওর ভ্রূক্ষেপ নেই, বরং লাল ব্যান্ড দিয়ে বেঁধে যেন রুপোলি রেখাগুলোর রূপ আরো খোলতাই করে নিয়েছে। বাদামি চোখদুটো কী সুন্দর! আমার উপর রেগে থাকলেও একবার আড়চোখে ওর দিকে না তাকিয়ে পারলাম না। কিন্তু রাগ… না তো… রাগ যেন অনেকটা পড়ে এসেছে। তার বদলে… হ্যাঁ, এ তো রাগ নয়, এ যে উদ্বেগের চাহনি!

    লিজি ভয় পাচ্ছে! এ যে অবিশ্বাস্য! আমি না থাকলে ও একা একাই কো-অপে যাতায়াত করে, পথঘাটের বিপদ-আপদ সম্পর্কে আমি হাজার বারণ করলেও কান পাতে না—এহেন ডাকাবুকো লিজি ভয় পাবে? নাহ্, আমারই ভুল হচ্ছে। লিজি নার্ভাস হতে পারে না—হতেই পারে না।

    লিজি ঠেলাগাড়ি ঘুরিয়ে গাজরগুলো শেডের মধ্যে রেখে আসতে গেল। আমি ভিতরের দিকে পা বাড়ালাম। ঘরের শেষ প্রান্তে ইয়া বড়ো এ.জি. (‘অলমোস্ট গ্রিন’) এয়ারকন্ডিশনারটা থাকা সত্ত্বেও বসার ঘর যেন গরমে তেতে কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে আছে। ঘরে আমার উপস্থিতি টের পেতেই মেশিনটা ‘ক্লিক’ শব্দ করে চালু হয়ে গিয়ে গোঁগোঁ করে চলতে থাকল। ঘরের এক কোণে ওয়েবপোর্টালখানা সন্তর্পণে মুখ গুঁজে পড়ে আছে—ঠিক যেমনটি ও চেয়েছিল যখন ওটা আমি ওরই সুবিধে হবে বলে লাগিয়েছিলাম—কিন্তু কন্ট্রোলের আলোগুলো টকটকে লাল হয়ে জ্বলছে। এমনটাই জ্বলে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত আর লক্ড হয়ে পড়ে থাকলে। কিন্তু আমি বাড়ি ঢোকার ঠিক আগেই তো ও আমাকে একটা মেসেজ পাঠিয়েছিল, তাই একটা শৌখিন ধাঁচের স্ক্রিন সেভার স্ক্রিনের উপর গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে খেলে বেড়াচ্ছে। কিচেনের দিকে যেতে যেতে ফুলো-ফুলো গুঁড়ো-গুঁড়ো পার্টিক্ল দিয়ে তৈরি অবয়বটার পুরো চেহারাটা আমি ধরতে পারলাম না। আমাকে এখন আমাদের দুজনের জন্য চিজ স্যান্ডউইচ বানাতে হবে। আর একটু জল খেতে হবে।

    ফিরে এসে দেখি ও চেয়ারে বসে আছে। ‘থ্যাংকস’ বলে আমার হাত থেকে প্লেটটা নিল, কিন্তু নিয়ে পাশের ছোটো টেবিলে রেখে দিল—যেন ক্ষিদে নেই ওর। আমি উল্টোদিকের কাউচটায় বসলাম। লিজ চোখ নামিয়ে রেখেছে মাটির দিকে।

    ওফ্, ভগবান! আবার সেই এক ঘ্যানঘ্যানানি-ঝগড়াঝাঁটি শুরু হবে নাকি? যাওয়ার আগেও সেই এক ক্যালরব্যালর চলছিল। ‘কাছেপিঠের কাজ নিলে কী হয়? এত দূরে যাওয়ার কী আছে? কোনোকালে তো দু প্রিজ-এর মুখের উপর একটাও কথা বলতে পারো না…’ হ্যানা ত্যানা!

    আমারও হঠাৎ যেন ক্ষিদেটা চলে গেল। চিজ স্যান্ডউইচের প্লেট নামিয়ে রেখে আড়ষ্টতার জমাটবাঁধা বরফ ভাঙার জন্যই বললাম, “বৃষ্টি না হলেও এবারে সবজিপাতির ফলন বেশ ভালোই হয়েছে, কী বলো?”

    মুখ তুলে আমার দিকে চেয়ে হাসল ও। বলল, “হ্যাঁ, আমাদের সোলার কুয়ো-পাম্পটা খুব কাজে দিয়েছে। তবে আমি সবসময় খেয়াল রেখেছি জল যেন বেশি নেমে না যায়, কুয়ো যেন সব সময় অন্তত পৌনে-ভর্তি থাকে।”

    ওকে একটু রিল্যাক্সড হতে দেখে আমার মুখেও হাসি ফুটল। বললাম, ‘ভাগ্যিস তুমি সার্ভেয়রকে ডেকেছিলে। ওটা বাঁ*  আশীর্বাদ ছাড়া আর কিছুই না। সত্যি লিজি, তোমার ইনট্যুইশনের মাইরি জবাব নেই!’

    মুখ কুঁচকে উঠে দাঁড়িয়ে ত্বরিত-পায়ে ওয়েব পোর্টালের কাছে চলে গেল লিজি। যাহ্ বাবা, কী আবার ভুলভালো বলে ফেললাম! ওহ্, ওই গালাগালি নিশ্চয়… লিজি খিস্তিখামারি একদম পছন্দ করে না। নিত্যদিন চার্চে গেলে যা হয় আর কী। ও কোনোদিন ‘হতচ্ছাড়া’-র উপরে উঠতেই পারেনি, তাও সেটাও সবে মাত্র গত কয়েকবছরের ব্যাপার।

    লিজি যখন ঘুরে দাঁড়াল তখন দেখি ওর দুচোখ জলে ভরে উঠেছে। পাতলা কম্পিউটার স্ক্রিনের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াতেই ওর আঙুলের চাপে স্ক্রিনে ঘুরে ঘুরে ভাসতে থাকা অবয়বটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। একটা ছবি। খালি পা, মলিন ছেঁড়াখোঁড়া হলুদ রঙের জামা পরা একটা কালো বাচ্চা মেয়ে মুখ তুলে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। যন্ত্রণায় মেয়েটার মুখ বেঁকে গিয়েছে। ছবিটা… ছবিটা আমাদের গেটে লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরার রিল থেকে ক্রপ করে নেওয়া মনে হচ্ছে…

    কাঁপা গলায় লিজেট বলল, “ওর নাম থান্ডি। তুমি চলে যাওয়ার পর কাল সকালে ও এসেছিল… গলা শুকিয়ে গিয়েছিল ওর। জিভ পুরু হয়ে আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিল, ও কিছু গিলতেও পারছিল না। তেষ্টায় ও মরে যাচ্ছিল গ্রাহাম… মরে যাচ্ছিল… হা ঈশ্বর! মাত্র সাত বছর বয়স, ওইটুকু ছোট্ট-ছোট্ট হাত-পা—মরে যাচ্ছিল ও! পরিস্থিতি যে এতটা খারাপ হয়ে পড়েছে আমি বুঝতেই পারিনি… আমাকে ওর মুখ ফাঁক করে আস্তে আস্তে জল খাইয়ে দিতে হল… উফ্ফ্!”

    উঠে দাঁড়ালাম আমি।

    “কলের জল দিলে না ফ্রিজের জল?”

    “না গ্রাহাম। আমি ওকে আমাদের জমিয়ে রাখা জল থেকে খেতে দিয়েছি। তারপর ওদের গোষ্ঠীপ্রধানকে ডেকে পাঠিয়ে বললাম মেয়েটার মা’কে খবর দিতে, আর… আর… জলের কথাটাও ওদের সবাইকে জানাতে। ওরা… ওরা অনেকজন আছে গ্রাহাম। ওই হতচ্ছাড়া রাস্তাটার ওধারেই… অনেক, অনেকজন। গোষ্ঠীপ্রধান দুমিসানেকে বলেছি যে আমাদের পৌনে-ভর্তি কুয়োর বাকি জলটুকু ওরা ব্যবহার করতে পারে।”

    “অ্যাঁ! কী? না না না না! লিজি তুমি… তুমি করেছটা কী? ওটা… ওটা আমাদের জল…! তুমি আমাকে একবার জিজ্ঞাসা করতে পারলে না? আজ তিন বছর ধরে আমার মাথায় তুমি অবাধে ঢুকতে পারো—ফ্রি অ্যাক্সেস দিয়ে রাখা আছে। ও হ্যাঁ, তুমি আমার কল ধরছিলে না কেন? ঘুরিয়ে তো কলও করতে পারতে। ঠিক আছ কি না সেটা তো অন্তত জানতে পারতাম!”

    “অবাধ! ফ্রি অ্যাক্সেস! ধুৎ! আমি খালি সেটুকুই শুনতে পাই যেটুকু তুমি আমাকে শোনাতে চাও। আর তোমাকে বললে তুমি কী বলতে আর কী করতে, মিস্টার গ্রাহাম মেসন?”

    লিজ উঠে দাঁড়িয়ে কঠোর চোখে আমার দিকে তাকাল। এতক্ষণ পরে এইবার যেন সে আসল নিজেকে খুঁজে পেয়েছে। মুহূর্তখানেক ইতস্তত করে বললাম, “আমি হলে ওকে ফ্রিজের জল দিতাম আর তোমাকে মনে করিয়ে দিতাম যে আমাদের কুয়োর কথাটা যেন কাকপক্ষীতেও টের না পায়। আমাদের নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদেই ওই কুয়োর ব্যাপারে মুখে কুলুপ এঁটে থাকা উচিৎ, জানো না তুমি? নইলে কোয়াজুলু-নাটালের প্রতিটি জল-ডাকাত আর ৎসত্সির১ নিশানা হয়ে যাব আমরা!”

    “এই—এই যে! দেখছ তো কেন বলিনি তোমায়? জানতাম তুমি ঠিক এইটাই বলবে আর আমাদের ঝগড়া হবে। তোমার মুখ না দেখে ঝগড়া করতে পারি না আমি! তোমাকে কিচ্ছু জানাইনি, তুমি উদ্বেগে হাঁসফাঁস করছিলে—আমি দুঃখিত তার জন্য। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তটা একা আমাকেই নিতে হত। দুমিসানে ভালো লোক, কাউকে কিচ্ছু বলবে না… আমার চোখের সামনে রাস্তার উপর বাচ্চাগুলো একফোঁটা জল না পেয়ে মরে যাবে আর আমি বসে বসে তাই দেখব বাঁ—!”

    চিৎকার করতে করতে লিজি হঠাৎ সশব্দে হাতের তালু দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরল। তারপর হাত নামিয়ে বড়ো করে নিঃশ্বাস টেনে দাঁতে দাঁত চেপে বলা শেষ করল—“না—কক্ষনো না!”

    লিজি কোনো দিনও গালাগালি দেয় না, আর আফ্রিকান্স বলতে শুরু করে একমাত্র একেবারে ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেলে তবেই। ও ঝুঁকে পড়ে নিজের শরীরের দুপাশ চেপে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করেছে। পিছনে হলুদ জামা পরা মেয়েটা স্ক্রিনের উপর ঘুরে ঘুরে নেচেই চলেছে। লিজি নিজেও তো একটা মেয়েই চেয়েছিল…

    আমার রাগ চলে গিয়ে তার জায়গা নিচ্ছিল অসহায়তা। খানিকক্ষণ ইতস্তত করে আমি ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। ওকে বুঝিয়েসুঝিয়ে স্ক্রিনের দিকে ঘুরিয়ে দিতে হবে। লাভঅ্যান্ডপিস ডটকম থেকে মন-ভালো-করা বেশ কয়েকটা ইমোটি-মেসেজ পাঠিয়ে দিলে হয় না? তাহলে মনে হয় ও শান্ত হবে।

    কিন্তু.. .. ওর চোখে.. চোখ.. পড়তেই.. আমি জমে গেলাম। কালো, মোহময়ী, কোণে একটু ভাঁজ-পড়া একজোড়া ভয়ঙ্কর হিংস্র চোখ। আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয় জানিয়ে দিল যে এই মুহূর্তে যদি আমি ওর গায়ে হাত দিয়ে ওকে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার এতটুকুও চেষ্টা করি তবে ও চিৎকার করে আমাকে আঁচড়ে-কামড়ে লাথি মেরে দরজার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেব। ওর চোখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, যে জায়গায় ও পৌঁছেছে সেখান থেকে আর ও ফিরবে না। আমার হাতজোড়া থতমত খেয়ে অসহায় হয়ে শরীরের দু’পাশে ঝুলতে লাগল, আর ওর গনগনে আগুনের মতো চোখ দিয়ে দরদর করে ঝরে পড়তে লাগল অশ্রুজল।

    ধুত্তেরি! এখন কী করব আমি? খানিক কিন্তু-কিন্তু করে দু হাত বাড়িয়ে ওর কাঁপতে থাকা আড়ষ্ট শরীরটা জাপটে জড়িয়ে ধরা ছাড়া আমার আর কিছু করার ছিল না।

    ওর হাতগুলো কঠিন হয়ে উঠে এক মুহূর্ত যেন আমাকে বাধা দিতে গেল, আমাকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইল। পরক্ষণেই যেন হাল ছেড়ে দিল ও, আর ওর গলার মধ্যে থেকে উঠে এল এতক্ষণ ধরে দলা পাকানো কান্নার আওয়াজ। ওর ঝুপসি কালো চুল আমার চোখমুখময় ছড়িয়ে পড়ছিল, সুড়সুড়ি দিচ্ছিল। হঠাৎ কী জানি কোনো অজানা আবেগে আমারও চোখদুটো জ্বালা করতে শুরু করে দিল। ওর মাথা থেকে ভেসে আসছিল নারকেলের সুবাস… আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল সেই দিনগুলোর কথা যখন প্রথম-প্রথম যখন আমরা দেখা করতে যেতাম—সে বোধ হয় আজ প্রায় বছর ত্রিশেক আগের কথা… শালা! আমরা শেষ কবে একে অপরকে এরকম জড়িয়ে ধরেছি, হ্যাঁ? মনেই তো পড়ে না!

    হ্যাঁ, মনে পড়েছে। মার্ক চলে যাওয়ার পর থেকে আর ধরিনি।

    আমার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আমার হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে লিজি বলল, “এসো।”

    তারপর আমাকে সামনে টেনে নিল ও। আমার জামার হাতা ওর মুখে লেগে থাকা জল মুছিয়ে দিতে লাগল।

    অ্যাঁ!… ওহ্…!! আমি তো ভাবলাম ও বুঝি আমাকে সবজিবাগানের ফসল দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে…!

    হে ভগবান! আমি তো ভুলতেই বসেছিলাম কী প্রচণ্ড, বিপুল, সব ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া নারী আমার স্ত্রী!

    আর.. সব ..শেষে ..দেখলাম.. আমার ভয়টাও একেবারেই অমূলক

    ছিল। সীমাহীন জলতেষ্টা সত্ত্বেও আমি শুকিয়ে যাইনি।

    ***

    আমি যখন উঠলাম তখনও ও ঘুমোচ্ছে।

    হাত-পা ছড়িয়ে চিৎপাত হয়ে শুয়ে আছে। ইয়াবড়ো হলুদ বালিশের উপর বিস্রস্ত চুলের ঢাল ছড়িয়ে পড়েছে। অল্প অল্প নাক ডাকার আওয়াজও ভেসে আসছে। শান্ত, শিথিল, নিশ্চিন্ত আরামের একটি নিটোল প্রতিমূর্তি। ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার মনের ভিতরে হঠাৎ কেমন যেন একটা ব্যথা জমাট বাঁধতে লাগল। এক অদ্ভুত অপরাধবোধ গ্রাস করে ফেলতে লাগল আমাকে। বড়ো অদ্ভুত, বুঝলেন? এতদিন আমরা একসঙ্গে রয়েছি, কই এমন তো কখনও হয়নি! আমি চুপচাপ বিছানা ছেড়ে শার্ট আর ট্রাউজার্স গলিয়ে নিয়ে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম।

    পাল্লায় ঝিলিক খেলে গিয়ে দরজাটা দুলতে লাগল। দরজার স্বয়ংক্রিয় রক্ষাব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় হতে হতে রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস জল খেয়ে এলে কেমন হয়? না, একটুখানি সময় জল না খেয়ে থাকলে কেউ কখনও মরে যায় না। আমি দরজার পিছনে লাগানো অস্ত্রের তাকে ভালো করে চোখ বুলিয়ে একটা টেসার-রড তুলে নিয়ে কোমরের বেল্টে গুঁজে নিলাম। একটা মৃদু ‘ক্লিক’ শব্দের সঙ্গে বাইরের দেয়ালের বড়ো গেটটা খুলে গেল।

    এই শুকনো গরম মাঝ-বিকেলে গত গ্রীষ্মের ঘাম-প্যাচপ্যাচে গুমোট আর্দ্রতার চিহ্নমাত্রও নেই। মন থেকে ভয় কাটানোর জন্য দশটা লম্বা শ্বাস নিয়ে থপথপে আড়ষ্ট পায়ে গেটের বাইরে বেরোলাম। আবার ‘ক্লিক’ শব্দ—এবারে আমার পিছনে গেটটা বন্ধ হবার নির্দেশ। ঘড়ঘড় শব্দ করে গেট বন্ধ হতেই আমার নজরে পড়ল রাস্তার ওপারে ঝাঁকড়া ওকগাছটার তলায় দাঁড়িয়ে থাকা স্পোর্টস কারটা। গাছের ছায়ার জন্য চালককে দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু এখন আর গেট খোলা চলবে না—খুললে আমাদের বাড়ি আর লিজির নিরাপত্তা বলে কিছুই থাকবে না, পরিষ্কার বুঝতে পারছি। আমি নিঃশব্দ বেড়াল-পায়ে পিছু হেঁটে গিয়ে গেটের গায়ে হেলান দিয়ে পকেটের মধ্যে রাখা হ্যান্ড প্যানেলটা যত জোরে পারি চেপে ধরলাম। কাঠের বেড়ার মধ্যে দিয়ে চলা বিদ্যুৎকে বন্ধ করতে হবে, নইলে বেড়া টপকে বাড়িতে ঢুকতে পারব না। আর একই সঙ্গে বেল্ট থেকে হাতে তুলে আনলাম টেসার-রডখানা। ইস্, কেন যে বন্দুকটা নিয়ে এলাম না!

    গাড়ির দরজা খুলে একটি মেয়ে বেরিয়ে এসে হাতদুটি কোমরে রেখে দাঁড়াল। হাতদুটো খালি। মেয়েটির পরনে শ্রমিকদের মতো নীল ওভারঅল, কাঁধে ঝোলানো ডাফ্লব্যাগ, মাথার চুল একেবারে বাটিছাঁট দিয়ে খুলির সঙ্গে লেপ্টে কাটা।

    “কুন্জানি২, মিস্টার মেসন। আপনার জলের ব্যাপারে এসেছি।”

    বাহ্, এতটুকুও সময় নষ্ট করা নেই! দারুণ! দুর্দান্ত!

    “ন্গিয়াফিলা, উন্জানি ওয়েনা?”৩ টেসারখানা কোমরে গুঁজতে গুঁজতে আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

    “ভালো আছি,” মেয়েটি বলল বটে, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে একটা বিচিত্র হাসি ফুটে উঠল যেন। মেয়েটা কি এবার আমার ভাঙা-ভাঙা ইসিজুলু ভাষার জ্ঞান পরীক্ষা করতে নামবে নাকি? নাহ্, আমাকে আশ্বস্ত করে মেয়েটা পরের কথাটা ইংরেজিতেই বলল।

    “আমি বুসিসিওয়ে এম্চুনু। পেশায় হাইড্রোজিওলজিস্ট, ফ্রিফ্লো কর্পোরেশনে চাকরি করি। কিন্তু পেশাদার কাজের বাইরে নিজের গোষ্ঠীর জন্যও কিছু কাজ করে থাকি। একেবারেই গোপনে অবশ্য—বুঝতেই পারছেন।”

    মেয়েটার সঙ্গে হাত মেলালাম। আফ্রিকান মতে করমর্দন—হাতের তালুতে তালু ঠেকানো, তারপর বুড়ো আঙুলে বুড়ো আঙুল জড়ানো, তারপর আবার হাতের তালু। উরেব্বাস, মেয়েটার পাঞ্জার জোর আছে তো বেশ!

    “আচ্ছা। আমি গ্রাহাম মেসন। আপনার সঙ্গে আলাপ করে খুব ভালো লাগল। হ্যাঁ, বুঝতে পারছি।”

    “আমি এসেছি আপনার জমিতে জল পরীক্ষা করতে। সাদা চামড়ার লোকেরা আসার আগে এই সমস্ত জমিই আমাদের ছিল, জানেন নিশ্চয়?”

    “এটা কী?… চাপা হুমকি নাকি?”

    মেয়েটা চাপা শব্দ করে হেসে উঠল।

    “ঘাবড়াবেন না মিস্টার মেসন। আমরা আমাজুলুরা হুমকি ‘চাপা’ রেখে দিই না। কথাটা ঐতিহাসিক ভাবে সত্যি, তাই বললাম। আপনার স্ত্রী আমাদের খেয়াল রাখেন তাই আমরাও আপনার খেয়াল রাখতে এলাম।”

    “হ্যালো! আপনি কে?”

    লিজেট গেটের ওপার থেকে মুখ বাড়িয়েছে। তার পরনে আবার সেই ঢলঢলে ট্র্যাক প্যান্ট আর শার্ট। বুসিসিওয়ে গেটের দিকে হেঁটে যেতে যেতে বলল, “আমি গোষ্ঠীপ্রধান দুমিসানের হয়ে জলের ব্যাপারটা দেখাশোনা করি মিজ ব্যাসন। আমাকে বুসিসিওয়ে বলেই ডাকবেন।”

    গেটের উপর দিয়ে তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে লিজ বলল, “আপনার সঙ্গে দেখা করে ভালো লাগল বুসিসিওয়ে। আমি লিজেট।”

    আমার হাত থেকে কন্ট্রোল প্যানেলটা নিয়ে লিজ হাসল। হড়বড় করে কী সব বলে গেল—মনে হল খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে ইসিজুলু ভাষায় বুসিসিওয়েকে স্বাগত জানাচ্ছে। মেয়েটাও একই রকম উচ্ছ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিচ্ছে দেখলাম।

    বুঝলাম দুটিতে দুর্দান্ত পটবে—খোড়ো চালের বাড়ি আর আগুন যেমন। বললাম, “আমি একটু হেঁটে আসছি।”

    গেট খুলে যাচ্ছে। লিজ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “সাবধানে যেও।”

    সাবধান? হ্যাঁ, জানি, সাবধান হতেই হবে। এই পথেই তো মার্কের উপর আক্রমণ হয়েছিল। ওর মুখ ছিঁড়ে ফালা ফালা হয়ে গিয়েছিল। কতবার নিজের মাথার মধ্যে সেই ফালা ফালা হয়ে যাওয়া মুখের ছবি ফিরিয়ে ফিরিয়ে চালিয়ে দেখেছি আমি। কিন্তু আজ যে আমাকে এটা করতেই হবে… যদি আদৌ পারি করতে…

    পথ বেশি লম্বা নয়। কিন্তু আমার পা দুটো যেন ভয়ের ভারে আর নড়তেই চাইছে না। দু’পাশে আখের খেতে বল্লমের ফলার মতো উঁচিয়ে রয়েছে গাছগুলো। ভয় হয়, এই বুঝি সেগুলোর আড়াল থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল কেউ। চার বছর আগে যখন এ-পথে শেষ এসেছিলাম তখনও রাস্তাটা এমনই ডানদিকে বাঁক নিয়েছিল।

    একটু গিয়েই পথটা সোজা ঢালু হয়ে নেমে গিয়েছে উপত্যকায়। সেখান থেকে শহরের একটা দারুণ ভিউ পাওয়া যায়। দিকচক্রবাল বরাবর পরিষ্কার আকাশের গায়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে উদ্ধত গগনচুম্বী বাড়ির ঝাঁক। তবে আজকের এই এত শুকনো গরমেও কোথাও আগুন জ্বলছে না।

    ওইখানে পথের ধারে পড়ে আছে সেই ভাঙা, এবড়োখেবড়ো পাথরের চাঁইটা। চার বছর আগে আমরা দুজনে এই বাড়িটা কিনব ঠিক করার পর আমি আর লিজি এসে বসেছিলাম এটারই উপরে।

    আজ ..ওটার ..উপরে ..বসামাত্র পিছনে ছ্যাঁকা লাগল যেন। পিঠের ঠিক মাঝখানে নিষ্ক্রিয় টেসার রডখানা খোঁচা দিচ্ছে। আমার চোখের সামনে অন্ধকার গায়ে মেখে পড়ে রয়েছে শহর ঘিরে রাখা মিডল্যান্ড পাহাড়শ্রেণীর অতিকায় এক-একটা চূড়া। এগুলোই উমগেনি উপত্যকার দক্ষিণাংশের সীমা নির্দেশ করে।

    চোখের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে রয়েছে ডিংগানে স্টাড—আগে লোকে যাকে ‘স্লিপি হলো’ বলে ডাকত, আর সাদা চামড়ার আফ্রিকানাররা ডাকত ‘পিটারমরিৎসবার্গ’৪ নামে।

    “সুইচ অফ!”

    মাথার মধ্যে বসে থাকা যন্ত্রটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আমার চোখের নীচে কোনো লাল আলো এখন দপদপ করে জ্বলছে না। শুধু মধ্যাহ্নসূর্যের প্রখর তাপ আমার বোজা চোখের পাতার হিলিবিলি রক্তজালিকাগুলো চুঁইয়ে ঢুকে আমার চোখের উপরে এক লাল আভা ছড়াচ্ছে। খুব সাধারণ, স্বাভাবিক এই লাল, গরম আভা।

    দু’বছর আগে আমার মাথায় অপারেশন করে এই যন্ত্রটা বসানো হয়েছিল। দু’বছর পরে আজ আমি আবার একা হলাম। একা—বাইরের পৃথিবী-মোড়া ইলেক্ট্রিক জাল থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন—সম্পূর্ণ একলা!

    এখানে কোনো অশরীরী নজরদার কন্ঠস্বর নেই, সিরিল নেই—আছে শুধু আমার নিজের মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকা চিন্তাভাবনা আর আমি।

    আমার শার্ট থেকে ঘাম গড়াচ্ছে। গালে কুটুস করে যে মাটাবেলে পিঁপড়েটা কামড়াল আমি বুড়ো আঙুলের চাপে সেটার ভবলীলা সাঙ্গ করে দিলাম। তীব্র টক-টক একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে। আমি লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। কিন্তু না, আশেপাশে কোথাও পিঁপড়ের ঝাঁক নেই। পাথরের নীচে পিঁপড়ের লুকোনো বাসাও নেই।

    এটা থাকার পক্ষে অত্যন্ত খারাপ একটা জায়গা, আমি জানি। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি এটাও জানি যে আমি এই জায়গাটাতেই মরতে চাই। এইখানেই আমি আমার দেহভার, আমার এই হাড়মাসের বস্তাটা চিরতরে নামিয়ে দিতে চাই… সেই হাতিগুলোর মতো…

    কেন? কে জানে! বলতে পারব না। হয়তো ওই দূরে বনপাহাড়ে জ্বলে.. ওঠা ..আগুনগুলোর.. জন্য।.. কিংবা ..হয়তো ওই মাটাবেলে পিঁপড়ের

    কামড় আর মৃত্যুগন্ধ আমার নাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে…

    ফাঁদে ধরা পড়া পশুর মতো চিন্তাগুলো—আমার একান্ত আপন, একান্ত নিজস্ব চিন্তার দল—আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে যেতে লাগল।

    কোথাও যাওয়ার পথ নেই তাদের আর।

    বাড়ি ফেরার পথ ধরলাম। পাগুলো থেকে আড়ষ্টতা অনেকটা বিদায় নিয়েছে এখন, যদিও টেনশন যে খুব একটা কেটেছে তা বলতে পারি না। আবার বাইরের জগতের জন্য তৈরি হতে হবে। মৃদু স্বরে বললাম, ‘সুইচ অন!’

    <ওই, এতক্ষণ ছিলে কোথায়? আজকের ভিডিও ক্লিপ্স—ভিক ফল্সের ভিডিও—কে আপলোড করবে শুনি?>

    শালা খা*** ** দু প্রিজ! মালটার আর কোনো কাজ নেই?

    ঘড়ি দেখলাম। চারটে বেজে গিয়েছে।

    <কাল করে দেব। আজ কাজের সময় পেরিয়ে গিয়েছে। >

    <এক্ষুনি করবে! তুমি তো আচ্ছা ইয়ে! লোকে কাজের সময় ঘুমিয়ে পড়ে শুনেছি, তুমি তো আরো এক কাঠি ওপর দিয়ে যাও হে! শুলে তো শুলে একেবারে বৌয়ের সঙ্গে!>

    কেস খেয়েছে! আমি রিগটা সুইচ অফ করতে ভুলে গিয়েছিলাম নাকি? নিশ্চয় তা-ই… সারাদিনের ধকলের পর আর… মালটা সব দেখে ফেলেনি তো?

    <তুমি কি…>

    আমি জিজ্ঞাসা করলাম বটে, কিন্তু ওপাশ থেকে দু প্রিজ চুপ করে রইল। কিন্তু আমি বেশ বুঝতে পারছি যে ও জানে আমি ঠিক কী জিজ্ঞাসা করছি।

    <জাহান্নামে যা তুই দু প্রিজ! কাট অফিস!>

    দাঁড়িয়ে পড়ে লম্বা লম্বা শ্বাস নিতে লাগলাম। আর চলতে পারছি না। তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে আমার।

    ***

    পথের শেষ বাঁকটা ঘুরতেই দেখলাম গাছের ছায়ার মধ্যে মিশে বুসিসিওয়ের গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুজনে। আমাকে আসতে দেকে

    দুজনেই এদিকে ফিরল। লিজেট দু’পাশে মাথা নাড়ল। আমি বুসিসিওয়ের দিকে তাকালাম।

    “মাটির নীচে মিষ্টি জলের অগভীর স্তর,” বুসিসিওয়ে বলল, “জল

    যা জমিয়েছেন আপনারা সে এমন কিছু বেশি নয়। বৃষ্টি না হলে খুব বেশি দিন চলবে না ওইটুকু জলে।”

    লিজেট নির্নিমেষ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমার ইচ্ছে হল ওকে বলি—এটা আফ্রিকা। তুমি যেটা করতে চাইছ তাতে তোমার বিবেক সাময়িক ভাবে শান্ত হতে পারে বটে, কিন্তু তাতে আসল লাভের লাভ কিছুই হবে না, কোনো সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হবে না।

    কিন্তু ওর দেখেই বুঝতে পারলাম যে খুব ভালোই আমার মনের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া কথাগুলো বুঝতে পারছে। আমার আর ওর মাঝে সিরিলের হস্তক্ষেপ ছাড়াই বুঝতে পারছে—আরো কাছাকাছি আসার ভ্রান্ত আশায় যে সিরিল ইনস্টল করে নেয়ার জন্য বারবার ওকে চাপ দিয়ে গিয়েছি আমি।

    কেমন এক অনিশ্চিত, হাল-ছেড়ে-দেয়া চাহনি ওর চোখে। আমরা, আমরা যা কিছু গড়ে তুলতে চেয়েছি—সে সব কিছুই যেন হঠাৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে, পড়েছে। ওর চোখে যেন ভয়ের অক্ষরে স্পষ্ট লেখা আছে সব শেষ হয়ে যাবে—আমরাও শেষ হয়ে যাব… হ্যাঁ, আজ সকালের ওই ঘটনার পরেও শেষ হয়ে যাওয়ার ভয় স্পষ্ট ফুটে উঠেছে ওর বড়ো বড়ো কালো চোখে।

    মুখ খুলতে খুলতে আমি জেনেই গিয়েছিলাম যে আমার মুখ থেকে বেরোতে চলা শব্দগুলো আমাদের জীবন ছারখার করে দিতে পারে। কিন্তু তাও বুসিসিওয়ের দিকে ফিরে আমি বললাম, “ঠিক আছে, তাও সাহায্য করব আমরা।”

    “ন্গিয়াবোংগা—ধন্যবাদ,” বুসিসিওয়ে বলল।

    লিজেট আমার বাহুর মধ্যে নিজের হাত ঢুকিয়ে জড়িয়ে ধরল। আমাদের চামড়া একে অপরের সঙ্গে ওম্ বিনিময় করছে।

    এই মুহূর্তটা দীর্ঘজীবী হোক।

    কতক্ষণ এই সময়টুকু টিকবে আমি জানি না। কেবল এইটুকু জানি যে কোনোরকম শেষ হয়ে যাওয়ার জন্য আমি এখন প্রস্তুত নই। আর এও জানি যে বৃষ্টি আসতে এখনও অনেক, অনেক দেরি।

    আরো একটা ভীষণ অদ্ভুত ব্যাপার—আমার কিন্তু আর একদম জলতেষ্টা পাচ্ছে না। এই অনুভূতিটাও অক্ষয় হোক তবে।

    টীকা

    ১) ৎসত্‌সি- দক্ষিণ আফ্রিকার টাউনশিপগুলির উঠতি মস্তান, ছিঁচকে চোরডাকাত, অসংগঠিত অপরাধীদের ‘ৎসত্‌সি’ নামে ডাকা হয়।

    ২) কুন্‌জানি- জুলু ভাষায় আলাপচারিতা শুরুর সময় ‘কুন্‌জানি’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। শব্দটির ব্যবহার ইনফর্মাল। অনেকটা বাংলায় ‘কী খবর?’ বা ‘সব চলছে কেমন?’ জিজ্ঞাসা করার মতো।

    ৩) ন্গিয়াফিলা, উন্জানি ওয়েনা- জুলু ভাষায় এই কথাগুলি অপরিচিত সম্মানীয় ব্যক্তির সঙ্গে দূরত্বব্যঞ্জক, সম্ভ্রমসূচক আলাপচারিতা শুরু করতে গেলে বলা হয়। অর্থ হল একেবারেই ‘আমি ভালো আছি, আপনি ভালো তো?’

    ৪) পিটারমরিৎসবার্গ- ১৮৩৮ সালের গোড়ার দিকে শ্বেতাঙ্গ অভিযাত্রী পিটার মরিৎস রেটিফ সদলবলে নিহত হন জুলু উপজাতির হাতে। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জুলুদের রাজা ডিংগানে। রেটিফের নামকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য কোয়াজুলু-নাটালের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের নামকরণ করা হয় তাঁরই নামে—‘পিটারমরিৎসবার্গ’। আফ্রিকান্স ভাষায় ‘স্টাড’ শব্দের অর্থ ‘শহর’। অদৃষ্ট, অজানা ভবিষ্যতের পটভূমিকায় লেখা এই গল্প এক অন্য পৃথিবীর অন্য রাজনীতি আর অন্য ইতিহাসের কথা বলে। ইতিহাস পাল্টানোর সঙ্গে নাম পাল্টে দেয়ার যে কী গভীর সম্পর্ক তা আমরা সকলেই জানি।

    লেখক পরিচিতি

    নিক উড জন্মেছেন জাম্বিয়ায়, তাঁর শৈশব কেটেছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। গত চার দশক ধরে সাহিত্যের নানান ধারায় লেখালিখি করছেন তিনি। আটের দশকে যখন দক্ষিণ আফ্রিকা অ্যাপার্টহেড নীতি ও বৈষম্যমূলক রাজনীতিকে পিছনে ফেলে ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে, সেই সময় নিক দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল তথা ব্ল্যাক টাউনগুলোতে ঘুরে ঘুরে কাজ করছেন। তাঁর অনেক লেখাতেই সে অভিজ্ঞতার কথা পরোক্ষভাবে উঠে এসেছে। পেশায় ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট হলেও নিক কোনোদিনই লেখালিখি থেকে বিরতি নেননি, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কলম আরো প্রাসঙ্গিক, আরো শক্তিশালী, আরো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর লেখা গল্প নানান পত্রপত্রিকা আর সঙ্কলনে প্রকাশিত হয়েছে। পাঠকপ্রিয় এই লেখকের উল্লেখযোগ্য একক বই ‘Azanian Bridges, ‘Water Must Fall’ এবং ‘The Stone Chameleon’.

    অনুবাদক পরিচিতি

    রাজর্ষি গুপ্তর জন্ম ১৯৯০ সালের ২৩শে জুন, বেড়ে ওঠা হাওড়া-হুগলির প্রান্তবর্তী ডানকুনিতে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ও এম.ফিল করেছেন, এখন ওই বিভাগেই গবেষণারত। পেশায় ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। কলকাতা ও কলকাতার বাইরে বিভিন্ন কলেজে পড়ানোর পর বর্তমানে কলকাতাতেই গুরুদাস কলেজে অধ্যাপনা করছেন। সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের মাধ্যম হিসেবে সাহিত্যকে দেখা থেকেই অনুবাদ সাহিত্যে আগ্রহ। পছন্দের বিষয় সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক, সিনেমা, ইতিহাস, নন্দনতত্ত্ব। লিখতে ভালোবাসেন গল্প, প্রবন্ধ, চিত্রনাট্য। উল্লেখযোগ্য অনূদিত গল্প সঙ্কলন ছায়া কায়া ভয়: এম আর জেমসের অলৌকিক গল্পের সটীক অনুবাদ (ঋত প্রকাশন) ও ভয় সমগ্র- ই এফ বেনসন (বুক ফার্ম)

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleনতুন বিশ রহস্য – স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    Next Article দ্য হাউস হোয়ার আই ডাইড ওয়ান্স – কেইগো হিগাশিনো
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }