রৌরবকাল – কৌশিক মজুমদার
রৌরবকাল
॥ ১॥
ওরা আসছে…
মাটিতে কান পেতে একমনে কী যেন শুনে চলে হরিদাস। নাওয়া খাওয়া নেই। ঘুম নেই। যবে থেকে শুনেছে ওরা এবার এদিকপানে এসেছে, ওর সব শান্তি চিতায় গেছে।
প্রথম যখন খবরটা শুনতে পেল, ও বিশ্বাস করেনি। না করারই কথা। এমন আবার হয় নাকি? কিন্তু অভয়পদ চিৎকার করছিল। বারবার কেঁদে কেঁদে একই কথা বলে চলছিল। শুরুতে হরিদাস ওকে খানিক বোঝানোর চেষ্টা যে করেনি তা না।
“এমনটা হয় না অভয়। হতে পারে না। হাজার হাজার বছর ধরে যে বিশ্বাস তিলে তিলে গড়ে উঠেছে, তা কি এইভাবে, এক মুহূর্তে…”
অভয়পদ কোনও কথা শুনছিল না। ওর এক ভায়রা শহর থেকে সদ্য পালিয়ে এসেছে। তিন রাত পায়ে হেঁটে। লুকিয়ে। দেখেছে গোটা পথ শুনশান। দেখেছে রাতের অন্ধকারে ওরা নির্বিচারে ধারালো অস্ত্রে চিরে ফেলছে অসহায় মানুষ আর পশুদের শরীর। গরম রক্ত ফিনকি দিচ্ছে ঝলকে ঝলকে। দুই আঁজলা ভরে সেটাই পান করছে ওরা।
অভয়পদর মৃগীর ব্যারাম আছে। হাউহাউ করে কান্না শেষ হতে না হতেই ফিটের ব্যামো দেখা দিল। মুখ থেকে অবিরাম গ্যাঁজলা উঠছে। চোখ উলটে গেছে। কাটা পাঁঠার মতো গোটা দেহটা ছটফট করছে। হরিদাস আগেও এমন দেখেছে। সে হেঁকে বউ মালতীকে বলল বালতি করে জল আনতে। আর পায়ের চামড়ার জুতো খুলে অভয়ের নাকের সামনে ধরল। যে রোগের যা ওষুধ।
বেশ খানিক ধস্তাধস্তির পর অভয়ের যখন জ্ঞান ফিরল, তখনও তার ছড়ানো গলায় একটাই কথা, “ওই এল রে!”
পাড়ার হানিফ, সুবল আর অমিত গোরুর গাড়ি চেপে কোথায় যেন যাচ্ছিল। হরিদাস তাদের ডাকলে, “ওরে ও ভালোমানুষের পো-রা। বলি যাস কোথায়? এট্টু দাঁড়া দেখি বাবারা। এই অভয়পদ ভিরমি গিয়েছেন। আমি বুড়ো মানুষ, গতরে পারব না। একে একটু বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আয় বাবা।”
অভয়ের ভিরমির কথা গাঁয়ের প্রায় সবাই জানে। সুবল একটু আকাশের পানে চেয়ে বলল, “দেরি হয়ে যাবে তো খুড়োমশাই। এমনিতেই বেরুতে বেরুতে মেলা সময় গেল। সারা সকাল শিশি বোতল ভাঙা সব একজায়গায় করে গুঁড়িয়ে দেওয়ালের উপরে ছড়িয়েছি। এখন যাচ্ছি কামারশালে। বাবা বললেন বাড়িতে যা শিকটা, লোহাটা আছে নিয়ে যা গে। বলাই কামারকে দিয়ে গরম করে পিটিয়ে অস্তর বানিয়ে নে আয় এবেলা। তা এই হানিফ আর অমিতও পোঁ ধরলে, ওরা ও নাকি যাবে। অভয়কাকার তো এমন প্রথমবার নয়। আপনি আরও খানিক ঘরে বসিয়ে হাওয়া বাতাস দিন। নিজেই ঠিক হয়ে যাবেন ‘খন। এবেলা গে না পৌঁছোতে পারলে আর সব করে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যাবে। তখন মেলা ফ্যাসাদে পড়ব।”
“তা বাবা ছইতে এত কী ভরে নিয়ে যাচ্ছিস তোরা?”
“লোহা গো কাকা, লোহা।” হানিফ উত্তর দিলে। “সবই তো জানো। জানটা তো বাঁচাতে হবে নাকি?”
“জান বাঁচানোর এত কীসের আঠা রে ছোঁড়া? যত্তসব গুলগপ্পো। এই অভয়ের ভায়রা এসে তোদের নাচিয়ে দিলে, আর তোরাও তেমনি। নেচে চলেছিস সেই তালে।”
“বিষ্টুদা একা কেন বলতে যাবে?” অমিত আপত্তি করল। “শহর থেকে কাল রাতে স্টেশনে ট্রেন এসেছে। গিয়ে দেখুন কী অবস্থা। আমি তো ইস্টেশন অবধি যেতেই পারিনি। তার আগেই ওয়াক বমি। এই হানিফের সাহস বেশি, ও গেছিল। সব দেখেছে। ভালো কথা বলি কাকাবাবু, আপনার ঘরে নাকি একখানা পুরোনো গাদা বন্দুক আছে শুনেছি। সেটাই তেল-ফেল দিয়ে চকচকে করে রাখুন। মানুন চাই না মানুন, ওরা কিন্তু এসে গেছে।” বলে আর সময় নষ্ট না করে অমিত পাঁচনির এক বাড়ি মারল বলদের পিঠে। ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করে খানিক বাদে ওদের গাড়িটা চোখের বাইরে চলে গেল।
স্টেশনে ট্রেন এসেছে? এত বছর পর? এ তো ভালো কথা নয়! হরিদাসের মাথায় চিন্তার ভাঁজ পড়ল।
এদিকে অভয়পদ খানিক সামলে নিয়েছে। চারিদিকে জল ছড়ানো। চোখ লাল। ঠোঁট তখনও একদিকে বেঁকে রয়েছে। অভয় ওঠার চেষ্টা করতেই হরিদাস বাধা দিলে। “এবেলা আমাদের এখানেই থেকে যাও বোসের পো। এই রোদ্দুরে বাড়ি ফিরতে গেলে আবার মাথা ঘুরে না পড়ো। কুয়োর থেকে জল তুলে চাট্টি ডালভাত খেয়ে ঘুমিয়ে নাও। আমি বলাইকে বলছি তোমাদের বাড়ি একটা খবর পাঠাতে।”
সেই যে মনটা কু গাইতে শুরু করল, সেটা চলতেই লাগল হরিদাসের। যাবার আগে অমিত স্টেশনের কথা কী বলে গেল যেন? এ যদি সত্যি হয়, তবে তো চিন্তার কথা। খানিক বিছানায় শুয়ে এদিক ওদিক করল। ঘুম এল না। শয্যাকণ্টকী রোগীর মতো খানিক বিছানাতেই হাত পা ঘষে ভিতরবাড়িতে উঁকি মেরে দেখল সব চুপচাপ। নিস্তব্ধ। হাতের লাঠিগাছাটা নিয়ে গ্রাম চরতে বেরুল হরিদাস। এ এমন নতুন কিছু না। মাঝে মাঝেই বের হয়। কিন্তু আজকে যে দৃশ্য দেখল তেমনটি আগে কখনও দেখেছে বলে মনে পড়ল না।
আজ হাটবার। অন্যদিন এই সময় আশেপাশের দশ গাঁ থেকে ওলাবিবির থানের পাশের মাঠে দিব্যি মেলা বসে যায়। কুসুমপুরের তাঁতের শাড়ি, দিগনগরের গিলটি করা সোনার গয়না, ঝিগরার কাঁসার বাসন থেকে শুরু করে চাঁপাডাঙার লাল কলা, বেড়োলের নধর মোরগ সবই মেলে এই হাটে। আজ একটা দোকানও বসেনি। ছেঁড়া শালপাতা, কাগজের টুকরোটাকরা উড়ে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক। গুপী মুদির দোকানখানা অবধি ঝাঁপ ফেলা বন্ধ। জগন্নাথের চায়ের আড্ডাখানায় যে মজলিশটা দুপুর গড়ালেই শুরু হয়ে যায়, তার পাত্তাটুকুও নেই। জগন্নাথ একা উনুনে কেটলি চাপিয়ে ভুরু কুঁচকে বিড়ি টানছে।
সেদিকেই পা বাড়াল হরিদাস। অন্য সময় হলে জগন্নাথ বেশ খাতির-টাতির করে। টুল এগিয়ে বসতে বলে। হাজার হোক হরিদাস এই গ্রামের বড়ো একজন কেউকেটা বলে কথা। আজ জগন্নাথ যেন তাকে পাত্তাই দিল না। একবার তার দিকে চেয়ে আবার বিড়ি টানতে লাগল।
খানিক দুজনেই চুপ। হরিদাসই প্রথম কথা বলল, “সকালে নাকি একটা ট্রেন এসেছে? জানো কিছু?”
জগন্নাথ উত্তর দিলে না। শুধু উপরে নিচে মাথা নাড়লে।
“তুমি গেসলে দেখতে?”
আবার মাথা নাড়ল জগন্নাথ। গেছিল।
“কী দেখলে?”
জিজ্ঞেস করেই হরিদাস বুঝল ভুল হয়ে গেছে। এতক্ষণ জগন্নাথ তবু শাস্ত ছিল। প্রশ্ন করা মাত্র তার হাতের বিড়ি পড়ল খসে। একটু এদিক ওদিক হলেই ময়লা ধুতিতে পড়ে ফুটো করে দিত। হরিদাস দেখতে পেল জগন্নাথের মুখ বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। দুই হাতে মুখ ঢেকে চিৎকার করে উঠল জগন্নাথ। এমন ভয়াবহ চিৎকার হরিদাস আগে কোনও দিন কারও গলায় শোনেনি। একভাবে চিৎকার করে চলল সে। বিরাম নেই, ক্লান্তি নেই। হরিদাসের ভয় হল। বুঝি থামাতে গেলে তাকেই না কামড়ে-টামড়ে দেয়। প্রায় দৌড়ে যখন ওলাবিবির থানের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, তখনও জগন্নাথের আওয়াজ কানে আসছে।
হরিদাস বুঝল অবস্থা গুরুচরণ। একবার স্টেশনপানে যেতে পারলে ভালো হত। কিন্তু সে তো প্রায় সোয়া মাইলের পথ। সাতপাঁচ ভেবে ধুতিতে কাছা দিয়ে লাঠিটা মাটিতে বার দুই ঠুকে, স্টেশনের দিকে পা বাড়াল হরিদাস।
হাট কেন ফাঁকা এবার বোঝা যাচ্ছে। অনেকেই ছোটো ছোটো দল বেঁধে স্টেশনের দিক থেকে ফিরছে। সবাই পুরুষমানুষ। মেয়েছেলে কাউকে চোখে পড়ল না। ছেলেদের দলও ফিরছে একদম নীরবে। কেউ কেউ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কেউ আবার চলার অবস্থায় নেই। দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে কোনওক্রমে টলতে টলতে চলেছে ঘরের পথে। সূর্য ডুবতে চলেছে প্রায়। এবার একটু পা না চালালে কিছুই দেখা যাবে না।
স্টেশনের একটু দূর থেকেই গন্ধটা নাকে এল হরিদাসের। ফি রবিবার মোড়ের বাজারে খোদাবক্সের পাঁঠার দোকানের পাশে দাঁড়ালে অনেকটা এমন গন্ধ পাওয়া যায়। রক্ত, কাঁচা মাংস আর মৃত্যুর গন্ধ মিলিয়ে মিশিয়ে। কিন্তু এখানে তার সঙ্গেই একটা মনখারাপ করা পচা গন্ধ এসে মিশেছে। শুধু মেশেনি, গোটা বাতাস ভারী করে ঝুলে রয়েছে ঘন মেঘের মত। যেন এখুনি ঝরে পড়বে। যেন চেষ্টা করলেই আঙুল দিয়ে ছোঁয়া যাবে সেই গন্ধকে।
হরিদাস সতর্ক হয়ে সড়ক থেকে সরে পাশেই আলের রাস্তা ধরল। এখানে পথ কিছুটা এবড়োখেবড়ো। হরিদাসের পায়ে সমস্যা আছে। চলতে কষ্ট হয়। তবু ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে এগোতে লাগল সে। খানিক বাদেই পীরবাবার ঢিপি। বেশি উঁচু না। হরিদাসের ছোটোবেলায় ইস্কুল পালিয়ে সে আর তার বন্ধু গোবিন্দ কত দুপুর এর উপরে কাটিয়েছে। বুনো কুল আর বিষটক একটা গোঁড়ালেবুর গাছ ছিল মাথায়। সেখান থেকে গোটা স্টেশনটা স্পষ্ট দেখা যায়। হাঁচড়েপাঁচড়ে কোনওমতে মাথায় উঠে হাঁফাল খানিকক্ষণ। এখানে গন্ধটা কিছু কম। বরং বুনো ঝোপঝাড়ের নতুন একটা পাঁশুটে গন্ধে ভরে আছে চারদিক। একটু দূরেই সেই কুলগাছটা দেখতে পেল হরিদাস। এখানে আজকাল বিশেষ কেউ আসে না বোঝাই যাচ্ছে। গাছ ডালপালা বাড়িয়ে ছড়িয়ে একেবারে ঢিপির সামনেটা আটকে রেখেছে।
হাতের লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মেরে মেরে কয়েকটা ডাল ভাঙল হরিদাস। তাতেও পথ পরিষ্কার হল না। কাঁটায় শরীরের নানা জায়গায় ছুলে গিয়ে জ্বালা করছে চিনচিন। কোনওক্রমে চোখ প্রায় বুজে কিছুটা হামা দিয়ে, কিছুটা উবু হয়ে গাছটা পেরিয়ে গেল সে। তারপর চোখ খুলতেই গোটা স্টেশনটা চোখের সমান একেবারে সিনেমার পর্দার মতো ফুটে উঠল …
.
ঊর্ধ্বশ্বাসে প্রায় ছুটতে ছুটতে বাড়ির দিকে দৌড়াল হরিদাস। এইমাত্র টিি উপর থেকে যে দৃশ্য সে দেখল, তা এতই অবিশ্বাস্য, এতই অলীক যে চরম অবাস্তব কল্পনাতেও তা আনা অসম্ভব। তবে সব সত্যি। সকাল থেকে বারবার যে সত্যিকে অগ্রাহ্য করছিল, আসলে তা নিজেকে প্রবোধ দেওয়া ছাড়া আর কিছু না। প্রৌঢ় হরিদাস জীবনে অনেক মৃত্যু দেখেছে। ঘুমের মধ্যে নিশ্চিন্ত মৃত্যু, যাতে মৃত নিজেই বুঝতে পারে না খাঁচার ভিতর থেকে কখন অচিন পাখি বেরিয়ে হাওয়া হয়ে গেছে। রোগে ভুগে ভুগে কষ্ট পেয়ে দিনের পর দিন মৃত্যু কামনা করেও না আসা মৃত্যুর আচমকা আঘাতের বিস্ময়, কিংবা আসন্ন মৃত্যুর সঙ্গে চরম লড়াই। হরিদাসের মা যখন মারা যায় সে পাশেই ছিল। প্রায় এক ঘন্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছিল মা। হাত পা ছুড়ে, শরীর টানটান করে। চোখ উলটে গেছে প্রায়, কিন্তু একচুল জমি ছাড়ছে না। শেষে একসময় যখন এই অসম লড়াই শেষ হল, হরিদাস মৃতা মায়ের মুখে এক অদ্ভূত হেরে যাবার হতাশা দেখেছিল।
কিন্তু আজ যা দেখল তার সঙ্গে আগের কোনও কিছুর তুলনা হয় না। যেন নরকের দক্ষিণ দরজা খুলে উঠে এসেছিল জাহান্নামের দূতরা। বহুদিনের অপূর্ণ ক্ষুধায় চপচপিয়ে খেয়ে ফেলেছে যাত্রীদের যকৃৎ, অস্ত্র, ফুসফুস। মাথা খুলে দুই ফাঁক করে ছিঁড়ে নিয়েছে ফুলকপির মতো নরম ঘিলু আর মগজের টুকরোটাকরা। মানুষগুলোর দেহের খোলগুলো পড়ে আছে শুধু। যেমনভাবে সাপ খোলস পালটায়। ট্রেনে চেপে আসার পথে সব খাবার শেষ হয়ে যাওয়ায় নির্বিচারে এদেরকেই খেয়েছে ওরা। হয়তো এদের অনেকে ওদেরই দলের।
হরিদাস ওসব নিয়ে ভাবে না। ভূতের ভয় তার কোনও কালেই নেই। সে চিন্তিত জ্যান্তদের নিয়ে। এখন আর অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। এতদিন যে কথা বাতাসে ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছিল, সেটা এখন দিনের আলোর চেয়ে সত্যি। ওরা এসে গেছে। এই ট্রেনে চেপেই। হয়তো ওরা কাছেই ওঁত পেতে রয়েছে।
এবার কেউ ছাড় পাবে না…
.
।।২।।
মাসখানেক আগেই যে সূর্যগ্রহণটা হয়েছিল সেটা মানব ইতিহাসের দীর্ঘতম। প্রায় ছেচল্লিশ মিনিট ধরে চলা পূর্ণগ্রাস গ্রহণে মোট সাতবার ডায়মন্ড রিং দেখা দিয়েছিল। পৃথিবীর কোনও বিজ্ঞানী কোনওভাবে এই ঘটনার ব্যাখ্যা করতে পারেননি। গ্রহণ কেটে যাবার পরেও ব্যাখ্যা করার কোনও সুযোগ ছিল না। গ্রহণ কাটতেই তীব্র এক আলোতে ভরে উঠল চারদিক। এখনও পাওয়া খবর অনুযায়ী, কায়রো, হেলসিঙ্কি, ডেট্রয়েট, সাংহাই, রাজশাহী আর কালিম্পং থেকে এই আলো দেখা গিয়েছিল। স্বাসরি যে কয়জনের চোখে এই আলো গেছে, তারা সঙ্গে সঙ্গে অন্ধ হয়ে গেছে। যারা ঝলক মাত্র দেখেছে, তারাও তাকালে এখনও চোখের সামনে হলদে বেগুনি স্ব ছোপ দেখতে পায়। এই আলোর ঝলকানি চলেছিল তিন মিনিট সাতাশ সেকেন্ড আর তারপরেই সারা বিশ্বের সব যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। স্যাটেলাইট কাজ করা বন্ধ করে। সার্ভারগুলো অচল হয়ে বিরাট দানবের মতো পড়ে থাকে ঘাড় ওক্তে। ইন্টারনেট শব্দটা এক মুহূর্তে ইতিহাস হয়ে যায়।
বিগত তিনশো বছর ধরে মানবসভ্যতা নিজেদের ইতিহাসের ডিজিটাইজেশন করেছে। বিপুল জনসংখ্যার বৃদ্ধিকে সামাল দিতে দাঁড়াবার জায়গার বাসনায় গত সত্তর লক্ষ বছরের সব ইতিহাসকে বিট বাইটে ভেঙে ফেলে পুরে দেওয়া হয় সার্ভারে। অপ্রয়োজনীয় বোধে ধ্বংস করা হয় ইতিহাসের নানা উপাদান। তার মধ্যে রোজেটা স্টোন থেকে খুফুর পিরামিড কিংবা শাহজাহানের তাজমহল সবই আছে। গোটা পৃথিবীর বেশিরভাগ অংশই এখন হাইরাইজ বিল্ডিং-এ ঢাকা। শহরের দিকে বিশেষ প্রজাতির কিছু হাইব্রিড ব্যাকটেরিয়ার চাষ করা হয়, যারা একইসঙ্গে খিদের খাবার এবং জীবনের প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের জোগান দেয়। তা বলে কি মানুষ ঘুরতে যাচ্ছে না? অবশ্যই যাচ্ছে। মোটা টাকায় ভার্চুয়াল ট্যুর কোম্পানিগুলো চাইলেই ঘুরতে নিয়ে যাচ্ছে রামেসিসের আমলের মিশরে কিংবা আকবরের আমলের আগ্রায়। তাতে চক্ষু কর্ণ নাসিকা সব কিছুরই বিবাদভঞ্জন করা হয়। মনে হয় যেন টাইম মেশিনে চেপে সোজা চলে গেছি সেই আমলে। দাঁড়িয়ে দেখছি আইফেল টাওয়ারের নির্মাণ কিংবা নর্মান্ডি উপকূল দখল।
শুরুতে একটা সমস্যা ছিল বটে, যে পরিমাণ অর্থব্যয় হত, সেই তুলনায় সময় ছিল অল্প। তাতে অনেকেই খুশি হতেন না। শেষে পদার্থবিজ্ঞানী জি এম হামবোল্ট আর ডাক্তার সত্যেন্দ্রকুমার বসু মিলে এক অদ্ভুত আবিষ্কার করেন। ভার্চুয়াল ট্যুরের সময়কাল মানুষের স্বপ্নের সময়কালের সঙ্গে সিনক্রোনাইজ করে দেন। সবাই আগেই জানত, মানুষ স্বপ্ন দেখার সময়ে তার কাছে ঘড়ি অনেক ধীরে চলে। বাস্তব ক্ষেত্রে সময়ের গতি অনেক দ্রুত। বিখ্যাত হামবোল্ট-বোস পেপারে তাঁরা রীতিমতো অঙ্ক কষে দেখান, স্বপ্নে একটা গোটা দিনের ঘটনা ঘটতে বাস্তবে লাগে মাত্র ৩.২১ সেকেন্ড। এই আবিষ্কারের জন্য তাঁদের নোবেল পুরস্কারও দেওয়া হয়েছিল। ভার্চুয়াল ট্যুর কোম্পানিগুলো এই আইডিয়া লুফে নেয়। এখন মাত্র কুড়ি মিনিটের ট্যুরে যে-কোনও জায়গায় এক বছর কাটানোর আনন্দ উপভোগ করা যায়।
সেই কুখ্যাত সূর্যগ্রহণের পর এখন যে সেসব বন্ধ, তা বলাই বাহুল্য। আসল ঘটনা হল সেদিন থেকে পৃথিবীতে আবার আদিম সাম্যবাদী সমাজ ফিরে এসেছে। ভার্চুয়াল নোট, ভার্চুয়াল মানির জগতে বসবাসকারী মানুষ আচমকা সেদিন আবিষ্কার করল ধনতান্ত্রিক বৈষম্য আর নেই। পৃথিবীর সবাই কপর্দকশূন্য। যেহেতু খুব কৌশলে প্রায় কয়েকশো বছরের চেষ্টায় এই ভার্চুয়াল টাকাকেই পুঁজি বলে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা চলেছিল, তাই এক মুহূর্তে সকল পুঁজিপতিরাও পথে বসল।
প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন দেশের সরকাররা বোঝাতে চেষ্টা করেছিল, এ একেবারেই সাময়িক ঘটনা, কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টা পার হবার পরেও যখন অবস্থার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হল না, তখন প্রথমবারের জন্য ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। শোনা গেল ফিলাডেলফিয়ার এক শপিং মল ভেঙে ঢুকে লুটপাট চালিয়েছে বহু মানুষ। জোগাড় করেছে প্রয়োজনীয় খাবার, অক্সিজেন আর জল। ম্যানেজার বাধা দিয়ে আসায় তাকে কুচিকুচি করে কেটে ঢুকিয়ে দিয়েছে কাবার্ডে। যেখানে কোনও যোগাযোগ ব্যবস্থাই নেই, সেখানে সুদূর ফিলাডেলফিয়া থেকে এমন খবর কীভাবে এল সে প্রশ্ন কেউ করল না। একইভাবে লুট করা হল কলকাতা, বর্ধমান, বহরমপুর, বারাসাত, ঢাকা, চট্টগ্রাম আর খুলনায়। খাবারের অভাবে প্রথমে শহরে অবশিষ্ট প্রাণীদের কেটে গবগবিয়ে খাওয়া হতে লাগল। তারপর বেওয়ারিশ শিশু আর অবলা মহিলাদের। সবশেষে সোমত্ত পুরুষদের।
এই লড়াইতে সমাজের প্রান্তিক গায়ে খাটা মানুষরা এগিয়ে গেল শুরুতেই। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেবার ক্ষমতা তাদের সবচেয়ে বেশি। ঠিক সাড়ে তিনদিন পর থেকে শুরু হল মর্টাল কমব্যাট। সরাসরি যুদ্ধ। গাঁইতি, ছেনি, হাতুড়ির ক্রমাগত আঘাতে ভেঙে পড়তে লাগল বিরাট সব ইমারতের দরজা। আগুন জ্বলে উঠল দিকে দিকে। অস্তিত্বের জন্য লড়াইতে বিজয়ী আর বিজিতের মধ্যে তফাত ঘুচে যেতে লাগল।
তারপর একদিন শহরের সব জমানো খাবার শেষ হল। ক্ষুধার্ত হিংস্র একদল মানুষ দেখল সঞ্চিত খাবারের ভাঁড়ার ফুরিয়েছে। সব বড়ো বড়ো গুদাম এখন খালি। উপায় একটাই। মূল শহর থেকে বহু দূরের গ্রামগুলি, যেখানে এখনও সেই আদ্যিকালের পদ্ধতিতে চাষ আবাদ হয়, সেখানের মানুষরা নাকি অপেক্ষাকৃত ভালো আছে। এই বিপদে তারা নিজেদের অর্থনীতিকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেছে আদিম যুগের বিনিময় প্রথায়। জিপিএস-নির্ভর মানুষ বুঝে উঠতে পারল না কোথায় যাবে? কোনদিকে যাবে? উপায় বার হতে সময় লাগল না। সারা দেশ জুড়ে রয়েছে যে রেললাইন, সেই রেলগাড়ি ছুটিয়ে দাও। দ্যাখো কোথায় রয়ে গেছে খাদ্যশস্যের শেষ কণাটুকু। না থাকলে প্রাণীরা। তাও না থাকলে হত্যা করার মতো মানুষ…
গ্রামে গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে গেল। সবার মুখে একটাই কথা। ওরা আসছে। চোখে খিদে। হাতে ধারালো অস্ত্র। ওদের সামনে পড়লে কারও রেহাই নেই। এই সব কথাই হরিদাস জানত। সঙ্গে এটাও বিশ্বাস করত, ওরা যেখানেই আসুক, ওর গ্রামে আসবে না। আসতে পারবে না। ও সেই ব্যবস্থা করে রেখেছিল দশ বছর আগেই।
.
।।৩।।
ড. হরিদাস পাল। খড়গপুর আইআইটি থেকে ইনফরমেশন টেকনোলজি নিয়ে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে পিএইচডি করার জন্য আমেরিকা গিয়ে হরিদাসের চোখ খুলে যায়। বুঝতে পারে গোটা পৃথিবী এক অলীক বিশ্বাসে চলছে। আর চালাচ্ছে চার-পাঁচটা মালটিন্যাশনাল কোম্পানি। ডিজিটাইজেশনের নামে প্রতি মুহূর্তে তারা সব মানুষের ব্যক্তিগত, অতি নিজস্ব, গোপন সব তথ্য পুরে নিচ্ছে নিজেদের তথ্যভাণ্ডারে। তৈরি করছে পারসোনালিটি প্রোফাইল। সে প্রোফাইল এত নিখুঁত, যাতে কোনও মানুষ নিজেকেও এত ভালো চেনে না, যেভাবে কোম্পানির রোবটরা তাকে চেনে। রোবট তার কথা বলার সঙ্গী হচ্ছে, প্রেমিকার প্রয়োজন মেটাচ্ছে, সমাজ থেকে প্রতিটা মানুষের শিকড় ছেঁটে তাকে একলা করে দিচ্ছে প্রথমেই। এমন একটা কমফোর্ট জোন দিচ্ছে যার মোহ কাটাতে পারছে না কেউই।
তারপরেই শুরু হচ্ছে আসল খেলা। প্রোফাইলের অ্যালগরিদম মেনে রোবটরা মানুষকে চালিত করছে, লোভ দেখাচ্ছে, বাধ্য করছে কোনও নির্দিষ্ট জিনিস কিনতে, বেছে নিতে কে হবে আগামী দিনের সরকার। হরিদাস ভয় পেয়ে গেল। ছোটোবেলায় ঠাকুমার মুখে শুনেছে, এমন একটা দিন ছিল, যখন এই ভার্চুয়াল টাকা নয়, সত্যিকারের টাকা ছিল। কাগজের। তাকে হাত দিয়ে স্পর্শ করা যেত। বিনিময় করা যেত ইচ্ছেমতো। সোনাদানাকে পুঁজি বলে ধরা হত, টাকার দাম নেমে গেলেও যাতে মানুষ সর্বস্বান্ত না হয়ে যায়।
ধীরে ধীরে ভয়টা চারিয়ে বসতে থাকে হরিদাসের মগজে। বেশ কয়েকবার সে তার গাইডকে প্রশ্নটাও করেছে। “যদি একদিন আচমকা এইসব সার্ভার অকেজো হয়ে যায়, তবে কী হবে স্যার?”
“বাজে না বকে নিজের কাজ করো”, ধমকে উঠেছিলেন গাইড। তবে সেই বকার মধ্যে হালকা একটা গলা কাঁপার সুর কি ছিল না? কে জানে?
দেশে ফিরে হরিদাস ঠিক করেই নিল তাকে কী করতে হবে। সরকারি চাকরি পেতে সমস্যা হল না। প্রতিরক্ষা দপ্তরের ডেটা অ্যানালিস্ট। খুব দ্রুত সেই বিভাগের প্রধান। এককালে রিটায়ারের আগে এই পদ পাওয়া অসম্ভব ছিল। কিন্তু যবে থেকে প্রতিরক্ষা দপ্তরকেও বেসরকারিকরণ করা হয়েছে, তবে থেকে পারফরম্যান্স অনুযায়ী প্রোমোশন।
প্রধান হতেই হরিদাস নিজের কাজ শুরু করে দিল। মূল শহর থেকে তার গ্রাম বেশ কয়েকশো কিলোমিটার দূরে। দূরত্বের জন্যেই হোক, বা অন্য কিছু, শহুরে উন্নয়নের জোয়ার তখনও সেখানে পৌঁছে উঠতে পারেনি। প্রাচীন নানা গ্রামের মতো সেটিও স্বনির্ভর। গ্রামের মানুষ চারিদিকের মালভূমির মাঝে প্রায় বিচ্ছিন্ন এক জীবনযাপন করেন। হরিদাস ঠিক করল গ্রামকে বাঁচাতে হবে। এক হপ্তা ছুটি নিয়ে গ্রামে থেকে মোড়লমশাই আর আশেপাশের গাঁয়ের আরও কিছু লোককে বুঝিয়ে রাজি করাল অবশেষে। জোয়ান ছেলেপুলে প্রথমে মানতে চায়নি। তারপর হরিদাস যখন তিন বছর আগের একদিন ছয় সেকেন্ডের জন্য সার্ভার বন্ধ হওয়াতে কী হয়েছিল, সেটা মনে করাল, সবাই মেনে নিল একবাক্যে। প্রায় এক বছর লেগেছিল পুরো সিস্টেমকে আগের অবস্থায় আনতে। ততদিনে অনেকের প্রায় ভিক্ষা করার মতো অবস্থা হয়ে গেছিল।
অফিসে ফিরে হরিদাস ম্যাপিং আর জিপিএস সিস্টেম হ্যাক করে তাদের গ্রাম আর আশেপাশের সবকটা গ্রামকে ম্যাপ থেকে মুছে দিল। পৃথিবীর মানচিত্রে তাদের আর কোনও হদিশ রইল না। আর কোনও দিন বাইরের কেউ এদের খবর পাবে না। যারা জানে তারা ঘুণাক্ষরে কাউকে জানাবে না। গ্রামের সবাই রাজি হয়েছে। গ্রামের অর্থনীতি চলবে বিনিময় প্রথায়।
সমস্ত কিছু করে হরিদাস সিস্টেম থেকে নিজের নাম ডিলিট করে দিল। সভ্যতার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করে চলে এসেছিল নিজের গ্রামে। জানত সারা দেশের পুলিশ তার খোঁজ করবে। করুক। মানচিত্রে যত জায়গা আছে তার মধ্যে খুঁজুক। একমাত্র ভয় ছিল রেললাইনটা নিয়ে। আগের মতো মানুষচালিত হলে সমস্যা হত ঠিকই। কিন্তু রোবট অতশত জানে না। সিস্টেমে তাই গ্রামে ঢোকার আগেই টার্মিনাল স্টেশন দেখিয়ে এসেছে সে।
হরিদাস এখন পৃথিবীর বাইরে এক নিঃসঙ্গ জগতের বাসিন্দা। বাইরের জগৎ আর তার খোঁজ পাবে না। অন্তত এমনটাই সে ভেবেছিল। ভুল ভেবেছিল।
.
।।৪।।
এই রেলপথ প্রদীপের চেনা।
অনেকদিন আগে, যখন মানুষে ট্রেন চালাত, তখন বাবা এই লাইনে জনমজুরের কাজ করত। বাবার সঙ্গে সেও চলে আসত মাঝে মাঝে। রোজ না। “মন দিয়ে পড় বাবু, মন দিয়ে পড়”, বলত বাবা। কী হল তাতে? এক কাঁড়ি পয়সা খরচা করে প্রাইভেট কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়ে এখন সেও জনমজুরের কাজ করে। শহরের ঠিক বাইরে একটা বিরাট বস্তি আছে। ওরা বলে ঘেটো। প্রদীপ, ওর বউ আর ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে ওখানেই থাকে।
যেদিন সূর্যগ্রহণ হল, মেয়েটার খুব জ্বর। সারছেই না। প্রদীপ নিজেই বলল, “আর না। হাসপাতালে নিয়ে চলো।”
“কিন্তু খরচ?”
“কী আর করা যাবে? বাড়িতে ডাক্তার ডাকলে তো খরচা আরও বেশি।” বাইরে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। মেয়ের শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। ঝাঁ চকচকে এক বেসরকারি হাসপাতালের বাইরে বিরাট লাইনে গিয়ে দাঁড়াল প্রদীপ। ওয়ার্ল্ড মেডিক্যাল অর্গানাইজেশনের নির্দেশ মেনে পৃথিবীতে কোথাও এখন আর সরকারি হাসপাতাল নেই। ফলে ফ্যালো কড়ি মাখো তেল। সূর্যে বিস্ফোরণের সেই আলোর ঝলকানি প্রদীপ দেখতে পায়নি, ওদের শহর থেকে দেখাও যায়নি।
কিন্তু যখন সে কাউন্টারের একেবারে সামনে, ভার্চুয়াল পেমেন্ট করতে যাবে, ভিতরের সাদা পোশাক পরা রূপসি মৃদু হেসে মাথা নেড়ে জানাল, “পেমেন্ট নেওয়া যাবে না স্যার। সার্ভার ডাউন।”
“মানে? এতক্ষণ দাঁড়িয়ে শেষে…”
“কিচ্ছু করার নেই স্যার। সার্ভার আসুক। তারপর…”
“কিন্তু আমার মেয়েটা…”
“কিচ্ছু করার নেই স্যার। আই অ্যাম সরি।” যন্ত্রের মতো বলে চলল সেই মেয়ে।
এর পরেও দেড়ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েছিল প্রদীপ। সার্ভার আসেনি। প্রায় পায়ে পড়ার মতো অনুরোধ করেছিল যাতে একবার ডাক্তার এসে মেয়েকে দেখে যান। কেউ আসেনি। খানিক বাদে মেয়েটি বিরক্ত হয়ে কাউন্টার ছেড়ে উঠে যায়। ভিতরে ঢুকতে গেলে দারোয়ান তাকে ঠেলে তাড়িয়ে দেয়।
.
দুই দিনের মাথায় মেয়ের চোখ উলটে গেল। মুখ দিয়ে গ্যাঁজা বেরুচ্ছে। গোঁ গোঁ শব্দ। জ্বরে বেহুঁশ। জ্বর কমার ওষুধ কিনতে গিয়ে দেখল দোকানের সামনে বিরাট জটলা। কেউ কিছু কিনতে পারছে না। দোকানদার শাটার ফেলে বসে আছে। সার্ভার ডাউন। সবাই বলাবলি করছে এমন নাকি সারা পৃথিবী জুড়েই হয়েছে। ফিলাডেলফিয়াতে লুট হয়েছে একটা ওষুধের দোকান। প্রদীপের মাথা আর কাজ করছিল না। কোথা থেকে একটা পাথর তুলে নিয়ে বারবার আঘাত করতে লাগল তালার জায়গাটাতে। বার্গলার অ্যালার্মের শব্দে কান পাতা দায়।
প্রথমে ভয় করছিল। যদি কেউ মারে। অবাক হয়ে দেখতে পেল, কেউ তাকে বাধা দিল না। আচমকা একটা শব্দ শুনে পাশে তাকিয়ে দ্যাখে, আরও একটা জোয়ান হাত আরও একটা পাথর দিয়ে আঘাত হানছে শাটারে। তারপর আরও এক। আরও এক…
অজান্তেই প্রদীপ কীভাবে এই দলটার নেতা হয়ে উঠল ও নিজেই জানে না। প্রথমে কিছুদিন চলল অবিরাম লুটতরাজ। দোকান, গুদাম, শপিং মলে। সেসব ফুরোতে সময় লাগল না। এদিকে প্রদীপের মেয়েটা মরেছে। সেদিন ওষুধ নিয়ে গিয়েও বাঁচাতে পারেনি শেষ অবধি। দুদিন বাদে বউটাও সেই শোকে গলায় দড়ি দিল।
বউ মেয়ে মরার পর প্রদীপ যেন পাগলপারা হয়ে উঠল। পাকা বাড়ি, দামি গাড়ি শহরে একটাও আর অবশিষ্ট রইল না। ওর দেখাদেখি গজিয়ে উঠল আরও কয়েকটা দল। তাদের মধ্যে আবার লড়াই বাধতে লাগল জোরকদমে। সবাই বলে তারাই নাকি আসল রেজিস্ট্যান্স গ্রুপ। প্রদীপ বুঝল এভাবে চলবে না। সবাই একই বদ্ধ ডোবায় মারামারি করে মরছে। তাকে যেতে হবে এমন জায়গায় যা এখনও সাধারণের নজরে আসেনি। ভার্জিন টেরিটরি।
সেদিন রাতেই সে দলবল নিয়ে মিটিং করল। দলে এমন একজন ছিল যে এককালে রেল চালাত। কিন্তু যাবে কোথায়? অনেক ভেবেও যখন প্রদীপের মাথায় কিছু আসছে না, দলের মধ্যেই কে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কতদিন চাঁপাডাঙার কলা খাইনে।” দুই-একজন ব্যঙ্গের হাসি হাসলেও প্রদীপের কান খাড়া। সত্যিই তো! আগে শহরে নিয়মিত চাঁপাডাঙার লাল কলা পাওয়া যেত। এই বছর দশেক আগেও তো শহরের সবকটা শপিং মল আলো করে থাকত সেই কলা। আচমকা কোথায় উবে গেল?
“চাঁপাডাঙা যেন কোন লাইনে?” প্রদীপ জিজ্ঞাসা করল।
“যতদূর মনে পড়ে হাওড়া-দিগনগর লাইনে। তবে ও লাইন এখন বন্ধ।”
“কেন? বন্ধ কেন?”
“তা জানি না। তবে শেষ যতদূর জানি সব গাড়ি হেতিমা অবধি যেত। ওখান থেকেই ফিরে আসত আবার।”
“কেন?”
“অত জানা নেই মশাই। রেল কোম্পানির সিদ্ধান্ত তাই হয়তো। আর ওই লাইনে লোক হয় না। প্রফিট নেই। হপ্তায় দুটো করে ট্রেন চলত। দিনের শেষে কোম্পানির লাভ না হলে আর গাড়ি চালাবে কেন?”
“হেতিমার পর কী যেন গ্রাম আছে সব?”
“কুসুমপুর, ঝিগড়া, বেড়োল, চাঁপাডাঙা… তারপর কী যেন একটা… শেষে দিগনগর।”
“তার মানে… ওই দিকটার কথা কেউ জানেই না।”
“কিন্তু যাবেন কীভাবে? সার্ভার ঠিক না থাকলে রেলের চাকা এক ইঞ্চি ঘুরবে না।”
.
প্রদীপের মুখে একটা অদ্ভুত হাসি খেলে গেল, “কেন, সেই ভিন্টেজ স্টিম ইঞ্জিনটা?”
.
॥ ৫॥
বছর পাঁচেক আগে একবার রেল কোম্পানি একটা অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নেয়। অনেকেই এখন পুরোনো দিনের স্বাদ নিতে চায়। তাই চড়া টিকিট নিয়ে রেল তাদের জন্য একটা প্রমোদভ্রমণের ব্যবস্থা করে। তাতে একটা স্টিম ইঞ্জিন হাওড়া থেকে সওয়ারি ভরে বালি, বেলুড়, শ্রীরামপুর, চুঁচুড়া, চন্দননগর হয়ে ব্যান্ডেল পর্যন্ত যায়। ওখানে গাইড যাত্রীদের নামিয়ে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসে। প্রতিটা বড়ো স্টেশনেই এমন ব্যবস্থা।
হরিদাস এই ইঞ্জিনের কথা জানত না। জানলে আগে থেকেই রেললাইন কেটে রেখে দিত। এখন আর উপায় নেই। ওরা এসেই আক্রমণে যাবে না, হরিদাস জানে। নিশ্চিতভাবে স্টেশনের ওপারে জঙ্গলে ওরা আশ্রয় নিয়েছে। কিছুদিন মেপে নেবে। বুঝবার চেষ্টা করবে কোনও বিপদ আছে কি না। তারপর…
এই তারপরটা আর ভাবতে চায় না হরিদাস। হাতে আর বেশি সময় নেই। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। সেই রাত্তিরেই মোড়লদের নিয়ে গাঁয়ের একপাশে সভা করল হরিদাস। সবাইকে নির্দেশ দেওয়া হল, কেউ যেন অকারণে বাইরে না বেরোয়। বাড়িতে আলো না জ্বালে। জ্বালতে হলেও জানলায় কালো কাপড় ঢেকে। এই বিপদেও এতদিন এই গ্রামে আঁচটা অবধি লাগতে দেয়নি সে। আজ আর গা বাঁচানো গেল না। সেদিন সারারাত বলাই কামারের হাপর চলল। খবর পেয়ে আশেপাশের চার-পাঁচ গ্রাম থেকেও লোকজন এসে জড়ো হল। এই বিপদে সবাই একসঙ্গে জড়ো না হলে চলবে কী করে? মেয়েদের হাতে তুলে দেওয়া হল কাটারি, দা, বঁটি। ছেলেরা শানিয়ে নিল কুঠার, বল্লম, লাঠি, তিরের ডগা। আজ থেকে চব্বিশ ঘণ্টা গ্রামে পাহারা দেওয়া হবে। কাছেই পাহাড় থেকে চুনাপাথর কেটে নিয়ে এল অমিত, হানিফ আর সুবল। প্রথমে কেউই বোঝেনি এ দিয়ে কী হবে। হরিদাস সবাইকে পাখিপড়া করে বুঝিয়ে দিল।
স্টেশন থেকে গ্রাম অবধি নির্দিষ্ট দূরত্বে এক-একজন করে ছেলে মোতায়েন। কোনও সন্দেহজনক কিছু দেখলেই শিস দিয়ে সে জানান দেবে। পুরোনো গাদা বন্দুকটা পরিষ্কার করে তাতে গুলি ভরে তৈরি হল হরিদাস। এখন অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই।
.
প্রদীপ আর তার দলবল দুইদিন ধরে নজর রাখছিল গোটা গ্রামের উপরে। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল গ্রামে এসেই তারা সরাসরি হামলা করবে। কিন্তু বাদ সাধল প্রকৃতি। দলের প্রায় সবার কম্প দিয়ে জ্বর আর পেটখারাপ। দুইদিন জঙ্গলে কোঁ কোঁ করে কাটল। ভাগ্যিস গাঁয়ের লোকরা বুঝতে পারেনি। এই সময় পালটা আক্রমণ করলে ঠেকানোর জো ছিল না। তবে একটাই ভরসা। আসার আগে একটা বন্দুকের দোকান লুট করে বেশ কিছু বন্দুক আর টোটা নিয়ে এসেছে ওরা। কেউ মারতে এলে এলোপাতাড়ি গুলি চালাবে।
তৃতীয় দিন ঘোর অমাবস্যা। গোটা গ্রাম যেন অন্ধকার এক কুয়োতে ডুবে রয়েছে। প্রদীপ স্থির করল আজকেই সুযোগ। স্টেশন আর গ্রামের মধ্যে বিরাট বড়ো মাঠ। আকাশে একটুকরো চাঁদ থাকলেও কারও নজর এড়িয়ে সে মাঠ পার হওয়া অসম্ভব। দলের দুই-একজন আপত্তি করছিল। তাদের কথায় বিন্দুমাত্র আমল দিল না প্রদীপ।
“এখানে বেশিদিন পড়ে থাকলে ওরাই একদিন এসে আমাদের মেরে রেখে যাবে। যারা এখন সঙ্গে যাবে না, ফিরে এসে তাদের আমিই খুন করব এই বলে দিলাম।” হিসহিসিয়ে বলল সে।
অনিচ্ছাতেও সবাই উঠে দাঁড়াল। অবশ্য খাবারেও টান ধরেছে।
নতুন গ্রাম। নতুন মানুষ। নতুন খাবার।
স্টেশন পার হতেই একটা দোয়েলের শিসের মতো আওয়াজ কানে ভেসে এল। এত রাতে দোয়েলের ডাক? আর-একটু এগোতেই কোথায় একটা কুবো পাখি ডেকে উঠল যেন। এবার প্রদীপ নিশ্চিত হল। তাদের কেউ ফাঁদে ফেলার চক্রান্ত করছে।
“চুপ। কেউ এক পা-ও এগোবে না।” কান পেতে কী যেন শুনতে চেষ্টা করল প্রদীপ। গোটা রাত যেন বোবা হয়ে গেছে। শুধু রাতচরা ঝিঁঝিঁর ডানার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে এদিক ওদিক থেকে।
প্রদীপ বলল, “ছড়িয়ে যেয়ো না। কাছাকাছি থাকো সবাই। এই অন্ধকারে যেমন আমরা ওদের দেখতে পাব না, ওরাও আমাদের দেখতে পাবে না। আলাদা হয়েছ কি মরেছ।”
গোটা মাঠ নির্বিঘ্নেই পার হয়ে গেল সবাই। গ্রাম যেন মরে পড়ে আছে। এমনটা প্রদীপ ভাবেনি। সবাই কি পালিয়ে গেল নাকি? তাহলে তো যে কাজে আসা সেটাই সফল হবে না। হাতের বন্দুকটা আবার একটু সামনে তুলে ধরল প্রদীপ। দলের সবাই এবার একটু যেন ভয় ভয় পাচ্ছে। পাওয়াই স্বাভাবিক। এদের কেউই তো পেশাদার খুনি না। একমাস আগেও কেউ মুটের কাজ করত, কেউ দোকানদার, আবার কেউ বা খাবার ডেলিভারি বয়। পরিস্থিতির চাপে আজ সবাই খুনি। কিন্তু খুন এদের মজ্জায় ঢোকেনি এখনও।
মাঠ পেরিয়ে মন্দির, আর তারপরেই একটা উঁচুমতো ঢিপি। ঢিপির উলটো দিকে কী আছে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু একটা হালকা লালচে আলোর আভা। প্রথমে প্রদীপ গুঁড়ি মেরে ওপারে দেখল। নানা জায়গায় ছোটো ছোটো করে আগুন জ্বালানো হয়েছিল। কেন কে জানে? এখন এ আগুন নিভে লাল আলো ছড়াচ্ছে। এটুকু আলোতে ধরা পড়ার ভয় নেই।
ফিরে এসে সবাইকে জানাল প্রদীপ। এই অংশটা দ্রুত পেরিয়ে যেতে হবে। ওপাশে প্রচুর ঘরবাড়ি। তাতে আলোও জ্বলছে। মানে লোকজন আছে। প্রদীপের সঙ্গের লোকদের আর তর সইছিল না। প্রায় সবাই মিলে একজোটে ঢিপি পেরিয়ে নামতেই আচমকা যেন ম্যাজিক হল। সেই লালচে আলো দপ করে জ্বলে উঠল সবার চোখ ধাঁধিয়ে।
প্রথমেই শোনা গেল একটা গাদা বন্দুকের গুলির শব্দ। প্রদীপের কপাল ফুটো করে গিয়ে সেই গুলি বিধল পিছনের শ্যাওড়া গাছের গুঁড়িতে। বাকিরা কিছু বোঝার আগেই শয়ে শয়ে তির এসে ফুঁড়ে ফেলল তাদের গলা, হাত, পা, বুক, মুখ। কেউ অস্ত্র চালানোর সময়টুকু পেল না। কোথা থেকে দা, কাস্তে হাতে রে রে করে তেড়ে এল গাছকোমর বাঁধা একদল মেয়েমানুষ। একজনেরও মুন্ডু আর ধড়ে রইল না। গোটা ব্যাপারটা ঘটল কয়েক মিনিটের মধ্যে। চুনাপাথর গরম করলে নির্দিষ্ট উষ্ণতায় তা দপ করে জ্বলে ওঠে। তার নাম লাইমলাইট। জানত হরিদাস। আজ সেই লাইমলাইট একেবারে ঠিক সময়ে তার কাজ করে দিয়েছে। জ্বলে পুড়ে এখন আবার কালচে লাল বরন হয়ে গেছে। শুকনো রক্তের মতো।
সেই নিকষ অন্ধকারের মধ্যে একদল ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁফাচ্ছে। শুধু একটা গলা শোনা গেল। হরিদাসের গলা।
“ওদের অস্ত্রগুলো নিয়ে নাও। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।”
“কিন্তু…”
“কোনও কিন্তু নেই। লড়াইতে জিতেছি ঠিকই, কিন্তু আমি নিশ্চিত সারা বিশ্বে এতদিনে যুদ্ধ বেধে গেছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। অস্তিত্বের সংগ্রাম। এই সংগ্রামে হয় তুমি ওদের মারবে, নয়তো ওরা তোমায় মারবে। কোনটা চাও?”
বলতে না বলতে অমাবস্যার রাত্রিকে চিরে দিল একটা শব্দ।
একটা হুইসলের শব্দ।
ট্রেনের হুইসল।
আরও একটা স্টিম ইঞ্জিন চেপে আবার কারা যেন স্টেশনে এসেছে।
.
খানিকক্ষণ কারও মুখে কোনও কথা নেই। কেউ কিছু বোঝার আগেই হরিদাস চিৎকার করে উঠল-
“অ্যাটাক!”
.
লেখকের জবানি— আফসার ব্রাদার্স প্রকাশিত কল্পবিজ্ঞান আর ডিসটোপিয়ান গল্পের সংকলন ছায়াপথ-এ গল্পটি প্রথম প্রকাশ পায় এই 2024-এর বইমেলায়। বছরখানেক আগে একদিন আচমকা কয়েক ঘণ্টার জন্য ফেসবুক বিকল হয়ে যায়। সবাই কেমন পাগলের মতো হয়ে গেছিল ওই সময়। তখনই মনে হয় এই ভার্চুয়াল টাকাপয়সার দুনিয়ায় একদিন সবকিছু বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের কী হবে? সেই চিন্তা থেকেই এই গল্পের জন্ম।
