বনফায়ার – কৌশিক মজুমদার
বনফায়ার
সেই অলৌকিক রাতে ভুটানের পাহাড় বেয়ে ঠান্ডা হাওয়া আসছিল হুহু করে। মাথায় মাঙ্কি টুপি, গায়ে আলোয়ান জড়িয়ে একদল ভূতের মতো জড়োসড়ো হয়ে বসেছিলাম আমরা কজন। আমরা যারা উইকএন্ডের ছুটিতে জয়ন্তী নদীর ধারে বেড়াতে এসেছি। নভেম্বরের কনকনে শীত। সামনে বনফায়ার জ্বালানো হয়েছে। কিন্তু তাতে আর ঠান্ডা কমে কই! দেহের সামনের দিকটায় আগুনের তাপ লাগছে, কিন্তু তিরতিরে নদীর ওপর থেকে বয়ে আসা হালকা জোলো বাতাস শিরদাঁড়া কাঁপিয়ে দিচ্ছে একেবারে আক্ষরিক অর্থেই। একটু আগেই এই বনফায়ারে মুরগির রোস্ট হয়েছে। পোড়া ঘি আর মাংসের গন্ধ এখনও বাতাস থেকে মিলিয়ে যায়নি। অবশিষ্ট হিসেবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে একরাশ শালপাতা। কোথা থেকে দুটো কুচকুচে কালো কুকুর এসে চেটেপুটে সাফ করছে সেগুলো।
একটা চ্যাটালো পাথরে উবু হয়ে বসে অমল গল্প বলে চলছিল। “রাত প্রায় দুটো হবে। একা এয়ারপোর্ট থেকে ফিরছি যশোর রোড হয়ে। তখন কবরখানাটা পেরোলেই একটা আসশ্যাওড়া গাছ ছিল। এখন কেটে ফেলেছে। সেদিনও এমন ঠান্ডা। গাড়ির সব কাচ বন্ধ। হঠাৎ মনে হল গাড়ির কোনও একটা জানলা খুলে গেছে। ঠান্ডা একটা হাওয়া ভিতরে ঢুকে হাড় অবধি জমিয়ে দিচ্ছে। অবাক হয়ে পাশের দিকে তাকাতেই দেখি আমার ঠিক পাশে একটা লোক বসে আছে। স্থির। সামনের দিকে তাকিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির ব্রেক চেপে গাড়ি থামালাম। আলো জ্বেলে দেখি কেউ নেই। ব্যস! ওই একদিন। অতটুকুই। পরেও আরও অনেকদিন অনেকবার ওই রাস্তায় রাতে গেছি। কিচ্ছু হয়নি।”
অমল আমাদের গাড়ির ড্রাইভার। ওর সুমো চেপেই আমরা এসেছি এখানে। খাওয়াদাওয়া সেরে এখন আড্ডা চলছে পুরোদমে। আর যেমন হয়, নানা প্রসঙ্গ ঘুরে আলোচনা এল ভূতে। কেউ ভূত দেখেছে কি না। কেউ দেখেনি। ফলে ভৌতিক থেকে অলৌকিকের দিকে আলোচনা মোড় নিল। আর তখনই অমল বলল ওর গল্পটা। একেবারে ছোট্ট গল্প। তাই মন ভরল না অনেকের। দলের মধ্যে সবচেয়ে ছটফটে মেয়ে অনন্যা। ক্লাস নাইনে পড়ে। ও-ই সবাইকে “বলো না, বলো না” বলে গল্প বলাচ্ছিল। এবার দেখি আমার পালা।
“তুমি এত বছর পাহাড়ে পোস্টিং ছিলে, কোনও দিন ভূত দেখোনি এ হতেই পারে না। নিশ্চয়ই দেখেছ, বলছ না।”
“তাহলে তো মিথ্যে গল্প বানিয়ে বলতে হয়। বরং আমি আমার শোনা একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতার গল্প বলি। আমার না। আমার এক স্যারের। এক বৃষ্টির দিনে চা মুড়ি খেতে খেতে বলেছিলেন আমায়। গল্পটার মজা এই যে প্রথমদিকে মনে হয় এ তো চেনা গল্প। কিন্তু শেষে গিয়ে সব কেমন গুলিয়ে যায়। কথার মাড় না বাড়িয়ে গল্পটা বলি বরং…
আমাদের বাড়ি হাবড়া অশোকনগরে। সেখানেই বয়েজ সেকেন্ডারি স্কুলে আমার পড়াশুনো। ভালো ছাত্র হবার কারণে শিক্ষকদের ভালোবাসা তো পেয়েইছি, উপরন্তু দু-একজনের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেছিল। এখন যার কথা বলছি তিনি আমাদের বাংলা শিক্ষক। নাম বিমল কুমার মজুমদার… আমার বাবার সমনামী। একদিন স্যারের বাড়ি গেছি। প্রবল বৃষ্টি। সন্ধ্যা একটু আগেই নেমে গেছে যেন। বাড়ি ফেরার উপায় নেই তাই চা মুড়ি খেতে খেতে আলোচনাটা কেমন করে যেন ভূতে চলে এল। আমার ভূত দেখার অভিজ্ঞতা নেই। স্যারকে বললাম, “আপনি দেখেছেন?” উনি হঠাৎ চুপ। খানিক ভেবে আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে বললেন, “নাহহ! তবে এমন একটা কিছু দেখেছি, বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলে না।”
আমি গল্পের আশায় চেপে ধরলাম। উনি চায়ে চুমুক দিয়ে গল্প শুরু করলেন…
“আমি যখন স্কুলে পড়তাম ততদিনে বড়দা চাকরি পেয়ে গেছে, মেজদা কলকাতায় নাইট কলেজে পড়ে আর দিনে একটা ছোটো চাকরি করে। আমি অশোকনগরের বাড়িতে বাবা মায়ের সঙ্গেই থাকি। দাদারা কখনও হপ্তায়, কখনও মাসাস্তে বাড়ি আসতেন। তখন আমি ইন্টারমিডিয়েট দেব। একা রাত জেগে পড়তে ঘুম পায় দেখে পাড়ার বন্ধু মানিককে জুটিয়ে নিলাম। দুই বন্ধু মিলে গ্রুপ স্টাডি করলে পড়া ভালো হবে। আমাদের মূল বাড়ির পাশেই একটা ছোটো ঘর ছিল। আলাদা। সেটাকেই স্টাডি রুম বানালাম। পড়া, আড্ডা ভালোই চলতে লাগল।
সেদিন সন্ধে থেকেই আকাশের মুখভার আর গুমোট গরম। তাও দেখি রাত নটা বাজতে না বাজতে মানিক খেয়েদেয়ে বইখাতা নিয়ে হাজির। অগত্যা পড়তে বসতেই হল। বসতে না বসতে প্রচণ্ড মেঘের গর্জন আর তুমুল বৃষ্টি। এমন বৃষ্টি খুব কমই দেখা যায়। আকাশ থেকে ঘড়া ঘড়া জল কে যেন মাটিতে ঢালছে। এক ঘণ্টা কেটে গেলেও বৃষ্টি থামার নাম নেই। মানিক একটু ঠান্ডা হাওয়া পেয়ে পড়তে পড়তে ঢুলছে। আমিও হ্যারিকেনের আলোয় শব্দ বিভক্তি আর ধাতু বিভক্তি পড়ছি। ঘরে জলের ছাঁট ঢুকছিল দেখে দরজাটা অনেক আগেই বন্ধ করেছি… তবু অতি ক্ষীণ একটা জলধারা ঘরে ঢুকে একটা দিক ভিজিয়ে দিয়েছে।
রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা হবে। আমি স্পষ্ট শুনলাম দরজায় কে যেন কড়া নাড়ল। ভাবলাম মনের ভুল। আবার এক আওয়াজ। এবার ভুল হতে পারে না। তাহলে কি বাবা কিংবা মা দেখতে এল আমরা ঠিক আছি কি না! কে জানে? মানিক তখনও একভাবে ঢুলে যাচ্ছে। বৃষ্টি পড়ছে অবিরাম। আমি উঠে দরজা খুলে দিলাম। দিয়েই চমকে গেছি। এ কী!! এত রাতে মেজদা!! তাও আমার ঘরে। হ্যারিকেনের অল্প আলোয় দেখলাম দাদার গায়ে কালো বর্ষাতি। হাত খালি। সারা মুখে জল। আর জলের একটা ফোঁটা নাকের ডগায় ঝুলে চিকচিক করছে। আমি প্রায় চেঁচিয়েই বললাম, “এ কি মেজদা! তুই এত রাতে!! ভিতরে আয়। সব ঠিক আছে তো!” ঠিক এই সময় পিছন থেকে মানিক একলাফে উঠে আমায় ঝটকা মেরে সরিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। ফিসফিস করে বলল, “এত রাতে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে তুই কার সঙ্গে কথা বলছিস বাবলু?” বললাম, “তুই কি পাগল? মেজদা এসেছে দেখ।” ও বলল, “দেখেছি। কেউ নেই।”
আমার জোরাজুরিতে দরজা আবার খোলা হল। সত্যিই কেউ নেই। বাড়ির ভিতর থেকে বাবা-মাকে ডাকা হল। তাঁরা কিছু টের পাননি। টর্চ জ্বালিয়ে চারদিক দেখাও হল।
কেউ নেই।
পরদিন সকালে বাবা বললেন, “বাবলু, মনটা কেমন কু গাইছে। তুই একবার শিয়ালদায় মেজোর মেসে যা। দেখ সব ঠিক আছে কি না।
শিয়ালদহ স্টেশনের কাছেই মেজদার মেস। পাঁচজন বোর্ডার। মেসে ঢুকতেই মালিকের বউ আভা কাকিমা কেঁদে বললেন, “বাবলু আইসো! তোমারে কে খবর দিল? তোমার দাদার তো কাইল রাত থেইক্যা ধুম জ্বর। অরা নিয়া এনআরএসে ভরতি করসে।’
মোহাবিষ্টর মতো গেলাম হাসপাতালে। দাদার খুব জ্বর। অজ্ঞান। পাঁচদিনের দিন চোখ খুলল দাদা। কাউকে চিনতে পারছে না। ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি। সেদিনই রাতে মারা গেল। খুব সম্ভব মেনিনজাইটিস। বলেছিল ডাক্তার।”
এই অবধি বলে স্যার থামলেন। চায়ের কাপে চুমুক দিলেন আবার। “দেখ কৌশিক, আমি যা দেখলাম সেটা তো ভূত না, কারণ দাদা এর পরও পাঁচদিন বেঁচে ছিলেন। কিন্তু আমি কিছু একটা দেখেছি। আমার চোখের ভুল না। নইলে আমি কলকাতায় আসতেই বা যাব কেন?”
“আমি তাহলে কী দেখলাম?”
ঠিক এইটুকু বলেছি, যারা শুনছিলেন তাঁরা গুনগুন করে আলোচনা শুরু করলেন, “এমন হয় জানো তো”, বললেন পল্লবীদি। অনন্যার মা। “হয়তো শেষ সময়ে ভাইকে দেখার প্রবল ইচ্ছে হয়েছিল। দেহ সঙ্গ দেয়নি। তাই…”
“না, না, এ বোধহয় নিশির ডাক”, বললেন অঞ্জনদা, পল্লবীদির বর। পেশায় সাংবাদিক। নেশায় ছবি আঁকিয়ে।
“ধুস, নিশি অন্য জিনিস। সে খুব ভয়ানক ব্যাপার”, পাইপে আগুন ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে অনির্বাণদা বললে। অনির্বাণদা কলেজের অধ্যাপক। সবাই তাঁকে বরদা বলে ডাকে। শরদিন্দুর সেই ভূতসন্ধানীর নামে। তিনি ভূত ব্যাপারে এক্সপার্ট। কীসব বইও নাকি লিখেছেন এসব নিয়ে।
“আর্বান লিজেন্ডস বোঝো? সেই লিজেন্ড অনুযায়ী নিশি হল সবচেয়ে ভয়ানক ভূত। কোনও তান্ত্রিক যদি কাউকে ক্ষতি করতে চায় তবে প্রথমে একটা সবুজ ডাবের ছাল ছাড়িয়ে তাতে সিঁদুর মাখায়। তারপর সে ডাবের মুখ খুলে মাঝরাতে মন্ত্র পড়ে জলকে জাগিয়ে তোলে। আরও কীসব কীসব করার পরে সেই ডাব হাতে নিয়ে যাকে নিশি ডাকা হবে, তার বাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। তখন নিশুতি রাত। অমাবস্যা-টস্যা হবে। সেখানেই নাকি ওই ডাবের ভিতর থেকে ভেসে আসে ডাক, যা শুনতে লাগে অভীষ্ট ব্যক্তির কোনও চেনা মানুষের কণ্ঠস্বরের মতো। এই ডাকে যদি লোকটি সাড়া দেয়, তাহলে তান্ত্রিক সেই ডাবের মুখটি খপ করে বন্ধ করে দেন। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই লোক হার্টফেল করে মারা যায়। নিশিরা নাকি দুবারের বেশি কাউকে ডাকতে পারে না। ফলে বলা হয়, রাতের বেলা তিনবার নিজের নামে ডাক শুনলে তবেই আওয়াজ করা উচিত।”
“ধুসস, যত্তসব বাজে গল্প। রাত হয়েছে। আমি শুতে চললাম”, বলে হোটেলের দিকে পা বাড়ালেন ডাক্তার সমীর সরকার। আমাদের দলের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ। স্ত্রী মারা গেছেন বছরখানেক হল। ক্যান্সারে। ছেলে সুকল্প এই সবে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ব্যাঙ্গালোরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেছে। প্রথমবার ছুটিতে এসে বাবার সঙ্গে উত্তরবঙ্গ ঘুরতে এসেছে।
“তুমি যাও বাবা। আমি আর-একটু বসি”, বলে কেমন যেন উশখুশ করতে লাগল সুকল্প। যেন কী একটা বলতে চায়।
“কি রে কিছু বলবি?” আমিই জিজ্ঞেস করলাম।
“হ্যাঁ, মানে…” সুকল্প ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিল ওর বাবা কতদূরে, তারপর দু-একটা ঢোঁক গিলে বলল, “মানে তুমি যে গল্পটা বললে না কাকু, আমারও অনেকটা ওইরকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল। কাউকে বলিনি। শুধু মা জানত। মা বাবাকে বলতে মানা করেছিল। বাবা এসবে বিশ্বাস করে না। তুমি বললে, তাই ভাবলাম আমিও বলি।”
“আরে বাহ্। দারুণ তো!” প্রায় লাফিয়ে উঠল অনন্যা। “বলো বলো, শুনি।
আগুন তখন প্রায় নিভু নিভু। কাঠ শেষ হয়ে এসেছে। পাশেই বসেছিল পুড়পুড়ে এক বুড়ো। হোটেলের কেউ হবে। সে-ই উঠে কোথা থেকে একরাশ কাঠকুটো এনে আগুনটা উসকে দিল। আমরাও সবাই মিলে নতুন গল্প শুনব বলে আরও ঘন হয়ে বসলাম।
“আমার মায়ের তখন সবে ক্যান্সার ধরা পড়েছে। প্রায়ই বাবা মাকে নিয়ে ঠাকুরপুকুর যায়। আমি সারাদিন বাড়িতে একা থাকি। আমার বাড়ি থেকে ইস্কুল বেশি দূর না। হেঁটেই যেতাম। আগে মা পৌঁছে দিত। নাইনে ওঠার পরে বন্ধুরা খেপায় বলে একাই যাতায়াত করতাম। মা বলেছিল বড়ো রাস্তা দিয়ে না যেতে তাই একটা সরু গলিপথ বেছে নিলাম। আর তখনই ছেলেটাকে প্রথমবার দেখি।”
“কোন ছেলেটা?” জিজ্ঞেস করল অনন্যা।
“আমার চেয়ে একটু ছোটো। মানে দশ-এগারো বছর হবে। গায়ে একটা গেরুয়া কালারের ফতুয়া। পরনে কালো ঢোলা প্যান্ট। এমন জামাকাপড় পরতে আমি আগে কাউকে দেখিনি। ছেলেটার হাতে একটা টিনের খেলনা। ট্যামটেমি। এই নামটা পরে ওই আমাকে বলেছিল। আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে থাকত, মিটিমিটি হাসত আর হাতের সেই ট্যামটেমি ঘোরাত। ছেলেটার ডান চোখের উপরে একটা জড়ুল। চিবুকে কাটা দাগ। স্কুল যাবার সময় কোনও দিন ওকে দেখতাম না। দেখতাম ফেরার সময়। একটা বকুল গাছ ঝড়ে বেঁকে প্রায় রাস্তায় চলে এসেছিল। ওটার গুঁড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। কখনও ডালে বসে পা দোলাত। আমি শুরুতে পাত্তা দিতাম না। তারপর ধীরে ধীরে আমিও ওকে দেখলে হাসতাম। হাত নেড়ে “হাই” করতাম। ছেলেটাও হাত নাড়ত। একদিন দেখি হাতছানি দিয়ে আমায় ডাকছে। কাছে গেলাম। অদ্ভুত মিহি গলায় সে জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কী ভাই?” বললাম। ওর নাম জিজ্ঞেস করতে বলল ভোলানাথ। ভোলানাথ ঘোষ।
“আমি বাড়ি থেকে পালিয়েছি। সব জিনিসপত্র নিয়ে”, বলল ভোলানাথ। “সে কী! কেন?”
“বাবা আবার বিয়ে করেছে। সৎমা আগে ভালো ছিল। এখন ছেলে হবার পর আমায় খুব মারে। এই দেখো না, গরম খুন্তি দিয়ে কী করেছে।
ফতুয়ার হাতা গুটিয়ে দেখাল ভোলা। লালচে বাদামি রঙের বেশ লম্বা একটা কালশিটে দাগ।
“সে কী! এমন করে কেউ মারে নাকি?”
“আমার মা মারে। কথা না শুনলেই মারে। আর অভিশাপ দেয়। বলে মরে যেতে। তাহলেই নাকি তার হাড় জুড়াবে।
“তোমার বাবা কিছু বলে না?”
“বাবা তো এখানে থাকেই না। কলকাতায় সওদাগরি আপিসে চাকরি করে। বাড়ি আসে মাসে একবার। বাড়ি এলে আমার সঙ্গে কথাই বলে না। খেয়েদেয়ে মায়ের সঙ্গে দরজায় খিল দিয়ে ঘুমায়। জানি না, মা কী বলেছে, বাবাও আজকাল আমায় পছন্দ করে না।
“তুমি যাবে কোথায়?”
“তা জানি না। তবে আমার বন্ধু আছে। গিরিন। একদিন রাতে মা আমায় বাড়ি থেকে বার করে দিয়েছিল। খেতে দেয়নি। আমি রাস্তায় বসে কাঁদছিলাম। সেদিনই প্রথম গিরিনের সঙ্গে দেখা। ও একা থাকে। ও আমাকে বলেছে মনখারাপ লাগলে ওর সঙ্গে গিয়ে থাকতে। আমি ওর বাড়ি চিনি না। তবে ও বলেছে এই সামনের সরু সুরকির রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলেই ওর থাকার জায়গা। তুমি আমায় নিয়ে যাবে ভাই?”
ছেলেটার গলায় এমন কিছু ছিল যে না করতে পারলাম না। একবার ভাবলাম সন্ধে হয়ে আসছে। শীতকাল। মা চিন্তা করবে। বাড়ি ফিরে যাই বরং। পরে কী মনে হল, ছেলেটাকে বললাম, “চলো তবে।”
সামান্য লেংচে চলে ছেলেটা। বাঁ পা একটু ছোটো। ওর পাশে পাশেই সেই সুরকি রাস্তা ধরে চললাম আমরা দুজন। গোটা রাস্তায় দুধারে বড়ো বড়ো গাছ। এদিকে আমি আসিনি কোনও দিন। বড্ড নির্জন। নিস্তব্ধ। পাখিদের ডাক এদিকে তেমন নেই। কেন কে জানে? এই সময় তো ওদের ঘরে ফিরে আসার সময়। রাস্তাটা বেশ কয়েকটা বাঁক নিয়ে একটা খোলা জায়গায় শেষ হল। সেখানে ছোটো ছোটো সব মন্দিরের মতো কী যেন এদিক ওদিক ছড়িয়ে। আলো কমে আসছে। আকাশে চাঁদ উঠেছে। আমার ভয় ভয় করতে লাগল। আমি ভোলাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার বন্ধু কোথায়?”
“জানি না। এখানেই কোথাও হবে”, বলে এদিক ওদিক খুঁজতে চেয়ে দেখতে থাকল ভোলা।
হঠাৎ পিছন থেকে “এসেছ তোমরা?” শুনে চমকে তাকিয়ে দেখি পিছনের আসশ্যাওড়া বন থেকে একটা আলোয়ান মুড়ি দিয়ে ভোলার বয়সি একটা ছেলে আসছে। পরনে ধুতি।
ওকে দেখেই ভোলার মুখে হাসি ফুটল।
“এই তো গিরিন। কোথায় ছিলে এতক্ষণ?”
“আসলে সূর্য না ডুবলে তো বেরুতে পারিনে ভাই, মানা আছে। তাই একটু দেরি হল। তোমরা এসেছ বুঝেছি। তা সঙ্গের জনটি কে?”
আমি নিজের নাম বললাম। পরিচয় দিতে গিয়ে বললাম, “ভোলার বন্ধু।” জানি একদিনের পরিচয়ে বন্ধু হয় না, তবু আর কীই বা বলা যেত।
“তুমিও কি আমাদের এখানে থাকবে ভাই? ভারী মজা হয় তবে। আমি সারাদিন এখানে একা একা থাকি। ঘুরে বেড়াই। আমার কোনও বন্ধু নেই। তোমরা আমার বন্ধু হবে?”
“একা থাকো মানে? আর কেউ নেই তোমাদের এখানে?”
“আছে। তবে সব বুড়ো বুড়ি। সারাদিন সারারাত শুধু ঘুমিয়ে থাকে। আমার সঙ্গে খেলে না। আমি খেলতে বললে বলে গোল করিসনে। ঘুমাতে দে। এত বছর ঘুমিয়েও শাস্তি নেই। আরও ঘুমাতে চায়।”
“তোমরা থাকো কোথায়?”
“আমি থাকি ওই ঝোপের পিছনে। ছোট্ট চাতালে। ওরা সবাই দূরের ওই বড়ো বাড়িতে থাকে।”
এতক্ষণ খেয়াল করিনি, এবার দেখলাম একটু দূরে ইটের তৈরি বিরাট এক ঘর। ভগ্নপ্রায়। করোগেটেড টিনের দরজাটা সামান্য খোলা। ভিতরে কুচকুচে অন্ধকার।
ততক্ষণে আকাশে চাঁদ উঠে গেছে। ফুটফুটে জ্যোৎস্না। একটু খেয়াল করতেই বুঝলাম আমরা মাকালতলার শ্মশানে এসে গেছি। এটার নাম শুনেছি অনেকদিন। বহু প্রাচীন জায়গা। এককালে খুব নামকরা শ্মশান ছিল। প্রচুর মড়া পোড়ানো হত। আগে কাঠের চুল্লি ছিল। এই অঞ্চলের ইলেকট্রিক চুল্লি এখানেই প্রথম আসে। তারপর একদিন ভয়ানক বিপদ ঘটে। গোটা চুল্লিঘরে আগুন লেগে যায়। দুটো মড়া পোড়ানো হচ্ছিল তখন। মড়ার সঙ্গে ডোম, বাড়ির লোকজন কেউ বেরোতে পারেনি। ওই ঘরেই জ্যান্ত পুড়ে মরা কাঠ হয়ে যায়।
বাইরে যারা ছিল তারা বলে দরজা নাকি কোনও অজ্ঞাত কারণে খোলা যাচ্ছিল না। একদম চেপে, এঁটে বসেছিল। অনেক রাতে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ঢোকে। তখন সব শেষ। আগুন কেন লাগল কেউ জানে না। শর্ট সার্কিট। ধরে নিয়েছিল সবাই। তবে সেই থেকে পৌরসভা এই শ্মশান বন্ধ করে কদমগাছির মোড়ে নতুন শ্মশান বানায়। এই সব আমার জন্মের আগের গল্প। মায়ের মুখে শুনেছিলাম।
“কি গো এসো, আমি কোথায় থাকি দেখে যাও।” ডাকল গিরিন I
ওর পিছনে পিছনে আসশ্যাওড়ার বন পেরিয়ে দুজনে একটা ভাঙা চাতালে এলাম। পাশেই একটা প্রায় ধসে পড়া স্মৃতিস্তম্ভ। চাঁদের আলোতে দেখলাম তাতে এক ফাটল ধরা শ্বেতপাথরে কী যেন লেখা। পড়বার চেষ্টা করলাম। “একমাত্র পুত্র গিরীন্দ্রশে… মৃত্যু— ২২ ফাল্গু..” ছাড়া আর কিছু পড়া যাচ্ছে না।
সবচেয়ে অবাক কাণ্ড, আমি ভয় পেলাম না। যেন খুব স্বাভাবিক একটা জিনিস। কিংবা কোনও নাটক, যার কিছুই বাস্তবে সত্যি না। যাতে আমিও অভিনয় করছি। অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “তুমি এখানে কতদিন আছ?”
“সে হিসেব নেই ভাই। তবে এতটুকু মনে আছে সে বছর রবি ঠাকুর নোবেল পেয়েছিলেন। আমার পাড়ায় কলেরা দেখা দিল। এক রাতে ফৌত। মা এসে আমাকে এখানে শুইয়ে দিল। মা খুব কাঁদছিল। বাবা এই ফলকখানা গড়ে দিয়েছে। তারপর থেকে অনেক খুঁজেছি। বাবা মাকে দেখতে পাইনি।”
“এই শ্মশানে আগুন লাগল কীভাবে?”
এবার গিরিনের মুখে একটা ভয়ের ভাব দেখলাম। আমতা আমতা করে বলল, “সব আমি জানি না ভাই। আমি বাইরে থাকি। ওই ঘরে ঢুকি না। বাইরে থেকে ডাকাডাকি করি। ওই ঘরে আরও কারা যেন সব থাকে। বাইরে আসে না। ওরা বড্ড খারাপ। কেউ কারও উপরে প্রতিশোধ নিতে চাইলে ওদের দলে নাম লেখায়।”
“কীভাবে?”
“ওই যে দরজা দেখছ, ভেজানো। ওই দরজা দিয়ে কেউ ভিতরে ঢোকে না। ঢুকলে ওরা ধরেই নেবে তুমি ওদের দলে নাম লেখাতে চাও। প্রতিশোধ হয়তো হবে, কিন্তু তার বিনিময়ে…” থেমে গেল গিরিন।
“এসব কথা থাক ভাই। চলো আমরা খেলা করি।”
মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমরা গিরিনের সঙ্গে খেলে চললাম সারা রাত ধরে। ছোঁয়াছুঁয়ি, লুকান্তিচোর। হাঁফিয়ে গেছিলাম। গিরিন দেখিয়ে দিল পাশেই বয়ে যাচ্ছে টলটলে খালের জল। সেখান থেকে জল খেয়ে পাশেই বিরাট পেয়ারা গাছটার ডালে পা ঝুলিয়ে বসে গল্প করলাম তিনজন। ভোলার শুধু গল্পে মন নেই। বারবার ফিরে তাকাচ্ছে ওই ইটের ঘরটার দিকে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে?”
ভোলা উত্তর দিল না।
পুব দিক ফর্সা হয়ে এল।
গিরিন বলল, “এবার তো আমাকে যেতে হবে ভাই। আবার সন্ধেবেলা এসো। খেলা করব।”
আমি কিছু বললাম না। ভোলা বলল, “আমি কোথায় যাব তবে? আমি তো পালিয়ে এসেছি।”
গিরিন চুপ। আমি বললাম, “তবে আমার বাড়ি চলো। আমার মা খুব ভালো। কিছু বলবে না।
ভোলা আবার গিরিনকে বলল, “তুমি যে বলেছিলে এখানে এলে তুমি থাকতে দেবে? মিথ্যে কথা বলেছিলে? শুধুই খেলার বাহানায়?”
গিরিন উত্তর দিল না। মাথা নিচু করে চুপ করে রইল।
আমি ভোলাকে হাত ধরে টেনে বললাম, “চলো। আমার বাড়ি চলো।”
সেই বিরাট ইটের ঘরটার পাশ দিয়ে যাচ্ছি, শুনতে পেলাম ভিতরে অদ্ভুত হিসহিসে একটা শব্দ। যেন একটা সাপকে কেউ কলসিতে বন্দি করে রেখেছে। ভোলা একবার সেই ভেজানো দরজার দিকে তাকাল, তারপর আমার হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে সেই ঘরে ঢুকে গেল। দরজার ফাঁক বন্ধ হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। আমি অনেক চেষ্টা করলাম। দরজা খুলল না। আমি সেই ভাঙা বাড়ির জানলা দিয়ে ভিতরে তাকালাম। একেবারে খালি। কেউ নেই।”
এইটুকু বলে যেন দম নিতেই থামল সুকল্প। পাশের জলের বোতল থেকে এ ঢোঁক জল খেল।
প্রথম কথা বলল অনন্যাই, “তারপর?”
“তারপর আর কিছু নেই। এইটুকুই। আমি সকালে বাড়ি ফিরে দেখি হইহই পড়ে গেছে। বাবা পুলিশে খবর দিয়েছে। সত্যি মিথ্যে মিলিয়ে বললাম যে পথ হারিয়ে সারারাত শ্মশানে ছিলাম। বাবা বকা দিয়ে ছেড়ে দিল। তারপর আমার ভয় হল। এবার পুলিশ নিশ্চয়ই ভোলার খোঁজ করবে। আর ভোলার খোঁজ করতে গিয়ে আমায় নিয়ে টানাটানি হবে। শরীর খারাপ বলে এক হপ্তা স্কুলে গেলাম না। তাতেও কোনও খোঁজ হল না। একমাস বাদে আমি নিজেই খোঁজ নিতে শুরু করলাম। সে এক অবাক কাণ্ড। আমাদের অঞ্চলে নাকি কোনও ছেলে হারিয়ে যায়নি। এমনকি ভোলানাথ ঘোষ নামে কোনও ছেলেই নাকি নেই এই গোটা অঞ্চলে। একটা জলজ্যান্ত ছেলে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। কেউ তার কোনও খবর রাখে না। তাই এখন মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে। যেটা কাকু বলল, আমি তাহলে কী দেখলাম?”
“ভোলানাথ বাড়ি থেকে এমনি পালায়নি। বাপ-মাকে বিষ খাইয়ে মেরে তারপর পালিয়েছিল। ওর মা বলত ও মরলে নাকি ওর মায়ের হাড় জুড়োয়, তাই… আর সেই ঘরে ঢোকার মূল্য যে কী ভয়ানক …” বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল সেই বুড়োটা। হাতে একটা লোহার কড়াই। সেখান থেকেই কাঠ নিয়ে আগুন উসকে দিচ্ছিল এতক্ষণ। আমরা কেউ খেয়াল করিনি। এবার দেখলাম বুড়োর ডান চোখের উপরে একটা জড়ুল, চিবুকে অস্পষ্ট একটা কাটা দাগ। আরও দেখলাম কড়াই থেকে বুড়ো আগুনে যেগুলো ফেলছিল সেগুলো কিছুতে কাঠ না। সেগুলো মনুষ্যজাতীয় কোনও প্রাণীর সাদা হাড়।
.
আমাদের সবাইকে একেবারে নির্বাক করে দিয়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে বুড়োটি জয়ন্তী নদীর পাশের জঙ্গলের অন্ধকারে মিশে গেল।
.
লেখকের জানি- পাড়ার সবাই মিলে একবার জয়ন্তী নদীর ধারে বেড়াতে গেছিলাম। এই গল্পের প্রেক্ষাপটে জাস্ট সেই সন্ধ্যার কথাই আছে। প্রথম দুটো গল্প আমার নিজের কানে শোনা, তবে একটু অন্যভাবে। আমি গল্পের খাতিরে তাদের বদলে নিয়েছি। শেষ গল্পটা নেহাত ফ্যান্টানি গল্প। মৃত শিশুদের নিয়ে অদ্ভুত একটা গ্রাফিক নভেল পড়েছিলাম। নাম বিউটিফুল ডার্কনেন। সেখান থেকেই শেষ গল্পটার আইডিয়া মাথায় আসে, যদিও লেখার পরে দেখি মূলের মঙ্গ আকাশ পাতাল তফাত হয়ে গেছে। প্রথম ছাপা হয়েছিল প্রাচী পত্রিকায়।
