পেডিকিওর – কৌশিক মজুমদার
পেডিকিওর
সেই অদ্ভুত গোলাপি সন্ধ্যায় আমি মৃত মানুষকে ফিরে আসতে দেখেছিলাম।
আমাকে পাগল ভাববেন না। একেবারে সত্যি! এই যেমন এখন এই গুলোকে ধরে ধরে কম্পিউটারের কিবোর্ডে টাইপ করছি, এই যেমন আপনার হাতের বইয়ের পাতায় লেগে থাকা আলগা গন্ধ, মলাটের রং, কালির আঁচড় সত্যি, তেমন সত্যি। মৃত মানুষের ফিরে আসার গল্প করতে বসিনি আমি। আমি গল্প বলতে জানি না। শিখিনি। শেখার মধ্যে একটা জিনিস শিখেছিলাম। পয়সা এচ করে। উচ্চমাধ্যমিকে জঘন্য রেজাল্ট হয়েছিল। বুঝে গেছিলাম পড়াশুনো আমার দ্বারা হবে না। তখন সদ্য সদ্য চারিদিকে গজিয়ে উঠছে স্পা, সালোন, পার্লার। শুনেছিলাম ওখানে কাজ শিখলে নাকি ভালো রোজগারের সম্ভাবনা। বাবা তখনও বেঁচে ছিল। সামান্য কিছু পুঁজি। সেখান থেকেই কোনওক্রমে কিছু ধার নিয়ে আমি নাভেদ হাবিবের বিউটিশিয়ান কোর্সে ভরতি হলাম। সেই ধার আমায় শোধ করতে হয়নি। বাবা তার আগেই মরে গেছিল।
সেখানেই আমার আলাপ হয়েছিল রত্নার সঙ্গে। ছোটো একহারা চেহারা। মুটা ঢলঢল। কালো গায়ের রং। কিন্তু হাসলে যেন একসঙ্গে অনেকগুলো আলো জ্বলে ওঠে। সেই পাথরপ্রতিমা থেকে ক্লাস করতে আসত। আমারই বয়সি। ওর বাবা ছিল না। মামাবাড়িতে মানুষ। মামা উচ্চমাধ্যমিক অবধি টেনেছে, আর পারবে না। বাবার কিছু জমানো টাকা মায়ের কাছে ছিল। মা সেটা দিয়েই…
সেই প্রথম আমরা জানতে পারলাম অ্যারোমাথেরাপি নামে এক শব্দ আছে। জানতে পারলাম গন্ধ মানুষের রোগ দূর করে। জানলাম এক গন্ধ থেকে অন্য গন্ধে যাবার আগে শুঁকে নিতে হয় কফি বিন। নইলে গন্ধ মিলে মিশে যায়। জানলাম লবঙ্গ গন্ধের মোমের সঙ্গে লেবু গন্ধের মোম জ্বালাতে নেই। কেন? সেটা কোনও দিন কেউ বুঝিয়ে বলেনি। আমরা ক্লাসে নির্দেশ নিয়ে যেতাম। শিখতাম কীভাবে ম্যাসাজ করলে সবচেয়ে তৃপ্ত হয় কাস্টমার। জানলাম মানুষের পায়েই রয়েছে সারা দেহকে সুস্থ করার চাবিকাঠি। গোটা দেহে দশটা আলাদা শক্তিস্থল আছে। পায়ের বুড়ো আঙুল থেকে সোজা একটা নার্ভ নাকি চলে যায় একেবারে মগজের ঘিলুতে। কে জানত মাথার খুসকি তাড়ানোর একমাত্র উপায় নাকি বুড়ো আঙুলের ঠিক তলাটায় হালকা করে ম্যাসাজ করা! শুনতে শুনতে মাঝে মাঝে নিজেকে ডাক্তার বলে মনে হত। আমরা ঠাট্টা করতাম। এইচ এস পাশ ডাক্তার। ট্রেনাররা বলতেন, যা শেখানো হচ্ছে, তার বাইরে যেন কিচ্ছুটি না করি। মন দিয়ে শুনতাম। আমার পাশে বসে রত্নাও একমনে শুনত। মানুষের মুখের দিকে তাকানোর আগে পায়ের দিকে তাকাতাম। কতরকম পা। সুন্দর, চাষাড়ে, ক্ষয়াটে, ডায়াবেটিক রোগীদের ফাটা পা, একনজরে চিনে নিতাম সব কিছু। পা দেখে মানুষ বিচার করা শিখিয়েছিল আমাদের। কীভাবে পায়ে মলম দিয়ে মালিশ করতে করতে এমনভাবে ডেড সেল থেকে শুরু করে পায়ে গ্যাংগ্রিনের গল্প করতে হবে, যাতে কাস্টমার ভয় না পায়, কিন্তু নিজের পা নিয়ে চিন্তিত হয়ে বারবার স্পা-তে ফিরে ফিরে আসে। কে প্রতি হপ্তায় আসার মতো, কে আর আসবে না- আমরা বুঝে নেবার চেষ্টা করতাম।
এই কাজে সবচেয়ে দক্ষ ছিল রত্না। রত্নার চেয়ে সুন্দরী, লাস্যময়ী অনেক মেয়ে ছিল আমাদের গ্রুপে। আমাদের অনেক ছেলেরা টেরিয়ে তাদের দেখতাম। কিন্তু কী অদ্ভুতভাবে কাস্টমারদের প্রথম পছন্দ ছিল রত্না। একেবারে ছাপোষা এই মেয়েটার মধ্যে এমন কিছু ছিল, যাতে বহু কাস্টমার ঠিক ওর জন্যেই ঘুরে ঘুরে আসত। বসে থাকত ওর হাতের স্পর্শ পাবার জন্য। দুই কোমল হাতের আঙুলে রত্না যখন মোলায়েমভাবে চেয়ারে আধশোয়া পুরুষের ফুট ম্যাসাজ করে দিত, বিশ্বাস করুন, অনেকের মুখে আমি অর্গাজমের সুখ দেখেছি।
রত্না নিজের কথা বলত না খুব বেশি। শুধু জানতাম ওর এক প্ৰেমিক আছে। ব্রাহ্মণ। আর রত্নারা সাহা। তাই একটা অশান্তি দানা বেঁধে উঠছে ধীরে ধীরে। কাস্টমারদের সামনে ছাড়া রত্না কথা বলা, হাসা বন্ধ করে দিল। কামাই বাড়তে লাগল। ও ছিল আমাদের স্টার পারফর্মার। প্রথম প্রথম অথরিটি কিছু বলেনি। একদিন বাধ্য হয়ে ওকে ধমকাল। ও উত্তর দেয়নি। শুধু চোখের কোণে জল চিকচিক করতে দেখেছিলাম। পরের দিনই শুনলাম ও নাকি আর আসবে না। ও মরে গেছে। গলায় দড়ি দিয়ে। প্রেমিকের সঙ্গে।
সেসব অনেক বছর আগের কথা। প্রায় দশ বছর তো হবেই। আমি এখনও নাভেদের সেলুনে কাজ করি। দুবার ইনক্রিমেন্ট হয়েও যে মায়না পাই, তাতে বিয়ে করা যায় না। তবে একটা ইউনিটের হেড করা হয়েছে আমাকে। নিজের হাতে কাজ করি না, স্পেশাল কাস্টমার ছাড়া। ক্লাস নিই। হপ্তায় একদিন ট্রিঙ্কাসে মদ খেতে যাই। অদ্ভুত গোলাপি আলোতে ভরে থাকে মিং রুম। আমি এক কোণে বসে তিন চার পেগ মদ টেনে বাড়ির দিকে টলমল পা বাড়াই।
সেখানেই সেদিন আবার রত্নাকে দেখলাম। ডোরম্যান দরজা খুলে দিতেই ফারের জ্যাকেট, টাইট স্কার্ট আর হাই হিলের যে মেয়েটা আধবুড়ো একটা লোককে প্রায় জড়িয়ে ধরে ঢুকল, ও রত্নাই। আর কেউ হতেই পারে না। ওই হাসি রত্নার। আমি চিনি। পায়ের দিকে তাকাতে আমি নিশ্চিত হলাম। এই পা আমার অনেকদিনের চেনা। ক্লাস চলার সময় রিক্লাইনিং চেয়ারে বসে একটু ইতস্তত করে এই পা-ই বাড়িয়ে দিত রত্না। এই পায়েই পেডিকিওরের প্র্যাকটিস করেছি আমি। এই পায়ের ছোট্ট লালচে জড়ুল, পায়ের কাফ মাসলের তিল, সব আমার চেনা। আমার চার পেগ মদ খাওয়া হয়ে গেছিল। অন্যদিন হলে আমি উঠে যেতাম। আজ উঠলাম না।
রত্না এই লোকটার সঙ্গে বড্ড বেশি ঘনিষ্ঠ। লোকটার হাত ওর সারা শরীরে ঘুরছে। ও বাধা দিচ্ছে না। হেসে হেসে ঢলে পড়ছে তবু লোকটার গায়ে। ওরা অর্ডার দিল। খাবার। মদ। ঠিক তখনই লোকটার মোবাইলে একটা ফোন এল। বসা অবস্থা থেকে সটান দাঁড়িয়ে পড়ল লোকটা। আমি শুধু শুনতে পেলাম, “এখুনি আসছি, এখুনি আসছি ডার্লিং।” রত্নার কানে ফিসফিস করে কী যেন বলল লোকটা। রত্না মাথা নাড়ল। তারপর সোজা হাত পাতল। লোকটা পিছনের পকেট থেকে মোটা একটা পার্স বার করে রত্নার খোলা হাতে গোটা দুই গোলাপি নোট গুঁজে, ওয়েটারকে ডেকে বিল মিটিয়ে তিরের মতো বেরিয়ে গেল দরজা দিয়ে। রত্না কোনও তাড়াহুড়ো করল না। খুব ধীরে ধীরে বেছে বেছে খাবার খেতে লাগল কাঁটা চামচে দিয়ে। মাঝে মাঝে অল্প চুমুক দিতে লাগল মদের গেলাসে। আমি নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে পাশের টেবিলে ওর সামনের চেয়ারটাতে বসে বললাম, “কেমন আছিস রত্না?”
রত্না চমকাল না। শুধু ভুরু তুলে আমাকে একবার দেখল। ওর হাতের আঙুলে হিরের আংটি চকচক করছে। গায়ে লাইল্যাকের মন কেমন করা গন্ধ। গাঢ় লাল ঠোঁট ভিজে ভিজে। মুখে অদ্ভুত একটা হাসি নিয়ে রত্না শুধু বলল, “আপনাকে কি আমি চিনি?” আমি নিজের পরিচয় দিলাম। রত্না আমায় চিনতে পারল। জিজ্ঞেস করল আমি এখনও নাভেদের ওখানেই আছি কি না। জিজ্ঞেস করল কত পাই। জিজ্ঞেস করল আমার কাঁচা টাকার দরকার আছে কি না। আমি জানালাম আছে, কিন্তু কীভাবে? ও বলল পেডিকিওর করেই। আমাকে ওর সঙ্গে যেতে হবে। ফাইভ স্টার হোটেলে। সেখানে হাইক্লাস ক্লায়েন্ট আছে। তাদের পেডিকিওরে এক-এক সিটিং-এ দশ হাজার টাকা।
“শুধু পেডিকিওর?”
“হ্যাঁ, আর সামান্য কিছু সার্ভিস”, বলে চোখ মারল রত্না। মুখে আবার অদ্ভুত এক হাসি। “আমার কিছু বছর চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশের মহিলা ক্লায়েন্ট আছে। তারা তোমার মতো ছেলে চায়। যাবে আমার সঙ্গে?”
আমি না করতে পারলাম না। বাইরে বেরিয়ে রত্না কাকে একটা ফোন করল। তারপর উবের বুক করল। গাড়িতে উঠেই রত্না প্রথম আমায় যা বলল, সেটা ওর নাম এখন রত্না না। মারিয়া। মারিয়া গোমেজ। রত্না সাহা মরে গেছে দশ বছর আগে। রত্না সাহা এক বামুনের ছেলের সঙ্গে প্রেম করত। খাঁটি বামুনের ছেলে। নিষ্ঠাবান, ত্রিসন্ধ্যা আহ্নিক করা। রত্নার প্রেমে পড়ায় সংসারে খুব অশান্তি হয়। সে ছেলে বাড়ির পাশে নিমগাছে গলায় দড়ি দেয়। পুলিশ বেজায় হাঙ্গাম করেছিল। রত্নার মামাবাড়ি থেকে ওকে তাড়িয়ে দেয়। রত্না এক কাপড়ে বেরিয়ে আসে। তখন থেকে ওর নাম মারিয়া।
“এখন কার সঙ্গে থাকিস?”
“কেন, অমরেশের সঙ্গে।”
বুঝলাম অমরেশ মারিয়ার নতুন প্রেমিক। কিন্তু সে এসব জানে?
রত্না অমরেশের কথা বলে চলছিল। ওরা লিভ-ইন করছে। অমরেশ ওর খুব টেক কেয়ার করে। খেয়াল রাখে। অমরেশের জন্যেই ও কাউকে তোয়াক্কা করে না। রাতবিরেতে কোথাও যেতে ভয় পায় না। এর আগে একবার এক ক্লায়েন্ট নাকি মারিয়ার সঙ্গে বেগড়বাই করেছিল। অমরেশ ওকে শায়েস্তা করেছে।
কথা বলতে বলতে গাড়ি ডেস্টিনেশানে পৌঁছে গেল। কলকাতার নামজাদা এক ফাইভ স্টার হোটেল। গেটের সামনেই ছেলেটা দাঁড়িয়ে ছিল। ধ্যাড়ধ্যাড়ে লম্বা, রোগা, ফ্যাকাশে ফর্সা। গায়ে টকটকে লাল জামা। মাথা পুরো ন্যাড়া। দেখে কেমন একটা অস্বস্তি হয়। মারিয়া হাতছানি দিয়ে ওকে ডাকল। ও এগিয়ে আসতেই প্রথম ওর চোখ দুটো দেখতে পেলাম। অদ্ভুত জ্বলজ্বলে। যেন ভিতর অবধি দেখে ফেলছে। বেশিক্ষণ সেই চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা যায় না। মারিয়া জানাল এ-ই অমরেশ। বুঝলাম প্রেমিক কাম দালাল। আর এও ব্ৰাহ্মণ। পিছন ফিরতেই মাথার টিকি দেখে নিশ্চিত হলাম। অমরেশের কঙ্কালসার চেহারায় এমন কিছু একটা ছিল, যা হাড় হিম করে দেয়। অমরেশ বেশি কথা বলছিল না। যতটুকু বলল তাতে দেখলাম ওর গলার স্বর স্বাভাবিক না। সর্দি বসা। ফ্যাসফ্যাসে।
মারিয়া অমরেশকে জানাল, ওর এক ক্লায়েন্ট আছে নয়তলায়। তিনি আর তাঁর স্ত্রী। আমরা দুজন তাঁদের পেডিকিওর করতে যাব। অমরেশ মাথা নাড়ল। মারিয়া বলল, “সেবারের মতো ঝামেলা হলে তুমি তো আছই।” কী ঝামেলা আমি জানি না। জানতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু ওরা কিছু বলল না। আমি শুধু অমরেশের কথা ভাবছিলাম। ওকে বড্ড চেনা চেনা লাগছে। কেন জানি না। আগে কোনও দিন দেখেছি কি? নাহ। তবে? এইবার মনে পড়েছে। ঠিক এইরকন দেখতে একজনের কথা ছোটোবেলায় মায়ের মুখে শুনেছি। দীর্ঘকায়, মুণ্ডিতমস্তক, ধবধবে রং, পরনে রক্তাম্বর, গলার স্বর সর্দি বসা। পায়ে… অমরেশের পায়ের দিকে তাকালাম। শুকনো কাঠের মতো। শিরা উপশিরা সব একে অপরকে পেঁচিয়ে আছে। পায়ে কাঠের জুতো। চললে খটখট আওয়াভ হচ্ছে। একটা অদ্ভুত অজানা ভয় আমায় খুব ধীরে ধীরে চেপে ধরতে লাগল। এ আমি কোথায় চলেছি? কার সঙ্গে চলেছি? গত দশ বছর যার কোনও খবর নেই, বেঁচে আছে না মরে গেছে জানি না, তার সঙ্গে, তার বিচিত্র প্রেমিকের সঙ্গে আমি এ কোন পথে পা বাড়ালাম?
ভাবার আগেই লিফটের দরজা খুলে গেল। দরজার সামনেই একটা ঘর। দরজার প্লেটে এমবস করে নম্বর লেখা “৯০৫।” অমরেশ আমাকে আর মারিয়াকে দরজা অবধি পৌঁছে দিয়ে চলে গেল। বেল বাজানোর কিছু বাদে দরজা খুলে দিলেন মাঝবয়সি এক ভদ্রলোক। পিছনেই এক বিপুলাকার মহিলা। তাঁর স্ত্রী হবেন। দুটো বিছানায় টাওয়েল পাতা। সাইড টেবিলে সার ধরে ম্যাসাজের প্রোডাক্ট। লোশান।
খানিক বাদেই ওঁরা দুজন জন্মদিনের পোশাকে শুয়ে পড়লেন খাটে। মারিয়া ভদ্রলোকের ফুট ম্যাসাজ শুরু করল আর আমি মহিলার। দুজনেই মুখ দিয়ে অস্ফুট গোঙানির আওয়াজ করছিলেন। এই অবধি ঠিক ছিল। আচমকা ভদ্রমহিলা আমার মাথার চুল ধরে টেনে নিলেন নিজের দিকে। কিছু বোঝার আগেই প্লাস্টিকের একটা স্ট্র্যাপ দিয়ে বেঁধে দিলেন আমার দুই হাত। তারপর দুই পা। আমরা যখন ঘরে ঢুকেছিলাম, আমাদের একটা ওয়েলকাম ড্রিঙ্ক দেওয়া হয়েছিল। তাতে কিছু ছিল। আমার মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। আড়চোখে দেখলাম মারিয়াকেও একইভাবে বেঁধে তার জামাকাপড় একের পর এক খুলে নিচ্ছে লোকটা। বর বউ দুজনেই খুব হাসছে। আমারও একই দশা হল। শরীরে একটা সুতোও নেই। এবার সাইড টেবল থেকে অদ্ভুত একটা জিনিস বের করেছে লোকটা। তলায় ধাতব হাতল। উপরে একগাদা সরু সরু তার সিংহকেশরের মতো দুলছে। প্রতিটা তারের মাথায় ছোট্ট লোহার বল। এ জিনিস আমি দেখেছি। নিজের চোখে না। বিদেশি সিনেমায়। মধ্যযুগীয় সেক্সুয়াল টর্চারের অস্ত্র। ঝন করে একটা শব্দ হতেই এক আর্ত চিৎকার। দেখলাম মারিয়ার গোটা শরীর কুঁকড়ে গেছে ব্যথায়। পিঠে সরু সরু দাগ। চিনচিনে রক্ত বেরোচ্ছে।
আবার ঝনন আওয়াজ হতেই বুঝলাম এবার আমার পালা। প্রতিটা মাংসপেশি চিরে, স্নায়ু ধমনিকে কেটে কেটে বসে যাচ্ছে এক-একটা তার। প্রাথমিক ব্যথা কমতেই জ্বালাটা শুরু হল। যেন গোটা শরীরে শুকনো লংকা বেটে মাখিয়ে দিয়েছে কেউ। মারিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে অদ্ভূত স্থির। চোখ শান্ত। ঠোঁটে বিড়বিড় করে কী যেন বলছে। এবার ওর পালা। আবার। কিন্তু ঠিক সেই সময় দেখতে পেলাম ঘরে আরও একজন এসে উপস্থিত। এই বন্ধ ঘরে সে কেমন করে এল আমায় জিজ্ঞেস করবেন না। আজ অবধি সে উত্তর আমি পাইনি। অমরেশ। ঘরে অদ্ভুত এক গন্ধ। এটা আগে ছিল না। মরা মাছ আর চন্দনবাটা মেশালে যেমন গন্ধ হয়, তেমন উৎকট গন্ধ। অমরেশকে দেখে দুজনে স্পষ্টতই চমকে উঠল। আমার মাথা ঘোরা বাড়ছে। অমরেশ মারিয়াকে মুক্ত করে ফেলেছে। অমরেশের দুই হাত যেন লম্বায় বহু বহুগুণ বেড়ে একত্রে দুজনের গলা টিপে ধরল। তুলোর পুতুলের মতো নেতিয়ে পড়ল দুটো দেহ। অমরেশ সেই অবশ দেহগুলোকে নিয়ে হেলায় ছুড়ে ফেলল সামনের খাটে। চিত হয়ে পড়ে আছে দুটো দেহ। পা ঝুলছে মাটি স্পর্শ না করে। সেই ঘোর লাগা অবস্থাতেও মনে পড়ল, মা বলত এই অবস্থাকে নাকি ত্রিশঙ্কু বলে। না মর্তে, না স্বর্গে। এই অবস্থায় মৃত্যু হলে নাকি মানুষ পিশাচ হয়ে যায়। ঘরে সেই গন্ধটা ক্রমাগত বাড়ছে। মারিয়া আর অমরেশ খুব যত্নে দুজনের দুইজোড়া পা নিজেদের বুকের সামনে তুলে ধরেছে, ঠিক যেমনটা আমাদের পেডিকিওরের ক্লাসে শিখিয়েছিল। তারপরেই প্রায় একইসঙ্গে কামড় বসাল দুইজন। অজ্ঞান হয়ে যাবার আগে শেষবারের মতো দেখতে পেলাম, অতি তৃপ্তিতে দুজন সেই ঝুলে থাকা পাগুলো চিবাচ্ছে।
পুলিশ এসে আধখাওয়া মৃতদেহ দুটো বাদে কেবল আমাকেই সেই ঘরে পেয়েছিল। সামান্য জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়। আমার হাত পা বাঁধা ছিল। আমার দ্বারা কিছু করা সম্ভব না, সেটা বুঝেই।
রত্নাটা মরে পিশাচী হয়েছিল। ওর প্রেমিক ব্রহ্মদৈত্য। মাঝে মাঝে ওরা দুজন একসঙ্গে শিকারে বার হয়। আমার দুর্ভাগ্য, তেমনই এক শিকারের সঙ্গী হয়ে গেছিলাম। রত্না, মারিয়া কিংবা অমরেশের কোনও খোঁজ আজ অবধি পুলিশ পায়নি। ওরা যে জগতের বাসিন্দা, আমাদের সভ্য সমাজ তার খোঁজ পাবে কী করে?
.
লেখকের জবানি- আর্বান হরর মিথ নিয়ে একটা সিরিজ লিখব ভেবেছিলাম। এর আগে আঁধার আখ্যান সংকলনে প্রেতিনী বা শল্পের নাভি কিংবা অভিশাপ গল্পগুলো সেই ধারার। এবারে তাই বেছে নিয়েছিলাম বাংলার একেবারে চেনা ভূত ব্রহ্মদত্যিকে। যদিও একেবারে হাল আমলে এনে ফেলা হয়েছে তাঁকে। পেডিকিওর ব্যাপারে খুঁটিনাটি জ্ঞান আমাকে দিয়েছিল একটি মেয়ে। আমি তার নাম জানি না। একবার জাভেদ হাবিবস-এ পেডিকিওর করাতে গিয়ে মেয়েটি আমার সঙ্গে প্রচুর গল্প করেছিল। এখানে পেডিকিওর বিষয়ে যতটা লিখেছি, গোটাটার জন্যেই আমি তার কাছে ঋণী। প্রথম ছাপা হয়েছিল প্রাচী পত্রিকায়।
