অপদেবতা – কৌশিক মজুমদার
অপদেবতা
॥ ১॥
পশ্চিম মেদিনীপুরে বদলি হবার কিছুদিন পর থেকেই রুষা ওর বরের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করল। এতটা বেশি না যে চোখে পড়ে। খুব অল্প। কিন্তু কী যেন আগের মতো নেই। রুষার বর অরিন্দমের বদলির চাকরি। এতদিন হুগলি ট্রেজারিতে কাটিয়ে এবার মেদিনীপুরে এসেছে। সঙ্গে রুষাও। প্রথমদিকে কিছুদিন বাড়ি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। রুষা শ্রীরামপুরে নিজের বাপের বাড়িতেই ছিল। মাসখানেক দুজনে আবার একসঙ্গে থাকছে।
এই ভাড়াবাড়িটা মূল শহর থেকে একটু দূরে। এলআইসি মোড় থেকে কুইকোটা হয়ে আরও মিনিট তিরিশেক লাগে। কিন্তু সাজানো গোছানো গোটা বাড়ি মাত্র সাত হাজার টাকা ভাড়ায় অন্য কোথাও পেত না। এটাও পেল প্রায় কপালের জোরে। অরিন্দমের অফিস কলিগ সন্দীপনের শ্বশুরবাড়ি এটা। তার শ্বশুর মারা গেছেন কিছুদিন হল। বৃদ্ধা শাশুড়িকে একা রাখার প্রশ্নই নেই। উনি আজকাল সন্দীপনদের সঙ্গেই থাকেন। এদিকে বাড়ি বেশিদিন ফেলে রাখলে বেদখল হয়ে যাতে পারে। মানুষ থাকলে বাড়ির প্রাণ থাকে। তাই নামমাত্র ভাড়ায় অরিন্দমকে গোটা বাড়ি ভাড়া দিয়ে সে নিশ্চিন্ত।
বাড়ির চাবি পেতেই অরিন্দম রুষাকে নিয়ে এল। বেশ বড়ো একতলা বাড়ি। একটেরে। আশেপাশে অন্য বাড়ি নেই বিশেষ। সামনে ছোটো বাগান। সে বাগান কিছুদিন আগেও দেখাশোনা করা হত বলে বোঝা যায়। রুষার মন বেশ খুশি খুশি হয়ে গেল। অবসর সময়ে বাগান করে কাটবে এবার। রুষার বিয়ে হয়েছে বছর তিনেক হল। সবেমাত্র দুইমাসের পোয়াতি।
বাড়ির দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই গা গোলানো পচা একটা গন্ধ এল নাকে। রুষার উলটে বমি এসে গেল। অরিন্দমও রুমাল বার করে নাক চেপে ধরেছে। নিশ্চয়ই কিছু মরেছে। নইলে এমন গন্ধ হওয়া সম্ভব না।
“তোমাকে এই অবস্থায় ভিতরে ঢুকতে হবে না। আমি দেখছি”, বলে অরিন্দম একাই ভিতরে ঢুকে গেল। শাড়ির আঁচল নাকে চেপে বাইরে অপেক্ষা করছিল রুষা। খানিক বাদে অরিন্দম বেরিয়ে এসে বলল, “জানলা দরজা সব খুলে দিয়েছি। ফ্যানও চালিয়ে দিলাম। আসলে এতদিন ঘর বন্ধ ছিল কিনা।” রুষা আর চাপতে পারল না। বাগানের এক কোণে হড়হড় করে বমি করে ফেলল।
ছোটো থেকেই রুষা একটু পিটপিটে স্বভাবের। নোংরা সহ্য করতে পারে না। ঘরে ঢুকেই তাই তার মাথা গরম হয়ে গেল। প্রায় সব ঘরের কোনায় কোনায় ধুলোবালি, ছেঁড়া চুল, ছেঁড়া কাগজ, এমনকি মুরগির পালক জড়ো করে রাখা। কোনায় কোনায় পুরু মাকড়সার ঝুল। আরশোলা আর ইঁদুরের নাদি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এদিক ওদিক। ঘর এতদিন বন্ধ থাকায় সব মিলেমিশে দমবন্ধ করা এক গন্ধ ছড়াচ্ছে। বাড়ির পিছনে ঝোপ জঙ্গল। সে জঙ্গলে ভাঁট গাছ, ঘেঁটু গাছ, কালকাসুন্দের ঝাড়। একদিকের খোলা নালার পাশে তরতরিয়ে জলবিছুটির দল। তাতে ভাঙা কুলো, মুড়ো খ্যাংরা ঝাঁটা, ছেঁড়া চুল আর রক্ত মাখা স্যানিটারি ন্যাপকিন। নতুন বাড়ি পাবার আনন্দ এসব দেখেই ঘুচে গেল রুষার।
“আমি এই বাড়িতে রাত কাটাতে পারব না”, রুষা সাফ জানিয়ে দিল। “আজ হোটেলে কাটাই চলো। কাল আমায় কাজের লোক ঠিক করে দিয়ো। তুমি যখন অফিসে যাবে আমি গোটা বাড়ি সাফ করাব। বুড়ো বুড়ি এই বাড়িতে থাকত কেমন করে!”
কাজের লোক পেতে বিশেষ সমস্যা হল না। আগে যে কাজের বউটি ছিল তার নম্বরে ফোন করতেই সে রাজি। পরের দিন সকাল সকাল সে চলে আসবে। কিন্তু সমস্যা শুরু হল পরের দিন সকালে…
.
॥ ২॥
কাজের বউটি, যার নাম দীপালি, কিছুতেই রুষার কথামতো কাজ করতে রাজি না। সে মরে গেলেও ঘরের কোনার সেই জঞ্জাল সরাবে না। এমন না সে অবাধ্য। অন্য সব কাজ মুখ বুজে করে যাচ্ছে। জল তুলছে, আসবাব পরিষ্কার করছে। বারান্দা ঝাঁটিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু কোণের ওই নোংরা সাফ করতে বললেই এমন ভাব করছে যেন শুনতেই পাচ্ছে না। প্রথমদিকে খেয়াল করেনি রুষা। ভেবেছিল মাঝবয়সি মহিলা, সত্যিই বুঝি কানে কম শোনে। কিন্তু প্রায় সব কাজ হয়ে যাবার পরও যখন ঘরের কোনার নোংরা একই জায়গায় রইল, তখন রুমাকে একটু গলা চড়াতেই হল।
“কী ব্যাপার বলো তো? কতবার করে বলছি, তুমি এই কোনার ময়লাগুলো না সরিয়ে অন্য কাজ করে যাচ্ছ!”
“দিদিমণি, আগের মাসিমা মেসোমশাই এগুলো সরাতে মানা করতেন”, মিনমিন করে জানাল দীপালি।
“বললেই হল”, এবার রুষা রেগে যায়, “ঘরের মধ্যে এইসব নোংরা, মুরগির পালক নিয়ে কোনও মানুষ থাকতে পারে? তোমার পরিষ্কার করার ইচ্ছে নেই সেটা বলো।”
“না দিদিমণি, এগুলান সরাতে নাই। এই বাড়ি কুনি বুনির বাসা। এখানে সবাই জানে। কুনি বুনি এসব খেয়ে বাঁচে।”
“কার বাসা? কী খেয়ে বাঁচে?” রুষার মনে হচ্ছিল টাইম মেশিনে চেপে আবার সে মধ্যযুগে চলে এসেছে। “এই কুনি বুনি কে?”
“একজন না দিদিমণি। দুই বোন। অপদেবতা। আমাদের এখানে ওদের খুব মানে। ওরা সব বাড়ি বাসা বাঁধে না। ওদের ডেকে আনতে হয়।
“ডেকে আনতে হয়? কেন?”
“আসলে অনেকের বাড়িতে ছেলেপিলে বাইরে থাকে। দেখার কেউ থাকে না। বাড়িতে বুড়োবুড়ি দুইজন। ফাঁকা বাড়িতে চোর ডাকাতের ভয়। কে পাহারা দেবে? তখন প্রথমে বুনিকে ডাকতে হয়।”
“বুনি কে?”
“কুনির বড়ো বোন। বনে থাকে। তাকে ডাকতে হলে বাড়ির পিছনে নোংরা ফেলে রাখতে হয়। লম্বা ঘাস গজায়। বাড়ি পরিষ্কার করা যাবে না। তাতেও সে আসবে কি না ঠিক নেই। তবে অনেকসময় এসে বাসা বাঁধে।”
এবার রুষার মজা লাগছিল। এসব গল্প সচরাচর শুনতে পাওয়া যায় না।
“বুনি বাসা বাঁধল কি না বুঝব কেমন করে? এসে দেখা করে যাবে? বলবে আমি এসেছি?”
দীপালি রসিকতাটা ধরতে পারল না, “না না দিদিমণি! কুনি বুনিকে দেখা যায় না। ওরা এলে মাঝে মাঝে ওদের গলার আওয়াজ পাওয়া যায়। খোনা গলায় কথা বলে। মাঝরাতে শুনলে অনেকটা শাঁখের আওয়াজের মতো লাগে।
“ও আচ্ছা। তারপর?”
“ওই বুনিই কুনিকে ডেকে আনে। কুনি ঘরের ভিতরে, কোনায় বাসা বাঁধে। মাকড়সার জালে শুয়ে থাকে আর কাঁচা রক্ত খায়।”
“রক্ত খায়?”
“হ্যাঁ। মুরগির পালকের গায়ে কাঁচা রক্ত মাখিয়ে ঘরের কোণে রেখে দিতে হয়। কুনি সেই রক্ত খেয়ে তেষ্টা মেটায়। কুনি ঘর রক্ষা করে, আর বুনি ঘরের বাইরে। গৃহস্থের আর কোনও চিন্তা নেই।
“তোমাকে এইসব কে বলেছে?”
“কেন আগের যিনি মেসোমশাই ছিলেন! তিনিই তো মেয়ের বিয়ের পরে এই বাড়িতে কুনি বুনিকে পুষেছিলেন। বলেছিলেন কুনি বুনিকে তাড়াতে নেই। তাড়ালে…”
“অনেক বাজে কথা হয়েছে। আর বলতে হবে না”, বলে দীপালিকে থামিয়ে দিল রুষা।
পোষা ভূত! ভাবতেই হাসি পায়। যতদূর সে জানত মেদিনীপুরের মানুষরা বেশ আলোকপ্রাপ্ত। সেখানেও এসব আজগুবি জিনিস চলছে, তাও শহরের থেকে খানিক দূরেই, রুষা সেটা ভাবতেও পারেনি। এবার বেশ বিরক্তভাবেই বলল, “দ্যাখো, আগের মালিক কী করেছেন না করেছেন আমি জানি না, জানতে চাইও না। আমি এই নোংরায় থাকতে পারব না। তুমি এগুলো পরিষ্কার করো।”
দীপালি ভেবেছিল কুনি বুনির গল্প শুনে রুষা বুঝি নিরস্ত হবে। কিন্তু তাতেও যখন কাজ হল না, সে সাফ জানিয়ে দিল সে এই কাজ করতে পারবে না। সে ভূতে বিশ্বাস করে না। কিন্তু এইসব অপদেবতার প্রচুর ক্ষমতা। বাড়িতে তার স্বামী আছে। ছেলে মেয়ে আছে। এইসব অসৈরণ কাজ করলে তার পরিবারের ক্ষতি হতে পারে। রুষা জোর করলে সে সোজা কাজে জবাব দিয়ে চলে গেল।
এমনিতেই যবে থেকে রুষার পেটে বাচ্চা এসেছে, শরীরটা বিশেষ ভালো যায় না। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করতে পারে না। কিছু খেতে পারে না, নাকে গন্ধ লাগে। টেনশন করলে প্রেশার বেড়ে যায় চড়চড়িয়ে। এবার রুষা রেগে গেল। কাউকে লাগবে না। সে নিজেই যা করার করবে। নাকে কাপড় পেঁচিয়ে, হাতে ঝাঁটা নিয়ে কোণের সব ময়লা সাফ করে এক জায়গায় জড়ো করল। তারপর আগুন ধরিয়ে দিল কেরোসিন দিয়ে। পোড়া গন্ধে গা গোলাচ্ছে, মাথা টলমল। তার মধ্যেই যতদূর হাত যায় মাকড়সার জালগুলোকে টেনে টেনে নামাল সে। মোটা সুতোর মতো টানতে গেলেই জড়িয়ে যাচ্ছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধস্তাধস্তির পর রুষা দেখল এতক্ষণে বাড়ি থাকার যোগ্য হয়েছে কিছুটা। ক্লান্ত হয়ে কিছু না খেয়েই বিছানায় গা এলিয়ে দিল সে।
.
।।৩।।
ঘুম ভাঙল কলিং বেলের শব্দে। সন্ধে হয়ে গেছে। অরিন্দম অফিস থেকে বাড়ি এসে বেল বাজাচ্ছে। দরজা খুলে মন ভালো হয়ে গেল রুষার। বুদ্ধি করে অরিন্দম বিকেল আর রাতের খাবার নিয়ে এসেছে। বিকেলে চাউমিন আর রাতের জন্য ডিম তরকা। শুধু রুটিটা গরম গরম বানিয়ে নিলেই চলবে। রাতে খেতে খেতে কথায় কথায় দীপালির কথা তুলল সে। অত ব্যাখ্যান না করে জানাল, নতুন কাজের লোক খুঁজে নিতে হবে। এই মহিলা ভারী অবাধ্য। অরিন্দম কিছু না বলে মাথা নাড়ল বটে, কিন্তু কতটা কী পারবে তা নিয়ে রুষার বেশ সন্দেহ আছে। সেই রাতেই প্রথমবার আওয়াজটা শুনল রুষা। শেষ রাতে। প্রথমে একটা অস্বস্তিতে ঘুম ভাঙল। পরে বুঝল ঘর জুড়ে একটা অদ্ভুত গন্ধ যেন থম মেরে আছে। গন্ধটা দম বন্ধ করা। তার মধ্যেই বাইরের ঝোপজঙ্গলের মধ্যে থেকে খুব মৃদু একটা শব্দ ভেসে আসছে। কান পেতে শুনলে বোঝা যাচ্ছে। টানা আওয়াজ না। থেমে থেমে। কেউ কাঁদছে কি? না না। যেন খুব কাছেই কেউ শাঁখ বাজাচ্ছে। আওয়াজটা বাড়ছে। কমছে। মিলিয়ে যাচ্ছে। ফিরে আসছে…
পরের দিন সকালে উঠে দুজনেই অবাক। ঘরের কোনায় মাকড়সার জাল আবার ফিরে এসেছে। এবার আরও ঘন। আরও ঠাসবুনোট। মেদিনীপুরের মাকড়সারা এত করিতকর্মা সে ধারণা রুষার ছিল না। সেদিনও সে যতটা পারে ঝুল ঝাড়ল। কিন্তু পরের দিন আবার আগের অবস্থা। এদিকে দিন চারেক পর এক রবিবার অরিন্দম অফিসের ক্লাস ফোর স্টাফ বৃন্দাবনের বউকে ধরে আনল। সে-ই এখন থেকে কাজ করবে। বৃন্দাবন নিজে সারাদিন ধরে বাড়ির পিছনের জঙ্গল সাফ করে পুড়িয়ে ঝকঝকে তকতকে বানিয়ে দিল। কাকতালীয় হলেও তারপর থেকে ঘরে আর একটাও মাকড়সার জাল দেখা যায়নি। অরিন্দম বলল আসলে ওই জঙ্গলেই নাকি ওগুলো থাকত। জঙ্গলের সঙ্গে সঙ্গে ওরাও দূর হয়েছে। রুষা এতদিনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
.
।।৪।।
পরিবর্তনটা এত সূক্ষ্ম যে রুষার নজরে পড়তে বেশ কিছুদিন সময় লাগল। আগে অরিন্দম শাকসবজি পছন্দ করত বেশি। মাছ মাংসের প্রতি খুব বেশি আকর্ষণ ছিল না। ইদানীং অফিসফেরতা কুইকোটা বাজার থেকে প্রায়ই চিকেন নিয়ে আসে। সপ্তাহে প্রায় তিনদিন। রুষা অন্তঃসত্ত্বা। মাংসের গন্ধে তার গা গুলোয়। তবু অরিন্দমের কথা ভেবে সে রান্না করে। আচমকা এখানে এসে অরিন্দমের এত আমিষের নেশা কেন হল কে জানে! অবশ্য মানুষের স্বাদ বদলায়। তাই রুষা প্রথম প্রথম গা করেনি। দিন পনেরো যাবার পরে ব্যাপারটা আর-একটু অদ্ভুত হল। অরিন্দম মুরগি আর কাটিয়ে নিয়ে আসত না। অফিসফেরতা বাইকের পিছনে মুরগি ঝুলিয়ে নিয়ে আসত। বাড়ি ফিরে পোশাক বদলে, খালি গায়ে গামছা পরে নিজের হাতে সেই মুরগি জবাই করত। রুষা এসব দৃশ্য সহ্য করতে পারে না।
“তুমি এটা আবার কী শুরু করলে? মুরগি তো দোকানেই কেটে দেয়। বাড়ি এনে কাটার কী আছে?”
“আরে তুমি বোঝো না। ওদের ছুরি কেমন কে জানে। তার ওপরে যেখানে কাটে সেই কাঠটাও আনহাইজেনিক। তার চেয়ে বাড়ি নিয়ে এসে কেটে খাওয়া অনেক স্বাস্থ্যকর।”
এইরকম অদ্ভুত যুক্তি অন্তত অরিন্দমের মুখে শুনবে বলে রুষা কোনও দিন ভাবেনি।
বাড়ির পিছনের বাগানে কলাপাতা কেটে তাতে মুরগির টুকরো সাজানো হত। তারপর ঘরে এনে সর্ষের তেল, পেঁয়াজ, রসুন দিয়ে রান্না করত অরিন্দম নিজেই। বাড়তি মাংস রেখে দেওয়া হত ফ্রিজে।
সেদিন রাতে রুষার ঘুম ভেঙে গেল। অরিন্দম পাশে নেই। উঠে প্রথমেই টয়লেটের দিকে গেল রুষা। টয়লেটের দরজা বন্ধ। কোথায় গেল অরিন্দম? রান্নাঘরে মৃদু একটা আলো জ্বলছে। হলদে আলো। আলোটা ফ্রিজ থেকে আসছে। ফ্রিজের ডালা খোলা। ভিতরে হাত ঢুকিয়ে অরিন্দম কী যেন গোগ্রাসে খাচ্ছে।
“কী খাচ্ছ এত রাতে?”
প্রায় ভূত দেখার মতো চমকে উঠল অরিন্দম। তখনও তার গাল দুটো খাবারে ভর্তি হয়ে ফুলে রয়েছে। চোখ দুটো বিস্ফারিত। যেন কোনও অপরাধ করে ধরা পড়েছে। শুধু নিচের চোয়াল অজান্তেই উপর নিচ করে চিবিয়ে চলেছে কী একটা।
প্রায় দৌড়ে অরিন্দমের কাছে গেল রুষা, “মুখ খোলো। দেখি কী খাচ্ছ তুমি?”
জেদি বাচ্চার মতো চোয়াল বন্ধ করে রাখল অরিন্দম। রুষা তাকাল খোলা ফ্রিজের দিকে। কাঁচা মাংসের পাত্রটার ডালা খোলা। রাতে শোবার আগে যা দেখেছিল, প্রায় তার অর্ধেক হয়ে গেছে। বিস্ময় কাটতে না কাটতে ‘কটাস’ করে একটা শব্দ। হাড় মটকানোর।
অরিন্দমের কষ বেয়ে এক টুকরো হাড় সমেত কাঁচা মাংস মাটিতে পড়ল।
.
॥ ৫॥
সে রাতে দুজনের কেউ কারও সঙ্গে কথা বলেনি। পরদিন সকালে না খেয়েই অফিসে বেরিয়ে গেল অরিন্দম। রুষার কাছে দীপালির ফোন নম্বর ছিল।
“দীপালি, আমি রুষা দিদি বলছি।”
“হ্যাঁ দিদি বলুন। আমি কিন্তু অন্য জায়গায় কাজ নিয়েছি।”
“না, না। কাজ না। অন্য বিষয়ে। একবার আসতে পারো? দুপুর নাগাদ? খুব দরকার। এসো, আমি তোমায় পঞ্চাশটা টাকাও দেব।”
দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে দীপালির অপেক্ষায় বসে রইল রুষা। সাড়ে তিনটে নাগাদ দীপালি এল। নিজের ঘরে খাটে বসিয়ে খুব নরমভাবে জিজ্ঞেস করল রুষা, “আচ্ছা দীপালি, সেদিন যে বলছিলে, কুনি বুনিকে তাড়ালে কী যেন হয়? সেটা আর-একবার বলো তো।”
একটু হেসে দীপালি বলল, “বলতে আর দিলেন কই? আপনি তো শুনলেনই না। আর যা দেখছি”, বলে চারদিকে তাকিয়ে দেখল দীপালি, “কুনি বুনিকে তো তাড়িয়েই ছেড়েছেন। আর বলে লাভ কী?”
“তবু বলো”, রুষা জোর করে।
“কেন দিদিমণি? কিছু হয়েছে? সত্যি করে বলুন তো!”
“না, না। কী আবার হবে! এমনিই জানতে চাইছি। তুমি বলো।
প্রায় ফিসফিস করে দীপালি বলল, “আপনি পোয়াতি মেয়েমানুষ দিদিমণি। কী আর বলব। কুনি বুনিও তো মেয়ে। ওদের কেউ বিয়ে করে না। ওদের বাচ্চাকাচ্চা নেই। ওদের তাড়ালে ওরা বাড়ির পুরুষমানুষকে লোভ দেখিয়ে বশ করে। তারপর সে পুরো বশে এসে গেলে পোয়াতি মেয়েমানুষের বাচ্চাকে খেয়ে নেয়। এখনও সময় আছে দিদিমণি। বাবু থাক। আপনি বাপের বাড়ি চলে যান। কুনি বুনি আপনার মঙ্গল করবে না।
যাবার সময় টাকা দিতে চাইলেও নিল না দীপালি। শুধু বারবার রুষাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলল। রুষা বুঝতে পারছিল না কী করবে। এই সামান্য কারণে বাড়ি ছেড়ে যাওয়াটা নিজের কাছেই খুব বোকা বোকা লাগছে। আবার গত কয়েকদিন যা হয়ে চলেছে তার ব্যাখ্যা সাধারণ বুদ্ধিতে মেলে না। অরিন্দম কি পাগল হয়ে গেল? বিয়ের পর থেকে এই প্রথমবার অরিন্দমের কাছে থেকেও নিজেকে সুরক্ষিত মনে হচ্ছিল না। বরং অদ্ভুত একটা ভয় ভয় করছিল গোটা শরীর জুড়ে…
.
॥ ৬॥
সেদিন অফিস থেকে অরিন্দম ফিরল যখন, বাইকে দুটো কালো মোরগ বাঁধা। রুষা এদের চেনে। কড়কনাথ নাম। ঘরে ঢুকে একটাও কথা বলল না রুষার সঙ্গে। মুখ থমথমে। গম্ভীর। যেন এক্ষুনি রাগে ফেটে পড়বে। রুষার পেট এখন আগের চেয়ে অনেকটাই বড়ো হয়েছে। চট করে ওঠানামা করতে অসুবিধা হয়। তবু কোনওক্রমে ইজিচেয়ার থেকে উঠে অরিন্দমের পিছন পিছন রান্নাঘরে গেল সে।
“কিছু খাবে?”
কোনও উত্তর নেই। অরিন্দম শার্ট প্যান্ট ছেড়ে লাল গামছাটা পরল। এবার মুরগি কাটতে যাবে।
“কি গো রাগ করেছ নাকি?” মিটমাট করার চেষ্টা করল রুষা। তাকে প্রায় ঠেলা মেরে সরিয়ে দুই হাতে দুটো মোরগ নিয়ে পিছনের বাগানে চলে গেল অরিন্দম।
চুপচাপ বসে রইল রুষা। সে ঠিক করে নিয়েছে। কালকেই বাপের বাড়ি চলে যাবে। কুনি বুনির জন্য না। অরিন্দমের আচরণের জন্য। ভাবতে ভাবতে রুষা শুনতে পেল আজ যেন মোরগটা চেঁচিয়েই যাচ্ছে। থামছে না। প্রতিদিন যেমন দুই একটা ডাক ছেড়েই চুপ করে যায়, আজ তেমন না। কী হল আবার!
কঁক! ককঁক!! কঁক!! ডাক যেন চরম আর্তনাদে গোটা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ছে।
রুষা চেয়ার ছেড়ে উঠে পিছনের বাগানের দিকের জানলা খুলে দিল।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। কিন্তু কিছু আলো তখনও অবশিষ্ট আছে। আর সেই আলোতেই রুষা দেখতে পেল একটা মোরগ পা বাঁধা অবস্থায় একধারে পড়ে আছে। অন্যটা তীব্রভাবে ডানা ঝাপটানোর চেষ্টা করছে। পারছে না। এক হাতে তার দুটো ডানা আর অন্য হাতে ঘেঁটিটা ধরে একের পর এক কামড় বসিয়ে চলছে অরিন্দম। তার ঠোঁট, গাল আর নাকের এক অংশ রক্তে মাখা। চোয়ালের চাপে সে মোরগটার নলি ছিঁড়ে দিয়েছে।
নিজের অজান্তেই কখন তীব্র এক চিৎকার করে উঠেছিল রুষা জানে না। যখন বুঝল, তখন দেখল যে মাথা ঘুরিয়ে সে পড়ে গেছিল সেখানেই।
এখন সে শুয়ে আছে। মাথায় যন্ত্রণা। তার চেয়েও বেশি যন্ত্রণা তলপেটে। ঊরু বেয়ে গড়াচ্ছে লাল থকথকে একটা তরল। তার সামনে দুই পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে অরিন্দম। মুখে অদ্ভুত একটা হাসি। সে তাকিয়ে আছে রুষার ঊরু থেকে বয়ে আসা টাটকা রক্তের দিকে।
অরিন্দম জিভ বার করে একবার ঠোঁটটা চেটে নিল…
.
লেখকের জবানি— আবার আর্বান হরর। আবার চেনা জায়গা। যে বাড়িটার কথা আছে, আমি পশ্চিম মেদিনীপুরে থাকার সময় নিজে সেই বাড়িতে থাকতাম। কুনি বুনির গল্প আমি সেখানেই শুনেছি। তবে ওখানে এদের খুব বেশি ভয় পায় না। সেটা আমার কল্পনা। প্রথম ছাপা হয়েছিল প্রাচী পত্রিকায়।
