নজরদার – কৌশিক মজুমদার
নজরদার
আমার একেবারে স্পষ্ট মনে আছে প্রথম কবে আমি সেই লোকটাকে দেখেছিলাম। ছোটো করে কাটা বাটিছাঁট চুল, প্রায় ন্যাড়ামাথা বললেই চলে। একটা চোখ ফুলে প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে। অন্যটা খোলা। টকটকে লাল। মুখে অদ্ভুত একটা কষ্টের ছাপ। লোকটা সোজা আমার দিকে তাকিয়েছিল।
তখন আমি সবে ক্লাস সেভেনে উঠেছি। বাবার বদলির চাকরি। নতুন মিশনারি স্কুল। ইংলিশ মিডিয়াম। সবকিছুতে বড্ড কড়াকড়ি। স্কুলের মধ্যে ইংরাজি ছাড়া বাংলায় কথা বলা যেত না। বললেই মনিটর কোথা থেকে যেন উদয় হয়ে হাতে এসে একটা কার্ড ধরিয়ে যেত। এবার যার যার হাতে সেই কার্ড থাকবে তাদের কাজ আরও একজনকে খুঁজে বার করা, যে বেচারা ভুলে একবার বাংলায় কথা বলে ফেলেছে। আমাদের ক্লাসটিচার ছিলেন মিস ইলিয়ানা ডিমেলো। বছর তিরিশেক বয়স। অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। বিয়ে হয়নি। পরে জেনেছিলাম ডিভোর্সি। আমাদের ইংরাজি ক্লাস নিতেন। পান থেকে চুন খসলেই সপাং করে বেতের বাড়ি পড়ত হাতের তালুতে। ইস্কুলে বাংলায় কথা বলা তাঁর বিলকুল নাপসন্দ। নিজে খুব অ্যাকসেন্ট দিয়ে ইংরাজি বলতেন। আমাদেরও বলতে বাধ্য করতেন। ক্লাসে এই কার্ডের নিয়ম ওঁরই করা। প্রথম প্রথম আমরা খুব একটা গুরুত্ব দিইনি। দিব্যি বাংলায় কথা বলতাম। তারপর একদিন দিগন্ত মার খেল। এমনিতে হাসিখুশি, গোটা ক্লাসকে মাতিয়ে রাখে। সেদিন ইয়ার্কি মেরে ক্লাস মনিটরকে “ডিমেলো’স ডিয়ার” বলেছিল। মনিটর অনির্বাণ দেখতে শান্ত, কিন্তু রাতদিন ম্যাডামকে তেল মেরে চলে। সে প্রায় জোর করেই ওর হাতে কার্ড ধরিয়ে দিল। ম্যাডাম ক্লাসে ঢুকতেই পাশে গিয়ে ফিসফিস করে কী বলল জানি না, ম্যাডাম দিগন্তকে ডেকে নিলেন। ঠাস করে চড় পড়ল তার গালে। তারপর দিগন্ত কিছু বলার আগেই ওর গায়ে একের পর এক আছড়ে পড়ল বেত। দিগন্ত মাটিতে শুয়ে ফোঁপাচ্ছিল। ও জানে ওর বেলায় কোনও গার্জিয়ান কল হবে না। হলেও ওর বাবা মা আসবেন না। দুজনেই আলাদা আলাদা ভাবে নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। ডিভোর্স শব্দটা ও আমাদের অনেক আগে জেনেছিল। ম্যাডামের বেত থামতেই চাইছিল না। দিগন্ত এবার চিৎকার করছে, “আর করব না ম্যাডাম। প্লিজ পার্ডন মি” বলে। ম্যাডামের মাথায় যেন খুন চেপেছে। আমি ছিলাম থার্ড বেঞ্চের কোনায়। কী যেন হয়ে গেল মাথায়, আমি দৌড়ে গিয়ে দিগন্তকে তুলতে গেলাম। ডান হাতে তীব্র জ্বালা। বুঝলাম দিগন্তকে ছেড়ে ম্যাডাম এবার আমায় নিয়ে পড়েছেন। “হোয়াট ডু ইয়ু থিংক অফ ইয়োরসলেফ? আ সেভিয়ার?” বলে আরও দুটো বেতের বাড়ি পড়ল গায়ে। কঁকিয়ে উঠে দরজার দিকে তাকাতেই প্রথমবার লোকটাকে দেখতে পেয়েছিলাম। স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে। দরজা বন্ধ। কিন্তু প্রিন্সিপাল যাতে দেখতে পান ক্লাস কেমন চলছে তার জন্য দরজায় একটা খোপ কাটা থাকে। তাতে কাচ লাগানো। সেই কাচের মধ্যে দিয়ে লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। মুখে অদ্ভুত একটা হাসি। একবার মনে হল ও বুঝি আমায় বাঁচাবে। কিন্তু না। যেন মজা পাচ্ছে এইভাবে দেখে যাচ্ছিল লোকটা। ম্যাডামের পরের বেতটা গায়ে পড়ার ঠিক আগে আমি হাতের মুঠোয় বেতটা চেপে ধরলাম।
গার্জেন কল হল। আমার। হেডমিস্ট্রেস মিসেস আলপনা ডিক্রুজ আবেগহীনভাবে বাবাকে বলে যাচ্ছিলেন, ঠিক কীভাবে আমি আচমকা মিস ডিমেলোকে আক্রমণ করি। মিস ডিমেলোর গালে লাল দগদগে বেতের ঘা তখনও স্পষ্ট। তিনি একপাশে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। বিচারসভা প্রায় শেষ। ক্লাসের সবাই আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছে। দিগন্তও। আমাকে এই স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। বাবা অনেকবার অনুরোধ করলেন হেডমিস্ট্রেসকে। তিনি অনড়।
“কিছু মনে করবেন না মি. বোস, এই ধরনের ঘটনা খুব ব্যাড প্রিসিডেন্স তৈরি করে। একজন ছাত্রকে যদি আমরা ইগনোর করি, কাল সবাই পেয়ে বসবে। তখন স্কুলের ডিসিপ্লিন রাখা মুশকিল হয়ে যাবে। আমাদেরকেও তো স্কুলের কমিটির কাছে, সেক্রেটারির কাছে কৈফিয়ত দিতে হয়। ছাত্রদের তৈরি করতে মাঝেমধ্যে একটু মারধর আমরা করি। সেটা ওদের ভালোর জন্যেই। কিন্তু তা বলে ক্লাসটিচারকে এভাবে… যাই হোক। আপনার ছেলেকে রাস্টিকেট করছি। তবে হ্যাঁ, ওর ফিউচারের কথা ভেবে ট্রান্সফার সার্টিফিকেটের ক্যারেক্টার অপশানে ‘গুড’ লিখলাম। না হলে জীবনে অন্য কোনও স্কুলে চান্স পাবে না।”
বাড়ি ফিরে বাবা একটা কথাও বলেনি। আমার মা নেই। মা বছর দু-এক হল সুবীরকাকুর সঙ্গে চলে গেছে। রেলের এই কোয়ার্টারে আমি আর বাবা থাকি। রান্না আর ঘরের কাজের জন্য কাননদি আসে সকালবেলায়। এই আধা শহরে আমার কোনও বন্ধু নেই।
বাড়ির কাছেই বিবেকানন্দ বিদ্যাভবনে ভরতি করে দেওয়া হল আমার। বছরের মাঝখানে অন্য কোনও স্কুল আর ভরতি নিতে চাইছিল না। এই স্কুলটার খুব বদনাম। এলাকার যত ওঁচা ছেলের ভিড়। মিশনারি স্কুল থেকে এখানে এসে প্রথমে একটা ধাক্কা, তারপর বেশ মজাই লাগল। নিয়মিত ক্লাসের বালাই নেই। অফ পিরিয়ড যখন তখন। ছেলেরা ইচ্ছেমতো এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। শিক্ষকরা অনিয়মিত। ক্লাসে এসেই জানিয়ে দেন তিনি কোথায় কোথায় প্রাইভেটে পড়ান। এই স্কুলে এসে আমার বেশ কিছু বন্ধু জুটল। ভোলা বলে একটা ছেলে ছিল। বিহারি। ভালো বাংলা বলতে পারত। কাছেই বস্তিতে ওদের বাড়ি। ক্লাস সেভেনের জীবনবিজ্ঞান বইতে কোশ অধ্যায়ের মাইটোকন্ড্রিয়ার ‘টোকন্ড্রিয়া’ চেপে ধরে একদিন বলল, “বল দেখি এটার মানে কী?”
ভোলার হাত ধরে আমার প্রথম বড়ো হওয়া। ভোলা খুব খিস্তি দিত। আমি প্রথম প্রথম লজ্জা পেতাম। ভোলা প্রায় টিচারের মতো আমাকে গালি শেখাত। বলত গালি না দিলে আমাকে ওদের দল থেকে তাড়িয়ে দেবে। ওদের একটা দল ছিল। সাইকেল চেপে ঘুরে বেড়াত। মেয়েদের দেখলে আওয়াজ দিত। আমিও ভিড়ে গেলাম ওদের দলে। একদিন ইস্কুলফেরতা ভোলা একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলল। ফাঁকা রাস্তা দিয়ে ঘাড় গুঁজে একটা মেয়ে হাঁটছিল। ভোলা তার পাশ দিয়ে জোরে সাইকেল চালিয়ে যেতে যেতে আচমকা এক খাবলে টেনে নিল তাঁর ওড়না। মেয়েটা চিল চিৎকার করে মাটিতে বসে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে। আমরা আরও চারজন ছিলাম। মেয়েটাকে ঘিরে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ভোলা তখন হ্যা হ্যা করে হাসছে। মেয়েটা পায়ের কাছে কুঁকড়ে বসে রয়েছে। আমারও বেজায় হাসি পেল। কিন্তু হাসতে গিয়েই আমি আবার সেই লোকটাকে দেখতে পেলাম। পাশেই একটা গাছের তলায়। পরনের শার্টের দুটো বোতাম আছে। বাকিগুলো নেই। জিন্সের প্যান্টের পকেটে হাত রেখে লোকটা আবার আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল। ওকে প্রায় ভুলেই গেছিলাম। ভেবেছিলাম চোখের ভুল। আমি চাপা গলায় ভোলাকে বললাম, “ভোলা শিগগির পালা, লোক আসছে।” পড়িমড়ি করে সাইকেল চালিয়ে রাস্তার শেষে গিয়ে সবাই পিছন ফিরে দেখি রাস্তায় কেউ নেই। মেয়েটা শুধু চোখ মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ভোলা জ্বলন্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে একটা খিস্তি মেরে বলল, “লোক কোথায় বে? ভালোই মুরগি বানালি!”
আমি যে বখে যাচ্ছিলাম, সেটা দিব্যি বুঝতে পারছিলাম আমি। পড়াশুনোয় মন নেই। বন্ধুদের কাছ থেকে নিয়ে এসে পানু বই পড়ি। “সচিত্র রঙিন প্রজাপতি” বা “উম্মাদ যৌবন”। বাড়িতে সিডি প্লেয়ার ছিল। বাবা না থাকলেই বন্ধুরা সিডি নিয়ে আসত। পানু ছবির। ওরা বলত “ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল”। মাঝে মাঝে স্কুলেই জিজ্ঞেস করত, “কি রে আবার তোদের বাড়ি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল কবে হবে?” জীবনে প্রথমবার নিজেকে কেউকেটা মনে হতে লাগল। ক্লাস নাইন থেকে টেনে উঠতে তিন সাবজেক্টে ফেল করলাম। বাবাকে জানালাম না। জানিয়েই বা কী হত! বাবাও বদলে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। মদ খাওয়া ধরেছিল। খুব নেশা চড়ে গেলে আমাকে বেল্ট খুলে পেটাত। আমি মুখ বুজে থাকতাম।
আমি প্রায়ই লোকটাকে দেখতে পেতাম। কিন্তু শুধু আমিই। তাই একসময় মনে হল আমার চোখের ভুল। আমি ছাড়া কেউ ওকে দেখতে পায় না বোধহয় সেবার ভোলা কোথা থেকে একটা দামি মোবাইল কিনে নিয়ে এল। ক্যামেরা লাগানো। ছবি তোলা যায়। ভিডিও দেখা যায়। গান শোনা যায়। ভোলা আমার একটা ছবি তুলে স্ক্রিনে চোখ রেখেই কেমন যেন ভেবলে গেল, “আরেহ! তোর পিছনে এটা কার ছবি?” চোখ তুলে দেখতে চাইল। কিন্তু কেউ নেই। আমিও দেখলাম। সেই লোকটা। বেশ দূরে দাঁড়িয়ে। কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। গায়ের জামা, পরনের জিন্সের প্যান্ট একেবারে প্রথম দিনের মতো। আমার থেকে হাত দশেক দূরে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। পকেটে হাত। সোজা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে। ভোলাকে সেদিন কিচ্ছু বলিনি। মনে মনে কোথাও একটা নিশ্চিত্ত হয়েছিলাম। যাক! তাহলে আমার মনের ভুল না।
ক্লাস টেনের টেস্টে ফেল করতেই আমি আর বাবা দুজনেই বুঝে গেলাম আমার দ্বারা আর পড়াশুনো হবে না। কিন্তু বাবা আজকাল আমায় আর বকত মারত না। একদিন ইস্কুলে তাড়াতাড়ি ছুটি। ভোলারা গেছিল কোথায় একটা মাছ ধরতে। বাড়ি ফিরে দেখি তালা খোলা। এই সময় বাবার বাড়ি ফেরার কথা না। নিঃশব্দে ঘরে ঢুকতেই বুঝলাম কিছু গণ্ডগোল। বাবার শোবার ঘর থেকে অদ্ভুত আওয়াজ ভেসে আসছে। দরজা খোলা। সামনেই টিভিতে একটা রগরগে সিনেমা চলছে। আমরা আগের হপ্তাতেই ফিল্ম ফেয়ার পার্টিতে দেখেছিলাম। খাটে বাবা আর কাননদি। আমি যে ঘরে ঢুকেছি টের পায়নি একদম। শঙ্খলাগা সাপের মতো জড়িয়ে আছে একে অপরকে। আমি কিচ্ছু না বলে চুপটি করে খাটের পায়ের কাছে বসে টিভিতে সিনেমা দেখতে থাকলাম। খানিক বাদে আমার উপরে চোখ পড়াতে কাননদি চিৎকার করে উঠল
তারপর থেকে বাবার সঙ্গে আমার কথা হত শুধু টাকা দেওয়া নেওয়ার। নতুন মোবাইল কিনলাম। বেশ কটা সেলফি তুলে দেখলাম প্রতিটাতেই লোকটা আমার সঙ্গে আছে। আমার পিছনে। তবে এবার আরও কাছে। মোবাইলে জুম করে দেখলাম। যদি চেনা যায়। চিনলাম না। কিন্তু একেবারে অচেনাও না। কোথাও যেন দেখেছি। দুই একজন বন্ধুকে দেখিয়েছিলাম। তারা কেউ চেনেনি।
প্রতিশোধ এমন জিনিস যা যত দেরিতে করা যায়, স্বাদ তত বাড়ে। আমাদের দলে ছেনো বলে একটা ছেলে ছিল। জিম করা চেহারা। দেবতার মতো দেখতে। বড়োলোকের এক ছেলে। ওই বয়সেই খারাপ পাড়ায় যেত। ঘুরে এসে পরদিন রসিয়ে গল্প করত আমাদের। ওর মুখেই শুনেছিলাম আমাদের এই আধা শহরের অনেক ভদ্রঘরের মহিলাও নাকি এই ব্যবসায় নেমেছে। চুপিচুপি। কেউ পয়সার লোভে, কেউ শরীরের প্রয়োজনে। বলেই আমাকে মোবাইলে একটা ভিডিও দেখাল। এ আমার বড়ো চেনা দৃশ্য। কিন্তু মজার ব্যাপার, এই প্রথম পর্দার পুরুষ আর নারী, দুইজনকেই আমি চিনি। ছেলেটা ছেনো আর মহিলাও আমার চেনা। সেই রাতেই ছেনোর সঙ্গে গেলাম আমি। না গেলে হত না। বেল টিপতেই জা খুলে দিলেন ইলিয়ানা ডিমেলো। আমায় দেখেই চমকে উঠলেন। আর যাকেই ভুলুন আমায় যে তিনি ভুলবেন না, তা আমি নিশ্চিত জানতাম। খুব স্বাভাবিকভাবেই তিনি প্রথমে রাজি হচ্ছিলেন না। ছেনোর সেই ভিডিওটায় কাজ দিল। মিশনারি স্কুলের দিদিমণির এই ভিডিও বাইরে বেরোলে কী হতে পারে স্টো খুব ভালো জানেন তিনি। বারবার করে বোঝাতে চাইলেন আমাকে। পায়ে ধরলেন। আমি অনড়। ঠিক হল আমি আর ম্যাডাম প্রথমে খাটে যাব। ছেনো ভিডিও তুলবে।
তারপর আমার কিচ্ছু মনে নেই। যখন খেয়াল হল, ছেনো আমাকে প্ৰাণপণে ম্যাডামের দেহ থেকে সরাতে চাইছে আর আমার হাতের আঙুলগুলো সাঁড়াশির মতো চেপে আছে ম্যাডামের গলা। ম্যাডামের চোখ দুটো বিস্ফারিত। লাল, যেন ঠিকরে বেরোতে চাইছে। জিভ বেরিয়ে আছে গোটাটা। প্রাণ নেই। গোটা ঘটনার ভিডিও তোলা ছিল। পুলিশের নতুন কোনও প্রমাণ লাগল না। তবু লক আপে ঢুকিয়ে রুলের বাড়ি মেরে পুলিশ বারবার জানতে চেয়েছিল ঘরে খাটের ধারে আমার একদম পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা কে? আমি বলতে পারিনি। ছেনোও না। ছেনোর বাবা ছেনোকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেল। আমার উকিল কোর্টে প্রমাণ করল অনিচ্ছাকৃত খুন। তার উপরে আমি অপ্রাপ্তবয়স্ক। তাই ফাঁসি হল না। পাঁচ বছরের জেল হল জুভেনাইল কোর্টে।
জেলে ওই লোকটার সঙ্গে দেখা হত প্রায়ই। কথা বলত না। আমার পাশে পাশে ঘুরত। আমি কথা বললে উত্তর দিত না। শুধু নির্বাক তাকিয়ে থাকত মুখের দিকে। বছরখানেক আগে আচমকা লোকটা হারিয়ে গেল। আমি ওকে খুঁজতাম ঠান্ডা গারদঘরে, ক্যান্টিনে, ফলের বাগানের পাশে মাটি খোঁড়ার সময়… লোকটা ভ্যানিশ হয়ে গেছে। ঠিক যেমনভাবে লোকটা হঠাৎ এসেছিল, তেমন হঠাৎ করেই হারিয়ে গেল।
আমি ছাড়া পেলাম। রেল কোয়ার্টারে গিয়ে শুনি বাবা অনেকদিন হল সেখানে নেই। ট্রান্সফার হয়ে গেছে হায়দ্রাবাদে। একদিন রাতে তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে গেছে কাউকে না জানিয়ে। পরদিন থেকে কাননদিও বেপাত্তা। কাননদির বর এসে বেজায় চিৎকার চেঁচামেচি করেছিল। কোনও লাভ হয়নি। আমাদের পুরোনো আড্ডার দিকে পা বাড়ালাম। সব নতুন নতুন ছেলে। রকে বসে আড্ডা দিচ্ছে। সামনে একটা বাইক এসে থামল। বুলেট। তারপর আর একটা। তারপর আরও একটা। এবার চিনতে পারলাম। ছেনো, ভোলা আর ওদের দলবল। আমাকে দেখেই ছেনো বলে উঠল, “হারামিটা এসেছে রে! এই বাঞ্চতটার জন্য আমাকে রুলে বাড়ি খেতে হয়েছিল।” ভোলা খুব ঠান্ডা গলায় বলল, “তুই এই জায়গা থেকে চলে যা। এক্ষুনি।”
আমার রোখ চেপে গেল। কেন যাব আমি? আমার কি একার দোষ? দিনের পর দিন ওরাই তো আমাকে এই পথে টেনেছে। এখন ভালো সাজলে হবে! জেলের অভিজ্ঞতা আমাকেও শক্ত করেছিল এতদিনে। আমিও হিসহিসিয়ে বললাম, “আমি যাব না। কোথাও না। যা করার করে নে।”
ছেনো আর একটাও কথা বলল না। গাড়ি থেকে নেমে সোজা মুখ বরাবর ঘুসি চালিয়ে দিল। মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই এক লাথি। তারপর গাড়িতে চেপে থাকা সবাই একে একে নেমে এল…
একটা ভ্যানে করে কয়েকজন আমাকে নিয়ে গেল হাসপাতালে। সারা শরীর ব্যথায় ফেটে যাচ্ছে। কপাল থেকে রক্ত ঝরে পড়ছে। ডাক্তার একটা চেয়ারে আমায় বসিয়ে দিলেন। মাথায় স্টিচ করতে হবে। সামনে আয়নায় তাকিয়েই আমি চমকে উঠলাম। আয়নায় আর আমি নেই। আছে ওই লোকটা। এক ও অদ্বিতীয়। ছোটো করে কাটা বাটিছাঁট চুল, প্রায় ন্যাড়ামাথা বললেই চলে। একটা চোখ ফুলে প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে। অন্যটা খোলা। টকটকে লাল। মুখে অদ্ভুত একটা কষ্টের ছাপ। লোকটা সোজা আমার দিকে তাকিয়েছিল…
.
লেখকের জবানি— বাংলাদেশের সেরা সব লেখকদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত অতীন্দ্রিয় নামের গল্পসংকলনে কীভাবে যেন এটা স্থান পেয়ে গেছিল। সম্পাদক প্রান্ত ঘোষ দস্তিদার আর সালমান হক। ডপেলগ্যাঙ্গার নিয়ে সত্যজিতের রতনবাবু আর সেই লোকটা আজ অবধি ভুলিনি। এখানেও সেই কনসেপ্টটাই নিয়ে এসেছি। একটু অন্যভাবে।
