অন্তরের অমীমাংসিত মৃত্যুও অন্যান্য ঘটনাবলি – কৌশিক মজুমদার
অন্তরের অমীমাংসিত মৃত্যু ও অন্যান্য ঘটনাবলি
॥১॥
বাপে মায়ে অনেক ভেবেচিন্তে ওর একটা নাম দিয়েছিল বটে। ও সেটা ভুলে গেছে। ইচ্ছে করে ভুলে যায়নি। ও জানে কোনও কিছু ভোলার চেষ্টা করলে ভোলা যায় না। বরং মাথার সরু সরু শিরায় এটুলির মতো সেইসব স্মৃতি এঁটে বসে থাকে। ও কী করে নিজের নাম ভুলে গেল, ও জানে না। একদিন ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে মনে হল মাথাটা আগাগোড়া ফর্সা হয়ে গেছে। জানলার ধারে বসে একটা পাখি ডাকছিল। এই পাখিটা রোজ আসে। বিস্কুটের গুঁড়ো দিলে ঠুকরে ঠুকরে খায়। না দিলে চেঁচিয়ে ঘুম ভাঙায়। পাখিটা আজকেও এসেছে। তাকের থেকে বিস্কুটের টিনটা পাড়তে পাড়তে ও আর-একবার নিজের নাম মনে করার চেষ্টা করল। এবার সচেতনভাবে। মনে পড়ছে না। কে জানে, হয়তো ঘুমের খোঁয়াড়ি কাটেনি এখনও। কাটলে আপনাআপনি মনে পড়বে। টিন থেকে একটা মেরি বিস্কুট বার করে হাতের তেলোতে নিয়ে ভাঙতে থাকল ও। পাখিটা ওর দিকে তাকিয়ে ডেকেই চলেছে। ভাঙতে ভাঙতে বিস্কুট গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল। নাম মনে এল না। জানলার গোবরাটে বিস্কুটের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিয়ে ও এবার দুই হাতে মাথা চেপে নিজের নাম ভাবতে বসল। মাঝে মাঝে মৃদু হাতে চাপড় দিতে থাকল মাথার পিছন দিকে। প্রতিবার চাপড়ে ওর আসল নামটা যেন আরও দূরে চলে যেতে লাগল। একসময় ওর যে আসলে অন্য একটা নাম ছিল, সেই চিন্তাটাই বেমালুম ভুলে গেল ও।
প্রায় ঘণ্টা দুই বাদে, তখন বেলা বেড়েছে। পাখিটা কখন উড়ে গেছে কে গোল। ও দেখল তখনও ও খাটের উপরে বাবু হয়ে বসে মাথার পিছনে অল্প অল্প চাপড় মেরে চলেছে। অনেক ভেবেও ও মনে করতে পারল না কেন। মাথার ভিতর ফিসফিস করে কে যেন একটা কথা বলছে। যে বলছে, তার গলাটা ওর চেনা চেনা। আগে কোথাও যেন শুনেছে। মেয়েলি গলা। কিন্তু একটু পুরুষ ঘেঁষা। বিড়বিড় বিড়বিড় করে সারাদিন বলে চলেছে। ও সোজা তাকাল। চৌকো চওড়া আয়নার একটা প্রতিবিম্ব। এটা ও। মানে ও ছাড়া আর কে-ই বা হবে? কিন্তু আয়নার মধ্যের লোকটাকে ও ঠিক চিনতে পারছে না। লোকটার মুখে অদ্ভুত কোমলতা। গালে পড়ি গোঁফের চিহ্ন নেই। বুকে একটা লোম নেই। সাদা ফ্যাকফ্যাকে চামড়ার মধ্যে থেকে হাড়গুলো যেন ঠেলে বেরোচ্ছে। নামের মতো এই দেহটাও ওর অচেনা হয়ে গেছে। খাট থেকে নেমে ধীরে ধীরে ও আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। আয়নার লোকটাও এগিয়ে এল ওর দিকে। দুজনে নিবিড়ভাবে দুজনকে দেখতে লাগল। অবাক বিস্ময়ে। অনেকক্ষণ পর আয়নার প্রতিবিম্বের মুখে প্রথম একচিলতে হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসি ছড়িয়ে পড়ল গোটা মুখে। অবাক বিস্ময়ে ও দেখল আয়নার লোকটার হাসতে হাসতে চোখের জল বেরিয়ে আসছে। পেট চেপে ধরছে। এদিকে ওর মাথায় সেই ফিসফিসানি বেড়েই চলছে। সেই মহিলার চিৎকার বাড়তে বাড়তে এখন চিনচিনে এক ধাতব শব্দের রূপ নিয়েছে। না, না। অ্যালার্ম বেজে উঠেছে ঘড়িতে। এটা বোধহয় সেটার শব্দ। ও ভাবল এবার খাটের পাশের ঘড়িটাকে বন্ধ করতেই হবে। কিন্তু আয়নার লোকটার থেকে চোখ ফেরাতে পারা যাচ্ছে না। লোকটা হাসতে হাসতেই ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকল। ধীর, অতি ধীর পায়ে ও এগিয়ে গেল আয়নার দিকে। অ্যালার্ম বেজে চলেছে। আয়নার লোকটা আলগোছে পকেট থেকে একগোছা তাস বার করল। তাস ফাটিয়ে বেঁটে দিল ওই। আয়নার সামনে একটা কাঠের টুল রাখা। ওর নিজের হাতে বানানো। ছোট্ট একটা কুঠার দিয়ে ক্রমাগত চেঁছে চেঁছে চকচকে করা। সেই টুলে আলগোছে এসে বসল ও। খেলা যখন শুরু হল, তখন ও নিজের নতুন নাম খুঁজে পেয়েছে।
.
॥ ২॥
সৌনাভকে আমি চিনি প্রায় বছর তিনেক। আমি যে থানায় কাজ করি, সেখানেই ওর প্রথম পোস্টিং। হাসিখুশি। উজ্জ্বল চেহারা। আলাপের প্রথম দিনই মোবাইলের গ্যালারি খুলে ওর বউ আর বাচ্চার ছবি দেখিয়েছিল। ওর বউটা দেখতে তেমন ভালো না। কেমন ক্ষয়াটে চেহারা। বাচ্চাটাও মায়ের মতো দেখতে হয়েছে। কোনও শিশুকে কুদর্শন বলতে নেই, কিন্তু সৌনাভর মেয়েকে দেখে “বাহহ, কী সুন্দর” এই মিথ্যে কথাটাও প্রাণে ধরে বলতে পারলাম না। সৌনাভ আগে বডি বিল্ডিং করত। এখনও করে। দেখলে বোঝা যায়। কোনও দিন অফিস তাড়াতাড়ি শেষ হলে আমি আর সৌনাভ একসঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে পাশেই একটা বারে যেতাম। আমি বেশি খেতাম না। সৌনাভ খেত। ও প্রচুর মদ খেতে পারত। মাছের মতো। আর খেয়েও বেহেড হত না। তিন-চার পাত্তর চড়িয়ে ও ওর বউয়ের নামে খিস্তি করত। বাচ্চার নামে খিস্তি করত। ওর নাকি মেয়েটার সঙ্গে কলেজে আলাপ। প্রেম না, জাস্ট টাইম পাস। আর এই টাইম পাস করতে গিয়েই পেটে বাচ্চা চলে আসে। সৌনাভ বারবার বলেছিল, ওর চেনা ভালো গাইনো আছে। কেউ জানতে পারবে না। বাচ্চা খসানোর টাকা অবধি ও দেবে। মেয়েটা রাজি হয়নি। পাড়ার দাদা, লোকাল এমএলএ ডেকে কেলেঙ্কারির একশেষ করেছিল। ওর বাবা একদিন সৌনাভকে কথা বলতে বাড়িতে ডাকে। ও বোঝেনি ওটা ট্র্যাপ। একদল ছেলে ওকে লাইটপোস্টে বেঁধে বেধড়ক মারে। সেই রাতেই ওদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের তিন মাসের মধ্যে ওদের বাচ্চা হল।
সৌনাভ নিজেই বলে, এই হাসিখুশি ভাব আসলে ওর একটা মুখোশ। সারাদিন এটা পড়ে থাকে। মাল পেটে পড়লেই আসল কথা হড়হড় করে বমির মতো বেরিয়ে আসে। প্রতিদিন মাল খেয়ে বাড়ি ফিরে ও বেল্ট দিয়ে বউকে পেটায়। বউয়ের বাবাটা লোকাল লিডার ছিল। এবার ক্ষমতায় অন্য দল আসায় আগের বোলবোলাও নেই। একেবারে ধ্বজ হয়ে গেছে। এটা আমার কথা না। সৌনাভর কথা। সেই শ্বশুর নাকি আজকাল কারণে অকারণে ওকে তেল দেয়। মেয়ে মার খায় জেনেও বলে মানিয়ে নিতে। সৌনাভ কয়েকবার সোনাগাছি গেছে। সেখানে গিয়ে ওর পোষায়নি। বউয়ের শায়া তুলে পাছায় বেল্টের বাড়ি মেরে মেরে পিটিয়ে লাল করে দেবার যে মজা, সে মজা আর কিচ্ছুতে নেই। এটাও আমার কথা না। সৌনাভর কথা। সৌনাভর মেয়ে চিৎকার করে কাঁদে। সৌনাভ আরও পেটায়। পাড়ার সবাই জানে সৌনাভ পুলিশে চাকরি করে। তাই কেউ কিচ্ছু বলে না। আমি প্রথমে কিচ্ছু বলিনি। সেদিন আর না থাকতে পেরে সৌনাভকে কুত্তার বাচ্চা বলে দিয়েছি। সৌনাভ তাতে রেগে গেছে। অবাক হয়েছে। আমার থেকে ও এটা আশা করেনি। খানিক ঘোরালো চোখে চেয়ে থেকে আমায় আবার বলতে বলল। আমি আবার ওকে কুত্তার বাচ্চা বললাম। কিছু বোঝার আগেই আমার নাকে প্রচণ্ড একটা ঘুসি। প্রথমে কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না। তারপর একের পর এক ঘুসি, চড়, লাথি মেরে সৌনাভ আমায় পেড়ে ফেলল। আমি কোনওমতে দরজা দিয়ে পালালাম। বারের সবাই অবাক। কিন্তু কেউ আমাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি।
এই মফস্সল শহরে শীত পড়ে তাড়াতাড়ি। নটা বাজতে না বাজতেই রাস্তা শুনশান। আমি একটা বন্ধ দোকানের আড়ালে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রুমাল বার করে নাকের রক্ত মুছতে লাগলাম। আর অপেক্ষা করতে থাকলাম। আধঘণ্টা বাদে টলটলে পায়ে সৌনাভ বার থেকে বেরিয়ে এল। আমি একেবারে চুপিসারে ওর পিছু নিলাম। রাস্তাটা যেদিক থেকে হেকিমপাড়ার দিকে বাঁক নিয়েছে, সেখানে একটাও জনমানব নেই। আমি সৌনাভকে নাম ধরে ডাকলাম। সৌনাভ ‘ভূত দেখার মতো চমকে গেল। আমি ধীর পায়ে ওর সামনে গিয়ে ওর পেটে আমার সাধ্যমতো জোরে আবার একটা ঘুসি মারলাম। সৌনাভ চমকে উঠল। আঘাতে না। আমার মতো পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির ল্যাকপ্যাকে বামন যে ওকে মারার সাহস দেখাতে পারে, সেটা ভেবে। তারপর ও আমাকে তাড়া করল। আমি জানতাম আমাকে কী করতে হবে। আমি সোজা ঢুকে গেলাম পাশের চিলড্রেনস পার্কে। এই লকডাউনে পার্কে কেউ আসে না। গেট একটা ছিল। সেটা জং ধরে, ভেঙে একধারে কেতরে গেছে। দেওয়াল ভেঙে বড়ো বড়ো ইট, সিমেন্টের চাবড়া ছড়িয়ে আছে এদিক ওদিক। ভিতরে বড়ো বড়ো ঘাস জন্মেছে। কেউ কাটে না। কাটার দায় নেই। সৌনাভ আমায় ধাওয়া করল। ওর পা টলছে। আমি দেখতে পেলাম। ঠান্ডা বাড়ছে। আমি হাতের দস্তানা আরও এঁটে নিলাম। সৌনাভ খুব কাছে এসে পড়েছে। আমার কলার ধরবে ধরবে, এমন সময় একটা গর্তে পা পড়ে সৌনাভ ছিটকে পড়ল মাটিতে। পড়েই আর উঠতে পারছিল না। আমি ওর খুব কাছে গেলাম। হাতে ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। পারছে না। আমি ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে খুব নরমভাবে জিজ্ঞেস করলাম, ওর কোনও কষ্ট হচ্ছে কি না। ও জবাব দিল না। বিড়বিড় করে কী একটা খিস্তি দিল। আমি কান দিলাম না। ওর কষ্ট হচ্ছে। ওর কষ্ট দূর করা উচিত। তার চেয়েও বেশি দরকার ওর বউ আর বাচ্চার কষ্ট দূর করা। পাশেই সিমেন্ট আর ইট মেশানো বড়ো একটা চাঙড় পড়ে ছিল। আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়োটা তুলে নিলাম। সৌনাভ মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছে। মুখ থেকে গ্যাঁজা বেরোচ্ছে। নাক ডাকছে হালকা। আমি সেই সিমেন্টের ভারী চাঙড়টা দুই হাতে তুলে নিলাম। বড্ড ভারী। তারপর ওয়েটলিফটারদের কায়দায় প্রথমে কাঁধ বরাবর, তারপর দুই হাতে মাথার উপরে। হাত কাঁপছে। বেশিক্ষণ ধরে রাখা যাবে না। রাখবও না। নিখুঁত লক্ষ্যে আমি সেটাকে এবার ফেলে দিলাম সৌনাভর মাথা বরাবর।
.
॥ ৩॥
তাস খেলতে খেলতে সারাদিন কেটে যায়। খেলা শেষ হয় না। আয়নার লোকটা কত কায়দাই না জানে। সর্বদা তুরুপের তাস কীভাবে ওর হাতে চলে যায়, কে জানে? আয়নার লোকটা ওকে খেলা শেখায়। তাস চিনিয়ে চিনিয়ে গল্প শোনায়। বলে তাসের চার সাহেব নাকি আসলে পুরাকালের চার রাজা। ডেভিড, শার্লামেন, অ্যালেকজান্ডার আর জুলিয়াস সিজার। এঁদের সবাই আলাদা। চলনে। ব্যবহারে। তাসের লাল রং দিনের প্রতীক, শুভের প্রতীক। আর কালো রাতের। অশুভের। চার ধরনের তাস মানে চার ঋতু। তেরোটি সংখ্যা চাঁদের তেরো দশা। সব মিলিয়ে বছরের বাহান্ন হপ্তার জন্য বাহান্ন তাস।
লোকটা বলে যায়। ও অবাক হয়ে শোনে। হাতের সব কটা তাস আয়নার সামনে বিছিয়ে ধরে লোকটা। একেবারে বাহান্নটা। ওকে গুনে দেখতে বলে। এক-একটা সারি ধরে ধরে। টেক্কা, দুই, তিন, চার… গোলাম, বিবি, সাহেব। এবার লোকটা বলে সংখ্যাগুলো যোগ করতে। এক থেকে তেরো। কড় গুনে গুনে যোগ করে চলে ও। একানব্বই। প্রতি সারিতে। চার সারিতে তবে কত হল? তিনশো চৌষট্টি। কই মিলল না তো? আয়নার লোকটা এবার হাওয়া থেকে উড়িয়ে নিয়ে আসে আরও এক তাস। সবার থেকে আলাদা। সবার চেয়ে দামি। বিদূষক জোকার। সে এসে বছরের শেষ দিনের হিসেব দিয়ে যায়। বাহান্ন সপ্তাহ। তিনশো পঁয়ষট্টি দিন। সব এই হাতের তাসের রঙের ফোঁটায় ধরা।
তবে ও তাকিয়ে থাকে অদ্ভুত সেই সাহেবটার দিকে। লাল পানের সাহেব। অবিকল ওর মুখ যেন বসানো। দাড়ি গোঁফ নেই। মুখে অদ্ভুত সরলতা। আয়নার লোকটা বুঝতে পারে। জানায় এ সাহেবকে যেন হেলা কোরো না। এই সাহেব মস্ত রাজা ছিলেন। হাতি ঘোড়া। লোক লশকর। কিন্তু সাহেবের একটাই দোষ। মাথার কথা শোনেন না। মনের কথায় চলেন। রেগে গেলেই গর্দান নেন। সেই রাজার পাঁচ ছেলে। বলেই লোকটা ফস করে বার করে আনল লাল পানের পাঁচ তাসটা। এই যে পাঁচ ছেলে। ছেলে তো নয়! মূর্তিমান শয়তান সব। রাজাও অবশ্য তেমনি। তাঁদের বলে দিয়েছিলেন, যাই করো আর তাই করো বাপু, আমি তোমাদের প্রত্যেকের একটা করে অপরাধ ক্ষমা করব। পাঁচজনের পাঁচটা অপরাধ শেষ হলেই…
আয়নার লোকটা মিলিয়ে যায়।
.
।।৪।।
সৌনাভ দত্ত খুনের প্রায় এক হপ্তা হয়ে গেল। পুলিশ খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাকে সন্দেহ করেছিল। কিন্তু কিছু করেনি। সৌনাভ আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল। সবাই জানত। বারের লোকেরাও। আর সামান্য কথা কাটাকাটি থেকে খুন অবধি ব্যাপারটা গড়াবে কেউ ভাবেনি। আমি অপেক্ষা করছিলাম। আমাকে জেরা করা হলে সব সত্যি বলে দেব। কিন্তু কেউ আমায় জেরা করেনি। বারে কী হয়েছিল তা আমি একেবারে ঠিকঠাক বলেছি। নিখুঁতভাবে। পুলিশ গোয়েন্দারা মিলিয়ে দেখেছিল। তারপর আর আমায় ঘাঁটায়নি। শুধু একজন জিজ্ঞেস করেছিল সৌনাভর মৃত্যুতে আমি ভেঙে পড়েছি কি না। আমি মাথা নেড়ে না বলে দিয়েছি। ওরা তাও আমায় সাবধানে থাকতে বলেছে।
ছোটো থেকে মৃত্যু দেখে আসছি। এখন আর নতুন করে কিছু মনে হয় না। আমাকে বাবা একটা ল্যাব্রাডর কিনে দিয়েছিল। নাম দিয়েছিলাম চকো। চকোলেট রঙের। তখন আমার বছর দশেক। এক বছর ঘুরতে না ঘুরতে সেটা আমার কোলে মাথা রেখে মরে গেল। উনিশে বাবা। মা তার পরে পরেই। বাবার চাকরিটা পেয়েছিলাম বলে পেটের ভাত জুটছে। আমার কোনও শখ আহ্লাদ নেই। তেমন কোনও বন্ধু নেই। সকালে থানায় যাই। টেবিলে মুখ গুঁজে কাজ করি। বিকেলে বাস ধরে বাড়ি ফিরে আসি। পাড়াপ্রতিবেশীদের সঙ্গে ভাব নেই। সেদিন অফিসের অতীশ জোর করেই আমার ফেসবুকে একটা অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছে। তাতে নাকি ছবি লাগাতে হয়। আমি ছবি তুলি না। আমার শেষ ছবি কবে তোলা মনে নেই। অতীশ জোর করেই আমার একটা ছবি তুলে দিল। বলল আমায় নাকি হ্যান্ডসাম লাগছে। আমি অনেক বছর পর নিজেকে দেখলাম। দেখে ভয় পেয়ে গেলাম। ফোনের স্ক্রিনে যে লোকটা তাকিয়ে আছে, সে আমি না। আমার বাবা। এই লোকটাই এককালে অফিস থেকে ফিরে এসে আমার মাকে পেটাত। বেন্ট খুলে। আমি ঠেকাতে গেলে আমিও দুই-চার ঘা খেতাম। বাবার হার্টের দোষ ছিল। একদিন আমি আর থাকতে না পেরে বাবাকে সব শক্তি দিয়ে মারলাম এক ধাক্কা। বাবা উলটে পড়ে গেল। আর উঠল না। ফ্যালফ্যালে চোখ দুটো তখনও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চকো ঠিক যেভাবে তাকিয়ে ছিল মরার পরে। চকো আমার খুব প্রিয় খেলনা বন্দুকটা চিবিয়ে নষ্ট করেছিল। আমি তাই ওকে শাস্তি দিতে চেয়েছিলাম। বাবা গোলাপ গাছে লাল পোকা মারার ওষুধ দিত। তারই কিছুটা চকোর খাবারে মিশিয়ে দিয়েছিলাম। আর খালি বোতলটা ফেলেছিলাম মাটিতে। সবাই বাবাকে বকেছিল। কেন এইসব বিষ কুকুরের নাগালে রাখে? কেউ আমাকে একটাও প্রশ্ন করেনি। করলে আমি সত্যি কথাই বলতাম। বাবা মারা যাবার পরেও পুলিশকাকুরা আমাকে নিয়েই ব্যস্ত ছিল। এতটুকু ছেলে, কীভাবে ব্যাপারটা নেবে। কোনও জেরা হয়নি। যদিও বা হতে পারত, মা বাবুনমামাকে বলে সব সেট করে নিয়েছিল।
বাবুনমামা মায়ের ভাই না। আমাদের কেউ হয় না। পাড়ার দাদা। বাবা অফিসে গেলে, আমি ইস্কুলে গেলে বাবুনমামা আমাদের বাড়িতে আসত। পাড়ার সবাই জানত। আমি বন্ধুদের মুখে কানাঘুষো শুনেছিলাম। বাবা মারা যাবার পর বাবুনমামার আসা যাওয়া বেড়ে গেল। বাবুনমামা এলেই মা ওকে নিয়ে বেডরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিত। ভিতরে নাকি আমার চাকরি নিয়ে আলোচনা চলছে। আমার চাকরিতে বাবুনমামার খুব একটা উৎসাহ ছিল না।
তারপর মা একদিন ঘুমের ওষুধ খেল। একসঙ্গে দুই পাতা। বাবা মারা যাবার পর মা মদ ধরেছিল। বোতলে ওষুধ আমিই মিশিয়ে দিয়েছিলাম। বাবুনমামা খুব হম্বিতম্বি করছিল। আমি মামাকে ডেকে বললাম, আমার চাকরি? মামা বলল, কীসের চাকরি। আমি তখন বাধ্য হয়ে মায়ের বেডরুমের জানলার বাইরে থেকে তোলা মায়ের আর বাবুনমামার ছবিগুলো দেখালাম। ছয়মাসের মধ্যে আমার চাকরি হয়ে গেল।
.
।।৫।।
আয়নার লোকটা আজকাল প্রায়ই আসে। ওর সঙ্গে গল্প করে ঘন্টার পর ঘণ্টা। ওর ঘরে কেউ আসে না। লোকটা তখন ওকে বলে। বলে লাল পান সাহেবের গল্প। এই সাহেবের উপরে আছেন রুইতনের সাহেব। কিন্তু তিনি বড়ো অলস। তিনি বড়ো একচোখো। তাঁর কথায় চলতে গেলে রাজ্যে সুশাসন অসম্ভব। তাই একদিন লাল পান সাহেব আইনের সব বাধা অমান্য করে নিজের হাতে আইন তুলে নিলেন। দোষীদের শাস্তি দিলেন নিজের নিয়মে। রুইতনের সাহেব গেলেন রেগে। বললেন, তোমার বিচার হবে। লাল পান সাহেব যুদ্ধ করলেন। সে কী যুদ্ধ, সে কী যুদ্ধ। যুদ্ধে সব হারালেন লাল পান সাহেব, কিন্তু নিজের হৃদয়কে হারতে দিলেন না। তাঁর অস্ত্র তাঁর বিবেক।
একদিন যুদ্ধ শেষ হল। রুইতনের সাহেব মেনে নিলেন হরতনের সাহেবের দাবি। মাথা হার মানল হৃদয়ের কাছে। আর তারপরেই রাজার কাছে এল সেই সংবাদ। তাঁর পাঁচ ছেলে- রাগ, পরনিন্দা, হিংসা, ঘৃণা, বিদ্বেষ আর হত্যা চারিদিকে পাপ করে চলেছে ক্রমাগত। রাজা নিজেকেও ক্ষমা করলেন না। একদিন রাজা শাস্তি পেলেন।
রাজা অন্যদের শাস্তি দেন, কিন্তু রাজা দোষ করলে শাস্তি দেয় কে? ও প্রশ্ন করে। আমি দিই, আয়নার লোকটা বলে।
দরজার বেল বাজল। কারা যেন এসেছে।
.
॥ ৬॥
আজ অফিসে সৌনাভর বউ এসেছিল। সঙ্গে মেয়ে। বউটা হাঁটতে পারে না। হুইলচেয়ারে বসা। মেয়েটা একেবারে ছোটো। আমি সৌনাভর সবচেয়ে কাছের বন্ধু শুনে বেজায় কাঁদল। বারবার বলল, সৌনাভর মতো স্বামী নাকি ভাগ্য করলে মেলে। প্রথমে আমি কিছু বলিনি। বারকয়েক বউটা একই কথা বলার পর আমি বলতে বাধ্য হলাম যে, সৌনাভ যে ওর বউকে পেটাত, সেটা ও নিজেই আমাকে বলেছে। শুনে বউটা একটু থমকে গেল। তারপর বলল, এটা নাকি সৌনাভর ফ্যান্টাসি। ওদের প্রেম করে বিয়ে। বিয়ের পর থেকেই ওর বউ অসুস্থ। শেষ বছরখানেক প্রায় শয্যাশায়ী। ওদের কোনও শারীরিক সম্পর্ক ছিল না। তা বলে সৌনাভ বউয়ের যত্নের বিন্দুমাত্র ত্রুটি করেনি কোনও দিন। শুধু পেটে মদ পড়লে আর মাথার ঠিক থাকত না। তখন ও চলে যেত অজানা ফ্যান্টাসির জগতে। যা খুশি তাই বলত। হয়তো ওর অবদমিত কাম ওকে দিয়ে বলাত। কিন্তু যা বলত সব মুখে। জীবনে বউ মেয়ের গায়ে হাতটুকু তোলেনি সে। ওর বউ বারবার মৃত সৌনাভর হয়ে ক্ষমা চাইল। আমি অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলাম। শেষে বউটা বলল যে সৌনাভ মরায় তার আর তার মেয়ের জীবনটা শেষ হয়ে গেল।
.
॥৭॥
অন্তররাজ গুপ্তর মৃত্যু ঠিক কী কারণে হয়েছিল, তা আজ অবধি এক রহস্যই থেকে গেছে। অন্তররাজ গুপ্তের আসল নাম সমুদ্রনীল গুপ্ত। তার বাবা বিশ্বনাথ গুপ্তের মৃত্যুর পরে সে চাকরিটা পায় এবং সফলভাবে পাঁচ বছর চাকরি করে। চাকরি পেয়েই আচমকা একদিন সে উকিল ডেকে নানা পরিশ্রমে নিজের নাম বদলে অন্তররাজ করে নেয়। এমন নামের কারণ কোনও দিন সে কাউকে বলেনি। স্বভাবে লাজুক অন্তরের যেমন কোনও বন্ধু ছিল না, তেমন শত্রুর কথাও জানা যায়নি। কিছুদিন আগেই তার প্রিয় বন্ধু সৌনাভ দত্ত খুন হন। তারপর থেকেই অন্তরের মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখা যায়। সে আরও বেশি চুপচাপ, নিঃসঙ্গ হয়ে যেতে থাকে। তার অবসর বিনোদন বলতে ছিল তাস খেলা। যদিও সে অন্য কারও সঙ্গে তাস খেলত না। মাঝে মাঝেই টেবিলে তাস বিছিয়ে কী যেন ভাবত শেষ তাকে অফিসে দেখা গেছে গত বুধবার। কাকতালীয়ভাবে সেইদিনই প্রথম অফিসে এসেছিলেন সৌনাভর স্ত্রী রূপলেখা ও তাঁদের কন্যা তানিশা। অন্তর রূপলেখার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাও বলে।
পরের দিন সকালে অন্তর নিজেই থানায় ফোন করে জরুরি ভিত্তিতে তার বাড়িতে পুলিশ পাঠাতে বলে। তার নাকি আসা সম্ভব নয়। সৌনাভর মৃত্যু নিয়ে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ খবর আছে। পুলিশ অফিসার বিপ্লব সান্যাল তার বাড়ি ফোর্স নিয়ে গিয়ে দেখেন দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। কেউ সাড়া দিচ্ছে না। দরজা ভাঙা হলে ঘরের লাইফসাইজ আয়নার সামনে অন্তরকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার মাথায় একটা ছোটো, ধারালো কুঠার কে যেন অস্বাভাবিক, অমানুষিক জোরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। একটা রক্তের ধারা নদীর মতো মেজেতে বয়ে যাচ্ছে। ঘরে আর কেউ ছিল না।
.
ক্লু বলতে মৃতদেহের পাশে অতি প্রাচীন একটি তাস পাওয়া গেছে। হরতনের সাহেবের তাস।
আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, সেই তাসেও অবিকল একইভাবে একটা কুঠার রাজার মাথায় গাঁথা রয়েছে…
.
লেখকের জানি— লিটল ম্যাগাজিনের ক্রোড়পত্রে তাস নিয়ে গল্প লেখার আহ্বান পেয়ে এই গল্পটা লেখা। আমার বিষয় ছিল সাহেব। কিন্তু গল্পটা এমন ডার্ক শেষ হবে, তা শুরুতে ভাবিনি।
