রোগ – কৌশিক মজুমদার
রোগ
॥১॥
হরবাবুর স্পষ্ট মনে আছে রোগটার কথা উনি প্রথম ঠিক কীভাবে শুনেছিলেন।
হরবাবু নামের মানুষরা সচরাচর ব্যবসা করতে পারেন না, চাকরিতেও খুব উঁচু পদে গেছেন বলে দেখা যায় নি। আবার বেসরকারী অফিসেও হরবাবু নামে কাউকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাই নামের প্রত্যাশা মেটাতেই হরবাবু সরকারি পি ডবলু ডি অফিসে লোয়ার ডিভিশান ক্লার্কের কাজ করেন। ছোটখাট চেহারা। চোখে হাই পাওয়ারের চশমা, তাতে সস্তা সেলুলয়েডের ফ্রেম। আগে কাঁধে একটা তাপ্পিমারা ব্যাগ ঝুলিয়ে অফিসে যাতাযাত করতেন। ইদানীং বড় মেয়ের ফেলে দেওয়া গোলাপী রঙের স্কুল ব্যাগটা পিঠে নিয়ে আসেন। প্রত্যাশা মতই হরবাবু মিতব্যায়ী। অফিসের দুর্মুখরা তাঁকে কৃপণ বলে। তিনি দুপুরে টিফিন বাক্স খুলে রোজ শুকনো রুটি, ঢেঁড়স ভাজা দিয়ে খান। অফিসে প্রায়ই চাঁদা তুলে খাওয়াদাওয়া হয়। তিনি ওসবে থাকেন না। অনর্থক পয়সা নষ্ট তাঁর বিলকুল না পসন্দ। অফিসের লোকেরা আগে অনুরোধ করত। এখন হাল ছেড়ে দিয়েছে।
একদিন হরবাবু স্পষ্ট শুনেছেন ক্যান্টিনে তাঁকে নিয়েই আলোচনা হচ্ছে। রমলা নামে নতুন একটি মেয়ে সদ্য ট্রান্সফার হয়ে তাঁদের অফিসে এসেছে। শশাঙ্ক বেশ জোরে জোরেই তাঁকে বলছে—
“বুঝলে রমলা সবাই তো সমান হয় না। কেউ আয় করে ভোগের জন্য। কেউ আয় করে রোগের জন্য। আর কেউ আয় করে মরার পরে যক্ষ হয়ে টাকা গোনার সুখ পেতে।”
রমলা মেয়েটাও তেমনি ন্যাকা। সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করল “এমন মানুষও আছে নাকি শশাঙ্কদা?”
“আছে, আছে। চোখ মেলে দেখ, আমাদের অফিসেই আছে। মাস গেলে চল্লিশ হাজার বেতন, এদিকে আজ অবধি চল্লিশ পয়সা কেউ খরচ করাতে পারেনি। হর-ই-বল…”
এই হর শব্দের মধ্যে এমন একটা কুইঙ্গিত ছিল, যে কারও বুঝতে বাকি রইল না কার কথা বলা হচ্ছে। হরবাবু পাত্তা না নিয়ে ক্যান্টিনের ওয়াটারকুলার থেকে জলের বোতল ভরে চুপচাপ টেবিলে ফিরে এলেন।
.
গতবার শীতকালের কথা। হরবাবুদের অফিসরুমে শেয়ারে পিকনিক হচ্ছে। তিনি যথারীতি রুটি চিবোচ্ছেন। শুনতে পেলেন অফিসের নতুন ক্লার্ক উৎপল দুঃখ করে বলছে—
“বুঝলে কানাইদা, এবার আর আমার হানিমুনে যাওয়া হল না”। শুনেই হরবাবুর কান খাড়া। উৎপল বিরাট বড়লোক বাড়ির ছেলে। সবে চাকরি পেয়েছে। আর পেয়েই তাঁর পাঁচ বছরের প্রেমিকা রত্নাকে বিয়ে করে নিয়েছে। অফিসের সবার সঙ্গে হরবাবুও সেই বিয়েতে গেছিলেন। বিরাট প্যালেস ভাড়া করে রিশেপশান। বিশাল বাগানে জায়গায় জায়গায় খাবারের স্টল। তন্দুরী চিকেন, বিরিয়ানির গন্ধে গোটা বাগান ভরে আছে। এলাহী আয়োজন। শশাঙ্ক সুযোগ পেয়ে সেখানেও শোনাতে ছাড়লে না।
“আরেহ! মাংসের কাউন্টারে হরদা যে! এই যে সেদিন আপনি অফিসে বললেন, আপনি মাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। আমরা সবাই শেয়ারে চিকেন চাপ খেলাম, আর আপনি জুলজুল চোখে দেখলেন। এখানে এসেই প্লেটে দুইখানা বড় বড় তন্দুরী!! এ কি ঠিক দেখছি?”
বাজে লোকের কথায় উত্তর দিতে গেলে কথায় কথা বাড়বে। হরবাবু মন দিয়ে মাংস চিবুতে লাগলেন। অনেকেই জানে না, হরবাবু এমনিতে মাংস খাওয়া পছন্দ না করলেও নিমন্ত্রণবাড়িতে খান, এবং অন্যদের চেয়ে কিছু বেশি পরিমানেই খান। সেই রিশেপশান পার্টিতেই শুনলেন উৎপলের কোন এক মামা নাকি সিঙ্গাপুর থাকে। তিনি নতুন বর বউকে হনিমুনে সিঙ্গাপুর আসা যাওয়ার প্লেনের টিকিট গিফট করেছেন। শুধু তাই না, হোটেল খরচাও নাকি তিনিই দেবেন। এমন একজন মামা পাওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার। তাঁর মামারা তাঁকে আজ অবধি একটা লজেন্স কিনে দেয় নি। মামাবাড়ির সম্পত্তিভাগ হলে তাঁর মায়ের ভাগ নিজেরা গাপ করেছে। ভাগ্য করে উৎপলের মামার মত মামা পাওয়া যায়। বাড়ি ফিরতে ফিরতে বহু দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন হরবাবু।
সেই উৎপল হনিমুনে যাচ্ছে না শুনে চমকে উঠলেন তিনি। এমন সুযোগ যে কেউ ছাড়তে পারে, সেটা তিনি ভাবতেও পারেন না। কারও ব্যক্তিগত ব্যাপারে খুব একটা নাক গলান না, তবুও জিজ্ঞাসা না করে পারলেন না।
“ভাই উৎপল, একটু এদিকে এস দেখি। কথা আছে।”
“বলুন হরদা।”
“না, মানে একটু পারসোনাল ব্যাপার। তবু জিজ্ঞেস করি। শুনলাম তুমি নাকি সিঙ্গাপুরে হনিমুনে যাচ্ছ না? কি ব্যাপার একটু বলবে?”
“সে কী হরদা! আপনি কি খবর দেখেন না? চীন, সিঙ্গাপুর এইসব জায়গায় নাকি নতুন এক রোগ এসেছে। একেবারে অজানা এক ভাইরাস। চীনের এক গোপন ল্যাবরেটরি থেকে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই ভাইরাস একবার আক্রমণ করলে নাকি আর নিস্তার নেই। ওদেশের সবাই এখন ঘরে বন্দি। এদিকে সিঙ্গাপুরে যাবার সব ফ্লাইট-ও বন্ধ। কবে খুলবে কিস্যু ঠিক নেই। মামা বলল, বাবলু রে, তোর কপালডাই খারাফ। ভাবসিলাম বউমারে এহানে আইন্যা ঘুরায়ে দেখামু, হেডা আর হইল না।”
রোগটার কি যেন একটা নামও বলেছিল উৎপল। হরবাবু খুব একটা বিশ্বাস করেন নি। তিনি বাড়িতে খবরের কাগজ রাখেন না। বাজে খরচ। টিভি থাকলেও তাতে দিনরাত সিরিয়াল আর রিয়েলিটি শো চলে। ফলে উৎপল বলার পরেও তিনি ব্যাপারটা খুব একটা সিরিয়াসলি নিলেন না। তাঁর কেন যেন বারবার মনে হতে লাগল, গোটাটাই সিঙ্গাপুরবাসী সেই মামার চক্রান্ত। তিনি বৌভাতের দিন ভুল করে একটা প্রতিজ্ঞা করে ফেলে এখন হাত কামড়াচ্ছেন। তাই উঠেপড়ে লেগেছেন ভাগনে যাতে গিয়ে উপস্থিত না হয়।
হরবাবুর যুক্তিতে এটা খুব একটা দোষের না বলেই মনে হল। মনে একটা কাঁটা সেই বৌভাতের সময় থেকে বিধছিল। আজকের দিনে এমনও হয়! আজ তিনি নিশ্চিন্ত হলেন। লোকাল বাসে দমবন্ধ করা ভীড়েও এই চিন্তা তাঁকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে পারল। সেদিন বাড়িতে ফেরার সময় দুই মেয়ের জন্য দশটাকার একটা চিপসের প্যাকেট কিনে ঢুকলেন তিনি।
॥ ২॥
রোগের ব্যাপারটা যে একেবারে ভাঁওতা না, তা বুঝতে মার্চ মাস অবধি সময় লাগল তাঁর। পাশের বাড়ির গদাধরবাবুর কথায় কথায় প্যানিক করার স্বভাব আছে। এবার সেটা প্রায় হিস্টেরিয়ায় গিয়ে দাঁড়ালো। তিনিই সকাল বিকেল হরবাবুকে আপডেট দিতে লাগলেন।
“জানেন, এই রোগ নিয়ে ডা. হরিদাস পাল কী বলেছেন? শুনে যান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে এমন মারণরোগ একশো বছর অন্তর পৃথিবীতে আসে। লিঙ্ক লাগবে? জানেন, কলকাতায় এই রোগ এসে গেছে… বিধাননগরে এই রোগ এসে গেছে… দমদমে এই রোগ ঢুকছে… দুর্গানগরের দিকে এই রোগ তাকাচ্ছে…
অন্যদিকে টিভিতে সব খবর বাদ দিয়ে এক একজন এক এক কথা বলে যাচ্ছে। গোটা দেশের সাংবাদিক আর মানুষজন যেন একসঙ্গে পাগল হয়ে গেছে। কেউ বলছে “আমার বাড়ি তিনটে স্যানিটাইজার। একটা আমার। একটা আমার বরের একটা কাজের মাসির। আমার বড় স্যানিটাইজারটা থেকে ৪৫ ডিগ্রী অ্যাঙ্গেলে হাতের দস্তানায় নিয়ে ভাল করে দস্তানাকে স্যানিটাইজ করি। তারপর সেই দস্তানাকে ৯৫ ডিগ্রী অ্যাঙ্গেলে চেপে ছোট একটা বোতলে স্যানিটাইজার রাখি। সেটা দিয়ে আবার দস্তানা পরিস্কার করে ভাত মেখে খাই। আপনারাও এমন করুন। এটা স্বাস্থ্যকর আর হাতে জল লাগানোর প্রয়োজনও হবে না।
কেউ বলছে “এই দেখুন সেই ভাই যিনি গামছা মুখে অটো চালাচ্ছেন। উনি একজন সতর্ক নাগরিক। আপনিও হোন। মনে রাখবেন এই ভাইরাসের আকার বড়। গামছা, এমনকি মাছ ধরার জাল মুখে বাঁধলেও এই ভাইরাস ঠেকানো যাবে। এক গৃহস্থবাড়ির বউ ক্রমাগত চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে চলেছেন “আমার খুব প্যানিক হচ্ছে… আমার খুব প্যানিক হচ্ছে…আমার খুব প্যানিক হচ্ছে…” আর তাঁকে সান্ত্বনা দিতে দিতে এক নেতা আওড়াচ্ছেন, “একদম চিন্তা করবেন না। সরকার আপনার পাশে আছে। আমাদের আপদকালীন ব্যবস্থায় বিষম খেয়ে কাশলেও বাড়ি থেকে উঠিয়ে আমাদের কর্মীরা আপনাদের হাসপাতালে নিয়ে যাবে” ইত্যাদি ইত্যাদি।
হরবাবুর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল এই সব চাইনিজ রোগ ভারতে ঢুকতেই পারবে না। পারলেও ভারতীয়দের কিচ্ছু করতে পারবে না। বিশেষ করে তাঁর। তিনি দুইবেলা আহ্নিক করেন। বীজমন্ত্র জপ করেন। রোগ বালাই তাঁর থেকে দূরেই থাকে। শেষ কবে তিনি রোগে ভুগেছেন, তাঁর মনে নেই।
মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী যখন টানা তিন হপ্তা সবাইকে বাড়িতে বন্দি থাকতে বললেন, তখন প্রথমবার হরবাবুর টনক নড়ল। তাঁর মানে উৎপলের মামা নেহাত মিথ্যে বলেন নি। রোগটাকে বিশ্বাস করলেও রোগ নিয়ে আর যা যা বলা হচ্ছিল একটাকেও বিশ্বাস করেন নি তিনি। সামান্য সর্দিজ্বর। এমন তো কতই হয়। এর জন্য মুখে মাস্ক, হাতে স্যানেটাইজারের বাড়তি খরচা করার কোন যুক্তি হরবাবুর মাথায় আসে নি। তিনি তিনবেলা গরম জলে গার্গল শুরু করলেন। গরম জল খেতেন। আর খুব গরমেও দুপুরবেলা ঘড়ি ধরে আধঘন্টা সূর্যের আলোতে শরীর সেঁকতেন। তাঁর স্ত্রী আর মেয়েদের এই ব্যাপারে উৎসাহ দিলেও তাঁরা এই কাঠফাটা রোদে পুড়তে একেবারেই রাজি ছিল না। ফলে তিনি নিজেই এই টোটকা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটল। হরবাবু শুনতে পেলেন পাড়ায় কোন একটা এনজিও এসেছে। তাঁরা নাকি যারা অভাবী, তাঁদের বিনে পয়সায় চাল ডাল দিচ্ছে। লাইন দিয়ে নিতে হচ্ছে। হরবাবু এই সুযোগ হাতছাড়া হতে দিলেন না। মাস্ক না থাকায় মুখে গামছা বেঁধে (কারণ তিনি কোথাও শুনেছিলেন এই ভাইরাস বেশ বড় সাইজের। গামছাতে আটকে যাবে) তিনিও লাইনে দাঁড়িয়ে দুই কেজি চাল, পাঁচশো ডাল, এক কেজি আলু আর এক প্যাকেট সোয়াবিনের বড়ি নিয়ে বিজয়ীর মত ঘরে ফিরলেন। এই রকম চলতে থাকলে গোটা লকডাউনে খুব বেশি খরচা করতে হবে না। গুনগুন করে “এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না, যাআআক নাআআ” গাইতে গাইতে চানের ঘরে ঢুকলেন হরবাবু।
.
।।৩।।
সমস্যাটা শুরু হল ঠিক তিনদিন পর থেকে। একেবারে কাকভোরে ঘুম থেকে ওঠার স্বভাব তাঁর। সেদিন উঠে দেখলেন ঘড়িতে আটটা বেজে গেছে। স্ত্রী বার তিনেক ডেকেও সাড়া না পেয়ে চলে গেছে। ঘুম থেকে উঠে খাটেই খানিক ঝিম ধরে বসেছিলেন হরবাবু। স্ত্রী এক কাপ লাল চা নিয়ে মুখের সামনে ধরে বললেন “কি ব্যাপার বলত? এত দেরী করে ঘুম থেকে উঠলে যে বড়?”
“বুঝতে পারছি না” মাথা চেপে ধরে হরবাবু কঁকিয়ে উঠলেন “মাথা ব্যাথায় ছিঁড়ে পড়ছে। সারা গায়ে ব্যাথা। জ্বর জ্বর ভাব। গোটা শরীর কেমন একটা তাজ্জিমতাজ্জিম করছে। ঢোঁক গিলতে গেলেই গলায় লাগছে। কি হল বল দেখি?”
“ওই জন্যেই বলি সন্ধ্যার পরে মাথায় একটা মাফলার দিয়ে বেরোও। আমার কথা তো কানে ঢোকে না। লেগেছে ঠান্ডা। এই সময় ওয়েদারটাও তো ভাল না। ভাল করে গার্গল কর। সেরে যাবে।”
মনটা সামান্য কু ডাকলেও খুব একটা পাত্তা দিলেন না হরবাবু। ঠান্ডা গরমে এমন হয়েই থাকে। নিজেকে বুঝিয়েছিলেন। তারপর টানা প্রতি পনেরো মিনিট অন্তর গার্গেল করেছেন। গরম জল খেয়েছেন। ইচ্ছে না থাকলেও স্ত্রী কারা নামের এক অপদার্থ তাঁকে গিলিয়েছেন, সেটাও নাক মুখ কুঁচকে গিলেছেন। শরীর ঠিক হবার লক্ষণ নেই।
কাশিটা শুরু হল বিকেল থেকে। প্রথমে খুকখুক। তারপর হুপিং কাশির মত খংখং। কাশতে গেলে বুকের পাঁজরা খুলে বেড়িয়ে আসছে, এত কষ্ট। তাঁর স্ত্রী, এমনকি মেয়েরাও বারবার বলল ডাক্তার দেখাতে। বলা যায় না, হয়তো সেই চীনা রোগ…। কাশির মধ্যেই ধমকে উঠলেন হরবাবু।
“আমাকে কি পাগল পেয়েছ? আজকাল ডাক্তার মানেই একগাদা টেষ্ট, আর কথায় কথায় নার্সিং হোমে ভর্তি করার চক্কর। টাকা হারামে আসে না। তার জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করতে হয়। নিজেরা তো ঘরে থাক। তোমরা কি বুঝবে পরিশ্রমের আয় কাকে বলে?” শেষ বাক্যটা তাঁর খুব প্রিয় লব্জ। দিনে অন্ততঃ একবার তিনি বলবেনই।
সেদিন সারারাত জ্বরের ঘোরে ঘুম এল না। বড় মেয়ে পাড়ার দোকানদারকে জিজ্ঞেস করে একপাতা প্যারাসিটামল নিয়ে এসেছিল। সেটা খেয়ে সকালের দিকে ঘাম দিয়ে জ্বরটা একটু কমল। স্ত্রী বড় গেলাস ভরে কারা নিয়ে এল। সেটা মুখে দিয়েই প্রথম ব্যাপারটা টের পেলেন হরবাবু। আগেরমত কুৎসিত স্বাদ গন্ধ তো লাগছে না! সত্যি বলতে কি ভালো মন্দ কোন রকম স্বাদই তিনি পেলেন না। গন্ধও না। গোটা তরলটাই কেমন একটা অদ্ভূত বোবা বোবা লাগল তাঁর কাছে। তিনি একটু রেগেই গেলেন। নিশ্চয়ই ঠিকঠাক বানায়নি। কাল অবধি এর গন্ধে প্রাণ যায় যায়, আর আজকেই এই দশা! বেলা বাড়তে আরও কিছু ব্যাপার খেয়াল করলেন হরবাবু। দুর্বল শরীরে বাথরুমে যেতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছিলেন। ডান পা-টা সামান্য মচকেছে। সেই পায়ে ভলিনি মাখতে গিয়ে তাঁর মনে হল নিশ্চয়ই ওষুধের তারিখ এক্সপায়ার করেছে। ভলিনির মত উগ্র গন্ধের মালিশে বিন্দুমাত্র গন্ধ নেই। তিনি জোরে জোরে পায়ে ডলে যাচ্ছেন তো যাচ্ছেন। পা জ্বালা করছে। ছাল উঠে যাবার উপক্রম। কিন্তু কোন গন্ধ নেই।
ছোট মেয়ের বয়স বছর পাঁচেক। সে কি যেন নিতে ঘরে ঢুকেই, ‘ভলিনি মাখছ বাবা?’ বলায় সম্বিৎ ফিরল তাঁর। তাঁর হাতে টিউব নেই। তাও মেয়ে বুঝতে পারছে। মানে গন্ধ বেরোচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর নাকে যাচ্ছে না।
“তুই গন্ধ পাচ্ছিস?”
“হ্যাঁ-অ্যা-অ্যা” বলে বড় করে ঘাড় নেড়ে দিল মেয়ে।
অর্থাৎ তাঁর ঘ্রাণশক্তি গেছে। এটা কি স্বাভাবিক? নাকি সেই চীনা রোগের কামাল? যিনি বলতে পারতেন, সেই গদাধরবাবু দিন দুই হল হাসপাতালে। তাঁরও নাকি সেই চীনা রোগ হয়েছে। এখন যমে মানুষে টানাটানি। নাকের গন্ধ চলে যাওয়াতে এই প্রথমবার হরবাবু সামান্য বিচলিত হলেন। যদিও বাড়িতে কিছু বললেন না। তাঁর স্ত্রী সব কিছুতে বাড়াবাড়ি করে, কিছু বললেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে।
দুপুরবেলা খেতে গিয়ে মুখে কোন স্বাদ পেলেন না হরবাবু। জ্বরের জন্য রুটি বানাতে বলেছিলেন। খেতে গিয়ে মনে হল জলে ভিজানো পিচবোর্ড চিবোচ্ছেন। কোনমতে কিছুটা গিলেই বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে পড়লেন তিনি। জ্বরটা আবার এসেছে। এবার আরও বেশি প্রাবল্যে। তাঁর সারা গা হাত পা কাঁপতে লাগল। দাঁতে দাঁতে খটখট। সারা গা ব্যাথায় ফেটে যাচ্ছে। কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বেরোচ্ছে। কাশিটা যেন থামতেই চাইছে না। বিকেল গড়াতে না গড়াতেই হরবাবুর শ্বাসকষ্ট শুরু হল। স্ত্রী আর মেয়েরা পাশের ঘরে বসে টিভিতে দিদি নাম্বার ওয়ান দেখছিল। তিনি কোনমতে শরীরটা টেনে নিয়ে ঘরের সামনে গিয়েই “ডাক্তার ডাকো” বলে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন। আর কিচ্ছু মনে নেই তাঁর।
.
॥ ৪॥
যখন জ্ঞান এল হরবাবু দেখলেন তাঁর গলা শুকিয়ে আসছে। তিনি কথা বলতে চাইলেন। পারলেন না। মুখ মাস্কে ঢাকা। চারিদিকে প্ল্যাস্টিকের একটা মশারি মত খাটিয়ে দেওয়া। হাতে তিন চার রকমের নল ঢোকানো। খানিক পর পর পিঁক পিক করে কিসের যেন একটা শব্দ কানে আসছে। প্রথমেই যেটা হরবাবুর মনে হল, নিশ্চয়ই এটা কোন নার্সিং হোম। সুযোগ পেয়ে প্রচুর টাকা খিঁচে নেবে। মাথা ওঠাতে গিয়ে দেখলেন, মাথা সীসার মত ভারী। শরীরে একরত্তি জোর নেই। তেষ্টা পেয়েছে। কাউকে ডাকবেন, সে উপায় নেই। আশেপাশে কাউকে দেখতে পেলেন না চন্দ্রবাবু। শব্দটা বাড়ছে। হয়তো সেই শব্দেই দরজা খুলে অদ্ভুত এক জন্তু ঘরে এসে ঢুকল। জন্তুটার দুই হাত, দুই পা মানুষের মত। কিন্তু মাথা থেকে পা অবধি অদ্ভুত একটা সাদা রঙের প্লাস্টিকের পোষাকে ঢাকা। অনেকদিন আগে বন্ধুর বাড়িতে নেহাত অনিচ্ছাতেই একটা ইংরাজি সিনেমা দেখেছিলেন হরবাবু। ভীনগ্রহের প্রাণীদের নিয়ে। এই জন্তুটাকে দেখে তাঁর সেই প্রাণীর কথাই মনে হল। জন্তুটা সেই আওয়াজ শুনে তাঁর কাছে এগিয়ে এল। ভাল করে তাঁর বিছানার পাশে রাখা কি একটা যন্ত্র দেখল। তারপর সেই প্ল্যাস্টিকের মশারির বাইরে থেকে তাঁর দিকে তাকালো। হরবাবুর চোখে চশমা নেই। তিনি তবু দেখার জন্য চোখ বড়বড় করে তাকালেন। জন্তুটা আচমকা একটা চিৎকার করে আবার দরজার দিকে ছুট দিল।
পরের অংশ বেশ সংক্ষিপ্ত। একদল একই রকম জন্তু এসে উপস্থিত। তাঁদের যিনি সর্দার তিনি হরবাবুকে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বললেন “স্ট্রেঞ্জ! একে তো মিরাকল ছাড়া কিছু বলাই যায় না! শেষে ওই ভুল ইঞ্জেকশানের জোরে কি মরা মানুষ বেঁচে উঠল?”
হরবাবু কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। বুঝলেন কিছুদিন পরে। এই অদ্ভুত পোষাকের নাম পিপিই কিট। এখন নাকি সেই চীনা রোগের হাত থেকে বাঁচতে ডাক্তার নার্সরা এই পোষাক পরেই চিকিৎসা চালাচ্ছেন। ডাক্তারের নাম কি একটা মুখার্জি। কাঁচা পাকা চুল। তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বেশ খানিক মাথা চুলকে বললেন-
“বুঝলেন মশাই, আপনার কেসটা স্ট্রেঞ্জ বললে কিস্যুই বলা হয় না। আপনাকে যখন নিয়ে এল, তখন আপনার প্রায় শেষ অবস্থা। আমি দেখেই বুঝেছিলাম গন কেস। এসব ক্ষেত্রে আমরা লাস্ট চান্স হিসেবে একটা কোরামিন দিই। সেটাই দিলাম। আর দিতেই আপনার বডি কাঁপতে কাঁপতে লোহার মত স্টিফ হয়ে গেল। সব রকম পরীক্ষা করে দেখলাম আপনার দেহে প্রাণ নেই।”
“বলেন কি!!” হতবাক হরবাবুর মুখে কথা জুটল না।
“তাহলে আর বলছি কি? কিন্তু জানেন তো, খানিক অবজারভেশনে রেখে বড়ি ছাড়তে হয়। ঘন্টা তিনেকবাদে আমি ডেথ সার্টিফিকেট লিখছি, এমন সময় খবর এল আপনি বেঁচে উঠেছেন। আমার এত বছরের ডাক্তারী বিদ্যায় এর কোন ব্যাখ্যা নেই। মিরাকল ছাড়া আর কিই বা বলি?”
.
ধীরে ধীরে হরবাবু জানতে পারলেন, খবর পেয়ে হাসপাতালে আত্মীয়রা চলেও এসেছিল। তাঁর শালা নাকি অফিসে ফোন করে তাঁর মৃত্যু সংবাদ জানিয়েছে। শুধু জানায় নি, তাঁর দিদি কবে থেকে ফ্যামিলি পেনশান পাবে, সেই তদারকও করে ফেলেছে। সে যাই হোক, আরও দুই হপ্তা হাসপাতালে কাটিয়ে হরবাবু বাড়ি ফিরলেন। প্রায় লাখখানেকের উপরে বিল হয়েছে। তবে একটাই বাঁচোয়া, সরকার নাকি ঘোষণ করেছেন, কোন সরকারী কর্মচারীর এই রোগে সরকার চিকিৎসার ব্যয় বহন করবেন। হরবাবু এখন বেশ সুস্থ। কিন্তু আরও দুই হপ্তা তাঁকে বাড়িতেই থাকতে বলেছেন ডাক্তার। শরীর দুর্বল কিন্তু ঝরঝরে। বাড়ি এসে শুনতে পেলেন পাশের বাড়ি গদাধরবাবুদের বাড়িতে তালা। এই চীনা রোগে তিনি, তাঁর স্ত্রী দুজনেই মারা গেছেন। বাচ্চা মেয়েটাকে তাঁর মামারা এসে মামাবাড়ি নিয়ে গেছে।
হরবাবুর ফেরার খুশিতে গিন্নি পাড়ার হনুমান মন্দিরে একশো টাকা দানপাত্রে ফেলে এলেন। অন্য সময় হলে হরবাবু কখনই এটা করতে দিতেন না। কিন্তু এই রোগ তাঁর মধ্যে কিছু একটা বদলে দিয়েছিল। তিনি বাধা দিলেন না। এখন তিনি সুস্থ। কিন্তু তাঁর গন্ধের অনুভূতি ফেরেনি। স্বাদ অল্প পেলেও গন্ধ জিনিষটাই একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে তাঁর ইন্দ্রিয় থেকে। আরও সাতদিন কাটল। তারপর একদিন অদ্ভুতভাবে তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর ঘ্রাণশক্তি ফিরে এসেছে।
কিন্তু তিনি ঠিক এমনটা চান নি।
.
।।৫।।
দুপুরবেলা নিজের খাটেই শুয়ে ঘুমাচ্ছিলেন হরবাবু। একটা অদ্ভুত অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল তাঁর। বিছানায় উঠে চুপ করে বসে রইলেন খানিকক্ষণ। কেন ঘুম ভাঙল সেটা বুঝতেই মিনিট পাঁচেক সময় লাগল। তাঁর দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আর যাচ্ছে অদ্ভুত এক গন্ধে। এই গন্ধ তিনি আগে কোনদিন পান নি। হরবাবু জানেন মানুষের অভিধানে হাজার রকম রঙের নাম থাকলেও গন্ধের কোন নাম নেই। ফলে মানুষকে পেঁয়াজের মত গন্ধ, পচা ডিমের মত গন্ধ কিংবা গোলাপের মত গন্ধ বলে কাজ চালাতে হয়। একেবারে অচেনা কোন গন্ধ পেলে তাঁর নাম কি হবে, সে হদিস কেউ দিতে পারেন নি। হরবাবুও এই গন্ধে খানিক ভ্যাবাচাকা খেয়ে বসে রইলেন। তারপর তিনি উঠলেন গন্ধের উৎস খুঁজতে।
বেশি খুঁজতে হল না। তাঁর ঘরেরই এক কোণে ছোটমেয়ে বসে পুতুল খেলছে। নতুন পুতুল তাঁর মামা কিনে দিয়েছে। মুখে লালিপপ। সে মহানন্দে লালিপপ চুষছে, পুতুলের সঙ্গে খেলছে আর গুনগুন করে “পুতুল পুতুল খুকুমণির আজকে হবে বিয়ে” গাইছে। মেয়ের সারা গা দিয়ে অদ্ভুত মিষ্টি একটা গন্ধ ভুরভুর করছে। সে গন্ধের তীব্রতা এতটাই যে হরবাবুর দম আটকে যাবার উপক্রম। হরবাবুর একই সঙ্গে আনন্দ আর রাগ হল। আনন্দ হবার কারণ তাঁর ঘ্রাণ শক্তি আবার ফিরে এসেছে, আর রাগের কারণ মেয়ে নতুন কোন ডিও বা সেন্ট কিনে প্রায় গোটাটাই গায়ে মেখে বসে আছে।
তিনি মেয়েকে একটু কড়া ভাবেই বললেন “অকারণে গায়ে এত সেন্ট মেখেছিস কেন?”
মেয়ে চমকে উঠল, “কোথায় বাবা? সেন্ট মাখিনি তো! তুমিই তো বল সেন্ট খুব বাজে জিনিস। মাখলে গায়ে ঘা হয়।”
হরবাবুর এবার বেজায় রাগ হল। তিনি অকারণ মিথ্যা কথা সহ্য করতে পারেন না। তিনি স্পষ্ট মেয়ে গা থেকে গন্ধটা পেয়েছেন, এখনও পাচ্ছেন, আর এতটুকু বাচ্চা মেয়ে কিনা অবলীলায় মিথ্যে বলে যাচ্ছে! মানুষের চরিত্রগঠনের সময় শিশুকাল। এখন বিগড়ালে সারা জীবন বিগড়েই থাকবে। তিনি নিচু হয়ে মেয়ের গালে মারলেন এক চড়। মেয়ে পরিত্রাহি চিৎকার জুড়ে দিলে।
“ও মা!! দেখো বাবা আমাকে অকারণে মারছে”
মজার ব্যাপার, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের গায়ের সেই মিষ্টি গন্ধটা একেবারে উবে গিয়ে তাঁর সারা গা থেকে ঝাঁঝালো একটা গন্ধ বেরোতে লাগল। সে গন্ধ আর যারই হোক, কোন ডিও বা এসেন্সের হতে পারে না। মেয়ের চিৎকার শুনে মেয়ের মা ছুটে এলেন এবং হরবাবুকে যারপরনাই দুকথা শুনিয়ে দিলেন।
“কি রকম বাবা গো তুমি হ্যাঁ? মেয়েদের সঙ্গে আজ অবধি দুটো ভাল করে কথা বলেছ? না আদর করেছ? এদিকে কিল মারার গোঁসাই। চল তো মা, এই ঘর থেকে চল। থাক তোর বাবা একা একা পড়ে। না আছে মুখে মিষ্টি, না আছে স্বভাবে মিষ্টি। আমি বলে তাও এই পাপের সংসারে টিকে আছি। অন্য কেউ হলে কবে এক লাথি মেরে যে দিকে দুচোখ যায় চলে যেত। তখন তোর বাবা বুঝত কত ধানে কত চাল।”
এতগুলো কথা অসুস্থ হরবাবুকে সহ্য করতে হল। তাঁর একমাত্র সাক্ষী ছিল যে মিষ্টি গন্ধ, তাও আচমকা উধাও হয়েছে। বদলে তাঁর স্ত্রী আর মেয়ে দুজনের শরীর থেকেই সেই ঝাঁঝালো গন্ধটা পাচ্ছিলেন হরবাবু, যদিও সেটা বলার সাহস তাঁর হয়নি।
.
বিকেলে আর রাতে খেতে গিয়ে হরবাবু একটু ধন্দে পড়লেন। তিনি যা ভাবে আনন্দিত হয়েছিলেন, ব্যাপারটা ঠিক তা না। খেতে বসে তিনি মাছভাজা, কাঁচা পেঁয়াজ এমনকি ধনে পাতার চাটনির সামান্যতম গন্ধও পেলেন না। বরং একেবারে অচেনা দুই তিন রকম গন্ধ তাঁর নাকে এল। হরবাবু একটু কৌতুহলী হলেন। ঠিক করলেন কাউকে কিছু না বলে নিজেই এই রহস্যের সমাধান করবেন।
.
॥৬॥
এক সপ্তাহ কেটে গেছে। হরবাবু এখন ধীরে ধীরে এই গন্ধের প্যাটার্নটা অনেকটা বুঝতে পেরেছেন। প্রথমত তিনি কোন নিষ্প্রাণ বস্তুর গন্ধ পান না। জীবনে প্রথমবার বাজার থেকে এসেন্স কিনে গন্ধ শুঁকে দেখেছেন, কোন কাজ হচ্ছে না। শুধু তাই নয়, কোন উদ্ভিদ বা রান্না করা খাদ্যের গন্ধও তাঁর নাকে আসে না। যে কারনে গোলাপ আর জবাকে গন্ধ দিয়ে তিনি আলাদা করতে পারেন না। কিন্তু তিনি গন্ধ পান। সে গন্ধ আসে জ্যান্ত মানুষের গা থেকে। প্রতিটা মানুষের দেহের যে আলাদা আলাদা গন্ধ থাকে, সেই ধারণা হরবাবুর আগে ছিল না। এখন তাঁর কোয়ারেন্টাইন পিরিয়ড কেটেছে। মুখে মাস্ক পরে বাইরেও যান মাঝে মধ্যে। ফলে নানা রকমের মানুষ এবং তাঁদের গন্ধের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ তাঁর মিলছে। শুধু তাই নয় একটু মনোযোগী হয়ে খেয়াল করে তিনি লক্ষ করেছেন এই গন্ধটা একেবারে চেহারার মত। গন্ধ দিয়েই মানুষ চেনা যায়। প্রতিটা মানুষের একটা বেসিক গন্ধ থাকে। সেই মানুষটা আনন্দে থাকলে গন্ধটা একটা মিঠে ভাব নেয়, আবার রেগে গেলে সেই গন্ধই তীব্র ঝাঁঝালো হয়ে ওঠে। বেসিক গন্ধটা বদলায় না। ভাল করে খেয়াল করলে শুধু গন্ধ দিয়েই একজন মানুষকে চেনা সম্ভব। নিজের ঘরে চোখ বন্ধ করে শুয়ে হরবাবু এই এক্সপেরিমেন্টটা করেছেন। সফল হয়েছেন। তিনি খাটে দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়েছিলেন। গন্ধতেই বুঝলেন পাশের ঘরে তাঁর স্ত্রী ঢুকে বেড়িয়ে গেলেন। এটাও বুঝলেন কোন কারণে স্ত্রী আজ রেগে আছেন। একেবারে হোমসের কায়দায় তিনি স্ত্রীকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন “কি গো কী ব্যাপার? মাথা গরম মনে হচ্ছে?”
তাঁর স্ত্রী বাস্তবিক পক্ষেই অবাক হলেন। সামনের বাড়ি নতুন এক ভাড়াটিয়া এসেছে। সেই বউটি ভারী অসভ্য। আজ তাঁদের বাড়ি গুঁড়ো দুধ ছিল না। তিনি সামনের বাড়ি চাইতে গেছিলেন। ভদ্রভাবেই বলেছিলেন “শান্তা, তোমার জামাইবাবু দুধ চা ছাড়া খেতে পারে না। এদিকে ঘরের দুধ বাড়ন্ত। অল্প ধার দেবে? আমি কাল পরশুর মধ্যে তোমার দাদার মাইনা হলেই ফেরত দিয়ে দেব।”
বউটি নাকি সোজা বলে দিয়েছে, “না গো দিদি। এই ক’দিনে পাড়ায় তোমাদের অনেক সুখ্যাতি শুনেছি। যা একবার ঢোকে, তা নাকি আর বেরোয় না। তোমার দেওর আমাকে পরিষ্কার বলে দিয়েছে আগেরদিনের আধপো চিনি ফেরত না পেলে আর নতুন করে কিছু ধার দেওয়া যাবে না।”
এসব শুনে কার মাথা ঠিক থাকে? কিন্তু সেটা হরবাবু জানলেন কেমন করে? হরবাবু আর বিস্তারিত ব্যাখ্যায় গেলেন না। ধীরে ধীরে প্র্যাকটিস করতে করতে তাঁর এই বিদ্যা আরও চকচকে হল। তিনি এখন চেনা লোক বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে থাকলেও শুধু গন্ধে তাঁকে চিনতে পারেন। গন্ধ দিয়েই বুঝতে পারেন আজ স্ত্রীর মুড কেমন আছে। এমনকি রাতের বেলাতেও মেয়েরা ঘুমিয়ে পড়লে কোনদিন স্ত্রীকে আদর করতে গেলে তিনি সাড়া দেবেন আর কোনদিন বলবেন “আজ প্রচণ্ড মাথাব্যাথা করছে” সেটাও আগে থেকেই গন্ধ দিয়েই তিনি আঁচ পেতে লাগলেন। ফলে তাঁর সংসারে আগের থেকে সামান্য হলেও পরিবর্তন এল। আর তারপরেই চীনা অসুখের প্রকোপ একটু কমায় অফিস খুলে গেল।
হরবাবুর গন্ধ ফিরল না। তিনি আর স্বাভাবিক কিছুর গন্ধ পান না। স্ত্রী বিশেষ চিন্তিত ছিলেন এই রোগ নিয়ে। এ কেমন রোগ যাতে বিরিয়ানী আর পাস্তাভাত খেতে একই রকম লাগে! তাঁর জোরাজুরিতেই দুই তিনজন ডাক্তার দেখালেন হরবাবু, কিন্তু কেউ কোন সুরাহা করতে পারল না। প্রত্যেকেই একগাদা টেস্ট করতে দিচ্ছে, আর সেসবে হরবাবুর ঘোর অনীহা। যা চলছে চলুক গে। হয়ত এভাবেই চলত কিন্তু এরই মধ্যে একটা ঘটনা ঘটল যাতে হরবাবু প্রথমবার বেশ ভয় পেলেন।
.
॥৭॥
হরবাবু বাড়ির সামনে থেকে বাসে ওঠেন। প্রায় একঘন্টা বাসজার্নি, তারপরে অফিস। হরবাবু যেখান থেকে বাসে ওঠেন, সেখানে বাস বেশ ফাঁকাই থাকে, ফলে বসার জায়গা পাওয়া যায়। সেদিনও সেই রকমই বসেছিলেন। দুটো স্টপেজ যেতে না যেতে প্রায় হুড়মুড় করে তাঁর পাশে একটা ছেলে উঠে বসল। বয়স খুব বেশি হলে বছর কুড়ি একুশ। কানে হেড ফোন গোঁজা। চোখ মোবাইলে। সে পাশে এসে বসতেই হরবাবু অদ্ভুত একটা গন্ধ পেলেন। এই রকম গন্ধ তিনি আগে পাননি। গন্ধটা নাকে যেতেই যেন মনটা দুঃখে ভরে উঠছে। তিনি বারকয়েক ছেলেটার দিকে তাকালেন। ছেলেটার ভ্রূক্ষেপ নেই। সে একমনে মোবাইলে চ্যাট করছে। এরপরেই ছেলেটার মোবাইলে একটা ফোন এল। বোধহয় প্রেমিকার। মাউথপিসটা প্রায় দাঁতে কামরে ধরে ফিসফিস করে কথা বলতে লাগল ছেলেটা।
“হ্যাঁ। আসছি…কেন কি হয়েছে? মাইরি বিশ্বাস কর, ওটা আমার বোন হয়। মা কালীর দিব্যি…মা শীতলার কিরা। এরকম করলে কিন্তু আমি খুব রেগে যাব বলে দিচ্ছি…”
কন্ডাকটার এসে টাকা চাইতে ছেলেটা আচমকা তাকিয়ে খেয়াল করল গাড়ি তাঁর গন্তব্য পেরিয়ে হাই রোডের উপর দিয়ে শোঁ শোঁ করে যাচ্ছে।
“এই থামাও, থামাও। নামব” বলে কন্ডাকটরের হাতে দশ টাকার একটা নোট গুঁজে নেমে গেল ছেলেটা। এদিকে কথা চলছেই “তুমি দুই মিনিট দাঁড়াও। আমি সব ক্লিয়ার করে দিচ্ছি। আগে একটা কিসি দাও…” উলটো দিক থেকে আরও একজন হাত দেখাচ্ছে। সেও বাসে উঠবে। ইঞ্জিন চালিয়ে বাস দাঁড়িয়ে আছে। হরবাবু জানলা দিয়ে খেয়াল করলেন ছেলেটা কথা বলতে বলতেই অন্যমনস্ক ভাবে হাই রোড পেরোতে গেল, আর কাউকে কোন সুযোগ না দিয়ে একটা দশ চাকার লরি প্রচণ্ড জোরে এসে পিষে দিল ছেলেটাকে। গোটা বাসের লোক ছুটে গেল। হরবাবু নামলেন না। তাঁর সারা শরীর ঠক ঠক করে কাঁপছে। একেবারে চোখের সামনে মৃত্যু দেখার জন্য নয়। তিনি বুঝে গেছেন তিনি মৃত্যুর গন্ধও পাওয়া শুরু করেছেন। এবার তাঁর ভয় করতে শুরু করল।
.
॥ ৮॥
পরের দুই তিন মাসে আরও গোটা দশেকবার সেই মন খারাপ করা গন্ধটা পেয়েছেন হরবাবু। প্রতিবার যার গায়ের থেকে পেয়েছেন সে মারা গেছে। অধিকাংশই সেই চীনা রোগে। একজন হার্ট অ্যাটাকে। ব্যাঙ্কে কিছু কাজ ছিল। লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ক্যাশ কাউন্টার থেকে সেই গন্ধটা পেতেই দেখেন কাউন্টারের ভদ্রলোক এই এসিতেও ঘাম মুছছেন। হরবাবু আর থাকতে পারলেন না। কাউন্টারের সামনে গিয়ে বললেন “আপনার মনে হয় শরীর খারাপ। আপনি ডাক্তার দেখান”। মোটা ভদ্রলোক মাথা নেড়ে চেয়ার থেকে উঠতে গিয়েই ঢলে পড়লেন। স্পট ডেড।
একটা ব্যাপার খেয়াল করলেন হরবাবু। যত রকম আবেগ, প্রায় প্রতিটার জন্য গন্ধের ধরনও পালটায়। রাগের গন্ধ ঝাঁঝালো, দুঃখের গন্ধ অনেকটা না মেলে দেওয়া ভেজা গামছার মত, যতদিন যায় তীব্রতা বাড়ে, আনন্দের গন্ধ সদ্য তোলা পাতিলেবুর মত, মন ভাল করা। যদিও একমাত্র আনন্দের বেলাতেই যত সময় যায় গন্ধের তীব্রতা কমে আসে। হরবাবুর একটা পুরোনো লাল ডায়রি ছিল। তাতে তিনি নানা অচেনা গন্ধ, সেটা অনেকটা কার মত, আর সেটা কোন আবেগের সঙ্গে যুক্ত, তাঁর একটা টেবিল বানালেন। মাস ছয়েকের মধ্যে তিনি বুঝতে পারলেন আর এমন কোন গন্ধ নেই, যা তাঁর অচেনা। রাস্তাঘাটে, অফিসে বাসে, সব জায়গায় তিনি এই গন্ধ দিয়েই মানুষের আবেগ বুঝতে শুরু করলেন। সবচেয়ে লাভ হল অফিসে।
এর মধ্যে তাঁর একটা প্রমোশান হয়েছে। সবাই আবদার করলেও তিনি কাউকে এক পয়সার খাওয়ান নি।
বরং শশাঙ্ক বলতে এলে তিনি দুকথা শুনিয়ে দিতেও ছাড়েন নি।
“দ্যাখ ভাই, প্রমোশান হয়েছে আমার নিজের যোগ্যতায়। কাউকে তেল মেরেও না, ঘুষ খাইয়েও না। ফলে তোমাদের খাইয়ে আমি ভূতের বাপের শ্রাদ্ধ করতে যাব কোন দুঃখে? তাতে তোমরা কে কি মনে করলে আমার কিছু যায় আসে না।”
কিন্তু এই না খাওয়ানোতে কে কে তাঁর উপরে ভয়ানক রেগে গেছে, কারাই বা হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরছে, সবই তাঁদের গন্ধ থেকে টের পেতে লাগলেন হরবাবু। অফিসের বড়সাহেবের মুড বুঝে না চললেই তিনি যা তা বলেন। আগে হরবাবু ছিলেন তাঁর মেইন টার্গেট। ইদানীং হরবাবু তাঁকে রাগার সুযোগই দিচ্ছেন না।
কিন্তু যে কোন মানুষ এক নতুন আবিষ্কারের পর খ্যাতি চায়। হরবাবুর-ও মনে হল এই যে তাঁর অদ্ভুত ক্ষমতা, শুধু ক্ষমতাই না, সেই ক্ষমতাকে তিনি যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কাজে লাগিয়েছেন, তা বিশ্বের মানুষের জানা উচিৎ। তার জন্যে আগে লাগবে স্বীকৃতি। নিতান্ত অনিচ্ছাতেও পাঁচশো টাকা দিয়ে হরবাবু সেই ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করলেন, যিনি তাঁকে ভুল ইঞ্জেকশান দিয়ে মেরে ফেলেছিলেন। ডাক্তার প্রথমে তাঁকে চিনতে অস্বীকার করে। পরে হরবাবু যখন বলেন তিনি ডাক্তারের বিরুদ্ধে মামলা করতে নয়, তাঁর সাহায্য চাইতে এসেছেন, তখন রীতিমত খাতির করে তাঁকে চা অবধি অফার করলেন।
গ্রীন টি-তে চুমুক দিতে দিতে হরবাবু প্রথম থেকে সব খুলে বললেন। এমনকি ডাক্তারকে বিশ্বাস করাতে সেই ডায়রিও দেখালেন। এও বললেন, তাঁর কাছে এখন গ্রীন টি আর গুঁড়ো চা সব সমান, তিনি কিছুর গন্ধই পান না। কিন্তু ডাক্তারবাবু যে অবাক আর বিরক্ত একসঙ্গে হচ্ছেন, তা তিনি বুঝতে পারছেন। ডাক্তার কিছু বললেন না, শুধু একজন ডাক্তারের নাম লিখে দিলেন প্রেসক্রিপশনে আর তাঁর সঙ্গেই দেখা করতে বললেন। শুধু শুতে যাবার আগে একটা ঘুমের ওষুধ লিখে দিলেন। নিচে রিসেপশানে খোঁজ নিয়ে হরবাবু জানতে পারলেন, যার নাম লিখে দিয়েছেন, তিনি বিখ্যাত এক পাগলের ডাক্তার। হরবাবু ঠিক করলেন আর কাউকে কোনদিন এই কথা জানাবেন না।
সেদিন বাড়ি ফেরার পথেই তিনি সম্পূর্ণ নতুন একটা গন্ধ পেলেন, যা তাঁর এতদিনের শান্তির জীবনটাকে বদলে দিল চিরকালের মত।
.
।।৯।।
হরবাবুর বাড়ি একটা গলির মধ্যে। ইদানীং প্রায়ই গলিতে আলো থাকে না। ল্যাম্পপোস্টে নতুন আলো লাগিয়ে দিলেও কারা যেন ফাটিয়ে দিয়ে যায়। নাকি সস্তার বাল্ব নিজেই ফেটে যায় কে জানে। সেদিন গলিতে ঢুকতে গিয়েই নাকে নতুন রকম একটা গন্ধ পেলেন হরবাবু। সাত আট মাস হয়ে গেছে। এখন এই গন্ধের ব্যাপারে তাঁকে বেশ বিশেষজ্ঞ বলা চলে। তাঁর ধারণা ছিল এমন কোন গন্ধ থাকতেই পারে না, যা তাঁর অজানা। তাই এই অজানা গন্ধ পেয়ে তিনি চমকে উঠলেন। তাকিয়ে দেখলেন তাঁর ঠিক পাশ দিয়েই চলে গেল বছর তিরিশের এক ছোকরা। বাবলু। বাবলু এককালে পড়াশুনোয় বেশ ভাল ছিল। এখন ইউনিভার্সিটিতে উঠে পাখা গজিয়েছে। সিগারেটে গাঁজা ভরে টানে। শোনা যায় ড্রাগ, মেয়ে মানুষ কিছুই নাকি বাদ নেই। বাবলুর চোখ মোবাইলে। তাঁকে দেখতে পায়নি।
কোন বিজ্ঞানী নতুন প্রজাতির প্রাণীর সন্ধান পেলে যেমন শত বিপদেও ঝাঁপিয়ে পড়ে, হরবাবুও বাবলুর গা থেকে এই নতুন গন্ধ পেয়ে তাঁর পিছু নেওয়া শুরু করলেন। একটু দূরত্বে। এত দূর থেকেও গন্ধটা পাওয়া যাচ্ছে। তার মানে যা হবার খানিকক্ষণের মধ্যেই হবে। গন্ধটা কিসের মত? চেনা চেনা। খাসির মাংসের দোকানে রক্ত আর মাংসের যে চিমসে একটা গন্ধ পাওয়া যায়, অনেকটা তার মত। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি কড়া। ঝাঁঝালো।
বাবলু মোবাইলে চোখ রেখে রাস্তার এক কোণা ধরে হাঁটতে লাগল। বেশ কিছুটা দূরে হরবাবু। বড় রাস্তায় কুচকুচে কালো দামী একটা গাড়ি। ভিতরে গান চলছে জোরে। ভিতরের আলো জ্বলছে। গাড়িতে ড্রাইভারের সিটে একটা সুন্দরী মেয়ে বসে। বাবলুর বয়সী হবে। বাবলু হাত নাড়ালো। মেয়েটাও। মেয়েটা গাড়ির দরজা খুলে দিল। এবার আর একটা গন্ধ খুব হালকা ভেসে এল হরবাবুর নাকে। এই গন্ধ শেষবার তিনি পেয়েছিলেন ব্যাঙ্কে। সেই ক্যাশিয়ারের গা থেকে। হরবাবু ঘাবড়ে পিছন ফিরতে গিয়ে পা পিছলে উলটে পড়লেন। হাঁচড়ে পাঁচড়ে কোনক্রমে উঠে দেখেন বাবলু গাড়িতে না ঢুকে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি উঠে দাঁড়াতেই গাড়ি ছেড়ে দিল হুশ করে। গাড়ির নম্বরটা হরবাবু মনে মনে মুখস্থ করে নিলেন।
.
॥ ১০॥
দিন তিনেক বাদে বাংলার প্রতিটা সংবাদপত্রে খবরটা বেরোলো। অফিসরুমে একটা পেপার রাখা হয়। উৎপলই জোরে জোরে পড়ে শোনাচ্ছিল।
“দেখছ কি অবস্থা? এত বড় বিজনেসম্যানের মেয়ের যদি এই রাজ্যে কোন সেফটি না থাকে, তো আমরা কোন চুনোপুঁটি?”
শশাঙ্ক টেবিল থেকে মুখ উঠিয়ে জিজ্ঞেস করল “কি হয়েছে ভাই?”
“এই যে শোন, পেপারে কি লিখেছে, ‘গত তিন দিন যাবৎ বিখ্যাত হোশিয়ারি ব্যাবসায়ী বিনয় জালানের মেয়ে পূজা জালান নিরুদ্দেশ। শেষ খবর পাওয়া অবধি সে জানিয়েছিল সে তার প্রেমিক কমলেশের বাড়ি যাচ্ছে। পুলিশ কমলেশকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু কমলেশ জানায় গত সাত দিনের মধ্যে তাঁর সঙ্গে পূজার কোন দেখা সাক্ষাৎ দূরে থাক ফোনেও কথা হয়নি। ইদানীং নাকি তাঁদের কোন এক ব্যাক্তিগত কারণে মনমালিন্য চলছিল। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী এখনও পূজার কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি। পূজার সঙ্গে নিখোঁজ পূজার গাড়িও। গাড়িতে জিপিএস লাগানো ছিল। তা সত্ত্বেও গাড়ির খোঁজ না পাওয়ায় পুলিশের ধারণা গাড়ির জিপিএস কিংবা গোটা গাড়িটাই কেউ নষ্ট করে দিয়েছে। পূজার ফোনও লোকেট করা যাচ্ছে না। পূজার গাড়ির নাম্বার…”
এই নাম্বারটা শুনে হরবাবুর হৃদস্পন্দন এক সেকেন্ডের জন্য হলেও বন্ধ হয়ে গেল। বাবলুকে সেদিন এই গাড়িতেই উঠতে দেখেছিলেন তিনি। তারপর দিন দুয়েক বাবলুকেও পাড়ায় দেখেন নি। যদিও কাল সকালেই মোড়ের মাথায় চায়ের দোকানে দেখতে পেয়েছেন। একেবারে নির্বিকার।
আরও দিন দুয়েকবাদে ঝাড়গ্রামে এক জঙ্গলে পোড়া গাড়ির মধ্যে পূজার দেহ পাওয়া গেল। জ্বলে কাঠ হয়ে গেছে। কোথাও কোন প্রমাণ নেই। আততায়ী বুদ্ধিমান। সব প্রমান লোপাট করে দিয়েছে। পুলিশ কমলেশকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। প্রথমত তার বাবা নাম করা ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট, আর দ্বিতীয় তাঁর পাক্কা অ্যালিবাই আছে।
হরবাবু অদ্ভুত দোলাচলে পড়লেন। পুলিশ অনেক খুঁজে কিছু চুলের স্যাম্পল আর আঙুলের ছাপ পেয়েছেন। কিন্তু সেটা কার তা বুঝতে পারছেন না। পূজার বাবা নিজে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, কেউ এই বিষয়ে কিছু জানাতে পারলে তিনি তাঁকে দশ লাখ টাকা দেবেন। অবশ্য খবর যদি সত্যি হয়। হরবাবু দোনামনা করছিলেন। এই বিজ্ঞাপনটা বেরনোর পর ঠিক করলেন আজই অফিস থেকে বাড়ি ফিরে পুলিসের কাছে যাবেন।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। তখন বউ মেয়েরা টিভি দেখে। আজ টিভি চলছে না। একটু অবাক হলেন হরবাবু। বাইরে একটা দামী উডল্যান্ডের জুতো খোলা। কেউ এল নাকি? ঘরে ঢুকে দেখলেন ছোটমেয়েকে কোলে নিয়ে হাসিমুখে বাবলু বসে আছে। আজ আর তাঁর গায়ে সেই গন্ধটা নেই। তাঁকে দেখেই বাবলু একগাল হাসল “কাকু এসে গেছেন? একটু কথা ছিল। প্রাইভেট।”
হরবাবু বাবলুকে বসতে বলে বাথরুমে হাত-পা ধুতে লাগলেন। তাঁর মাথা বোঁ বোঁ করে ঘুরছে। তিনি আন্দাজ করতে পারছেন বাবলু কেন এসেছে। শুধু বুঝতে পারছেন না, তাঁর থেকে বাবলু কী চায়?
বাবলুকে নিয়ে নিজের ঘরে গেলেন হরবাবু। বাবলু প্রথমেই তাঁর মোবাইলটা চেয়ে নিল। যদি রেকর্ডার অন থাকে। মোবাইলের সুইচ অফ করে সোজা কাজের কথায় এল বাবলু “দেখুন কাকু, আপনিও এই পাড়ার। আমিও ছোট থেকে আপনাকে দেখে আসছি। আপনি আমায় খোঁচাবেন না, আমিও আপনাকে খোঁচাব না। সেদিন আপনি আমার পিছু নিয়েছিলেন। কেন বলুন দেখি?”
হরবাবু এই প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারলেন না। শুধু বুঝতে পারলেন ভিতরে ভিতরে বাবলু ভয়ানক রেগে আছে। তারই সঙ্গে আরও একটা জিনিষ যোগ হয়েছে। ঘৃণা। হরবাবু চুপ করে রইলেন।
“আজকে পেপারে একটা বিজ্ঞাপন বেড়িয়েছে। আপনি যেমন মানুষ, সবাই জানে। ওয়ান পাইস ফাদার মাদার। আপনি নিশ্চয়ই পুলিশে আমাকে ধরিয়ে দেবেন ঠিক করেছেন?”
“না, মানে!”
“মিথ্যা কথা বলবেন না” বাবলুর রাগ বাড়ছে, হরবাবু বুঝতে পারলেন। “শুনুন আমি যদি বিপদে পরি আমি কাউকে ছাড়ব না, এই বলে দিলাম। আর আপনার বড় মেয়ে তো এখন ক্লাস টুয়েলভ। সাবধানে রাস্তায় চলতে বলবেন। কখন কী হয়ে যায়?”
বাবলু চলে গেল। হরবাবুর স্ত্রী বহুবার জিজ্ঞেস করার পরেও হরবাবু বললেন না বাবলু ঠিক কেন এসেছিল। তাঁর দম বন্ধ হয়ে আছে। একটা গন্ধে। তাঁর নিজের গায়ের গন্ধ। এই গন্ধ আতঙ্কের।
.
।। ১১।।
হরবাবু ঠিক করে নিলেন তিনি পুলিশে জানাবেন। বেনামে। কিন্তু সমস্যা হল, বাবলুর বাবার হাত বেশ লম্বা। প্রমাণের অভাবে একবার যদি বাবলু জামিন পেয়ে যায়, তবে তাঁদের পাড়া ছাড়া হতে হবে। কিন্তু এভাবে ভয়ে ভয়ে কতদিন কাটাবেন? মেয়েরাও বড় হচ্ছে। তাঁর বড় মেয়ের দিকে বাবলুর নজর আছে। তিনি বুঝতে পেরেছেন। যে ছেলে অতবড়লোকের মেয়েকে এভাবে মারতে পারে, সে যে তাঁর মেয়েকে ছেড়ে দেবে সে গ্যারান্টি কোথায়? আজকাল মেয়েরা বাইরে বেরোলে তিনিও সঙ্গে যান। বাবলু মোড়ের মাথায় চায়ের দোকানে বসে তাঁকে নজরে রাখে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন বাঁচা যায়? ভয়ে ভয়ে একদিন লোকাল পুলিশ স্টেশনে ফোন করলেন হরবাবু। বললেন এক খুনের ব্যাপারে তাঁর কাছে খবর আছে। থানার ওসি নিজে তাঁর সঙ্গে কথা বললেন। খুব অমায়িক ব্যবহার। তারপর ফোনে গোটা ঘটনাটা শুনে বললেন “অসংখ্য ধন্যাবাদ। সবাই যদি আপনার মত সাহসী হত! এপনি এক কাজ করুন, এক ঘন্টার মধ্যে একটু স্টেশনে আসুন। চিন্তা নেই। একটা কাগজে সই করতে হবে। জাস্ট ফরমালিটি। আপনার পরিচয় গোপন থাকবে।”
ঘন্টাখানেক পরে পুলিশ স্টেশনে যেতেই এক হাবিলদার তাঁকে খাতির করে ওসির রুমে নিয়ে গেল। সেখানে আগে থেকেই বাবলু আর বাবলুর বাবা বসে। ওসি হরবাবুকে বললেন ফোনে যা বলেছেন আবার বলতে। হরবাবুর গলা শুকিয়ে আসছিল। কাঁপা কাঁপা গলায় তিনি বললেন। বাবলু অদ্ভুত ভাবে হাসল। বাবলুর বাবা গম্ভীরভাবে বললেন, “বাবলু সেই সময় এখানে ছিলই না। মাসির বাড়ি মালদা গেছিল। অন্তত দশজন সাক্ষী আছে। পুলিশ অফিসার এফ আই আর নিতে চাইলেন না। হরবাবু একগ্লাস জল চেয়ে খেয়ে পুলিশ স্টেশন থেকে বেড়িয়ে এলেন। বাড়ি ফিরেই জীবনে প্রথমবার তিনি একটা গাড়িভাড়া করে বউ আর মেয়েদের বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। সেই রাতেই। তাঁর মত মিতব্যায়ী মানুষ এই শহরতলি থেকে বহরমপুর অবধি গাড়ি ভাড়া করবে সেটা তাঁর স্ত্রী মেয়ের চিন্তার বাইরে। তাঁদের মিথ্যে বললেন। অফিসের কাজে এক হপ্তা দিল্লী যেতে হবে। কাল সকালেই। চারিদিকে এই রোগের প্রকোপ তাই ট্রেনে বাসে তাঁর ভরসা নেই। আর মেয়েরাও অনেকদিন মামাবাড়ি যায় না। কিন্তু কিন্তু করে হলেও তাঁরা রাজি হল। হরবাবু রাতের খাওয়া খেয়ে বিছানায় ঠায় বসে রইলেন। অপেক্ষায়।
.
॥ ১২॥
রাত দেড়টা নাগাদ দরজায় টোকা দিল কে যেন। প্রথমে ধীরে। তারপর বেশ জোরে। হরবাবু তৈরিই ছিলেন। তিনি তাঁর ভবিতব্য জানেন। কিন্তু এই ভবিতব্যের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী বা মেয়েকে জড়াতে চান না। দরজা খুলেই দেখলেন বাবলু দাঁড়িয়ে একা। হাতে কুচকুচে কালো একটা পিস্তল। খুব নম্রভাবে বলল “কাকু, একটু আমার সঙ্গে আসতে হবে যে”। বাবলু আসার আগে খেয়াল করেন নি, সে আসতেই গন্ধদুটো প্রকট হল হরবাবুর নাকে। দুটো গন্ধ। দুটোই তাঁর চেনা। একটা খুনীর আর একটা মৃতের। সেই মাংস রক্তের গন্ধের সঙ্গে মন খারাপ করা মৃত্যুর গন্ধটা মিশে যাচ্ছে না। আলাদা আলাদা করে দুটোকেই পাচ্ছেন তিনি। তীব্র এবং অব্যর্থ। হরবাবু জানেন এই গন্ধ পেয়েছেন মানে আর তাঁর কিচ্ছু করার নেই।
পোষাক পরাই ছিল। ঘরের আলো নিভিয়ে বাইরের দরজায় তালা মেরে অতি ধীর পায়ে বাবলুর পিছন পিছন হরবাবু বাবলুর গাড়িতে চেপে বসলেন। হন্ডা সিটি গাড়ি। হরবাবুকে বেচলেও এত দামি গাড়ি কেনার সামর্থ্য তাঁর নেই। অনেকদিন ইচ্ছে ছিল এই গাড়িতে চড়ার। আজ ইচ্ছেপূরণ হল। গাড়ির পিছনের সিটে বসিয়ে খুব যত্ন নিয়ে হরবাবুর হাত-পা বেঁধে দিল। পকেট থেকে মোবাইল নিয়ে সুইচ অফ করে নিজের পকেটে রেখে দিল। তারপর মুখ বেঁধে দিল কাপড় দিয়ে। হরবাবু বাধা দিলেন না। দিয়ে লাভও নেই বিশেষ। যা হবার তা হবেই তাঁকে আটকানোর সাধ্যি নেই তাঁর।
গাড়ি ছুটল কোলাঘাট এক্সপ্রেসওয়ে ধরে। এই পথ দিয়ে মেদিনীপুর ঝাড়গ্রাম যাওয়া যায় শুনেছেন হরবাবু। বাবলু প্রথমে একটা ইংরাজি গান গাইছিল। তারপর যেন বাতাসকে উদ্দেশ্য করেই বলল “সবার সঙ্গে চালাকি চলে, কিন্তু এই বাবলু শর্মার সঙ্গে ওসব চলবে না। পুলিশ থেকে মন্ত্রী সবাইকে আমি বাঁ পকেটে রেখে ঘুরি। তবে হ্যাঁ, আপনার চিন্তা নেই। আপনি চলে যাবার পর বউদি আর দুটো মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না। আমি আছি তো। আমাদের পার্টিতে বাচ্চা মেয়েদের খুব কদর। আর সত্যি বলতে কি বউদির-ও তো তেমন বয়স হয়নি, ফিগারটাও যাকে বলে…আপনি ভাববেন না। সব দায়িত্ব আমার” বলেই খ্যাঁক খ্যাঁক করে একটা অশ্লীল হাসি হাসল বাবলু।
গাড়ির এসি বাড়ানো। খুব ঢিমে আওয়াজে একটা গান চলছে। কথা বোঝা যাচ্ছে না। পিছনে বসতে অসুবিধে হচ্ছে হরবাবুর। একে হাত পা বাঁধা, তাঁর উপরে একগাদা মদের বোতল পায়ের সামনে পড়ে আছে। গাড়ির দোলার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোও নড়ছে। হরবাবুর বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল। গন্ধগুলো হঠাৎ বেড়ে গেল না? গাড়ি হাই রোড ছেড়ে এবার একটা কাঁচা রাস্তা ধরেছে। দুইধারে বাঁশবন। তার মধ্যে দিয়েই হলুদ জন্ডিস রোগীর চোখের মত ঝাপসা গাড়ির আলো অন্ধকার চিরে পথের নিশানা দেখাচ্ছে। গন্ধ বাড়ছে। এবার যেন দম আটকে দেবে।
“গন্ধ কিসের?” নিজের মনেই বলে উঠল বাবলু। ডান হাতে কাচ নামিয়ে দিল সামান্য। লাভ নেই। গন্ধ আরও বেড়ে যাচ্ছে গাড়ির ভিতর। এবার গাড়িটা স্লো করে হাত বাড়িয়ে অন্যদিকের জানলাটাও খুলতে গেল সে। সামনের দুই সিটের মাঝে অন্ধকারে একটা কোঁকড়ানো চুলওয়ালা মাথা দেখতে পেলেন হরবাবু। দুইহাতে ধরে থাকা ভারী কাঁচের শ্যাম্পেনের বোতলটা সোজা মারলেন মাথা লক্ষ্য করে। গাড়ি ঘুরে গেল। হরবাবু থামলেন না। মারতে থাকলেন। আবার। আবার। আবার। যতক্ষণ না নারকেল ফাটার মত মচাৎ শব্দে বাবলুর খুলিটা ফেটে গেল।
.
॥ ১৩॥
পুলিশ স্টেশনে থাকতেই বাবলুর আর নিজের গায়ের গন্ধদুটো টের পেয়েছিলেন হরবাবু। আবছা। আর এই গন্ধ ভুল বলে না। তিনি জানেন। গাড়িটা একদিকে কেতরে পড়ে আছে। চারিদিকে জঙ্গল। অতিকষ্টে হাত পায়ের বাঁধন খুলে বেরিয়ে এলেন হরবাবু। গাড়ির ডিকিতেই পেট্রলের একটা ক্যান পাওয়া গেল। এখন আর কোন গন্ধ নেই। তাঁর গা থেকেও না। বাবলুর গা থেকেও না। গোটা পৃথিবীর সব গন্ধ মুছে আবার সব যেন কেমন বোবা হয়ে গেছে হরবাবুর কাছে। বাবলুর পকেটেই লাইটার পাওয়া গেল। গোটা গাড়িতে তেল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলেন হরবাবু। দাউদাউ করে গাড়িটা জ্বলে উঠল।
ঠিক সেই সময় নাকে এল একটা গন্ধ। এক না, একাধিক গন্ধ মিলেমিশে গেছে যেন। যেন গত জন্মের স্মৃতির মত। পেট্রল, রঙ, কাপড় আর মাংস পোড়ার গন্ধ।
হরবাবু বাবলুর পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে নিয়েছিলেন। সুইচ অন করে স্ত্রীর নম্বরে ফোন করলেন। এই জঙ্গলেও টাওয়ার পাওয়া যাচ্ছে! স্ত্রী ফোন ধরতেই অতি শান্ত গলায় বললেন “হ্যালো। আমি বলছি। তোমরা ঠিকঠাক পৌঁছেছ তো? আর হ্যাঁ শোনো। ডাক্তারের এককাঁড়ি খরচ বাঁচল। আমার রোগটা এমনিতেই সেরে গেছে।”
.
লেখকের জবানি— বাংলাদেশের অতীন্দ্রিয় গল্প সংকলনের পরে প্রকাশ পেয়েছিল অলৌকিক নামের গল্প সংকলন। বিষয় ফ্যান্টাসি। এদিকে তখন চারিদিকে করোনার হাহাকার। সবার নাক থেকে গন্ধ চলে যাচ্ছে। একদিন এক কলিগ জানাল অদ্ভুত একটা সিম্পটমের কথা। তার গন্ধ ফিরে এসেছে, কিন্তু সে গন্ধগুলো আগের মতো পাচ্ছে না। যেমন ডিও থেকে কেরোসিনের গন্ধ ইত্যাদি। ভেবেছিলাম একটা হাসির গল্প লিখব এই নিয়ে। শুরুটাও তেমনই ছিল। কিন্তু শেষে দেখি কেমন একটা ডার্ক ফ্যান্টাসির রূপ নিল। গল্পে কোথাও করোনার নাম নেই। ইচ্ছে করেই। ওই অসভ্য রোগটাকে ফুটেজ দেব না বলে। এই গল্পটা আকাশবাণীর এফ এম গোল্ডে ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫ তারিখ সম্প্রচারিত হয়।
