ভোজ কয় যাহারে – কৌশিক মজুমদার
ভোজ কয় যাহারে
সদ্য খাওয়া কোনও মুরগির মাংস দেখে এতটা শুকনো, মরাটে মনে হয় না। হাড্ডিগুলো প্লেটের একধারে ফ্যাকফ্যাকে সাদা কাঠির মতো এলিয়ে আছে। রেস্টুরেন্টের নরম আলোতে আরও বেশি সাদা, শুকনো আর নগ্ন গাছের ডালের মতো লাগছে সেগুলোকে। শুধু হাড়। তা থেকে চামড়া, মাংস আর পেশির তন্তুগুলো অবধি খুব ধীরে, ধৈর্য ধরে কে যেন ছাড়িয়ে নিয়েছে। এগুলো বাদে গোটা প্লেট ঝকঝকে পরিষ্কার। অন্য ছোটো ছোটো ডিশ আর বাটিগুলোও একইরকম পরিষ্কার, একেবারে নতুনের মতো। একে অন্যকে টেক্কা দিয়ে জেল্লা দিচ্ছে। তাদের হালকা ক্রিমের মতো রং, নিচের ধবধবে সাদা টেবিল ক্লথের উপরে একেবারে ছবির মতো লাগছে। টেবিল ক্লথটাও তেমনি। ঝোলের দাগ নেই, কফির ছোপ নেই। এমনকি পাউরুটির গুঁড়ো, সিগারেটের ছাই কিংবা নখপালিশের দাগ অবধি দেখতে পাবেন না।
একমাত্র সেই ফর্সা সাদা মুরগির ঠ্যাং না থাকলে কে বলবে গোটা একটা ডিনার খাওয়া হয়ে গেছে এই টেবিলটাতে?
মিস্টার অ্যাওর্টা, একেবারেই ছোটোখাটো মানুষ নন। হাতির মতো চেহারা তাঁর। মাঝারি মাপের একটা ঢেকুর তুলে তিনি চেয়ার থেকে খবরের কাগজটা তুলে নিলেন। টেবিল ছেড়ে যাবার আগে মুগ্ধ দৃষ্টিতে ভুক্তাবশেষের দিকে আরও একবার তাকিয়ে ধীর পায়ে এগোলেন ক্যাশিয়ারের কাউন্টারের উদ্দেশে।
কাউন্টারের বুড়ি একবার তাঁর দিকে তাকাল।
“হ্যাঁ, স্যার। আসুন।”
“এই নিন”, বলে মিস্টার অ্যাওর্টা তাঁর পকেট থেকে ইয়া মোটকা ওয়ালেটটা বার করলেন। তারপর আপনমনে নিজের সামনের দুই দাঁতের ফাঁক দিয়ে গুনগুনিয়ে “সেভেন জয় অফ মেরি” গানের শিস দিতে দিতে যেন টাকা বার করতেই ওয়ালেটটা খুললেন। তারপরেই আচমকা তাঁর শিস বন্ধ হয়ে গেল। মিস্টার অ্যাওর্টা যেন চমকে উঠলেন। ওয়ালেট বার করে কী যেন খুঁজতে লাগলেন তন্নতন্ন করে। গোটা ওয়ালেট উলটে দিলেন ক্যাশিয়ারের টেবিলে। তাঁর ভুরু কুঁচকে গেল।
“কিছু অসুবিধে হয়েছে স্যার?”
“না, ঠিক অসুবিধে না”, যদিও দেখেই বোঝা যাচ্ছিল ওয়ালেটে আর কিছু নেই, তবুও তিনি সেটার আশপাশ বেশ করে ঝাড়তে লাগলেন, যদি কিছু মেলে। দেখে মনে হল বিরাট একটা কালো বাদুড় যেন মাঝ বাতাসে ডানা ঝাপটাচ্ছে। মিস্টার অ্যাওর্টা ফ্যাকাশে একটা হাসি হাসার চেষ্টা করলেন। এবার নিজের চোদ্দোটা পকেট খালি করা শুরু করলেন এক এক করে। এতেই গোটা কাউন্টার ভরে গেল হাবিজাবিতে।
“এ তো মহা মুশকিল”, বেশ রেগেই বললেন তিনি, “আসলে কী হয়েছে জানেন, আমার গিন্নি আমার মানিব্যাগ থেকে টাকা নিয়ে বাজারে গেছে। আমার জন্যেও যে কিছু রাখবে, সে খেয়াল তার নেই। শুনুন না, আমার নাম জেমস ব্রকেলহার্স্ট, আমি পিলোফিল্ম কর্পোরেশনে চাকরি করি। এমনিতে আমি বাইরে খাই না, আর… না না, শুনুন না, এই যে আমার কার্ড। আমি আপনার কাছে এটা রেখে যাচ্ছি। এখানে আমার নম্বরও আছে। আমি কাল সন্ধেবেলা এসে আপনার পাইপয়সা মিটিয়ে দিয়ে যাব।”
মিস্টার অ্যাওর্টা তাঁর হাতের কার্ডটা বুড়ির হাতে গুঁজে দিলেন। টেবিলে রাখা যাবতীয় জিনিস আবার যথাস্থানে পুরে নিলেন। তারপর রেস্তরাঁ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
আজ তাঁর মন বেশ খুশি খুশি। কিছু না দিয়েই অনেক কিছু পাবার মধ্যে যেমন আনন্দ থাকে, ঠিক তেমন। গোটা ব্যাপারটাই দারুণভাবে মিটে গেল। কোনও ঝামেলা হয়নি। আর খাবারও ছিল তেমনিই সুস্বাদু। হাঁটতে হাঁটতে তিনি বাসস্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে গেলেন। পাশেই ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে বেশ কিছু উলঙ্গ ম্যানিকুইন রাখা। মিস্টার অ্যাওর্টার চোরা দৃষ্টি গেল সেগুলোর দিকে। বাস এসেছে। ভিড়ের ঠিক মাঝখানে ভ্যাবলার মতো চেয়ে থাকতে হবে, যেন কিছুই বুঝতে পারছ না, কন্ডাকটার পয়সা চাইতে এলেই এমন ভাব করতে হবে যেন এখুনি দিচ্ছি, আর ভিড়ে সে চোখের আড়াল হলেই সম্পূর্ণ উলটো দিকে একটা খবরের কাগজ মুখে নিয়ে বসে পড়তে হবে। এভাবেই গত চার বছরে মিস্টার অ্যাওর্টা ২১১ ডলার ২০ সেন্ট বাঁচিয়েছেন। পত্রিকায় আজেবাজে খবরগুলো পড়েই তিনি সোজা চলে গেলেন ধাঁধার পাতায়। এক-একটা তেমন ধাঁধা সমাধান করলে হাজার ডলারও মেলে। ভাবো একবার। কিছু না করেই হাজার হাজার ডলার! মিস্টার অ্যাওর্টা এই ধরনের মাগনার সঞ্চয় খুব পছন্দ করেন। তাঁর সিটের ঠিক পাশেই এক বৃদ্ধা মহিলা দাঁড়িয়ে। ক্লান্ত বিষণ্ণ চোখ যেন তাঁকে একটু জায়গা দিতে বলছে। পাগল নাকি! মিস্টার অ্যাওর্টা গম্ভীরভাবে জানলার বাইরের দিকে তাকিয়ে দৃশ্য দেখতে লাগলেন। আর যা দেখলেন, তাতে তাঁর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। তিনি রোজ এই রাস্তায় যাতায়াত করেন। এই নোটিশ তো তাঁর আগেই দেখা উচিত ছিল! হয়তো চারিদিকের কবরখানা, শ্মশান আর মর্গের ভিড়ে এই ছোট্ট নোটিশবোর্ড তাঁর চোখ এড়িয়ে গেছে।
তিনি চিল্লিয়ে ড্রাইভারকে বাস থামাতে বললেন, তারপর একলাফে নেমে গেলেন বাস থেকে। একটু হেঁটে পিছনে যেতেই সেই নোটিশবোর্ড। বোর্ডটার রংচটা। নোটিশের হাতের লেখা আঁকাবাঁকা, যদিও বানানে ভুল নেই। সাদা রং ফুলে চলটা উঠে গেছে এপাশে ওপাশে। ভিতরের কমলা রং দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। আর সেই বোর্ডে গোটা গোটা হরফে লেখা—
“একেবারে বিনামূল্যে”
মাগনার ময়লা
আবেদন করুন
লিলিভেল কবরখানায়
সাদা বোর্ডে ময়লা সবুজ রঙে ঠিক এটাই লেখা ছিল। মিস্টার অ্যাওটা বুঝলেন তাঁর ভিতরে কেমন যেন একটা হচ্ছে। মাগনা, বিনামূল্য, ফ্রি, এই শব্দগুলো শুনলেই তাঁর মধ্যে এইরকমটাই হয়। মাগনা শব্দটাই যেন তাঁর মধ্যে এক অদ্ভুত অচেনা আনন্দ জাগিয়ে তোলে। মাগনা মানে কী? কিছু না দিয়েই অনেক কিছু। আর এই কাজে মিস্টার অ্যাওর্টার চেয়ে দড় বিশ্বে আর কেউ নেই। এই যে মাগনায় আসলে ময়লা দেওয়া হবে, তাতে তাঁর কিচ্ছু আসে যায় না। তিনি এইসব ছোটোখাটো ব্যাপার নিয়ে ভাবেনই না। বিনাপয়সায় পেলেই হল। কাজে লাগুক বা না লাগুক।
এই নোটিশের অন্য ছোটো ছোটো ব্যাপারগুলোও খুব স্বাভাবিকভাবেই তাঁর চোখ এড়িয়ে গেল— কেন আচমকা বিনাপয়সায় এই ময়লা দেওয়া হচ্ছে, কবরখানার ময়লা আসলে কী জিনিস হতে পারে ইত্যাদি প্রভৃতি। তিনি শুধু ভাবলেন কবরখানার মাটি খুব উর্বর হয় শুনেছেন, যদিও কেন, তা ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি। তাঁর মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরতে লাগল। এই প্রস্তাব কি সত্যি সত্যি একেবারে যা বলছে তাই? নাকি এর লোভ দেখিয়ে তাঁকে শেষ অবধি পয়সা খরচ করে কিছু একটা কিনতে বাধ্য করা হবে? কতটা ময়লা বিনে পয়সায় পাওয়া যাবে তার কি কোনও মাপ আছে? নাকি যত ইচ্ছে তত? যদি তাই হয়, তবে বাড়ি নিয়ে যাবেন কেমন করে?
সব সমস্যারই সমাধান হল।
মিস্টার অ্যাওর্টা মনে মনে হিসেব ছকে নিয়ে একটু হাসলেন। তার একি ওদিক তাকিয়ে সোজা পা বাড়ালেন লিলিভেল কবরখানার দিকে। এই কবরখানার ফাঁকা মাঠে এককালে একটা সুতোর কারখানা ছিল, তারপর হল পেরেকের কারখানা, কিছুদিন মেয়েদের জুতোর দোকান, আর এখন গোটা জমি জুড়ে অদ্ভূত মড়াপচা একটা বাষ্প যেন চাদরের মতো জড়িয়ে আছে। এদিক ওদিক উলটে পড়ে থাকা ক্রুশকাঠ, চিমনি থেকে বেরিয়ে আসা ধোঁয়া, ইতিউতি ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো, আর অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা যেন ঠিক করেই দিয়েছিল এই সন্ধ্যার সঙ্গে সেই মোটা লোকটার কী সম্পর্ক, আর তার চেয়েও বড়ো কথা, লোকটার ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে। শয়ে শয়ে মরা মানুষের পচাগলা মৃতদেহ উলটো হয়ে শুয়ে যেন সেই ভবিষ্যতেরই দিন গুনছিল।
মিস্টার অ্যাওর্টা তাড়াহুড়ো করে প্রায় দৌড়ে চললেন। সময় নষ্ট করা যাবে না। বলা যায় না। অন্য কেউ যদি তাঁর আগে দাঁও মেরে দেয়? একজন আধিকারিককের সঙ্গে তাঁর যা কথা হল সেটা এইরকম—
“আপনারাই তো মাগনায় ময়লা দিচ্ছেন?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“একজন কতটা ময়লা নিতে পারে?”
“যতটা চান।”
“কোন কোন দিন?”
“যেদিন, যখন আপনার ইচ্ছে। সর্বদাই কিছু না কিছু ফ্রেশ ময়লা থাকে।” মিস্টার অ্যাওর্টা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। যেভাবে কেউ বিরাট একটা উত্তরাধিকার বা ব্যাংকে আচমকা কোটি টাকা জমতে দেখে ফেলে। তিনি পরের শনিবার আসবেন বলে কথা দিলেন আর বুক ভরা আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরলেন।
ঠিক রাত নটায় তাঁর মাথায় একেবারে হাই ভোল্টেজ স্পার্ক। তিনি বুঝে গেলেন এই ময়লাগুলো নিয়ে ঠিক কী করবেন। তাঁর বাড়ির পিছন দিকে একেবারে শুকনো মাটিতে একগাদা বুনো আগাছা জন্মেছে। একবার একটা গাছ হয়েছিল বটে। সে গাছে ফুল ফুটেছিল, পাখিও বাসা বেঁধেছিল। তারপরেই মিস্টার অ্যাওর্টা এই বাড়ির মালিকানা পান। তিনি যেদিন এই বাড়িতে প্রথম ঢোকেন, পাখিরা উড়ে পালায়। সেই গাছও আর বাঁচেনি। এই জঙ্গলে কোনও বাচ্চাও খেলতে আসে না।
মিস্টার অ্যাওর্টা উৎসাহী হলেন। এই ময়লা ফেললে সেখানে যে ভালো গাছ গজাবে না, কে বলেছে? তিনি অনেকদিন আগে একটা কোম্পানিতে বিনেপয়সায় ফুল ফল গাছের বীজ পাঠাতে লিখেছিলেন। তারা যা পাঠিয়েছিল তাতে দশটা লোকের কাজ চলে যায়। কিন্তু ওই কঠিন অনুর্বর মাটিকে উর্বর করার যা খরচা, তা ভেবেই মিস্টার অ্যাওর্টা হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন…
এক পড়শি, নাম জোসেফ উইলিয়াম সানটুক্কিকে ভজিয়েভাজিয়ে তাঁর রিও ট্রাকটা জোগাড় করা গেল। কয়েক ঘণ্টা বাদেই ময়লার প্রথম বোঝাটা মিস্টার অ্যাওর্টার বাড়ির পিছনে এসে হাজির হল। ময়লার সেই বিরাট ঢিবিটা দেখে গর্বে, আনন্দে মিস্টার অ্যাওর্টার চোখ চকচক করে উঠল। ময়লা ওঠানো নামানোর কষ্ট এখানে নগণ্য। এরপর এল দ্বিতীয় বোঝাটা। তারপর তৃতীয়। তারপর চতুর্থ। শেষ বোঝাটা যখন এসে পৌঁছাল তখন সূর্য ডুবে গেছে, আর মিস্টার অ্যাওর্টার বাড়ির পিছনে কয়লাখনির পাশে কয়লার ঢিবির মতো বিরাট এক ময়লার পর্বত জমা হয়েছে।
মিস্টার অ্যাওর্টা ট্রাক ফেরত দিয়ে ঘরে এসে শান্তির ঘুম ঘুমাতে লাগলেন।
পরদিন ভোর না হতেই গির্জার ঘণ্টার সঙ্গে আরও একটা অদ্ভুত ধাতব শব্দ শোনা গেল। মিস্টার অ্যাওর্টার কোদালের ঠুং ঠাং। তিনি সেই কবরখানার মাটিকে ভেঙে, গুঁড়িয়ে, সমান করে মিশিয়ে দিচ্ছেন তাঁর বাড়ির পিছনের জমির ফালিতে। এখন সেই জমিতে বেশ একটা গ্রাম্য ভাব এসেছে। কালো, নরম, ফোলাফোলা, রসে টুসটুসে। সূর্যের কড়া তাপেও যেন জলে ভরা। বাড়ির পিছনের বেশিটাই সেই মাটিতে ঢেকে মিস্টার অ্যাওর্টা ঘরে বিশ্রাম নিতে বসলেন। ঘরে বসে তিনি রেডিওতে শুনতে লাগলেন অনুরোধের আসরের গান। শুনতে গিয়ে সঞ্চালক একটা গানের সুর শুনিয়ে নাম জিজ্ঞাসা করলেন। মিস্টার অ্যাওর্টা একটা পোস্টকার্ডে সেই নাম লিখে পাঠিয়ে দিলেন। তাঁর আশা, ওরা নিশ্চয়ই উপহার হিসেবে একটা টোস্টার বা জল দেবার হোসপাইপ পাঠাবে।
তিনি হাতে চারটে বান্ডিল তুলে নিলেন। একটায় ভিটামিনের ক্যান, যার বেশিরভাগটাই সাবাড় করে দিয়েছেন, অর্ধেক টিন কফি, আধ বোতল ছোপ দূর করার লোশন আর একবাক্স সাবানের টুকরো যা থেকে বেশিরভাগ টুকরো গায়েব। প্রতিটাতে নির্দিষ্ট ঠিকানা লিখে তিনি কোম্পানিগুলোকে জানালেন তাঁরা তাঁকে ঠকিয়েছে। তিনি জিনিস চান না। বদলে টাকা পুরো ফেরত চান।
ডিনারের সময় হয়ে গেল। আজ খাবারে সার্ডিন মাছ, মাশরুম, ক্যাভিয়ার, অলিভ, আর পার্ল অনিয়ন। এমন না, তিনি এসব খেতে দারুণ পছন্দ করেন। কারণ একটাই। এদের টিনগুলো ছোটো। ব্যস্ত মুদি দোকানির চোখ এড়িয়ে সহজেই পকেটে পুরে নেওয়া যায়। মিস্টার অ্যাওর্টা নিজের প্লেট এত পরিষ্কার করে খেলেন যে বেড়ালের চাটার জন্যেও কিছু অবশিষ্ট রইল না। বাটি, প্লেটগুলো আগের দিনের মতোই চকচক করতে লাগল। মিস্টার অ্যাওটা তাঁর ব্যাংকের ব্যালেন্সটা বই খুলে দেখে মৃদু মৃদু হাসলেন। তারপর জানলা দিয়ে বাইরের জমির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আকাশে বড়ো করে চাঁদ উঠেছে। তাঁর কিরণ বেড়া টপকে মিস্টার অ্যাওর্টার কুচকুচে কালো জমিতে পড়ে অদ্ভূত এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। মিস্টার অ্যাওর্টা চেকবুক সরিয়ে রেখে বাগানের বীজের বাক্সটা খুঁজতে লাগলেন। এখনও একেবারে নতুনের মতো আছে!
জোসেফ উইলিয়াম সান্টক্কির ট্রাকটা সেই সপ্তাহের পরেও টানা পাঁচ হপ্তা ব্যবহার করলেন মিস্টার অ্যাওর্টা। বেচারা ভালো মানুষটি অবাক হয়ে দেখতেন কীভাবে দিনের পর দিন তাঁর প্রতিবেশী ট্রাকে চাপিয়ে টন টন ময়লা এনে জড়ো করছে। তিনি তাঁর গিন্নিকেও এ নিয়ে বলতে যেতেন, কিন্তু গিন্নি মিস্টার অ্যাওর্টার নাম অবধি শুনতে নারাজ।
“শয়তানটা দিনের পর দিন আমাদের ঠকাচ্ছে। দেখো ব্যাটা তোমার জামা পরে, আমাদের বাগানের সবজি খেয়ে দিন দিন মোটা হচ্ছে। সবকিছুই চলছে ধারে। ধারে না আমার মুন্ডু। চুরি, বুঝলে, ডাহা চুরি। আমি এ জীবনে একটা জিনিস ফেরত দিতে দেখলাম না লোকটাকে। চোখের চামড়া নেইকো হ্যাঁ? কেমনতর মানুষ? কীসে কাজ করে যে নিজের বাঁচার টাকাটাও জোগাড় করতে পারে না!”
দুজনের কেউই জানতেন না মিস্টার অ্যাওর্টার জীবিকা ছিল বেজায় পরিশ্রমের। তাঁকে শহরতলিতে রাস্তার ধারে সারাদিন কালো গগলস চোখে, টিনের কাপ সামনে নিয়ে বসে থাকতে হত। লোকজন পাশ দিয়ে গেলেই তিনি হেঁকে উঠতেন, “অন্ধে কো কুছ দে দে বাবা!” একই লোক বহুবার তাঁকে বহু পয়সা দিয়ে গেছে। আজ অবধি কেউ তাঁর স্বরূপ ধরতে পারেনি। রেলের একটা গোপন লকারে তাঁর এইসব সাজপোশাক লুকানো থাকে।
সে যাই হোক, এখন বীজ বোনার পালা। লাইব্রেরি থেকে একাধিক বই এনে পড়াশুনো করে মিস্টার অ্যাওর্টা বীজ বোনার সঠিক সময় আর পদ্ধতি ঠিক করে নিলেন। একটা বীজও যাতে নষ্ট না হয়। কালো, সরস জমিতে লাইন দিয়ে পোঁতা হল স্কোয়াশের বীজ। পাশেই একে একে জায়গা নিল মটর, ভুট্টা, বিন, পেঁয়াজ, বিট আর বাকি প্রচুর গাছ। সবশেষে মিস্টার অ্যাওর্টা হাসিমুখে খেয়াল করলেন তাঁর কাছে এখনও প্যাকেট ভরা স্ট্রবেরি, তরমুজ আর আরও কিছু বীজ রয়েছে যাদের নাম পরিষ্কার করে লেখা নেই। সব বীজই মাটিতে ঠাঁই পেল।
কিছুদিন গেল। মিস্টার অ্যাওটা মনে মনে ভাবছিলেন আবার কবরখানায় যাবেন কি না। ময়লা এতদিনে কিছু আবার জমেছে নিশ্চয়ই। এমন সময় একদিন তিনি অদ্ভুত একটা ব্যাপার লক্ষ করলেন।
কালো কুচকুচে মাটিতে কী যেন একটা গজাচ্ছে। মাটি ফুঁড়ে, ফাটিয়ে উঠছে। মিস্টার অ্যাওর্টা বাগানের কিছুই জানতেন না প্রায়। ফলে তিনি খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপারটা নিলেন। ঘটনাটা তাঁকে অবাক করল ঠিকই, কিন্তু তিনি খুব একটা আমল দিলেন না। কিছু একটা গজাচ্ছে, এটাই বড়ো কথা। বড়ো হলে এটা থেকে তাঁর খাবারের জোগান হবে।
সেই আনন্দে নাচতে নাচতে লিলিভেলে গিয়েই দুঃসংবাদটা পেলেন তিনি। এই কয়দিনে কেউই প্রায় মরেনি। ফলে নতুন ময়লা নেই বললেই চলে। সামান্য যা ছিল, নতুন, তা দিয়ে একটা ট্রাকও গোটা ভরল না। সামনে কিছু ছুটির দিন আছে, তখন সংখ্যাটা অবশ্যই বাড়বে। নিজেকে বোঝাতে বোঝাতে বাড়ি ফিরলেন মিস্টার অ্যাওর্টা। এদিকে তাঁর বাড়ির বাগানের গাছগুলো লকলকিয়ে বেড়ে উঠছিল। সাধারণত এত কম সময়ে এই বাড় দেখা যায় না। তিনি সামনের শনিবার অবধি অপেক্ষা করতে পারছিলেন না। বিনে পয়সায় এত ভালো জৈব সার হবে, তা তিনি ভাবতেও পারেননি। তিনি চাইছিলেন আরও। আরও।
পরের শনিবার চরম হতাশা। এক কোদাল ভরা ময়লাও নেই। এদিকে নতুন খাদ্য না পেয়ে তাঁর বাগানের গাছেরা মুষড়ে পড়তে লাগল ধীরে ধীরে। সবুজ ফলন্ত বাগান আবার আগের মতো হলদেটে ভাব নিল, যেন যে-কোনো দিন ফিরে যাবে একেবারে শুরুর দশায়। এটা মিস্টার অ্যাওর্টা কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না। এই বাগানের পিছনে তিনি প্রাণপাত করেছেন আর এই পরিশ্রম তিনি বৃথা হতে দেবেন না। তাঁর রাতের ঘুম উড়ে গেল। অন্য কাজেও বাধা পড়তে লাগল।
বাধ্য হয়ে তিনি এক গভীর রাতে এক নির্জন কবরখানায় ঢুকে সদ্য খোঁড়া কিন্তু ফাঁকা এক কবরের ছয় ফুট গভীরতা বাড়িয়ে সাত ফুট করে দিলেন। তিনি জানতেন এই সামান্য পরিবর্তন কেউ খেয়ালও করবে না। ওই বাড়তি এক ফুট মাটি তিনি ভরে নিলেন ট্রাকে। এভাবে আলাদা আলাদা কবরখানার বাড়তি মাটিতে মিস্টার সান্টক্কির ট্রাক ভরে উঠল। সে মাটি জমিতে পড়া মাত্ৰ… বাগান আবার বেঁচে উঠল আগের মতো।
মিস্টার অ্যাওর্টা এবার বুঝে গেছেন। এই বাগানের ক্রমাগত খাবারের প্রয়োজন। সময়ে সময়ে। আর খিদে পেলেই সে খাবার জোগানোর দায়িত্ব তাঁর। তিনি হাসিমুখে সে দায়িত্ব নিলেন, আর পালনও করছিলেন, যতদিন না –
আচমকা এক রাতে সব গাছ একসঙ্গে ফলে ভরে গেল। এই সামান্য সময়ে আর একসঙ্গে সব গাছে এত ফল ফলা যে সম্ভব, তা কেউ কোনও দিন ভাবেনি। রাতারাতি মিস্টার অ্যাওর্টার বাগান যেন স্বর্গোদ্যানের চেহারা নিল। সোনালি ভুট্টায় গাঢ় সবুজ পাতা, মটরের আধফাটা ফল থেকে উঁকি মারছে সবুজ রসালো দানাগুলো। গাছের পর গাছ। লাইনের পর লাইন। সব গাছ ফলে ভরপুর।
মিস্টার অ্যাওর্টা আনন্দে প্রায় মূর্ছা যান আর কি! কিন্তু তাঁকে আনন্দে লাফালে চলবে না। তিনি জানেন এবার তাঁর কী কর্তব্য। তিনি ধৈর্য ধরে প্রথমে গোটা বাগানের সব ফলগুলো তুলে আলাদা আলাদা করলেন। একটা দানাও বাদ গেল না। তিনি সেগুলো পরিষ্কার করলেন, ছুললেন, ছাড়ালেন, রাঁধলেন, ফোটালেন আর তারপর সব খাবার টেবিলের উপরে সাজিয়ে দিলেন সুন্দর জ্যামিতিক আকারে
এবারে তিনি খেতে বসলেন।
প্রথমেই শুরু করলেন অ্যাসপারাগাস দিয়ে। ইংরাজি বর্ণমালায় এ সবার আগে আসে কিনা! তারপর বিট, সেলারি, পার্সলে, রুবার্ব। এইগুলো খেয়ে তিনি একটু জিরিয়ে নিলেন। গ্লাস থেকে দুই ঢোক জল খেলেন, তারপর আবার শুরু করলেন। আবার শুরু হল সেই ভয়ানক খাওয়া। একটা দানা, একটা টুকরোও যাতে নষ্ট না হয়। মিস্টার অ্যাওর্টা খেয়েই চললেন, যতক্ষণ না তাঁর গলা জলের জন্য শুকিয়ে এল। ততক্ষণে তাঁর পেটে অদ্ভুত একটা ব্যথা শুরু হয়েছে। কিন্তু সে ব্যথায় মজা আছে। মিস্টার অ্যাওর্টা সেই সুখের মতো ব্যথাকে অবজ্ঞা করেই লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে আবার খাওয়া শুরু করলেন।
সব খাওয়া শেষ। প্রতিটা প্লেট নতুনের মতো ঝকঝকে, যেমন থাকে আর কি। মিস্টার অ্যাওর্টা যেন যৌন সংগমের আনন্দ পেলেন। অনেক খেয়েছেন। ঢেঁকুর তোলার জায়গাটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। তাঁর মনে নানা সুখের চিন্তা ভেসে এল। তাঁর জীবনের দুটো লক্ষ্যই আজ পূরণ হয়েছে। যার জন্য মানুষের এত পরিশ্রম। খাবার উৎপাদন আর সেই খাবার ভক্ষণ।
হাসিমুখে মিস্টার অ্যাওর্টা জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন। চারিদিকে ঘন অন্ধকারের মধ্যে বাগানে দূরে একটা উজ্জ্বল কী যেন দেখা যাচ্ছে না? ছোটো কিন্তু স্পষ্ট। অতি কষ্টে নিজের দেহকে নাড়িয়ে বিরাট এক জলহস্তীর মতো মিস্টার অ্যাওটা চেয়ার থেকে উঠলেন, প্রায় থপথপিয়ে দরজার কাছে গেলেন, আর প্রায় হাঁফাতে হাঁফাতে দরজা খুলে বাগানে এলেন। বাগানেও কোথাও সেই জিনিসটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। তিনি চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন। নাহ। কোথাও কিছু নেই। চাঁদের আবছা আলোয় গোটা বাগান এবার দেখা যাচ্ছে। কোথাও একটা কুটো অবধি নেই। যা ছিল, সব তিনি কেটে খেয়ে ফেলেছেন।
এবারে তাঁর চোখ পড়ল অন্য দিকে। একটা সাদা ঘোমটা ঢাকা ওটা কী? গাছের মতো। কিংবা গাছ না। একটাই বড়ো ফুল। কিন্তু ওটা কী করে তাঁর চোখ এড়িয়ে গেল কে জানে?
বাগানের একেবারে পিছনে যে ঢালু জমিটা আছে, সেখানে ফুলটা ফুটে আছে। মরা গাছটার পাশে একটা গর্তের মধ্যে রয়েছে সেটা। মিস্টার অ্যাওর্টা এমন কোনও গর্ত খুঁড়েছিলেন বলে কিছুতেই মনে করতে পারলেন না। হয়তো প্রতিবেশীদের দুষ্টু ছেলেদের কাজ। কী গাছ কে জানে? কিন্তু যাই হোক, এটা তাঁর ভোগেই লাগবে।
মিস্টার অ্যাওর্টা সেই ছোটো গর্তের ধারে এসে কোনওক্রমে হাত বাড়িয়ে চকচকে ফুল গাছটা ধরতে গেলেন। গাছটা যেন বারবার মাথা সরিয়ে নিচ্ছে। ধরব ধরব করেও তিনি ধরতে পারছেন না। মিস্টার অ্যাওর্টা শারীরিকভাবে দারুণ ফিট নন। তবু একজন প্রকৃত শিল্পী যে অসামান্য দক্ষতায় তাঁর ছবিতে শেষ রঙের বিন্দুটা দিতে চান, সেভাবেই তিনি হালকা হাতে ফুলটা ধরতে গিয়ে কাদাগরে ঝপাৎ করে পড়ে গেলেন। কী যন্ত্রণা! হাঁচড়েপাঁচড়ে কোনওক্রমে তিনি ও চেষ্টা করলেন, কিন্তু সেই ফুলগাছটা? গোটা গর্তের কোথাও তো এই গাছ নেই। তিনি গোটা গর্ত খুঁজে ফেললেন। পুরো ফাঁকা। উপরে তাকাতেই দুটো জিনিস খেয়াল হল তাঁর। এক— গর্তটা যা ভেবেছিলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি গভীর। দুই— তিনি ভুল দেখেছিলেন। গাছটা গর্তের ভিতরে না। গর্তের ঠিক কিনারে হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। একটু আগে তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
মিস্টার অ্যাওর্টার পেটের ব্যথাটা ক্রমে বাড়ছে। নড়াচড়ায় ব্যথা বাড়ে। এবার তাঁর বুকে আর পাঁজরে অদ্ভুত এক চাপবোধ হতে লাগল। উপরের দিকে তাকিয়ে মিস্টার অ্যাওর্টা বুঝতে পারলেন গর্তের কিনারা তাঁর হাতের সীমার বাইরে চলে গেছে, আর সেই ফুল এবার চাঁদের আলোতে সাদা একটা বড়ো হাতের মতো মাটির সঙ্গে আটকে আছে। পাঁচটা আঙুল। বড়ো বড়ো। ফ্যাকাশে। মোমের মতো। মাটির সঙ্গে শিকড় দিয়ে পোঁতা। বাতাসে সেই হাতটা অল্প অল্প নড়ছে। আবার হাওয়া এল। গর্তের কিনারা থেকে একদলা মাটি ঝরে পড়ল মিস্টার অ্যাওর্টার মুখে।
এতক্ষণে গোটা ব্যাপারটা মিস্টার অ্যাওর্টার মাথায় ঢুকল। প্রাণভয়ে তিনি উপরে ওঠার চেষ্টা করতে থাকলেন। তাঁর নখের আঁচড়ে গর্তের মাটি খসে পড়ল। এদিকে পেটের যন্ত্রণা এত তীব্র হয়ে উঠল যে তিনি আর্তনাদ করে গর্তে শুয়ে পড়ে কাতরাতে লাগলেন। আবার হাওয়া এল। আবার দলা দলা মাটি গর্তে পড়তে লাগল। হাওয়ার ধাক্কায় সেই হাত এদিক ওদিক করে নিজের সেই মোমের মতো আঙুল দিয়ে গর্তে আরও আরও ময়লা ফেলতে শুরু করল। আবার। এবং আবার। এবং আবার…
এতক্ষণ মিস্টার অ্যাওর্টা চুপ ছিলেন। এবার তিনি চিলচিৎকার করে লোক ডাকতে চাইলেন। যদি তাঁর গলা শুনে প্রতিবেশীদের কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। গলা ফাটিয়ে চেঁচালেন তিনি। কেউ শুনতে পেল না।
এবার গাদা গাদা ময়লা ঝুপঝুপ করে নামতে শুরু করেছে। মিস্টার অ্যাওর্টার হাঁটু অবধি ভরে গেছে ময়লায়। তিনি উঠবার চেষ্টা চালিয়ে বারবার বিফল হচ্ছেন। সেই হাতের মতো গাছ ক্লান্তিহীনভাবে ময়লা ফেলেই যাচ্ছে।
মিস্টার অ্যাওর্টার গলা বসে গেছে। চেঁচালে ফ্যাসফ্যাসে অদ্ভুত আওয়াজ বেরোচ্ছে গলা থেকে। তাও তিনি চেঁচিয়ে চলেছেন।
খানিক বাদে সেই আওয়াজ বন্ধ হল। সংগত কারণেই।
বাগান আবার আগের মতো শাস্ত। নিস্তব্ধ।
মিস্টার আর মিসেস জোসেফ উইলিয়াম সানটুক্কি যখন মিস্টার অ্যাওর্টার দেহ খুঁজে পেলেন, দেখলেন পরপর সাজানো অনেকগুলো টেবিলের সামনে তিনি চিৎপাত হয়ে শুয়ে আছেন। প্রতিটা টেবিলে থরে থরে প্লেট। প্রতিটা প্লেট নতুনের মতো ঝকঝকে।
মিস্টার অ্যাওর্টার পেট ফেটে নাড়িভুঁড়ি সব এলিয়ে গেছে। হঠাৎ দেখে মনে হচ্ছে বিরাট একটা তিমি মাছকে যেন সদ্য শিকার করে সমুদ্রের পাড়ে তোলা হয়েছে।
“খেতে খেতেই মরল লোকটা”, বাঁকা সুরে বললেন মিসেস সানটুক্কি।
মিস্টার সানটুক্কি নিচু হয়ে মৃতের ঠোঁটে লেগে থাকা ময়লার টুকরোটা দেখতে পেলেন। সেটাকে হাতে তুলে নিলেন। তাঁর মাথায় অদ্ভুত এক আইডিয়া এল…
তিনি বারবার চেষ্টা করে গেলেন মাথা থেকে সেই আইডিয়া ঝেড়ে ফেলতে। পারলেন না। যখন ডাক্তারেরা তাঁকে জানালেন মিস্টার অ্যাওর্টার পাকস্থলীতে গাদা গাদা ময়লা ছাড়া কিচ্ছু ছিল না, তখন প্রায় হপ্তাখানেক তিনি রাতে ঘুমাতে পারলেন না। ওঁরা সবাই মিলে মিস্টার অ্যাওর্টার বিরাট দেহটাকে নিয়ে গেলেন বাড়ির পিছনের বাগান দিয়ে। একটা মরা গাছ, কিছু পাথর আর আগাছা ছাড়া সেখানে কিচ্ছু নেই। সবাই মিস্টার অ্যাওটাকে সসম্মানে কবর দিল। নিজেরা চাঁদা তুলে। কারণ মিস্টার অ্যাওর্টার ঘরে একটা পয়সাও ছিল না। এই কবরখানাটা মিস্টার অ্যাওর্টার খুব প্রিয় ছিল। তিনি প্রায়ই এটায় আসতেন। বলল অনেকে। এর বাইরেই সাদা বোর্ডে ময়লা সবুজ অক্ষরে কীসব যেন লেখা। সবাই ফিরে গেল নিজের নিজের বাড়িতে।
আর সেই কবরের উপর দিয়ে উদাসী এক বাতাস বয়ে গেল শোঁ শোঁ করে। একেবারে বিনামূল্যে।
.
অনুবাদকের জবানি- স্পেকুলেটিভ ফিকশান বা অবাস্তবের জগৎ নিয়ে কারবার করতেন চার্লস ব্যোঁমো। অবাস্তবের মধ্যেও ভৌতিক আর অলৌকিক ঘরনার লেখায় দিনের পর দিন পাঠককে মুগ্ধ করেছেন তিনি। তাঁর লেখা গল্প চিত্রায়িত হয়েছে কান্ট হয়ে যাওয়া আমেরিকান টিভি সিরিজ টোয়াইলাইট জোন-এ। বেশ কিছু সিনেমার চলচ্চিত্র লেখার কৃতিত্বও আছে তাঁর। বর্তমান গল্পটির মূল নাম ফ্রি ডার্ট। এটাও টোয়াইলাইট জোন-এর রেডিও নাটকে চিত্রায়িত করা হয়েছিল। ছাপার অক্ষরে গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে ফ্যান্টাসি হাউস প্রকাশিত “ফ্যান্টাসি অ্যান্ড সায়েন্স ফিকশান” বইতে।
