জন্মদিন – কৌশিক মজুমদার
জন্মদিন
১৪ নভেম্বর ১৯৮০
আজ জিতুর নবম জন্মদিন হতে পারত।
আমরা ওর আটটা জন্মদিন পালন করেছিলাম, প্রতিটাই প্রায় উৎসবের মতো, আত্মীয় বন্ধুরা সবাই উপস্থিত হয়েছিল এক ছাদের তলায়। এমনটা আর কোনও দিনও হবে না।
জিতু আর নেই!
ও গত ১৪ অক্টোবর মেনিনজাইটিসে চলে গেছে। কিন্তু আমরা সেই অভিশপ্ত দিনের এগারো মাস আগেই জেনে গেছিলাম এমনটা হতে চলেছে। ওর মা তখন বিশ্বাস করেনি। তবে আমি বুঝেছিলাম একে এড়ানো অসম্ভব।
কারও মৃত্যু হবার আগেই মৃত্যুদিন জেনে গেলে স্বজন হারানোর বেদনা বিন্দুমাত্র কমে না। বলুন দেখি, কীভাবে মা বাবা তাদের সন্তানের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেবে? তাদের আট বছরের আদরের ছোট্ট সন্তানের মৃত্যুর?
এগারো মাস আগেও ওর এই মৃত্যু যেন অলীক কল্পনা মনে হচ্ছিল, যদিও আমি জানতাম সেটাই ভবিতব্য। তারপরেও আমরা কেউই এই কথা মুখে উচ্চারণ করার সাহস পর্যন্ত পাইনি।
১৪ নভেম্বর ১৯৭৯
জিতুর অষ্টম জন্মদিন।
সেদিন শিশুদিবস। তাই আত্মীয়-বন্ধুদের সঙ্গে আমরা কাছের আশ্রমের কিছু অনাথ শিশুকেও নেমতন্ন করেছিলাম। সন্ধে ছটা নাগাদ জনা পঞ্চাশ অনাথ শিশু এসে উপস্থিত হল। সঙ্গে এক বয়স্ক ভদ্রলোক। বেশিরভাগ শিশুই সাপ শর্ট আর সামান্য কোঁচকানো খাকিরঙা হাফপ্যান্ট পরে এসেছিল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম ওরা সবাই মিলে একটা ব্যান্ড পার্টির বাজনাপাতি সঙ্গে নিয়ে এসেছে।
“ওরা কোনও পার্টিতে খালি হাতে যায় না, বুঝলেন কিনা”, ওঁদের শিক্ষক জানালেন। “আমি ওদের শিখিয়েছি। দয়াদাক্ষিণ্যের ওপরে বেশি নির্ভর করা চলবে না। তাই এই ব্যবস্থা। ওরা আপনার নিমন্ত্রণের বদলে উপহার হিসেবে গান শোনাবে।” এই ব্যাপারটা এতটাই অপ্রত্যাশিত যে আমি আনন্দের সঙ্গে আমার অতিথিদের সামনে ওদের ব্যান্ডকে পরিচয় করালাম, আর ওরাও দুলে দুলে দারুণ গান শোনাল।
ওদের গান শুনে সব বাচ্চারা আনন্দে হাসছিল।
খুব শিগগির ওদের ব্যান্ড পুরো পার্টি জমিয়ে দিল। আলো উজ্জ্বল হয়ে উঠল, বেলুন উড়তে লাগল এদিক ওদিক, অতিথিরাও মহানন্দে আলাপ, গল্প, হাসিঠাট্টায় মেতে উঠলেন। ডিনার সার্ভ করা হল। তখনও সবাই দারুণ খুশি। জিতু একটা সুন্দর যোধপুরী স্যুট পরে উপহার নিচ্ছিল, মৃদুস্বরে ধন্যবাদ জানাচ্ছিল সবাইকে, আর বড়োদের পা ছুঁয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ চাইছিল। সব যেন স্বপ্নের মতো ঘটে চলেছিল একে একে।
আমি অবাক হয়ে দেখলাম, গানের শেষে অনাথ শিশুরা কী অদ্ভুত সুন্দরভাবে অন্য নিমন্ত্রিত শিশুদের সঙ্গে অবলীলায় মিশে গেল। বুঝলাম শিশুদের মধ্যে কোনও শ্রেণিবিভাগ হয় না। খানিক বাদেই কোলাবার বিদেশি পোশাকের বাচ্চারা হো হো করে হেসে অনাথ শিশুদের পিঠ চাপড়ে দিতে লাগল। কেউ ভাবছিল না কার পরনে কী পোশাক আছে, কিংবা কে সমাজের কোন তলা থেকে এসেছে।
আচমকা মনে হল কে যেন আমায় দেখছে। ঠিক তখনই আমার নজরে এল একজোড়া বুদ্ধিদীপ্ত চোখ আমায় অনুসরণ করে চলেছে। একটা বাচ্চা ছেলে। ঘরের এক কোনায় বসে আছে। অনাথদের সঙ্গে এলেও ছেলেটা অন্যদের মতো খাকি পোশাক পরেনি। চেহারা ওদের থেকে কিছু হলেও ভালো। কিন্তু যে জিনিসটা আমায় চমকে দিল, সেটা ওর দুই চোখ। অদ্ভুত জ্বলজ্বলে। স্থির দৃষ্টিতে ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।
“কী ব্যাপার, এখানে একা একা বসে আছ কেন?”
“অ্যাঁ”, যেন চটকা ভেঙে ঘুম থেকে উঠল ছেলেটা। তারপর হাসল। সে এক মনকেমনিয়া অলীক হাসি।
“খেয়েছ?”
“হ্যাঁ”, মাথা নেড়ে জানাল। মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমি তাকিয়েছিলাম ছেলেটার হাসির দিকে। চোখের দিকে।
“চলো সবার সঙ্গে আড্ডা মারি গে”, আমি ছেলেটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম।
ওকে জিতুর সঙ্গে আলাপ করালাম, “এই যে আমার ছেলে জিতু। আজ ওরই জন্মদিন।”
ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের পরিচিত এক বড়োলোক পার্সি ভদ্রমহিলা পার্টিতে এলেন। এসেই জিতুকে বেশ অপ্রস্তুতে ফেলে ওর গালে লম্বা একটা চুমু খেয়ে বললেন, “হ্যাপ্পি বার্থডে সোনা। অনেক অনেক দিন বেঁচে থাকো।” জিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে ওঁকে প্রণাম করতেই উনি একটা বেতের ঝুড়িতে দামি শালে ঢাকা কী যেন একটা তুলে দিলেন জিতুর হাতে, “সারাজীবন ধরে এই উপহার তোমার সঙ্গী থাকবে বাছা। হাজার হোক এরাই মানুষের সেরা বন্ধু।”
জিতু তাড়াহুড়ো করে শালের ঢাকনা খুলেই চেঁচিয়ে উঠল, “আরে! একটা কুকুরছানা! আন্টি, তুমি কী করে জানলে আমার কুকুরছানার এত শখ?”
“আমার মারিয়ম দিন দুই আগে চারটে বাচ্চা দিয়েছে। তার মধ্যে তিনটে আগেই বুক করে নিয়েছিল। ভেবেছিলাম একটা নিজের কাছে রাখব। তারপর মনে পড়ল আজ তোমার জন্মদিন। তুমি এটাকে খুব আদরে রাখবে।”
“কীইই মিষ্টি না ও?” বেতের ঝুড়ির ভিতরে রাখা তুলোর বলের মতো প্রাণীটাকে দেখে জিতু উত্তেজনা গোপন করতে পারছিল না।
“মাত্র দুদিন বয়স। বারোই নভেম্বর, উনিশশো উনআশি। ওর জন্মদিন।”
“বারোই নভেম্বর”, আমিও আওড়ালাম ওঁর সঙ্গে। আর তখনই ঘটনাটা ঘটল। সেই অভিশপ্ত ঘটনা, যা আমার জীবনকে বদলে দেবে চিরকালের মতো।
সেই আনন্দের দিনে, সেই উৎসবের রাতে আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনাথ ছেলেটা বলে উঠল, “ও আগামী ষোলোই নভেম্বর মারা যাবে।”
“কীইই!” প্রাথমিক চমকের পর আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“এই কুকুরছানাটা আগামী ষোলোই নভেম্বর মারা যাবে। মানে পরশু দিন”, বুঝিয়ে বলল ছেলেটা। ওর গলা নিশ্চিত।
“কী বলছে ও?” মহিলা ওর মারাঠি বুঝতে না পেরে আমায় শুধালেন। ভাবলাম সত্যিটা বলে দিলে এ বেচারা বিপদে পড়বে। এমনকি মারধরও খেয়ে যেতে পারে। ভদ্রমহিলা হয়তো চেঁচিয়েমেচিয়ে এই পার্টিতে একটা ঝামেলা খাড়া করবেন। আমি আলোচনা ঘুরিয়ে পারভেজের ব্যবসা, তাঁর ছেলের গিটার শেখা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম। তাতে কাজ হল। যতক্ষণ না আমি ওঁর হাতে একটা আইসক্রিমের বাটি ধরিয়ে দিলাম, মহিলা বকরবকর করেই গেলেন।
এরই মধ্যে জিতু আর তার বন্ধুরা ছেলেটার সঙ্গে আড্ডা জমিয়ে দিয়েছে। কুকুরছানাটার মৃত্যু নিয়ে ছেলেটা আবারও বলল, “আমি বললাম তো, এই ছানাটা আগামী ষোলোই নভেম্বর মারা যাবে।”
“তার মানে পরও সব কুকুর মরে যাবে?” এক কলেজের ছাত্র ফাজলামো মেরে বলল।
“সবার কথা বলতে পারব না, তবে এটা মরবেই।”
ওর গলায় এমন একটা নিশ্চয়তা ছিল, যা আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিল। হঠাৎ করে সবাই চুপ মেরে গেল একেবারে। কেউ বুঝতে পারছে না কী বলবে।
অবশেষে আর-একজন কলেজ ছাত্র গলাখাঁকরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি সবার মৃত্যুদিন বলে দিতে পারো?”
“যদি আমি তাদের জন্মদিন জানি, তবে… হ্যাঁ। পারি।”
“বাহ, তবে আমারটা বলো। আমার জন্মদিন বিশে ডিসেম্বর, উনিশশো সাতান্ন।”
ছেলেটা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। যেন কী একটা হিসেব করছে।
“তিরিশে জানুয়ারি, দুহাজার আঠাশ”, অবশেষে বলল সে।
“যাক বাবা! মরতে ঢের দেরি আছে আমার”, হাঁফ ছেড়ে বলল ছেলেটা।
আমাদের অ্যাকাউন্টেন্ট মিস্টার গোরে ওঁদের কথাবার্তা শুনছিলেন। আগ্রহী হয়ে বললেন, “তুমি ভবিষ্যতের কথা বলতে পারো?”
“না। কিন্তু কারও জন্মদিন জানলে আমি তার মৃত্যুদিন বলে দিতে পারি।
“কী ভাঁওতাবাজি রে ভাই! যাই হোক, আমার সতেরোই ফেব্রুয়ারি, উনিশশো উনত্রিশে জন্ম। বলো আমি কবে মরব?”
খানিক ভয়ানক মনোসংযোগ করে ভেবে-টেবে ছেলেটা উত্তর দিল, “উনিশশো চুরানব্বইয়ের পাঁচই মার্চ।
“বাপরে! তাহলে আমার এবার নিজের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখতে হবে”, বিড়বিড় করে বলতে বলতে গোরে সেই জায়গা ছেড়ে চলে গেলেন।
“আমি তোমায় বিশ্বাস করি না”, চশমা আঁটা আর-এক কলেজ ছাত্র বলল, “দশই জুন, উনিশশো চুয়ান্ন।”
“বিশে আগস্ট, দুহাজার চোদ্দো”, এবার ভাবতে খুব বেশি সময় লাগল না।
খানিক বাদেই দেখি সে ছেলে ভিড়ের মধ্যে একজন কেউকেটা হয়ে গেছে। তার চারদিকে ছোটোখাটো একটা ভিড়। সবাই যেন এটা একটা খেলা পেয়ে বসেছে। কেউ ওকে সিরিয়াসলি নিচ্ছে না। একমাত্র তারাই নিচ্ছিল, যাদের মৃত্যুদিনের বহুবছর দেরি আছে। সে এক অদ্ভূত ভিড়। মৃত্যুচিন্তায় বিভোর। কে নেই তাতে? কলেজ ছাত্র, তরুণী, যুবতি, অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ, গৃহবধূ। তারা ওকে বিশ্বাস করছিল কি না জানি না, কিন্তু যখনই ও কোনও বহুদুরের তারিখ বলছিল, সবাইকে আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দেখেছি।
ছেলেটার মুখে এমন কিছু ছিল, যাতে আমি ওর থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না। যখনই কেউ ওকে একটা তারিখ বলছিল, ওর মুখের ভাব বদলে যাচ্ছিল। যেন কিছু একটা হিসেব করছে। আর তারপর একেবারে আবেগহীন ভাবে ছেলেটা প্রত্যেকের মৃত্যুদিন বলে যাচ্ছিল। নামতা বলার মতো।
কীভাবে ও করছে এটা? হিসেবটা কী? একই দিনে জন্মালে একই দিনে মরবে, এমন তো হয় না। তাহলে জন্মদিন জেনে কী করবে? তবে কি ও প্রত্যেকের আয়ু হিসেব করতে পারে? কিন্তু ওর মুখ… ওর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল এটা যেন একেবারে কোনও চেনা গণিতের সূত্র। মনে মনে ও সেটাই আওড়াচ্ছে। চার বা ছয় ঘরের মানসাঙ্কের চেয়ে জটিল কোনও অঙ্ক।
আমি প্রথমে ভাবলাম এটা বুঝি কোনও খেলা। একটু বিকট ধরনের। তবে খেলাই। যদিও গোটা পার্টির নজর এবার ছেলেটার দিকে ঘুরে গেছিল, আমি তবুও ছেলেটাকে সিরিয়াসলি নিইনি।
তারপরেই আমি শুনতে পেলাম।
এক বিকট আর্তনাদ আর ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ। আমার খুড়তুতো ভাই অনন্ত, চল্লিশ বছর বয়স, বাচ্চাদের মতো কেঁদেই চলেছে। সবাই তাকে বোঝাচ্ছে, এটা নেহাতই একটা খেলা। ও শুনছে না। কাঁদছে আর বিড়বিড় করে বলছে, “আমার ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে আছে। বউ আছে। ওদের কে দেখবে? আমি এত তাড়াতাড়ি মরে গেলে ওদের কী হবে?”
“ছেলেটা বলেছে ও নাকি আগামী বিশে নভেম্বর মারা যাবে। আর মাত্র ছয় দিন বাদে”, শুনলাম ভিড়ের মধ্যে একজন আর-একজনকে বলছে।
কেউ একটা অনন্তকে ধরে নিয়ে অন্য ঘরে চলে গেল। আমি কিছুটা হলেও অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। এমন কেউ করে নাকি? বাচ্চাদের মতো কান্না! তাও এই পার্টিতে? সবার মুড অফ। সবাই ভিড় ছেড়ে নিজের নিজের মতো সরে গেল। সেই অনাথ ছেলেও কোথায় চলে গেল কে জানে।
আমি আবার ওকে দেখলাম, যখন আশ্রমের ছেলেরা ফিরে যাবার উদ্যোগ করছে। “ও পরে আসবেখন”, ওদের শিক্ষক বললেন। ছেলেটা বোধহয় ওর শিক্ষকের খুব একটা প্রিয় না। নইলে উনি এমনভাবে বলবেনই বা কেন?
খানিক বাদেই আমি আবার যখন ছেলেটাকে দেখলাম, দেখি আমার স্ত্রী ওকে ভয়ানকরকম মেরে কালশিটে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু ছেলেটা কাঁদছে না।
“কী ব্যাপার? তুমি এই বেচারাকে এভাবে মারছ কেন?” আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।
“বেচারা! তোমার মুন্ডু। জিজ্ঞেস করো এইমাত্র ও কী বলেছে।” জিতুকে আমার দিকে এগিয়ে দিল সে।
ফোঁপাতে ফোঁপাতে জিতু শুধু এটাই বলতে পারল, “ও বলেছে… ও বলেছে… আমি নাকি আর মাত্র এগারো মাস বাঁচব।”
আমার পায়ের তলার জমি যেন সরে গেল এক নিমেষে। কুকুরছানা বা অনন্তের কথায় একটু আগেই হেসেছি। কিন্তু জিতু? আমার একমাত্র সন্তান… অসম্ভব।
কীভাবে ও করছে এটা? হিসেবটা কী? একই দিনে জন্মালে একই দিনে মরবে, এমন তো হয় না। তাহলে জন্মদিন জেনে কী করবে? তবে কি ও প্রত্যেকের আয়ু হিসেব করতে পারে? কিন্তু ওর মুখ… ওর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল এটা যেন একেবারে কোনও চেনা গণিতের সূত্র। মনে মনে ও সেটাই আওড়াচ্ছে। চার বা ছয় ঘরের মানসাঙ্কের চেয়ে জটিল কোনও অঙ্ক।
আমি প্রথমে ভাবলাম এটা বুঝি কোনও খেলা। একটু বিকট ধরনের। তবে খেলাই। যদিও গোটা পার্টির নজর এবার ছেলেটার দিকে ঘুরে গেছিল, আমি তবুও ছেলেটাকে সিরিয়াসলি নিইনি।
তারপরেই আমি শুনতে পেলাম।
এক বিকট আর্তনাদ আর ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ। আমার খুড়তুতো ভাই অনন্ত, চল্লিশ বছর বয়স, বাচ্চাদের মতো কেঁদেই চলেছে। সবাই তাকে বোঝাচ্ছে, এটা নেহাতই একটা খেলা। ও শুনছে না। কাঁদছে আর বিড়বিড় করে বলছে, “আমার ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে আছে। বউ আছে। ওদের কে দেখবে? আমি এত তাড়াতাড়ি মরে গেলে ওদের কী হবে?”
“ছেলেটা বলেছে ও নাকি আগামী বিশে নভেম্বর মারা যাবে। আর মাত্র ছয় দিন বাদে”, শুনলাম ভিড়ের মধ্যে একজন আর-একজনকে বলছে।
কেউ একটা অনন্তকে ধরে নিয়ে অন্য ঘরে চলে গেল। আমি কিছুটা হলেও অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। এমন কেউ করে নাকি? বাচ্চাদের মতো কান্না! তাও এই পার্টিতে? সবার মুড অফ। সবাই ভিড় ছেড়ে নিজের নিজের মতো সরে গেল। সেই অনাথ ছেলেও কোথায় চলে গেল কে জানে।
আমি আবার ওকে দেখলাম, যখন আশ্রমের ছেলেরা ফিরে যাবার উদ্যোগ করছে। “ও পরে আসবেখন”, ওদের শিক্ষক বললেন। ছেলেটা বোধহয় ওর শিক্ষকের খুব একটা প্রিয় না। নইলে উনি এমনভাবে বলবেনই বা কেন?
খানিক বাদেই আমি আবার যখন ছেলেটাকে দেখলাম, দেখি আমার স্ত্রী ওকে ভয়ানকরকম মেরে কালশিটে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু ছেলেটা কাঁদছে না।
“কী ব্যাপার? তুমি এই বেচারাকে এভাবে মারছ কেন?” আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।
“বেচারা! তোমার মুন্ডু। জিজ্ঞেস করো এইমাত্র ও কী বলেছে।” জিতুকে আমার দিকে এগিয়ে দিল সে।
ফোঁপাতে ফোঁপাতে জিতু শুধু এটাই বলতে পারল, “ও বলেছে… ও বলেছে… আমি নাকি আর মাত্র এগারো মাস বাঁচব।”
আমার পায়ের তলার জমি যেন সরে গেল এক নিমেষে। কুকুরছানা বা অনন্তের কথার একটু আগেই হেসেছি। কিন্তু জিতু? আমার একমাত্র সন্তান… অসম্ভব।
আমার আর আমার স্ত্রীর জন্য এই বেচারা প্রাণীটার মৃত্যু এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের সূচনা করল। জিতু কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়তেই আমার স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, “এ- এটা সত্যি। তাই না? ছেলেটা তো আজকেই কুকুরের মরার কথা বলেছিল…” ওর গলার স্বর কেঁপে যাচ্ছিল।
“আমি জানি না। তুমি এসব জিজ্ঞেস করছ কেন?” আমি ওকে থামানোর চেষ্টা করলাম।
“তুমি সব জানো। তুমি জানো। আর যদি এসব সত্যি হয়, তবে জিতু… আমার জিতু…” ও ঘুমন্ত জিতুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
.
১৯ নভেম্বর ১৯৭৯
আমি কুকুরছানাটার মৃত্যুর কথা অনন্তকে বলিনি, কিন্তু ওর বাড়িতে প্রায়ই ফোন করে একথা সেকথায় ওর স্বাস্থ্যের খবর নিতাম। ফোন ও-ই ধরত। মৃত্যুভয়ে ভীত, প্রায় অবশ। বাড়ি থেকে এক পা বেরোত না, কুড়ি তারিখ অবধি ও অফিস থেকে ছুটি নিয়ে নিল। বেচারা ভয় পেয়ে গেছিল, কিন্তু ওর স্বাস্থ্য একেবারে অটুট ছিল।
হতেই পারে কুকুরের মৃত্যুটা নেহাত কাকতালীয়। হতেই পারে অনন্ত বা জিতুর বেলায় এই অমঙ্গল ঘটবে না।
.
২১ নভেম্বর ১৯৭৯
গতকাল অনন্ত মারা গেছে।
কোনও ঝড় হয়নি, একফোঁটা বৃষ্টি পড়েনি, তবু কোনও এক অজানা কারণে ওর বাড়ির একটা দেওয়াল ধসে পড়ে ওকে চাপা দিয়ে মেরে ফেলেছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অনন্তের দেহ এক টন ইটের তলায় পিষে গেছে।
আমি বুঝে গেছি। জিতুও আর বেশিদিন আমাদের মধ্যে নেই।
সেই উজ্জ্বল চোখের ছেলেটা সত্যি বলে মার খেয়ে গেল। আমার স্ত্রী ওকে টেনে বাড়ি থেকে বার করে দিল, চিৎকার করে গালাগালি দিল, কারণ ও যা বলছিল তা সত্যি। আর সেই সত্যি আমাদের মনমতো ছিল না কখনোই।
নিজেকে অপরাধী বলে মনে হতে লাগল। ভাবলাম ছেলেটাকে ডেকে নিয়ে ক্ষমা চাই। অপরাধের ভারে এটাও ভাবলাম আমরা বরং ওকে বাড়িতে এনে দত্তক নিয়ে নিই। ওকে আর ওর এই গুণপনা নিয়ে একলা ওই অনাথ আশ্রমে পড়ে থাকতে হবে না। জিতু আর এগারো মাসের বেশি আমাদের সঙ্গে নেই। কিন্তু ওই ছেলেটা… আমাকে ওই দীপ্ত চোখের ছেলেটাকে খুঁজে বার করতেই হবে।
আমি ওর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করব, যেমন জিতুর সঙ্গে করি। ও জিতুর মতোই আমাদের সঙ্গে থাকবে। ওর মাধ্যমেই এগারো মাস পরেও আমাদের ছেলে আমাদের মধ্যেই থাকবে। এই একমাত্র সমাধান। আমার স্ত্রী নিশ্চয়ই আপত্তি করবে না। আইডিয়াটা ওর ভালোই লাগার কথা। এগারো মাস পরে কিন্তু মারা গেলে আমরা নতুন জিতুকে পাব। দীপ্ত, বুদ্ধিমান চোখের জিতুকে।
.
২২ নভেম্বর ১৯৭৯
আমি সেই অনাথ আশ্রমে গিয়ে চেনা সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করলাম। সেদিন যিনি ওদের নিয়ে এসেছিলেন। উনি আমায় দেখে খুশিই হলেন। “কী ব্যাপার স্যার? এখানে?” আমাকে চা বেড়ে দিতে দিতে ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন।
“না আসলে আমি ভাবছিলাম…”
“বলুন না স্যার, কী হয়েছে? অত কিন্তু কিন্তু করবেন না।”
“সেদিন জিতুর পার্টিতে একটা ছেলে এসেছিল। ও আমাদের বাড়িটা ভালোবেসে ফেলেছে মনে হল। আমরা ভাবছিলাম, যদি ওকে আমাদের পরিবারের একজন করে নেওয়া যেত…”
লোকটার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। “এর বেশি আর কী-ই বা চাইতে পারি? আমার রীতিমতো উত্তেজনা হচ্ছে। কোন ছেলেটাকে আপনাদের মনে ধরেছে স্যার?”
“সেই যে ছেলেটা কুর্তা পায়জামা পরে এসেছিল… আপনি বাকিদের নিয়ে চলে যাবার পরেও যে থেকে গেছিল, সেই ছেলেটা।”
“ওহ, ওই ছেলেটা…” লোকটার ভুরু কুঁচকে গেল।
“কেন? কোনও সমস্যা আছে?”
“না, আসলে ও আমাদের এই আশ্রমের কেউ না। মাঝে মাঝে আমাদের সঙ্গে যায় বটে, কিন্তু আমরাও ওর সম্পর্কে সঠিক কিছু জানি না।”
“ওহহ”, একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল অজান্তেই। “পরের বার ওর সঙ্গে দেখা হলে অবশ্যই আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন তবে… “
“সে তো বটেই। কিন্তু আপনি যদি অন্য কাউকে দত্তক নিতে চান তো…” আমি আর একটাও কথা না বলে উঠে পড়লাম।
.
২৩ নভেম্বর ১৯৭৯
গতকাল রাতে ও আমাদের বাড়ি এল। আমি রাতে খাবার পর বাগানে ঘুরছিলাম। আকাশ তারায় ভরা। আমি হঠাৎ বাগানের একপাশে ছেলেটাকে দেখতে পেলাম।
“আমি আপনার কথা শুনলাম। তাই এসেছি।”
“কোন কথা?”
“আপনি আমায় খুঁজছিলেন?”
“ওহ হ্যাঁ। তুমি ঠিকই বলেছিলে। কুকুরটা মারা গেছে। অনন্তও। তার মানে জিতুও… কি, তাই তো?”
ওর মুখ ভাবলেশহীন। ঠিক প্রমাণ হবার আনন্দ বা জয়ের উল্লাস কিচ্ছু নেই। এমনকি কোনও দুঃখ বা আশ্চর্যের ভাবটুকুও না।
“সত্যি করে বলো। জিতুর ব্যাপারটা কি ঘটবেই?”
“হ্যাঁ। তাতে কী হয়েছে? অনন্ত কাকু এত ভেঙে পড়েছিলেন কেন? কুকুরটা তো এই নিয়ে কান্নাকাটি করেনি! সবাইকে তো একদিন না একদিন মরতেই হবে।”
“আসলে কী বলো তো সোনা, মৃত্যুভয়টা একেবারেই বড়োদের ব্যাপার। যত তুমি বড়ো হবে, ততই এই জগতের নানা বিষয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে ধীরে ধীরে। তখন এই সমস্ত কিছু ছেড়ে যেতে তোমার খুব খুব কষ্ট হবে। তোমার মতো বাচ্চা ছেলে এই ব্যাপারটা ঠিক বুঝবে না।”
ছেলেটা মৃদু হাসল। কিছু বলল না।
“তুমি কি আমাদের সঙ্গে আমার বাড়িতে এসে থাকবে? তুমি যা যা চাও, সব পাবে। জিতুর মতো আমরা তোমার জন্মদিনও ধুমধাম করে পালন করব। তোমার জন্মদিন কবে?”
“বারোই মার্চ।”
“তুমি নিজের মৃত্যুদিন জানো?” বলতে না চেয়েও বলে ফেললাম।
“জানি, কিন্তু আমি ও নিয়ে ভয় পাই না।”
“কবে?”
“পাঁচই জুন। উনিশশো পঁয়ষট্টি।”
.
অনুবাদকের জবানি— রত্নাকর মটকারে (১৯৩৮-২০২০) মহারাষ্ট্রের লেখক মটকারে পেশায় ছিলেন একাধারে লেখক, চিত্রনাট্যকার, সিনেমার প্রযোজক ও পরিচালক। বিখ্যাত মারাঠি পত্রিকা সোনেরি সাবল্যা ও আপলে মহানগর-এ নিয়মিত লিখতেন কলাম। অশ্বমেধ, ব্রহ্মহত্যার মতো সাড়া জাগানো নাটকের লেখক-পরিচালক। ১৯৮৬ সালে পেয়েছেন দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, মাঝে ঘর মাঝে সংসার সিনেমার জন্য। ২০২০ সালের মে মাসে কোভিডে তাঁর মৃত্যু ঘটে। বর্তমান গল্পটি তাঁর হার্পার কলিন্স থেকে প্রকাশিত ইংরাজি অনুবাদ বই “ডার্কনেস থেকে নেওয়া। প্রথম প্রকাশ অনুবাদ পত্রিকায়।
