কেউ কোত্থাও নেই – কৌশিক মজুমদার
কেউ কোত্থাও নেই
“কোরেল, শোন না, আজকে সিনেমা দেখতে যাবি? শরুক খানের। সবাই দেখতে যাচ্ছে। হেবি হয়েছে নাকি শুনলাম।”
.
অশোকনগর উনিশ নম্বর কাঁকপুল ফরেস্টের আশেপাশে কোনও সিনেমা হল নেই। হল বলতে প্রায় চার-পাঁচ কিলোমিটার উজিয়ে সেই হাবড়ার রুপকথা হল। খানিক হেঁটে, খানিক টোটো আর বাকিটা অটো। সব মিলিয়ে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার মামলা। তাও যদি সবকিছু সময়মতো ঠিকঠাক পাওয়া যায়, তবেই।
মনে মনে খানিক কী যেন ভাবল কোরেল। আসলে ওদের বাড়ির এই বেকায়দা পজিশনটা নিয়ে চিরটাকাল ওর মনে দুঃখ। আগে স্কুল, এখন কলেজ, সবই বাড়ি থেকে বহু দূরে। সামান্য একটা দেশলাই কিনতে গেলে দশ মিনিট হেঁটে করেস্টের বাইরে মোড়ের মাথায় যেতে হয়। স্বাধীনতার পরেও বহুকাল এই জঙ্গলে লোক থাকত না। খ্যাঁকশিয়াল, ভাম বিড়াল আর সাপের বাস ছিল। অনেকে বলে ছোটোখাটো চিতাবাঘের বাচ্চাও নাকি দেখেছে। সত্যি মিথ্যে ঠিক নেই। তারপর সরকার থেকে এখানে কিছু পরিবারের পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করা হল। বাইরে থেকে আসা কিছু পানের ব্যবসায়ী বাউড়ি সম্প্রদায়ের লোক আর মধু চাষের জন্য কিছু পরিবার। সব মিলিয়ে এখন এই ফরেস্টে নয় নয় করেও গোটা কুড়ি পরিবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। কোরেলদের নিজেদেরই তিনটে পানের বরজ আছে। আর বেশ কিছু মৌমাছি পালনের বাক্স। এদিকটায় এখনও কেবল লাইন আসেনি। ব্রডব্যান্ড-ও না। ফলে নতুন সিনেমা দেখতে গেলে হল ছাড়া গতি নেই।
খানিক কী যেন ভাবল কোরেল, তারপর জুঁইকে বলল, “কটার শো রে?”
“আজ যদি যাই, তবে ইভনিং পেয়ে যাওয়া উচিত। তা না হলে নাইট। খুব নাকি ভিড় হচ্ছে। আজকেই যাবি?”
“গেলে আজই যাব। মা ভাইকে নিয়ে মামাবাড়ি গেছে। বাবা গেছে ব্যবসার কাজে নদিয়া। আজ ফিরবে না।”
“মানে? গোটা বাড়িতে তুই একা? মামাবাড়ি গেলি না কেন?”
“ধুর, পোষায় না। মামা মামি দেখলেই কবে বিয়ে করবি, কবে বিয়ে করবি বলে শুধু জ্বালায়। আর মা-ও সেসব শুনে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তাই কলেজের প্রোজেক্ট আছে বলে কাটিয়ে দিয়েছি।”
“তাহলে আজকেই যাবি তো? শিওর?”
“হুমম। শুধু ভাবছি, বাই চান্স ইভনিং-এর টিকিট না পেলে তো রাত হয়ে যাবে ফিরতে ফিরতে…”
“হলে হবে। ভয় কীসের?” বলেই জুঁইয়ের চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল। “তুই কি ওই খুনিটার কথা ভেবে…”
“একদম যে ভাবছিও না তা না কিন্তু। ভেবে দেখ, গত চার মাসে এই ফরেস্টে চারটে খুন। চারজনই মহিলা, প্রায় আমাদের সমবয়সি, আর সবাইকেই খুন করা হয়েছে গভীর রাতে।”
“একজনই যে করেছে তার প্রমাণ কী?”
“খুনের ধরন। সবাইকে একইভাবে গলায় ফাঁস লাগিয়ে খুন করেছে। এত জোরে ফাঁস লাগিয়েছে যে জিভ লকলক করে বেরিয়ে পড়েছিল। একজনের তো দাঁতের চাপে জিভ কেটে দুই টুকরো হয়ে গেছে শুনলাম।”
“ইসস! শুনেই আমার কেমন গা ঘিনঘিন করছে। এসব বলিস না”, কান চেপে ধরে জুঁই বলল। “বাদ দে, আজকে যেতে হবে না।”
“সেটা কোনও কথা না। গেলে আজকেই যাব। সামনে পরীক্ষা। কাল সকালে মা এসে গেলে আর হলে যেতে দেবে না। ততদিনে সিনেমাটাও উঠে যাবে। তোকে তোর ঠাম্মা ছাড়বে?”
“ঠাম্মাকে নিয়ে চাপ নেই। বুড়ি চোখেও দেখে না, কানেও শোনে না। একরকম ভুজুংভাজুং দিয়ে ম্যানেজ করে নেব। কিন্তু সিরিয়াসলি, তুই বলার পর আমারই গা কেমন কেমন করছে। ভেবে বল। যাবি?”
“যাব তো বটেই। আমায় জাস্ট পনেরো মিনিট দে। আর একটা কাজ কর। সুজাতাকে একটা ফোন করে দে। ও যদি যায়… যাবার পথে ওকে উঠিয়ে নিয়ে যাব।”
বাড়ি থেকে বেরোতেই সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল কোরেলদের। শীতের বেলা। চারিদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে এখনই। ফরেস্টের পাশে বড়ো খালটার ধারে জনা বিশেক লোকের ভিড়। দুটো পুলিশের ভ্যানও দেখা গেল। খালে জাল ফেলা হয়েছে। উঁকি মেরে কোরেল দেখতে পেল আর-একজন মেয়ে। পরনে ছোটো স্কার্ট। উলটো হয়ে ভাসছে, তাই মুখ দেখা যাচ্ছে না। মুখ দেখেও বা কী হত? কোরেল জানে অচেনা কেউ হবে। আগের চারজনের দুজনের বাড়ি ছিল বনগাঁয়, একজনের দত্তপুকুরে, শেষজন বারাসাতের মেয়ে। কেউই লোকাল না।
“যাক! বাঁচা গেল। যতটুকু ভয় ছিল, সেটাও গেল। খাল পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিসফিস করে কোরেল বলল।
“মানে? কী বলছিস তুই?”
“মানে আর কিছুই না। এই মাসের কোটা কমপ্লিট। এক মাসের জন্য খুনি বাবাজি আর এদিকে ঘেঁষবে না।’
“কী করে এত শিওর হচ্ছিস?”
“দেখ আমি গোয়েন্দা গল্পের বই পড়ি। আর… হ্যাঁ হ্যাঁ, এই বনের মধ্যে দিয়েই শর্টকাটে চল… আর এই খুন শুরু হওয়া থেকে আমি খুনগুলো ফলো করছি। এই খুলি যেই হোক, সে মাসে একটার বেশি খুন করে না, আর লোকাল কাউকে মারে না। খেয়াল করে দেখ। এটাই খুনির প্যাটার্ন। প্রত্যেক খুনির একটা নিজস্ব সিগনেচার থাকে। চাইলেও সে তার থেকে বেরোতে পারে না… এই, সাবধান, এখানে গর্ত আছে।”
“কে জানে বাবা!” বিড়বিড় করে বলতে বলতে কোরেলের পিছন পিছন চলল জুঁই।
সুজাতার বাড়ি মূল টাউনে। কিন্তু ওর তৈরি হতেই সময় লাগল সবচেয়ে বেশি। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই ইভনিং শো-র টিকিট পেল না ওরা। লাস্ট শে সাড়ে সাতটা থেকে সাড়ে এগারোটা। হলে ঢুকে সবকিছু ভুলে গেল তিনজনে। অনেকদিন পরে তাদের প্রিয় নায়ক এত ভালো একটা ছবিতে অভিনয় করেছে। তবে ছবিটা লম্বা। হল থেকে তিনজনায় যখন বেরোল, তখন বারোটা বাজতে আর মাত্র মিনিট দশেক বাকি। হলের সামনে সামান্য কয়েকটা টোটো দাঁড়িয়ে চেল্লাছে। তাদের কেউই ফরেস্ট অবধি যাবে না। এত রাতে অতদূর গেলে ফেরার সময় ফাঁকা টোটো নিয়ে ফিরতে হবে। অনেক সাধ্যসাধনার পর প্রায় দেড়া দামে এক টোটো সুজাতার বাড়ি অবধি যেতে রাজি হল। টোটোওয়ালার বয়েস কম। তিনজন কমবয়েসি মেয়েকে দেখে আরও বকবক করতে শুরু করল, “দিদিভাই, এত রাতে সিনেমা দেখতে আসবেন না। পথঘাট ভালো না। আগে এসব বাপের জম্মে দেখিনি। এখন চারিদিকে যা ঘটছে… বুঝতেই তো পারছেন।”
“কী ঘটছে?” জিজ্ঞেস করল সুজাতা।
“সে কী, কোনও খবরই রাখেন না দেখছি! অশোকনগরে এক নতুন খুনি এসেছে। মেয়েদের ধরে নিয়ে উনিশ নম্বরের বনে যায়, তারপর… কী আর বলব দিদি… সব হয়ে গেলে গলা টিপে খুন করে। পেটের নাড়িভুঁড়ি ছোরা দিয়ে কেটে বাইরে বার করে আনে। চোখ উপড়ে দেয়।”
“একদম বাজে কথা বলবে না তো”, প্রতিবাদ না করে পারে না কোরেল। “আমার নিজের বাড়ি ওই ফরেস্টে। আমি জানি। গলা টিপে না, গলায় দড়ি দিয়ে খুন। আর ছোরা-টোরা কিচ্ছু ঢোকায়নি। সব বানিয়ে বলছ আমাদের ভয় দেখাতে।”
টোটোওয়ালা যেন একটু দমেই গেল। একটু আমতা আমতা করে বলল, “অতশত জানি না দিদি, যে শুনেছি তাই বলছি। আর আপনাদের ভালোর জন্যেই বলা”, বলে গুম হয়ে চুপ করে গেল। চারিদিকে গাড়ির সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে। দোকানপাট প্রায় সব বন্ধ। যেগুলো খোলা, সেগুলোতে দোকানদার একলা বসে সারাদিনের হিসেব মেলাচ্ছে, অথবা ঝাঁপ বন্ধ করার তোড়জোড় করছে। মালবোঝাই লরিরা একের পর এক চলেছে সার বেঁধে। নালন্দা মোড় পেরোতেই দেখতে পেল রাস্তার ধারে একটা ঠেলাগাড়িতে কুলপি মেলেভা বিক্রি করছে বুড়োমতো একটা লোক। সেখানে তিন-চারটে অল্পবয়সি ছেলেমেয়ে ভিড় করেছে। গাড়ির লাল নীল চিকচিকে আলোতে তাদের হাসিগুলো চকচক করছে।
“এত রাতে কারা আইসক্রিম খায় ভাই?” বলে হেসে উঠল জুই।
“তাও আবার শীতকালে”, গলা মেলাল সুজাতাও।
টোটোওয়ালা এবার একটু ঘাড় ঘুড়িয়ে কোরেলের দিকে ফিরে বলল, “আজকেও নাকি একটা বডি পাওয়া গেছে? বিকেলবেলায়?”
কোরেলের এই ছেলেটার সঙ্গে বেশি কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। একটু বেশিই গায়ে পড়া যেন। সে “হুঁ” বলে কাটিয়ে দিতে চাইল।
“তাহলেই দেখুন। আগে খুন করত রাতে। এখন তো দিনদুপুরে খুন করা শুরু করেছে!”
“হয়তো আগেই করেছে। বডি ভেসে উঠতে তো টাইম লাগে।”
“না দিদি। আজকেই খুন হয়েছে। সেই মেয়েকে সকালেও জ্যান্ত দেখা গেছিল। মাইরি বলছি। মিথ্যে কথা না।”
“তুমি এত কিছু জানলে কী করে? এর আগে তো পরিচয় পেতেই দিন সাতেক চলে যেত।”
“আরেহ! এত কিছু জানেন, আর এই খবরটা জানেন না! সেই মেয়ে তো আপনাদের লোকাল! পাড়ার মেয়ে।”
এবার কোরেল একটু চমকাল। পাড়ার মেয়ে? এ বলে কী? এতদিন যা হচ্ছিল, সবটাই বাইরে হচ্ছে বলে এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছিল, কিন্তু যদি পাড়ার মেয়ে খুন হয় তবে তো বুঝতে হবে খুনি এবার ঘরে ঢুকে পড়েছে।
“কী নাম? বলতে পারবে?” জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে সামান্য হলেও গলা কেঁপে গেল কোরেলের। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোতে দেখল বাকি দুজনেরও মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। জুই তো একটা রুমাল দিয়ে মুখ চেপে ধরে বসে আছে।
“তা আমি কী করে বলব বলুন। কাল সকালেই জানতে পারবেন। এই যে দিদি, কচুয়া মোড় এসে গেছে…”
দিনের বেলায় মানুষজন আর বাস অটোর দাপটে এখানে নড়াচড়ার জায়গা থাকে না। সর্বদা জায়গাটা আওয়াজে ভরপুর। আর আজ রাতে, কী জানি কেন, দু-তিনটে লেড়ি কুকুর ছাড়া কাউকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। চৌরঙ্গীর দিকে যে রাস্তাটা গেছে, সেটাও শুনশান। শুধু পাতলা একটা কুয়াশার আস্তর নেমে গোটা জায়গাটাকে কেমন ভৌতিক রূপ দিয়েছে। সুজাতার বাড়ি কাছেই। তিনজন ওকে এগিয়ে দিতে গিয়ে দেখল ওর মা আলো জ্বেলে বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন।
“কী ব্যাপার বল তো তোর? সেই কখন থেকে ফোন করেই যাচ্ছি, আর বলছে ফোন সুইচড অফ।”
“এই রে!” ব্যাগ থেকে ফোন বার করে দেখল সুজাতা, “আবার গেছে!! এবার সার্ভিস সেন্টারে দিতেই হবে। ব্যাটারির সমস্যা। যখন-তখন অফ হয়ে যাচ্ছে।”
“আরে আমি তো ভয়ে মরছি এদিকে। তোরা এতটা হেঁটে এলি?”
“না না। কচুয়া অবধি টোটো ছেড়ে দিয়ে গেল। কেন, কী হয়েছে?”
“বলছি, ভিতরে আয়। আর তোরা এত রাতে ওই ফরেস্টে ঢুকবি? কী দরকার? আজ রাতটুকু এখানেই শুয়ে পড় খেয়েদেয়ে।”
“আমার হবে না গো কাকিমা”, প্রথম বেঁকে বসল জুঁইই। “ঠাম্মা একা আছে। আমাকে যেতেই হবে।”
“সে তো ঠিক আছে। কিন্তু কী হয়েছে শুনেছিস?”
“শুনব কী করে? হলে ছিলাম তো। ওহহ… সেই উনিশ নম্বরের ঘটনা?”
“হ্যাঁআআ…” বড়ো করে বললেন সুজাতার মা। “হ্যাঁ রে কোরেল, সুকন্যার বাড়িটা তোর বাড়ির ওদিকেই না?”
একটা হিমশীতল স্রোত নেমে গেল কোরেলের শিরদাঁড়া বেয়ে। সুকন্যা? মানে সুকন্যা বাড়ৈ? যদি তাই হয় তবে তো…
সুজাতার মা বলেই চলছিলেন, “আরে যার বাবাটা চেন্নাইতে না কোথায় যেন থাকে। ছোটো একটা বোন আছে…”
আর কোনও সন্দেহ নেই। সন্দেহ থাকতেই পারে না। টোটোওয়ালা একদম ঠিক বলেছিল। সুকন্যা কালকে অবধি বেঁচে ছিল। শুধু বেঁচে ছিল না, কালকে কোরেলের বাড়ি এসে ঘণ্টা দেড়েক আড্ডাও মেরে গেছে। কালকেই ও বলছিল, ফেসবুকে যেন কার সঙ্গে আলাপ হয়েছে। পরের দিন ডেটে যাবে। কোরেল সেই ছেলের ছবি দেখতে চেয়েছিল। সুকন্যা দেখায়নি। বলেছিল সব পাকাপাকি হলে দেখাবে। এই খুনি কি তবে সেই প্রেমিক? নাকি অন্য কেউ?
কোরেল চুপ করে আছে দেখে সুজাতার মা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “কি রে চিনিস? ওই মেয়েটাই তো?”
তীব্র একটা আতঙ্ক আর ভয়াবহ দুঃখ চেপে বসছিল কোরেলের মনে। জুই মুখে রুমাল চাপা দিয়ে কাঁদছে। কোরেল কাঁদতে পারছে না। ও কেমন একটা হতভম্ব মতো হয়ে গেছে এই খবরে। তেমনভাবে রিঅ্যাক্টও করতে পারছে না। সব কিছু গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।
সুজাতার মায়ের অনেক অনুরোধের পরেও ওদের থাকা হল না। জুইয়ের বাড়ি ফিরতেই হবে। আর জুঁইকে একা ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না। জুই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। দুজনে খানিক হেঁটে যখন ডানদিকের গলি ধরে ফরেস্টের পথে এগোচ্ছে, উলটো দিক থেকে একটা কালো বাইক অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এল। বাইকের উজ্জ্বল আলোতে দুজনের চোখ ধাঁধিয়ে গেল মুহূর্তে। ওদের অবাক করে দিয়ে ঘ্যাঁচ করে ওদের পাশে এসে দাঁড়াল বাইকটা। লোকটাকে চেনা যাচ্ছে না। কালো জ্যাকেট আর মাথায় কালো হেলমেট। জুঁই ভয়ে কোরেলের একেবারে গা ঘেঁষে মিশে রইল।
হেলমেট খুলতেই কোরেল চিনতে পারল। নারায়ণ। ফরেস্টের একটু আগেই যে ওষুধের দোকানটা আছে, সেই দোকানের মালিকের ছেলে। হাবেভাবে বোঝা কোরেলকে পছন্দ করে। কোরেল পাত্তা দেয় না। দোকান বন্ধ করে এখন বাড়ি যাচ্ছে। কোরেলদের এই সময় রাস্তায় দেখে নারায়ণ একটু অবাক হল, “এত রাতে? কী ব্যাপার?”
“সিনেমা দেখতে গেছিলাম। বাড়ি ফিরছি।”
“আচ্ছা! তাই বলো। তা বাড়ি পৌঁছে দেব নাকি?”
“কীভাবে দেবে? তোমার বুলেট গাড়িতে ক্যারিয়ার আছে? আর আমরা তো দুজন।”
“তাও বটে”, একটু যেন লজ্জা পেল নারায়ণ। “যাই হোক। সাবধানে যেয়ো। শুনেছ তো আজকে বিকেলে…” আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল সে। কোরেল আচমকা “দেরি হয়ে যাচ্ছে। গুড নাইট” বলে পা চালাল।
“এই শোনো, শোনো, ভালো কথা। তোমার সেই কলেজের বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল তো?”
“কোন বন্ধু?”
“আরে আজকে সন্ধে নাগাদ এসেছিল যে।”
থেমে গেল কোরেল। “আজ সন্ধেবেলা? আজ তো আমি সন্ধেবেলা ছিলামই না!”
“এহে… তাহলে বোধহয় ফিরে গেছে।”
“কে এসেছিল? নাম বলল কিছু?”
“না। তোমার থেকে সামান্য বড়ো একটা ছেলে। বলল তোমার কলেজের সিনিয়ার। কিন্তু বন্ধু। আমায় জিজ্ঞাসা করল তোমার বাড়ি কোথায়?”
“আর তুমিও বলে দিলে? আমার কাছে মোবাইল ছিল না? যার দরকার কল করে নিত।”
“আরে বলেছিলাম। বলল নাকি সারপ্রাইজ দেবে… কিন্তু তোমায় না পেলে তো ফোন করা উচিত। কোনও ফোন পাওনি তোমার সেই সিনিয়ার কাম বন্ধুর?” বলে একটা ফিচেল হাসি দিল নারায়ণ।
“নারানদা… এবার একটু রেগেই বলল কোরেল, “তুমি হয়তো জানো না, আমাদেরটা ওমেনস কলেজ। সেখানে ছেলে সিনিয়ার থাকবে কেমন করে?” বলেই গোটা ব্যাপারটা মাথায় ঢুকল কোরেলের। একটা অচেনা লোক তার খোঁজ করছিল। তার বাড়ির ঠিকানা জিজ্ঞাসা করছিল। কিন্তু কেন?
ওদিকে নারায়ণ আর কথা না বাড়িয়ে “আচ্ছা, চলি। সাবধানে যেয়ো। গুড নাইট”, বলে বাইক চালিয়ে দিল।
জুঁই এতক্ষণ কিছু বলেনি। এবার বলল, “কী কেস রে? কিছু করছিস নাকি? সত্যি করে বল তো?”
“কিচ্ছু না। করলে বলব না কেন? তবে এখন আমার মনে হচ্ছে তোকে আগে যেটা বলেছিলাম, সেটা যদি ভুল হয়, তবে মহা বিপদ।”
“কী বলেছিলি?”
“প্রতিটা খুনির একটা প্যাটার্ন থাকে। তারা এর বাইরে বেরোতে পারে না। এই খুনির প্যাটার্ন ছিল মাসে একটা করে খুন আর বাইরের মেয়ে। একটা প্যাটার্ন ভেঙেছে। লোকাল মেয়েকে খুন করেছে। এবার যদি অন্যটাও ভাঙে? তবে তো আমরা আজকেও সেফ নই।”
“বলিস না, বলিস না। প্লিজ। আমার খুব ভয় করছে।” জুঁই যেন আরও কুঁকড়ে একেবারে ছোটো হয়ে গেল। পুরো রাস্তা একেবারে জনমানবহীন। নিস্তব্ধতায় যেন কানে তালা লেগে যাচ্ছে। রাস্তার ধারে উজ্জ্বল ভেপার ল্যাম্পের হলুদ আলো। নিজেদের ছায়াই অদ্ভুত অশরীরী প্রেতাত্মার মতো। এই মোড়ের শেষ দোকানটাও চলে গেল। গীতা শাড়ি মিউজিয়াম। মিউজিয়ামই বটে। সামনে বড়ো কাচ লাগিয়ে একগাদা ম্যানিকুইন বিভিন্ন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বোবা চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
“আচ্ছা, এখন খুব জোরে একটা চিৎকার করলে ওরা সাড়া দেবে?”
“কারা?”
“ওই ম্যানিকুইনগুলো। ধর এদের মধ্যে কেউ একটা নড়ে উঠল।”
“কোরেল!! ভালো হবে না বলে দিচ্ছি…”
বাঁধানো রাস্তায় দুইজোড়া হিল জুতোর খটখট শব্দ শুনতে স্টেনগানের আওয়াজের মতো লাগছে। ডান হাতে সামান্য বেঁকলেই ফরেস্টের হাতা শুরু।
“চল তোকে আগে বাড়ি পৌঁছে দিই।”
“না, আমি তোকে দেব।
“বোকা বোকা কথা বলিস না জুঁই। তোর ঠাকুমা একা আছেন। তার উপরে তোর বাড়ি আগে পড়বে। আমি ঠিক চলে যেতে পারব। আমাকে পৌঁছে দিতে হলে ফেরার সময় গোটা বনপথ আর খালের উপরের পুলটা তোকে একা পেরিয়ে আসতে হবে।
পারবি তো?”
জুঁই আর কথা বাড়াল না।
“চল গান করি দুজনে মিলে”, কোরেল প্রস্তাব দিল। একটু বেসুরো হলেও গান ধরল দুজনে। কিন্তু এই শীতের রাতে, এই কুয়াশার মধ্যে, অন্ধকারে, সে গান নিজেদেরই এত অদ্ভূত ঠেকল যে চুপ করে গেল দুজনেই। ফরেস্টে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ল্যাম্পপোস্টের দূরত্ব বেড়েছে। ভেপার ল্যাম্পের বদলে সাদা নিয়ন আলো মিটমিট করছে। ক্ষীণভাবে কানে আসছে বনচর পোকা আর পশুদের সরসর আওয়াজ। আরও বিশ পা হাঁটার পর জুঁইদের বাড়ি। এতক্ষণে ঠাকুমা ঘুমিয়ে পড়েছেন। জুঁইয়ের কাছে চাবি আছে। চাবি ঘুরিয়ে সে ঘরে ঢুকে পড়ল।
“তোর আর আজকে বাড়ি যাবার দরকার নেই। আমার এখানেই থেকে যা।
“না রে। হবে না। এখান থেকে আর কতটুকু? ঠিক চলে যাব। চাপ নিস না।”
“থাক না। প্লিইইজ।
“আরে না রে বাবা। আর-একদিন এসে থাকব।”
“তাহলে বাড়িতে পৌঁছেই ফোন করবি। করবি তো?”
“পাক্কা।”
.
কোরেল এবার মধ্যরাতের জঙ্গলে সম্পূর্ণ একা। তার এই একুশ বছরের জীবনে এই প্রথমবার। দূরে দূরে বাড়িগুলো ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। একটাতেও আলো জ্বলছে না। গোটা অরণ্য যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমাক। ভালো করে ঘুমাক। আর মাত্র পাঁচ মিনিট ঘুমালেই চলবে। কোরেল ততক্ষণে নিজের বাড়ি পৌঁছে যাবে। তারপরেই ফোন করবে জুইকে। জুইটা এত্ত ভীতু না… দূরে কোথায় যেন একটা কুকুর ডেকে উঠল, আর ঠিক তারপরেই কোরেল একটা গান শুনতে পেল গুনগুন করে। পুরুষ কণ্ঠের গান। বনের ঝোপঝাড়ের ফাঁকে কে যেন গান গাইছে, “আভি না যাও ছোড় কর।” এই গান কোরেলের খুব প্রিয়। কিন্তু এই রাতে, এমন অবস্থায় এই গান শুনে কোরেলের হাড় হিম হয়ে গেল। সে একটু দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। আকাশের চাঁদ এতক্ষণে বনের মধ্যে উঁকি দিয়েছে। আর সেই চাঁদকে পিছনে রেখে তার দিকেই এগিয়ে আসছে একটা লোক। বেশ বড়োসড়ো চেহারা। হাঁটার মধ্যে কোনও ব্যস্ততা নেই। যেন বিকেলে পার্কে ঘুরতে বেড়িয়েছে। ওই লোকটাই গাইছে, “সিতারে ঝিলমিলা উঠে, চড়াগ জগমগা উঠে… কী ব্যাপার? এত রাতে আপনি এখানে?”
শেষ প্রশ্নটা কোরেলকে। কোরেল দেখল লোকটার পরনে পুলিশের উর্দি। বয়স অবশ্য খুব বেশি না। জোয়ান। পেটানো চেহারা।
“আমাকে আজ রাতে এই ফরেস্টেই ডিউটি দিয়েছে। আজ সন্ধ্যায় এখানে একটা মার্ডার হয়েছে, জানেন তো? আপনি কে?”
“আমি একটু দূরেই থাকি। বন্ধুদের সঙ্গে রূপকথায় সিনেমা দেখতে গেছিলাম।
নাইট শো। ফিরতে ফিরতে লেট হয়ে গেল।”
“ওকে। আমি আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেব?”
“দরকার নেই। আর একটুখানি। আমি চলে যাব। থ্যাংকস।”
“কিন্তু ওই বনপথ আর খালের ওপর দিয়ে এত রাতে যেতে পারবেন?”
“পারব, পারব। আপনাকে চিন্তা করতে হবে না।” একটু ঝাঁজিয়েই বলল কোরেল। মরে গেলেও ওই বনপথে এই রাতে কোনও পুরুষের সঙ্গে যাবে না সে। এই লোক নিজেকে পুলিশ বলছে। কিন্তু এ যে সত্যিকারের পুলিশ তার প্রমাণ কী? এই পোশাক যে কেউ পরতে পারে।
“আমি এখানেই আছি। অসুবিধা হলে হাঁক পড়বেন, কেমন?” লেন লোকটা। “আমি দৌড়ে গিয়ে আপনাকে উদ্ধার করব।”
কোরেল উত্তর দিল না। পুলিশটাকে পেরিয়ে বনপথের মধ্যে নিয়ে চলতে লাগল সোজা। আর বড়োজোর তিন মিনিট। মানে ১৮০ সেকেন্ড। এতক্ষণ যখন কিছু হয়নি, এই সামান্য সময়েও কিছু হবে না। নিজেকে প্রবোধ দিল কোরেল। দুই সেকেন্ডে এক পা ফেললে আর মাত্র নব্বই পা। ঊননব্বই। অষ্টাশি। সাতাশি…
খানিক বাদে সে অবাক হয়েই খেয়াল করল, নিজের অজান্তে সে জোরে জোরে গোনা শুরু করে দিয়েছে “বিরাশি, একাশি, আশি…”
বনপথ ভয়ানক অন্ধকার। মোবাইলের আলো জ্বেলে যে সামান্য আলো হয় তাতে যতটুকু দেখা যায়, সেই ভরসা। কোরেলের মনে হল সারা পৃথিবীতে আর কিচ্ছু নেই। শুধু সে আছে, আর এই ভয়ানক কালো বন আছে। শাড়ির দোকানের ম্যানিকুইন, নারাণের দোকান, রূপকথা সিনেমা হল, এমনকি জুঁইদের বাড়ি, সবকিছু যেন এক লহমায় ভ্যানিশ হয়ে গেছে। “পঞ্চান্ন, চুয়ান্ন, তিপ্পান্ন”… কোরেল মনে মনে সিনেমার নায়িকার মুখ মনে করতে গেল। কিন্তু এখন শুধু সুকন্যার মুখ মনে ভেসে উঠছে। সামনেই সেই খাল। আর খালের উপরে বাঁশের পুল। কোরেলের মনে হল এবার কেউ তাকে ফলো করছে। বনপথে পরিষ্কার পায়ের শব্দ। কোরেল থেমে গেল। পায়ের শব্দ আর নেই। শুধু একগাদা ঝিঁঝিপোকা তারস্বরে চেল্লাচ্ছে। আবার দুই পা ফেলতেই পিছনে পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। ঝিঁঝিরাও বা চুপ করে গেল কেন? কেউ কি আসছে? কোরেল চুপ করে রাত্রির আওয়াজ শোনার চেষ্টা করল। রাত্রিও যেন তার আওয়াজের অপেক্ষায়। অনেক পরে ক্ষীণ একটা শব্দ এল কোথা থেকে… দুম! ধুপ! দুম! ধুপ!
মনের ভুল। কোরেলের হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ এত জোরে কিছুতেই হতে পারে না। অসম্ভব। কোরেলের মাথা কাজ করছে না। সে আবার প্রাণপণে দৌড় লাগাল। ভয়, আতঙ্ক, ত্রাস, উদ্বেগ মিলিয়ে মিশিয়ে সে বাঁশের পুলটা প্রায় উড়েই যেন পার হয়ে গেল। নামার সময় সামান্য বেখেয়ালে দুটো বাঁশের মধ্যে পড়ে ডান পা-টা মচকে গেল। প্রচণ্ড যন্ত্রণা। কিন্তু কোরেলকে থেমে থাকলে চলবে না। সে কোনওমতে লেংচে লেংচে এগোতে থাকল বাড়ির দিকে।
হায় ভগবান। আর বড়োজোর কুড়ি পা। কিন্তু পায়ের যন্ত্রণায় এটাই কয়েক মাইল মনে হচ্ছে। পিছনে পায়ের শব্দটা মাঝে মাঝে আসছে। মাঝে মাঝে মিলিয়ে যাচ্ছে। এই শেষ। আর কোনও দিন যদি সে রাতের শো দেখতে যায়। আর গেলেও সুজাতার বাড়ি রাত্রিটা থেকে যাবে। কিংবা জুইয়ের বাড়িতে। বড্ড বোকামো করেছে আজকে। আর নয়। ওই তো! ওই তো তার বাড়ির দরজা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। যাবার আগে সামনের আলোটা জ্বালিয়ে গেছিল। সেটাও জ্বলছে একইভাবে। কোনওমতে শেষ কয়েকটা পা ফেলে বাড়ির দরজার সামনে হাজির হল কোরেল। ব্যাগ থেকে চাবি বার করতে গিয়ে অসাবধানে গোটা পার্সের জিনিসপত্র ছড়িয়ে পড়ল মাটিতে। পড়ুক গে। কাল তোলা যাবে। আগে তো ঘরে ঢুকি।
প্রথমে চাবি গোলমাল হল।
“তাড়াতাড়ি, জলদি, খুলছে না কেন দরজাটা?”
দরজা খুলেই দড়াম করে দরজা বন্ধ করে, ছিটকিনি লাগিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল কোরেল। উফফ। বাবা! এবার শাস্তি। এবারে আর কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না। এবারে সে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। হোম হোম সুইট হোম, সাধে বলে লোকে? বসার ঘরের কাচের জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল কোরেল। যতটা দেখা যায়, কেউ কোত্থাও নেই। গোটাটাই তার মনের ভুল। নিজের উপরেই রাগ ধরল তার। প্যানিক অ্যাটাকে মানুষ কী-ই না করে! পায়ের ব্যথাটা বাড়ছে। ভোলিনি না লাগালে কমবে না। মোবাইল বার করে জুঁইকে ফোন করল কোরেল।
“হ্যাঁ রে। এখনও জেগে আছিস? ঘুমিয়ে পড়। হ্যাঁ, হ্যাঁ। বাড়িতেই ঘরের ভিতরে। আর কোনও ভয় নেই। পা সামান্য মচকেছে।
আরে না, না, অন্ধকারে গর্তে পড়ে গেছিলাম। হ্যাঁ, ভোলিনি লাগাচ্ছি। তুই শুয়ে পড়। গুড নাইট”
আর তখনই শোবার ঘরে নিজের বিছানার দিকে চোখ পড়ল কোরেলের। গোটা ঘর অন্ধকার। শুধু বিছানায় একটা চৌকো চাঁদের আলোর ফালি এসে রুপোলি আলোতে ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছে। কোরেলের শোবার ঘরে কাঠের জানালা। কাচ দেওয়া না। জানলায় শিক নেই। তাই সন্ধেবেলাতেই বন্ধ করে দেওয়া হয় রোজ। আজও করেছিল। স্পষ্ট মনে আছে।
অপলক দৃষ্টিতে শোবার ঘরের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় কোরেল বলে উঠল, “কে? কে?”
.
ঠিক তার পিছনে অন্ধকার বসার ঘর থেকে কার যেন গলাখাঁকরানোর আওয়াজ পাওয়া গেল…
.
অনুবাদকের জবানি— যদিও গোটা গল্প বা তার আঙ্গিক একেবারে আমার জন্মস্থান অশোকনগরে, কিন্তু কাহিনি রে ব্র্যাডবেরির বিখ্যাত গল্প ‘দ্য হোল টাউন ইজ স্লিপিং’ থেকে নেওয়া। বিশেষ করে শেষটা। তাই একে মৌলিক গল্পে না রেখে অনুবাদ বা ভাবানুবাদ অংশেই রাখা গেল। ‘কেউ কোত্থাও নেই’ নামটা একেবারেই সহজ পাঠ থেকে ওঠানো।
