পরিশিষ্ট – ‘আতঙ্ক সমগ্র’: সমগ্র আতঙ্কের খতিয়ান
গল্পসংকলনের মূল্যায়ন করে কিছু লিখতে যাওয়া খুব বিপদের কথা। কারণ যতই কষে ধরেবেঁধে বাঁধতে যাওয়া হোক না কেন, ঠিক ঠোঙা ফেটে গল্পচূর্ণ স্পয়লার হয়ে রাস্তায় ছড়িয়ে যাওয়ার রিস্ক থেকে যায়। আর ‘ছোটো’ গল্প তো, তাই ওইটুকু গল্পচূর্ণ বেরিয়ে পড়লেই গোটা গল্পটা মুখ দেখিয়ে ফ্যালে আর রিভিউয়ার গালাগালি খেয়ে মরেন। উপন্যাস বা নন-ফিকশনের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি থাকে না অতটা। অতএব প্রথমেই বলে রাখি যে এই লেখায় আমি ‘আতঙ্ক সমগ্র’-এর গল্পগুলি ধরে ধরে সামারি দেওয়ার মতো বিশ্লেষণ করতে বসিনি। বইটা পড়ে সামগ্রিকভাবে যে কটি কথা মনে হয়েছে তাই বলব।
বইতে আছে ছোটো-বড়ো মিলিয়ে পঁচিশটি গল্প। বইয়ের নাম থেকে এও পরিষ্কার যে, সবকটিরই মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে ‘আতঙ্ক’। এর মধ্যে বেশিরভাগ কাহিনিই লেখকের পূর্বপ্রকাশিত দুটি বই ‘আঁধার আখ্যান’ ও ‘আবার আঁধার’-এ অন্তর্ভুক্ত ছিল। কাজেই বেশ কিছু মানুষ সেগুলি পড়েছেন। যে গল্পগুলি আগে সাদা-কালোয় ছাপা হয়নি তারাও বিপুলভাবে প্রশংসা পেয়েছে মানুষের- না, পাঠকের নয়, শ্রোতার। ‘গপ্পো মীরের ঠেক’-এ কৌশিক মজুমদারের ভয়ের গল্পের জন্য আলাদা করে দাবি আসে আজ। মোদ্দা কথা, কৌশিক মজুমদারের কলমে যে ভয়ের পাওয়ান রচিত হয় তার স্বাদ বাংলার জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ডুবে থাকা এক বড়ো অংশের মানুষই পেয়েছেন। আমি এই বইয়ের পঁচিশটি গল্পের নিরিখে সেই মনোহর পাওয়ানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মশলাপাতিগুলির স্বাদ-গন্ধ একটু আলাদা আলাদা করে চেখে দেখার চেষ্টা করব কেবল।
আতঙ্ক জিনিসটা আসে রহস্য থেকে, অন্ধকার থেকে। অন্ধকারের রং কালো। কিন্তু সব কালো তো একরকমের হয় না, তাই না? তাই আতঙ্কের রং-ও অন্ধকারের ঘনত্ব আর উপাদানের সঙ্গে সঙ্গে পালটাতে থাকে। এ বইয়ের গল্পগুলি নানান ধাঁচের। কৌশিক মজুমদার স্পেকুলেটিভ ফিকশনের বিভিন্ন জঁরেই হাত দিয়েছেন মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা ‘অন্ধকার’-কে বিভিন্ন দিক থেকে নিরীক্ষণ করার জন্য। আসলে মানুষের মনের তলদেশে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারের পাঁকই তাকে দিয়ে করিয়ে নেয় এক-একটা অভাবনীয় কুকর্ম, তাকে ভয় দেখায়— দুঃস্বপ্নের বেশে, অলৌকিকের রূপে, ভবিষ্যতের চেহারায়। অন্ধকারের উৎস তাই একই, উদ্ভাস হয় ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির। দানবের অধিষ্ঠান কখনও মনের ভিতরে, হয়তো মনের অগোচরে, আবার কখনও বা নিতান্ত চোখের সামনে অসহনীয়ভাবে। কালিকলমে যখনই এই রূপভেদ ফুটে উঠেছে, লেখক-পাঠক-সমালোচক তাদের ভেঙে দিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন জঁর আর সাবজঁরে— ক্রাইম, হরর, সুপারন্যাচারাল, স্ল্যাশার হরর, ডিস্টোপিয়ান ফ্যান্টাসি, সাই-ফি থ্রিলার, কিংবা একেবারে আমাদের ঘরের তন্ত্র-মন্ত্র আর ভূত-প্রেত- অপদেবতাদের নিয়ে লেখা অকাল্ট হরর- বলতে বলতে রাত ভোর হয়ে যাবে। মহাজন-সাহিত্যিক স্টিফেন কিং ‘ড্যান্সে ম্যাকা’ বইতে এই জঁর ভাগাভাগির ব্যাপারটাকে মান্যতা দিয়েও আদতে সবই যে এক সেটা স্বীকার করে নিয়েছেন।
“It’s a trap, this matter of definition, and I can’t think of a more boring academic subject […] and not really interesting unless those involved in the discussion are drunk or graduate students- two states of roughly similar incompetence. I’ll content myself with stating the obvious inarguables: [they] are works of the imagination, and [they] try to create worlds which do not exist, cannot exist, or do not exist yet. There is a difference, of course, but you can draw your own borderline, if you want- and if you try, you may find that it’s a very squiggly border indeed.”
কৌশিক মজুমদার এই তত্ত্বের মূল ধরে টান দিয়েছেন। তিনি স্বচ্ছন্দ পায়ে বিচরণ করেছেন এক জঁর থেকে আর এক জঁরে, কিন্তু মূল বিষয়বস্তু যে অন্ধকার সেটা ভুলে যাননি কখনও। গল্পগুলিতে বিভিন্ন রূপে এবং বিভিন্ন পরিমাণে এসেছে ‘ডার্কনেস’। গোটা বইটাই তাই হয়ে উঠেছে সেই অন্ধকার-সঞ্জাত আতঙ্ক নিয়ে সাহিত্যিক পরীক্ষানিরীক্ষার এক ল্যাবোরেটরি। সেইজন্যই বুঝি বইয়ের নাম ‘আতঙ্ক সমগ্ৰ’– গোটা বই জুড়ে যেন একখানাই গল্প- আতঙ্কের। পঁচিশটা ছোটোগল্পকে সেই একটা গল্পের পঁচিশটা পর্ব ভেবে পড়লে স্বাদগ্রহণে সুবিধে হবে। এবং পঁচিশটি আদ্যম্ভ ভিন্ন স্বাদের গল্পে ‘আতঙ্ক সমগ্র’ হয়ে উঠেছে একটি লোভনীয় আতঙ্ক-চকোলেটের মিক্সড ব্যাগ। অবশ্য তা না বলে বইটিকে একটি ডার্কনেস থিমের পূর্ণাঙ্গ থালিও বলতে পারেন। অথবা একটি পারফেক্ট ধ্রুপদি সংগীতের আসর। ধ্রুপদি রহস্যগল্প দিয়ে শুরু হয়ে, নন-ক্রাইম স্টোরি পেরিয়ে, ডার্ক হিউমর আর ডার্ক ফ্যান্টাসি হয়ে সাইকোলজিকাল হররের ঘাট পেরিয়ে সোজা সুপারন্যাচারাল হররে ঢুকে পড়েন লেখক। সেখানে বিরাট এক প্ল্যাটার সাজিয়ে তিনি পুজো দেন বিশ্বের হরর সাহিত্যের মহারাজ হাওয়ার্ড ফিলিপস লাভক্রাফটের। তারপর ডিস্টোপিয়ান-কল্পবিজ্ঞান দিয়ে মৌলিক গল্পের পাত শেষ করেন। ডেজার্টে হাতে তুলে নেন বিদেশি মিষ্টি, বাংলার রসে অনুবাদ করা। পাঠক এইখানেই বুঝতে পারবেন কেন তাঁর আগের গল্পগুলো পড়তে এত ভালো লেগেছে। কারণ তিনি বুঝতে পারবেন যে লেখকের মনের তার বাঁধা আছে পাশ্চাত্য স্পেকুলেটিভ ফিকশনের ডার্কনেসের ট্রিটমেন্টের মধ্যে, সেই ঘরানার থেকেই তিনি উদ্বুদ্ধ হয়েছেন অন্ধকারকে বিজ্ঞানীর মতো একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে এক্সপ্লোর করা এমন একটি বইয়ের কথা ভাবতে।
‘আতঙ্ক সমগ্ৰ’-তে পাশ্চাত্য হররের প্রভাব নিয়ে কিছু বলতে গেলে আলাদা করে অবশ্যই বলতে হবে লাভক্রাফটিয়ান হররের কথা, কারণ এই বইয়ের কয়েকটি গল্প লাভক্রাফটের কপিবুক স্টাইলে লেখা। কিন্তু সেগুলির কথায় যাওয়ার আগে লাভক্রাফটিয়ান হররের ব্যাপারে কিছু কথা জেনে নেওয়া জরুরি, কারণ বাঙালি পাঠকের কাছে লাভক্রাফট স্বনামে পরিচিত হলেও গল্পের ধাঁচের নিরিখে ততটা নন। ১৯২০-র দশকে হরর-ফ্যান্টাসি-উইয়ার্ড সাহিত্যের ইতিহাসের মোড় ফিরিয়ে তাকে ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকায় ঘাঁটি গাড়তে বাধ্য করার পিছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল থুলু মিথোসের স্রষ্টা হাওয়ার্ড ফিলিপস লাভক্রাফটের লেখালিখি শুরু করা। হরর সাহিত্যকে কালের বিচারে যদি দুটি যুগে ভাগ করতে হয়, তবে সেই যুগসন্ধিতে দাঁড়িয়ে আছেন লাভক্রাফট। তিনি পূর্বসূরিদের রচনাশৈলী নিংড়ে নিলেন এবং তাই দিয়ে তাঁর পরবর্তী এক বিরাট লেখকসমাজকে পথ দেখানোর মতো একদম নতুনরকমের রচনা ও চিন্তাশৈলী তৈরি করলেন। ভয়-আতঙ্কের কারবারে মানুষী সম্পর্কের অলিগলিতে নয়, তিনি আগ্রহী ছিলেন মানুষের সঙ্গে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সম্পর্কের আনাচকানাচ নিয়ে। লর্ড ডানসেনি, রবার্ট, ডব্লিউ চেম্বার্স, আর্থার ম্যাকেন প্রমুখের রচনা তাঁকে দেবতাপদবাচ্য প্রাচীন ‘থিংস’-এ ভরা এক ‘কসমস’, এক ছদ্ম-মিথোলজি কল্পনা করতে প্রভাবিত করেছিল। মানুষের জানা দুনিয়ার বাইরে থাকা অমিত শক্তিধর এই ব্রহ্মাণ্ডের অশেষ ক্ষমতা এই দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার। লাভক্রাফট বলতে চাইলেন যে নিজেদের সব জ্ঞান-বুদ্ধি আর সমগ্র অস্তিত্বের দন্ত নিয়েও মানুষ আসলে সেই ব্রহ্মাণ্ড আর তাদের প্রকাণ্ড অধিবাসীদের ক্ষমতার সামনে খড়ের পুতুল মাত্র। তাদের আর আমাদের জগতের মাঝখানে ব্যবধান শুধুমাত্র একটি পাতলা পর্দার- আর সে পর্দাও সরে যেতে পারে যখন-তখন। হয়তো বা আমাদেরই অতি-কৌতূহলের বশে কিংবা অসাবধানী আঙুলের স্পর্শে। লাভক্রাফট বললেন এক রহস্যময় বইয়ের কথা। ‘নেক্রোনমিকন’ নামের সেই মহাগ্রন্থই দুই জগতের মাঝের সেই রহস্যদ্বার খোলার চাবি। সে মহাগ্রন্থে রয়েছে সেই বহিব্রহ্মাণ্ডের বিকট ভয়ংকরদের কথা, জগতের পরম সত্য— ঈশ্বর বলে কিছু নেই, মৃত্যুর অতীত সেই সর্বশক্তিমানরাই নিয়ন্ত্রণ করছে এই মরজগৎকে তাদের যেমন ইচ্ছা তেমন। নেক্রোনমিকনের এই পরম জ্ঞানও কিন্তু সকলের জন্য নয়। নেক্রোনমিকন বেছে নেয় নিজের পাঠককে। তাকে ডাক পাঠিয়ে অলৌকিক উপায়ে টেনে আনে নিজের কাছে। তারপর তার চোখের সামনে সেই মহাগ্রন্থ জীবন্ত হয়ে ওঠে। তার অক্ষরগুলি প্রাণ পেয়ে ধীরে ধীরে অধিকার করে নেক্রোনমিকনের পাঠককে। তখন তার সামনে সেই জ্ঞান-বোধ-আবেগের অগম্য অধিবাসীরা তাদের সমস্ত ক্ষমতা নিয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় প্রলয় ঘটাতে ঘটাতে। তারা দেবতা না দানব? লাভক্রাফট পাঠককে গুলিয়ে দেন। থুলু, ডাগনের মতো সেই দানবিক দেবতারা (লাভক্রাফটের ভাষায় ‘দি ওল্ড ওয়াস’) মানুষকে পাকে পাকে বেঁধে ফেলে নিজেদের দাস বানিয়ে রেখে অট্টহাসি হাসতে থাকে। তখন সৃষ্টি হয় প্রবল আতঙ্কের। সেই আতঙ্ককে লাভক্রাফট উপস্থাপিত করলেন ঘাড়ে কাঁটা দেওয়া মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের রূপে। নেক্রোনমিকনের পাঠক সেই মৃত্যুর অতীত সর্বশক্তিমানের পূজারী হয়ে উঠতে উঠতে কি নিজেই সেই ‘কসমিক’ মহাভয়ংকরের অংশে পরিণত হয়? লাভক্রাফট তাই বলেন। তবে তাদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কী? উপায় নেই… নেই।
লাভক্রাফটিয়ান হরর বা কসমিক হররের মূল চরিত্র হল এই। পরবর্তীতে যে ভিন্ন জগতের প্রাণীর পৃথিবী আক্রমণ হরর সাহিত্যের এক অতি জনপ্রিয় বিষয় হয়ে উঠেছিল, তার একটা উৎস যে এই ভিনব্রহ্মাণ্ডের আতঙ্ক বা ‘কসমিক হরর’, এমনটা বলা যায়। ধ্রুপদি সাহিত্য-সংস্কৃতির ভক্ত লাভক্রাফটের ভয়ের চড়াই ভাঙার ভাষায় সেই ধ্রুপদি প্রভাব স্পষ্ট। তাঁর ‘ডাগন’ (১৯১৯), ‘দ্য কল অফ থুলু’ (১৯২৮), ‘দ্য ডানউইচ হরর’ (১৯২৯), ‘দ্য শ্যাডো ওভার ইন্সমাউথ’ (১৯৩৬), ‘দ্য কেস অফ চার্লস ডেক্সটার হাওয়ার্ড’ (১৯৪১) প্রভৃতি প্রায় সত্তরটি গল্প-উপন্যাসের প্রত্যেকটিই অনন্য। লাভক্রাফটকে অনুসরণ করে এই ‘কসমিক’ হরর তাঁর পরে অনেকে (যেমন ক্লার্ক অ্যাশটন স্মিথ, রবার্ট ই হাওয়ার্ড, অগাস্ট ডেরলেথ, ফ্রিৎস লাইবার, রবার্ট ব্লক প্রমুখ) লিখতে চেয়েছেন, কিন্তু তাঁর উচ্চতায় কেউই নিয়ে যেতে পারেননি। বাংলাতে নিখাদ লাভক্রাফটীয় ঘরানার হরর লেখা হয়নি বললেই চলে, যদিও একাধিক লেখকের একাধিক লেখায় সেই ছাপ পড়েছে। যেমন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বন্ধ দরজার ওপারে’ কিংবা অদ্রীশ বর্ধনের ‘আদিম আতঙ্ক’। কৌশিক মজুমদারের ‘আতঙ্ক’ বা ‘জুজুমা’ সেখানে এই কসমিক হররের ছক মেনে চলেছে প্রায় নব্বই শতাংশ। এই গল্পদুটি ইতিমধ্যেই জনপ্রিয় অডিও স্টোরি প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত হয়েছে। ‘আতঙ্ক’ গল্পে লেখক লাফক্রাফটের ইংরেজি ধ্বনিগাম্ভীর্যের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে সাধুভাষার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। তারপর যে বইটির সামনে কথক উপস্থিত হন সেটি যে নেক্রোনমিকনই তা লাভক্রাফটিয়ান হররের সঙ্গে সামান্য পরিচিত যে-কোনও পাঠকই বুঝতে পারবেন। ‘জুজুমা’ গল্পে লাভক্রাফটের আদিম ভয়ংকর দেবতা থুলু-ডাগনের জায়গা নিয়েছে ভারতীয় মূলনিবাসী জনবিশ্বাসের দেবতা জুজুমা, যিনি নাকি বৃদ্ধ ঠাকুরদা, যিনি প্রতিশোধ নেন। তাঁর আবির্ভাবও ঘটে দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে, লাভক্রাফটেরই লেখার ঢঙে। এমনকি জুজুমার বর্ণনাও লাভক্রাফটের দৈবী-দানব থুলুকে মনে পড়িয়ে দেয়।
কিন্তু ভুল করবেন না, কৌশিক মজুমদার স্বদেশের কুকুর ফেলে বিদেশের ঠাকুরকে মাথায় তুলে নেননি আদৌ। বরং ‘আতঙ্ক সমগ্র’-এর যে বৈশিষ্ট্যটি সবথেকে বেশি আমার নজর কেড়েছে তা হল পাশ্চাত্য আর ভারতীয় গল্প বলার ধারার মেলবন্ধনের একটা প্রচেষ্টা। লেখকের কলম যেমন আধুনিক এক্সপেরিমেন্টাল হররের (উত্তর— ১৯২০/৩০ হরর সাহিত্যের ধারা অনেকটাই মার্কিন প্রভাবান্বিত) কাছে ঋণ স্বীকার করেছে, তেমনই একাধিকবার আপন করে নিয়েছে খাঁটি ইংরেজ ভয়-রহস্য গল্পের অন্ধকার পরিমণ্ডল নির্মাণের আদি ধ্রুপদি শৈলীকে। আর এই ‘ব্যাক টু দ্য বেসিক্স’-এ যাওয়ার সময়ই তিনি বাংলার ভূতের গল্পের মাটির গন্ধকেও নিজের কাজে লাগিয়েছেন। ‘শল্পের নাভি’ গল্পের শেষে ‘লেখকের জবানি’-তে তিনি ঠিক এই কথাটা জানিয়েওছেন। তন্ত্রের আবছায়া গলিগালায় প্রবেশ না করেও যে নিটোল ভয়ের গল্প লেখা যায়, তা এই তন্ত্রসর্বস্ব ভয়বাজারের বুকে দাঁড়িয়ে তিনি এই গল্প দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছেন। বাংলার অলৌকিক কাহিনি-ঐতিহ্যের অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে আমাদের লোককথার ভূতপ্রেতেরা। ‘রিয়ালিস্টিক হরর’-এর দাবির এই যুগে যখন ভয়ের গল্প মানেই অ্যাড্রিনালিনে চোবানো রগরগে শিহরনের নামান্তর হয়ে উঠছে, তখন ব্ৰহ্মদৈত্য-শাঁখচুন্নি-পেতনি-ভুলো-একানড়েরা নেহাতই ‘গ্রাম্য’, ‘ছেলেভুলোনো’ মিথের তকমা পেয়ে পিছু হঠছে। তাদের দোষ হয়তো তাদের কাহিনিগুলির গঠনগত সারল্য। কিন্তু কৌশিক মজুমদার তাদেরও এনে ফেলেছেন হাড়- হিম করা বাস্তবোচিত ভয়ের পটভূমিকায়, আর তার ফল যে হয়েছে চমকপ্রদ তা ‘পেডিকিওর’, ‘অপদেবতা’, ‘একানড়ে’ গল্পগুলো পড়লেই বোঝা যাবে। এই নিরিখে ভীষণভাবে মন কাড়ে ‘প্রেতিনী’। এই গল্পের শিরদাঁড়াস্বরূপ বাংলার নিজস্ব আদিম ‘র’ ভৌতিকতাকে যোগ্য পূর্ণ রূপ দিয়েছে ভিক্টোরিয়ান আবহনির্মাণ, এবং শেষের টুইস্টটি একেবারেই আধুনিক সাইকোলজিকাল হররের মোক্ষম টাচ যা পাঠককে ভাবতে বাধ্য করবে সত্যিই কি যা বলা হচ্ছে সেটাই সত্যি? এবং এই বিভাগের সেরা কাহিনি নিঃসন্দেহে ‘মনা’। তন্ত্র-মন্ত্র-মারণ- উচাটন কি সত্যিই হয়? কোনও দিন ছিল? থাকলেও এই একবিংশ শতাব্দীতে কি তার কোনও জায়গা আছে? যারা এসবের চর্চা করে বলে শোনা যায় তারা কি খাঁটি লোক, নাকি ভাঁওতাবাজ অথবা পাগল? এইসব প্রশ্নের কংক্রিট উত্তর খোঁজা বৃথা। শুধু যা জেগে থাকে তা হল ‘হলেও হতে পারে’-সঞ্জাত ভয়। আর সে ভয় তীব্রতর হয় যখন তেমন আধিদৈবিক, অতিলৌকিক, অদ্ভুতুড়ে কার্যকলাপের রঙ্গমঞ্চ হয়ে দাঁড়ায় আমার-আপনারই পাশের বাড়ি, কুশীলব আমার-আপনারই প্রতিবেশী— এমনকি কখনও কখনও আপনি নিজেও। তখন সেই অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে তীব্রতম ভয়ের, যে ভয়ের স্বাদ দেয় ‘মনা’।
বলতে গেলে প্রায় সব গল্পের কথাই বলতে হয় আলাদা করে। ‘স্ন্যাপচ্যাট’ গল্পে অন্ধকারের থিম ব্যবহৃত হচ্ছে কনেবউয়ের সিঁথিতে সিঁদুরের রেখার মতো- এক লাইনে গোটা গল্পটার ভোল পালটে দিতে। এই গল্পটিকে স্পেকুলেটিভ ফিকশনের চেয়েও বেশি আমি উচ্চমানের সামাজিক গল্পই বলব। ‘রৌরবকাল’ মূলত কল্পবিজ্ঞান হলেও, এক অনাগত ভবিষ্যতের ছবি আমাদের হাড় হিম করে দেয়। কেবলমাত্র মৌলিক গল্পই নয়, অনুবাদের ক্ষেত্রেও তিনি অসাধারণ সাবলীল। আধুনিক বাঙালির পরিচিত ঝরঝরে বাংলা ভাষায় তিনি তাঁর গল্পের প্ল্যানচেট টেবিলে ডেকে এনেছেন নিল গেইম্যান, জোসেফ কনরাডের আত্মাকে। ‘কেউ কোত্থাও নেই’ গল্প যে আসলে রে ব্র্যাডবেরির ‘দ্য হোল টাউন ইজ স্লিপিং গল্পকে ‘হিন্দের বন্দি’ (নারায়ণ সান্যালের কাছে ঋণ স্বীকার করি) তথা ‘বাংলার বন্দি’ করা, তা গল্প শেষ করে অনুবাদকের জবানি পর্যন্ত যাওয়ার আগে বোঝাই যায় না। একে নিছক অনুবাদ বলতে আমি রাজি নই। মার্কিন স্মল টাউন কৌশিক মজুমদারের কলমের গুণে আত্তীকৃত হয়ে রূপ নিয়েছে কলকাতার কাছ-বরাবর অশোকনগরের। সত্যি বলতে কী, ইংরেজি হরর সাহিত্যের অন্যতম পটভূমি যে মফস্সলের ছোটো শহর বা ‘স্মল টাউন’, তা যেন কৌশিক মজুমদারের বিভিন্ন গল্পে বারবার ফুটে উঠেছে। কখনও তা কালিম্পংয়ের মতো শৈলশহর, কখনও মেদিনীপুরের মতো জেলাসদর, কখনও বা তাঁর নিজের বাসভূমি উত্তর চব্বিশ পরগনার অশোকনগর।
প্রতিটা কাহিনির গল্প বা উপন্যাস বা বই ‘হয়ে ওঠার’ একটা কাহিনি থাকে। সেটা লেখকের একান্ত আপন। সচরাচর লেখক সেই ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলো কারও সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান না, কিন্তু সেগুলো জানতে পারলে পাঠকের কাহিনিপাঠের আনন্দ কয়েকশো গুণ বেড়ে যায়। এখানে কৌশিক মজুমদার প্রতিটি গল্পের শেষে ‘লেখকের/অনুবাদকের জবানি’-তে সেটা করেছেন এবং তাতে বইয়ের গুণমান বেড়েছে বই কমেনি।
কৌশিক মজুমদার বিখ্যাত প্রাবন্ধিক এবং ঔপন্যাসিক। কিন্তু উপন্যাসের থেকেও ছোটোগল্প বোধহয় একজন কাহিনিকারের কাছের দুরূহতর পরীক্ষার জায়গা, কারণ অল্প পরিসরে নিপুণ মুনশিয়ানায় কাহিনির সবটুকু রস সুচারুভাবে পরিবেশন করতে হয়। ম্যাসন সিরিজ বা তারিণীচরণের মতো রহস্য কাহিনি, ‘হোমসনামা’, ‘তোপসের নোটবুক’-এর মতো সিউডোগ্রাফি হোক কিংবা ‘নোলা’- ‘কুড়িয়ে বাড়িয়ে’-র মতো নন-ফিকশন, কৌশিক মজুমদার যে গল্প বলতে পারেন এবং তার থেকেও বড়ো কথা গল্প বলতে দারুশ ভালোবাসেন, সেটা বারবার প্রমাণ হয়েছে। ‘আঁধার আখ্যান’-এ তাঁর ছোটোগল্পকার রূপের উদযাপনের শুরু হয়েছিল, ‘গপ্পো মীরের ঠেক’-এ সেই উদ্যাপন রীতিমতো উৎসবে পরিণত হয়েছে। এখন পাঠক, সেই উৎসবের তারাবাজি, রংমশাল, তুবড়ি যা-ই বলতে চান না কেন, ভুলে দেওয়া হল আপনারই হাতে। তবে আর দেরি না করে জ্বালিয়ে ফেলুন। দেখুন সেই আলোয় আতঙ্কের আঁধার ফিকে হয়, না আরও গাঢ় হয়ে আসে।
রাজর্ষি গুপ্ত
ভূত চতুর্দশী, 2025
.
রাত নিস্তব্ধ। বইয়ের একেবারে শেষপাতায় এসে গেছি। সাদা পৃষ্ঠাখানা বিরাট এক ক্ষারীয় প্রান্তরের মত আমার সামনে বিস্তৃত। ভাবছিলাম, যাক, এবারের মত আমার গল্প বলা শেষ হল। কে যেন কানের সামনে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল “না, এখনই নয়”। চমকে উঠে আমি আয়নার দিকে তাকালাম আর দেখলাম, আমার বলা সব গল্পের চরিত্ররা এখন আমার ভিতরেই বাস করছে। তারা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে, অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করছে আবার ডুকরে কেঁদে উঠছে অকারণে।
আর সেই আয়নায় আগুনের হরফে লেখা
‘এবার পরের গল্প শুরু।’
