মনা – কৌশিক মজুমদার
মনা
এক অদ্ভুত যুগসন্ধিক্ষণে বেড়ে ওঠা আমাদের। নব্বইয়ের দশক। বার্লিনের প্রাচীর ভেঙে পড়েছে সদ্য। ভাঙছে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। অ্যান্টেনাবাঁধা টিভিতে দূরদর্শনে ছুটি ছুটি, হরেকরকম্বা, চিচিং ফাঁক আর আবার যখের ধন সিরিয়াল। দুপুরের রোদটা একটু মিহিমতো হয়ে এলেই মাঠের ধারে কাশফুল। ভোরের দিকে হালকা একটা শিরশিরানি। পালবাবুর আটচালাতে মূর্তিতে রং ধরানো প্ৰায় শেষ। চক্ষুদান এখনও বাকি। পুজোতে আনন্দমেলায় শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজ, প্রফেসর শঙ্কুর অভিযান আর শারদীয়া দেশ-এ ফেলুদার অ্যাডভেঞ্চার। মোবাইল, ইন্টারনেটহীন সেই অলীক দিনগুলোতে আমাদের মফস্সল শহরতলি বেঁচে থাকত পাড়া কালচারে। বিকেল হতে না হতে কাছের মানুষরা আরও বেঁধে বেঁধে থাকতে দুই-তিন বাড়ি মিলে এক বাড়ির উঠোনে গল্পে মেতে উঠতেন। পাড়ার ক্লাব, পাড়ার পুজো, পাড়ায় পাড়ায় বিচিত্রানুষ্ঠান।
আমাদের পাড়ায় কিশোরদের জন্য একখানা সায়েন্স ক্লাব ছিল। ক্লাস টুয়েলভে থাকতেই আমি সেই ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছিলাম। বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে ভূত-প্রেত আর অলৌকিকের বিরুদ্ধে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রচার করতাম। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অভিনীত হত আমাদের পথনাটিকা। তাতেও আমিই পরিচালক। ফলে কোনও দিন ভূতে তো বিশ্বাস করতামই না, অলৌকিকেও না। আমাদের সামনে ভুলক্রমে কেউ ভূতের কথা ওঠালেই আমি আর আমার বন্ধু চাঁদ, রূপম, বুবান মিলে তার পিছনে বেদম লাগতাম।
আর এই সবই ঘটেছিল মনারা আমাদের পাড়ায় আসার আগে।
সেই অপার্থিব ঘটনার বিশ বছর পরে আজও আমি রোজ রাতে আলো জ্বেলে ঘুমাই। তবু আমার মনে হয় দেওয়ালের অন্ধকার কোণগুলো থেকে কে যেন স্থির তাকিয়ে আছে আমার দিকে। নিষ্পলক, নিষ্কম্প। ঘরে একা থাকলে একবারে ঘাড়ের কাছে বয়ে যায় ঠান্ডা নিঃশ্বাস। মেরুদণ্ড থেকে শিরশিরে এক অনুভূতি ছড়িয়ে যায় গোটা দেহে। খুব চেনা এক ফিসফিসে কণ্ঠ যেন কানের খুব কাছে এসে বিড়বিড় করতে থাকে।
সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সঙ্গে যারা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল, তাদের মধ্যে যাঁরা সেদিন শ্মশানে উপস্থিত ছিলেন, সবাই ঘটনার বছর ঘুরতে না ঘুরতেই মারা গেছেন। মানে আমার জেঠু, বুবানের বাবা আর নীলুকাকু। প্রথম দুইজন আচমকা স্ট্রোকে আর নীলুকাকু গাড়ি চাপা পড়ে। আমার মতো যারা বেঁচে আছে, তারা কেউই আর ওই ঘটনার কথা আলোচনা করে না। প্রসঙ্গ উঠলেই এড়িয়ে যায়। এক অভিশপ্ত ইতিহাসের মতো, কালিমাখা অধ্যায়ের মতো, আমরা, সেই ঘটনার সাক্ষীরা,
প্রাণপণে চেষ্টা করেছি ওই ক-মাসের স্মৃতিকে কবর দেবার। কিন্তু চাইলেই তো আর সব সত্যিকে কবর দেওয়া যায় না। জানি না আপনাদের সামনে সেই অভিশপ্ত দিনগুলোর অপার্থিব ঘটনাবলি বর্ণনা করলে সেই ছায়া, সেই ফিসফিসে কণ্ঠ আমাকে ছেড়ে যাবে কি না। কিন্তু অন্য কোনও উপায়ও তো নেই…
এ কাহিনি আদৌ কোনও ভূতের গল্প না। তাই ভয়ের গল্পের যে চেনা নাটকীয়তা, যে কাহিনির উত্থানপতন, যে ক্লাইম্যাক্স আপনি আশা করে থাকেন, তা এখানে পাবেন না। গল্পে যেমন, সব প্রশ্নের যুক্তিযুক্ত উত্তর দেওয়া থাকে, এ কাহিনিতে সেটাও নেই। কারণ সঠিক উত্তর আমরা আজও পাইনি। তবে হ্যাঁ, কথা দিচ্ছি আজ আমি যা শোনাব, তা বর্ণে বর্ণে সত্যি। আমি নিশ্চিত জানি, এর এক লাইন মিথ্যে হলে মনা আমাকে ছেড়ে দেবে না। বাকি বিশ্বাস অবিশ্বাসের ভার আপনাদের। শুনুন তবে…
.
॥ ১॥
স্কুল ছেড়ে তখন সবে কলেজে ভরতি হয়েছি। একদিন বিকেলে কলেজ থেকে ফেরার সময় পাড়ার মোড় ঘুরতেই ভিড়টা চোখে পড়ল। প্রথমে ভেবেছিলাম আমাদের বাড়ির সামনে লোক জড়ো হয়েছে। পরে দেখি, না তো! পাশের বাড়িতে। মা গেটের সামনেই মুখে আঁচল চাপা দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। চোখে জল। আমাকে দেখেই ধরা গলায় বলল, “তুই এখন ঘরে ঢুকিস না। ব্যাগটা আমায় দিয়ে আগে বিশুদের বাড়ি যা।’
“কেন? কী হয়েছে?”
“বিশুর বাবা আজ দুপুরে গলায় দড়ি দিয়েছে। পুলিশ একটু আগে এল। আমি এইমাত্র ওদের বাড়ি থেকে এলাম। এসময় তোর বিশুর পাশে থাকা উচিত।”
বিশু, মানে বিশ্বজিৎ আমাদের পাশের বাড়িতেই থাকে। আমার একেবারে ছোটোবেলার বন্ধু। ওর বাবা মাধবকাকু নানারকম ব্যবসা করতেন। কখনও কাটা কাপড়ের, কখনও গয়নার বাক্স বানানোর, আবার কখনও নেহাতই মুদির দোকানের। মুশকিল হল কোনওটাই তেমন চলেনি। ভদ্রলোক ইদানীং সর্বদাই বেশ চিন্তিত থাকতেন, বিশেষ করে বিশু উচ্চমাধ্যমিক পাশের পর। গালভর্তি দাড়ি, উশকোখুশকো চুল নিয়ে পাগল পাগল হয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতেন। চেনা লোকেদের কাছে টাকাও ধার চাইতেন। আমার বাবাও শুনেছি কিছু টাকা দিয়েছিলেন। জেঠুও। কিন্তু সেই টাকা ফেরত দেবার সাধ্য মাধবকাকুর ছিল না। ফলে যা হয় আর কি, সবাই কাকুকে টাকা ধার দেওয়া বন্ধ করেছিল। ওঁকে দেখলেই পাড়ায় সবাই না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে চলে যেত। তবে কি সেইজন্যেই…
বিশুদের বাড়ির সামনে গিয়ে দেখি মেলা লোকের ভিড়। পুলিশের গাড়ি, মড়া নেবার ভ্যান আর জনাকয় ডান্ডা হাতে পুলিশ এদিক ওদিক দাঁড়িয়ে। পাড়ার সবাই বেশ কয়েকটা ছোটো ছোটো দলে ভাগ হয়ে গুনগুন করে আলোচনা করছে। আমার বন্ধুদের কয়েকজনকেও সেই ভিড়ে দেখলাম। আমাকে দেখতে পেয়েই বুবান এগিয়ে এসে চাপা গলায় বলল, “এসেছিস? এদিকে তো…”
“বিশুর কী খবর রে?”
“ওই তো ওদিকে আছে। আমাদেরই সঙ্গে।”
“ঠিক আছে?”
“শুরুতে খুব কান্নাকাটি করছিল। এখন অনেকটা নর্মাল। কিন্তু কাকিমা…”
“কাকিমার আবার কী হল?”
“কাকিমা কেমন একটা হয়ে গেছে, জানিস!” ফিসফিস করে বলল বুবান। “একটুও কাঁদছে না। শুধু বলছে, ‘ওর কিচ্ছু হয়নি। অনেকদিন ঘুমায়নি তো, তাই ঘুমাচ্ছে। তোমরা ওকে বিরক্ত কোরো না।’ তুই যাবি নাকি ওদিকে? আমার মা আর মনা কাকি আছে ওর সঙ্গে।
“না থাক। বরং বিশুর কাছে চল। কিন্তু আচমকা এসব হলই বা কী করে?”
গলা আরও খাদে নামিয়ে বুবান বলল, “আরে আর বলিস কেন? তুই তো গুপীকাকাকে চিনিস, কেমন লোক। এমনিতেই ওয়ান পাইস ফাদার মাদার। তার উপর ইদানীং আবার শাসক দলের বড়ো নেতা হয়ে মাটিতে পা পড়ে না। মাধবকাকু নাকি ব্যবসা করবে বলে, গুপীকাকার থেকে বেশ কিছু টাকা সুদে ধার নিয়েছিল। তারপর তো বুঝিসই… সে টাকা আর শোধ দিতে পারে না। গুপীকাকা নাকি মাসখানেক ধরে সুদসহ টাকা ফেরত দেবার জন্য খুব চাপ দিচ্ছিল। কাকু বলেছিল কিস্তিতে কিস্তিতে মিটিয়ে দেবে। সে আবার তাতে রাজি না। যাই হোক, পরশুদিন গুপীকাকা দলবল নিয়ে বাড়িতে চড়াও হয়েছিল। বিশু তখন বাড়ি ছিল না। কাকুকে ওপীকাকার গুন্ডারা চড় থাপ্পড় মারে। কাকিমা বাধা দিতে গেছিল বলে কাকিমাকেও দু-চার ঘা দেয়। বুঝে দেখ অবস্থা।”
“ওরা পুলিশে জানায়নি?”
“জানিয়েছিল। পুলিশ এফআইআর দূরে থাক, একটা জিডি নিতেও অস্বীকার করে। সেই থেকে কাকু কেমন গুম মেরে গেছিল। আজ দুপুরে কাকিমা স্নান থেকে ফিরে এসে দ্যাখে শোবার ঘরের খাটের উপরে ফ্যানের সঙ্গে কাকিমার শাড়ি পেঁচিয়ে কাকু দুলছে। সে এক বীভৎস দৃশ্য!”
“সুইসাইড নোট?”
“হ্যাঁ। খাটের উপরেই ছিল। তাতে গুপীকাকার নামে দোষারোপ করা। আর শেষে লেখা, ‘আমি শান্তিতে বাঁচতে পারলাম না, আমি কাউকে শান্তিতে থাকতে দেব না’।”
“চল বিশুর সঙ্গে দেখা করে আসি।’
বিশু বাড়ির এক কোণে মাটির উপরে মাথা নিচু করে বসে ছিল। ওকে ঘিরে আমাদের চার-পাঁচজন বন্ধু। আমাকে দেখে মুখ তুলেই নামিয়ে নিল। আমি ওর পাশে বসে পিঠে হাত রাখলাম। বিশুর চোখ জবাফুলের মতো লাল। কান্নাচাপা গলায় বলল, “বাবা একটা দারোয়ানের কাজ পেত সামনের মাসেই। সব কথা হয়ে গেছিল, জানিস। ওরা আর একটা মাস অপেক্ষা করতে পারল না…” বলেই আবার মাথা নিচু করে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল বিশু। আমি আর কীই বা বলি। ওর পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম।
বাইরে একটা ছোট্ট গোলমালের আওয়াজ শুনে উঠে দাঁড়াতেই বুঝলাম এবার ঝামেলা বাধল বলে। গুপীকাকা একটা মোটা ফুলের মালা আর জনাকয়েক সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে মাধবকাকুকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছেন। সামনেই পৌরসভার ভোট। সবাই জানে গুপীকাকা এবার কাউন্সিলরের পদে টিকিট পাবে। গুপীকাকাকে দেখেই বিশু তেড়ে উঠে মারতে যায় আর কি!
“ওই শয়তানটার জন্য বাবার আজকে এই অবস্থা! আর ও এসেছে এখানে নাটক করতে?” চিৎকার করে বলছিল বিশু। পাড়ার অনেকেই ওর সঙ্গে গলা মেলাল।
গুপীকাকার অবশ্য এতে খুব কিছু এসে গেল না। গম্ভীর মুখে মৃতদেহের সামনে এসে মালা দিতে গিয়েও একবার থমকে পার্টির একজনকে প্রায় ধমক দিয়ে বললেন, “কি রে সুমন, ছবি তুলবি না?”
ছবি তোলা হতেই গুপীকাকা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক পুলিশ কনস্টেবলকে প্ৰায় হুকুম করলেন, “এত দেরি করছেন কেন আপনারা? বডি পোস্টমর্টেমে নিয়ে যান।”
সেই পুলিশও বশংবদের মতো আর দুজনকে হেঁকে বলল, “এই তোমরা রেডি হও। এবার বড়ি ওঠাতে হবে।” মাধবকাকুর মাথাভরা জটপাকানো চুল। অযত্নে দেহ কঙ্কালসার। কাকু এমনিতেই বেশ লম্বা ছিল। এখন যেন আরও লম্বা মনে হচ্ছে। গলায় ইংরাজি ভি অক্ষরের মতো একটা কালশিটে দাগ। জিভটা একদিকে অল্প বেরিয়ে রয়েছে। চোখদুটো আধখোলা। সেখান থেকে চোখের যতটুকু সাদা অংশ দেখা যাচ্ছে, তা সাদা নয়, কালচে লাল। গোটা মুখে অদ্ভুত একটা কষ্টের ছাপ
আমি বিশুকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কাকিমা কোথায় রে?”
“মা ভিতরে। ডাকব?”
“ডাকতে তো হবেই। বডি নিয়ে যাচ্ছে। শেষ দেখার একটা ব্যাপার আছে তো।” পাড়ার তিন-চারজন বউ মিলে ধরাধরি করে কাকিমাকে প্রায় হেঁচড়ে বাইরে নিয়ে এল। কাকিমার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি নেই। কাকুর বডির সামনে একটা বস্তার মতো ধপাস করে এসে পড়ে চুপ করে বসে রইল। চোখে শূন্য দৃষ্টি। খানিক বাদে কাকুর মাথার এলোমেলো চুলগুলোতে আলগোছে হাত বোলাতে লাগল কাকিমা, ঠোঁটে তিরতির করছে একটা হাসি। কাকুর কপাল, গাল, চোয়ালে পরম যত্নে আদর করতে লাগল, যেন সদ্যকিশোরী এক প্রেমিকা। বিশুর দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে বলল, “চিন্তা করিস না বাবু, তোর বাবা কোথাও যায়নি। এখানেই আছে।”
বিশুও বোকার মতো বলল, “কোথায়?’
“ওই যে তোর পিছনে… তাকিয়ে দেখ। বদমাইশটা আমার দিকে চেয়ে চেয়ে হাসছে আবার।”
কাকিমার এই কথায় আমরা সবাই যেন একটু শিউরে উঠলাম।
.
॥২॥
বিশুদের আর আমাদের পাড়ায় থাকা হল না। দুর্গাপুরে ওর দিদার বাড়ি। দিদা একাই থাকেন। সেখানেই চলে গেল ওরা দুজনে। তবে সেদিনের পর কাকিমা আর মানসিকভাবে সুস্থ হননি। প্রায়ই বিড়বিড় করে কাকুর সঙ্গে কথা বলতেন। চলে যাবার আগে একদিন আমি দেখা করতে যাওয়ায়, খানিক একেবারে স্বাভাবিক কথা বলে তারপরেই “তুই বসে তোর কাকুর সঙ্গে গল্প কর। আমি চা বানিয়ে আনছি” বলে উঠে রান্নাঘরে চলে গেলেন। কাকিমা যখন সত্যিই দুই পেয়ালা চা বানিয়ে একটা আমার সামনে আর অন্যটা পাশে রেখে “এই যে, কি গো, খেয়ে নাও। তোমারটা চিনি ছাড়া বানিয়েছি” বললেন, তারপর আমার আর ও বাড়ি যাবার সাহস হয়নি।
বিশুরা পাড়া থেকে চলে গেলেও বিশুদের বাড়িটা বিক্রি হয়নি বহুদিন। একে তো ওই বাড়িতে একজন গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে, তার উপরে আরও একটা ঘটনা কিছুদিনের মধ্যেই ঘটল, যার সঙ্গে মাধবকাকুর মৃত্যুর কোনও যোগ না থাকলেও আমাদের মফস্সল শহরে গুজব রটতে সময় লাগল না। গুপীকাকার মেয়ে শেলি মধ্যমগ্রামের একটা কলেজে বটানি নিয়ে পড়ত। যাতায়াত বনগাঁ লোকালেই। একদিন লেট হওয়ায় রানিং ট্রেনে উঠতে গিয়ে প্ল্যাটফর্মে পা পিছলে ট্রেনের তলায় পড়ে শেলি দু-আধখানা হয়ে গেল। গুপীকাকা একমাত্র মেয়ের এই দশা মেনে নিতে পারেননি। এক হপ্তা যেতে না যেতে গুপীকাকার স্ট্রোক হল। সেই থেকে কথা বন্ধ। একদিকে প্যারালাইসিস। দিনরাত ঘরে শুয়ে অর্থহীন বোবা চিৎকার করে কাঁদেন। পাড়ায় ফিসফাস রটল, এই সবই পাপের ফল। কেউ কেউ এক ধাপ এগিয়ে বলল, “মাধবের আত্মা প্রতিশোধ নিয়েছে।”
মোট কথা বিশুদের বাড়িটা খালিই পড়ে রইল বছর দু-এক। মাঝে একবার এক ভদ্রলোক কিছুদিনের জন্য ভাড়ায় এসেছিলেন। অবিবাহিত। লাইফ ইনসিওরেন্সে চাকরি করেন। দুই হপ্তা যেতে না যেতেই এক বাদলার রাতে আমাদের বাড়ি হন্তদন্ত হয়ে এসে মায়ের হাতে একটা চাবি দিয়ে “বউদি এটা রাখুন তো, আমি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ফিরে আসছি” বলে সেই যে গেলেন, সাতদিন হয়ে গেল আর তাঁর দেখা নেই। শেষে বাবা পুলিশে খবর দিল। পুলিশ এসে দ্যাখে দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। দরজা ভেঙে দেখা গেল সেই ভদ্রলোক বিছানায় মরে পচে গলে পড়ে আছেন। পুলিশ বাবা আর মাকে জেরা করেছিল বহুবার। জেঠু আর আমাকেও। করে কিছু লাভ হয়নি। মায়ের হাতের সেই চাবি দিয়ে ঘরের কিছুই যখন খোলা গেল না, পুলিশ গোটা ব্যাপারটাই মায়ের চোখের ভুল বলে চালিয়ে দিল। পরে শুনলাম ভদ্রলোকের নাকি হার্ট ফেলিওরে মৃত্যু ঘটেছে। আত্মহত্যা বা খুন না।
এই ঘটনার পর পাড়ায় আর কারও কোনও সন্দেহই রইল না। আমার পাশের বাড়িটা অফিশিয়ালি ভূতের বাড়ি তকমা পেল। এমনকি এও দেখেছি, পাড়ায় কেউ বেড়াতে এলে তাঁদের এই বাড়ির সামনে এনে দেখানো হত। অনেকে দাঁড়িয়ে বাড়ির ছবিও তুলতেন। কেউ কেউ মাকে সামনে পেলে জিজ্ঞেস করতেন, “দিদি, কিছু মনে করবেন না, এ বাড়ি থেকে রাতের বেলা কোনও আওয়াজ- টাওয়াজ শোনেন?” মা যখন জানাত, কিছুই শোনা যায় না, তখন তাঁদের চোখেমুখে স্পষ্ট হতাশার ছাপ আমি নিজের চোখে দেখেছি।
এদিকে বিশুদের গোটা বাড়ি জংলা আগাছায় ভরে যেতে লাগল। ভূতের ভয় না থাকলেও সাপের ভয় ছিল পুরোদমে। আমি ওই বাড়িতে দুইদিন দুটো কালাচ সাপ দেখেছিলাম। বারবার পৌরসভাতে জানালেও তারা বাড়ির ভিতরটা পরিষ্কার করতে রাজি ছিল না কোনওমতেই। একসময় এমন হল, বিশুদের বিরাট দোতলা বাড়িটা অন্ধকারে দেখলে অতিকায় এক ভয়ানক দানবের মতো দেখতে লাগত। তখন লোডশেডিং-এর বাড়বাড়ন্ত ছিল প্রচুর। আর আলো থাকলেও ল্যাম্পপোস্টের বাঘের মৃদু হলুদ আলো রাস্তার সামান্যই আলোকিত করতে পারত। ফলে পাড়ার অনেকেই রাতের বেলা বিশুদের বাড়ির সামনে দিয়ে যেত না। প্রায় আধা কিলোমিটার ঘুরে বুবানদের বাড়ি আর মজা ডোবাটার ধার দিয়ে ঘুরে যেত। দুই বছর এমনই চলল। সবাই ভেবেছিল এভাবেই চলবে। কিন্তু তারপরেই মনারা আমাদের পাড়ায় এল।
.
॥৩॥
আমার তখন কলেজের লাস্ট ইয়ার, একদিন দেখলাম একদল মুনিশ নিলে বিশুদের বাড়ির ঝোপজঙ্গল পরিষ্কার করছে। তাদের কাছে জিজ্ঞেস করে বিশেষ কিছু জানতে পারা গেল না। এটুকু শুধু বুঝলাম বিশুদের বাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে। কবে এসব হল, কী করেই বা হল, কারাই বা কিনল, সব নিয়ে পাড়ায় অনেকদিন পর বেশ একটা সাড়া পড়ে গেল। চাঁদের মা তো বলেই দিল, “যে কিনছে, কিছু না জেনেই কিনছে নিশ্চয়ই। জেনেশুনে এমন ভূতুড়ে বাড়ি কে নেবে? নিচ্ছে নিক, তবে বেশিদিন টিকবে না এই বলে দিলাম।
শুনেই রমা কাকিমা প্রায় এক সুরে বলে উঠল, “আমাদের টিনার বাবা একদিন আমাকে বলে কী, চলো না বাড়িটা তো পড়েই আছে। আমরাই কিনে নিই বরং। পরে অন্য কাউকে বেচে দিয়ে বেশ কিছু কামানো যাবে। আমি বললাম, রক্ষে করো। শান্তিতে আছি, তোমার পোষাচ্ছে না, তাই না? ওই মাধবের ভূত ঘাড়ে চেপে ধরলে কী হবে বুঝেছ? বেঁচে থাকতেই রোজ একবার করে আসত আর টাকা চাইত। মরার পর কী রূপ নিয়েছে কে জানে। দুগগা, দুগগা” বলে কপালে তিনবার জোড়হাত ঠেকাল কাকিমা।
তারপর বেশ কয়েকদিন কেটে গেলেও বাড়ির নতুন মালিকদের কাউকে আসতে দেখলাম না। প্রথমে একটা “কবে আসে, কবে আসে” ভাব পাড়ার সবার মধ্যেই ছিল। এক সপ্তাহের মধ্যে সেটাও মরে গেল। অনেকে তো ধরেই নিল, বাড়ি কিনেছে ঠিকই, কিন্তু থাকবে না। পরে এইখানে ফ্ল্যাটবাড়ি হবে। কিন্তু আমরা ভুল ভেবেছিলাম।
আমার আজও সেই দিনটা খুব ভালো মনে আছে। সারাটা দিন গরম বাতাস বইছিল হু-হু করে। ভয়ানক তাপপ্রবাহ। জানলা-দরজা বন্ধ করেও ফাঁকফোকর দিয়ে গরম হাওয়া যেন গলন্ত লাভার মতো ঘরের ভিতরে ঢুকে জিভ-তালু শুকিয়ে দিচ্ছিল একেবারে। বিকেল চারটে সাড়ে চারটে নাগাদ রোদের হামালটা একটু কমল। দীর্ঘ ছায়ার মতো কালো কুচকুচে সর্বনাশী এক মেঘে ঢেকে গেল গোটা আকাশ। আর তার খানিকক্ষণ বাদেই ঝড়টা উঠল। বাইরের শুকোতে দেওয়া কাপড়গুলি জোরে জোরে দুলতে লাগল পাখার মতো। খালি তারগুলোতে অদ্ভুত এক ঝন্ঝনে শব্দ। নারকেল গাছের মাথায় মাথায় বাতাসের লুটোপুটি। বৃষ্টি নামল বলে। আর ঠিক তখনই, আচমকা পাশের বাড়ির দোতলার জানলার দিকে চোখ পড়ল। জানলাটা খোলা। ভাবলাম হাওয়ায় খুলে গেছে। তারপর দেখি ঘরের ভেতরে একটা ছায়া নড়ে উঠল যেন। প্রথমে ভেবেছিলাম বাতাসে পর্দা উড়ছে, কিন্তু না। একটা স্পষ্ট নারীমূর্তি। পরনে একটা পাতলা হাতকাটা ম্যাক্সি। রোগা কাঠির মতো চেহারা, কুচকুচে কালো গায়ের রং, দুই গাল ভেঙে ভিতরে ঢুকে গেছে, হনু বাইরের দিকে বার করা। লম্বা, জটপাকানো কাঁচাপাকা এলোমেলো চুল, রক্তহীন ফ্যাকাশে মুখ, আর চোখ… এমন জ্বলজ্বলে চোখ আমি আগে কারও দেখিনি। সেই মহিলা আঁকশির মতো আঙুলগুলো দিয়ে জানলার শিক ধরে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে অবিচলভাবে। মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই। শরীরটা হিম হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে রান্নাঘরে গিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, “পাশের বাড়িতে কারা এসেছে মা?”
শুনে মা-ও অবাক। “কী বলিস! কখন এল? টের পেলাম না তো! দাঁড়া রমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করি।” রমা কাকিমা জানাল, “সে কী দিদি, তোমরা জানো না? আসলে রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো কি না! কাল অনেক রাতে ওই বাড়িতে লোক এসেছে। তোমার দেওর একবার ঢুঁ মেরে এসে আমায় বলল খুব সম্ভব দুইজনের পরিবার। একটা থুড়থুড়ে বুড়ি, আর অন্যজন বোধহয় তার আইবুড়ো মেয়ে। অত রাত বলে আমি আর যাইনি। দেখি একবার যেতে হবে। হাজার হোক নতুন প্রতিবেশী বলে কথা।”
“বুঝেছি। কিন্তু অত রাতের বেলায় চোরের মতো ঢোকার কী আছে? কে জানে বাবা!”
“হয়তো অনেক দূরে থাকে। আসতে আসতে লেট হয়েছে। একদিন গিয়ে দুটো কথা বললেই সব জানা যাবে। তুমিও যেয়ো নাহয় আমার সঙ্গে।”
কিন্তু দিনকয়েক যেতেই বোঝা গেল, আমাদের পাশের বাড়ির দুই মহিলা পাড়ার কারও সঙ্গে মেলামেশায় একেবারেই আগ্রহী নন। দিনের বেশিরভাগ সময় তাঁদের দরজা জানলা বন্ধই থাকে। সারাদিন মেন গেট বাইরে থেকে তালাবন্ধ। প্রতিদিন নিয়ম করে ঠিক রাত এগারোটায় একজন লোক বাইক চালিয়ে ওদের বাড়ির সামনে আসে। লোকটার দুই হাতে দুটো চটের বিগশপার ধরনের ব্যাগ। লোকটা মেন গেটের চাবি খুলে সোজা ভিতরে ঢুকে যায়। খানিক বাদে আবার সেই দুটো ব্যাগ নিয়েই বেরিয়ে আসে। কিছুদিন এমন চলার পর আমাদের পাড়ার নীলুকাকু লোকটাকে পাকড়াও করল।
“ও ভাই, শোনো শোনো। তুমি কে? নাম কী? রোজ এই বাড়িতে আসই বা কেন? আর এই ব্যাগগুলোতে কী আছে?”
নীলুকাকু আগে আর্মিতে ছিল। এখনও বেশ গাঁট্টাগোট্টা চেহারা। কাকুকে দেখে আর এত প্রশ্ন শুনে লোকটা বেশ ভয়ই পেয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল, “আমি কিছু জানি না বাবু। আমি তো হোটেলে কাজ করি।
“কোন হোটেল?”
“ওই স্টেশনের ধারে প্রশান্তদার হোটেল আছে না, সেখানে।
চারিদিকে ছোটোমতো একটা ভিড় জমে গেছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ লোকটাকে চিনতেও পারল।
“আরে তুই গোপাল না? তুই এই বাড়িতে কী করিস?” একজন বলে উঠল।
“খাবার দিতে আসি। মালিকের সঙ্গে এই বাড়ির লোকেদের মাসকাবারি চুক্তি আছে। রাতের বেলা এসে খাবার দিয়ে যাই, পরের দিন আবার আগের দিনের বাসন নিয়ে নতুন খাবার দিই। হোম ডেলিভারি আর কি।”
“বাড়িতে কে কে আছে রে?” রমা কাকিমা যে কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে কেউ খেয়াল করেনি।
“একজন বুড়ি আর তার আধবুড়ি মেয়ে। কেমন একটা পাগল পাগল ভাব। দরজায় বেল বাজালে হাজারবার প্রশ্ন করে আমি কে। তারপর নিশ্চিন্ত হলে সেই মেয়েটাই দরজা খুলে সিঁড়ি দিয়ে আমাকে দোতলায় নিয়ে যায়। সেখানে ঘরের দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে খাবার নেয় আর আগের দিনের বাসন দেয়।
“তোকে ঘরে ঢুকতে দেয় না?”
“না। আমিই ঢুকি না। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি।”
“কোনও দিন উঁকি দিয়েও দেখিসনি?”
“দেখার কী আছে বাবু? নিচটা তো পুরো খালি। আর উপরের ঘরেও আসবাব বলতে কিছুই তেমন নেই। শুধু দরজা থেকে একটা আয়না দেখতে পাওয়া যায়। সেই আয়নার ভিতর থেকে একদিন বুড়িকে বসে থাকতে দেখেছি। সামনাসামনি দেখিনি কোনও দিন। তবে আজকাল আর ওদিকে তাকাই না, ভয় ভয় করে।’
“কেন?”
“একদিন আমি আয়নায় তাকিয়ে আছি, দেখি বুড়ি কী যেন একটা চেটে চেটে খাচ্ছে। আমি তাকিয়ে আছি দেখে বুড়ি আমার দিকে তাকাল। চোখদুটো সাদাটে। আমাকে দেখেই বুড়ি রেগে গিয়ে ‘কী দেখছিস রে ছোঁড়া? জানিস আমি কে? আর একবার তাকালে চোখ গেলে দেব এই বলে দিলাম’, বলেই হাতের কী একটা ছুড়ে মারল জানি না আর সেটা আমার গায়েও লাগল না, কিন্তু আমার মনে হল এখুনি অজ্ঞান হয়ে যাব। আর ঠিক তখনই তার মেয়ে হাতে তালি দিয়ে ‘হি হি’ করে হাসতে শুরু করল। আমি কোনওমতে ব্যাগ নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলাম। ফিরে প্রশান্তদাকে বললাম, আর ওই বাড়ি যাব না, তো প্রশান্তদা বললে, সব তোর মনের ভ্রম। সেই থেকে আসি, কিন্তু ভিতরে তাকাই না।” এইটুকু বলে গোপালের কী একটা যেন মনে পড়ে গেল কিংবা হয়তো ভাবল অনেক বেশি কথা বলে ফেলেছে।
“আমি যাই বাবু। দেরি হলে প্রশান্তদা আবার রাগারাগি করে।” বলে বাইকে স্টার্ট দিয়ে গোপাল কোনওমতে রেহাই পেল।
এই ঘটনার পর আমাদের পাড়ায় ওই বাড়ি নিয়ে আলোচনা বাড়ল বই কমল না।
.
।।৪।।
মাসখানেক যাবার পর এই বাড়ির লোকজন সম্পর্কে আরও বেশ কিছু তথ্য জোগাড় করা গেল। আমার মা বিশুর মাকে ফোন করে এ কথা ও কথায় জানতে পরল, বাড়িটা ওরা বিশুদের থেকে সরাসরি কেনেনি, কিনেছে কোনও এক দালালের মারফত। ফলে বিশুরাও জানে না এরা কারা। তবে এদের প্রচুর পয়সা আছে এটুকু বোঝা যায়। যে বাড়িতে অপঘাতে মৃত্যু হয়, সেই বাড়ির দাম বেশি হয় না। তবু বিশুর মা নিজেদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অস্বাভাবিকরকম এক দাম হেঁকেছিলেন। ভেবেছিলেন দরাদরি করে কিছুটা কমবেই। এরা তো এককথায় সেই টাকা দিয়েইছেন, সঙ্গে দালালি বাবদ এক্সট্রা কিছু। এইরকম একটা বাড়ি এত টাকা দিয়ে কেনার কী অর্থ তা কারও মাথায় এল না। এটাও জানা গেল ওই বুড়ির মেয়ের ডাকনাম মনা। সেটা আমিই প্রথম জেনেছি। আমি যে ঘরে একলা ঘুমাই, দোতলার সেই ঘরের খাটের ঠিক পাশেই একটা জানলা আছে। জানলাটা সেই বুড়িদের বাড়ির দিকে খোলে। মজার ব্যাপার ঠিক উলটো দিকে ওই বাড়িতেও একখানা জানলা আছে। বিশুরা থাকতে আমি আর বিশু এই জানলার পাশে বসে কত গল্প করেছি। এখন এরা আসার পর চব্বিশ ঘণ্টা সেই জানলা বন্ধ থাকত।
একদিন গভীর রাতে একটা তীব্র আর্তনাদে আমি চমকে জেগে উঠলাম। মনে হল কেউ যেন ভয়ানক যন্ত্রণায় আছাড়িপিছাড়ি করে কাঁদছে। ঠিক আমার খাটের পাশে। তাকিয়ে দেখি ওদের দোতলার জানলাটা খোলা। গোটা ঘর উজ্জ্বল আলোতে মাখামাখি। ঘরের মেঝেতে বুড়ি শুয়ে কাতরাচ্ছে আর তার মেয়ে হাতে একটা চাবুকজাতীয় জিনিস নিয়ে মাকে সপাং সপাং করে পেটাচ্ছে। কারও দেহে একটা সুতো অবধি নেই। বুড়ি মাঝে মাঝেই ফুঁপিয়ে উঠছে আর বলছে, “আমাকে আর মারিস না মনা। আর হবে না। আমাকে ক্ষমা করে দে।” কিন্তু মেয়ে শুনছে না।
আমি তড়াক করে বিছানা থেকে নেমে পাশের ঘর থেকে মাকে ডাকলাম। মা যখন এল ততক্ষণে জানলা বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বুড়ির চাপা গোঙানির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। মা খানিক সেটাই শুনল কান পেতে। তারপর আমায় বলল, “তুই শুয়ে পড়। সকালে কলেজ আছে তো। আমি তোর পাশে শুচ্ছি।”
পরদিন ঘুম থেকে উঠতে দেরি হওয়ায় কলেজ যেতে পারলাম না। তবে শুনলাম মা নাকি পাড়ার লোকদের নিয়ে ওই বাড়ি গেছিল। বুড়ি প্রায় সবাইকে ভাগিয়েই দিয়েছে। বলেছে আমি নাকি স্বপ্ন দেখেছি, কিংবা চোখের ভুল। মা আর ব্যাপারটা আলটায়নি।
“মেয়েটা মনে হয় উন্মাদ। সে যাই হোক, আজ থেকে তুই আমাদের সঙ্গে এ ঘরে শুবি। নয়তো নিচতলায় জেঠুর সঙ্গে ঘুমাবি। তোকে আর এই খাটে শুতে দেব না।” ফরমান দিয়ে দিল মা। জেঠু অবিবাহিত। নিচে একটা ঘরে একাই থাকে। কিন্তু তার নাক ডাকার আওয়াজে সারা পাড়া কাঁপে। এর সঙ্গে ঘুমানো অসম্ভব। আমার ভারী রাগ হল। বেশ জোরেই বললাম, “আশ্চর্য ব্যাপার। কে কী করছে, তার জন্য আমি শাস্তি পাব কেন? এবারে ছাড়ো, পরেরবার এমন হলে আমিই আর এই খাটে শোব না।”
কিন্তু মনে মনে ঠিক করে নিলাম, এরপর যাই হোক না কেন, মাকে আর ডাকা যাবে না।
আমাদের বাড়ির সবাই বেশ তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ি। উঠি খুব ভোরে। একদিন কলেজের একটা অ্যাসাইনমেন্ট করতে গিয়ে বেশ রাত হয়ে গেল। সেই রাতটা আজও ভুলতে পারি না। পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে আকাশে। আলো ঠিকরে পড়ছে আমাদের পুরোনো গলি আর বাড়ির দেওয়ালে। জানলার পর্দার ফাঁক দিয়ে চোখ চলে গেল পাশের বাড়ির দোতলার জানলার দিকে। আজও সেই জানলাটা খোলা। তবে সেদিনের ঝকঝকে আলো নয়, আজ সারা ঘরে মিটমিটে কুয়াশার মতো একটা আলোয় ভরা। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে লাগলাম।
চোখে পড়ল সেই বুড়ি ঘরের একপাশে বসে আছে। শীর্ণ, কুঁজো শরীর। মুখের চামড়া ঝুলে পড়েছে। বুড়ির এক হাতে ধরা একটা কালো হাঁড়ি, আর অন্য হাতে একটা মোটা মোমবাতি। মোমবাতির আলোতেই দেখতে পেলাম বুড়ির দুই চোখে পাতলা সাদা পর্দার মতো ছানিতে গোটা চোখ কেমন এক মণিহীন ভূতুড়ে ভাব নিয়েছে। ঘরের ঠিক মাঝখানে জানলার দিকে মুখ করে মনা বসে আছে। চুল এলোমেলো, শরীর আধভাঙা, গলায় জট বেঁধে থাকা রুদ্রাক্ষের মালা, গায়ে পুরোনো লাল শাড়ি, প্রতিটি আঙুলে লাল সুতো বাঁধা। মনার দুই চোখ বন্ধ। চোখ বন্ধ করেই ধারালো কিছু একটা দিয়ে সে হাতের চামড়া চিরে ফেলল। চেরা হাতে এখন তাজা রক্ত ঝরছে, আর সেই রক্ত সে ঢালছে পিতলের এক ছোটো বাটিতে। সেই বাটির পাশে জ্বলছে পাঁচটি কালো মোমবাতি, যাদের শিখা যেন বাতাস ছাড়াই দুলছে। মনার সামনে একটা পেতলের ঠাকুর, কোনও অজানা দেবতা। এমন বীভৎস মূর্তি আমি আগে কোনও দিন দেখিনি। মনা সেই মূর্তির গায়ে বাটির রক্ত মাখিয়ে দিল। পাশে সেই বুড়ি গলায় এক অদ্ভুত আওয়াজ করছে— না গান, না মন্ত্র, যেন কোনও করুণ আর্তি।
একসময় মনা উঠে দাঁড়াল— মন্ত্র আওড়াতে আওড়াতে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সে কী যেন একটা দেখতে পাচ্ছে, যেটা আমি পাচ্ছিলাম না। মনে হল ওই ঘরের বাতাসে হঠাৎ আরও কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। ঠিক সেই সময় চোখ গেল আয়নার দিকে। আয়নায় মনা আর ওর বুড়ি মা ছাড়া আরও একজনের ছায়া পড়েছে। মনা হাত তুলে সেই অদৃশ্য মানুষটাকে আহ্বান জানাল। তারপর হঠাৎ নিজের মুখে এক চড় মারল, আবার মারল, আবার… যতক্ষণ না ঠোঁট ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। দেখতে পেলাম ঘরের কোণ থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে, ধোঁয়ার ভেতরে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে এক ছায়ামূর্তি। ততক্ষণে মনার চোখ উলটে গেছে, সে চিৎকার করছে, হাসছে, কাঁদছে- সব একসঙ্গে। আর মুখে বলছে “বাবা… বাবা গো… তুমি এসেছ?” আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম ঘরের মাঝে যেন ছায়ার মতো কেউ দাঁড়িয়ে আছে। তার চেহারা অস্পষ্ট, কিন্তু চোখ দুটো যেন জ্বলছিল ধকধক করে! ঠিক এই জায়গায় মনা পাশের ঘরে গিয়ে ছোটো বস্তার মধ্যে করে কী যেন একটা ধরে নিয়ে এল। কোনও জ্যান্ত প্রাণী, কারণ বস্তার ভিতরে সেটা ছটফট করছে। ঘরের ধোঁয়া ততক্ষণে কমে গেছে। মনা জানলার দিকে এগিয়ে আসতেই আমি মাথা নিচু করে শুয়ে পড়লাম। যখন মাথা ওঠালাম, জানলা বন্ধ হয়ে গেছে। আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। দৌড়ে চলে গেলাম মায়ের ঘরে। ঘুমে অচেতন মায়ের পাশে শুয়ে পড়লাম।
সারারাত আমি জেগে ছিলাম। আর কিচ্ছু হয়নি।
.
॥ ৫॥
পরদিন গোটা পাড়ায় হইহই কাণ্ড। রমা কাকিমার পোষা মেনিটাকে পাওয়া যাচ্ছে না। কুচকুচে কালো এই বিড়ালটাকে কাকিমা আদর করে কৃষ্ণকলি বলে ডাকত। সংক্ষেপে কলি। গলায় একটা ছোট্ট পিতলের ঘুঙুর বাঁধা। রোজের মতো গতকাল রাতেও কলি পাড়া চরতে বেরিয়েছিল। আর ফেরেনি। কাকিমারা ভেবেছিলেন সকালেই ফিরে আসবে। কিন্তু দুপুর গড়াতেও যখন সে বিড়াল ফিরল না, তখন কাকিমাকে আটকে রাখা মুশকিল হল। রমা কাকিমা হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন।
“আমারই ভুল হয়েছে। কলিকে আমার ঘরে বেঁধে রাখা উচিত ছিল। কালো বিড়ালের উপরে অনেকের কুনজর থাকে। আমার মেয়েটাকে কে নিয়ে গেল গো… তোমরা একটু দ্যাখো না গো” বলে সবার হাতেপায়ে ধরতে লাগলেন। প্রায় সবাই বুঝল কলি আর ফিরবে না। তবুও “চিন্তা কোরো না, দেখবে নিজে নিজেই ফিরে আসবে” বলে কাকিমাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। আমার গতকাল রাতে দেখা ঘটনাটা বলতে খুব ইচ্ছে করছিল। কিন্তু অকারণে অশান্তি বাড়বে ভেবে চেপে গেলাম।
কলির ঘটনাটা এখানেই থেমে যাবার কথা কথা ছিল। কিন্তু গেল না। এক সপ্তাহ বাদেই আবার পাড়া চঞ্চল হয়ে উঠল। মনাদের বাড়ির ঠিক পিছনেই দাস কাকুদের বাড়ি। বুড়ো বুড়ি দুজনে থাকেন। একমাত্র ছেলে ব্যাঙ্গালোরে। মনারা যখন এ পাড়ায় এল, তখন ওঁরা ছেলের কাছে। বাড়ি ফিরে এসে বাড়ির পিছনের জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে কামলারা একটা বাচ্চা কালো বিড়ালের মৃতদেহ পেল। গোটা দেহ শক্ত কাঠ। গলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে চিরে খুন করেছে কেউ। সেই রক্ত শুকিয়ে লেগে রয়েছে পাশেই পড়ে থাকা একটা পিতলের ঘুঙরুতে। কলিকে যেখানে পাওয়া গেল, ঠিক তার উপরেই মনাদের জানলা। ফলে যা হবার হল। চিৎকার, চেঁচামেচি, অভিসম্পাত… রমা কাকিমা কিছুই বাকি রাখলেন না।
“ওই ডাইনি, ওই রক্তখাগী আমার সোনাকে খুন করেছে। মানুষ না, ওটা সাক্ষাৎ শয়তানের দূত। ওটাকে পাড়া থেকে না তাড়ালে পাড়া ছারখার হয়ে যাবে এই বলে রাখলাম!” মনাদের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলেন রমা কাকিমা। কোনও প্রত্যুত্তর এল না। মনাদের বাড়ির জানলা যেমন বন্ধ ছিল, বন্ধই রইল।
তবে কাকিমার কথা খুব ভুল কিছু ছিল না। ওরা আসার পরেই নানারকম দুর্ঘটনা শুরু হল পাড়ায়। চাঁদের বাবা ছাদ থেকে পড়ে পা ভাঙলেন। নীলুকাকুদের ভাঁড়ার ঘরে আচমকা আগুন লেগে গেল, কিন্তু কেন লাগল বোঝা দায়। আমাদেরই এক বন্ধু অলকেশ আমাদের সঙ্গে জোর আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরে খেয়েদেয়ে কার্টুন নেটওয়ার্ক দেখতে দেখতে গলায় দড়ি দিল। সুইসাইড নোট বলে কিছু ছিল না। শুধু পাশের টেবিলে ওর হোমওয়ার্কের খাতায় বড়ো বড়ো করে লেখা ছিল, “ঘড়ির কাঁটাদুটো উলটো দিকে ঘুরছে কেন?”
সন্ধ্যা নামলেই এই পুরোনো পাড়াটা এক অদ্ভুত বিষণ্নতায় ডুবে যায়। দিনের বেলা মানুষের কোলাহল, হাঁটাচলা, সাইকেলের ঘণ্টির আওয়াজ, ফিরিওয়ালার ডাক মিলিয়ে একধরনের বেঁচে থাকার আওয়াজ থাকে। কিন্তু সূর্য ডোবার পর সব যেন থেমে যায় হঠাৎ। ধুলো ধরা রাস্তাগুলো ফাঁকা হয়ে পড়ে, গলির মোড়ে মোড়ে ঝাপসা হলুদ আলোয় কাঁপতে থাকে সস্তা বাতিগুলো। রাত বাড়লে পাড়াটা যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে থাকে। কী জানি আজকে আবার কী হয়!
কিছুদিন এমন চলার পর পাড়ার লোকে ঠিক করল, এবার এসবের একটা বিহিত করতেই হবে। পাড়াতে থাকবে আর কারও সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখবে না, এ তো হতে পারে না! আর এত লুকোচুরির আছেটাই বা কী? সত্যিই যদি এরা কালা জাদু করে থাকে তাহলে তো গোটা পাড়ার পক্ষে বিপদ। কিন্তু কী করা যেতে পারে? কেউ বলল, “পুলিশে খবর দাও”। কিন্তু শুধু নিজের মতো থাকার অপরাধে পুলিশ কেনই বা ধরতে যাবে? বিড়াল খুনের কথা বলেও লাভ নেই। প্রমাণ নেই যেহেতু। কয়েকজন মাথাগরম ছোকরা বলল “চল, বাড়ির দরজা ভেঙে ঢুকে দেখি কী চলছে!”
নীলুকাকা বললেন, “তাহলে শিওর পুলিশ আসবে। তবে ওদের ধরতে না। তোদের ধরতে। দুইজন মহিলা ওই বাড়িতে থাকে। সেই অর্থে কারও সাতে পাঁচে নেই। কোন অছিলায় ভিতরে ঢুকবি? এটাকে ট্রেসপাসিং বলে, জানিস তো?” ফলে তারাও দমে গেল। আসলে মন থেকে চাইলেও মনাদের কেউ ঠিকঠাক শায়েস্তা করতে পারছিল না।
তবে কথায় বলে ধম্মের কল বাতাসে নড়ে। দুই মাস পেরোতে পারল না। একদিন ঘুম ভাঙতেই শুনি মনাদের বাড়ির সামনে ভয়ানক চেঁচামেচি। এক গম্ভীর পুরুষ কণ্ঠ চিৎকার করে অশ্রাব্য ভাষায় মনাকে গালিগালাজ করছে, আর মনাও তার তীক্ষ্ণ, ধারালো গলায় ততোধিক নোংরা ভাষায় তার উত্তর দিয়ে চলেছে। সেই প্রথম আমি মনার গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম। দেখতে দেখতে ওদের বাড়ির সামনে বেশ বড়ো একটা ভিড় জমা হয়ে গেল। খানিক বাদে যা জানা গেল তাতে সবাই হতবাক! লোকটির নাম সঞ্জীব। বেলঘরিয়ায় বউ নিয়ে বাসা ভাড়া করে থাকে। এদের আসল বাড়ি বর্ধমানের গুসকরায়।
জেঠু আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, “ও ভাই, তুমি এই ভদ্রপাড়ায় এমন গালাগালি করছ কেন?”
আগুনে যেন ঘি পড়ল। “করব না? জানেন, ওই মহিলা আর তার মেয়ে মিলে কী অন্যায়টাই না আমার সঙ্গে করেছে! আপনার সঙ্গে হলে আপনি বুঝতেন।”
“ঠিক আছে, ঠান্ডা হও। চলো আমাদের বাড়ি চলো। সকাল থেকে অনেক চেঁচিয়েছ। আমাদের বাড়ি বসে একটু চা খাও।”
“আমি চা খেতে আসিনি। এসেছি বিচার চাইতে।” গম্ভীর গলায় বলল সঞ্জীব। যদিও গলা তখন অনেকটা খাদে নেমেছে।
“আহা! সেসব তো হবে। আগে আমি শুনি তো, সমস্যাটা কী? আমাদের পাড়া কমিটি আছে। তেমন হলে আমাদের বিধায়ক মশাইও পাশের পাড়াতেই থাকেন। তাঁকেও জানানো যাবে। তুমি চলো তো ভাই আমার সঙ্গে।” বলে সঞ্জীবকে প্রায় জড়িয়ে ধরে জেঠু ঘরে ঢুকেই মাকে বলল, “বউমা, একটু চা জলখাবার করো তো এর জন্যে। সেই কোন সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে কে জানে।”
জেঠু একলা মানুষ। কিন্তু পাড়ার সব কাজে তাকে পাওয়া যায়। পাড়ার সবাই ভালোওবাসে, শ্রদ্ধাও করে। সঞ্জীব ততক্ষণে একেবারে নরম হয়ে এসেছে। জেঠুর একতলার ঘরে বসে গোটা গল্পটাই বলল।
“কী আর বলি দাদা, ঘরের কথা বলতেও কেমন লাগে। আমার বাবা ভোলানাথ ভটচায ওখানের নামকরা তান্ত্রিক ছিলেন। মা আমার ছোটোবেলায় কলেরায় মরে যাবার একমাস যেতে পারল না, বাবা এক মহিলাকে জোগাড় করে আমাদের বাড়িতে এনে ওঠাল। নাম কমলা। সঙ্গে আবার মনা নামের ছোটো একটা মেয়ে। এই মহিলা নাকি বাবার সাধনসঙ্গিনী। সাধনসঙ্গিনী না ছাই… সবই তো বোঝেন। গ্রামের ঘরে ঘরে ফিসফাস উঠলেও কেউ কিছু বলতে সাহস করেনি। সবাই বাবাকে ভয় পেত। ভাবত বাবা মন্ত্র পড়ে ক্ষতি করে দিতে পারে।
মনা ছোটো থেকেই পাগল। পাগল মানে একেবারে উন্মাদ তা না, তবে স্বাভাবিকও না। অকারণ হাসত। পড়াশোনা কিছু করত না। দিনের বেলায় হাঁটতে হাঁটতে কুনুর নদী অবধি চলে যেত কিংবা পোড়ো বটগাছের ধারে বসে কখনও শূন্যে তাকিয়ে, কখনও নিজের সাথে বিড়বিড় করে কথা বলত। যত বড়ো হতে থাকে, মনার এই পাগলামো বেড়েই চলে। খুব বাড়াবাড়ি হলে মাকে পেটায়। জানি না কেন, আমার বাবাকে খুব ভালোবাসত মনা। আর বাবাও ওকে। কথায় কথায় আমাকে বলত, ‘তুই তো আমার থেকে কিছু শিখলি না, আমি যত গুহ্যবিদ্যা মনাকেই শিখিয়ে যাব।’ আমার কোনও দিন ওসবে মতি ছিল না। আমি কোনওমতে দাঁতমুখ চেপে সহ্য করছিলাম। আর তো কোথাও যাবার উপায় নেই।
বিএ পাশ করার পর কলকাতায় এক দোকানে খাতা লেখার কাজ পেলাম। বড়োবাজারে এক মাড়োয়ারি দোকানে কাজ। এখানেই এক মুসলিম মেয়ের সঙ্গে আলাপ। জানতাম ওদের পরিবার মেনে নেবে না। তাই পালিয়ে বিয়ে করে বউকে নিয়ে আবার গুসকরায় ফিরে এসে একটা মুদির দোকান দিলাম। কিছুদিন বাদেই বাবার স্ট্রোক হল। মিথ্যে বলব না, কমলা আর তার মেয়ে বাবার জন্য অনেক করেছিল। কিন্তু বাবা দুদিন বাদেই চলে গেলেন। বাবা চলে যাবার পরেই মনার পাগলামো যেন আরও বেড়ে গেল। বাচ্চা মেয়েদের মতো ওর মায়ের কাছে বায়না ধরত, ‘আমাকে বাবার কাছে নিয়ে চলো। আমি বাবাকে দেখব। আমার বাবার দেখতে খুব ইচ্ছে করছে।’ অবাক কাণ্ড, তার মা-ও সায় দিত, আর কটা দিন যাক। তোর বাবা মুক্তি পাক, তারপর একদিন ডেকে আনব।
আমাদের বাড়ির সামনে বেশ কিছুটা জমি আছে। সেখানেই ছোটো একটা ঘর করে আমি আর আমার বউ হেনা থাকতাম। একদিন বউয়ের এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল। ও তখন দুই মাসের পোয়াতি। সেদিন পূর্ণিমার রাত। আমি মাল আনতে বর্ধমান গেছিলাম। ঘুমোতে ঘুমোতেই হেনার গোটা শরীরে অদ্ভুত অস্বস্তি শুরু হল। বুকের ওপর ভারী চাপ। বাতাস যেন থমকে আছে। শ্বাস নেওয়া দায়।
মনে হল একটা পাশবিক গর্জন ভেসে আসছে কোথা থেকে… তড়াক করে জেগে উঠে জানলা দিয়ে কমলাদের ঘরের দিকে তাকাতেই ভয়ে হেনার শুকিয়ে গেল। উঠোনের এক কোণে ছায়ার ভেতর থেকে একটা কুকুর বেরিয়ে আসছে। প্রায় একটা বাছুরের মত বড়। কুকুরের গলার মতই গরগর আওয়াজ কিন্তু অনেক বেশি ভারী আর কর্কশ। সেই কুকুরের চোখদুটো লাল আগুনের মত জ্বলছে। কুকুরটা এগিয়ে এসে মনাদের ঘরের সামনে দাঁড়ালো। মনা ঘরের ভিতর থেকে একটা থালা হাতে বেরিয়ে এসে থালাটা কুকুরটার সামনে রেখে দিল। সেই কুকুর প্রথমে নাক দিয়ে খাবারের গন্ধ শুঁকল, তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ল খাবার উপরে। কিন্তু সেই খাওয়ার শব্দ কুকুরের নয়, মানুষের দাঁত ঘষার মত কিরকিরে। খাওয়ার মাঝে মাঝে ওটা মাথা তুলে আমাদের ঘরের দিকে তাকাচ্ছিল। আর তখনই হেনা দেখল সেই কুকুরের মুখটা বদলে যাচ্ছে ক্রমাগত। এই মুখ হেনার চেনা। অবিকল যেন আমার বাবা ভোলানাথ ভটচায। থালা থেকে খাবার ছিটকে উঠোনে ছড়িয়ে পড়ায় সেই অদ্ভুত প্রাণীটা জিভ দিয়ে চেটে নিল প্রতিটি দানা। একসময় প্রাণীটা সেই থালা উল্টে দিল, আর দু’হাত…দুটো নখওয়ালা মানুষের হাত দিয়ে ভাতের দলা গুঁজে গুঁজে পুরতে লাগল বুভুক্ষু মুখের ভিতরে। থুতনি থেকে লালা আর ভাত মিশে গড়িয়ে পড়ছিল। হেনা ভয়ে পুতুলের মত স্থির হয়ে গেল। বারবার চাইছিল চিৎকার করতে, পালিয়ে যেতে। কিন্তু কে যেন মন্ত্র পড়ে তাঁকে বোবা বানিয়ে সেখানেই আটকে রেখেছে”।
“তারপর?” জেঠু জিজ্ঞেস করলেন।
“তারপর আর কী! পরদিন সকাল থেকে হেনার ব্লিডিং শুরু হল। আমি ফিরে এসে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। কিন্তু বাচ্চা থাকল না।” ডুকরে কেঁদে উঠল সঞ্জীব। “ডাক্তার বলল আর বাচ্চা আসার সম্ভাবনাও নাকি নেই। হেনার বাচ্চার থলিটা একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। সেইদিনই আমি ঠিক করলাম এইখানে আর না। দোকানটা বেচে দিয়ে সোজা চলে গেলাম বারাসাতে। ওখানেই একটা প্রাইভেট ব্যাংকে গার্ডের কাজ করি। বহুবছর ওদের সঙ্গে সম্পর্ক নেই।”
“তাহলে এরা এখানে আছে খবর পেলে কী করে?”
“পেলাম দিন চারেক আগে। আমাদের গ্রামের শঙ্কর ব্যাংকে এসেছিল। আমায় দেখে তো চমকে গেছে। বলল, “কি রে? বাড়ি বিক্রি হল, তোকে তো দেখলাম না!’ শুনে তো আমি আকাশ থেকে পড়লাম। ও বাড়িতে আমার পুরো হক আছে। আমায় না জানিয়ে বাড়ি বিক্রি হয় কীভাবে? শঙ্কর জানাল ইদানীং নাকি কমলা আর মনার অবস্থা খুব পড়ে গেছিল। তাই বাড়ি জমি সব চড়া দামে বেচে দিয়েছে। আমাদের দেশের বাড়ির পাশ দিয়ে হাইওয়ে হচ্ছে। তাই দাম এখন প্রচুর। পাশের গ্রামের পবন মণ্ডল দালালি করে বাড়ি বিক্রি করিয়েছে। শঙ্করই জানাল ওরা নাকি নতুন বাড়িও কিনেছে, কোথায় তা জানে না। আমি গিয়ে পবনকে ধরলাম। সে তো প্রথমে কিছুই বলে না। শেষে দু-ঘা দিতে এই বাড়ির ঠিকানা বলে দিল।
সঞ্জীব বাড়ি চায় না। সে বাড়ি বেচার টাকার অন্তত অর্ধেক চায়। সে দাবি একেবারেই ভুল না। কিন্তু মনা আর তার মায়ের বক্তব্য, যেহেতু সে কোনও দিন মা-বোনের খবর নেয়নি, তাই একটি পয়সাও তার প্রাপ্য নয়। সবচেয়ে বড়ো কথা এই বাড়ি কিনতে সেই টাকার বেশিরভাগ বেরিয়ে গেছে। দেবার মতো কিছু নেই। সঞ্জীব চাকরি করে, রোজগার আছে। তাদের কোনও রোজগার নেই। ফলে জমানো টাকায় বাকি জীবন চালাতে হবে তাদের।
ব্যাপারটা অনেকদূর গড়াল। প্রথমে পাড়া কমিটি, তারপর পুলিশ, শেষে লোকাল বিধায়ক অবধি এলেন। শেষমেষ ঠিক হল, মনা আর তার মায়ের পক্ষে টাকা যখন দেওয়া সম্ভবই না, আর বাড়ির একতলা খালিই পড়ে আছে, সঞ্জীব আর তার বউ থাকবে একতলায় আর তার মা আর বোন থাকবে দোতলায়। সঞ্জীব প্রথমে একটু গাইগুই করছিল, “আমার অফিস সেই বারাসাত। যাতায়াতে অনেক দূর হয়ে যাবে।” কিন্তু বিধায়ক মশাই এক ধমক দিলেন, “দ্যাখো বাপু, অনেকেই রোজ বনগাঁ লোকালে চেপে সকাল বিকেল ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে। তোমার পোষালে এই ব্যবস্থা মেনে নাও, নয়তো আমার কাছে আর এসো না। দুইজন অসহায় মহিলাকে হ্যারাস করার দায়ে পুলিশ তোমাকেই ধরবে। তখন কী করবে বুঝে নিয়ো।” মনা আর তার মা চুপ করে রইল।
কথায় কাজ হল। দিন সাতেক বাদে বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে সঞ্জীব আর তার বউ হেনা পাড়ায় উপস্থিত। প্রথমদিকে পাড়ার সবাই ভেবেছিল বেশ ভালোই হল। এবার অন্তত কথা বলার লোক পাওয়া যাবে। বাস্তবে দেখা গেল এরা আসায় পাড়ার লাভ হল না ক্ষতি, তা বলা মুশকিল। প্রায় রোজ সকালেই মনা আর তার বউদির মধ্যে বিভিন্ন কারণে ঝগড়া বাধে। হেনা আর মনা দুজনের কেউই মুখখারাপে পিছপা নয়। মাঝে মাঝে আবার তাতে যোগ দেয় মনার মা আর মনার দাদা। প্রতিদিন ভোর না হতেই প্রথমে ঝগড়া, তারপর গালাগাল আর শেবে কান্নার আওয়াজে আমাদের শান্ত পাড়াখানা বেশ গমগমিয়ে উঠল। হেনা প্রায়ই বলত, “পাগলের গুষ্টি, এই পাগলটা মরে না কেন? মরলে শান্তি পাই।” মনা প্রতিবারই উত্তর দিত, “শোন রে হারামজাদি, মরলেও আমি এই বাড়ি ছেড়ে যাব না। এই বাড়ি আমার। এই বাড়ি আমার মা আমার নামে করে দিয়েছে। তোরা জোর করে দখল করেছিস।” এইখানে সঞ্জীবের প্রবেশ ঘটত, “কে বলেছে এটা তোর বাড়ি? আমার বাবার টাকায় কেনা বাড়ি। আমার পুরো হক আছে এ বাড়িতে থাকার। বেরোতে হয় তুই বেরিয়ে যা এখান থেকে…”
সঞ্জীব পাড়ায় আসায় যাঁরা বলেছিলেন, “যাক, এবার এরা শায়েস্তা হল”, তাঁরাও গোপনে ঢোঁক গিলতে বাধ্য হলেন। ঠিক এইরকম শায়েস্তা কেউই চাননি বোধহয়। এমনকি রমা কাকিমাও একদিন হেনার সঙ্গে আলাপ জমাতে গেছিলেন, হেনা পাত্তা দেয়নি। এরা আসলে কেউই বিশেষ সুবিধের নয়, এই ভেবে পাড়ার লোক এদের এড়িয়ে চলতে লাগল। সবাই ভেবেছিল এভাবেই চলে যাবে, কিন্তু আড়ালে যে ভয়ানক এক অন্ধকার ভবিষ্যতের ছায়া গোটা পাড়ার উপরে ঘনিয়ে উঠছিল, তার কণা মাত্র কেউ টের পায়নি।
.
॥ ৬॥
বলতে ভুলে গেছি, মনাদের ঘরে রাতের পুজোটা সেই একদিনের পর আর হতে দেখিনি। তবে হোম ডেলিভারির সেই ছেলেটার আসা যাওয়া বন্ধ হয়নি। তার ওঠানামার জন্য বাইরে থেকে একটা সিঁড়ি বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আগের মতো রাত হলেই সে নিয়ম করে চলে আসে আর ব্যাগ নিয়ে চলে যায়। গভীর রাতে মনা সুর করে কাঁদে, “তোদের সংসার পুড়ে যাক! সুখ ধ্বংস হোক! রক্তে ডুবে মর তোরা!” দাদাকে অভিশাপ দেয়। মাঝে মাঝে জোরে জোরে চিৎকার করে। সেই চিৎকারে পাড়ার কুকুরগুলোও ডাক ছেড়ে হাউমাউ করে ওঠে। আমি জানলা বন্ধ করে রাখলেও সে শব্দ আমার কানের ভিতর দিয়ে ঢুকে আত্মা পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেয়। আমি বালিশ কানে চেপে চুপটি করে শুয়ে থাকি।
যেদিনের ঘটনা বলছি, সেদিন রবিবার। বাড়ির সামনে আমি, রূপম, চাঁদ আর বুবান মিলে ইট পেতে ক্যাম্বিস বল দিয়ে ক্রিকেট খেলছিলাম। হঠাৎ চাঁদ বলে উঠল, “এই, ভালো করে শোন! কে একটা চিৎকার করে কাঁদছে না?” কান পেতে বুঝলাম কথাটা ভুল না। তবে ঠিক কাঁদছে না। প্রাণভয়ে ভয়ানক চিৎকার করছে, “মরে গেলাম! ওফফ জ্বলে গেল! মরে গেলাম! বাঁচাও!” এই গলার আওয়াজ আমি চিনি। মনাদের বাড়ির দিকে তাকাতে দেখি দোতলার পূর্ব দিকের জানালা দিয়ে বেরোচ্ছে লাল-কমলা আগুনের লেলিহান শিখা, আর সঙ্গে ঘন কালো ধোঁয়া ছুটছে আকাশের দিকে। ব্যাটবল ফেলে সবাই ছুটলাম ওদের বাড়িতে। নিচে হেনা বসে বাসন মাজছিল। আমিই জিজ্ঞেস করলাম, “কাকিমা, ওপরে কী হয়েছে? কী পুড়ছে?”
হেনা ঘাড় বেঁকিয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে একটা ব্যাঁকা হাসি দিয়ে বলল, “কে জানে! বুড়ির ঘর পুড়ছে মনে হয়।” হোম ডেলিভারি দেবার সিঁড়ি বেয়ে দুড়দাড় উঠে দেখি দরজা ভেজানো। আর দরজা খুলতেই ধোঁয়ায় ভরে যাওয়া ঘরে প্রথমেই যেটা খেয়াল করলাম সেটা গন্ধ। মাংস পোড়া গন্ধ। বুবানটা একটু বোকাটে ধরনের। বলে উঠল, “তন্দুরি চিকেনের মতো গন্ধ কেন রে?”
“তুই চুপ কর!” ধমকে উঠল রূপম, “ওদিকে তাকিয়ে দেখ, তন্দুরি মানুষ!”
ঠিক তখনই আমার নজরে এল গোটা ঘরে মনা ছোটাছুটি করছে আর দাউদাউ করে পুড়ছে। বাতাসে পোড়া কাপড়ের ঝাঁজ, আর গরম ধোঁয়া মিলে এক দমবন্ধ করা পরিবেশ তৈরি করেছে। চিৎকার ছেড়ে এখন মুখে কোনও স্পষ্ট শব্দ নেই— কেবল এক কর্কশ, ভাঙা গর্জন বেরোচ্ছে গলা থেকে। আগুনের আলোতে তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, যেন আতঙ্কের মধ্যেও তীব্র বেঁচে থাকার লড়াই চলছে ওর মধ্যে।
“সবাই সরে দাঁড়া!” চিৎকার করে বলল চাঁদ, “এই অবস্থায় আমাদের জড়িয়ে ধরলে মুশকিল। আর জল কোথায় আছে দেখ। আমি পাড়ার লোক ডেকে আনি।” চাঁদ গেল লোক ডাকতে। রূপম আর বুবান গেল ঘরের বাথরুমে জলের খোঁজে। আমার পা দুটো কেউ যেন আঠা দিয়ে মেঝের সঙ্গে লাগিয়ে দিয়েছিল। জ্যান্ত মানুষকে পুড়তে আমি আগে কোনও দিন দেখিনি। মনা পরনের শাড়িটা আগেই খুলে ফেলেছিল। রোগা শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। যতটা দেখা যাচ্ছে মাংস পুড়ে কালো হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও সেই কালো মাংস আর চামড়া পাতলা শঙ্কের মতো খুলে খুলে বেরিয়ে মাটিতে খসে খসে পড়ছে। ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে লালচে মাংস আর সাদা হাড়। গালের একপাশটা পুরো পুড়ে গিয়ে গালটাও খসে পড়াতে চোয়ালের দাঁতগুলো দেখতে পাচ্ছি। শেষবারের মতো আমি মনার মুখটা দেখলাম— পুরো মুখটা আগুনে ঢেকে যাচ্ছে, কিন্তু চোখ দুটো এখনও খোলা। প্ৰতি মুহূর্তে মনে হচ্ছে এখান থেকে পালিয়ে যাই। কিন্তু যেতে পারছি না।
রূপম এরই মধ্যে এক বালতি জল এনে মনার মাথায় ঢেলে দিল। আগুন নিভে গেল ঠিকই, কিন্তু জলের তোড়ে মনার দেহের নানা অংশ খসে খসে মাটিতে পড়তে লাগল। মনা আর সহ্য করতে পারল না। সোজা শুয়ে পড়ল মাটিতে আর চিৎকার করে দাপাতে লাগল। কিন্তু তখনও তার কথা বন্ধ হয়নি। মনা বলেই চলছিল, “আমার মাকে তোরা দেখিস। আমি অত সহজে মরব না। এই বাড়ি আমার। যতদিন আমি আছি, এই বাড়ি ভোগ করে যাব। আমাকে মেরে বাড়ি দখলের তাল? ওই মাগির সব চালাকি আমি বুঝি। ফিরে আসি, সব হিসেব নেব।”
ততক্ষণে চাঁদ পাড়ার সবাইকে ডেকে এনেছে। মনার যা অবস্থা, তাতে তাকে হাসপাতালে নেওয়াই দুষ্কর। শরীরের যেখানে ধরা হচ্ছে, সেখান থেকেই চামড়া মাংস খুলে খুলে আসছে। শেষে ঠিক হল দুটো বড়ো কলাপাতায় তেল মাখিয়ে তাতে করে উলঙ্গ মনাকে ঢেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে। অ্যাম্বুলেন্সে উঠেও মনা যথারীতি তার তীক্ষ্ণ গলায় দাদা আর বউদিকে অভিসম্পাত করতে লাগল।
“আমার টাকাপয়সা সব হিসেব করে রাখা আছে। ফিরে এসে দেখব… যদি একটা টাকা এদিক থেকে ওদিক হয়, তবে কাউকে ছাড়ব না এই বলে দিচ্ছি। ভেবেছিস আমি মরে যাব? বাবা বলেছিল আমার আয়ু একশো বছর। তার আগে আমাকে কেউ মারতে পারবে না!”
হাসপাতাল আমাদের পাড়া থেকে বেশি দূর না। আমার আচমকা শরীর খারাপ লাগা শুরু হল। পেট পাকিয়ে বমি উঠছে। তাই আমি আর ওদের সঙ্গে গেলাম না। পরে চাঁদ জানাল, ডাক্তার বলেছেন গন কেস। আজ রাত কাটবে না।
“হ্যাঁ রে, মনার মা কোথায় গেল? তাকে তো কোথাও দেখলাম না!”
“শোবার ঘরে কাঠের পুতুলের মতো বসে ছিল। কোনও নড়াচড়া নেই। কথা নেই। কী হয়েছে কে জানে?”
“আগুন ধরল কীভাবে?”
“জানি না। পুলিশ হাসপাতালে গেছে এনকোয়ারি করতে। তখনই জানা যাবে।”
চাঁদের একটা কথাও মিলল না। মনা সেই রাতে মরল না। এমনকি পরের রাতেও না। শুনলাম ডাক্তার স্যালাইন পর্যন্ত দিতে পারছেন না। দেহ এমন পুড়ে গেছে যে ভেইন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ঠিক করলাম মনাকে দেখতে যাব। হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ঢুকতেই নাকে একটা অসহনীয় পোড়া মাংসের গন্ধ এসে লাগল। সাদা চাদরের নিচে মনা শুয়ে আছে। শরীরের যতটা দেখা যাচ্ছে ততটাই কালচে পোড়া। তাতে সাদা সাদা মলম লাগানো। শুধু চোখ দুটো অদ্ভুতরকম চকচক করছে। ঠোঁটের চামড়া উঠে গিয়ে লাল মাংস উঁকি দিচ্ছে তরু তার বিড়বিড় করা থামছে না। অদম্য জীবনীশক্তিতে হাসপাতালের বেডে শুয়েও মনা সঞ্জীবদের শাপশাপান্ত করছে আর কাঁদছে। “তোরা কেউ রেহাই পাবি না … তোর ঘরে শাস্তি থাকবে না” – গলাটা ভাঙা, কিন্তু প্রতিটা শব্দ যেন ধারালো ছুরির মতো বেরোচ্ছে। পাশে নার্স এসে দেখে যাচ্ছে, কিন্তু তার চোখে ভয় স্পষ্ট। আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। মনা এক মুহূর্তের জন্য আমার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে যেন দাউদাউ আগুনের শিখা জ্বলছিল। “তুইও… তুইও বুঝবি… রাতের বেলা জানলায় উঁকি দিয়ে খুব দেখা হয়, তাই না? আমাকে ফিরে যেতে দে। তারপর দেখাচ্ছি!” থুথুর মতো শব্দ করে বলল মনা। আমি আর থাকতে পারলাম না। পালিয়ে এলাম।
মনার গায়ে কেমন করে আগুন লাগল সেটা কিন্তু রহস্যই থেকে গেল। পুলিশ বারবার জেরা করা সত্ত্বেও মনা কিছুতেই কিছু বলতে রাজি হল না। বরং পুলিশদের ঘুষখোর, মুখপোড়া ইত্যাদি গালাগাল করে ভাগিয়ে দিল। মনার মা ঘটনার সময় শোবার ঘরে ছিলেন। তাঁর থেকেও কিছু জানা গেল না। ঘটনার অভিঘাতে ভদ্রমহিলা একেবারে বোবা হয়ে গেছেন। কেউ কিছু প্রশ্ন করলেই ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতেন।
পাঁচদিনের মাথায় মনা মারা গেল। মনা যে মারা যাবে এটা আমার মতো অনেকেই বিশ্বাস করেনি। অনেকেরই ধারণা ছিল মনার মধ্যে কোনও অলৌকিক শক্তি আছে। মনা মরতেই পারে না। প্রথমে কেউ কেউ বলল বডিটা একবার বাড়িতে আনা হোক। কিন্তু সঞ্জীবের তাতে প্রবল আপত্তি। সে ওই পোড়া বডি আর বাড়িতে আনতে রাজি না। ফলে মনাকে হাসপাতাল থেকেই সোজা শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হল। আমি যাইনি, কিন্তু যারা সঙ্গে গেছিল, তাদের মধ্যে রূপম ছিল। রূপমই জানাল, “দেহতে আর কিছুই ছিল না বুঝলি? এভাবে চার ঘণ্টাও বাঁচার কথা না। মনা চারদিন বাঁচল কীভাবে? শ্মশানে তো আর-এক কাণ্ড। মনার গোটা বডি পোড়া কাঠ, তবুও ডোম বলল আগুন ঠিকঠাক ধরছে না। বোতল বোতল ঘি ঢালল, তেল দিল, কিছুতেই কিছু হয় না। শেষে ডোম লাঠি দিয়ে কোমরের কাছে একটা বাড়ি মারতেই জ্বলন্ত চিতায় মড়া উঠে বসল। মুখের চামড়া অর্ধেক ঝরে পড়েছে, তবু তার ঠোঁটের ফাঁকে কালো দাঁত দেখা যাচ্ছে। চোখ গলে গাল বেয়ে রস গড়াচ্ছে। অন্যটা উপড়ে এসেছে নার্ভ সমেত। চারপাশে যারা ছিল, তারা এই দৃশ্য দেখে ভয়ে পেছনে সরে গেল। কেউ কেউ হোঁচট খেয়েও পড়ে যাচ্ছিল। পরমুহূর্তে এক প্রবল বাতাস এসে চিতার আগুন উঁচু করে তুলল, ধোঁয়ার দেয়ালের আড়ালে মনা মিলিয়ে গেল। বড়ি ছাই হয়ে যাবার পর ডোম একটা মাটির সরা মাথার খুলির হাড় আর নাভি দিয়ে সঞ্জীবকাকাকে বলল জলে ভাসিয়ে দিতে। ঘাটে নামতে গিয়ে কাকা আছাড় খেয়ে পড়ল আর মাটির সরা কোথায় ছিটকে গেল কে জানে! আমরা সবাই টর্চ নিয়ে কত খুঁজলাম। পেলামই না। ডোম বলল, অস্থি বিসর্জন না হওয়া নাকি ভালো না। এতে…” বলতে বলতে আচমকা চুপ করে গেল রূপম।
“কী হল রে? চুপ করে গেলি কেন? কী ভাবছিস?” জিজ্ঞাসা করলাম।
“জানিস, মনার চোয়ালের মাংসগুলো খুলে যাওয়ায় সব দাঁত বাইরে বেরিয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল মরে গিয়েও মনা হাসছে।” আমি পরিষ্কার দেখলান বলতে গিয়ে রূপমের গায়ের লোম সব খাড়া হয়ে যাচ্ছে। আমার কেমন গা ঘিনঘিন করে উঠল। আমি ওকে থামিয়ে বললাম, “বাদ দে। মনা মরেছে। যা হবার সব শেষ হয়ে গেছে।”
বুঝিনি, সব কিছুর সেই শুরু।
.
॥৭॥
ঝামেলা শুরু হল মনার শ্রাদ্ধের দিন থেকে। উঠোনের মাঝখানে বাঁশের খুঁটি দিয়ে ছাউনি টাঙানো হয়েছে, তলায় সাদা কাপড় বিছানো। মাঝখানে বসানো হয়েছে যজ্ঞকুণ্ড। চার কোণে গাঁদাফুলের মালা আর তিল, চাল, কুশঘাস ছড়ানো। কুণ্ডের ভিতরে শুকনো আমকাঠ, পাটকাঠি, গুম্বুল, ধূপকাঠি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। পাশেই থালাভর্তি পঞ্চগব্য, ঘি, ফল, আর কাঁসার পাত্রে গঙ্গাজল। ঠিক সামনেই মনার বহু পুরাতন এক ছবি, ফুলের মালা আর প্রদীপ জ্বলছে। কিন্তু সঞ্জীব যতবার পিণ্ডদান করতে যাচ্ছিল, পিণ্ড ছড়িয়ে পড়ছিল। কলা আর মধুর পরিমাণ বাড়িয়েও সেই পিণ্ডকে কিছুতেই আকার দেওয়া যাচ্ছিল না। শেষে পুরুতমশাই নিজে হাত লাগালেন।
“দেখি দেখি আমার হাতে দাও”, বলে নিজেই নতুন মধুর বোতল খুলতে গেলেন। খোলার সময় আর-এক বিপত্তি। যে ছুরি দিয়ে সিল কাটা হচ্ছিল, তা পিছলে পুরুতমশাইয়ের আঙুল কেটে ফিনকি দিয়ে রক্তে পিণ্ডে মাখামাখি। কোনওক্রমে আঙুলে ব্যান্ডেজ করে তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, “একে তো চৈত্র অমাবস্যার মড়া, তায় আবার ত্রিপাদ দোষ। আত্মা কিছুতেই এই লোক ছেড়ে যেতে চাইছে না। বড়ো টান হে, বড়ো টান।” শুনেই পাড়ার বড়োদের অনেকে কপালে হাত ছোঁয়াল।
“দেখি শেষ চেষ্টা করে”, বলে পুরুত যজ্ঞ শুরু করতেই যেন আচমকা হাওয়ায় মনার ছবিটা ছোটো টুল থেকে সোজা আগুনে গিয়ে পড়ল। এবার আর পুরুতমশাইকে থামানো গেল না। তিনি তৎক্ষণাৎ “রাম রাম” করে উঠে পড়লেন। মনার শ্রাদ্ধ অসম্পূর্ণ রইল। খুব স্বাভাবিকভাবেই অন্য কোনও পুরোহিত সেই শ্রাদ্ধ সম্পূর্ণ করতে রাজি হল না। সবার প্রাণের ভয় আছে। ঘটনাটা গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে গেল। এটাও ছড়াল, জ্যান্ত অবস্থায় মনা যা যা করতে পারেনি, এবার সে তা করবে। কয়েকদিন গোটা পাড়া বেশ থমথমে। সবাই যেন অনাগত কোনও বিপদের অপেক্ষা করছে। পাড়ার চরিত্র বদলে যেতে থাকল দ্রুত। সন্ধ্যার পর রাস্তা ফাঁকা হতে শুরু করল। ড্রেনের থেকে যেন ভেসে আসতে লাগল পোড়া মাংসের গন্ধ। সবাই দমবন্ধ করে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু সাত দিন কেটে গেলেও যখন কিছুই হল না, পাড়া আবার আগের মতো স্বাভাবিক হতে শুরু করল।
সে রাতের কথা আজও মনে আছে আমার। চারিদিকে গুমোট, বেশ গরম। রাতে বিছানায় ছটফট করতে করতে একটু তন্দ্রামতো এসেছিল। আচমকা একটা অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল। ঘুমের মধ্যেই মনে হল কে যেন আমায় ডাকছে। জেগে উঠে ভালো করে শুনতেই আমার হাড় হিম হয়ে গেল। আমাকে না, কেউ মনাকে ডাকছে। ঠিক আমার জানলার বাইরে থেকে। জানলা খোলাই ছিল। পর্দা সরাতেই দেখলাম উলটো দিকের ঘরের সেই জানলাটা খোলা। ঘরের মৃদু নীল আলোটা জ্বলছে আর হাতে একটা থালা নিয়ে দাঁড়িয়ে মনার মা সোজা অপলকে আমাদের বাড়ির ছাদের দিকে চেয়ে আছে আর বলছে, “মনা… অ্যাই মনা, তুই ও বাড়ির ছাদে কী করছিস? নেমে আয়। মনা তুই পড়ে যাবি… নেমে আয় মা। কি রে মনা, উত্তর দিচ্ছিস না কেন?” এমন চলল খানিকক্ষণ। ভয়ে আমার সারা শরীর হিম হয়ে গেছে। বুঝতে পারছি ঠান্ডা ঘামের একটা সরু স্রোত চুলের নিচ থেকে বেরিয়ে বয়ে যাচ্ছে শিরদাঁড়া বরাবর। বুড়ি ডেকেই চলেছে, “আয় মা, তোর জন্য মুরগির মাংস রেখেছি। তুই তো ভালোবাসিস। আয়… খেয়ে যা।”
হয়তো আমার মনের ভুল, কিন্তু মনে হল থম মেরে থাকা বাতাস জুড়ে বাসি ভাত আর পচা মাংসের তীব্র গন্ধ। খানিক বাদেই দেখলাম বুড়ি মেঝেতে সেই থালা রেখে হাঁটু গেড়ে বসে ফিসফিস করে বলল, “খা মা… তুই তো অনেকদিন খাস না…” আমি ভূতে বিশ্বাস করি না, কিন্তু ওই রাতে বুড়ির গলায় ও কথা শুনে আমি আর সাহস ধরে রাখতে পারলাম না। কোনওমতে জানলাটা বন্ধ করে ওই গরমেও ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলাম। শুধু শুনতে পেলাম বুড়ির ম্লান কণ্ঠ- “খা মা… খা…
তারপর একটা ভেজা, কর্কশ গর্জন। যেন গলা ভরা কাদা নিয়ে কেউ কিছু খাচ্ছে, আর সেটাও ঠিক আমার মাথার উপরের ছাদে বসে।
পরদিন ঘুম ভাঙতেই সোজা ছাদে চলে গেছি। আমাদের ছাদে ওঠার দরজাটা বহুদিন তালাবন্ধই থাকে। আমি জন্ম থেকে তেমনই দেখছি। শুনেছি আমার এক দাদা ছিল। তিন বছর বয়সে সবার চোখের আড়ালে এই ন্যাড়া ছাদে কেমন করে যেন উঠে গেছিল সেই দাদা। মা টের পেয়ে যায়। দৌড়ে ছাদে উঠে দ্যাখে সে ছেলে একেবারে ছাদের কোনায়। মা ‘খোকন’ করে ডাকতেই ভয় পেয়ে আমার সেই দাদা সোজা দোতলার ছাদ থেকে মাটিতে পড়ে মরে যায়।
এই ঘটনার পর মা নাকি প্রায় উন্মাদ হয়ে গেছিল। ডাক্তারের পরামর্শে প্রায় পাঁচ বছর পর আমি আসি। ছাদের চাবিটা ঠাকুরঘরের কোণে একটা পেরেকে ঝোলানো থাকে। প্রতি বছর ওই ছাদেই দাদার বাৎসরিক হয়। এখনও। তখন খোলা হয়। আমি কাউকে না বলে চুপিচুপি ছাদে উঠলাম। গোটা ছাদ ধুলোয় ভরা। কোথাও কিচ্ছু নেই। কিন্তু তাই কি? আমার ঘরটা যেখানে, ঠিক তার উপরে ছাদের ধুলো জমা সিমেন্টের ওপর কী সব যেন ছড়িয়ে আছে। কাছে গিয়ে দেখি একগাদা মুরগির হাড়গোড়- কিছু শুকনো, ফাটল ধরা, কিছু আবার হাল্কা চিটচিটে, যার গায়ে এখনও জমে আছে বাদামি রঙের শুকনো রক্তের দাগ। হাড়গুলোর ফাঁকফোকরে কালো পিঁপড়ে গিজগিজ করছে। তারা হাড়ের সঙ্গে লেগে থাকা মাংসের টুকরো কেটে নিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কোথায় যেন। হাড়ের মাঝেই পড়ে আছে একরাশ পচা ভাত- আঠালো, সাদা-ধূসর হয়ে যাওয়া, তাতে সবুজ-নীল ছত্রাকের দাগ ফুলে উঠেছে। বাতাসে ভাসছে তীব্র, পচা গন্ধ, যেন দীর্ঘদিন বন্ধ কোনও নর্দমার মুখ হঠাৎ খুলে দেওয়া হয়েছে। ছাদের একপাশে ছোট্ট একটা গর্তে জমে আছে নোংরা জল আর তাতে ভাসছে মুরগির কাঁধের গলার হাড় আর আধগলা ভাতের দলা। পুরো দৃশ্যটা এমন এক ঘিনঘিনে আর পচা মৃত্যুর গন্ধে ভরা, যে, আমার গা শিরশির করে উঠল।
মাকে দেখাতে প্রথমেই মা বলল, “তোকে ছাদে উঠতে বারবার মানা করি, তাও উঠেছিলি কেন?” আমি উত্তর দিলাম না। তবে হাড়গোড়গুলো নিয়ে মা বিশেষ পাত্তা দিল না। “কাক নিয়ে এসে ফেলেছে নিশ্চয়ই; নইলে এখানে এসব আসবে কেমন করে? দরজা তো তালা মারা।” আমি আর মাকে কিছু বলতে গেলাম না। কিন্তু রাতে মনার আনাগোনা বাড়তে লাগল। এ এক অদ্ভুত নেশার মতো। রাত বাড়লেই আমি অপেক্ষা করতাম কখন সামনের জানলা খুলে যাবে আর বুড়ি হাতে একটা থালা নিয়ে মেয়েকে খেতে ডাকবে।
“মনা… মনা রে! আয় মা, তোর জন্য খাবার রেখেছি। এসে খেয়ে যা। বারবার, ধীরে ধীরে, গলায় একটা অদ্ভুত হাহাকার মিশে আছে যেন। রোজ যে এমন হত তা নয়। তবে যেদিন বুড়ি ডাকত না, কেমন যেন হতাশ লাগত। আমি কান পেতে থাকতাম। হপ্তায় একদিন কি দুইদিন বুড়ি জানলা খুলে মেয়ের জন্য মাছ কিংবা মুরগির মাংস বেড়ে মেয়েকে খেতে ডাকত। নেশাগ্রস্তের মতো আমি পরদিন ছাদে উঠে সেইসব খাবারের ভুক্তাবশেষ খুঁজতাম। পেয়েও যেতাম। মাছের কাঁটা, মাংসের হাড়ের টুকরো কিংবা ভাতের দলা। সারাদিন একটা বমি বমি ভাব আর নাকে সেই পচা গন্ধে কিছুই খেতে পারতাম না। পড়াশোনা ডকে উঠল। এক অদ্ভুত ক্লান্তিভাব জড়িয়ে থাকত সারাদিন। একদিন ঘুম থেকে উঠে দাঁত মেজে আয়নায় তাকাতেই আমি মনাকে দেখতে পেলাম। ঠিক আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। অস্পষ্ট, লম্বা চুল, মুখে এক শীতল, অমানুষী হাসি। আমি চোখ সরাতে পারছিলাম না। মা এসে আমায় ঝাঁকুনি দিল, “কি রে? তোর কী হয়েছে? তুই একা একা কার সঙ্গে কথা বলছিস?” পরে দেখি আমার অজান্তেই প্রায় আধঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। আমি একভাবে টুথব্রাশ হাতে দাঁড়িয়ে আছি।
এই ঘটনার পর মায়ের কিছু একটা সন্দেহ হয়েছিল। একদিন সন্ধ্যায় দেখি একটা অচেনা লোক কোথা থেকে এসে হাজির। দেখে কোনও প্রাইভেট কোম্পানির অফিসার বলে মনে হয়। বয়স তিরিশের কাছাকাছি, নিখুঁত কামানো দাড়িগোঁফ, ফুলহাতা সাদা শার্ট, ফর্মাল প্যান্ট, ঠোঁটের কোণে তিরতির করছে অদ্ভুত একটা হাসি। লোকটার হাতে একটা সুটকেস মতো কী যেন। সে প্রথমে দরজা বন্ধ করে বাবা মায়ের সঙ্গে গোপনে কী যেন কথা বলল। তারপর দরজা খুলে আমার ঘরে এসে খুব নরম গলায় বলল, “আমার নাম অমলেন্দু চক্রবর্তী। প্যারাফিজিওলজিক্যাল সোসাইটির ফাউন্ডার মেম্বার।”
আমি বুঝতেই পারছিলাম না, আমাকে এসব বলার মানে কী? ভদ্রলোক বোধহয় সেটা বুঝতে পেরেই মৃদু হেসে বললেন, “তোমায় কয়েকটা প্রশ্ন করব। ঠিকঠাক উত্তর দেবে তো?”
ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলাতে ভদ্রলোক বেশ খুশি হলেন।
“বেশ। তাহলে সত্যি করে বলো দেখি, তুমি আজকাল প্রায়ই ছাদে যাও কেন?”
আমি বেশ চমকেই গেলাম। মা বাবা যে এই ব্যাপারটা এত সিরিয়াসলি নিয়েছে, তা বুঝিনি। আমি চুপ করে আছি দেখে লোকটা আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, “বলো। ভয় পেয়ো না। তোমার কোনও ক্ষতি হবে না।”
আমি রাতের বেলায় যা যা দেখি সেটা বললাম। কিন্তু তিনি খুশি হল না। শুধু জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, “আর কিছু? ঠিক মনে করে বলো।”
আর কিছু বলার মতো নেই। ভদ্রলোক এবার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এবার আপনি বলুন কী দেখেছেন?”
মা একটু ধরা গলায় বলল, “কী আর বলি, কদিন হল ওর পড়াশোনাতে একদম মন নেই। সারাদিন দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবে আর বিড়বিড় করে কথা বলে। আগে কোনও দিন ছাদে উঠত না। এখন মাঝে মাঝেই ছাদে গিয়ে কী যেন খোঁজে। আমি একদিন লুকিয়ে পিছন পিছন উঠেছিলাম। দেখি ছেলে পুরোনো ভাঙা ইটের ফাঁকে হাত দিয়ে মুরগির শুকনো হাড় টেনে এনে সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আপনাকে তো বললাম ওই ছাদের কোণ থেকেই আমার বড়ো ছেলে…” মা কথাটা শেষ করতে পারল না। ডুকরে কেঁদে উঠল।
খানিক স্বাভাবিক হয়ে মা আবার শুরু করল, “আমি ওকে বলেছিলাম রাতে আমাদের সঙ্গে ঘুমো। তাতেও ছেলে রাজি না। বলে, আমি এখন বড়ো হয়ে গেছি। পরশু রাতে আড়াইটে নাগাদ টয়লেটে উঠে দেখি ওর ঘর থেকে একটা গোঙানির আওয়াজ আসছে। মৃদু, কিন্তু অনেকটা শ্বাসটানের মতো। শুনে আমার বুকের ভেতর কেমন একটা চাপা ধুকপুক শুরু হল। ছেলেটা মাঝেমধ্যেই দেরি করে ঘুমোতে যায়, কিন্তু এইরকম শব্দ তো কখনও শুনিনি! ঘরের দরজাটা আধখোলা, আমি আস্তে করে দরজাটা ঠেলে ভেতরে তাকালাম। গোটা ঘরে একটা দমবন্ধ করা পোড়া পোড়া গন্ধ। জানলা দিয়ে অল্প রাস্তার আলো ঢুকছিল। তাতেই দেখলাম আমার ছেলে একদম মড়ার মতো নিশ্চল হয়ে শুয়ে আছে, মুখটা বালিশের দিকে ঘোরানো। গোঙানির শব্দ ছেলের মুখ দিয়েই বেরোচ্ছে। আর তার ওপর ঝুঁকে আছে একটা ছায়ার মতো মহিলা। লম্বা চুল, মুখ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু মাথাটা এমনভাবে নিচু, যেন খুব কাছ থেকে তাকিয়ে আমার ছেলেকে দেখছে। আমি ঘরে ঢুকতেই আমার দিকে চাইল। আর তখনই আমি দেখলাম তার চোখ। অন্ধকারের মধ্যেও সাদা, ফ্যাকাশে। মানুষের চোখের মতো নয়, বরং মড়া কিছুর চোখের মতো। আমি চিৎকার করে উঠতেই ছায়াটা মিলিয়ে গেল। সারারাত আমি ছেলেকে জড়িয়ে শুয়েছি, যতক্ষণ না সকাল হয়। এদিকে ছেলের কোনও সাড় নেই। অঘোরে ঘুমোচ্ছে।”
সত্যিই আমার এসব কিছুই জানা ছিল না। মা পরের দিন আমাকে কিছু বলেওনি।
“চেনা কারও মতো মনে হল?” অমলেন্দুবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
“হ্যাঁ”, ঘাড় নেড়ে আঙুল দেখিয়ে মা বলল, “ওই বাড়ির মনার মতো।”
অমলেন্দুবাবু এবার গম্ভীর মুখে মাকে বললেন, “একটা জ্বর মাপার থার্মোমিটার আনুন তো মা।”
মা দৌড়ে গিয়ে একটা ডিজিটাল থার্মোমিটার এনে দিল। আমার মুখের ভিতর সেটা ঢুকিয়ে তিন মিনিট পর বার করে তিনি বললেন, “দেখুন অবস্থা। থার্মোমিটারেও এরর দেখাচ্ছে।”
“কী ব্যাপার? খারাপ হয়ে গেল নাকি?” বাবা জিজ্ঞেস করল।
“আমার তা মনে হয় না। আপনি একটু পরীক্ষা করে দেখুন।” বাবা মুখে ঢোকাতে দুই মিনিট পরেই পিক পিক শব্দ এল। বার করে দেখা গেল ৯৮.৩ ডিগ্রি। থার্মোমিটার একেবারে ঠিক আছে।
“তবে?”
“আপনি একবার ছেলের গায়ে হাত দিয়েই দেখুন না মা।
মা আমার গায়ে হাত দিয়েই চিৎকার করে উঠল। “এ কী! এ যে মড়ার মতো ঠান্ডা!”
“যা বুঝছি পরীক্ষাটা করে দেখতেই হবে”, বলে ভদ্রলোক স্যুটকেস থেকে একগাদা তার আর যন্ত্রপাতি বার করলেন। একটা রেডিয়োর মতো যন্ত্র, একটা টুনিলাইট বসানো রামধনুরঙা মেশিন, ইনফ্রারেড ক্যামেরা, বেশ কয়েকটা স্পিকার আর থার্মোমিটার। যন্ত্রগুলোকে আমার ঘরের বিভিন্ন জায়গায় বসিয়ে দিয়ে চিন্তিত মুখে বললেন, “এই হল প্যারানর্মাল অ্যাক্টিভিটি ডিটেক্টর। দেখতে রেডিয়োর মতো, কিন্তু এর ভেতরে নানারকম সেন্সর, অ্যান্টেনা আর এমন শব্দ বিশ্লেষণ ব্যবস্থা আছে, যা মানুষের কানে শোনা যায় না এমন কম্পনও ধরতে পারে। এই মুহূর্তে এই ঘরে কোনও প্যারানর্মাল এনটিটি নেই। তাই কিছু হচ্ছে না। কিন্তু আত্মারা অভ্যাসের দাস। নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় ঘুরে ঘুরে আসে। যদি তার নিয়মিত এই ঘরে আসার অভ্যাস থাকে, তবে আজও আসবে। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। যেমন করে শিকারি শিকারের অপেক্ষা করে। এ ছাড়া উপায় নেই।” রাতে খাওয়াদাওয়ার পর আমি, বাবা, মা আর জেঠু কেউ ঘুমোলাম না। রাত ঠিক বারোটা বাজতেই অমলেন্দুবাবু ঘরের আলো বন্ধ করে সবকটা যন্ত্রের সুইচ অন করতেই যন্ত্রগুলোতে পিক পিক শব্দ করে লাল আলো জ্বলে ধীরে ধীরে সবুজে বদলে গেলো। প্রথম একঘন্টা কোনও অস্বাভাবিকতা নেই। শুধু যন্ত্রের মৃদু গুনগুন শব্দ আর গ্রাফের সোজা লাইন। বাবা উশখুশ করতে লাগল। জেঠু বেশ খানিক বিরাট বিরাট হাই তুলে নিচের ঘরে ঘুমোতে চলে গেল। ঘড়িতে দেড়টা বাজতে না বাজতে আচমকা গ্রাফের লাইনটা কাঁপতে শুরু করল, যেন কোনও অদৃশ্য হাত সেটাকে ঠেলে দিচ্ছে। সঙ্গে একটা মৃদু যান্ত্রিক ক্যার ক্যার শব্দ। অমলেন্দুবাবু লাফ দিয়ে উঠে রেডিয়োর মাইক্রোফোনটা চালু করে দিলেন। মনে হচ্ছে রেডিয়োর ভিতরে শোঁ শোঁ করে খালি হাওয়া বইছে। তেমনই চলল মিনিট পনেরো। তারপর আওয়াজ বদলাতে থাকল। স্পিকারের ভেতর থেকে ভেসে আসতে লাগল এক অদ্ভুত আওয়াজ। না, মানুষের গলা না। এ যেন অসংখ্য গলার একজোটে এক অপার্থিব ফিসফিসানি। শব্দগুলো এত ধীরে, এত নিচু সুরে, যেন মনে হচ্ছিল কেউ আমার কানের ভেতরে মুখ দিয়ে কথা বলছে, কিন্তু সে কথা আমি বুঝতে পারছি না।
হঠাৎ যন্ত্রের লাল আলো দপদপ করতে শুরু করল, স্ক্রিনে তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের ওঠানামা বেড়ে গেল অস্বাভাবিকভাবে। সারা ঘর জুড়ে অদ্ভুত এক যান্ত্ৰিক প্যাঁ প্যাঁ শব্দে কানে তালা লাগার জোগাড়। এদিকে ঘরের বাতাস হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে যেন হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতেই ফুসফুসে ঢুকছে বরফঠান্ডা হাওয়া। অমলেন্দুবাবু টর্চ জ্বালিয়ে কাগজে কীসব নোট নিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই ইনফ্রারেড ক্যামেরায় দেখা গেল জানলার পাশে অস্পষ্ট এক অবয়ব। ধোঁয়ার মতো এক মহিলার ছায়া। লম্বা, কুঁজো, মাথা সামান্য কাত করা।
তারপর একসঙ্গে সব শুরু হল। তরঙ্গমাপক যন্ত্রের কাঁটাটা সর্বোচ্চ সীমায় গিয়ে লাফাতে লাগল। টেবিলের ওপরের কাগজগুলো হঠাৎ উড়ে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। অডিয়ো রেকর্ডার থেকে ভেসে এল কর্কশ এক আর্তনাদ। এই আর্তনাদ আমার চেনা। মনা যেদিন জ্যান্ত পুড়ছিল সেদিন ঠিক এই আর্তনাদ আমি ওর গলায় শুনেছি। মা চিৎকার করে “রাম রাম” ডাকতে শুরু করল। বাবা ছুটে ঘরের আলোর সুইচ জ্বালাতে গিয়ে পায়ে জড়িয়ে তারের মাথা ছিঁড়ে বেরিয়ে এল, আর তড়িৎচৌম্বকীয় সেন্সর মেঝেতে পড়ে চুরমার হয়ে গেল। সারা ঘরে পোড়া মাংসের গন্ধে দম আটকে আসছিল। রেডিয়োর আওয়াজ আর্তনাদ থেকে বদলে গেছে এক চাপা গর্জনে। যেন এক আহত পশু মরণকামড় বসানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত।
তারপর আচমকা সব থেমে গেল। যেন কখনও কিছু হয়ইনি। আমাদের ঘিরে নিবিড় এক নিস্তব্ধতা। কান পাতলে শোনা যাচ্ছে আমাদের চাপা শ্বাসের শব্দ আর মায়ের ফুঁপিয়ে কাঁদার আওয়াজ। ঘরের মাঝখানে যন্ত্রের ভাঙা টুকরোগুলো ছড়িয়ে আছে, মেঝেতে পড়ে আছে কাগজের ছেঁড়া ছেঁড়া টুকরো আর বাতাসে মৃদু পোড়া গন্ধ যেন শামিয়ানার মতো ঝুঙ্গে রয়েছে।
প্রথম কথা বললেন অমলেন্দুবাবুই। “খুব ভালো সময়ে আমাকে ডেকেছেন আপনার ছেলের উপরে আর এই বাড়ির উপরে এই মনার দৃষ্টি পড়েছে। এর কদিন সময় পেলে মনা আপনার ছেলের আত্মাকে দখল করত। তার ও খুব কমই আছে এটা বোঝা যাচ্ছে। মরদেহের প্রতি আকর্ষণ, সম্পত্তির প্রতি লোভ এখনও যায়নি। মৃত্যুর পর আত্মা চিরশান্তির দেশে চলে যায়। এ যেতে পারছে না। জীবলোক আর পরলোকের মাঝে ত্রিশঙ্কু হয়ে কাটাচ্ছে। আর এভাবে কাটানো সে কত বড়ো যন্ত্রণার, সে আর কী বলি। আপনারা পাড়ার লোকজন মিলে যে করেই হোক প্রেতকে জলদান করে লোকান্তরিত করার ব্যবস্থা করুন।
“কিন্তু আমাদের কী হবে? এরকমই চলতে থাকবে?” ধরা গলায় মা জিজ্ঞাস করল। “আপনাদের একটা ব্যবস্থা করে দিয়ে যাচ্ছি। এ বাড়ি বন্ধন করতে হবে। আর দেরি করা যাবে না। কিছু সরঞ্জাম লাগবে অবশ্য, সে আমিই সঙ্গে করে এনেছি। গাড়িতে আছে। ছেলেকে পনেরো দিন বাইরে বেরোতে দেবেন না। একা ঘুমাতে দেবেন না। এই ঘর বন্ধ করে রাখবেন। পনেরো দিন বাদে, যখন বেরোবে, আমি একটা মাদুলি করে দেব, সেটা পরে বেরোবে। ওটা ছয়মাস পরার পর কোনও অমাবস্যায় গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে আসবেন।”
আমি সায়েন্স ক্লাব করা ছেলে। তাই আমার গোটা ব্যাপারটাই কেমন যেন অদ্ভুত লাগছিল। অন্য সময় হলে হয়তো কিছুটা প্রতিবাদ করতাম। কিন্তু মনের একটা অংশ ততদিনে মেনে নিয়েছিল, মরে গেলেও মনা আমাদের আশেপাশেই আছে। তাই ইচ্ছে থাকলেও প্রতিবাদের সাহস জোগাল না।
পরদিন সূর্যোদয়ের আগে শুরু হয়ে গেল গৃহবন্ধনের আচার অনুষ্ঠান। প্রথমে বাড়ির চৌহদ্দি ভালোভাবে ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে চার কোণে ছেটানো হল পবিত্র গঙ্গাজল। বাড়িতে ঢোকার মেন গেটের পাশে গঙ্গাজল, কুমকুম, হলুদ, নীলকণ্ঠ ফুল আর পঞ্চশস্য মেশানো একটা লোহার কলস স্থাপন করা হল। “এর নাম দ্বারপাল কলস মা”, বললেন চক্রবর্তী, “এই কলস অশুভ শক্তির প্রবেশ রোধ করবে।” এরপর উনি গোটা বাড়ির চারপাশে ঘড়ির কাঁটার মতো দিক ঘুরে মন্ত্রপাঠ করতে করতে সিঁদুর দিয়ে স্বস্তিক চিহ্ন আঁকতে শুরু করলেন। গোটা বাড়ি গমগম করতে লাগল তাঁর গলার আওয়াজে।
“ওম সূর্যপুত্রায় বিদ্মহে মহাকালায় ধীমহি। তন্নো যমঃ প্রচোদয়াৎ।।
ওম ভাস্করায় বিদ্মহে মহাদুত্যাথিকরায়া ধীমহি তন্নো আদিত্য প্রচোদয়াৎ।।
ওম মহাদেবায় বিদ্মহে রুদ্রমূর্তয়ে ধীমহি তন্ত্রঃ শিবঃ প্রচোদয়াৎ।।
ওম পবনপুরুষায় বিদ্মহে সহস্রমূর্তয়ে চ ধীমহি তন্নো বায়ুঃ প্রচোদয়াৎ।।”
একখণ্ড সাদা সুতোর ওপর মন্ত্র পড়ে সেটাকে গোটা বাড়ির চারদিকে টানা হল। ঠিক যেন একটা অদৃশ্য বেড়া। প্রতি কোণে একটা করে নিমপাতার ডাল আর লংকা ঝোলানো। এর নাম নাকি সূত্রীবন্ধন। তারপর হাতে একমুঠো ধুলো নিয়ে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে বাড়ির চারিদিকে সেই ধুলো ছিটিয়ে, চার কোণে চারটে লোহার ত্রিশূল পুঁতে, চার দেওয়ালে চারটে জলভরা মাটির ঘট রেখে দিলেন তিনি। বলে গেলেন, “কাল হয়তো দেখবেন এই চারটে ঘটই ভাঙা। প্ৰেত যেনতেনপ্রকারে এই গৃহে ঢোকার চেষ্টা করবে, কিন্তু এই ত্রিশূল আর মন্ত্রপড়া সুতো তাকে ঢুকতে দেবে না। তিনদিন রাতে দরজা জানলা খোলা রাখবেন না, নিরামিষ খাবেন, আর অপরিচিত কোনও মানুষ কিংবা অশৌচ চলছে এমন কোনও মানুষকে বাড়ির ভিতরে ঢুকতে দেবেন না। আর হ্যাঁ, এই মাদুলিটা আপনার ছেলের জন্য করে দিয়ে গেলাম। ‘ওম নিসাসরায় বিদ্মহে/ কডগা হস্তয় ধীমহি/ তন্নো নৈরুথী প্রচোদয়াতী’ মন্ত্র উচ্চারণ করে পুবদিকে তাকিয়ে সূর্যকে প্রণাম করে স্নানের পর শুদ্ধ নতুন বস্ত্রে লাল সুতো দিয়ে একে ধারণ করবে। আশা করি আর কোনও বিপদ হবে না।”
অমলেন্দুবাবুর কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি, আমাদের বাড়ির ফলন্ত নারকেল গাছের সবকটা পাতা আর ফল ঝড়াম আওয়াজ করে একসঙ্গে ঝরে পড়ে গেল। সেই আওয়াজে তিনি নিজেও একটু চমকে উঠেছিলেন বইকি!
.
॥ ৮॥
পরদিন সত্যিই ঘটগুলোকে ওলটানো আর ভাঙা অবস্থায় দেখা গেল। বাবা রহস্য করে বলল, “দ্যাখো গে অমলেন্দু নিজেই রাতে এসে ভেঙে দিয়ে গেছে।” কিন্তু যে-কোনও কারণেই হোক, আমার শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে লাগল একটু একটু করে। রাতে মনার মা-কে দেখা যেত কি না জানি না। কারণ মায়ের আদেশে আমাদের ওই ঘরটায় পাকাপাকি তালা মারা হল। মাঝে আমার খিদে পেত না। সেটাও ফিরে এল। ভাবলাম ঝামেলা চুকল।
কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অন্যদিকে। আমরা বাদে পাড়ার লোকেদের অনেকেই এবার মনাকে দেখতে শুরু করল। তখন লোডশেডিং-এর প্রকোপ ছিল মারাত্মক। প্রথম নীলুকাকুই অফিস থেকে ফেরার সময় মনাকে রাস্তার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। ঝলসে যাওয়া ছেঁড়া কাপড়, কালো ফাটা চামড়া, আর মুখের অর্ধেক পুড়ে গলে গেছে। নীলুকাকু চিৎকার করে পালাতে গিয়ে ড্রেনে পড়ে পা মচকাল। সেই শুরু। তারপর থেকে যত দিন যেতে লাগল মনার উপদ্রব বাড়তে লাগল। চাঁদ একদিন রাত করে টিউশনি থেকে বাড়ি ফিরছিল। একটা ঠান্ডা স্পর্শ ঘাড়ের কাছে পেতেই আর কোনও দিকে না ভেবে সে দৌড় লাগাল। পরে দেখা গেল তার ঘাড়ে স্পষ্ট লালচে পোড়ার দাগ। রাত বাড়লেই গলির অন্ধকার কোণ থেকে মনার কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়। লোকের ছাদের উপর দিয়ে কে কেন দুপদাপ করে হেঁটেচলে বেড়ায়। পাড়ায় কালু বলে একটা কুকুর ছিল। একদিন রাতে রমা কাকিমার বাড়ির সামনে তার ঘাড় মটকানো দেহ পাওয়া গেল। চাপ দুটো ভয়ে ঠিকরে বেরোচ্ছে।
উপায় না দেখে পাড়ার সবাই মিলে মনার দাদা সঞ্জীবের কাছে দরবার করল শুরু করল নীলুকাকুই। গলাখাঁকরে বলল, “দ্যাখো সঞ্জীব, জানি না তোমরা কিছু বুঝতে পারছ কি না, কিন্তু পাড়ায় নানারকমের অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটছে। তোমার বোন মনার শ্রাদ্ধ যে ঠিকমতো হয়নি, সেটাও তো মাথায় রাখতে হবে। তুমি এক কাজ করো, গয়ায় গিয়ে মনার নামে একটা পিণ্ড দিয়ে এসো বরং।”
সঞ্জীব আবার তাতে রাজি না। “গয়া অনেক দূর নীলুদা। তার উপর যাতায়াতে মেলা খরচাপাতির ব্যাপার। আমার প্রাইভেট ব্যাংকে নো ওয়ার্ক নো পে। যদি একান্তই বলেন তো কাছাকাছি কোথাও এক শনিবার দেখে দিয়ে আসতে পারি। আমার ওইদিন ছুটি থাকে। কোথায় দেব, তা আপনারাই ঠিক করে বলুন। এই বাড়িতে শ্রাদ্ধ করতে গিয়ে কী হল সে তো নিজেরাই দেখলেন।”
পাড়া কমিটির মিটিং বসল এই নিয়ে। শেষে ঠিক হল পাড়া থেকে বেশ দূরে একটা শ্মশানকালীর মন্দির আছে। সেখানেই শ্রাদ্ধ হবে। আগের বার যা হয়েছিল, তাতে মনার শ্রাদ্ধ আর কেউ পাড়ায় করতে রাজি হচ্ছিল না। এক শনিবার জেঠু, নীলুকাকু আর বুবানের বাবা দুগগা দুগগা করে শ্মশানের দিকে রওনা হল। কেউ কেউ জিজ্ঞেস করল, “হেনা যাবে না?” সঞ্জীব গম্ভীর মুখে জানাল, “বলেছিলাম। আসবে না বলেছে।” এরপরে আর কথা হয় না। মনার মৃত্যুর পরে হেনাও চুপ হয়ে গেছে। ঝগড়া করার সঙ্গী নেই কিনা। দিনরাত ঘরেই থাকে। তার আর মনার মায়ের দেখাই পাওয়া যায় না। ফলে কেউ আর ঘাঁটাল না। সেদিন আকাশের মুখ ভার। যে-কোনও সময় বৃষ্টি নামবে। পাড়ার সবাই অধীর অপেক্ষায় বসে আছি কখন ওরা আসে। ঘণ্টা চারেক কেটে গেল, ওদের দেখা নেই। পিণ্ড দিতে তো এত সময় লাগার কথা না! আর সেকালে মোবাইল ফোনও ছিল না যে খবর নেওয়া যাবে। এদিকে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। প্রথমে ছিল শুধু গাঢ় গর্জন, তারপর হঠাৎই শোঁ-শোঁ শব্দে ঝাঁপিয়ে পড়ল বৃষ্টি, যেন হাজারও ছোটো ঢাক একসঙ্গে বাজছে। খানিক বাদে বাদে আকাশ চিরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে আর তারপরেই বাজের আওয়াজে কান ফেটে যাবার দশা।
চাঁদ তারই মধ্যে একবার বলল, “আমি গিয়ে দেখে আসব?” কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মা ওকে ধমক দিল, “তোকে পাকামো করতে হবে না। নিশ্চয়ই বৃষ্টিতে আটকে গেছে। একটু বাদেই ঠিক ফিরবে।” আর আধঘণ্টা বাদে বৃষ্টি একটু ধরতেই দুখানা পুলিশের গাড়ি শোঁ শোঁ করে এসে মনাদের বাড়ির সামনে দাঁড়াল। পিছনে আওয়াজ করে একটা অ্যাম্বুলেন্স। গাড়ি থেকে সঞ্জীব বাদে বাকি তিনজন নামল। সঙ্গে জনা চারেক পুলিশ। নেমেই সবাই মিলে মনাদের বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল। আমরা কেউই কিছু বুঝতে পারছি না। এসব কী হচ্ছে? এমনটা তো হবার কথা ছিল না! মনাদের বাড়ি থেকে প্রথম চিৎকার করতে করতে বেরোল নীলুকাকুই।
“মেরে ফেলেছে। মেরে ফেলেছে… দুইজনকেই গলা টিপে মেরে ফেলেছে”, বলে বাইরে বেরিয়েই অজ্ঞান হয়ে গেল। আমরা ছুটলাম কাকুকে সুস্থ করতে। এদিকে পাড়ার বড়োরা ততক্ষণে বাড়ির ভিতর ঢুকে গেছে। একজন ডান্ডাধারী পুলিশ “ঢুকবেন না, ঢুকবেন না, ক্রাইম সিন” বলার মৃদু চেষ্টা করলেও কে শোনে কার কথা! জানা গেল, মনাদের বাড়িতে সঞ্জীবের বউ আর মনার মা দুইজনকেই মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। মনার মা খাটে আর হেনা বাথরুমে মরে পড়ে আছে। দুজনের গলাতেই সরু সরু আঁকশির মতো আঙুলের দাগ। পুলিশ বলল সঞ্জীবের মাথা খারাপ হয়ে গেছিল। শ্রাদ্ধ করতে যাবার আগে সে তার মা আর বউকে মেরে রেখে গেছে। কিন্তু আমরা যারা ওদের চিনতাম, তারা সবাই জানি ওই সরু আঁকশির মতো আঙুল সঞ্জীবের কিছুতেই হতে পারে না। সঞ্জীবের আঙুল আমি দেখেছি। বেঁটে বেঁটে। মোটা মোটা। অমন আঙুল যার ছিল, সে নিজেই কয়েকমাস আগে মারা গেছে।
“কিন্তু সঞ্জীব কোথায়?” মায়ের প্রশ্নে জেঠু সোজা ওই অ্যাম্বুলেন্সের দিকে আঙুল তুলল। আমাদের সবার হয়ে মা-ই আবার প্রশ্ন করল, “কী হয়েছে সঞ্জীবের?”
জেঠু প্রথমে কথাই বলতে পারছিল না। শেষে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “শ্মশানে পৌঁছোনোর পর সঞ্জীবকে দেখেই পুরুতমশাই ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘আপনি শ্রাদ্ধের কাজ করতে পারবেন তো? আপনি সুস্থ আছেন তো?’ জানি না তাঁর কোনওরকম সন্দেহ হয়েছিল কি না। কিন্তু সঞ্জীব বারবার বলতে থাকে, ‘আমি ঠিক আছি। একদম ঠিক আছি। ফাইন। ফাইন। সুপার ফাইন।’ তান্ত্রিক মতে মনার শ্রাদ্ধ সম্পন্ন হয়। শ্রাদ্ধ শেষে মৃতের উদ্দেশে পিণ্ডদান। পুরুতমশাই মন্ত্র পড়তে পড়তে গোটা চাল, কালো তিল, মধু আর গঙ্গাজল মিশিয়ে পিণ্ডগুলো কলাপাতায় সাজিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, ‘এবার চলুন, ওই কুয়োতে পিণ্ডদান করে আসি। ‘
আকাশ তখন কুচকুচে কালো মেঘে ঢাকা। আমরা বারবার ঘড়ি দেখছি। বৃষ্টি নামার আগে যেভাবে হোক পিণ্ডদানটা হয়ে গেলে বাঁচি। কুয়োটা শ্রাদ্ধস্থল থেকে বেশ কিছুটা দূরে। চারপাশে শ্যাওলা আর বুনো লতা-পাতা। সঞ্জীব হাতে কলাপাতাটা নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল কুয়ার ধারে। নীলু আমায় বলল, ‘দাদা, আপনিও সঙ্গে যান।’ ফলে আমিও চললাম ওদের সঙ্গে। কুয়োর ধারে যেতেই ভেতর থেকে সেই গন্ধটা পেলাম। অদ্ভুত ঠান্ডা আর স্যাঁৎসেঁতে একটা গন্ধ। সঞ্জীবের চোখে মুখে কেমন যেন একটা ঘোর লাগা ভাব। পুরুতমশাই মন্ত্র উচ্চারণ শুরু করলেন-
ওঁ নমঃ যমায় ধর্ম্মরাজায়, মৃত্যবে চাস্তকায় চ, বৈবস্বতায় কালয়, সৰ্ব্বভূতক্ষয়ায় চ।
ঔডুম্বরায় দধ্নায়, নীলায় পরমেষ্ঠিনে, বৃকোদরায় চিত্রায়, চিত্রগুপ্তায় বৈ নমঃ।
মন্ত্র উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে সঞ্জীব এক একটা পিণ্ড একে একে কুয়ার ভলে ফেলতে শুরু করল। প্রথমটা পড়তেই মনে হল কুয়োর কালো জলে কেমন যেন ঢেউ খেলে উঠল। যেন বিরাট একটা মাছ জলের নিচে নড়েচড়ে উঠছে। দ্বিতীয়টা পড়তেই ঢেউ আরও তীব্র হল, সেই পচা গন্ধ বাড়তে লাগল আর ভল থেকে ফেনা উঠতে লাগল। মনে হল জলে কেউ ডিটারজেন্ট পাউডার গুলে দিয়েছে পুরুতমশাই তৃতীয়বার মন্ত্র পড়ার আগেই সঞ্জীবের হাত থেকে তৃতীয় পিণ্ডটা খসে পড়ল জলে। ব্যস! আর যায় কোথায়! পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়ার ভেতর থেকে এক বিকট শব্দ উঠল। যেন এক বন্য পশুর গর্জন আর গোঙানির আওয়াজ। পুরুতমশাই প্রায় আর্তনাদ করে বলে উঠলেন, ‘এ কী করলেন আপনি? যমকে নিবেদনের আগেই প্রেতকে পিণ্ড দিয়ে দিলেন!’ তাঁর কথা শেষ হতে পারল না, দেখতে পেলাম কুয়োর কালো জল হঠাৎ ফুলেফেঁপে লম্বা হয়ে লাফিয়ে কুয়োর পাড়ে উঠে এল, যেন কোনও তরল হাত উপরের দিকে বেড়ে উঠছে ক্ৰমাগত। কিছু বোঝার আগেই সেই কালো, শ্যাওলাধরা ‘হাত’ সঞ্জীবের কবজি চেপে ধরল। সঞ্জীব মুখ দিয়ে একটাও আওয়াজ করতে পারল না। শুধু তার চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে মুখটা হাঁ হয়ে গেল, যেন ভয়ানক কিছু দেখেছে। গোটা ব্যাপারটা বুঝতে বুঝতেই বেশ কিছু সময় চলে গেছে। আমি তারই মধ্যে সঞ্জীবের অন্য হাতটা টেনে ধরলাম। দেখি সেটা বরফের মতো ঠান্ডা। ততক্ষণে সঞ্জীবের সারা গা ভরে গেছে ফেনা আর কালো বুদবুদে। আর সেই বুদবুদের মধ্যে থেকে… বললে বিশ্বাস করবে না, আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম অসংখ্য বিকৃত মুখ। তাদের চোখ নেই, কিন্তু মুখ হাঁ করা। বুভুক্ষু সেইসব আত্মারা যেন সবাই একসঙ্গে সঞ্জীবকে গিলে খেতে চাইছে।
সঞ্জীবের শরীরের অর্ধেক ততক্ষণে কুয়োর মধ্যে। পুরুতমশাই ভয়ে চোখ বন্ধ করে-
ওঁ তদ্ বিষ্ণোঃ পরমং পদং, সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ।
দিবীব চক্ষুরা ততম্॥ ওঁ বিষ্ণুঃ, ওঁ বিষ্ণুঃ।
মন্ত্র পড়ে যাচ্ছেন। আর পড়তে পড়তেই আচমকা তাঁর গলা গেল ভেঙে যেন কারও শ্বাস গলার কাছে আটকে গেছে। আমি চাইলেও কুয়ো থেকে চোখ সরাতে পারছি না। দেখলাম কুয়োর ভেতর থেকে উঠে এল এক নারীমূর্তি। ভেজা, লম্বা চুল, সারা গায়ে পোড়া পোড়া দাগ, কিন্তু মুখ নেই। মুখের জায়গায় শুধু এক কালো গর্ত। তার সারা গা বেয়ে টপটপ করে ঝরে পড়ছে জলের ধারা। সেই মুখহীন নারীমূর্তি দুটো কালো কালো পোড়া কাঠের মতো কঙ্কালসার হাত দিয়ে সঞ্জীবকে এক ঝটকায় কুয়ার ভেতরে টেনে নিল।
আমি এতক্ষণে গলার স্বর ফিরে পেয়ে চিৎকার করতে শুরু করলাম। দুজন সেই আওয়াজ পেয়ে ছুটে এল। এসে দ্যাখে কুয়োর জল একেবারে শান্ত হয়ে গেছে। যেন কিছুই ঘটেনি। এদিকে শুরু হল বাঁধভাঙা বৃষ্টি। তার মধ্যেই ভিজতে ভিজতে আমরা পুলিশ স্টেশনে গেলাম। পুলিশ কুয়ো থেকে বডি উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সে চাপিয়ে বাড়ি নিয়ে আসতেই দেখি এই কাণ্ড!
এতটা কথা বলে জেঠু হাঁফিয়ে পড়েছিল। বাবা তাকে জড়িয়ে ধরে ভিতরের ঘরে নিয়ে গেল। পুলিশ সিদ্ধান্তে এল, কোনও কারণে সঞ্জীবের মাথা খারাপ হয়ে গেছিল। তাই সে মনার মা আর হেনাকে টুটি টিপে খুন করে নিজেও কুয়োতে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করে। কিন্তু তারপরেও পুলিশ যে ব্যাপারটার কোনও উত্তর দিতে পারেনি, তা হল সঞ্জীবের মৃতদেহের অবস্থা। আমি নিজে অ্যাম্বুলেন্সে সেই মৃতদেহ দেখেছি। দেখলাম শুয়ে আছে এক আধখাওয়া মৃতদেহ। তার পেটের ভেতরটা ফাঁকা, যেন ক্ষুধার্ত এক জন্তু পরম আশ্লেষে সেখানকার মাংস ছিঁড়ে নিয়েছে। ত্বক ফেটে খুলে গিয়ে সাদা হাড় বেরিয়ে আছে। কিছু জায়গায় পচা চামড়া কালচে সবুজ হয়ে গেছে। মুখের একপাশ নেই। অন্যপাশের ঠোঁট গলে গিয়ে দাঁত বেরিয়ে আছে, অনেকটা সেই মনার মতো। চোখের কোটরে চোখ নেই, সেখানে নড়ছে কালো কালো পোকা আর সাদা ম্যাগটরা। মাত্র একঘণ্টার মধ্যে একজন জীবিত মানুষের দেহ কীভাবে এমন ভয়ানকরকম পচে যেতে পারে, স্বয়ং ফরেনসিক ডাক্তাররাও তার ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
.
॥৯॥
সঞ্জীবের মৃত্যুর পরে গোটা পাড়া কেমন একটা থম মেরে ছিল কয়েকদিন। এক বছর যেতে না যেতে জেঠু, বুবানের বাবা আর নীলুকাকু একের পর এক মারা গেলেন। সেই পুরুতমশাইয়ের কী হল জানা নেই অবশ্য। শুধু মনার নামটা এক অপয়া কুসংস্কার হয়ে রয়ে গেল বহুদিন। এতগুলো অপঘাত মৃত্যুর পর ওই বাড়ি আর কেউ কিনতে চায় না। কিন্তু পাড়ায় অদ্ভুত কিছু আর ঘটেও না। চাঁদ বিদেশে, রূপম আর বুবান দিল্লিতে। কালেভদ্রে পাড়ায় এলে দেখা হয়। মনার নাম উঠলেই আমরা আশ্চর্যরকম চুপ হয়ে যাই। আমি এখন বিজ্ঞানীর পদে চাকরি পেয়ে সংসারজীবনে ঢুকেছি। মেয়ে বড়ো হচ্ছে।
মনাদের গোটা বাড়িটা এখন যথার্থই পোড়ো বাড়ি। শুনেছি মাঝে কোন এক কর্নেল সাহেব কেনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু রেজিস্ট্রির দিন হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। মিশরের তুতেনখামেনের অভিশাপের মতো হয়তো এগুলোও সব কাকতালীয়। হয়তো সবটাই আমার মনের ভুল, এই ভেবেই মনকে বুঝিয়েছি কতবার। কারণ বহু প্রশ্নের উত্তর আজও আমার অজানা। মনার গায়ে আগুন দিল কে? কীভাবে? যে দিল, সে কি সঞ্জীব? তাহলে মনা তার নাম পুলিশের কাছে বলল না কেন? নাকি ভেবেছিল নিজেই চরম শাস্তি দেবে? সেদিন উপরে আগুন লাগলেও হেনা নিচে বসে বাসন মাজতে মাজতে বলেছিল বুড়ির ঘর পুড়ছে। তবে কি মনার মৃত্যু আসলে অ্যাকসিডেন্ট না? খুন? মনা নিজেই সঞ্জীবকে সেই খুনের শাস্তি দিল? তাই যদি হয়, তবে মনার মা আর হেনাকে মারল কে? একা বসে থাকলেই এসব প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক খায়। আগেই বলেছি ভূতের গল্পের মতো এই কাহিনিতে সব প্রশ্নের যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর নেই, কিংবা থাকলেও সেই জ্ঞান আমাদের আয়ত্তের বাইরে।
যে ঘরটা থেকে মনাদের জানলা দেখা যেত, সেটা এখন আমার লাইব্রেরি ঘর। ও ঘরে কেউ থাকে না। গতকাল মেয়ে টেবিলে বসে ছবি আঁকতে আঁকতে আচমকা জিজ্ঞেস করল, “বাবা, এই পাড়ায় খুব বাচ্চা কোনও ছেলে বা মেয়ে আছে নাকি গো?” বেশ অবাক হয়ে বললাম, “না তো! কিন্তু তুই হঠাৎ এই কথা জিজ্ঞেস করছিস কেন?”
মেয়ে ছবি আঁকা ছেড়ে আমার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “আরে ও কিছু না। শোনার ভুল হবে। আসলে কাল রাতে কিছুতেই আমার ঘুম আসছিল না। তোমরা তো ঘুমিয়ে কাদা। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি রাত দেড়টা। শুয়ে শুয়ে বোর হয়ে শেষে গল্পের বই খুঁজতে লাইব্রেরি রুমে ঢুকেছিলাম। ভাবলাম সোনার কেল্লাটা আবার পড়ি। ওই বইটাই খুঁজছিলাম। এমন সময় শুনি অত রাতে কার মা যেন তার বাচ্চাকে খেতে ডাকছে। বারবার ডাকছে। কিন্তু সে বাচ্চা কিছুতেই আসছে না। দুষ্টুমি করছে।”
“তাই নাকি? বলিস কী?” একটু হেসেই বললাম।
“হ্যাঁ গো বাবা। সে মহিলা ডেকেই যাচ্ছে। বলছে, মনা, এই মনা, তুই খেতে আসবি না? আয়… আয় খেয়ে যা। তুই ওই বাড়ির ছাদে কী করছিস?” বিশ্বাস করুন, তারপর থেকে, আমার না… ভীষণ ভয় করছে।
.
লেখকের জবানি— কাহিনির কথামুখের সূত্র ধরেই বলি, যে ঘটনাক্রম এই গল্পে বলা আছে, তার শতকরা আশিভাগ আমাদেরই পাশের এক পাড়ায় ঘটেছিল। গল্পটা সাক্ষাৎকারভিত্তিক ভাবে লেখা। মনা-র নাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যদিও তার আসল নামটি উল্লেখ করিনি। কাহিনিটি পূর্বে অপ্রকাশিত।
