খিদে – কৌশিক মজুমদার
খিদে
॥১॥
“অ্যাই সানি, একটা ভূতের গল্প শুনবি?”
“না শুনব না।”
“কেন রে? তোর ভয় করে নাকি? অন্ধকারে ভয় পাস?”
আমি কোনও দিন অন্ধকারে ভয় পেতাম না। তবু দাদা প্রায় রাতেই আমায় খেপাত। সবাই খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার পর যখন চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে যেত আর আমি কোলবালিশ জড়িয়ে আধোঘুমে ঢলে পড়তাম, ঠিক তখনই পাশের খাট থেকে ফিসফিসে গলায় দাদা নানারকম ভয়ের গল্প বলত। আমাকে খেপিয়ে কী যে আনন্দ পেত, সে আর বলার না। একবার কোথা থেকে একটা মরা বিড়াল নিয়ে আমার পাশে শুইয়ে রেখেছিল। মাথাটা থেঁতলানো। মুখটা হাঁ। দাঁতগুলো চকচক করছে। আমি ঘুম থেকে উঠে ওটাকে দেখে যেই না চিৎকার করে উঠেছি, অমনি দাদা নিজের বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নেমে “সানি ভয় পেয়েছে। সানি ভয় পেয়েছে” করে ঘর জুড়ে নাচতে লাগল। ও জানে, আমি এসব ইয়ার্কি একদম পছন্দ করি না। তবুও করে। ভুল বললাম, করত।
আমি সানি। ভালো নাম স্বর্ণাভ সেন। আমার দাদা অনি। ওর ভালো নাম ছিল অগ্নিভ। আমি জন্ম থেকেই দুর্বল। বাবা বলে কঙ্কালসার। হাড়জিরজিরে চেহারায় ফুটবলের মতো একখানা মাথা, লালচে চুল আর ফ্যাকাশে সাদা দেহ। পড়াশোনায় দাদা আমার চেয়ে ঢের বেশি ভালো ছিল। খেলাধুলাতেও। কে বলবে আমি অমন দাদার ভাই? কাউকে না বললেও আমি জানি আমি আমার জ্বর ভীত্ব। ভীতু আর দুর্বল। আমার শুধু থেকে থেকে খিদে পায়।
“তোর কী ব্যাপার বল তো?” দাদা মাঝেমধ্যে জিজ্ঞেস করে, “এত বলে, সব যায় কোথায়? দেহে তো একটুও মাংস হচ্ছে না। সরু পেটে গোরু ধরে কথটিংয়ে একেবারে মিথ্যে নয়, তা তোকে দেখলেই বোঝা যায়।”
আমাদের বাবার বদলির চাকরি। আজ এখানে তো কাল ওখানে। তার যেখানেই যেতাম না কেন, আমাকে আর দাদাকে এক ঘরে শশাশি বাটে ঘুমাতে হত। বাবা অফিস নিয়ে ব্যস্ত আর মায়ের শরীর খুব একটা ভালো থাকত না কখনোই। সারা গা সাদা সাদা, ফোলা ফোলা। চোখের তলায় কালি। না সারাদিন জানলার ধারে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন দেখত। আমরা কাছে গেলে বড়োজোর বলত, “এসেছিস?”
“মন দিয়ে পড়ছিস তো?” কিংবা “যা, বাইরে গিয়ে খেল।” আবছা শুনতাম মায়ের রক্তে কী একটা অসুখ আছে। আগে ছিল না। আমি জন্মানোর পর থেকেই মা এমনধারা হয়ে গেছে। একা একা কথা বলে, গুনগুন গান গায়। লোক এলে মুখ ফিরিয়ে থাকে। যেখানেই যেতাম, পাড়ার মেয়ে-বউরা প্রথম প্রথম মায়ের সঙ্গে আলাপ জমাতে আসত। পরে মায়ের ভাবগতিক দেখে আর এধার মাড়াত না।
দাদা অবশ্য একা একাই পাড়া জুড়ে ঘুরে বেড়াত আর আজব সব গল্প জোগাড় করে নিয়ে আসত। ওর মতে, এর একটাও গল্প না। সব সত্যি! তখন আমি বেশ ছোটো। বাবা বাঁকুড়ার সোনামুখীতে পোস্টিং। যথারীতি সঙ্গে আমরাও আছি। সেবার দাদাই আমাকে প্রথমবার নিশির কথা বলেছিল।
“নিশি কাকে বলে জানিস?”
“জানব না কেন? নিশি মানে তো রাত্রি।”
“ধুর বোকা! তুই কিচ্ছু জানিস না। আমাদের ক্লাসের অনির্বাণ আজ আমাকে বলেছে। নিশি হল সবচেয়ে ভয়ানক ভূত। কোনও তান্ত্রিক যদি কারও ক্ষতি করতে চায় তবে প্রথমে একটা সবুজ ডাবের ছাল ছাড়িয়ে তাতে সিঁদুর মাখায়। তারপর সে ডাবের মুখ খুলে মাঝরাতে মন্ত্র পড়ে জলকে জাগিয়ে তোলে। আরও কীসব কীসব করার পরে সেই ডাব হাতে নিয়ে অমাবস্যার নিশুতি রাতে যাকে নিশি ডাকা হবে, তার বাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। সেখানেই ওই ডাবের ভিতর
থেকে ভেসে আসে ডাক, যা শুনলে তোর মনে হবে কোনও চেনা মানুষ তোকে ডাকছে। এই ডাকে যদি তুই একবার সাড়া দিয়ে দিলি, কি মরলি। তান্ত্রিক সেই ডাবের মুখটি খপ করে বন্ধ করে দেবে। আর সঙ্গে সঙ্গে তুই হার্টফেল করে মারা যাবি। তবে হ্যাঁ, শুনেছি নিশিরা দুবারের বেশি কাউকে ডাকতে পারে না। এই অঞ্চলে নিশির ভারী উপদ্রব। তাই রাতে তিনবার নিজের নামে ডাক শুনলে তবেই উত্তর দিবি, বুঝলি?”
প্রথম দুইদিন কিচ্ছু হল না। তৃতীয় দিন, তখন অনেক রাত। আচমকা গরমে ঘুম ভেঙে গেল। ফ্যান চলছে না। এদিকটায় লোডশেডিং-এর ভারী উপদ্রব। আমাদের বাংলোর ঠিক বাইরে আমার মাথার কাছে একটা কাঠবাদাম গাছ ছিল। ওটার পাতার সরসরানি আওয়াজে আমার গা হাত পায়ে কেমন শিরশির করত বলে জানলা বন্ধ রাখতাম। দেখি সেই জানলার পাল্লা দুটো কীভাবে নিজে থেকেই খুলে গেছে। খোলা জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকছে চাঁদের আবছা আলো। একটা খিদে খিদে ভাব আমার নাভি থেকে পাকিয়ে উঠতে লাগল। আমি স্থির হয়ে দেখতে থাকলাম বাদাম গাছের ধারে একটা অন্ধকার ধীরে ধীরে জমাট বাঁধছে। আর তারপরেই দাদার গলা পেলাম। ঠিক জানলার বাইরে থেকে। স্পষ্ট। নির্ভুল।
“সানি…”
উত্তর দিতে যাচ্ছিলাম, এমন সময় চমকে পাশে তাকিয়ে দেখি দাদার বিছানায় দাদা চাদরমুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। এ তবে কে? দাদা তো নয়। তবে কি…
আবার ডাক ভেসে এল জানলা দিয়ে। এবার আরও কাছে। “সানি-ই-ই…”
আমি ভয়ে পাথর হয়ে গেছি। নড়তে পারছি না। কেউ যেন মন্ত্রবলে আমাকে পুতুল বানিয়ে দিয়েছে। আমি শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি খোলা জানলার দিকে। কাঠবাদাম গাছের পাশের ছায়াটা এবার অবয়ব নিয়েছে। সেই অবয়ব অবিকল আমার দাদার মতো। ধীর পায়ে জানলার ধারে এসে রড ধরে সেই ছায়ামূর্তি খিলখিল হেসে উঠল, “সানি ভয় পেয়েছে। সানি ভয় পেয়েছে। ভীতু, সানি ভীতু!”
শুধুমাত্র আমাকে ভয় পাওয়ানোর জন্য শয়তানটা কোলবালিশকে মানুষের মতো শুইয়ে, পাখা বন্ধ করে চুপিচুপি এই মাঝরাতে ঘরের বাইরে কাঠবাদাম গাছের তলায় বসে মশার কামড় খেয়েছে। মানুষ হিসেবে নেহাত খারাপ ছিল না দাদা। আমি যখন ভয় পেয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতাম, ও এসে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিত। বলত, “সরি সানি। সত্যি বলছি। এই বিশ্বাস কর। মা কালীর দিব্যি। আর কোনও দিন যদি তোকে ভয় দেখাই তো আমার নাম বদলে ফেলব।” এক হপ্তা ঘুরতে পারত না। আবার যে কে সেই।
যেন কোনও গোপন কথা বলছে, এমনভাবে বলত, “অ্যাই সানি, খবর শুনেছিস?”
“কী খবর?”
“গত সপ্তাহে বাপ্পা গুন্ডা পুলিশের গুলিতে মারা গেল জানিস তো?”
বাপ্পা গুন্ডাকে আমরা সবাই চিনতাম। গায়ের রঙ পুড়ে কালো, চোখদুটো কয়লার মতো, কণ্ঠে কর্কশ গর্জন। রাত হলেই সে আমাদের গলির মোড়ে এসে দাঁড়াত। হাতে লোহার রড। টাকার ব্যবসায়ীদের হুমকি দিত। না দিলে ইচ্ছেমতো পেটাত। রাতে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। তার মধ্যেই পুলিশ আচমকা ওঁর বাড়ি ঢুকে পড়ে। প্রাণে বাঁচতে বাপ্পা গুলি চালায়। পুলিশও পালটা গুলি চালায়। আর তাতেই বাপ্পা মরে যায়। এসব দাদার থেকেই শুনেছি।
“হ্যাঁ। পুরোনো খবর। তুই-ই তো বললি সেদিন” বললাম আমি।
“সে তো বলেছি, কিন্তু আজ নতুন খবর পেলাম। শুনবি?”
আমি বুঝে গেছি আবার কোনও ভয়ের গল্প বলবে। তাই আগে থেকেই বললাম, “আমি শুনতে চাই না।”
“চাই না বললেই হবে? আমি শোনাতে চাই। অদ্ভুত ঘটনা। শুনলে চমকে যাবি। “তাও শুনতে চাই না।”
“বাপ্পা গুন্ডা মরার পর দানো হয়ে গেছে।”
“দানো? সে আবার কী?” আপনাআপনিই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল।
“সে কী! তুই দানো জানিস না? পাপী মানুষের মৃতদেহে অতৃপ্ত আত্মারা বাসা বাঁধে। বাপ্পাকে তো পোড়ানো যায়নি। যতবার চিতায় আগুন লাগাচ্ছে, ততবার নিভে যাচ্ছে। শেষমেষ বাপ্পাকে কবর দেওয়া হল কালীবাড়ির পেছনের পুরোনো শ্মশানে আর সেখান থেকেই যত সমস্যা।”
“কী সমস্যা?”
“কদিন আগে আমাদের ক্লাসের মিঠু টিউশন থেকে ফিরছিল, হাতে টর্চ। হঠাৎ টর্চের আলোয় দেখতে পেল কালীবাড়ির মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কেউ। মাথা নিচু, সারা শরীর ভেজা, আর চোখদুটো টকটকে লাল। যেন টুনিবাতি জ্বলছে।
“কে… কে ওখানে?” মিঠু কাঁপা গলায় বলতেই লোকটা ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল। ঠোঁটের কোণে বিকৃত, রক্তমাখা হাসি। মিঠু আর দাঁড়িয়ে থাকতে সাহস করেনি। সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে বাড়ি ফিরে আসে, আর সেই রাতে ধূম জ্বর।”
“তারপর?”
“তারপরেই তো আসল খবর। বাপ্পার পুরোনো সঙ্গী মন্টু, যে এখন স্টেশনে চায়ের দোকানটা চালায়, পরশু যখন দোকান বন্ধ করছিল তখন রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা হবে। সঙ্গে ওদের আর এক বন্ধু পলাশও ছিল। হঠাৎ ওদের কানে এল টুং… টুং… করে একটা ধাতব আওয়াজ। কেউ যেন রড মাটিতে ঠুকছে।
“কে ওখানে?” পলাশদা জিজ্ঞাসাও করেছিল, কিন্তু কোনও উত্তর নেই। হঠাৎ দোকানের পেছনের অন্ধকার থেকে ভেসে এল একটা গলা—
“কিরে, আমায় চা দিবি না মন্টু?”
দুজনেরই গলা শুকিয়ে গেল। দুজনেই এই গলা চেনে- বাপ্পার গলা। পলাশদা আমায় নিজে বলেছে ধীরে ধীরে ছায়া থেকে বেরিয়ে এল বিরাট একটা বিশাল শরীর। মুখ অন্ধকারে ঢাকা, শুধু চোখে আগুন। তার বাঁ-হাতে একটা লোহার রড, ডান হাতের আঙুলগুলো লম্বা, ধারালো, যেন নখ নয়, ছুরি।
“তুই আমায় ধরিয়ে দিলি মন্টু, তুইই তো পুলিশকে বলেছিলি আমি কখন ঘরে থাকব” দানোটা ফিসফিস করে বলল।
তারপর পলাশদা আর দাঁড়ায়নি। প্রাণপণে ছুটে গিয়ে লোকজন জোগাড় করে ফিরেছিল। সবাই আলো নিয়ে এসে দেখল দোকানের ভেতর পড়ে আছে মন্টুর দেহ। চোখদুটো নেই, গলা পেঁচানো। আর দেওয়ালে রক্ত দিয়ে লেখা “আমি ফিরেছি।”
এসব শুনেই আমার হয়ে গেছে। তাঁর উপরে দাদা আবার বলল, “তুইও সাবধানে থাকিস।”
“আমি কেন?”
“কাল নাকি কালীবাড়ির পিছনে বাপ্পার কবর নড়তে দেখা গেছে। মাটি ফেটে বেরোচ্ছে একটা হাত। কালো কালো, ফোলা ফোলা, নখগুলো যেন কাস্তে। চারিদিকে পচা দেহের সঙ্গে পোড়া মদের গন্ধ।”
সে রাতে ঘুম আসেনি আমার। একেবারে ভোরের দিকে একটু চোখ লেগেছে কি লাগেনি, ঘুমের মধ্যেই মনে হল কেউ আমার পা ধরে টানছে। আমি চিলচিৎকার করে উঠে বসতেই হা হা করে হাসতে হাসতে আবার দাদা ঘুরে ঘুরে বলতে লাগল, “সানি ভয় পেয়েছে। সানি ভয় পেয়েছে। ভীতু, সানি ভীতু!”
এরপরের টানা সাতদিন ওর আমাকে সরি বলতে হয়েছে। তারপর কথা বলেছি।
.
॥ ২॥
বাঁকুড়ায় প্রায় দেড় বছর কাটানোর পর একদিন বাবা অফিস থেকে বেশ হাসিমুখে ফিরল। তখন জুন মাস। প্রচণ্ড গরমে সবাই হাঁসফাঁস করছি। মা বিছানায় শুয়ে কী একটা বই পড়ছিল। বাবা ঘরে ঢুকেই বলল—
“ভালো খবর আছে লিলি। আমার ট্রান্সফার অর্ডার এসেছে।
“আবার ট্রান্সফার?” ক্লান্ত গলায় বলল মা।
“আরে, যেমন তেমন ট্রান্সফার না। একেবারে দার্জিলিং-এ। একবার ওদিকে গেলে অন্তত পাঁচ-সাত বছরের জন্য আর নিচে নামাবে না। পাহাড়ে দারুণ দারুণ সব ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলও আছে। অনি আর সানিকে ভরতি করে দেওয়া যাবে। কী বলো?”
“আবার দার্জিলিং?”
“কেন, দার্জিলিং-এ সমস্যাটা কোথায়?”
“তুমি জানো না?”
“উফফ! এখনও তুমি সেই কবেকার কথা ধরে বসে আছ? ওসব ভুলে যাও।”
“তুমি ভুলে যেতে পারো রাজীব। আমি পারি না। তোমার অফিস আছে, বন্ধু আছে, ক্লাব আছে… আমার কী আছে বলো? এই ঘরটুকু ছাড়া?”
“সব কিছুর জন্য তাহলে আমিই দায়ী?” বাবার গলা চড়তে শুরু করেছে।
“আমি সেকথা বলিনি। কিন্তু তুমি জোরাজুরি না করলে সেদিন রাতের বেলায় আমি কিছুতেই মুর্দাহাটি যেতাম না। ডোমা বারণ করেছিল, লোবসার বারান করেছিল। বলেছিল, পোয়াতি মহিলার ওসব জায়গায় যেতে নেই। শেষে আমিও মানা করেছিলাম। বারবার। কিন্তু তুমি শুনলে তো? চিরটাকাল নিজে যা ভালো বুঝেছ করে এসেছ। কী? না, অ্যাডভেঞ্চার করবে… হল তো অ্যাডভেঞ্চার?”
বাবা চুপ। খানিক বাদে যখন বাবার গলা পেলাম। ক্লান্ত, বিষণ্ণ। মনে হল অন্য মানুষের গলা—
“মুর্দাহাটিতে সেই রাতে তুমি হারিয়ে যাবার পর সারারাত তোমায় খুঁজেছি আমি। আমি কেন? লোকাল লোকজন, পুলিশ সবাই। কেউ তোমায় দেখতে পায়নি, বিশ্বাস করো। আচ্ছা, তোমার এখনও মনে নেই সেই রাতে কী হয়েছিল?”
“মনে থাকলে কি এত বছর চুপ থাকি? তোমরাই তো বলেছ নিবেদিতার সমাধির একধারে পরদিন সকালে আমায় অজ্ঞান অবস্থায় কুড়িয়ে পেয়েছিলে।
“হ্যাঁ, কিন্তু রাতে আমি নিজে ওই জায়গাটা দিয়ে কতবার গেছি, তোমার নাম ধরে ডেকেছি। তুমি ওখানে ছিলে না।”
“আর তারপর থেকেই আমার এই অবস্থা। ভেবেছ কোনও দিন?”
“এ তোমার মনের ভ্রম লিলি। তুমি শুরু থেকেই অ্যানিমিক ছিলে। সানি হবার পর সেটা বেড়েছে। এর মধ্যে অন্য কিছুকে টেনে আনছ কেন? তুমি এখনও লোবসাং-এর কথা ধরে বসে আছ। সানি তো বড়ো হয়ে গেছে। এখন আর কীসের চিন্তা? যা হোক, তুমি দার্জিলিং যাবে কি না বলো। অতি কষ্টে এই অর্ডারটা করিয়েছি। তাহলে কাল গিয়ে ক্যানসেল করিয়ে আসব।”
মা এবার বিড়বিড় করে কী বলল, গোটাটা শোনা গেল না। শেষটায় শুধু শুনতে পেলাম, “দ্যাখো, তুমি যা ভালো বোঝো।”
দিন পনেরো যেতে না যেতেই আমরা সপরিবারে দার্জিলিং গিয়ে উপস্থিত হলাম। বুঝতে পারিনি, সেই আমাদের দুর্ভাগ্যের শুরু।
.
॥৩॥
দার্জিলিং-এ লেবং কার্ট রোডে রায় ভিলা ছাড়িয়ে একটা খোলা মাঠের মতো জায়গায় প্রায় একশো বছরের বেশি পুরোনো একটা বাংলোবাড়িতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। বাড়িটা আকারে বেশ বড়ো। সাহেবি কেতায় বানানো। সবুজ রঙের চাল আর লাল ইটের দেওয়াল। সামনের পোর্টিকোতে অযত্নে ফুটে আছে গোছা গোছা হলিহক আর রডোডেনড্রন। সামনে কাঠের গেট। আমি জানি এই ধরনের গেটকে সাহেবরা উইকেট বলে। সামনের লনে একটা পুরোনো সাদা দোলনা। দমকা বাতাস এলে সেটা এলোমেলো দোল খায়। এই জায়গাটা বেশ গা-ছমছমে। দিনের বেশিরভাগ সময় ঘন কুয়াশা জড়িয়ে থাকে গোটা বাড়িটাকে। বড়ো বড়ো গাছের ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝেই বৃষ্টি ঝরে পড়ে। বাতাসে শনশনে জোলো ঠান্ডা। ঘরগুলোতে কেমন একটা স্যাঁৎসেঁতে ভেজা ভেজা ভাব। দেওয়ালে ওক আর মেহগনি কাঠের প্যানেলিং, ফায়ারপ্লেস এইসব দেখে বোঝা যায় এককালে কোনও সাহেব এই বাড়িতে থাকতেন। একটা ব্যাপার অবাক করার মতো। আমাদের বাংলোটা যেখানে, তার আশেপাশে আর একটাও বাড়ি নেই। দূরে যে কটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাড়ি দেখতে পাই, তাতেও লোকজন বেশি থাকে না। পাশের নেপালি বস্তিতেও কোনও ছোটো ছেলেমেয়ে নেই। সবাই বুড়োবুড়ি।
বছরের মাঝে এখানে এসেছি। তাই এই বছর নতুন স্কুলে ভরতি হওয়া যাবে না। দাদা সকালের ব্রেকফাস্ট খেয়েই ঘুরতে বেরিয়ে যেত। আমি ঘর ছেড়ে বেরোতাম না। আমার ভালো লাগত না। বাবা আর দাদা বেরিয়ে গেলেই আমি ওই বিরাট বাংলোটার এ ঘর ও ঘর ঘুরে বেড়াতাম। গোটা বাংলোতে বারোখানা ঘর! রান্নাঘর, খাবার ঘর আলাদা। দোতলার গোটা লবিতে একের পর এক অচেনা সাহেব মেমসাহেবদের অয়েলপেন্টিং। অযত্নে কালো হয়ে গেছে। কিন্তু তবু এত জীবন্ত, যে মাঝে মাঝে মনে হয় আমার দিকে তাকিয়ে আছে। লবির একেবারে শেষ প্রান্তে বিরাট এক লাইব্রেরি রুম। একদিন সেই ঘরে ঢুকলাম।
প্রায় ছাদ অবধি উঁচু সব কাচে ঢাকা আলমারি। সব আলমারিতে থরে থরে রাখা চামড়া বাঁধানো সোনার জলে লেখা সব বই। আমি পাল্লা ধরে টানাটানি করেও খুলতে পারিনি। জানি না এদের চাবি কার কাছে আছে, কিংবা আদৌ আছে কি না। একেবারে নিচের একটা আলমারির পাল্লা আধখোলা ছিল। উবু হয়ে বসে টান দিতেই খুলে গেল। ভিতরটা ফাঁকা। অবশ্য একেবারে ফাঁকা না। ঝুলে জড়াজড়ি বিরাট একটা চামড়া বাঁধানো বই এক কোণে অযত্নে পড়ে আছে। দুইহাতে বইটা টেনে বার করে উলটাতেই চমকে উঠলাম। এ কেমন বই? আমার কোনও চেনা বইয়ের সঙ্গে বিন্দুমাত্র মিল নেই এই বইয়ের। হাতে নিয়েই বুঝলাম এই বইয়ের পাতাগুলো কাগজ না। কোনও প্রাণীর দেহ থেকে ছাড়ানো চামড়া। পাতায় পাতায় হাতে আঁকা অচেনা সব চিহ্ন, মূর্তি আর জন্তুর ছবি। বইয়ের একটি অক্ষরও আমার চেনা কোনও অক্ষর না। ছবিগুলো যেন এইমাত্র নরক থেকে উঠে এসেছে। কোনও ছবিতে বাদুড়ের ডানাওয়ালা একটা দানবের মাথায় কিলবিল করছে সাপের দল। সেই দানব বিরাট বড়ো হাঁ করে এক নারীর হাত পা ছিঁড়ে চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে। কোনও ছবিতে লেলিহান আগুনে জ্যান্ত পোড়ানো হচ্ছে মানুষদের। যে পোড়াচ্ছে, তার দেহটা মানুষের মতো কিন্তু মাথাটা মোরগের। সারা গা সবুজ আঁশে ঢাকা। একেবারে শুরুর পাতায় কালচে লাল কালিতে ছড়ানো প্যাঁচানো অক্ষরে ইংরাজিতে লেখা, কম্প্যানডিয়াম অফ ডেমোনোলজি রিটেন ইন ব্লাড বাই ড্যানিয়েল ই ম্যাগাস (১৮৯১), বাউন্ড ইন দ্য স্কিন অফ হিউম্যান। মানুষের রক্তে লেখা, মানুষের চামড়ায় বাঁধানো বই? এও সম্ভব? বইয়ের মলাটে ধীরে ধীরে হাত বোলাতে লাগলাম। বহুদিনের অব্যবহারে সে চামড়া খসখসে হয়ে গেছে। তবু ভালো করে দেখলে রোমকূপগুলো পরিষ্কার বোঝা যায়। ধুলোতে চামড়া ছাই ছাই রঙা হয়ে গেলেও ধুলো ঝাড়তেই বইয়ের পিছনের মলাটে মস্ত বড়ো লালচে একটা জঙুলের ছাপ দেখতে পেলাম। আর তখনই গোটা ব্যাপারটার বীভৎসতা আমার মাথায় এল। আর এক মুহূর্ত এই ঘরে না।
আর ঠিক তখনই আওয়াজটা শুনতে পেলাম। কিচ-কিচ-কিচ। কেউ জং ধরা লোহার উপরে আরও একটা ধাতব কিছু নিয়ে ঘষছে। আওয়াজটা এই ঘরেই কোথাও হচ্ছে। ইঁদুর নাকি? কিন্তু এই ঘরে ইঁদুর থাকলে বইয়ের এতদিনে দফারফা হবার কথা। তা তো হয়নি। ধীর পায়ে উঠে কান পেতে শোনার চেষ্টা করলাম। আওয়াজটা হয়েই চলেছে। কিচ-কিচ-কিচ। কখনও দ্রুত লয়ে হচ্ছে, কখনও বা ধীরে। কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না। এক পা এক পা করে দেওয়ালের দিকে এগিয়ে গেলাম। দেওয়ালের ধুলোপড়া প্যানেলের ফাঁক দিয়েই আসছে আওয়াজটা। দেওয়ালে কান দিলাম। এবার আমি নিশ্চিত। আওয়াজের উৎস এই দেওয়ালই। সবজেটে ফুল আঁকা ওয়ালপেপার খসে পড়েছে অনেকটাই। কালো পাউডারের মতো গুঁড়ো গুঁড়ো ছত্রাক বাসা বেঁধেছে দেওয়াল জুড়ে। আওয়াজটা এবার খানিক বদলে গেল। কে যেন ভারী কিছু দিয়ে মেঝেতে ঠুকছে। কে আছে এই ঘরে? দাদা? কিন্তু একটু আগেই তো দাদাকে শিস দিতে দিতে বেরিয়ে যেতে দেখলাম। বলল এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে। তবে এই দেওয়ালের ভিতরে কে? অল্প একটু চাপ দিতেই দেওয়ালে লম্বালম্বি একটা ফাটল তৈরি হল। একটু চাপ দিতেই সরে গেল দেওয়ালের প্যানেলিং। দেওয়ালের ওপাশেও একটা ঘর আছে তবে? বাড়ির তেরো নম্বর ঘর? গোপন কুঠুরি!
এমন ঘর সাধারণত অন্ধকার হয়। কিন্তু এটা তেমন না। একপাশের ছোটো একটা বো-উইন্ডো দিয়ে তেরছা আলো ঢুকছিল। ঘরের প্রায় বেশিরভাগটাই ফাঁকা। দেওয়ালের রং কুচকুচে কালো। ঘর জুড়ে চাপা একটা গন্ধ জমাট বেঁধে রয়েছে। এমন গন্ধ আমি একবারই পেয়েছিলাম। বাজারে যেখানে খাসি কাটা হয়, তার পাশে। বাড়ি এসে হড়হড়িয়ে বমি করেছিলাম। রক্তের গন্ধ এমনই হয়। বলেছিল বাবা। অবিকল সেই গন্ধ। শুধু অনেকদিনের বাসি। মেঝেতে বেশ কিছু শিকল আর আংটা বাঁধা। একধারে দেওয়ালে একটা বিরাট বড়ো র্যাক। তাতে ঝুলছে অদ্ভুতদর্শন সব প্লায়ার, সাঁড়াশি, গজাল আর তুরপুন। টেবিলে থরে থরে সাজানো গোটা দশেক জং ধরা ছুরি, একটা মাংস কাটার চপার, কাঠের হাতল দেওয়া একটা হাতুড়ি আর দুই দাঁতওয়ালা বিরাট কাঁটাচামচের মতো কী একটা। কিন্তু এসব এখানে কেন? কী হত এই ঘরে?
“অ্যাই সানি, বাবাকে বলে দেব?”
দাদা কখন চুপিচুপি এই ঘরে এসে ঢুকেছে টেরই পাইনি।
“না, তুই বলবি না!”
“হ্যাঁ, বলবই বলব। তোকে না বাবা বলেছে এই পুরোনো বাড়িতে ঘোরাঘুরি করবি না! এখনও সব মেরামত করা হয়নি। কখন কী বিপদ ঘ… বলেই দাদার চোখ পড়ল গোটা ঘরে, “ওহ মাই গড! এটা কীসের ঘর রে? কোথায় ছিল এটা?”
“গোপন ঘর। আজকেই খুঁজে পেয়েছি। তবে কী কাজে লাগত তা জানি না। আর জানি না বলেই তো দেখছিলাম।”
দাদা কিছু না বলে ধীর পায়ে র্যাকের দিকে এগিয়ে গেল।
“বাপ রে! এ তো কোনও অপারেশন থিয়েটার মনে হচ্ছে! মেঝেতে এই আংটা আর শিকল কী করছে?”
“জানি না। তুই জানিস?”
“নাহ। জানতে চাইও না। সানি, এই ঘরটা থেকে চল। আমার কেমন একটা লাগছে।”
“ভয় পাচ্ছিস?”
“ভয়? ফুঃ!” বলল বটে, কিন্তু বোঝাই গেল ও ভয় পেয়েছে।
“তুই যে বললি কোন এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাবি? গেলি না?”
“গেছিলাম। কাজ হয়নি। আবার কাল যাব।”
“কেন?”
“পরে বলব।”
আমরা দুজন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলাম। দাদাকে কথা দিলাম আমি আর কোনও দিন ওই ঘরে ঢুকব না। ঢুকলে ও বাবাকে বলে দেবে। কিন্তু অদৃশ্য এক চুম্বকের মতো ওই ঘর আমাকে টানতে লাগল। আমার এই ছোট্ট জীবনে এমন টান আর কারও উপরে অনুভব করিনি কোনও দিন। মনে হল ঘরের সেই যন্ত্রপাতিগুলো, সেই গন্ধ, সেই কালো কুচকুচে দেওয়াল আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এ ডাক উপেক্ষা করা যায় না। ঘরে যাবার ইচ্ছেটা কিছুতেই সামলাতে পারছি না। ও ঘরে আমাকে যেতেই হবে, না হলে আমার সব সুখ চলে যাবে। রাতে খেতে বসে আচমকা সেই গন্ধটা নাকে ভেসে এল। রক্তের গন্ধের সঙ্গে পচা ক্ষতের গন্ধ মেশানো। উলটে বমি চলে এল।
“কি রে তুই খাচ্ছিস না কেন?” খাবার টেবিলে বাবা জিজ্ঞাসা করল।
“খিদে নেই।”
“খিদে নেই? তোর খিদে নেই? কেন?”
“জানি না। খেতে ইচ্ছে করছে না।”
দাদা আড়চোখে আমার দিকে তাকাল। ভাবটা এমন, “দেব বাবাকে বলে?” আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম।
বাবা বলল, “একদম না খেয়ে ঘুমাস না। একটু স্যুপ খেয়ে নে।”
“ইচ্ছে করছে না বাবা।”
“তাহলে ছাড়। শুতে যা।”
.
ঘুমোতে এসে দাদা প্রায় জেরা করার মতো আমাকে চেপে ধরল। “সত্যি কথা বল। জন্ম থেকে যে ছেলে শুধু খাইখাই করে গেল, সে সোজা ডিনার না খেয়ে শুয়ে পড়ছে! ব্যাপারটা কী চাঁদু?”
“বললাম তো আমার খিদে নেই।
“দুপুরের ঘটনায় ভয় পেয়েছিস?”
“না। আমি কেন ভয় পাব? ভয় তো তুই পেলি?”
“ধুর পাগলা! যাক গে। একরাত না খেলে কিছু হয় না। ঘুমিয়ে পড়। “হুঁ। কিন্তু তুই যে তখন কী একটা কথা বলবি বলেছিলি?”
“বলেছিলাম, তাই না?” হাই তুলে দাদা বলল, “আজকে বড্ড ঘুম পাচ্ছে। রাতে মাংসটা বড্ড ভালো রেঁধেছিল। এখন ঘুমাতে দে। কাল বলব। প্রমিস।”
আর পরদিনই দাদা আচমকা হারিয়ে গেল।
.
।।৪।।
সেইদিনটা শুরু হয়েছিল অন্য দিনগুলোর মতোই। আকাশ মেঘলা। যেন এখুনি বৃষ্টি নামবে। দূরে সবুজ পাহাড় কালচে লাগছে। মাঝেমধ্যে একটা শনশনে হাওয়া এসে জানলার কাচে ঠকঠক শব্দ করে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। সকালে ফলের রস, স্যান্ডউইচ আর সেদ্ধ ডিম দিয়ে আমাদের ব্রেকফাস্ট হত। বাবার অফিসে জরুরি মিটিং ছিল। সকাল সকাল খেয়েদেয়ে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল বাবা। অন্য দিন দাদাও পাড়া চরতে বেরিয়ে যায়। সেদিন গেল না। অনেকক্ষণ ধরে বিছানায় পড়ে রইল। আমি জানতাম ও ঘুমাচ্ছে না। ভান করছে শুধু। বেলা করে উঠে আমায় জিজ্ঞেস করল, “খেয়েছিস?”
মিথ্যে কথা বললাম, “হ্যাঁ। তুইও খেয়ে নে।
বুঝতে পারছিলাম মনে মনে ও বেশ উত্তেজিত। কিন্তু অন্য কেউ যাতে কিছু না বুঝতে পারে, তাই চুপ করে আছে। সকাল থেকে দুপুর অবধি বই পড়ার ভান করে খাটেই বসে রইল। কিন্তু পড়ছিল না। বারবার ঘড়ি দেখছিল। বিকেল চারটে বাজতেই তিরের মতো ছিটকে উঠে দাঁড়িয়ে “আমি একটু ঘুরে আসছি” বলে মাথায় টুপি, গায়ে সোয়েটার পরে বেরিয়ে গেল।
বাবা সেদিন অন্য দিনের তুলনার একটু দেরি করেই ফিরল। ঘড়ির কাঁটা ততক্ষণে আটটা পেরিয়ে গেছে।
দাদার দেখা নেই।
আমি প্রতি মুহূর্তে ভাবছি এই বুঝি দাদা এল। দাদা ফিরছিল না।
বাবা ঘরে ঢুকে আমাকে একলা সোফায় বসে বই পড়তে দেখে প্রশ্ন করল, “তুই একা বসে কী করছিস? অনি কোথায়?”
আমি ভয়ে ভয়ে জানালাম, “বেরিয়েছে। এখনও ফেরেনি।”
“ফেরেনি মানে? কখন বেরিয়েছে?”
“বিকেল চারটের সময়।”
“বিকেল চারটেয় বেরিয়ে এখনও ফেরেনি? কোথায় গেছে?”
“জানি না।”
“তোর মা জানে?”
আমি মাথা নাড়লাম, “না।”
“হোয়াট দ্য হেল! কী চলছে এই বাড়িতে?” বলে বাবা স্যুট বুট পরেই সোজা ঢুকে গেল মায়ের ঘরে। মায়ের আয়া ইয়াংজি তখন মাকে চুল বেঁধে দিচ্ছিল। বাবাকে ওভাবে ঢুকতে দেখে মা-ও থতোমতো খেয়ে গেল।
“কী হয়েছে তোমার?”
“কী হয়েছে মানে? অনি কোথায় গেছে?”
মা আমতা আমতা করতে লাগল। আমাদের রোজকার জীবনযাপনে মায়ের সরাসরি যে কোনও যোগাযোগ ছিল না, সেটা সবাই জানলেও এই কঠিন সত্যের উপরে একটা আলগা পর্দা দেওয়া থাকত। সেদিন বাবা নিজে থেকেই সেই পর্দাটা ছিঁড়ে ফেলবে বলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে উঠেছিল।
“জানো না, তাই তো? তোমার ছেলে বিকেল চারটেয় বেরিয়ে এখনও ফেরেনি। খোঁজ রাখো তার?”
মা খানিক চুপ থেকে বলল, “রাখিনি। কারণ আমার এই শরীর নিয়ে ঠিকঠাক নড়তেচড়তেই পারি না, তো ছেলেদের খোঁজ রাখব কেমন করে? মরেই তো গেছিলাম সেই রাতে…”
বাবা মাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “ওহ স্টপ ইট। কিছু হলেই তুমি এই এক ইস্যু নিয়ে শুরু করো।”
“করব না কেন? একশোবার করব। বাপ-মা মরা মেয়েকে বিয়ে করেছিলে বলে যা খুশি তাই বলে যাবে, তাই না? আমি সব জানি। অজ্ঞান হয়ে যাইনি। মরেই গেছিলাম। সানিও পেটের ভিতরে নড়াচড়া বন্ধ করে দিয়েছিল। শেষে লোবসাং ওর চেনা কোন এক ওঝাকে ডেকে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিল। তুমি বারবার মানা করেছিলে… বলেছিলে এসব বুজরুকি… কি, তাই তো? আমি কোনও দিন অ্যানিমিক ছিলাম না। যা হয়েছে, সেই রাতের পরে হয়েছে। ভুমি সবাইকে ভুল বোঝাও। কিন্তু নিজের বিবেককে বোঝাতে পারবে তো?”
এতগুলো কথা বলতে বলতে মা হাঁফিয়ে পড়ছিল। ইয়াংজি বারবার বলে চলেছিল, “ম্যাডামজি, শান্ত হনুস। ঢিলো, ঢিলো।”
কিন্তু মাকে থামানো যাচ্ছে না। হাঁফাতে হাঁফাতেই বলে চলল, “সানিকে নিয়ে লোবসাং কী বলেছিল মনে আছে তো? তারপরেও তুমি আমাদের এখানে…” বাবা আর বাকিটা শোনার জন্য অপেক্ষা করল না। আমার হাত ধরে “সানি চল, অনিকে খুঁজে নিয়ে আসি”, বলে একটা পাঁচ সেলের টর্চ হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। মা পিছন থেকে চিৎকার করে মানা করল। বাবা শুনল না।
দার্জিলিং-এর লেবং বস্তির সবাই ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। শুনশান রাস্তায় ইতিউতি শোনা যাচ্ছে কুকুরের ডাক। দূর পাহাড়ে জোনাকির মতো জ্বলা নেভা আলোর মালা আর ডিপার জ্বালিয়ে চলে যাচ্ছে মোটরগাড়ি।
“অনি, অনি… অনি…”
“দাদা…আ…আ…”
আমি আর বাবা ডাকতে ডাকতে এগিয়ে চললাম। খানিক এগোতেই একটা পুরোনো চার্চ আর তার পিছনেই সেই সাহেবি কবরখানাটা। দাদা প্রথম দিনই আমাকে এখানে যেতে মানা করে দিয়েছিল। কবরখানার কাছাকাছি এগোতেই আমার চেনা সব মরা মানুষদের কথা মনে এল। আমার সেই যমজ বোনটা, যাকে আমি কোনও দিন দেখিনি, যে জন্মাবার আগে পেটের মধ্যেই মারা গেছিল, কিংবা বাবার মৃত ছোড়দা, বাঁকুড়া থাকতে মাঝে মাঝেই যিনি জামরুল গাছ থেকে নেমে আসতেন আমার সঙ্গে খেলার জন্য, অথবা যশোর রোডে আমাদের গাড়ির পাশাপাশি লম্বা লম্বা পা ফেলে হেঁটে চলা সেই মহিলা, যার মুখের অর্ধেকটা পোড়া…
আমি বাবার আঙুলগুলো এত জোরে ধরে রেখেছিলাম যে বাবার ব্যথা লাগছিল। “আস্তে… কী হল সানি? তুই কি ভয় পাচ্ছিস?”
আমাদের চমকে দিয়ে বহুদূর থেকে একটা আওয়াজ ভেসে এল। বাঁশির আওয়াজ। এ বাঁশির আওয়াজ এখানে এসে আমি আগেও শুনেছি। মানুষের হাড় দিয়ে তৈরি বাঁশি। স্থানীয় নেপালিরা এই বাঁশি দিয়ে ভূত তাড়ায়।
“অনি-ই-ই” ডাকতে গিয়ে শেষের দিকে বাবার গলাটা কেঁপে গেল। বাবাও কি তবে ভয় পেল? কিন্তু বাবারা কি ভয় পায়? বাবারা তো সুপারহিরো!
ঠিক সেই সময় আমি দাদাকে দেখতে পেলাম। মূল রাস্তা থেকে পাশে বনের দিকে একটা কাঁচা সড়ক চলে গেছে। সেখানে বিরাট একটা হলঘর মতো আছে। ঠিক কবরখানাটার পাশেই। আগুনে পুড়ে গোটা ঘর কালচে হয়ে গেছে। দেখতে পেলাম দাদা মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই ঘরের লোহার দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দরজা আধভেজানো। আমার মনে হল ঘরের ভিতর থেকে কারা দাদাকে ডাকছে আর দাদা কোনও দিকে না তাকিয়ে সেদিকেই ভূতে পাওয়া মানুষের মতো হেঁটে চলেছে।
আমি জানি না আমার কী হল। এক মুহূর্তে বাবার হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে গিয়ে আমি দাদাকে জড়িয়ে ধরলাম। আর সঙ্গে সঙ্গে জোরে আওয়াজ করে সেই ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। দাদার চোখে ফ্যালফ্যালে দৃষ্টি। মনে হচ্ছে সদ্য ঘুম থেকে উঠল। বাবা বেজায় বকল দাদাকে। “এত রাতে একা একা এই কবরখানায় কী করছিলি?”
দাদা উত্তর দিল না।
“কাল থেকে তোমাদের দুই ভাইয়ের বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ। বেশি স্বাধীনতা পেয়ে গেছ, তাই না?” গজগজ করতে করতে টর্চ হাতে এগিয়ে চলল বাবা। পিছু পিছু আমরা। কিন্তু আমি নিশ্চিত জানতাম দাদা এই কবরখানায় একা একা ঘুরছিল না।
.
।।৫।।
সেই রাতেও আমি কিছু খেলাম না। আমার এত দিনের খিদে কোন অজানা কারণে একেবারে ভ্যানিশ হয়ে গেছিল। শুতে এসে আলো বন্ধ করে দাদা প্রথমেই বলল, “তুই কি আজকেও ওই তেরো নম্বর ঘরে ঢুকেছিলি?”
“ন-না তো। কেন?”
“আমি একটু আগে গেছিলাম। সেই ছুরি, সাঁড়াশি, প্লায়ার, হাতুড়ি… কিচ্ছু নেই।”
“তাতে কী হল?”
“না… মানে… কেমন একটা লাগছে আমার।”
দাদাকে বলতে চাইলাম, আমি মিথ্যে কথা বলছি। আজ দুপুরে ও বেরিয়ে যাবার পরে আমি ওই ঘরে ঢুকেছিলাম। একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে। আমিই ওই যন্ত্রগুলো একটা একটা করে সেই ব্যাগে পুরে আমার খাটের তলায় রেখে দিয়েছি। কেন? জানি না। কিন্তু বারবার মনে হচ্ছিল ওগুলো সেই নিশির ডাকের মতো আমাকে ডাকছে। এ ডাক উপেক্ষা করা যায় না। কিন্তু বলতে পারলাম না। বরং কথা ঘোরাবার জন্য বললাম-
“তুই কী করছিলি এতক্ষণ?”
“জর্জের সঙ্গে দেখা করতে গেছিলান।”
“কে জর্জ?”
“বলতে পারি, কিন্তু কথা দে, তুই কাউকে বলবি না?”
“বলব না।”
“মা-বাবাকে তো নয়ই।”
“ঠিক আছে।”
“তবে শোন, তুই একটা ব্যাপার খেয়াল করেছিস, আমাদের এই বাড়ির আশেপাশে তেমন কোনও বাড়ি নেই। আর যে কটা আছে, সেগুলোতেও কোনও বাচ্চা ছেলেমেয়ে থাকে না।”
“এটা আমিও খেয়াল করেছি রে। একটু অবাকই লেগেছিল। কিন্তু আমি তো বাড়ি থেকে বেরোই না, তাই ভাবতাম আমারই ভুল।
“আমি সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াই। কোনও ভুল নেই। সত্যিই কোনও বাচ্চা থাকে না এই এলাকাটায়। আর কেন থাকে না, সেটা জর্জ আমায় বলেছে।”
“কী মুশকিল, জর্জ কে সেটাই তো বলছিস না।”
“একটা অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ছেলে। তোকে গোটাটা বলছি শোন। এ পাড়ায় এসে আমার বয়সি কোনও ছেলেমেয়ে না দেখে আমি একদিন ঘুরতে ঘুরতে চার্চের পিছনের সেই কবরখানাটার পাশের রাস্তায় গেছিলাম। দিনের বেলাতেও ওই জায়গাটা কেমন অন্ধকার অন্ধকার। সেখানেই প্রথমবার জর্জকে দেখি। আমার চেয়ে একটু ছোটো। মানে বারো-তেরো বছর হবে। গায়ে নীল ময়লা কোট। পরনে গ্যালিস দেওয়া কালো ঢোলা প্যান্ট। আজকাল এমন জামাকাপড় পরতে আমি কাউকে দেখিনি। ছেলেটার হাতে একটা টিনের সৈন্যপুতুল। আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে ছিল ছেলেটা। তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছিল। ছেলেটার ডান চোখের উপরে একটা কাটা দাগ। আমিও ওকে দেখলে হাসলাম। হাত নেড়ে “হাই” করলাম। দেখি হাতছানি দিয়ে আমায় ডাকছে। কাছে গেলাম।
মিহি গলায় সে জিজ্ঞেস করল, “তোমরা এখানে নতুন এসেছ?’ বললাম, হ্যাঁ।
‘তোমার নাম কী?’
তাও বললাম।
ওর নাম জিজ্ঞেস করতে বলল জর্জ। জর্জ ওয়াকার। বাবা সাহেব। মা এদেশীয়। ও আমাকে নানা বিষয়ে গল্প বলত। কীভাবে সাহেবরা এই পাহাড়ে নেটিভদের সরিয়ে নিজেদের আস্তানা বানাল, কীভাবে রাস্তা কেটে এই দার্জিলিং হিমালয়ান টয়ট্রেনের রেলপথ তৈরি হল… সব কিছু। গতকাল কথায় কথায় ও আমাকে জিজ্ঞাসা করল আমি কোথায় থাকি। আর সেটা বলতেই ও কেমন ভয় পেয়ে গেল।
‘তোমরা আর বাড়ি পেলে না? শেষ অবধি ওই বাড়িতে?’
‘কেন? কী সমস্যা আছে ওখানে?’
‘আজ বলা যাবে না। এখন বাড়ি যাও। কাল বিকেল চারটের পরে এসো। তোমাকে আমাদের সর্দারের সঙ্গে দেখা করাব আর একটা জায়গায় নিয়ে যাব।’
আজ বিকেল চারটেয় রওনা হয়ে কবরখানায় পৌঁছে দেখি জর্জ তখনও আসেনি। এল প্রায় ঘণ্টাখানেক বাদে সূর্য অস্ত যাবার পর। সঙ্গে ওরই বয়সি আরও একটা ছেলে। টকটকে ফর্সা। একেবারে সাহেবদের মতো। ইংরাজি উচ্চারণও তেমনি। একবার ভাবলাম সন্ধে হয়ে আসছে। মা-বাবা চিন্তা করবে। বাড়ি ফিরে যাই বরং। পরে কী মনে হল, ভাবলাম যা জানতে এসেছি জেনেই যাই।
ছেলেটা শুরুতে নিজের নাম বলল না। শুধু বলল, ‘জর্জ তোমার কথা বলেছে। এখানে আমরা কজন বাচ্চা ছেলে মেয়ে একসঙ্গে থাকি। তুমিও কি এখানে থাকবে? আমাদের সবার সঙ্গে? ভারী মজা হয় তবে।’
জর্জ ওকে থামিয়ে বলল, ‘তোমায় যা বলতে ডেকেছি, সেটা বলো আগে।’
ছেলেটার মুখ এক লহমায় গম্ভীর হয়ে গেল।
‘শুনলাম তোমরা নাকি পাগলা ম্যাগাসের বাড়িতে থাকা শুরু করেছ?’
‘কে পাগলা ম্যাগাস?’
‘ওই বাড়ি আসলে যার তৈরি। দার্জিলিং-এ সাহেবরা এসে এখানে একটা বসতি বানিয়েছিল। তাতে অনেকের সঙ্গে ম্যাগাস আর ম্যাগাসের বুড়ি মা-ও এসেছিল। এমনিতে ভারী পণ্ডিত মানুষ। কিন্তু শখের কামার। লোহার কাজে ওর জুড়ি ছিল না।’ এইটুকু বলে ছেলেটা একটু থামল।
‘তারপর?’
‘বুড়ি মা-টা মারা যাবার পরে ম্যাগাস একেবারে উন্মাদ হয়ে গেল। কিন্তু বাইরে থেকে কেউ বুঝতে পারেনি। এই লেবং-এ তখন অনেক সাহেব থাকত আর আর নিচেই ভুটিয়া বস্তি। অগুনতি বাচ্চারা খেলে বেড়াচ্ছে রাস্তাঘাটে। একদিন একটা ভুটিয়া বাচ্চা গায়েব হয়ে গেল। প্রথমে কেউ গা করেনি। বস্তির বাচ্চারা হারিয়ে যায়। আবার ফিরেও আসে। কিন্তু এই বাচ্চাটা আর ফিরল না। এক হপ্তা পরে আরও একটা। এবার একটা ছোট্ট ভুটিয়া মেয়ে। তার মাসখানেক পর একটা অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ছেলে। ম্যাজিকের মতো হারিয়ে যাচ্ছিল একে একে।’”
দাদা যখন এই গল্পটা বলছে, একটা হালকা ধাতব ঝনঝনানি আমার কানে এল। কেউ একটা থলে ভরা ধাতব কোনও যন্ত্রপাতিকে টেনে এক ভায়গ থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, আওয়াভটা আসছে আমারই খাটের তলা থেকে। তবে কি দাদা সব জেনে গেল? গোটাটাই আমাকে ভয় দেখানোর জন্য?
“কীসের শব্দ?” বলেই দাদা একলাফে বিছানা ছেড়ে উঠে আলো জ্বেলে দিল, “তোর খাটের তলা থেকে অদ্ভুত একটা শব্দ আসছে। কী রেখেছিস তলায়?”
আমি বুঝে গেলাম, এইবার আমি ধরা পড়ে যাব। কেউ বাঁচাতে পারবে না। দাদা হাতের ছোটো টর্চটা নিয়ে খাটের তলায় উবু হয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজল।
“নাহ! কিছু নেই তো। তাহলে আমিই ভুল শুনেছি। তুই কিছু শুনতে পাসনি?”
শুকনো গলায় বললাম, “না তো! কীসের শব্দ?”
দাদা গোটা ঘরটা আবার ভালো করে দেখল। কোথাও সন্দেহ করার মতো কিছু নেই। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে গিয়েই মনে পড়ল, খানিক আগে নিজের হাতে ব্যাগটা আমি খাটের তলায় রেখেছিলাম। সেটা গেল কোথায়? নাকি এটাও অন্যবারের মতোই দাদার একটা প্র্যাঙ্ক? খাটের তলায় তাকানোর অদম্য ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু তাহলে ও বুঝে যাবে যে আমি কিছু একটা সন্দেহ করেছি। সেটা হতে দেওয়া যাবে না কিছুতেই।
“যাক গে। আমারই শোনার ভুল।” বলে আলো বন্ধ করে নিজের বিছানায় শুয়ে দাদা আবার আরম্ভ করল।
“যা বলছিলাম, ছয়-সাতটা বাচ্চা এভাবে হারিয়ে যাবার পর সবার টনক নড়ল। শেষটা ছিল আবার এখানকার ডাকসাইটে থিওডোর সাহেবের একমাত্র ছেলে। পিঠে ইয়া বড়ো একটা লাল জল। বন্ধুরা ওকে মজা করে “ব্লচ’ বলে ডাকত। এরপর সবাই সবার দিকে নজর রাখতে শুরু করল। মাসখানেক সব চুপ। তারপর এলসা নামে একটা মেয়ে হারাতেই একজন খবর দিল, শেষবার এলসাকে ম্যাগাসের বাড়ির কাছে দেখা গেছে। বসতির সক্কলে মিলে লাঠিসোঁটা, মশাল আর হ্যারিকেন নিয়ে ওর বাড়ির সামনে ভিড় জমাল।
ম্যাগাস ঘর থেকে বেরোল। ওকে বেরোতেই হত। ঘরের ভিতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। অন্ধকার আর কনকনে ঠান্ডা। সেই ডিসেম্বরের শীতরাতে ফায়ারপ্লেসে আগুনটুকুও জ্বলছে না। আর ঘরজোড়া একটা মাংসপচা গন্ধ। ম্যাগাস সেই অন্ধকারের মধ্যে মিশে ছিল। শুধু তার কোটরাগত জান্তব চোখদুটো জ্বলজ্বল করছিল সেই আঁধারেও। সবাই জিজ্ঞেস করল ম্যাগাস এলসাকে দেখেছে কি না। ম্যাগাস ‘দেখিনি’ বললেই হয়তো মিটে যেত। কিন্তু ও আচমকা নার্ভাস হয়ে পড়ল। কোনও উত্তর না দিয়ে তাড়াহুড়ো করে দরজা ঠেলে বন্ধ করতে যেতেই গোটা ব্যাপারটা হাতের বাইরে বেরিয়ে গেল। একজন লণ্ঠন তুলে ওর মুখের সামনে ধরতেই দেখতে পেল ম্যাগাসের কঙ্কালসার মুখের শুকনো ঠোঁটের চারপাশে গাঢ় কালচে লাল তেলরঙের মতো কী একটা লেপটে আছে। কিন্তু প্রত্যেকে বুঝতে পারছিল ওটা আর যাই হোক তেলরং ছিল না। কী ছিল বল তো?”
আমার গলা শুকিয়ে এসেছিল। তবু বললাম, “কী?”
“ধুর বোকা! রক্ত ছিল রে, কাঁচা রক্ত!”
ঠিক তখনই আবার আমি সেই আওয়াজটা শুনতে পেলাম। পশু কাটার আগে কসাই যখন ছুরি ধার করে, তখন যেমন একটা কিচ-কিচ-কির-কির শব্দ হয়, অবিকল সেই শব্দ।
“অ্যাই সানি, কিছু শুনতে পাচ্ছিস?” দাদা জিজ্ঞেস করল। আর ঠিক তখনই আওয়াজটা বন্ধ হয়ে গেল।
“না”, আমি সত্যি কথাই বললাম।
দুজনে মিলে খানিকক্ষণ একেবারে চুপ করে শুয়ে রইলাম। দুজনেরই কান খাড়া। আমার মনে হচ্ছিল দাদা এবার বাড়াবাড়ি করছে। প্র্যাঙ্ক করতে গিয়ে এতটা না এগোলেও পারত। কিন্তু ম্যাগাস? এ নাম ও জানল কেমন করে? কিংবা সেই জড়ুলওয়ালা ছেলেটার কথা? আমি নিজে বইয়ের মলাটে সে জঙুলের দাগ দেখেছি। ও হরি! এবার বুঝেছি। আজ বাড়ি ফিরে ও লাইব্রেরি রুমে গেছিল। ওখানেই ম্যাগাসের বইটা দেখে দাদা গোটা গল্পটা মনে মনে বানিয়েছে। এ সমস্ত কিছু আসলে আমাকে ভয় দেখানোর জন্য। আমি ভয় পাব, আর ও ঘুরে ঘুরে নাচবে।
“তুই বরং সেই ম্যাগাসের গল্পটা বল”, আমি কোনওমতে গল্পটাকে শেষ করতে চাইছিলাম।
“তারপর আর কী? ম্যাগাস পালাল। সিঁড়ি দিয়ে উঠে সোজা লাইব্রেরি রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে গেল। কিন্তু পারল না। ততক্ষণে অনুসরণকারীরাও ভিতরে ঢুকে গেছে। লাইব্রেরির ওই গোপন ঘরে ঢুকতেই সবাই ওর সেই যন্ত্রপাতিগুলো দেখল। সেই যন্ত্র, যেগুলো তুই সেদিন খুঁজে পেলি। শুধু সেসবে জং ধরা ছিল না, ছিল রক্তমাখা। টাটকা রক্ত। আর কী পেয়েছিল জানিস?”
আবার সেই চির-চির-চিক-চিক ধাতব শব্দটা হচ্ছে। এবার আওয়াজ আরও দ্রুত। মনে হল, এক কসাই খুব জোরে ঘষছে তার অস্ত্রকে। দাদা বোধহয় শুনতে পায়নি। ও আগের মতোই বলে চলছিল-
“ওরা সবকটা হারানো বাচ্চাকে ওই ঘরেই খুঁজে পেল। সবাই মৃত। কারও কারও শরীরের অংশ গলে পচে গেছে। ম্যাগাসকেও ওই ঘরেই খুন করা হল। ঠিক যেভাবে ও বাচ্চাগুলোকে খুন করত।”
আমি ঢোঁক গিললাম। ভিতরে ভিতরে শিরদাঁড়া জুড়ে একটা ভয়ের প্রাত নিচে নামছিল। হাতের মুঠো শক্ত করে বিছানায় শুয়েই আমি কাঁপছিলন।
“আর সেটা কীভাবে?”
“প্রথমেই বাচ্চাগুলোর মুখ বন্ধ করে মেঝের সঙ্গে শিকল দিয়ে বাঁধত! তারপর ওই বড়ো বড়ো গজাল আর হাতুড়ি নিয়ে দমাদ্দম, দমাদ্দম, দমাদন… যতক্ষণ না ওরা মেঝের সঙ্গে সেঁটে যায়। আর তারপর কী করত জানিস?”
দাদা আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলতে লাগল, “এই মাংস কাটার ছুরিতে শান দিয়ে, শান দিয়ে, ধারালো করে ও ওদের প্রথমে কেটে ফালফালা করত। আর তারপর কচমচ করে চিবিয়ে চিবিয়ে খেত। যতক্ষণ না বাচ্চাটার প্রাণ বের হয়। এখনও নাকি ম্যাগাসের অতৃপ্ত আত্মা অপেক্ষায় আছে। সে দিনরাত খিদেতে ছটফট করে। উপযুক্ত কাউকে পেলে নিজের খিদে মেটাবে।
“তোকে এইসব গল্প জর্জ বলল?”
“নইলে আর বলছি কী? বলল ম্যাগাসের সেইসব শিকারেরা এখনও ওই পোড়ো বাড়িটায় আছে। বলল আমার সঙ্গে আলাপ করাবে। আমি বিশ্বাস করছিলাম না। আবার মানাও করতে পারছিলাম না। হয়তো ওদের সঙ্গে চলে যেতাম। জর্জ ততক্ষণে ঘরে ঢুকে গেছে। অন্য ছেলেটাও ঢুকতে যাবে, আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার নামটা তো জানা হল না…’ ও বলল, ‘আমার নাম হ্যারিস। তবে ওরা সবাই আমাকে ব্লচ বলে ডাকে।’ শুনে আমার পা সেখানেই আটকে গেল। ব্লচ বারবার ডাকছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম না কী করব। এমন সময় আচমকা একটা বাঁশির শব্দে সংবিৎ ফিরল আর তারপরেই তোরা এলি…”
বলতে না বলতে দাদা এবার সত্যিই চমকে উঠল। গোটা ঘর জুড়ে সেই ধাতব আওয়াজ। চির চির চিক চিক। আওয়াজ এত বেশি যে মনে হচ্ছে ঘরের দেওয়াল কাঁপছে। অস্ফুট একটা চিৎকার করেই দাদা গলা দিয়ে অদ্ভুত একটা আওয়াজ করতে লাগল। যেন প্রাণপণে চিৎকার করতে চাইছে, কিন্তু কেউ সজোরে তার টুটি চেপে ধরে রেখেছে। আমার প্রচণ্ড ভয় করছিল। ভয় করছিল, আর দাদার উপরে রাগও হচ্ছিল। এবার ও খুব বাড়াবাড়ি করছে। এতটা না করলেও পারত। ঘরজোড়া ঘুটঘুটে অন্ধকার বিরাট এক পাথরের মতো বুকে চেপে বসেছে। আমার শীত করছে। সঙ্গে বরফের মতো ঠান্ডা ঘামে ভিজে যাচ্ছে গোটা শরীর, বিছানা।
পাশের খাট থেকে ভেসে আসছে দাদার আর্তনাদ, “বাঁ-চা-ও। বাঁচাও!!”
আমি উঠবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঘরের এই ঠাসবুনট অন্ধকার যেন লোহার শক্ত গজাল দিয়ে আমাকে বিছানার সঙ্গে পুঁতে দিয়েছে। পাশে দাদার বিছানাটা ঠকঠক করে নড়ছে। দাদার মুখের আওয়াজ বন্ধ হয়ে শুধু একটা গোঙানি শোনা যাচ্ছে মাত্র। আর তারপরেই দুম দুম দুম করে হাতুড়ির আওয়াজ। শেষবারের মতো দাদার একটা চিলচিৎকার শুনতে পেলাম। তারপর সব বন্ধ। শুধু গলার কাছ থেকে গরগর গরগর করে গার্গলের মতো এক ধ্বনি দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে গোটা ঘর ঘুরে বেড়াচ্ছে। এবার কিন্তু সত্যিই অনেকটা বেশি করে ফেলছে দাদা। ও যে এত ভালো অভিনয় করতে পারে, সেটা কে জানত?
খানিক বাদে আবার সেই হাতুড়ির শব্দ, আবার আর্তনাদ।
কতক্ষণ এমনটা চলেছিল বলতে পারি না। একসময় দেখলাম খাটের নড়াচড়া থেমে গেছে।
আমি সাহস করে শুকনো গলায় ডাকলাম, “দাদা… দাদা… কোনও উত্তর নেই।”
“আমি সত্যিই ভয় পেয়ে গেছিলাম রে দাদা। তুই এবার সাড়া দে।”
সব চুপ।
অপেক্ষায় ছিলাম এই বুঝি দাদা হো হো করে হেসে উঠে বলবে, “সানি ভয় পেয়েছে। সানি ভয় পেয়েছে। ভীতু, সানি ভীতু!” কিন্তু এমন কিছুই হল না।
তারপরেই পেলাম একেবারে অন্যরকম একটা শব্দ। এই ঘরের মধ্যেই কেউ কিছু একটা চিবোচ্ছে। মনে হয় বহুদিন ক্ষুধার্ত এক দানব এতদিনে মনের মতো একটা খাবার পেয়ে গোগ্রাসে গিলে চলেছে। সেই খাওয়ার কচমচ আওয়াজ আর ঠোঁট চাটার চাকুমচুকুম শব্দ ধীরে ধীরে ভরে ফেলছে চারিদিক। সময়ের কোনও হিসেব ছিল না আমার কাছে। মনে হচ্ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাচ্ছে। কিন্তু আমি নড়তে পারছি না। মুখ দিয়ে কোনওরকম আওয়াজও করতে পারছি না। একসময় সেই খাওয়া শেষ হল। চারিদিক শান্ত হয়ে গেল। শান্ত আর নিস্তব্ধ।
এবার নিশ্চয়ই দাদা হেসে উঠবে।
উঠল না।
অনেক হয়েছে এসব। আর না। মনের সব জোর একত্র করে উঠে বসলাম। আর উঠতেই হাতে একটা ঠান্ডা ধাতব স্পর্শ পেলাম। এ কী! এ তো আমার বিছানা না! আমার বিছানায় বালিশের পাশে টর্চ রাখা থাকে না কোনও দিন। এ তো দাদার বিছানা! কিন্তু এখানে আমি এলাম কেমন করে? গোটা বিছানা তরল আঠালো একটা পদার্থে মাখামাখি হয়ে আছে। আমার মুখ, আমার ঠোঁট, আমার হাতের আঙুলেও সেই তরল চিটচিটে পদার্থ মাখা। আমি তখনও অপেক্ষা করছিলাম দাদা কখন হেসে ওঠে। কিন্তু মনের গভীরে একজন বারবার হিসহিসে গলায় বলে চলছিল, দাদা আর হেসে উঠবে না কোনও দিন। মা বলেছিল মুর্দাহাটির শ্মশানে আমি আর আমার বোন পেটের মধ্যে মারা গেলেও পরে আমি বেঁচে উঠেছিলাম। কিন্তু কীভাবে? পদাকে জর্জ বসেছিল ম্যাগান এখন ও অপেক্ষায় আছে। উপযুক্ত কাউকে পেলে নিজের খিদে মেটাবে। সেটা কি তাকে খেয়ে? না তার সাহায্যে অন্যদের খেয়ে?
আমি এখন এসবের কিচ্ছু জানি না। জানতে চাইও না। শুধু জানি এই বাড়ির ঠিক কোন ঘরে এখন বাবা আর মা অঘোরে ঘুমিয়ে রয়েছে। কোন ঘরে মায়ের আয়া ইয়াংজি শুয়ে থাকে।
অনেকদিন পর আজকে আমার ভীষণ খিদে পাচ্ছে…
.
লেখকের জবানি— এই গল্পের বীজ আমার আগে লেখা বেশ কিছু গল্প থেকে নেওয়া। তাদের কয়েকটা এই সংকলনেও আছে। কিন্তু ক্লাইম্যাক্স বা ন্যারেটিভ সম্পূর্ণ আলাদা। নেক্রোমিক্রন – এর কথা এখানে থাকলেও সেটাই সব নয়। গল্পের শেষের ওপেন এন্ডিং অবশ্যই আমার লেখালেখির অন্যতম গুরুদেব নীল গাইম্যান প্রভাবিত। কাহিনিটি গপ্পো নীরের বক অরিজিনালস-এ ২৯ মার্চ, ২০২৫-এ প্রচারিত হয়েছিল।
