Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    আতঙ্ক সমগ্ৰ – কৌশিক মজুমদার

    কৌশিক মজুমদার এক পাতা গল্প466 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    আতঙ্ক – কৌশিক মজুমদার

    আতঙ্ক

    ॥ ১॥

    ১৮৯২ সালের কথা। সেবার শীত একটু দ্রুতই আসিয়া পড়িয়াছিল। কিন্তু বর্ষা তখনও বিগত হয় নাই। সন্ধ্যার অল্প অল্প আঁধার গড়াইয়া নামিতেছে। দূরে আমার গ্রামের গৃহবাতির ম্লান রেখা ক্ষীণতর হইয়া আসিতেছে। আমি মহামান্য ইংরাজ বাহাদুরের জরিপকার্যের নিমিত্ত সাইকেল চাপিয়া নিজের গ্রাম হইতে বেশ খানিক দূরে রাঁচির উপকণ্ঠে এক পার্বত্য অঞ্চলে উপস্থিত হইয়াছিলাম। যে পথে চলিতেছি, সে পার্বত্য পথ সংকীর্ণ, দুই ধারে উজাড় জমি, কোথাও অল্প কিছু ঝোপঝাড় ও তালগাছ বিস্মৃত প্রহরীর ন্যায় একাকী দণ্ডায়মান।

    হঠাৎ আকাশ কালো হইয়া আসিল। দিগন্তে ঘন কালো মেঘ জন্মাইতে শুরু করিল। সে মেঘ নিতান্ত সাধারণ ছিল না। এ যেন কোনও অশুভ সংবাদবাহী। কৃষ্ণবর্ণ সেই মেঘ দেখিতে না দেখিতে সমগ্র দিকচক্রবাল আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। পশ্চিম দিগন্তে বজ্রধ্বনি শুনিয়া বুঝিলাম, ঝড় আসিতে বিশেষ দেরি নাই। মুহূর্তের মধ্যে তুমুল ঝড়-বৃষ্টি আরম্ভ হইল। আর সে হাওয়ার এমন বেগ আর এমনতর বৃষ্টি, যাহার জলকণা ধারালো শূলের ন্যায় ত্বকে বিধিতে থাকে। আমি পথভ্রষ্ট যাত্রী। চারিদিকে কোনও আশ্রয়স্থল নাই। তখনও আমি পাহাড়ি পথে একাকী সাইকেল চালাইতেছি। অরণ্যের ভিতর সরু কাদা-পথ, আর দূর হইতে পাহাড়ের পাথরখণ্ডসমূহ কালো হইয়া উঠিতেছে।

    ঠিক এই সময়ে অদূরেই বিরাট ছায়ার ন্যায় দণ্ডায়মান এক ভগ্ন প্রাসাদ নজরে আস্লি। গাঢ় অন্ধকারে সেই অর্ধভগ্ন অট্টালিকা যেন এক প্রাগৈতিহাসিক দৈত্যের দাঁতের ন্যায় আকাশ বিদীর্ণ করিয়া উঠিয়াছে। ভগ্ন দেওয়ালে লতা-গুল্মে ছাওয়া, জানালার কাচ ভাঙা, কিন্তু কোনও অদৃশ্য দৃষ্টি যেন সেই ভাঙা জানালা হইতেই আমার দিকে স্থির নিবদ্ধ।

    বৃষ্টি আমার শরীর ভিজাইয়া দিল। শীত ও পথশ্রমের ক্লান্তিতে আমি জ্বোরো রোগীর ন্যায় কাঁপিতে লাগিলাম। অতএব আর উপায়ান্তর না দেখিয়া মনে মনে সাহস সঞ্চয় করিয়া অবশেষে সেই প্রাসাদের বৃহৎ লোহার দরজার নিকটে গেলাম। বিস্ময়ের ব্যাপার, দরজাটি আধখোলা, যেন আমাকে হাতছানি দিয়া আহ্বান করিতেছে। কাছে যাইতেই অনুভব করিলাম, কী নারকীয় এক নিস্তব্ধতা বিরাজ করিতেছে চারিদিকে। আকাশের বজ্রধ্বনিও যেন কোনও অলক্ষ শক্তির দ্বারা চাপা পড়িয়া কর্ণে আসিতেছে।

    সশঙ্কিত মনে নীরবে ভিতরে প্রবেশ করিলাম।

    অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া আমার মনে এক শীতল স্রোত বহিয়া গেল। প্রাসাদের ভিতরটা নীরব, কিন্তু সেই নীরবতা প্রগাঢ় নহে। অদৃশ্য কিছু যেন ঘরের অন্ধকার কোণে অপেক্ষা করিতেছে আর আমার প্রতিটি পদক্ষেপে তাহার নিঃশ্বাস শুনিতে পাইতেছি। করিডর দীর্ঘ। সেই করিডরের দেয়ালে ঝুলন্ত প্রাচীন তৈলচিত্ৰসমূহ ক্ষয়প্রাপ্ত হইয়া অধুনা গাঢ় কালো ছত্রাকে আবিষ্ট এক ছায়ারূপ ধারণ করিয়াছে। এক স্থানে এক মহিলার প্রতিকৃতি অনুধাবন করা গেল। মহিলার মুখ অস্পষ্ট, কিন্তু আলোকিত চক্ষুদুটি যেন আমার গতি অনুসরণ করিতেছে।

    করিডর পার হইয়া অন্য একটি ঘরের ভিতর প্রবেশ করিলাম। সঙ্গে সঙ্গেই নাসিকায় প্রবিষ্ট হইল এক অদ্ভুত গন্ধ… আর্দ্রতা ও পচনের মিশ্রণ যেমন হয়, অথচ একেবারেই অচেনা। সে ঘরে কালের চিহ্ন সুস্পষ্ট, কিন্তু ঘরটি আশ্চর্যরূপে অক্ষত। প্রাচীন কাঠের টেবিল, কারুকার্য করা মেহগনি কাঠের চেয়ার, এক বিশাল আলমারি, কোণের গ্রামোফোন সকলই সুন্দর সাজানো। মনে হইল গ্রামোফোনের ভিতর হইতে এখুনি বহু পূর্বের কোনও সুর হঠাৎ বাজিয়া উঠিতে পারে। বাতাস ভারী, স্যাঁৎসেঁতে, তবু তাহার অন্তঃস্রোতে কেমন এক রহস্যের গন্ধ। ঘরের ঠিক মাঝখানটিতে এক বিশালাকার প্রাচীন কাঠের টেবিল, বিরাট কাচবসানো আলমারিতে রাখা থরে থরে সাহেবি পুতুল, আর প্রাচীরস্থ গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটি এখন আর টিকটক শব্দ করিতেছে না। সময় যেন ইহাতেই স্থির হইয়া রহিয়াছে।

    টেবিলের ঠিক উপরে বিরাট এক গ্রন্থ স্থাপিত। পাশেই দপদপ করিয়া একটি চর্বির মোমবাতি জ্বলিতেছে। সেই গ্রন্থখানি আমার দৃষ্টি যেন চুম্বকের ন্যায় টানিতেছিল। ঘরের অন্য সকল জীর্ণ আসবাব, এমনকি সেই মেম পুতুলগুলাও আমার দ্বারা উপেক্ষিত হইল। দৃষ্টিপথের সম্মুখে শুধু সেই গ্রন্থখানি। আমি মৃদু কম্পিত হস্তে গ্রন্থটিকে তুলিলাম। উহা অচেনা কোনও প্রাণীর কালো চর্মে বাঁধাই, প্রতি পৃষ্ঠা চর্মনির্মিত এবং হস্তে লিখিত লাল-কালো কালি এখনও বিবর্ণ হয় নাই। গ্রন্থের মলাটে স্বর্ণাক্ষরে লেখা পিগাফেত্তার Regnum Congo, ১৫৯৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রাঙ্কফুর্টে মুদ্রিত। চামড়ার মোড়ক বহু প্রাচীন। স্থানবিশেষে ছিঁড়িয়া গিয়া ভিতরের ধাতব পট্টি উন্মুক্ত। এমন পট্টি পূর্বে আমি কোনও গ্রন্থে দেখি নাই। যেন কেহ পাণ্ডুলিপি রক্ষার্থে কেবল কালি বা কাগজ নয়, রক্ত, চামড়া ও ধাতুর সমবায় ব্যবহার করিয়াছে। গ্রন্থখানি খুলিতে গিয়া প্রথমে ভয় লাগিল। প্রচ্ছদের ভিতর হইতে এক বিচিত্র গন্ধ নির্গত হইতেছে। এই গন্ধ সাধারণ পুরোনো কাগজের নয়, বরং যেন কবরস্থ মাটির গন্ধের সহিত রক্তের ধাতব গাঢ় গন্ধ মিশ্রিত হইয়াছে। প্রথম পাতায় অক্ষরগুলি কেবল আধো অন্ধকারে ক্ষীণভাবে উদ্ভাসিত হইল। এ অক্ষর আমার অজ্ঞাত। বাংলা, সংস্কৃত, ইংরাজি কিংবা ফারসি কোনও কিছুর সঙ্গেই ইহার সাদৃশ্য নাই। অক্ষরগুলো বাঁকা, বিকৃত, বিচিত্র সাপের ন্যায় প্যাঁচানো। অথচ আমার চোখ সেগুলিকে চিনিবার চেষ্টা করিতে করিতে এক অদ্ভুত বোধ অনুভব করিল। আচমকা মনে হইল যেন শব্দেরা নিজেই আমার মস্তিষ্কে অর্থ ঢালিয়া দিতেছে। যে পৃষ্ঠা আপনাআপনি আমার হস্তে খুলিয়া গেল, তাহাতে এক ভীষণ চিত্র আঁকা। অঞ্জিক নামক নরভোজী এক জাতির কসাইখানার দৃশ্য। মানবদেহের অঙ্গচ্ছেদের বিভীষিকা প্রাচীন উডকাটে এত জীবন্ত রূপে অঙ্কিত ছিল যে তাহা হইতে দৃষ্টি সরানো দুষ্কর। নিচেও সেই অজানা ভাষায় লেখা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এইবারে শব্দগুলো ক্রমাগত আমার বোধগম্য হইতে লাগিল। আমি উচ্চারণ করিয়া পড়িলাম, “রাত্রির ভ্রূণ হইতে জন্ম লইবে যে সত্তা, তাহার খাদ্য হইবে মানবরক্ত। যাহারা তাহাকে আহ্বান করিবে, তাহারা প্রথমে শক্তি পাইবে, পরে ধ্বংস হইবে।”

    কেবলমাত্র একটি বাক্য পড়িয়াছি, অথচ মনে হইল যেন শতবর্ষের অভিশাপ আমার শিরায় শিরায় প্রবাহিত হইতেছে। আমি এক মুহূর্তে বইখানি বন্ধ করিলাম। হৃদয়ে শীতল শিহরন বহিতে শুরু করিয়াছে। বাহিরে বৃষ্টি অব্যাহত। জানালার কাচের ভাঙা অংশ দিয়া বাতাস প্রবেশ করিয়া মোমবাতির শিখাকে দুলাইয়া তুলিল।

    আমি অবাক হইয়া দেখিলাম, গ্রন্থখানি আমার হস্তে নিজ হইতেই আবার খুলিয়া যাইতেছে। যেন অদৃশ্য কোনও আঙুল অত্যন্ত দ্রুততার সহিত পৃষ্ঠা উলটাইতেছে ক্রমাগত। আমি বিমূঢ়ভাবে তাকাইয়া রহিলাম। প্রতিটি পৃষ্ঠা উলটানোর সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘশ্বাসের এক ক্ষীণ শব্দ শোনা যাইতে লাগিল। হঠাৎ একটি পৃষ্ঠায় চক্ষু থামিয়া গেল। সেখানে পৃষ্ঠাজোড়া এক চিত্র অঙ্কিত রহিয়াছে। উহা মানব নয়, দানব নয়। অর্ধেক পশু ও অর্ধেক মানবের এক বীভৎস মিশ্র চিত্র। দেহের উপরিভাগে শৃঙ্গ, মুখে দীর্ঘ করাতের ন্যায় দন্তরাজি, চোখ মণিহীন অথচ আলোকিত। তাহার হস্তে একটি শিরশ্ছেদিত মানবমুণ্ড। চিত্রটি আমার দিকে তাকাইতেই তাহার শূন্য নয়নে লাল আভা জ্বলিয়া উঠিল। পরের পৃষ্ঠায় এমন এক দৃশ্য, যাহা কোনও মানুষের শিল্পকর্ম হইতে পারে না। মাটির তলায় অসংখ্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মিশিয়া আছে। অজস্র বিকৃত মুখ, কাহারও চক্ষু নাই, কেহ মুণ্ডহীন, কেহ বা শরীরের মধ্যস্থলে অতিরিক্ত চক্ষু লইয়া দণ্ডায়মান। চারদিকের শৃঙ্খল যেন সর্পের ন্যায় কুণ্ডলী পাকাইয়া রহিয়াছে। আচমকা বোধ হইল চিত্রটি নড়িতেছে, আর সেই মৃত চক্ষুহীন মুখগুলো ধীরে ধীরে ঘুরিয়া ঘুরিয়া আমাকেই দেখিতেছে। আমি দ্রুত সে পুস্তক বন্ধ করিলাম। মনে হইল ইহার সহিত অধিক সময় কাটানো উন্মাদনার সামিল।

    ঠিক সেই সময়ে শুনিলাম উপরের তলায় কাহার পদধ্বনি। মুহূর্তে বিস্ময়ে স্থবির হইলাম। কারণ, দ্বারে কড়া নাড়িলে সে শব্দ কর্ণে আসিত। আমি এতক্ষণ কাহারও কোনও সাড়া পাই নাই। ধীর পদক্ষেপের শব্দ কাষ্ঠল সিঁড়ি বাহিয়া নামিয়া আসিল এবং অল্পক্ষণেই দরজা খুলিয়া ঘরে এক বৃদ্ধ প্রবেশ করিলেন। দীর্ঘদেহী, শুভ্রকেশ, শ্মশ্রুতে মুখ প্রায় আচ্ছাদিত, পরনে মলিন ছিন্নবস্ত্র। বয়সের ভার থাকিলেও বৃদ্ধের দেহ বলিষ্ঠ, চক্ষু তাম্রাভ কিন্তু রক্তাভ দীপ্তিতে প্রজ্বলিত। তাঁহার দৃষ্টিতে এমন এক সম্মোহন ছিল যে চক্ষু ফিরাইতে পারিলাম না। আমি টুপি খুলিয়া তাঁহাকে অভিবাদন জানাইলাম। তিনি অতি ভদ্রভাবে আমাকে বসিবার প্রস্তাব করিলেন। কথায় বুঝিলাম তিনি জাতে ব্রিটিশ, এই দেশে ভাগ্যসন্ধানে আসিয়াছিলেন। তিনি প্রথমে আমার কুশল জিজ্ঞাসা করিলেন, কী কার্যে এই দুর্যোগে বাহির হইয়াছি তাহাও জানিতে চাহিলেন, শেষে কথার মোড় ঘুরিল টেবিলে রক্ষিত পিগাফেত্তার গ্রন্থের দিকে।

    “দ্যাখো, এগুলি আমার উত্তরাধিকার। এই উপত্যকার মাটি যেমন কালো ও অশুভ, তেমনই এর ভেতর লুকানো ইতিহাসও অন্ধকার। এই ইতিহাস মানুষ জানে না, কিন্তু আমি জানি।”

    “এগুলো কী?” আমি জানিতে চাহিলাম।

    বৃদ্ধ হাসিয়া উঠিলেন। মোমের ক্ষীণ আলো তাঁহার শরীরকে যেন আরও কঙ্কালসম, আরও প্রেতবৎ করিয়া তুলিল।

    “এগুলো সেইসব কথা, যা মানুষের জানার যোগ্য নয়। অরণ্যের গভীরে যে অদ্ভুত প্রস্তরখণ্ড দাঁড়িয়ে আছে, যাদের চারপাশে কোনও পাখি উড়ে যায় না, পশুপাখি ঘেঁষে না, তাদের কথা লেখা আছে এখানে। মাটির তলায় যেসব অচেনা সত্তা ঘুমিয়ে আছে, ঝড় আর অন্ধকার যাদের আহ্বান করে, তাদের বৃত্তান্ত লেখা আছে এই পৃষ্ঠাগুলোতে।”

    আমি কিছুই বুঝিলাম না। অবাক বিস্ময়ে চাহিয়া রহিলাম। বৃদ্ধ বলিয়া চলিলেন, “তুমি কি জানো, এই উপত্যকায় এককালে একটা গ্রাম ছিল? অনেক বছর আগে, এই প্রাসাদের আশেপাশেই বহু মানুষ বসবাস করত। কিন্তু এক রাতে ভয়ানক এক অভিশাপে তারা সবাই বিলীন হয়ে যায়। কেবল এই বাড়ি আর আমি বেঁচে আছি। বাকিরা চলে গেছে।”

    “কোথায়?”

    “এমন স্থানে, যেখানে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি পৌঁছোতে পারে না। ঝড় নামতে তারা আবার সজাগ হয়। এই বিদ্যুতের আলো, এই বজ্রের গর্জন, এইসবই তাদের সংকেত। তারা মাটির নিচ থেকে ডাকে, আর আমি তাদের একমাত্র শ্রোতা। শুনতে পাচ্ছ না? ওরা ডাকছে।” ঠিক তখনই এক বিকট বজ্রপাত আকাশ বিদীর্ণ করিল। পুরো ঘর মুহূর্তের জন্য আলোকিত হইয়া উঠিল। আর সেইক্ষণে আমি স্পষ্ট দেখিতে পাইলাম, বৃদ্ধের ছায়া মেঝেতে পড়িতেছে না। বৃদ্ধের চোখের পলকও পড়িতেছিল না। স্থির দৃষ্টিতে আমার পানে চাহিয়া ফিসফিসে কণ্ঠে তিনি কহিলেন, “আমি জানতাম, একদিন তুমি আসবেই।”

    আমি বিস্ময়ে কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করিলাম, “কিন্তু… কিন্তু… আপনি কে?”

    “আমি এই প্রাসাদের প্রাচীন রক্ষক। আমি সেই সকলের একজন, যারা রক্ত দিয়ে এই বই রচনা করেছিল। একে সাধারণ পুথি ভাবলে ভুল ভাবা হবে। আসলে এ এক অঙ্গীকার, এক শপথ। এই ভাষা সবার কাছে ধরা দেয় না। তুমি যখন প্রথমবার পাতাটি উচ্চারণ করলে, তখনই সেই শপথের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছ।”

    আমার গলা শুকাইয়া আসিল। আমি বলিয়া উঠিলাম, “আমি তো কেবলমাত্র কয়েকটা লাইন পড়েছি!!’

    বৃদ্ধ ধীরে ধীরে মাথা নাড়িলেন, “লাইন কেন, একটি শব্দ, এমনকি একটি অক্ষর মাত্রই যথেষ্ট। এই অক্ষরগুলির প্রকৃতি অন্যরকম। মানুষ পড়ে তবে অর্থ বোঝে, কিন্তু এ অক্ষর এমন, যা নিজে থেকেই মানুষের মগজে প্রবাহিত হয়। এই অক্ষরেরাই নির্বাচন করে কে তাদের পড়তে পারবে। তুমি পেরেছ, তাই তুমি এখন নির্বাচিত।”

    আমি হতবুদ্ধি হইয়া গেলাম। ঘরের মধ্যকার বাতাস আরও শীতল হইয়া উঠিল। মোমের শিখা হঠাৎ নিম্নে নত হইয়া আবার দাউদাউ করিয়া উঠিল, যেন ঘরে সদ্য অন্য এক অদৃশ্য সত্তা প্রবেশ করিয়াছে।

    আমি সাহস সঞ্চয় করিয়া বলিলাম, “নির্বাচিত মানে কী? আমাকে কী করতে হবে?” বৃদ্ধ ধীরে ধীরে আমার নিকটে আসিলেন। এতটাই নিকটে যে তাঁহার শুষ্ক নিশ্বাস আমার মুখমণ্ডল ছুঁইয়া গেল। সেই নিশ্বাসে পচা মৃতদেহের দুর্গন্ধ। দেখিলাম তিনি কথা কহিতেছেন, কিন্তু তাঁহার ওষ্ঠ নড়িতেছে না। তবুও প্রতিটি বাক্য যেন সরাসরি আমার মস্তিষ্কে প্রোথিত হইতেছে, “তুমি যা আরম্ভ করেছ, তার শেষ তুমিই করবে। তোমার রক্ত দিয়ে এবার তাঁকে আহ্বান করতেই হবে। তিনি মুক্তি পেলে তবেই তোমার মুক্তি। এ ছাড়া এ জীবনে তোমার মুক্তি নেই।”

    আমি প্রশ্ন করিলাম, “তাঁকে মানে? কাকে?”

    বৃদ্ধের ওষ্ঠ বিকৃত হাসিতে প্রসারিত হইল। আমার মস্তিষ্কে বহিয়া গেল এক অদ্ভুত ফিসফিসানি, “তাঁকে, যিনি অন্ধকারের অন্তঃস্থল থেকে জেগে উঠবেন। যিনি মানুষ নন, দেবতা নন, কেবল এক অসীম তৃষ্ণা। সেই সত্তার নাম মানুষের ভাষায় উচ্চারণ করা যায় না। তুমি নিজেই তাঁকে জানবে, কারণ তিনি স্বয়ং তোমাকে ডেকে নেবেন।”

    আমি দিশাহারা হইয়া ক্রমাগত পিছু হটিতে লাগিলাম। কিন্তু বৃদ্ধ সবলে আমার বাহু আঁকড়াইয়া ধরিলেন। তাঁহার হাড়সর্বস্ব হস্তখানি প্রবল শক্তিতে ভরা। তিনি আমার চোখে চোখ রাখিয়া হুংকার দিলেন, “মনে রেখো, তুমি এখন এই বই পড়ে ফেলেছ। তোমার আর পালাবার পথ নেই। তুমি যদি দূরে পালিয়েও যাও, এই বই ছায়ার মতো তোমাকে অনুসরণ করবে। তুমি যদি একে অস্বীকার করো, তখন সেই সত্তা তোমার রক্ত দিয়ে নিজেকে পুষ্ট করবে।”

    আমি চিৎকার করিবার চেষ্টা করিলাম, কিন্তু গলা হইতে শব্দ বাহির হইল না। যাহা বাহির হইল তাহা এক মূকের অর্থহীন গোঙানি মাত্র। দেখিলাম বৃদ্ধের দৃষ্টি ক্রমশ রক্তিম হইয়া উঠিতেছে। মোমের আলো নিভিয়া গেল। আলোর একমাত্র উৎস এখন সেই বৃদ্ধের চোখের লাল মণি দুখানি। গোটা ঘর এক অদ্ভুত কালো কুয়াশায় ভরিয়া উঠিল। সেই অন্ধকারে, আমি স্পষ্ট দেখিতে পাইলাম বৃদ্ধের পশ্চাদ্দেশ হইতে দীর্ঘ শৃঙ্গের ন্যায় ছায়া গজাইয়া উঠিতেছে, আর তাঁহার কঙ্কালসার শরীর লম্বা হইতে হইতে হাড়গোড় ভাঙিয়া এক বিকৃত আকার নিল। আমি হাহাকার করিয়া উঠলাম। অনুভব করিলাম ঘর যেন ধীরে ধীরে সংকুচিত হইয়া আসিতেছে। বাতাস ভারী, শ্বাস নেওয়া দুরূহ।

    বিকৃত দেহের বৃদ্ধ ধীরে ধীরে টেবিলের উপর রাখা সেই গ্রন্থটির দিকে অগ্রসর হইলেন। আমার পদযুগল যেন এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে বাঁধা। কেবল চক্ষুদ্বয় সচল। দেখিলাম পুথির অক্ষরগুলি নড়িতেছে। যেন পৃষ্ঠার উপর কালি নহে, জীবন্ত কীটরাশি গলগল করিয়া চলিতেছে। গলায় এক আদিম ঘড়ঘড় শব্দ করিয়া বৃদ্ধ বলিলেন, “এই বই আসলে এক অমোঘ সংকেত। লেখা বা লিখিত শব্দ আবদ্ধ থাকে বইয়ের পাতায়। সে প্রাণহীন অচল। একমাত্র নিজের স্বরযন্ত্র দিয়ে উচ্চারণ করে মানুষ সেই মৃত শব্দে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে। শব্দ ভেসে চলে বাতাসে। আসলে শব্দ তো ঈশ্বর; আর এই শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে কিছু সময়ের জন্য হলেও পাঠকের কণ্ঠ তালু মূর্ধা দত্ত ওষ্ঠ সেই পবিত্র শব্দ পরশে আপ্লুত হয়। ঠিক সেইজন্যই ধর্মগ্রন্থদের মনে মনে পড়া হয় না। তাদের পাঠ হয়। আর সেই কথক খানিক সময়ের জন্য হলেও হয়ে ওঠেন ঈশ্বরের অংশ, যাঁর ধ্বনি বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে। পাঠশেষে তাই তিনিই সবার প্রণাম পান। কারণ তিনিই তো জড় শব্দে প্রাণ এনেছেন। যখন এই গ্রন্থের প্রথম শব্দ তুমি উচ্চারণ করলে, তখনই এ বই আর সাধারণ রইল না। প্রতিটি শব্দ এক-একটি দ্বার, প্রতিটি বাক্য এক-একটি আহ্বান। তোমার কণ্ঠে সে শব্দ উচ্চারণ করে তুমি সেই দ্বার খুলে দিয়েছ।”

    আমি বলিলাম, “আমি তো ডাক দিইনি!”

    “তুমি ডাক না দিলেও, এই বই ডাক দেয়। তুমি কেবল ডাকের মাধ্যম। পথ মাত্র। এখন তোমার রক্ত ছাড়া সে পথ পূর্ণ হবে না।”

    দেখিলাম পুথির প্রাপ্ত লাল আভা ছড়াইতেছে। হঠাৎ চারিপার্শ্বের দেয়ালে কালো দাগ ফুটিয়া উঠিল। দাগগুলি ক্রমে স্পষ্ট আকার ধারণ করিল। তাহাতে হাজারে হাজারে দীর্ঘ বিকৃত মুখ, বিকট দন্ত, জ্বলন্ত চক্ষু। আর প্রতিটি মুখই যেন অশ্রুত অভিশাপের জান্তব মূর্তি। আমি আতঙ্কে চক্ষু বন্ধ করিলাম। কিন্তু বন্ধ করিবার পর সেই মুখগুলি স্পষ্টতররূপে দেখা যাইতে লাগিল। যেন আমার মস্তিষ্ক দগ্ধ করিয়া তাহাদের কেউ চিরকালের ন্যায় খোদাই করিয়া দিয়াছে।

    বৃদ্ধ কহিলেন, “আজ মধ্যরাতে যখন চাঁদ রক্তরঙে রাঙা হবে, ঠিক তখনই তোমাকে এই বই আবার খুলতে হবে। তোমার রক্তের প্রথম ফোঁটা পড়লেই চক্র সম্পূর্ণ হবে। দুয়ার খুলবে। আর তারপর? তারপর তুমি কেবল তাঁর বাহন। তখন তিনি আসবেন। তিনিই সবাইকে মুক্ত করবেন।

    বুঝিলাম আজ রাত্রেই পাতাল হইতে জাগিয়া উঠিবে শত সহস্র উপোসি প্রেতাত্মারা। ইহারা কত যুগ ধরিয়া ক্ষুধার্ত আছে কে জানে! মুক্তি পাইয়া এই মরলোকের প্রতিটি প্রাণী যে তাহাদের ভোজ্য হইবে না, তাহার নিশ্চয়তা কোথায়? ভাবিয়াই আমি সন্ত্ৰস্ত হইয়া উঠিলাম। প্রশ্ন করিলাম, “আর যদি আমি অস্বীকার করি?”

    “অস্বীকার মানে মৃত্যু না। অস্বীকার মানে অন্তহীন দাসত্ব। তুমি পচে যাবে, ক্ষয় হবে, অথচ মরতে পারবে না। তিনি তোমাকে অন্তহীন ক্ষুধার অঙ্গীকারে বেঁধে রাখবেন।”

    আমি দরজার দিকে দৌড়াইতে উদ্যত হইলাম, কিন্তু দরজা তখন বন্ধ, যেন অদৃশ্য কোনও শিকল দিয়া কেউ বাঁধিয়া রাখিয়াছে। পিছন হইতে বৃদ্ধের কণ্ঠ ভাসিয়া আসিল, “চেষ্টাও কোরো না। এ বাড়ির সব পথ একমুখী।” মেঝের তলা হইতে এক গুঞ্জনধ্বনি ধীরে ধীরে বাড়িয়া কর্ণবিদারক এক শিসধ্বনির রূপ নিল, তারপর শুনিতে পাইলাম আত্মা কম্পিত করা এক আর্তনাদ। মেঝের তলার ফাঁক ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতেছে। কোথাও বা ইট ভাঙিয়া গিয়া গভীর গহ্বর ফুটিয়া উঠিয়াছে, যাহার তলদেশ দেখা যায় না। আর সেই গহ্বর হইতে উত্থিত হইতেছে শত শত শুষ্ক, কৃষ্ণকায় মৃত মনুষ্যের হস্ত। আমি অনুভব করিলাম সেই সকল শীতল, কঙ্কালসার হস্ত আমায় স্পর্শ করিতে চাহিতেছে। অন্ধ মনুষ্যের ন্যায় আমি আতঙ্কে হাতড়াইতে লাগিলাম, কিন্তু কেবল শুনিতে পাইলাম বৃদ্ধের গম্ভীর কণ্ঠ, “এখন তুমি এই বইয়ের অন্তর্গত। তুমি আর মুক্ত নও।”

    বাহিরের ঝড় শান্ত হইয়া গিয়াছে। দূরে কোথা হইতে শোনা যাইতেছে মধ্যরাত্রি হইবার ঘণ্টাধ্বনি। ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়া আমি তাকাইয়া দেখিলাম, চাঁদ যেন রক্তে রঞ্জিত। তাহার চারিপাশে ছড়াইয়া আছে শীতল কুয়াশার প্রগাঢ় আচ্ছাদন। সেই মুহূর্তে আমার শিরদাঁড়ায় কম্পন ধরিল। বৃদ্ধের বাণী আমার কৰ্ণে প্ৰতিধ্বনিত হইল, “আজ মধ্যরাতে যখন চাঁদ রক্তরঙে রাঙা হবে, ঠিক তখনই তোমাকে এই বই আবার খুলতে হবে।” বুঝিলাম, আর কোনও পথ খোলা নাই। যতই চক্ষু ফিরাই, টেবিলের উপর রাখা অশুভ গ্রন্থটি কিছুতেই আমার দৃষ্টির আড়াল হইতে চাহে না।

    আমি শিহরিয়া উঠিলাম। মনে মনে বলিলাম, “না… কিছুতেই এই বই আমি খুলব না। আমি রক্ত দেব না।”

    উত্তর আসিল দেয়ালের অন্ধকার হইতে। সেখানে অসংখ্য বিকৃত মুখ হা করিয়া রহিয়াছে। একযোগে তাহারা ফিসফিস করিল, “রক্ত… রক্ত… রক্ত…”

    আমি দুই হস্ত দিয়া দুই কর্ণ চাপিলাম, কিন্তু মস্তিষ্কের প্রতিটি কোশে কোশে যেন সেই আর্তনাদ ছড়াইয়া পড়িতেছে। আমার নিজের খুলির ভিতরে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হইয়া রক্তের সেই নারকীয় পিপাসা ছড়াইয়া যাইতেছে আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আমার মগজের প্রতিটি কোশ একসঙ্গে আর্তনাদ করিতেছে, “রক্ত… রক্ত… রক্ত…”

    অতঃপর, অদৃশ্য শক্তির টানে আমি সেই টেবিলের নিকট গিয়া দাঁড়াইলাম। গ্রন্থখানি যেন নিঃশ্বাস ফেলিতেছে। পাতার ভাঁজ নিজ বলেই খুলিয়া বন্ধ হইতেছে। অক্ষরগুলি কাঁপিতেছে এবং ভিতর হইতে আসিতেছে এক অদ্ভুত হৃদয়বিদারক কষ্টের গন্ধ। গ্রন্থখানি স্পর্শ করিবার পূর্বেই এক অজানা শক্তি আমার তর্জনীকে পুস্তকের পৃষ্ঠার উপর টানিয়া আনিল। শীতল শিরশিরানি ছড়াইয়া পড়িল সারা দেহে। আর ঠিক তখনই আঙুলে একটি সূক্ষ্ম কাটা দাগ ফুটিয়া উঠিল। রক্তের ফোঁটা গড়াইয়া পড়িল পৃষ্ঠার উপরে। মুহূর্তে চারিপাশের নীরবতা বিদীর্ণ হইয়া গেল। প্রচণ্ড ঝড় উঠিল। জানালা ধাক্কা খাইয়া খুলিয়া গেল। মোমবাতির স্থলে জ্বলিয়া উঠিল লাল আগুনের লেলিহান শিখা, আর গ্রন্থের পাতা গর্জন করিয়া খুলিতে বন্ধ হইতে লাগিল। দেখিলাম প্রতিটি পাতায় অক্ষরগুলি জ্বলন্ত অঙ্গারের ন্যায় উজ্জ্বল। আর সেই অক্ষরগুলি হইতে অসংখ্য ছায়ামূর্তি নির্গত হইল। প্ৰায় সকলেরই হাড়গোড় ভাঙা দেহ, মুখ পচিয়া গিয়াছে, লম্বা দত্ত, দগ্ধ অঙ্গ। আমি সম্ভ্রস্ত দৃষ্টিতে দেখিলাম, তাহাদের মধ্যে এক বৃহৎ ছায়া ধীরে ধীরে ভীমাকার ধারণ করিল। ইহার বিশাল দেহ, বিচিত্র কণ্টকাকীর্ণ ত্বক, দগ্ধ মুখমণ্ডল, রক্তবর্ণ চোখ। সে মূর্তি অতি ধীরে আমার প্রতি অগ্রসর হইল।

    আমার পদযুগল যেন পাথরে পরিণত হইয়াছিল। নড়িতে পারিলাম না। কেবল হৃৎস্পন্দনের শব্দ চারিদিক ভরিয়া বাজিতে লাগিল। অতঃপর সেই ভয়াল ছায়া আমার সম্মুখে দাঁড়াইল। গর্জন করিয়া বলিল, “তুমি দ্বার খুলেছ। এখন তুমি আমার। আমার বুকের মধ্যে অসহ্য চাপ, শ্বাসরুদ্ধকর যন্ত্রণা। কোথাও যেন শুনিতে পাইলাম বৃদ্ধের কণ্ঠ, “তোমার যাত্রা এখন শুরু। তুমিই বাহন, তুমিই সেতু। তুমি না থাকলে তিনি আসতে পারতেন না। এখন তোমার আত্মা তাঁর খাদ্য, তোমার দেহ তাঁর শৃঙ্গার।” আমি অচেতন হইয়া পড়িবার পূর্বে শেষবারের ন্যায় দেখিলাম, আকাশের চন্দ্র আরও গাঢ় রক্তরঙে রঞ্জিত হইয়া উঠিল। সমস্ত প্রাঙ্গণ রক্তাভ জ্যোতিতে নিমজ্জিত হইল, আর সেই আলোতে পৃথিবী ভেদ করিয়া অসংখ্য বিকৃত হাত যেন নরকের অগ্নিকুণ্ড হইতে উঠিয়া আসিতেছে।

    তারপর অন্ধকার।

    .

    ॥ ২॥

    যখন চক্ষু মেলিলাম, বুঝিলাম আমি আর আমার সেই পরিচিত পৃথিবীতে নাই। চারিদিকে গাঢ় অন্ধকার, আর সেই অন্ধকারের মধ্যে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে রক্তের ধোঁয়ার ন্যায় এক আভা। বাতাসে শবদেহের দুর্গন্ধ। মাটি নরম। আঙুল ডুবাইয়া দেখিলাম তাহা আসলে জমাটবাঁধা রক্তের আস্তরণ। শুধুমাত্র অদূরের সেই প্রাসাদ এখনও ধ্রুবক। আমি কাঁপিয়া উঠিলাম। কণ্ঠে স্বর জন্মাইল না, অথচ মস্তিষ্কের ভিতর এক প্রবল শব্দ প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল—

    “তুমি জেগেছ। এখন তুমি আমার দাস। তুমি আমার।”

    আমি দিশাহারা হইয়া চাহিয়া দেখিলাম, সেই ভয়াল ছায়ামূর্তি, যাহাকে পূর্বে দেখিয়াছিলাম, এখন ঠিক আমার সম্মুখে দাঁড়াইয়া। তাহার চক্ষু দুইটি সবুজ অগ্নিশিখার ন্যায় জ্বলিতেছে। সেই ভীষণ দৃষ্টির অভিঘাতে আমার সমস্ত প্রতিরোধ ভাঙিয়া গেল। আমি মাটিতে হাঁটু গাড়িয়া নতমস্তকে তাহার সামনে বসিলাম। ইচ্ছা করিয়া নয়। যেন কোনও অদৃশ্য শৃঙ্খল আমাকে জোর করিয়া মাটির উপর নত করিল।

    সেই দানব গলগলে এক তরলের ন্যায় কণ্ঠে বলিল, “এখন থেকে তুমি আমার বাহন, তুমি আমার সেতু। তোমার শরীর দিয়েই আমি ছড়িয়ে যাব জীবন্ত মানুষের জগতে। তোমার চোখ দিয়ে আমি দেখব, তোমার শ্বাস দিয়ে আমি বাঁচব 1 আজ থেকে তুমি আর তুমি নও। তুমি আমি।”

    মনে হইল, অন্তরস্থ রক্তপ্রবাহ হঠাৎ থমকাইয়া গেল। আমার দেহ দুলিয়া উঠিল। বুঝিলাম আমার আত্মা আর আমার অধীনে নাই। এমন সময় সেই বৃদ্ধকে আবার দেখিলাম। দূরে সেই প্রাসাদের ছায়া হইতে তিনি আবির্ভূত হইলেন। মুখে তৃপ্তির হাসি। বলিলেন, “আজ আমার কাজ শেষ হল। প্রভু আমাকে সেতু নির্মাণ করতে আদেশ দিয়েছিলেন। আমি এতদিনে তা করতে পেরেছি। অসংখ্য প্রজন্মের রক্ত, অশ্রু, প্রাণ এই একটিমাত্র বইয়ের জন্য উৎসর্গ হয়েছে। দরকার ছিল শুধু মরজগতের রক্তে তাঁকে শুদ্ধ করার। আজ তা সফল। আজ থেকে আমার দাসত্বের শেষ। আমি মুক্ত।”

    আমি অসহায় দৃষ্টিতে তাঁহার দিকে চাহিয়া থাকিলাম। কণ্ঠে শব্দ নাই, তবু মনের ভেতর চিৎকার উঠিল, “কিন্তু আমিই কেন? কেন আমার উপর এই অভিশাপ?”

    বৃদ্ধ আমার চিন্তা পড়িতে পারিলেন। তিনি বলিলেন, “কারণ তুমি এসেছিলে। কারণ তুমি অজান্তেই এই বই খুলেছিলে। আর এই বই তোমাকে পড়েছিল। তোমাকে নির্বাচন করেছিল।” এই বলিয়া তিনি মিলাইয়া গেলেন।

    প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চারিদিকের ছায়ারা ধীরে ধীরে আমার দিকে ঝুঁকিয়া পড়িল। আমি অনুভব করিলাম, তাহারা আমার বুক ভেদ করিয়া ভিতরে ঢুকিতেছে। প্রতিটি ছায়া আমার দেহের সঙ্গে মিশিয়া যাইতেছে। আর যখন শেষ ছায়াটি ও আমার মধ্যে প্রবেশ করিল, আমি আর মানুষ রহিলাম না। বুকের ভিতর এক অদ্ভুত শক্তি সঞ্চার হইল, যাহা মানুষের পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব। আর সেই মুহূর্তে সেই অলীক জগতের রক্তচন্দ্র বিদীর্ণ হইয়া তাহার খণ্ড খণ্ড গুঁড়া ঝরিয়া পড়িল আমার উপর। আমি বুঝিতে পারিলাম এই নরকে যে যাত্রা শুরু করিলাম, তাহা আর আমার ইচ্ছায় শেষ হইবে না। তাহার অব্যবহিত পরেই এক দুর্দান্ত ঝড়ের ন্যায় সেই ভয়াল ছায়ামূর্তি আমার ভিতর প্রবেশ করিল। আমার বুক হঠাৎ ভারাক্রান্ত হইল। মুখ হইতে নিরুচ্চারে এক গোঙানি নির্গত হইল। আমার দুই চক্ষু অগ্নিশিখার ন্যায় জ্বলজ্বল করিতে লাগিল, কিন্তু সেই দৃষ্টির মধ্যে মানবীয় কোমলতা কোথাও রহিল না। শিরদাঁড়া বরফশীতল হইয়া গেল, রক্তধারা যেন শিরায় জমাট বাঁধিয়া অচল হইল। গলা হইতে ক্রমাগত কর্কশ স্বর উত্থিত হইল, যাহা আমার নহে। বুঝিলাম অশরীরী আত্মাটি আমার দেহ-মধ্যস্থল দখল করিয়া ফেলিয়াছে। আমার আত্মা যেন কোণে অবসরপ্রাপ্ত, নিস্তেজ, এবং করুণভাবে কাঁদিতেছে, অথচ নিয়ন্ত্রণ লইবার ক্ষমতা একেবারে হারাইয়া ফেলিয়াছে। বাহ্যত আমি মানুষ, কিন্তু অন্তরে এক দানবীয় শক্তি আমার এই রক্ত-মাংসের কেল্লাকে অধিকার করিয়া বসিয়াছে। আমি নিজ দেহের দর্শক আসনে বসিয়া সকল কিছু অবলোকন করিতেছি। এই দেহে আমার কোনও নিয়ন্ত্রণ নাই। দেহ আমার, কিন্তু প্রাণ ও চেতন অন্য কারও। আমার মানবীয় সত্তা নিঃশেষ, কেবল অশুভের উল্লাস প্রবলরূপে বিকশিত।

    আমি আবার অজ্ঞান হইয়া পড়িলাম।

    .

    ॥ ৩॥

    আমার চোখ খুলিল। কিন্তু এইবার আর সেই অদ্ভুত রক্তমাখা অন্ধকার নয়, বরং বাস্তব জগতের শীতল রাত্রিকে পুনরায় দেখিতে পাইলাম। আকাশের রক্তবর্ণ চন্দ্র পুনরায় রুপালি রঙ ধারণ করিয়াছে। আর আমি সেই ভগ্ন প্রাসাদের নির্জন ঘরের মাঝখানে শুইয়া রহিয়াছি। চন্দ্রালোকে প্রাসাদের ঘরখানি ভাসিয়া যাইতেছে। আর সেই আলোকেই চারিদিকে নজর দিয়া বুঝিলাম ঘরের বয়স যেন এই সামান্য সময়ে কয়েক শত বৎসর বাড়িয়া গিয়াছে। চারিপাশে মৃত শৈবাল, মাকড়সার জাল, ভাঙা স্তম্ভ। সেই টেবিল আর গ্রন্থখানি আর নাই। প্রাসাদের প্রতিটি ইটের অন্তঃস্থল হইতে আমি স্পষ্ট শুনিতে পাইতেছিলাম এক অবরুদ্ধ ধুকপুক শব্দ, যেন উহারা প্রাণপণ রক্তসঞ্চালন করিতেছে। মেঝেতে হাত রাখিলাম। তাও ক্রমাগত ধীর লয়ে কাঁপিতেছে। গোটা প্রাসাদ যেন কোনও জীবন্ত দানবের প্রকাণ্ড শরীর।

    আমি নিজ পায়ে দাঁড়াইতে চেষ্টা করিতেই বুঝিলাম, এ শরীর আর সেই পুরাতন দেহ নাই। আমার হাতের শিরায় অগ্নির রেখা দাউদাউ করিয়া জ্বলিতেছে। নখরের প্রান্ত পর্যন্ত সেই লাল আভা ছড়াইয়াছে। আমার প্রতি শ্বাসে পৌরাণিক ড্রাগনের ন্যায় ধোঁয়া নির্গত হইতেছে। প্রথমে ভীত হইলাম। তবু ভাগ্যের ব্যাপার, আমার মনুষ্য আত্মাটির চিত্তনক্ষমতা তখনও লোপ পায় নাই। তাই অচিরেই মনে হইল, এ শক্তি আমাকে গিলিয়াছে বটে, কিন্তু একইসঙ্গে আমায় দিয়াছে অমানুষিক ক্ষমতা। যেন অসংখ্য অশুভ আত্মা আমার দেহে আশ্রয় পাইয়া আমাকে অদম্য করিয়া তুলিয়াছে। যদি আমার মনুষ্যসত্তার কিছু মাত্র বাঁচাইয়া রাখিতে পারি, তবে এই মহাবিপদ হইতেও মুক্তি সম্ভব। এইসব ভাবিতেছি, আচমকা শুনিলাম করিডরের দিক হইতে কেহ বা কাহারা আসিতেছে। তাহাদের পদচারণায় প্রাচীন মেঝেতে ঘষা খাইবার ন্যায় টানা এক শব্দ উত্থিত হইতেছে। আমি ধীরে ধীরে সেই দিকে অগ্রসর হইলাম। করিডর ভেদ করিয়া যখন ভগ্ন অন্দরে প্রবেশ করিলাম, দেখিলাম একদল ছায়ামূর্তি আমারই জন্য অপেক্ষা করিতেছে। তাহারা একইসঙ্গে আমার দিকে হাত তুলিল, আর কণ্ঠ মিলাইয়া উচ্চারণ করিল—

    “প্রভু…! আমাদের মুক্তি দাও… আমাদের কাজে লাগাও… আমরা তোমার সেনা।

    আমি হতবুদ্ধি হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম। এরা তো সেই আত্মারা, যাহাদের আর্তনাদ শুনিয়াছিলাম সেই অন্ধকার পাতালে! তাহারা তবে এক্ষণে আমার অধীন? আমি তাহাদের দাস নহি, বরং তাহারা আমার! কিংবা হয়তো বা আমার নহে। আমাকে সেতু বানাইয়া যে দানব এই দেহপঞ্জরে বাসা বাঁধিয়াছে তাহার। যাহাই হউক না কেন, এ দেহ আমার। এ মস্তিষ্কে এখনও দানব তাহার কব্জা জমাইতে পারে নাই। এই নতুন উপলব্ধি আমার শরীরে প্রবল স্রোতের ন্যায় ছুটিয়া গেল। আমি দক্ষিণ হস্ত বরাভয়ের ন্যায় উত্থিত করিলাম। অদৃশ্য এক শক্তির ঢেউ ছুটিয়া গেল চারিদিকে। প্রাসাদের দেয়াল কাঁপিয়া উঠিল, মাকড়সার জাল ছিঁড়িয়া গেল, ভগ্ন স্তম্ভ কাঁপিয়া কাঁপিয়া ভাঙিতে লাগিল। অথচ আমি কোনও ভয়ের পরিবর্তে এক ভয়ংকর তৃপ্তি অনুভব করিলাম। বুঝিলাম, আমি আর এক অভিশপ্ত গ্রন্থের হতভাগ্য পাঠক মাত্র নই। সম্পূর্ণ গ্রন্থটি আত্মস্থ করিয়া আমি নিজেই সেই অভিশপ্ত গ্রন্থের জীবন্ত প্রতিমূর্তি।

    প্রাসাদের অন্ধকার করিডরে হাঁটিয়া চলিলাম। প্রতিটি পদক্ষেপে ছায়ামূর্তিরা আমাকে অনুসরণ করিল। আমার দেহের মধ্যে কিলবিল করিয়া বহিতেছে সেই গ্রন্থের প্রতিটি অক্ষর। এক অমোঘ টান আমাকে লইয়া চলিল প্রাসাদের উপরের কক্ষের দিকে, যেখান হইতে সেই বৃদ্ধ নামিয়াছিলেন। প্রতি পদক্ষেপে যেন মৃতকালের প্রতিধ্বনি বাজিতেছে। ধাপে ধাপে উঠিবার সময় জীর্ণ কাঠের তক্তা কট্‌ট্ শব্দ করিতে লাগিল। প্রতিটি বাঁকে সিঁড়ির অন্ধকার আরও গাঢ় হইয়া উঠিতেছিল। নিস্তব্ধতার মধ্যেই হঠাৎ দূরবর্তী করুণ নিশ্বাসের শব্দ করে আসল, কিন্তু চারিদিকে কাহাকেও দেখিতে পাওয়া গেল না। উপরের দিকে যতই উসিতেছি ততই মনে হইল সিঁড়িটি অন্তহীন। পদধ্বনি শূন্যে প্রতিধ্বনিত হইয়া ফিরিয়া আসিতেছিল, যেন বহু পদক্ষেপ একত্রে চলিতেছে। সেই প্রাসাদের সিঁড়ি যেন কেবল ইট-পাথরের নহে, বরং অভিশপ্ত আত্মাদের অদৃশ্য পথ, যাহাতে একবার পা রাখিলে আর সহজে ফেরা যায় না। প্রতিটি ধাপ অশরীরীর নিশ্বাসে ভরপুর, প্রতিটি ছায়া মৃত্যুর অঙ্গীকার বহন করে।

    একসময় তাহাও শেষ হইল। দেখিলাম উপরে এক বিরাট কক্ষ। আর সেই কক্ষের কেন্দ্রে সেই অদ্ভুত গ্রন্থটি এখনও মেঝেতে উলটানো অবস্থায় শুইয়া আছে। আমি তাহার দিকে হাত বাড়াইতেই সেটি খুলিয়া গেল। গ্রন্থে আর কোনও পৃষ্ঠা অবশিষ্ট নাই। সকলই আমার দেহে পরজীবীর ন্যায় বাসা বাঁধিয়াছে। কিন্তু মলাটে সেই দুর্বোধ্য অক্ষরে খোদিত রহিয়াছে—

    “প্রাসাদকে পুনর্জীবন দাও। বাইরের পৃথিবীকে আহ্বান করো। এই ভগ্ন প্রাচীরের বাইরে যে অসংখ্য তৃষ্ণার্ত, অসমাপ্ত আত্মারা অপেক্ষা করছে, তাদের ডাকো। পৃথিবী থেকে মরমানুষের আলো মুছে ফ্যালো।”

    চমকিয়া উঠিলাম। এ কেমন আদেশ! আমি যেন বহুদূর হইতে আমার গ্রামখানিকে দেখিতে পাইতেছি। আমার গ্রাম। যেখানে আমার জন্ম, আমার জীবন যৌবন। প্রাঙ্গণে তুলসীচৌকি, পাশে কূপ, আর দরজার সম্মুখে গোবরলেপা আঙিনা। সন্ধ্যার সময় গৃহিণীগণ প্রদীপ জ্বালিয়া পূজা করিতে বসেন, আর সন্ধ্যাকালে শঙ্খধ্বনি ভাসিয়া আসে। শিশুগণ সেই সময়ে ক্রীড়ারত, আর বৃদ্ধগণ পিঁড়ি পাতিয়া একত্রে কালক্ষেপ করেন। সেখানে মানুষ এখন নিশ্চিন্তে ঘুমাইতেছে। আমার বৃদ্ধা মাতা, আমার ভ্রাতা ভগিনীগণ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তাহারা কেহই জানে না এই ধ্বংসপ্রাসাদ আবার জাগিয়া উঠিয়া আমার দ্বারাই তাহাদের ভয়ানক ক্ষতিসাধন করিতে উদ্যত।

    আমার অন্তরে ভয় আর করুণা জন্মাইতে না জন্মাইতে একইসঙ্গে তাহার স্থান লইল এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা। যেন আমি সেই গ্রামের প্রতিটি প্রাণ শুষিয়া লইতে চাই, তাহাদের আত্মা দিয়া এই সেনাদলকে আরও শক্তিশালী করিতে চাই। বুঝিতে পারিলাম সেই দুরাত্মা দানব ধীরে ধীরে আমার মস্তিষ্কের দখল লইতেছে। আর বিশেষ সময় নাই।

    আমি পুনরায় হস্ত উত্থিত করিলাম। কক্ষের ভেতরে বাতাস ঘুরিয়া ঘুরিয়া অগ্নিঝড়ের ন্যায় উঠিল। প্রাসাদের ছাদ ভেদ করিয়া এক রক্তিম শিখা আকাশে উঠিয়া গেল। সেই শিখা দিগন্তকে আলোকিত করিল। দূরের গ্রামে কুক্কুরগণ একযোগে হাউহাউ করিয়া উঠিল। শিশুরা ঘুম ভাঙিয়া কাঁদিতে লাগিল। বয়স্কদের বুক কাঁপিয়া উঠিল অজানা আতঙ্কে।

    বুঝিলাম প্রাসাদের পুনর্জাগরণ শুরু হইয়াছে।

    আমি হাসিলাম। কিংবা আমি নয়। কারণ যে হাসিল সে আমার নিয়ন্ত্রণে নাই। সেই প্রাণীটির কন্ঠে এক অচেনা, গম্ভীর, অমানবিক ধ্বনি গর্জিয়া উঠিল-

    “আক্রমণ!”

    প্রাসাদের প্রতিটি ইট সেই কন্ঠের সঙ্গে মিলিয়া একই আওয়াজ তুলিল। দূরের গ্রামে ঘোর রাত্রে হঠাৎ শৃগালের চিৎকার, কুক্কুরের ঘেউঘেউ আর কুক্কুটের বিভ্রান্ত ডাকে এক অদ্ভূত ভয়ের আবহ ছড়াইয়া পড়িল। মানুষজন জানালা খুলিয়া দেখিল দিগন্তব্যাপী লালাভ আলোয় আকাশ জ্বলজ্বল করিতেছে।

    কেহ প্রথমে ভাবিল, দূরে কোথাও অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়াছে। কিন্তু শীঘ্রই বুঝিল, ইহা জাগতিক অগ্নি নহে। সেই অগ্নি হইতে দপদপ করিয়া উত্থিত হইতেছে ঘনকৃষ্ণ ছায়ার দল। আমি তখন প্রাসাদের উচ্চতম স্থানে দাঁড়াইয়া আছি। আমার চারিপাশে আমার অশুভ সেনাদল সারিবদ্ধ। তাহাদের শূন্য চোখের গহ্বর হইতে আগুন নির্গত হইতেছে, আর প্রতি পদক্ষেপে ধ্বনিত হইতেছে বিকট ধাতব আওয়াজ।

    আমি এবার দুই হস্ত একত্রে সম্মুখে বাড়াইয়া দিলাম। এক অদৃশ্য শক্তি গ্রামমুখী হইয়া বিদ্যুতবেগে ছুটিয়া গেল। মুহূর্তে চাঁদ নিভিয়া গেল, তারারা নিভিয়া গেল, বাতাস স্থবির হইয়া পড়িল, গ্রামের সকল আলো বুজিয়া গেল। গোটা গ্রামের উপরে নামিয়া আসিল এক দমবন্ধ অন্ধকার।

    গ্রামের মানুষরা দেখিতে পাইল ঘরের দেওয়ালে অচেনা সব ছায়া ঘুরিতেছে। সেই ছায়া একবার মানুষের রূপ, আবার পশুর রূপ, আবার একবার দেহহীন জেলির আকার ধারণ করিল। শিশুরা চিৎকার করিয়া মায়ের আঁচল আঁকড়াইয়া ধরিল। মায়েরা বিবর্ণ, পাথরের ন্যায় স্থির চোখে সন্তানকে জড়াইয়া অনাগত ভবিষ্যতের অপেক্ষা করিতে লাগিল। কাহারা কহিল সত্বর মন্দিরের ঘণ্টা বাজাইয়া এই অশুভ আত্মাকে দূর করো। বৃদ্ধ পুরোহিত মন্দিরের ঘণ্টা বাজাইতে গেলেন। কিন্তু ঘণ্টার ধ্বনি হাহাকারের ন্যায় বাজিতে লাগিল। দেবমূর্তির চোখ হইতে অশ্রুর ন্যায় কালো তরল ঝরিতে লাগিল।

    আমি দূর প্রাসাদের উপরে দাঁড়াইয়া এই সকলই দেখিতে পাইতেছিলাম। এ দৃশ্য একাধারে আমাকে উত্তেজিত করিতেছে, অন্যদিকে আমার বুকের ভিতর এক অবরুদ্ধ ক্রন্দন নীরবে ফুঁপাইতেছে। এই ভাব ভাষায় ব্যক্ত করা অসম্ভব। যেন আমি এক নাটকের পরিচালক, আর সমগ্র গ্রাম আমার ক্রীড়নক।

    আমার সেনারা ধীরে ধীরে গ্রামমুখী হইয়া নামিতে লাগিল। তাহারা যখন প্রথম গৃহের সম্মুখে পৌঁছাইল, তখনই শিশুর কান্না থামিয়া গেল। নীরবতার মধ্যে শুধু শোনা গেল শুকনো পাতার ন্যায় চটচট শব্দ… যেন কোনও অদৃশ্য দাঁত কচি মাংস ছিঁড়িতেছে।

    তাহার পরেই গ্রামের প্রত্যেক ঘর হইতে সুতীব্র ভয়াল আর্তনাদ উঠিল।

    গ্রামবাসীরা যেদিক সম্ভব পালাইতে লাগিল। কিন্তু পালাইবার পথ নাই। চারিদিকে অন্ধকার যেন দুর্ভেদ্য এক প্রাচীর উঠাইয়া দাঁড়াইয়াছে। সেই প্রাচীরের ওপারে শুধু ছায়া, যাহা একে একে সকলকে জাপটাইয়া ধরিতেছে। তাহাদের শরীর ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হইয়া মিলাইয়া যাইতেছে আমার সেনাদের দেহে।

    ঠিক এমন সময়ে গ্রামপাড়ের দিক হইতে একদল মানুষ অগ্নি জ্বালাইয়া বাহির হইল। তাহাদের হাতে মশাল, মুখে ত্রাণমন্ত্র। তাহারা দৌড়াইয়া গ্রামের কেন্দ্রস্থলে মন্দিরের সামনে জুটিল। তাহাদের নেত্রী এক বৃদ্ধা। কৃশ দেহ কিন্তু চক্ষে প্রবল দীপ্তি। এই বৃদ্ধাকে আমি চিনি। যখন আমি মনুষ্য ছিলাম, ইনি আমার মাতা ছিলেন।

    তিনি চিৎকার করিয়া বলিলেন, “শোনো সবাই! এই অশুভ শক্তি যদি প্রাসাদ থেকে এসে থাকে, তবে তার পতনও সেখানেই ঘটবে। আমরা অত সহজে হার মানব না। আমাদের বীজমন্ত্র আগেও আমাদের বাঁচিয়েছে, এবারও সে-ই আমাদের রক্ষা করবে।”

    বৃদ্ধা আপন ঝুলন্ত চুল খুলিয়া দিলেন, এক ত্রিশূল হাতে লইলেন, আর কণ্ঠে উচ্চারণ করিলেন অগ্নিময় মন্ত্র। শূন্যে যেন বজ্রধ্বনি গর্জিয়া উঠিল। একদিকে প্রেতবাহিনী কর্কশ হাসিয়া তাঁহার দিকে ধাবমান, অন্যদিকে বৃদ্ধার চোখ অগ্নিশিখার ন্যায় জ্বলিতে লাগিল। তিনি মাটি হইতে একমুষ্ঠি ধূলি তুলিয়া মন্ত্রোচ্চারণে আকাশে ছুড়িয়া দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে সেই ধূলি পরিণত হইল অগ্নিস্ফুলিঙ্গে, যাহা বজ্রপাতের ন্যায় প্রেতদিগের দেহে আঘাত করিতে লাগিল। প্রেতেরা কাতর ধ্বনিতে চিৎকার করিল, কিন্তু মন্ত্রের বল এতই প্রবল যে তাহাদের বিকৃত দেহ ছাই হইয়া গেল।

    গ্রামবাসীরা আগুনের মশাল একত্র করিয়া মণ্ডল আকৃতিতে দাঁড়াইল। মুহূর্তে চারিপার্শ্বে এক ক্ষীণ সোনালি আলো সৃষ্টি হইল, যাহা সেই অন্ধকারকে খানিকটা দূরে ঠেলিয়া দিল। এদিকে বৃদ্ধার কণ্ঠ তখন বজ্রের ন্যায় উচ্চ। তিনি ত্রিশূলখানি ভূমিতে আঘাত করিতেই মাটি ফাটিয়া গেল আর অগ্নিগর্ভ গহ্বর হইতে এক অদৃশ্য শক্তি বিরাট মুখব্যাদানে আমার প্রেতবাহিনীকে গ্রাস করিতে লাগিল। একে একে শত শত প্রেত সেই গহ্বরে নিমজ্জিত হইয়া ভস্ম ও ধুম্রে বিলীন হইল। আকাশে যে রক্তিম জ্যোতি ছড়াইয়া ছিল, তাহাও ধীরে ধীরে অপসৃত হইল।

    প্রথমবার বুকের মধ্যে এক কম্পন অনুভব করিলাম। যখন মরমানুষ ছিলাম, জানিতাম না আমার মাতা এক সাধারণ বৃদ্ধা নহেন। তিনি কোনও গুপ্ত সাধিকা, যাঁহার শক্তি বহুকাল সংসারপাশে নিদ্রিত ছিল। আজ আমিই তাহাকে জাগাইয়া তুলিয়াছি। কিন্তু ইহা আবেগের সময় নয়। আমি বুঝিলাম, এইবার আমাকে প্রাসাদ হইতে নামিতে হইবে। আমি প্রাসাদের উচ্চতর প্রাচীর হইতে ধীরে ধীরে নামিয়া আসিলাম। আমার প্রতিটি পদক্ষেপে বাতাস থমকাইয়া গেল, চারিদিকের বৃক্ষরাজি যেন শিরদাঁড়া সোজা করিয়া ভয়ে স্তব্ধ হইল। আমার কালো আবরণ বাতাসে উড়িতে উড়িতে গ্রামমুখী হইল। আমি দত্ত পিষিয়া অগ্রসর হইলাম। বুকের ভেতর এক অজানা ক্রোধ ফুঁপাইতে লাগিল।

    সোনালি মণ্ডলের মধ্যে দাঁড়ানো বৃদ্ধা দীপ্ত চোখে আমার দিকেই চাহিয়া রহিলেন। তাঁর ঠোঁটে গম্ভীর মন্ত্রজপ থামিল না, বরং আমার প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে আরও উচ্চস্বরে ধ্বনিত হইতে লাগিল।

    আমি শীতল কণ্ঠে কহিলাম, “মা, তুমি আমাকে বাধা দিয়ো না। মন্ত্র আর আগুন দিয়ে তুমি কি তোমার নিজের সন্তানকে আটকাতে পারবে? আজ আমার ভিতরে শত শত বছরের অভিশপ্ত আগুন। কেবল এ গ্রাম না, আমি সে আগুন সমস্ত পৃথিবীর শিরায় ছড়াতে এসেছি। তুমি বাধা দিয়ো না। চলে যাও। আমি তোমার আর ভাই বোনেদের কোনও ক্ষতি করব না।”

    বৃদ্ধা শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন, “তুই তো আমার ছেলে নোস বাছা। আমার ছেলের শরীর দখল করা এক অন্ধকারের ছায়া মাত্র। অগ্নি জীবন দেয়, আলো দেয়। আর তুই শুধু জীবন কেড়ে নিস। বহু বছর আগে আমারই অভিশাপে ওই প্রাসাদে দেহহীন হয়ে বন্দি ছিলিস। আজ সুযোগ পেয়ে আমারই ছেলের দেহকে আশ্রয় করে আমাদের চরম ধ্বংস করতে এসেছিস? তোর সাহস মন্দ না।”

    আমি উচ্চস্বরে হাসিয়া উঠিলাম। সেই হাসি সমগ্র গ্রাম কাঁপাইয়া তুলিল। ঘরের দরজা জানালা ঝনঝন করিয়া উঠিল, তালা ভাঙিয়া পড়িল। দূরে নদীর জলে ঢেউ উত্তাল হইল।

    “তোর ছেলে মরেনি। এখনও আমার মধ্যেই আছে। ও দেখুক, ওর মাকে, আত্মীয়দের আমি কীভাবে শেষ করি।” আমার কণ্ঠ বলিয়া উঠিল। সঙ্গে সঙ্গে কালো ঝড়ের ন্যায় আমার সেনারা একযোগে সেই মনুষ্যমণ্ডলের দিকে ধাইয়া আসিল।

    বৃদ্ধা হুংকার দিলেন, “অগ্নিমণ্ডল সজীব হোক!”

    মুহূর্তে এক দাউদাউ সোনালি অগ্নির বৃত্ত তাহাদের ঘিরিয়া ধরিল। আমার সেনারা তাহা স্পর্শমাত্র দগ্ধ হইয়া ভস্মে পরিণত হইতে লাগিল। তাহাদের আর্ত চিৎকার রাত্রির নীরবতা খানখান করিয়া দিল। আমি ক্রোধে গর্জিয়া উঠিলাম, “এই আগুনের ভয় দেখিয়ে আমায় রুখতে পারবি? সাধ্য থাকলে তোর আগুন আমায় গ্রাস করুক!” আমি হস্ত ভূমির দিকে নামাইলাম। ভূগর্ভ হইতে কৃষ্ণবর্ণ এক শীতল অগ্নি উঠিয়া আসিল, যাহার স্পর্শে পাথর গলিয়া যায়, বৃক্ষ শুকাইয়া যায়, মনুষ্যের প্রাণ নির্গত হয়।

    বৃদ্ধার সোনালি অগ্নির সহিত সেই কৃষ্ণবর্ণ অগ্নির ভয়ানক সংঘর্ষ ঘটিল। মুহূর্তে যেন আকাশ ফাটিয়া গেল। বিদ্যুৎ চমকাইল, বজ্র গর্জিল। মনুষ্যেরা মশাল ফেলিয়া কান চাপিয়া বসিয়া রহিল, যেন এখনই পৃথিবী ভাঙিয়া পড়িবে। বৃদ্ধা ঠায় দাঁড়াইয়া রহিলেন। তাঁহার মুখমণ্ডল ঘর্মসিক্ত, তবুও মন্ত্রোচ্চারণ থামিল না। তিনি চিৎকার করিয়া উঠিলেন, “ওঁ অগ্নিঃ শুদ্ধিঃ!”

    আমার বুকের ভিতর এক প্রচণ্ড দহন শুরু হইল। অনুভব করিলাম, আমার অভিশপ্ত শক্তি ক্রমে ক্রমে ক্ষয় পাইতেছে। আমি স্মরণ করিলাম সেই ক্ষণকে যখন প্রথমবার আমি নিষিদ্ধ গ্রন্থ পাঠ করিয়া অমরত্বের অভিশাপ লইয়াছিলাম। আমি দাঁড়াইয়া আছি অগ্নিবৃত্তের বাইরে। আমার শরীরের ভিতর দাউদাউ জ্বলিতেছে কৃষ্ণবর্ণ অগ্নি, কিন্তু সে অগ্নিও ধীরে ধীরে নিভিয়া আসিতেছে। আমি গর্জিয়া উঠিলাম, “না… এ প্রাসাদ আমার। এ গ্রাম আমার। আমি ছাড়া আর কারও অধিকার নেই এখানে।” কিন্তু সেই মুহূর্তে প্রাসাদের অন্তঃপুর হইতে এক অদ্ভুত শব্দ ভাসিয়া আসিল। যেন শত শত মানুষের করুণ রোদন আর শৃঙ্খল ছিঁড়িবার শব্দ।

    আমি চমকিয়া উঠিলাম। বহু শতাব্দী পূর্বে আমি যাহাদের বন্দি করিয়া রাখিয়াছিলাম, সেই আত্মারা কি তবে মুক্ত হইতেছে? প্রাসাদের দেওয়াল ফাটিয়া গেল। একের পর এক কালো ছায়া বাহিরে আসিতে লাগিল। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, তাহারা আমার দিকে ফিরিল না। তাহারা শূন্য আকাশের পানে তাকাইয়া ধীরে ধীরে মিলাইয়া গেল, যেন সকলে একযোগে মুক্তি পাইতেছে।

    আমি ক্রুদ্ধ হইয়া বলিতে চাহিলাম, “না! তোমরা আমার দাস। আমার শক্তি তোমাদের মধ্যেই নিহিত। তোমরা আমায় ছেড়ে যেতে পারো না!” কিন্তু এক অপার্থিব শক্তি যেন আমার কণ্ঠরোধ করিয়া রাখিল। আত্মারা কোনও উত্তর দিল না। তাহারা আমার অভিশাপ ভাঙিবার এই মুহূর্তটুকুর জন্য শত সহস্র বৎসর অপেক্ষা করিতেছিল।

    বৃদ্ধা সেই দৃশ্য দেখিয়া শান্ত স্বরে বলিলেন, “দেখ, তোর প্রাসাদ আজ তোকেই ত্যাগ করেছে। যাদের রক্তে তুই শক্তি সঞ্চয় করেছিস, তারা আজ মুক্তি পেল। এখন তুই একা, নিঃসঙ্গ, দীন। আমার ছেলেকে তুই গ্রাস করেছিস। সেই শাস্তি তোকে পেতেই হবে।”

    আমার বুক ফাঁপা হইয়া উঠিল। শরীরের ভিতরের হুতাশন নিভিয়া আসিতেছে দ্রুত। আমি হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া পড়িলাম। রাত্রির আকাশে চাঁদের আলো পড়িল আমার উপর, এবং প্রথমবার আমি অনুভব করিলাম… আমি দুর্বল।

    দেখিতে পাইলাম আমার চোখের সম্মুখে সমগ্র প্রাসাদ অগ্নির লেলিহান শিখায় আবৃত হইয়া পড়িল, যেন সে নিজেই ভস্মীভূত হইবার জন্য প্রস্তুত। বৃদ্ধা হস্ত উত্তোলন করিলেন। বুঝিলাম এই শেষ। চক্ষু বন্ধ করিয়া অন্তিমকালের অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। বৃদ্ধার বিড়বিড় শব্দ ক্রমে দূরাগত এক ধ্বনির ন্যায় কর্ণে প্রবেশ করিতে লাগিল। মনে হইল এক মরণঘুম আমাকে আচ্ছন্ন করিতেছে। পলক ক্রমশ ভারী হইয়া আসিল, দেহে রক্তের প্রবাহ শীতল হইয়া গেল, আর হৃদয়ের স্পন্দন যেন দূরবর্তী ঢাকের মৃদু ধ্বনির ন্যায় ক্ষীণ হইতে লাগিল। সমস্ত ইন্দ্রিয়প্রত্যঙ্গ অসাড় হইয়া পড়িল, শ্বাস যেন গলায় থমকাইয়া দাঁড়াইল। অন্ধকারের অতল গহ্বর আমাকে টানিয়া লইয়া চলিল, যেন অশরীরী কোনও করাল হস্ত আমার বক্ষ আঁকড়াইয়া ধরিয়াছে। তাহার পর আর কিছু নাই…

    .

    ।।৪।।

    জ্ঞান ফিরিতে দেখি বিরাট এক শ্বেত প্রান্তরে আমি শুইয়া রহিয়াছি। আমার দেহে বিন্দুমাত্র বল অবশিষ্ট নাই। কে যেন গজাল দিয়া আমায় সেই প্রান্তরে আঁটিয়া রাখিয়াছে। আমি প্রাণপণে চিৎকার করিতে চাহিলাম। মুখ দিয়া কোনও শব্দ উচ্চারিত হইল না। খানিক বাদেই সেই প্রান্তর দুলিতে শুরু করিল। আর তখনই গোটা অবস্থা আমার সম্যক বিবেচনায় আসিল।

    আমি কোনও প্রান্তরে শুইয়া নাই। বৃদ্ধা তাঁহার অমোঘ মন্ত্রবলে আমায় পুনরায় দেহহীন করিয়া পুস্তকের কাগজনির্মিত পৃষ্ঠার এক অক্ষরে পরিণত করিয়াছেন। আমি অমর হইতে চাহিয়াছিলাম। এখন এই পুস্তকের পৃষ্ঠায় বাকি সকল অভিশপ্ত আত্মার ন্যায় আমি এক নিষ্প্রাণ অক্ষর হইয়া চিরটাকাল শুইয়া থাকিব। নির্জীব, নীরব, নিস্পন্দ। আমার লয় নাই, ক্ষয় নাই, শক্তি নাই। যতক্ষণ না কেউ আমায় উচ্চারণ করে। যতক্ষণ না তাহার কণ্ঠ, তালু, মূর্ধা, দত্ত কিংবা ওষ্ঠকে সেতু বানাইয়া আমি পুনরায় প্রাণ ফিরিয়া পাই।

    ঠিক এই মুহূর্তে একজোড়া চোখ নিবিষ্ট মনে আমায় অধ্যয়ন করিতেছে। তাহার ভ্রূকুঞ্চিত, অক্ষিপটল স্ফীত। সে চাহিতেছে প্রতিটি অক্ষরকে জীবিত করিয়া নিজ মধ্যে আত্মীকরণ করিতে। তবে কি আমার অপেক্ষা শেষ হইল? আপনিই কি সেই নির্বাচিত ব্যক্তি? আমার মুক্তিদাতা? আমার দাস?

    .

    লেখকের জবানি- রসিক পাঠক মাত্রেই বুঝবেন গল্পটি সম্পূর্ণ মৌলিক হলেও এইচ পি লাভক্রাফটের অনেকগুলো ট্রোপ এখানে ব্যবহার করেছি। সাধু ভাষার প্রয়োগও ঠিক সেই কারণেই। লম্বা লম্বা বর্ণনা, পরিবেশের ডিটেলিং ইত্যাদি সব ওই ঘরানারই ফসল। এই বড়গল্পখানি আগে অপ্ৰকাশিত।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleবোতল ভূত – হুমায়ূন আহমেদ
    Next Article খেলার নাম খুন – সৈকত মুখোপাধ্যায়

    Related Articles

    কৌশিক মজুমদার

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    কৌশিক মজুমদার

    নোলা : খাবারের সরস গপ্পো – কৌশিক মজুমদার

    August 4, 2025
    কৌশিক মজুমদার

    সূর্যতামসী – কৌশিক মজুমদার

    August 4, 2025
    কৌশিক মজুমদার

    আঁধার আখ্যান – কৌশিক মজুমদার

    August 4, 2025
    কৌশিক মজুমদার

    নীবারসপ্তক – কৌশিক মজুমদার

    August 4, 2025
    কৌশিক মজুমদার

    অগ্নিনিরয় – কৌশিক মজুমদার

    August 3, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }