Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকতে -এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ

    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ এক পাতা গল্প563 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৪. দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর

    ০৪.

    দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মুসলিম বাহিনীর সাহায্যে পাঁচ হাজার সদস্যের একটি বাহিনী এসে পৌঁছল। তারিক বিন যিয়াদ অধীর আগ্রহে সেনা-সাহয্য পৌঁছার অপেক্ষা করছিলেন। সেনা-সাহায্য পৌঁছতেই আল্লাহর দরবারে তিনি শোকরিয়া আদায়ের জন্য সেজদায় লুঠিয়ে পড়লেন। সেনা-সাহায্য পৌঁছার আগ পর্যন্ত তিনি এতটাই অস্থির আর বেকারার ছিলেন যে, গভীর রাতে কখনও ঘুম ভেঙ্গে গেলে তিনি তাঁবু থেকে বের হয়ে সোজা রক্ষীবাহিনীর কমান্ডারের তাঁবুতে প্রবেশ করে তাকে ডেকে তুলতেন, আর বলতেন,

    ‘এখনই দুজন ঘোড়সওয়ার সমুদ্রের দিকে পাঠিয়ে দাও। সেনা-সাহায্য আসার সাথে সাথে যেন তারা আমাকে সংবাদ দেয়। আমি ঘুমিয়ে পড়লেও আমাকে ঘুম থেকে জাগ্রত করে তৎক্ষণাৎ সংবাদ দেবে।’

    প্রতিদিন একবারের জন্য হলেও তিনি সমুদ্রসৈকতে গিয়ে উপস্থিত হতেন। আর জাবালুতারিকের উঁচু কোন টিবির উপর দাঁড়িয়ে জাহাজের প্রতীক্ষায় চেয়ে থাকতেন। কখনও পায়ের আঙ্গুলের উপর ভর করে দৃষ্টির শেষ সীমানায় জাহাজের চিহ্ন খুঁজে বেড়াতেন। অবশেষে যখন নিশ্চিত হতেন যে, আজ আর জাহাজ আসবে না তখন তার প্রতিটি কথায় ও কাজে গোসা ঝড়ে পড়ত। তার সহকারী সারগণ তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন,

    ‘এতো দূর থেকে সেনা-সাহায্য এসে পৌঁছতে কিছুটা বিলম্ব তো হবেই। এতো বিচলিত হওয়ার কোন কারণ নেই।

    ‘আমি বুঝতে পেরেছি, সেনা-সাহায্য আসতে এত দেরী হচ্ছে কেন?’ তারিক বিন যিয়াদ প্রতিদিন এই একই কথার পুনরাবৃত্তি করতেন। আফ্রিকার সম্মানিত আমীর হয়তো খলীফার নিকট সেনা-সাহায্য চেয়ে দামেস্কের উদ্দেশ্যে কাসেদ পাঠিয়েছেন। দামেস্ক থেকে সেনা-সাহায্য পৌঁছতে তো তিনটি নতুন চাঁদ উদিত হবেই। বুড়ো আর জোওয়ানের মধ্যে পার্থক্য তো এখানেই।’

    তারিক বিন যিয়াদ একবার অধৈর্য হয়ে বলে বসেন।

    ‘মুসা বিন নুসাইর অনেক বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। তিনি এখন সব কাজই ধীরে সুস্থে করতে পছন্দ করেন। এটা তার মনে রাখা উচিৎ, আমি নওজোওয়ান। আমার ধৈর্যশক্তি কম। সিরিয়া ও আরব থেকে সেনা-সাহায্য তলব করার মাঝে কী এমন বুদ্ধিমত্তার পরিচয় আছে? বাবার সম্প্রদায় তো এখনও মরে যায়নি, তাদের মাঝে শুধু এই এলান করলেই চলত যে, সমুদ্রের ওপারে বিন যিয়াদের সেনা-সাহায্য প্রয়োজন, তা হলে এক দিনেই মুসা বিন নুসাইরের নিকট শত-সহস্র যোদ্ধা জানের নাযরানা পেশ করার জন্য জমা হয়ে যেত।

    সেনা-সাহায্য পৌঁছতে বিলম্ব হওয়ার কারণে তারিক বিন যিয়াদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হল। আত্মসংবরণ করতে তাঁর অনেক কষ্ট হচ্ছিল। তারপরও তিনি বড় ধরনের যুদ্ধের জন্য তাঁর বাহিনীকে প্রস্তুত করে তুলছিলেন। তিনি অশ্বচালনার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিলেন। থিয়োডুমিরের পরাজয়ের পর যুদ্ধলব্ধ ঘোড়াগুলো যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য তিনি বিশেষ নির্দেশ জারি করেছিলেন।

    জাবালুততারিকের যুদ্ধে যে ঘোড়াগুলো মুসলমানদের হস্তগত হয়েছিল, তারিক বিন যিয়াদ কয়েকশ’ পদাতিক সৈন্য বাছাই করে ঘোড়াগুলো তাদেরকে দিয়ে দেন। তিনি তাদেরকে ঘোড়ায় চড়ে গেরিলা যুদ্ধের বিশেষ প্ৰশীক্ষণও প্রদান করেন।

    তারিক বিন যিয়াদ অকর্মণ্য হয়ে বসে থাকার লোক ছিলেন না। পরাজিত জেনারেল থিয়োড়মিরের কথা চিন্তা করেও তিনি অস্বস্তি অনুভব করছিলেন। তিনি ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলেন, থিয়োডুমির পরাজয় মেনে নিয়ে পরবর্তী আক্রমণের আশায় নিশ্চিন্তে বসে থাকবে না। সে অবশ্যই পরাজয়কে বিজয়ে পরিণত করার চেষ্টা করবে। নিশ্চয় সে জবাবী হামলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।

    তারিক বিন যিয়াদ পূর্বেই এই সংবাদ পেয়েছিলেন যে, আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিক এখন রাজধানী টলেডোতে নেই। সে বিদ্রোহ দমন করার জন্য পাম্পালুনা নামক এক সীমান্ত এলাকায় গেছে। তারিক ভাবছিলেন, রডারিকের এই অনুপস্থিতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে আন্দালুসিয়ার আরও কিছু এলাকা দখল করে নেওয়া যায় কি না? কিংবা অতর্কিত হামলা চালিয়ে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর বড় ধরনের ক্ষতিসাধন করা সম্ভব হয় কি না?

    অবশেষে সেনা-সাহায্য এসে পৌঁছলে তারিক তাদেরকে মাত্র একটি রাতের জন্য বিশ্রাম দিলেন। পরদিন ভোর হওয়ার সাথে সাথে গোটা বাহিনীকে সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি জুলিয়ানকে জিজ্ঞেস করে সামনের এলাকা সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে নিয়েছিলেন। তাঁর গুপ্তচর ইউনিটের প্রধান অস্ত্র ছিল হেনরি।

    এই সেই হেনরি, যে ফ্লোরিডার সাথে ওয়াদা করে এসেছিল, রডারিকের মাথা কেটে নিয়ে যাবে। তারিক বিন যিয়াদ তার সাথে আরও দুজন চৌকস সৈনিককে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য নিযুক্ত করলেন। তারা সামনের এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ করে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সংগ্রহ করে আনত। তাদের দায়িত্ব হল, কোন এলাকায় কতজন সৈন্য আছে, কোন্ দুর্গ কতটা মজবুত, ইত্যাদি সংবাদ সংগ্রহ করা।

    তারিক বিন যিয়াদ সামনে যে এলাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, সেই এলাকার নাম ছিল কার্টিজা। কার্টিজার দুর্গ ছিল অত্যন্ত মজবুত। থিয়োডুমিরের বেশ কিছু সৈন্য যুদ্ধ থেকে পালিয়ে গিয়ে সেই দুর্গে আশ্রয় নেয়, ফলে কার্টিজা দুর্গের সৈন্যসংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। এতে দুর্গপ্রধানও অত্যন্ত খুশী হয়। সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সে ভাবতে শুরু করে যে, তার দুর্গ এখন অপরাজেয়। অথচ পালিয়ে আসা সৈন্যদের মাঝে লড়াই করার মতো কোন মনোবলই অবশিষ্ট ছিল না। বার্বার সৈন্যরা তাদের মনোবল ভেঙ্গে ঘুড়িয়ে দিয়েছিল।

    যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে আসা পরাজিত কোন সৈনিক কখনও নিজেকে ভীরু আর কাপুরুষ মনে করে না। সে নিজের পরাজিত মনোবৃত্তিকে গোপন করার জন্য শত্রুপক্ষকে অতিশক্তিশালী ও ভয়ঙ্কররূপে চিত্রিত করে। খিয়োডুমিরের পরাজিত সৈন্যরা কার্টিজার দুর্গে প্রবেশ করে আক্রমণকারী বাহিনী সম্পর্কে ভীতি আর ত্রাস ছড়াতে লাগল।

    তাদের একজন বলল, এরা তো মানুষ নয়, মানুষরূপী জিন-ভূত। আপন জীবনের কোন পরোয়াই তারা করে না।

    আরেকজন বলল, ‘আমরা দেখলাম, তাদের নিকট একটি ঘোড়াও নেই। হঠাৎ দেখি, অসংখ্য বোড়সওয়ার আমাদের পিছন দিক থেকে এসে আমাদের উপর অতর্কিত আক্রমণ করে বসল।

    অন্যজন বলল, ‘আসমান থেকে আমাদের উপর তীর নিক্ষেপ করা হতো। একেকটি তীর আমাদের একেকজন সৈন্যকে হত্যা করে ফেলত।’

    আরেকজন বলল, ‘সংখ্যায় তারা আমাদের অর্ধেকও ছিল না।

    অন্যজন বলল, তারা মেঘের গর্জনের ন্যায় মর্মভেদী হুঙ্কার ছেড়ে আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত, আমরা তাদেরকে প্রতিহত করতে পারতাম না।

    পরাজিত সৈন্যদের এসব কথাবার্তা দুর্গের ফৌজদের মনে যে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল, তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া শহরের বাসিন্দাদের মাঝেও পরিলক্ষিত হল। তারা এতটাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল যে, তারা ঘরে ঘরে প্রার্থনার আয়োজন করল। তাদের একমাত্র প্রার্থনা ছিল, এই ভয়ঙ্কর শত্রুবাহিনী যেন এদিকে না আসে। গোটা শহরে শক্তবাহিনীর নির্মমতা ও হিংস্রতা সম্পর্কে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে, শহরবাসী ভয়ে বিহ্বল হয়ে পড়ল।

    এ সময় কার্টিজা শহরের যে অবস্থা হয়েছিল তার বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ঐতিহাসিক লেনপুল লেখেন, মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা কম হলেও তারা সকলেই ছিল অসাধারণ সাহসী, অসম্ভব কষ্ট সহি, আর আত্মোৎসর্গের বলে বলিয়ান। তাদের নেতৃত্ব ছিল এমন এক সিপাহসালারের হাতে, ইতিহাস যাকে হিরো আখ্যায়িত করেছে। সামরিক শক্তি, উন্নত অস্ত্র-সস্ত্র ও সৈন্যসংখ্যার দিক থেকে আন্দালুসিয়ার বাহিনীকে অপরাজেয় মনে হলেও মানসিক দিক থেকে তারা ছিল অত্যন্ত ভীরু ও কাপুরুষ। অপর দিকে মুসলিম বাহিনী সামরিক শক্তিতে দুর্বল হলেও তাদের মানসিক শক্তি ছিল পর্বতসম। প্রত্যেকটি সৈনিক যুদ্ধজয়ের নেশায় টগবগ করছিল। যুদ্ধজয়ের তামান্না আর আত্মোৎসর্গের স্পৃহাই বলে দিচ্ছিল, কোন শক্তিই তাদেরকে প্রতিহত করতে সক্ষম হবে না।

    মুসলিম বাহিনী লড়াই করছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য, আর আন্দালুসিয়ার বাহিনী লড়াই করছিল বাদশাহর ক্রোধ থেকে আত্মরক্ষার জন্য। মুসলিম বাহিনী ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হুঙ্কার ছেড়ে প্রবল বিক্রমে শত্রুবাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। তাদের এই রণহুঙ্কার অন্তরের অন্তস্থল থেকে বের হয়ে আসত। এই রণহুঙ্কারের মাঝে ভীতি সঞ্চারণকারী যে প্রভাব ছিল, তা হল আল্লাহর নাম। আন্দালুসিয় বাহিনীর এমন কোন রণহুঙ্কার ছিল না। তারা শুধু। বলত, ‘আন্দালুসিয়ার বাদশাহ দীর্ঘ জীবি হোক। এটা ছিল এক নিষ্প্রাণ রণহুঙ্কার। আপন সৈনিকদের মাঝে যুদ্ধ-উন্মাদনা সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে এই রণহুঙ্কারের কোন ভূমিকাই ছিল না।

    ***

    সবুজে ঘেরা অনিন্দ্য সুন্দর এক নগরী কার্টিজা। প্রকৃতি যেন তার চতুর্দিকে নৈসর্গিক সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিয়েছে। তখনও পূর্ণরূপে ভোরের আলো ফোটেনি। দুর্গ প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে এক সৈনিক চিৎকার করে ঘোষণা করল, ঐ তো ওরা এসে গেছে।’

    মানুষের মুখে মুখে মুহূর্তের মধ্যে এই ঘোষণা গোটা নগরীতে ছড়িয়ে পড়ল। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই শহরবাসী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। তারা চিৎকার-চেঁচামেচি করে ছোটাছুটি করতে শুরু করল।

    দুর্গপতি দৌড়ে দুর্গ-প্রাচীরের উপর এসে দাঁড়াল। সে দেখতে পেল, মুসলিম বাহিনী সুতীব্র বেগে দু লক্ষ্য করে এগিয়ে আসছে। দুর্গপতি ভাবতে লাগল, এই সেই বাহিনী, যারা থিয়োডুমিরের মতো অভিজ্ঞ জেনারেলকে পরাজিত করেছে। থিয়োডুমির কিছুক্ষণের জন্য এই দুর্গেও আশ্রয় নিয়েছিল। সে এমনভাবে যুদ্ধের বিবরণ দিয়েছিল যে, দুর্গপতি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। সে দেখতে পেল, সেই জিন-ভূতের বাহিনী এখন তার দুর্গ লক্ষ্য করে ছুটে আসছে।

    ‘দুর্গের সকল ফটক ভালোভাবে বন্ধ করে দাও।’ দুর্গপতি প্রাচীরের উপর থেকে চিৎকার করে নির্দেশ দিল। ফটকের পিছনে সকলেই প্রস্তুত থাক।’

    নির্দেশ ঘোষিত হওয়ার সাথে সাথে তীরন্দাজ বাহিনী ও বর্শা নিক্ষেপকারী দল দুর্গপ্রাচীরের উপর আবস্থান গ্রহণ করল। দুর্গের ফটক ভিতর থেকে মজবুতভাবে বন্ধ করে দেওয়া হল। প্রত্যেক ফটকের পিছনে বিপুল সংখ্যক সৈন্য পজিশন নিয়ে দাঁড়াল।

    মুসলিম বাহিনী দ্রুতগতিতে দুর্গের নিকট পৌঁছে দুর্গের চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। তারিক বিন যিয়াদ আন্দালুসিয়ার ভাষায় ঘোষণা করালেন, দুর্গের ফটক খোলে দাও। অস্ত্র সমর্পণ কর। তোমাদের কারো তীরের আঘাতে আমাদের কোন সৈনিক যদি আহত বা নিহত হয়, কিংবা দুর্গের ফটক ভেঙ্গে যদি আমাদেরকে দুর্গে প্রবেশ করতে হয়, তাহলে তোমাদের প্রত্যেক সৈন্যের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। তোমরা নিজেরাই যদি ফটক খোলে দাও তাহলে তোমাদের সাথে অত্যন্ত উত্তম আচরণ করা হবে।

    মনে রেখো, আমরা দীর্ঘ দিন দুর্গ অবরোধ করে বসে থাকব না। আজকের সূর্য তখনই অস্ত যাবে যখন দুর্গ আমাদের করতলগত হবে।

    ‘তোমাদের সূর্য তো সেদিনই অস্ত গেছে, যেদিন তোমরা আন্দালুসিয়া আক্রমণ করেছ।’ দুর্গপ্রচীরের উপর থেকে দুর্গপতির গলধগম্ভীর আওয়াজ ভেসে এলো। সাহস থাকলে নিজেরাই দুর্গের ফটক খোলে নাও।

    তারিক বিন যিয়াদ তাঁর নির্দেশ পুনরাবৃত্তি করার প্রয়োজন মনে করলেন না। সাথে সাথে তিনি নির্দেশ দিলেন,

    ‘দুর্গ আক্রমণ কর, দুর্গের রক্ষাপ্রাচীর ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দাও।’

    মুসলিম বাহিনী দুর্গ আক্রমণ করার অর্থ ভালোভাবেই বুঝতেন। নির্দেশ পাওয়ামাত্রই এক দল সৈনিক কুঠার ও হাতুরী নিয়ে দুর্গের প্রধান ফটক লক্ষ্য করে ছোটে গেল। প্রাচীরের উপর থেকে তাদের উপর তীরবৃষ্টি শুরু হল। চতুর্দিক থেকে বর্শা ছুটে আসতে লাগল।

    বার্বার যোদ্ধারা তীরবৃষ্টির কোন পরোয়াই করত না। তারা ঝাঁকে ঝাঁকে বর্শা, আর তীরবৃষ্টি উপেক্ষা করে সম্মুখ দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।

    দুর্গের ফটক আক্রমণকারী বাহিনীর পিছনে তীরন্দাজ বাহিনী প্রস্তুত ছিল। তাদের ধনুক অত্যন্ত মজবুত ছিল। এ সকল ধনুক দ্বারা বহুদূরের লক্ষ্য ভেদ করা সম্ভব ছিল। ধনুক থেকে নিক্ষিপ্ত তীর আক্রান্ত ব্যক্তির দেহের অভ্যন্তরে ঢুকে যেত। এ জাতীয় ধনুক পরিচালনার জন্য বিশেষ দৈহিক শক্তির প্রয়োজন হত।

    মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনী দুর্গপ্রাচীরের উপর অবস্থানরত তীরন্দাজ ও বর্শা নিক্ষেপকারীদের লক্ষ্য করে সজোরে তীর ছুঁড়তে লাগল। তাদের নিক্ষিপ্ত তীরে আক্রান্ত হয়ে কয়েকজন সৈনিক দুর্গপ্রাচীর থেকে নিচে পড়ে গেল। আর অন্যরা মাথা নিচু করে আত্মরক্ষা করল।

    দুর্গের ফটক ছিল চারটি। সকল ফটকের উপর বার্বার যোদ্ধারা এক যোগে আক্রমণ রচনা করল। তুমুল তীরবৃষ্টি আর ঝাঁকে ঝাঁকে বর্শার আক্রমণ–কোন কিছুই তাদের নিবৃত রাখতে পারছিল না। তারা বিপুল বিক্রমে দুর্গের সকল ফটকের উপর কুঠার আর হাতুরীর সাহায্যে অনবরত আঘাত হেনে চলল।

    এটা ছিল অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ আক্রমণ। সাধারণত এভাবে দুর্গ আক্রমণ করা হয় না। কারণ, কোন সেনাপতিই তার অধীনস্থ যোদ্ধাদেরকে মৃত্যুর মুখে ঢেলে দিতে চান না। কিন্তু তারিক বিন যিয়াদের ধরনই ছিল ভিন্ন। তাঁর নীতি হল, তুমি নিজেই যদি শত্রুর জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে যাও তাহলে সকল বিপদাশঙ্কাই বিদূরীত হয়ে যাবে।

    তারিক বিন যিয়াদের শক্তির উৎস ছিল তাঁর অন্তর। যে অন্তরে তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাম নিয়ে কাফেরদের মোকাবেলায় জিহাদে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পবিত্র নাম তার হৃদয়ের গভীরে স্বমহিমায় প্রথিত ছিল। স্বপ্নে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে বিজয়ের সুসংবাদ ছিল তাঁর শক্তির আরেক উৎস।

    মূলত স্বপ্নের এই সুসংবাদ আল্লাহ তাআলার নির্দেশেরই পুনরাবৃত্তি ছিল। তিনি পবিত্র কালামে ইরশাদ করেছেন, “যদি তোমাদের মধ্যে বিশজন দৃঢ়পদ থাকে তাহলে তারা দুইশ কাফেরকে পরাজিত করতে সক্ষম হবে। আর যদি তোমাদের মধ্যে দুইশ জন দৃঢ়পদ থাকে তাহলে তারা এক হাজার কাফেরকে পরাজিত করতে পারবে।” (সূরা আনফাল : ৬৫, ৬৬)।

    তারিক বিন যিয়াদ এমন এক ব্যক্তি ছিলেন, যার অন্তরে পবিত্র কুরআনের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। যুদ্ধ জয়ের ব্যাপারে কেবল রাসূলুল্লাহর সুসংবাদবাণীই তাঁর শক্তির উৎস ছিল না; বরং পবিত্র কুরআনের উল্লেখিত অমোঘ বাণীও তাঁর প্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল।

    মুসলিম বাহিনীর প্রবল আক্রমণের সামনে কার্টিজার সৈন্যরা টিকতে পারল না। সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বেই কার্টিজার দুর্গ মুসলিম বাহিনীর করতলগত হল। অল্প সময়ের মধ্যে তারা একটি ফটক ভেঙ্গে ফেলল। তারপর বাধাপ্রাপ্ত পানির ঢলের ন্যায় মুসলিম বাহিনী ভাঙ্গা ফটক দিয়ে দুর্গে প্রবেশ করল। দুর্গের সিপাহীরা সামান্য সময়ের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুলল, কিন্তু তাদের প্রতিরোধযুদ্ধে বিজয়ের জন্য কোন আকাঙ্ক্ষা ছিল না। তারা শুধু দুর্গপতির নির্দেশক্রমে যুদ্ধ করছিল। দুর্গপতি নিজ সৈনিকদের মনোভাব বুঝতে পারল। বিপুল পরিমাণ সৈনিকের জীবন ধ্বংস হওয়ার পূর্বেই সে অস্ত্র সমর্পণ করল।

    আন্দালুসিয়ার বাহিনী আত্মসমর্পণ করার পর সর্বপ্রথম এই ঘোষণা প্রচার করা হল যে, কোন লোক যেন পালিয়ে না যায়। তাদের জান-মাল ও ইজ্জত-আবরুর পূর্ণ হেফাযত করা হবে।’

    লোকজনের মাঝে ভাগ-দৌড় শুরু হয়ে গেল। মা-বাবারা যুবতী মেয়েদের লুকিয়ে রাখার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। যাদের ঘরে ধন-দৌলত ছিল তারা সেই ধন-দৌলত একত্রিত করে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ সন্ধান করতে লাগল। তারিকের নির্দেশে পলায়নের সকল পথ বন্ধ করে দেওয়া হল।

    তারিক বিন যিয়াদের দ্বিতীয় নির্দেশ ছিল, ‘সকল সৈন্য যেন অস্ত্র সমর্পণ করে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তিনি এই নির্দেশও জারি করেন যে, ‘নগরবাসীদেরকে এই মর্মে সতর্ক করা হচ্ছে, তারা যেন কোন সিপাহীকে তাদের ঘরে আত্মগোপন করার সুযোগ না দেয়। কেউ যদি এই ভুল করে তাহলে তার ঘরের সকল সদস্যকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে গ্রেফতার করা হবে, আর যাবতীয় সহায়-সম্পদকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বিবেচনা করা হবে।’

    এমনিভাবে কার্টিজার মজবুত দুর্গ খুব অনায়াসে মুসলিম বাহিনীর করতলগত হল। সকল যুদ্ধবন্দীকে কার্টিজার দুর্গেই বন্দী করে রাখা হল।

    ***

    কার্টিজার দুর্গ মুসলিম বাহিনীর করতলগত হওয়ার কারণে আশপাশের বিশাল-বিস্তৃত উপত্যকা তারিক বিন যিয়াদের দখলে এসে গেল। এই উপত্যকার নাম রাখা হল, লাকা। সবুজ-শ্যামল দৃষ্টিনন্দন এই উপত্যকার সীমানা কয়েক মাইল দূরবর্তী এক নদীর সাথে গিয়ে মিশেছে। নদীর নাম গোয়াডিলেট।

    তারিক বিন যিয়াদ দুর্গে অবস্থান না করে নদীর তীরে তবু স্থাপনের নির্দেশ দিলেন। সেই সাথে মুসলিম বাহিনীকে সদা সতর্ক ও চৌকস থাকতেও বললেন।

    বিজিত দুর্গ থেকে এতো বিপুল পরিমাণ ঢাল-তলোয়ার, আর তীর-বর্শা হস্তগত হল যে, সেগুলো অনেক বড় ও দীর্ঘ মেয়াদী যুদ্ধের জন্য যথেষ্ট ছিল। সবচেয়ে মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল দুই হাজার ঘোড়া। তারিক বিন যিয়াদ এ সকল ঘোড়া এমন সব বাহাদুর সিপাহীদের মাঝে বণ্টন করে দেন, যারা প্রকৃত শাহসওয়ার ও যুদ্ধবাজ ছিল। তাদের প্রত্যেককে তারিক বিন যিয়াদ কমান্ডো যুদ্ধের বিশেষ প্রশীক্ষণও প্রদান করেন।

    তারিক বিন যিয়াদ প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগাচ্ছিলেন। তিনি চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য নিজ বাহিনীকে সর্বদা প্রস্তুত রাখতেন। তাঁর হাতে ছিল মাত্র বার হাজার সদস্যের এক সাধারণ বাহিনী। এই বাহিনীর মাধ্যমেই তাঁকে এক লাখ সদস্যের এক বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয়মাল্য ছিনিয়ে আনতে হবে। ইতিপূর্বের দুটি যুদ্ধে তিনি ভালোভাবেই লক্ষ্য করেছেন যে, আন্দালুসিয়ার বাহিনীর নিকট যে অস্ত্র-সস্ত্র আছে, তা অত্যন্ত উন্নত। তাদের প্রত্যেকের দেহে আছে লৌহবর্ম, আর মাথায় শিরস্ত্রাণ। এক লাখ সৈন্যের সংখ্যাটা এতো বেশি যে, মাত্র বার হাজার সৈন্যের মুসলিম বাহিনীকে পদপিষ্ট করে মেরে ফেলা তাদের জন্য একেবারেই সহজ। এই বিশাল বাহিনীকে একমাত্র রণকৌশলের মাধ্যমেই পরাজিত করা সম্ভব। তারিক বিন যিয়াদের একমাত্র চিন্তা ছিল, তিনি কী এই বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হবেন?

    ‘ইবনে যিয়াদ!’ তারিক বিন যিয়াদের চেহারায় দুশ্চিন্তার চিহ্ন দেখে জুলিয়ান একদিন তাঁকে বললেন। আপনার রাসূল তো আপনাকে বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েই দিয়েছেন। তারপরও আন্দালুসিয়ার অধিবাসীদের থেকে যে দুআ আপনি পাচ্ছেন, তাও আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। আশা করি, এ কথা আপনি বলবেন না যে, যারা মুসলমান নয়; আল্লাহ তাদের প্রার্থনা কবুল করেন না। আল্লাহ অবশ্যই তার নির্যাতিত বান্দার আহাজারি শুনেন; তাদের দুআ কবুল করেন।

    আপনি যুদ্ধবন্দীদের সাথে উত্তম আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যুদ্ধবন্দীদের চেয়েও শহরবাসীদের সাথে আরও বেশি উত্তম আচররণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আপনি বলেছেন, মুসলিম বাহিনীকে এই আস্থা অর্জন করতে হবে যে, তারা শহরবাসীদের ইজ্জত-আবরুর রক্ষক; তক্ষক নয়। মানুষ হিসেবে সব ধরনের অধিকার তারা প্রাপ্ত হবে। তারা যা উপার্জন করবে, তা তাদের নিজস্ব সম্পদ বলে বিবেচিত হবে। তবে সামর্থ অনুযায়ী সকলকে নিরাপত্তাকর আদায় করতে হবে।

    আপনি তো জানেন, রডারিকের রাজত্বে সাধারণ মানুষকে কীট-পতঙ্গের মতো মনে করা হয়। এখানে সেই ব্যক্তিই কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, যার কোন সরকারী পদ বা পদবী আছে। কিংবা আছে বিশাল ভিত্ত-বৈভব। যার রূপসী কন্যা-সন্তান আছে সে তার কন্যা-সন্তানকে এই ভয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয় যে, বাদশাহ বা কোন সরকারী পদস্থ কর্মকর্তা যদি তার কন্যার রূপ-লাবণ্য সম্পর্কে জানতে পারে তাহলে তার কন্যার সতীত্ব রক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। সামিরিক বাহিনীর লোকেরা সাধারণ মানুষকে ধরে নিয়ে গিয়ে বেগার খাটতে বাধ্য করে।

    ইবনে যিয়াদ! এই কার্টিজা ও তার আশপাশের যে সকল এলাকা আপনার করতলগত হয়েছে, সে সকল এলাকার লোকজন হানাদার বাহিনীর ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। সেসব এলাকা মানবশূন্য হয়ে পড়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, হানাদার বাহিনীর প্রধান হয়তো কোন রাজ্যের বাদশাহ হবে এবং রডারিকের মতোই জালিম হবে। তার বাহিনী বিজিত এলাকায় সুটতরাজ ও হত্যাযজ্ঞ চালাবে। যুবতী মেয়েদের ইজ্জত-আবরু নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে, তাদেরকে দাসী-বান্দি বানাবে। জবরদস্তী গৃহপালিত পশু নিয়ে যাবে। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ছেলে-মেয়ে ও গৃহপালিত পশু নিয়ে পাহাড়-জঙ্গলে পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করেছিল। পরে যখন জানতে পারল যে, হানাদার বাহিনী তাদের ঘরবাড়ির দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না তখন তারা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে এলো।

    ইবনে যিয়াদ। এ সকল নির্যাতিত, নিপীড়িত সাধারণ মানুষও আপনার সাথে আছে। তারা সকলেই আপনার বিজয়ের জন্য আপন প্রভুর নিকট প্রার্থনা করছে। তারা সুবিশাল আকাশের দিকে হাত প্রসারিত করে ফরিয়াদ করছে, রডারিকের বাদশাহী যেন ধ্বংস হয়ে যায়, তার সালতানাত যেন বরবাদ হয়ে যায়।

    ‘বিজিত এলাকার লোকদের সাথে মানবোচিত আচরণ করার নির্দেশ, আমার মনগড়া কোন নির্দেশ নয়। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। এই নির্দেশ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ।

    ***

    আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিক একলাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে ঝড়ের গতীতে এগিয়ে আসছিল। রডারিক রাজধানী টলেডোতে অবস্থান না করে সামনে এগিয়ে চলছিল। সে পূর্বেই পয়গাম পাঠিয়ে ছিল যে, সে টলেডোর শাহীমহলে অবস্থান করবে না। শহরের বাহিরে সামান্য সময়ের জন্য যাত্রা বিরতি করবে। সে টলেডোর উপকণ্ঠে এসে পৌঁছার পূর্বেই সেখানে সরকারী পদস্থ কর্মকর্তা, পারিষদবর্গ ও খোশামদীদের এক বিরাট অংশ তর আগমনের অপেক্ষা করছিল। তাদের মাঝে পরাজিত জেনারেল থিয়োডুমিরও উপস্থিত ছিল। এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে রডারিক সেখানে এসে উপস্থিত হল। থিয়োডুমির আগত লোকদের সম্মুখভাগে দাঁড়ানো ছিল। তার প্রতি দৃষ্টি পড়তেই র.রিক বলে উঠল,

    ‘তুমি কি নিজেকে এর উপযুক্ত মনে কর যে, আমি তোমার চেহারা দেখব? নিজ বাহিনীর চেয়েও অর্ধেক সংখ্যক বাহিনীর হাতে পরাজিত হয়ে আমাকে এখন স্বাগত জানাতে এসেছ? ধিক তোমাকে।

    ‘সম্মানিত শাহানশা, যুদ্ধের ময়দানে সেনাপতি একা লড়াই করে না। থিয়োডুমির রডারিকের গোসা বরদাশত করে বলল। আমি আমার বাহিনীর পূর্বে যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে আসিনি। আমার কসুর শুধু এতটুকুই যে, আমি সেখানে বেঘোরে মরার জন্য বা যুদ্ধবন্দী হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকিনি।

    রডারিক আরও বেশি রাগান্বিত হয়ে তাকে খুব তিরস্কার করল। থিয়োডুমিরও কোন সাধারণ জেনারেল ছিল না। রডারিক নিজেও তার শক্তি-সাহস, অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করত। থিয়োভুমিরও রডারিকের দুর্বলতা সম্পর্কে অবগত ছিল। সে আহত সিংহের ন্যায় গর্জে উঠে বলল,

    ‘আন্দালুসিয়ার মহামান্য শাহানশা। আপনি শাহীমহলে গিয়ে আরাম করুন, আর এই এক লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনীর দায়িত্বভার আমার হাতে ন্যস্ত করুন। আমি এই হানাদার বাহিনীকে একদিনে পদপিষ্ট করে সমুদ্রতীর পর্যন্ত পৌঁছে যাব, তারপর হানাদার বাহিনী যে রাজ্য থেকে এসেছে সেই রাজ্যে আপনার বিজয়ঝাণ্ডা উড্ডীন করে তবে ক্ষান্ত হব। আমাকে তিরস্কার করার পূর্বে মহামান্য শাহানশা সে সংখ্যক সৈন্য নিয়ে যান, যে সংখ্যক সৈন্য আমার সাথে ছিল। আমার সাথে ছিল মাত্র পনের হাজার সৈন্যের এক ক্ষুদ্র বাহিনী। এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে তো যে কোন অযোগ্য ও কাপুরুষ জেনারেল বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হবে।

    কোন এক গোপন রহস্যের কারণে রডারিক থিয়োড়মিরের প্রতি কিছুটা দুর্বল ছিল। অন্যথায় রডারিকের মতো জালিম ও নিষ্ঠুর বাদশাহ থিয়োডুমিরকে এই গোস্তাখির জন্য অত্যন্ত কঠোর শান্তি প্রদান করত। কিন্তু সে থিয়োড়মিরের কথার কোন উত্তর না দিয়ে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।

    রডারিকের দৃষ্টি মেরিনার উপর এসে স্থির হল। মেরিনা শাহীমহলের ভিতর রডারিকের মনোরঞ্জনের ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল। রডারিক মেরিনার প্রতি দৃষ্টিপাত করার সাথে সাথে মেরিনা সসম্মানে তাকে কুর্নিশ করে নিবেদন করল, ‘আমার প্রতি আঁহাপনার কি কোন নির্দেশ আছে?

    ‘তোমার জন্য কি নির্দেশ-তুমি কি তা জান না? তোমার পুস্পকাননে নতুন কোন ফুলের আগমন ঘটেছে কি?

    ‘জী, জাহাপনা, মেরিনা বলল। অর্ধপ্রস্ফুটিত অপরূপ রূপসী এক গোলাপের আগমন ঘটেছে। জাহাপনা আমিও কি আপনার সাথে আসব?

    ‘ঐ গোলাপকে সাথে নিয়ে তুমিও চলে এসো।’ রডারিক বলল। সে ছাড়া আরও কোন গোলাপ থাকলে তাদেরকেও নিয়ে এসো। মেয়েদের ঘোড়াগাড়ি পিছনে রয়েছে।’

    মেরিনা রডারিকের প্রতি গভীরভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর সম্মান প্রদর্শন করে সেখান থেকে চলে গেল।

    রডারিকের আগমনের পূর্বেই সেখানে তাঁবু স্থাপন করা হয়েছিল। তাঁবুর উপর মহামূল্যবান শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। তাঁবুর ভিতর মখমলের গালিচা বিছিয়ে তার উপর ময়ূর সিংহাসনের ন্যায় শাহীকুরসী রাখা হয়েছে। এই তাঁবুকেই রডারিকের দরবার কক্ষ হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে। রডারিক ঘোড়া থেকে নেমে জাঁকজমকপূর্ণ সেই দরবারকক্ষে উপস্থিত হল। দরবারকক্ষে প্রবেশ করার সময় রডারিক তার সাথে আগত এক ব্যক্তির কানে কানে কি যেন বলল।

    ‘সে এখানেই উপস্থিত আছে, জাহাপনা!’

    ঐ ব্যক্তি রডারিকের কথার উত্তর দিয়ে পিছনে আগত লোকদের মধ্য থেকে এক লোকের নিকট চলে এসে তাকে বলল, ‘বাদশাহ নামদার আপনাকে ডাকছেন।

    রডারিক এই ব্যক্তি সম্পর্কেই জানতে চাচ্ছিল। এই ব্যক্তি হল, একজন নামকরা জাদুকর। তার বিশেষ ধরনের পোশাক, আর বার্ধক্যপীড়িত গৌরবর্ণের চেহারার মাঝে এক ধরনের সম্মোহনী শক্তি ছিল। তার বয়স সত্তরের উপরে হবে বলেই মনে হচ্ছে। মুখভরা দীর্ঘ সফেদ দাড়ি, আর কাঁধ থেকে টাখনু পর্যন্ত ঝুলানো লম্বা জুব্বার মাঝে তাকে অদ্ভুত দেখাচ্ছে।

    তার মাথায় আছে গোল টুপি, আর গলায় সবুজ রঙের মোটা মোতির মালা। ডান হাতে ছোট ছোট মোতি দিয়ে বানানো তছবিহ, আর বাম হাতে গাড় বাদামী রঙের আঁকাবাঁকা লাঠি। কাঁধ পর্যন্ত লম্বা সেই লাঠির উপরের অংশে সাপের ফনাতুলা মাথার আকৃতি। তার কমর লাল রঙের কাপড়ের বেল্ট দিয়ে বাঁধা। কিন্তু রডারিক তাকে দেখে কোন রকম প্রভাবিত হল না এবং তাকে কুরসীতেও বসতে বলল না; বরং দাঁড় করিয়ে রেখেই জিজ্ঞেস করল,

    ‘বোসজান, তুমি কি দেখতে পেয়েছ, ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কী ধরনের বিপদ অপেক্ষা করছে?

    ‘বাদশাহ নামদার! জাদুকর বোসজান বলল। ভবিষ্যতের অবস্থা আমার কাছে অস্পষ্ট ও মেঘাচ্ছন্ন মনে হচ্ছে। যা দেখতে পাই তা কখনও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, আবার কখনও সামান্য স্পষ্ট হয়।

    ‘তুমি কী দেখতে পাও।’ রডারিক বলল।

    ‘দুর্গের মাঝে আপনি যে দৃশ্য দেখেছিলেন, আমি অনেকটা সে রকমই দেখতে পাই।’ জাদুকর বোসজান বলল।

    ‘দুর্গের যে ঘটনা আমি তোমার কাছে বর্ণনা করেছি, তা কি তোমার পূর্ণরূপে মনে আছে?’ রডারিক বলল।

    ‘মহামান্য শাহানশা, আপনি যা বলেছেন, তা আমার পূর্ণরূপে মনে আছে। জাদুকর বলল। আপনার এই গোলামের স্মৃতিশক্তি অতল সমুদ্রের ন্যায়।’

    ‘তোমাকে যা জিজ্ঞেস করছি শুধু তার উত্তর দাও। রডারিক শাহী গাম্ভির্যের সাথে বলল। ফালতু কথা শুনার সময় আমার নেই। দুর্গের যে ঘটনা আমি তোমাকে নিয়ে ছিলাম তা যদি তোমার স্মরণ থেকে থাকে তাহলে বল, তা বাস্তব রূপ নিবে না তো?

    ‘এক লাখ ফৌজের সামনে কোন বাস্তবতাই টিকতে পারে না। জাদুকর বলল। এই বিশাল বাহিনীর তুলনা শুধু সামুদ্রিক ঝড়ের সাথেই হতে পারে, বালির বাঁধ যাকে আটকে রাখতে পারে না।

    ‘আরেকটি কথা, অল্পবয়স্কা একটি মেয়েকে আমি প্রায়ই স্বপ্নে দেখি।’ রডারিক বলল।

    ‘শাহানশা! তাকে কি অবস্থায় দেখতে পান?’ জাদুকর বলল।

    ‘মস্তকহীন অবস্থায় সে আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। রডারিক বলল। ‘ক্ষাণিক পরেই দেখা যায়, তার শরীরে মাথা আছে। সে মিট মিট করে হাসছে, আর আমাকে দেখছে। আমি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। কিছুক্ষণপর মেয়েটির মুখের কথা শুনতে পায়, সে ঘৃণাভরে আমাকে বলে, “তোর রাজত্বের উপরও ঘোড়া দৌড়ানো হবে। তোর নাম-নিশানাও থাকবে না।” কথা বলার সময় মেয়েটির ঠোঁট নড়ে না, কিন্তু আওয়াজ শুনা যায়।

    ‘শাহানশা কি ঐ মেয়েটিকে চিনেন? এমন কোন মেয়ে কি আপনার সান্নিধ্যে এসেছে?’ জাদুকর জিজ্ঞেস করল।

    ‘হা, পাম্পালুনায় এমন একটি মেয়ে আমার সান্নিধ্যে এসেছিল। রডারিক বলল। সে বিদ্রোহী সরদারের মেয়ে। তার বয়স ছিল খুবই কম। আমি তাকে আমার কাছে রেখেছিলাম। তারপর এক গোস্তাখির কারণে তলোয়ারের এক আঘাতে ধড় থেকে তার মাথাটা আলদা করে ফেলি।

    রডারিক পালুনার বিদ্রোহী সরদারের মেয়ে উস্তোরিয়া সম্পর্কে পূর্ণ ঘটনা বলার পর বলল,

    ‘এটা কি কোন খারাপ লক্ষণ? তাছাড়া আমার মতো অকুতোভয় ব্যক্তিও ঐ এতটুকুন মেয়েকে স্বপ্নে দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি।

    ‘শাহানশা! লক্ষণ ভাল নয়।’ জাদুকর বলল। ছোট বাচ্চাদের বন্দুআ তাড়াতাড়ি কবুল হয়ে থাকে। যিনি সবাইকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি সবার সাথে ইনসাফ করেন।’

    ‘আমি জানি, তোমার হাতে এমন ক্ষমতা আছে, যার মাধ্যমে তুমি কুলক্ষণের প্রভাব নষ্ট করতে পার।’ রডারিক বলল। এটা সেই জাদুর প্রভাব, যার উদ্ভাবক হল ইহুদি সম্প্রদায়। আর তুমি সাধারণ কোন ইহুদি নও, বরং তুমি ইহুদিদের ধর্মগুরু এবং একজন বিখ্যাত জাদুকরও বটে। আমি তোমাকে শাহীমহলে যে মর্যাদা দান করেছি, তার উপযুক্ত কোন ইহুদিকে আমি মনে করি না। কেবল তুমিই হলে একমাত্র ইহুদি, যাকে আমি এত সম্মান দান করেছি।’

    ‘মহামান্যের এই অধম গোলাম কি এ সম্মান পাওয়ার উপযুক্ত নয়? এতটুকু ইজ্জত কি তার প্রাপ্য নয়?’ জাদুকর বলল।

    ‘নিশ্চয়!’ রডারিক বলল। আমি তোমাকে এর চেয়েও বড় পুরস্কার দেব। তুমি এখনই এমন কোন তদবির কর, যেন ঐ মেয়ে স্বপ্নে আমার কাছে না আসে, আর আমার অন্তর হতে যেন তার ভয় বিদূরিত হয়ে যায়। এমন যেন না হয় যে, আমি হানাদার বাহিনীর মোকাবেলায় গেলে আমার অন্তরে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে।

    এক পোর্তগিজ ঐতিহাসিক ডিলোমেগো লেখেন, রডারিক অত্যন্ত সাহসী বাদশাহ ছিল। যুদ্ধের ময়দানে সে ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী যোদ্ধা। কিন্তু ঐ কিশোরীকে হত্যা করার পর থেকে তার মাঝে ভয় বাসা বাঁধে।

    বোসজান জাদুবিদ্যায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিল। সে গণনা করে ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারত। আর এ কারণেই রডারিক তাকে শাহীমহলে জায়গা দিয়েছিল।

    রডারিক বোসজানকে বলল, ‘স্বপ্নে দেখা ঐ মেয়েটির ব্যাপারে আমাকে নির্ভয় করে দাও এবং তোমার জাদুর প্রভাবে ঐ অশুভ লক্ষণকে শুভ করে দাও।

    জাদুকর বোসজান রডারিকের মাথা থেকে মুকুট নামিয়ে নিজের কোলে রাখল। তারপর রডারিকের মাথা নিজের হাতের মাধ্যে নিয়ে তার চেহারাটা সামান্য উঁচু করে ধরলো। বোসজান রডারিকের চোখে চোখ রেখে তার দুই হাতের মধ্যমা আঙ্গুলে পরিহিত এক বিশেষ ধরনের আংটি দিয়ে রডারিকের কপালে ঘষতে লাগল। অল্প কিছুক্ষণ এমনটি করে সে তার হাত সরিয়ে নিল। রডারিক তার মাথা ডানে-বায়ে ঘুরিয়ে বলল,

    ‘আমার কেমন যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে।

    ‘আমি জানি, শাহানশা! বোসজান বলল। এখন ঐ মেয়ে আর শাহানশাকে স্বপ্নে বিরক্ত করবে না। ঐ মেয়ের কোন চিন্তাই শাহানশাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতে পারবে না।’

    ‘আর সেই অশুভ লক্ষণের কি হবে?’ রডারিক বলল। “তুমি না বললে, লক্ষণ শুভ নয়–এর কি বিহিত করবে?

    ‘শাহানশা কি আমাকে একটি আনকোরা কুমারী মেয়ে দিতে পারবেন? বোসজান বলল।

    ‘একটি কেন? একশটির কথা বল।’ রডারিক বলল। কোন বয়সের মেয়ে চাই তোমার?

    ‘একুশ বছরের চেয়ে কম হতে হবে। বোসজান বলল। আমার নিজের কোন প্রয়োজনে আমি এই মেয়েকে চাচ্ছি না। এই মেয়েকে জীবিত রাখা হবে না। আজকের রাতই হবে তার জিন্দেগির শেষ রাত। আমি তার বুক ফেড়ে হৃদপিণ্ড ও আরো কিছু জিনিস বের করব। তার পর সারা রাত তার উপর জাদু প্রয়োগ করব।’

    রডারিক তৎক্ষণাৎ মেরিনাকে ডেকে পাঠাল। মেরিনা আসতেই রডারিক তাকে জিজ্ঞেস করল,

    ‘তুমি না একটি মেয়ের কথা বলেছিলে? তুমি বলেছিলে, তার বয়স খুবই কম। সে অর্ধপ্রস্ফুটিত এক কলি। তার বয়স কত হবে?

    ‘ষোল-সতের বছর হবে, শাহানশা’ মেরিনা বলল।

    ‘ঐ মেয়েকে আজ রাতে এই জাদুকরের নিকট পৌঁছে দেবে।’ রডারিক বলল।

    ‘আমার প্রতি শাহানশার নির্দেশ ছিল, আমি যেন শাহানশার সফরসঙ্গী হই।’ মেরিনা বলল।

    ‘আমার সাথে আসার কোন প্রয়োজন নেই। রডারিক বলল। বোসজান যেখানে বলবে, আজ রাতেই তুমি সেই মেয়েকে সাথে নিয়ে সেখানে পৌঁছে যাবে।

    রডারিক বোসজানের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই হল মেরিনা। একে তুমি সাথে করে নিয়ে যাও এবং ভালোভাবে বুঝিয়ে বল, তাকে কী করতে হবে।

    রডারিকের কথা শেষ হতেই জাদুকর চলতে শুরু করল। মেরিনাও তার অনুসরণ করল।

    ***

    রাতের প্রথম অংশ অতিবাহিত হয়েছে অনেকক্ষণ হয়। মেরিনা অত্যন্ত রূপসী একটি মেয়েকে সাথে নিয়ে বৃদ্ধ ইহুদি জাদুকর বোসজানের কামরায় প্রবেশ করল। রডারিকের নির্দেশে মেরিনা যখন বৃদ্ধ জাদুকরের সাথে মহলে ফিরে এলো তখন সে জাদুকরকে বলল, শাহানশা আপনাকে অনেক বড় ও সুন্দর একটি উপহার দিয়েছেন। এই মেয়েকে আমি শাহানশার জন্য উপঢৌকনরূপে এনেছিলাম। কথাছিল সে শাহানশার সাথে যাবে।

    ‘তুমি কি কখনও আমার কামরায় কোন মেয়েকে আসতে দেখেছ?’ বৃদ্ধ জাদুকর বলল। এই বয়সে যুবতী মেয়েদেরকে দিয়ে আমি কি করব? এই মেয়েকে অন্য একটি উদ্দেশ্যে এখানে আনা হয়েছে। রাতে এ ব্যাপারে তোমাকে সবকিছু বলব। তুমি এ কাউকে কিছু বলতে পারবে না। যদি কাউকে কিছু বল তাহলে মৃত্যুই হবে তোমার শেষ পরিণতি। আশা করি, বেঘোরে মারা পড়াটা তুমি কিছুতেই পছন্দ করবে না।’

    কিছুক্ষণ পর মেরিনা ঐ মেয়েকে সাথে নিয়ে বৃদ্ধ জাদুকরের ঘরে প্রবেশ করল। মেয়েটি বৃদ্ধের ঘরে প্রবেশ করতেই ভয়ে সড়জড় হয়ে গেল। সে মেরিনার আঁচল আকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। বৃদ্ধের ঘরে একটি টেবিলের উপর তিনজন মৃত মানুষের মাথার খুলি রাখা আছে। ঘরের এক দিকের দেওয়ালে মানুষের একটি কঙ্কাল ঝুলছে।

    বৃদ্ধ জাদুকর একটি লাকড়ীর বাক্সের ঢাকনা খুললে সেখান থেকে দুটি কালো সাপ মাথা উঁচিয়ে ফনা তুলে ফুসফুস করতে লাগল। এ দৃশ্য দেখে মেয়েটি চিৎকার করে উঠল। বোসজান সাপের বাক্সে কি যেন নিক্ষেপ করে সাথে সাথে ঢাকনা বন্ধ করে দিল।

    কামরা এমন দুর্গন্ধময় যে, মনে হচ্ছে এখানে কোন পচা-গলা লাশ আছে। কিন্তু এখানে কোন লাশ নেই; বরং পঁচা গলা লতাগুল্ম, আর রাসায়নিক পদার্থের সংমিশ্রণে এমন একটা দুর্গন্ধ পুরো কামরার মাঝে ছড়িয়ে আছে যে, নাড়িভূঁড়ি বের হয়ে আসার উপক্রম হচ্ছে।

    বোসজান সেই কামরায় বিভিন্ন পদার্থ জ্বালিয়ে রেখেছিল। কামরার মাঝে এমন একটা পরিবেশ বিরাজ করছে ছিল যে, ভয়ে গায়ের লোম কাঁটা দিয়ে উঠে। ছোট-বড় অসংখ্য পুঁটলি, আর বিভিন্ন আকৃতির বাক্স বিছানার উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।

    এই সেই বোসজান, যাকে গৌরবর্ণের চেহারা, দীর্ঘ সফেদ দাড়ি, আর পরিচ্ছন্ন লম্বা জুব্বার কারণে অত্যন্ত সম্মানী, বিজ্ঞ, আর আত্মমর্যাদাশীল মনে হত। এই পুঁথিগন্ধময় কামরায় সেই তাকেই অত্যন্ত রহস্যময় ও ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে।

    বোসজান পার্শ্ববর্তী আরেকটি কামরার দরজা খুলে মেরিনাকে বলল, এই মেয়েকে এখানে বসিয়ে রেখে তুমি আমার কাছে চলে এসো।’

    মেরিনা মেয়েটিকে নিয়ে সেই কামরায় প্রবেশ করল। এই কামরাটি অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। কামরার এক দিকে খুব সুন্দর একটি পালঙ্ক রাখা। পালকের উপর পরিচ্ছন্ন বালিশ, আর সুন্দর পালঙ্কপোশ বিছানো আছে। মেঝেতে মহামূল্যবান গালিচা বিছানো। ছাদের সাথে ঝুলন্ত ফানুসের আলোয় গোটা কামরা ঝলমল করছে। পূর্বের কামরায় পাওয়া গন্ধের মতো তীব্র একটা গন্ধ এই কামরায়ও অনুভব হচ্ছে।

    ‘কোথায় নিয়ে এসেছ আমাকে?’ মেয়েটি মেরিনাকে জিজ্ঞেস করল। ‘বাদশাহ রডারিক কি এই ব্যক্তি? এতো সেনাবাহিনীর সেই জেনারেলও নয়, যার জন্য তুমি আমাকে নিয়ে এসেছিলে। সেই জেনারেল তো তার বাহিনীর সাথে সামনে অগ্রসর হয়ে গেছে।’

    ‘বাদশাহর নির্দেশে সমস্ত পরিকল্পনা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।’ মেরিনা বলল। ‘তোমাকে যে কাজের জন্য আমি এনেছিলাম, তা ব্যর্থ হয়ে গেছে। কথা ছিল আমিও বাদশাহর সাথে যাব, কিন্তু আমাকে এখানে থাকতে বলা হয়েছে।’

    ‘কিন্তু কেন? মেয়েটি বলল। আমি দুর্গন্ধযুক্ত এই কামরায় ঐ বৃদ্ধের সাথে কিছুতেই থাকতে পারব না। তুমি আমার বাবাকে যে টাকা দিয়েছ তা ফিরিয়ে নিয়ো, আমি চললাম।’

    ‘জলদি এসো, মেরিনা! পাশের কামরা থেকে বোসজান বলল। মেয়েটিকে ওখানেই থাকতে দাও।

    ‘ভয় পেয়ো না।’ মেরিনা মেয়েটির কানে কানে বলল। আমি তোমাকে এখান থেকে বের করার চেষ্টা করব।’

    এ কথা বলে মেরিনা পাশের কামরায় চলে গেল।

    ***

    ‘আমি জানি, তুমি একজন ইহুদি। জাদুকর বোসজন বলল। হয়তো তুমিও জান, আমি একজন ইহুদি। আমাকে তোমার সহযোগিতা করতে হবে। বাদশাহ রডারিকের বিজয়ের জন্য অত্যন্ত ভয়ঙ্কর একটা কাজ করতে হবে। আমার এসব কাজ দেখে তোমার ভয় পেলে চলবে না।’

    ‘কোন ইহুদির উচিৎ নয় রডারিকের বিজয়ের জন্য কিছু করা। মেরিনা বলল। ‘এই বিপুল সংখ্যক সৈন্যের মাধ্যমে তিনি অবশ্যই বিজয় লাভ করবেন।’

    ‘আমার কাজে নাক গলাতে এসো না। বেসিজান মেরিনাকে ধমকের সুরে বলল। বাদশাহ রডারিকের জন্য দুটি লক্ষণ খুবই অশুভ। সেই অশুভ লক্ষণের প্রভাব অবশ্যই বিদূরিত করতে হবে।’

    ‘শুনেছি, হানাদার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা মাত্র বার হাজার। মেরিনা হাসতে হাসতে বলল। বাদশাহ নামদারের এক লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনীতে শুধু অশ্বারোহীর সংখ্যাই তো বার-তের হাজার। বিজয় আমাদের বাদশাহরই হবে। সুতরাং আপনার এই কষ্ট স্বীকার করার কোন প্রয়োজন নেই। কোন রকম কষ্ট স্বীকার করা ছাড়াই আপনি পুরস্কার পেয়ে যাবেন।

    ‘আমি যা জানি তুমি তা জান না। বোসজান বলল। ‘আমার কথা শোন, ঐ মেয়েকে আমি বিশেষ পদ্ধতিতে হত্যা করব। সে যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে তখন তার বুক চিড়ে হৃদপিণ্ড বের করব। তারপর পেট ফেড়ে আরও দুটি অঙ্গ বের করব। এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে আমি জাদু প্রয়োগ করব। আমাকে তোমার সাহায্য করতে হবে। আমার কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে তোমাকে এই লাশ গোম করে ফেলতে হবে। এই মহল থেকে লাশ গেম করা কোন কঠিন কাজ নয়। এখান থেকে প্রায়ই লাশ গোম করা হয়ে থাকে। কীভাবে লাশ গেম করতে হবে, আমি তোমাকে তা দেখিয়ে দিচ্ছি।

    ভয়ে-আতঙ্কে মেরিনার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হল, অনেক কষ্টে সে নিজেকে সংবরণ করে রাখল।

    ‘যাও, মেয়েটিকে নিয়ে এসো।’ বোসজান বলল। ছলে-বলে-কৌশলে তাকে এখানে নিয়ে আসবে, সে যেন কিছুই বুঝতে না পারে।’

    মেরিনা দ্বিতীয় কামরায় প্রবেশ করে দ্রুত এদিক-সেদিক তাকাতে লাগল। একটি শক্ত মজবুত লাঠি তার দৃষ্টিগোচর হল। সে লাঠিটি উঠিয়ে তার আস্তিনের ভিতর লুকিয়ে রাখল।

    ‘এখন কি হবে?’ মেরিনাকে দেখতে পেয়ে মেয়েটি জিজ্ঞেস করল। আমাকে এই নোংরা বুড়োর কাছে রেখে চলে যাচ্ছ বুঝি?

    ‘ভয় পেয়ো না। মেরিনা বলল। অত্যন্ত কঠিন একটা কাজ আমাদের করতে হবে। আমাকে সাহায্য কর। চল, এখন বুড়োর কামরায় যাই।

    মেরিনা মেয়েটিকে নিয়ে বোসজানের কামরায় প্রবেশ করল।

    ‘এসো মা এসো।’ বোসজান মেয়েটির মাথায় হাত রেখে আদর করে বলল। ‘এই টেবিলের উপর বস। ভয় পাচ্ছ কেন? আমি তো তোমার বাবার মতো।

    মেয়েটি ভয়ে মেরিনার দিকে ফিরে তাকাল। মেরিনা চোখের ইশারায় তাকে টেবিলের উপর বসতে বলল। জাদুকর বোসজান একেবারে মেয়েটির শরীরের সাথে ঘেসে দাঁড়াল। সে কোন কিছু শুকিয়ে বা সম্মোহনী শক্তির মাধ্যমে মেয়েটিকে হত্যা করতে উদ্যত হল। মেরিনা বোসজানের ঠিক পিছনে দাঁড়ানো ছিল। সে দ্রুত হাতে লাঠি বের করে সজোরে বৃদ্ধ বোসজানের মাথায় আঘাত করল। সে অনবরত আঘাত করেই চলল। বোসজান কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই বেহুশ হয়ে মাটিতে লুঠিয়ে পড়ল।

    মেরিনা বোসজানকে চিক্করে শুইয়ে দিয়ে সজোরে তার বুকের উপর চেপে বসল। তারপর দু’হাত দিয়ে তার গলা চেপে ধরল। বোসজান কিছুক্ষণ ছটফট করে অসার হয়ে গেল।

    মেরিনা দ্বিতীয় কামরায় একটা বড়সড় কাঠের বাক্স দেখেছিল। মেরিনা আর ঐ মেয়েটি ধরাধরি করে বোসজানের লাশ ঐ কামরায় নিয়ে গেল। মেরিনা সেই বাক্স খোলে বোসজানের লাশ বাক্সে রেখে ঢাকনা বন্ধ করে দিল।

    ‘এখন দেখব, ওর বাদশাহ বিজয় লাভ করে কীভাবে ফিরে আসে?’ মেরিনা চিবিয়ে চিবিয়ে বলল। চল, মেয়ে! জলদি এখান থেকে বের হয়ে পড়।

    ‘আমার ভয় করছে। মেয়েটি বলল। এসব কি হচ্ছিল?

    ‘এই বুড়ো না মরলে এতক্ষণে এখানে তোমার লাশ পড়ে থাকত। মেরিনা বলল। ভয় পেয়ো না, সকালে তোমাকে আমি এখান থেকে বের করে নিয়ে যাব। ভুলেও কারো সাথে এ ব্যাপারে কোন আলোচনা করো না।’

    ভোর হওয়ার সাথে সাথে উভয়ে জাদুকর বোসজানের বাড়ি থেকে বের হয়ে এলো। মেরিনা অতি সংগোপনে মেয়েটিকে তার বাড়ি পৌঁছে দিল। তারপর উদ্দেশ্যহীনভাবে চলতে লাগল। কিছুক্ষণ চলার পর তার মনে হল, সে নিজের জন্য অনেক বড় বিপদ ডেকে এনেছে। তার সমস্ত শরীর ভয়ে কাঁপতে লাগল। মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। সে চিন্তা করতে লাগল, রডারিক যদি বিজয়ী হয়ে ফিরে আসে তাহলে নিশ্চয় সে ভাববে, বোসজান অশুভ লক্ষণ দূর করার পর হয়তো কারো হাতে নিহত হয়েছে। আর যদি পরাজিত হয়ে ফিরে আসে তাহলে নিশ্চয় আগুন লাগিয়ে দেবে। সে আলবত ধরে নিবে, জাদুকর বোসজানের মৃত্যুর পিছনে আমার হাত রয়েছে।

    এসব কথা ভাবতে ভাবতে মেরিনা সিদ্ধান্ত নিল যে, যত দ্রুত সম্ভব তাকে এই এলাকা ছেড়ে পালাতে হবে। এই এলাকার এক আমীর ব্যক্তির সাথে মেরিনার সম্পর্ক ছিল। সে ব্যক্তি ছিল গোথ বংশীয়। মেরিনা তার নিকট গিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করার পর বলল,

    ‘আমি জাদুকর বোসজানকে হত্যা করে এসেছি।’

    ‘তুমি অতি উত্তম কাজ করেছ।’ গোথ বংশীয় সেই ব্যক্তি বলল। তুমি একটি নিষ্পাপ মেয়ের জীবন বাঁচিয়েছ। এখন কী হয়–আমরা তা দেখব।’

    ‘এমন আশা করা কি ঠিক হবে যে, রডারিক জীবন নিয়ে আর ফিরে আসবে না।’ মেরিনা বলল। মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা তো খুবই কম।

    ‘ধরে নাও, রডারিক জীবিতই ফিরে আসবে।’ লোকটি বলল। “চিন্তিত হওয়ার কোন কারণ নেই। সে এক দিক দিয়ে ফিরে আসবে, আর তুমি অন্য দিক দিয়ে এখান থেকে বের হয়ে যাবে। তোমাকে নিরাপদে সিউটা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। দুআ কর, আউপাস যেন বেঁচে থাকে। সে যদি বেঁচে থাকে তাহলে অবশ্যই আমরা তোমাকে তার নিকট পৌঁছে দেব।’

    ***

    আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিকের মানসিক অবস্থা ছিল বিপর্যস্ত। বাহ্যিকভাবে সে নিজেকে যতই সাহসী আর দৃঢ় মনোবলের অধিকারী বলে প্রকাশ করুক না কেন, ভিতরে ভিতরে সে একেবারে মুষড়ে পড়েছিল। তাই এক লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনীর উপরও তার কোন ভরসা হচ্ছিল না। সে জাদু মন্ত্রের আশ্রয় নেওয়াকেই অধিক নিরাপদ মনে করছিল। অপর দিকে মুসলিম বাহিনীর একমাত্র ভরসা, আর আশ্রয়স্থল ছিলেন আল্লাহ তাআলা।

    তারিক বিন যিয়াদ মুসলিম বাহিনীকে পূর্বেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য আটগুনের চেয়েও বেশি সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী এগিয়ে আসছে। প্রত্যেক মুজাহিদকে অন্তত আটজনের সাথে লড়াই করতে হবে। প্রতি দিন ফজরের পর তারিক তার বাহিনীকে সেই স্বপ্নের কথা শুনাতেন, যে স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিজয়ের সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন। এছাড়াও তিনি পবিত্র কুরআনের সেসব আয়াত পাঠ করে শুনাতেন, যেসব আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনগণকে বিজয় ও সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

    তারিক বিন যিয়াদ কখনও তাঁর বাহিনীকে এই আয়াত পাঠ করে শুনাতেন : ‘আল্লাহর নির্দেশে অনেক ছোট দল বড় দলকে পরাজিত করে থাকে’।  (সূরা বাকারা : ২৪৯)

    এই আয়াত তেলাওয়াত করে তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীর সৈন্যদেরকে এ কথা বুঝতেন যে, একটি ছোট বাহিনীর সদস্য ও তাদের আমীরের মাঝে কী ধরনের গুণাবলী, এবং কী পরিমাণ ঈমানী শক্তি থাকলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বড় দলের বিপক্ষে বিজয় দান করবেন।

    তারিক বিন যিয়াদ এই আয়াতটিও বারবার তেলাওয়াত করে তার বাহিনীকে শুনাতেন : ‘স্মরণ কর সে সময়ের কথা, যখন আমি সমুদ্রকে দ্বিখণ্ডিত করলাম এবং তোমাদেরকে বাঁচিয়ে দিলাম, আর ফেরাউনের সম্প্রদায়কে ডুবিয়ে মারলাম।’ (সূরা বাকারা : ৫০)

    তিনি তাঁর বাহিনীকে লক্ষ্য করে বলতেন, এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলকে সম্বোধন করেছেন। হযরত মুসা আ. ফেরাউনের জাদুকরদের চ্যালেঞ্জের মুকাবেলায় এমন মুজেযা প্রদর্শন করেছিলেন যে, জাদুকরদের সকল ভেলকিবাজি মুহূর্তের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে যায় এবং ফেরাউন হতভম্ব হয়ে পড়ে। এর পর বনী ইসরাঈল যখন মিসর হতে পালিয়ে যাচ্ছিল তখন তাদের সামনে নীলনদ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সামনে বিশাল-বিস্তৃত গভীর নদী, আর পিছনে ফেরাউন ও তার সৈন্যবাহিনী। এমন পরিস্থিতিতে মুসা আলাইহিসসালাম তর লাঠি দ্বারা নদীতে আঘাত হানলেন। সাথে সাথে নদীর পানি সরে গিয়ে রাস্তা বের হয়ে এলো। মুসা আ, তার বাহিনী নিয়ে সে রাস্তা দিয়ে নিশ্চিন্তে নদী পাড় হয়ে চলে গেলেন। কিন্তু সেই একই রাস্তায় ফেরাউন যখন তার বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হল, তখন নদীর উভয় তীরের পানি প্রচণ্ড বেগে এক সাথে মিলিত হয়ে গেল। ফলে ফেরাউন ও তার বাহিনীর সলীল-সমাধি ঘটল।

    মুহাজিদ ভায়েরা! আল্লাহ্ তাআলা হযরত মূসা আ. কে চল্লিশ দিনের জন্য আহ্বান করেছিলেন তখন বনী ইসরাঈল তাঁর অনুপস্থিতিতে একটি গো-বাছুরকে তাদের উপাস্যরূপে গ্রহণ করে নিয়েছিল। পরিণতিতে তাদের উপর নেমে এসেছিল ভয়াবহ বিপর্যয়।

    সুতরাং হে মুজাহিদ ভায়েরা! আজ আমরা যারা ইসলামের জন্য নিজের মাথাকে নাযরানাস্বরূপ পেশ করতে চাই, আমাদের উচিত–পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন, আমরা সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলারই ইবাদত করব।’

    এমনি আরও কয়েকটি আয়াত তেলাওয়াত করে তিনি মুজাহিদদেরকে ঈমানের বলে বলিয়ান করে তুলছিলেন এবং তাদের মাঝে জিহাদের স্পৃহা, আর উদ্দীপনা বৃদ্ধি করছিলেন।

    তারিক বিন যিয়াদ দিনের বেলা মুজাহিদদেরকে এমন স্থানে নিয়ে যেতেন যে স্থানটি তিনি যুদ্ধের জন্য নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। তিনি এমন এক রণাঙ্গনের ছক এঁকে নিয়েছিলেন, যেখানে শক্র-বাহিনীকে পূর্ণরূপে লণ্ডভণ্ড ও বিপর্যস্ত করে দেওয়ার মতো রণকৌশল প্রয়োগ করা সম্ভব ছিল। তিনি পাহাড় ও ছোট ছোট টিলার মধ্যবর্তী এমন কিছু জায়গা নির্বাচন করে রাখলেন, যেখানে শত্রুবাহিনীর অগ্রবর্তী দলকে বোকা বানিয়ে শেষ করে দেওয়া একেবারেই সহজ। মোটকথা, তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীকে একটি বিশেষ ধরনের রণকৌশল শিখাতে লাগলেন।

    তারিক বিন যিয়াদের জন্য কোন অশুভ লক্ষণ ছিল না। কোন শুভ লক্ষণও ছিল না; বরং শুভ-অশুভ কোন ধরনের লক্ষণের সাথেই তার কোন পরিচয় ছিল না।

    ***

    মেরিনা যে প্রাসাদে আশ্রয় নিয়েছিল, সেখানে ইতিপূর্বেও সে কয়েকবার এসেছিল। প্রতিবারই সে এমন বেশভূষা ধারণ করে এখানে আসত যে, কেউ যেন তাকে চিনতে না পারে। টলেডো শহরে এ ধরনের বেশকয়েকটি প্রাসাদ ছিল। এ সমস্ত প্রাসাদে রাজ্যের শীর্ষস্থানীয় ও সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর লোকেরাই বসবাস করত। তাই এসব প্রাসাদের অভ্যন্তরে কী হতো–সে ব্যাপারে কারো কোন মাথা ব্যথা ছিল না।

    মেরিনা যে প্রাসাদে আশ্রয় নিয়েছিল, সে প্রাসাদে এমন এক গোপন আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করেছিল, যা পরবর্তীতে ইউরোপের ইতিহাসই পাল্টে দিয়েছিল। আইপাস যেদিন ঝিলের পাড়ে মেরিনার সাথে সাক্ষাৎ করেছিল সেদিন থেকেই এ আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। আউলাস সেদিন মেরিনাকে বলেছিল,

    ‘রডারিকের বাদশাহী ধ্বংস করার এখনই সময়। ইহুদি ও গোথ সম্প্রদায়ের উচিত এ সুযোগকে কাজে লাগান। আর তার একমাত্র উপায় হল, ইহুদি ও গোথ সম্প্রদায়ের যেসকল সৈন্য রডারিকের বাহিনীতে রয়েছে, চূড়ান্ত লড়ায়ের সময় তারা মুসলমানদের সাথে মিলে রডারিকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।

    মেরিনা ছিল ইহুদি। এ কারণেই তার মস্তিষ্ক ছিল ষড়যন্ত্রের উর্বর ক্ষেত্র। অধিকন্তু তার অন্তরে রডারিকের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল। সে আউপাসকে ভালোবাসত। আউপাসকে নিয়ে ঘর বাঁধার সুন্দর একটা স্বপ্ন ছিল তার। রডারিক তার সেই ভালোবাসাকে অপবিত্র করেছে, তার সেই স্বপ্নকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। সেদিন বিশ বছর পর আউপাস যখন তার সাথে সাক্ষাৎ করে তখন তার সেই পুরনো ক্ষত বের হয়ে আসে। সময়ের আবরণে চাঁপা পড়া প্রতিশোধের সেই আগুন লেলিহান অগ্নিশীখার রূপ ধারণ করে। সেদিন বিকেলে উপাসের কথা শুনে সে শপথ করে বলেছিল, রডারিকের বুকে খঞ্জর বিদ্ধ করার আগে আমার অশান্ত আত্মা কখনও শান্তি পাবে না।’

    রডারিক সবেমাত্র পাম্পালুনা থেকে রওনা হয়েছে। রাস্তায় তার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চলছে। মেরিনা সেদিন রাত থেকেই রডারিক থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের পরিকল্পনা শুরু করেছিল। তার কাছে অসংখ্য সুন্দরী মেয়ে ছিল। রূপ-লাবণ্যে কেউ কারো চেয়ে কম ছিল না। বাদশাহর খাছ মহল পর্যন্ত মেরিনার অবাধ যাতায়াত ছিল। শাহীমহলের রহস্যময় জগতে তার বিরাট প্রভাব ছিল।

    শাহীমহলে দুই-চারজন গোথ সম্প্রদায়ের লোক বিশেষ সম্মান-মর্যাদা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী ছিল। দুই-একজন ইহুদিও এমন মর্যাদার অধিকারী হল। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আন্দালুসিয়ায় সবচেয়ে মজলুম সম্প্রদায় ছিল ইহুদি। তাদের অধিকাংশই ছিল গরীব। যে দুই-একজন ইহুদি শাহীমহলে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিল, তারা অত্যন্ত ধূর্ত আর চালাক ছিল। এসমস্ত লোকদের সাথে মেরিনার বিশেষ সম্পর্ক ছিল।

    মেরিনা নিজেও ছিল ইহুদি। এজন্য তার অন্তরে ইহুদিদের জন্য সহমর্মিতা ছিল। কিন্তু সে ভাবল, এখনই তাদের সাথে রডারিকের বিপক্ষে কথা বলা ঠিক হবে না। তাই মেরিনা সবকিছু বিবেচনা করে গৌথ সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী এক ব্যক্তির প্রাসাদে গিয়ে আশ্রয় নিল। শাহীমহলে ও সেনাবাহিনীতে এই ব্যক্তির বিশেষ প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। এই ব্যক্তি অর্টিজাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করত। সে এজন্য অত্যন্ত মর্মাহত ছিল যে, রডারিক অর্টিজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাকে হত্যা করেছে এবং নিজে বাদশাহ হয়ে গেছে। যার ফলে সোথ সম্প্রদায়ের বাদশাহী খতম হয়ে গেছে।

    মেরিনা যে প্রাসাদে আশ্রয় নিয়েছিল সেখানে জিউস নামে এক ব্যক্তি ছিল। সে ছিল আউপাসের বাল্যবন্ধু। মেরিনা তার সাথে সাক্ষাৎ করে আউপাসের সাথে তার যে কথা হয়েছিল তা সবিস্তারে বর্ণনা করল। জিউস কোন প্রকার চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই মেরিনার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। সে মেরিনাকে তার বাবা ও ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ করাল এবং আউপাসের পরিকল্পনা সম্পর্কে তাদেরকে বলল।

    জিউসের বাবা বলল, ‘উত্তম প্রস্তাব, কিন্তু এই প্রস্তাব যতটা উত্তম তার চেয়ে বেশি বিপদজনক। কারণ, কেউ বিশ্বাস করবে না যে, এত স্বল্প সংখ্যক হামলাকারী আন্দালুসিয়ার একলাখ ফৌজকে পরাজিত করতে পারবে। এটা অসম্ভব। ইহুদি ও গোথিরা যদি গাদ্দারী করেও তাহলে তাদের সংখ্যা কতইবা হবে। বেশির চেয়ে বেশি পনের-বিশ হাজারই হবে। এরা হামলাকারীদের সাথে মিলে কিইবা করতে পারবে? বিজয় রডারিকেরই হবে। তারপর জানই তো পরিণাম কি হবে? রডারিক একজন গাদ্দারকেও জীবিত রাখবে না। আর গোথ ও ইহুদিদের উপর যে নিপীড়ন চালান হবে, তা হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।

    ‘আউপাসের ধারণা কিছুটা ভিন্ন। মেরিনা বলল। সে বলেছিল মুসলিম বাহিনী খুবই সাহসী ও বীরপুরুষ। তারা এতটাই যুদ্ধপটু যে, তাদের চেয়ে দ্বিগুণ সৈন্য ছিল থিয়োডুমিরের। কিন্তু খুবই কম সময়ের মধ্যে তারা থিয়োডুমিরের সেই বাহিনীকে পরাজিত করে। থিয়োডুমিরের প্রায় অর্ধেক সৈন্য রণাঙ্গনেই মারা পড়ে, আর অল্প কয়েকজন প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। অন্যরা মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। এখন আপনারা নিজেদের মাঝে সলা-পরামর্শ করে ঠিক করুন, আপনারা কোন পক্ষ অবলম্বন করবেন এবং আপনাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? আউপাস আবারও আসবে। আমি তাকে আপনাদের নিকট পৌঁছে দেব।’

    ‘তুমি ইহুদি নেতাদের সাথেও আলোচনা করে নাও।’ জিউসের বাবা বললেন।

    ***

    মেরিনা দিন-রাত ইহুদি ধর্মগুরু ও নেতাদের সাথে আলোচনা ও মতবিনিময় করে কাটাতে লাগল। তার অব্যাহত প্রচেষ্টার ফলে এক রাতে তিন-চারজন ইহুদি নেতা আলোচনার জন্য জিউসের প্রাসাদে এলো। সেখানে তিন-চারজন গোথ বংশীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও ছিলেন। তারা সকলেই এ ব্যাপারে মতবিনিময় করছিলেন। মেরিনা চুপ করে তাদের কথাবার্তা শুনছিল।

    এক বৃদ্ধ ইহুদি বললেন, আমরা শুধু একটা বিষয়েই চিন্তা-ভাবনা করছি। আর তা হল, আজ আমরা রডারিকের নির্যাতন-নিপীড়নের কারণে পশুর ন্যায় জীবন যাপন করছি। এখন আমরা রডারিকের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় হামলাকারীদেরকে সাহায্য করতে চাচ্ছি। কিন্তু তারা যখন বিজয়ী হবে তখন তারা রডারিকের মতোই আমাদের উপর জুলুম-নির্যাতন করবে। আমরা ইহুদিরা রডারিকের পরিবর্তে মুসলমানদের জুলুম-নির্যাতনের শিকারে পরিণত হব। আমাদের চিন্তা-ভাবনা করা উচিত যে, আমরা মুসলমানদেরকে এমনভাবে সাহায্য করব, যেন তারা রডারিককে পরাজিত করতে পারে। তার পর আমরা মুসলমানদের উপর এমন অতর্কিত আক্রমণ করব, যেন তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তারপর ইহুদি ও খোথরা যৌথভাবে আন্দালুসিয়া শাসন করবে।

    মেরিনা দেখতে পেল, আউপাসের সকল পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে। তার মনে পড়ল, সে ঝিলের পাড়ে আউপাসকে নিজের ব্যাপারে বলেছিল,

    ‘আমি কারো স্ত্রী হতে পারিনি, হতে পারিনি কারো মা। আমি সাক্ষাৎ শয়তান হয়ে গেছি। আমার মাঝে শয়তানী স্বভাব-চরিত্র দানা বেঁধে উঠেছে।

    এখন সে ভাবল, সেদিন সে ঠিকই বলেছিল। বৃদ্ধ ইহুদির কথা শুনার সাথে সাথে সে বুদ্ধি খাটিয়ে বলল,

    ‘মুসলিম বাহিনী এখানে বাদশাহী করবার জন্য আসেনি। আউপাস আমাকে বলেছে, তারা লুটতরাজ করার জন্য এসেছে। তাদের ঝুলি ভরে গেলে তারা ফিরে যাবে। এটা কীভাবে সম্ভব যে, আট-দশ হাজার সৈন্যের এক মামুলি বাহিনী এত বিশাল একটি রাজ্য জয় করার জন্য আসবে? আউপাস আমাকে বলেছে, সে এবং জুলিয়ান রডারিকের সিংহাসন ভূলণ্ঠিত করার জন্য তাদেরকে প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে এসেছে। তারা মুসলমানদেরকে বলেছে, আন্দালুসিয়ার শাহী জানায় এত বিপুল পরিমাণ ধন-দৌলত, সোনা-দানা রয়েছে, যা বহন করার জন্য হাজারো উটের প্রয়োজন। আপনারা তাদের ব্যাপারে ভয় পাবেন না, তারা কোন মুলুকের সেনাবাহিনী নয়; বরং তারা দস্যুদল।’

    ‘তাহলে আমি বলব, তুমি মুসলমানদের ব্যাপারে অবহিত নও।’ বৃদ্ধ ইহুদি বলল। তারা যেখানেই যায়, সেখানেই স্বল্প সংখ্যক গিয়ে বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করে নিজেদের অধীনত করে ফেলে। তারা সংখ্যায় স্বল্প হওয়া সত্ত্বেও পারস্য ও রোমের মতো বিশাল সাম্রাজ্যকে খতম করে দিয়েছে। লক্ষ্য করে দেখ, ইসলামী সালতানাত কতটা বিস্তৃতি লাভ করেছে। এই মুসলিম বাহিনী লুণ্ঠনকারী নয়; তারা অমুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করাকে ধর্মীয় কর্তব্য মনে করে।

    বৃদ্ধ ইহুদি মুসলমানদের বীরত্ব ও সাহসিকতার ইতিহাস বর্ণনা করে শুনাচ্ছিল, মেরিনা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

    ‘শ্রদ্ধেয় মেহমান! আমি নিশ্চিত, আপনি আরবের মুসলমানদের কথা বলছেন। আন্দালুসিয়ায় যারা এসেছে তারা বার্বার। যুদ্ধ-বিগ্রহ, আর লুটতরাজ করাই তাদের পেশা। তাদের সিপাহসালারও বার্বার। এরা যুদ্ধবাজ সম্প্রদায়। ছোট-বড় পোত্র, আর বিভিন্ন উপগোত্রে তারা বিভক্ত। তারা নিজেদের মুলুকে কোন ধরনের বাদশাহী কায়েম করে রেখেছে যে, আমাদের মুলুকে বাদশাহী কায়েম করবে?

    মেরিনা বাকচাতুর্যের মাধ্যমে নিজের বক্তব্য প্রমাণিত করে বৃদ্ধ ইহুদিদেরকে ষমতাবলম্বী বানিয়ে ফেলল।

    ***

    দুই-তিন দিন পরের কথা। টলেডো এসে পৌঁছতে রডারিকের আরও তিন-চার দিন সময় লেগে যাবে। এই সুযোগে আটপাস এক সন্ন্যাসীর রূপ ধারণ করে টলেডো এসে মেরিনার সাথে সাক্ষাতের মওকা তৈরী করে নিল। মেরিনা তাকে গোথ বংশীয় সেই ব্যক্তির প্রাসাদে নিয়ে গেল। এখানকার নেতৃস্থানীয় গোথ ও ইহুদিদের সাথে কি ধরনের কথা-বার্তা হয়েছিল সে ব্যাপারেও মেরিনা আউপাসকে সবকিছু বলল। এ সময় একজন ইহুদি পণ্ডিত কি ধরনের যুক্তি পেশ করেছিল এবং মেরিনা তার যুক্তি খণ্ডন করে কীভাবে তাকে সমতাবলী বানিয়ে ফেলেছিল, সে কথাও সে আউপাসের কাছে বর্ণনা করল।

    আটপাস যেদিন সেই প্রাসাদে এসে পৌঁছল সেদিন রাতেই গোথ ও ইহুদি নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ সেখানে একত্রিত হল। মেরিনাও সেখানে ছিল। আউপাস যেহেতু গোথ বংশীয় ছিল, আর রডারিক গোথদের থেকে বাদশাহী ছিনিয়ে নিয়েছিল, তাই আইপাস সহজেই গোথ নেতাদেরকে নিজ মতের অনুসারী করে ফেলল। কিন্তু ইহুদি নেতৃবর্গ কেবল নিজ সম্প্রদায়ের ফায়দার কথাই বারবার বলতে লাগল।

    আউপাস ইহুদি নেতাদেরকে সম্বোধন করে বলল, ‘এটা তো খুব বেশি দিন আগের কথা নয় যে, আপনারা তা ভুলে যাবেন। গোখরা তাদের রাজত্বকালে ইহুদিদেরকে যে সম্মান দান করেছিল এবং তাদের যে অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছিল, তা আপনারা কীভাবে ভুলে গেলেন? এটা তো ভুলার কথা নয়। ইহুদিদেরকে গোথদের সমমর্যাদা দান করার কারণেই তো আমার ভাই অর্টিজাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আপনারা আমাদের সাথে থাকুন, কথা দিচ্ছি, ইহুদিরা আবার তাদের সেই মান-মর্যাদা ফিরে পাবে। বার্বাররা তো লুটতরাজ করে ধন-সম্পদ গুছিয়ে নিয়ে এখান থেকে চলে যাবে।

    অবশেষে সেই রাতেই সকল পরিকল্পনা সম্পন্ন করা হল এবং পরদিন সকাল থেকেই পূর্ণ উদ্দমে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু হয়ে গেল। একজন গোথ জেনারেল রাজী হচ্ছিল না। সে রডারিকের অপেক্ষা করছিল। জেনারেল মূলত রডারিকের চাটুকার ছিল। মেরিনা তার উপর বিশেষ জাদু প্রয়োগ করল, সে তাকে উদ্ভিন্ন যৌবনের অধিকারিনী খুবসুরত এক মেয়ের প্রলোভন দেখাল। জেনারেল সাথে সাথে কাবু হয়ে গেল। সে মেয়েটিকে তার সাথে যুদ্ধে নিয়ে যেতে চাইল।

    ‘বাদশাহ আপনার জন্য বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে।’ মেরিনা বলল। এত সুন্দর একটি মেয়েকে সে আপনার কাছে রাখতে দেবে না, বরং আমি এই মেয়েকে বাদশাহর কাছে পৌঁছে দেব। সে বাদশাহর সাথেই যাবে; কিন্তু আমি তাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলব, যেন সে আপনার সাথে সম্পর্ক রাখে। তবে আমি আপনাকে যা বললাম, আপনি যদি তা করেন তাহলে আমি আপনাকে এই নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, রডারিক যদি নিহত হয় তাহলে নতুন বাদশাহকে বলে আপনার জন্য বিশাল জায়গীরের ব্যবস্থা করে দেব।’

    মেরিনা সেই তরুণীকে ডেকে এনে বলল, এই জেনারেলের উপর কোন ভরসা করা যায় না। সে প্রতারণাও করতে পারে।’

    মেরিনা ঐ তরুণীর হাতে সামান্য ‘সুফুফ’ দিয়ে বলল, “রাত্রে এই জেনারেলের তাঁবুতে গিয়ে তাকে শরাব পান করাবে এবং শরাবের সাথে এই সুফুফ মিশিয়ে দেবে।

    সুফুফ এক জাতীয় চূর্ণ ঔষধ। এর মাঝে কোন বিষক্রিয়া নেই। তবে তা সেবনের ফলে মেধা লোপ পায় এবং শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। সুফুফ সেবন করানো দ্বারা মেরিনার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের সময় এই জেনারেলকে অকেজো করে রাখা।

    এই সুফুফ যদি রডারিককে পান করান যেত তাহলে ইহুদি ও গোছদের সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু বাস্তবে তা ছিল একেবারেই অসম্ভব। কেননা রডারিক কোন কিছু পানাহার করার পূর্বে দু’জন ব্যক্তিকে খাইয়ে তা পরীক্ষা করে নিত। এমন কি খানা পাক করার সময়ও তার একান্ত আস্থাভাজন দুই-তিনজন লোক সেখানে উপস্থিত থাকত। মোটকথা, রডারিককে সুফুফ জাতীয় কোন কিছু পান করানো একেবারেই অসম্ভব ছিল।

    ঐতিহাসিকগণ লেখেন, বাদশাহরা সাধারণত এধরনের সতর্কতা অবলম্বন করেই থাকে। কিন্তু রডারিক জানত যে, সে কত বড় জালিম। তাই সে সর্বদা মাজলুমদের প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যাপারে শঙ্কিত থাকত।

    ***

    গোধ ও ইহুদি নেতবর্গ আউপাসের সাথে পরামর্শ করে যে প্লান বানিয়েছিল, সে অনুযায়ী প্রায় দেড়শ নওজোয়ান তৈরী করা হল। রডারিক টলেডোতে পৌঁছার পর নওজোয়ানদেরকে তার সামনে উপস্থিত করা হল এবং বলা হল যে, এরা স্বেচ্ছায় ফৌজে শামিল হতে চায়। এরা সাধারূণ কোন সিপাহী নয়, বরং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও জানবাজ।

    রডারিককে আরও বলা হল, এরা নৈশ অভিযানে পারদর্শী। রাতের আঁধারে হামলাকারীদের উপর অতর্কিত আক্রমণ করে এরা তাদের সমূহ ক্ষতি সাধন করতে পারবে।

    রডারিক যেদিন টলেডো এসে পৌঁছে তার আগের দিন আউপাস টলেডো ছেড়ে চলে যায়। সেদিন রাতেই গোথ সম্প্রদায়ের কমান্ডাররা এক গোপনে বৈঠকে মিলিত হয়। এই বৈঠকে দু’জন ইহুদি নেতাও ছিল। তারা অনেক গোপন বিষয়ে মতবিনিময় করার পর সবাই যার যার মতো চলে গেল।

    পরদিন রডারিক একলাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে টলেডো এসে পৌঁছলে দেখা গেল, তার বাহিনীর ঘোড়সওয়ারই হবে কয়েক হাজার। তারা হানাদার বাহিনীকে আন্দালুসিয়া থেকে বিতাড়িত করার জন্য ঝড়ের গতিতে অগ্রসর হচ্ছিল, কিন্তু তারা নিজেদের মাঝে হানাদার বাহিনী সম্পর্কে বিভিন্ন উদ্ভট ও ভীতিকর গল্প-গুজব করছিল।

    কেউ বলল, ‘থিয়েভুমিরের মতো বাহাদুর জেনারেলও তাদেরকে দেখেই পালিয়ে এসেছে।

    অন্য একজন বলল, ‘তারা সংখ্যায় মাত্র কয়েক হাজার, কিন্তু এক লাখ সৈন্যের জন্যও ভয়ঙ্কর।

    আরেকজন বলল, ‘তাদের কোন তীরই ব্যর্থ হয় না। তারা বাতাসে তীর ছুঁড়ে মারে, আর তীর নিজেই কারো বুকে গিয়ে বিদ্ধ হয়।’

    অন্যজন বলল, ‘তাদের একজন পদাতিক সৈন্য পাঁচ-ছয়জন অশ্বারোহীকে ধরাশায়ী করে হত্যা করে ফেলে।

    অন্য আরেকজন বলল, ‘আরে ভাই, কী আর বলব, স্বয়ং থিয়োডুমিরও বাদশাহকে বলেছে, তারা মানুষ নয়; জিন-ভূত।

    অপরজন বলল, ‘শুনা যায় তারা কিস্তিতে চড়ে আসেনি; বরং সাঁতার কেটে এত বিশাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এসেছে।

    অন্যজন বলল, ‘আমি তো এমন শুনেছি যে, তারা সাঁতার কাটে না, বরং পানির উপর দিয়ে হেঁটে চলে; কিন্তু ডুবে না।’

    এমন অনেক কথাই রডারিকের বাহিনীর মাঝে গুজব আকারে ছড়িয়ে পড়ল। একজন একটি কথা শুনে তার সাথে আরও দুই-তিনটি কথা যোগ করে অন্যের কাছে বর্ণনা করত। ফলে গোটা বাহিনীর মাঝে হানাদার বাহিনী সম্পর্কে ভয়-ভীতি বেড়েই চলছিল। তবে একটি কথা তাদের সকলের মনেই আশার আলো হয়ে জ্বলছিল। তাই তারা সকলেই বলাবলি করছিল, ‘হানাদার বাহিনী যতটাই নির্মম ও ভয়ঙ্কর, ততটাই দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। তবে শুধু সেই ব্যক্তির জন্য যে তাদের সামনে অস্ত্র সমর্পণ করে তাদের বন্দীত্ব স্বীকার করে নেয়।’

    ইহুদি ও গোথদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ফৌজের মাঝে এ ধরনের ভীতি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল। আউপাসই এধরনের প্রপাগাণ্ডা চালানোর ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিল। যে দেড়শত সিপাহীকে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও নৈশযুদ্ধে পারদর্শী বলে ফৌজে শামিল করা হয়েছিল, তারা অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে সৈন্যদের মাঝে এসব ভয়-ভীতি ছড়িয়ে দিচ্ছিল।

    ইংরেজ ঐতিহাসিক আর্থ গ্রেম্যান স্বীয় গ্রন্থ ‘মুসলমানদের ইতিবৃত্তিতে লেখেন :

    ‘আন্দালুসিয়ার ফৌজের উপর এটা এক মানসিক আক্রমণ ছিল। তারিক বিন যিয়াদ এই আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি আউপাসকে বলেছিলেন, সে যেন আন্দালুসিয়ার ফৌজের মাঝে এমন কিছু লোক শামিল করে দেয়, যারা হবে অত্যন্ত চালাক-চতুর ও বাকপটু। তারা মুসলমানদের ব্যাপারে অন্দালুসিয়ার বাহিনীর মাঝে ত্রাস সৃষ্টি করবে। আউপাস ইহুদি ও গোথ সরদারদের কাছে এ প্রস্তাব পেশ করলে তারা সে জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করে দেয় এবং দেড়শত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গুপ্তচর রডারিকের ফৌজে শামিল হয়ে যায়।

    আর্থ গ্লেম্যান আরও লেখেন : ‘তারিক বিন যিয়াদের এই আক্রমণ ছিল অত্যন্ত কার্যকরী ও সফল।

    ***

    মুসলমানদের তাঁবুতে সর্বদা বিজয়ের জন্য দুআ করা হচ্ছিল। অপরদিকে ইহুদি ও গোদের উপাসনালয়ে রডারিকের পরাজয়ের জন্য প্রার্থনা করা হচ্ছিল। ইহুদি ও গোথ সম্প্রদায়ের লোকেরা পরস্পর এ ধরনের আলোচনা করত যে, রডারিক যদি নিহত হয় বা পরাজিত হয় তাহলে রাজত্ব তো আমাদেরই থাকবে। হানাদার বাহিনী তো লুটতরাজ করে চলেই যাবে।’

    রডারিকের বাহিনী গোয়াডিলেট নদীর তীরে এসে পৌঁছল। তারিক বিন যিয়াদ খবর পেয়ে ঘোড়ায় করে একটি নিকটবর্তী পাহাড়ের উপর চড়লেন। গোয়াডিলেট নদীর তীরে বহুদূর পর্যন্ত তিনি অসংখ্য মানুষ আর ঘোড়ার মিছিল দেখতে পেলেন। এত বিপুল সংখ্যক সৈন্যবাহিনী ইতিপূর্বে তিনি কখনও দেখেননি। তাকে পূর্বেই বলা হয়েছিল যে, রডারিকের সৈন্যসংখ্যা এক লাখের মতো হবে।

    ‘আল্লাহ্! হে আমার আল্লাহ! তারিক বিন যিয়াদ আসমানের দিকে দুই হাত প্রসারিত করে কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলে উঠলেন। তোমার নামের সম্মান রক্ষা করো, আমরা তো তোমার নামেই কুফুরীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছি। আমরা একমাত্র তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি।’

    তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীকে নদী থেকে প্রায় এক মাইল পিছনে রেখেছিলেন। তিনি চাচ্ছিলেন, রডারিকের বাহিনীকে গোয়াডিলেট নদীর তীরে নিয়ে আসতে, যাতে তাদের পশ্চাদে থাকে অথৈ পানি, আর খরস্রোতা নদী।

    তারিক বিন যিয়াদ অল্প কিছু সংখ্যক সৈন্য নিয়ে নদীর দিকে অগ্রসর হন, আর বেশির ভাগ সৈন্যকে তিনি পাহাড়ের ভিতর আত্মগোপন করে থাকতে বলেন। তারিক সামনে অগ্রসর হয়ে লক্ষ্য করলেন যে, রডারিকের বাহিনী অতিদ্রুত নৌকা দিয়ে পুল তৈরী করছে।

    ‘এদেরকে তো অত্যন্ত ক্ষিপ্র মনে হচ্ছে। তারিক বিন যিয়াদের পিছন থেকে কে যেন বলে উঠল।

    তারিক বিন যিয়াদ কথা শুনে পিছন ফিরে দেখেন, মুগিস আর-রূমী ও আবু জুরাআ তুরাইফ তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন।

    ‘আমরা খুব দ্রুতই এই বাহিনীকে তাড়িয়ে দিতে পারব।’ তারিক বিন যিয়াদ বললেন।

    ‘তারা যদি যুদ্ধক্ষেত্রেও এমন ক্ষিপ্র হয় …।’ আবু জারু’আর মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই তারিক বিন যিয়াদ বলে উঠলেন,

    ‘আপনারা কি দেখতে পারছেন না, তাদের এই ক্ষিপ্রতার কারণ কি? তারিক বিন যিয়াদ বললেন। লক্ষ্য করে দেখুন, তাদেরকে কীভাবে বেত্রাঘাত করা হচ্ছে। তারা স্বেচ্ছায় এই কাজ করছে না; বরং তাদের সালারের অনবরত বেত্রাঘাত তাদেরকে এ কাজ করতে বাধ্য করছে। যুদ্ধের ময়দানেও কি তাদের সালার তাদেরকে এভাবে পিঠিয়ে যুদ্ধ করতে বাধ্য করবে?”

    তারিক বিন যিয়াদের দুই সালার গভীরভাবে লক্ষ্য করে দেখলেন, গোয়াডিলেট নদীর তীরে ফেরাউনের সময়কার দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। কিছু মানুষ কর্মরত মানুষের মাথার উপর ছড়ি ঘুরাচ্ছে। কেউ একটু অলসতা করলে সাথে সাথে তার পিঠে সপাং সপাং বেতের বাড়ি পড়ছে।

    ‘লাঠির ভয় দেখিয়ে যুদ্ধ করানো যায় না। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। দৃঢ়চেতা মন, আর পাহাড়সম মনোবল নিয়ে যুদ্ধ করতে হয়। যে সম্প্রদায়ের নেতারা তাদের অধীনস্থদেরকে গোলাম মনে করে, আর বাদশাহ তার প্রজাদের জন্য ফেরাউন হয়ে যায়, সে সম্প্রদায়ের ধ্বংস অনিবার্য। উঁচু-নীচুর ভেদাব্দে একটি সুসংঘঠিত জাতিকেও ধ্বংস করে ছাড়ে। আমাদের সিপাহীদের মনোবল অটুট। জেনারেল হোক বা সিপাহী, অশ্বারোহী হোক বা পদাতিকসকলের অন্তরেই এক আল্লাহ ও এক রাসূল। এ কারণেই আমাদের মাঝে পূর্ণ সমতা বিদ্যমান। কারো আল্লাহ বড়, আর কারো আল্লাহ ছোট–এমন নয়। প্রাসাদ কিংবা পর্ণকুটির–সর্বত্রই আল্লাহ্ সমানভাবে বিরাজমান। বড়ত্ব একমাত্র আল্লাহরই।

    ‘কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক সৈন্য!’ আবু জারু’আ তুরাইফ অনেকটা হতাশার স্বরে বললেন।

    ‘সকলেই নিজ নিজ জায়গায় চলে যান। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। ‘আল্লাহ্ তাআলা আমাদেরকে বিজয় দান করার জন্য এমনসব উপকরণ সৃষ্টি করেছেন, যা আমি মোটেও আশা করিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুসংবাদ মিথ্যে হতে পারে না; কিন্তু আমি কেবল স্বপ্ন দেখার মানুষ নই। আমি বিশ্বাস করি, যে ব্যক্তি আল্লাহকে তালাশ করে সে অবশ্যই আল্লাহকে পায়। আর আল্লাহ কেবল তাকেই সাহায্য করেন, যে চেষ্টা-সাধনা করে। এখন তোমাদের কাজ হল, মাথা ঠিক রেখে অটল-অবিচল থাকা।

    নদী পার হতেই রডারিকের সৈন্যদের সারা রাত লেগে গেল। সকাল হওয়ার সাথে সাথে দেখা গেল নদীর তীরের বিস্তৃত প্রান্তর জোড়ে রডারিকের একলাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী লড়ায়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

    প্রখ্যাত ঐতিহাসিক লেনপোল লেখেছেন :

    তারিক বিন যিয়াদ ঘোড়ায় আরোহণ করে তার ফৌজের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বললেন :

    ‘আমার মুজাহিদ ভাইয়েরা! তোমাদের সামনে আছে তোমাদের রক্তপিপাসু দুশমন, আর পিছনে আছে কূলকিনারাহীন অথৈ সমুদ্র। পলায়নের কোন রাস্তাই তোমাদের জন্য খোলা নেই। তোমাদের সম্মুখে একটাই রাস্তা খোলা আছে, তা হল বীরত্বের সাথে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে আনা। দুশমনের সংখ্যাধিক্যে ভয় পেয়ো না; বরং সেই পরাজয়কে ভয় কর, যা তোমাদের জন্য বয়ে আনবে সীমাহীন লাঞ্ছনা।

    তারিক বিন যিয়াদের এই সংক্ষিপ্ত জ্বালাময়ী ভাষণ শুনে মুসলিম মুজাহিদগণ আকাশ-বাতাস মুখরিত করে গর্জন করে বলে উঠল, ‘তারিক বিন যিয়াদ। তোমার কোন ভয় নেই, আমরা তোমার সাথে আছি; তোমার সাথেই থাকব।’

    আন্দালুসিয়ার বাহিনীর পক্ষ হতে ঘোষণা করা হল, তোমরা যেই হও না কেন, এখান থেকে চলে যাও। আন্দালুসিয়ার শাহানশার বাদশাহী এক সদ্র হতে আরেক সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত। তার তলোয়ারের ভয়ে গোটা ইউরোপ প্রকম্পিত। তোমাদের প্রতি তার অনুগ্রহ এটাই যে, তোমরা এখান থেকেই ফিরে যাবে, তা হলে আর তলোয়ার কোষবদ্ধ থাকবে। অন্যথায় তোমাদের পরিণাম হবে খুবই ভয়াবহ।

    তারিক বিন যিয়াদকে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর ঘোষণা তরজমা করে বুঝানো হলে তিনি তার জবাব দিয়ে বললেন, আন্দালুসিয় ভাষায় এটা ঘোষণা করে শুনাও। ঘোষণা শুনানোর জন্য আটপাস ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে উচ্চ আওয়াজে বলল :

    ‘তারিক বিন যিয়াদের পক্ষ থেকে আন্দালুসিয়ার শাহানশাকে সালাম। মুহতারাম শাহানশা! আমরা বিনয়ের সাথেই জানাচ্ছি যে, আমরা ফিরে যেতে পারব না। করণ, আমরা আমাদের সকল রণতরী জ্বালিয়ে দিয়েছি। আমরা এ জন্য শাহানশার শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি আমাদের জন্য সমুদ্রে নৌকার পুল তৈরী করে দিয়েছেন। আমরা আল্লাহর নির্দেশে এসেছি, সুতরাং আন্দালুসিয়ার বাদশাহর হুকুমে ফিরে যেতে পারি না।’

    অপর প্রান্ত হতে আন্দালুসিয় এক জেনারেল বার্বার ভাষায় ঘোষণা করল, ‘শাহানশা রডারিকের মুকাবেলা করতে এলে আল্লাহও তোমাদের কোন সাহায্য করতে পারবে না। তোমরা হলে ডাকাতের দল, আমরা তোমাদেরকে শেষবারের মতো …।’

    জেনারেলের মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই মুসলিম বাহিনীর দিক থেকে তিনটি তীর এসে সমূলে তার বুকে বিদ্ধ হল। সে ঘোড়া হতে নিচে পড়ে গেল। তৎক্ষণাৎ আন্দালুসিয়ার দুইজন অশ্বারোহী ঘোড়া দৌড়িয়ে এসে তার লাশ ঘোড়ায় উঠিয়ে নিয়ে গেল।

    ***

    রডারিক সৈন্যবাহিনীর সম্মুখ দিকে ছিল না। তার পতাকা ছিল পিছনে। সে তার সফেদ ঘোড়া ‘উরলিয়ার উপর বসাছিল। সে যখন জানতে পারল যে, মুসলিম বাহিনী তার এক জেনারেলকে হত্যা করে ফেলেছে তখন সে আক্রমণ করার নির্দেশ দিল। রডারিক সমরশাস্ত্রে বিশেষ পারদর্শী ছিল। আক্রমণাত্মক যুদ্ধে তার বেশ সুনামও ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রের যে প্লান সে বানিয়েছিল তার জেনারেলরা তা পরিপূর্ণরূপে রপ্ত করে নিয়েছিল।

    ররিক তার জেনারেলদেরকে বলল, “ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে আক্রমণ করতে হবে। দুই-তিনটি দল মিলে এক সাথে আক্রমণ করবে। এর চেয়ে বেশি সৈন্য এক সাথে ভীড় করলে তোমাদের নিজেদের তীরেই তোমরা জখম হবে এবং তোমাদের নিজেদের ঘোড়ার পদতলে পিষ্ঠ হয়ে মারা যাবে। তাছাড়া ভীড়ের মাঝে সিপাহীরা ঠিকমত তীর চালাতে এবং স্থান পরিবর্তন করতে পারবে না। তাই প্রতিটি আক্রমণই হবে ছোট ছোট দলের মাধ্যমে এবং প্রতিটি আক্রমণের সময়ই নতুন ও উদ্যমী সৈন্য অংশ গ্রহণ করবে। দুশমনের সংখ্যা খুবই অল্প, তাদেরকে অনবরত যুদ্ধ করতে বাধ্য করতে হবে, যেন তারা বিশ্রামের সুযোগ না পায়। এক দিনেই যুদ্ধ শেষ করা ঠিক হবে না। যুদ্ধ যতই প্রলম্বিত হবে দুশমন ততই আমাদের তলোয়ারের শিকারে পরিণত হবে। এক সময় তারা ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে হাতিয়ার সমর্পণ করতে বাধ্য হবে।

    এদিকে তারিক বিন যিয়াদ তার কমান্ডারদের উদ্দেশ্যে বলছিলেন, কোথাও এক জায়গায় ঠাই দাঁড়িয়ে থেকে লড়াই করবে না। আঘাত করেই সরে পড়বে। সরে পড়ার সময় চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়বে, যেন তোমাদের পিছু নিয়ে দুশমনরাও ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। যে কোন হসনাই হোক শত্রুবাহিনীকে পাহাড়ের আড়ালে নিয়ে আসতে হবে। তখন তীরন্দাজ বাহিনীই তাদেরকে সামলাতে পারবে।

    তারিক বিন যিয়াদের প্রান ছিল গেরিলা যুদ্ধের। কারণ, এত বিপুল সংখ্যক সৈন্যবাহিনীর সাথে একটি ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে এক জায়গায় স্থির থেকে সামনা-সামনি যুদ্ধ করে যাওয়া কোন প্রকারেই সম্ভব নয়। কিন্তু গেরিলা যুদ্ধও কোন সহজ যুদ্ধ নয়। কেবলমাত্র বিজ্ঞ কোন জেনারেলের পক্ষেই গেরিলা যুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব।

    রডারিক তার বাহিনীকে আক্রমণ করার নির্দেশ দিলে আন্দালুসিয়ার বাহিনী মুসলিম বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারিক বিন যিয়াদ তিন-চারটি ছোট দলকে সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন। তারা এমনভাবে লড়াই করতে লাগল, যেন তারা পলায়নের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। যুদ্ধ করতে করতে তারা সন্তর্পণে পিছু হটে এলো, যেন আন্দালুসিয়ার সৈন্যরা কিছুই বুঝতে না পারে। মুসলিম বাহিনী একটা পাহাড়ের আড়ালে এসে ডানে-বামে ছড়িয়ে পড়ল। সাথে সাথে পাহাড়ের চূড়া হতে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর উপর বর্শী ও তীর বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।

    এ সকল তীর-বর্শা থিয়োডুমিরের বাহিনী থেকে হাসিল হয়েছিল। তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীকে বর্শা নিক্ষেপ করার বিশেষ কৌশল শিক্ষা দিয়েছিলেন।

    যেসকল মুসলিম সৈন্য ডানে-বামে ছড়িয়ে পড়েছিল তারা কিছু দূর অগ্রসর হয়ে একত্রিত হয়ে গেল। আন্দালুসিয়ার সৈন্যরা হঠাৎ তীর বৃষ্টির মুখে পড়ে দিশেহারা হয়ে যখন পলায়ন করতে লাগল তখন মুসলিম বাহিনী অতর্কিতে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আন্দালুসিয়ার বাহিনীর যে দলটি আক্রমণ করতে এসেছিল তারা বিশৃঙ্খল অবস্থায় ছুটোছুটি করতে লাগল। তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙ্গে পড়ল। ফলে তারা অসহায়ভাবে মুসলিম বাহিনীর হাতে মার খেতে লাগল।

    সমরবিশারদ ঐতিহাসিকগণ লেখেছেন, মুসলিম সেনাপতির রণকৌশল নিঃসন্দেহে তার যুদ্ধ-পারঙ্গমতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ব থেকেই আন্দালুসিয়ার প্রতিটি সৈনিকের অন্তরে মুসলিম বাহিনী সম্পর্কে যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল, তা-ই তাদের যুদ্ধের মনোবল একেবারে দুর্বল করে দিয়েছিল।

    সেদিন রডারিক আরও কয়েকটি দলের মাধ্যমে আক্রমণ পরিচালনা করাল। প্রত্যেক বাহিনীকে ভালোভাবে বলে দিল যে, মুসলিম বাহিনী যদি পিছু হটে তাহলে তোমরা তাদের পিছু নিবে না। কিন্তু তখন আর মুসলিম বাহিনীর পিছু হটার কোন প্রয়োজন ছিল না। তাদের উপর আক্রমণ হওয়ার সাথে সাথে তারা দূর-দূরান্তের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল। ফলে আন্দালুসিয়ার বাহিনী বাধ্য হয়ে তাদের পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। এই সুযোগে মুসলিম বাহিনী আন্দালুসিয়ার বাহিনীর উপর প্রচণ্ড আক্রমণ করে তাদের প্রচুর ক্ষতি সাধন করল।

    মুসলিম বাহিনী পিছু হটার কৌশলে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর উপর আক্রমণ করত। তারপর আচানক একত্রিত হয়ে তিন দিক থেকে ব্যুহ রচনা করে আন্দালুসিয়ার বাহিনীকে ঘিরে ফেলত। মুসলিম বাহিনী ধীরে ধীরে তাদের ন্যূহ সংকুচিত করে আনত। ফলে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর জন্য তলোয়ার উঁচিয়ে আঘাত করারও সুযোগ থাকত না। এই সুযোগে মুসলিম বাহিনী তাদেরকে টুকরো টুকরো করে ফেলত।

    সূর্য অস্ত যাওয়ার পর দেখা গেল, গোটা রণাঙ্গণজোড়ে শুধু রডারিকের সৈন্যদের লাশ আর লাশ। নিয়ম অনুযায়ী সেদিনের মতো সকল সৈন্য নিজ নিজ ছাউনিতে চলে গেল। মাত্র একদিনের যুদ্ধে এত বিপুল পরিমাণ সৈন্যের প্রাণহানী দেখে রডারিক বাহিনীর অপরাপর সৈন্যদের অন্তরআত্মা কেঁপে উঠল। তারা সকলেই ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল।

    ***

    রাতের অর্ধ প্রহর অতিবাহিত হয়েছে। রডারিকের বাহিনী গভীর ঘুমে অচেতন। কয়েকজন প্রহরী এদিক-সেদিক ঘুরাফেরা করছে। হঠাৎ কে যেন পিছন থেকে এক প্রহরীর মুখ চেপে ধরে সমূলে তার বুকে খঞ্জর বসিয়ে দিল। আরও কয়েকজন প্রহরীর অবস্থাও এমনই হল। অল্প সময়ের মধ্যে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর এই দিকটা একেবারে প্রহরী মুক্ত হয়ে গেল। সাধারণ সৈন্যদের জন্য তাবুর কোন ব্যবস্থা ছিল না। খোলা আকাশের নিচে বিস্তৃত প্রান্তরজোড়ে যে যার মতো ঘুমিয়ে ছিল। প্রত্যেক সিপাহীর ঘোড়া তার নিকটেই বাঁধা ছিল।

    প্রহরী নিহত হওয়ার পর ছয়টি ছায়ামূর্তি সন্তর্পণে ঘোড়াগুলোর কাছে গিয়ে পৌঁছল। তারপর দ্রুত হাতে ঘোড়র রশি কেটে দিয়ে খঞ্জর মেরে ঘোড়াগুলো জখম করে দিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে প্রায় দেড়শ ঘোড়া তারা জখম করে ফেলল। আঘাত এত গভীর ছিল যে, ঘোড়াগুলো ভয়ঙ্ককরূপে হ্রেষা ধ্বনি করতে করতে দিগ্বিদিক ছুটতে লাগল।

    ছায়ামূর্তিগুলো অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে একেকটি ঘোড়াকে আঘাত করছিল, আর ঘোড়াগুলো আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে চিৎকার করতে করতে এলোপাথারি ছুটতে লাগল। আহত ঘোড়ার চিৎকার শুনে সিপাহীরা জেগে উঠল ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। সৈন্যরা ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হওয়ার ভয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটতে লাগল। এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হল যে, ঘোড়র পদতলে পিষ্ট হয়ে মাটিতে শুয়ে থাকা ও পলায়নরত অসংখ্য সৈন্য বেঘোরে মারা পড়ল।

    বিস্তৃত প্রান্তরজোড়ে রডারিকের সৈন্যরা সারাদিনের যুদ্ধক্লান্ত দেহ নিয়ে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়েছিল। আঘাতপ্রাপ্ত ও লাগামহীন ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হয়ে কত সিপাহী যে মারা পড়ল, তার কোন হিসাব রইল না। ঘোড়াগুলোকে রাও সম্ভব ছিল না। যেই ছুটন্ত ঘোড়ার সামনে এসে পড়ত, তারই পরিণতি হত অত্যন্ত করুণ। ঘোড়ার সাথে ধাক্কা খেয়ে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ত, আর অন্য ঘোড়ার পা তার শরীর ক্ষতবিক্ষত করে সামনে অগ্রসর হয়ে যেত।

    এই চোরাগোপ্তা হামলায় যারা অংশ নিয়েছিল তারা ছিল জানবাজ কয়েকজন মুজাহিদ। তারা মিশন শেষ করে নিরাপদে নিজেদের ক্যাম্পে ফিরে এলো। তারা যখন তাদের ক্যাম্পে এসে পৌঁছল তখনও রডারিকের সৈন্যদের শোরগোল শুনা যাচ্ছিল। তখনও আঘাতপ্রাপ্ত ঘোড়াগুলোর এলোপাথারি ছুটোছুটি করার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। আঘাতপ্রাপ্ত এই ঘোড়াগুলো কোন সাধারণ ঘোড়া ছিল না। যুদ্ধের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অসাধারণ ঘোড়া ছিল এগুলো। তাই ঘোড়াগুলোকে আয়ত্বে আনা সহজ কোন ব্যাপার ছিল না। ঘোড়ার ছুটোছুটি আর আহত সৈন্যদের চিৎকারে রডারিকসহ বাহিনীর সকল সৈন্যই জেগে উঠল।

    মশাল জালানো হল। একটা ঘোড়াকে খুব কষ্ট করে ধরা হল। ঘোড়র পিঠ থেকে অঝোরে রক্ত ঝরছিল। রডারিক হতভম্ব হয়ে গেল। সে অবাক হয়ে ভাবছিল, এতগুলো ঘোড়া জখম হল কি করে? আরও কয়েকটি ঘোড়া ধরে আনা হল। সবগুলোর শরীর থেকেই প্রবল বেগে রক্ত ঝরছিল।

    ‘নিশ্চয় শত্রুবাহিনী রাতের অন্ধকারে এ কাজ করেছে।’ রডারিক বলল ‘যারা পাহারায় ছিল তাদের সকলকে ঘোড়ার পিছে বেঁধে মোড়া ছুটিয়ে দাও। তারপর তাদের চামড়া ছিলে সমুদ্রে নিক্ষেপ কর।’

    সাথে সাথে প্রহরীদেরকে খোঁজা শুরু হল। অনেকক্ষণ পর তাদের তিন জনের লাশ পাওয়া গেল।

    ***

    রাত শেষ হয়ে যখন পূর্ব আকাশে দিনের আলো ফুটে উঠল তখন চোখে পড়ল, মাত্র এক রাতে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর কী ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে। রাত্রি যাপনের জন্য আন্দালুসিয়ার বাহিনী ময়দানের যে স্থানটিতে অবস্থান করছিল সে স্থানটির চতুর্দিকে কেবল লাশ আর লাশ।

    অন্যন্য সৈন্যরা দেখার আগেই লাশগুলো সরিয়ে না ফেলে রডারিক বড় ধরনের একটি ভুল করল। আগে থেকেই আন্দালুসিয়ার বাহিনীর মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। সকাল হতেই বিপুল সংখ্যক সহযোদ্ধার মৃত দেহ দেখে অন্যান্য সৈন্যরা আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। রডারিকের উচিৎ ছিল রাতের অন্ধকারেই লাশগুলো উঠিয়ে সমুদ্রে ফেলার ব্যবস্থা করা। কিন্তু সে হয়তো এ কথা ভেবে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল যে, মুসলিম বাহিনী এক রাতে এত বিপুল সংখ্যক সৈন্য খতম করল কীভাবে? তার ধারণা ছিল, মাত্র কয়েকটি দল আক্রমণ করলেই এই স্বল্প সংখ্যক মুসলমান পলায়ন করতে বাধ্য হবে। কিন্তু প্রথম দিনের যুদ্ধেই তার সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হল।

    রডারিক তার জেনারেলদেরকে ডেকে বলল, ‘ময়দানে তোমাদের সৈন্যদের যে পরিমাণ লাশ দেখেছ এই পরিমাণ মুসলমানদের লাশ আজ আমি দেখতে চাই। তোমাদেরকে আজ অবশ্যই প্রতিশোধ নিতে হবে।’

    ‘আজ আমরা বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করব। একজন জেনারেল বলল।

    ‘পাহাড়ের অভ্যন্তরে গিয়ে আমরা তাদেরকে খতম করব। থিয়োডুমির বলল।

    ‘তোমার মাথায় যদি সামান্য বুদ্ধি থাকত তাহলে তুমি তাদের হাতে মার খেয়ে পলায়ন করতে না।’ রডারিক বলল। তুমি যদি সৈন্য নিয়ে পাহাড়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ কর তাহলে তুমি তো মারা পরবেই, তোমার একজন সিপাহীও জীবন নিয়ে ফিরে আসতে পারবে না।’

    তারপর সে অন্য জেনারেলকে লক্ষ্য করে বলল, তুমি বলছ, বিপুল পরিমাণ সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করবে। তুমি কি কালকের যুদ্ধ দেখনি? তারা প্রথমে তোমাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। তারপর তোমাদেরকে এক জায়গায় একত্রিত করে ব্যুহ রচনা করে সবাইকে খতম করেছে। তুমি কি জান না, যুদ্ধের ময়দানে দুশমনের সামনে জটলা সৃষ্টি করা ক্ষতিকর?’ আজ বরং স্বল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করবে। একজন মুকাবেলা করবে একজনের। নিজেদের মাঝে এতটুকু দূরত্ব রাখবে, যেন অনায়েসে তলোয়ার চালান যায়। আজকের হামলায় অর্ধেক অশ্বারোহী, আর অর্ধেক পদাতিক থাকবে।’

    এদিকে তারিক বিন যিয়াদ কয়েকজন পদাতিক সৈন্য নিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি প্রথমে আক্রমণ করতে চাচ্ছিলেন না, বরং দুশমনের যুদ্ধ-কৌশল বুঝার জন্য প্রথমে তাদেরকে আক্রমণের সুযোগ দিতে চাচ্ছিলেন।

    রডারিকের পরিকল্পনা মুতাবেক তার ফৌজ গতকালের মতো দ্রুত বেগে সম্মুখে অগ্রসর হল না, বরং তারা স্বাভাবিক গতিতে সামনে অগ্রসর হতে লাগল। তারা তিনটি সারিতে সারিবদ্ধ ছিল। প্রথম সারিতে ছিল অশ্বারোহী বাহিনী। তারা মুসলিম বাহিনীকে দেখামাত্র দ্রুত বেগে ধেয়ে আসল। মুসলিম সৈন্যগণ পূর্ব হতেই প্রস্তুত ছিল। তারা সকলেই ছিল পদাতিক। তাদের মাঝে একজন অশ্বারোহীও দেখা যাচ্ছিল না।

    মুসলিম বাহিনীর পক্ষ হতে যুদ্ধের নাকারা বেজে উঠল। আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহীরা পূর্ব হতেই বর্শা প্রস্তুত করে রেখেছিল। তারা সামনে অগ্রসর হয়ে মুসলিম বাহিনীকে লক্ষ্য করে তীর-বর্শা নিক্ষেপ করতে লাগল। কিন্তু মুসলিম বাহিনী পাল্টা আক্রমণ না করে আন্দালুসিয়ার বাহিনীকে অবাক করে দিয়ে মাটির উপর বসে পড়ল। ক্ষিপ্রবেগে ছুটে আসা ঘোড় মুহূর্তের মধ্যে মুসলিম বাহিনীকে অতিক্রম করে সামনে চলে গেল। তারা সাথে সাথে ঘোড়া থামাতে ব্যর্থ হল। পরে যখন তারা ঘোড়া থামিয়ে পিছনে ফিরে আসছিল ততক্ষণে মুসলিম বাহিনী আন্দালুসিয়ার পদাতিক বাহিনীর নিকট পৌঁছে পূর্ণ উদ্যমে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে।

    এ অবস্থায় আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহী বাহিনী একেবারে কিংকর্তব্যবিমোঢ় হয়ে পড়ল। কারণ, তারা যদি মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করে তাহলে তাদের পদাতিক সৈন্যও আক্রমণের শিকার হয়ে পড়বে। আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহী বাহিনী যখন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে ভাবছিল, কী করা যায়–এমন সময় পিছন দিক হতে মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনীর একটি দল আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহীদের উপর অতর্কিত আক্রমণ করে বসল। এই আক্রমণ আন্দালুসিয়ার বাহিনীর কাছে অকল্পনীয় ছিল। তারা কোন কিছু বুঝে উঠার পূর্বেই মুসলিম বাহিনী তাদেরকে টুকরো টুকরো করে ফেলল।

    আন্দালুসিয়ার বাহিনী যখন তাদের অশ্বারোহীদের করুন অবস্থা দেখল তখন তাদের সাহায্যার্থে আরেক দল অশ্বারোহী মুসলিম অশ্বারোহীদেরকে প্রতিহত করার জন্য সামনে অগ্রসর হল। কিন্তু তারা পৌঁছার পূর্বেই মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনী দ্রুতবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে যে পাহাড়, আর টিলা হতে বের হয়ে এসেছিল সেদিকে চলে গেল।

    আন্দালুসিয়ার যে অশ্বারোহী বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়েছিল–পিছন থেকে তাদেরকে বারবার এই বলে সতর্ক করা হল, “খবরদার, পাহাড়ের ভিতর যেও না। ফিরে এসো।’

    অগত্যা আন্দালুসিয়ার দ্বিতীয় অশ্বারোহী দলটিও যখন ফিরে আসতে লাগল তখন মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনীর আরেকটি দল পিছন হতে আক্রমণ করে তাদেরকে খতম করতে লাগল। মুসলিম বাহিনী তাদের উপর আক্রমণ করেই দ্রুত পালিয়ে যেত।

    ঐতিহাসিকগণ লেখেন, উভয় পক্ষের সৈন্যরাই সমানতালে বীরত্ব প্রদর্শন করছিল, কিন্তু মুসলমানদের মাঝে যে স্পৃহা ছিল আন্দালুসিয়দের মাঝে তা ছিল না। মুসলিম বাহিনী ছিল বাবার সম্প্রদায়ের লোক। বার্বার জাতি-গোষ্ঠির জন্য যুদ্ধ-বিগ্রহ হল একটি সাধারণ বিষয়। অধিকন্তু তারা ছিল যুদ্ধপারদশী ও শৃঙ্খলাবদ্ধ একটি বাহিনী। রণাঙ্গনে তাদের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের কথা ছিল খুবই মশহুর। ইসলাম গ্রহণের পর কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করা তাদের ধর্মীয় বিশ্বসে পরিণত হয়েছিল, ফলে তাদের যুদ্ধ-স্পৃহা বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল।

    যাহোক, আন্দালুসিয়ার বাহিনী মুসলিম বাহিনীর সামনে টিকতে পারল না। তারা পিছু হটতে বাধ্য হল। মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনী আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহী বাহিনীকে অতর্কিত হামলা করে নাজেহাল করে তুলল। আন্দালুসিয়ার সৈন্যবাহিনীর চেইন অব কমান্ড পূর্ণরূপে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। একেকজন মুসলিম যোদ্ধা কয়েকজন আন্দালুসিয় সৈন্যকে হত্যা করে অকুতোভয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।

    আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহী সৈন্যদেরকেও তারা সমানতালে হত্যা করছিল। অনেক সৈন্যকে তারা ঘোড়াসহ জীবন্ত পাকড়াও করল।

    মুসলিম বাহিনীর মুহুর্মুহু তাকবীর-ধ্বনীতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর পরই যুদ্ধের দামামা বেজে উঠছিল। যুদ্ধের ময়দানে বার্বার সৈন্যরা এক ধরনের বিশেষ দামামা বাজাতে অভ্যস্ত ছিল। সেই দামামার বিকট আওয়াজ শত্রুবাহিনীর অন্তরে মৃত্যুর বিভীষিকা ছড়িয়ে দিত।

    রডারিকের সৈন্যদের মাঝে পূর্ব হতেই আতঙ্ক বিরাজ করছিল। ফলে যুদ্ধের ময়দানে এসে শত্রুপক্ষের দুর্দমনীয় আক্রমণ দেখে তাদের যুদ্ধ-স্পৃহা একেবারেই খতম হয়ে গেল। তাদের অনেকেই হাতিয়ার ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করতে লাগল।

    ***

    রডারিকের নির্দেশে রাতের বেলা ক্যাম্পের চতুর্দিকে পাহারা জোরদার করা হল। তারপরও জানবাজ কয়েকজন মুজাহিদ ক্যাম্পে পৌঁছে কমান্ডো আক্রমণের মাধ্যমে বেশ কিছু সৈন্যকে হত্যা করে এবং অসংখ্য ঘোড়া জখম করে নিমিষেই অন্ধকারে পালিয়ে গেল।

    সকালে রডারিক অগ্নিশর্মা হয়ে বলল, ‘আজ আমি এই দস্যুবাহিনীর উপর শেষ আঘাত হানব। আজকের লড়াই হবে শেষ লড়াই। আজ আমি নিজেই যুদ্ধের নেতৃত্ব দেব।’

    রডারিক এক গৌথ জেনারেলকে লক্ষ্য করে বলল, এখন পর্যন্ত কোন গোথ সিপাহীকে আমি সম্মুখ যুদ্ধে পাঠাইনি। তুমি তোমার গোথ সিপাহীদেরকে প্রস্তুত হতে বলে দাও। গোথ সিপাহীরাই এখন আমার একমাত্র ভরসা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, একমাত্র তোমরাই বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারবে। আমার সম্প্রদায়ের সিপাহীরা আমাকে ভীষণ লজ্জায় ফেলে দিয়েছে।’

    এই সেই জেনারেল, যাকে মেরিনা নিজের পক্ষে আনতে চেষ্টা করেছিল। মেরিনা তাকে এই প্রস্তাব দিয়েছিল যে, যখন পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হবে তখন সে যেন গোথ বাহিনীকে নিয়ে মুসলিম বাহিনীর সাথে মিশে যায়। কিন্তু এই জেনারেল মেরিনার কথায় রাজি হয়নি। অবশেষে মেরিনা একটি সুন্দরী মেয়ের লোভ দেখিয়ে তাকে বাগে আনতে চেষ্টা করেছিল। মেরিনা তাকে বলেছিল,

    এই মেয়েকে আমি রডারিকের জন্য এনেছি। যুদ্ধের দিনগুলোতে সে রডারিকের মনোরঞ্জনের জন্য রডারিকের সাথে থাকবে। তুমি যদি আমার কথায় রাজি হও তাহলে এই মেয়ে সুযোগ করে তোমারও মনোরঞ্জন করবে। চিন্তা করে দেখ, এমন সুযোগ বারবার আসবে না।’

    মেরিনা চাচ্ছিল, জেনারেল যদি রাজি হয় তাহলে যুদ্ধ চলাকালীন সময় অন্তরঙ্গ কোন এক মুহূর্তে মেয়েটি জেনারেলকে এক ধরনের নেশাকর পানীয় পান করাবে। সেই নেশার প্রভাবে মেয়েটি তাকে যা বলবে, সে তাই করতে বাধ্য হবে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে রডারিকের নির্দেশে মেয়েটিকে জাদুকর বোসজনের হাতে তুলে দিতে হল। ফলে মেরিনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হল না। ইহুদি জাদুকর বোসজন সেই মেয়েটিকে জবাই করার জন্য নিয়ে গেল।

    আজ যুদ্ধের তৃতীয় দিন। গোয়াডিলেট নদীর তীরে গোথ সিপাহীরা মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করার জন্য সম্মুখে অগ্রসর হল। তাদের পিছনে ছিল অন্য সম্প্রদায়ের সৈন্যবাহিনী। রডারিক তাদের মাধ্যখানে অবস্থান করছিল। সে তার সফেদ ঘোড়া উরলিয়ার উপর বসেছিল। তার মাথার উপর ছিল আন্দালুসিয়ার পতাকা, আর চতুরপার্শ্বে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী।

    তারিক বিন যিয়াদ রডারিকের পতাকা দেখে ঘোড়া ছুটিয়ে সৈন্যবাহিনীর সম্মুখ দিকে চলে এলেন। তারিক বিন যিয়াদের পিছনে তার রক্ষী বাহিনী এগিয়ে এলে তিনি তাদেরকে পিছনে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং মুগীছ আর-রূমীকে কাছে ডেকে তার কানে কানে কি যেন বললেন।

    মুগীছ আর-রূমী আন্দালুসিয়ার ভাষা বুঝতেন। তিনি সামনে অগ্রসর হয়ে ঘোষণা করলেন, আমরা আন্দালুসিয়ার শাহানশাকে স্বাগতম জানাচ্ছি। আমাদের সিপাহসালার তারিক বিন যিয়াদ বলছেন, বাদশাহ রডারিক যদি যুদ্ধের জন্য এসে থাকেন তাহলে তিনি যেন আমাদের মতো রক্ষিবাহিনী ছাড়া একাকী সামনে আসেন।’

    ‘আমার মতো কোন বাদশাহ যদি তোমাদের মাঝে থাকত তাহলে আমি তোমাদের সামনে যেতাম। অপর দিক থেকে রডারিক ঘোষণা করাল। একজন দস্যুসরদারের সামনে যাওয়া আমার মতো বাদশাহর জন্য শোভা পায় না। তোমাদের উচিৎ ছিল তোমাদের বাদশাহকে সাথে নিয়ে আসা।’

    ‘আমরা তোমাকে অচিরেই আমাদের বাদশাহর নিকট পৌঁছে দেব। তারিক বিন যিয়াদের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হল। আমাদের বাদশাহ হলেন আল্লাহ। আমরা কোন মানুষকে বাদশাহ বানাই না। আমাদের সকলের বাদশাহ একমাত্র আল্লাহ” এই পয়গাম পৌঁছানোর জন্য এবং তোমাদের বাদশাহী চিরতরে খতম করার জন্যই আমরা এসেছি।’

    ‘সামনে অগ্রসর হও।’ গোথ জেনারেলের নাম নিয়ে রডারিক হুঙ্কার ছেড়ে বলল। এই বর্বর জংলিদের মুখ বন্ধ করে দাও।

    ‘গোথ সিপাহীরা, আঁপিয়ে পড়। শত্রু বাহিনীকে ধ্বংস করে দাও।’ গোথ জেনারেল চিৎকার করে নির্দেশ দিয়ে সে নিজেও প্রবল বেগে ঘোড়া হাঁকিয়ে দিল।

    এমন সময় এক অশ্বারোহী গোখ সৈন্য পিছন দিক থেকে দ্রুতগতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে জেনারেলের পিঠ লক্ষ্য করে সজোরে বর্শার আঘাত হানল। তারপর টেনে বর্শা বের করে পুনরায় আঘাত করল। জেনারেল ঘোড় হতে পড়ে সাথে সাথে মারা গেল।

    গোখ সৈন্যরা তলোয়ার কোষাবদ্ধ করে মুসলিম বাহিনীর দিকে এগিয়ে গেল। তাদের মাঝে পদাতিক ও অশ্বারোহী বিপুল সংখ্যক সৈন্য ছিল। তারা হৈ-হট্টগোল করে সামনে অগ্রসর হচ্ছিল। তারিক বিন যিয়াদ তো পূর্বে থেকেই জানতেন যে, গোধ ও ইহুদিরা তাদের সাথে মিলে যাবে। কিন্তু রিকের সৈন্যরা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। তারা ভাবছিল, এটা আবার কেমন হামলা! হামলাকারী তলোয়ার কোষবদ্ধ করে রেখেছে।

    ‘তাদেরকে স্বাগত জানাও। তারিক বিন যিয়াদ ঘোষণা করালেন। এখন থেকে তারা তোমাদের দোস্ত, তোমাদের সহযোদ্ধা।

    ‘এটা হচ্ছে কি?’ রডারিক হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগল। এরা যাচ্ছে কোথায়? এরা তো দেখছি, নিজেদের জেনারেলকে হত্যা করে ফেলল?

    তার এসব প্রশ্নের জওয়াব দেওয়ার কেউ ছিল না। এটা ছিল মেরিনা ও আউপাসের গোপন পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন।

    কত সংখ্যক গোথ সৈন্য মুসলিম বাহিনীতে যোগ দিয়েছে, সে ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন, বিশ হাজার। কেউ বলেছেন, পঁচিশ হাজার। আবার কেউ বলেছেন, পনের-বিশ হাজারের মাঝামাঝি হবে।

    রডারিকের প্রশ্নের জবাব কেউ দিতে পারছিল না। মুসলিম বাহিনীর দিক থেকে এক গোথ সৈন্য সামনে অগ্রসর হয়ে উচ্চস্বরে বলল,

    ‘আমরা আমাদের বাদশাহ অর্টিজার প্রতিশোধ নেব। আন্দালুসিয়ায় বাদশাহী করার অধিকার একমাত্র গোয় সম্প্রদয়েরই আছে। রডারিক! তুমি গোথদের রাজত্ব খতম করে নিজে ক্ষমতার মসনদে বসেছিলে। এবার দেখতে পাবে, আমরা আমাদের অধিকার কীভাবে আদায় করি।

    ***

    কয়েক মুহূর্তের মধ্যে রণাঙ্গনের চেহারাই পাল্টে গেল। আগের দুই দিন রডারিক তার সৈন্যদের মাধ্যমে বিপুল বিক্রমে আক্রমণ করিয়েছিল, কিন্তু প্রতিটি আক্রমণই চরম ব্যর্থতার রূপ নিয়েছিল। আজ যখন এক সাথে মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা বিশ হাজার বৃদ্ধি পেল তখন গোটা আন্দালুসিয় বাহিনীর মনোবল একেবারেই ভেঙ্গে গেল।

    বিশ হাজারের মতো যে বিপুলসংখ্যক সৈন্য মুসলিম বাহিনীর সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল, তারা কোন মামুলি সিপাহী ছিল না। তারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সামরিক বাহিনীর নিয়মিত সিপাহী ছিল। তাদের সকলের অন্তরেই প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল। প্রতিশোধের স্পৃহা নিয়ে যে সকল গৌথ ও ইহুদি সৈন্য মুসলিম বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল, মুসলিম বাহিনী তাদেরকে সাদরে গ্রহণ করল। ফলে মুসলিম, গোথ ও ইহুদি সৈন্যদের সম্মিলিত বাহিনী এক অপ্রতিরুদ্ধ শক্তিতে পরিণত হল।

    সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে তারিক বিন যিয়াদ যুদ্ধ পলিসি পরিবর্তন করলেন এবং গোথদের মধ্য থেকেই একজনকে তাদের জেনারেল নিযুক্ত করলেন। তাদের পূর্বের জেনারেল গোথ সৈন্যের হাতে নিহিত হয়েছিল।

    ‘কে বলতে পারবে, আমার রাসূল সালালাহু আলাইহি ওয়াসালামের ভবিষ্যত্বাণী সত্য প্রমাণিত হবে না?’ তারিক বিন যিয়াদ তার সালারদেরকে সম্বোধন করে বললেন। আল্লাহর সাহায্য যখন আসে তখন তার বান্দার সকল সমস্যাই দূর হয়ে যায়। আল্লাহ অবশ্যই তার মাহবুবের সুসংবাদ পূর্ণ করবেন। এখন আমার সামনে সেই সুসংবাদ চিরসত্যের রূপ ধারণ করেছে। তোমরা তোমাদের অধীনস্থ সকল সিপাহীকে বলে দাও, তারা যেন আল্লাহর দরবারে সেজদাবনত হয়, আর সর্বদা অন্তরে আল্লাহর নাম স্মরণ করে।

    রণাঙ্গনের অপর দিকের চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন। গোয়াডিলেট নদীর তীরে এক জাঁকজমকপূর্ণ তাবুতে রাগে-দুঃখে বাদশাহ রডারিক ছটফট করছিল। কখনও সে কুরসীর উপর বসছিল, কখনও আবার লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে তাঁবুর মাঝে পায়চারী করছিল। কখনও রাগে-গোসায় টেবিলের উপর সজোরে আঘাত করছিল। আবার কখনও এক হাত দ্বারা অন্য হাতে আঘাত করছিল।

    সেই তাঁবুর বাইরে দুজন জেনারেল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল। অবশেষে একজন বয়স্ক জেনারেল—-রডারিক যাকে অত্যন্ত সম্মান করত–কামরায় প্রবেশ করে বলল :

    ‘বাদশাহ নামদার! আপনি এভাবে ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। গোথ সিপাহীরা ধোঁকা দিয়েছে তাতে কী এমন অসুবিধা হয়েছে? আমরা সেসকল বিশ্বাসঘাতক গোথদের বংশ ধ্বংস করে দেব।’

    ‘আমাদের বংশই তো ধ্বংস হচ্ছে। রডারিক সজোরে মাটিতে পদাঘাত করে গর্জে উঠে বলল। যা বলছ, যদি তোমরা তা করতে পারতে তাহলে প্রথমদিনই এ লড়াই শেষ হয়ে যেত। তোমরা দুশমনের কী ক্ষতি করতে পেরেছ? সংখ্যার বিচারে আমাদের সামনে তাদের দৃষ্টান্ত হলে, মানুষের পায়ের নিচে পিপড়ার ন্যায়। কিন্তু এই পিপড়াই এখন আমাদের অস্তিত্বের জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুশমন কমজোর হওয়ার পরিবর্তে দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। আমার সামনে থেকে চলে যাও।

    জেনারেল চলে না গিয়ে বরং পানপাত্রে শরাব ঢেলে রডারিকের সামনে পেশ করে বলল, ‘আমরা শাহানশাকে এ অবস্থায় দেখতে চাই না। এই নিন; পান করে নিজেকে একটু সামলে নিন।

    রডারিক জেনারেলের হাত থেকে পানপাত্র নিয়ে সজোরে তা ছুঁড়ে ফেলে দিল। পানপাত্র শক্ত মেজের সাথে লেগে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।

    ‘তোমরা চাও, শরাবের নেশায় যেন আমার জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়।’ রডারিক বলল। তোমরা চাও, আমি যেন এই কঠিন বাস্তবতাকে ভুলে যাই।

    জেনারেল রডারিকের তাঁবু থেকে বের হয়ে মেয়েদের তাঁবুর দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর জেনারেল যখন ফিরে এলো তখন তার সাথে একটি অপরূপ সুন্দরী মেয়ে ছিল। রডারিক মেয়েটিকে খুবই পছন্দ করত। জেনারেল মেয়েটির সাথে কি যেন বলল। তাঁবুর নিকটবর্তী হয়ে সে মেয়েটিকে তাঁবুতে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর মেয়েটি তাঁবু থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলো। রডারিক তাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে তাঁবু থেকে বের করে দিল। তাল সামলাতে না পেরে মেয়েটি হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তারপর উঠে ধীরে ধীরে মেয়েদের কামরার দিকে চলে গেল।

    ***

    রডারিক চিৎকার করে বৃদ্ধ জেনারেলকে ডাকল। জেনারেল হন্তদন্ত হয়ে রডারিকের তাঁবুতে এসে উপস্থিত হল। রডারিককে কিছুটা শান্ত মনে হচ্ছিল।

    ‘মনে হয়, সেই ইহুদি জাদুকর ব্যর্থ হয়ে গেছে।’ রডারিক হতাশার সুরে বৃদ্ধ জেনারেলকে লক্ষ্য করে বলল। সেই জাদুকর আমাকে বলেছিল, একটি অল্প বয়স্কা কুমারী মেয়েকে বলি দিলে আমি অশুভ শক্তির মন্দ প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারব। আমি তাকে একটি কুমারী মেয়ে দিয়েছিলাম। সে হয়তো তাকে বলি দিয়েছে, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়ে গেছে। সেই ইহুদি আমাকে ধোঁকা দেয়নি তো?

    ‘আমি এখনই একজন দ্রুতগতি সম্পন্ন অশ্বারোহী টলেডো পাঠিয়ে দিচ্ছি, সে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সংবাদ নিয়ে ফিয়ে আসবে।’ বৃদ্ধ জেনারেল বলল।

    ‘সে কবে পৌঁছবে, আর কবেইবা ফিরে আসবে?’ পরাজিত সৈনিকের মতো হতাশার সুরে রডারিক বলল। আসলে হিরাক্লিয়াসের দুর্গ খোলা আমার ঠিক হয়নি। দুর্গের রক্ষক সেই পাদ্রি দুজন আমাকে বাধা দিয়েছিল। তুমি আমার সাথে ছিলে, তুমিও আমাকে নিষেধ করেছিলে।

    ‘শাহানশা! অন্তর থেকে এই দুশ্চিন্তা এখন বের করে দিন। বৃদ্ধ জেনারেল বলল।

    ‘কীভাবে আমি আমার অন্তর থেকে এই দুশ্চিন্তা বের করে দেব। রডারিক ভীত-সন্ত্রস্ত কণ্ঠে বলল। তুমি কি দেখতে পাচ্ছে না, দুর্গে আমরা যুদ্ধের যে দৃশ্য দেখেছিলাম, সে দৃশ্য আমরা এখানে প্রতিদিন দেখতে পাচ্ছি। মুসলমানদের সেই রণহুঙ্কার শুনতে পাচ্ছি। প্রতিদিন আমার বাহিনী মার খেয়ে পিছু হটে আসছে। দুর্গের সেই ছায়াচিত্রে আমি নিজেকে দেখতে পেয়েছিলাম। আমি দেখেছিলাম, আমার ঘোড়া আমাকে ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে। আর যে মেয়েটিকে আমি পাম্পালুনায় হত্যা করেছিলাম, তাকে আবারও স্বপ্নে দেখতে পাচ্ছি।’

    ঐতিহাসিক লেনপোল তকালীন আন্দালুসিয়ার তিনজন ঐতিহাসিকের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখেছেন, ‘রহস্যময় দুর্গ, আর সেই কিশোরী মেয়ে রডারিকের মন-মস্তিষ্কের উপর প্রেতাত্মার ন্যায় বেঁকে বসেছিল। যে ইহুদি জাদুকর রডারিককে এই প্রেতাত্মার হাত থেকে মুক্তি দেবে বলে কথা দিয়েছিল, সে জাদুকর মেরিনার হাতে নিহত হয়েছে। তারপর বিশ-পঁচিশ হাজার সিপাহীর বিশাল বাহিনী কেবলমাত্র রডারিকের পক্ষই ত্যাগ করেনি, বরং তার বিরুদ্ধে দস্তুরমতো লড়াই করছে। তারপরও রডারিকের নিকট যে পরিমাণ সৈন্য ছিল, তার সংখ্যাও মুসলিম বাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি ছিল। কিন্তু তার বাহিনীর প্রতিটি সৈন্য মনোবল হারিয়ে ফেলেছিল। রণাঙ্গনের কর্তৃত্ব পুরোদমে তারিক বিন যিয়াদের হাতে চলে এসেছিল। তারিক কোন দুশ্চিন্তা বা প্রেতাত্মার অশুভ প্রভাবের শিকার ছিলেন না। তাঁর মনে কোন পাপের অনুশোচনা ছিল না। তার দৃঢ় বিশ্বাস তার মনোবলকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। পক্ষান্তরে পাপের অনুশোচনা রডারিককে কুরে কুরে খাচ্ছিল। সে ভাবছিল তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার সময় উপস্থিত হয়েছে।

    ***

    গোয়াডিলেট নদীর তীরে যুদ্ধের অষ্টম দিনের সর্য উদিত হল। রডারিক তার সকল সৈন্যকে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে ময়দানে দাঁড় করাল। সে তার সফেদ ঘোড়া উরলিয়ার উপর বসাছিল। সে ঘোড়ায় চড়ে সারিবদ্ধ সৈন্যদের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ছুটতে ছুটতে ঘোষণা করতে লাগল,

    ‘আজকের যুদ্ধেই চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে। আজ তোমরা যদি দুশমনকে পরাজিত করতে পার তাহলে এত বিপুল পরিমাণ পুরস্কার তোমাদেরকে দেব যে, তোমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও শাহানশা রডারিককে স্মরণ করবে।’

    ওদিকে তারিক বিন যিয়াদ সোথ সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে এক জ্বালাময়ী ভাষণ প্রদান করেন। তিনি বলেন : ‘হে গোথ সম্প্রদায়, তোমরা যদি আজ পরাজিত হও তাহলে আন্দালুসিয়া হতে তোমাদের বংশ নির্মূল করা হবে। তোমাদের স্ত্রী-কন্যা ও ছোট ছোট বাচ্চাদেরকে রডারিক জীবন্ত কবর দেবে।

    হে আমার বাবার সম্প্রদায়! তোমরা কি কখনও কারো কাছে পরাজিত হয়েছ? আজ যদি তোমরা পরাজিত হও তাহলে কোথায় যাবে? তোমরা এই প্রথম অন্য একটি দেশে আক্রমণ করতে এসেছ। আরব মুসলমানরা কয়েকটি রাজ্যকে ইসলামী সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। তোমরা কি এটা পছন্দ করবে যে, তোমাদের আরব ভাইরা বলবে, বার্বাররা অন্য দেশে গিয়ে যুদ্ধ করার যোগ্য ছিল না?’

    ‘না, তারিক! কক্ষণও না! বার্বার মুজাহিদগণ সমস্বরে চিৎকার করে বলে উঠল। আমরা তোমার সাথে আছি, তোমার সাথেই থাকব।

    ‘আক্রমণকারীদের রণহুঙ্কারে ভয় পেয়ো না।’ রডারিক তার বাহিনীকে বলল। এরা কোন বাদশাহর ফৌজ নয়, এরা ডাকাত; এরা লুটেরা।’

    ‘হে আমার মুসলিম ভায়েরা!’ তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীর মাঝে বিজয়ের উদ্দীপনা সৃষ্টির জন্য বললেন। “বিজয় তোমাদেরই হবে। তোমরা দুশমনের মাঝে ত্রাস সৃষ্টি করতে পেরেছ। আর এটা ভুলে যেয়ো না যে, হাজার হাজার গোথ সৈন্য তাদের জালিম বাদশাহর হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য তোমাদের সাথে যোগ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলার নির্দেশ হল, কোন জনবসতির উপর যদি জুলুম-নির্যাতন করা হয় এবং তাদেরকে সাহায্য করার কেউ না থাকে তাহলে তোমরা তাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে যাও। তোমরা তোমাদের এই গোথ বংশীয় ভাইদেরকে জালিম বাদশাহর হাত থেকে মুক্ত করার জন্য নিজেদের জীবন বিলিয়ে দাও।

    ‘আমরা জীবনবাজি রেখে তাদের জন্য যুদ্ধ করব, আমরা তাদের জন্য আমাদের জীবন উৎসর্গ করে দেব।’ বার্বার সিপাহীরা এক সাথে চিৎকার করে বলে উঠল।

    ***

    রডারিক হামলা করার নির্দেশ দেওয়ামাত্র তার অশ্বারোহী সৈন্যরা উন্মাদের ন্যায় ছুটে এলো। তারিক বিন যিয়াদ তার অশ্বারোহী বাহিনীকে সামনের কাতারে রেখেছিলেন। যখন দুশমনের অশ্বারোহী দল কাছাকাছি চলে এলো তখন হঠাৎ করে মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনী সামনে চল এলো। তারা অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে আন্দালুসিয়দের উপর তীর নিক্ষেপ করতে লাগল।

    বার্বার সৈন্যদের ধনুক ছিল খুবই মজবুত। এসব ধনুক হতে নিক্ষিপ্ত তীর খুবই দ্রুত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানত। এসব ধনুকের মাধ্যমে দূরপাল্লার লক্ষ্য বস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব ছিল।

    তীরের আঘাতে বেশ কয়েকজন আন্দালুসিয় অশ্বারোহী মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, কিন্তু তাদের ঘোড়া সমান গতিতে সামনের দিকে ধেয়ে আসতে লাগল। ঘোড়র গতি একটুও কমল না। তারা যখন একেবারে কাছে চলে এলো তখন তীরন্দাজ বাহিনী দ্রুতগতিতে অশ্বারোহী বাহিনীর পিছনে চলে গেল।

    মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনী পূর্ব হতেই তৈরী ছিল। উভয় বাহিনী প্রচণ্ড সংঘর্ষে লিপ্ত হল। উভয় বাহিনী যখন পুরোদমে যুদ্ধে লিপ্ত ঠিক তখনই তারিকের ইশারায় গোথ সৈন্যদল অতর্কিতে আন্দালুসিয়দের উপর হামলা করে বসল।

    রডারিক এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রণাঙ্গনের পরিস্থিতি লক্ষ্য করছিল। গোথ সৈন্যদল আক্রমণ করার সাথে সাথে সে আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। সে পদাতিক বাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ দিল।

    তারিক বিন যিয়াদ এবার তাঁর বিশেষ রণকৌশল প্রয়োগ করতে লাগলেন। তিনি গোথ সৈন্যদেরকে সামনাসামনি যুদ্ধ করতে বললেন, আর মুসলিম বাহিনীকে ডানে-বামে পাঠিয়ে দিলেন। একদিকে গেলেন মুগীস আর-রুমী, আর অপরদিকে গেলেন আবু জারু’আ তুরাইফ। তারা বহুদূর ঘুরে পূর্ব থেকে নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে পৌঁছলেন।

    রডারিক পূর্ণোদ্যমে আক্রমণের জন্য অগ্রসর হচ্ছিল। রডারিক বাহিনীর পিছনে ছিল গোয়াডিলেট নদী। রডারিকের চতুপার্শ্বে যে বাহিনী ছিল মুগীস আর-রুমী ও আবু জারু’আ তুরাইফ সে বাহিনীর উপর বীর বীক্রমে আক্রমণ করে বসলেন। তাঁরা এতটাই আচমকা হামলা করে বসলেন যে, আন্দালুসিয় সৈন্যরা পুরোপুরি ঘাবড়ে গেল। রডারিক নিজেও বুঝে উঠতে পারল না যে, কি হতে যাচ্ছে।

    রডারিকের বাহিনী নিজেদেরকে সামলে নিয়ে পাল্টা আক্রমণ করার পরিবর্তে ভীত-সন্ত্রস্ত মেষ পালের ন্যায় একজন আরেকজনের সাথে হুড়াহুড়ি শুরু করে দিল। যারা অস্ত্র সমর্পণ করল তারাই কেবল মুজাহিদদের হাত থেকে রেহাই পেল।

    উভয় সালার ডান ও বাম দিকের বাহিনীকে পরাজিত করে রডারিকের মূল বাহিনীর পিছন দিকে আক্রমণ করে বসল। গোথ সৈন্যরা এই বাহিনীর সাথেই সামনাসামনি লড়ায়ে লিপ্ত ছিল। পিছন দিকের এমন অতর্কিত হামলার জন্য রডারিক বাহিনী মোটেই প্রস্তুত ছিল না। আক্রমণ প্রতিহত করে পাল্টা আক্রমণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠল না। ফলে অসংখ্য আন্দালুসিয় সৈন্য বেঘোরে জীবন হারাল। যারা আত্মসমর্পণ করল তারাই শুধু বাঁচতে পারল।

    সমর বিশেষজ্ঞ ঐতিহাসিকদের মতে গোয়াডিলেটের যুদ্ধ বিশ্বের বড় বড় যুদ্ধসমূহের মাঝে একটি অন্যতম যুদ্ধ। এই যুদ্ধে যেমন বীরত্ব প্রদর্শিত হয়েছে তেমনিভাবে মুসলমানদের পক্ষ হতে এমনসব রণ-কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে, যা খুব কম যুদ্ধেই পরিলক্ষিত হয়।

    ভয়ঙ্কর এই যুদ্ধের ময়দানে এক ব্যক্তি উন্মুক্ত তলোয়ার নিয়ে কাউকে যেন তালাশ করে ফিরছিল। গৌরবর্ণের সে যুবক যুদ্ধ করছিল না। কাকে যেন খুঁজতে খুঁজতে সে গোয়াডিলেট নদীর তীরে এসে পৌঁছল। তারপর প্রমোদবালাদের কামরায়ও গেল, কিন্তু মনে হচ্ছিল, সে যাকে খোঁজ করছিল তাকে পাচ্ছিল না।

    এই যুবকই হল হেনরি, যে ফ্লোরিডার কাছে ওয়াদা করে এসেছিল যে, রডারিকের মস্তক কেটে এনে ফ্লোরিডার পদতলে রাখবে। হেনরি হন্তদন্ত হয়ে রডারিককে তালাশ করছিল।

    রডারিকের ঝাণ্ডা দেখা যাচ্ছিল না। অনেক্ষণ হয় সেই ঝাণ্ডা ভূপাতিত হয়েছে। আন্দালুসিয় সৈন্যদের হতোদ্যম হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হল, তাদের শাহীঝাণ্ডা ভূপাতিত হয়ে গিয়েছিল। যার অর্থ হল, বাদশাহ হয়তো নিহত হয়েছে, নয়তো গ্রেফতার হয়েছে।

    হেনরি নদীর তীরে রডারিকের সাদা ঘোড়া দেখতে পেল, কিন্তু রডারিককে দেখতে পেল না। ঘোড়র কাছেই একটি তলোয়ার পড়েছিল। তলোয়ারের হাতলে বহু মূল্যবান মণি-মুক্তা খচিত ছিল। এটা যে রডারিকের তলোয়ার তাতে কোন সন্দেহ ছিল না। আশ্চর্যের বিষয় হল, রডারিকের জুতাও তলোয়ারের কাছে পড়েছিল।

    হেনরি প্রমোদবালাদের তাঁবুতে প্রবেশ করল। সেখানে রডারিকের লালসার শিকার মেয়েরা জড়সড় হয়ে বসেছিল। হেনরি তাদেরকে ধমক দিয়ে রডারিকের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করল। তারা সকলেই জবাব দিল, তারা কেউ রডারিকের ব্যাপারে কিছুই জানে না।

    হেনরি দ্রুত তাঁবু থেকে বের হয়ে রডারিকের তলোয়ার ও জুতা উঠিয়ে তার ঘোড়ায় আরোহণ করল। তারপর দ্রুত বেগে ঘোড়া হাঁকিয়ে উচ্চস্বরে ঘোষণা করতে লাগল, ‘রডারিক নিহত হয়েছে, রডারিক নিহত হয়েছে।’

    ঘোষণা করতে করতে হেনরি তারিক বিন যিয়াদের নিকট পৌঁছে বর্ণনা করল, কীভাবে রডারিকের ঘোড়া, তলোয়ার ও জুতা তার হস্তগত হয়েছে।

    হেনরির ঘোষণার সাথে সাথে আট দিনের যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। লেনপোল লেখেন, এই আট দিনের যুদ্ধই মুসলমানদেরকে আন্দালুসিয়ার উপর আটশত বছর রাজত্ব করার ক্ষমতা প্রদান করেছিল। এরপরও মুসলমানদেরকে আরও কয়েকটা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে হয়েছিল, কিন্তু চূড়ান্ত যুদ্ধ হিসেবে ‘গোয়াডিলেটের যুদ্ধ’ই ইতিহাসে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হয়ে আছে।

    সকল ঐতিহাসিকই একমত হয়ে লেখেছেন যে, এই ঘটনার পর রডারিকের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। তার সফেদ ঘোড়া, মণি-মুক্তা খচিত তলোয়ার, আর জুতা গোয়ডিলেট নদীর তীরে পড়েছিল। কেউ কেউ বলেছেন, সে নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করেছে। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে সে পলানোর উদ্দেশ্যে নদী পাড়ি দিচ্ছিল, কিন্তু নদীর উত্তাল তরঙ্গরাশী তাকে অপর পাড়ে পৌঁছতে দেয়নি।

    অধিকাংশ ঐতিহাসিক এই বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আন্দালুসিয়ার খ্রিস্টানদের মাঝে পূর্ণমাত্রায় এ বিশ্বাস জন্ম নিয়েছিল যে, রডারিক নিহত হয়নি; বরং সে অতিসত্ত্বর ভিন্ন রূপে খ্রিস্টবাদের প্রচারক ও রক্ষক হিসেবে ফিরে আসবে। এ বিশ্বাস দীর্ঘদিন যাবৎ আন্দালুসিয়ার অধিবাসীদের মাঝে বদ্ধমূল ছিল।

    সে সময়ে রচিত যেসকল ঐতিহাসিক প্রমাণপঞ্জি পাওয়া যায় এবং যার অধিকাংশই জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে, তা থেকে আরেকটি নতুন বিষয় প্রতীয়মান হয়। তা হল, রডারিক নদীতে ডুবে মারা যায়নি; বরং সে নদী পার হয়ে একটি দ্বীপে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। সেই দ্বীপে বিষাক্ত সাপের আধিক্য ছিল। প্রতিদিন একটি করে বিষাক্ত সাপ রডারিককে দংশন করত। কিন্তু তা সত্ত্বেও রডারিক মৃত্যুবরণ করত না। আল্লাহ তাআলা রডারিককে তার পাপের শাস্তি স্বরূপ সুদীর্ঘ জীবন দিয়েছিলেন। প্রতিদিনই সাপ তাকে দংশন করত। অবশেষে সে যেদিন মারা যায়, সেদিন তার মৃত দেহ সাপের খাদ্যে পরিণত হয়। যেসকল ঐতিহাসিক এই তত্ত্ব লেখেছেন, তাদের সকলেই হলেন খ্রিস্টান।

    এই যুদ্ধে পঞ্চাশ হাজার আন্দালুসিয় সৈন্য নিহত হয়। এই বিপুল পরিমাণ সৈন্যের মাঝে নামকরা জেনারেল এবং আন্দালুসিয়ার ধনী ও বনেদি বংশের লোকেরাও ছিল। ত্রিশ হাজার সিপাহী এবং ছোট-বড় অসংখ্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। ঐতিহাসিক দলীল-প্রমাণে পাওয়া যায় যে, রডারিকের সৈন্যরা মুসলমানদেরকে বন্দী করে বেঁধে আনার জন্য বড় বড় রশি নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস এই যে, মুসলিম বাহিনী সেই রশি দ্বারাই রডারিকের। ত্রিশ হাজার সৈন্যকে বেঁধে তাদেরকে সাথে নিয়ে সামনে অগ্রসর হয়।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleপরাজিত অহংকার (অবিরাম লড়াই-২) – এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    Next Article ঈমানদীপ্ত দাস্তান – এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ

    Related Articles

    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ

    অপারেশন আলেপ্পো – এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ

    July 16, 2025
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ

    ঈমানদীপ্ত দাস্তান – এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ

    July 16, 2025
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ

    পরাজিত অহংকার (অবিরাম লড়াই-২) – এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ

    July 16, 2025
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ

    নাঙ্গা তলোয়ার – এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ

    July 16, 2025
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ

    দামেস্কের কারাগারে – এনায়েতুল্লাহ্ আলতামাশ

    July 16, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Our Picks

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }