আমাজনিয়া – ১০
পলায়ন
আগস্ট ১৪,
রাত ৩:১২
আমাজন জঙ্গল
পাহাড়-দ্বীপটির চূড়ায় অন্য সিভিলিয়ানদের সাথে রেঞ্জার-বৃত্তের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে নাথান। এটার সংখ্যা এখন কমে এসেছে আটজনে। এক সিভিলিয়ানের জন্য এক রেঞ্জার। নাথান ভাবল, অনেকটা নিজস্ব দেহরক্ষীর মত।
“আরও একটা নাপাম বোমা ব্যবহার করে হারামিগুলোকে উড়িয়ে দিয়ে পথ বের করে নিলে কেমন হয়?” জিজ্ঞেস করল ফ্রাঙ্ক। সে দাঁড়িয়ে আছে ওয়াক্সম্যানের কাছে। “শুধু একটা বোমা নিচে গড়িয়ে দিয়ে নিজেদেরকে একটু আড়াল করে নিলেই হয়ে গেল।”
“আমরা সবাই মরব এতে। যদি ওটার তাপে আমরা ভাঁজাভাঁজা না-ও হয়ে যাই তবুও আটকা পরতে হবে আমাদের জ্বলন্ত বন আর ঐ বিষাক্ত হারামিগুলোর মাঝে।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলল ফ্রাঙ্ক, তাকিয়ে আছে গভীর অন্ধকার জঙ্গলের দিকে। “তাহলে গ্রেনেড ব্যবহার করলে কেমন হয়? পর পর কয়েকটা ছুঁড়ে দিয়ে ওদেরকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দেই?” ওয়াক্সম্যান ভ্রু কুঁচকালো।
“আমাদের এত কাছাকাছি এরকম কিছু করাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হবে। তাছাড়া এমন কোন নিশ্চয়তা নেই যে, গাছ-পালার আড়ালে থাকা ঐ বানচোতগুলো সব বিস্ফোরণের চোটে মরে যাবে। তাই বলছি এই পাহাড়েই থাকি, চেষ্টা করি আগামীকাল সকাল পর্যন্ত অবস্থান করার।”
ফ্রাঙ্ক দু-হাত ভাঁজ করে বুকের কাছে রাখল । এই পরিকল্পনায় সন্তুষ্ট হতে পারছে না সে । ছোট পাহাড়টার উভয় পাশজুড়ে ফ্লেমথ্রোয়ারের শব্দ এবং সবেগে বেরিয়ে আসা আগুনের আলোয় রাতের নীরবতা আর অন্ধকার তিরোহিত হয়েছে। কর্পোরাল ওকামোটো এবং প্রাইভেট ক্যারেরা ফ্লেমথ্রোয়ার হাতে পাহাড়ের দুই ঢালে পাহারা দিচ্ছে। যদিও গত আধঘণ্টায় ঐ প্রাণীগুলোর একটাকেও দেখা যায় নি। ওরা অবশ্যই আশেপাশেই আছে এখন । চারপাশের বন মৃতের মতই শান্ত। বানরের ডাকও নেই, নেই পাখির গান। এমনকি পোকামাকড়েরাও যেন চুপ মেরে আছে। ওদিকে ফ্লাশ-লাইটের আলোক-সীমানার বাইরে ঘাপটি মেরে থাকা প্রাণীগুলো ঝোপ-ঝাড় থেকে বের হতেই শুকনো পাতার শব্দ শোনা গেল।
পানির দিকে তাক করা নাইট-ভিশনগুলো দিয়ে দেখা গেল ঐ প্রাণীগুলো জলধারা এবং তার আশেপাশের অঞ্চল দিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ আগে করা নাথানের অনুমাণই সঠিক বলে মনে হচ্ছে। ফুলকা দিয়ে শ্বাস নেয়া এই প্রাণীগুলো নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কম পরিমাণে হলেও পানিতে ফিরে যাবার দরকার আছে।
কাছেই পাতাঝরা নরম মাটিতে হাটু গেড়ে বসল ম্যানুয়েল। সে কাজ করছে ফ্লাশলাইটের আলোতে। কেলি এবং কাউয়ি তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ানোর সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বন থেকে আগুনে আহত একটি প্রাণী তুলে নিয়েছিল ম্যানুয়েল। যদিও আংশিক পুড়ে গেছে তবুও নমুনা হিসেবে যথেষ্ট ভাল অবস্থা আছে। প্রাণীটা লেজের প্রান্ত থেকে ধারালো দাঁতের মুখ পর্যন্ত একফুটের মত লম্বা। কালো আর বড় বড় চোখগুলো বাইরের দিকে প্রসারিত, যার সাহায্যে চারপাশে প্রায় তিনশ-ষাট ডিগ্রির কাছাকাছি পরিমাণ দৃশ্য দেখতে পায় ওটা। দৃঢ় অস্থিগুলো গিয়ে শেষ হয়েছে ওটার দেহের মতই দীর্ঘ মেরুদণ্ডে। পায়ের প্রতিটি আঙুলের মাঝে হাঁসের পায়ের মত সংযুক্তকারী চামড়া ।
সবাই তার কাজ দেখছে। ম্যানুয়েল খুব দ্রুত প্রাণীটার ব্যবচ্ছেদ করে ফেলল । ব্রাজিলিয়ান বায়োলজিস্ট দক্ষতার সাথে ছুরি আর চিমটা দিয়ে কাজ করছে। এগুলো সে নিয়েছে কেলির মেডিকেল ব্যাগ থেকে।
“এটা অবিশ্বাস্য,”অবশেষে বলল ম্যানুয়েল । বায়োলজিস্ট তার বিবরণ শুরু করতেই কেলি এবং কাউয়ির সাথে যোগ দিল নাথান ।“স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এটা জেনেটিক্যালি বিভিন্ন টিস্যু থেকে সৃষ্টি হয়েছে। বলা যায় একাধিক প্রজাতির সংকর।” ভেতরটা দেখাল সে। “পানির অন্যান্য প্রাণীর মত আঁশটে নেই, তবে শ্বসনক্রিয়া ব্যবস্থা আছে নিশ্চিত। ফুলকা আছে, কোন ফুসফুস নেই। আঙুলের সংযোগস্থলে চামড়ার যে ভাঁজ তা নির্দেশ করে উভচর প্রাণীকে । শরীরের রেখাগুলো দেখে অনেকটা ফোবোবোইট ট্রিডিট্যাটাস, মানে ডোরাকাটা বিষাক্ত ব্যাঙের মত। ব্যাঙের গোত্রের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে বিষাক্ত এটি।”
“তাহলে তুমি বলছ এটা ঐ ব্যাঙ থেকেই বিবর্তিত হয়েছে?” নাথান জিজ্ঞেস করল ।
“প্রথমে এমনটাই ভেবেছিলাম আমি। এটা দেখতে এমন ব্যাঙাচির মত লাগে যেটার ফুলকা থাকা অবস্থায়ই বৃদ্ধিটা থামিয়ে দেয়া হয়েছে, আর তখনই ওটার পেছনের পাগুলো গজিয়েছে । কিন্তু ব্যবচ্ছেদ করার পর বুঝলাম, ব্যাপারটা আমার অনুমানের মত নয়। আর সবচেয়ে যেটা চোখে পড়ার মত তা হল, এটার অসামঞ্জস্যপূর্ণ আকৃতি । এটির ওজন হবে পাঁচ পাউন্ডের মত। ওজনটা ভয়ঙ্কর রকমের বেশি, এমনকি সবচেয়ে বৃহদাকৃতির বিষাক্ত ব্যাঙের চেয়েও।” ব্যবচ্ছেদ করা প্রাণীটা উল্টিয়ে ওটার চোখ ও দাঁতগুলো দেখাল ম্যানুয়েল। “সেই সাথে এর মাথার খুলিটাও বেঢপ সাইজের। ব্যাঙের খুলির মত আনুভূমিকভাবে সমান না থেকে এটার খুলি উলম্বভাবে গঠিত, অনেকটা মাছের মত। আসলে, মাথার গঠন, চোয়াল আর দাঁতের আকার-আকৃতিতে আমাজনিয় নদীর পরভোজী সেরাস্যালমাস রমবেয়াস-এর সাথে অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ।” কাজ থামিয়ে মুখ তুলে তাকাল সে। “ব্ল্যাক পিরানহা।”
সোজা হয়ে দাঁড়াল কেলি। “এটা অসম্ভব।”
“এই জিনিসটা যদি আমার সামনে না থাকত আমিও আপনার সঙ্গে একমত হতাম।” সোজা হয়ে বলল ম্যানুয়েল, “সারাজীবন আমাজনের প্রাণীদের নিয়ে কাজ করেছি, এমন কোন কিছু কখনও দেখি নি। সত্যিকারের একটা কাইমিয়ারা এটা । একক একটি প্রাণী যা একই সাথে ব্যাঙ এবং মাছের জৈবিক বৈশিষ্টগুলো বহন করছে।”
প্রাণীটার উপরে চোখ বুলাল নাথান। “এটা কিভাবে হতে পারে?
মাথা ঝাঁকাল ম্যানুয়েল। “জানি না, তবে কিভাবে একজন মানুষের নতুন করে হাত গজাতে পারে? আমার মনে হয় এরকম কাইমিয়ারার উপস্থিতি এটাই নির্দেশ করছে যে, আমরা সঠিক পথেই আগাচ্ছি। কিছু একটা আছে এই জঙ্গলে, এমন কিছু যা তোমার বাবার দলটা আবিষ্কার করেছিল, এমন কিছু যেটা দৃঢ়ভাবে বিবর্তন করার ক্ষমতা আছে।”
প্রাণীটার দেহাবশেষের দিকে তাকাল নাথান।কি জিনিস হতে পারে সেটা?
একটা চিৎকার ভেসে এল প্রাইভেট ক্যারেরার। পাহাড়ের উত্তর-প্রান্তের ঢালুতে পাহারা দেবার দায়িত্বে পড়েছে তার। “ওগুলো আবারো আসতে শুরু করেছে!” সোজা হয়ে দাড়াল নাথান। মেয়ে রেঞ্জারটা যে-দিকে দাঁড়িয়ে আছে সে-দিকের বন থেকে ভেসে আসা মর্মর শব্দটা বাড়ছে ধীরে ধীরে। মনে হচ্ছে যেন পুরো জঙ্গলটাই যেনো ছুটে আসছে তাদের দিকে। ক্যারেরা নিচের দিকে আগুন ছুড়ল । তীব্র আলো অন্ধকারকে দূরে ঠেলে দিতেই শত শত ক্ষুদ্রাকৃতির প্রাণীর চোখে আগুনটা প্রতিফলিত হল । প্রাণীগুলো মাটিতে এবং গাছে সবখানেই ছেয়ে গেছে। এদের মধ্য থেকে একটা প্রাণী উঁচু পামগছের ডাল থেকে লাফিয়ে পড়ল আগুনের সীমানার ভেতরে। অটোমেটিক রাইফেল থেকে ভেসে এল একটি শব্দ। মুহূর্তেই রক্তাক্ত শরীরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।
“সবাই পেছনে সরে যান!” চিৎকার দিল ক্যারেরা “ওরা আসছে!”
গাছের উপর আর নিচে থেকে ছোটখাট প্রাণীগুলো লাফিয়ে লাপিয়ে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। আগুন বা গুলি কোনটাকেই পরোয়া করছে না ওরা। প্রাণীগুলো যেন ওদের বিশাল বাহিনী নিয়ে মানুষজনকে দাবড়ানি দিতে বদ্ধপরিকর।
নাথানের মনে পড়ে গেল ইন্ডিয়ানদের হত্যাযজ্ঞের কথা । ঐ ঘটনারই পুণরাবৃত্তি হচ্ছে যেন। সে দ্রুত শটগানট হাতে তুলে নিল, তা করেই গুলি চালিয়ে একটা প্রাণীকে ছিন্নভিন্ন করে দিল ওটা শূন্যে থাকা অবস্থায়। ওটা গাছের ডাল থেকে লাফিয়ে ক্যারেরার উপর পড়তে যাচ্ছিল। ছোটছোট মাংসের টুকরো ছড়িয়ে পড়ল মাটিতে। দলগতভাবে সবাই ওদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থামিয়ে পাহাড়চূড়া থেকে দক্ষিণে নেমে যেতে বাধ্য হল। ফ্লেমথ্রোয়ারের আগুন আর বন্দুকের গুলি ছোঁড়ার সময় সৃষ্ট অগ্নিস্ফুলিঙ্গ আলোকিত করে রাখল তাদের পথ। দৌড়ানোর ফলে ফ্লাশ-লাইটের আলোগুলো নাচছে, ছায়াগুলো ছোটবড় হচ্ছে আলোর ঝাকুনিতে।
পাহাড়ের দক্ষিণ দিকের দায়িত্বে থাকা কর্পোরাল ওকামোটো দলের বাকিদের তার দিকে আসতে দেখে ফ্লেমথ্রোয়ারারের আগুন নিক্ষেপ করল তাদের দিকে। “এদিকটা এখনো ক্লিয়ার!” চিৎকার দিয়ে বলল সে। নাথান ঝুঁকি নিয়ে তার রাস্তার দিক একটু তাকাল। বনের মাঝ দিয়ে জলধারা দুটোর মিলনস্থলটি দেখতে পেল সে। ওটা ভাগ হওয়ার পর একটা ধারা পাহাড়ের দক্ষিণ পাদদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
“পাহাড়ের এপাশটায় কোন প্রাণী নেই কেন?” আনা ফঙ জিজ্ঞেস করল। তার মুখমণ্ডল লাল হয়ে আছে স্নায়ুচাপে।
রিচার্ড জেন সতর্কভাবে নিজের পেছন দিকে চোখ রেখে উত্তর দিল, “তারা সম্ভবত চূড়ান্ত আক্রমণের জন্য সবাই একপাশে জড় হয়েছে।” নিচের পানি ধারাটার দিকে তাকাল নাথান । ওটা বেশ চওড়া, বাকহীন আর শান্তু কিন্তু আসল ব্যাপারটা সে ভালই জানে। বড় কাঠবিড়ালিটার কথা মনে পড়ে গেল তার। ওটা জঙ্গল থেকে ছুটে এসেই নদীপাড় ধরে দৌড়ানো শুরু করেছিল, আর সেখানেই পরভোজীরা আক্রমণ করেছিল ওটাকে।।
“তারা আমাদের গবাদিপশুর মত চরাচ্ছে, বিড়বিড় করে বলল সে।
“কি?” বুঝতে না পেরে বলল কেলি।
“তারা আমাদেরকে পানির কাছাকাছি নিতে চায়। তাই আমদেরকে ধাওয়া করে নদীর দিকে নিয়ে যাচ্ছে।”
ম্যানুয়েলের কানে গেল নাথানের কথাটা। “আমার মনে হয়, ও ঠিকই বলছে। স্বল্প দূরত্বে ডাঙ্গায় ওদের চলাচল করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও, ওরা মূলত জলজপ্রাণী, নিজেদের শিকারকে ধরাশায়ী করার আগে ওরা চাইবে সেটাকে পানির যত কাছা কাছি আনা যায়।”
কেলি পেছনে ফিরে দেখল একসারি রেঞ্জার আগুন জ্বালিয়ে পেছনে ছুড়ে দিতে দিতে সামনে এগোচ্ছে। এখন আমাদের কি করার আছে?”
সবার সামনে ওকামোটা নদীটার কাছে পৌছতেই গতি থামিয়ে দিল, চোখে-মুখে পানির ভয় ফুটে উঠেছে তারও। কর্পোরাল তার পেছনে দাঁড়ানো ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানের দিকে ঘুরল। “স্যার, আমি প্রথম পার হওয়ার চেষ্টা করি। শেষবার যেমনটি করেছিলাম।”
মাথা নেড়ে সায় দিল ওয়াক্সম্যান। “সাবধানে, কর্পোরাল।”
ওকামোটো পানির দিকে পা বাড়াতেই নাথান চিৎকার দিয়ে উঠল, “না। আমি নিশ্চিত ওটা একটা ফাঁদ।”
ওকামোটো একবার তার দিকে আরেকবার ক্যাপ্টেনের দিকে তাকাল। সিদ্ধান্তে অটল ক্যাপ্টেন হাত নেড়ে এগিয়ে যেতে বলল তাকে। “এই জায়গা থেকে সরে যেতে হবে আমাদের।”
“দাঁড়ান, সামনে এগিয়ে এসে বলল ম্যানুয়েল, কণ্ঠে তার বেদনার ছাপ। “তার বদলে আমি বরং টরটরকে পাঠাই।”
সবাই জড়ো হয়ে গেল একজায়গায়। জাগুয়ারটার দিকে তাকাল ওয়াক্সম্যান, তারপর মাথা নেড়ে সায় দিল। “তাহলে তাই করুন।
ম্যানুয়েল জাগুয়ারকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল অন্ধকারাচ্ছন্ন কালো পানির দিকে। নাথানের মনোযোগ ঘুরে গেল দ্রুত। ঐ পানিতে নামা মানে আত্মহত্যা করা। কালকের সূর্যদয়ের ব্যাপারে যতটা নিশ্চিত সে ঠিক ততটাই নিশ্চিত আগামীকালের সূর্যদয়ের ব্যাপারে, কিন্তু ওয়াক্সম্যানের কথাও ঠিক। একটা পথ তাদেরকে খুঁজতে হবে পানির অপরপ্রান্তে গিয়ে। তার মাথার ভেতর বিভিন্ন ঘটনা ঘুরপাক খেতে লাগল। দড়ির কোন ব্রিজ করা যায় পানির উপর দিয়ে দ্রুত চিন্তা করল সে। এমনকি যদি তারা কোনভাবে একটা ব্রিজ তৈরিও করে, জলজ প্রাণীগুলোর প্রচণ্ড লাফানোর ক্ষমতা থাকায় তা কাজে আসবে না। একসাথে একসারিতে বড় একটি টোপে পরিণত হবে তারা সবাই। হয়তো পানিতে গ্রেনেড ছোড়া যেতে পারে ওদের থামাতে কিন্তু পানি ধারাটা বেশ দীর্ঘ। বিস্ফোরণের কারণে যতগুলোই মরুক না কেন অন্যদিক থেকে আরও প্রাণী এসে সেজায়গা পূরণ করে আক্রমণ চালাবে । না, এমন কিছু দরকার যেটা সমগ্রপ্রাণী-দলটাকেই আটকে রাখবে, কিন্তু কি হতে পারে সেটা? ঠিক তখনই জিনিসটা তার মনে উদয় হল । সে যা খুঁজছে তার প্রয়োগ হতে দেখেছে মাত্র কয়েক দিন আগে। এরইমধ্যে ম্যানুয়েল এবং টর-টর পানির খুব কাছে পৌছে গেছে, মাত্র কয়েক মিটার দূরে তারা এখন। তাদের সাথে আছে ওকামোটো, আগুন জ্বালিয়ে পথ দেখাচ্ছে সে।
“দাঁড়াও,” চিৎকার দিল নাথান, “একটা বুদ্ধি পেয়েছি আমি।” থামল ম্যানুয়েল।
“কি বুদ্ধি?” জানতে চাইল ওয়াক্সম্যান। “ম্যানুয়েলের কথামতে এই প্রাণীগুলো মূলত মাছ, তাই তো?”
নখান ক্যাপ্টেনের ক্ষুব্ধ অভিব্যক্তি উপেক্ষা করে কাউয়ির দিকে ফিরল । “তোমার মেডিসিন ব্যাগের ভেতর আয়াইয়া লতার গুঁড়ো আছে না?”
“অবশ্যই, কি-” তখনই ব্যাপারটা বুঝতে পেরে চোখ দুটো গোল হয়ে গেল প্রফেসরের। “অসাধারণ, নাথান। এটা অনেক আগেই আমার বোঝা উচিত ছিল।”
“কি জিনিস?” ওয়াক্সম্যান জিজ্ঞেস করল, তার কণ্ঠে হতাশা।
তাদের পেছনে, উঁচু পাহাড়ি ঢলে রেঞ্জারদের সারিবাধা দলটি প্রাণীগুলোকে সাময়িক সময়ের জন্য কোণঠাসা করে রেখেছে রাইফেল আর আগুন দিয়ে। আর সবচেয়ে নিচে নদীর কাছে দাঁড়িয়ে আছে ওকামোটা।
দ্রুত ব্যাখ্যা করল নাথান। “ইন্ডিয়ান আয়াইয়া আঙ্গুরের ভাঁ ব্যবহার করে মাছ ধরতে।” তার মনে পড়ে গেল সেই মুহূর্তের কথা যখন টামা ওতকাহোকে নিয়ে ডিঙ্গিতে করে সাও-গ্যাব্রিয়েলে যাবার সময় মাছ ধরার একটি দৃশ্য দেখেছিল । এক মহিলা নদীর পানিতে কালো রঙের পাউডার মিশিয়ে দিচ্ছে আর পুরুষগুলো কিছুটা দূরে থেকে স্রোতের বিপরীতে দাড়িয়ে পাউডারের প্রভাবে স্থির হয়ে আসাঁ মাছগুলোকে বর্শী অথবা জাল দিয়ে শিকার করছে। “এই আঙ্গুরের গুঁড়োর ভেতরে আছে বিষাক্ত ক্রিস্টালাইন যেটা আক্ষরিক অর্থেই মাছগুলোকে অচেতন করে বা শাস রোধ করে মেরে ফেলে। এর প্রভাবটা পড়ে প্রায় সাথে সাথেই।”
“এখন আপনি কি করতে চাচ্ছেন? ওয়াক্সম্যান জিজ্ঞেস করল । “এই জিনিসটার সাথে আমি বেশ পরিচিত। পাউডারের ব্যাগটা নিয়ে আমি স্রোতের বিপরীত দিকে গিয়ে ওগুলো মিশিয়ে দেব পানিতে । বিষাক্ত ক্রিস্টালাইন যখন পানিতে মিশে গিয়ে স্রোতের সাথে প্রবাহিত হবে নদীর যেকোন ধরনের প্রাণী অচেতন হয়ে পড়বে ওটার প্রভাবে।”
চোখ দুটো সংকুচিত করল ওয়াক্সম্যান। “এই পাউডারে কাজ হবে?”
ব্যাগের ভেতর হাত চালিয়ে উত্তর দিল কাউয়ি, “অবশ্যই হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত ফুলকা দিয়ে শ্বাস নেয়া প্রাণীরা থাকবে। প্রফেসর ম্যানুয়েলের দিকে তাকাল এবার।
মাথা নেড়ে সায় দিল বায়োলজিস্ট। তার চোখেমুখে পরিত্রাণের স্পষ্ট অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। “আমি নিশ্চিত, এটা দারুণ কাজ করবে।”
হাফ ছেড়ে বাঁচল যেন ওয়াক্সম্যান। হাত নেড়ে ওকামোটো এবং ম্যানুয়েলকে নদী থেকে সরে আসতে বলল সে। তারপর নাথানের দিকে ঘুরতেই তীব্র এক বিস্ফোরণের শব্দ হল তাদের পেছনে। মাটি, পাতা আর বেশ কিছু ডাল-পালা উড়ে গেল বাতাসে। কেউ একজন গ্রেনেড ফাটিয়েছে।
‘ওরা ঢুকে পড়ছে!” চিৎকার দিল সার্জেন্ট কসটস।
ওয়াক্সম্যান ইশারা করল নাথানকে, “তাড়াতাড়ি যান!”
ঘুড়ে দাঁড়াল নাথান। প্রফেসর কাউয়ি চামড়ার একটা বড় ব্যাগ ছুড়ে দিল নাথানের দিকে। “সাবধানে থেকো।”
একহাত দিয়ে পাউডারের ব্যাগটা ধরে অপর হাতে শাটগানটা নিল নাথান। “ক্যারেরা!” নাথানকে দেখিয়ে ওয়াক্সম্যান চিঙ্কার দিয়ে বলল, “তাকে ব্যাক-আপ দাও।”
“ইয়েস, স্যার, প্রাইভেট তার জায়গা ওকামোটাকে ছেড়ে দিয়ে ফ্লেমথ্রোয়ারসহ ঢাল থেকে নিচে নেমে এল ।
“যখন দেখবেন মাছ ভেসে উঠতে শুরু করেছে,” নাথান বলতে লাগল সবার উদ্দেশে, “দ্রুত ঐ পাড়ে চলে যাবেন। এখানকার পানি শ্রোতটা যেহেতু বেশি নয় তাই নিশ্চিত করে বলতে পারছি না পাউডার কতটুকু ছড়াবে কিংবা এর কার্য ক্ষমতা কতক্ষণ সক্রিয় থাকবে।”
“কখন আমাদের যাত্রা করতে হবে সেটা আমি জানাবো সবাইকে,” বলল কাউয়ি ।
নাথান দলের সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। কেলির চোখে চোখ পড়তেই দেখল একটা হাত দিয়ে নিজের গলাটা ধরে আছে মেয়েটি। আত্মবিশ্বাসেভরা ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল নাথান । সে এবং প্রাইভেট ক্যারেরা একসাথে স্রোতের উল্টোদিক বরাবর ছুটে চলল। পানির দিকে সজাগ দৃষ্টি দুজনেরই। নাথান ছুটছে রেঞ্জারটার পেছনে। সে নিরবিচ্ছিভাবে আগুন ছুড়ে রাস্তা তৈরি করে দিচ্ছে। কুয়াশার মত জেঁকে বসা লতা-পাতা, ঝোঁপ-ঝাড় ধংস করে এগিয়ে চলছে তারা। পেছনে তাকাল নাথান। তার দলের অন্যেরা বনের মাঝে ধংস হওয়া ছোট্ট একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
“হারামিগুলো অবশ্যই জেনে গেছে খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে, কষ্ট করে দম ছেড়ে ক্যারেরা বলল। মুক্ত হাতটা দিয়ে পানির ধারাটা দেখাল। নাথান দেখল, পানিতে কয়েক জায়গায় ছলাৎ করে শব্দ হচ্ছে, কিছু প্রাণী লাফিয়ে ডাঙ্গার দিকে দৌড়াচ্ছে দ্রুতবেগে।
আরও জোরে চলুন,” তাড়া দিল নাথান। “গন্তব্যটা আর বেশি দূরে নয়।” ছুটে চলল তারা, সাথে ছুটছে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ আর ঝোপ-ঝাঁড় ধংস হওয়ার শব্দ। অবশেষে সে-জায়গায় পৌছাল তারা যেখানে মূল ধারাটা বিভক্ত হয়ে পাহাড়ের উত্তর ও দক্ষিণ পাশ দিয়ে বৃত্তাকার পথে প্রবাহিত হয়েছে। এখানকার মূল চ্যানেলটা বেশ সরু এবং স্রোতময় । পাথরের উপর দিয়ে শব্দ করে প্রবাহিত হচ্ছে জলধারা, চারদিকে অনেক ফেনা। আরও কিছু প্রাণী লাফিয়ে উঠল ডাঙ্গায়, ভেঁজা শরীরগুলো চকচক করে উঠল আগুনের ঝলকে। ক্যারেরা মাটিতে খানিকটা জায়গাজুড়ে আগুন ছুড়লে নাথান এগিয়ে এল তার দিকে উঠে আসা প্রাণীগুলো কিছু পুড়ে মিশে গেল কাদার সাথে, কিছু পালিয়ে গেল পানিতে।
“এখনই করতে হবে, নইলে করা যাবে না,” বলল ক্যারেরা।
শটগানটা কাঁধে ঝুলিয়ে সামনে দিয়ে এগিয়ে গেল নাথান, হতে পাউডারের ব্যাগ। দ্রুত ব্যাগের মুখ খুলে ফেলল সে।
“পুরো জিনিসটা ছুড়ে ফেলে দিল,” রেঞ্জার পরামর্শ দিল ।
“না, আমাকে নিশ্চিত হতে হবে এটা সবজায়গায় ভাল করে ছড়িয়ে পড়েছে কিনা।” নাথান আরো এক পা এগিয়ে গেল নদীর কাছে। “সাবধানে!” তাকে অনুসরণ কল ক্যারেরা, চারদিকে আগুন ছড়াচ্ছে সে প্রাণীগুলোকে দূরে রাখতে । জলধারা থেকে মাত্র একফুট দূরে নাথান! ক্যারেরা হাটু গেড়ে পানিতে আগুন ছুঁড়ল। যে-ই পানি থেকে জেগে ওঠার দুঃসাহস দেখবে সে-ই পুড়ে মরবে। “তাড়াতাড়ি করুন!”
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে পানির দিকে ঝুঁকে গেল নাথান। একটা হাত প্রসারিত করা, সেই হাতে ধরে রেখেছে ব্যাগটা। শিকারের মত কিছুকে পানির খুব কাছে পেয়ে আকৃষ্ট হল একটা প্রাণী । খিপ্রগতিতে ওটা লাফিয়ে উঠল শূন্যে। ওটার কামড়ের হাত থেকে বাঁচাতে ঠিক সময়ে হাত ঝাড়া দিল নাথান। প্রাণীটা হাতের পরিবর্তে ধারাল দাঁতে কামড় বসাল শার্টের আস্তিনে । ঝুলে থাকল সেখানে। হাতটা পেছন দিকে ঝুঁকি দিল মাখান, আস্তিনের কাপড়ের কিছু অংশ ছিড়ে একটু দূরে ছিটকে পড়ল প্রাণীটা।
“শালা!” আর দেরি না করে নাখান দ্রুত আইয়াইয়া আঙ্গুরের গুড়োটুকু ঢালতে লাগল পানিতে ধীরে ধীরে ছিটিয়ে দিল সবদিকে, নিশ্চিত হতে চাইছে ঠিকমত ছড়িয়ে পড়ছে কিনা। তার পেছনে ক্যারেরা ব্যস্ত আছে তাদের পেছন দিকটার নিরাপত্তা নিয়ে। পানির সব দিক থেকে প্রাণীগুলো ছুটে আসছে এখন তাদের দিকেই।
নাথান ব্যাগ থেকে শেষ পাউডারটুকু ঝেড়ে ফেলে ব্যাগটা ছুড়ে দিল পানিতে। ব্যাগটা স্রোতে ভেসে যেতে দেখে মনে মনে প্রার্থনা করল যেন তার পরিকল্পনায় কাজ হয়। “শেষ!” ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল নাথান।
ক্যারেরা মুখ তুলে তাকাল। নাথান দেখল মেয়েটির পেছনে বেশ কিছু প্রাণী গভীর জঙ্গলের গাছ-পালা থেকে লাফিয়ে আসছে। একটা সমস্যা হয়ে গেছে,” রেঞ্জারটা বলল ।
“কি?”
ফ্লেমথ্রোয়ার উচু করে ধরে জঙ্গলের দিকে আগুন ছড়লে নাথান দেখল আগুনের শিখা ছোট আর নিস্তেজ হতে হতে অস্ত্রের নলটার ভেতর ঢুকে গেল।
“জ্বালানি শেষ,” মেয়েটা বলল।
ফ্রাঙ্ক ওব্রেইন দাঁড়িয়ে আছে তার যমজ বোনের পাশে, পাহারা দিচ্ছে তাকে। মঝেমাঝে সে নিশ্চিতভাবেই তার বোনের মাথায় ঢুকে যেতে পারে, পড়ে নিতে পারে সে কি চিন্তা করছে। ঠিক এখন যেমন কেলি তাকিয়ে আছে নদীর দিকে, দেখছে কাউয়ি এবং ম্যানুয়েলকে, ওরা পরীক্ষা করছে নাথান রান্ডের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজটা হচ্ছে কিনা। কিন্তু ফ্রাঙ্কের চোখে ঠিকই ধরা পড়ল কিভাবে তার বোন আড়চোখে জঙ্গলের দিকে উঁকি দিচ্ছে বার বার। তার মনোযোগ নিবন্ধিত সেই পথের দিকে যেখান দিয়ে হেটে গেছে এথনো-বোটানিস্ট আর মেয়ে রেঞ্জারটি। তার চোখে আবেগের দিপ্তীটাও ফ্রাঙ্ক টের পেল।
হঠাৎ একটা বিস্ফোরণ তার মনোযোগ সাময়িকভাবে দূরে নিয়ে গেল । আরেকটা গ্রেনেড। বনের একাংশ ছিন্ন ভিন্ন হয়ে জ্বলতে লাগল বৃষ্টির মত। গোলাগুলি চলছে এখন প্রায় বিরতিহীনভাবে, তাদের চারপাশ জুড়ে । রেঞ্জারদের সারিটা পিছু হটে সিভিলিয়ানদের দিকে যেতে বাধ্য হচ্ছে । শীঘ্রই তাদের সবারই আর কোন উপায় থাকবে না নদীর দিকে পিছিয়ে যাওয়া ছাড়া, পানির খুব কাছে যেখানে ওৎ পেতে আছে বিষাক্ত প্রাণীগুলো। কাছেই আনা ফঙ দাঁড়িয়ে আছে রিচার্ড জেনের সাথে, তাদের গার্ড দিচ্ছে অলিন পাস্তানায়েক, যার হাতে একটা নয় মিলিমিটার বেরেটা পিস্তল। অস্ত্রটা খুবই ছোট আর ক্ষিপ্রগতির টার্গেটের বিরুদ্ধে বেশ দূর্বল কিন্তু একেবারে নিরস্ত্র থাকার চেয়ে এটা অনেক ভাল । তার পেছনে ম্যানুয়েলের জাগুয়ারের একটা গর্জন ভেসে এল ।
“ওদিকে দেখুন।”
ঘুরে দাঁড়াল ফ্রাঙ্ক । তার বোন ফ্লাশ-লাইটের আলো পানিতে ফেলে দাঁড়ি, আছে । সেই আলোতে সে-ও দেখতে পেল দৃশ্যটা । চকচকে কিছু বস্তু ডুব-সঁতার কাটতে শুরু করেছে, কিছু ভেসে যাচ্ছে স্রোতে।
“নাথান পেরেছে।” হাসি হাসি মুখে কেলি বলল। ” প্রফেসর কাউয়ি তার কাছে এগিয়ে গেল। একটা পিরানহা পানি থেকে লাফ দিল তাদের দিকে কিন্তু বেশিদূর লাফাতে পারল না, মুখ থুবড়ে পড়ল কাদায়। কয়েক সেকেন্ড দাপাদাপি করে শান্ত হয়ে গেল ওটা। কাউয়ি তাকাল ফ্রাঙ্কের দিকে । “এই সুযোগটা হারানো উচিত হবে না, এখনই পার হতে হবে আমাদের।”
ফ্রাঙ্ক ঘুরে দাঁড়াল সামান্য দূরে ঢালুতে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানের দিকে। সে খুব জোরে হাঁকিয়ে উঠল যেন গোলাগুলির শব্দ ছাপিয়ে তার কষ্ট ওয়াক্সম্যানের কাছে পৌছায়।
ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান! রান্ডের পরিকল্পনায় কাজ হয়েছে,” একটা হাত আন্দোলিত করল সে। “আমরা পার হতে পারি এখন।”
ওয়াক্সম্যান সম্মতি দিল মাথা নেড়ে, তারপর গর্জে উঠল তার কণ্ঠ । “শাবাশ ইউনিট। এইধার দিয়ে নদীর দিকে যাও!”
ফ্রাঙ্ক তার মাথার লাকি বেসবল ক্যাপটা স্পর্শ করে কেলির কাছে এল । “চল!” ।
ম্যানুয়েল দ্রুত তাদেরকে অতিক্রম করল। “টর-টর আর আমি সবার আগে যাব । আমার বিশ্লেষনের উপর ভিত্তি করেই এই পরিকল্পনাটা করা হয়েছে।” সে কারোর উত্তরের জন্য অপেক্ষা করল না। পোষা প্রাণীটা সঙ্গে নিয়ে পানিতে নেমে গেল। ম্যানুয়েলের বুক অবধি পানিতে ডুবে গেলেও টরটরকে সাঁতরাতে হল। খুব তাড়াতাড়িই অপরপ্রান্তে পৌছে গেল বায়োলজিস্ট, তারপর ঘুরল সবার দিকে।“তাড়াতাড়ি! এখন এটা নিরাপদ আছে?”
“চল সবাই!” আদেশ দিল ওয়াক্সম্যান। “সবার আগে যাবে সিভিলিয়ানরা।”
ফ্রাঙ্কের হাত ধরে আছে কেলি। এরইমধ্যে শতশত প্রাণী পানিতে ভেসে উঠতে শুরু করে দিয়েছে। ওরা সবাই প্রাণীগুলোকে উপেক্ষা করে পানিতে নেমে গেল । ভীত হলেও সতর্কতার সাথে ভেসে থাকা ধাঁরালো দাঁতের জীবগুলোকে সরিয়ে দিতে হচ্ছে হাত দিয়ে। দম আটকে রাখল ফ্রাঙ্ক, প্রার্থনা করল যেন ওগুলো আরও কিছুক্ষণ নিস্তেজ হয়ে থাকে।
অবশেষে তারা পানি থেকে উঠে বেশ খানিকটা দূরে যেতে সক্ষম হল। সবাই আতঙ্কে আচ্ছন্ন হয়ে আছে এখনও। এবার যাত্রা শুরু করল রেঞ্জাররা, একসঙ্গে পার হচ্ছে তারা দ্রুত গতিতে, আশেপাশে কি ভাসছে সে-দিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই কারোর । যখনই তারা অপর প্রান্তের মাটিতে পা রাখল ওপারের চারপাশের জঙ্গল থেকে ছুটে আসা প্রাণীগুলোও পৌছে গেল পানির কাছে। কয়েকটা পিরানহা পানির একেবারে কাছে এসে স্থির হয়ে থাকল । তাদের ফুলকাগুলো কাঁপছে শব্দ করে। ওরা নিশ্চিত বিপদটা বুঝতে পারছে কিন্তু কোন বিকল্প পথ নেই ওদের জন্যে । ডাঙ্গায় থাকলে দম আটকে মারা যাবে। নিজেদের মধ্যে নিশ্চুপ কোন সংকেত আদান প্রদান হল যেন, তারপরই সেই বিবর্তিত পিরানহাগুলো ঝাপ দিল পানিতে।
“পেছনে সরে যাও!” আদেশ দিল ওয়াক্সম্যান। “পানিটা যে এখনও বিষাক্ত আছে সে-ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত হতে পারি না।”
দলটা পানি থেকে বেশ একটু দূরে উঁচু জঙ্গলে ঢুকে গেল। ফ্লাশ-লাইট এখনও তাক করা পানি এবং পাড়ের দিকে। কিন্তু কয়েক মিনিট পরই বোঝা গেল, দৌড়টা আসলেই থেমে গেছে অথবা প্রাণীগুলো কোন কারণে ধাওয়া করা থামিয়ে দিয়েছে।
হাফ ছাড়ল ফ্রাঙ্ক। “বিপদ কেটে গেছে।”
কেলি এখনও নদীর অপর পাড়ে আলো ফেলছে, কিছু একটা খুঁজছে পানির আশেপাশে। প্রাইভেট ক্যারেরা কোথায়?” ফিসফিসিয়ে বলল সে, তারপর ঘুরল ফ্রাঙ্কের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে একটা বিস্ফোরণের শব্দ হল, প্রকম্পিত হল সমগ্র বন। চোখ দুটো প্রসারিত হল কেলির, ফ্রাঙ্কের দিকে তাকাল সে। “ওরা বিপদে পড়েছে!”
নাথান শটগানটা উঁচু করে আরেকটা ছুটে আসা প্রাণীকে উড়িয়ে দিল । ক্যারেরা তার ফ্লেইমথ্রোয়ার থেকে ফুয়েল ক্যানিস্টারটা খুলে সেটার উপর ঝুঁকে কিছু একটা করছে।
“আর কতক্ষণ?” জিজ্ঞেস করল নাথান, চারদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে সে । “প্রায় শেষ।” ।
পেছনে পানির দিকে তাকাল নাথান। ক্যারেরার ফ্ল্যাশ-লাইটের আলোতে দেখল পানিতে ঢালা পয়জন কাজ করছে। নদীতে অসংখ্যা প্রাণী ভেসে উঠছে আর সেগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে স্রোত । তাদের ঠিক পেছনের পানিতে কোন প্রাণী ভাসছে না, আর সে-কারণেই ভরসা পাচ্ছে না তারা। যে পয়জন ঢালা হয়েছে তা স্রোতের সাথে দ্রুতগতিতে ভেসে যাচ্ছে দূরে। তাদের জন্য জায়গাটা মোটেও নিরাপদ নয় এখন। এখনই নদী ধরে উল্টোপথে ছোটা দরকার। পার হবার জন্য দ্রুত একটা নিরাপদ জায়গা খোঁজা দরকার, যেখানে স্রোত তুলনামূলক অনেক কম কিন্তু পয়জনটা এখনও সক্রিয় আছে। কিন্তু সে-রকম নিরাপদ স্থান ও তাদের মাঝে পথটা রোধ করে বিছিয়ে আছে একঝাঁক ভয়ালদর্শণ প্রাণী।
“প্রস্তুত, উঠে দাড়িয়ে বলল ক্যারেরা।
সে হাতের জিনিসটা মাটি দিয়ে খানিকটা টেনে এনে ক্যানিস্টারের মুখ শক্ত করে আটকালো। একটা সলতে বের হয়ে আছে ওটার মুখ থেকে। ট্যাঙ্কের ভেতরে সামান্য একটু তেল আছে, এটুকু দিয়ে অস্ত্রের মুখ থেকে আগুন বের করানো যাবে না কিন্তু ওদের অন্যরকম প্রয়োজনটা ঠিকই মেটাবে। নাথান অন্তত তাই আশা করল । শটগানটা শক্ত করে ধরে এদিক-ওদিক দেখে নিল সে। “তুমি নিশ্চিত, এটা কাজ করবে?
“করা তো উচিত।” তার কণ্ঠে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের ছাপ পেল না নাথান।
“ঐ টার্গেটটাকে পয়েন্ট করুন,” তার পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলল ক্যারেরা।
নাথান শটগানটার নল ধূসর রঙের বাকলের একটা গাছের দিকে তাক করল, তার থেকে ওটা প্রায় পঁচিশ মিটার দূরে স্রোতের কাছে দাঁড়িয়ে আছে ওটা।
“ঠিক আছে,” ক্যারেরা তার লাইটারটা দিয়ে সলতের একমাথায় আগুন জ্বালিয়ে দিল। “রেডি?” সে দ্রুত তার হাতটা পেছন দিকে নিয়ে শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে ক্যানিস্টারটা ছুড়ে দিল সামনের দিকে।
নাথানের দম আটকে এল । ক্যানিস্টারটা গিয়ে পড়ল টার্গেট করা গাছের গোড়ায়। ক্যারেরা চাপাস্বরে বলল, “শুয়ে পড়ুন!”
দু-জনেই ঝাঁপ দিল মাটিতে। নাথান তার শটগান এখনও সামনের দিকে তাক করে রেখেছে। তার কপাল ভাল যথেষ্ট সজাগ আছে সে। পাশের ঝোপ থেকে একটা পিরানহা লাফ দিয়ে পড়ল তার সামনে, ঠিক তার নাক থেকে ইঞ্চিখানেক দূরে। নাথান দেরি না করে শটগানের নল ধরে বাট দিয়ে প্রাণীটাকে সজোরে আঘাত করল। পেটের উপর ভর দিয়ে রেঞ্জারের দিকে ঘুরল এবার। “ভার্সিটিতে বেসবলটা ভালই খেলতাম,” ফিসফিসিয়ে বলল সে। “বিশেষ করে ফাইনাল ইয়ারে।”
“নিচু হোন!” ক্যারেরা তার মাথা ছোঁয়ালো মাটিতে।
একটা কানফাঁটা বিস্ফোরণ হল সঙ্গে সঙ্গে। ধাতব টুকরোগুলো মাথার উপরের ডালপালা ভেদ করে চলে গেল। পেছনে তাকাল নাথান। ক্যারেরার কৌশল সন্দেহাতীতভাবেই সফল হয়েছে। তার ফ্রেমথোয়ারের প্রায় খালি হয়ে যাওয়া জ্বালানি ট্যাঙ্কটাকে সে রুপান্তর করেছে মলোটোভ ককটেলে। আগুনের শিখায় কয়েক মুহূর্তের জন্যে অন্ধকার কেটে গেল। হাটুর উপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল ক্যারেরা।
“ওটা কি?” এবার ক্যারেরাকে ধরে নিচু করে দিল নাথান ।
দ্বিতীয় বিস্ফোরণটা হল বজ্রপাতের মত । কাঠের ছোট-বড় টুকরো ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। জঙ্গলের একটা অংশ ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেল। বৃষ্টির মত আগুনের ফুলকি পড়ল তাদের উপরে। “উফ!” বলে উঠল ক্যারেরা। তার জামার আস্তিনে আগুন লেগে গেছে। সে হাতটা মাটিতে চেপে ধরে আগুন নিভিয়ে দিল।
উঠে দাঁড়াল নাথান, পরিকল্পনামত কাজ হয়েছে দেখে খুব সম্ভষ্ট সে । তাদের টার্গেট ঐ গাছটা এখন বিধ্বস্ত। নিলাভ অগ্নিশিখা জ্বলছে ওটার উপরিভাগে। নাথান যেমনটা আশা করেছিল তেমনটাই হয়েছে। হাইড্রোকার্বনে ভরা গাছটার আঠা কাজ করেছে জালানি হিসেবে। তাৎক্ষণিকভাবে বানানো মলোটোভ ককটেইলের কল্যাণে পরিণত হয়েছে প্রাকৃতিক এক বোমায়, সেইসাথে একটি টর্চলাইটে। ফলে সম্পূর্ন নদীর পাড়টাই আলোকিত এখন।
“জলদি আসো!” চিৎকার দিল নাথান, ক্যারেরার সাথে ছুটতে শুরু করেছে সে ।
ধংস হয়ে যাওয়া বনের ভেতর দিয়ে দৌড়ে স্রোতের যেতে শুরু করুল। জলের ধারার সাথে সমান্তরালভাবে কিছুক্ষণ ছোটার পর বিষাক্ত পানির কাছে আসতেই দেখল ধারাল দাঁতের সেই প্রাণী এবং অন্যান্য মাছে ভরে আছে পানির উপরিভাগ । “এ-দিকে!” নাথান দৌড়ে পানিতে নেমে গেল, তারপর সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে সাঁতরে পার হতে থাকল পানির ধারাটা। তাকে অনুসরন করল ক্যারেরা। খুব দ্রুতই হামাগুড়ি দিয়ে অপরপ্রান্তে উঠে গেল তারা ।
“আমরা পেরেছি!” একটা হাসি দিয়ে বলল ক্যারেরা দম নিল নাথান। “দেখা যাক সবাই ঠিক আছে কিনা।
তারা একে অপরকে সাহায্য করল পানি থেকে পুরোপুরি উঠে আসতে। বন ধরে আরেকটু এগোতেই একটা হর্ষধ্বনি শোনা গেল।
“এদিকে, ক্যারেরা!” কসটস বলল, মুখে নির্ভেজাল একটা হাসি ফুটিয়ে। নাথানের প্রতি সম্ভাষণটিও কম আন্তরিক ছিল না। সে সবার কাছে পৌছতেই, ছুটে এসে কেলি তাকে জড়িয়ে ধরল।
“তুমি পেরেছ!” ফিন্সফিস করে বলল নাথানের কানে। “তুমি পেরেছ!” “তবে খুব বেশিক্ষণের জন্যে নয়,”মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল সে। ফ্রাঙ্ক তার পিঠে চাপড় মারল।
“চমৎকার, ডা. রান্ড,” ওয়াক্সম্যান বলল উদাসভাবে। রেঞ্জারদের জড়ো করতে ঘুরে দাঁড়াল সে। পানিটা বিষাক্ত থাকুক আর না থাকুক কেউ আর পানির কাছাকাছি থাকতে চায় না।
নাথানের চিবুকে একটা কোমল চুমু খাওয়ার পর তাকে বাহুমুক্ত করল কেলি। “আমাদের সবাইকে বাচাঁনোর জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। তারচেয়েও বেশি ধন্যবাদ দেব নিরাপদে ফিরে আসার জন্য।”
নাথানকে হতবুদ্ধিকর অবস্থায় ফেলে দিয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল সে।
পেছন থেকে তাকে কনুই দিয়ে আলতো করে গুঁতো দিল ক্যারেরা। মনে হচ্ছে কেউ একজন নতুন বন্ধু পেয়ে গেছে, চোখ টিপে বলল সে।
* * * *
রাত ১০:০২
আমাজন জঙ্গল
ধ্বংস হয়ে যাওয়া নদীর তীরবর্তী জঙ্গলের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে লুই। বাতাসে নাপাম বোমার কটু গন্ধ পাচ্ছে এখনও। তার পেছনে দলের অন্যসব সদস্যরা ডিঙ্গি নৌকা থেকে মাল-পত্তর নামিয়ে ঘাড়ে ঝুলিয়ে নিচ্ছে। এখন থেকে ভ্রমণটা হবে পায়ে হেটে। সূর্য ওঠার সময় থেকে আকাশে মেঘ জমছে, সাথে ঝিরঝির বৃষ্টি ঝরছে অঝোর ধারায়, বিস্ফোরণের পর থেকে এখনো জ্বলতে থাকা আগুনের অবশিষ্ট নিভে যাচ্ছে সেই বৃষ্টিতে । ধোয়াটে কুয়াশার একটি স্তর বনের মধ্যে স্থির হয়ে আছে যেন। দেখতে ভুতুড়ে সাদা আর ঘন ।
পাশেই তার মিসট্রেস চারপাশটা ঘুরে দেখছে, তার মুখে ব্যাথিত অভিব্যক্তি ভেসে উঠেছে। জঙ্গলের এই ধ্বংসটুকু যেন তার ব্যক্তিগত ক্ষতি। ধ্বংস হওয়া একটা গাছ, শুধু গুড়িটাই এখন দাঁড়িয়ে আছে খুঁটির মত, সেটার চারপাশ ঘুরে এল সে। একটা মৃতপ্রাণী বিদ্ধ হয়ে আছে সেই গুঁড়িতে। এটা সেইসব বিস্ময়কর প্রাণীগুলোর একটি, যারা অন্য দলটিকে আক্রমণ করেছিল। এ-ধরনের কোন কিছু দেখে নি লুই এর আগে, আর সুই’র অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যাচ্ছে তারও একই অবস্থা। প্রাণীটার মাথা কাত করে টুসি দেখল, যেমনটা কোন পাখি কেঁচো ধরার আগে দেখে নেয় ।
জ্যাক এগিয়ে এল লুইর পেছন দিক থেকে। “একটা রেডিও কল এসেছে…আপনার নিজস্ব কোডেড ফ্রিকোয়েন্সি থেকে।”
“অবশেষে,” হাফ ছাড়ল সে।
এর আগে ভোরবেলায় তার দু-জন স্কাউটের মধ্যে একজন ফিরে এসেছে। মারাত্মকভাবে ভয় পেয়েছে সে, তার চোখে দেখা গেছে বন্যভীতি । সে ফিরে এসে রিপোর্ট করেছে, তার সাথে যে গেছিল সেই টডি একরকম প্রাণীর আক্রমণে মারা গেছে। আর সে কোনমতে জীবন নিয়ে ফিরে এসেছে এখানে। দূর্ভাগ্যবশত, অন্য দলটির সম্ভাব্য অবস্থান নিয়ে তার দেয়া রিপোর্টটি বেশ অস্পষ্ট । মনে হচ্ছে রেঞ্জারদের দল শাখা-নদীটা অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ।কিন্তু ওরা যাচ্ছেটা কোথায়?
অবশ্য এটা খুঁজে বের করার বিকল্প একটা পথ আছে লুইর । সে জ্যাকের কাছ থেকে রেডিওটা নিল। বার্তাগুলো যে প্রেরকযন্ত্র থেকে পাঠানো হচ্ছে তা এমন এক বিশেষ পদ্ধতিতে যে, বিশেষ ধরণের রিসিভার ছাড়া অন্য কারো পক্ষে সেটার মর্মোদ্ধার করা সম্ভব নয়। আর এই বার্তা সরাসরি যে ক্ষুদ্র ক্র্যামবলড ট্রান্সমিটার থেকে আসছে সেটা তারই বিপক্ষ দলের এক সদস্যের কাছ থেকে রেঞ্জারদের একেবারে নাকের ডগায় থাকা চড়াদামে কেনা এক গুপ্তচর।।
“ধন্যবাদ, জ্যাক।” রেডিওটা হাতে নিয়ে কয়েক মিটার দূরে সরে গেল লুই । সে সকালে আরও একটা কল পেয়েছিল । কলটা এসেছিল তার অর্থ-সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রান্সের সেন্ট সেভিন ফার্মাসিউটিক্যাল থেকে। মনে হচ্ছে আমজন আর ইউনাইটেড স্টেটসজুড়ে কিছু রোগ-ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে। লোকটার মৃতদেহের সাথে সম্পৃক্ততা আছে এমন কোন কিছু। পারিশ্রমিক বাড়ানোর বেশ ভাল সুযোেগ এটা । চুপ করে থাকেনি লুই, ধারণার থেকে বেশি বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করার জন্য নিজের টাকার পরিমাণটা বাড়িয়ে দেবার কথা বলেছে সে। রাজি হয়েছে সেন্ট সেভিল, যদিও সে জানত রাজি তাদের হতেই হবে। ছড়িয়ে পড়া রোগটার কোন ওষুধ যদি পাওয়া যায় এই জঙ্গলে তবে সেটা দিয়ে শত শত কোটি ডলার ব্যবসা করতে পারবে তার নিয়োগদাতা । তাই আরও কিছু ডলার তার দিকে ছুঁড়ে দিতে সমস্যা কি?
রেডিওটা উঁচু করে ধরল লুই। “ফাভ্রি বলছি।”
“ডা. ফ্যাভ্রি, কণ্ঠে স্বস্তির আভাস ফুটে উঠল স্পষ্ট । “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আপনাকে পাওয়া গেল।”
“তোমার কলের অপেক্ষা করে আছি আমি,” কিছুটা রুঢ়তার আভাস তার কণ্ঠে । “গত রাতে আমার দলের গুরুত্বপূর্ন একজনকে হারিয়েছি আমি, এর কারণ এই বিষাক্ত প্রাণীগুলোর সম্পর্কে কেউ কোন সতর্কবার্তা বা পূর্বাভাস দেয়নি আমদেরকে।”
লম্বা একটা বিরতি নেমে এল । “আমি…আমি দুঃখিত। ঐ সময়টাতে এতটাই দৌড়ের উপর ছিলাম যে একমুহূর্তের জন্যেও সরে আসতে পারি নি, জানাতে পারি নি কিছু। সত্যি বলতে, এখনই এই সময়টুকু পেলাম ল্যাট্রিন করার জন্য।
“বেশ, তাহলে এখন বল কাল রাতের খবরা-খবর।”
“ভয়ঙ্কর ব্যাপার, গুপ্তচর টানা তিন মিনিট তার কানে-বড় করে সব বলে গেল যা ঘটেছে তার সামগ্রিক বর্ণনা দিয়ে । “যদি না রান্ড মাছ মারার বিষাক্ত পাউডারটা ব্যবহার করত আমরা সবাই নিশ্চিত মরে ভূত হয়ে যেতাম”
রান্ডের নামটা শুনতেই লুইর আঙুলগুলো আরও শক্ত করে ধরল রেডিওটাকে। এই একটা পারিবারিক নামই তার কাধের লোমগুলো খাড়া করে দেয়। “এখন তোমরা সবাই কোথায়?”
‘আমরা এখনো দক্ষিণ-পশ্চিম দিকেই এগোচ্ছি, জেরাল্ড ক্লার্কের পরের চিহ্নটা খুঁজছি।”
“বেশ।”
“কিন্তু”
“কিন্তু কি?”
“আমি..আমি বেরিয়ে আসতে চাই।”
“দুঃখিত, কি বললে বন্ধু?”
“গত রাতে প্রায় মারাই যাচ্ছিলাম। তাই আশা করছিলাম আপনি যদি…মানে…আমি এখান থেকে পালিয়ে গেলে যদি আমায় তুলে নিতেন তাহলে লোকালয়ে নিরাপদে ফিরিয়ে নেবার জন্য আমি মোটা অঙ্কের টাকা দিতাম আপনাকে।”
চোখে দুটো বন্ধ করল লুই বোঝা যাচ্ছে তার গুপ্তচর বেশ ভয়ের মধ্যে আছে। ওকে এখন চাঙ্গা করে তুলতে হবে। “বেশ, যদি তুমি কাজটা বাদ দিতে চাও আমি অবশ্যই তোমাকে তুলে নেব।”
“ধন্যবাদ…আমি খুব..
বাধা দিয়ে বলল লুই, “তবে আমি নিশ্চিত, যখন তোমাকে আমি পাব তোমার মৃত্যুটা হবে দীর্ঘ, যন্ত্রণাময় আর অপমানজনক। আমার কাজের সাথে যদি পরিচিত থাক, তবে আমি নিশ্চিত তুমি ভাল করেই জান কতটা সৃজনশীল হতে পারি আমি।”
একটা নীরবতা নেমে এল অপর প্রান্তে । লুই কল্পনা করতে পারল তার ছোট্ট গুপ্তচরটি ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে কাঁপছে। “আমি বুঝতে পেরেছি।”
“দারুণ । আমার ভাল লাগছে বিষয়টা নিষ্পত্তি হওয়ায় । এখন এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ে আসা যাক। শোন, মনে হচ্ছে আমাদের পেছনে অর্থব্যয়কারী ব্যক্তিটি আরও একটি বাড়তি অনুরোধ করতে চাচ্ছে। আর সেটা মনে হয় তোমাকেই করতে হবে।”
“কি…কি সেটা?”
“নিরাপত্তার খাতিরেই কাজটা করতে চায় ওরা। যে সম্পদ অর্জন করতে যাচ্ছে তার শতভাগ নিজেদের করায়ত্ত করার জন্যই তোমার টিমের যাবতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বিকল করে দিতে চায়, যেন বাইরের দুনিয়ার সাথে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দলটি, আর সেটা যত দ্রুত সম্ভব কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই।”
“আমি এটা কিভাবে করব? আপনি তো জানেন আমাকে কম্পিউটার ভাইরাস সরবরাহ করা হয়েছিল টিমের স্যাটেলাইট আপলিংক নষ্ট করে দেবার জন্য কিন্তু রেঞ্জারদের তো নিজস্ব যোগাযোগের সরঞ্জাম আছে। আমি ওটার ধারে-কাছেও ঘেষতে পারব না।”
“সমস্যা নেই । ঐ ভাইরাসটা ঢুকিয়ে দাও তুমি, রেঞ্জারদের আমি সামলাচ্ছি।”
“কি-“
“ভরসা রাখ, তুমি কখনোই একা নও।”
লাইনটায় আবারো নিরবতা নেমে এল। হাসল লুই। তার কথাগুলো নিশ্চিন্ত করতে পারে নি তার লোকটাকে। “রাতে আবার জানাও সবকিছু” বলল লুই।
একটা বিরতি। “ঠিক আছে, আমি চেষ্টা করব।”
“চেষ্টা না…এটা তোমাকে করতেই হবে।”
“ঠিক আছে, ডক্টর।” লাইনটা কেটে গেল।
রেডিওটা নামিয়ে জ্যাকের কাছে এল লুই। “কাজে নেমে পড়তে হবে আমাদের। অন্য দলটা আমাদের থেকে ভাল অবস্থানে আছে।”
“জি, স্যার।” জ্যাক ফিরে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সবাইকে প্রস্তুত করতে।
লুই দেখল সুই এখনো সেই ক্ষত-বিক্ষত প্রাণীটার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার যদি ভুল না হয়ে থাকে, ভয়ের একটা রেখা ফুটে উঠেছে তার মিসট্রেসের চোখে। কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছে না লুই। আর কিভাবেই বা হবে সে? এর আগে কখনো এমন অভিব্যক্তি সে দেখে নি এই ইন্ডিয়ান মায়াবী নারীর চোখে-মুখে। সে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে তাকে টেনে নিল দু-বাহুর মাঝে।
তার বাহুডোরে থেকেও মেয়েটি কেঁপে উঠল যেন। ‘শান্ত হও, ডার্লিং। ভয়ের কিছু নেই।”
সুই তার দিকে একটু ঝুঁকে গেল কি তার চোখে অনিশ্চয়তার ছাপ স্পষ্ট। সে-ও জোরে জড়িয়ে ধরল লুইকে, যন্ত্রণার চাপা একটি শব্দ বেরিয়ে এল তার ঠোট দিয়ে । দ্রু কুঁচকালো লুই। সম্ভবত তার প্রেমিকার অব্যক্ত সতর্কবার্তায় কর্ণপাত করা উচিত তার । এখন থেকে তাদের আরও ধীরে, আরও সতর্কতার সাথে সামনে এগোতে হবে । অন্য দলটি প্রায় ধ্বংসই হয়ে যাচ্ছিল এইসব অভূতপূর্ব জলজ প্রাণীদের হাতে। তারা যে সঠিক পথেই আছে তার পরিস্কার আলামত এটি। কিন্তু যদি আরও কোন অজ্ঞাত বিপদ থেকে থাকে তবে?
বিষয়টা গভীরভাবে বিবেচনা করতে গিয়ে সে অনুধাবন করল তার দলটি বিনাকষ্টে একটা সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছে গতরাতে বিপক্ষ দলটি নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে তাদের সমস্ত ধূর্ততা আর উদ্ভাবনীকাজে লাগিয়েছে, যেটা সবার অগচরে একটা পথকে সুগম করে দিয়েছে লুইয়ের দলটির জন্য। তাহলে এমনটি আবারো ঘটতে সমস্যা কোথায়? অযাচিত কোন বিপদকে দূর করতে শত্রুপক্ষের উপর নির্ভর করা কেন যাবে না? বিড়বিড় করল লুই । “তারপর আমরা ওদের মৃতদেহগুলোর উপর নাচব আর বগলদাবাব পুরস্কার!” আরও একবার আত্মতুষ্ট হল লুই। সে একটু ঝুঁকে সুইর মাথার তালুতে চুমু খেল। “ভয় করো না, প্রিয়তমা। আমরা হারব না।”
* * * *
সকাল ১০:০৯
ইন্সটার ইন্সটিটিউট হাসপাতালের ওয়ার্ড ল্যাঙ্গলে,
ভার্জিনিয়া
লরেন ওব্রেইন বিছানার পাশে বসে আছে, ভুলে গেছে একটা বই কোলের উপর রাখা। ডা. নিউসের গ্রিন এস আ্যান্ড হ্যাম রেসিপির বই । জেসির প্রিয় খাবার এটা। তার নাতনি এখন ঘুমিয়ে আছে। বেলা বাড়ার সাথে জ্বরটাও নেমে গেছে। প্রদাহ এবং জ্বরের জন্য
যথাক্রমে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরিজ এবং অ্যান্টি-পাইরেটিক্স একত্র করে বানানো ককটেল জেসির তাপমাত্রা একশ-দুই থেকে ধীরে ধীরে আটানব্বই দশমিক ছয়ে নামিয়ে এনেছে। কেউই আসলে নিশ্চিত নয় জেসি জঙ্গলের ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত কিনা। যদিও বাচ্চারা স্বাভাবিক জ্বরে হরামেশাই আক্রান্ত হয়, তবু কেউ ঝুঁকি নিচ্ছে না। যে ওয়ার্ডে তার নাতনি শুয়ে আছে সেটা সিল করা আবদ্ধ একটি কক্ষ। এখান থেকে বাতাস বের হতে দেয়া হচ্ছেনা। সরাসরি সম্ভাব্য কোন জীবাণুর ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতেই এই ব্যবস্থা। লরেন নিজেও একটা সেলাইবিহীন ডিসপোজেবল কোয়ারেন্টাইন পোশাক পরেছে, সাথে শ্বাস নেওয়ার জন্য সেলফ-ব্রিদিংমাস্ক । প্রথমে সে ভেবেছিল এটা হয়তো জেসিকে আরও ভয় পাইয়ে দেবে। এখানকার কর্তৃপক্ষ ঘোষনা করেছে, হাসপাতালের সমস্ত স্টাফ এবং আগতদের প্রয়োজনমত নিরাপত্তা পোশাক পরতে হবে । লরেনকে ওরকম পোশাকে দেখে জেসি ঠিকই ভয় পেয়েছিল, কিন্তু মুখের সচ্ছ আবরন আর সাহস জাগানো কিছু কথা শান্ত করেছিল তাকে। সারা সকালজুড়ে লরেন বসে আছে জেসির বিছানার পাশে, এই সময়টুকুতে জেসিকে বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়েছে। রক্তের স্যাম্পল নেয়া হয়েছে, বদল করা হয়েছে ওষুধ। হুশ করে একটা শব্দ জানান দিল ঘরে একজন প্রবেশ করেছে। একটু কেঁপে উঠে পেছনে ফিরল লরেন। সে দেখল স্বচ্ছ মুখোশের আড়ালে পরিচিত একটি মুখ। বইটা টেবিলের উপর রেখে উঠে দাঁড়াল সে। “মার্শাল?”
তার স্বামী এগিয়ে এসে প্লাস্টিক পোশাকে ঢাকা বাহু দুটো দিয়ে জড়িয়ে ধরল তাকে। আমি এখানে আসার আগে তার চার্টটা পড়েছি,” বলল সে। তার কষ্ট কিছুটা ক্ষীণ আর যান্ত্রিক শেনাল। “জ্বর নেমে গেছে?”
“হ্যা, ঘন্টা দুয়েক আগে থেকে নামছে।” “ল্যাব থেকে কোন রিপোর্ট এসেছে?”
তার কণ্ঠে ভয়ের ধ্বনি শুনল লরেন। “না…এত তাড়াতাড়ি বলা যাচ্ছে না এটা মহামারি কিনা।”
রোগের জন্য দায়ি জীবাণুকে না জেনে দ্রুত পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। ডায়াগোনসিস বলতে যা করা হচ্ছে তা তিনটি ক্লিনিক্যাল সিম্পটমের উপরে : ওরাল আলসারেশন, টাইনি সাবমিউকোসাল হেমরিজ এবং শ্বেতরক্ত কণিকার পরিমাণ ব্যাপকভাবে নেমে যাওয়া। কিন্তু এই উপসর্গগুলো পুরোপুরি বোঝা যাবে জ্বরের ছত্রিশ ঘণ্টা পর অপেক্ষাটা অনেক দীর্ঘ সময়ের । যদি না…
লরেন এই বিষয়টি পরিবর্তন করতে চাইল। “সিডিসি এবং কেবিনেট মেম্বারদের সাথে তোমার কনফারেন্স-কলটা কেমন হল?” ।
মাথা ঝাকাল মার্শাল । “সময়ের অপচয় শুধু। কয়েক দিন লেগে যাবে রাজনৈতিকভাবে এটার সুরাহা করে কার্যকরী কোন পদক্ষেপ নিতে । একমাত্র ভাল খবরটা হল সিডিসির ব্রেইন ফ্লোরিডার সীমান্ত বন্ধ করার আমার প্রস্তাবটা সমর্থন করেছে। বেশ অবাক হয়েছি এতে।”
“এতে অবাক হবার কিছু নেই,” বলল লরেন, “সারা সপ্তাহজুড়ে তাকে আমি কেস ডাটা পাঠাচ্ছি। সাথে এটাও জানাচ্ছি ব্রাজিলে কি ঘটছে। সম্ভাব্য ফলাফলগুলো আসলে ভয়ঙ্কর।”
“আচ্ছা, তাহলে তুমিই তাকে নাড়িয়ে দিয়েছ, তার হাত দুটো চেপে ধরল মার্শাল । “থ্যাংকস।”
বিছানার দিকে তাকাতেই লরেন অনেকক্ষণ ধরে চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাস বের করে দিল। শব্দ করে। “একটা ব্রেক নিচ্ছ না কেন তুমি? জেসিকে আমি দেখছি কিছু সময়ের জন্য। একটু ঘুমিয়ে নেয়া উচিত তোমার । সারাটা রাত জেগে আছ।”
“একটুও ঘুমাতে পারব না আমি।”
“তাহলে অন্তত সকালের খাবার আর একটু কফি খেয়ে নাও। ওদিকে কয়েক ঘণ্টা বাদেই কেলি আর ফ্রাঙ্কের সাথে কথা বলতে হবে।” একটু পেছনে ঝুঁকে জেসির দিকে তাকাল লরেন। “কেলিকে আমরা কি বলব?”
“সত্যটা বলাই ভাল । জেসির জ্বর হয়েছে কিন্তু ভয়ের কিছু নেই। আমরা এখনো নিশ্চিত নই এটা সেই রোগ কি-না।”
মাথা নেড়ে সায় দিল লরেন। কিছুক্ষণের জন্য চুপ রইল তারা। অবশেষে মর্শাল তাকে ধীরে দরজার দিকে নিয়ে গেল।“তুমি যাও।”
লরেন এয়ার-টাইট দরজাটা ঠেলে বাইরে এসে করিডোর ধরে তার লকার-রুমের দিকে হাটা শুরু করল। ওখানে তাকে পোশাক বদলে পরিস্কার জামা পরে নিতে হবে। লক-রুম থেকে বের হতেই নার্স-স্টেশনের সামনে থামল। “ল্যাব থেকে কিছু এসেছে?”
ছোটখাট এশিয়ান এক নার্স প্লাস্টিকের একটা কেস-ফাইল তুলে ধরল। এগুলো মিনিটখানেক আগে ফ্যাক্স করা হয়েছে।”
লরেন ফাইলটা খুলে ব্লাড কেমিস্ট্রি এবং হেমাটোলজির রিপোর্টগুলো দেখল । লম্বা তালিকার উপর দিয়ে চোখ বুলাতে গিয়ে থেমে গেল শ্বেত-রক্ত কণিকার সংখ্যা দেখে :
টিডব্লিউবিসি : ২১৩০ (এল) ৬০০০-১৫০০০
সংখ্যাটা কম, অনেক কম। মহামারির তিনটি উপসর্গের একটি! ভয়ে কাঁপতে লাগল তার আঙুল। সে দ্রুত রিপোর্টটার অন্য অংশে গেল যেখানে বৃক্ত কণিকাগুলোর স্তর আলাদা আলাদাভাবে বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া আছে । গতরাতে টিমেৱ মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যালভিসো একটা তথ্য দিয়েছে তাকে, যেটা ল্যাবে রাখা এই রোগের তথ্যগুলো বিশ্লেষন করার সময় অ্যালভিসের কম্পিউটার সনাক্ত করেছে সে লরেনকে জানিয়েছে, নির্দিষ্ট কোন শ্বেতকণিকা যেমন ব্যাসোফিলের মাত্রা বেড়ে যায় এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর পরই, যেখানে সামগ্রিকভাবে রক্তকণিকার মাত্রাটা নেমে যায়। যদিও এটা এত দ্রুত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না তবুও পুরনো সব কেসগুলোর আলোকে অ্যালভিসার তথ্যটাকে সঠিকই ধরে নেয়া যায়। এটা হয়তো প্রাথমিকভাবে রোগটার উপস্থিতি সনাক্ত করতে সাহায্য করবে। লরেন শেষ লাইনটা পড়ল ।
ব্যাসোফিল সংখ্যা : ১২(এইচ) ০-৪
“হায় ঈশ্বর!” সে চার্টটা নামিয়ে রাখল নার্স-স্টেশনের টেবিলের উপর। জেসির ব্যাসোফিল লেভেল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, অনেকখানিই বেশি। চোখ বন্ধ করল লরেন ।
“আপনি ঠিক আছেন, ডা. ওব্রেইন?”
নার্সের কথা কানে গেল না লরেনের। তার মন সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন হয়ে আছে ভয়ঙ্কর কিছু একটা অনুধাবন করায় : এই সাংঘাতিক রোগটা জেসিরও হয়েছে?
* * * *
১১:৪৮
আমাজন জঙ্গল
অন্যদের সাথে সারি বেধে এগিয়ে চলছে কেলি, অসম্ভব ক্লান্ত কিন্তু এগিয়ে যেতে দৃঢ় প্রতীজ্ঞ সে। সারা রাত ধরে তারা হাটছে, মাঝে সাময়িক বিরতি বাদ দিলে আক্রমণের পর থেকে পাক্কা দু-ঘন্টা হেটেছে তারা, তারপর একটা অস্থায়ী ক্যাম্প করে সূর্যদয়ের সময় । সে সময়ে রেঞ্জাররা ওয়াওয়ের ফিল্ড-বেইসের সাথে যোগাযোগ করে। তারা মনস্থির করেছে দিনের মাঝামাঝি সময় অবধি হাটবে স্যাটেলাইট লিংক দিয়ে স্টেটসের সাথে মোগাযোগের ঠিক আগ পর্যন্ত। তারপর দিনের বাকি সময়টুকুতে বিশ্রাম নেয়া হবে, সবাইকে কাজ বুঝিয়ে দেয়া হবে, আর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে কিভাবে সামনের দিকে এগোবে সবাই।
কেলি ঘড়ি দেখল। দুপুর আসন্ন । এরইমধ্যে সে ওয়াক্সম্যানকে চিল-ফাল্লা করতে শুনেছে দিনের ক্যাম্প কোথায় করা হবে সে-বিষয়। “পানি থেকে ভাল দূরেই এসেছি আমরা।” কেলি শুনল তার চিৎকার। সারাদিন ধরে তাদের দলটি সব রকম পানির ব্যাপারেই সর্তক ছিল। যাত্রাপথে ছোটছোট ধারা বা পুলগুলো হয় এড়িয়ে গেছে অথবা পার হয়েছে দৌড়ে। তবে আর কোন আক্রমণের শিকার হতে হয় নি কাউকে । এর একটা যুক্তি উপস্থাপন করল ম্যানুয়েল।
“সম্ভবত প্রাণীগুলো ঐ ছোট্ট এলাকার মধ্যেই আবদ্ধ। আর সেজন্যেই হয়তো হারামিগুলোকে এর আগে কোথাও দেখা যায় নি।”
“তাহলে তো নিষ্কৃতি পেয়ে গেলাম,”ফ্রাঙ্ক বলল তিক্তস্বরে।
তারা ধীরগতিতে লম্বা পা ফেলে হেটে যাচ্ছে। সকালের ঝিরঝিরে বৃষ্টি আদ্রতাপূর্ণ মেঘমালায় রূপ নিচ্ছে। ভ্যাপসা গরম ভিজিয়ে দিয়েছে সবকিছু : পোশাক, ব্যাগ, জুতো । কিন্তু কেউই কোন অভিযোগ করছে না হাটার ব্যাপারে। সবাই খুব খুশি গতরাতের ভয়ঙ্কর প্রাণীগুলো থেকে লম্বা দূরত্ব বজায় রাখতে পেরে। ২@
এমন সময় সামনে থেকে কর্পোরাল রাকজ্যাক চিৎকার দিয়ে উঠল, “একটা ক্লিয়ারিং?”
ইউনিটের একজন ট্র্যাকার হিসেবে তাকে এখন দুটো কাজ করতে হচ্ছে। সবাইকে পথ দেখানোর পাশাপাশি জেরাল্ড ক্লার্কের ব্যবহার করা পথের কোন চাক্ষুষ প্রমাণাদি পাওয়া যায় কিনা সে বিষযেও নজর রাখতে হচ্ছে। “ক্যাম্প করার জন্য জায়গাটা একদম পারফেক্ট মনে হচ্ছে আমার।”
হাফ ছাড়ল কেলি। “আরও আগেই পাওয়া উচিত ছিল।”
“দেখে নাও ভাল করে,” চেঁচিয়ে বলল ওয়াক্সম্যান। “নিশ্চিত হয়ে নাও ধারেকাছে কোন পানি নেই।”
“জি, স্যার।কসটস এরইমধ্যে ভাল করে দেখেছে জায়গাটা।”
নাথান কেলির থেকে কয়েক পা এগিয়ে চিৎকার করে সামনের দিকে বলল, “সাবধান ওখানে-“
সঙ্গে সঙ্গে একটা আর্তনাদ ভেসে এল সামনে থেকে। জমে গেল সবাই, শুধু নাথান ছাড়া, সে দৌড়ে গেল সামনের দিকে। “আশ্চর্য, কেউ শুনতে পাননি আমি কি বলছিলাম সবাইকে?” দৌড়াতে দৌড়াতে বলল সে। তারপর পেছন ফিরে কেলি এবং কাউয়ির দিকে অকাল।“তোমাদের দুজনের সাহায্যের দরকার।”
কেলি অনুসরণ করল তাকে। “কি হয়েছে?” সে জিজ্ঞেস করল কাউয়িকে।
ইন্ডিয়ান প্রফেসর এরইমধ্যে পেছনের ব্যগটা সামনে এনে তার খুলতে শুরু করে দিয়েছে। “আমার মনে হয় সুপে চাকরা। শয়তানের বাগান।
“শয়তানের বাগান?” এমন নাম কেলির পছন্দ হল না।
ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান বাকি রেঞ্জারদেরকে সিভিলয়ানদের সাথে থাকার জন্য আদেশ দিয়েই ফ্রাঙ্ককে সঙ্গে নিয়ে যোগ দিল নাথানের সাথে ।
দ্রুত এগিয়ে গেল কেলি, দেখল দু-জন রেঞ্জার মাটিতে পড়ে আছে। মনে হচ্ছে যেন তারা মারামারি করছে—একজন মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে, অপরজন হাতের তালু দিয়ে তাকে চড়াচ্ছে ক্রমাগত নাথান এগিয়ে গেল তাদের দিকে।
“শালা এগুলো আমার শরীর থেকে ঝেড়ে ফেল!” চিৎকার দিয়ে বলছে পড়ে থাকা রেঞ্জার সার্জেন্ট কস্টস।
“চেষ্টা করছি তো আমি, কর্পোরাল র্যাকজ্যাক হাত দিয়ে ঝাড়তে ঝাড়তে বলল ।
নাথান ঠেলে সরিয়ে দিল কর্পোরালকে। থামুন! আপনি ওদের আরো রাগিয়ে দিচ্ছেন। তারপর সে ঘুরল পড়ে থাকা রেঞ্জারের দিকে। “সার্জেন্ট কস্টস চুপচাপ শুয়ে থাকুন!” ধমকের সুরে বলল এবার।
“ওরা সারা শরীরে হুল ফুটাচ্ছে আমার!”
কেলি এখন যথেষ্ট কাছে চলে এসেছে তাদের। সে দেখল মানুষটার সারা শরীর টেকে আছে বড় বড় কালোপিপড়ায়। একেকটা ইঞ্চিখানেক লম্বা হবে। সংখ্যায় ওরা হাজার হাজার।
“নড়াচড়া থামান, ওরা আপনাকে কামড়াবে।”
কস্টস রেগেমেগে তাকাল নাথানের দিকে। চোখে তার ক্রোধের আগুন জ্বলছে যেন সে তার উপদেশ মেনে নিল । সে ঝাড়াঝাড়ি থামিয়ে দিয়ে স্থির হয়ে থাকল। দম নিয়ে হাফাচ্ছে এখন। কেলি দেখতে পেল তার সারা হতে ও মুখে ফোসকা পড়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে তার শরীরে স্বাঁকা দেয়া হয়েছে।
“কি হয়েছে?” জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান।
নাথান সবাইকে কটসের কাছ থেকে দূরে রাখার জন্য বলল, “পেছনে সরে যান।
কসটস কেঁপে উঠল শোয়া অবস্থায় ? কেলি দেখল, লোকটার চোখের কোণে যন্ত্রণার অশ্র। কিন্তু নাথানের কথায় কাজ হল। সে স্থির হয়ে শুয়ে থাকার পর থেকে পিপড়ার দল কামড়ানো বন্ধ করে দিল। আস্তে আস্তে তারা নেমে যাচ্ছে ওর হাত-পা আর শরীর থেকে। চলে যাচ্ছে ঝোপের আড়ালে ।
“কোথায় যাচ্ছে ওরা?” জিজ্ঞেস করল কেলি।
“ফিরে যাচ্ছে বাড়িতে,”বলল কাউয়ি। “ওরা ওদের কলোনির সৈন্য।”
সে দূরের কয়েকটা গাছ দেখাল। কয়েক মিটার দূরে একটা জায়গা বেশ খোলামেলা, দেখে মনে হয় যেন কেউ বড় একটা ঝাড়ু দিয়ে পুরো জায়গাটা পরিস্কার করে তার চারপাশে লতাগুলোর বেড়া দিয়ে দিয়েছে। জায়গাটার মাঝখানে দাড়িয়ে আছে বিশাল একটি গাছ। ওটার শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে আছে পুরো জায়গা জুড়ে, যেন নিঃসঙ্গ কোন দৈত্য।
“এটা একটা পিঁপড়াগাছ,” ব্যাখ্যা দিতে লাগল কাউয়ি, “পিঁপড়াদের পুরো কলোনি এই গাছের ভেতর বাস করে।”
“এটার ভেতরে?”
মাথা নেড়ে সায় দিল কাউয়ি। “রেইনফরেস্টর গাছ যে বিভিন্ন উপায়ে জীব-জন্তু ও পশু-পাখিকে অভিযোজিত করে এটা তার অন্যতম উদাহরণ। এই গাছটা বিশেষভাবে বেড়ে উঠেছে ওটার ডাল ও গুড়ির ভেতর এক রকম সুড়ঙ্গ সহকারে যেটা পিঁপড়ারা বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার করে, এমনকি গাছটা ওদেরকে মিষ্টি স্বাদের একরকম আঠাও সরবরাহ করে খাবার হিসেবে। বিনিময়ে এই গাছটাও কিন্তু উপকৃত হচ্ছে পিঁপড়াদের কারণে। এই কলোনির সকল উচ্ছিষ্ট এবং আবর্জনা গাছটাকে একদিকে যেমন উর্বর করে তোলে, অন্যদিকে পিপড়ারাও বেশ সক্রিয় এটাকে বিশ্রী পোকা-মাকড়, পাখি ও জীবজন্ত থেকে রক্ষা করতে।” ফাকা জায়গাটার দিকে মাথা নেড়ে সায় দিল কাউয়ি। “গাছটার আশেপাশে যা-ই কিছু জন্মাক না কেন সেগুলো ধ্বংস করে দেয় পিপড়ার দল। কেউ গাছ কাটতে আসুক বা চড়তে আসুক, কামড়ে তাকে শেষ করে দেয় ওরা। আক্রমণ করে ডাল-পালা থেকে। এই কারণেই জঙ্গলের এসব জায়গাকে বলা হয় সুপে চারা, মানে শয়তানের বাগান।”
“কি দারুণ সম্পর্ক।”
“আসলেই, তবে এই সম্পর্কটা পারস্পরিকভাবে লাভবান করে বৃক্ষ ও ক্ষুদেপ্রাণী, উভয় প্রজাতিকেই। প্রকৃতপক্ষে, একজন বাঁচতে পারবেনা অপরজন ছাড়া।”
কেলি তাকাল পরিচ্ছন্ন জায়গাটার দিকে । ভেবে সে বিস্মিত, এখানকার জীবন কতটাই না পরস্পর সম্পর্কিত। কয়েক দিন আগে নাথান তাকে একটা অর্কিড দেখিয়েছিল যেটার ফুলের গঠন এককম প্রজাতির বোলতার প্রজননতন্ত্রের মত। বলেছিল নাথান পরাগায়ন করা জন্য বোলতাগুলোকে আকৃষ্ট করতেই এই বিশেষ আকৃতি। তারপর এখানে আরও অনেক লতা-গুল্ম আছে যেগুলো সুমিষ্ট পুষ্পমধুনিঃসরন করে বিভিন্ন রকম পরাগায়ন কর্মীদের, আর এধরণের সম্পর্ক শুধু পোকা-মাকড় ও গাছের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্দিষ্ট কিছু গাছ আছে যেগুলোর ফল খায় নির্দিষ্ট কিছু প্রাণী এবং জম্ভ,তারপর সেগুলোর আঁটি বর্জ্যের সাথে বেরিয়ে যায় অঙ্কুরোদগম হওয়ার আগেই। ব্যাপক পরিমাণে বিস্ময়ের ছড়াছড়ি, অবিশ্বাস্য রকমের জটিল এক জালের ভেতর সবরকম জীবনই তাদের চারপাশের জীবনের উপর নির্ভরশীল একটা সম্পর্কে আবদ্ধ।
নাথান হাটু গেড়ে বসে পড়ল সার্জেন্টের পাশে। মনোযোগ ফিরে এল কেলির । এরইমধ্যে পিপড়াগুলো নেমে গেছে কসটসের শরীর থেকে। “কতবার আমি সতর্ক করেছি আপনাকে কোন কিছুতে হেলান দেওয়ার আগে সেটা ভাল করে দেখে নেবেন?”
“আমি ওদের দেখতে পাই নি,” কস্টস বলল, একইসাথে বেদনার্ত এবং আক্রমণাত্মক কষ্ঠে।“একটু প্রস্রাব করতে গেছিলাম আমি।”
কেলি দেখল মানুষটার জিপার আসলেই নামানো। মাথা ঝাকাল নাথান, “একটা পিপড়াগাছের উপর?”
নিজের ব্যাগের ভেতর বিক্ষিপ্তভাবে হাত চালাতে চালাতে ব্যাখ্যা করল কাউয়ি । “পিপড়ারা রাসায়নিক ব্যাপারগুলোতে খুব সংবেদনশীল। আপনার প্রস্রাব যখনই গাছে পড়েছে তারা ভেবেছে গাছের ভেতরে তাদের কলোনিকে আক্রমণ করা হয়েছে।”
কেলি অ্যান্টি-হিস্টামিনের একটি সিরিঞ্জ খুলল, এদিকে কাউই তার ব্যাগ থেকে একমুঠো পাতা বের করে সবগুলোকে একসাথে ডলতে লাগল। ওটার ঘ্রাণ নাকে যেতেই তৈলাক্ত পাতাটাকে চিনতে পারল কেলি। “কু-রান-ইয়েহ?” জিজ্ঞেস করল সে।
ইন্ডিয়ানটি হাসল। চিনতে পেরেছেন তাহলে।” এটা সেই ঔষধি গাছ যেটা কাউয়ি ব্যবহার করেছিল কেলির আঙুলের জ্বালা-পোড়া সারানোর জনা যখন সে ফায়ার-লিয়ানা গাছ ছুয়েছিল। খুব শক্তিশালী ব্যাথানাশক এটি। ডাক্তার দু-জন ব্যস্ত হয়ে পড়ল রোগীকে নিয়ে। একদিকে কেলি একটা অ্যান্টিহিস্টামিন ও একটা অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি ইনজেকশন দিচ্ছে, অন্যদিকে কাউয়ি পাতাগুলো পিষে রেঞ্জারের হাতে লাগিয়ে দিচ্ছে, সাথে শিখিয়ে দিচ্ছে কিভাবে, এটার প্রলেপ দিতে হবে । সার্জেন্টের চোখেমুখে তৎক্ষণাৎ ব্যাথা উপশমের অভিব্যক্তি দেল গেল।
একটা শ্বাস ফেলে সে এক মুঠো পাতা নিল হাতে। আমি নিজেই পারব এবার, বলল সে। কর্পোরাল র্যাকজ্যাক তার সার্জেন্টকে দাঁড়াতে সাহায্য করল। “এই জায়গাটা আমাদের এড়িয়ে যাওয়া উচিত,” বলল নাথান। “একটা পিপড়াগাছের এত কাছে ক্যাম্প করতে চাই না আমরা। আমাদের খাবারগুলো ওদের আকর্ষন করতে পারে।”
ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান মাথা নেড়ে সায় দিল। “তাহলে আবার হাটা শুরু করা যাক, এখানে অনেকটা সময় নষ্ট করে ফেলেছি আমরা, খুড়িয়ে হাটতে থাকা সার্জেন্টের দিকে তাকাল, তার দৃষ্টিতে কোন সহানুভূতি নেই।
পরবর্তী আধঘণ্টাজুড়ে দলটি আবারো চলতে থাকল সবুজ আচ্ছাদনের নিচ দিয়ে। ক্যাপুচিন ও পশমি বানরের চিৎকার চেঁচামেচিই কেবল তাদের সঙ্গী হল। ম্যানুয়েল দেখল একটা ক্ষুদে পিপড়া খেকো সাপ এক ডালে বসে আছে। ভয়ে জমে গিয়ে ওটাকে দেখতে বড়-চোখের সিষ্কের কোট গায়ে দেয়া জবুথবু জর মত লাগছে। ওটার সবুজ আঁশটেগুলো এমনভাবে আলো প্রতিফলিত করছে যে ওটাকে কৃত্রিম বলে মনে হচ্ছে। পাম গাছের একটা ডগার সাথে পেচিয়ে ঝুলে থাকায় এই প্রাণীটা একটা ফরেস্ট পিট ভাইপার-জঙ্গলের বিষধর সাপগুলোর একটি। অবশেষে একটা চিৎকার ভেসে এল সামনে থেকে ।
“কিছু একটা পেয়েছি আমি,”কর্পোরাল রাকজ্যাক বলল চেঁচিয়ে । কেলি প্রর্থনা করল এটাও যেন আরেকটা পিপড়াগাছ না হয়। “আমার বিশ্বাস এটা ক্লার্কের আরেকটি চিহ্ন!”
দলের সবাই ছুটে গেল তার দিকে। ছোট একটা ঢিবির উপর বিশাল ব্রাজিল নাট গাছ দাঁড়িয়ে আছে। এটার ছড়িয়ে পড়া ডালপালার নিচের মাটি অপরিষ্কার হয়ে আছে ঝরে পড়া বাদাম এবং পাতায়। গাছটার গুড়িতে এক টুকরো ছেঁড়া কাপড় ঝুলছে। অন্যরা সেখানে পৌঁছে গেলেও কর্পোরাল র্যাকজ্যাক থামতে ইশারা করল সবাইকে । “আমি জুতার ছাপ পেয়েছি,” সে বলল, “ওগুলো কেউ নষ্ট করবেন না।”
“জুতোর ছাপ?” কেলি বলল চাপাস্বরে।
রেঞ্জাররা গাছটার চতুর্দিকে ধীরে ধীরে ঘুরে দেখে নিল। “যে রাস্তাটা এখানে এসে থেমেছে সেটা পেয়েছি,” আবারও চিৎকার দিল কর্পোরাল।
ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান এবং ফ্রাঙ্ক এগিয়ে গেল তার দিকে। ভ্রু কুঁচকে দেখল কেলি। “আমি ভেবেছিলার জেরাল্ড ক্লার্ক খালি পায়ে জঙ্গল থেকে এসেছিল।”
“হ্যা, সে তাই করেছিল,” জবাব দিল নাথান। কিন্তু ইয়ামোমামো যে শামানকে আমরা ধরেছিলাম সে বলেছিল, ইন্ডিয়ান গ্রামবাসীরা ক্লার্কে সবকিছু খুলে নিয়েছিল। তারা সম্ভবত তার জুতা জোড়াও খুলে নিয়ে থকবে।” মাথা নেড়ে সায় দিল কেলি। রিচার্ড জেন গাছটার দিকে দেখাল। “এটাও কি আরেকটি মেসেজ?”
তারা সবাই অপেক্ষা করছে ওখানে যাবার অনুমতি পাবার জন্য। ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান আর ফ্রাঙ্ক ফিরে এল কর্পোরাল রাকজ্যাককে রেখে, কর্পোরাল ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করছে পথটা ।
“আমরা এখানেই ক্যাম্প করব,” সবাইকে সামনে এগোতে বলে ঘোষনা দিল ওয়াক্সম্যান।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দলের সবাই সামনের গাছটার কাছে পৌছাল। ক্ষয়ে যাওয়া বাদামগুলো শব্দ করে ভেঙে যাচ্ছে মানুষের পায়ের নিচে পড়তেই। গাছটার গুড়ির কাছে যারা আগে পৌছাল তাদের ভেতর কেলি একজন। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে খোদাই করা পরিস্কার একটি চিহ্ন।
“G.C.আবারো ক্লার্ক,” তীর চিহ্নষ্টা দেখিয়ে বলল নাথান। “পশ্চিম দিকে।”
রাকজ্যাক জুতোর ছাপযুক্ত যে রাস্তাটা পেয়েছে ঠিক সে দিকটা দেখিয়ে বলল, তারিখটা মে মাসের । এখান থেকে গ্রামটায় পৌছাতে দশ দিন লেগে গিয়েছিল ক্লার্কের? সে এতটা ধীর গতিতে আগাচ্ছিল!”
“সে হয়তো আমাদের মত দ্রুত ছোটে নি,” বলল নাথান, “হয়তো মানুষের বসতি বা সভ্যজগত খোজার জন্য সে বেশি সময় ব্যয় করেছিল, ঘুরে বেরিয়েছে এদিক-সেদিক।”
“তার দেহাবশেষ নিয়ে আমার মা পরীক্ষা করে যা পেয়েছে অতে বোঝা যাচ্ছে এক সময় তার শরীরে ক্যান্সারটা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল। সেজন্যে হয়তো ঘন ঘন বিশ্রাম নিতে হচ্ছিল তাকে।”
আনা ফঙ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সে যদি আরেকটু আগে লোকালয়ে পৌছাত আহলে বলে যেতে পারত এতদিন সে কোথায় ছিল।”
গাছের দিক থেকে সরে এল অলিন। “কমিউনিকেশনের সময় হয়েছে, স্যাটেলাইট আপলিংক সেট-আপ করছি আমি। আধ-ঘণ্টার ভেতর কনফারেন্স কল কল করব।”।
“চলুন, আপনাকে সাহায্য করি,” জেন বলল । তার সাথে হাটা শুরু করে দিল সে।
দলের অন্যরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। কেউ কেউ কাঠ জড় করতে গেল, কেউ গেল আশপাশ থেকে ফল সংগ্রহ করতে, বাকিরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল হ্যামোক তৈরিতে। কেলি ব্যস্ত হল তার নিজের ক্যাম্প নিয়ে, মশারি টানাছে একেবারে অভিজ্ঞ মানুষের মত ।
ফ্রাঙ্ক তার পাশেই কাজ করছে। “কেলি…?”
ভাইয়ের কণ্ঠ শুনেই সে বলে দিতে পারে, তার ভাই সতর্কতা বিষয়ক কিছু বলতে যাচ্ছে। “কি ফ্রাঙ্ক” ।
“আমার মনে হয় তোমার ফিরে যাওয়া উচিত।” সে মশারি টানানো বাদ দিয়ে তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
“তুমি কি বলতে চাইছ?”
“আমি ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানের সাথে কথা বলেছি। আজ সকালে যখন উধর্বতন কর্মকর্তাদের কাছে গতরাতের আক্রমনের বিষয়ে রিপোর্ট করেছি, তারা আদেশ দিয়েছে নিরাপদে একটি ক্যাম্প করার পর অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের ফেরত পাঠিয়ে দিতে। প্রায় মরতে বসেছিলাম কাল। তারা চায় না আর কোন প্রাণহানি হোক। পাশাপাশি সিভিলিয়ানদের দেখভাল করতে গিয়ে রেঞ্জাররা স্থবির হয়ে পড়েছে।” ফ্রাঙ্ক পেছনে তাকাল।” আমাদের অনুসন্ধান কাজটি ভালমত চালিয়ে নেবার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে আনা এবং জেনকে ম্যানুয়েল এবং কাউয়ির সাথে এখানে রেখে যাওয়ার।”
“কিন্তু-” “অলিন, নাথান এবং আমি যোগ দেব রেঞ্জারদর সাথে।”
কেলি এবার ঘুরে দাঁড়াল। “আমি অপ্রয়োজনীয় নই, ফ্রাঙ্ক । আমিই এখনকার একমাত্র চিকিৎসক, আর আমি তোমাদের সাথে তাল মিলিয়েই ভ্রমন করতে পারছি এই জঙ্গলে।”
“কর্পোরাল ওকামোটো একজন প্রশিক্ষিত ফিল্ড চিকিৎসক।”
“ঐ প্রশিক্ষণ তো তাকে ডক্টর অব মেডিসিন বানায়নি।”
“কেলি…”
‘ফ্রাঙ্ক, এটা করতে দিও না।”
সে তার চোখের দিকে তাকাতে পারল না। “সিদ্ধন্তটা নেয়া হয়ে গেছে এরইমধ্যে।”
কেলি তার চোখে চোখ রেখে বলল এবার, সিদ্ধান্তটা তুমি নিয়েছ। এই অপারেশনের নেতা তুমি। অন্য কেউ নয়।”
চোখ তুলে তাকাল ফ্রাঙ্ক। “হ্যা, সিদ্ধান্তটা আমারই ছিল।” কাঁধ ঝাকাল সে, তারপর ঘুরে দাঁড়াল। “আমি তোমাকে ঝুঁকির মধ্যে রাখতে চাই না।”
মাথাটা গরম হয়ে গেল কেলির, রাগে, হতাশায় কাপতে শুরু করল। সে ভাল করেই জানতো সিদ্ধান্তটা তার ভাই-ই নিয়েছে ।।
“আমরা আমাদের বর্তমান জায়গা থেকে একটা জিপিএস লক পাঠাবো স্যাটেলাইটে, আর দু-জন রেঞ্জার রেখে যাব গার্ড হিসেবে। তারপর মূল ক্যাম্পে ফিরিয়ে নিতে সক্ষম এমন একটা হেলিকপ্টার আসামাত্রই একটা টিম এসে তোমাদের নিয়ে যাবে। এই সময়টুকুতে ছয়জন রেঞ্জার সাথে নিয়ে আমরা তিনজন এখান থেকে যাত্রা শুরু করে
দেব।”
“সেটা কখন?”
“বিশ্রামের জন্য ছোট্ট একটা বিরতি নেবার পর। দুপুরের পরপরই আমরা রওনা হব, হাটতে থাকব সূর্যাস্ত পর্যন্ত । আমরা এখন ক্লার্কের পথটাতেই আছি। একটা ছোট দল হলে খুব দ্রুত এগোতে পারব।”।
চোখ বন্ধ করে সশব্দে নিঃশ্বাস ফেলল কেলি। পরিকল্পনা বেশ ভাল হয়েছে। রোগটা এখানে এবং স্টেটসে যেভাবে ছড়াচ্ছে সে হিসেবে সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। তাছাড়া কিছু পাওয়া গেলে একটা গবেষকদল খুব সহজেই যেকোন সময় এখানে উড়িয়ে আনা যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য। আমার মনে হয় কিছু বলার সুযোগ নেই আর।” চুপ থাকল ফ্রাঙ্ক, বিশ্রামের জন্য হ্যামোক বাধার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে। একটা ডাক পড়তেই অস্বস্তিকর পরিবেশটা কেটে গেল। অলিন ব্যস্ত স্যাটেলাইট লিংকের কাজে। ত্রিপলের নিচে বসে আছে অলিন। ঝুঁকে আছে কিবোর্ডের উপর টাইপ করছে দ্রুত।
“ধ্যাত্ শালা! চ্যানেল ক্লিয়ার পেতে ঝামেলা হচ্ছে, কাজ করে যাচ্ছে সে। “এত ভেঁজা…আহ এই তো, এবার হবে বোধহয়!” উঠে দাঁড়াল সে। “পাওয়া গেছে এতক্ষণ পর।” সাবেক কেজিবি এজেন্ট একপাশে সরে গেলে কেলি বসে পড়ল ফ্রাঙ্কের সাথে । মনিটরের পর্দায় ভেসে উঠল একটি মুখ। ক্রমাগত কাঁপছে সেটা, ক্ষুদ্র অংশে ভাগ হয়ে যাচ্ছে বার বার ।
“সর্বোচ্চ এতটুকুই করতে পেরেছি,” পাশ থেকে অলিন বলল আস্তে করে। মুখটা তার বাবার। তার সেই মুখটা কঠোর দেখাচ্ছে, এমনকি তরঙ্গের এই ব্যতিচারের মধ্যেও। “কাল রাতের খবর শুনেছি আমি,” কথা বলতে শুরু করল সে। “তোমাদের দুজনকেই নিরাপদ দেখে ভাল লাগছে।”
মাথা নেড়ে সায় দিল ফ্রাঙ্ক, “আমরা ভাল আছি, একটু ক্লান্ত, তবে ঠিকই আছি।”
‘আর্মি থেকে পাঠানো রিপোর্টটা পড়েছি আমি, তবে তোমাদের মুখ থেকেই শুনতে চাই কি ঘটেছে।”
কেলি এবং ফ্রাঙ্ক ভয়ঙ্কর প্রাণীদের সম্পর্কে বলে গেল দ্রুত।
“একটা কাইয়ামিআরা?” তার বাবা জিজ্ঞেস করল তাদের বলা শেষ হতেই। চোখ দুটো সরু হয়ে আছে তার। ব্যাঙ এবং মাছের সঙ্কর?”
“সেটাই,” বলল কেলি । ফ্রাঙ্কের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকাল যেন বোঝাতে চাইছে, এমনকি ম্যানুিয়েলও প্রমান করেছে সে এই অভিযানে থাকার উপযুক্ত। “তাহলে তো ঝামেলা চুকেই গেল,” বলল তার বাবা, সোজা হয়ে বসে সরাসরি কেলির দিকে তাকিয়ে। “এক ঘন্টা আগে ফোর্ট ব্যাগ থেকে স্পেশাল ফোর্সের প্রধান আমার সাথে যোগাযোগ করেছিল, সংশোধিত পরিকল্পনাটা আমাকে জানিয়েছে সে।”
“সংশোধিত পরিকল্পনাটা কি?” জেন প্রশ্ন করল পেছন থেকে ।
তার বাবা বলে চলল : “এই অদ্ভুত রোগটা নিয়ে যে কান্ড ঘটছে তার কথা বিবেচনা করে আমিও জেনারেল কাসেনের সাথে সম্পূর্ন একমত হয়েছি, রোগটার সমাধান পেতেই হবে, এদিকে সময় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
কেলি একবার ভাবল তাকে দল থেকে বাদ দেবার ব্যাপারে আপত্তি জানাবে, কেলি ঠোট কামড়ে ধরে নিজেকে সংযত রাখল সে এটা চিন্তা করে যে, তার বাবার কাছ থেকে এ বিষয়ে কোন সাহায্য পাবে না সে। অভিযানের আগে তার বাবা চায় নি সে এখানে অসুক।
ফ্রাঙ্ক মনিটরের দিকে ঝুঁকল। “স্টেটসের কি অবস্থা?”
মাথা ঝাঁকাল তাদের বাবা। “তোমার মাকে দিচ্ছি, সে-ই এসব প্রশ্নের উত্তর দিক, এক পাশে সরে গেল সে।
খুব পরিশ্রান্ত দেখাল লরেনকে, চোখে অবসাদের ছায়া। ” আক্রান্তের সংখ্যা…” একটু কেশে গলাটা পরিস্কার করে নিল । “গত বারো ঘণ্টায় আক্রান্তদের সংখ্যা তিনগুন বেড়েছে।”
ভয়ে কিছুটা নুয়ে পড়ল কেলি, খুব দ্রুতই ছড়াচ্ছে রোগটা।
“বেশির ভাগই ফ্লোরিডার, তবে এগুলো ক্যলিফোর্নিয়া, জর্জিয়া, আলাবামা ও মিসৌরিতেও দেখা যাচ্ছে।”
“ল্যাংলে’র কি অবস্থা?” জিজ্ঞেস করল কেলি, “ইন্সটিটিউটের?”
একটা দৃষ্টি বিনিময় হল তার বাবা-মার মধ্যে। “কেলি…” তার বাবা শুরু করল । তার ভাবভঙ্গি কিছুক্ষণ আগের ফ্রাঙ্কের মতই সতর্ক। “আমি চাই না তুমি আতঙ্কিত হও।” সোজ হয়ে বসল কেলি, তার হৃপিণ্ডটা গলায় উঠে এল সঙ্গে সঙ্গে। আতঙ্কিত হবে না এই শব্দগুলো কখনো কাউকে শান্ত করতে পেরেছে? “কি হয়েছে?”
“জেসি অসুস্থ…”
শেষের কথাগুলো আর স্পর্শ করল না কেলিকে। তার দৃষ্টি অন্ধকার হয়ে এল। ছোঁয়াচে রোগটার কথা জানার পর থেকেই আতঙ্কের সাগরে ভাসছে সে। আমার জেসি অসুস্থ।
তার বাবার নজরে পড়ল কেলির মাথাটা পেছনে হেলে গেছে, ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার মুখ। রীতিমত কাঁপছে সে।
“কেলি,” তার বাবা বলল। “আমরা জানি না এটা ঐ রোগ কিনা। এখন পর্যন্ত এটা সামান্য জ্বর…এরইমধ্যে তাকে দেয়া ওষুধগুলো কাজও করতে শুরু করেছে। আমরা যখন এই কল করতে আসছি সে মজা করে আইসক্রিম খাচ্ছিল, তাকে সুস্থ দেখাচ্ছিল, চটপট করে কথা বলছিল।” তার মা একটা হাত রাখল তার বাবার কাঁধের উপর। তাদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় হল । “এটা সম্ভবত সেই রোগটা নয়, তাই না লরেন?” হাসল তাদের মা। “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! আর কোন উপসর্গ দেখাচ্ছে?”
“না,” নিশ্চিত করল তাদের বাবা ।
কিন্তু কেলির চোখজোড়া স্থির হয়ে হয়ে আছে তার মায়ের উপর । তার মুখের হাসিটা বেশ ক্লান্ত আর দূর্বল দেখাচ্ছে এখন। দৃষ্টিটা নিচে নেমে গেল তার।
চোখজোড়া বন্ধ করে ফেলল কেলি। হায় ঈশ্বর “খুব শীঘ্রই দেখা হচ্ছে তোমার সাথে,” শেষ করল তার বাবা। ফ্রাঙ্ক হাত দিয়ে মৃদু ঠেলা দিল বোনকে। মাথা নেড়ে সায় দিল সে, “হ্যা, শীঘ্রই…”
জেন আবারো কথা বলে উঠল কেলির পেছন থেকে। আপনার বাবা এটা দিয়ে বোঝাতে চাইলেন খুব শীঘ্রই তার সাথে আপনার দেখা হবে? পরিশোধিত পরিকল্পনাটাই বা কি? কি ঘটছে এখানে?”
জেনের কথাটা আমলে না নিয়ে ফ্রাঙ্ক জড়িয়ে ধরল কেলিকে। “জেসি ভাল আছে, ফিসফিস করে বলল তাকে । বাড়ি গিয়েই দেখতে পাবে। তারপর সে ঘুরে দাঁড়াল জেনের দিকে তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য ।
কেলি এখনো অনড় হয়ে বসে আছে ল্যাপটপের সামনে। তার পেছনে বাকযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তার চোখে বার বার ভেসে উঠল তার মায়ের মুখটা। কিকরে হাসিটা মিইয়ে গেল, চোখ দুটো নিচু হয়ে গেল লজ্জায়। যে-কারো থেকেই সে তার মাকে ভাল করে চেনে, এমনকি তার বাবার থেকেও। তার মা তাকে মিথ্যে বলেছে। সে বুঝে গেছে আশ্বস্ত করা কথাগুলোর অন্তরালে লুকিয়ে আছে আরও কিছু।
ঐ রোগটাই হয়েছে জেসির। আর তার মা এটা ভাল করেই জানে। চোখের জল আটকে রাখতে পারল না সে। পরিকল্পনার বদল নিয়ে তর্কে ব্যস্ত থাকায় অন্যেরা লক্ষ করছে না তাকে। সে দু-হাতে মুখটা ঢেকে ফেলল । হায় ঈশ্বর…এটা হতে পারে না!
