আমাজনিয়া – ১১
আকাশপথে আক্রমণ
আগস্ট, ১৪,
দুপুর ১:২৪
আমাজন জঙ্গল
ঘুমাতে পারছে না নাথান যদিও সে তার হামোকে শুয়ে আছে, সে জানে পরবর্তী যাত্রা শুরুর আগে একটু বিশ্রাম নেয়া উচিত। পরবর্তী এক ঘণ্টার মধ্যে তাদের দলটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, কিন্তু তর্ক-বিতর্ক চলছে এখনো। পুরো ক্যাম্পটার উপর চোখ বুলাল সে। অর্ধেকটা ক্যাম্প ঘুমাচ্ছে, বাকি অর্ধেক ব্যস্ত আছে বাদ পড়া বিষয়ে চাপাস্বরে তর্ক করায় ।
“আমরা চুপিসারে তাদের পেছন পেছন যেতে পারি,” জেন বলল। “কি করবে তারা, গুলি করবে আমাদের?”
“আমাদের উচিত তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া, শান্তভাবে বলল কাউয়ি, কিন্তু নাথান জানে এই প্রফেসর দল থেকে বাদ পড়ায় কোন অংশে কম অখুশি নয় টেলাক্স প্রতিনিধি থেকে।
নাথান তাদের দিক থেকে ঘুরে গেল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ঠিকই বুঝতে পারছে। তাদের হতাশা। যদি সে পেছনের মানুষগুলোর একজন হত তার চার হাত-পা বেধে রাখতে হত অভিযান থেকে তাকে বিরত রাখার জন্য । সে একা একাই চালিয়ে নিত তার অভিযান। ঘুরে শোবার কারণে নতুন একটা দৃশ্য এল সামনে, সে দেখল, কেলি তার হ্যামোকে শুয়ে আছে। সে-ই একমাত্র ব্যক্তি যে কোনরকম হাউ-কাউ করে নি। নিশ্চিতভাবেই বোঝা যাচ্ছে তার মেয়ের ব্যাপারটা এখন তার কাছে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে । তার সাথে চোখে চোখ পড়তেই দেখতে পেল কেলির চোখ দুটো কান্নার কারণে ফুলে আছে। ঘুমানোর চেষ্টা বাদ দিয়ে হ্যামোক ছেড়ে উঠে মেয়েটির কাছে গেল নাথান, হাটু ভেঙে বসল তার সামনে।
“জেসি ভাল হয়ে যাবে,” কোমলভাবে বলল সে।
নির্বাক চেয়ে রইল কেলি তার দিকে, তারপর কথা বলল দুঃখভরী দূর্বল কণ্ঠে।“ওর ঐ রোগটা হয়েছে।”
ভ্রু কুঁচকালো নাথান, “তোমার মনের ভয় থেকে এটা বলছ । এমন কোন প্রমান নেই।”
“মার চোখ দেখেই আমি বুঝতে পেরেছি সবটা। আমার কাছ থেকে কোন কিছুই লুকাতে পারে না সে। কখনও না । জেসিরও যে রোগটা হয়েছে তা সে জানে কিন্তু আমাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে।”
নাথান বুঝতে পারছে না কী বলবে। সে মশারির ভেতর দিয়ে তার কাছে গিয়ে একটা হাত রাখল তার কাঁধে। খুব ধীরে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল, চাইছে তার ভেতর শক্তি যোগাতে। তারপর হৃদয়ের আন্তরিকতা দিয়ে কথা বলল সে, কোমলভাবে কিন্তু দৃঢ়তার সাথে, “তুমি যা বলছ তা যদি সত্যি হয় তবে তার সমাধান খুঁজে বের করবই আমরা, কথা দিলাম আমি।”
একটা ক্লান্ত হাসির জন্ম দিল কথাটি। তার ঠোট দুটো নড়ে উঠলেও কোন শব্দ বেরিয়ে এল না। তারপরও, অব্যক্ত কথাগুলো পড়তে পারল নাথান খুব সহজেই। ধন্যবাদ তোমাকে। এক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়তেই পাশ ফিরে মুখ ঢেকে ফেলল কেলি।
উঠে দাঁড়াল নাথান, মেয়েটাকে এ সময় একা থাকতে দেয়া উচিত । সে দেখল ফ্রাঙ্ক এবং ওয়াক্সম্যান মাটিতে একটা ম্যাপ বিছিয়ে সেটা নিয়ে আলোচনা করছে। পেছনে তাকিয়ে কেলিকে একনজর দেখে সে প্রতিজ্ঞাটা আবারো করল নিঃশব্দে। একটা সমাধান আমি খুঁজে বের করবই । যে ম্যাপটা দু-জন পর্যবেক্ষণ করছে সেটা এই ভূ-খণ্ডের একটা টপোগ্রাফিক ম্যাপ । ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান ম্যাপের উপর আঙুল চালিয়ে কিছু একটা দেখাচ্ছে। “এখান থেকে পশ্চিম দিকের বনটা ক্রমে উচু হয়ে পেরুর সীমান্তে গিয়ে মিশেছে। কিন্তু আসলে এটা খাড়া-পাহাড় ও উপত্যকার বিক্ষিপ্ত সংমিশ্রন, একটা সত্যিকারের গোলকধাধা। ঐ অঞ্চলে হারিয়ে যাওয়াটা খুব সাধারণ ব্যাপার হবে।”
“জেরাল্ড ফ্রাঙ্কের চিহ্ন দেয়া জায়গাগুলো ধরে সাবধানে এগোতে হবে আমাদের,” কথাটা বলেই ফ্রাঙ্ক মুখ তুলে নাথানকে দেখে বলল সে, “আপনার ব্যাকপ্যাকটা গুছিয়ে নেয়া দরকার। খুব তাড়াতাড়িই আমরা রওনা হচ্ছি। যতটুকু পারা যায় দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে আমাদের।”
মাথা নেড়ে সায় দিল নাথান। “পাচ মিনিট লাগবে আমার তৈরি হতে।” উঠে দাঁড়াল ফ্রাঙ্ক, “তাহলে গুছিয়ে নেয়া যাক।”
পরবর্তী আধঘণ্টাজুড়ে টিমটা গঠন করা হল। তারা সিদ্ধান্ত নিল রেঞ্জারদের স্যাটকম রেডিও যন্ত্রটা এখানে থেকে যাওয়া দলটির কাছে রেখে যাওয়া হবে, যাতে করে ব্রাজিলিয়ান আর্মি তাদেরকে খুব সহজেই খুঁজে পেতে পারে। যে দলটা এগিয়ে যাবে তারা সিআইএ’র শক্তিশালী স্যাটেলাইট ডিভাইস ব্যবহার করবে বাকিদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য ।
নাথান তার শটগানটা এককঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে ব্যাকপ্যাকটা বাঁধল একটা সুবিধাজনক জায়গায়। পরিকল্পনা করা হল দ্রুততার সাথে এগোনোর সূর্যাস্ত পর্যন্ত পথে কয়েকটা ছোট্ট বিরতি নেয়া হবে। ওয়াক্সম্যান একহাত উঁচু করে সংকেত দিতেই জঙ্গলের ভেতর চলতে শুরু করল দলটি, এর নেতৃত্ব দিচ্ছে কর্পোরাল জ্যাক। যাত্রা শুরু করতেই পেছনের দিকে একবার তাকাল নাথান। সে অবশ্য এরইমধ্যে তার বন্ধু কাউয়ি এবং ম্যানুয়েলকে গুডবাই জানিয়েছে কিন্তু পেছনে তাকিয়ে দেখল বন্ধুদ্বয়ের পেছনে আরও দু-জন দাঁড়িয়ে আছে, তাকিয়ে আছে তার দিকে । দু-জন রেঞ্জার কর্পোরাল জারগেনসেন এবং প্রাইভেট ক্যারেরা । মেয়ে রেঞ্জার তার অস্ত্র উঁচিয়ে বিদায় জানালে নাথানও সাড়া দিল।
ওয়াক্সম্যান মন থেকে চেয়েছিল কর্পোরাল গ্রেইভসকে অন্য দলটার সাথে রেখে যেতে, যেন সে-ও ফিরে যেতে পারে, এটা বিবেচনা করে যে তার ভাই রডনি গ্রেভস মারা গেছে। কিন্তু পাল্টা যুক্তি দেখাল গ্রেভস, “স্যার, এই মিশন আমার ভায়ের জীবন নিয়েছে, সাথে আমার দলের আরও কিছু সহকর্মীর । আপনার অনুমতি নিয়েই আমি এর শেষ দেখতে চাই। আমার ভাইয়ের সম্মানে…আমার ঐসব রেঞ্জার্স ভাইদের সম্মানে।”
মেনে নিল ওয়াক্সমান । আর কোন কথা না বলে দলটি যাত্রা শুরু করল জঙ্গলে।
এতোক্ষণে সূর্যের আলো মেঘ ভেদ করে ছড়িয়ে পড়েছে, বাষ্প-স্নানের পরিবেশ তৈরি কাছে সবুজের ঝাপসা আচ্ছাদনের নিচে। কয়েক মিনিটের মাঝেই ঘেমে চটচটে হয়ে গেল সবার মুখ । নাথান হাটছে ফ্রাঙ্ক ওব্রেইনের পাশে। কয়েক পা হাটার পর পরই মাথার বেসবল ক্যাপটা খুলে কপালে জমে থাকা ঘাম মুছল সে। নাথান একটা রুমাল বেধে নিয়েছে মাথায়, ঘাম আর চোখ পর্যন্ত আসতে পারছে না তার কিন্তু ঘামের নোনতা গন্ধে ছুঁটে আসা কাল-মাছি ও মশার আক্রমণ থেকে বাঁচাতে পারছে না নিজেকে।
এত তাপ আর আদ্রতা এবং নিরবিচ্ছিন্ন ভনভন শব্দ থাকা সত্ত্বেও বেশ ভালই অগ্রসর হল তারা । দু-ঘন্টার মাঝেই নাথান হিসাব করুল সাত মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছে তারা। পশ্চিম দিকেই এগোচ্ছে এখনো । ব্ল্যাকজ্যাক বুটের ছাপ অনুসরণ করেই এগিয়ে যাচ্ছে। তবে নরম কাদায় ছাপগুলো সনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে ক্রমশ, গতকালের বৃষ্টির পানিতে এই অবস্থা। তার সামনেই হাটছে কর্পোরাল ওকামোটো, আবারো বেসুরো গলায় শিস বাজানো শুরু করেছে সে । দীর্ঘশ্বাস ফেলল নাথান। জঙ্গলটাই কি যথেষ্ট বিরক্তির যোগান দিচ্ছে না? হাটা অবস্থাতেই দৃষ্টি সজাগ রাখল সে। যেকোন বিপদ থাকতে পারে : সাপ, ফায়ার-লিয়ানা, পিপড়া-গাছ, অথবা যেকোন কিছু, এরফলে তাদের গতি শ্লথ হয়ে যেতে পারে। সবাই প্রতিটি পানির ধারাই পার হল সতর্কতার সাথে। কিন্তু ঐসব মারাত্মক পিরানহার কোন চিহ্ন দেখা গেল না। নাথান দেখল একটা তিন আঙ্গুলের শ্লথ উচু গাছের ডাল বেয়ে ধীর গতিতে এগিয়ে চলছে, বহিরাগতদের দিকে কোন খেয়ালই নেই ওটার। গাছটার নিচে দিয়ে যাবার সময় সে ওটার যাত্রাপথই দখল ওপরে তাকিয়ে। শ্লথদের সাধারণত শান্ত প্রকৃতির মনে হয় কিন্তু যখন আঘাত পায় ওটার ধারে কাছে আসা যেকোন প্রাণীরই নাড়ি-ভুড়ি বের করে ফেলার সুনাম আছে তাদের। ওদের নখগুলো ক্ষুরধার । কিন্তু এই বৃহৎ প্রাণীটি তার গেছোযাত্রা অব্যাহত রাখল। পেছনের দিকে তাকাতেই আলোর ছোট্ট একটা ঝলকানি তার চোখে পড়ল, মনে হল কোন কিছু থেকে প্রতিফলিত হয়েছে। দূরের কোন উঁচু গাছ থেকে। প্রায় আধমাইল দূরে হবে । বিষয়টা পরীক্ষা করার জন্য থামল নাথান।
“কি হল?” জিজ্ঞেস করল ফ্রাঙ্ক ,নাথানকে থামতে দেখে।
আলোর প্রতিফলনটা উধাও। মাথা ঝাকাল সে। হয়তো কোন ভেজা পাতায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়েছে। “কিছু না,” সে বলল, হাত নেড়ে হাটা চালিয়ে যেতে বলল ফ্রাঙ্ককে।
কিন্তু বিকেলের বাকি সময়টুকুজুড়ে সে অব্যাহতভাবে পেছনে তাকিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে যেতে লাগল। মাথা থেকে এই চিন্তা দূর করতে পারছে না যে, তাদের উপর নজর রাখা হচ্ছে, গোয়েন্দাগিরি করা হচ্ছে উঁচু থেকে। অনুভুতিটা আরও খারাপ হল দিনের আলো শেষ হয়ে আসতেই।
অবশেষে ফ্রাঙ্কের সাথে কথা বলল সে। “কিছু একটা ভাল ঠেকছে না আমার গ্রামে আক্রমণের শিকার হওয়ার পর কিছু একটা খেয়াল করতে ভুলে গিয়েছিলাম আমরা।”
“কি?”
“মনে পড়ে কাউয়ির ঐ অনুমানটির কথা, আমাদেরকে অনুসরণ করা হচ্ছে?”
“কিন্তু সে তো পুরোপুরি নিশ্চিত ছিল না। শুধু গাছ থেকে কিছু ফল ছেড়া ও ঝোপগুলো এলোমেলো দেখা গেছে। পায়ের ছাপ অথবা অন্য কোন বাস্তব প্রমাণ ছিল না।”
নাথান পেছনে তাকাল।” কিন্তু প্রফেসরের কথা যদি ঠিক হয়, তাহলে কারা অনুসরন করছে আমাদের?”
“ঐ গ্রামের ইন্ডিয়ানরা হবে না কারণ ওরা মারা গেছে আমরা গ্রামে ঢোকার আগেই। তাহলে কারা হতে পারে?”
“না, ঠিক সেরকম কিছু হবে না…তবে কেমন যেন একটা প্রতিফলন চোখে পড়ল কিছুক্ষণ আগে । ওটা কিছু না হয়তো।”
মাথা নেড়ে সায় দিল ফ্রাঙ্ক। “সে যা-ই হোক, ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যনকে এটা জানাব আমি। ঠিকমত প্রস্তুত থকলে কেউ কিছু করতে পারবে না এখানে।” হাঁটা থামিয়ে ফ্রাঙ্ক পেছন দিকে রেঞ্জারদের প্রধানের কাছে গেল, সে হাটছে অলিন পাস্তারনায়েকের সাথে।
নাথান তার চারপাশের ছায়াঘেরা জঙ্গলটাকে দেখল। হঠাৎ তার মনে একটা আশংকা জেগে উঠল এ সময়, দলের বাকি সদস্যদের রেখে আসাটা বুদ্ধিমানের মত কাজ হয়েছে কিনা কে জানে।
* * * *
বিকেল ৫:১২
ম্যানুয়েল একটা ব্রাশ দিয়ে টর টরের পশমি লোম আঁচড়ে দিচ্ছে। এটা নয় যে খুব বেশি জীবাণুমুক্ত হতে হবে ওটাকে। জাগুয়ার তার খসখসে জিহ্বা দিয়েই এ কাজটা করে নিয়েছে ভালভাবেই কিন্তু এটা একটা রুটিনমাফিক কাজ হওয়ায় তারা দুজনেই বেশ উপভোগ করে। ম্যানুয়েল ওটার পেটে ব্রাশ চালাতেই চাপাস্বরে গড়গড় করতে লাগল জাগুয়ারটা। ম্যানুয়ালও বিড়বিড় করে কিছু বলতে শুরু করল তবে সেটা আনন্দে নয়, দলটা তাকে এখানে ফেলে গেছে বলে খুব রাগ হচ্ছে তার। পাশ থেকে একটু শব্দ আসতেই মুখ তুলল সে। তাদের টিমের এন্থ্রপলজিস্ট আনা ফঙ।
“আমি কি একটু করতে পারি?” জাগুয়ারটার দিকে দেখাল সে।
কিছুটা বিস্মিত ম্যানুয়েল ভ্রু উঁচু করল। সে আগেও দেখেছে এই মহিলাকে জাগুয়ারটার দিকে চেয়ে থাকতে কিন্তু সে ভেবেছিল এটা যতটা না আগ্রহের কারণে তার চেয়ে বেশি ভয়ের জন্য।
“নিশ্চয়, সে তার পাশের জায়গাটার উপর থাবা দিয়ে বসতে বলল। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল ফঙ। ম্যানুয়েল তার হাতের ব্রাশটা তাকে দিল। “সে সাধারনত পেটে আর গলায় আদর পেতে পছন্দ করে।”
আনা ফঙ সতর্কতার সাথে টর-টরের ঘন পশমে ব্রাশ চালাতে শুরু করল। “এটা খুব সুন্দর। আমার দেশে, মানে হংকঙে আমি চিড়িয়াখানায় জাগুয়ার দেখেছি খাচার ভেতরে, একবার সামনে হাটে একবার পেছনে। কিন্তু আপনার মত কাউকে এভাবে জাগুয়ার পুষতে দেখি নি। এখন সমানে থেকে দেখে বুঝতে পারছি, কত সুন্দর হতে পারে এটা।”
মহিলার কথা বলার ধরনটা পছন্দ করল ম্যানুয়েল। কোমলভাবে পরিস্কার কথা বলে, শব্দচয়নও বেশ ভাল, আর ব্যতিক্রমি শিষ্টাচার।
“আপনি বলছেন সুন্দর? ও আমার খাবারে ভাগ বসায়, আমার দুটো সোফা কামড়ে ছিড়েছে, আর কতগুলো ছেড়া কার্পেট যে বাদ দিয়েছি তার কোন হিসেব নেই।”
তারপরও আনার মুখে হাসি। “ব্যাপারটা নিশ্চয়ই উপভোগ্য?”
একমত হল ম্যানুয়েল কিন্তু এটা কারো সামনে ঘোষণা দিয়ে বলতে অনিচ্ছুক সে। এই বিশালাকারের বেড়ালটাকে সে যে কত ভালবাসে তা প্রকাশ করাটা কাপুরুষোচিত মনে হয়। “খুব জলদিই টরটরকে আমি ছেড়ে দেব।”
চেপে রাখার চেষ্টা করলেও তার কণ্ঠে দুঃখের উপস্থিতি ঠিকই বুঝে ফেলল আনা ফঙ। স্থিরদৃষ্টিতে সে তাকাল ম্যানুয়েলের দিকে, চোখে তার সমর্থনের ছায়া। “আমি নিশ্চিত, তারপরও এটা উপভোগ্য।”
লাজুকভাবে হাসল ম্যানুয়েল। আসলেই উপভোগ্য।
আনা ব্রাশ দিয়ে ম্যাসাজ করে যাচ্ছে। তাকে ভাল করে দেখছে ম্যানুয়েল । রেশমি চুলগুলোর একটা গোছা কানের পেছনে গোজা। তার ছোট নাকটা একটু কুঁচকে যাচ্ছে। জাগুয়ারটাকে ব্রাশ করার দিকে মনোযোগ দিতেই।
“সবাইকে বলছি!”
একটা কণ্ঠ চিৎকার দিয়ে উঠল তাদের কাজে বিঘ্ন ঘটিয়ে । ফিরে তাকায় দু-জনেই। কাছেই কর্পোরাল জারগেনসেন রেডিও রিসিভারটা নামিয়ে রেখে মাথা ঝাকিয়ে ঘুরে দাঁড়াল সবার দিকে।
“সবাই শুনুন। আমার কাছে একটা ভাল খবর আর একটা খারাপ খবর আছে।” মৃদু অসন্তোষের দেখা পেল রেঞ্জারটা। “ভাল খবরটা হল ব্রাজিলিয়ান আর্মি আমাদেরকে এখান থেকে নিয়ে যেতে হেলিকপ্টার পাঠিয়েছে।
“আর খারাপটা?” জিজ্ঞেস করল ম্যানুয়েল।
জারগেনসেন ভ্রু কুঁচকালো। “দু-দিনের আগে সেটা এখানে পৌছাচ্ছে না। পুরো অঞ্চলে মহামারিটা যেভাবে ছড়াচ্ছে, এ-সময়ে কোন কপ্টার-প্লেন পাওয়াটা অপ্রত্যাশিত। আর ঠিক এ-মূহূর্তে আমাদেরকে নিয়ে যাবার ব্যাপারটা তেমন গুরুত্বপূর্ণও নয়।”
“দু-দিন?” ব্রাশটা আনার কাছ থেকে নিয়ে বলে উঠল ম্যানুয়েল। কণ্ঠে তার বিরক্তি। ‘তাহলে তো বাকি দলটার সাথে এই দু-দিনে আরো সামনে এগোতে পারতাম।”
“ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানের আদেশ ছাড়া কিছু করা যাবে না,” অপারগতা প্রকাশ করে বলল জারগেনসেন।
“ওয়াওয়েতে রাখা কমানচি হেলিকপ্টারটা আনা যায় না?” জেন জিজ্ঞেস করল নিজের হ্যামোকে আরাম করে শুয়ে থেকেই। তারও চোখেমুখে ক্ষোভ।
প্রাইভেট ক্যারেরা নিজের অস্ত্রটা পরিস্কার করতে করতে জবাব দিল, “ওটা দুই সিটের অ্যাটাক-হেলিকপ্টার। ওই কপ্টারটা রেখে দেয়া হয়েছে অন্যদলটার জরুরি সাহায্যের জন্য।”
মাথাটা দুলিয়ে আড়চোখে কেলির দিকে তাকাল ম্যানুয়েল । সে তার হ্যামোকে শুয়ে আছে। চোখে ক্লান্তি, অবসাদ আর পরাজয়। এই দু-দিনের অপেক্ষাটি সবচেয়ে বেশি খারাপ হবে তার জন্য । অসুস্থ মেয়েকে দেখার জন্য সে অপেক্ষা করতে রাজি নয়।
ব্রাজিল নাট-গাছটার গায়ে ক্লার্কের ছুরি দিয়ে খোদাই করা লেখাটা পরীক্ষা করছিল কাউয়ি, সে এবার আশেপাশে চোখ বুলিয়ে মুখ খুলল, “কেউ কি কোন ধো৺য়ার গন্ধ পাচ্ছ?”
ম্যানুয়েল গন্ধ শোকার চেষ্টা করলেও তেমন কিছু ঠেকল না তার কাছে।
ভ্রু উঁচু করল আনা। “আমি কিছু একটার গন্ধ পাচ্ছি..”
কাউয়ি খুব দ্রুত গাছটার কাছ থেকে সরে এসে গন্ধটা শুঁকার চেষ্টা করল আবার । দীর্ঘদিন জঙ্গলের বাইরে থাকলেও প্রফেসরটার ইন্ডিয়ান অনুভূতি এখনো প্রখর। “ওদিকে!” সে চিৎকার দিল অপরপ্রান্ত থেকে।
দলটা তার পেনে ছুটতেই ক্যারেরা দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে এম-১৬ রাইফেলটি হাতে নিয়ে নিল। তাদের ক্যাম্প থেকে কিছুটা দক্ষিণ দিকে প্রায় একশ ফিট দূরে, ছায়াঘেরা এক জায়গায় ছোট্ট একটি অগ্নিশিখা জ্বলছে, মাটি থেকে খুব বেশি উপরে উঠছে না শিখাটা, ডাল-পালার আচ্ছাদন ভেদ করে ধূসর ধোঁয়ার শীর্ণ এক রেখা উঠে যাচ্ছে আকাশের দিকে ।
“আমি দেখছি,” বলল জারগেনসেন। “বাকিরা সবাই ক্যারেরার সাথে থাকুন।”
“আমিও আসছি আপনার সাথে,” ম্যানুয়েল বলল। “যদি কেউ থেকে থাকে টর-টর সেটার গন্ধ পাবে।”
জারগেনসেন তার বেল্ট থেকে এম-৯ পিস্তলটা হাতে নিয়ে ম্যানুয়েলের দিকে বাড়িয়ে দিল। দু-জনে খুবই সতর্কতার সাথে এগিয়ে গেল গভীর জঙ্গলের দিকে। হাত দিয়ে ম্যানুয়েল ইশারা করতেই টরটর তাদের আগে এগিয়ে গেল।
তাদের পেছনে সবাইকে একত্র করে আদেশ দিল ক্যারেরা : “সতর্ক থাকুন!”
ম্যানুয়েল অনুসরণ করছে তার পোষাপ্রাণীটাকে তার পাশেই হাটছে কর্পোরাল জারগেনসেন। “আগুনটা মাটির উপরেই জ্বলছে,” ফিসফিস করে বলল ম্যানুয়েল ।
জায়গাটার কাছে পৌছাতেই কর্পোরাল থামার জন্য ইশারা করল। তাদের দুজনের অনুভুতিই এখন প্রখর, দেখছে যেকোন ছায়ার নড়াচড়া, কারো উপস্থিতি আছে কিনা তা বুঝতে কান পেতে আছে, খুঁজছে লুকিয়ে থাকা কোন বিপদের চিহ্ন। কিন্তু পাখির কিচিরমিচিরের সাথে বানরের চিৎকার মিশে সৃষ্ট শব্দজটের মাঝে কাজটা বেশ কঠিন।
তাদের পদক্ষেপ ধীর হয়ে এল আগুনটার আরও কাছে আসতেই। সামনে টর-টরও এগিয়ে গেল, তার সহজাত আচরণ জেগে উঠল আরও কিছু ধোয়া-মগ্ন এলাকার ভেতর কয়েক ফুট যেতেই থমকে গেল সে, গড়গড় করতে শুরু কল। আগুনের দিকে তাকিয়ে কিছুটা পেছনে সরে এল এবার।
প্রাণীটার দেখাদেখি ওরাও থেমে গেল। জারগেনসেন একটা হাত উঁচু করে সতর্কবার্তা দিল ম্যানুয়েলকে। কিছু একটা বুঝতে পেরেছে জাগুয়ারটি। ম্যানুকে একটু নিচু হয়ে ইশারা করে গার্ড পজিশন নিয়ে জারগেনসেন এগিয়ে গেল সামনের দিকে। দমবন্ধ হয়ে এল ম্যানুয়েলের। কর্পোরাল নিঃশব্দে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতেই সতর্কতার সাথে পা ফেলছে। তার হাতের অস্ত্র তাক করা সামনের দিকে।
ম্যানুয়েল তার চারপাশে নজর রাখছে, কান দুটো সজাগ । টরটর ফিরে এসেছে তার পাশে, এখন নিশ্চুপ ওটা, ঘাড়ের লোমগুলো সোজা হয়ে আছে, জ্বলজ্বল করছে সোনালী চোখ দুটো। ম্যানুয়েল শুনতে পেল, জাগুয়ারটা তার পাশে বসে শব্দ করে ঘ্রাণ নিচ্ছে বাতাসে। তার মনে পড়ল নদীর পাশে কালো কুমিরটার মূত্র দেখে জাগুয়ারটার প্রতিক্রিয়ার কথা। কিছু একটার ঘ্রাণ পাচ্ছে সে…এমন কিছু যা তাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে। ম্যানুয়েলের রক্তে অ্যাড্রেনালাইন মাদক নেয়ার প্রভাবে তার অনূভুতি বেশ প্রখর এখন। জাগুয়ারের পরিবর্তে সে নিজেই বিভিন্ন রকম অদ্ভুত গন্ধ পাচ্ছে ধোঁয়াটা থেকে-ধাতব, কটু আর তিক্ত গন্ধ। শুধু মাত্র কাঠ পোড়ান ধোয়া নয় এটা।
ম্যানুয়েল চাইল জারগেনসেনকে সতর্ক করতে, কিন্তু রেঞ্জার এরইমধ্যে অনেকখানিই এগিয়ে গেছে। জ্বলন্ত জায়গাটাকে ভাল করে দেখতেই রেঞ্জারের কঁধজোড়া বিস্ময়ে কেঁপে উঠতে দেখল সে। নিভু নিভু করে জ্বলতে থাকা আগুনটার চারপাশে ঘুরে এল ধীরে ধীরে রেঞ্জার, এখনও দৃষ্টি বরাবর তা করা তার রাইফেল । কিন্তু ভয়ঙ্কর কোন কিছুই বেরিয়ে এল না জঙ্গল থেকে। পুরো দুই মিনিট ধরে জায়গাটা দেখল জারগেনসেন, তারপর ইশারা করল ম্যানুয়েলকে আসতে।
আটকে রাখা বাতাস বুক থেকে বের করে দিয়ে এগিয়ে গেল ম্যানুয়েল পেছনে পড়ে থাকল টর-টর, আগুনের কাছে যেতে এখনো নারাজ সে।
“যে-ই এটা জ্বালিয়ে থাকুক না কেন কাজটা করেই পালিয়েছে” বলল জারগেনসেন। আগুনটার দিকে দেখাল সে। “আমাদেরকে ভয় পাইয়ে দিতেই এটা করা হয়েছে।”
বনের মাটিতে জ্বলতে থাকা আগুনের দিকে ভাল করে দেখার জন্য আরো কাছে এগিয়ে গেল ম্যানুয়েল । যেটা জ্বলছে তা কাঠ নয়, তবে এক ধরণের তৈলাক্ত পদৰ্থ যেটা লতা-পাতাহীন পরিস্কার জায়গার মাটিতে লেপে দেয়া। তীব্র উজ্জ্বল, এখনও জ্বলছে ঠিকই কিন্তু তাপটা খুব কম। এটা থেকে যে ধোঁয়া উঠে আসছে সেটা বেশ সুরভিত আর তীব্র, অনেকটা কস্তুরী দেয়া ধুপ-ধোয়ার মত । কিন্তু যেটা ম্যানুয়েলের অস্থিগুলোকে বরফ শীতল করে দিল সেটা না- ধোয়া না এটার অদ্ভুত জ্বালানী। জিনিসটা হল একটা নকশা।
জঙ্গলের মাটিতে অঙ্কিত যে চিত্রটা জ্বলছে সেটা পরিচিতি সর্পিলাকারের পেঁচা প্রতীক ব্যান-আলির ছাপ । জ্বলছে উজ্জ্বলভাবে বনের ছায়াঘেরা আচ্ছাদনের নিচে।জারগেনসেন বুটের অগ্রভাগ দিয়ে তৈলাক্ত প্রলেপের উপর ডলা দিল। “দাহ্য কিছুর মিশ্রণ।” তারপর অপর পা ব্যবহার করে কিছু মাটি লাথি দিয়ে আগুনের উপর ফেলল সে। ঢেকে গেল অগ্নিশিখটা। ম্যানুয়েলের সহায়তায় আগুনটা নিভিয়ে ফেলল এবার। কাজটা করা হয়ে গেলে বিকেলের আকাশের দিকে উঠে যাওয়া ধোয়াটা অনুসরন করে উপরের দিকে তাকাল ম্যানুয়েল।
“ক্যাম্পে ফেরা উচিত আমাদের।”
মাথা নেড়ে সায় দিল ম্যানুয়েল । তারা পুণরায় বড় ব্রাজিল নাট-গাছটার নিচে ফিরে এল । কি আবিষ্কার করেছে তারা বর্ণনা করল জারগেনসেন।
“আমি ফিল্ড-বেইসে রেডিও করছি। আমরা কি পেলাম সেটা জানাতে হবে ওদের, সে মোটাসোটা রেডিও প্যাক থেকে রিসিভারটা তুলে নিল। কয়েক মুহূর্ত বাদেই মেজাজ খারাপ করা গালি দিয়ে রিসিভারটা আছাড় মেরে রাখল রেঞ্জার।
“কি হল?” জিজ্ঞেস করল ম্যানুয়েল। “পাচ মিনিটের জন্য স্যটিকমের স্যাটেলাইট উইন্ডোটা মিস করেছি আমরা।”
“এটার অর্থ কি?” জানতে চাইল আনা।
জারগেনসেন হাত তুলে রেডিও ইউনিটকে দেখাল, তারপর মাথার উপরের আকাশকে। “মিলিটারিদের স্যাটেলাইট ট্রান্সপন্ডার, মানে-যে যন্ত্রটা আমাদের রেডিও সিগন্যাল গ্রহণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবারো পাঠিয়ে দেয় সেটা আমাদের সীমানার বাইরে চলে গেছে।”
কতক্ষণের জন্য?” “আগামীকাল ভোর চারটা পর্যন্ত।
“অন্য টিমটাকে জানালে কেমন হয়?” জিজ্ঞেস করল ম্যানুয়েল। “পারসোনাল রেডিও ব্যবহার করে?”
“সেটাও চেষ্টা করে দেখা হয়েছে। এই যন্ত্রটার দৌড় মাত্র ছয় মাইল পর্যন্ত । ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানের টিমটাও আমাদের নাগালের বাইরে এখন।”
“তাহলে আমরা এখন বিচ্ছিন্ন?” জিজ্ঞেস করল আনা।
মাথা ঝাকাল জারগেনসেন। “কাল সকাল পর্যন্ত।”
“তারপর?” বিষন্নভাবে হেটে এল জেন, চোখ দুটো বনের দিকে। “দু-দিন ধরে হেলিকপ্টারের জন্য আমরা এখানে অপেক্ষা করতে পারি না।
“আমি একমত,” ভ্রু জোড়া কুঁচকে বলল কাউয়ি গ্রামের ইন্ডিয়ানরা তাদের শাবানোতে একই রকম চিহ্ন দেখেছিল, আর ঐ রাতেই তারা আক্রমণের শিকার হয় পিরানহাসদৃশ প্রাণীগুলোর হাতে।”
। প্রাইভেট ক্যারেরা ঘুরল তার দিকে । “আপনার পরামর্শটা কি?”
এখনো কুঁচকে আছে কাউয়ির ভ্রু। “আমি এখনো নিশ্চিত নই।” প্রফেসরের চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে আকাশের ধোয়াটে মেঘের দিকে। বনটা এখনো ঠাণ্ডা বাস্প নিঃসরণ করছে। তবে আমাদেরকে চিহ্ন দেয়া হয়ে গেছে।”
* * * *
বিকেল ৫:৩৩
ফ্রাঙ্ক এর আগে কখনো সূর্যকে দিগন্ত হেলে পড়তে দেখে খুশি হয় নি। খুব শীঘ্রই থামতে হবে তাদের। এতগুলো ঘণ্টা হেটে আর ছোট বিরতি নিয়ে শরীরের প্রত্যেকটা মাংসপেশিই যন্ত্রণা করছে এখন। একটু সামনে থেকে চিৎকার দিয়ে উঠল একজন। “এদিকে দেখ!”
হাফিয়ে ওঠা দলের সদস্যরা দ্রুত এগিয়ে গেল সেদিকে। ফ্রাঙ্ক ঢালু একটা জায়গা ধরে খানিক ওপর উঠে দেখল কিসের কারণে এমন সতর্কবার্তা। প্রায় আধকিলো মিটার সামনে জঙ্গলটা ভেসে যাচ্ছে একটা ছোট হ্রদের পানিতে। এটার উপরিভাগটা পশ্চিমে ডোবা সূর্যের আলোতে রুপালী পর্দার মত লাগছে। তাদের পথ আটকে দিয়েছে এটা, ছড়িয়ে আছে দুদিকেই মাইলের পর মাইল জুড়ে।
“এটা একটা ইগ্যাপো,” বলল নাথান। “জলমগ্ন বন।”
“এটা তো আমার ম্যাপে নেই, ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান বলল ।
কাঁধ তুলল নাথান । “এরকম জায়গা অনেক আছে আমাজন জুড়ে। বৃষ্টির মাত্রার উপরে নির্ভর করে কিছু টিকে থাকে, কিছু চলে যায়। কিন্তু এই অঞ্চলটা গ্রীষ্মের শেষ অবধি ভেজা থাকায় বোঝা যাচ্ছে, এই হ্রদটি বেশ কিছুদিন ধরেই এখানে আছে।” সামনে দেখাল নাথান। “লক্ষ করুন, এখানকার জঙ্গলটা কিভাবে ভেঙ্গে গেছে, বোঝা যাচ্ছে বছর বছর ধরে জলমগ্নতায় ডুবে আছে এই অঞ্চল।”
ফ্রাঙ্কও দেখল ঘন জঙ্গলটা কিভাবে শেষ হয়েছে সামনে গিয়ে । অবশিষ্ট বলতে যা আছে সেখানে বিশাল কয়েকটি গাছ পানি থেকে উঠে গেছে সোজা। পানিতে ভেসে আছে হাজারখানেক ছোটবড় মাটির ঢিবি। অন্যদিকে, পানির উপরের নীল আকাশটা বেশ খোলা। এত দীর্ঘ সময় শ্যামল-ছায়া মগ্ন থাকার পর এখনকার আলোর কিরণ বেশ তীক্ষ্ণ ও শীতল।
দলটা সতর্কতার সাথে ঢাল বেয়ে নিচে নেমে হাটতে থাকল পানির দিকে। বাতাসটা মনে হল বেশ টাটকা। ভারি জলাভূমির চারপাশজুড়ে কাঁটাযুক্ত ব্ৰমেলিয়াড এবং বৃহদাকৃতির অর্কিড তাদের দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত। মনে হচ্ছে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দের কাছে সদ্য শুরু করা ব্যাঙের ডাকাডাকি হার মেনে গেছে। কাক সারসসহ আরও বেশ কিছু জলচর পাখি মাছ শিকারে ব্যস্ত। তারা কাছে যেতেই একপাল হাঁস উড়াল দিল আকাশে।
পানি থেকে পনের ফিটের মত দূরে থেকে সবাইকে থামতে বলল ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান । “পাড়ের জায়গাটায় ক্লার্কের কোন চিহ্ন আছে কিনা তা দেখব আমরা, তবে তার আগে নিশ্চিত হতে হবে পানির এত কাছে যাওয়াটা নিরাপদ কিনা। আর কোন চমক পেতে চাই না আমি।”
নাথান এগিয়ে এল। “আমাদের কোন সমস্যা হবে না বোধহয়। ম্যানুয়েলের মতে এই পরভোজী প্রাণীগুলো আংশিক পিরানহা । তাই এই ওরা এমন স্থির পানি পছন্দ করবে না। প্রবাহমান পানির স্রোতই এদের বেশি পছন্দ।”
তার দিকে তাকাল ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান। “কিন্ত আমার শেষ অভিজ্ঞতা বলে, পিরানহাগুলো শিকার ধরার জন্য ডাঙ্গায় উঠে আসতেও দারুণ পছন্দ করে।”
ফ্রাঙ্ক দেখল নাথান কিছুটা লজ্জা পেয়ে মাথা নেড়ে সায় দিল । ওয়াক্সম্যান জলাভূমির তীরের দিকে কর্পোরাল ইয়ামিরকে পাঠাল। “দেখা যাক কিছু উঠে আসে কিনা।”
পাকিস্তানি রেঞ্জার তার এম-১৬ উঁচু করে ওটার সাথে যুক্ত লাঞ্চার থেকে একটা গ্রেনেড ছুড়ল পানিতে। বিস্ফোরণের সাথে সাথে অনেকখানি পানি বাষ্প হয়ে উড়ে গেল, ভয়ে ছোটাছুটি করতে শুরু করলো পাখি আর বানরের দল। পদ্মফুলের ছিন্নভিন্ন অংশ বৃষ্টির মত চার পাশের বনজুড়ে বৃষ্টির মত আছড়ে পড়ল পানির সাথে। তারা দশ মিনিটের মত অপেক্ষা করার পরও কিছুই দেখতে পেল না। কোন বিষাক্ত প্রাণী পালিয়ে গেল না এমন আক্রমণের পর অথবা পাল্টা আক্রমণও করল না কেউ।
ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান তার রেঞ্জার দু-জনকে সামনে পাঠাল কোন গাছে নতুন কোন চিহ্ন আছে কিনা তা খুঁজে দেখতে। “সাবধানে থেকো । পানি থেকে দুরে থাকবে। চোখকান খোলা রাখবে।”
খুব বেশি অপেক্ষা করতে হল না তাদের। আবারো এই টিমের ট্র্যাকার কর্পোরাল র্যাকজ্যাক মাত্র দশ মিটার দূরে ডানদিকে পানির উপরে ঝুঁকে পড়া একটি পামগাছের গুড়িতে পরিচিত পলেস্টার কাপড়ের টুকরো আর গাছের গায়ে খোদাই করা লেখা দেখতে পেল। চিহ্নগুলো প্রায় আগেরটার মতই। নামের অক্ষর এবং তীরচিহ্নটা পশ্চিম দিক নির্দেশ করছে আবারো, ঠিক হ্রদের দিকে। পার্থক্যটা শুধু তারিখে।
“৫ই মে,” জোরে পড়ল অলিন। “আগের চিহ্নটা থেকে দুই দিন আগে।” র্যাকজ্যাক দাঁড়িয়ে আছে কয়েক গজ দূরে। মনে হচ্ছে ক্লার্ক এই পথেই এসেছে।”
“কিন্তু তীরটা তো পানির দিকে দেখাচ্ছে,” বলল ফ্রাঙ্ক । চোখ দুটোর উপর ছায়া ফেলতে মাথায় বেসবল ক্যাপটা একটু টেনে দিয়ে পানির দিকে তাকাল। সামনে জলাধার থেকে বেশ দূরে সে দেখতে পেল কিছু উঁচু জমি, এগুলো ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান তার টপোগ্রাফিক ম্যাপে দেখিয়েছিল । লালচে পাহাড়ের একটা সারি দাঁড়িয়ে আছে জঙ্গলের ধারাবাহিকতা ভেঙে দিয়ে, সমতল শীর্ষগুলোর বৃক্ষে আচ্ছাদিত মুকুট পাহাড়গুলোকে সবকিছু থেকে আলাদা করে দিয়েছে।
তার পাশে থাকা কর্পোরাল ওকামোটো একজোড়া বায়নোকুলার এগিয়ে দিল তার দিকে। “এটা দিয়ে দেখুন।”
“ধন্যবাদ।” যথাস্থানে দূরবীনটা ধরল ফ্রাঙ্ক। নাথানকেও দেয়া হল একটা দূরবীন । লেন্সের ভেতর দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল পাহাড় এবং চূড়াগুলো। ছোটছোট জলপ্রপাতে নেমে আসছে উঁচু চূড়া থেকে নিচের জলমগ্ন এলাকা বরাবর। ৰাম্পের ঘন আস্তরণ আটকে আছে পাহাড়গুলোর ঢাল ও বৃক্ষে আচ্ছাদিত চূড়ায়, ফলে নিচ থেকে চূড়া পর্যন্ত দৃশ্যটা অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
“পানির ঐ ছোট্ট ধারা এবং প্রপাতগুলোই এই জলাধারে পানির জোগান দেয়,” বলল। নাথান। “সারা বছর ধরেই জলমগ্ন রাখে জায়গাটা।” ফ্রাঙ্ক দুরবীনটা নামিয়ে রাখল, দেখতে পেল ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান কম্পাস পর্যবেক্ষণে মগ্ন। গাছটার দিকে দেখাল নাথান । ‘বাজি ধরে বলতে পারি এই চিহ্নের দিকেই নির্দেশ করছে। আমি নিশ্চিত, সে এই জলমগ্ন এলাকাটা সম্পূর্ণ ঘুরেই এখানে এসেছিল। সে কাদাময় দীর্ঘ চরটা দেখাল। “পানি ঘুরে আসতে তার কয়েক সপ্তাহ লেগে গেছে।”
নাথানের কণ্ঠে জেগে ওঠা হতাশা ধরতে পারল ফ্রাঙ্ক। তাদেরও একই পরিমাণ সময় লাগবে ওভাবে ঘুরে পার হতে।
ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান কম্পাস থেকে মুখ তুলে পানির দিকে তাকাল ভ্রু কুচকে। “পরবর্তী চিহ্নটা যদি সোজাসুজিই থেকে থাকে তবে সেটাই অনুসরণ করব আমরা।” হাত তুলে পানির দিকে দেখাল সে। “এক সপ্তাহের জায়গায় একদিনেই পার হয়ে যাব আমরা।”
“কিন্তু আমাদের সঙ্গে তো কোন রাবার-বোট নেই,” বলল ফ্রাঙ্ক।
ওয়াক্সম্যান তার দিকে তাকাল চোখ কটমট করে । “আমরা আর্মি রেঞ্জার, বয়স্কাউট না।” বনের দিকে দেখাল সে। “অসংখ্য গাছ পড়ে আছে ওদিকে, আরো আছে একরের পর একরজুড়ে বাঁশ। আমাদের কাছে যে দড়িটুকু আছে তার সাথে চারপাশের লতা দিয়ে একজোড়া ভেলা বানিয়ে ফেলতে পারব আমরা। আমাদেরকে এভাবেই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে : হাতের কাছে যা পাও তা দিয়েই প্রয়োজন মেটাও।” সে দূরে, অপর প্রান্তের দিকে তাকাল।“পথটা দু-মাইলের বেশি হবে না এখান থেকে।”
নাথান মাথা নেড়ে সায় দিল। “দারুন! অনুসন্ধান কাজে অনেকগুলো দিন বাঁচাতে পারব আমরা।”
“তাহলে কাজে নেমে পড়া যাক! রাত নামার আগেই কাজটা শেষ করতে চাই, যেন বাকি সময়টুকু বিশ্রাম নিয়ে সকালেই এটা অতিক্রম করার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারি।” ওয়াক্সম্যান সবাইকে ছোট কয়েকটি দলে ভাগ করে দিয়ে সবগুলোর সমন্বয় করল । গাছগুলোকে বনের ভেতর থেকে গুঁড়িয়ে হাত ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়া হল পানির কাছে, কুড়াল দিয়ে ঝটপট বড় বড় বাঁশ কাটা হল, বাঁধাই এর জন্য সংগ্রহ করা হল শক্ত লতা । যেখানে প্রয়োজন সেখানেই হাত লগাল ফ্রাঙ্ক। প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো এত দ্রুত জলাধারের কাছে জড়ো হতে দেখে বিস্মিত হল সে।শীঘ্রই ভেলার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই সগ্রহ করে ফেলল তারা। সবকিছু জোড়া দিতে লাগল আরও কম সময় । সমানাকৃতির দুটো গাছ রাখা হল পাশাপাশি সমান্তরাল করে, তার উপর দেয়া হল বাঁশের ঘন আর পুরু আস্তরণ। দড়ি ও লতা দিয়ে ভাল করে বাধা হল একটার সাথে আরেকটাকে। প্রথম ভেলাটা ঠেলে কাদার ভেতর দিয়ে পানিতে নামানো হল, আধভাসমান হয়ে থাকল ওটা অগভীর পানিতে, একটা আনন্দ ধ্বনি ভেসে এল রেঞ্জারদের কাছ থেকে । নাথানও যোগ দিল তাদের সাথে। বাশ আর শুকনো পাতা দিয়ে বৈঠা বানাতে প্রস্তুত হয়ে পড়ল সে।
দ্রুত আরও একটা ভেলা বানানো হল। সমগ্র প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে লাগল দুঘণ্টারও কম সময়। ফ্রাঙ্ক দেখল দ্বিতীয় ভেলাটা ভেসে আসছে প্রথমটার পাশেই। এরইমধ্যে সূর্য ডুবতে বসেছে। পশ্চিম আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে লাল-কমলা আর গাঢ় ধুম্রনীলের মিশ্রণে সৃষ্ট আভা। তার চারপাশজুড়ে ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে। জ্বালানো হয়েছে আগুন, ঝোলানো হয়েছে হ্যামোক, রান্না হচ্ছে খাবারও। অন্যদের সাথে যোগ দিতে যাবে ঠিক তখনই আকাশে কিছু একটা দেখল ফ্রাঙ্ক। সূর্যাস্তের উজ্জ্বল আলোর বিপরীতে কালো একটা আঁকাবাঁকা রেখা । ভ্র জোড়া শক্ত করে চোখ দুটো সরু করল সে। কর্পোরাল একামোটো হাতভর্তি কাঠ নিয়ে তাকে অতিক্রম করার সময় ফ্রাঙ্ক তাকে বলল, “আপনার বায়নোকুলারটা একটু দেবেন?”
“নিশ্চয়। আমার ফিল্ড জ্যাকেট থেকে ওটা নিয়ে নিন। সে তার বোঝাটা ঘুরিয়ে ধরল।
ফ্রাঙ্ক তাকে ধন্যবাদ দিয়ে চোখের সামনে তুলে ধরল বায়নোকুলারটা। এমন সময় তার কাছ দিয়ে চলে গেল ওকামোটা। একমুহূর্ত লাগল আকাশে জেগে ওঠা কালো রেখাটা খুঁজে পেতে । ধোয়া? মনে হচ্ছে দূরের পাহাড় থেকে আসছে। কোন লোকালয়ের চিহ্ন? কুণ্ডলী পাকানো কালো রেখাটাকে অনুসরণ করল সে।
“কি দেখছেন আপনি?” নাথান জিজ্ঞেস করল। “ঠিক বুঝতে পারছি না,” আকাশের দিকে আঙুল তুলে দেখাল ফ্রাঙ্ক । “আমার মনে হয় একটা ধোঁয়া। হয়তো অন্য কোন ক্যাম্প বা গ্রাম থেকে আসছে।” ভ্রু কুচকাল নাথান । ফ্রাঙ্কের কাছ থেকে বায়নোকুলারটা নিল সে। “ওটা যা-ই হোক না কেন,” জিনিসটা চোখের সামনে ধরে বলল, “এদিকেই আসছে।”
এমনকি বায়নোকুলার ছাড়াও ফ্রাঙ্ক দেখতে পাচ্ছে নাথানের কথাই ঠিক। ধোয়ার সারিটা তাদের দিকেই এগিয়ে আছে। একটা হাত উচু করল সে। “কিছুই বুঝতে পারছি না। বাতাসটা তো বইছে বিপরীত দিকে!”
“আমি জানি,” বলল নাথান। “এটা ধোঁয়া না। কিছু একটা উড়ে আসছে এদিকে।” “আমি বরং ক্যাপ্টেন কে জানাই।”
শীঘ্রই সবাই বায়নোকুলার নিয়ে উপরের দিকে তাকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কালো রেখাগুলো এখন রুপ নিয়েছে ঘন কালোমেঘে, তেড়ে আসছে সরাসরি তাদের দিকে।
“কি জিনিস ওগুলো?” বিড়বিড় করল ওকামোটো । “পাখি?,বাদুড়?”
“আমার তা মনে হয় না,” বলল নাথান । ধোঁয়াটে কালো রেখাগুলো আরও বেশি মেঘে মনে হচ্ছে কোন বস্তু থেকে, একটা প্রান্তগুলো ওঠা-নামা করছে উত্তাল ঢেউয়ের মত, যেন এক তরঙ্গের জোয়ার-ভাটা ভেসে আসছে সোজা তাদের দিকে।
“তাহলে ওগুলো কি?” বিড়বিড় করে বলল কেউ একজন ।
এক মুহূর্তের মধ্যেই কালোমেঘ তাদের ক্যাম্পের উপরে চলে এল, উড়ে গেল গাছপালার ঠিক উপর দিয়ে। দলটা সাথে সাথে ভারি গুঞ্জনের শব্দও হচ্ছে। জঙ্গলে এত দিন কাটানোর পর এ-ধরনের শব্দ বেশ পরিচিত সবার কাছে কিন্তু এখনকারটা অন্যরকম। আগেরগুলোর চেয়ে বেশি জোরাল।
“পঙ্গপাল,” উপরের দিকে তাকিয়ে বলল নাথান। “লক্ষ-লক্ষ হবে।”
পতঙ্গ-মেঘটা মাথার উপর দিয়ে তাদের অতিক্রম করতেই পেছনেরগুলো গাছের পাতার সাথে সংঘর্ষ হয়ে পটপট করে শব্দ হতে থাকল। বিপদ ভেবে মাথা নিচু করল সবাই কিন্তু পঙ্গপালের ঝাক একটুও না থেমে অতিক্রম করে গেল তাদের। উড়ে গেল পূবদিকে। ঝাঁকের শেষ অংশটা ভারিগুঞ্জনসহ চলে যেতেই বায়নোকুলারটা নিচু করল ফ্রাঙ্ক ।
“কি করছে ওরা? দেশান্তরিত হচ্ছে না কি অন্য কিছু?”
মাথা ঝাকাল নাথান । “জানি না। এই অদ্ভুত আচরন দেখে কিছুই বুঝতে পারছি না।”
“তবে যাই হোক, ওরা চলে গেছে এখন,” উড়ন্ত-প্রদর্শনী থেকে মনোেযোগ সরিয়ে ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান বলল ।
মাথা নেড়ে সায় দিল নাথান। কিন্তু তার দৃষ্টি পূর্ব দিকে যেতেই একটা চোখ সরু হয়ে গেল । “হ্যা, গেছে। কিন্তু ওরা যাচ্ছেটা কোন্ দিকে?”
নাথানের দৃষ্টি অনুসরণ করল ফ্রাঙ্ক। কিছু একটা আছে পূর্ব দিকে। তাদের দলের বাকি অংশটি। ভেতর থেকে উগড়ে আসা ভয় ঢোক গিলে চেপে রাখল সে। কেলি….
* * * *
সন্ধ্যা ৭:২৮
দিনের আলো ফুরিয়ে শেষ আলোটুকু দিগন্তে জমা হতেই কেলি অদ্ভুত একটি শব্দ শুনতে পেল। শোঁ-শোঁ করে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে চারদিকে। সে ব্রাজিল নাট-গাছটার চারদিকে ঘুরে আসতেই তার চোখ দুটো সংকুচিত হল। তীক্ষ শব্দটার উৎস খুঁজতে চেষ্টা করছে সে।
“এটা তুমিও শুনতে পাচ্ছ?” কাউয়ি জিজ্ঞেস করল, গাছটার অপরপ্রান্ত থেকে তার দিকে তাকিয়ে আছে দ্রলোক।
কাছেই রেঞ্জার দু-জন অস্ত্র উঁচু করে দাঁড়িয়ে পড়ল। বাকিরা দুড়ল ক্যাম্পের আগুনের কাছে, শুকনো জঞ্জাল এবং বাঁশের কল্যাণে আগুন জ্বলছে অনকখানি জায়গা নিয়ে। তাদের ক্যাম্পের চারপাশ থেকে কিছু একটা আসছে, এমন একটা কথা ছড়িয়ে পড়ার পর যতটা সম্ভব বেশি আলো জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা কছে তারা। শিখার পাশেই জ্বালানির বিশাল একটা স্তুপ রাখা, বাকি রাতটুকু ভাল করেই পার হয়ে যাবে তাতে।
“শব্দটা বাড়ছে দ্রুত,” বিড়বিড় করল কেলি।
“কি ওটা?” মাথা উঁচু করল কাউয়ি । “ঠিক বুঝতে পারছি না।”
এরইমধ্যে শব্দটা শুনতে শুরু করেছে বাকিরাও। খুব দ্রুত ওটা বেড়ে চরম মাত্রায় গিয়ে পৌছাল । এখন সবাই তাকাচ্ছে আকাশের দিকে। পশ্চিমে সূর্যের আলোকে পেছনে ফেলে একটা ছায়া বেয়ে উঠছে আকাশে, একটা কালোমেঘ ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র । আর ওটা ছুটে আসছে তাদের দিকেই।
“পঙ্গপালের ঝাঁক,” বলল কাউয়ি। কণ্ঠে তার উদ্বেগ। “প্রণয়ের ঋতুতে এমনটা করে এরা, কিন্তু বছরের এই সময়টা তো ওটা করার উপযুক্ত নয়। আর এমন বড় ঝাঁক এর আগে কখনো দেখিনি আমি।”
“এতে কি ভয়ের কিছু আছে?” জারগেনসেন জিজ্ঞেস করল কয়েক পা দূর থেকে।
“সাধারণত নেই, তবে কোন বাগান বা জঙ্গলের ক্ষেত-খামারের জন্য বেশ বিপজ্জনক হতে পারে এরা। পঙ্গপালের বড়সড় একটা ঝক কয়েক মিনিটের মধ্যেই কোন বাগানের পাতা, সবজি, ফল-মূল ছিড়ে সাবাড় করে দিতে পারে।”
“আর মানুষদের?” রিচার্ড জেন জিজ্ঞেস করল ।
“তেমন ভয়ের কিছু নেই। এরা তৃণভোজী, তবে এদের বিরক্ত করলে একটু কামড়ে দিতে পারে। একটা পিনের খেচার চেয়ে বেশি কিছু না ওটা।” কাউয়ি ভাল করে দেখল ঝাঁকটা। “যদি না…”
“কি?” প্রশ্নটা কেলির।
“ব্যান-আলিদের চিহ্ন পাওয়ার পর পরই পঙ্গপালের এমন ঝাক হাজির হল…ব্যাপারটা কাকতালীয় হয়তো, তবু ভাল ঠেকছে না আমার কাছে।”
“নিশ্চিতভাবেই এগুলোর ভেতর কোন সম্পর্ক নেই,” আনা বলল রিচার্ডের পাশ থেকে। ম্যানুয়েল এগিয়ে এল টর-টরকে সাথে নিয়ে। জাগুয়ারটা ঘরঘর শব্দ করছে। পঙ্গপালের সাথে সুর মিলিয়ে আর বিরক্তিভরে ঘুরছে তার মাস্টারের চারপাশে ।
“প্রফেসর, আপনি কি মনে করছেন পঙ্গপালগুলো বিষাক্ত পিরানহাদের মতই হবে। নতুন কোন হুমকি? নতুন একটা আক্রমণ?”
কাউয়ি তাকাল বায়োলজিস্টের দিকে। প্রথমে এখানে চিহ্নটা দেখলাম আর অদ্ভুত এক ঝাঁকের উদয় হল পরপরই।” কাউয়ি লম্বা পা ফেলে তার প্যাকের কাছে গেল।“এটা এমন এক কাকতালীয় ব্যাপার যেটাকে এড়িয়ে যাওয়া উচিত হবে না আমাদের।”
ভয়ের সাথেই কেলি বুঝতে পারল, প্রফেসরের কথাই ঠিক।
“আমরা তাহলে এখন কি করতে পারি?” জারগেনসেন জিজ্ঞেস করল । তাঁর সহকর্মী রেঞ্জার প্রাইভেট ক্যারেরা তার সাথে সাথে আকাশের দিকে চোখ রেখে চলেছে। ঝাঁকের সামনের অংশটা সন্ধ্যার আধারে অদৃশ্য হয়ে গেল মাথার উপর দিয়ে প্রকৃতির আধারের সাথে ছড়িয়ে পড়ছে উড়ে আসা অন্ধকার!
“সবার আগে নিরাপদ আশ্রয়…” উপরের দিকে তাকিয়ে বলল কাউয়ি, সরু হয়ে গেল তার চোখ দুটো। “ওরা প্রায় পৌছে গেছে এখানে সবাই মশারির ভেতরে চলে যান।”
বাধা দিল জেন। “কি”।
“এখনই!” চিৎকার দিল কাউয়ি। সে আরও বেশি উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে তার ব্যাগের ভেতর হাত চালাতে শুরু করুল।
“উনি যা বললেন তা করেন!” অস্ত্রটা কাঁধে ঝুলিয়ে আদেশ দিল জারগেনসেন, আসন্ন যুদ্ধে এই অস্ত্র প্রায় মূল্যহীন।
কেলি দৌড় শুরু করেছে এরইমধ্যে । সে দ্রুত তাবুসদৃশ মশারিতে ঢুকে পড়ল। ঢোকার জায়গাটা বন্ধ করে সেখানে একটা পাথর চাপা দিয়ে মশারির খোলা প্রান্ত দুটিকে আটকে দিল। কাজ শেষ করেই বিছানায় হাত-পা গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকল সে। চারপাশটা একবার চেয়ে দেখল। দলের অন্যরাও ঢুকে গেছে যার যার তাবুতে। প্রত্যেকটা হ্যামোক কাপড় আচ্ছাদিত দ্বীপেরর মত । ক্যাম্পের মাত্র একজন সদস্য এখনো বাইরে দাঁড়িয়ে ।
“প্রফেসর কাউয়ি!” জারগেনসেন তার তাবু থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।
“ওখানেই থাকুন!” ব্যাগের ভেতর বিক্ষিপ্তভাবে হাত চালাতে চালাতে বলল কাউয়ি । সিদ্ধান্তহীনতায় জমে গেল জারগেনসেন ।“কি করছেন আপনি?”
“কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
হঠাৎ আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। বড়-বড় ফোঁটা পাতার উপর পড়ার পরিচিত শব্দ কানে এল সবার। তবে আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে যেটা সেটা মোটেও পানি নয়-কালো রঙের বৃহদাকৃতির পোকাগুলো ডালপালার আচ্ছাদন ভেদ করে নেমে আসছে মাটির দিকে। ঝাঁকটা পৌছে গেছে তাদের কাছে।
কেলি দেখল একটা পোকা এসে পড়ল তার মশারির উপর। তিনইঞ্চি লম্বা প্রাণীটা। পিঠের খোলসটা তেলের মত চকচক কছে ক্যাম্পের আগুনের আলোয় । অবতরণের জায়গাটায় নিজেকে আটকানোর চেষ্টা করতেই পিঠের উপর শরীরের তিনগুন বড় আকৃতির পাখাগুলো কাঁপতে থাকল।
কেলি তার হাত-পাগুলো আরো গুটিয়ে। এর আগেও সে পঙ্গপাল আর এরকম পোকা দেখেছে কিন্তু এখনকারগুলোর মত নয়। ওদের মুখ বলতে বড় বড় দুটি চোয়াল, শূন্যে কামড় কাটছে শব্দ করে। যদিও অন্ধ তবে অনুভূতিহীন নয় এরা। লম্বা শুঁড় মশারির ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে একজোড়া ডিভাইনিং রডের মত ঘোরাচ্ছে এদিক-ওদিক । ওটার আরেক জ্ঞাতি ভাই ধপ করে এসে পড়ল মশারির উপরিভাগে।। একটা আর্তচিৎকার তার মনোযোগ কাউয়ির দিকে নিয়ে গেল। প্রফেসর তার থেকে মিটার পাঁচেক দূরে, এখনো ঝুঁকে আছে আগুনের দিকে। সে একটা পঙ্গপাল জোরে থাবা দিয়ে ফেলে দিল বাহু থেকে।
“প্রফেসর!” চিৎকার দিল জারগেনসেন ।
“যেখানে আছেন সেখানেই থাকুন।” চামড়ার দড়ি দিয়ে বাধা একটি ছোট ব্যাগ খোলায় ব্যস্ত সে। কেলি দেখল তার বাহুতে পঙ্গপাল কামড়ালে সেখান থেকে রক্ত বেরিয়ে আসছে। এতটা দূর থেকেও সে পরিস্কার বুঝতে পারছে ক্ষতটা বেশ গভীর। মনে মনে প্রার্থনা করল পোকাগুলো যেন পিরানহাদের মত বিষাক্ত না হয়।
কাউয়ি আরও ঝুঁকে গেল আগুনের কাছে, উজ্জ্বল আর রক্তিম হয়ে উঠল তার অবয়ব। কিন্তু মনে হল আগুনের তীব্রতা এবং ধোঁয়া পোকাগুলোকে কিছুটা হলেও কোণঠাসা করে রাখতে পারছে। চারপাশের পুরো জঙ্গলজুড়ে পঙ্গপাল ছুটে বেড়াচ্ছে, গুঞ্জন করছে।প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথেই বাড়ছে ওদের সংখ্যা।
“মশারি ছিড়ে ভেতরে চলে আসছে ওরা!” ভয়ে কেঁদে উঠল জেন।
কেলি মনোযোগ ফিরিয়ে আনল তার সামনের পোকাটার দিকে। প্রথম আক্রমণকারীটি ওটার শুঁড় গুটিয়ে নিয়েছে, নিশ্চিত বোঝা যাচ্ছে মশারি কাটতে শুরু করেছে ওটা। সুতোর বুননগুলো ছিড়ে ফেলছে ধারালো দাঁত বসানো চোয়াল দিয়ে। বড়সড় একটা ছিদ্র করে ভেতরে ঢোকার আগেই হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে আঘাত করল কেলি । ছিটকে পড়ে গেল ওটা, তবে মরল না। অন্তত মশারিটা নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচল। এবার ঝুলতে থাকা বাকি পোকাটার পেছনে লাগল সে।
“চড় দিয়ে ফেলে দিন ওগুলোকে!” সবার উদ্দেশে চিৎকার দিয়ে বলল সে। “মশারি ছিড়ে ভেতরে আসার কোন সুযোগ দেবেন না।”
আরো একটা চিৎকার ভেসে এল কাছ থেকেই। “শালা!” লোকটা ম্যানুয়েল । জোরে একটা চড়ের শব্দ হল, সাথে ভেসে এল আরও কিছু গালিগালাজ।
কেলি ভাল করে তাকে দেখতে পারছে না হ্যামোকটা তার পেছনে। “আপনি ঠিক আছেন?”
“একটা নিচ থেকে বেয়ে উঠেছিল!” জোরে বলল মানুয়েল । “সবাই সাবধান! হারামিগুলোর কামড় মারাত্মক। লালা লাগলেই জ্বলছে অ্যাসিডের মত।”
আবারও কেলি প্রার্থনা করল পোকাগুলো যেন বিষাক্ত না হয়। সে ঘুরে ম্যানুয়েলকে দেখার চেষ্টা করল। সর্বোচ্চ যা দেখতে পেল, টরটরটা তার মাস্টারের তাবুর চারপাশে হাটছে, পোকার ঝাক তাকে ঘিরে ফেলেছে চারদিক থেকে। তবে মনে হচ্ছে জাগুয়ারটার শরীরের পশম আর মোটা চামড়া কাজ করছে প্রাকৃতিক বর্ম হিসেবে। একটা পোকা গিয়ে বসল এটার নাকের উপর কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাকে ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিল প্রাণীটা।
এরইমধ্যে পুরো জায়গাটা ভরে উঠেছে পাখার গুঞ্জনে। এমন নিরবিচ্ছিন্ন ভনভন শব্দে কেলির মাথা ঝালাপালা হয়ে গেল । মুহূর্তের মধ্যেই ওদের উপস্থিতি আরও বেড়ে গেলে তাবু থেকে বাইরের দৃশ্য দেখাটা কঠিনই হয়ে পড়ল । মনে হচ্ছে যেন কালো কুয়াশার একটা ঘুর্ণি নেমে আসছে তাদের দিকে। সবকিছু ছেয়ে আছে পোকায় । কামড়ে ছিড়ে নিচ্ছে সামনে যা পাচ্ছে। কেলি আবারো মানোযোগ দিল পোকাগুলো তাড়ানোর কাজে, কিন্তু খুব দ্রুতই এটা পাল্টা আক্রমণের কারণে ব্যার্থ মিশনে পরিণত হল। পোকাগুলো সব জায়গা থেকেই ছুটে আসছে। ওদের সাথে যুদ্ধ করার সময় কপাল থেকে ঘাম গড়িয়ে পড়ল চোখের উপর । আতঙ্ক আরও বেড়ে গেল তার। সে সামনে ঝুলতে থাকা একটা পোকাকে সাই করে উড়িয়ে দিয়ে ভাবল এদের সাথে কোনভাবেই পারবে না। হাল ছেড়ে দিতে হবে। ঠিক তখনই তার চোখে ভেসে উঠল জেসি। মেয়েটা শুয়ে আছে হাসপাতালের বিছানায় । বাহু দুটো প্রসারিত করে দিয়েছে তার বহুদিন না-দেখা মায়ের জন্য, কাঁদছে মা-মা বলে। “না!” আরও আক্রমণাত্মকভাবে পোকাগুলো ঝাড়তে শুরু করল সে, হাল ছেড়ে দেবার প্রশ্নই ওঠে না।
আমি এখানে মরতে চাই না…এভাবে জেসিকে না দেখে মরতে চাই না। সূক্ষ্ম কাটার মত কিছু একটা বিধল তার উরুতে। হাতের তালু দিয়ে পিষে ফেলল পোকাটাকে । আরেকটা এসে পড়ল তার বাহুতে। তীব্র বিরক্তিতে ঝেড়ে ফেলল সেটা। তৃতীয় একটা ঝুলতে থাকল তার চুলে। যুদ্ধ তে করতে ঝড়ের মত চিৎকার তৈরি হল তার বুকের ভেতরে যেটা বেরিয়ে আসতে চাইছে তীব্র বেগে । তার তাবুটা ছিড়ে গেছে। ক্যাম্পের অন্যান্য জায়গা থেকে ভেসে আসছে কান্নার শব্দ। তীব্র আক্রমণের শিকার তারা সবাই।
তারা সবাই হেরে যাচ্ছে।
জেসি! একটা পঙ্গপালকে গলা থেকে ঝেড়ে ফেলে অস্কুটস্বরে বলল কেলি। আমি পারলাম না, বেবি। সরি! আরেকটা হুল ফুটল তার হাটুর নিচে। বৃথাই লাথি দিল সে। চোখ দিয়ে যন্ত্রণা আর হতাশায় পানি ঝরছে। খুব শীঘ্রই দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হল তার। কাশছে সে, গলাটা আটকে আসছে। চোখেও তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেছে। তীব্র গন্ধে দম বন্ধ হবার যোগার হল। বার্নিশ মিশ্রিত মিষ্টি একগন্ধ, মনে হচ্ছে কোন ফায়ারপ্লেসে সবুজ দেবদারু গাছের কাঠ পোড়ন হচ্ছে। আবার কাশল । কি ঘটছে চারপাশে! অশ্রুসিক্ত চোখ দুটো দিয়ে সে দেখল পঙ্গপালের ঘণ ঝকটা পাতলা হয়ে গেছে। যেন কোন ঝোড়ো বাতাসে উড়ে যাচ্ছে ওরা। ঠিক সোজাসুজি সামনে, ক্যাম্পের আগুনটা
স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে দেখল কাউয়ি দাঁড়িয়ে আছে আগুন থেকে খানিকটা দূরে, বড় একটা পামগাছের পাতা দোলাচ্ছে আগুনের উপর, ফলে ওটা থেকে আরও গাঢ় ধোয়া বের হচ্ছে।
‘টক-টক পাউডার!” কাউয়ি বলল তাকে। তার সারা শরীর রক্তাক্ত পোকাগুলোর কামড়ে। মাথাব্যথার একটি ওষুধ…কিন্তু যখন পোড়ান হয় তখন শক্তিশালী পোকানাশকের কাজ করে।”
তার মশারির গায়ে যে পঙ্গপালগুলো আটকে ছিল সেগুলো উড়তে শুরু করল জায়গা ছেড়ে। কেলির অস্পষ্টভাবে মনে পড়ল নাথান তাকে বলেছিল, কিভাবে ইন্ডিয়ানরা তাদের জমির সীমানা নির্ধারণ করার জন্য বাশের টর্চ ব্যবহার করে, আর তাতে একরকম পাউডার পোড়ায় পোকা-নাশক হিসেবে, তাদের ফসলাদি রক্ষা করতে। সে মনে মনে ইন্ডিয়ানদের এমন অসাধারণ উদ্ভাবনকে ধন্যবাদ দিল।
যখন পঙ্গপালোর সংখ্যা দ্রুত কমে এল, কাউয়ি হাত ইশারা করল তার দিকে, তারপর সবাইকে। “চলে আসুন এখানে!” বলল সে। “তাড়াতাড়ি
এক মুহূর্ত ইতস্তত করে হ্যামোক থেকে নামল কেলি, বেরিয়ে এল মশারি থেকে যেটা এখন ছিন্নভিন্ন ন্যাকড়া সাদৃশ্য। মাথা নিচু রেখে আগুনের কাছে পৌছাল সে। পেছনে অনুসরণ করল অন্যেরা । মিষ্টি গন্ধের আতিসহ্যের কারণে দম বন্ধ হয়ে আসছে সবার, কি পোকাগুলো দূরে সরে গেছে। ছত্রভঙ্গ হলো না পঙ্গপালের ঝাঁকটা এখনো ভারি গুঞ্জন করে মাথার উপর ঘুরছে কালোমেঘের মত। দু-একটা কিছুক্ষণ পর পর ছুটে নেমে আসছে তাদের দিকে বোমারু বিমানের মত কিন্তু পিছু হটে যাচ্ছে ধোয়ার কারণে।
“কিভাবে জানলেন আপনি, ধোয়ায় কাজ হবে?” জারগেনসেন জিজ্ঞেস করল । “জানতাম না। মানে নিশ্চিত ছিলাম না আর কি।” একটু দম নিল কাউয়ি, ব্যাখ্যা করতে করতে পাম পাতাটা নাড়িয়ে গেল সে। “জঙ্গলের ঐ ব্যান-আলির জ্বলন্ত সিম্বল…ওটার ধোয়ার পরিমাণ আর গন্ধটা দেখে আমি চিন্তা করলাম এটা কোন ধরনের সংকেত হতে পারে।”
“ধোয়ার একটা সংকেত?” জিজ্ঞেস করল জেন।
“না, গন্ধের সংকেত থেকেও বেশি কিছু বলল কাউয়ি। “কিছু একটা ছিল ঐ ধোঁয়ায় যা এই পঙ্গপালগুলোকে টেনে এনেছে এখানে।”
এমন মন্তব্য শুনে ঘোঁৎ করে উঠল ম্যানুয়েল ।“ফেরোমোন বা এরকম কোন কিছু?”
সম্ভবত, আর এই পুচকে বজ্জাতগুলোকে এমন কিছু করা হয়েছে যে, এখানে একবার আসার পর যেন আশেপাশের সবকিছুই ধ্বংস করে দেয় পুরোপুরি।”
“তার মানে আপনি যা বলছেন তার অর্থ হল মৃত্যুর জন্য আমাদেরকে চিহ্নিত করে দেয়া হয়ে গেছে,” মন্তব্য করল আনা। “পঙ্গপালগুলোকে এখানে পাঠান হয়েছে একটা উদ্দেশ্যে?”
মাথা নেড়ে সায় দিল কাউয়ি। “এই একই ব্যাপার হয়তো ঘটেছে ঐ পিরানহাদের ক্ষেত্রেও, কিছু একটা অবশ্যই তাদেরকে টেনে এনেছিল গ্রামটির দিকে, হয়তো আরেকটা ঘ্রাণের উপস্থিতির কারণে। পানিতে এমন কিছু মেশানো হয়েছিল যার জন্যে মাছগুলো শাবানোর দিকে চলে এসেছিল।” মাথা ঝাঁকাল সে। “আমি পুরোপুরি নিশ্চিত। তবে দ্বিতীয় বারের মত ব্যান-আলি আমাদেরকে ধ্বংস করার জন্য জঙ্গলকে লেলিয়ে দিয়েছে।”
“তাহলে এখন কি করব আমরা?” জিজ্ঞেস করল জেন। “সকাল পর্যন্ত কি পাউডারটা থাকবে?”
চারপাশের অন্ধকারময় ঝাকের দিকে তাকাল কাউয়ি । “না।”
* * * *
রাত ৮:০৫
নাথান ক্লান্ত হয়ে গেছে তর্ক করতে করতে। সে, ক্যাপ্টেন ওয়াম্যান আর ফ্রাঙ্ক এখনো তর্কের মাঝেই ঘুরপাক খাচ্ছে যেটা চলছে গত পনের মিনিট ধরে।
“আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে, দেখতে হবে কি হচ্ছে ওদিকে,জোর দিয়ে বলল সে। “অন্তত একজনকে পাঠান ওদের অবস্থা দেখার জন্য। সে ওখানে গিয়ে আবার ফিরে আসতে পারবে সকালের আগেই।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলল ওয়াক্সম্যান। “ওগুলো পঙ্গপাল ছাড়া কিছুই না, ডা, রান্ড। তারা কোন রকম ক্ষতি না করেই উড়ে গেছে আমাদের উপর দিয়ে কি দেখে আপনার মনে হল বাকিরা বিপদে আছে?”
ভ্রু কুঁচকাল নাথান। “কোন প্রমাণ নেই আমার কাছে, শুধু মন বলছে তাই বললাম । সারা জীবন জঙ্গলে কাটিয়েছি আমি, সে হিসেবে বলতে পারি পঙ্গপালের এমন ঝাঁক সৃষ্টি হওয়াটা অস্বাভাবিক।
ফ্রাঙ্ক প্রথম দিকে নাখানের পক্ষে ছিল কিন্তু ধীরে ধীরে রেঞ্জারদের দেখ-কি-হয় এই যুক্তির দিকেই ঝুঁকে গেল সে।
“আমার মনে হয় ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানের পরিকল্পনাটা বিবেচনা করা উচিত আমাদের। প্রথম কাজ আগামীকাল সকালে যখন স্যাটেলাইটটা মাথার উপর আসবে, আমরা একটা মেসেজ রিলে করে দেব অন্য দলটার কাছে, নিশ্চিত হব তারা ঠিক আছে কিনা।”
“পাশাপাশি,” যোগ করল ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান, “রেঞ্জারদের সংখ্যা এখন ছয়জনে নেমে এসেছে, এখন আরও দু-জন এই ব্যর্থ মিশনে পাঠিয়ে ঝুঁকি নেব না আমি, যেখানে আসলেই বিপদের কোন গন্ধ নেই।”
“আমি একাই যাব,” একটা হাত মুঠি করে বলল নাথান ।
‘আমি তা মেনে নেব না,” প্রস্তাবটি বাতিল করে দিল ওয়াক্সম্যান। “আপনি বিপদের মাঝে ঝাপ দিচ্ছেন, ডা, রান্ড। সকাল হলেই আপনি দেখবেন তারা ঠিক আছে।” ক্যাপ্টেনের দূর্দমনীয় মনোভাবকে নমনীয় করতে নাথান চেষ্টা করছে অন্য কোন উপায় খুঁজতে।
“তাহলে অন্তত একটা রেডিও দিন আমায় । তাদের ধারে-কাছে কোথাও গিয়ে যোগাযোগ করতে পারি কিনা দেখি । আপনার পার্সোনাল রেডিওটার রেঞ্জ কত?”
“ছয় বা সাত মাইলের মত হবে।”
আমরা তো মোটামুটি পনের মাইলের মত এসেছি। তার মানে আট মাইল পেছনে যেতে হবে ওদের নাগাল পেতে। মাঝরাতের আগেই ফিরে আসতে পারব আমি।”
ওয়াক্সম্যান ভ্রু কুঁচকাল।
নাথানের দিকে এক পা এগিয়ে এল ফ্রাঙ্ক। যাই হোক, প্রস্তাবটা কিন্তু মন্দ নয়, ক্যাপ্টেন।” তার বোনকে সে ফেলে এসেছে জঙ্গলে। এখন পর্যন্ত বোনকে নিয়ে দুশ্চিন্তা আর ওয়াক্সম্যানের যৌক্তিক সতর্কতাপূর্ণ মনোভাবের মাঝে সামঞ্জস্য করে আসছে, চেষ্টা করছে আবেগবর্জিত অপারেশন লিডার হতে, নিজস্ব দূর্বলতাকে সংযত রাখতে। “আমি নিশ্চিত ওরা হয়তো ঠিকই আছে,” দ্রুত বলল নাথান। “কি আরও একটু সতর্ক হওয়াতে ক্ষতি কি?…বিশেষ করে গত দুই দিন পর।”
এবার মাথা নেড়ে সায় দিল ফ্রাঙ্ক।
“আমাকে শুধু একটা রেডিও দেয়া হোক,” বলল নাথান। “আর কিছুদরকার নেই। বিরক্তিভরা দম ছেড়ে হার মানল ওয়াক্সম্যান।
“কিন্তু আপনি এক যাচ্ছেন না।” একটা চিৎকার দিতে গিয়েও চেপে রাখল নাথান অবশেষে ।
“আপনার সঙ্গে একজন রেঞ্জার যাবে।”
“এটাই ভাল…” ফ্রাঙ্ককে মনে হল স্বস্তির সাগরে ঝাপ দিয়েছে। নাথানের দিকে ফিরল সে, চোখে তার কৃতজ্ঞতা।
ঘুরে দাঁড়াল ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান। “কর্পোরাল রাকজ্যাক! একটু এদিকে আসুন!”
* * * *
রাত ৮:২৩
ম্যানুয়েল এবং অন্যান্যরা আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, ধোঁয়ায় ভরে আছে তাদের চারপাশ। পাউডারের ধোয়াটা নিয়ন্ত্রনে রেখেছে পঙ্গপালদের। আশপাশজুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে ঝাঁকটা, যেন কালো একটা পরিধির ফাঁদে ফেলেছে মানুষগুলোকে। অনেকক্ষশ ধরে আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখ জ্বালা করছে ম্যানুয়েলের। প্রফেসরের টকটক পাউডারটা কতক্ষণ টিকবে আর? এরইমধ্যে পাতলা হয়ে এসেছে ধোয়াটা ।
“এটা নিন!” পেছন থেকে বলল কেলি। দুই ফিটের মত লম্বা একটি বাঁশ এগিয়ে দিল আগুনের পাশে স্তুপ করে রাখা জ্বালানি থেকে নিয়ে, তারপর প্রফেসরের সাথে হাটু ভেঙে বসে কাজ করতে শুরু করে দিল। ইন্ডিয়ান শামান অবশিষ্ট টক-টক পাউডারটুকু দিয়ে সর্বশেষ বাঁশটি প্রস্তুত করছে জ্বালাবার জন্য।
ম্যানুয়েল ভীত-সন্ত্রস্তভাবে পা নাড়ল। শেষ বাঁশটা প্রস্তুত করে উঠে দাঁড়াল কেলি এবং কাউয়ি। আগুনের দিকে তাকিয়ে আছে ম্যানুয়েল । সবাই ঠিক জায়গামত প্যাকটা ঝুলিয়ে নিয়েছে, আর ছোট্ট এক টুকরো বাঁশ ধরে আছে।
“ওকে,” জারগেনসেন বলল। “রেডি?” কোন উত্তর দিল না কেউই। সবার চোখেই প্রতিফলিত হচ্ছে আতঙ্ক। মাথা নেড়ে সায় দিল জারগেনসেন। টর্চগুলোয় আগুন জ্বালান।”
দলবদ্ধভাবে প্রত্যেকেই হাতে ধরে রাখা বাঁশের আগাগুলো ক্যাম্পের আগুনে ছোঁয়ালে পাউডারটা জ্বলতে করল। বাঁশগুলো যখন সবাই উঁচু করে ধরল তখন তাদের মশালগুলো থেকে গাঢ় ধোয়ার কুণ্ডুলি পাকিয়ে উঠতে থাকল উপরে।
“কাছাকাছি রাখুন সবগুলোকে, তবে অনেক উঁচুতে ধরে,” নির্দেশনা দিল কাউয়ি, নিজের মশালটা উচু করে ধরে দেখিয়ে দিল সবাইকে। “দ্রুত এগোতে হবে আমাদের।”
ঢোক গিলল ম্যানুয়েল । পঙ্গপালদের ঘূর্ণায়মান ঝাঁকটার দিকে তাকাল সে। মাত্র দুটো কামড় খেয়েছে কিন্তু এখনও যন্ত্রণা করছে ক্ষতস্থানগুলো। টরটর তার পাশে দাঁড়িয়ে মৃদুভাবে ঠেলছে তাকে, বুঝতে পারছে বাতাসে বিপদের গন্ধ।
‘কাছাকাছি রাখুন সবগুলো,” আগুন থেকে সরে গিয়ে অপেক্ষমান ঝাঁকটার দিকে এগিয়ে যেতেই ফিসফিস করে বলল কাউয়ি । পরিকল্পনাটা হল টক-টক পাউডার মেশানো মশালগুলো দিয়ে ঝাকটাকে ছত্রভঙ্গ করে কোণঠাসা করে ফেলা। যাতে করে জায়গা ছেড়ে পালায় ওরা । কাউয়ি যেমনটা বলে দিয়েছে প্রথমে, “পঙ্গপালগুলোকে নির্দিষ্ট এই জায়গাতে আনা হয়েছে ব্যান-আলির সিম্বলে লেপ্টে থাকা তৈলাক্ত পার্থটুকু পুড়িয়ে। এখন যদি আমরা এই বিশেষ জায়গা ছেড়ে বেশ দূরে চলে যেতে পারি, হয়তো ওদের হাত থেকে মুক্তি পাব।” পরিকল্পনাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু এছাড়া অন্য কোন উপায় নেই তাদের। শামানের পাউডার ফুরিয়ে যাচ্ছে, যেটুকু আছে তা দিয়ে ক্যাম্পে আগুন এক থেকে দু-ঘণ্টার বেশি জ্বালিয়ে রাখা যেতো না। পাশাপাশি পঙ্গপাল গুলোকেও নাছোড়বান্দা মনে হচ্ছে, কোনভাবেই জায়গাটা ছেড়ে যাচ্ছে না। সুতরাং তাদেরকেই এলাকা ছেড়ে যেতে হবে।
“আসো, টর-টর,” ম্যানুয়েল অনুসরণ করছে কর্পোরাল জারগেনসেনকে। তাদের দলটা এগোচ্ছে ঘণ সন্নিবেশিতভাবে, টর্চগুলো উচু করে ধরে । ম্যানুয়েলের কানে তালা লাগার জোগার হল পোকাগুলোর গুঞ্জনে। সে হাটছে আর প্রার্থনা করছে যেন কাউয়ির
অনুমান সঠিক হয়। কেউ কথা বলছে না। দলটা পা টিপে টিপে ধীর গতিতে হাটছে পশ্চিম দিকে, অন্যদলটা ঠিক যে পথে এগিয়েছে । এটাই তাদের একমাত্র ভরসা এখন । পেছনে তাকাল ম্যানুয়েল। আরামদায়ক উষ্ণ আলো ছড়াতে থাকা ক্যাম্পফায়ারকে দেখে মনে হচ্ছে আগুনের দূর্বল দিপ্তী। মাটিতে ঘুরে বেড়ানো কিছু পঙ্গপাল পা দিয়ে পিষে ফেলল ম্যানুয়েল। কয়েক মিনিট পরই ধীরে দলটা ঢুকে গেল ঘন জঙ্গলে কিন্তু পঙ্গপালের যে মেঘ তার কোন শেষ প্রান্ত দেখা গেল না। এখনো মাথার উপরে ঝাঁক বেধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবদিকেই নজর রাখতে হচ্ছে দলের সবাইকে। পঙ্গপাল ঘিরে আছে সবদিকেই। ভন ভন করছে বাতাসে, আস্তরণ হয়ে ঢেকে আছে গাছের গুড়িগুলো ধারালো দাঁতগুলো আঁচড় কাঁটছে গাছের গায়ে। শুধুমাত্র ধোয়াই দূরে রাখতে পারছে ওদের। ম্যানুয়েল টের পেল তার প্যান্টের নিচের দিকে কিছু একটা সুরসুরি দিছে। সঙ্গে সঙ্গে হাত দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল পঙ্গপালটিকে। সময় যতো গড়াচ্ছে আরও ঘণীভূত হচ্ছে পোকাগুলো।
‘আমার মনে হয় ওদের ঝাঁকটার মাঝামাঝিতে আছি এখন,” মৃদুস্বরে বলল কাউয়ি ।
“কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমাদের অনুসরণ করছে,” আনা বলল। গতি একটু কমাল কাউয়ি, চোখ দুটো সরু হল তার।
“আমি বুঝতে পারছি ঠিক বলছেন আপনি। এবার তাহলে কি করব আমরা?” ফিসফিস করে বলল জেন। “এই মশালগুলো তো খুব বেশিক্ষণ জ্বলবে না। এখন যদি দৌড় দেই তাহলে হয়তো আমরা….
“থামুন…আমাকে ভাবতে দিন একটু!” ধমকের সুরে বলল কাউয়ি। সে ঝাঁকটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল “ওরা কেন আসছে আমাদের পেছনে? যেখানে ওদেরকে ডেকে আনা হয়েছিল সেখানেই আটকে থাকছে না কেন ওরা?”
দলের একেবারে পেছন থেকে ক্যারেরা আস্তে করে বলল, “ওরা হয়তো সেই পিরানহাদের মত কোন প্রাণী। একবার এখানে আসার পর আমাদের গন্ধ পেয়ে গেছে। আমাদেরকে অনুসরন করতে থাকবে ওরা যতক্ষণ না আমাদের ভেতর থেকে দু-একজন শেষ না হচ্ছে।” হঠাৎ একটা বুদ্ধি এল ম্যানুয়েলের মাথায় । “তাহলে ব্যান-আলি যা করেছে তাই কেন করছি না আমরা?”
“কি বলতে চাইছেন?” কেলি বলল ।
“হারামিগুলোকে আরও ভাল কিছু দেয়া যাক।আমাদের রক্তের পেছনে ছুটে আসার চেয়েও মজার কিছু।”
“কি সেটা?”
“ঐ একই ঘ্রাণ যেটা পঙ্গপালগুলোকে এতদূরে টেনে এনেছে। কপোরাল জারগেনসেন এবং আমি আগুনটা নিভিয়ে দিয়েছিলাম যেটা ধোয়াটে ফেরোমোন বা এরকম কিছু একটা তৈরি করছিল, কিন্তু জ্বালানীটা এখনো আছে ওখানে।” সে হাত তুলে জায়গাটা দেখাল।
মাথা নেড়ে সায় দিল জারগেনসেন। “ঠিক বলেছে ম্যানুয়েল । যদি আবারো ওটা জ্বালাতে পারি আমরা…”
উজ্জ্বল হয়ে উঠল কাউয়ির চোখমুখ। “তাহলে নতুন ধোঁয়া এই ঝাঁকটাকে আমাদের থেকে দূরে রাখবে, আটকে রাখবে ওখানে, ঠিক সেই মুহূর্তে পালিয়ে যাব আমরা?”।
“ঠিক তাই,” বলল ম্যানুয়েল।
‘তাহলে এটাই করা যাক,” জেন বলল। “শুধু শুধু অপেক্ষা করছি কেন?”
সামনে এগিয়ে এল জারগেনসেন। “এমন টিমটিমে মশাল নিয়ে সময় কিন্তু খুব বেশি পাওয়া যাবে না। সবাই একেবারে ফিরে গিয়ে ঝুঁকি নেওয়ার কোন মানে হয় না।”
“কি বলছেন আপনি?” জিজ্ঞেস করল ম্যানুয়েল।
সামনে দেখাল জারগেনসেন। “আপনারা সবাই একত্রে রাস্তাটা ধরে এগিয়ে যাবেন আর আমি ফিরে গিয়ে আগুনটা ধরিয়ে দেব।”
এগিয়ে এল মানুয়েল । “আমিও যাব আপনার সাথে।”
“না। কোন সিভিলিয়ানকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলব না আমি।” জোর দিয়ে বলল জারগেনসেন। “তাছাড়া আমি একা কাজটা করলে খুব দ্রুত করতে পারব।”
“কি ”।
“আমরা সময় এবং পাউডার দুটোই আপচয় করছি,” চিৎকার দিয়ে বলল কর্পোরাল । সে ঘুরল তার সহকারী রেঞ্জারের দিকে। ক্যারেরা, এখান থেকে দূরে নিয়ে যান সবাইকে দ্রুত। ওখানে আগুন জ্বালানোর পর পরই আমি আপনাদের কাছে চলে আসতে পারব।”
“জি, স্যার।”
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে জারগেনসেন ঘুরে দাঁড়িয়েই দ্রুত পদক্ষেপে হাটা ধরল ক্যাম্পের দিকে। হাতের মশালটা উঁচু করে ধরা। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার অবয়বটা ডুবে গেল ঝাঁকের ভেতর। শুধুমাত্র পিট পিট করা আলোয় কিছুটা বোঝা যাচ্ছে তার অবস্থান। কিছুক্ষণ পর সেটাও অদৃশ্য হয়ে গেল কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুরতে থাকা ঘন পঙ্গপালের ঝাঁকের আড়ালে ।
“চলুন সবাই!” ক্যারেরা বলল ।
ঘুরে দাঁড়াল দলটিা, আবারো চলতে শুরু করল রাস্তা ধরে । মনে মনে সফলতা কামনা করল ম্যানুয়েল । শেষবারের মত পেছনে একবার দেখে নিয়ে বাকিদের অনুসরন করল সে।
জারগেনসেন ছুটে যাচ্ছে পোকার আস্তরণ ভেদ করে। তার হাতে একটামাত্র মশাল থাকার কারণে পোকারা বেশি পরিমাণে জড়ো হচ্ছে তার চারপাশে। বড় সড় কিছু পোকা তাকে কামড়েছে কয়েক দফায় কিন্তু সেই যন্ত্রণাকে আমলেই নেয় নি সে। একজন রেঞ্জারকে অনেক কঠিন প্রশিক্ষণের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। বিভিন্ন রকম পরিবেশে তাদেরকে মানিয়ে নেবারও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়-পহাড়ে, জঙ্গলে, জলমগ্ন বনে, তুষার আর মরুভূমিতে। কিছু আমাজনের মতো বন আর এরকম অসহ্য মাংসখেকো পোকার ঝাঁকের ভেতর দিয়ে নয় কখনও।
অস্ত্রটা কাঁধে ঝুলিয়ে পিঠে ঝোলান ব্যাগটা আরও উচু করে ধরল একই সাথে দৌড়ানোর সুবিধার জন্য আর বর্ম হিসেবে ওটা ব্যবহার করে পেছনের পোকাগুলো থেকে নিজেকে বাঁচাতে । যদিও সে আতঙ্কিত, একটা অদ্ভুত জয়ের নেশায় রক্ত গরম হয়ে উঠল তার । এটাই সেই কারণ যার জন্য সে রেঞ্জারদের দলে নাম লিখিয়েছে। নিজেকে প্রমাণ
করার মোক্ষম সময় এখন। সত্যিকারের অ্যাকশানের অভিজ্ঞতার স্বাদ পাচ্ছে সে। মিনেসোটার এক পশ্চাৎপদ এলাকার কয়টা কৃষক-ছেলের এটা করার সুযোগ আছে?
সে তার মশালটা সামনের দিকে ঠেলে ধরে ছুটতে থাকল দ্রুত। “মর শালারা!” চিৎকার দিল সে পঙ্গপালদের উদ্দেশ্যে।
ভনভন করতে থাকা পঙ্গপালের আস্তরণে ঢাকা মাটির উপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে জারগেনসেন। পরিত্যাক্ত ক্যাম্পফ্যায়ারটাই তর গন্তব্য। ব্রাজিল নাট-গাছটার চারপাশে ঘুরে এল সে, ব্যান-আলির জ্বলন্ত চিহ্নটা যেখানে আঁকা আছে সেদিকে হাটা ধরল এবার। অনেকটা অন্ধের মতই জায়গাটা অতিক্রম করে গেল সে না দেখেই, তারপর দ্রুত ফিরে এল সেখানে। হাটু ভেঙে বসে পড়ল চিহ্নটার পাশে । “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।”
জারগেনসেন মশালটাকে নরম মাটিতে গেঁথে দিল, তারপর মাটি আর পঙ্গপালে ঢেকে যাওয়া বার্নিশসদৃশ পদার্থ দিয়ে আঁকা চিহ্নটি বের করতে শুরু করল সে। জায়গাটার উপর পঙ্গপালের পুরু আস্তরণ পড়ে আছে। এগুলো হাত দিয়ে সরাতেই বেশ কয়েকটা কামড় খেতে হল তাকে। আরও একটু ঝুঁকতেই চাপা পড়ে থাকা শেষ ধোয়াটুকু তার নাকে প্রবেশ করল-তীব্র আর কটু। প্রফেসরের কথাই ঠিক, এটা নিশ্চয়ই পঙ্গপালদের আকৃষ্ট করেছে।
দ্রুততার সাথে আসল চিহ্নস্টার উপর থেকে আবর্জনা সরাতে লাগল জারগেনসেন, সে জানে না কি পরিমাণ কালো তেল পোড়ানো লাগবে ঝাঁকটার মনোযোগ এদিকে নিয়ে আসতে, কিন্তু তারপরও সে কোন ঝুঁকি নেবে না এখন। দ্বিতীয় বারের মত এখানে ফিরে আসার কোন ইচ্ছে তার নেই। হাটুর উপর ভর দিয়ে ঝুঁকে কাজ কতে করতে আঁঠাল কালো তেলটা হাতে মেখে গেল । চিহ্নটা নিয়ে দ্রুত কাজ করে যাচ্ছে সে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সর্পিল আকারের চিহ্নটার অর্ধেকাংশ দেখা গেল। খুশি হয়ে সোজা হয়ে বসল, একটা বিউটেন লাইটার জ্যাকেট থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আগুন জ্বালাল। লাইটারটা নিচু করল সে তেলের দিকে। “এই তো…জ্বলে ওঠ, বেবি।”
তার প্রার্থণা মঞ্জুর হল । তেলটায় জ্বলে উঠল আগুন আসলেই পদার্থটা এতই দাহ্য যে হঠাৎ করে আগুন ধরে বসল তার তৈলাক্ত হাতের আঙুলে। লাইটারটা ফেলে দিয়ে দ্রুত হাতটা সরিয়ে নিল জারগেনসেন। পুড়ে যাচ্ছে তার আঙুলগুলো। “ধ্যাত্!”
সে অন্য দিকে ঘুরে হাতটা নরম মাটিতে চেপে ধরল আগুন নেভানোর জন্য। এটা করতে গিয়ে দূর্ঘটনাবশত তার বইয়ের খোচা লাগল পাশে পুতে রাখা বাশের মশালে । পড়ে গেল ওটা কাছের ঝোপের উপর, আগুন ছড়িয়ে পড়ল একটা অর্ধবৃত্তাকার পথে। অশ্রাব্য শব্দ বেরিয়ে এল জারগেনসেনের মুখ দিয়ে। মুহূর্তেই মশালটা গর্ত করে যে পাউডারটুকু রাখা ছিল তা ছিটকে পড়ল মাটি এবং ছোট গাছের উপর । হিসহিস শব্দ হল । মশালের অগ্রভাগটা জ্বলছে লাল শিখায় কিন্তু ওটা থেকে কোন ধোয়া বেরুচ্ছে না।
ঝটকা মেরে উঠে দাঁড়াল জারগেনসেন। তার পেছনে ব্যান-আলির সিম্বলটা জ্বলছে উজ্জ্বলভাবে, ঝাঁকটাকে ডাকছে খাবারের দিকে।
“হায় ঈশ্বর!”
প্রথম চিৎকারটা শুনতে পেল কেলি। একটা ভয়ঙ্কর শব্দ প্রত্যেককে যার যার জায়গায় বরফের মত জমিয়ে দিল সেটা।
“জারগেনসেন…” ঝটপট ঘুরে বলল প্রাইভেট ক্যারেরা। কেলি ছুটে গেল রেঞ্জারের পাশে। “ফিরে যেতে পারি না আমরা,” রাস্তা ধরে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে বলল জেন।
দ্বিতীয় আরেকটি ভয় জাগানো আর হতবুদ্ধির চিৎকার ধ্বনিত হল জঙ্গল থেকে । কেলি লক্ষ্য করল পঙ্গপালের ঝাঁকটা হঠাৎ করে যেতে শুরু করেছে তাদের চারপাশ থেকে, ফিরে যাচ্ছে ক্যাম্পের আগের জায়গায়। “ওরা চলে যাচ্ছে!” প্রফেসর কাউয়ি তার পেছন থেকে বলে উঠল। “কর্পোরাল সফল হয়েছে সিম্বলটা আবারো জ্বালাতে।”
এরইমধ্যে যন্ত্রণাকাতর কান্নার শব্দটা আসতে শুরু করেছে নিরবিচ্ছিন্নভাবে, চিকারের ধ্বনিটা দীর্ঘ আর বন্য । কোন রক্তমাংসের মানুষ এমন চিৎকার করতে পারে না।
“তাকে আমাদের সাহায্য করতে যেতে হবে,” ম্যানুয়েল বলল।
ক্যারেরা তার খালি হাতটা দিয়ে ফ্লাশ-লাইট জ্বালিয়ে আলোটা ক্যাম্পের দিকে ফেলল সে। পনের মিটারের মত দূরে পঙ্গপালের ঝকটা এত ঘণীভূত যে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। “সময় বেশি নেই এখন,” বলল সে নরমস্বরে, উচু করল মশালটা। নিভে যাবার আগে পটপট শব্দ শুরু করে দিয়েছে ওটা এরইমধ্যে। “আমরা জানি না জারগেনসেন কতোক্ষণের জন্য ওদের মনোেযোগ ওদিকে সরাতে সক্ষম হবে।”
ম্যানুয়েল ঘুরল তার দিকে। “অন্তত একটা বার চেষ্টা করে দেখি আমরা। হয়তো এখনো বেঁচে আছে সে।”
ঠিক তখনই দূরের কান্নার শব্দটা ম্লান হয়ে এল। ক্যারেরা মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে মাথা দোলালো আক্ষেপে।
“দেখুন!” একটা হাত উচু করে চেঁচিয়ে উঠল আনা
বাঁ দিক থেকে একটা অবয়ব বেরিয়ে এ ঝাঁকের ভেতর থেকে। ফ্লাশ-লাইটের আলো ফেলল ক্যারেরা সেদিকে। “জারগেনসেন!”
দম বন্ধ করে মুখ ঢেকে ফেলল কেলি।
মানুষটাকে চেনার উপায় নেই, মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে আছে পঙ্গপালের চাদরে। নিজের বাহু দুটো হাতড়ে বেড়াচ্ছে এদিক সেদিক অন্ধের মত। পা দুটো ছোটাছুটি করছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। কয়েক পা এভাবে এগিয়েই লতা-পাতায় বেঁধে হোচট খেয়ে পড়ে গেল সে। বসে পড়ল হাটু ভেঙে। এ সময়টুকুতে অস্বাভাবিকভাবে নিশ্চুপ থাকল, শুধুমাত্র বাহু দুটো প্রসারিত করে রাখল সাহায্যের জন্য ।
ম্যানুয়েল মানুষটার দিকে যেতে উদ্যত হল কিন্তু তাকে সামলে রাখল ক্যারেরা । ঝাঁকটা হাটু গেড়ে বসে থাকা মানুষটাকে ঘিরে আছে, গিলে খাচ্ছে তাকে।
“অনেক দেরি হয়ে গেছে,” ম্যানুয়েলকে বলল সে। “আর আমাদের সময়ও ফুরিয়ে আসছে দ্রুত।” তার কথা মেনে নিল ম্যানুয়েল। সঙ্গে সঙ্গে দেখল তার নিজের টর্চের জ্বলন্ত ছাইটুকু পটপট শব্দে ধপ করে জ্বলে উঠল, তারপর নিবু নিবু হয়ে এল। “আমাদের এখান থেকে যতদূরে সম্ভব চলে যেতে হবে, আমাদের এই অমূল্য সুযোগ হারানোর আগেই।”
কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল ম্যানুয়েল নারী রেঞ্জারের কঠিন দৃষ্টির কারণে কাছে। তার কথাগুলো আরও কঠিন শোনাল। “জারগেনসেনের ত্যাগটাকে মূল্যহীন হতে দেব না আমি।”গভীর জঙ্গলের দিকে দেখাল সে।“হাটুন সবাই!”
সামনে যাত্রা করতেই পেছনে একবার তাকাল কেলি। ঝাঁকটা এখনো আছে তাদের পেছনে, বৈচিত্রহীন কালো মেঘের মত, কি ওটার মাঝে একজন মানুষ আছে যে তার জীবনকে উৎসর্গ করেছে ওদেরকে বাঁচাতে গিয়ে। চোখ দুটো সিক্ত হল তার। অবসাদ এবং হতাশায় অসাড় হয়ে আসছে পা দুটো, বুকটা মনে হচ্ছে অনেক ভারি। কর্পোরালকে হারানো সত্ত্বেও একটা চিন্তা, একটা মুখচ্ছবি এখনো ভেসে উঠছে কেলির অন্তরে-তার মেয়ের চেহারা । ওর কাছে থাকা এখন খুব দরকার। তার মন আচ্ছন্ন হয়ে উঠল জ্বরে শয্যাশায়ী সন্তানের কথা ভেবে। আমি ফিরে আসছি তোমার কাছে, সোনা, মনে মনে বলল সে। কিন্তু একই সাথে তার মনে একটা ভয়ও দানা বেঁধেছে, সে ভাবছে যদি কারো সাথে কোন চুক্তি করা যেত তাদের নিরাপত্তার জন্য তবে সে তাই করত। যতই তারা জঙ্গলের গভীরে ঢুকছে ততই মানুষ কমছে। গ্রেইভস, ডি-মারটিনি, কঙ্গার, জোন্স এবং এখন জারগেনসেন… মাথা ঝাকাল কেলি, আশা হারাবে না সে। যতক্ষণ তার দেহে প্রাণ আছে অন্যদের সাথে এগিয়ে যাবে। বাড়ি ফেরার জন্য একটা পথ সে খুঁজে পাবেই।
পরবর্তী একঘন্টাজুড়ে দলটা সেই পথ অনুসরণ করে সামনে এগোল যেটা তাদের দলের বাকিরা ব্যবহার করে এগিয়ে গেছে গতকাল দুপুরে। এক এক করে নিভে গেল তাদের মশালগুলো। ফ্লাশ-লাইটগুলো হাত বদল হতে থাকল। এখন পর্যন্ত পেছন থেকে নতুন করে কোন পঙ্গপালের চিহ্ন দেখা গেল না তবে কেউই সেটা বড় গলায় বলার সাহসও পেল না।
ম্যানুয়েল হাটছে রেঞ্জারের কাছ দিয়ে । “যদি অন্য দলটাকে খুঁজে না পাই তাহলে কি হবে?” আস্তে করে জিজ্ঞেস করল সে। জারগেনসেনের কাছে আমাদের রেডিও ইকুইপমেন্টটা ছিল। বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ করার একমাত্র মাধ্যম ছিল ওটা।”
কেলি এটা বিবেচনা করে নি এর আগে । রেডিওটা এখন নেই, তার মানে তারা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।
“ওই দলের কাছে আমরা পৌঁছে যেতে পারব,” দৃঢ়তার সাথেই বলল ক্যারেরা।
কেউ কোন তর্ক করল না তার সাথে । কেউ চায়ও না এটা করতে । চুপচাপ গভীর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেল ওরা, সবার মনোযোগ এখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার দিকে। সময় যতই গড়াল দৃষ্টির অস্পষ্টতাজুড়ে ঘণীভূত হতে থাকল ঘুম ক্লান্তি আর সীমাহীন ভয়। তাদের ফেলে আসা রাস্তায় চিহ্ন হিসেবে থেকে যাচ্ছে পেঁচার ডাক এবং অদ্ভুত রকম কান্নার ধ্বনি।
পঙ্গপালের উপস্থিতি আছে কিনা সেজন্যে সবার কান খাড়া হয়ে আছে তাই প্রাইভেট ক্যারেরার ফিল্ড জ্যাকেটে ঝোলান ছোট পারসোনাল রেডিওটা শব্দ করে উঠতেই সবাই খুব কেঁপে উঠল। জোরে, খসখসে আর ভাঙা ভাঙা কিছু শব্দ ভেসে এল ওটা থেকে। “এটা……যদি শুনতে পেয়ে থাকা… রেঞ্জার…”
ঝট করে সবার মুখ রেঞ্জারের দিকে ঘুরে গেল। তাদের চোখগুলো প্রসারিত।
ক্যারেরা হেলমেট থেকে রেডিও মাইক্রোফোনটা নামিয়ে আনল মুখে। “প্রাইভেট ক্যারেরা বলছি। শুনতে পাচ্ছেন আমার কথা? ওভার।”
একটা লম্বা বিরতি, তারপর…“হ্যা পাচ্ছি। আমি রাকজ্যাক বলছি, ক্যারেরা। তোমার অবস্থান জানাও।”
রেঞ্জার দ্রুত সব বলে গেল আবেগবহির্ভূ আর পেশাদারী কণ্ঠে। কিন্তু কেলি দেখল মাইক্রোফোনটা ঠোটের সাথে লাগিয়ে রাখার সময় হাতটা কি পরিমাণে কাপছে তার। কথা শেষ হল এবার।
“আমরা আপনাদের পথেই আসছি । আশা করি নির্ধারিত জায়গায় দু-ঘন্টার মাঝেই দেখা হবে মূল দলটার সাথে।” সাড়া দিল কর্পোরাল রাকজ্যাক, “রজার দ্যাট, ড. রান্ড এবং আমি এরই মধ্যে রওনা দিয়েছি তোমাদের কাছে । ওভার অ্যান্ড আউট “
রেঞ্জার চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেলল শব্দ করে। “আমাদের সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, অনেকটা আপন মনে ফিসফিস করে বলল সে।
পরিত্রাণের একটি গুঞ্জন সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়তেই ঘন জঙ্গলের দিকে তাকাল কেলি। আমাজনের এই জগতে ঠিক থাকা থেকে অনেক দূরে আছে তারা সবাই।
