আমাজনিয়া – ১২
লেক অতিক্রম
আগস্ট ১৫, সকাল ৮:১১
ইন্সটার ইন্সটিটিউট
ল্যাংলে, ভার্জিনিয়া
লরেন তার অফিসের দরজার লকে ম্যাগনেটিক সিকিউরিটি কার্ডটা ঢুকিয়ে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল। কয়েকদিনের মধ্যে এই প্রথম অফিসে আসার সুযোগ পেল সে। ইন্সটিটিউটের হাসপাতাল ওয়ার্ডে জেসিকে দেখা এবং এমইডিইএ’র বিভিন্ন সদস্যদের সাথে একাধিক মিটিঙের কাজগুলো একটানা করতে গিয়ে নিজের জন্য একটা মুহূর্ত বের করারও ফুসরৎপায় নি। এইযে সময়টুকু বের করে নিয়েছে সেটা জেসির ক্রমাগত ভাল হতে থাকা শারিরীক পরিস্থিতির কারণেই। তার তাপমাত্রা এখনো স্বাভাবিক আছে, কথা বলার ধরণটাও প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে সময় গড়ানোর সাথে সাথে । সতর্কতার সাথে আশাবাদী লরেন ভাবতে শুরু করেছে, রোগ নির্ণয়ে তার প্রাথমিক পদ্ধতিটা ভুল ছিল। জেসির হয়তো জঙ্গলের রোগটা হয় নি। তার ভয়টা এখন পর্যন্ত চেপে রাখতে পারায় খুশি হল সে। মার্শাল এবং কেলিকে খামোখাই আতঙ্কিত করে তুলেছিল। ডা, অ্যালভিসের সমীক্ষাগত তত্ত্বের উপর একটু বেশিই আত্মবিশ্বাস স্থাপন করেছিল বলেই এই অবস্থা। কিন্তু এজন্যে মহামারি বিশেষজ্ঞকে কোন দোষ দিচ্ছেনা বা সমালোনা করছে না সে। ডা. অ্যালডিস বেশ দৃঢ়ভাবেই তাকে সতর্ক করেছিল, তার দেয়া ফলাফলটি চূড়ান্ত কোন কিছু নয়। বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত করিয়ে চুড়ান্ত কোন সিদ্ধান্তে আসতে আরও তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
তবে অন্য দিকে, এখনো পর্যন্ত হয়ত সবরকম অনুসন্ধানের মাত্রাগুলোকে প্রায় সংজ্ঞাবদ্ধ করে ফেলেছে তার দেয়া তত্ত্ব । প্রত্যেক দিন ফ্লোরিডা এবং দক্ষিণ আমেরিকায় রোগটা যতই ছড়িয়ে পড়েছে, হাজার হাজার তত্ত্বের জন্ম হচ্ছে মানুষের মাথায়। রোগের কারণ, চিকিৎসা ব্যবস্থা, রোগ নির্ণয় পদ্ধতি, কোয়ারেন্টাইন বিষয়ক পরামর্শ—এসবকিছুই জুড়ে আছে সবার চিন্তা-ভাবনায়। ইন্সটা হয়ে উঠেছে গোটা জাতির চিন্তা-ভাবনা জমা করার কেন্দ্রবিন্দু। এখন তাদের কাজ হল প্রতিনিয়ত জড়ো হতে থাকা এই অসংখ্য পরিমাণ বৈজ্ঞানিক অনুমাণগুলো থেকে আসল তথ্য খুঁজে বের করা। উদ্ভট কল্পনানির্ভর এপিডেমিওলজিক্যাল মডেলের জঞ্জাল ঘেঁটে মুক্তোগুলো আহরণ করা। এটা এক ধরণের নিরুত্সাহসৃষ্টিকারী কাজ, কারণ প্রতিনিয়তই দেশের সবপ্রান্ত থেকে তথ্য আসছে। তবে সেরা মাথাগুলো আছে তাদের ঝুলিতেই।। নিজের সিটে বসে শরীরটা ছেড়ে দিয়ে কম্পিউটারে একটা ক্লিক করল লরেন । মেইলবক্সে নতুন মেইল আসায় টং করে শব্দ হল। একটা ছোট গোঙানি দিয়ে চশমাটা চোখে পরে ঝুঁকে গেল স্ক্রিনের দিকে। তিনশত চৌদ্দটা মেসেজ অপেক্ষা করছে তার জন্য । এটা তো শুধু তার একান্তই ব্যক্তিগত মেইলবক্স। অ্যাড্রেস-লিস্ট ধরে স্ক্রল করে নিচে নামতে থাকল আর প্রতিটা মেইলের বিষয়ের উপর চোখ বুলিয়ে গেল সে। মেইলগুলোর ছোটছোট শিরোনামের ভেতর দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু খুঁজে যাচেছ তার চোখ।
প্রেরক : jptdym@davls.ut.arg
বিষয় : স্যাম্পল স্ট্যান্ডার্ড করার বিষয়ে আলোচনা করা দরকার।
রেফান্সের জায়গা অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের ই-মেইল অ্যাড্রেস।
সে আরও একটু নিচে নামতেই, একটা নামের উপর এসে স্থির হল তার চোখ । কেমন যেন পরিচিত লাগছে নামটা কিন্তু সে কিছুই মনে করতে পারল না। সে তার কম্পিউটারের মাউস পয়েন্টার নামের উপর ধরল লার্জস্কেল বায়োলজিক্যাল ল্যাবস । চিন্তা করতে নাকটা কুঁচকে গেল। তারপরই মনে পড়ল যে-রাতে জেসি জ্বরে পড়ল সেরাতেই তার পেজারে একই ঠিকানা থেকে একটি বার্তা এসেছিল । সময়টাও মনে পড়ল তার-মাঝরাতের পরপরই। কিন্তু জেসির জ্বর পেজারের বার্তা থেকে তার মনোযোগ সম্পূর্ন অন্যদিকে নিয়ে গিয়েছিল । হয়তো তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না তবুও কি মনে করে যেন মেইলটা খুলল সে। কৌতুহলটা তার জেগে উঠেছে এখন। চিঠিটা ভেসে উঠল পর্দায়।
ডা: হাভিয়ের রোভস।
হাসল সে, সঙ্গে সঙ্গে নামটা চিনতে পারল। বছর কয়েক আগে তার একজন গ্র্যাজুয়েট লেভেলের ছাত্র ছিল সে। কাজ শুরু করেছিল ক্যালিফোর্নিয়ার কোন এক ল্যাবে, হয়তো এই একই ল্যাবের ভিন্ন কোন শাখায় । সে তার সেরা ছাত্রদের একজন ছিল। লরেন চেষ্টা-তদবির করেছিল তাকে এমইডিইএ গ্রুপের এখানকার ইন্সটার শাখার শিক্ষানবীশ হিসেবে নিয়োগ দেবার জন্য কিন্তু খুব মার্জিতভাবে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল হাভিয়ের। তার হবু স্ত্রী বার্কলে ইউনিভার্সিটিতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করে, স্বভাবতই স্ত্রীর কাছ থেকে আলাদা হতে চায় নি সে। সাবেক এই ছাত্রের পাঠানো নোটটা পড়ল । পড়া শুরু করতেই ধীরে ধীরে মুছে যেতে লাগল তার ঠোটের কোণে লেগে থাকা হাসি।
ডা: ওব্রেইন আমার এই অনাহুতভাবে নাক গলানোকে ক্ষমা করবেন। আমি গতরাতে আপনার সাথে যোগাযোগ করার জন্য আপনার পেজারে চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু বুঝতে পারছি আপনি খুব ব্যস্ত আছেন। তাই আমি এই সংক্ষিপ্ত বার্তা পাঠালাম। দেশের আরও অনেক ল্যাবের মত আমাদের নিজেরটাও মারাত্মক প্রাণঘাতি রোগ নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছে, পুরোপুরি সমাধান করতে না পারলেও সেই মূল ধাঁধাটার সম্ভাব্য কোন সমাধানের ইঙ্গিত আমরা পেয়েছি : কিসের কারণে রোগটা হচ্ছে? কিন্তু সবার সামনে সেটা প্রকাশ করার আগে আমি আপনার নিজস্ব মতামত প্রার্থনা করছি। লার্জস্কেল বায়োলজিক্যাল ল্যাবে প্রোটিনমিক টিমের প্রধান হিসেবে আমি চেষ্টা করে আসছি মানবজাতির প্রোটিন জিনোমর একটি তালিকা তৈরি কতে, এটা হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট ফর ডিএন-এর মতই আরেকটি প্রজেক্ট। সত্যিকার অর্থে, এই রোগটা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে উল্টো পথেই হাটতে হয়েছে আমাকে। বেশিরভাগ রোগ সৃষ্টিকারী এজেন্ট ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাঙ্গাস, পরজীবি-জীবাণু কিন্তু নিজেরা কোন রোগ সৃষ্টি করে না। তারা যে প্রোটিন উৎপাদন করে সেই প্রোটিনই রোগগুলো সৃষ্টি করে। তাই আমি একটি সম্পূর্ন স্বতন্ত্র ধরণের প্রোটিন খুঁজে ফিরেছি সূক্ষ্মভাবে যেটা সব রোগীর ভেতরেই পাওয়া যাবে। তবে এটার ভাঁজ করা আর পেঁচানো প্যাটার্ন দেখে নতুন একটা চিন্তা এসেছে আমার মাথার। নতুন প্রোটিনটা একটা উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য বহন করছে অন্য একটা প্রোটিনের সাথে যেটার করণে বোভাইন স্পর্মি এনসেফ্যালোপাথি রোগ হয়। সাধারণ মানুষ এটাকে চেনে গবাদিপশুর মস্তিষ্ক প্রদাহজনিত অসুখ হিসেবে। এই আবিষ্কারটা অন্যদিকে আরেকটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আমরা কি তাহলে এই রোগের জন্য ভাইরাস সম্পর্কিত কোন কিছুকে রোগের কারণ হিসেবে ধরে ভুল পথে ছুটে এসেছি? কেউ কি কোন প্রিয়জনকে বিবেচনা করছে রোগের কারণ হিসেবে? আপনার বিবেচনার জন্য আমি প্রোটিনটির একটি মডেল তৈরি করে নিচে দিয়ে দিলাম।
নাম : অজ্ঞাত প্রোটিন
উপাদান : ভাঁজকরা প্রোটিন ডুব্লিউ/ডাবল টার্মিনাল আলফা হেলিক্স মডেল :
পরীক্ষণ পদ্ধতি : এক্সরে বিচ্ছুরণ
ইসি নম্বর : ৩.৪.১.১৮
উৎস: রেগী ২৪-বি ১২ আনাওয়াক গোত্র, আমাজনের নিচু এলাকা।
সিদ্ধান্ত : ২.০০ আর-মূল্য: ০.১৪
স্পেসগ্রুপ : পি ২১ ২০ ২১
ইউনিট সেল : ডিম: এ ৬০.৩৪ বি ৫২.০২ সি ৪৪.৬৮
অ্যাঙ্গেলস : আলফা ৯০.০০ বেটা ৯০.০০ গামা ৯০.০০
পলিমার চেইন : ১৫৬এল
রেসিডিউ: ১৪৪
অ্যাটম:১২৮৬
তো এই হল টুইস্টিং পাজল। আপনার বিশাল অভিজ্ঞতাকে আমি খুব মূল্যায়ন করি, ডা: ওব্রেইন, আমার এই মৌলিক তত্ত্বটাকে প্রকাশ করার আগে আপনার সুচিন্তিত মতামত, বিচার-বিশ্লেষণ প্রার্থনা করছি ।
আপনার বিশ্বস্ত,
হাভিয়ের রেনল্ডস, পিএইচডি ।
“একটা প্রিয়ন।” লরেন প্রোটিন অণুটার বাহ্যিক গঠনটা দেখল । সত্যি-ই কি এটাই রোগের কারণ হতে পারে? সম্ভাব্যতাটা গভীরভাবে বিবেচনা করল সে। প্রিয়ন শব্দটা ‘প্রোটিনেসিয়াস ইনফেকশাস পার্টিক্যাল’-এর বৈজ্ঞানিক নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। কোন রোগের পেছনে প্রিয়নের ভূমিকা প্রমাণিত হয়েছে গত দশকে, যেটা আবিষ্কার করার জন্য ১৯৯৭ সালে এক আমেরিকান প্রাণ-রসায়নবিদ নোবেল প্রাইজ পান। প্রিয়ন প্রোটিন পাওয়া যায় সবরকম প্রাণির ভেতরে, মানুষ থেকে শুরু করে এক-কোষি প্রাণীতেও। যদিও সাধারণত ক্ষতিকর নয়, তবে তাদের আণবিক গঠনের মধ্যে একটি অদ্ভুত আচরণ আছে। ব্যাপারটা ডা: জেকিল অ্যান্ড মি: হাইড-এর মত । স্বাভাবিক গঠনে থাকাকালীন সময়ে তারা কোন কোষের জন্য নিরাপদ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ কিন্তু এই একই প্রোটিন ভাঁজ হয়ে একটা প্যাচ তৈরি করে নিজের আকার বদলে ফেলে একটা অদ্ভুত বস্তুতে পরিণত হয়, আর এটাই কোষের সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে দুমড়ে-মুচড়ে ধ্বংস করে দেয়। এই প্রভাবটা বাড়তে থাকে দ্রুত। কোন বাহকের শরীরে একবার একটা পেঁচানো প্রিয়ন সৃষ্টি হবার পর ওটা শরীরের অন্যান্য প্রোটিনকেও নিজের মত রূপান্তর করে ফেলতে শুরু করে, ফলে আশেপাশের কোষগুলো একের পর এক আক্রান্ত হতে থাকে। ছড়িয়ে পড়ে অসম্ভব দ্রুত গতিতে। আরও খারাপ দিক হলো বাহক সহজেই আরেক জনের শরীরে এই প্রক্রিয়াটি পরিবাহিত কতে পারে। সংক্রামক হিসেবে এটা অসম্ভব ক্ষমতাশালী।
প্রিয়ন রোগের অস্তিত্বের প্রমান পাওয়া গেছে মানুষ ও জীব-জন্তু উভয়ের মাঝেই। ভেড়ার চর্মরোগ থেকে শুরু করে মানুষের ক্রোইটস ফেল্ট জ্যাকব রোগ পর্যন্ত। যে প্রিয়ন রোগটা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সুপরিচিত সেটা এক প্রজাতি থেকে আরেক প্রজাতির মাঝে পরিবাহিত হয় । ডা. রেনল্ডস তার চিঠিতে সেটা উল্লেখ করেছে বোইন শঞ্জিফর্ম এনসেফ্যালোপ্যাথি, অথবা আরও ভেঙে বললে, ম্যাড কাউ ডিজিজ হিসেবে।
কিন্তু মানুষের নতুন এই রোগগুলো তো ধ্বংসাত্বক হওয়া থেকেও বেশি কিছু। আর কোন জানা রোগ নেই যেটা এমন অনায়াসে ছড়িয়ে পড়তে পারে ,অবশ্য এখনো একটা প্রিয়নকে এই রোগের কারণ হওয়ার সম্ভাবনা থেকে বাতিল করার সম্ভাবনা নেই। সে প্রিয়নদের উপর লেখা গবেষণাপত্র পড়ে জেনেছে জেনেটিক মিউটেনশন-এ তাদের ভূমিকা এবং ওটার উপস্থিতির ব্যাপারে। এখানেও কি প্রিয়নের মতই কিছু একটা ওসব রোগ ঘটাচ্ছে? এটা বাতাস-বাহিত হওয়ার ক্ষেত্রেই বা কতদূর এগিয়েছে? প্রিয়নরা অতিমাত্রায় সূক্ষ্ম ও আকারে ভাইরাস থেকেও ছোট, তাই যেহেতু নির্দিষ্ট কিছু ভাইরাস বাতাস-বাহিত হতে পারে সেহেতু নির্দিষ্ট কিছু প্রিয়নেরও হতে সমস্যা কোথায়?
লরেন কম্পিউটার স্ক্রিনে প্রোটিন মডেলটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ডেস্কের উপর রাখা ফোনটা তুলে নিল। ডায়াল শুরু করতেই একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল তার মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে প্রার্থনা করল তার সাবেক ছাত্রের পর্যবেক্ষণ যেন ভুল হয়।
ফোনের অপরপ্রান্তে রিং হতেই কলটা রিসিভ হল। “ডা. রেনল্ডস, প্রোটিনমিক ল্যাব থেকে বলছি।”
“হাভিয়ের?”
“হুম?”
“ডা. ওব্রেইন বলছি।”
“ডা, ওব্রেইন!” সাবেক ছাত্র কথা শুরু করল উত্তেজনাভরা কণ্ঠে। বেশ রোমাঞ্চিত সে।।
তাকে থামিয়ে দিল লরেন। “হাভিয়ের, তোমার এই প্রোটিন সম্পর্কে আরও জানতে চাই আমি।” তার কাছ থেকে যতটা সম্ভব তথ্য জোগাড় করা প্রয়োজন, যত তাড়াতাড়ি হয় ততই মঙ্গল। যদি বিন্দুমাত্রও সম্ভাবনা থেকে থাকে যে, ডা. রেনল্ডসের তত্ত্বটা সঠিক…
লরেন আরও একবার কেঁপে উঠল কম্পিউটার মনিটরে ভেসে থাকা কাকড়া সদৃশ আণবিক গঠনটার দিকে তাকিয়ে। আরও একটা তথ্য এই প্রিয়নসৃষ্ট রোগ সম্পর্কে জানে সে । আর তার জানামতে ওই রোগের কোন ওষুধ নেই!
* * * *
সকাল ৯:১৮
আমাজন জঙ্গল
অলিন পাস্তারনায়েকের কাঁধের উপর দিয়ে তাকাল নাথান। সিআইএ’র এই কমিউনিকেশন এক্সপার্ট বেশ ত্যাক্ত-বিরক্ত হয়ে উঠছে তার স্যাটেলাইট কম্পিউটার সিস্টেম নিয়ে । সকালের ভ্যাপসা গরম ও তার নিজের আতঙ্কের কারণে ফোটা ফোটা ঘাম পড়ছে কপাল
দিয়ে।
“এখনো নেটওয়ার্ক নেই..ধুর!” নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরল অলিন, চোখদুটো প্রায় বুজে আছে বিরক্তিতে।
“চেষ্টা করে যান,” উৎসাহ দিল ফ্রাঙ্ক অপরপ্রান্ত থেকে।
নাথান তাকাল কেলির দিকে, সে দাড়িয়ে আছে তার ভায়ের পাশে। চোখে দুশ্চিন্তা আর ক্লান্তি। গতরাতের কাহিনীটা কয়েকভাবে শুনেছে নাথান দৈত্যাকার পঙ্গপালের এক ঝাঁক জলন্ত ব্যান-আলি চিহ্নের আকর্ষণে ছুটে এসেছিল। ঘটনা এতটাই লোমহর্ষক যে কল্পনা করা যায় না। তবে জারগেনসেনের মৃত্যুই প্রমান করে ঘটনার সত্যতা।
গতরাতে জলাভূমির তীরে বানানো ক্যাম্পেরই আবার এক সাথে জড়ো হবার পর থেকে রেঞ্জার টিম পাহারা দিয়েছে তাদের। দলটা সারা রাতভর চোখ খোলা রেখেছে চার পাশের বনের মাঝে আশপাশজুড়ে সতর্ক ছিল যেকোন বিপদের জন্য, দৃষ্টি ছিল সজাগ। পঙ্গপালের গুঞ্জন শোনা যায় কিনা সেজন্যে কান খাড়া করে রেখেছিল সবাই। কিন্তু কিছুই ঘটে নি। সূর্যদয় পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টা কেটে গেছে কোনরকম ঘটনা ছাড়াই।
যোগাযোেগ করার স্যাটেলাইট সীমার ভেতর আসতেই বিরতিহীনভাবে অলিন চেষ্টা করে যাচ্ছে স্টেটসের সাথে যোগাযোগ করতে এবং ওয়াওয়ের ফিল্ড-বেইসে খবরটা রিলে করে পাঠাতে। এটা জানানো খুব দরকার, যেহেতু দল নিয়ে তাদের পরিকল্পনা আবারও পরিবর্তন করা হয়েছে । অজানা সব শিকারী তাদের পিছু নেওয়ায় তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সবাই একসাথে জলাধারটা পার হয়ে এগিয়ে যাবে। ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান আশা করছে তারা তাদের পিছু ধাওয়াকারীদের থেকে দু-দিন এগিয়ে যাবে। পার হয়ে যাবার পর ব্যানআলির কোন নৌকা বা কোন চিহ্ন দেখার জন্য ওয়াক্সম্যান পানির ওপর চোখ রাখবে বিরতিহীনভাবে, আর ডাঙ্গায় উঠে দলকে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে গিয়ে অপেক্ষা করবে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার পৌছানোর আগ পর্যন্ত । ওয়াওয়ের ফিল্ড-বেইসের রিজার্ভ ফোর্স থেকে রেঞ্জার এনে প্রত্যেক সিভিলিয়ানের বিপরীতে একজন করে রেঞ্জার রাখার পরিকল্পনা করেছে সে। নতুন এই সৈন্য সামন্ত নিয়ে সে এগিয়ে যাবে জেরাল্ড ক্লার্কের পথ ধরে। তবে এই পরিকল্পনায় একটা সমস্যা আছে। “ল্যাপটপটা খুলে ওটার মাদারবোর্ড বের করতে হবে,” বলল অলিন। “কিছু একটা মনে হয় বিগড়ে গেছে। একটা চিপ খারাপ হয়েছে, নয়তে এই দু-দিনের টানা-হেচড়ায় কোন যন্ত্রাংশ নড়ে গেছে, ঠিক বুঝতে পাছি না । সব খুলে পরীক্ষা করতে হবে।”
ওয়াক্সম্যান তার স্টাফ সার্জেন্টদের সাথে কথা বলার সময় অলিনের কথাটা কানে গেল। “ওসব করার সময় নেই এখন আমাদের হতে। তৃতীয় ভেলাটা তৈরি, পাক্কা চার ঘণ্টা লেগে যাবে পার হতে। যত দ্রুত সম্ভব সামনে এগিয়ে যেতে হবে আমাদেরকে।” জলাধারের দিকে তাকাতেই নাথান দেখল চারজন রেঞ্জার নতুন বানানো ভেলাটার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। দলটা ভারি হয়ে যাবার কারণে নতুন একটা ভেলা বানানোর দরকার পড়ে।
অলিন একটা ছোট ক্রু-ড্রাইভার নিয়ে স্যাটেলাইট-কম্পিউটারের উপর ঝুঁকে পড়ল। “কিন্তু কাউকে আমাদের নাগালের মধ্যে আনার ক্ষমতা আমার নেই। ওরা জানতেও পারবে না আমরা কোথায় আছি।” কব্জির উল্টোপিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছল সে। ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে তার মুখমণ্ডল।
উঠে দাঁড়াল জেন, অস্বস্তির সাথে মুখের একপাশে লাগানো ব্যান্ড এইডের পট্টির উপর হাত বুলালো। পঙ্গপালের কামড়ের কারণে এই ব্যান্ডেজ। “আমরা কাউকে পাঠিয়ে জারগেনসেনের প্যাক থেকে মিলিটারি রেডিওটা নিয়ে আসতে পারি না?” পরামর্শ দিল
সবাই কথা প্রস্তাবের পক্ষে বিপক্ষে বলতে শুরু করে দিল। “অপেক্ষা করতে গেলে আমাদের আরও একটা দিন পার হয়ে যাবে।” ‘ঝুঁকির মুখে পড়বে দলের আরও লোকজনও “কারও কাছে পৌছাতে হবে আমাদের।’
“তার রেডিওটা যে এখনও কাজ করবে সেটা কে বলতে পারে? পঙ্গপালগুলো যা করেছে তাতে তো মনে হয় না ওটা সচল আছে। কভার ছিড়ে ভেতরে ঢুকে গেছে ওরা।”
এসব কথার ঝড়ে বাধা দিল ওয়াক্সম্যান। তার কণ্ঠ গর্জে উঠল। “ভয়ের কোন কারণ নেই এখানে।” মন্তব্যটা সবার উদ্দেশ্যেই ছুঁড়ে দিল সে। “এমনকি বাইরের সাথে যোগাযোগ করতে না-ও পারি ফিল্ড-বেইস আমাদের বর্তমান অবস্থানের কথা জেনে গেছে গতকালের রিপোর্ট থেকে। পূর্ব-পরিকল্পনা অনুয়ায়ী ব্রাজিলিয়ান উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারটি যখন আগামীকাল আসবে, আমরা সেটা পানির ওপার থেকেও শুনতে পাব । তখন ফ্রেয়ার জ্বালিয়ে উপরে ছুঁড়ে দিয়ে তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারব আমরা।”
মাথা নেড়ে সায় দিল নাথান, এই তর্ক-যুদ্ধে অংশ নেয় নি সে। তার মনে শুধু একটাই চিন্তা-সামনে এগিয়ে যাওয়া। ওয়াক্সম্যান আঙুল তুলল অলিনের দিকে। “গুছিয়ে নাও এটা। ওপারে যাবার পর সমস্যাটা নিয়ে কাজ করার যথেষ্ট সময় পাবে তুমি।”
ক্ষান্ত দিয়ে মাথা নেড়ে সায় দিল অলিন। সে তার ছোট্ট ড্রাইভারটা টুলবাক্সের ভেতর চালান করে দিল। সব ঠিকঠাক হয়ে গেলে যে যার মালপত্র গোছগাছ করা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
“অন্তত হাটতে হবে না আমাদের,” বলল ম্যানুয়েল। টর-টরকে ঘুম থেকে জাগাতে যাবার সময় নাথানের কাঁধে চাপড় মারল সে। টরটর ঘুমিয়ে আছে একটা গাছের নিচে। গতরাতের পর থেকে চারপাশে কি ঘটে চলেছে তা নিয়ে কোন কৌতুহলই নেই প্রাণীটার ।
নাথান গলা লম্বা করে এদিক-ওদিক একটু দেখে নিয়ে প্রফেসর কাউয়ির দিকে এগিয়ে গেল। ইন্ডিয়ান শামান দাঁড়িয়ে আছে জলাধারের কাছে, পাইপ ফুঁকে যাচ্ছে একমনে। চোখ দুটো তার বিপদগ্রস্ত, ঠিক কেলির চোখের মতই। যখন নাথান এবং কর্পোরাল রাকজ্যাকের সাথে পালিয়ে আসা দলটার দেখা হল তখন থেকেই প্রফেসরকে অস্বাভাবিক রকম শান্ত আর শোকাহত দেখাচ্ছে । নাথান তার পুরনো বন্ধুর পাশে নিঃশব্দে দাঁড়াল ।
এক মুহূর্ত পর নাথানের দিকে না তাকিয়েই কাউয়ি কথা বলল কোমলস্বরে। “ওরাই…ওই ব্যান-আলিরাই পঙ্গপালগুলোকে পাঠিয়েছিল…” মাথা ঝাকাল শামান। “ওরাই পিরানহা দিয়ে ধ্বংস করেছে ইয়ানোমামোর ছোট গোত্রটিকে। যে ব্লাড-জাগুয়ার গোত্রটি আসলেই জঙ্গলকে নিয়ন্ত্রন করছে। এই মিথটা যদি সত্যি হয়, এরপর কি আছে?” মাথাটা আবার ঝাঁকাল সে।
“তুমি কি নিয়ে এত চিন্তা করছ?”
“ইন্ডিয়ান স্টাডিজের উপর প্রফেসর হয়েছি প্রায় দুই দশক হতে চলল। বেড়ে উঠেছি এই জঙ্গলেই।” কণ্ঠ ধরে এল তার। আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল,.কর্পোরালটা…তার চিৎকার,.”
কাউয়ির দিকে তাকাল নাথান, একটা হাত রাখল তার কাঁধে। “প্রফেসর, তুমি টকটক পাউডার দিয়ে সবাইকে বাচিয়েছ।”
“সবাইকে না,” পাইপে লম্বা এক টান দিয়ে ধোয়া ছাড়ল সে। “আমরা ক্যাম্প ছাড়ার আগেই ব্যান-আলি সিম্বলটা আবারো জ্বালিয়ে দেবার কথা মাথায় আনা উচিত ছিল আমার, যদি এটা করতে পারতাম তরুণ কর্পোরালটা বেঁচে যেত।”
নাথান বেশ জোর দিয়ে কথা বলল। চেষ্টা করল মানুষটার অপরাধবোধ এবং অনুশোচনা ভুলিয়ে দিতে। “নিজেকে অনেক বেশি শাস্তি দিচ্ছ তুমি। কোন গবেষণা বা অভিজ্ঞতাই তোমাকে ব্যান-আলি এবং তাদের জৈবিক আক্রমণ ঠেকাতে প্রস্তুত করতে পারবে না ।কিছু আগে-পরে দেখা গেছে সব কিছুর থেকেই আলাদা এটা।”
কাউয়ি মাথা নেড়ে সায় দিলেও নাথান ঠিক বুঝতে পারল না তার মনটা নরম হল কিনা ।
ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান পনির কাছ থেকে চেঁচিয়ে বলল, “উঠে পড়ুন সবাই। এক একটি ভেলায় পাঁচজন করে উঠবেন।
সে রেঞ্জার এবং সিভিলিয়ানদের সঠিক অনুপাতে ভাগ করতে শুরু করল। নাথানের দলে থাকল কাউয়ি এবং ম্যানুয়েল, সাথে টর-টর। তাদের সাময়িক সঙ্গী হল কর্পোরাল ওকামোটা এবং প্রাইভেট ক্যারেরা। বাঁশ আর কাঠে নির্মিত জলযানের দিকে এগিয়ে গেল সবাই। ভেলার উপরে ওঠার পর ওটার মজবুত গঠন দেখে মুগ্ধ হল কেলি। হাত বাড়িয়ে দিয়ে টর-টরকে ওঠানোর কাজে ম্যানুয়েলকে সাহায্য করল নাথান। ভিজে যাওয়ার ব্যাপারটায় কোন আনন্দ খুঁজে পেল না টর-টর। জাগুয়ারটা নিজের শরীর থেকে পানি ঝাড়তে ব্যস্ত হতেই বাকি দলগুলোও চড়ে বসল যার যার ভেলায়।
পাশেল ভেলায় উপর কেলি এবং ফ্রাঙ্ক দাঁড়িয়ে আছে ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান, কর্পোরাল রাকজ্যাক এবং ইয়ামির সাথে । অবশিষ্ট পাঁচ সদস্য চড়ল শেষের ভেলাটিতে। অলিন তার স্যাটেলাইট যন্ত্রপাতির ব্যাগটা মাথার উপর ধরে খুব সাবধানে এগিয়ে গেল । তাকে উঠতে সাহায্য করল রিচার্ড জেন এবং আনা ফঙ । তাদের দু-পাশে দাড়িয়ে আছে নির্বিকার টম গ্রেইভস আর রগচটা সার্জেন্ট কসটস। সবই ঠিকঠাকমত চড়ার পর লম্বা বাঁশের খুঁটিগুলো লগি হিসেবে ব্যবহার করে প্রত্যেকটা ভেলাকে অগভীর পানি দিয়ে ঠেলে দূরে নিয়ে যাওয়া হল । কিন্তু জলাধারের পাড় হঠাৎ করেই প্রায় খাড়া নিচে নেমে গেছে। পাড় থেকে মাত্র শ’খানেক মিটারের মধ্যেই জলের নিচের মাটির নাগাল পেল না বাশের দীর্ঘ খুঁটিগুলো। তাই বৈঠাগুলো ব্যবহারের জন্য নেওয়া হল। প্রত্যেক ভেলার জন্য চারটি বৈঠা। একজন করে পালাক্রমে সবাই বিরতি পাবে। সবার লক্ষ্য বিরতিহীনভাবে এগিয়ে যাওয়া । ভেলার ছোট বহরটা ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করতেই নাথান বৈঠা চালাতে শুরু করল । পানির বিভিন্ন দিক থেকে ছোট-বড় বেশ কিছু জলপ্রপাতের গর্জন ও ভীতি জাগানো শব্দ প্রতিধ্বণিত হচ্ছে। দূরে তাকাল নাথান, উঁচুভূমিগুলো এখনো আচ্ছন্ন হয়ে আছে কুয়াশায়। বনের গাছ-সবুজ পাহাড়ের লালচে রঙের সাথে মিশেছে পুঞ্জিভূত ঘনকুয়াশার আস্তরণ। তাদের গন্তব্যে পৌছানোর জন্য যে রাস্তাটা নির্বাচিত করা হয়েছে সেটা খাড়া দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু একটি নালা। পাহাড় দুটো সোজা দাঁড়িয়ে আছে, শীর্ষ দুটো সমতল । মাঝের পথটা ধোয়াশাচ্ছন্ন হয়ে বয়ে গেছে উচুঁ ভূখন্ডের ভেতর দিয়ে। এটাই সেই জায়গা জেরাল্ড ক্লার্কের সর্বশেষ খোদাই করা বার্তায় নির্দেশ করা হয়েছে। তারা আরও একটু এগোতেই জলাভূমির বাসিন্দারা নিজেদের পথের দিকে মনোেযোগ দিল। একটা তুষার-শুভ্র সারসপাখি ডানা দোলাতে দোলাতে ডাল ছুঁই ছুঁই করে উড়ে গেল পানির উপর দিয়ে। ব্যাঙেরা উচ্চস্বরে লাফিয়ে পড়ছে স্যাতস্যাতে মাটির টিবি থেকে। দেখতে টার্কি মোরগের মত হুটজিন পাখিগুলোকে প্রাগৈতিহাসিক টেরাহাক টেইল প্রাণীর কুৎসিত সঙ্কর বলে মনে হচ্ছে। তাদেরকে দেখেই চিৎকার করতে শুরু করল ওরা সেই সাথে নিজেদের বাসার উপর উড়ে বেড়াতে লাগল । বাসাগুলো বোনা হয়েছে জলাভূমির পানির উপর মাথা জাগিয়ে রাখা অসংখ্য মাটির ঢিবির উপর সোজা দাঁড়িয়ে থাকা পাম গাছের উপরে। শুধুমাত্র মশার ঝাঁকগুলোই আনন্দিত মনে হচ্ছে তাদের উপস্থিতিতে । ভনভন করছে উৎফুল্ল হয়ে। শিকারে ভরা স্যান্ডউইচসদৃশ ভাসমান ভেলাগুলোর দিকে তাদের লোলুপ দৃষ্টি।
“শালার মশা, গলায় একটা চড় বসিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল ম্যানুয়েল । এদের শায়েস্তা করতে গিয়েই তো আমার দফা-রফা হয়ে যাচ্ছে।”
পরিস্থিতিটা আরও খারাপ করে দিয়ে ওকামোটা তার বেসুরো আর বিরক্তিকর শিষ দেয়া শুরু করল আবারো। তাদের এই দীর্ঘ ভ্রমনের কথা চিন্তা করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল নাথান । ঘন্টা খানেকের মধ্যে তাদের চারপাশে ঘিরে থাকা ছোটছোট দ্বীপগুলো অদৃশ্য হয়ে গেল। জলাভূমির কেন্দ্রে পানি এতই গভীর যে জঙ্গলের গাছ এবং মাথা জাগিয়ে রাখা দ্বীপগুলো এখন পানির নিচে চলে গেছে। একটাই মাত্র টিবি যেটার বেশিরভাগ বৃক্ষশূন্য, নিঃসঙ্গ জেগে আছে। মাথার উপরে সূর্য উত্তপ্ত আর উজ্জ্বল। তাপ দিচ্ছে বিরতিহীনভাবে।
“এ যে একেবারে বাষ্প,”ক্যারেরা বলল তার ভেলার বাম-দিক থেকে।
একমত হতে হল নাথানকে। আদ্রতা এখানকার বাতাসকে এতটাই ঘন করে দিয়েছে যে, শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। ক্লান্তি সবাইকে পেয়ে বসতেই জলাভূমিজুড়ে তাদের গতি বেশ মন্থর হয়ে পড়ল। জলের পাত্রগুলো হাত বদল হচ্ছে কিছুক্ষণ পর পর। এমনকি বাঁশের ভেলার মেঝেতে গা এলিয়ে দেয়া টর-টরও হাপাচ্ছে মুখ হা করে। এত কষ্টের পরও এতটুকুই স্বস্তি যে, জাপটে ধরা জঙ্গলের মুঠো থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে তারা। ব্যাখ্যাতীত এক মুক্তির অনুভূতি ঘিরে ধরেছে সবাইকে। কিছু সময় পরপর পেছনে তাদের ফেলে আসা পথের দিকে তাকাচ্ছে নাথান এই আশায়, যদি বন্য গোত্রের কাউকে দেখা যায় । হয়তো জলের কিনারায় দাড়িয়ে হাত নাড়ছে তার দিকে। কিন্তু ব্যান-আলির আর কোন চিহ্নই চোখে পড়ল না তার। ভুতুড়ে গোরের অভিযাত্রীরা লুকিয়েই থাকল। আশার কথা হল, নাথানদের দলটা তাদের ধাওয়াকারীদের পেছনে ফেলে কয়েক দিনের পথ এগিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় কাঁধে চাপ অনুভব করল নাথান। “এবার আমাকে একটু করতে দাও,” কাউয়ি বলল তার পাইপের মধ্যে জমে থাকা তামাকের ছাই পানিতে ফেলে দিয়ে।
“সমস্যা নেই,” বলল নাথান।
খানিক এগিয়ে গিয়ে বৈঠাটা হাতে নিল কাউয়ি । “আমি এখনো অতোটা বুড়ো হয়ে যই নি।”
আর কোন আপত্তি না করে ভেলার পেছন দিকটাতে সরে বসল নাথান। একটু স্বস্তি পেল সে। দেখতে পেল ক্রমেই ছোট হতে থাকা তাদের ফেলে আসা আস্তানাটি। পানির পাত্রের জন্য সে হাত বাড়াতেই চোখে পড়ল তাদের ভেলার ডান দিকে কিছু একটা নড়ে উঠল। যেন পাথুরে আর কালো একটা টিবি ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে । এতই ধীর গতিতে যে জলে একটা বুদবুদও তৈরি হল না। ওটা কি? বাম-দিকটাতে আরও একটাকে ডুবতে দেখে উঠে দাঁড়াল নাথান । এই অদ্ভুত জিনিসগুলো নিয়ে কিছু বলতে যাবে অমনি পাথুরে দ্বীপের একটি চকচকে বড় একটি চোখ খুলে তাকাল। মুহূর্তেই বুঝতে পারল নাথান কি দেখছে সে।
সর্বনাশ!”
ওটা একটা কেইমান। দৈত্যাকার এক জোড়া চোখ। এক চোখ থেকে আরেক চোখের দূরত্ব কম করে হলেও চার ফিট হবে। ধু মাথাটাই যদি এত বড় হয় তাহলে চোয়ালটা…।
“কি সমস্যা?” প্রাইভেট ক্যারেরার প্রশ্নে তার ভাবনায় ছেদ পড়ল। ডুবতে থাকা দ্বিতীয় কুমিরটার দিকে আঙুল তুলে দেখাল নাথান ।
“এটা কি?” জিজ্ঞেস করল রেঞ্জার । তার চোখেমুখে সন্দেহ, ঠিক একমুহূর্ত আগে নাথানের যেমনটা ছিল ।
“কেইমান,”স্তম্ভিত গলায় বলল নাথান।
এরইমধ্যে ভোলাগুলোর বৈঠা থমকে গেছে। সবার চোখ এখন নাথানের দিকে। উচ্চস্বরে বলল সে, যাতে তিনটি ভেলার সবার কানেই তার কথা পৌছায়, সেই সঙ্গে হাত উঁচু করে শূন্যে দোলাল। “ছড়িয়ে পড় সবাই। যেকোন সময় আক্রমণ করতে পারে ওরা।”
“কোথা থেকে?” প্রায় পঞ্চাশ মিটার দূরে থাকা ভেলা থেকে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান। “কি দেখেছ তুমি?” উত্তরটা স্বয়ং হাজির হল সবার চোখের সামনে। নাথান ও তার পাশের ভেলার মাঝখানে বিশাল কিছু একটা চলে গেল ভেলা দুটোকে মৃদু দুলুনি দিয়ে। আশেপাশের পানিতে আঁকাবাঁকাভাবে এক জোড়া লেজের উপস্থিতি ভাল করেই বুঝতে পারল সবাই । এমন আচরণের সাথে বেশ পরিচিত নাথান। এই কৃষ্ণকায় বিশাল আকারেরটাই হল অন্যসব কেইমানের রাজা, আর এরা মৃতভোজী নয়। নিজেদের খাবার নিজেরাই শিকার করতে ভালবাসে। এ কারণেই নিশ্চল থাকাটা তাদেরকে বাঁচিয়ে দিতে পারে এই পরভোজীগুলোর হাত থেকে। প্রায়ই এরা যেগুলোকে খাবার মনে করে একটু নাড়িয়ে দেখে । বোঝার চেষ্টা করে ওগুলো নড়াচড়া করে কিনা এদেরকেও এইমাত্র পরখ করে দেখা হল । একটু দূরে, তৃতীয় ভেলাটাও দুলে উঠল সামান্য। আবারও চিৎকার করে নাথান তার প্রাথমিক পরিকল্পনাটার কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলল, “কেউ নড়বেন না!বৈঠা চালানো বন্ধ রাখুন। নইলে ওদেরকে আকৃষ্ট করা হবে।”
ওয়াক্সম্যান তার কথাটাকে গুরুত্ব দিয়ে বলল, “ওর কথামত কাজ করুন সবাই। রেঞ্জার্স, অস্ত্র উঁচু কর, গ্রেনেডগুলো রেডি রাখ!”
ম্যানুয়েল হামাগুঁড়ি দিয়ে নাথানের পাশে পড়ে আছে, বিস্ময় ও ভয় দুটোই ভর করেছে তার ফিসফিস করা কণ্ঠে । “একশ ফিট লম্বা হবে কমপক্ষে ওটা। সধারণ কেইমান থেকে তিনগুন বড়।”
এম-১৬ হাতে ক্যারেরা দ্রুত তার গ্রেনেড-লাঞ্চারটা প্রস্তুত করে নিল। “এখন বোঝা যাচ্ছে জেরাল্ড ক্লার্ক কেন জলাভূমিটা ঘুরে এসেছিল।”
ওকামোটো তার রাইফেল রেডি করে বুকে ক্রশ এঁকে মাথা ঝাকাল প্রফেসর কাউয়ির দিকে তাকিয়ে। “আশা করি ঝুলিতে আপনার সেই ম্যাজিক্যাল পাউডার আরও কিছুটা আছে।” তারপর নাথানের দিকে তাকাল সে ।
সে একটা তথ্য জানিয়ে দিল রেঞ্জারকে, তাদের শক্ত-পোক্ত দেহাবরনের কারণে একটা জায়গায় আঘাত করলেই কেবল ঘায়েল করা যেতে পারে, আর সেটা হল চোখ।”
“শুধু তাই নয়, গুলিটা করতে হবে উপরের চোয়ালের ভেতর দিয়ে, যোগ করল ম্যানুয়েল, একটা আঙুল দিয়ে নিজের চোয়ালের উপরের দিকে নির্দেশ করে। তবে এভাবে গুলি করতে হলে খুব কাছ থেকে করতে হবে কাজটা।”
“ঐ যে ডানপাশে,” হঠাৎ বলে উঠল ক্যারেরা, কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে হাটু ভর দিয়ে বসে আছে সে।
ছোটছোট ঢেউয়ের লম্বা একটা সারি শান্ত পানির উপরিভাগকে নাড়িয়ে দিয়ে গেল, ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে তার পূর্বসংকেত যেন ওটা ।
“নিশ্চিত না হয়ে গুলি কর না, খবরদার,” তার পাশে নিচু হয়ে বসে থাকা নাথান ফিসফিসিয়ে বলল। “নয়তো ক্ষেপে যেতে পারে ওটা। শুধু তখনই গুলি করবে যদি নিশ্চিত হও যে এক শটেই এটা মারা যাবে।”
সবার মত ওয়াক্সম্যানও চুপচাপ শুনে গেল নাথানের সতর্কবার্তা। “ডা, রান্ড যা বলল তা ভাল করে শোন। সুযোগ পেলেই গুলি করবে কিন্তু সেটা যেন কাজে লাগে ।” প্রতিটি ভেলায় রাইফেলগুলো প্রস্তুত হয়ে গেল। নাথান নিজেও তার শটগানটা তুলে নিল হাতে। অপেক্ষা করছে সবাই, পুড়ছে খরতাপে, ঘাম চলে চুইয়ে পড়ছে কপাল বেয়ে, ছোটছোট ঢেউ ছাড়া তাদের গতিপথের কোন চিহ্নই রেখে যাচ্ছে না দৈত্যগুলো। মাঝে মাঝে কোন একটা ভেলাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে পরখ করছে তারা।
“ওরা কতক্ষণ দম আটকে রাখতে পারে?” ক্যারেরা জিজ্ঞেস করল ।
‘কয়েক ঘন্টা।”
“আক্রমণ করছে না কেন?” এবার ওকামোটো জানতে চাইল।
এর জবাব দিল ম্যানুয়েল। “ওরা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না আমরা ওদের খাবারের উপযোগী কি না।”
এশিয়ান রেঞ্জার দূর্বল কণ্ঠে বলল, “আশা করি ওরা বুঝে উঠতে পারবে না।” প্রতীক্ষার ব্যপ্তি দীর্ঘ হতে থাকল। বাতাস যেন ভারি হয়ে উঠেছে তাদের চারপাশে।
“আচ্ছা, এখান থেকে যদি একটা গ্রেনেড ছুঁড়ি অন্যদিকে?” প্রস্তাব দিল ক্যারেরা, “ওগুলোর মনোযোগ কি তাহলে ওদিকে চলে যাবে না?”
“ঠিক নিশ্চিত করে বলতে পারছি না আমি। এতে হয়তো ওরা কৌতুহল বাদ দিয়ে বিরক্ত হয়ে উঠবে, ছিনিয়ে নেবে আমাদের মত চলমান যেকোন কিছু।”
জেন কথা বলে উঠল সবচেয়ে দূরের ভেলা থেকে, কিন্তু তা নাথানের কান পর্যন্ত পৌছাল না। আমি বলি কি, ঐ জাগুয়ারটার গায়ে কিছু বিস্ফোরক বেঁধে দিয়ে ওটাকে পানিতে নামিয়ে দেই। কুমিরগুলো যখন জাগুয়ারটার কাছে পৌছাবে আমরা সুইচ টিপে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেব?”
পরিকল্পনাটা শুনে ভয়ে যেন কেঁপেই উঠল নাথান। ম্যানুয়েলের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠল কারণ অনেকের চোখেমুখের অভিব্যক্তি দেখে প্রস্তাবটার ব্যাপারে সায় আছে বলে মনে হল।
‘আপনি যদি ওভাবে সফল হনও একটার বেশি মারতে পারবেন না,” বলল নাথান। “এরপর ওর সঙ্গি মাতালের মত ছুটে আসবে, গুঁড়িয়ে দেবে সবগুলো ভেলা । আমাদের জন্য ভাল হয় অপেক্ষা করে দেখা, যাতে কুমির দুটো একসময় আগ্রহ হারিয়ে চলে যায়। তারপর আবার বৈঠা চালিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে যাব আমরা।”
ওয়াক্সম্যান ঘুরে দাঁড়াল ডেমোলিশন বিশেষজ্ঞ কর্পোরাল ইয়ামির দিকে। যদি ততক্ষণেও কুমির দুটো আগ্রহ হারিয়ে না ফেলে তবে তাদের জন্য বাড়তি কিছু বিনোদনের ব্যবস্থা করা দরকার । এক জোড়া নাপাম প্রস্তুত কর।”
কর্পোরাল মাথা নেড়ে সায় দিয়ে তার প্যাকের দিকে মনোযোগ দিল। আরও একবার অপেক্ষার খেলাটা শুরু হল, দীর্ঘ হতে থাকল সময়। নাথান অনুভব করল তার হাটুর নিচের ভেলাটা একটু কেঁপে উঠছে।
“শক্ত করে ধরে রাখুন সবাই!”
হঠাৎ তাদের নিচের ভেলাটা ধাক্কা খেল, সাথে সাথে ভেলার পেছনের অংশটা শূন্যে উটে গেল। ভেলার সবাই বাঁশ ধরে ঝুলে রইল মাকড়সার মত । এখানে সেখানে ঝপাত করে পড়তে থাকল ভেলার উপরে রাখা প্যাকগুলো। তারপর তীব্র ঝাকুনি দিয়ে আবার ভেলাটা আছড়ে পড়ল পানিতে ।
“সবাই ঠিক আছে?” চিৎকার দিল নাথান ।
অস্পষ্ট কিন্তু ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেল ।
“আমার রাইফেলটা গেছে,” বলল ওকামোটা, তার চোখে ক্রোধ।
“কপাল ভাল তুমি যাও নি,” বলে উঠল কাউয়ি ।
আবারো চিৎকার দিয়ে উঠল নাথান। “ওরা কিন্তু ভয়াবহ হয়ে উঠছে।” ভাসতে থাকা একটা প্যাকের দিকে হাত বাড়াল ওকামোটা । “আমার প্যাকটা।” নাথান দৃশ্যটা দেখে আৎকে উঠল। “কর্পোরাল থামুন!” ।
সঙ্গে সঙ্গে জমে গেল ওকামোটো । “ওহ …তার রাকস্যাকের দড়িগুলো এরইমধ্যে ধরে ফেলেছে সে, তোলাও হয়ে গেছে জল থেকে অর্ধেকটার মত ।
“ছেড়ে দিন,” বলল নাথান । “সরে যান ভেলার কিনার থেকে।”
ছোট একটা ধাক্কায় প্যাকটা ছেড়ে দিয়ে হাতটা গুটিয়ে নিয়ে এল কর্পোরাল, কিন্তু ভেলার কিনারা থেকে সে সরতে গিয়ে দেরি করে ফেলল। দৈত্যটা আচমকা পানি থেকে উঠে এল । ওটার চোয়াল দুটো হা করা । চোয়ালের ভেতরে দাঁতগুলো যেন এক একটি একহাত লম্বা। এক ঝটকায় দৈত্যটা একেবারে শূন্যে ভাসিয়ে নিল রেঞ্জারকে। ভয়ে আর আতঙ্কে চিৎকার দিল বেচারা । বিশাল চোয়াল দুটো এক হতেই হাঁড় ভাঙার মচমচ শব্দ শোনা গেল। ওকামোটোর চিৎকারটা যন্ত্রণা আর অবিশ্বাসে রুপ নিল এবার । শরীরটা ঝাকুনি খাচ্ছে পুরনো কাপড় দিয়ে বানানো পুতুলের মত, পা দুটো দুলছে এদিক-ওদিক বিক্ষিপ্তভাবে । তারপর বিশালাকার দেহটা আবারো নেমে এল জলের উপরিভাগে।
“ফায়ার!” গর্জে উঠল ওয়াক্সম্যান। যা ঘটল তাতে নাথান এতই হতচকিত হেয়ে গেছে যে নিজের হাত-পা নাড়তেই পারছে না। গর্জে উঠল ক্যারেরার এম-১৬ একঝাক গুলি গিয়ে আছড়ে পড়ল দৈত্যাকার কুমিরটার উপরে। কিন্তু হলদে পেটের আঁশটেগুলো লোহার মতই শক্ত। এমনকি কুমিরটার যে অংশ বন্দুকের সবচেয়ে কাছে ছিল সেখানটাও প্রায় অক্ষতই দেখাল। এর দূর্বল জায়গা, মানে চোখগুলো অক্ষতই আছে। নিজের শটগানটা এক ঝটকায় তুলে নিল নাথান। একঝাক গুলি শূন্য বাতাস ভেদ করে আছড়ে পড়ল পানিতে। দৈত্যটা ততক্ষণে ডুব দিয়ে দিয়েছে । আক্রমণটা পুরোপুরি ব্যর্থ হল । ওকামোটাকে নিয়ে কেইমানটা উধাও হয়ে গেল।
ঘটনার নির্মমতায় জমে গেল সবাই। কুমিরটা চলে যাওয়ার ফলে পানির টানে নাথানের ভেলাটা একটু দুলে উঠল । সে তাকিয়ে আছে ঠিক যে জায়গাটায় রেঞ্জার অদৃশ্য হয়েছে । বেসুরো শিষ দেয়া বেচারা ওকামোটা। একটা লালচে বুদবুদ জলের উপর উঠে এল কেবল। রক্ত মিশছে পনিতে। এতক্ষণে দৈত্যগুলো জেনে গেছে তাদের খাবার এখানেই আছে!
কেলি তার ভায়ের পাশে ভেলার মাঝখানে হামাগুড়ি দিয়ে আছে। ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান এবং কর্পোরাল রাকজ্যাক হাটু গেড়ে বসে প্রস্তুত রেখেছে তাদের অস্ত্রগুলো ইয়ামিরের নাপাম বোমা দুটো প্রস্তুত। এক একটার আকৃতি মাঝারি মানের ডিনার প্লেটের সমান । প্রতিটি বোমার উপর একটি ইলেক্ট্রনিক টাইমার বসানো । কিছুটা পেছনে হেলে গেল ডেমলিশন এক্সপোর্ট।
“রেডি, ক্যাপ্টেনের উদ্দেশ্যে মাথা নেড়ে সায় দিল সে।
“অস্ত্রটা হাতে রাখ,” ওয়াক্সম্যান বলল। “প্রস্তুত হও।
ইয়ামির তার এম-১৬ রাইফেলটা তুলে নিয়ে ভেলার পাশে নজর রাখতে থাকল। কিছু একটা ভেঙে যাবার শব্দ হল তাদের পেছন দিকে দ্রুত পেছনে ঘুরে কেলি দেখল তাদের ভেলাবহরের তৃতীয় ভেলাটা শূন্যে ভাসছে কিছুক্ষণ আগে নাথানদেরটা যেমন হয়েছিল। কিন্তু এটার যাত্রিরা অতোটা সৌভাগ্যবান নয় ।। আকস্মিক আক্রমণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আনা ফঙ ছিটকে পড়ল পানিতে, সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভেলাটাও আছড়ে পড়ল। রিচার্ড জেল এবং অলিন কোনমতে ভেলাটা ধরে ঝুলে আছে, ঝুলে আছে সার্জেন্ট কসটস এবং কর্পোরাল গ্রেইভসও। পানির উপরে ভেসে উঠল আনা, কিছুটা শ্বাসরোধ অবস্থায় কাশছে। তার ভেলা থেকে মাত্র এক গজ দূরে সে।
“একটুও নড়বে না, আনা!” চিঙ্কার দিল নাথান। “হাত-পা ভাঁজ করে ভেসে থাক।”
নিশ্চিতভাবেই তার আদেশটা মানতে চাইল আনা কিন্তু তার প্যাকটা পানিতে ভরে গেছে, ভারি সেই জিনিসটা তাকে টেনে নিতে চাইছে পানির নিচে। যদি না সে পা দিয়ে নিচে ধাক্কা মেরে ভাসার চেষ্টা করে তবে ডুবতেই হবে তাকে। আতঙ্কে চোখ দুটো ফ্যাকাশে হয়ে সাদা হয়ে গেছে তার। একদিকে ডুবে যাবার ভয় অন্যদিকে পানির নিচে ঘাপটি মেরে থাকা দানব। ভেলাটার উপর মানুষজনের নড়াচড়া মনোযোগ আকর্ষন করল আনার । সার্জেন্ট কসটস পানির দিকে ঝুঁকে আছে বাশের লম্বা একটা খুঁটি বাড়িয়ে দিয়ে । এটা তারা লগি হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
“এটা ধরুন!” কসটস বলল তাকে।
“না!” কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল সে ।
চেঁচিয়ে উঠল নাথান আবারো । “আনা, যতক্ষণ না তুমি নড়া-চড়া করছ কোন সমস্যা নেই। আর কস্টস, ওকে খুব ধীরে ধীরে টানতে থাক। কোন স্রোত তৈরির চেষ্টা কর না।”
কেঁপে উঠল কেলি। ফ্রাঙ্ক জড়িয়ে আছে তাকে। ধারণার থেকেও আস্তে আস্তে সার্জেন্ট তাকে টেনে ভেলার কাছে নিয়ে এল।
“দারুন, দারুণ…” আপন মনে বিড়বিড় করতে লাগল নাথান আর ঠিক তখনই আনার ঠিক পেছনে শক্ত চামড়ায় মোড়ান একটা নাক ভেসে উঠল । চোখ দুটো এখনো পানির নিচে।
“কেউ গুলি করবেন না!” চিৎকার দিল সে। “ওটাকে ক্ষেপানো যাবে না।”
বন্দুকগুলো তাক করা থাকলেও কোন গুলি বেরুল না। কস্টস টেনে আনতে থাকা বাঁশটি থামিয়ে দিয়েছে কেইমানের উপস্থিতি লক্ষ্য করেই। কেউ-ই নড়ছে না এখন। একটা চাপা আর্তনাদ ভেসে এল পানিতে ভাসতে থাকা আনার কণ্ঠ দিয়ে। খুবই ধীরে সরু নাকটি একটু এগিয়ে এল, মুখটা ভেসে উঠতেই কেইমানটার বিশাল চোয়াল খুলে গেল । কস্টস আনাকে তার দিকে না টেনে পারল না। দৈত্যটা থেকে কয়েক ফিট দূরে আছে মেয়েটি।
“সাবধানে,” বলল নাথান।
এটা যেন অদ্ভুত একটি দৃশ্য । যেখানে নিশ্চিত মৃত্যু এগিয়ে আসছে আর শিকার চেষ্টা করছে প্রাণপনে মুক্তি পেতে, তবে হেরে যাচ্ছে সে।প্রাণীটার বাঁক এখন এক ফুটেরও কম দূরে আনার শরীর থেকে। কর্পোরাল গ্রেইভস এগিয়ে এল এই পরিস্থিতিতে। ভেলার অপর প্রান্ত থেকে দৌড়ে এসে আমার মাথার উপরদিয়ে পানিতে ঝাঁপ দিল সে।
“গ্রেইভস!” চেঁচিয়ে উঠল ক্যাপ্টেন।
কুমিরের ভেসে ওঠা নাকের উপর গিয়ে পড়ল রেঞ্জার। দু-হাতে চেপে ধরল চোয়ালটাকে । “ওকে টেনে তোল!কেইমানটার সাথে যুদ্ধ করতে করতে চিৎকার দিয়ে বলল গ্রেইভস। তাকে নিয়েই দৈত্যটা ডুব দিল পানিতে।
কসটস আনাকে দ্রুত টেনে নিল ভেলার দিকে, অলিন তাকে সাহায্য করল ভেলায় ওঠার জন্য। এক মূমুর্ত পর দৈত্যটা পানির উপর ভেসে উঠল, গ্রেইভস এখনো ওঠার চওড়া মাথার উপর সেঁটে আছে । কেইমানটা নড়াচড়া করছে বিক্ষিপ্তভাবে, চেষ্টা করছে প্রাণপনে তার মাথার উপর অবতরন হওয়া এই অদ্ভুত আগন্তুককে ঝেড়ে ফেলে দিতে । ওটার চোয়াল আংশিক খুলে যেতেই তীব্র ক্রোধমিশ্রিত একটি শব্দ বেরিয়ে এল মুখ দিয়ে। “জাহান্নামে যা!” বলল গ্রেইভস। “আমার ভাইকে খেয়েছিস তোরা…” পা দুটো দিয়ে ওটাকে জাপটে ধরে ফিল্ড জ্যাকেট থেকে একটা গ্রেনেড় খুলে নিল সে, সময় নষ্ট না করেই দৈত্যটার গলার ভেতর ছুড়ে দিল ওটা।।
বিশাল চোয়ালটা রেঞ্জারকে ঝটকা মেরে সরাতে চাইল কিন্তু সে ওটার নাগালের বাইরে।
নিচু হও সবাই!” হুঙ্কার দিল ওয়াক্সম্যান।
গ্রেইভস তার জায়গা থেকে লাফ দিল ভেলাটার দিকে, উন্মাদের মত চিৎকার করে বলল, “ওটাই খা, শালার বানচোত।”
জঙ্গলের নিরবতাকে ছিন্নভিন্ন করে ছড়িয়ে পড়ল বিস্ফোরণের শব্দ। কেইমানের মাথাটা উড়ে গেল শূন্যে। টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল গ্রেনেডের ধাতব টুকরোর আঘাতে। বিস্ফোরণের ধাক্কায় গ্রেইভসও উড়ে গেল বাতসে, বিজয়ের একটা গর্জন বেরিয়ে এল তার মুখ থেকে। ঠিক তখনই অন্য কেইমানটা গভীর জল থেকে উঠে এল। চোয়াল দুটো হা করা, শূন্যে ভাসতে থাকা করপোরালকে লক্ষ্য করে উঠে এল যেন। বাতাসে ভাসমান থাকতেই ধরে ফেরল রেঞ্জারকে, ঠিক ছুঁড়ে মারা কোন বল কুকুর যেভাবে ধরে । তারপর চেপে ধরল শক্ত করে, অবশেষে শিকারকে নিয়ে ডুব দিল ওটা। সবই ঘটল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ।
মৃত কেইমানটা চিৎ হয়ে ধীরে ধীরে ভেসে উঠল পানির উপর। সব সময় আড়ালে থাকা পেটের নিচের বাদামী আর হলদে আঁশটেগুলো দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। নিথর দেহটাকে পানির নিচ থেকে ধাক্কা দেয়া হচ্ছে। বেঁচে থাকা অপর কেইমানটা পরীক্ষকরে দেখতে চাইছে আর কি । ওটার চারপাশে একটা মৃদু স্রোতের মত তৈরি হল ।
ওটা চলে যাবে,” ফ্রাঙ্ক বলল। “হয়ত অন্য একটাকে মরতে দেখে ওটাও ভয়ে পালাবে।” কেলি জানে এমনটা ঘটবে না। এই প্রাণীগুলো শতশত বছরের পুরনো। সারাটা জীবন জুটি হয়ে থেকেছে। স্রোতটা মিইয়ে গেল, আবারো শান্ত হয়ে গেল পানি। সবাই হিরদৃষ্টিতে চেয়ে আছে পানির দিকে। কারো শ্বাস থেমে আছে, কারোরটা চলছে উত্তেজনার সাথে প্রতিটি মিনিট যেন এক একটা দিন। সূর্যতাপ ঝলসে দিচ্ছে সবাইকে।
“কোথায় গেল ওটা?” ফিসফিস করে বলল জেন। তার পাশে পানিতে ভিজে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া আনা আতঙ্কে কেঁপে উঠল একটু।
“আসলেই চলে গেছে হয়তো,” বিড়বিড় করে বলল ফ্রাঙ্ক । তিনটি ভেলার বহর হালবিহীন হয়ে ভাসছে শ্রোতে, দুলছে মৃত কুমিরটার পাশে।
নাথানের ভেলা কুমিরটা থেকে সবচেয়ে দূরে। কেলির সাথে চোখাচোখি হতেই মাথা নেড়ে সায় দিল সে। চেষ্টা করল নিশ্চয়তাপূর্ণ অভিব্যক্তি দিতে। কিন্তু তার পেছনে জঙ্গলে অভিজ্ঞ ম্যানুয়েলও আতঙ্কিত এখন। জাগুয়ারটা হামাগুড়ি দিয়ে আছে তার মাস্টারের পাশে। খাড়া হয়ে আছে পিঠের লোমগুলো।
ফ্রাঙ্ক একটু নড়ে চড়ে উঠল। “ওটা আসলেই পালিয়েছে। সম্ভবত।”
চূড়ান্ত আঘাত হানার আগে কেলি কিছু একটা অনুভব করল। তাদের ভেলার নিচে হঠাৎ করে পানির একটা দুলুনি হল।
“দাঁড়াও।”
তাদের নিচে ভেলাটা যেন বিস্ফোরিত হল। এবার শুধু উপরে ধাক্কাই না, সোজাসুজি উঠে গেল আকাশের দিকে। তারপর ভেলাটা মাঝখান থেকে ভেঙে টুকরো হয়ে গেল ক্রোধান্বিত কেইমানটার ইস্পাত শক্ত বিশাল নাকের আঘাতে । উড়ে গেল কেলি, পাক খেল বাতাসে। তার মত শূন্যে উঠে যাওয়া ভাঙা ভেলার বাঁশ ও প্যাকগুলো নিচে পড়তে শুরু করল তার সাথে সাথে, তবু কিছু একটা ধরতে চাইল কেলি ।
‘ফ্রাঙ্ক!” তার ভাই পানিতে আছড়ে পড়ল বেশ জোরে। পানিতে পড়ার পরই নাক-মুখ দিয়ে কিছুটা পানি ঢুকে গেল তার । খকখক করে একটু কাশল সে, সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল নাথানের সতর্কবার্তাটা । যতটা সম্ভব স্থির হয়ে থকতে হবে। কি মনে করে একটু উপরে তাকাতেই কেলি দেখল ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভেলাটির বড় একটা গুড়ি নেমে আসছে ঠিক তার মৃখ বরাবর । এক ঝটকায় মুখটা মারাত্মক আঘাতের হাত থেকে বাঁচাল কিন্তু গুড়িটার অপরপ্রান্ত এসে আঘাত করল তার মাথার একপাশে। ধাক্কায় পেছনে সরে গেল সে, তলিয়ে যেতে লাগল পানির নিচে, অন্ধকার গ্রাস করে নিচ্ছে তাকে।
নাথান দেখল কেলি ধ্বংসাবশেষের আঘাতে হয় মারা যাচ্ছে অথবা জ্ঞান হারাচ্ছে, ঠিক বুঝতে পারছে না সে। চারপাশজুড়ে ভাসছে ভেঙে যাওয়া ভেলাটা, মানুষজন, প্যাকগুলো আর ভেলার টুকরো অংশ। “স্থির হয়ে ভেসে থাকুন সবাই। যতটা সম্ভব চিঙ্কার দিয়ে বলল নাথান । ভীত চোখ দুটো খুঁজে বেড়াচ্ছে কেলিকে ।কি হল তার?
ঘাতক কেইমানটা আবারো অদৃশ্য হয়ে গেল পানির নিচে, “কেলি!” চিৎকার দিল ফ্রাঙ্ক।
তার বোন খানিকটা দূরে ধ্বংস স্তুপের সাথে পানিতে ভেসে আছে আধ-ডোবা অবস্থায়। তার মুখটা পানির দিকে উপুড় করা, নিষ্প্রাণ লাগছে দেখতে। নাথান দোদুল্যমান অবস্থায় পড়ে গেল । সে কি মারা গেছে ঠিক তখন দেখতে পেল কেলির একটা হাত নড়ে উঠেছে, দুলছে দুর্বলভাবে। বেঁচে আছে। কিন্তু কত সময়ের জন্য? যে চোট পেয়েছে তাতে তার ডুবে যাবার ঝুঁকি অনেক বেশি।
“ধ্যাৎ!” বুদ্ধি বের করার চেষ্টা করছে নাথান, এমন একটা যা দিয়ে মেয়েটিকে বাঁচান যাবে । কেলির শরীর থেকে অল্প একটু দূরেই ছোট একটি দ্বীপ আছে, ওর উপর মাত্র একটাই বিশাল ম্যানগ্রোভ গাছ দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে। ওটার মোটা গুড়িটা দাড়িয়ে আছে অসংখ্য এলোমেলো আর পেচানো শেকড়ের উপর । তারপর দৃশ্যমান ঐ দৃঢ় শেকড়ের কাঁধেই গাছটা ভর করেই ডাল-পালার বিশাল এক ঝুলন্ত আচ্ছাদন তৈরি করেছে পানির উপর । কেলি যদি একবার ওখানে পৌছাতে পারত…
একটা চিৎকার ভেসে এল পানি থেকে চিন্তায় ছেদ পড়ল নাথানের । কেইমানটার মাথা দেখা গেল, ভেঙে যাওয়া ভেলাটার ধ্বংসস্তুপের মাঝে ভেসে উঠেছে ওটা সাবমেরিনের মত। ওটার বড় একটা চোখ দেখে নিল চারপাশটা । কিছু গুলি ছোঁড়া হল ওটাকে লক্ষ্য করে কিন্তু ওটা ডুব দিয়ে হারিয়ে গেল দ্রুত।
ফ্রাঙ্ক অবশেষে তার বোনকে দেখতে পেয়েছে। “হায় ঈশ্বর…কেলি!” ঘুরে গেল সে, সঁতার দিতে উদ্যত হল বোনকে বাঁচানোর জন্য।
“ফ্রাঙ্ক! একটুও নড়বেন না!” চিৎকার দিল নাথান। “আমি ওর কাছে যাচ্ছি।” হাতের শটগানটা ভেলার মেঝেতে ফেলে দিল সে।
“কি করছ তুমি?” জিজ্ঞেস করল ম্যানুয়েল।
উত্তর না দিয়ে কাজটা করেই দেখাল নাথান, তার ভেলার খুব কাছেই মৃত কেইমানটা। মাঝখানের পানিটুকু লাফ দিয়ে কুমিরটার পেটের উপর পড়ল সে। দ্রুত উঠে দাঁড়াল এবার। তারপর ওটার পিচ্ছিল শরীরের উপর দিয়ে দৌড় শুরু করল যতটা সম্ভব কেলির কাছে পৌছানোর জন্য। ডান দিকে একটা চিৎকার ভেসে এলে নাথান দেখল কর্পোরাল ইয়ামিরকে । কুমিরের সাথে ধস্তাধস্তি করছে সে। হঠাৎ পানির নিচে টেনে নেওয়া হল তাকে। বড় বড় বুদ বুদ ভেসে উঠল কয়েক মুহূর্ত পর। পানিতে ভেসে থাকা সবাইকেই লক্ষ্য বানিয়েছে কেইমানটা। নাথান কুমিরটার শরীরের উপর থেকে লাফ দিয়ে পড়ল কেলির একেবারে কাছে। মেয়েটার মুখ পানি থেকে একটু তুলে ধরল সে দুর্বলভাবে নড়ে উঠল।
“কেলি! আমি নাথান! শান্ত থাক।”
তাদের এই হালকা নড়াচড়া কুমিরটার চোখে পড়ে গেল। নাথান পা দিয়ে আঘাত করতে থাকল ঢিবিটার কাছে পৌছানোর জন্য । ধ্বংসস্তুপের ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে তাকে। হঠাৎ তার হাতে কিছু একটা লাগল, কালো একটা ডিনার প্লেটসদৃশ জিনিস। ওটার গায়ে মিটমিট করতে থাকা কিছু লাল বাতি জ্বলছে। এটা নিহত কর্পোরালের একটি বোমা । কোন কিছু না ভেবেই অন্য হাতটা দিয়ে বোমাটা তুলে নিয়ে পা চালাতে থাকল বিরামহীনভাবে।
“ঠিক তোমার পেছনে সার্জেন্ট কটস চিৎকার দিয়ে উঠল খানিক দূর থেকে।
পেছনে তাকাল নাথান । একটা স্রোত এগিয়ে আসছে ঠিক তার দিকে। তারপরই দেখতে পেল নাকের অগ্রভাগটা ভেসে উঠছে পানির উপর । আস্তে করে ভেসে উঠল হাতির মাথার চেয়েও বড় কালো মাথাটা। সাথে সাথেই নাথান নিজেকে আবিষ্কার করল দৈত্যটার সাথে চোখাচোখি অবস্থায়। শক্রর দৃষ্টির আড়ালে যে ধূর্ততা লুকিয়ে আছে তা বুঝতে পারল সে। ওটা হিংস্র তবে নির্বোধ নয়। মরার ভান করায় কাজ হবে না এখন।
দ্রুত ঘুরে গেল সে। পা চালাতে লাগল ঢিবির অভিমুখে, হাতে ধরে রাখা নাপাম বোমাটা কাজ করছে বৈঠার মত। কয়েক ফিট এগোতেই তার পা মাটিতে আঘাত করল । বেঁচে থাকার জন্য ভয় আর আতঙ্কের মাঝে জন্ম নেওয়া শক্তিটুকু দিয়ে কেলিকে নিজের বাহুর নিচে টেনে নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে থাকল নাথান ।।
“ওটা ঠিক তোমার পেছনে!” কেউ একজন বলল ।
পেছনে তাকিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করল না নাথান। সে দ্রুত এগিয়ে গেল ম্যানগ্রোভ গাছটার পেঁচানো শেকড়ের দিকে। তারপর কেলিকে শেকড়ের ফাকা দিয়ে ঠেলে দিয়ে নিজেও ঢুকে গেল সেখানে।
পানি থেকে মাথা একটু ওপরে তুলতেই কেলি একটু কেশে উঠল, সাথে কিছু পানিও বের হয়ে এল মুখ থেকে। চারপাশটায় আতঙ্কের সাথে চোখ বুলাল সে চেতনা আসতেই । নাথান কেলিকে জাপটে ধরে রাখল সেই ছোট্ট জায়গাটার ভেতরে।
“ওটা…?” নাথানের কাঁধের উপর দিয়ে কেলি দেখল প্রাণীটাকে । বিস্ফারিত হল তার চোখ । “ওহ্, সর্বনাশ!”
দৈত্যটা এগিয়ে এসে পাড়ের কাদার উপর উঠে গেল। তারপরই শেকড়ের দেয়ালকে আঘাত করতে লাগল, ঠিক যেন কোন মালবাহী লরি ছোট্ট একটা ট্যাক্সি-ক্যাবকে আঘাত করছে। পুরো গাছটা কেঁপে উঠল । নাথানের মনে হল গাছটার শেকড় ভেঙে তাদের উপর পড়বে কিন্ত অনড় থাকল গাছটা । মুখটা হা করে হাসফাস করল দৈত্যটা । ওটার বড় বড় দাঁতগুলো স্পষ্ট দেখতে পেল সে। হঠাৎ থেমে গেল প্রাণীটা । হিংস্র চোখে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর পেছন দিকে সরে গিয়ে ফিরে গেল পানিতে ।
নাথানের দিকে ঘুরল কেলি। “তুমি আমাকে বাঁচালে!”
মেয়েটার দিকে তাকাল সে। শেকড়ের এই জেলখানাটা এত ছোট যে নাক দুটো তাদের প্রায় ছুঁই-ছুঁই করছে। “না হলে তো মরতে বসেছিলে তুমি, এটাকে বরং এভাবেই দেখা উচিত,” হাটুতে
ভর দিয়ে একটু সোজা হল নাথান। ঝুলে আসা একটা শেকড়কে উপরে ঠেলে দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াল সে। “তাছাড়া আমরা কিন্তু এখনো গাছবন্দী।” চারপাশের জলরাশি ভাল করে দেখছে সে। কুমিরটার উপস্থিতি জানান দেয়া কোন স্রোত আছে কিনা খুঁজে দেখল । কিন্তু পানিটাকে শান্তই দেখাচ্ছে। তবে নাথান জানে, কেইমানটা আশেপাশে কোথাও ঘাপটি মেরে আছে । লম্বা একটা দম নিয়ে শেকড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এল সে।
“কোথায় যাচ্ছ?”
“পানিতে এখনো অনেকেই পড়ে আছে.এরমধ্যে তোমার ভাইও আছে, নাথান নাপাম বোমাটা শার্টের ভেতর চালান করে দিয়ে গাছ বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল । মনে মনে একটা পরিকল্পনা করেছে সে। বেশ খানিকটা উঁচুতে উঠে একটা ভাল ডাল বেছে নিল, খুব কষ্ট করে পৌছাল ওটার শীর্ষে । এরপর ধীরে ধীরে ডালটা বেয়ে নামতে থাকল পানির দিকে যেখানে গাছের ডালগুলো পানি থেকে খানিকটা উপরে ঝুলছে । ডালটার প্রাতগুলো সরু হতেই নাথানের শরীরের ওজনের চাপে বাঁকাতে শুরু করল, খুব সতর্কতার সাথে এগোলো সে। অবশেষে, আর বেশি এগোনোর ঝুঁকি নিল না। নিচে এবং চারপাশের খানিকটা জায়গা দেখে নিল এক নজর । এটুকুতেই হয়ে যাবার কথা। বোমাটা উঁচু করে দোলাতে দোলাতে অন্য ভেলাটার উদ্দেশ্যে চিৎকার দিল :
“কেউ কি জানে এই বিস্ফোরকটা কিভাবে অ্যাকটিভ করতে হয়?”
সার্জেন্ট কসটস উত্তর দিল, “ওখানে একটা টাইমার দেয়া আছে। ওটাতে টাইম বেঁধে দাও, তারপর লাল বাটনটা চাপ দিলেই হবে।”
কথাটা বলার পরেই ওয়াক্সম্যান বাধা দিয়ে উঠল। শান্তস্বরে যে সতর্কবার্তাটা যোগ করল সে তা গুরুত্বের সাথেই শুনে গেল নাথান । “ওটার বিস্ফোরকগুলো চারদিকে কয়েকশ মিটার পর্যন্ত আঘাত হানতে পারে । ভুলভাবে ওটা বিস্ফোরিত করা মানে আমরা সবাই শেষ।” বোমাটার দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাকাল নাখান। খুবই সাদামাটা একটি কি-বোর্ড বোমাটার উপরে বসান, ঠিক যেন একটা ক্যালকুলেট। মনে মনে সে প্রার্থনা করল বোমাটা যেন ভিজে গিয়ে কিংবা টানাহেঁচড়ায় নষ্ট না হয়ে থাকে। বোমাটার টাইমারে পনের সেকেন্ড সময় বেঁধে দিল সে। এই সময়টুকুই অনেক। তারপর বোমাটা আলতো করে বুকের উপর রেখে পকেট থেকে ছুরিটা নিয়ে বসিয়ে দিল হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলে, চামড়া ভেদ করিয়ে গভীরভাবে ছুরিটা বসিয়ে দিল । ফিনকি দিয়ে রক্ত বের করা দরকার। কাটা শেষ করে একটা ছোট ডাল ধরে সে এগোতে লাগল দুলতে থাকা ডালের উপর দিয়ে। সে যখন জল থেকে খানিক ওপরে ঝুলছে তখন থামল। রক্তাক্ত হাতে বোমাটা ধরল ভাল করে। পানির দিকে আরেকটু ঝুঁকে বোমাটা বাড়িয়ে দিল পানির দিকে। নিচের পানিতে গিয়ে পড়তে শুরু করল রক্তের ফোটা । সে ধরে আছে শক্ত করে, কেঁটে যাওয়া আঙুলটি বোমার ট্রিগারের উপর। “আয় শালা, কাছে আয়?” অস্ট্রেলিয়াতে থাকাকালীন সে একবার জীবন্ত বন্যপ্রাণীদের একটা পার্কে গিয়েছিল, সেখানে দেখেছিল ত্রিশ ফুট দীর্ঘ একটা নোনাপানির কুমিরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এমনভাবে যাতে কুমিরটা লাফিয়ে পুলের উপর উঠে আসতে পারে সদ্য মাথা কাটা রক্তাক্ত মুরগির লোভে। নাথানের পরিকল্পনাটাও ঠিক তেমনি। পার্থক্য হল সে নিজেই মুরগি।
আস্তে করে হাতটা দোলাল যাতে আরও একটু রক্ত ঝরে কোথায় তুমি, চান্দু?” ফিসফিসিয়ে বলল সে। হাতটা ক্লান্ত হয়ে আসছে। একটু ঝুকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সে আড়চোখে সবাইকে একটু দেখে নিল। ভাসমান ধ্বংসক্তপের মাঝেই এখনো ভাসছে তারা। কেইমানটার সঠিক অবস্থান না জানার কারণে দুটো ভেলার একটাও এগিয়ে এসে ভাসমান মানুষগুলোকে উদ্ধার করতে পারছে সামান্য অমনোযোগী হবার কারণে বিশালাকৃতির দানবের পানির উপরে উঠে আসাটা খেয়ালই করতে পারে নি সে।
“নাথান!” চিৎকার দিল কেলি।
সম্বিত ফিরল নাথানের । কেইমানটা পানির উপরে, একেবারে তার নীচে। চোয়াল দুটো হা করা। গর্জনের শব্দ আসছে সেখান থেকে। বোমার ট্রিগারটা টিপল নাথান, তারপরেই সেটা ফেলে দিল দৈত্যটার খোলা মুখের ভেতরে। ঠিক তখনই নাথান বুঝতে
২৪৭________________
পারল জলাভূমির এই দৈত্যাকার কুমিরগুলো কতোটা লাফিয়ে উঠতে পারে সে বিষয়ে তাদের অনুমান মোটেও সন্তোষজনক নয়। হাতে-পায়ে ভর দিয়ে কোন মতে উঠে দাঁড়াল নাথান, তারপর সোজাসুজি উপর দিকে দিল লাফ, দু-পায়ে যত শক্তি ছিল সটুকু দিয়ে পায়ের নিচের ডালটিকে ধাক্কা মেরে স্প্রিংয়ের মত খানিকটা উপরে লাফিয়ে উঠল সে । পাতার আস্তরণ ভেদ করে একটা ডালকে ধরল শক্ত করে। পা দুটো ঝটকা মেরে দূরে সরিয়ে নিল আর ঠিক তখনই কুমিরটার উদ্যত চোয়াল নাথানের নিতম্ব আলতো স্পর্শ করে ফেলল । দৈত্যটার হাফিয়ে ওঠা নিঃশ্বাসও টের পেল পিঠে । এমন ঝুলন্ত শিকারের প্রতি এতক্ষণে আগ্রহ হারাল কুমিরটা । তাই ওটা আবারো পানিতে গিয়ে আছড়ে পড়লে অনেক উঁচু পর্যন্ত পানি ছিটকে উঠল । নিচে তাকিয়ে নাথান দেখল, যে ডালটার উপর সে এতক্ষণে বসেছিল সেই ডালটা আর নেই। শক্তিশালী চোয়াল দুটো নিখুঁতভাবে গুড়িয়ে দিয়েছে এটা । যদি সে এটার উপর দাঁড়িয়ে থাকত তাহলে এতক্ষণে দানবের মুখের গ্রাসে পরিণত হত।
নাথান দেখল কেইমানটা গভীর পানিতে থেকে আবারো উপরে ভেসে উঠেছে কিন্তু এবার আর ওটা আধাডুবন্ত অবস্থায় নয়, নিজের ভয়াল আকৃতির পুরোটাই ভেসে উঠল। একটা পুরুষ কুমির। দৈর্ঘ্যে কমপক্ষে ১২০ ফিট তো হবেই। ডালে ঝুলতে থাকা নাথানকে কেইমানটার ক্রোধান্বিত দৃষ্টি আঘাত করল যেন। তবে ওটুকুই শেষ। কুমিরটা ধীরে ঘুরে চলে গেল পানিতে ভাসমান মানুষগুলোর দিকে। গাছে ঝুলন্ত শিকার থেকে ভাসমান শিকারগুলোই ঢের সহজ ঠেকল ওটার কাছে। তবে পুরোপুরি ঘোরার আগেই নাথান দেখল কুমিরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল । সেকেন্ড গুণতে ভুলেই গিয়েছিল সে। হঠাৎ দৈত্যটার পেট ফুলে উঠল। চিৎকার দেবার জন্য চোয়াল দুটো প্রসারিত করতেই তীব্র বেগে ছুটে বেরিয়ে এল আগুন । কেইমানটাকে সত্যিকারের আগুন নির্গত করা কাল্পনিক প্রাণী ড্রাগনের মতই লাগছে এখন। একটা পাক খেয়েই ওটা ডুবে গেল গভীর পানিতে, তারপর হুশ করে একটা বিস্ফোরণ উপরের দিকে ঠেলে উঠতেই আগুন, পানি আর কুমিরের দেহাংশ পানির উপরে ছিটকে পড়ল চারদিকে।
নাথান ডালের সাথে শক্ত করে ঝুলে রইল হাত-পা ব্যবহার করে নিচে শেকড় ঘেরা গর্তে কেলি চিঙ্কার দিয়ে উঠল ভয়ে । বিস্ফোরণটা যেমন মুহূর্তেই শুরু হয়েছিল তেমনি মুহূর্তেই থেমে গেল । যা থাকল তা জলভূমিজুড়ে বৃষ্টির মত পড়তে থাকা কেইমানটার ছোট-বড় জ্বলন্ত মাংসের টুকরো । বৰ্মসদৃশ বহিরাবরণের কারণে বোমাটার সবচেয়ে খারাপ প্রভাব দৈত্যাকার কেইমানটার শরীরের ভেতরেই পড়েছে। বিজয়ের উল্লাসধ্বনিত শোনা গেল অন্যদের কাছ থেকে। নাথান গাছ বেয়ে নিচে নেমে কেলিকে বের করে অনল শেকরে ভেতর থেকে।
“তুমি ঠিক আছ?” জিজ্ঞেস করল সে।
মাথা ঝাকাল কেলি। চুলের সাথে আটকে থাকা এক টুকরো মাংস দেখিয়ে বলল, “মাথা ব্যাথা করছে একটু । কিন্তু ঠিক হয়ে যাবে।” খকখখ করে কেশে উঠল এবার । “কমপক্ষে এক গ্যালন পানি গিলেছি আমি।”
কেলিকে পানিতে নামতে সাহায্য করল নাথান । সার্জেন্ট কসটস যখন ব্যস্ত হয়ে পড়ল ভাসতে থাকা প্যাক এবং মানুষগুলোকে ভেলায় ওঠানোর কাজে, তখন নাথানের নিজের ভেলাটাতে তার বন্ধু ম্যানু এবং রেঞ্জার ক্যারেরা ছাড়া আর কেউ নেই। বৈঠায় ভর করে তাদের দিকে ভেসে এল সে। ক্যারেরা হাত বাড়িয়ে কেলিকে ভেলায় উঠতে সাহায্য করল। ম্যানুয়েল নাথানের কজিটা ধরে টেনে তুলল ভেলায়। “বুদ্ধিটা বেশ দ্রুতই করেছিলে ডক্টর,” হেসে বলল সে। “প্রয়োজনীয়তাই উদ্ভাবনের জনক,” বলল নাথান, তার অভিব্যক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটা ক্লান্ত হাসি দিয়ে। “কিন্তু আবারো শুকনো পাড়ে ওঠার জন্য তর সইছে না আমার।
“এখানো কি আরও দু-একটা থাকতে পারে এখানে?” তাদের দলটি বাকি দলের উদ্দেশ্যে রওনা হতেই জিজ্ঞেস করল কেলি । “আমার কিন্তু এখনো সন্দেহ হচ্ছে,” দুঃখের একটা অদ্ভুত অভিব্যক্তি ফুটিয়ে বলল ম্যানুয়েল। “চারপাশের বিশাল এই পরিবেশ যতই সমৃদ্ধ হোক না কেন, আমার মনে হচ্ছে
এখানে ঐ দৈত্যাকার পরভোজী দুটো ছাড়াও আরও কয়েকটার জন্য পর্যাপ্ত খাবার থাকবে। তারপরও, আমি চোখ-কান খোলাই রাখব, বলা যায় না ও দুটোর কোন বাচ্চাকাচ্চা আছে কিনা। থাকলে সেগুলোও খুব ছোট হবে না, বিপদের ঝুঁকি তাদের দিক থেকেও থাকবে।”
ক্যারেরা রাইফেল নিয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখল, বাকিরা ব্যস্ত হয়ে গেল বৈঠা চালানোর কাজে। “আপনার কি মনে হয়, ব্যান-আলিই এগুলো পাঠিয়েছে আমাদের কাবু করতে, ঠিক পঙ্গপাল আর পিরানহাদের মত?” ম্যানুয়েলকে জিজ্ঞেস করল রেঞ্জার।
উত্তর দিল কাউয়ি, “না, তবে এই কুমির দুটোকে বাকি আক্রমণকারীদের সাথে দূরে রাখতে চাই না, বরং আমার মনে হয় এরা ব্যান-আলিদের রাজ্যের প্রধান ফটকের পাহারাদার। এটা ভুল কি সঠিক জানি না, তবে ঐ জোড়াটা স্থায়ীভাবে এখানে আস্তানা বানিয়ে ব্যান-আলি রাজ্যে প্রবেশ করার দুঃসাহস দেখানো যে কাউকেই আটকে দেয়।”
পাহারাদার?… দূরে তীরের দিকে তাকাল নাথান। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া উচুঁ জমিটুকু বিকেলের উজ্জ্বল আলোয় চকচক করছে এখন। জলপ্রপাতগুলোকে মনে হচ্ছে রুপালী ঝর্না । খাড়া পাহাড় থেকে নিচে নামতেই রুপ বদলে যাচ্ছে ওদের। পাহাড় থেকে শুরু করে উপত্যকা পর্যন্ত সবটাই সবুজের ঘন আচ্ছাদনে ঢাকা। কেইমান দুটোর পাহারাদার হবার ব্যাপারে প্রফেসরের কথা যদি সত্যিই হয়ে থাকে, তবে তাদের সামনে বিস্তৃত ভূমিটা ব্যান-আলি গোত্রের, আর এতে কোন সন্দেহ নেই, সেটা তাদের ভয়ঙ্কর রাজ্যের কেন্দ্রই হবে।
বাকি ভেলাটার দিকে তাকাল সে, মাথাগুলো গুণল । ওয়াক্সম্যান, কসটস, রাকজ্যাক এবং ক্যারেরা-এখানে পাঠান বারজন রেঞ্জারের মধ্যে থেকে মাত্র চারজন অবশিষ্ট আছে, অথচ এখনো ব্যান-আলির মূল ভূ-খণ্ডেই পৌছাতে পারে নি তারা । “আমরা কখনোই এটা পারব না,” বিড়বিড় করল সে বৈঠা চালাতে চালাতে।ক্যারেরা শুনে ফেলল তার কথা। “চিন্তার কিছু নেই। আমরা পাড়ে উঠে গর্ত খুঁড়ে ক্যাম্প বানিয়ে নিরাপদে থাকব প্রয়োজনীয় রসদ আকাশপথে এখানে না পাঠানো পর্যন্ত । একদিনের বেশি লাগবে না সবকিছু পেতে ।” ভ্রু কুঁচকাল নাথান। তারা আজ তিন-তিনজন মানুষকে হারিয়েছে, সবাই উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা। একটা দিনও কম গুরুত্বের নয় । দূরের ভূমিটা আস্তে আস্তে কাছে আসতেই হঠাৎ কেমন যেন সন্দিহান হয়ে পড়ল সে। আসলেই কি সে ঐ শুকনো জমিতে পৌছাতে চায়? বিশেষ করে এমন একটা জমি যেখানে বিশেষ কিছু অপেক্ষা করছে হয়তো। কিন্তু পিছু ফেরার উপায় নেই এখন। ওদিকে স্টেটসে অজ্ঞাত এক রোগ মহামারিতে রূপ নিয়েছে। আর এদিকে তাদের ছোট দলটা বড় এক গোলকধাঁধার সমাধানের খুব নিকটে চলে এসেছে। এখন ফিরে যাবার কোনই উপায় নেই। তাছাড়া, তার বাবাও এই পথটাই বেছে নিয়েছিল, চালিয়েছিল পদেপদে বিপদ বিছানো বায়োলজিক্যাল অভিযান। নাথান এখন সেটা ক্ষান্ত দিতে পারে না। এতগুলো মৃত্যু, সীমাহীন বিপদ আর ঝুঁকি সত্ত্বেও তাকে খুঁজে বের করতেই হবে তার বাবার ভাগ্যে কি ঘটেছিল। যত বাধাই আসুক, সে শুধু জানে তাকে এগিয়ে যেতে হবে সামনে।
তারা তীরের কাছে চলে আসতেই ওয়াক্সম্যান হাক দিল। “সবাই সাবধান। আমরা ওখানে নামতেই দ্রুত জলাভূমি থেকে দূরে অবস্থান নেব। অল্প দূরেই জঙ্গলের ভেতর আমরা একটা বেইস-ক্যাম্প বানাব।”
নাথান দেখল ক্যাপ্টেন কিভাবে জলাভূমির পানি খুঁটিয়ে দেখছে। ওয়াক্সম্যান নিশ্চিতভাবেই এখনো উদ্ধিগ্ন কেইমান বা অন্যান্য পরভোজীদের নিয়ে। তবে ভেতরের রক্ত তাকে জানান দিচ্ছে, সামনেই ওৎ পেতে আছে সত্যিকারের বিপদ ব্যান-আলি ।
ওদিকে নাথান শুনতে পেল ক্যাপ্টেন এবার লেগেছে অলিন পাস্তারনায়েকের পেছনে, “আর তুমি যতদ্রুত সম্ভব আপলিংকটা সচল কর । হাতে আমাদের এখনো তিন ঘণ্টা সময় আছে, তারপর স্যাটেলাইটগুলো আমাদের সীমার বাইরে চলে যাবে আজ রাতের জন্য।”
“আমি সাধ্যমত চেষ্টা করব।” অলিন নিশ্চিত করল তাকে।
মাথা নেড়ে সায় দিল ওয়াক্সম্যান। নাথানের চোখে চোখ পড়তেই দেখতে পেল ওয়াক্সম্যানের চোখ দুটো দুঃখ আর দুশ্চিন্তায় ভরা। কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের উপস্থিতি থাকলেও সে নাথানের মতই বিচলিত ভেতরে ভেতরে। এই বিচলিত মানুষগুলো তাদের চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে, আর এর উপরেই তাদের টিকে থাকাটা নির্ভর করছে। বেশ বুঝতে পারছে নাথান। ভেলা জোড়া অগভীর পানিতে পৌছাতেই ধাক্কা খেল পাড়ের শক্ত মাটিতে। রেঞ্জাররা নামল প্রথমে। রাইফেলগুলো প্রস্তুত করেই তারা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল ঝটপট। দেখে নিল কাছের জঙ্গলটুকু । শীঘ্রই অলক্লিয়ার!” ধ্বনি ভেসে এল ঘন জঙ্গলের ভেতর থেকে।
সামনে কোন সমস্যা নেই এমন বার্তা আসার পর ভেলা থেকে নামল নাথান । তার চারপাশে অগণিত জলপ্রপাতের মৃদু গর্জন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। দুপাশে খাড়া-উঁচু পাহাড়ের একটা কাঠামো, যেটার মাঝ দিয়ে জঙ্গলটা সরু হয়ে এগিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে যেন শ্বাস রোধ করে রেখেছে পাহাড় দুটোর । গিরিখাদটির মাঝ বরাবর প্রশস্ত এক জলপ্রপাত খুব ধীরে আছড়ে পড়ছে জলাভূমির পানিতে।
জঙ্গলের একপ্রান্ত থেকে চিৎকার দিল রাকজ্যাক। “ওটা পেয়েছি!” কর্পোরাল ছায়াঘেরা জঙ্গলের ঝোপের ভেতর থেকে খানিকটা বাইরে ঝুঁকে ক্যাপ্টেনের দিকে হাত ইশারা করল। “ক্লার্কের আরও একটা চিহ্ন।
ওয়াক্সম্যান ছুটল রাইফেল সাথে নিয়ে ।“পাড়ে ওঠ সবাই!”
অপেক্ষা করল না নাথান। সে অন্যদের সাথে ছুটল রাকজ্যাকের দিকে। জঙ্গলের ভেতর কয়েক পা এগোতেই বড় একটা স্প্যানিশ সিডার গাছের সাথে আটকে থাকা এক টুকরো কাপড় দেখা গেল। তার ঠিক নিচেই আরও একটা খোদাই করা চিহ্ন। উপস্থিত প্রত্যেকেই ওটার দিকে চেয়ে রইল ভয়ের দৃষ্টিতে । একটা তীর চিহ্ন নির্দেশ করছে জঙ্গলের সরু পথটাকে। অর্থটা পরিস্কার।
“খুলি এবং আড়াআড়ি হাড়,” বিড়বিড় করল জেন। তার মানে মৃত্যু সামনেই।”
* * * *
সকাল ৩:৪০
“ব্যাপারটা বেশ মজারই ঠেকছে,” বায়নোকুলারটা নিচু করে লুই বলল লেফটেন্যান্টকে। “কেইমানটার বিস্ফোরণ কি…” মাথা দোলাল সে, “…বেশ শক্তিশালী ছিল।”
আজ সকালে লুই তার গুপ্তচর মারফত জানতে পারে রেঞ্জার্সদের প্রয়োজনীয় রসদ আকাশপথে না আসা পর্যন্ত নদীর পাড় থেকে দূরের কোথাও ক্যাম্প বানিয়ে থাকবে তারা। সে ভেবেছিল আরও তিনজন রেঞ্জার হারানো ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানের পরিকল্পনাকে স্থবির করে দেবে। দলে রেঞ্জার্সদের সংখ্যা চারে নেমে এসেছে এখন। তার মানে এটা তার জন্য মোটেই কোন হুমকি নয় আর । লুইর দল এখন যেকোন সময় ওদের শেষ করে দিতে পারে। লুই চায় না সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত আর কোন পরিবর্তন আসুক। জ্যাকের দিকে ঘুরল সে।
“মাঝরাত পর্যন্ত আমরা ওদেরকে বিশ্রাম নিতে দেব, তারপর ঘুমন্ত মানুষগুলোকে জাগিয়ে দিয়ে দৌড়ের উপর রাখব সামনের দিকে। কে জানে, আবার কোন বিপদ তৈরি করে ওরা আমাদের জন্য?” জলাভূমির দিকে দেখাল লুই।
“জি স্যার। আমি আমার দলকে মাঝরাতের আগেই তৈরি করে রাখব। আমরা এখন বেশ কিছু বাতি থেকে যথেষ্ট কেরোসিন সংগ্রহ করেছি।
“বেশ,” জলাভূমি থেকে ঘুরে দাঁড়াল লুই। সবাই যখন দৌড়ের ওপর থাকবে, আমরা তোমাকে পেছন থেকে অনুসরণ করব ডিঙ্গিতে চড়ে।”
“জি স্যার, কিন্তু… নিচের ঠোট কামড়ে ধরে জ্যাক জলাভূমির দিকে তাকাল।
লুই তার লেফটেন্যাক্টের কাঁধে হাত চাপড়ল। “ভয় কর না। যদি আরও কোন জানোয়ার পানিতে ওৎ পেতে থাকত তবে সেগুলো ঐ রেঞ্জারগুলোকে আক্রমণ করত । তুমি নিরাপদেই থাকবে।”
তবে লুই জানে তার লেফটেন্যান্টের চিন্তার কারণ। লুই-ই একমাত্র লোক নয় যে কিনা স্কুবা-ডাইভ দিতে যাচ্ছে অক্সিজেনের সিলিন্ডার কাঁধে নিয়ে একটা মটরযুক্ত স্রেজে চড়ে, একজনের সাঁতারের পোশাক শুকনো আর অন্যজনের ভেঁজা । তার সামনে যে আছে সে আগে আগে সাঁতার কাটতে থাকবে তার পেছনে থাকবে লুই। এমনকি নাইট-ভিশন ল্যাম্প থাকার পরও এই পানি পার হওয়াটা হবে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। মাথা নেড়ে সায় দিল জ্যাক । আদেশ অনুসারেই কাজ করবে সে। জঙ্গলের দিকে পা বাড়ালো লুই, গন্তব্য তার ক্যাম্পে। লেফটেন্যান্টের মতই আরও বেশ কিছু সদস্য পাড়ে অবস্থান করছে, সবার মধ্যে উত্তেজনা। তারা সবাই গাছের ফাঁকে আটকে থাকা এক রেঞ্জারের অবশিষ্ট অংশ দেখেছে। রেঞ্জারটাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন তাকে জীবিত খাওয়া হয়েছে, হড়গুলো বেরিয়ে আছে, চোখগুলো নেই। একঝাঁক পঙ্গপাল তাদের আস্তানার চারপাশে জেঁকে ধরেছিল কিন্তু তাদের বেশির ভাগই এখন উধাও। গুপ্তচরের সতর্কবার্তা পেয়ে আজ সকাল থেকে লুই অব্যাহতভাবে খুব সাবধানে কিছু টক-টক পাউডারের ধোঁয়া ছড়িয়ে এসেছে সারাটা পথজুড়ে । সাবধানের মার নেই। সৌভাগ্যক্রমে সুই যথেষ্ট পরিমাণে এই কার্যকারী পাউডার তৈরি করে নিয়েছে শুকনো লিয়ানা আঙ্গুরলতা থেকে। কিছু বাধা-বিপত্তি ছিল, তা সত্ত্বেও লুইর পরিকল্পনাটা এগুচ্ছে সুন্দরভাবেই। লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে তার দলকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তাকে যথেষ্ট সফলই বলা চলে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ব্যান-আলিরা তাদের সকল মনোযোগ নিবন্ধিত করে আছে অগ্রগামী দলটির সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পদ রেঞ্জারগুলোর দিকে।
তবুও লুই আশা করে না, এই বিশেষ ধরণের সুযোগ দীর্ঘ সময়ের জন্য থাকবে । বিশেষ করে একবার যখন তারা নিজেরাই ঐ গোপন গোত্রটির এলাকায় প্রবেশ করে ফেলেছে। আর এই দুশ্চিন্তাটা যে শুধু তার এ-কারণে হয়েছে তা নয়। প্রথমদিকে ভাড়া করা তিন সৈন্য গোপনে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল, সামনে কি বিপদ অপেক্ষা করছে সেটা ভেবেই সব রকম বাধ্য-বাধকতা ত্যাগ করেছিল ওরা। সহজেই কাপুরুষগুলো ধরা পড়ে আর সঙ্গত কারণেই তাদেরকে নিয়ে চমৎকার একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে সুই। বাকি সৈন্যদেরকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে, পালানোর শাস্তি কেমন হতে পারে।
লুই জঙ্গলের ভেতর করা অস্থায়ী ক্যাম্পে পৌছেই তার মিসট্রেস সুকে পেল । তাবুর পাশে হাটুর উপর ভর দিয়ে বসে আছে মেয়েটি । খানিকটা দূরে, বিভিন্ন গাছের মাঝে ডানা মেলা ঈগলের মত হাত পা ছড়িয়ে প্রসারিত করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বিনা দরখাস্তে ছুটিতে যাওয়া তিন সদস্যকে। চোখ সরিয়ে ফেলল লুই । নিশ্চিতভাবেই সুই তার কাজে নতুন কিছু শৈল্পিক ছোঁয়া দিয়েছে কিন্তু লুই তা দেখতে চাইল না। তার আসার শব্দে মাথা তুলে তাকাল সুই। এক বাটি পানির মধ্যে তার যন্ত্রপাতিগুলো পরিস্কার করছে সে।
প্রশস্ত এক হাসি দিল লুই ,তার দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল সুই তার পেশীবহুল পা দুটোর উপর ভর করে। তাকে বাহুর নিচে আলতো করে ধরে তাবুর দিকে নিয়ে গেল সে। ব্যবচ্ছেদের জায়গাটুকু পার হতেই সুইর বুকের গভীর থেকে চাপা একটা গর্জন বেরিয়ে এল, যেন অধৈর্যের বহিঃপ্রকাশ। লুইর হাতটা ধরে সে খুব আগ্রহভর এগিয়ে গেল তাদের অন্ধকারাচ্ছন্ন উষ্ণতায় ভরা তাঁবুর দিকে।
এই মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছে বাকি সবাইকে কিছুটা সময় অপেক্ষায় থাকতে হবে ।
