আমাজনিয়া – ১৩
ছায়া
১৫ আগস্ট, রাত ৩:২৩
ইন্সটার ইন্সটিটিউট
ল্যাঙ্গলে, বার্জিলিয়া
ডা. অ্যালভিসোর দরজায় টোকা দিল লরেন। আজ সকালে এই মহামারি বিশেষজ্ঞ বেশ জরুরি ভিত্তিতেই লরেনকে তার সাথে একটু দেখা করার অনুরোধ করে। এটাই প্রথম কোন সুযোগ এতসব কাজের চাপ ঠেলে নিজেকে সাময়িক সময়ের জন্য মুক্ত করার এবং তার সাথে দেখা করার।
কিন্তু তা করার পরিবর্তে সে সারাটা সকাল ও দুপুর ক্যালিফোর্নিয়ার ভ্যাকাভিলে অবস্থিত বায়োলজিক্যাল ল্যাবসে ডা. হাভিয়ের রেনল্ডস ও তার দলের সাথে ভিডিও কনফারেন্সিং করেছে। তাদের আবিষ্কৃত প্রিয়ন প্রোটিনটাই হতে পারে এই রোগ নিরাময়ের প্রথম ক্লু। এখন পর্যন্ত এই ছোঁয়াচে রোগটা কেড়ে নিয়েছে ষাট জনের জীবন, অসুস্থ করেছে আরও কয়েকশ জনকে। লরেন তার এই প্রাক্তন ছাত্রের দেওয়া তথ্য-উপাত্তগুলো পুণঃবিশ্লেষণ ও পরীক্ষার জন্য আরও চৌদ্দটি ভিন্ন-ভিন্ন ল্যাবে পাঠিয়েছে। সে-সব জায়গা থেকে নিশ্চিত কোন ফলাফল আসার আগে কিছুটা সময় তার হাতে রয়েছে যেটা সে ব্যবহার করতে চায় এই এপিডেমিওলজিস্টের সাথে দেখা করে ।
দরজাটা খুলে গেল। স্ট্যানফোর্ড থেকে পাশ করা এই তরুণ ডাক্তারকে দেখে মনে হচেছ যেন কয়েক সপ্তাহের ভেতর একটুও ঘুমায় নি। খোঁচাখোচা কালো দাড়ি সারা মুখে, চোখ দুটো রক্তলাল । “ডা. ওব্রেইন, এখানে আসার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ,” সে রুমের ভেতরে আসার জন্য ইঙ্গিত করল তাকে।
লরেন এর আগে কখনো তার অফিসে আসে নি, তাই সে যখন দেয়ালের একপাশে রাখা সারি-সারি কম্পিউটার দেখল, বেশ অবাকই হল। এটুকু বাদ দিলে রুমটা বরং বেশ সাদামাটাই বলা চলে। এলোমেলো ফাইলপত্রে ঢাকা একটি ডেস্ক ,বইয়ে উপচে পড়া একটি তাক, কিছু চেয়ার। একেবারে নিজস্ব বলতে স্টানফোর্ড কার্ডিন্যাল দলের লাল রঙের একটি ব্যানার, যেটা ঝুলছে বিপরীত দিকের দেয়ালে কি লরেনের চোখ দুটো সব বাদ দিয়ে আটকে গেল কম্পিউটার মনিটরের দিকে মনিটরগুলো নানা রকম গ্রাফ আর সংখ্যায় ভরা।
“কি এমন জরুরি বিষয়, হ্যাঙ্ক?” জিজ্ঞেস এল লরেন ।
সে হাত নেড়ে কম্পিউটারগুলোর দিকে ইঙ্গিত করল,“আপনাকে এগুলো আমার দেখানো দরকার।” তার কণ্ঠে হতাশা।
লরেন মাথা নেড়ে ডা. অ্যালভিসোর এগিয়ে দেয়া চেয়ারটাতে বসে পড়ল একটা মনিটরের সামনে।
“আপনার কি মনে আছে আমি বলেছিলাম, এই রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যাসোফিলের সম্ভাব্য বৃদ্ধির কথা? কিভাবে এই পরীক্ষালবদ্ধ ব্যাপারটি রোগটিকে দ্রুত সনাক্ত ও শ্রেণীবদ্ধ করতে পারে সে কথা?”।
মাথা নেড়ে সায় দিল লরেন, কিন্তু এই তত্ত্ব শোনার পর পরই এটার সত্যতা নিয়ে তার ভেতরে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে সেই তখন থেকেই। জেসির দেহেও ব্যাসোফিনের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল কিন্তু বাচ্চাটা বেশ ভালভাবেই সেটা সামাল দিতে পেরেছে । এমনকি এই কথাও শোনা যাচ্ছে যে, তাকে পারলে আগামীকালই হাসপাতালের ওয়ার্ড থেকে ছেড়ে দেয়া হবে। ব্যাসোফিলের বেড়ে যাওয়াটা হতে পারে এমন কিছু যা অন্য কোন জ্বরের সাথে সংশ্লিষ্ট, এই নতুন রোগের সাথে ব্যাসোফিলের কোন সম্পৃক্ততা নেই। ঠিক এ-কথাটা বলার জন্য সে মুখ খুলতেই ডা. অ্যালভিসো তাকে থামিয়ে দিয়ে কম্পিউটারের কি-বোর্ডের দিকে ঘুরে গেল ।দ্রুত টাইপ করে যাচ্ছে সে। “এটা করতে আমার সম্পূর্ণ চব্বিশ ঘণ্টা লেগে গেছে। সারা দেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। সবগুলোই শিশু আর বয়স্কদের মধ্যে জ্বর-বিষয়ক, বিশেষ করে যাদের শরীরে
বেসোফিলের পরিমাণ হঠাৎ অনেক বেড়েছে তাদের। নতুন এই মানদন্ডের উপর ভিত্তি করে আমি একটা মডেল দাঁড় করাতে চাচ্ছিলাম।”
সামনের মনিটরে ইউনাইটেড স্টেটসের একটা ম্যাপ ফুটে উঠল যেটার মাঝে প্রত্যেকটি অঙ্গরাজ্য আলাদা করা কালো রঙের সীমারেখা দিয়ে। ছোটছোট কিছু লাল-বিন্দু ফুটে উঠল ম্যাপটিতে, বিশেষ করে ফ্লোরিডা এবং দক্ষিণাঞ্চলের অঙ্গরাজ্যগুলোতে।
“এগুলো আগের তথ্য। লাল-বিন্দু দেখা প্রত্যেকটি অঞ্চল তথ্য-সংগ্রহের সময়কালীন রোগের পরিস্থিতিকে প্রকাশ করেছে।”
রিডিং গ্লাসটা পরে স্ক্রিনের দিকে আরেকটু ঝুঁকে গেল লরেন।
“কিন্তু ব্যাসোফিলের বৃদ্ধিটাকে একটা মান-নিৰ্ণায়ক হিসেবে ধরে যদি হিসেবটা করি তবে ইউনাইটেড স্টেটসজুড়ে রোগটার সাম্প্রতিক অবস্থার বাস্তব চিত্র পাব, কি-বোর্ডে টাইপ করল মহামারি বিশেষজ্ঞ । সাথে সাথে ম্যাপটি আরও লাল রঙের ফোটায় ভরে গেল । ফ্লোরিডা বলতে গেলে পুরোটাই লাল, জর্জিয়া এবং আলাবামার অবস্থাও প্রায় একই রকম অন্যান্য অঙ্গরাজ্যগুলো যেখানে আগের ম্যাপটিতে সাদা ছিল এখন ভরে উঠছে। লাল ফোটায়। হ্যাঙ্ক ঘুরল লরেন এর দিকে।
“দেখতেই পাচ্ছেন, আক্রান্তের সংখ্যা কেমন উর্দ্ধমুখি। এদের মধ্যে বেশির ভাগ রোগিকেই কোয়ারেন্টাইন করে আলাদা করা হয় নি কারণ সিডিসি থেকে ঘোষণা করা এই রোগের তিনটি লক্ষণ আক্রান্তদের মাঝে এখনো দেখা যায় নি, ফলে ওদের কাছ থেকে আক্রান্ত হচ্ছে বাকিরা।”
এ-ব্যাপারে সন্দিহান হওয়া সত্ত্বেও লরেনের পেটটা গুলিয়ে উঠল। ব্যাসোফিল নিয়ে ডা. অ্যালভিসোর অনুমাণ যদি ভুলও হয়, তারপরও সে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে এনেছে । প্রথম অবস্থাতে রোগের সনাক্তকরণ খুবই কঠিন। তাই যতক্ষণ না নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত আক্রান্ত সকল শিশু ও বয়স্কদেরকে কোয়ারেন্টাইন করে রাখা উচিত জরুরি ভিত্তিতে। এমনকি তারা যদি ফ্লোরিডা এবং জর্জিয়ার মত বেশি মাত্রায় আক্রান্ত অঞ্চলের মত না-ও হয়ে থাকে।
“আমি বুঝতে পারছি তুমি কি বলতে চাইছ,” বলল লরেন। “আমাদের খুব দ্রুতই সিডিসির সাথে যোগাযোগ করা উচিত, তাদেরকে সারা দেশে কোয়ারেন্টাইন পলিসি চালু করতে বলা উচিত।”
মাথা নেড়ে সায় দিল হ্যাংক। “কিন্তু এটাই সবকিছু নয়। সে কম্পিউটারের দিকে ঘুরে কিছু একটা টাইপ করল। “নতুন এই ব্যাসোফিলের তথ্যের উপর ভিত্তি করে আমি একটি এক্সপ্লোরেশন মডেল দাঁড় করিয়েছি ভবিষ্যতের পরিস্থিতিটা বোঝার জন্য। দুসপ্তাহের মধ্যে রোগের মাত্রাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে এটা তারই ছবি।” সে এন্টার বাটনে চাপ দিলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্ধেক অঞ্চলই লালে ছেয়ে গেল ।
কেঁপে উঠে খানিকটা পেছনে সরে গেল লরেন । “আর এক মাসের মধ্যে,” এন্টার বাটনটা দ্বিতীয়বার চাপল হ্যাংক। লাল ফোটাগুলো আট-চল্লিশটি অঙ্গরাজ্যের প্রায় পুরোটাই গিলে ফেলল। হ্যাংক তাকাল লরেনের দিকে। “এটা থামাতে এখনই আমাদের কিছু করতে হবে। প্রত্যেকটা দিনই গুরুত্বপূর্ণ।
রক্ত রঙে ছেয়ে যাওয়া পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে লরেন, গলা শুকিয়ে গেছে তার, চোখ দুটো ছানাবড়া। একটাই শান্ত্বনা মনে, হয়তো ডা. অ্যালভিসের করা এই রিপোর্টটি অতিরঞ্জিত হয়ে গেছে। লরেনের সন্দেহ হচ্ছে বেসোফিলের বৃদ্ধিপ্রাপ্তিটা আসলেই রোগের প্রাথমিক অবস্থার নির্ণায়ক কিনা। তারপরও সতর্কবার্তাটা বেশ নাড়া দিয়েছে তাকে। প্রত্যেকটা দিনই খুব গুরুত্বপূর্ণ। তার পেজার যন্ত্রটা বিপ করে উঠল, যেন এটা মনে করিয়ে দিতে, এই রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হলে প্রত্যেকটা সম্পদই নিয়েই যুদ্ধ নামতে হবে । সে পেজারের স্ক্রীনটা দেখল । মার্শাল। নির্দিষ্ট সংখ্যার কোডের সাথে একটা ৯১১জুড়ে দিয়েছে তার স্বামী। তার মানে খুবই জরুরি কিছু। “আমি কি তোমার ফোনটা ব্যবহার করতে পারি?” জিজ্ঞেস করল সে।
“আবশ্যই।
সে উঠে দাঁড়িয়ে ডেস্কের অন্য প্রান্তে গেল । হ্যাঙ্ক ডুবে গেল কম্পিউটারের পরিসংখ্যান মডেলে। ডায়াল করল লরেন। রিংটা অর্ধেক হতেই উত্তর এল ওপাশ থেকে ।
“লরেন…”
“কি হয়েছে মার্শাল?”
কথাগুলো খুব দ্রুত বেরিয়ে আসল তার স্বামীর মুখ থেকে । কণ্ঠে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। “জেসির অবস্থা ভাল না, আমি হাসপাতালে।”
ফোনটা আরও শক্ত করে ধরল লরেন। “কি…কি হয়েছে ওর? কি সমস্যা?”
“তাপমাত্রা আবার বেড়ে গেছে,” বলল সে। “এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে সবচেয়ে বেশি। আরও তিনটি শিশু ভর্তি হয়েছে। তাদের সবারই একই রকম জ্বর।”
“কি…কি বলছ তুমি?” তোতলালো লরেন, কিন্তু সে নিজেই জানে এই প্রশ্নের উত্তর। চুপ মেরে রইল তার স্বামী। “আমি আসছি,”অবশেষে বলল সে। ফোনটা জায়গামত রাখতে হাত কেঁপে উঠল।
হ্যাংক ঘুরল তার দিকে, তার এই অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া দেখে অবাক সে। “ডা. ওব্রেইন?”
কথা বলতে পারছে না লরেন । জেসি…ব্যাসোফিলের বৃদ্ধি…আরও আক্রান্ত শিশু। হায় ঈশ্বর, রোগটা এখানে ছড়িয়ে পড়ছে! লরেন ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে রইল মনিটরে ভেসে ওঠা লাল ফোটায় ছেয়ে যাওয়া ইউনাইটেড স্টেটসের ম্যাপটার দিকে। এই এপিডেমিওলজিস্টের তত্ত্বটা ভুল নয় তাহলে । অতিরঞ্জিত কিছু নেই এখানে।
“সব কিছু ঠিক আছে তো?” কোমলস্বরে জিজ্ঞেস করল হ্যাংক। খুব ধীরে মাথা ঝাকাল লরেন, চোখ দুটো এখনও স্থির হয়ে আছে স্ক্রিনের উপর।
* * * *
বিকাল ৫:২৩
আমাজন জঙ্গল
ভায়ের সাথে কেলিও ঝুঁকে আছে, অলিন পাতারনায়েকের দু-পাশে তারা দুজন। রাশিয়ান কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন সিস্টেমটি সম্পূর্ণ খুলে নতুন করে সব যন্ত্রাংশ জোড়া দিচ্ছে। সারাটা দুপুর ধরে কাজ করে যাচ্ছে সে, স্টেটসের সাথে যোগাযোগের প্রাণান্তর প্রচেষ্টা হিসেবে।
“এবার কাজ করতে পারে এটা,” বিড়বিড় করল সে। “মাদার বোর্ড পর্যন্ত খুলে আবার লাগালাম। এরপরও যদি কাজ না করে জানি না আর কি করার আছে।”
মাথা নেড়ে সায় দিল ফ্রাঙ্ক। “আগুনে জ্বালিয়ে দিও।”
চূড়ান্ত বারের মত কানেকশনটা পরীক্ষা করল অলিন, স্যাটেলাইট ডিশটা ঠিকঠাক বসিয়ে আবার মনোযোগ দিল ল্যাপটপের দিকে। সৌরশক্তির যটা চালু করলে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই অপারেটিং সিস্টেমটা চালু হল । জীবন্ত হয়ে উঠল স্ক্রিন।
“হার্মেস স্যাটেলাইটের সাথে একটা সংযোগ পেয়েছি আমরা,”বলল অলিন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে।
একটা আনন্দ ধ্বনি উঠল কেলির চারপাশে। অলি তার যোগাযোগ যন্ত্রের চারপাশে জড়ো হল সবাই শুধু জলাভূমির কাছে পাহারায় থাকা দু-জন রেঞ্জার বাদে।
“কোন আপলিংক দিতে পারবে তুমি?” ওয়াক্সন জিজ্ঞেস করল । “হাত তুলে প্রার্থনা করুন,” বলল অলিন, কিবোর্ডে হাত চালাতে শুরু করেছে সে।
নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে কেলির। স্টেটসের কারো সোথ যোগাযোগ করাটা খুবই দরকার। প্রয়োজনীয় সব কিছুই দরকার এখন তাদের। কি সব ছাপিয়ে কেলির কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হল জেসির এখনকার অবস্থাটা জানা। তার মেয়ের কাছে পৌছানোর একটা উপায় বের করতেই হবে তাকে।
“এবার যাওয়া যাক,” চূড়ান্তবারের মত কিছু টাইপ করল অলিন, পরিচিত একটা কাউন্টডাইন শুরু হল ক্রিনে।
রিচার্ড জেন কেলির পেছনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করল, “হে ঈশ্বর…যেন কাজ হয়…” তার এই প্রার্থনাটা যেন সবারই প্রার্থনা।
কাউন্টডাউনটা শূন্যে এসে বিপ করে থামল। সাথে সাথে ক্লিনটাও কালো হয়ে গেল, কিছু নেই। শেষ হতে চায় না এমন দীর্ঘ কয়েকটি সেকেন্ড অতিবাহিত হবার পর হঠাৎ কেলির বাবা-মার ছবি ভেসে উঠল পর্দায়। একই সাথে ভীতি আর পরিত্রাণের ছবি ফুটে উঠল মানুষ দুটির চোখেমুখে।
“থ্যাংক গড!” বলল কেলির বাবা। গত কয়েক ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করছি তোমার সাথে যোগাযোগ করার জন্য।”
অলিন একপাশে সরে গিয়ে ফ্রাঙ্ককে জায়গা করে দিল । “কম্পিউটারে সমস্যা ছিল,” বলল ফ্রাঙ্ক, “এছাড়া আরো অনেক সমস্যা তো আছেই।”
সামনের দিকে ঝুঁকে গেল কেলি, আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারল না সে। “জেসি কেমন আছে?”
তার মায়ের মুখের অভিব্যক্তিই উত্তরটা দিয়ে দিল যেন। চোখের চারপাশের পেশীগুলো কেমন অস্থিরভাবে নড়ে উঠল তার। একটা বিরতি নিয়ে মুখ খুলল সে। “ও…ও ভালই আছে সোনা।”
ক্রিনের ছবিটা কেমন আটকে গেল, যেন কম্পিউটার একটা মিথ্যে সনাক্তকারী যন্ত্র। স্থবিরতা আরও বেড়ে গেল, ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হতে লাগল ছবি। তার মায়ের কাছ থেকে আসা কথাগুলো খুব জড়াননা শোনাচ্ছে এখন।
“রোগের একটা ওষুধ…প্রিয়ন ডিজিজ…তথ্য পাঠাচ্ছি…”
এবার কথা বলে উঠল তার বাবা, কিন্তু কথা বার বার কেটে যাচ্ছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে উঠল এবার। মনে হল যেন তারা বুঝতে পারছে না তাদের কথাগুলো কেন আটকে যাচ্ছে।“…হেলিকপ্টার রওনা..ব্রাজিলিয়ান আর্মি…”
অলিনের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল ফ্রাঙ্ক, “এই ইনকামিং সিগন্যালের সমস্যাটা ঠিক করতে পারবে?” সে ঝুঁকে গিয়ে কিছু বাটন চাপল। “ঠিক জানি না, মনে বুঝতে পারছি না আমি। এইমাত্র একটা ফাইল রিসিভ করলাম। হতে পারে এ কারণে অন্য তথ্যগুলো আসতে বাধা পাচ্ছে।”
কিন্তু অলিনের প্রত্যেকটা ক্লিকেই সিগন্যাল আরো খারাপ হতে লাগল । কম্পিউটারের পদা স্থির হয়ে গেল, মাঝে-মধ্যেই শো-শশা শব্দ হচ্ছে। আবার ফাকে-ফাকে ভিন্ন কিছু শব্দ বেরিয়ে এল। “ফ্রাঙ্ক…দেখছিল তোমায়…তুমি কি আগামীকাল সকালে…জিপিএস লক হয়েছে..” এরপর সম্পূর্ণ শব্দটাই আটকে গলে। ক্লিনটা শেষবারের মত একবার হঠাৎ ঝলকানি দিয়ে জ্বলে উঠেই নিভে গেল।
“ধ্যাত্!” বিরক্তি প্রকাশ করল অলিন।
“আবারো চালু কর ওটা,” পেছন থেকে বলল ওয়াক্সম্যান।
যন্ত্রগুলোর ওপর ঝুকে মাথা নেড়ে সায় দিল অলিন। “আমি জানি না আমি পারব কিনা। আমি মাদার বোর্ডটা ঠিক করে সবগুলো সফটওয়্যার নতুন করে ইন্সটল কলাম।”
“তাহলে সমস্যা কোথায়?” কেলি জিজ্ঞেস করল।
“নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। মনে হচ্ছে কোন ভাইরাস সম্পূর্ণ স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন যন্ত্রগুলোকে বিকল করে দিয়েছে।”
“বেশ, চেষ্টা করে যাও,” বলল ওয়াক্সম্যান। “স্যাটেলাইটটা আমাদের অকাশ-সীমার বাইরে যাবার আগে হাতে আধ-ঘণ্টার মত সময় পাবে তুমি ।
ফ্রাঙ্ক সবার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। এমনকি এখন যদি আমরা সংযোগ না-ও পাই তবু এতক্ষণে যা শুনলাম তাতে বোঝা গেল, ব্রাজিলিয়ান হেলিকপ্টার আমাদের এখানে আসছে। হতে পারে ওটা আগামীকাল সকালে এসে পৌছাবে।”
তার পেছনে বসা অলিন তাকিয়ে আছে নিস্প্রান স্ক্রিনের দিকে। “ওহ, গড।”
সবার চোখ ঘুরে গেল রাশিয়ান কমিউনিকেশন এক্সপার্টের দিকে। সে স্ক্রিনের ডান পাশের উপরের কোণায় ভেসে থাকা কিছু সংখ্যাকে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। আমাদের জিপিএস সিগন্যাল এটা।”
“কি হয়েছে?” জিজ্ঞেস করল ওয়াক্সম্যান ।
অলিন মুখ তুলে সবার দিকে তাকাল। “সিগন্যালটা ভুল। এই স্যাটেলাইট যন্ত্রকে যা-ই বিকল করুক না কেন সেটা আমাদের এখান থেকে স্যাটেলাইটে পাঠান জিপিএস সিগন্যালের হিসেবটাও এলোমেলো করে দিয়েছে। এর ফলে স্টেটসে ভুল জিসি সিগন্যাল চলে গেছে। আবারো সে তাকাল স্ক্রিনের দিকে। “আমরা এখন যেখানে আছি তার থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান দেখিয়েছে।”
কেলির মনে হল তার মাথার ভেতর দিয়ে যেন রক্তের স্রোত বয়ে গেল। “ওরা তাহলে জানবে না আমরা কোথায়?”
“এটাকে আবারো ঠিকঠাক করে চালাতে হবে,” বলল অলিন। “অন্তত সিগন্যালটা ঠিক করা যায় কিনা দেখি।”
সে কম্পিউটারটা রিস্টার্ট দিয়ে আবারো কাজে লেগে গেল। পরবর্তী আধঘণ্টা ধরে অলিন উদ্বেগের সাথে তার যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করে গেল। প্রার্থনা ও অভিশাপের বাণীগুলো একই সাথে ইংরেজি এবং রাশিয়ান ভাষায় তার মুখ থেকে অনর্গল বের হতে লাগল । সে যখন ব্যস্ত তার কাজ নিয়ে, তখন প্রত্যেকেই কিছু না কিছু কাজ পেয়ে গেল। বিশ্রাম নেওয়ার কথাটা কেউ মাথায়ই আনল না । কেলি বসে গেল আনাকে ভাত রাঁধতে সাহায্য করতে। খাবার বলতে এটুকুই আছে তাৰ্দের কাছে। সবাই কাজের ফাঁকে অলিনের দিকে নজর রাখছে আর মনে মনে প্রার্থনা করছে। কিন্তু তাদের সকলের চেষ্টা ও প্রার্থনা কোন কাজেই এল না। কিছু সময় পর ফ্রাঙ্ক এসে অলিনের কাঁধে একটি হাত রাখল। অন্য হাতটি তুলে হাতঘড়িটা দেখিয়ে বলল, “অনেক দেরি হয়ে গেছে । যোগাযোগ স্যাটেলাইট সীমার বাইরে চলে গেছে এতক্ষণে।”
পরাজিত, বিধ্বস্ত অলিন তবুও ঝুঁকে পড়ল স্যাটেলাইট যন্ত্রের উপর।
“আগামিকাল সকালে আবারো চেষ্টা করা যাবে,” বলল ফ্রাঙ্ক, অনেকটা আদেশের সুরে।“এখন বরং বিশ্রাম নাও। কাল আবার নতুন করে শুরু কর।”
নাথান, কাউয়ি আর ম্যানুয়েল জলাভূমি থেকে ফিরল তাদের মাছধরা অভিযান শেষে। শিকারের পরিমাণ দারুণ। সবগুলো মাছ দড়িতে গেঁথে লম্বা একটা সারি তৈরি করে নিয়ে এল সবাই মিলে। আগুনের পাশে রেখে দিল ওগুলো।
“আমি ওগুলো পরিষ্কার করছি,”কাউয়ি বলল মাটির উপর বসে পড়ে । শ্বাস ফেলল ম্যানুয়েল। তাহলে কি আর করা।”
নাথান হাত মোছা শেষ করে অলিন এর কম্পিউটারের দিকে তাকাল। তারপর এগিয়ে গেল তার দিকে। মাছ ধরার সময় কেমন যেন একটা কথা শুনলাম আমি। একটা ফাইল না যেন এরকম কিছু একটা, তাই না?”
“ঠিক কি বলছ বুঝতে পারছি না,” কাতরস্বরে বলল অলিন।
“তুমি মনে হয় বলেছিলে, যোগাযোগের মধ্যে কোন এক সময়ে একটা ফাইল ডাউনলোড করা হচ্ছিল।”
মুখমণ্ডল কুঁচকে গেল অলিনের, তারপর বুঝতে পেরেছে এমন ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। “ওহ..হ্যা, একটা ডাটা ফাইল।”
কেলি ও ম্যানুয়েল ছুটে এল এ-সময় । কেলির এবার মনে পড়ল তার মা তার সাথে কথা বলার সময় একটা ফাইল পাঠানোর কথা বলেছিল, ঠিক কানেকশনটা কাটার আগেই। সেই ফাইলটা বের করে ওপেন করল অলিন।
আরও খানিকটা ঝুঁকে গেল কেলি। ক্রিনে তথ্যের কিছু পৃষ্ঠা ভেসে উঠল, সেগুলোর ঠিক ওপরে একটা থ্রি-ডি আণবিক মডেলের ঘূর্ণায়মান ছবি । কৌতুহলি কেলি কম্পিউটারের পাশে বসে পড়ল । রিপোর্টটায় চোখ বোলাল সে। “আমার মায়ের কাজ এগুলো,” বিড়বিড় করে বলল । কিছুটা আনন্দিত হল এটা ভেবে যে, তার মনটা এখন তার নিজস্ব সব উদ্বেগ থেকে সরে গিয়ে নতুন কিছুতে ব্যস্ত হচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এর বিষয়-বস্তু মোটেই সহজ বলে মনে হচ্ছে না।
“কি এটা?” জিজ্ঞেস করল নাথান। “নতুন রোগটার কোন এক সম্ভাব্য কারণ এটা,” বলল কেলি।
কেলির কাঁধের উপর দিয়ে তাকিয়ে আরও পরিস্কার করে উত্তর দিল ম্যানুয়েল । “একটা প্রিয়ন।
“একটা কি..?”
ম্যানুয়েল বোঝাতে শুরু করল নাথানকে, কিন্তু কেলি মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকল রিপোর্টটা । “বেশ অদ্ভুত” বিড়বিড় করল সে।
“কি অদ্ভুত?” জানতে চাইল ম্যানুয়েল ।
“এখানে বলা হয়েছে, এই প্রিয়নটা জেনেটিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। দ্রুত পরের রিপোর্টে গেল সে। ম্যানুয়েলও পড়ল তার কাঁধের উপর দিয়ে। একটা শিষ দিল সে, যেন আনন্দ পাচ্ছে।
“ঘটনা কি?” জিজ্ঞেস করল নাথান।
কেলির কণ্ঠে উত্তেজনা ভর করেছে। এটাই এই রোগের সমাধান হতে পারে। এখানে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন গবেষকের করা কিছু পেপার রয়েছে যেগুলো প্রকাশিত হয়েছিল নেচার সাময়িকীতে ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। তারা ঈষ্টের উপর চালানো এক গবেষণায় দেখিয়েছিল, প্রিয়নরা জেনেটিকভাবে কিছু পরিবর্তন করে দিতে পারে, এমনকি বিবর্তনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এরা।”
“সত্যি? কিভাবে?”
“বিবর্তনের বিস্ময়গুলোর মধ্যে একটা বড় বিস্ময় হল কিভাবে টিকে থাকা প্রাণীগুলো নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি যুগপৎভাবে একাধিক জেনেটিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যায় । এ-ধরণের পরিবর্তনগুলোকে বলা হয় ম্যাক্রোভুলুশন। যেমনটা দেখা যায় সরল গঠনের অ্যালজি শৈবালের ভেতর। যার কারণে শৈবালগুলো বিষাক্ত পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। এটা আরও দেখা যায় ব্যাকটেরিয়ার ভেতরেও যার জন্য ব্যাকটেরিয়াগুলোর মধ্যে খুব দ্রুত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু কিভাবে এই একাধিক যুগপৎ পরিবর্তনগুলো ঘটে থাকে তা জানা ছিল না । কি এই প্রবন্ধটা একটা সম্ভাব্য সমাধানের কথা বলছে। আর সেটা হল প্রিয়ন। কেলি কম্পিউটারের ক্রিনের দিকে দেখাল । “এখানে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখিয়েছেন, একটা ঈষ্টের প্রিয়ন জেনেটিক কোডের বিন্যাস উল্টে ফেলতে পারে, হয়তো পুরোপুরি কিংবা একটুও না। যখন উল্টে দেয়, বলা যেতে পারে একটা ব্যাপক পরিবর্তন চলে আসে সবকিছুতে, একইসাথে যেটা জাগিয়ে তোলে বিবর্তনের নতুন ধাপকে। বুঝতে পারছ এটার অর্থ কি?”
কেলি ম্যানুয়েলের চোখে ভেসে ওঠা অনুধাবনের দ্যুতি দেখতে পেল । “ঐ পিরানহা প্রাণীগুলো, পঙ্গপালের দল,” বিড়বিড় করে বলল বায়োলজিস্ট।
“ঐ সবগুলোর মধ্যেই যে মিউটেশন হয়েছে তার জন্য দায়ি এই প্রিয়ন।” “কিন্তু এসব রোগের সাথে এই প্রিয়নের কি সম্পর্ক?” জিজ্ঞেস করল নাথান ।
ভ্রু কুঁচকাল কেলি। “আমি ঠিক জানি না। তবে এই আবিষ্কারটা দিয়ে ভাল একটা সূচনা হল কিন্তু আমরা এখনো পরিপূর্ণ জবাবটা পেতে অনেক দূরে আছি।
স্ক্রীনের দিকে তাকাল ম্যানুয়েল । “কিন্তু আর্টিকেলটার এই জায়গায় ওটার হাইপোথিসিস…” মাথা নেড়ে সায় দিল কেলি । দু-জনেই আলোচনায় ডুবে গেল, কথা হচ্ছে দ্রুত, হচ্ছে মতের আদান প্রদান। তাদের পাশে বসা নাথান এসব কথা শোনা থামিয়ে দিল । তার ভাবনা ঘূর্ণায়মান পেঁচানো প্রিয়ন প্রোটিনের দিকে নিবদ্ধ। কিছুক্ষনপর ম্যানুয়েলের আলোচনায় বাধা দিল সে। “এই মিলটা কি খেয়াল করেছ কেউ?”
“কিসের কথা বলছ তুমি?” জিজ্ঞেস করল কেলি। স্ক্রিনের দিকে দেখাল নাথান। “প্রিয়নটার পেঁচানো প্রান্ত দুটো দেখেছ?”
“ডাবল আলফা হেলিক্স” কেলি বলল ।
“হ্যা…আর এখানে দেখ কর্ক-স্ক্রুর মত পেঁচানো দেখতে মাঝের অংশটা।” আঙুল দিয়ে ক্লিনটা স্পর্শ করে নাথান বলল ।
“তো?” বলল কেলি।
নাথান ঘুরে কাছের মাটির উপর বসে পড়ল। তারপর একটা কাঠি তুলে মাটির উপর আঁকা শুরু করে দিল তার মুখের বর্ণনানুসারে । “এই হল মাঝের কর্ক-স্ক্রুর মত পেঁচানো অংশটা, কেমন ছড়িয়ে আছে উভয় দিকে আর প্রত্যেক পাশেই এই হল দুটো করে প্রান্ত, তার বলা শেষ হলে বাকিদের দিকে তাকাল সে।”
হতভম্ব কেলি তাকিয়ে আছে মাটিতে আঁকা ছবিটার দিকে। দম আটকে আসার উপক্রম হল ম্যানুয়েলের। “ব্যান-আলি প্রতীক!”
দুটি ছবিই দেখতে লাগল কেলি। একটা উচ্চপ্রযুক্তিতে আঁকা কম্পিউর মডেল, অন্যটি নরম মাটিতে খোদাই করা, কি দুটোর মধ্যে যে সাদৃশ্য রয়েছে তাতে কোন সন্দেহই নেই।স্ক্রুর প্যাঁচ, ডাবল হেলিক্স মনে হচ্ছে যেন কাকতালীয়তার চেয়েও বেশি। এমন কি আণবিক গঠনটির ঘড়ির কাটার দিকে ঘুরতে থাকা অবস্থায়ও অদ্ভুত রকমই মিলে যাচ্ছে।
কেলি ঘুরে গেল নাথান এবং ম্যানুয়েলের দিকে। “হায় ঈশ্বর।” ব্যান-আলি প্রতীকটি এই প্রিয়নেরই আরেক রূপ।
* * * *
রাত ১১:৩০
জ্যাকের সাহস এখনও গ্রাস করে আছে জলাভূমির এই অন্ধকার পানিভীতি, যদিও তার জন্মের কয়েক বছর পর, বালক বয়সেই পিরানহার আক্রমণে তার চেহারা অদ্ভুতভাবে বদলে যায় । এই গভীর ভয় থাকা সত্ত্বেও সে ভেসে চলেছে পানির ভেতর দিয়ে। পানির ঐসব দাঁতালো প্রাণী আর তার মধ্যে পার্থক্য বলতে একটা ভেঁজা সঁতারের পোশাক ছাড়া আর কিছুই না। তার পছন্দের কোনই মূল্য নেই এখানে। তাকে তার লিডারের কথা মানতেই হবে । অমান্য করার ফল এখানে লুকিয়ে থাকা যেকোন ভঙ্কর প্রাণীর আক্রমণের চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর হবে।
একটা মোটর-চালিত অ্যাটাক-বোর্ডের সাথে ঝুলে আছে সে। ওটার পাখাগুলো নিঃশব্দে ঘুরছে আর তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে জলাভূমির দূরের পাড়ের দিকে। তার শরীরে এমন একটি পোশাক যেগুলো ব্যবহৃত হয় অগভীর পানিতে চালানো নৌবাহিনীর গোপন অভিযানের সময় । সিলিন্ডারসহ সব রকমের যন্ত্রপাতি পিঠের পরিবর্তে বুকে আর পেটের সাথে লাগান। এতে করে পানির নিচ দিয়ে যাবার সময়ে কোন রকমের স্রোত বা বুদবুদ uর হয় না, ফলে তার উপস্থিতিটা নির্ণয় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস তার পোশাকের সাথে আছে, সেটা একটা নাইট-ভিশন গগলস। এটা তাকে অন্ধকার পানির ভেতরেও দেখতে সাহায্য করছে।
তারপরও এই অন্ধকারাচ্ছন্ন পানি জেঁকে ধরেছে তাকে। মাত্র ত্রিশ মিটারের মত তার দৃষ্টিসীমা । কিছু সময় পরপর আয়না বসানো ছোট্ট যন্ত্রটি দিয়ে দ্রুত পানির উপরটা দেখে নিচ্ছে আর নিজের গতিপথ ঠিক রাখছে । এই মিশনে অংশ নেয়া তার দলের বাকি দুই সদস্যও তার মত মটর লাগানো ছোট্ট স্লেডের উপর ভর করে তার পেছনে অগ্রসর হচ্ছে। জ্যাক শেষ বারের মত তার আয়না বসানো পেরিস্কোপটা ব্যবহার করল। জলাভূমি পার হওয়ার কাজে রেঞ্জারদের ব্যবহৃত বাঁশের ভেলা দুটো তার খুব কাছেই রয়েছে। আরও একটু সামনে, গাছের সারির মধ্যে ক্যাম্পের জ্বলন্ত আগুন দেখা গেল । এমন কি এত রাতেও জেগে পাহারা দিচ্ছে দু-জন। বেশ ভাল, ভাবল জ্যাক, সে তার সাথের দু-জনকে এগিয়ে যেতে দিল। একেকজন একেকটা ভেলার দিকে। জ্যাক ধীরগতিতে তাদের পেছনে অবস্থান নিল । সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে তার ছোট্ট পেরিস্কোপ দিয়ে। তিন জনের দলটি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সামনে। ভেলা দুটোকে বেঁধে রাখা দড়ি উঠে গেছে পাড়ে আর ভেলা দুটো ভাসছে পাড় থেকে প্রায় চার ফুট নিচের পানিতে।
এখান থেকে তাদেরকে আরও সতর্ক হয়ে এগোতে হবে। খুব সতর্কতার সাথে দলটি ভেলা দুটোর কাছে পৌছাল। জ্যাক লক্ষ্য রাখছে পাড়ের উচু আর নিচু দিকটা। তার লোকগুলো নিজ নিজ ভেলার আড়ালে অপেক্ষা করছে। দূরে গাছপালার দিকে খেয়াল করল সে। একটু ভালভাবে দেখতেই বুঝতে পারল জঙ্গলের অন্ধকারে হাটাহাটি করতে থাকা মানুষ দু-জন পাহারার কাজে নিয়োজিত। দু-জনেই রেঞ্জার । সে তাদেরকে পুরো পাঁচ মিনিট পর্যবেক্ষণ করল, তারপর সংকেত দিল তার লোকদেরকে।
ভেলার নিচ থেকে মানুষ দুটো ভেলায় রাখা কেরোসিনে ভরা বোতল থেকে কেরোসিন স্প্রে করে দিতে শুরু করল। বাঁশের সারিগুলো কিছুক্ষণের মাঝেই ভিজে গেল কেরোসিনে। বোতলগুলো খালি হতেই তারা জ্যাককে বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে সংকেত দিল। তাদের কাজের ফাকে জ্যাক আবারে উকি দিল ডাঙ্গার দিকে। এখন পর্যন্ত তাদের হাতের কারসাজি কারো চেখে পড়ার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। সে আরও এক মিনিট অপেক্ষা করে চূড়ান্ত সংকেত দিল। প্রত্যেকেই একটা হাত জাগিয়ে রেখেছে পানি থেকে, সংকেত পেতেই একটা বিউটেন লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে সেই আগুনের ফুলকি ছুড়ে দিল কেরোসিনে ভেঁজানো ভেলার দিকে । সাথে সাথে আগুন ছড়িয়ে পড়ল শ্রেয়।
কোন রকম অপেক্ষা না করে মানুষ দু-জন তাদের স্নেডগুলোয় চড়ে জ্যাকের দিকে এগিয়ে এল। সে-ও ঘুরে গিয়ে তার নিজর মোটরটাও চালু করে তার লোক দুটোকে জলাভূমির এক বাকের দিকে নিয়ে গেল পথ দেখিয়ে। কিছু দূর এগিয়ে চারপাশটা ভাল করে দেখতে লাগল সে।শত্রুদের ক্যাম্প থেকে কমপক্ষে আধ-কিলোমিটার দূরে জঙ্গলের ভেতরে অবস্থান নিতে হবে তাদের।
পেছনে তাকাল জ্যাক। জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে লোকগুলো। ভেলাগুলোর কাছাকাছি অবস্থান করছে তারা, অস্ত্রগুলো তাক করা। এমন কি পানির নিচ থেকেও তাদের কথাবার্তা এবং অ্যালার্মের শব্দ শোনা যাচ্ছে ভালই। সবকিছুই দারুণভাবে হল । ডা.ফেভ্রি জানত, শত্রুপক্ষ পঙ্গপালের অমন আক্রমণের পর নিশ্চিতভাবেই পরিচয়বিহীন
আগুনে ভয় পেয়ে যাবে। তারা কখনই এমন আগুনের কাছে থাকতে চাইবে না। তারপরও তাদেরকে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে, পরিকল্পনার বাইরে এক পা-ও আগানো যাবে না। জ্যাক তার সঙ্গের দু-জনকে আবারো অগভীর পানিতে নিয়ে গেল, আর কিছুটা দূরে গিয়ে খুব ধীরে পানি ছেড়ে ডাঙ্গায় উঠল তারা । মুখ থেকে রেগুলেটর মাউথপিসটা ফু দিয়ে সরিয়ে পায়ে লাগানো চওড়া পাখনাগুলো ছুড়ে দিল। এই মিশনের দ্বিতীয় অংশটি হল এটা নিশ্চিত হওয়া যে, তাদের শত্রুরা সব গুটিয়ে পালাচ্ছে।
পানি থেকে উঠে পরিত্রাণের নিঃশ্বাস ফেলল জ্যাক। খুব ভাল লাগছে তার অন্ধকার জলাভূমি পেছনে ফেলে আসতে পেরে। সে তার নাকের অবশিষ্ট ভাল অংশটুকুতে হাত রাধল, দেখল পিরানহার রেখে যাওয় অংশটুকু ঠিকঠাক আছে কিনা। দ্রুত এক জোড়া নাইট-ভিশন বায়নোকুলার চোখে পরে নিল জ্যাক। চোখের সাথে আটকে যেতেই পেছনে ফিরে ক্যাম্পের দিকে তাকাল সে। তার ঠিক পেছনেই তার সঙ্গী দু-জন মিশন সফল হয়েছে এই আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে শিষ বাজাচ্ছে। এসব কিছুই আমলে নিল না সে। চারপাশের সবকিছু ফিকে সবুজে রূপান্তর করা নাইট-ভিশন চশমায় সে দেখতে পেল দুজন মানুষ, ওদের অস্ত্র বহন করার ভঙ্গী দেখেই বোঝা যাচ্ছে ওরা রেঞ্জার। মানুষ দু-জন জ্বলন্ত ভেলাগুলো থেকে দূরে সরে দলের অন্যদের উদ্দেশ্যে চিৎকার দিচ্ছে। পেছনে সরে যাচ্ছে দলটি, আরও কিছু বাতি জ্বলে উঠল । বোঝা গেল সেগুলো ফ্লাশ-লাইট। ক্যাম্প ফায়ারের চারপাশটা সরগরম হয়ে উঠেছে। ধীরে ধীরে বাতিগুলো দূরে সরতে শুরু করল জোনাকি দলের মত । দলটি জঙ্গলে ঢাকা গিরিখাদের মত জায়গাটা দিয়ে আরো গভীরে ঢুকে যাচ্ছে। তাদের দু-পাশে দাঁড়িয়ে আছে শীর্ষ-সমতল দুটি পাহাড়।
হাসল জ্যাক ডক্টরের পরিকল্পনাটা কাজে দিয়েছে। যন্ত্রের ভেতর দিয়ে চোখ রেখেই সে তার রেডিওটা চালু করল । ট্রান্সমিটারটা অন করে মাইক্রোফোনটা ধরল ঠোটের সামনে। মিশন সফল । নির্বোধগুলো পালাচ্ছে।”
“রজার দ্যাট,” ডক্টর জবাবে বলল।
ডিঙ্গিগুলো এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। “যেমনটা কথা ছিল, ওদের ফেলে যাওয়া ক্যাম্পে দেখা হচ্ছে তাহলে,..ওভার অ্যান্ড আউট।”
রেডিওটি জায়গায় রাখল জ্যাক। আরও একবার শিকার শুরু হল। বাকি সদস্যদের দিকে সে ঘুরে দাঁড়াল এই সুখবরটা দেবার জন্য কিন্তু তার পেছনে কেউ নেই। সঙ্গে সঙ্গে হাটু ভেঙে বসে পড়ে চাপাস্বরে তাদের নাম ধরে ডাকল “মানুয়েল! রবার্তো!”
কোন সাড়া নেই।
চারপাশের সবকিছু কেমন অন্যরকম আঁধারময় ঠেকল তার কাছে। গাছগুলো আরও বেশি অন্ধকারে ঢাকা । সে দ্রুত নাইট-ভিশন মাস্কটা মুখে পরে নিল। গাছগুলো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে কিন্তু ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে খুব সামান্য দূরেই গেল তার দৃষ্টি । খানিকটা থেমে সরে গেল সে, তার খালি পা দুটো পানি স্পর্শ করল। থেমে গেল জ্যাক, পেছনের
পানি আর তার সামনে যে ভয় ওৎ পেতে আছে তা ভেবে জমে গেল সে। নাইট-ভিশন মাস্কের ভেতর দিয়ে কিছু একটার নড়াচড়া দেখতে পেল। হৃদস্পন্দনের মত একঝলক আশা জেগে উঠল তার, মনে হচ্ছে যেন একটা ছায়ামানব দাঁড়িয়ে আছে তার দিকে পেছন ফিরে। ত্রিশ ফিটের মত দূরে হবে। জ্যাক একবার পলক ফেলতেই উধাও হয়ে গেল ওটা। তবে এবার চারপাশের সব আঁধার, ছায়া সব যেন নড়তে শুরু করেছে এদিকওদিক, জীবন্ত প্রাণীর মত এগিয়ে আসছে তার দিকে। হোঁচট খেয়ে পেছনের পানিতে পড়ে গেল সে। এক হাত দিয়ে শ্বাস নেবার রেগুলেটরটা মুখে পুরে নিল দ্রুত। ছায়াগুলোর মাঝ থেকে একটা অবয়ব এগিয়ে এল গাছের আড়াল থেকে। পাড়ের কাদার উপর দিয়ে নিঃশব্দে আসছে ওটা। বিশাল কাঠামোটা যেন দৈত্য…
চিৎকার দিল জ্যাক কিন্তু মুখের রেগুলেটরটি আটকে দিল সেই শব্দ। একটা ভেঁজা গড়গড় শব্দ বের হল শুধু। আরও কয়েকটি ছায়াময় অবয়ব বেরিয়ে এল গাছের আড়াল থেকে। মাকন গোত্রের একটা প্রাচীন প্রার্থনা উঠে এল তার ঠোঁটে, আরও পেছনে সরে গেল সে। অন্ধকার পানি আর পিরানহার ভয় ছাপিয়ে জীবন্ত খাওয়ার ভয় আচ্ছন্ন করল তাকে। পেছন দিকে ঝাঁপ দিল সে, সজোরে হাত-পা চালাতে লাগল এখান থেকে দূরে সরে যেতে । কিন্তু ছায়াগুলোর গতি তার চেয়েও বেশি।
* * * *
দুপুর ১:৫১
আমাজন জঙ্গল
শটগানের সাথে ডাকটেপ দিয়ে একটা ফ্লাশ-লাইট জুড়ে সামনের দলটিকে অনুসরণ করছে নাখান । তার পেছনে প্রাইভেট ক্যারেরা এবং কর্পোরাল কসটস। প্রত্যেকের হাতেই লাইট, চারপাশের অন্ধকার দূরে সরিয়ে দিচ্ছে সেগুলো। এত রাত হওয়া সত্ত্বেও বেশ দ্রুতই এগুচ্ছে তারা। চেষ্টা করছে অজানা কারো জ্বালিয়ে দেয়া ভেলাগুলো থেকে যতটা সম্ভব দূরত্ব সৃষ্টি করতে। ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানের পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের এখন আরও বেশি নিরাপদ একটা জায়গা খুঁজতে হবে। একদিকে ঘন জঙ্গল আর অন্যদিকে পানি । জ্বলন্ত আগুন কোন বিপদ ডেকে আনে তা দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকার মত নিরাপদ জায়গা এটা নয়। আর দলের কেউই এমনটা ভাবছে না, নতুন কোন আক্রমণ আর হবে না । সবসময় একধাপ এগিয়ে আছে তাদের পরিকল্পনা। এরইমধ্যে রেঞ্জারদেরকে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে তুলনামূলক নিরাপদ কোন জায়গা খোঁজার জন্য । কর্পেয়াল রাকজ্যাক রিপোর্ট করেছে, সামনেই কিছুটা উপরে উপত্যাকার পাহাড়ের গুহা রয়েছে। ওটাই এখন তাদের লক্ষ্য। আশ্রয় এবং রক্ষণাত্মক অবস্থানের জন্য আদর্শ হলে এটা।
অন্যদের অনুসরণ করে এগুচ্ছে নাথান। তার একপাশে ক্যারেরা। হাতে তার ভোঁতা নলের এক অদ্ভুত অস্ত্র। দেখে মনে হচ্ছে যেন একটা ভাস্টবাস্টার ভ্যাকুয়াম ক্লিনার কোন রাইফেলের সামনেজুড়ে দেয়া হয়েছে। ঘন জঙ্গলের দিকে তাক্ করে হাটছে সে। “এটা কি?” জিজ্ঞেস করল নাথান।
মনোযোগ জঙ্গলের দিকেই রাখল রেঞ্জারটি। “জলাভূমিতে সব হারিয়ে এম-১৬-এর ঘাটতি পড়েছে আমাদের।” একটু উঁচু করে ধরল হাতের অটা। “এটাকে বলে বেইলে । বন-জঙ্গলের যুদ্ধের প্রথম যুগের অস্ত্র। সে একটা সুই টিপে ধরতেই তীক্ষ এক লেজারের আলো জঙ্গলের আঁধার ফুঁড়ে একটা জায়গায় গিয়ে পড়লে সে তার কাঁধের উপর দিয়ে পদস্থ রেঞ্জারের দিকে তাকাল। “একটা টেস্ট করি?”
স্টাফ সার্জেন্ট কস্টস হাতের এম-১৬ রাইফেলটা উঁচিয়ে চিৎকার দিল । “অস্ত্র পরীক্ষা হচ্ছে!” সামনের সবাইকে সতর্ক করে দিল সে।
অস্ত্রটা উঁচু করে ধরল ক্যারেরা, একটা টার্গেট ঠিক করল সে। লেজারের লাল আলোটা সরু ও লম্বা এক গাছের গুঁড়িতে ফেলল। ষাট ফুটের মত হবে ওটা। “এই সোজাসুজি ফ্লাশ-লাইটটা ধর।” নাথান মাথা নেড়ে সায় দিয়ে হাতের ফ্লাশ-লাইটটা তুলে ধরল। বাকি সবাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। শক্ত করে অস্ত্রটা ধরে ট্রিগার চাপল ক্যারেরা। কোন বিস্ফোরণ হল না। পরিবর্তে উচ্চ কম্পনের একটা হুইশেলের শব্দ হল । নাথান দেখতে পেল রুপোর মত চকচকে কিছু একটা ঝট করে ছুটে গেল সামনে। সাথে সাথে গাছটি হেলে পড়ে গেল পেছনে। গুড়িটা একেবারে নিখুঁতভাবে কেটে গেছে। ওটার পেছনে একটা মোটা সিঙ্ককটন গাছ কেঁপে উঠল ওটার গুঁড়ির উপর গাছটা ভেঙে পড়ায়। নাথান ফ্লাশ-লাইটটা দূরের গাছে ফেলল । রুপালী কিছু একটা গেঁথে আছে ওটার গুড়িতে ।
লক্ষ্যের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল ক্যারেরা। “তিন ইঞ্চি রেজর ডিস্ক, অনেকটা জাপানিদের ছুড়ে দেওয়া ধাতব তারকার মত। জঙ্গলে যুদ্ধ করার পক্ষে আদর্শ। স্বংয়ত্রিয় মোড়ে ফায়ার করলে চারপাশের কম দৃঢ় গাছপালাগুলো গুড়িয়ে দিতে পারে নিমিষেই।”
“আর পথে যা-ই বাধুক না কেন সেগুলোও,” দলকে সামনে এগিয়ে যেতে ইশারা করে যোগ করল কসটস।
নাথান সম্ভ্রমের সাথে অস্ত্রটি আরেকবার দেখে নিল। তাদের দলটি আবারো জঙ্গলে ঢাকা সরু গিরিখাদের মাঝ দিয়ে এগিয়ে গেল কর্পোরাল র্যাকজ্যাক ও ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানের নেতৃত্বে। ছোট জলাধারের সাথে একটু এলোমেলোভাবে সমান্তরাল হয়ে এগুচ্ছে তারা, তবে পানি থেকে অবশ্যই একটা নিরাপদ দূরত্বে থাকছে, সাবধানের মার নেই । আধঘণ্টা হাটার পর রাকজ্যাক তাদেরকে দক্ষিণ দিকে লালচে পাহাড়গুলোর কাছে নিয়ে যেত থাকল।
এখন পর্যন্ত পেছনে ধাওয়া করছে এমন কিছুর প্রমাণ মেলে নি তারপরও নাথানের কান দুটো খাড়া হয়ে আছে যেকোন রকম শব্দ শোনার জন্য চোখ দুটো খুঁজে বেড়াচ্ছে চারপাশের ছায়াময় জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা কোন বিপদকে। অবশেষে মাথার উপরে আচ্ছাদন পাতলা হতে শুরু করল । চাঁদের আলোয় বিধৌত হল সবাই । সামনের জায়গাটা হঠাৎই শেষ হয়ে গেল লাল-পাহাড়ের দেয়ালের কাছে এসে। আলগা চুনাপাথর আর কাদার মিশ্রনে সৃষ্টি ওটা। ছোট-বড় বেশ কিছু পাথর পড়ে রয়েছে এখানে-সেখানে। ঢালু পাহাড়টার একেবারে চূড়ায় বেশ কিছু গুহামুখ আর বড় বড় ফাটল দেখা গেল । চাঁদের আলো উল্টো দিকে থাকায় অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে গুহা এবং ফাটলগুলো।
“এখানেই থাম সবাই,” ফিসফিস করে বলল ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান। পাহাড়ের পাদদেশে ঘন ঝোপঝাড়ে সবাইকে একরকম লুকিয়ে থাকতে বলল সে। তারপর রাকজ্যাককে আদেশ দিল সামনে এগিয়ে যেতে।
কর্পোরালটি ফ্লাশ-লাইট জ্বালিয়ে একজোড়া নাইট-ভিশন গগলস পরে অস্ত্র নিয়ে পা বাড়াল অন্ধকারে । মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে গেল সে ।।
হামাগুড়ি দিয়ে আছে নাথান। তার সামনে ও পেছনে রেঞ্জার দু-জন দাড়িয়ে আছে । খুব সতর্ক দৃষ্টি রাখছে পেছন দিকটায়। নিজের শটগানটা একেবারে রেডি করে রেখেছে নাথান। বেশির ভাগের হাতেই অস্ত্র। অলিন, জেন, ফ্রাঙ্ক এমনকি কেলির হাতেও পিস্তল । অন্যদিকে ম্যানুয়েলের এক হাতে একটা বেরেটা আর অন্য হাতে একটা চাবুক। টর-টর জন্মসূত্রে পাওয়া নিজস্ব অস্ত্র বহন করছে-থাবা এবং ধারালো দাঁত । ওর জন্যে এটাই যথেষ্ট। শুধুমাত্র প্রফেসর কাউয়ি আর আনা ফঙ নিরস্ত্র রয়েছে । প্রফেসর হামাগুড়ি দিয়ে পেছনে সরে নাথানের কাছে গেল।
ব্যাপারটা ভাল ঠেকছে না আমার কাছে,” বলল কাউয়ি।
“ঐ গুহাগুলো?”
“না…এই পরিস্থিতিটা।”
“কি বলতে চাইছ?”
কাউয়ি পেছনে ফেলে আসা নিচু জঙ্গলের দিকে তাকাল। জলাভূমিতে ভেলা দুটো এখনো পুড়ছে।“ঐ আগুনের শিখাগুলো থেকে আমি কেরোসিনের গন্ধ পেয়েছি।”
“তো কি হয়েছে? ওটা কোপাল তেলও হতে পারে। পোড়ালে ওগুলো কেরোসিনের মতই গন্ধ ছড়ায় আর এখানে প্রচুর পরিমাণে এগুলো পাওয়া যায়।” গাল চুলকাল কাউয়ি। “ঠিক জানি না। পঙ্গপালের ঝাঁকটা যে আগুনের কারণে এসেছিল সেটা কিন্তু একটা শৈল্পিক কাজ ছিল। ব্যান-আলি সিম্বল খোদাই করে তার মাঝে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া । তোমার মনে আছে নিশ্চয়, কিন্তু এটাকে ওরকম সুশৃংখল মনে হচ্ছে না।”
“আমরা কিন্তু পাহারার ভেতর ছিলাম। যা করার খুব দ্রুতই করে সরে পড়তে হয়েছিল ইন্ডিয়ানদের। হয়তো ঐ মুহূর্তে এতটুকুই করতে পেরেছে ওরা।”
কাউয়ি তাকাল নাথানের দিকে । “ওরা ইন্ডিয়ান ছিল না।”
“তাহলে কারা?”
“যারা আমাদের উপর নজর রেখে আসছে।” খুব সতর্ক কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল কাউয়ি। যারাই সেই বিশেষ প্রতীকটা জ্বালিয়ে দিনে-দুপুরে আমাদের ক্যাম্পের উপর পঙ্গপালের ঝাঁক আনুক না কেন, তারা কিন্তু কোন রকম কোন চিহ্ন রেখে যায় নি। না ঐ জায়গায়, না আশেপাশে কোথাও। এমনকি একটা ডাল ভাঙে নি । অসম্ভব রকমের দক্ষ ওরা । আমার নিজেরও সন্দেহ হয় অমনটা করতে পারব কিনা।”
নাথান এবার কাউয়ির চিন্তার মূল বিষয়টা ধরতে পারল । “যারা আমাদেরকে নাছোড়বান্দার মত অনুসরণ করে আসছে তাদের কাজগুলো দেখে আনাড়ি বলেই মনে হয়, তাই তো?”।
জলাভূমির দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সায় দিল কাউয়ি। “ঠিক ঐ আগুনের মত।”
নাথানের মনে পড়ল গতকাল দুপুরে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাবার সময় কোন এক গাছের উপর থেকে আসা প্রতিফলিত আলোর কথা। “তাহলে তুমি কি বলতে চাচ্ছ?”
দাঁতে দাঁতে চেপে উত্তর দিল কাউয়ি,” এখানে যে ভয়ের ব্যাপার একটাই আছে তা নয়। সামনে যা-ই থাকুক না কেন, হোক সেটা হাত-পা গজিয়ে দিতে পারে এমন কিছু, অথবা ছড়িয়ে পড়া মহামারির কোন ওষুধ, সবই কিন্তু বিলিয়ন ডলার মূল্যের হবে। যে কেউ এখানে ছড়িয়ে থাকা জ্ঞান-ভাণ্ডার হাতিয়ে নেবার জন্য কাড়ি কাড়ি টাকা ঢালতে প্রস্তুত।
ভ্রু কুঁচকালো নাথান । “তাহলে তুমি মনে করছ ওই অন্য দলটিই ভেলায় আগুন লাগিয়েছে? কিন্তু কেন?”
“আতঙ্কিত করে আমাদেরকে সামনে এগিয়ে নিতে, যেমনটা আরও একবার হয়েছিল। তারা চায় নি আমাদের সাথে আরও কিছু সৈন্য বা রসদ যুক্ত হোক, ওতে ওদের ঝুঁকি বাড়ত। আর সম্ভবত তারা আমাদেরকে একটা মানব-বর্ম হিসেবেই ব্যবহার করছে ব্যান-আলিদের করা প্রাকৃতিক সব ফাঁদ ও বিপদের বিরুদ্ধে। আমরা এখন ওদের বলির পাঠা হয়ে গেছি। ওরা আমাদের দলের লোকজনদের জীবন ব্যবহার করতে থাকবে ব্যানআলির কাছে পৌছানোর আগ পর্যন্ত। তারপর হঠাৎ আক্রমণ করে সব আবিষ্কার হাতিয়ে নেবে।”
প্রফেসরের দিকে তাকাল নাথান । “রওনা হবার আগে এগুলো বল নি কেন?”
কঠিন দৃষ্টিতে নাথানের দিকে তাকাল প্রফেসর। প্রশ্নের জবাবটিও তার মনে উঁকি দিল। “কোন বিশ্বাসঘাতক!”
ফিসফিস করে বলল নাথান, “কেউ একজন আমাদের শত্রুপক্ষের হয়ে কাজ করছে।”
“ব্যাপারটা এমন করে দেখানোটা খুবই সহজ-আমরা যে-ই না ব্যান-আলির কাছাকাছি চলে এসেছি অমনি হয়তো অন্য কোন শক্তির প্রভাবে আমাদের স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন সিস্টেমটা বিগড়ে গেল। সাথে যোগ হল যন্ত্রটা ভুল জিপিএস সিগন্যাল পাঠিয়েছে।”
মাথা নেড়ে সায় দিল নাথান। যাতে করে আমাদের প্রয়োজনীয় রসদগুলো বয়ে নিয়ে আসা প্লেন আমাদেরকে খুঁজে না পেয়ে ফিরে যায়।”
“ঠিক তাই।”
“এই বিশ্বাসঘাতক লোকটা কে হতে পারে?” ঝোপের ভেতর মাথা গুঁজে বসে থাকা সবার দিকে একবার তাকাল নাথান। কাঁধ ঝাকাল কাউয়ি। “যে কেউ। তবে তালিকার প্রথমে থাকতে পারে ঐ রাশিয়ান । এসব যন্ত্রপাতি সে-ই চালায়। তার পক্ষে এমন ক্ষতি হবার ভান করাটা খুবই সহজ ব্যাপার। তবে তারপরই জেন এবং মিস ফঙ। অলিন যখনই একটু দূরে কোথাও গেছে তখনই এই দু-জনকে ঐ কমিউনিকেশন সিস্টেমের আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখেছি আমি। তারপর আসবে দুই ওব্রেইনের নাম। দু-জনেই সিআইএ’র ছত্রছায়ায় মানুষ হয়েছে, ওদের ভেতরে খুব নীরব কিন্তু শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে যার যার মত সুযোেগ সুবিধা অর্জনের জন্য। এগুলো বেশ জানা কথাই। আসলে, শেষ কথা হল আমরা কোনো রেঞ্জারকেই এই তালিকা থেকে বাদ দিতে পারছি না।”
“বিশ্বাস হয় না।”
“টাকা প্রায় সবাইকেই বদলে দিতে পারে, নাথান। আর আর্মি রেঞ্জারদেরকে যোগাযোগ রক্ষার উপরেই বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।”
কিছুটা পেছনে হেলে গেল নাথান। “তাহলে তো বিশ্বাস করার মত একমাত্র ম্যানুয়েলই থাকে।”
“তাই কি?” কাউয়ির অভিব্যক্তি আরও তিক্ত হয়ে উঠল।
“তুমি কি জান তুমি কি বলছ? ম্যানুয়েল? আমাদের দুজনের বন্ধু সে।”
“সে-ও কিন্তু ব্রাজিলিয়ান সরকারের হয়েই কাজ করে। আর এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, এই অভিযান থেকে যা-ই আবিষ্কার হোক না কেন তা এ-দেশের সরকার নিজের করেই নিতে চাইবে। সে-রকম কোন ওষুধ আবিষ্কার হলে টাকার বন্যা বয়ে যাবে এদেশের অর্থনীতিতে।” ভয়ের একটা স্রোত নাথানকে দূর্বল করে দিচ্ছে। এই প্রফেসর নিজেই কি ঠিক আছে? বিশ্বাস করার মত কেউই কি নেই তাদের? কাউয়ির এই মূল্যায়ন সম্পর্কে পরবর্তী প্রশ্ন করার আগেই একটা চিৎকার রাতের নিরবতাকে ভেঙে দিল । বিশাল বড় কিছু একটা উড়ে এল যেন বাতাস ফুড়ে। মানুষগুলো যে যার মত সরে গেল এদিক-ওদিক। নাথানও দ্রুত কাউয়ির সাথে পেছন দিকে সরে গেল । বিশাল জিনিসটা হামাগুড়ি দিয়ে থাকা দলটির মাঝখানে এসে পড়ল এবার । মুহূর্তেই ফ্লাশ-লাইটগুলোর আলো ফেলা হল ওখানে।
চিৎকার দিয়ে উঠল আনা। তীব্র আলোর ঝলকানির মধ্যে কর্পোরাল রাকজ্যাককে দেখল সবাই। মাটিতে চিৎ হয়ে পড়ে আছে। রক্তে ডুবে আছে তার শরীর । একটা হাত দিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে হাতড়াতে লাগল যেন নিজের শরীরের রক্তের সাগরে ডুবে যেতে চাইছে না সে।
খুব জোরে একটা চিৎকার দিতে চাইল কিন্তু চাপা আর্তনাদ ছাড়া কিছুই বের হল না।
তাকিয়ে আছে নাথান, বরফের মতই জমে গেছে সে। বিধ্বস্ত কর্পোরাল এর উপর থেকে চোখ সরাতে পারছে না। কোমর থেকে শরীরের নিচের অংশটা নেই। অর্ধেকটা কামড়ে কেটে নেয়া হয়েছে। “অস্ত্র রেডি!” চিৎকার দিয়ে আতঙ্কের কারণে সৃষ্ট স্থবিরতাকে ভেঙে দিল ওয়াক্সম্যান। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল নাথান, শটগানটা অন্ধকারের দিকে তাক করল সে। কেলি এবং কাউয়ি ছুটে গেল মৃতপ্রায় কর্পোরালের দিকে। কিন্তু নাথান জানে, এর কোন দরকারই নেই। লোকটা এরইমধ্যে ঢলে পড়েছে মৃত্যুর কোলে ।
অস্ত্রটা তাক করল সে। পুরো জঙ্গলজুড়ে অসংখ্য ছায়ার আনাগোনা লক্ষ্য করল সবাই। ফ্লাশ-লাইটের আলো থেকে নিজেদেরকে বাঁচাতে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করছে দ্রুত গতিতে। তবে নাথান বেশ বুঝতে পারছে, ওগুলো নিছক ছায়া নয়। ফাঁদে পড়া মানুষের এই দলটিকে একরকম ঘিরেই ফেলছে ওরা।
একজন রেঞ্জার একটা ফ্লেয়ার ছুড়ে দিল উপরে। বাতাসে শিষ দেবার মত শব্দ করে আগুনের শিখাটা বাঁকাপথে বেশ উপরে উঠে বিস্ফোরিত হয়ে ম্যাগনেসিয়াম পোড়ার আলোয় চারপাশের জঙ্গলকে আলোকিত করল । রুপালি আলোর এক ঝলকানিতে ঘাপটি মেরে থাকা সেই অশরীরিগুলোকে দেখতে পেল সবাই।
হঠাৎ নাথান সেই ক্ষনজন্ম আলোতে দেখতে পেল দৈত্যসদৃশ একটা প্রাণী তার থেকে কিছু দূরে বসে আছে একেবারে তার চোখে চোখ রেখে । ওটা বসে আছে পাহাড়ের ঢালে একটা পাথরের আড়ালে। আকারে বিশাল, ঠিক একটা মহিষের মত কিন্তু শরীরটা চকচকে আর মসৃণ। ওটা একটা জাগুয়ার। নাথানকে ভাল করে দেখছে। শীতল আর কৃষ্ণকায় চোখ দুটো যেন জমাট বাধা লাভা। অন্যগুলো জঙ্গল আর পাথরের আড়ালে ঘাপটি মেরে আছে। তার মানে ওদের একটি ঝাঁক এখানে চলে এসেছে। কমপক্ষে বিশটা!
“জাগুয়ার!” ভয়ার্ত কঠে ফিসফিসিয়ে বলল কাউয়ি। “ব্ল্যাক-জাগুয়ার!”
নাথান ওগুলোর সাথে টর-টরের কাঠামোগত সাদৃশ্যটা ধরতে পারল কিন্তু টর-টরের চেয়ে এরা তিনগুন বড় হবে। ওজন হবে আট টনের মত। যেন আদিম যুগের কোন প্রাণী ।
“ওরা আমাদের চারপাশে ঘিরে আছে!” ফিসফিস করে বলল ক্যারেরা ।
আর এ-কথায় নাথান তার বাবার পাঠানো শেষ কথাটার প্রতিধ্বনি শুনতে পেল যেন : বেশিক্ষণ থাকতে পারছি না… হায় ঈশ্বর! ওরা আমাদের চারপাশে ঘিরে আছে! তাহলে এটাই তার বাবার ভাগ্যেও ঘটেছিল?
আরও কয়েকমুহুর্ত কেউ নড়ল না। দম ছাড়তে পারছেনা নাথান । মনে মনে প্রার্থনা করছে যেন এই নিশাচরের দলটি ফ্লেয়ারের আগুনে ভয় পেয়ে পিছু হটে যায়। এই প্রার্থনাটা যেন এক রেঞ্জারকেও ছুঁয়ে গেল। দ্বিতীয় একটা ফ্লেয়ার ছোঁড়া হলো উপরে। মুহূর্তেই জঙ্গল আলোকিত করে বিস্ফোরিত হল ওটা। আগুনের ছোটছোট ফুলকিগুলো। প্যারাসুটের মত ভাসতে ভাসতে নেমে এল নিচে।
“স্থির থাক সবাই!” ফিসফিসিয়ে বলল ওয়াক্সম্যান। নিরবতাটি দীর্ঘায়িত হল, কিন্তু জাগুয়ারগুলো নড়ল না।
“সার্জেন্ট?” বলল ওয়াক্সম্যান। “আমি যে-দিকে দেখাবো সে-দিকে গ্রেনেডগুলো ফেলবে, একেবারে পাহাড়ের উঁচু ঢাল পর্যন্ত । সবাই অস্ত্র প্রস্তুত রাখ । সংকেত দিলেই ছুটে যাবে একেবারে ওপরে গুহার দিকে।” পাহাড়ে উপরে হাঁ করে থাকা গুহাটাকে এক ঝলক দেখে নিল নাথান। যদি কোনভাবে দলটি এখানে পৌছাতে পারে তবে যেকোন একটা দিক থেকেই আক্রমণ আসবে শুধু। জায়গাটা বেশ সুরক্ষা দেবে ওদের। আর এটাই একমাত্র ভরসা এখন।
“ক্যারেরা বেইলেটা ব্যবহার করে আমাদের…”
বন্দুকের তীক্ষ্ণ এক শব্দ ক্যাপ্টেনের আদেশে ছেদ ঘটাল। শব্দের উৎস অপর পাশে থাকা রিচার্ড জেন। গুলি ছোড়ার সময় বন্দুকের বিপরীতমুখী ধাক্কায় চিৎ হয়ে পড়ে গেছে সে। একটা জাগুয়ার গর্জন করে এগিয়ে আসতে শুরু করল দ্রুত। অন্যগুলো এটাকে অনুসরণ করে চাপাস্বরে গরগর করতে করতে এগোতে লাগল তাদের দিকে।
“এক্ষুণি!” চিৎকার দিল ওয়াক্সম্যান।
কসটস এক হাটু ভাজ করে বসে হাতের এম-১৬ টা তাক করে গুলি করতে শুরু কল পাহাড়ের দিকে। ক্যারেরা ঘুরে গেল , তার নতুন অস্ত্রটা কোমর বরাবর উঁচিয়ে ট্রিগারে চাপ দিল সে। সারি সারি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বেরুতে লাগল অস্ত্রের নল থেকে। রুপালী চাকতিগুলো ঝলকানি দিয়ে তীব্র বেগে ছুটে যাচ্ছে, কেঁপে উঠছে পুরো জঙ্গল। একটা চাকতির একেবারে সামনে লাফিলে উঠল এক জাগুয়ার, আর মুহূর্তেই নরম মাখনের মত মসৃণভাবে দু-ভাগ হয়ে গেল ওটা। তীব্র আর্তনাদ করে জঙ্গলে লুটিয়ে পড়ল প্রাণীটা । মৃত্যুর আগে ওটার চিৎকার ঢাকা পড়ল কসটসের গ্রেনেডগুলোর কানফাটা শব্দে। একে একে ফাটতে শুরু করছে তার গ্রেনেড। পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে পুরো জঙ্গল কাঁপিয়ে দিচ্ছে যেন। মাটি আর পাথর চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে বৃষ্টির মত ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। চারদিক থেকেই গোলাগুলি চলছে এখন। ফ্রাঙ্ক আগলে রেখেছে তার বোন এবং প্রফেসরকে। তারা হাটুতে ভর দিয়ে বসে আছে কর্পোরাল রাকজ্যাকের নিথর দেহটার ঠিক পেছনেই। ম্যানুয়েল এক পা ভাঁজ করে বসে আছে টর-টরের পাশে। ঘাড়ের লোমগুলো খাড়া আর চোখ দুটো প্রশস্ত হয়ে আছে প্রাণীটার । জেন এবং অলিন দাড়িয়ে আছে ফঙের পাশে, তারা সবাই গুলি ছুঁড়ছে সামনের অন্ধকার জঙ্গল লক্ষ্য করে। হাতের শটগানটা একটু উঁচু করে একটা জায়গায় তাক করুল নাথান । একটা জাগুয়ারকে দেখেছে সে। পাথরের আড়ালে ঠিক তার সোজাসুজি ঘাপটি মেরে আছে ওটা। চারপাশে এত ধ্বংসযজ্ঞ, গোলাগুলি চলা সত্ত্বেও একেবারে পাথরের মত স্থির হয়ে বসে আছে। কিছু জাগুয়ার পাহাড়ের ঢালে বিস্ফোরণের জায়গাগুলো থেকে পালাল। বাকিগুলোর কয়েকটি আধমরা আর কিছু ছিন্নভিন্ন দেহ নিয়ে পড়ে আছে এখানে-সেখানে।
“দৌড়াও!” তীক্ষ গলায় চিৎকার দিল ওয়াক্সম্যান। বিস্ফোরণের শব্দের তোড়ে তার কথাগুলো উড়ে যাচ্ছে। “গুহার দিকে যাও সবাই।”
দলটি হঠাৎ ছুটতে শুরু করল ঝোপ-ঝাড় ভেঙে খোলা পাথুরে জমির দিকে। পাহাড়টার উপরে উঠতে হবে তাদের পায়ে ভর করে। জাগুয়াটার দিকে এখনও সটগানটা তাক করে রেখেছে নাথান। যদি ওটার লেজও একবার নড়ে…….
ওয়াক্সম্যান আবারো এগোতে বলল সবাইকে ধাবমান দলটির নেতৃত্বে আছে কসটস।
“ওগুলো আবার দলবদ্ধ হবার আগেই ওখানে পৌছাতে হবে। ক্যাপ্টেন থেকে গেল ক্যারের সাথে, তাদের পেছনে। বিচ্ছিন্ন দলটি আবারো একস্থানে জড়ো হতে শুরু করেছে। কয়েকটা খোঁড়াচ্ছে, কেউ কেউ আবার তাদের মৃত-সঙ্গীকে খুঁকে দেখছে, তবে একটা নিরাপদ দূরত্বে থাকছে ওরা। নাথান খুব সাবধানে এবং নিরবে জাগুয়ারটার বাম
দিক থেকে অতিক্রম করল। শুধুমাত্র ওটার চোখগুলোই তার পথের উপর নিবদ্ধ হয়ে আছে। নাথান অনুমান করল এটা এই দলের নেতা হবে। শীতল দৃষ্টির পেছনে কিছু একটা রয়েছে যেটা দিয়ে নাথান বুঝতে পারছে, এই আগন্তুকগুলোকে বিচার-বিশ্লেষন করছে প্রাণীটা।
ক্যারেরা তার অস্ত্রের স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিটা বন্ধ করে দিল। যথেষ্ট হয়েছে, কিছু সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। তবে হঠাৎ একটা জাগুয়ার খুব কাছে চলে আসায় আবার একটা চাকতি ছুড়তে হল তাকে। নিখুঁত লক্ষ্যভেদ। রুপালী চাকতিটা জাগুয়ারের কাঁধটা প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। আহত প্রাণীটা উপুড় হয়ে পড়ে গেল। যন্ত্রণায় চিষ্কার করছে। সে।
“এগিয়ে যাও! থেম না।” ওয়াক্সম্যান তাড়া দিল ।
এরইমধ্যে গুহাটা পরিস্কার দৃষ্টিসীমার মধ্যে চলে এসেছে। তাদের আতঙ্কে রুদ্ধশ্বাসে ছুটে চলাটা হঠাৎ থেমে গেল। আরও সামনে এগিয়ে গেল কসটস। গুহাটার মুখে একটা ফ্রেয়ার ছুড়ল সে। এটা বিস্ফোরিত হয়ে আলোকিত করে ফেলল ভেতরটা। গভীর গুহাটার শুরু থেকে একেবারে পাথুরে শেষপ্রান্ত পর্যন্ত আলোকিত হয়ে উঠল ক্ষণিকের জন্য।
“অল ক্লিয়ার,” বলল কসটস। “চলে আসো সবাই।”
প্রথমে অলিন, জেন এবং আনা দৌড়ে ভেতরে ঢুকল। সার্জেন্ট দাঁড়িয়ে রইল প্রবেশমুখে, হাতে তার এম-১৬। “জোরে দৌড়াও!”
ফ্রাঙ্ক কেলিকে ঠেলে দিল সামনে। তার পেছনে প্রফেসর কাউয়ি । ফ্লেয়ারটা জ্বলা শেষ হলে নাথান গুহামুখে অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে রইল কসটসের মত, তার শটগানটা রেডি। ম্যানুয়েল এবং টর-টর পাহাড়ে উঠে গেল ওয়াক্সম্যান আর ক্যারেরার পিছু পিছু।
ঠিক এমন সময় একটা জাগুয়ার অন্ধকার ফুঁড়ে লাফিয়ে এসে একটা পাথরের উপর বসল, ঠিক শেষ দু-জন রেঞ্জারের পাশে। ক্যারেরা তার অস্ত্র তাক করলেও ট্রিগার চাপার আগেই ওটা লাফিয়ে ক্যাপ্টেনের বুকের উপর গিয়ে পড়ল। ওয়াক্সম্যান ছিটকে পড়ল মাটিতে । জাগুয়ারটার তীক্ষ্ণ নখযুক্ত থাবা ক্যাপ্টেনের পোশাক ভেদ করে বসে গেল বুকে। ক্যাপ্টেন এক ঝটকায় অস্ত্র বের করে কয়েকটা ফায়ার করল দ্রুত, তবে বুলেটগুলো প্রাণীটার মাথার উপর দিয়ে চলে গেল । জাগুয়ারটি তার ঘাড়ের উপর জেকে বসছে এখন । দৈত্যটা টানা-হিচড়ে করে পাথরটার উপরে ওঠাল ক্যাপ্টেনকে হাড় ভাঙার শব্দ শোনা গেল । ক্যারেরা নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত পাথরটার উপর প্রান্তে গেল ক্যাপ্টেনকে সাহায্য করতে। এদিকে নাথান কিছুই দেখতে পাচ্ছে না কিছুটা দূরে থাকায়, তবে ক্যারেরার বিশেষ অস্ত্রটা চালানোর শব্দ শুনতে পেল সে। তারপর হঠাই তাকে পিছু হটতে দেখা গেল। তার পেছনে একজোড়া জাগুয়ার। রক্ত ঝরছে ওগুলো থেকে, রুপালী চাকতির টুকরোগুলো বিধে আছে শরীরে। এটা নিশ্চিত, ক্যারেরার ভাণ্ডারে আর কোন চাকতি নেই।
এক লাফে গুহার মুখ থেকে ছুটে গেল নাথান তাকে সাহায্য করতে। তার কাছে পৌছাতেই হাতের শটগানটা তুলে ধরল, বন্দুকের নলটা মাত্র ফুটখানেক দূরে দাঁত বের
করে গর্জন করতে থাকা জাগুয়ারের থেকে। ট্রিগারে চাপ দিল সে, ধাক্কা খেয়ে পেছনে সরে গেল ওটা, তীব্র আর্তনাদে গর্জে উঠল ।
সুযোগ পেয়ে ক্যারেরাও তার নাইন-এমএম পিস্তলটা হাতে নিয়ে নিল । এক মুহূর্ত দেরি না করে গুলি চালাল অপর জাগুয়ারটাকে লক্ষ্য করে। পড়ে গেল জাগুয়ারটা, নিমেষেই নিথর হয়ে গেল ওটা। ঢালে হোচট খেল তারা। পাথরের অপর প্রান্তে ক্যাপ্টেনকে পড়ে থাকতে দেখা গেল। হামাগুড়ি দেবার চেষ্টা করছে। বেচারার একটা হাত নেই। সারা মুখমণ্ডলে রক্ত।
“আমি.. আমি তো ভাবলাম উনি মারা গেছেন,” কেঁপে উঠে বলল ক্যারেরা । ক্যাপ্টেনের দিকে পা বাড়ল সে।
ক্যাপ্টেন সামান্য একটু এগোতেই একটা থাবা এসে শপাং করে গেঁথে গেল তার উরুতে। তারপর ঝটকা মেরে তাকে টেনে নেয়া হল পেছনের অন্ধকার ঝোপে। চিৎকার দিয়ে উঠল সে, তার আঙুলগুলো আঁকড়ে ধরতে চাইছে আলগা মাটি কি ধরার মত কিছুই নেই সেখানে । একটা গুলির শব্দ হল। ক্যাপ্টেনের মাথাটা একবার পেছনে তারপর আবার সামনে এসে পড়ল শক্ত মাটির উপর। মারা গেল মুহূর্তেই । নাথান পেছনে তাকাতেই দেখল কসটস হামাগুড়ি দিয়ে তার এম-১৬ রাইফেলের ট্রিগারে আঙুলটা স্পর্শ করল । কিন্তু আস্তে করে অস্ত্রটা নামিয়ে আনল সার্জেন্ট, তার চোখে-মুখে সুতীব্ৰদুঃখ।
“ভেতরে যাও, সবাই,”কাঁপা কণ্ঠে চিৎকার দিয়ে বলল সে।
ছোট দলটির সবাই অনেকটা গায়ে গায়ে লেগে থেকে গুহার কাছে পৌছাল । নাথান এবং ক্যারেরা দ্রুত ছুট গেল একেবারে প্রবেশমুখে। ফ্রাঙ্ক আর কসটস পাহারা দিচ্ছে অস্ত্র তাক করে। গুহার ভেতর ক্রমে নিভে আসা ফ্লেয়ারের আলো এসে পড়ছে তাদের পেছনে। হাত নাড়ল ফ্রাঙ্ক তাদের দিকে।
“জলদি!” নাথান দেখল কয়েক ফিট নিচে একটা ছায়া দ্রুত বেগে ছুটে যাচ্ছে গুহামুখের দিকে। “সাবধান!” একটু আগে নাথান যেটাকে দেখেছিল সেই বড় জাগুয়ারটি এক লাফে গুহার মুখের সামনে এসে দাঁড়াল । ছিটকে অনেকখানি পেছনে গিয়ে চিৎ হয়ে পড়ল ফ্রাঙ্ক, কসটস আছড়ে পড়ল গুহার দেয়ালে। তারপরই জাগুয়ারটা দ্রুত জঙ্গলের ভেতর চলে গেল।
চিৎকার দিল কেলি । “ফ্রাঙ্ক!”
নাথান দৌড়ে গেল ক্যারেরার সাথে । কসটস উঠে দাড়িয়েছে মাটি থেকে, বুক চেপে ধরে দম নিচ্ছে সে, রেঞ্জারটা একেবারে স্তম্ভিত। একে
“একটু সাহায্য কর!” চিৎকার দিল কেলি ।
পাথুরে মাটিতে পড়ে আছে ফ্রাঙ্ক ! কেলির ভাই যে শুধুমাত্র ছিটকে পড়ে গেছে তা নয়, হাঁটুর নিচ থেকে দুটি পা-ই হারিয়েছে । রক্ত ছুটছে ফিনকি দিয়ে । এত অল্প সময়ের মধ্যেই জাগুয়ারটা ফ্রাঙ্কের পা দুটো খাবলে নিয়ে গেছে নিখুঁতভাবে, একেবারে গিলোটিনের মত।
কাউয়ি বসে পড়ল ফ্রাঙ্কের একপাশে। অলিন গুহার ভেতরে টেনে নিয়ে গেল তাকে। পেছনে ছুটল কেলি, তার প্যাক থেকে এক ঝটকায় টর্নিকেই বের করে এনেছে রক্ত বন্ধ করার জন্য। তাড়াহুড়োর জন্য মরফিনের বোতলগুলো প্যাক থেকে মেঝেতে পড়ল । নাথান জড়ো করল সেগুলো।
গুহার মুখে একটা গুলির শব্দ হতেই সাথে সাথে আলোও জ্বলতে দেখা গেল । আরো একটা ফ্লেয়ার জ্বালানো হয়েছে। মরফিনের প্যাকেটগুলো ধরে আছে নাথান, ঠিক কি করবে, কোন দিকে যাবে বুঝে উঠতে পারছে না।
তার হাত থেকে ওগুলো নিয়ে নিল কাউয়ি। “ওদিকে যাও, দেখ কি হল।” মাথা নেড়ে গুহামুখের দিকে ইঙ্গিত করল সে।
অলিন এবং কেলি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে আহত ফ্রাঙ্ককে নিয়ে। চোখের জলে গাল ভিজে গেলেও চোখে-মুখে কাঠিন্যতা ধরে রেখেছে মেয়েটি। সংকল্প ও মনোযোগ দুটোই আছে তার । ভাইকে হারাতে চায় না সে কোনভাবেই। শটগানটা নিয়ে ঘুরে গেল নাথান, যোগ দিল গুহামুখে অবস্থান করা কসটস আর ক্যারেরার সাথে । নতুন ফ্রেয়ারে দেখা যাচ্ছে জঙ্গলটা এখনও চলমান ছায়ায় ঢেকে আছে। মানুষগুলো গুহায় আসার কারণে চারপাশে ছড়িয়ে থাকা পাথরগুলোকে একটা অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে পাচ্ছে জাগুয়ারগুলো। অনায়াসে লুকিয়ে আছে ওগুলোর আড়ালে।
ম্যানুয়েলও যোগ দিল তাদের সাথে, তার এক হাতে পিস্তল। টর-টর ফ্রাঙ্কের পাশ দিয়ে যাবার সময় রক্তের গন্ধ শুঁকে শব্দ করে গর্জন করে উঠল।
“গুনে দেখলাম কমপক্ষে আরও পনেরটা হবে,” ক্যারেরা বলল, মুখটা অর্ধেক ঢেকে আছে নাইট-ভিশন গগলসে। “এগিয়ে আসছে ওরা।
গালি দিয়ে উঠল কসটস। “ওরা যদি ছুটে আসা শুরু করে তাহলে ওদের সবাইকে থামানোটা অসম্ভব হয়ে পড়বে। আমাদের হাতে এখন মাত্র একটা গ্রেনেড লঞ্চার, দুটো এম-১৬ আর গুটিকয়েক পিস্তল আছে।”
“আর আমার শটগানটা,” যোগ করল নাথান ।
এবার ক্যারেরার পালা। “আমার বেইলে’তে নতুন কার্টিজ, ভরলাম, কিন্তু এটাই শেষ।”
ম্যানুয়েল হামাগুড়ি দিয়ে পিস্তল হাতে বাইরে এল। “গুহার ভেতরে ওদিকটায় বেশ কিছু আবর্জনা পড়ে আছে । ডালপালা, পাতা, আর ওরকম কিছু হাবিজাবি । ওগুলো দিয়ে এই গুহার মুখে ঠিক এখানে আগুন জ্বালাতে পারি আমরা
“তাই কর তাহলে,” বলল কসটস। ম্যানুয়েল ঘুরে দাঁড়াতেই একটা লম্বা নিচু গর্জন শোনা গেল উপর থেকে । জমে গেল সবাই। ফ্লেয়ারের আগুনের উজ্জ্বল আলোয় বিশাল একটি অবয়ব দেখা গেল সবার সামনে । নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের ঢালে। অস্ত্রগুলো তাক করা হলো ওটার দিকে।
নাথান চিনতে পারল এটই সেই বিশাল আকারের জাগুয়ারটি।
“একটা বাঘিনী,” বিড়বিড় করে বলল ম্যানুয়েল ।
ওটা স্থির হয়ে আছে আগের জায়গায়, মানুষগুলোকে গভীরভাবে দেখছে, সাথে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে যুদ্ধের । এটার পেছনে জায়গাটা ছেয়ে আছে চকচকে আরও কিছু শরীর । পেশীবহুল তীক্ষ্ণ থাবার একটি বাহিনী। “এখন কি করব?” ক্যারেরা বলল।
“ওটা চাইছে আমরাই ওদেরকে আক্রমণ করি আগে,” রাইফেলে চোখ রেখে একটু নিচে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল কাউয়ি ।
“খবরদার গুলি কর না,” ফিসফিসিয়ে বলল নাথান । “এখন যদি গুলি চালাও পুরো দলটা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।”
“ঠিক বলেছে নাথান,” বলল ম্যানুয়েল। “রক্তের লোভ বা নেশা এখন আর নেই ওদের। যেকোন কিছুই ওদেরকে পিছু হটিয়ে দিতে পারে। অন্তত এখানে একটা আগুন জ্বালানো পর্যন্ত অপেক্ষা কর।”
জাগুয়ারটাকে মনে হল যেন তার কথাটা বুঝতে পেরেছে। তীক্ষ একটা হাঁক দিল ওটা । শক্তিশালী পেশীগুলো ব্যবহার করে অস্বাভাবিক ক্ষিপ্রতায় বিশাল একটা লাফ দিল মানুষগুলোর দিকে, যেন নির্ভুলভাবে ছুটে চলা এক যন্ত্র । গুলি ছুড়ল রেঞ্জাররা, কিন্তু এই স্ত্রী-জাগুয়ারটি এত ক্ষিপ্র আর অতিপ্রাকৃত গতির যে বুলেটগুলোকে পাশ কাটিয়ে ভেসে গেল বাতাসে। বুলেটগুলো পাথরে আছড়ে পড়লে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হল। একটাও লাগল না ওটার গায়ে, যেন সত্যিকারের একটি ফ্যান্টম। একটা ধারালো চাকতি সাই করে ছুটে গেল বেইলে খেকে, একটা পাথরে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল নিচের ঢালু জমিতে।
এক হাটুতে ভর দিয়ে বসে পড়ল নাখান। শটগান তাক করে রেখেছে সে। “এই যে সোনা, এদিকে-এদিকে,” খুব নিচুস্বরে জাগুয়ারটাকে আকৃষ্ট করতে চাইল সে। একবার খুব কাছে আসুক ওটা..
ক্যারেরা আবার তাক করল তার অস্ত্র, কিন্তু ট্রিগারে চাপ দেবার আগেই টর-টর তাকে ঠেলে ফেলে দিয়ে তার মাস্টারের পাশ দিয়ে এক লাফে গিয়ে পড়ল পাহাড়ের ঢালে ।
“টর-টর!” চিৎকার দিয়ে উঠল ম্যানুয়েল ।
বেঁধে রাখায় ওটা কয়েক ফিট পর্যন্ত গিয়ে থেমে গেল। বড় জাগুষটার পথ আগলে ধরে নিজেকে প্রকাশ করল সাহসের সাথে । তীক্ষ্ণ দাঁতগুলো বের করে মাথাটা নিচু করে চাপাস্বরে গরগর করছে ওটা। শরীরের পেছনের অংশ উঁচু করে লেজটা এদিক-ওদিক নেড়ে শত্রুকে যেন হুমকি দিচ্ছে। তীক্ষ্ণ বাকা হলদে নখ আর বড় বড় দাঁতগুলো বের করে আছে। কালো দৈত্যটা এবার ছুটে এল ওটার দিকে এক ঝটকায় ওটাকে ছুড়ে দিতে উদ্যত, কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে নিজেকে একটু গুটিয়ে নিল । কালো জাগুয়ারটা টরটরের সামনে এসেই থেমে গেল। আকারে ছোট এই জাগুয়ারটার মতই দাঁড়িয়ে পড়ল ওটা। গরগর করছে দাঁত বের করে। হিসহিস শব্দ করে দুটো প্রাণী চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল একে অপরের প্রতি।
হাতের অস্ত্রটা উঁচু করল কসটস। “তুই মরেছিস এবার।”
ম্যানুয়েল ঘুরে গেল তার দিকে। “দাঁড়াও।”
জাগুয়ার দুটো ধীরে এগিয়ে গেল একে অন্যের দিকে । যেন একটা কাল্পনিক বৃত্তের চারপাশে ঘুরছে। দুই-তিন ফিট হবে তাদের ভেতরকার দূরত্ব। একটা পর্যায়ে কালো জাগুয়ারটার পেছনের অংশ এসে পড়ল দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর দিকে। নাথান নিশ্চিত, এমন সুযোগ পেয়েও গুলি করা থেকে বিরত থাকতে বেশ কষ্টই হল রেঞ্জারদের।
“কি করছে ওরা?” জিজ্ঞেস করল ক্যারেরা।
জবাব দিল ম্যানুয়েল, স্ত্রীটা ঠিক বুঝতে পারছে না কি কারণে তার নিজের গোত্রেরই একজন, হোক না সেটা তার তুলনায় ছোট, এই মানুষগুলোকে বাচাতে চাইছে। এ ঘটনা তাকে একেবারে হতবাক করে দিয়েছে।”
এরইমধ্যে জাগুয়ার দুটো গরগর করা থামিয়ে দিয়েছে। খুব সতর্কতার সাথে একে অপরের কাছাকাছি এল, নাকে নাক ছুঁয়ে যায় এমন অবস্থা। কিছু নিচুপ ভাব বিনিময় হল দু-জনের মধ্যে, চক্রকারে ঘুরছে এখনো। খাড়া লোমগুলো আবার ফিরে গেল আগের জায়গায় । আরও একটু কাছাকাছি আসতেই বড় জাগুয়ারটা এই অদ্ভুত ছোট প্রাণীটার ঘ্রাণ শুঁকল শব্দ করে। অবশেষে তাদের এই ঘূর্ণিনত্য থামলে ধীরে ধীরে আবারো নিজেদের জায়গায় ফিরে গেল ওরা। টর-টর একটু নিচু হয়ে গুহা আর জাগুয়ারটার মাঝখান দিয়ে গেল। শেষবারের মত একবার শব্দ করে বড় জাগুয়ারটা একটু এগিয়ে এসে মুখ ঘষল টর-টরের মুখের সাথে, কিছু একটা বোঝাপড়া হল, যেন একটা চুক্তি, হয়তো সাময়িক যুদ্ধ-বিরতির । চোখে ফাঁকি দেবার মত কালো পশমের জাগুয়ারটা ঘুরে গিয়ে একটু সরে দাঁড়ালে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল টর-টর। চোখে যেন আগুন খেলা করছে। বেড়াল গোত্রর প্রাণীদের মত সে খুব স্বাভাবিকভাবে জিহ্বা দিয়ে চেটে অগোছালো লোমগুলো আবার আগের জায়গায় নিয়ে গিয়ে মানুষগুলোর দিকে ফিরল ।
গুহামুখের কাছে এসে অস্ত্রটি নামালো ক্যারেরা, নাইট-ভিশন গগলসটা পরে নিল সে। “চলে যাচ্ছে ওরা,” বিস্মিত হয়ে বলল সে।
ম্যানুয়েল জড়িয়ে ধরল তার প্রিয় প্রাণীটিকে। “মাথা মোটা বেকুব,কোথাকার, “বিড়বিড় করল সে।
“ঘটনাটা কি হল?” জিজ্ঞেস করল কসটস।
“যৌবন খুব কাছাকাছি চলে এসেছে ওর,” বলল ম্যানুয়েল “কৈশোরের শেষপ্রান্তে থাকা পুরুষটার চেয়ে স্ত্রীটা যদিও আকারে বিশাল তবু বয়সের অনুপাতে সমবয়সী ওরা। পাশাপাশি এত রক্তের ছড়াছড়িতে উত্তেজনাটা চরম মাত্রায় কাজ করছে সবার ভেতরে, আর যৌন উত্তেজনাটাও সক্রিয় হয় এ-সময়। তাদের ভাবভঙ্গি দেখে বোঝা গেল টর-টর একই সাথে হুমকি ও যৌবনের প্রদর্শনী করেছে চমৎকারভাবে।”
ভ্রু কুঁচকালো কস্টস।“তার মানে বলতে চাচ্ছ ওটা ঐ দৈত্যের মন জয় করার জন্য তামাশা করছিল?”
“এবং সে রাজিও হয়েছিল,” বলল ম্যানুয়েল, গর্বভরে জাগুয়ারটার একপাশে হাত বুলাতে বুলাতে। “যেহেতু টর-টর বীরের মত এগিয়ে গিয়ে স্ত্রীটার ছুড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জ
গ্রহন করেছিল, তাই ওটা ভেবেছে টর-টরই আমাদের দলনেতা, যে কিনা একজন গ্রহণযোগ্য সাহসী সুপুরুষ।
“তাহলে এখন কি করব?” জিজ্ঞেস করল ক্যারেরা। “ওরা সরে গেছে কিন্তু পুরোপুরি চলে যায় নি, সত্যি বলতে কি, মনে হচ্ছে ওরা নিচু ভূমিতে গিয়ে দলবদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করছে। হয়তো জলাভূমিতেও ফেরার রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে।”
মাথা ঝাঁকালো ম্যানুয়েল। “আমি জানি না কি করতে চায় । তবে টর-টরের কল্যাণে বেশ কিছুটা সময় পেয়েছি হাতে। আমি বলি কি, এটা কাজে লাগাই। আগুন জ্বালিয়ে পাহারা দিতে থাকি।”
নাথান দেখল জাগুয়ারের দলটা ধীরে ধীরে নিচের জঙ্গলে হারিয়ে যাচ্ছে। কি করছে ওরা?
“মনে হয় আরেকটা নতুন দলের দেখা পেয়েছি আমরা,” ক্যারেরা বলল, কণ্ঠে আবারো আতঙ্ক ভর করেছে। সে পেছনের উঁচু গিরিখাদের দিকে দেখাল ।
ক্যারেরার দিকে মনোযোগ দিল নাথান । রেঞ্জারের দেখানো জায়গাটায় ভাল করে তাকিয়ে ঘন অন্ধকার জঙ্গল আর বিভিন্ন পাথুরে জমি ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না। “কই, তুমি কিসের” অমনি কিছু একটা নড়াচড়া তার চোখে পড়ল। একটু ওপরেই একটা আবছায়া অবয়ব এগিয়ে এল জঙ্গলের ভেতর থেকে, একেবারে খোলা জায়গায়। একটা মানুষের অবয়ব। সত্যিকারের মানুষ! কালো জাগুয়ারদের মতই কালো সে, পা থেকে মাথা পর্যন্ত কুচকুচে কালো। একটা হাত উঁচু করে ঘুরে আবারও হাটতে শুরু করল সে। নিজেকে খোলা জায়গায় এনে সবার দৃষ্টি কাড়তে চাইছে যেন। তারা সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে দেখল মানুষটিকে।
“এটা নিশ্চিতভাবেই ব্যান-আলিদের কেউ হবে,” বলল নাথান।
অবয়বটা থামল, তারপর আবারো তাদের দিকে ঘুরে দাঁড়াল, মনে হল সে অপেক্ষা করছে মানুষগুলোর জন্য।
“আমার মনে হয় সে চাচ্ছে আমরা তাকে অনুসরণ করি, ম্যানুয়েল বলল।
“ওদিকে জাগুয়াররাও পথ আগলে আছে আমাদের, বিকল্প কিছু করার আছে বলে ততা মনে হচ্ছে না,” ক্যারেরা বলল । দূরের অবয়বটি স্থির দাঁড়িয়েই আছে “তাহলে কি করব?” জিজ্ঞেস করল রেঞ্জার ।।
উত্তর দিল নাথান, “ওকে অনুসরণ করব আমরা এজন্যেই আমরা এখানে এসেছি। ব্যান-আলির কাছে পৌছানোর জন্য এটাই সব সর্বশেষ পরীক্ষা..আমি জাগুয়ার দলের কথা বলছি।”
“অথবা এটাও আরেকটা ফাঁদ হতে পারে,”কটস বলল ।
“এছাড়া অন্য কিছু তো দেখছি না,” ক্যারেরা বলল। “মনে হচ্ছে আমাদের যাওয়াই উচিত নইলে জাগুয়ারগুলোই শেষ করে দিতে পারে সবাইকে।”
ঘাড়ের উপর দিয়ে গুহার ভেতরে তাকাল নাথান । ত্রিশ-চল্লিশ ফিট দূরে কেলি, কাউয়ি এবং বাকিরা জড়ো হয়ে আছে ফ্রাঙ্কের চারপাশে। আহত মানুষটা একটা শর্টস পরে আছে শুধু। এখন বেশ শান্ত দেখাচ্ছে তাকে। উঠে দাঁড়াল আনা, এক হাতে একটা আইভি ব্যাগ উঁচু করে আছে ঘাড় অবধি । কেলি এরইমধ্যে তার ভাইয়ের কেটে যাওয়া পা দুটোর একটা ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে, অপর পা-টা একটা প্যাকেট বেঁধে দিচ্ছে রক্ত যাতে বাইরে
আসতে পারে। কাউয়ি হাটুতে ভর দিয়ে বসে পড়ল তার পাশে, বাকি পা-টা বাধার জন্য ব্যান্ডেজ প্রস্তুত করে রেখেছে এক হাতে । তাদের চারপাশে গুহার মেঝেতে সিরিঞ্জের প্যাকেট আর বিভিন্ন ওষুধের বোতল ছড়িয়ে আছে।
“আমি দেখছি ফ্রাঙ্ককে সরানো যায় কিনা।”
“একজনকেও ফেলে যাব না আমরা,” কসটস বলল ।
মাথা নেড়ে সায় দিল নাথান, কথাটা শুনে খুব খুশি হল। অন্যদের দিকে এগিয়ে গেল সে। ফ্রাঙ্কের কি অবস্থা?” কাউয়িকে জিজ্ঞেস করল।
“অনেক রক্তপাত হয়েছে। একটু স্বাভাবিক হবার পর কেলি ওকে কিছু ইনজেকশন দেবে।”
দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল নাথান।“ওকে হয়তো আমাদের সরাতে হবে এখান থেকে।
“কি?” জিজ্ঞেস করল কেলি, তার ব্যান্ডেজ বাধা শেষ। “তাকে নড়াচড়া করা যাবে না কোনভাবেই।” আতঙ্ক, ক্লান্তি আর অবিশ্বাসের কারণে তার কথাগুলো খুব কর্কশ শোনালো।
কাউয়ি এবং কেলি দ্বিতীয় ব্যান্ডেজটা শুরু করতেই নাথান বসে পড়ল তাদের কাছে । ক্ষতস্থানে নড়া লাগতেই একটু কঁকিয়ে উঠল ফ্রাঙ্ক। দু-জনে ব্যান্ডেজটা কিছু দূর করার পর নাথান এইমাত্র গুহামুখে ঘটে যাওয়া সবকিছু বর্ণনা করল ।
“ব্যান-আলি আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছে। সম্ভবত আমাদেরকে আমন্ত্রনও জানিয়েছে ওদের গ্রাম পর্যন্ত যাবার জন্য। আমার মনে হয় আমন্ত্রণটা আর দ্বিতীয়বার দেবে না ওরা।”
মাথা নেড়ে সায় দিল কাউয়ি। “আমরা বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছি, কিছু যুদ্ধে বেঁচে গেছি,” নাখানের সাথে সুর মিলিয়ে বলল সে। “আর এতকিছুর পর আমারা নিজেদেরকে যোগ্য প্রমান করার অধিকার অর্জন করেছি।”
“কিন্তু ফ্রাঙ্ক?” কেলি বলল।
“একটা স্ট্রেচার বানিয়ে ফেলব বাঁশ আর পামপাতা দিয়ে কেলির হাতটা স্পর্শ করে নরম গলায় বলল কাউয়ি । “যেহেতু একবার ওদের চোখে পড়েই গেছি এখন যদি ফ্রাঙ্ককে নিয়ে যাই তাহলে সে তো মরবেই, আমরাও ছাড়া পাবো না।”
নাথান দেখল মেয়েটির মুখ ভয়ে শক্ত হয়ে গেল। চোখগুলো চকচক করে উঠল। ওদিকে তার মেয়ে আর এদিকে তার ভাই এখন বিপদাপন্ন। নাথান তার পাশে বসে একটা হাত রাখল তার পিঠে। “আমরা যেখানেই যাই না কেন সে যেন নিরপদে থাকে সেটা দেখব আমি। একবার পৌছাবার পর অলিন আবারো রেডিও সিগন্যালটা পাঠাবে স্যাটেলাইটে।”
রাশিয়ানটার দিকে তাকাল নাথান। খুব দৃঢ়ভাবে মাথা ঝাকাল অলিন। “আমি জানি আমাদের জিপিএসটা অন্তত চালু করতে পারব একটা সিগন্যাল পাঠানোর জন্য।”
“আর একবার এটা করা হয়ে গেলে সাহায্যও চলে আসবে। এখান থেকে তোমার ভাইকে নিয়ে গেলে তার সাথে সাথে আমরাও বেঁচে যাব।”
কেলি ঝুঁকল নাথানের দিকে, কোমলভাবে স্পর্শ করল তাকে। “কথা দিচ্ছ তো?” খুব নরম গলায় বলল সে। তার চোখে জল। হাতের বাঁধনটা একটু দৃঢ় করল নাথান। “অবশ্যই কথা দিলাম। কিন্তু নাথান যখন তার ভাইয়ের মলিন মুখের দিকে তাকাল দেখল নতুন ব্যান্ডেজ ভেদ করে রক্ত চুইয়ে পড়ছে। মনে মনে প্রার্থনা করল যেন এই প্রতিজ্ঞাটা সে যেভাবেই হোক রাখতে পারে।
নাথানের বাহু থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল কেলি। কণ্ঠে দৃঢ়তা ফুঠিয়ে কথা বলল সে। “তাহলে চল যাই ।”
তাকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করল নাথান।
সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল নতুন ভ্রমণ শুরু করার আগে । কসটস এবং ম্যানুয়েল জঙ্গল থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে এল একটা অস্থায়ী স্ট্রেচার বানাবার জন্য, ওদিকে কেলি আর কাউয়ি ফ্রাঙ্ককে যতটা সম্ভব শান্ত রাখার কাজে ব্যস্ত। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পুণরায় যাত্রা করার জন্য তৈরি হয়ে গেল সবাই। নাথানের সাথে ক্যারেরার দেখা হল গুহামুখে।
“আমাদের উপর নজর রাখা লোকটি এখনও যায় নি,” সে বলল । একটু দূরেই নিঃসঙ্গ কালো মানুষটি দাড়িয়ে আছে।
হাঁক দিল কসটস, নিশ্চিত হতে চাইছে সবকিছু ঠিকঠাকমত চলছে কি না। সবাই হাত লাগাও কাজে। আর সাবধানে থাক।”
বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল নাথান এবং ক্যারেরা। একজনের পেছনে আরেকজন, এভাবে সারি বেঁধে সার্জেন্ট কসটসের নেতৃত্বে দলটা রওনা দিল। দলের একেবারে শেষে ম্যানুয়েল এবং অলিন স্ট্রেচারটা বহন করছে। রোগিকে বাশের সাথে বেঁধে নেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত নিরাপত্তার জন্য। দলের সবাই পালাক্রমে হাত চালাবে এটা বহনের কাজে। স্ট্রেচারটা অতিক্রম করতেই কেলি অনুসরণ করল ওটাকে, তারপর নাথান এবং ক্যারেরা অবস্থান নিল তার পেছনে। গুহামুখ অতিক্রম করে কয়েক পা এগোতেই নাথানের বুটের পেছনের অংশে কিছু একটা বাঁধল, জিনিসটা আলগা ধুলোয় পড়ে আছে। নিচু হয়ে ওটা তুলে ভাল করে দেখলো সে। এই জিনিসটা তারা ফেলে রেখে যেতে পারে না।হাত দিয়ে ওটা থেকে ময়লা ঝেড়ে আবার সামনে চলতে শুরু করল সে। সামনে মানুয়েলেকে অতিক্রম করে যাবার সময় ভাল করে রেড-সক্স ক্যাপটি মুছে আহত ফ্রাঙ্কের মাথায় পরিয়ে দিল। আবার নিজের জায়গায় আসার জন্য নাথান ঘুরে দাঁড়াতেই কেলির সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল । তার চোখে বেদনা । কষ্টের হাসি দিল সে। তার এই নীরব ধন্যবাদ মাথা নেড়ে গ্রহণ করল নাথান। ক্যারেরার পেছনে অবস্থান নিল এবার। গভীর জঙ্গলে একটু দূরে একাকী দাড়িয়ে থাকা কালো মানুষটিকে ভাল করে পর্যবেক্ষণ করল।
এ পথটা এখান থেকে কোথায় নিয়ে যাবে তাদেরকে?
