Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    জেমস রোলিন্স এক পাতা গল্প700 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    আমাজনিয়া – ১৪

    আবাসভূমি

    আগস্ট ১৬, ভোর ৪:১৩

    আমাজন জঙ্গল

    লুই তার ডিঙ্গি নৌকায় বসে অপেক্ষা করছে গুপ্তচরের কাছ থেকে খবর পেতে। সূর্য উঠতে এখনো এক ঘণ্টা বাকি। এরইমধ্যে জলাভূমি ডুবে গেছে গভীর অন্ধকারে। নাইট-ভিশন চশমার ভেতর দিয়ে সে খুঁজে ফিরছে মানবচিহ্ন। কিছুই নেই। ভেঙচি কাটল সে। ডিঙ্গিতে অপেক্ষা করতে করতে অনুভব করল, পরিকল্পনাটা ভেস্তে যাচ্ছে। কি হচ্ছে এদিকটাতে তার কোন ধারণাই নেই। রেঞ্জারদের দলটাকে পালাতে বাধ্য করার যে পরিকল্পনা সেটা সফল হয়েছে। কিন্তু এখন কি হচ্ছে?

    মাঝরাতে লুইর দল ভেলায় চড়ে জলাভূমিটা পার হয়েছে, তারপর সব মালামাল টেনে-হিচড়ে তুলেছে ডাঙ্গায় । পাড়ের কাছাকাছি আসতেই বেশ কয়েকটা ফ্লেয়ারের আগুন দেখা গেছে আকাশে, সামনের উঁচু কোন পাহাড় থেকে ছোড়া হয়েছিল ওগুলো, দক্ষিণ দিকের পাহাড়গুলোর কাছে হবে জায়গাটা। গোলাগুলিও হয়েছে অনেক, এই জলাভূমিতে এসে আছড়ে পড়েছে তার শব্দ। বায়নোকুলার ব্যবহার করে ফ্লেয়ারের ক্ষণিকের ঝলকানিতে পরিবেশটা দেখেছে লুই। রেঞ্জাররা নিশ্চিতভাবেই আবার আক্রমণের শিকার হয়েছে। কিন্তু দূরত্বটা বেশি হওয়ায় কে বা কি তাদেরকে আক্রমণ করেছে তা দেখতে পায় নি । জ্যাকের অর্জিত তথ্যগুলো পেতে তার সাথে যোগাযোগের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে । তার এই লেফটেন্যান্ট রহস্যময়ভাবে গা-ঢাকা দিয়েছে। তথ্যের প্রয়োজনে একটা ছোট দলকে পাঠিয়েছিল লুই যেটা তার সবচেয়ে সেরা অনুসন্ধানকারী দল । নাইট-ভিশন এবং ইনফ্রারেড় যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত মানুষগুলোকে পাঠিয়েছিল শুধুমাত্র ঘটনা কি তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য । সে এবং বাকিরা পাড় থেকে সামান্য দূরে ভেলায় চড়ে অপেক্ষা করেছে তাদের জন্য। কিন্তু দুই ঘণ্টা কেটে গেলেও কোন সাড়া পাওয়ায় নি। এমন কি কোন রেডিও বার্তাও আসছে না ওদের কাছ থেকে। তার নিজের ভেলায় তার মিসট্রেসসহ আরও তিনজন মানুষ আছে । তারা সবাই বায়নোকুলার দিয়ে চেয়ে আছে দূরের পাড়ের দিকে ।

    সুই প্রথমে দেখল জঙ্গল থেকে কেউ একজনকে বেরিয়ে আসছে, আঙুল দিয়ে দেখাল সে। সতর্ক করে দেয়ার মত ছোট্ট একটা শব্দকরল মুখ দিয়ে। বায়নোকুলারটা তুলে দেখল লুই। যাকে দেখা গেল সে তার পাঠানো দলটির নেতা। এক হাত দুলিয়ে তাকে পাড়ের দিকে আসতে ইশারা করল লুই। “অবশেষে, বিড়বিড় করে বলে বায়নোকুলারটা নামিয়ে রাখল।

    কাদাময় পাড়ের দিকে এগিয়ে গেল ভেলার বহরটা। প্রথম ক’জনের সাথে লুইও পাড়ে উঠল । তার লোকদেরকে একটা রক্ষণাত্মক অবস্থান নিশ্চিত করার ইশারা দিয়ে সে এগিয়ে গেল তার প্রধান বার্তাবাহকের কাছে। কালো চুলের মানুষটি এক জার্মান সৈনিক, নাম ব্রেইল । লুইকে দেখে সৌজন্যমূলক মাথা নাড়ল সে। খাটো আকৃতির, পাঁচ ফিট থেকে বেশি হবে না উচ্চতায়, শরীরে কালো রঙের পোশাকে নকশা আকা। খুব সহজেই মানুষের চোখে ফাঁকি দিতে পারে।

    “কিছু কি পেলে?” জিজ্ঞেস করল লুই। লোকটি স্পষ্ট জার্মানটানে বলল। “জাগুয়ার পালের একদল ।”

    মাথা নাড়ল লুই, অবাক হয় নি সে। জলাভূমিজুড়ে অদ্ভুত আর বন্য কিছু আর্তনাদের শব্দ শুনেছে তারা।

    “কিন্তু ওগুলো মোটেই কোন সাধারণ জাগুয়ার নয়,” ব্রেইল বলে গেল। “দৈত্যের মত এক একটা। স্বাভাবিক আকৃতির তিনগুন হবে। আপনাকে ওদের একটার ছবি দেখাচ্ছি।”

    “উহু, বলে যাও,” লুই বলল। দেখার ব্যাপারে তার কোন আগ্রহ নেই। “অন্যদের কি খবর?”

    সবরকম বিবরণী দিতে থাকল ব্রেইল, বলে গেল কিভাবে তার দলের সদস্যদেরকে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে খুব সাবধানে পাহাড়টা বেয়ে উপরে ওঠানো হয়েছে। চারজনের এই দলের বাকি সবাই পাহাড়ের উপরে বিভিন্ন গাছে অবস্থান নিয়েছে এখন। “জাগুয়ারের দলটা চলে যাচ্ছে গিরিখাদ ধরে আরও গভীর জঙ্গলে । ওগুলোকে মনে হচ্ছে যেন সামনের বেঁচে থাকা মানুষগুলোর উপর খুব নজর রাখতে রাখতে এগুচ্ছে।” একটা হাত উঁচু করল সে। ওগুলো ঐ জায়গাটা ছেড়ে যাবার পর ছিন্ন-ভিন্ন একটা মৃতদেহের উপর পেয়েছি এগুলো।” গুপ্তচরটি রূপার দুটি ধাতব পাত লাগানো এক টুকরো খাকি কাপড় তুলে ধরল । পাত দুটো ক্যাপ্টেনের পদমর্যাদাকে নির্দেশ করে।

    তার মানে রেঞ্জারদের দলপতি শেষ? “জাগুয়ারগুলো বাকি সবাইকে আক্রমণ করছে কেন?” জিজ্ঞেস করল লুই। ব্রেইল তার নাইট-ভিশন যন্ত্রটা স্পর্শ করল। “কেউ একজনকে দেখলাম আমি, দেখতে ইন্ডিয়ানদের মত, সবাইকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল আরও উঁচু গিরিখাদে।”

    ‘ব্যান-আলিদের কেউ?” কাঁধ ঝাকাল মানুষটি।

    কে হতে পারে লোকটা? অবাক হল লুই । সদ্য পাওয়া এই তথ্যটাকে খুবই গুরুত্বের সাথে নিল সে। তার শত্রু-দলকে খুব বেশি সামনে এগোতে দিতে চায় না সে, বিশেষ করে সেই রহস্যময় গোত্রের সাথে সফল যোগাযোগের বিষয়টিই বেশি চিন্তার ব্যাপার এখন । পুরস্কারের এত কাছে চলে এসে ওগুলো হারাতে চায় না কোনভাবেই। কিন্তু বেঁচে যাওয়া জাগুয়ারগুলোই নিঃসন্দেহে বড় একটা বাধা। ওগুলোর অবস্থান এখন তার দল এবং শত্রুদের মাঝামাঝি। ওই জাগুয়ারগুলোকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পথ থেকে দূর করতে হবে, তবে সেটা করতে হবে তার শত্রুদের সম্পূর্ণ অগোচরে।

    গভীর জঙ্গলের দিকে তাকাল লুই। অন্যের ছায়ায় গা ঢাকা দিয়ে থাকার সময় প্রায় ফুরিয়ে আসছে। একবার যদি সে গ্রামের অবস্থানটা জানতে পারে, আর জানতে পারে ওটার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা মজবুত, তাহলে চূড়ান্ত খেলাটার জন্য পরিকল্পনা করে নেবে। সে।

    “জাগুয়ারগুলো এখন কোথায়?” জিজ্ঞেস করল লুই। “ওরাও কি গিরিখাদ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে?”

    বিরক্তিসূক শব্দ করল ব্রেইল। “আপাতত ওরা ওদের পেছন পেছনই যাচ্ছে। ওদের অবস্থানের যদি বড় কোন পরিবর্তন ঘটে তবে আমার লোকগুলো ওয়্যারলেসে জানাবে। ভাগ্য ভাল যে নাইট-ভিশন দিয়ে দৈত্যগুলোকে সহজেই সনাক্ত করা যায়। যেমন বড় তেমনি হিংস্র।”

    মাথা নেড়ে সায় দিল লুই, সস্তুষ্ট সে। “অন্যান্য বিপদাপদের কোন খবর আছে?” সারাটা অঞ্চল আমরা চষে ফেলেছি, ডক্টর । কোন হিংস্র প্রাণীর চিহ্ন চোখে পড়ে নি।”

    ভাল। অন্তত কিছুক্ষণের জন্যে হলেও রেঞ্জারদের মনোযোগ লুইর দল থেকে সরে গিয়েছে। কিন্তু লুই জানে, ব্যান-আলি রাজ্যের এত কাছে চলে আসার সুযোগটি বেশিক্ষণের জন্য থাকবে না। তাকে তার দলবলসহ এখান থেকে সরে পড়তে হবে দ্রুত । তবে প্রথমেই পথের বাধা ওইসব জাগুয়ার থেকে মুক্ত হতে হবে তাদেরকে। সে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল সুই দাঁড়িয়ে আছে তার পেছনে। নিঃশব্দ ও প্রাণঘাতী, যেকোন বন্যবাঘের মতই। একটু এগিয়ে আলতো করে একটা আঙুল রাখল লুই তার চিবুকে। মেয়েটিও ঝুঁকে এল তার দিকে। লুইর এই জীবনসঙ্গী একই সাথে বিষাক্ত এবং বিধ্বংসী ।

    “সুই, মাই ডারলিং…মনে হচ্ছে আরও একবার তোমার বুদ্ধির সাহায্য নিতে হবে।”

    * * * *

    সকাল ৫:৪৪

    নাথানের কাঁধটা ব্যাথা করছে স্ট্রেচারের ভারে। দু-ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে হাটছে তারা। পুবের আকাশে প্রভাতের আগমনিতে কোমল-গোলাপী আভা ছড়িয়ে পড়েছে ধীরে।

    “আর কতদূর?” হাফ ছেড়ে প্রশ্ন করল ম্যানুয়েল।

    জবার মনের কথাটাই বলেছে সে। “আমি জানি না, কিন্তু এখান থেকে ফেরার কোন রাস্তা নেই আর,” বলল নাথান ।

    “যদি না তুমি কারও সকালের নাস্তা হতে চাও,” প্রাইভেট ক্যারেরা মনে করিয়ে দিল পেছনে ফেলে আসা শত্রুদেরকে । সারাটা রাত ধরে জাগুয়ারগুলো পিছু পিছু এসেছে তাদের বেশিরভাগই গা ঢাকা দিয়েছে পাহাড়ি বনের ঝোপ-ঝাঁড়ের ভেতরে । কখনও দুএকটা আলগা মাটির উপর ছুটে গিয়ে অবস্থান নিচ্ছে বড় বড় পাথরের আড়ালে। ওগুলোর উপস্থিতি টরটরকে জাগিয়ে রেখেছে। একদম নিঃশব্দ জাগুয়ারটা স্ট্রেচারের চারপাশে ঘুরছে প্রহরীর মত । চোখগুলো জ্বলে উঠছে ক্রোধের আগুনে । তাদের সবার জন্য যে পথটা একমাত্র নিরাপদ সেটা হল সামনে থাকা নিঃসঙ্গ সেই ছায়ামানবের দেখানো পথ । ঐ অপরিচিত মানুষটি নাথানদের থেকে তিনশ মিটারের মত সামনে এগিয়ে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তার গতিটা এমনই, খুব সহজেই তাকে অনুসরণ করা যাচ্ছে ।

    কিন্তু ক্লান্তি খুব দ্রুতই পেয়ে বসেছে সবাইকে। এতগুলো দিনে খুব সামান্যই ঘুমাতে পেরেছে তারা, ফলে ক্লান্তি পৌঁছেছে একেবারে চরম পর্যায়ে। সমগ্র দলটি এগুচ্ছে শম্বুক গতিতে, পা টেনে টেনে হাটছে তারা, হোঁচট খাচ্ছে প্রায়ই। কি সবার স্নায়ু দূর্বল করে দেয়া সারা রাতের এই কষ্টের ভ্রমন ছাপিয়ে একজন মানুষই সবচে বেশি কষ্ট পেয়েছে তাদের দলের-ফ্রাঙ্কের পাশ থেকে কখনোই সরছে না কেলি। অব্যাহতভাবে ভাইকে পরীক্ষা করে যাচ্ছে, বদলে দিচ্ছে রক্তে ভিজে যাওয়া ব্যান্ডেজগুলো। সবই করতে হচ্ছে তাকে চলন্ত অবস্থায়। মুখটা ছাইবর্ণ হয়ে আছে মেয়েটার, চোখ দুটোতে রাজ্যের ভয় আর ক্লান্তি । যখনই ডাক্তারি কাজকর্ম সরিয়ে রাখছে তখনই একজন বোনের ভুমিকা নিচ্ছে সে। ফ্রাঙ্কের হাতটা ধরে রাখছে উঁচু করে, প্রাণপণে চেষ্টা করছে ভাইকে সাহস যোগাতে।

    আশার কথা হল, মরফিন আর চেতনানাশকগুলো একেবারে নিস্তেজ করে রেখেছে ফ্রাঙ্ককে। যদিও অনেক লম্বা বিরতির পর দু-একবার কাতরিয়ে উঠছে সে। যতবারই এমনটা হয়েছে কেলিও উত্তেজিত হয়ে পড়েছে প্রচণ্ডভাবে, চোখে-মুখে কষ্টের ছাপ এমনভাবে পড়েছে যেন ব্যাথাটা তার নিজের শরীরেই। ব্যাপারটাকে নাথান কিছুটা যৌক্তিক হিসেবেই দেখছে ফ্রাঙ্ক তো কেলিরই যমজ ভাই। “অ্যাটেনশন!” কসটস জোরে বলে উঠল দলের একেবারে সামনে থেকে। “রাস্তা বদলাতে হবে আমাদের।”

    সামনের দিকে উঁকি দিল নাথান। সারাটা রাত ধরে ক্লান্তিভরা শরীরে শক্ত মাটির উপর দিয়ে হেটে হেটে এমন একটা জায়গায় এসে থেমেছে সবাই যেখানে জঙ্গলটা গিয়ে মিশেছে পাথুরে, আরও খাড়া পাহাড়ি রাস্তায়। সে দেখল তাদেরকে পথ দেখান মানুষটি খাড়া অংশটি অতিক্রম করে পাহাড়ের গায়ে অসংখ্য ফাঁটলগুলোর একটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফাঁটলগুলো উপর থেকে একেবারে নিচ পর্যন্ত গভীর, চওড়ায় দুটো গাড়ির গ্যারেজের সমান হবে। ছায়ামানব ফাঁটলের মুখে একটু থেমে তাদের দিকে ঘুরে একটু দেখে নিল, তারপর স্বাগত জানানোর কোন লক্ষণ না দেখিয়েই লম্বা পা ফেলে নেমে গেল ফাঁটলটার ভেতরে।

    “আমি প্রথমে দেখে আসি জায়গাটা, কসটস বলল জোর পায়ে রেঞ্জার এগিয়ে গেলে অন্যেরা তাদের গতি ধীর করল। একটা ফ্লাশলাইট লাগানো আছে তার এম-১৬ রাইফেলের সাথে। লাইটটা লক্ষ্যের দিকে স্থির রাখল সে। ফাটলের মুখে এসে একটু দম নিল, তারপর বাঁকা হয়ে আলোটা নিচের দিকে ধরল । কয়েক সেকেন্ড ওভাবে থেকে ভারসাম্য রেখে একটা হাত দোলালো। “একটা খাদ ওটা, বেশ খাড়া।”

    দলের সবাই রেঞ্জারের দিকে ছুটে গেল। নাথান কোনমতে উঁকি দিয়ে দেখল ওটার গভীরতা। ফাঁটলটা একেবারে পাহাড়ের উচ্চতার সমান গভীর, মিশে গেছে নিচের মাটিতে। খোলা মুখটা বেশ প্রশস্ত আর তাই নক্ষত্রের মিটমিটে আলোতেও ফাঁটলের ভেতরটা দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। নামার জায়গাটা বেশ খাড়াই তবে বেশ কিছু পাথরের কোণা দেখা যাচ্ছে যেগুলোকে ব্যবহার করা যেতে পারে নিচে নামার কাজে।

    প্রফেসর কাউয়ি বলল, “এটা দেখে মনে হচ্ছে অপর প্রান্তে আরও একটা গিরিখাদ থাকতে পারে, ঠিক এটার মতই।”

    আনা ফঙ দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে। “অথবা হতে পারে এটা একই গিরিখাদের আরেকটি অংশ, উপরের অংশে যাবার একটি শর্টকাট রাস্তা।”

    একটু দূরেই ছায়ামানব একের পর এক পাথর বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন তাকে মানুষগুলো অনুসরণ করুক বা না করুক সে-ব্যাপারে কোন আগ্রহই নেই তার। কিন্তু তার এই ধীর-স্থিরতা সবাইকে ছুঁয়ে যেতে পারল না। তাদের পেছনেই জাগুয়ারের দল এগিয়ে আসছে হাঁক-ডাক আর গর্জন করতে করতে ।

    “আমি বলি কি, একটা সিদ্ধান্তে আসা দরকার আমাদের, ক্যারেরা বলল ।

    অমসৃণ পাথরের সিঁড়ি লাগানো খাড়া দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাল কসটস। “এটা একটা ফাঁদ হতে পারে, না-জানি কোন বিপদ ঘাপটি মেরে আছে ওখানে!” ফাঁটলটার দিকে এক পা এগিয়ে গেল জেন। “আমরা তো এরইমধ্যে ফাদে পড়ে গেছি, সার্জেন্ট । আমার মতে পেছনের বিপদ থেকে সামনের অজানা বিপদকেই বেছে নেয়া উচিত।”

    কেউ কোন আপত্তি করল না। রাকজ্যাক এবং ওয়াক্সম্যানের করুণ মৃত্যু এখনও জ্বলজ্বল করছে সবার মনে। কসটস এগিয়ে গেল জেনকে অতিক্রম করে। “চলুন !চোখ কান খোলা রাখবেন সবাই।”

    ফাটলটা বেশ প্রশস্ত হওয়ায় ম্যানুয়েল এবং নাথান স্ট্রেচারসহ সহজেই পাশাপাশি হাটতে পারছে। খাড়া ঢাল বেয়ে নামার কাজটা একটু সহজই হল এতে। কিস্তু তারপরও খুব দেখেশুনে পা ফেলাটা বেশ কঠিনই।

    অলিন এগিয়ে এল তাদের দিকে। “তোমাদের কারও কি বিশ্রাম দরকার?” মুখটা সামান্য বাঁকাল ম্যানুয়েল। “আমি আরও কিছুক্ষণ বইতে পারি। নাথান রাজি হল স্ট্রেচারটা তাকে বহন করতে দিতে।

    সবাই দীর্ঘ ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করে দিয়েছে। বাকি সবাই এগিয়ে যেতেই ম্যানুয়েল এবং নাথান কয়েকজনের সাথে পেছনে পড়ে গেল। কেলিও আছে তাদের কাছাকাছি, চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ। ক্যারেরা সবার পেছনে থেকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে।

    হাটু ব্যাথা করছে নাথানের, মাংসপেশী যেন পুড়ছে আর কাঁধগুলো টনটন করছে ব্যাথায় । কিন্তু হাটা থামাল না সে। “বেশি পথ বাকি নেই আর,” জোরেসোরে বলল, অনেকটা নিজেকেই সুধালো যেন।

    “আমিও আশা করি,” বলল কেলি।

    মানুষটার প্রাণশক্তি বেশ ভাল,”ফ্রাঙ্কের দিকে মাথা নেড়ে সায় দিল ম্যানুয়েল।”

    “এমন মানুষেরাই তোমাকে এতদূর আনতে পারে,” কেলি বলল।

    “দেখ, ও ভাল হয়ে যাবে,” নাথান আস্থা দিল মেয়েটাকে। “তার তো সৌভাগ্যের প্রতীক রেড-সক্স ক্যাপ আছে, তাই না?”

    দীর্ঘশ্বাস ফেলল কেলি। “ঐ পুরনো জিনিসটাকে সে খুব ভালবাসে। তুমি কি জান সে ফার্মক্লাক-এ শর্টস্টপ পজিশনে খেলতো? বেসবলের ট্রিপল এ ডিভিশন।” কণ্ঠস্বর একটু নিচে নেমে গেল তার। “আমার বাবা খুব গর্ব করত ওকে নিয়ে। আমরা সবাই করতাম। এমনকি এমন কথাও উঠেছিল, ফ্রাঙ্ক মেজরস লিগে খেলতে যাচ্ছে। ঠিক তারপরই স্কি করতে গিয়ে একটা দূর্ঘটনায় পড়ে তার হাটু ভেঙে যায় ফলে ওর ক্যারিয়ারটাও শেষ হয়ে যায়।”

    বিস্ময়ে ঘোৎ করে উঠল ম্যানুয়েল । “তাহলে এটাই সেই লাকি হ্যাট?”

    ক্যাপের প্রান্তে লেগে থাকা ধুলো মুছতে লাগল কেলি, হাসির একটা রেখা ফুটে উঠল তার ঠোটের কোণে । “তিনটা মৌসুম ধরে তার পছন্দের খেলাটা সে খেলেছিল হৃদয় উজাড় করে দিয়ে। এমনকি সেই দূর্ঘটনার পরেও কখনো ভেঙে পড়ে নি। সে মনে করত সে এই বিশ্বের সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মানুষ ।”

    ক্যাপটার দিকে তাকাল নাথান । ফ্রাঙ্কের আনন্দের দিনগুলোর কথা ভেবে ঈর্ষা হতে লাগল তার মনে। তার নিজের জীবন কি কখনো এমন সহজ ছিল? হয়তো ওর এই ক্যাপটা আসলেই শুভ। আর ঠিক এই মুহুর্তে সর্বোচ্চ পরিমাণ সুপ্রসন্ন ভাগ্যের দরকার তাদের।

    এই স্মৃতি রোমন্থনে বাধা দিল ক্যারেরা। “জাগুয়ারগুলো…ওরা আমাদেরকে অনুসরণ করা থামিয়ে দিয়েছে।”

    পেছনে তাকাল নাথান। বড় একটা জাগুয়ার দাড়িয়ে আছে ফাটলের মুখে। দলের সেই স্ত্রী জাগুয়ারটি। সে কিছুটা সামনে-পিছনে করতে থাকল। টর-টর তাকাল ওটার দিকে, ওটার চোখ যেন জ্বলছে। স্ত্রী জাগুয়ারটাও ছোট জাগুয়ারের দিকে তাকিয়ে থাকল কয়েক মুহূর্তের জন্য, তারপর জঙ্গলে হারিয়ে গেল।

    “নিচু উপত্যকাটি জাগুয়াদের অঞ্চলই হবে,” বলল ম্যানুয়েল। “আরও একসারি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

    “কিন্তু কাকে তারা রক্ষা করছে?” জিজ্ঞেস করল ক্যারেরা।

    সামনে থেকে সার্জেন্ট কসটস একটা ডাক দিল। খাদটা বেয়ে সম্পূর্ন উঠে যেতে আর দশ ফিটের মত বাকি আছে তার। সে হাটা থমিয়ে দিয়ে অন্যদেরকে তার দিকে এগিয়ে আসতে সংকেত দিল। দলটি জড় হতেই সবাই দেখল পুবের আকাশ ফর্সা হতে শুরু করেছে। পাথুরে খাদটা থেকে দূরেই উপত্যকাটি দেখা যাচ্ছে এখন। বিস্তৃত ঘন জঙ্গল। মাঝে মাঝে স্তম্ভের মত বিশাল দীর্ঘকায় বৃক্ষ দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও একটা জলপ্রপাত আছড়ে পড়ছে, এত দূর থেকেও চাপা শব্দ শোনা যাচ্ছে স্পষ্ট।

    “ব্যান-আলিদের দ্বীপ, প্রফেসর কাউয়ি বলল।

    অলিন এগিয়ে এল ম্যানুয়েল আর মাথানের কাছে। স্ট্রেচারটা নেবার জন্য হাত বাড়াল সে। “এখান থেকে আমরা নিয়ে যাব, আমাদের কাছে দাও।”

    রিচার্ড জেনকে রাশিয়ানের পাশে দেখে অবাক হল নাথান, তবে আর কোন আপত্তি করল না সে। স্ট্রেচারটা নতুন বাহকদ্বয়ের সাথে হাত বদল করল তারা। ভার থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে একশ পাউন্ড হালকা মনে হল নাথানের। বাহুগুলো মনে হচ্ছে যেন ভেসে উঠতে চাইছে উপরে। সে এবং ম্যানুয়েল কসটসের দিকে এগিয়ে গেল ।

    ইন্ডিয়ানটা গায়েব হয়ে গেছে,” গম্ভীর স্বরে বলল সার্জেন্ট ।

    নাথান দেখল আসলেই মানুষটাকে দেখা যাচ্ছে না কোথাও। “তবুও আমরা জানি কোথায় যেতে হবে আমাদের।”

    “সূর্য পুরোপুরি ওঠা পর্যন্ত এখানেই অপেক্ষা করব আমরা,” কসটস বলল।

    ভ্রু কুঁচকাল ম্যানুয়েল। “ব্যান-আলি সেই প্রথম থেকেই আমাদের উপর নজর রেখে আসছে রাতদিন ধরে। এখন সূর্য উঠুক বা না উঠুক ওরা না চাওয়া পর্যন্ত ওদের ছায়ার দেখাও পাব না আমরা।”

    “তাছাড়া,” বলল নাথান, “আমাদের একজন অসুস্থ। যত তাড়াতাড়ি কোন গ্রাম বা ওরকম কোন জায়গায় পৌছাতে পারব ফ্রাঙ্কের বাঁচার সম্ভাবনা ততই বাড়বে। আমি বলি কি, সামনের দিকে এগিয়ে যাই।”

    শ্বাস ফেলল কসটস তারপর মাথা নাড়ল। “ঠিক আছে, তবে একসাথে এগোতে হবে। সার্জেন্ট সোজা হয়ে আবারো ওখান থেকে নেতৃত্ব দিতে শুরু করল।

    প্রতিটা পদক্ষেপেই নতুন দিনটি উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। আমাজনে সূর্যোদয় প্রায় হুট করেই হয়। মাথার উপরে আকাশের মিটমিটে তারাগুলোকে গ্রাস করতে শুরু করেছে সূর্যোদয়ের গোলাপী আলো। মেঘমুক্ত আকাশ একটা উষ্ণ দিনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

    খাদের শীর্ষে ওঠার পর সবাই একটু থামল। একটা সরু পথ ঢালু জমির বুকের উপর দিয়ে জঙ্গলের দিকে চলে গেছে। কিন্তু কোথায় গিয়ে মিশেছে ওটা? ঢালু উপত্যাকাটির কোথাও কোন কাঠ পোড়ানো ধোয়া দেখা যাচ্ছে না, নেই কোন মানবকণ্ঠের প্রতিধ্বনি। আরেকটু এগোনোর আগে কস্টস বায়নোকুলার দিয়ে উপত্যকাটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।

    “ধ্যাত!” বিড়বিড় করে বলল সে।

    “কি সমস্যা?” জিজ্ঞেস করল জেন।

    “এই গিরিখাদটা আগেরটারই একটা অংশ, মানে যেখানটায় আমরা ছিলাম, ডানদিকে দেখাল সে। “তবে মনে হচ্ছে এই খাদটা নিচের ভূমি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেছে খাড়া পাহাড়টার জন্য।”

    নিজের বায়নোকুলারটা নিয়ে সার্জেন্টের দেখানো দিকটায় তাকাল নাথান । জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আলাদা করে একটা জলপ্রপাতকেই দেখতে পেল সে যেটা গিরিখাতের কেন্দ্রে গিয়ে আছড়ে পড়ছে। ওটার প্রবাহটাকে অনুসরণ করতে থাকল যতদূর পর্যন্ত দেখা যায়। কিছু দূর অতিক্রম করেই জলপ্রপাতটা আবারো আছড়ে পড়ছে আরেকটা নিচু গিরিখাদে, ঐ অঞ্চলটা দৈত্যাকার জাগুয়ারদের রাজ্য, একটু আগেই নাথানেরা অতিক্রম করে এসেছে।

    “আমরা এখন বাক্সবন্দী,”কসটস বলল ।

    নাথান বায়নোকুলারটা বিপরীত দিকে ঘুরাল । আরও একটা জলপ্রপাত দেখতে পেল সে । এটা এই গিরিখাদে এসে পড়ছে দূরের বিশাল এক উঁচু পাহাড়ের উপর থেকে। প্রকৃত পক্ষে সম্পূর্ণ উপত্যকাটাই তিনদিক থেকে পাথুরে দেয়ালে আবদ্ধ, আর চতুর্থ দিকটায় খাড়া একটা পাহাড়। জায়গাটা পুরোপুরি জঙ্গলের বিচ্ছিন্ন একটি অংশ, অনুধাবন করুল নাথান।

    আবারো মুখ খুলল সার্জেন্ট। “বিষয়টা ভাল লাগছে না আমার কাছে। যে-পথে এলাম সেটা ছাড়া আর কোন পথ নেই এখান থেকে বেরুবার কিংবা ঢোকার।”

    নাথান বায়নোকুলারটা যখন নামাল ততক্ষণে সূর্য পুবাকাশে উঠে গেছে অনেকখানি। সূর্যালোকে আলোকিত সামনের জঙ্গল । নীল-সোনালী রঙের একঝাঁক ম্যাকাও পাখি বাসা ছেড়ে ডানা ঝাপটে উড়ে এল কুয়াশাঘেরা খাড়া পাহাড়টার দিকে। বড় বড় ডানা মেলে তাদের উপর দিয়ে উড়ে গেল দূরে । দু-দিকের জলপ্রপাত থেকে ভেসে আসা জলকণার চাদর ঢেকে ফেলেছে মাঝের উপত্যকাটাকে, সূর্যের প্রথম আলো জলকণার সাথে মিশে সৃষ্টি করেছে চোখ ধাঁধানো এক দৃশ্য।

    “এতো দেখছি এক টুকরো স্বর্গ,” প্রফেসর কাউয়ি বলল ফিসফিসিয়ে । সূর্যালোকের স্পর্শে অরণ্য জেগে উঠতে লাগল পাখির গান আর বানরের চিৎকারে। ডিনার প্লেটের মত বড় বড় প্রজাপতিগুলো রঙিন ডানায় ভর করে ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে । ক্রমশ কিছু প্রাণী দ্রুত গতিতে বনের ভেতর ঢুকে গেল । বিচ্ছিন্ন হোক আর নাই হোক, জীবন তার নিজস্ব গতি ঠিকই খুজে নিয়েছে এই সবুজ উপত্যকায় ।

    কিন্তু কি সেই জিনিস যা এই জায়গাটাকে কারোর বাসস্থান বানিয়েছে?

    “এবার কি করব আমরা?” জিজ্ঞেস করল আনা।

    সবাই চুপ থাকল কয়েক মুহূর্ত, অবশেষে মুখ খুলল নাথান। “আমার মনে হয় না সামনে এগোনো ছাড়া অন্য কোনো পথ আছে আমাদের।”

    ভ্রু কুঁচকালেও পরক্ষণেই মাথা নাড়ল কসটস। “দেখা যাক পথটা কোথায় নিয়ে যায় আমাদের। তবে সাবধানে থাকতে হবে সবাইকে।”

    দলটি ঢালুপথ ধরে সতর্কতার সাথে নিচে নেমে জঙ্গলের প্রান্তে পৌছাল। নেতৃত্বে আবারো কসটস, তার পাশে শটগান হাতে নাথান। লতা পাতার ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সবাই। আরও একটু এগিয়ে জঙ্গলের ছায়াঘেরা সীমানার ভেতরে পা রাখতেই অর্কিড এবং বিভিন্ন আঙ্গুর ফুলের ঘ্রাণে বাতাস ভরে গেল, আর তা এতই তীব্র যে তারা সবাই যেন তার স্বাদটাও পাচ্ছে।

    তারপরও, মিষ্টি বাতাসের মতই দুশ্চিন্তাটা বেড়ে চলল অব্যাহতভাবে। কি লুকিয়ে আছে সামনে? কি ধরনের বিপদ? প্রত্যেকটা ছায়াই যেন চিন্তার খোরাক জোগাচ্ছে। সত্যিকারের অবাক করার মত কিছু নাথানের চোখে পড়তে পনের মিনিট সময় কেটে গেল। ক্লান্তি নিশ্চিতভাবেই তার অনুভূতিকে ভোঁতা করে দিয়ে থাকবে। পা দুটো ধীর গতি হয়ে গেল, তার চোয়ালটা নিচে নামতেই হা হয়ে গেল মুখটা।

    ম্যানুয়েল ধাক্কা খেল তার সাথে।“কি হল তোমার?” ভ্রু দুটো কুঁচকে নিজের পথ ছেড়ে অন্যদিকে কয়েক পা এগিয়ে গেল নাথান।

    “কি করছ, রান্ড?” জিজ্ঞেস করল কসটস।

    “এই গাছগুলো..” বিস্ময়ের অনুভূতি নাথানকে গ্রাস করে নিয়েছে পুরোপুরি, সব দুশ্চিন্তাকে ভুলিয়ে দিয়েছে নিমেষেই। অন্যেরাও থেমে গাছগুলোর দিকে তাকাল।

    খুব ধীরে একটা বৃত্তাকার পথ ঘুরে এল নাথান। “একজন উদ্ভিদবিদ হিসেবে এখানকার বেশির ভাগ গাছপালাই আমি চিনি। সে একটা করে গাছ দেখিয়ে নাম বলতে লাগল । সিল্ক কটন, লরেল, ফিগ, মেহেগনি, রোজউড, সবরকমের পাম। এসবই যেকোন রেইনফরেস্টে দেখা যায় । কিন্তু…” কণ্ঠ থেমে গেল তার ।

    “কি কি?” জিজ্ঞেস করল কস্টস।

    একটা সরু গুঁড়িবিশিষ্ট গাছের দিকে এগিয়ে গেল নাথান। গাছটা ত্রিশ ফিটের মত উপরে উঠে ঘন ডাল-পালার ভেতরে হারিয়ে গেছে। বিশাল কোণাকৃতির ফলগুলো ঝুলছে নিচের দিকে। “তুমি কি জান এটা কি?”

    “দেখে তো মনে হয় পাম,” সার্জেন্ট বলল ।

    “না, এটা পাম নয়।” নাথান হাতের তালু চাপড় মারল ওটার পঁড়িতে। “এটা একটা বিখ্যাত সাইকাডেওয়েড গাছের একটি প্রজাতি। মনে করা হয়েছিল অনেক আগেই এটা বিলুপ্ত হয়ে গেছে…সেই ক্রেস্টাসাস যুগে। ওটাকে আমি শুধু জীবাশ্ম-রেকর্ড হিসেবেই দেখেছি ল্যাবরেটরিতে।”

    “তুমি কি নিশ্চিত?” জিজ্ঞেস করল আনা ফঙ।

    মাথা নেড়ে সায় দিল নাথান। “আমার গবেষণাটা ছিল প্যালেওবোটানির উপর, গাছ পালার জীবাশ্ম নিয়েই কাজ করেছি।” সে আরেকটা গাছের দিকে এগিয়ে গেল, ফার্নের মত দেখতে তবে উচ্চতায় তার শরীরের দিগুণ । প্রতিটি পাতা লম্বায় তার মতই দীর্ঘ আর চওড়ায় তার প্রসারিত বাহুর মত। বিশাল দৈত্যাকার একটা পাতায় ঝাঁকুনি দিল সে। “আর এই হল সেই জায়ান্ট ক্লাস মস । ধারণা করা হয় এটা বিলুপ্ত হয়েছে সেই কারববানিফেরোয়াস যুগে। আর এটাই কিন্তু শেষ নয়। এরকম অসংখ্য উদ্ভিদ এখানে ছড়িয়ে আছে, আমাদের চারপাশেই। ঘুসোপটারডিস, লাইকোপডস, পোলোকাপ, কনফায়ার্স…” সে অদ্ভুত গাছগুলোকে দেখাতে লাগল।“আর সত্যি বলতে আমি এর সবগুলোরই বর্ণনা দিতে পারি।” নাথান তার শটগানটা দিয়ে একটা গাছের দিকে দেখাল যেটার গুঁড়ি সর্পিলাকার আর পেচাননা। “তবে এটা যে কি তা নিয়ে আমার কোন ধারণাই নেই।” সে ফিরে দাঁড়াল অন্যদের দিকে, উপচে পড়া ক্লান্তিকে বিস্ময়ের আবরণ দিয়ে ঢেকে বাহু দুটো উঁচু করে ধরল। “আমরা তো দেখছি একটা জীবন্ত জীবাশ্ম জাদুঘরের ভেতরে আছি।”

    “এটা কিভাবে সম্ভব?” জিজ্ঞেস করল জেন।

    উত্তর দিল কাউয়ি, “এই জায়গাটা বিচ্ছিন্ন, সভ্যতার মাঝে এক বিচ্ছিন্ন জগৎ। যেকোন কিছুই এখানে টিকে থাকতে পারে সহস্র-লক্ষ বছর ধরে।”

    “আর ভৌগলিকভাবে এই অঞ্চলটি সেই প্যালেওজোয়িক যুগের, তার মানে পঁচিশ কোটি বছরেরও আগের,” যোগ করল নাথান, বেশ উত্তেজিত সে। “আমাজনে এই নদীটা একসময় বিশুদ্ধ জলের এক সাগর ছিল। পরে টেকটোনিক প্লেটগুলো পরস্পর সরে গিয়ে বড় সাগরের সাথে আমাজনের সংযোগ হতেই সব জল সাগরে গিয়ে মিশল । আমরা আজ এখানে যা দেখছি তা প্রাচীন আমাজনের অতি ক্ষুদ্র এক রুপ। আসলেই বিস্ময়কর!”

    কেলি কথা বলে উঠল স্ট্রেচারের পাশ থেকে। “বিস্ময়কর হোক আর না হোক, ফ্রাঙ্ককে নিরাপদ জায়গায় নেয়া দরকার।”

    তার কথা নাথানকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। মাথা নেড়ে সায় দিল সে। সবার এমন কঠিন পরিস্থিতিতে অন্যমনস্ক হয়ে যাওয়ায় লজ্জিত বোধ করল ।

    গলাটা পরিস্কার করল কসটস। সামনে এগোনো যাক এবার।” তার পিছু নিল পুরো দলটি।

    জঙ্গল বিমুগ্ধ নাথানের মনোযোগ আর চারপাশেই আটকে থাকল। চোখগুলো পত্রপল্লবের মাঝেই ঘুরছে শুধু। কোন ছায়ার দিকেই আর মনোযোগ নেই এখন। চিন্তাভাবনা সব জঙ্গলকে নিয়ে। একজন প্রশিক্ষিত বোটানিস্ট হওয়ায় অবিশ্বাসে তার মুখ হাঁ হয়ে আছে চারপাশের এত সব দুষ্প্রাপ্য গাছপালা দেখে। অর্গান পাইপের মত বড় বড় স্টক হটেইল, বিশালাকৃতির ফার্ন যা আজকের যুগে বামনাকৃতির পামগাছে রুপ নিয়েছে, দৈত্যাকার প্রাচীন কনিফার যার একেকটা ফলের আকৃতি বড়সড় পোকার মত। আদিম ও আধুনিকের মিশ্রণটা হতবাক করার মত, এমন বিকশিত এক ইকো-সিস্টেম যা আর কোথাও দেখা যায় না।

    প্রফেসর কাউয়ি তার পাশে চলে এসেছে । “তোমার কি মনে হয় এগুলো দেখে?”

    মাথা ঝাকাল নাথান। “আমি ঠিক জানি না। এর আগেও প্রাচীন গাছ-পালা আবিষ্কৃত হয়েছে। চায়নাতে বিলুপ্ত তালিকায় থাকা ডন-রেডউড গাছ পাওয়া গিয়েছিল চল্লিশের দশকে। আফ্রিকায় এক গুহায় পাওয়া গেল দূর্লভ কিছু ফার্ন। আর অতি সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়াতে বিশাল একসারি অতি প্রাচীন গাছ পাওয়া গেছে প্রত্যন্ত এক রেইনফরেস্টে, যে গাছগুলোকে মনে করা হত অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।” কথায় গুরুত্ব আনার জন্য নাথান কাউয়ির দিকে তাকাল। “এসব বিবেচনা করলে বলা যায়, আমাজনের খুব সামান্যই আবিষ্কার হয়েছে, এটা আরও বিস্ময়ের ব্যাপার যে, আমরা এমনটা এর আগে দেখি নি।”

    “জঙ্গল তার রহস্য ভালমতই লুকিয়ে রাখে,” কাউয়ি বলল।

    আরও কিছুটা এগোতেই মাথার উপরের আচ্ছাদন আরও ঘন হতে থাকল, দীর্ঘ হতে থাকল গাছগুলো। সকালের সূর্যের ঘন আলো রুপ নিল সবুজ আভায়, যেন সবাই হাটছে অতীত অভিমুখে। জঙ্গল দেখতে দেখতে কথা থেমে গেল সবার। এতক্ষণে যারা বোটানিস্ট নয় তারাও বুঝতে শুরু করেছে তাদের চারপাশের এই জঙ্গলটা বেশ অস্বাভাবিক। একালের পরিচিত গাছের বিপরীতে আদিকালের গাছগুলোর সংখ্যা অনেক বেশি এখন চারদিকে। গাছগুলো সব বিশালাকৃতির, ফার্নগুলো দাড়িয়ে আছে স্তম্ভের মত। অদ্ভুত দর্শন পেঁচানো গাছগুলো ছড়িয়ে আছে মাঝে মাঝে। তারা একটা কাঁটাওয়ালা ব্রোমেলিয়াড গাছের পাশ দিয়ে গেল যেটা ছোটখাট একটা ঘরের মত। আরো আছে বিশাল আকৃতির ফুল যার একেকটা একটা আকার কুমড়ার মত হবে, ঝুলছে লতায় আর বাতাসকে ভারি করে তুলছে সুবাসে। এটা বিস্ময়কর রকমের এক সবুজরাজ্য।

    হঠাৎ সামনে থেমে গেল কসটস, স্থির হয়ে আছে নিজ স্থানে, চোখ নিবন্ধিত সামনের পথের উপর, সেখানে তাক করে রেখেছে অস্ত্র । চাপাকণ্ঠে সবাইকে নিচু হতে বলল সে। হামাগুড়ি দিল দলটি। শটগান উচু করে ধরল নাথান। ঠিক তখনই দেখতে পেল রেঞ্জারের ভড়কে দেবার কারণটা। নাথান ডানে-বায়ে, এমনকি পেছনেও দেখে নিল। এটা ঠিক কম্পিউটারাইজড কোন ছবির মত দেখতে, যেটাকে প্রথম দেখাতে বিচ্ছিন্ন কিছু বিন্দুর মত মত মনে হয় কিন্তু চোখের আকৃতি ও অবস্থান পরিবর্তন করে ভিন্ন কোন কোণ থেকে দেখলে একটা ত্রিমাত্রিক ছবি ভেসে ওঠে। হতবাক হয়ে চারপাশের জঙ্গলকে নতুন আলোতে দেখতে পেল সে। উঁচু গাছগুলোর একেবারে শীর্ষে মোটা ডাল-পালার মাঝে প্লাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে, তার উপরে ঘর-দুয়ার। অনেকগুলোর ছাদ বানানো হয়েছে। জীবন্ত ডাল, লতা-পাতা দিয়ে, যার কারণে প্রাকৃতিক ছদ্মবেশে ঢাকা পড়ছে ওগুলো। এই আধা-জীবন্ত কাঠামোগুলো ওদেরকে ধরে রাখা গাছগুলোর সাথে মিশে গেছে নিখুতভাবে।

    নাথান আরেকটু ভাল করে দেখতেই লতা-পাতার প্রাকৃতিক সেতু ও সাঁকো চোখে পড়ল, যেগুলোকে প্রথম দেখাতে ডাল-পালার সহজাত বিক্ষিপ্ত বুনন মনে হয়েছিল। সাঁকোগুলোর একটা আবার নাথানের খুব কাছেই, তার থেকে কয়েক মিটার দূরে, ডানপাশে। সঁকোর উপর থেকে নিচ পর্যন্ত পুরোটাজুড়ে ফুল ফুটে আছে। তার মানে এটাও জীবন্ত । চারপাশ আরও ভাল করে দেখার পরও এটা বলা বেশ কঠিনই মনে হল যে, মানুষের বানানো কাঠামো কোথায় শেষ হয়েছে, আর জীবন্ত কাঠামোগুলো কোথায় শুরু হয়েছে। অর্ধেক কৃত্রিম অর্ধেক জীবন্ত গাছপালা । দুয়ের মিশ্রণটা অসাধারন, নিখুঁত তাদের ছদ্মবেশ।

    কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ঢুকে পড়েছে ব্যান-আলিকো গ্রামে।

    একটু সামনেই আরও বড় কিছু বাসস্থান দেখা গেল, আরও উঁচু উঁচু গাছের উপরে। সবগুলোই কয়েক তলাবিশিষ্ট, প্রত্যেকটার সামনেই ছাদহীন করিডোর, আর ওগুলো মিশেছে মূল ঘরগুলোর সাথে। কিন্তু এগুলো এতটাই বাকল, লতা-পাতায় ঢাকা যে আলাদা করে চেনা বেশ দুরুহ ব্যাপার। দলের সবার চোখে এগুলো ধরা পড়তেই স্থির হয়ে গেল তারা, কোন নড়াচড়া নেই কারোর। একটা প্রশ্ন ফুটে উঠেছে সবার মুখে। গাছের মাথায় এই ঘর-বাড়িগুলোর অধিবাসীরা কোথায়?

    একটা গভীর সতর্কবার্তা ভেসে এল টর-টরের গলা থেকে। আর তখনই ছদ্মবেশ নেয়া গ্রামটার মতই সবাইকে দেখতে পেল নাথান। মানুষগুলো ঠিকই আছে স্থির, নিঃশব্দে দাড়িয়ে আছে চারপাশে। যেন জীবন্ত ছায়ামানব । সবার শরীরে কালো রঙ, ওরা মিশে আছে গাছ ও ঝোপের ছায়ায়। একজনকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল অন্ধকারের পর্দা ভেদ করে । সভ্যজগতের মানুষগুলোর হাতে অদ্ভুত সব অস্ত্র দেখেও কোন ভাবান্তর হল না এই বন্য মানুষটার ।

    নিশ্চিত হল নাথান, এই লোকই তাদেরকে এতদূর পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে। কালো চুল বেণী করা, সাথে কিছু পাতা ও দু-একটা ফুলও আছে যার কারণে আরও একটু প্রাকৃতিক ছদ্মবেশ যোগ হয়েছে । সে আরও একটু এগিয়ে এসতেই দেখা গেল তার হাতে কোন রকম অত্র নেই। আসলে, মানুষটি একেবারেই নয়, পোশাক বলতে ছোট্ট এক টুকরো কাপড়, নিতম্বের চারপাশে পেঁচানো । লোকটা একটু থেমে মানুষগুলোকে দেখল । তার মুখের অভিব্যক্তি পাঠোদ্ধার করা অসম্ভব। চাহনি খুবই কঠিন। হঠাৎ কোন শব্দ না করেই ঘুরে দাঁড়াল লোকটি, তারপর হাটা শুরু করল রাস্তা ধরে। “সে অবশ্যই চাচ্ছে আমরা আবার তাকে অনুসরণ করি,” পায়ের উপর ভর দিয়ে প্রফেসর কাউয়ি বলল । অন্যরাও উঠে দাঁড়াল ধীরে। গাছের আড়ালে ছায়া বিধৌত মানুষগুলো দাড়িয়েই থাকল একেবারে স্থির হয়ে । দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ল কস্টস।

    “যদি ওরা আমাদের মেরে ফেলতেই চাইত,” যোগ করল প্রফেসর কাউয়ি “এতক্ষণে সবাইকে শেষ করে দিতে পারত।

    ভ্রু কুঁচকে একরকম সন্দেহ নিয়েই রেঞ্জার অনুসরণ করা শুরু করল পথ দেখানো ব্যান-আলি লোকটাকে। হাটা শুরু করে নাথান অব্যাহতভাবে চোখ বুলাতে লাগল চারপাশের নিশ্চুপ গ্রাম আর তার অধিবাসীদের উপর। মাঝে মাঝে দু-একটা ছোট মুখের অবয়ব চোখে পড়ল এক ঝলক, সে বুঝল ওগুলো শিশু ও নারীরা হবে। একটু দূরেই চারপাশে আরও কিছু অর্ধ-লুকায়িত মানুষের উপস্থিতি বুঝতে পারল সে। গোত্রীয় যোদ্ধা বা স্কাউট হবে হয়ত, ভাবল সে। রঙ করা মুখগুলোর হাড়ের গঠন পরিচিত আমেরিকান ইন্ডিয়ানের গঠনের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, কিছুটা এশিয়ান ভাঁজও আছে সেখানে। একটা জেনেটিক বন্ধন হিসেবে এই সাদৃশ্যটা ওরা পেয়েছে ওদের পূর্বপুরুষ থেকে যারা সর্বপ্রথম এশিয়া থেকে আলাস্কায় যাবার সংকীর্ণ এক পথ তৈরি করেছিল প্রায় পঞ্চাশ হাজার বছর আগে এবং পরে আমেরিকায় স্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু এ মানুষগুলো কারা? এখানে এল কেমন করে? এদের উৎপত্তিই বা কোথায়? বিপদ আর নিরব হুমকি সত্ত্বেও নাথান ব্যাকুলভাবে জানতে চায় এই মানুষগুলোকে, জানতে চায় এদের ইতিহাস, বিশেষ করে এটা যেহেতু তার নিজের সাথেই এখন যুক্ত হয়ে গিয়েছে । চারপাশের জঙ্গলটার উপর চোখ বুলাল সে। তার বাবাও কি এই পথ ধরেই হেটেছিল? সম্ভাবনার কথাটা বিবেচনা করতেই ফুসফুসটা শক্ত হয়ে উঠল তার উথলে উঠল পুরনো আবেগগুলো। তার বাবার কি হয়েছিল সেটা আবিষ্কার করার খুব কাছেই চলে এসেছে সে।

    আরও কিছু দূর দলটা এগোতেই পরিস্কার হয়ে গেল যে, সবাইকে একটা পরিস্কার আর আলো ঝলমলে জায়গার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সরু রাস্তা ধরে ঝোপঝাড়হীন পরিক্ষার জায়গাটায় পৌছাতেই দেখা গেল রাস্তাটার উভয়পাশই খোলা । বিরাট বিরাট বৃক্ষ আর প্রাচীন পাইনগাছের একটা বৃত্ত খোলা জায়গাটা ঘিরে রেখেছে। একটা অগভীর জলপ্রবাহ বয়ে গেছে খোলা জায়গাটার মাঝ দিয়ে কলকল শব্দে। সূর্যের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে সেই পানিতে। দলটি সমনে এগোতে থাকল কিন্তু বৃত্তের সীমার কাছে আসতেই সবাইকে থামতে হল হঠাৎকরে, সবাই হতভম্ব।

    পরিস্কার জায়গাটুকুর মাঝে প্রায় পুরোটা জায়গাজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল একটি গাছ । এমন নমুনা আগে কখনো দেখে নি নাথান। কমপক্ষে ত্রিশ তলার মত উঁচু হবে ওটা, সাদা গুঁড়িটার পরিধি দশ মিটার হবে কমপক্ষে। মোটা শেকড়গুলোর কিছু কালো মাটি ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আছে শক্ত খুঁটির মত । কিছু শেকড় জলধারার উপর দিয়ে গিয়ে আবার মাটিতে ডুবে গেছে। উপর দিকে গাছটার শাখাগুলো ছড়িয়ে আছে চারদিকে ধাপে ধাপে, অনেকটা জায়ান্ট রেডউডের মত। তবে সূঁচালো পাতার পরিবর্তে সেখানে বেশ চওড়া, অনেকটা হাতের তালুর মত পাতা, দুলছে মৃদুভাবে যেন পাতাগুলোর অপর পাশের রুপালী রংয়ের ঝলকানি, আর শুকনো ফলগুলোর আকৃতি নারকেলের মত। হাঁ হয়ে আছে নাথান, হতভম্ব সে। এতটুকুও জানে না যে কিভাবে বা কোথা থেকে এটাকে শ্রেণীকরন শুরু করবে। হয়তো আদি জিমনোসপেপারের কোন প্রজাতি, কিন্তু নিশ্চিত হবার কোন উপায় নেই। ফলগুলো দেখতে কিছুটা আধুনিক যুগের ক্যাটস-কু গাছের ফলের মত কিন্তু তারপরও নিঃসন্দেহে এই নমুনাগুলো আসলেই প্রাচীন।

    গাছটি নিয়ে আরও একটু ভাবতেই নতুন একটা জিনিস অনুধাবন করল নাখান । এত কঠিন একটা জায়গাতেও প্রাণের চিহ্ন বিদ্যমান। ফলের মতই দেখতে ছোটছোট ঘর বানানো হয়েছে ডালের উপর বা গাছের গায়ে। এমনভাবে বানানো যে ওগুলোকে ফল ভেবে ভুল হয় । বিস্ময়ে অভিভূত নাথান । এতক্ষণে তাদের পথ দেখানো মানুষটি বিক্ষিপ্ত শেকড়ের ভেতর অন্ধকার দিয়ে এগিয়ে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল । ভাল করে দেখার জন্য একপাশে সরে যেতেই নাথান বুঝতে পারল, অন্ধকারটা আসলে গাছের গুড়ির ভেতরের একটি খোলা পথ। তার মানে একটা প্রবেশদ্বার। গাছের উপরে কুঠুরিগুলোর দিকে তাকাল সে । লতা দিয়ে বানান কোন মই বা সাঁকো নেই এখানে। তাহলে ঐ ঘরগুলোতে পৌছায় কিভাবে ওরা? গাছটার ভেতরে কি কোন সুড়ঙ্গ আছে? ব্যাপারটা বোঝার জন্য সামনে পা বাড়াল নাথান।

    কিন্তু ম্যানুয়েল একটা হাত ধরে বসল তার। “ওদিকে দেখ, হাত দিয়ে অন্য একটা দিকে দেখাল সে।

    সেদিকে তাকাল নাথান । দৈত্যাকার গাছটা তার মনোযোগ এতটাই কেন্দ্রীভূত করে রেখেছিল যে ওখানে কাঠ নির্মিত আরও একটা কুঠুরি আছে তা তার দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে । ঘরটা ছোট বাক্সের মত তবে বেশ মজবুত করেই বানানো, পর্যন্ত চোখে পড়া একমাত্র মাটির উপর মানুষের বানান কিছু ওটা।

    “ছাদের উপরের ওগুলো সোলার প্যানেল নাকি?” জিজ্ঞেস করল ম্যানুয়েল।

    চোখের পাতা সংকুচিত হল নাথানের । সে বায়নোকুলারট উঁচিয়ে ধরল। কেবিনের উপরে দুটো ছোটছোট কালো প্যানেল সকালের রোদে চকচক করছে। ওগুলোকে পুরোপুরি সোলার প্যানেল বলেই মনে হচ্ছে। আশ্চর্যের ব্যাপার! বায়নাকুলারে চোখ লাগিয়ে আরও ভাল করে দেখতে লাগল সে। ঘরটায় কোনো জানালা নেই, দরজা বলতে পামপাতায় বোনা একটা ছাপড়া। নাথানের মনোযোগ আটকে গেল দরজার পাশে রাখা একটা জিনিসের উপর, একটা পরিচিত বস্তু সূর্যের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। স্নেকউডেরর বানানো লম্বা বা বহু বছর ব্যবহারের ফলে মসৃণ চকচকে, শীর্ষে হোকো পালক লাগানো। নাথানের মনে হল তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে যাচ্ছে।

    ওটা তার বাবার ব্যবহৃত ছড়ি! বায়নোকুলারটা ফেলে দিয়েই কেবিনের দিকে ছুটে গেল সে।

    “রান্ড!” পেছন থেকে চিৎকার দিল কস্টস। কিন্তু কিছুই পরোয়া করল না নাথান। পা দুটো ছুটছে পুরোদমে। অন্যেরাও তাকে অনুসরণ করল, বিচ্ছিন্ন হতে চাইছে না কেউ। জেন এবং অলিন হাসফাস করতে লাগল স্ট্রেচার নিয়ে দৌড়াতে গিয়ে।

    কেবিনের কাছে দ্রুত ছুটে গিয়ে পিছলে পড়ে থামল নাথান। দম বন্ধ হয়ে আছে তার। ছড়িটার দিকে ভাল করে তাকাতেই গলা আর বুক শুকিয়ে গেল। কাঠে খোদাই করা প্রথম অক্ষরগুলো সি আর-কার্ল রান্ড। জল এসে গেল তার চোখে। বাবার নিরুদ্দেশের পর থেকে এখনও সে মেনে নিতে পারে নি তার বাবা মারা গেছে । আশাটাকে জিইয়ে রাখার প্রয়োজন ছিল তার, পাছে হতাশা গ্রাস করে ফেললে বছরজুড়ে বাবাকে খোজার প্রচেষ্টা মাটিচাপা পড়ত। এমনকি যখন অর্থের জোগান ফুরিয়ে গেল, তাকে এক রকম চাপ দেয়া হয়েছিল তার বাবার চিরতরে হারিয়ে যাওয়াটাকে মেনে নিতে । সে তখনও কাঁদে নি। এখন এই দীর্ঘ সময় পর তার যন্ত্রণাগুলো রুপ নিয়েছে আধারময় হতাশায়, এমন এক অধ্যায় যা তার জীবনের চার-চারটা বছর কেড়ে নিয়েছে। কিন্ত্র এখন এখানে তার বাবার উপস্থিতির প্রমাণ স্পষ্টভাবে দেখার পর বাধাহীনভাবে অশ্রু বেয়ে পড়ছে চোখ থেকে। তার বাবার এখনো বেঁচে থাকাটা যে অলীক মনে হয় না নাথানের কাছে তা কিন্তু নয়। এমন অতিপ্রাকৃত ব্যাপার গল্প-উপন্যাসে দেখা যায়। যে ঘরটা পড়ে আছে সামনে সেটা দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত থাকার চিহ্ন বহন করছে। শুকনো পাতাগুলো উড়ে এসে স্তূপ হয়ে রয়েছে দরজার সামনে, এটা জানিয়ে দিচ্ছে দীর্ঘদিন এদিকে কারো পা না পড়ার কথা। নাথান এগিয়ে গিয়ে চটের মত পামপাতার দরজাটা টেনে খুলল। ভেতরটা অন্ধকার। তার ফিল্ড জ্যাকেট থেকে ফ্লাশ-লাইটটা বের করে জ্বালাল সে। একটা লেজবিহীন ইদুর আর কাঠবিড়ালী ভয় পেয়ে প্রাণ বাঁচাতে সামনের দেয়ালের ফাঁক গলিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল । ধুলোর পুরু স্তর মেঝেতে, তার উপর ছোটছোট প্রাণীর পায়ের ছাপ, কাঠবিড়ালীর বিষ্ঠাও দেখা যাচ্ছে। আলোটা চারদিকে ফেলল নাথান । একটু ভেতরে সামনের দেয়ালের কাছে চারটা হ্যামোক ঝুলছে কাঠের বানানো সিলিং থেকে, সবগুলোই খালি, কারো স্পর্শ পড়ে নি বহুদিন। ওগুলোর কাছেই কাঠের একটা বেঞ্চ বানানো । ওটার উপরে গবেষণাগারের বিভিন্ন জিনিসপত্রের সাথে একটা ল্যাপটপও আছে।

    বাইরে দেখা কাঠের ছড়িটার মত ছোট মাইক্রোস্কোপ আর নমুনা রাখার পাত্রগুলোও চিনতে পারল নাথান। এসবই তার বাবার যন্ত্রপাতি। সে অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরটার ভেতরে এগিয়ে গিয়ে ল্যাপটপটা খুলল । তাকে একেবারে হতভম্ব করে ওটা সচল হলে ভুত দেখার মত চমকে গিয়ে একটু পেছনে সরে গেল সে।

    “ঐ সোলার সেলগুলো,” ম্যানুয়েল বলল দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। “এখনো ওটাকে শক্তি দিয়ে যাচ্ছে।” হাত থেকে মাকড়সার জালগুলো সরাল নাথান। “আমার বাবা এখানে ছিল,” বিড়বিড় করে বলল সে অনেকটা মন্ত্ৰতাড়িত হয়ে।“এগুলো তারই যন্ত্রপাতি।”

    একটু পেছন থেকে বলল কাউয়ি, “ইন্ডিয়নটা সাথে দলবল নিয়ে ফিরে আসহে।”

    আরও এক মুহূর্তের জন্য কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে রইল নাথান। ধুলিকণী ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। ঘরের খোলা জায়গা থেকে সকালের রোদ এসে চকচক করে তুলেছে ওগুলোকে। সুগন্ধি কোন কাঠের তেল এবং কোনো পামপাতার কারণে ঘরে একরকম ঘ্রাণ ছড়ানো। কিন্তু এর নিচে চাপা পড়ে আছে ছাই আর পুরনো দিনের গন্ধ। কমপক্ষে ছয় মাস এখানে কেউ আসে নি । চোখ মুছে দরজার দিকে ফিরে নাথান দেখল কালো রঙ করা মানুষগুলো কেবিনের দিকে এগিয়ে আসছে। ওদের ঠিক পাশেই ছোটখাট একজন হেটে আসছে দ্রুত-এক বেটে ইন্ডিয়ান । উচ্চতা কোনভাবেই চার ফুটের বেশি হবে না। চকচকে ত্বকে কোন রং মাখানো নেই, শুধুমাত্র পেটের উপর কালো রঙের উজ্জ্বল নক্সা আর নাভির ঠিক উপরে নীল রঙের পরিচিত হাতের ছাপ ছাড়া। নবাগত এই লোকটির কান দুটো ছিদ্র করা, ওখান থেকে পালক ঝুলছে। সাজটা সাধারণ ইয়ানামামোদের মতই। তবে সে আরও এটা ব্যান্ড পরে আছে মাথায় যেটার ঠিক মাঝখানে নক্সা হিসেবে পরিচিত একটা পোকা বসানো। এই মাংসখেকো পঙ্গপালই কর্পোরাল জারগেনসেনকে মেরে ফেলেছিল।

    অন্যদের সাথে যোগ দিল নাথান। আড়চোখে প্রফেসর কাউয়ি তাকে দেখে নিল। সেও এই অদ্ভুত সাজ-সজ্জার মধ্যে থাকা ঘাতক প্রাণীকে চিনতে পেরেছে। তবে এটা এখন প্রমাণিত, নিশ্চিতভাবে এখান থেকেই পঙ্গপাল দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে। তার পেটের ভেতর ছুরি চালিয়ে দেবার মত অনুভব হল নাথানের, তীব্র ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে পড়ল ভেতরে ভেতরে। এই খর্বাকৃতির লোকগুলো যে তাদের দলের অর্ধেক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে শুধু তা-ই নয়, তার বাবার হারিয়ে যাওয়া দলের জীবিত মানুষগুলোকেও আটকে রেখেছে চার বছর ধরে। ক্রোধ এ যন্ত্রণায় নিমজ্জিত হয়ে গেল সে। কাউয়ি নিশ্চিত বুঝতে পারছে নাথানের মানসিক অবস্থা।

    “শান্ত থাকো, নাথান । দেখা যাক কোথায় এর শেষ হয়।”

    পথ দেখিয়ে নিয়ে আসা লোকটি বেটে ইন্ডিয়নের প্রতি যথেষ্ট নম্রতা ওশ্রদ্ধা জানিয়ে নাথানদের সামনে এসেই সরে দাঁড়াল একপাশে। বেটে ইন্ডিয়ান তাদের দলের উপর চোখ বুলাল, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল প্রত্যেককে । টর-টরকে দেখে চোখ দুটো তার সরু হয়ে গেল। অবশেষে স্ট্রেচারটা চোখে পড়তেই অলিন এবং জেনের দিকে আঙুল তুলে দেখাল।

    “এই আহত মানুষটাকে নিয়ে আস,” অস্বাভাবিক ইংরেজিতে বলল ইন্ডিয়ানটি।

    তারপর একটা হাত তুলে বাকিদের ইশারা করল। “আপনারা এখানেই থাকবেন।

    এই আদেশ দিয়েই অস্বাভাবিক খাটো মানুষটি ঘুরে চলতে শুরু করল সাদা-গুঁড়ির গাছটার দিকে। একেবারে স্থির আর হতভম্ব সবাই। লোকটাকে ইংরেজিতে কথা বলতে দেখে নাখানের ক্রোধ ছাপিয়ে বিস্ময়ের উদ্রেক হল।

    অলিন এবং জেন বরফের মত জমে আছে এখনো।

    পথ দেখিয়ে নিয়ে আসা লম্বা ইন্ডিয়ান লোকটি রেগেমেগে একটা হাত ইশারা করল, বোঝাতে চাইছে যেন লোক দুটো বাকি ইন্ডিয়ানগুলোকে অনুসরণ করে।

    “কেউ কোথাও যাচ্ছে না, সার্জেন্ট কসটস বলে উঠল। এগিয়ে এল প্রাইভেট ক্যারেরাও। উভয়েই অস্ত্র ধরে আছে। দলটা ভাঙা যাবে না কোনভাবেই।” ভুরু তুলল লম্বা ইন্ডিয়ানটি, তারপর একটা আঙুল তুলে চলে যেতে থাকা খাটো ইন্ডিয়ানে দিকে দেখাল। “উনি চিকিৎসক,” বলল সে। অনভ্যস্ত ভাষা ব্যবহারের কারণে বেগ পেতে হল তাকে। “ভাল চিকিত্সক।”

    আরও একবার ইংরেজি ভাষা তাদেরকে হতবাক করে দিল।

    “এই ভাষাটা সম্ভবত তারা শিখেছে তোমার বাবার এখানে অভিযান চলার সময়ে,” বিড়বিড় করে বলল আনা ফঙ।

    অথবা সরাসরি আমার বাবার কাছ থেকেই হয়তো, ভাবল নাথান।

    কাউয়ি ঘুরে দাঁড়াল কেলির দিকে। “আমার মনে হয় ওদের অনুসরণ করাই উচিত। মনে হয় না ওরা ফ্রাঙ্কের কোন ক্ষতি করবে। কিন্তু তারপরও, স্ট্রেচারের সাথে যাব আমি ।

    “আমি আমার ভাইকে ছেড়ে যাচ্ছি না কোথাও,” স্ট্রেচারের দিকে আরও একটু এগিয়ে গিয়ে বলল কেলি।।

    চট করে বলল জেন, “আমিও যাচ্ছি না । বন্দুক যেখানে আমিও সেখানে।”

    “চিন্তার কিছু নেই,” প্রফেসর বলল। “আমি তোমার জায়গায় হাত লাগাচ্ছি। তাছাড়া এবার তো আমারই পালা।” জেন খুবই খুশি হল তবে তা শুধুমাত্র স্ট্রেচার থেকে মুক্তি পাবার জন্য ছাড়া পেয়েই সে ছুটে গিয়ে দাঁড়াল সার্জেন্ট কসটসের আড়ালে, যার চোখেমুখে রাগের অভিব্যক্তির কোন পরিবর্তন হচ্ছে না সেই কখন থেকে । কেলি এগিয়ে গেল স্ট্রেচারের সামনে থাকা অলিনের দিকে। “এবার এটা ছাড়, আমি নিচ্ছি,” রাশান সৈন্যটি বাধা দিতে চাইল তবে লাভ, হল না। “তুমি ততক্ষণে জিপিএসটা চালু করার চেষ্টা কর,” আদেশ করল কেলি এখানে তুমিই একমাত্র লোক যে এই জিনিসটা ঠিক করতে পারবে।” ।

    সে দ্রুত মাথা নেড়ে স্ট্রেচারের বাশের হাতলটা কেলির কাছে হস্তান্তর করল। স্ট্রেচারের ওজন সামলানো একটু কঠিনই হয়ে পড়ল কেলির জন্যে।

    এগিয়ে এল নাথান তাকে সাহায্য করতে। আমি ফ্রাঙ্ককে নিচ্ছি,” বলল সে, “তুমি বরং আমাদের পেছনে আস।”

    “না,” দাঁতে দাঁত চেপে কর্কশ সুরে বলল কেলি। সে মাথা নেড়ে কেবিনের দিকে ইশারা করল।“ওখানে গিয়ে দেখ এখানে কি হয়েছিল সে বিষয়ে কিছু খুঁজে পাও কিনা।”

    আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কেলি চলতে শুরু করল । স্ট্রেচারের অপর প্রান্তে কাউয়ি। লম্বা ইন্ডিয়ানটার মুখে স্বস্তি দেখা গেল এমন সহযোগীতপূর্ণ সমাধান দেখে । সেও দ্রুত হাটা শুরু করল । সে এই ছোট দলটিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বিশাল দৈত্যাকার গাছটির দিকে ।

    ছোট্ট কেবিনটার উঠান থেকে নাথানের দৃষ্টি চলে গেল সাদা গুঁড়ির গাছের উপরের ঘরগুলোর দিকে। অনুভব করল এখান থেকে এই দৃশ্য সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তার অনুসন্ধানী চোখ দুটো খুঁজতে থাকল তার বাবার মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণগুলো। কেলি এবং কাউয়ি গাছের সুড়ঙ্গের ভেতর হারিয়ে যাওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়েই রইল সে। দলের বাকিরা তাদের ব্যাগ কাঁধ থেকে নামাতে শুরু কতেই নাথান আবারো মনোযোগ দিল শূন্য কেবিনটার দিকে। দরজার ফাঁক গলে ল্যাপটপটার আলো ঠিকরে আসছে, যেন ভুতুড়ে কোন আভা ঘিরে রেখেছে অন্ধকার ঘরের ভেতরটা। একটা নিঃস্ব, একাকী আলোর হাতছানি ।দীর্ঘশ্বাস ফেলল নাথান বাকিদের কথা চিন্তা করে। কি হয়েছিল তাদের ভাগ্যে?

    যমজ ভাইটির দেহের ভারে পিষ্ট কেলি বিশাল গাছটার গুড়ির মধ্যে থাকা সুড়ঙ্গ দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল । তার সমস্ত মনোযোগ ক্রমেই মুমূর্ষ হতে থাকা ভাই এবং সামনের অদ্ভুত পরিবেশ, এই দুইয়ে বিভক্ত হয়ে গেছে। এরইমধ্যে ফ্রাঙ্কের বাঁধনগুলো পুরোটাই রক্তে জব জব করছে। মাছির ঝাঁক ভনভন করছে চারপাশে, কিছু আবার জেঁকে বসেছে ব্যান্ডেজের ওপর। সস্তায় এমন খাবার কমই পায় ওরা। যত দ্রুত সম্ভব রক্ত দিতে হবে তাকে। মাথার ভেতর কয়েকটা চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছে শুধু কেলির-নতুন একটা আইভি লাইন, পরিস্কার একটা প্রেসার ব্যান্ডেজ, আরও ব্যাথানাশক ও কিছু অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারটা নিয়ে আসার আগ পর্যন্ত ফ্রাঙ্ককে বাঁচিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।

    কেলির ভেতরটা এখনো ভয় আর আতঙ্কে ভরে আছে। গাছটার ভেতরে ঢুকতেই কেলি যা দেখল তাতে বিস্মিত না হয়ে পারল না। কেলি আশা করেছিল একটা সরু ও খাড়া সিঁড়ি অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। তার বদলে যেপখটা সে দেখতে পেল সেটা বেশ প্রশস্ত ও সমান, এঁকেবেঁকে উঠে গেছে একেবারে গাছের মাথায়, মানুষগুলোর ঘর-বাড়ির দিকে। দেয়ালগুলো খুব মসৃণ আর রঙটা ঠিক গাঢ় মধুর মত। অল্প কিছু নীলচে হাতের ছাপ দিয়ে সাজানো হয়েছে। দেয়ালটা থেকে শুরু করে প্রতি ত্রিশ ফিট পর পর একটা সরু জানালা কাটা ইয়েছে দেয়ালের গায়ে, অনেকটা দূর্গের দেয়ালের মত করে। সকালের তীর্যক আলো জানালা দিয়ে ঢুকে আলোকিত করছে তাদের পথ । সামনের গাইডকে অনুসরণ করতে করতে কেলি এবং কাউয়ি উঠতে থাকল আঁকাবাঁকা পথ ধরে । মেঝেটাও বেশ মসৃণ তবে সেখানে যথেষ্ট খাঁজ রয়েছে পিছলে না পড়ার জন্য। পথের খাড়া ভাবটা যদিও কম তবু খুব তাড়াতাড়িই হাফাতে শুরু করল কেলি, কিন্ত উত্তেজনা আর ভয়ের কারণে থামার কোন ফুসরই পেল না । ভয় তার ভাইকে নিয়ে, সবগুলো মানুষের জীবন নিয়ে ।

    ‘“সুড়ঙ্গটা একেবারে প্রাকৃতিক মনে হচ্ছে,” পেছন থেকে নিচুস্বরে বলল কাউয়ি । “দেয়ালগুলো কি মসৃণ, পথের বাঁকগুলোও নিখুঁত। দেখে মনে হয় যেন গাছের ভেতরে এই ফাঁপা অংশগুলো এমনিতেই ছিল এখানে, মানুষের বানানো নয়।” জিহ্বা দিয়ে ঠোট দুটো ভিজিয়ে নিল কেলি কিন্তু শব্দ বেরুল না মুখ দিয়ে। তীব্র ক্লান্তি ও ভয় জেঁকে ধরেছে তাকে।

    প্রফেসরের কথাগুলো তার মনোযোগকে দেয়াল ও মেঝের দিকে নিয়ে এল। এবার বুঝতে পারল প্রফেসরের কথা। কোথাও কোন কুড়াল বা অন্য কোন যন্ত্রের ছাপ বা দাগ নেই। শুধু জানালাগুলোই মানুষের বানানো তা বোঝা যাচ্ছে। পার্থক্যটা খুবই পরিস্কার। এই মানুষগুলো কি ভাগ্যক্রমে এমন একটা সুড়ঙ্গের খোঁজ পেয়ে তার থেকে সুবিধা ভোগ করে নিচ্ছে? আসার পথে ব্যান-আলিদের যে ঘরবাড়ি চোখে পড়েছিল তাতে সন্দেহাতীতভাবেই প্রমান হয় এই মানুষগুলো দক্ষ প্রকৌশলি, বিশেষ করে প্রকৃতির সাথে কৃত্রিমতার মিশ্রণের কাজে। হয়তো একই মেধা এখানেও প্রয়োগ করা হয়েছে।

    পেছন থেকে মন্তব্য করল প্রফেসর, “মাছিগুলো ভেগেছে।” কেলি দেখল তার ভায়ের রক্তে ভেঁজা ব্যান্ডেজের চারপাশে ভন ভঙ্গ করতে থাকা মাছির ঝাঁকটা আসলেই উধাও হয়ে গেছে। “বদমাশগুলো পালিয়েছে আমরা এই গাছের ভেতর আসার পর পরই,” যোগ করল কাউয়ি। “এই গাছের শরীর থেকে গন্ধযুক্ত তৈলাক্ত কিছু একটা বের হয় যে কারণে পোকা মাকড়েরা দূরে থাকে।”

    কেলির নাকেও বিশেষ একটা গন্ধ ধরা পড়েছে। তার কাছে কেমন যেন পরিচিত মনে হচ্ছে গন্ধটা। অনেকটা শুকনো ইউক্যালিপ্টাসের মত ঔষধি এবং মিষ্টি তবে সেই সাথে তীব্র একটা ভিন্ন গন্ধও আছে, মনে হল যেন পেকে যাওয়া কোন ফল আর উর্বর মাটির সোঁদা গন্ধের অপূর্ব এক সংমিশ্রণ । মাথা ঘুরিয়ে কেলি দেখল তার ভায়ের ব্যান্ডেজগুলো রক্তে ভিজে একাকার। এভাবে রক্ত বের হতে থাকলে তাকে বাঁচান যাবে

    না। কিছু একটা করতেই হবে। আরও একটু হাটতেই শীতল এক আতঙ্ক গ্রাস। করল তাকে, সেইসাথে ক্লান্তিও চেপে ধরেছে, গতি বাড়াল সে। আরও কিছু দূর এগিয়ে সুড়ঙ্গের খোলামুখ দেখতে পেল। সেটা অতিক্রম করতেই লক্ষ্য করা রাস্তাটা তাদেরকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে যেটাকে ঠিক কি বলা যায় তা বুঝতে পারল না । একবার মনে হল কুঁড়েঘরের মত কিছু একটা, আবার মনে হল তারা যেন আছে সুড়ঙ্গের মধ্যেই। জায়গাটা বেশ চওড়া, অনায়াসে একটা ট্যাক্সি যেতে পারবে ওটার মধ্য দিয়ে। কিছু দূরেই কুঁড়েঘরগুলো দেখা গেল। পথ যেন ফুরোচ্ছেই না, উঁচুতে উঠে যাচ্ছে সবাই ধীরে ধীরে। উদ্বেগ ঘিরে ধরেছে কেলিকে, তবু ক্লান্তি ছাপিয়ে যাচ্ছে সব কিছু । হোঁচট খেয়ে পড়তে চাচ্ছে তার শরীর, পা দুটো কোনমতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সে, হাঁপিয়ে উঠছে চরম মাত্রায়। চোখ দুটো জ্বালা-পোড়া করছে বিরামহীনভাবে বেয়ে আসা ঘামের কারণে। অবচেতন মন তার শরীরকে ঠেলে দিতে চাইছে বিশ্রামের দিকে বারবার কিন্তু সে ফ্রাঙ্ককে হারাতে চায় না। তাদের পথপ্রদর্শক বারবার পিছন ফিরে দেখছে তাদের অবস্থান। এতটা দূর আসার পর সে গতি থামিয়ে তাদের দিকে ফিরে কেলির পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।

    “আমি সাহায্য করবে,” হাত মুঠো করে বুকের একপাশে চাপড় দিয়ে বলল সে, “আমি শক্তিশালী আছে।” কেলিকে আলতো করে একপাশে ঠেলে স্ট্রেচারের হাতল শক্তহাতে তুলে নিল লোকটা।

    শরীর প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে যাবার কারণে আর বাধা দিল না কেলি। মুখ ফুটে যে একটু ধন্যবাদ জানাবে সে-ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে এখন। ও একপাশে সরে যেতেই মানুষ দুজন আরো দ্রুত গতিতে উপরে উঠতে শুরু করল । কেলিও সমান তালে চলতে থাকলো স্ট্রেচারের পাশে। ফ্যাকাসে হয়ে গেছে ফ্রাঙ্ক। শ্বাশ-প্রশ্বাসও কমে আসছে দ্রুত। স্ট্রেচারের ভার থেকে মুক্ত হওয়াতে তার সম্পূর্ন মনোযোগ ভাইয়ের দিকে এখন। সে দ্রুত স্টেথোস্কোপটা বের করে ফ্রাঙ্কের বুকে ধরলো। হৃদস্পন্দন চলছে ধীর গতিতে, ফুসফুস যেন চুপসে যাচ্ছে ক্রমশ। শরীর অসাড় হয়ে আসছে দ্রুত, হাইপোলেমিক শকের আশঙ্কা দেখা দিল কেলির মনে। রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে হবে দ্রুত। ভায়ের দিকে খেয়াল রাখতে গিয়ে সে বুঝতে পারেনি কখন সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে চলে এসেছে। ফেলে আসা সর্পিল পথটা বিক্ষিপ্তভাবে শেষ হয়েছে খোলা একটি প্রান্তে গিয়ে। এটা সুড়ঙ্গে ঢোকার প্রবেশদ্বারের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে সূর্যের আলো পড়া জায়গায় না গিয়ে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হল এমন একটি জায়গায় যেটার গঠন ফাঁপা এবং মেঝেটা বড়সড় একটা পিরিচের মত।

    চারপাশটা একবার চোখ বোলাল কেলি, খানিক আগে দেখা দেয়ালের আলো-বাতাস চলাচল করা কোটরগুলো এখানেও দেখা গেল অনেক উঁচু অবধি । বৃত্তাকার জায়গাটা একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের দূরত্ব একশো মিটারের মত হবে, যেন দৈত্যাকার এই গাছের মাঝে বিরাট আকারের এক বুদবুদের গোলক, মূল গাছ থেকে আলাদ হয়ে আছে আংশিকভাবে।

    “এই ফাঁপা জায়গাটা তো বিশাল,” কাউয়ি বলল গোলকসদৃশ জায়গাটার দিকে ইঙ্গিত করে। “এমন ফাঁকা জায়গা সাধারণত তৈরি হয় ওক বা এরকম কোন গাছে বিভিন্ন পোকা আর পরজীবির আক্রমণে।”

    তুলনাটা ভাল লাগল কেলির কাছে, তবে এই শূন্যস্থানটা কোন পোকা-মাকড়ের সৃষ্ট নয়। বাঁকানো দেয়ালজুড়ে বেশ কিছু হাতেবোনা হ্যামোক ঝুলছে, কমপক্ষে বারোটি তো হবেই, সবগুলোই আঙটাজাতীয় কিছুর সাথে বাঁধা। তার কয়েকটাতে কিছু ইন্ডিয়ান শুয়ে আছে হাত-পা ছড়িয়ে বিবস্ত্র অবস্থায়। কিছু ব্যান-আলি দেখা গেল তাদের চারপাশজুড়ে কাজে ব্যস্ত। বেশ কিছু নারী-পুরুষকে দেখা গেল বিভিন্ন রকম অসুস্থতা নিয়ে জড়ো হয়েছে। কারো পায়ে ব্যান্ডেজ, একজনের হাতে প্লাস্টার, কারো বা জ্বর । সে দেখল এক ইন্ডিয়ান তার গভীরভাবে কেটে যাওয়া বুক নিয়ে হাজির হতেই আরেক ইন্ডিয়ান দ্রুত সেখানে গাঢ় থকথকে কিছু একটা লাগিয়ে দিতেই তার আর্তনাদ মিলিয়ে গেল অনেকটা। কেলির আর বুঝতে বাকি রইলনা সে কি দেখছে-একটা হাসপাতালের ওয়ার্ড ।

    তাদেরকে এখানে আসতে বলেছিল যে বেঁটে ইন্ডিয়ানটি, সে দাঁড়িয়ে আছে কয়েক মিটার দূরে। চাহনিতে অধৈর্যের বহিপ্ৰকাশ স্পষ্ট। সে একটা খালি হ্যামোক দেখিয়ে দ্রুত কিছু বলল নিজের ভাষায়। তাদের গাইড মাথা নেড়ে সায় দিয়ে হামোকের দিকে নিয়ে গেল সবাইকে। হাটা শুরু করতেই বিড়বিড় করে কথা শুরু করল প্রফেসর। “আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে তবে ওটা ইয়ানোমামো ভাষা।”

    মুখ ঘুরিয়ে তাকাল কেলি প্রফেসরের দিকে। তার কণ্ঠে ভয় ও বিস্ময়।

    ব্যাখ্যা করা শুরু হল প্রফেসরের। “জানামতে ইয়াননামামো ভাষার কোন প্রতিপক্ষ বা সমকক্ষ আর ভাষা নেই। তাদের বাচনভঙ্গি এবং স্বরগঠন পুরোপুরিই স্বতন্ত্র, আর এটা কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। একটা সত্যিকারের নির্বাসিত একটি ভাষা। এই ইয়ানোমামোরাই যে আমাজনের সবচেয়ে প্রাচীন মানুষদের উত্তরসূরী এমনটা ভাবার পেছনে যে কারণগুলো আছে তার মধ্যে এই ভাষার ব্যাপারটা অনাতম।” দৃষ্টি যেন আরও প্রসারিত প্রফেসরের, দেখছে গোলাকৃতি এই চেম্বারের সব নারী-পুরুষগুলোকে। “ব্যানআলি নিশ্চয় ইয়াননামামোরই একটি ছোট দল, যেটা হারিয়ে গেছে সবার অগোচরে।”

    কোনমতে মাথা নাড়ল কেলি, দুশ্চিন্তায় ভরা মাথায় প্রফেসরের এই পর্যবেক্ষণকে সাদরে গ্রহণ করল সে। তার মনোযোগ এখনো নিজের ভাইয়ের দিকে।

    বেটে ইন্ডিয়ানের নির্দেশে হ্যামোকটা একটু নিচু করা হলে ফ্রাঙ্ককে সেখানে স্থানান্তর করা হল । খুব নার্ভাস ভঙ্গিতে হ্যামোকের পাশে গিয়ে দাঁড়াল কেলি, নড়াচড়ার করণে সৃষ্ট ঝাঁকুনিতে আর্তনাদ করে উঠলো ফ্রাঙ্ক, চোখের পাতা পিটপিট করে উঠলো। তার শরীরে দেয়া চেতনানাশকের তীব্রতা স্পষ্টতই কমে আসছে। কেলি দ্রুত স্ট্রেচারের উপর রাখা মেডিকেল প্যাকটা তুলে নিল। সিরিঞ্জ এবং মরফিনের বোতল বের করার আগেই বেটে ইন্ডিয়ানটি উচ্চস্বরে কাউকে কিছু একটা আদেশ দিলে তাদের গাইড এবং আরেকজন ইন্ডিয়ান মিলে ফ্রাঙ্কের দু-পায়ের ব্যান্ডেজগুলো আলগা করতে লাগলো। তাদের হাতে অস্ত্র বলতে হাড়ের ছুরি মাত্র ।

    “না, না!” চিৎকার দিল কেলি কিন্তু তার কথা কানে তুললো না কেউই তারা রক্তে ভেঁজা ব্যান্ডেজগুলো আলগা করতেই সাথে সাথে রক্তপাত শুরু হয়ে গেল। কেলি হ্যামোকের কাছে ছুটে গেল, লম্বা ইন্ডিয়ানটার কনুই ধরে তার হাতটা সরিয়ে আনতে চাইলো।

    “না! তুমি জানো না তুমি কি করছো! জায়গাটা আগে শক্ত করে বাধব আমি । একটা আইভি লাইনও দিতে হবে । না-হলে রক্তপাতে মারা যাবে সে।” ইন্ডিয়ানটা ঝাঁকুনি দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কুচকে তাকালো কেলির দিকে । এগিয়ে এলো কাউয়ি।“এই মেয়েটাই আমাদের চিকিত্সক,” কেলিকে দেখিয়ে বলল সে।

    ইন্ডিয়ানটাকে দেখে মনে হল সে যেন এ-কথা শুনে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছে । ইতস্তত করে তাদের চিকিৎসক বেটে শামানটির দিকে তাকালো । বেঁটে ইন্ডিয়ান ফ্রাঙ্কের মাথার কাছে ঝুঁকে আছে। তার হাতে একটা পাত্র । দেয়ালের একটা জায়গা থেকে চুঁইয়ে আসা আঠা সংগ্রহ করছে সে। “আমিই এখানকার চিকিত্সক,” দৃঢ়কণ্ঠে বলল, “এটা ব্যান আলিদের ওষুধ । এটাই রক্তপাত বন্ধ করবে। এটা ইয়াগার খুব শক্তিশালী ওষুধ।”

    কেলি তাকাল কাউইর দিকে।

    শব্দটার অর্থ বলতে লাগলো প্রফেসর। “ইয়াগা..শব্দটা আসলে ইয়াকার মত…ইয়ানোমামমাদের ভাষায় এর অর্থ হল মা।” চারপাশে একবার চোখ বোলাল সে। “ওরা এই গাছটির নাম দিয়েছে ইয়াগা। এটা এদের কাছে দেবতার মত।”

    ইন্ডিয়ান শামান তার পাত্রটি নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, অর্ধেকটা ভরে আছে লালচে আঠা । “শক্তিশালী ওষুধ,” আবারো বলল সে। তারপর পাত্র হাতে হামোকের কাছে এসে দাড়ালো সে। “ইয়াগার এই রক্ত, এই মানুষটির রক্তপাত বন্ধ করবে।” কথাটা মনে হল যেন মুখস্থ কোন প্রবাদবাক্য। লম্বা ইন্ডিয়ান দুটোকে আরো দ্রুত ব্যান্ডেজগুলো কেটে ফেলার নির্দেশ দিল সে।

    কেলি আবারও কিছু বলতে চাইলে কাউই তার বাহুতে চাপ দিয়ে তাকে থামিয়ে দিল । “ব্যান্ডেজ এবং এলআরএস ব্যাগ রেডি রাখো,” ফিসফিস করে কেলিকে সে বলল । প্রস্তুত থাক, কিছুই বলা যাচ্ছে না। তবে আগে দেখি এই ওষুধে কাজ হয় কিনা।”

    শান্ত হল কেলি, তার মনে পড়লো সাও গ্যাব্রিয়েলের হাসপাতালের সেই ছোট ইন্ডিয়ান মেয়েটির কথা। মুহূর্তেই চোখে ভেসে উঠল সেই দৃশ্য কিভাবে আধুনিক চিকিৎসা ব্যর্থ হয়েছিল। এক মুহূর্তের জন্য ব্যান-আলির ওপর নির্ভর করলো সে, তবে যতটা না বেটে ইন্ডিয়ানটার কাজে তার চেয়ে বেশি প্রফেসর কাউইর কথায় । চট করে নিজের মেডিকেল ব্যাগের উপর ঝুঁকে পড়ে দ্রুত আঙুল চালাতে লাগলো ওটার মধ্যে। কেলি যা খুঁজছিল তা পেতেই তার চোখে পড়লো কাছের দেয়ালে একটা নালী দিয়ে লালচে আঠা আসছে। ইয়াগার রক্ত। আঠাটা যে লতার ভিতর দিয়ে আসছে ওটা ঠিক কালো একটা ফিতার মত ঝুলে আছে উপর থেকে। আরো কিছু লতা চোখে পড়ল, প্রত্যেকটিই থেমেছে হ্যামোগুলোর কাছে গিয়ে ।

    ব্যান্ডেজের প্যাকেট হাতে কেলি তার ভায়ের পাশে দাঁড়িয়ে দেখল ব্যান্ডেজগুলো ততক্ষণে খুলে নেয়া হয়েছে। কি করবে বুঝে উঠতে পারলো না সে কোন ডাক্তার নয়, একজন বোনের দৃষ্টি নিয়েই অনুভব করছে এখন। তবে যা দেখছে তা সহ্য করা তার পক্ষে কষ্টকর। সাদা হাড়ের প্রান্তগুলো বেরিয়ে পড়েছে, ছিড়ে যাওয়া মাংশপেশীগুলো কাঁপছে যেন, গাঢ়রক্ত খানিকটা ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এসে হ্যামোক গলে মেঝেতে পড়ল। কেলি আবিষ্কার করল তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। চারপাশের কোলাহল কখনো মনে হচ্ছে অনেক দূরে, একই সাথে তীক্ষ্ণ হয়ে কানে এসে বাজছে। দৃষ্টিসীমা সংকুচিত হয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে তার সামনে পড়ে থাকা মানুষটির দিকে। মানুষটি ফ্রাঙ্ক নয়…তার মনকে এটা বলে প্রবোধ দিতে চাইলো সে। কিন্তু মনের আরো গভীরে সে জানে আসল সত্যটি-খুবই খারাপ অবস্থায় আছে তার ভাই। অশ্রুতে ভরে গেল চোখ দুটো, একটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে চাইলো, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এলো তার কণ্ঠ। এমন সময় টের পেল তার কাঁধে কাউইর হাতটা। কেলিকে সমবেদনা প্রকাশ করল সে।

    “ওহ গড…প্লিজ…”ফুঁপিয়ে উঠল মেয়েটি।

    তার এই কান্নাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে ব্যান-আলি শামানটি গভীর মনোযোগ দিয়ে ক্ষতস্থানগুলো দেখতে লাগল। তারপর সে পাত্র থেকে লালচে আঠা তুলে নিল হাতে । পোর্টওয়াইনের মত দেখতে আঠাটুকু ক্ষতস্থানে লাগাতে শুরু করল এবার। প্রতিক্রিয়াটা বেশ দ্রুত আর ভয়ঙ্কর হল। ফ্রাঙ্কের পা দুটো এমনভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলে যেন ইলেট্রিক শক দেয়া হয়েছে তাকে। চেতনাহীনতার মাঝেই কেঁদে উঠলো ফ্রাঙ্ক পশুর মত শব্দ করে ।

    কেলি হুমড়ি খেয়ে পড়ল ভায়ের উপর। “ফ্রাঙ্ক!”

    শামানটি কেলির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কিছু বলতে বলতে পেছনে সরে গেল । তাকে কোন বাধা দিল না সে। ভায়ের উপর ঝুঁকে পড়ে একটা হাত তুলে নিল কেলি কিন্তু ফ্রাঙ্কের কেঁদে ওঠার শব্দ ততক্ষণে মিলিয়ে গেছে। শরীরটা যেন আবারো নিস্তেজ হয়ে গেছে তার। কেলি বুঝতে পারল সে আর বেঁচে নেই। আরেকটু ঝুঁকে গেল সে, তারপর জোরে কাঁদতে শুরু করল। তখনই কেলি বুঝতে পারল তার ফুসফুস কাপছে, আরো গভীরে স্পন্দিত হচ্ছে পিণ্ড!

    বেঁচে আছে! পরিত্রাণের অনুভূতি নিয়ে হাটু ভেঙে বসে পড়ল সে। তার ক্ষতস্থানগুলো দৃশ্যমান হয়ে আছে এখনো তার চোখের সামনে। হয়তো খারাপ কিছু হতে চলেছে এমনটা অনুভব করে নতুন ব্যান্ডেজগুলো কাজে লাগাবে ভাবলো । কিন্তু সেগুলোর আর প্রয়োজন নেই । গাঢ় আঠাটা ক্ষতস্থানের যেখানেই লাগছে, একটা মজবুত সিল তৈরি হয়ে যাচ্ছে। বড়বড় চোখে একমুহূর্ত তাকিয়ে থেকে হাত বাড়িয়ে জিনিসটা স্পর্শ করল কেলি। বস্তুটা আর চটচটে নেই তাই হাতে লাগল না একটুও। কেমন যেন শরীরের চামড়ার মত মনে হল, আর বেশ মজবুতও। যেন প্রাকৃতিক ব্যান্ডেজ। গভীর শ্রদ্ধা নিয়ে শামানটির দিকে তাকাল সে। রক্ত পড়া বন্ধ হয়েছে, ক্ষতস্থানও মজবুতভাবে আটকে গিয়েছে ।

    “ইয়াগা তাকে যোগ্য মনে করছে,” বলল শামান। “সে সুস্থ হয়ে যাবে।”

    বিস্ময়াভিভূত কেলি উঠে দাঁড়িয়ে দেখল শামান তার ভায়ের কেটে ছিড়ে যাওয়া অন্যান্য অঙ্গেও এই বিস্ময়কর বস্তুটা লাগিয়ে দিচ্ছে পরম যত্নে।

    “বিশ্বাস করতে পারছিনা আমি,”অনেক কষ্টে বলল কেলি, একেবারে ক্ষীণস্বরে।

    কাউয়ি আবারো নিজের বাহুডোরে টেনে নিল কেলিকে আমি পনের রকমের ভিন্নভিন্ন গাছ চিনি যেগুলোর এমন ক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু এখানে যা দেখলাম তার ধারেকাছেও নেই একটা । এটাই সবচেয়ে কার্যকরী।”

    দ্বিতীয় পায়ে আঠাটা লাগাতেই ফ্রাঙ্কের শরীর কেঁপে উঠল আবার। লাগানো শেষ করে শেষবারের মত একবার নিজের কাজ পর্যবেক্ষণ করল শামান, তারপর ঘুরে দাঁড়াল তাদের দিকে। “এই ইয়াগা তাকে রক্ষা করবে,” গম্ভীর কঠে বলল সে।

    “আপনাকে অনেক ধন্যবাদ,”কেলি বলল ।

    ছোটখাট ইন্ডিয়ানটি মাথা ঘুরিয়ে তাকাল তার ভাইয়ের দিকে। “সে এখন একজন ব্যান-আলি। বেছে নেয়াদের মধ্যে একজন।”

    ভ্রু-কুটি করল কেলি।

    বলে চলল শামান। “তাকে এখন এই ইয়াগার সেবা করে যেতে হয়ে সবদিক দিয়ে, সারাটা জীবন।” এগুলো বলেই সে ঘুরে দাঁড়াল তবে সাথে আরও কিছু বলল নিজের ভাষায়, খুব ভয়ঙ্কর এবং হুমকির সুরে।

    মানুষটা চলে যেতেই প্রফেসরের দিকে ঘুরল কেলি, তার চোখে-মুখে প্রশ্ন। মাথা ঝাঁকাল প্রফেসর। “আমি একটা শব্দই বুঝলাম শুধু-ব্যান-ই।” “এটার মানে কি?” ফ্রাঙ্কের দিকে তাকাল কাউয়ি।

    “ক্রীতদাস।”

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleহেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    Related Articles

    জেমস রোলিন্স

    ব্ল্যাক অর্ডার (সিগমা ফোর্স – ৩) – জেমস রোলিন্স

    August 18, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Our Picks

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }