আমাজনিয়া – ১৬
বিশ্বাসঘাতকতা
আগস্ট ১৭, সকাল ৭.০৫
আমাজন জঙ্গল
নাথান চোখ মেলেই দেখল তার বাহুবন্ধনে কেলি। মেয়েটা দু-চোখ মেলে চেয়ে আছে ফাঁকা দৃষ্টিতে ।
“গুড মর্নিং,” বলল সে। কেলি তার দিকে তাকাল। বৃষ্টির ঘ্রাণ পেল নাথান ওর শরীর থেকে। হাসল মেয়েটি।
“এই কিছুক্ষণ আগে সকাল হল,” কঁনুইতে ভর দিয়ে শরীরটা উঁচু করল নাথান, হ্যামোকে শোয়া অবস্থায় কাজটা যদিও কঠিন তারপর সে তাকাল কেলির দিকে।
“আমাকে জাগাও নি কেন?”
“আমি ভাবলাম তোমার অন্তত একটা ঘন্টা টানা ঘুমানো উচিত।” সে খুব দক্ষতার সাথে হ্যামোক থেকে নেমে একটা কম্বল গায়ে জড়িয়ে নিল। একটা হাত বাড়িয়ে তাকে ধরতে গেল নাথান। দূরে সরে গেল সে।
“আজ অনেক কাজ পড়ে আছে আমাদের।”
একটা অসন্তোষের শব্দ করে সেও উঠে দাঁড়িয়ে খুলে রাখা পোশাকগুলো পরতে শুরু করল। প্রস্তুত হচ্ছে কেলিও। পেছনের খোলা দরজা দিয়ে বাইরে তাকাল নাথান । গতরাতে কয়েক ঘণ্টা ধরে তারা কথা বলেছে, বাবা-মা, ভাই, তার মেয়ের জীবন, সুখদুঃখ, লাভ-ক্ষতি এসব কিছু। আরও কয়েক পর্বে অশ্রু বিনিময় হয় তখন । তারপর আরও ঘনিষ্ঠভাবে কিছুটা সময় কাটিয়েছে তারা। অবশেষে একটা হামোকে চাপাচাপি করে ঘুমিয়েছে একসাথে।
পেছনের পাটাতনের দিকে এগিয়ে জঙ্গলটাকে ভাল করে দেখতে লাগল নাথান । সকালের আকাশটা একেবারে পরিস্কার গাঢ় নীল, গতরাতের ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাত অনেকক্ষণ ধরেই চলেছে, তার প্রমান এখনো গাছের পাতায় বৃষ্টি পানি লেগে আছে, পড়ছে ফোটায় ফোটায়, সূর্যের আলোতে চকচক করছে হীরার মত। তবে এটাই যে সব তা নয়।
“একটু দেখ এদিকে এসে, কেলিকে ডাকল সে। ”
খাকি পোশাকের বোতামগুলো অর্ধেকটা লাগানো হয়েছে বাকিগুলো লাগাতে লাগাতে নাথানের সাথে যোগ দিল সে। মাথা ঘুরিয়ে সে দেখল তাকে, আবারো মুগ্ধ হল তার সৌন্দর্যে । বাইরের সৌন্দর্যের দিকে চোখ পড়তেই হতবাক হয়ে গেল কেলি । “কি অপূর্ব…”।
নাথানের দিকে ঝুঁকে গেল সে, নাথানও তাকে বাহুডোরে টেনে নিল । গাছটার ওপর দিকের জলে ভেজা শাখা-প্রশাখাগুলো ছেয়ে আছে হাজার-হাজার প্রজাপতিতে। পাতা,ডালে বসে আছে কিছু, কিছু উড়ছে এদিক-ওদিক। একেকটা পাখা হাতের তালুর সমান প্রশস্ত, নীল এবং উজ্জ্বল সবুজের মিশ্রনে অসাধারন লাগছে পাখাগুলোকে।
“মরফো প্রজাতি,” বলল নাথান। কিন্তু রঙের এমন বিন্যাস আগে দেখি নি।”
বিশাল একটা প্রজাপতি উড়ে গেল ঠিক কেলির মাথার ওপর দিয়ে । চওড়া পাখায় সূর্যের আলো বাঁধা পড়ল, আর সাথে সাথে খানিক জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল রঙিন আলো। মনে হচ্ছে যেন কেউ রঙিন কাচের ছাউনি দিয়েছে গাছের ওপরে।”
হাত দুটো আরও একটু শক্ত করে ধরল তাকে। যেন চাইছে এই মুহূর্তটা আজীবনের জন্য ধরে রাখতে। কয়েক মিনিট এভাবেই তন্ময় হয়ে থাকল তারা দু-জন। নীরবতা ভাঙল নিচ থেকে ভেসে আসা মানুষের চেঁচামেচিতে ।
“আমার মনে হয়, নিচে নামা উচিত আমাদের,” অবশেষে বলল নাথান। “অনেক কাজ পড়ে আছে সামনে।”
মাথা নেড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল কেলি, তার এমন অনিচ্ছার কারণ ঠিকই বুঝল নাথান। এখানে এত ওপরে তারা সব কিছু থেকে একরকম বিচ্ছিন্ন, রাজ্যের সব দুশ্চিন্তাভয় সব কিছুই মাথা থেকে সরে গিয়েছিল সাময়িক সময়ের জন্যে হলেও। সেগুলোকে নিয়েই আবারো পাড়ি দিতে হবে অজানায়, কে-ই বা মনে করতে চায় এগুলো? কিন্তু চারপাশের জগৎ থেকে তারা তো পালিয়ে যেতে পারে না, যা করার তা করতেই হবে, বাঁচা-মরা নিয়ে এখন ভাবার পথ নেই আর ।
ধীরে ধীরে বাকি পোশাকগুলো পরে নিল তারা। ঘর থেকে বের হবে ঠিক তখন পেছনের পাটাতনের কাছে গেল নাথান । বাঁশ ও পাম বাতায় বানানো ছাপড়াটি হুক থেকে ছাড়িয়ে দিল যাতে ওটা নিচে নেমে এসে দরজাটা ঢেকে দেয়। কাজ শেষে ঘরে আসার সময় সে দেখল ওটা যথাস্থানে নেমে এসেছে। কেলি এতক্ষণ দেখল নাথান কি করছে তারপর কাছ থেকে দেখার জন্য এগিয়ে গেল তার দিকে। দরজার ওপরের কাঠের সাথে লাগানো কব্জার মত কিছু জিনিস চোখে পড়ল তার।
“আটকে গেছে, এই দরজাটা বন্ধ এখন…ঠেলে খুলতে হবে, এটা তখন কাজ করবে পাটাতনের ছাউনি হিসেবে, কি দারুণ বুদ্ধি।” মাথা নাড়ল নাথান । গতকাল সে নিজেও অভিভূত হয়ে গিয়েছিল। “এরকম কোন কিছুর ব্যবহার এখানে দেখি নি আমি, বাবাও তার নোটে এরকম বেশ কিছু জিনিসের কথা উল্লেখ করেছে । প্রাচীন গোত্রগুলোর মাঝে এই গোষ্ঠি যে অনেক বিষয়ে এগিয়ে আছে তার একটা প্রমাণ এটা, ছোটখাট কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার । সত্যি বলতে, ঠিক সাদা-মাটা এলিভেটর আবিষ্কারের মত।”
“ঠিক এই মুহূর্তে একটা এলিভেটর ব্যবহার করব আমি,” কেলি বলল পেছনের দিকটা দেখিয়ে। “এটাও তোমাকে অবাক করে দেবে। ইয়াগার কথা ভাব, গাছটা কত কিছুই না করছে মানুষগুলোকে নিয়ে।”
সশব্দে সম্মতি জানাল নাথান, তারপর আবারো নিজের জিনিসপত্র গোছগাছে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আবাক হবার মত আরও অনেক কিছুই আছে এখানে। প্রস্তুত হয়ে শেষবারের মত ঘরের ভেতরটা চোখ বুলাল সে, তারপর মূল দরজার দিকে এগিয়ে গেল যেখানে কেলি তার জন্য অপেক্ষা করছে। নিজের ব্যাগটা কেলি কাঁধে ঝুলিয়ে দিতেই নাথান তার দিকে ঝুঁকে গভীরভাবে জড়িয়ে ধরল তাকে। বেশ অবাক হল সে তখন…কেলিও যেন কিছু ফেরত দিতে চাইল নাথানকে, সমান আবেগ দিয়ে। তারা দুজন এই অভিযান শেষে কোথায় যাবে তা নিয়ে কোন কথা বলেনি একে অপরের সাথে। তারা দু-জনই জানে গতরাতের হুট করে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আসলে দুটি মনে জমে থাকা তীব্র কষ্টেরই বহির্প্রকাশ, যেন কিছুক্ষণের জন্যে একটি পরিত্রাণ । কিন্তু কালই শেষ হয়ে যায় নি সব, শুরু হয়েছে সবে। নাথান এখন দেখতে চাইছে, এই ঘনিষ্ঠতা শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যায় তাকে। আর কেলির এই আলিঙ্গন যদি একটা সূত্র হয় এই রহস্যের তবে কেলিও একইরকম ভবছে হয়তো।
বিছিন্ন হল তারা, তারপর আর কোন বাক্য বিনিময় ছাড়াই মই বেয়ে নিচের কমন রুমের দিকে এগিয়ে গেল। কমন রুমের আরও একটু কাছে যেতেই রান্না-বান্নার ঘ্রান ঘিরে ধরল তাকে। পাকস্থলিটা মোচড় দিয়ে উঠলে হঠাৎ করে তার ক্ষুধার কথা মনে পড়ে গেল। পাটাতনের মাঝে চুলা জ্বলছে, আনা এবং কাউয়ি সকালের নাস্তা প্রস্তুত করে পরিবেশনের জন্য তা সাজাচ্ছে। প্রথমেই তার চোখে পড়ল কাসাবা ময়দার রুটি ও পাথরের পাত্রে রাখা পানি।
আনা ফঙ নাথানকে দেখে একটা থালা এগিয়ে দিল । থালাটিতে আসল স্বাদের তাজা মাংস ভাজা উপচে পড়ছে । সে ওটা তুলে ধরল নাথানের উদ্দশ্যে। “বুনো শুকরের মাংস। আজ ভোরে দুই ইন্ডিয়ান নারী এই ভোজের ব্যবস্থা করে দিয়ে গেছে।”
মুখ ভিজে গেল জলে। নাথান দেখল সেখানে আরও খাবার রয়েছে, ফল, কয়েক রকম ডিম, একটা কেক, দেখতে ঠিক পাইয়ের মত ।
“তোমার বাবা কেন এখানে দীর্ঘদিন কাটিয়েছে এবার বুঝতে পেরেছি,” প্রাইভেট ক্যারেরা বলল, মুখভর্তি রুটি আর মাংস।
বাবার এমন কথা মনে করিয়ে দেয়া সত্ত্বেও সেটা তার প্রচণ্ড ক্ষুধার অনুভূতিকে ছাপিয়ে যেতে পারল না। বাকি সবার সাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। বসতেই নাথানের খেয়াল হল তাদের দলের দু-জন অনুপস্থিত।
“জেন এবং অলিন কোথায়?,”
“রেডিও নিয়ে ব্যস্ত,” কসটস বলল। “আজ সকালে অলিন জিপিএস সিগন্যাল ধরতে পেরেছে।”
বিষম খেল নাথান কথাটা শুনে। “সে ওটা সারাতে পেরেছে?”
মাথা নেড়ে সায় দিল কসটস, তারপর কাঁধ উঁচু করল অনিশ্চয়তায়। “সেটা কোনমতে সারিয়েছে, এখন কে জানে তার সিগন্যাল কারো কাছে পৌছাচ্ছে কিনা।”
ধাতস্থ হতে একটু সময় নিল নাথান এই খবরটা শুনে। আড়চোখে দেখল কেলিকে। সিগন্যালটা যদি ধরা পড়ে নতুন স্যাটেলাইটে তবে আজ রাতের আগেই হয়তো উদ্ধার করা হবে তাদের। আশার যে দীপ্তি জেগে উঠেছে কেলির চোখে তা সহজেই বুঝতে পারল সে।
“তবে রেডিও বার্তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত অন্ধকারে সুঁই খোঁজার মত ব্যাপার হবে, বলে গেল কসটস । আর যতক্ষণ না নিশ্চয়তা পাচ্ছি আমরা আমাদের নিজস্ব যা কিছু আছে। তা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাব। আজকে তোমার কাজ হল কেলি আর জেনকে সাথে নিয়ে ফ্রাঙ্ককে প্রস্তুত রাখা যাতে যেকোন সময়ে তাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়া যায়।”
“সাথে আঠা সংগ্রহ করার কাজটিও সারতে হবে,”বলল কেলি।
মাথা নেড়ে সায় দিল কসটস, মুখেল ভেতর খাবারগুলো চিবোচ্ছে শক্ত করে। “অলিন যতক্ষণ রেডিও নিয়ে কাজ করছে, অন্যরা দলে দলে ভাগ হয়ে গিয়ে দেখবে ইন্ডিয়ানদের কাছ থেকে আরও কিছু দরকারি তথ্য বের করা যায় কিনা। কয়েকজন শুধু সেই বিশেষ পাউডার খোঁজায় ব্যস্ত থাকবে।”
সার্জেন্টের পরিকল্পনা নিয়ে কোন অভিযোগ নেই নাথানের । জিপিএস হোক বা না হোক, সাবধানে যত দ্রুত সম্ভব এগিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কেউ আর কোন কথা না বলে চুপচাপ বাকি খাবারগুলো শেষ করল, তারপর একে একে ঘর থেকে বেরিয়ে নেমে পড়ল নিচের জঙ্গলে। ঘরে শুধু অলিন তার স্যাটেলাইট যন্ত্রটি নিয়ে থেকে গেল। ম্যানুয়েল এবং দু-জন রেঞ্জার গেল একদিকে, আনা আর কাউয়ি গেল অন্যদিকে। নাথান এবং কেলি গেল ইয়াগার দিকে, তাদের সাথে রিচার্ড জেন। পরিকল্পনা মত সবাই দুপুর নাগাদ ফিরে আসবে। নিজের শটগানটা হাতে নিল নাথান। সার্জেন্ট কসটস খুব জোর দিয়ে বলেছে কেউ যেন অস্ত্র ছাড়া বাইরে না বেরোয়, অন্তত একটা পিস্তল হলেও সঙ্গে রাখতে হবে। কেলি কোমরে ঝুলিয়ে নিয়েছে নাইন-এমএম পিস্তল । সদাসন্দিহান জেন নিয়েছে তার নিজের বেরেটা। এই অস্ত্রের পাশাপাশি প্রত্যেক দলকে একটা করে শর্টরেঞ্জের রেডিও দেয়া হয়েছে বাকিদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য।
“প্রতি পনের মিনিট অন্তর সবার কাছ থেকে যেন সব ঠিক আছে এমন সংকেত পাই,” কসটস বলেছিল খুব রুক্ষ্মভাবে। “কেউ চুপ থাকতে পারবে না।”
প্রয়োজনীয় সব রকম প্রস্তুতি নেয়া শেষে দলগুলো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। জংলা অঞ্চলটুকু অতিক্রম করতেই নাথানের চোখে পড়ল প্রাগৈতিহাসিক যুগের বিশাল দৈত্যাকার গাছটিকে । এটার সাদা গুঁড়িটার গায়ে জমা শিশিরবিন্দুতে সূর্যের আলো পড়ায় চকচক করছে, সেইসাথে চকচক করছে পাতাগুলোও। উঁচু ডালগুলোতে বিরাট আকৃতির ফলগুলো ঝুলছে, আকারে মানুষের বানান কুড়েঘরের ছোট সংস্করনের মত। এমন দৈত্যাকার গাছ আর কত আছে এখানে তা নিয়ে চিন্তিত নাথান । ওটার মোটা ও পেঁচান শেকড়ের কাছে পৌছাল তারা। সামনে থেকে পথ দেখিয়ে শেকড়ের ভেতরের রাস্তা দিয়ে তাদেরকে নিয়ে যাচ্ছে কেলি । খুব কাছ থেকে ওগুলো দেখার পর নাথান একটা ব্যাপার বুঝতে পারল, আসলেই অবাক করার মত। কেন এই গোত্রের মানুষগুলো এই গাছকে ইয়াগা বা মা বলে ডাকে এর প্রতিকী কারণটা তার সামনে পরিস্কার এখন। মূল শেকড়ের শাখা দুটি সমান্তরালে বেরিয়ে এসে একটু প্রসারিত হয়ে গিয়েছে দু-দিকে, ঠিক শুয়ে থাকা মানুষের দু-পায়ের মত। আর পা দুটোর সংযোগস্থলের গঠনকে তুলনা করা যেতে পারে নারীর যোনির সাথে, যে পথে সন্তান জন্ম দেয়া হয়। এই শেকড়ের গঠনটাও সেরকম, পার্থক্য শুধু আকারে। তার মানে এই রাস্তা ধরেই ব্যান-আলিদের জন্ম আর এই রাস্তা ধরেই তারা বাইরের জগতে বেরিয়ে আসে।
“এটার ভেতর দিয়ে একটা ট্রাক ঢোকানো যাবে অনায়াসে,” জেন বলল ওটার খোলা মুখের দিকে তাকিয়ে। গাছটির মূল অংশে প্রবেশ করে শরীরটা একটু কেঁপে উঠল নাথানের। ছায়াময় রাস্তাটায় পা রাখতেই নাক ধরে আসা ঐ গাছের তেলের গন্ধ ঘিরে ধরল তাকে। সুড়ঙ্গ পথটার নিচের অংশজুড়ে চারদিকে বিভিন্ন রকমের কারুকাজ, রঙের ছাপ দেখা গেল, সংখ্যায় শত শত, কিছু ছোট কিছু বড়। এই ছাপ দিয়ে কি এই গোত্রের মানুষগুলোকেই বোঝান হচ্ছে? তার বাবাও কি তাহলে এখানে হাতের ছাপ দিয়ে কিছু এঁকেছে কখনো? আর আঁকলেও কোথায় পাওয়া যাবে সেটা? “এই পথ দিয়ে, কেলি বলল সামনে থেকে।
গাছের মূল দরজাটা পেরিয়ে এখন ঢালুপথ ধরেছে তারা ওপরে ওঠার জন্য । নাথান এবং জেন তাকে অনুসরন করতেই নিল রঙের ছাপ চিত্রগুলো আর দেখা গেল না ওপরের দেয়ালের গায়ে। মসৃণ দেয়ালগুলোর ওপর চোখ বোলাল সে, তারপর তাকাল সামনে। কিছু একটা ভাবিয়ে তুলতে চাইছে কিন্তু ঠিক কি সেটা বুঝে উঠতে পারছেনা। কিছু একটা সমস্যা আছে এখানে। দেয়ালের উপরিভাগটা ভাল করে দেখল নাথান । জাইলেম এবং ফ্লোয়েম, যেগুলোর ভেতর দিয়ে গাছ তার প্রয়োজনীয় পুষ্টিরস আনা-নেওয়া করে সেগুলোও লক্ষ্য করল সে। তার চারপাশের দেয়ালজুড়ে এই গুলো অসংখ্য পরিমাণে দেখা গেল । কিন্তু নিচে ঢোকার পথে চারপাশের দেয়ালের উপরিভাগে এমন কিছু চোখে পড়েনি তার। জাইলেম ফ্লোয়েমগুলো মসৃণভাবে আর প্রবাহিত হয় নি, কেমন যেন হঠাৎ করেই থেমে গেছে, আর মসৃণ ভাবটাও নেই ওপর দিকের দেয়ালের মত। ব্যাপারটা আরও ভাল করে পরীক্ষা করার আগেই দলটা বাঁকা সুড়ঙ্গ অতিক্রম করে গেল। “বেশ খানিকটা পথ উঠতে হবে আমাদের, কেলি বলল সামনের দিকে দেখিয়ে । “রোগীদের চিকিত্সা করার চেম্বারটা একেবারে গাছের মাথায়।”
সামনে তাকাল নাথান । সুড়ঙ্গটা দেখতে মনে হচ্ছে যেন বিরাট কোনো পোকার যাওয়া আসার রাস্তা। উদ্ভিদবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার সময় সে পরিচিত হয়েছে নানা রকমের ক্ষতিকর পোকার সাথে যেগুলো গাছের ভেতর বাসা বাধে । আউটইন পাইন-বিটল, ইউরোপিয়ান এম-বারক বিল, রাসবেরি ক্রাউন-বোরার, এমন আরও কিছু পতঙ্গ আছে। যেগুলো গাছের ভেতর গর্ত করে আবাসস্থল তৈরি করে। তবে এই গাছটাকে অন্যকোন প্রাণী এমন করে দেয় নি এটা সে বাজি ধরে বলতে পারে। এটা প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়েছে, সেই পিঁপড়া গাছের মত যেটার মাঝে এমন ফাঁপা শাখা এবং সুড়ঙ্গের মত পাওয়া গিয়েছিল। এটা এক রকমের বিবর্তিত রুপ। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থেকে যায় । এই গাছের জন্ম কয়েক শ’ বছর আগে, ব্যান-আলিরা প্রথম এখানে পা রাখারও অনেক আগে। তাহলে কেন এটা এমন সুড়ঙ্গের সৃষ্টি করল একেবারে শুরুতেই? নাথানের মনে পড়ে গেল কাল রাতে সবার আলোচনার শেষে কেলির বিড়বিড় করে বলা কথাটা। কিছু একটা দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের…খুব গুরুত্ব পূর্ণ।
সুড়ঙ্গটা এখন বিভিন্ন রাস্তায় ভাগ হয়ে গিয়েছে। কিছু গিয়ে শেষ হয়েছে কয়েকটা ঘরে, আর কিছু গিয়ে মিশেছে আরও দূরের ঘরগুলোর সাথে । যেতে যেতেই নতুন রাস্তা গুনে ফেলল নাথান। কম করে হলেও সেখানে বিশটি ভিন্ন ভিন্ন রাস্তা। তার পেছনে জেন রেডিওতে জানিয়ে দিল তাদের অবস্থানের কথা। অন্য দলগুলোও ঠিক আছে জানা গেল । অবশেষে তারা সুড়ঙ্গের শেষ অবধি পৌছাল, যেখানে সমগ্র জায়গাটা বৃত্তাকার বলের মত ফুলে উঠেছে যেন, দেয়ালের গায়ে আলো বাতাস আসার জন্য কিছু গর্ত কাটা হয়েছে, তবে মূল সুড়ঙ্গটা এখনো ছায়াঘেরা।
কেলি দ্রুত তার ভায়ের দিকে এগিয়ে গেল। ছোট্ট শামানটি ঘরে দাড়িয়ে আছে পরীক্ষা করছে অন্য রোগীদেরকে। তাদের আসার শব্দে মাথা তুলে তাকাল সে। কোন সহকারীকে দেখা গেল না তার পাশে। “গুড মর্নিং,” জড়তার সাথে বলল সে ।
মাথা নেড়ে গ্রহন করল নাথান। এখানকার মানুষেরা যতটা ইংরেজি বলতে পারে। আজ তার প্রায় সবটুকুই ওর বাবার শেখানো । নাথান তার বাবার নোট পড়ে জেনেছে, এই পুঁচকে শামানটিও এক সময় ব্যান-আলিদের সাধারণমানের এক নেতা ছিল। এই মানুষগুলোর মাঝে শ্রেণী গঠন খুব একটা সুবিন্যস্ত নয়। প্রত্যেকেরই আলাদা অবস্থান এবং কাজ ভাগ করে দেওয়া, তবে একজন রাজা থাকে এদের, এমন কেউ যার সাথে সবচেয়ে বেশি ভাবের আদান প্রদান হয় ইয়াগার।
কেলি বসে পড়ল হাটু ভাঁজ করে ফ্রাঙ্কের পাশে। তার ভাই একটা খড়ের নল মুখে দিয়ে ঐ গাছেরই একটা ফলের ভেতরের রস টেনে খাচ্ছে। কেলিকে দেখে পাশে সরিয়ে রাখল তরল খাবারটা। “বিজয়ীর সকালের নাস্তা এটা,” স্বভাবসুলভ একটা হাসি দিয়ে বলল সে।
নাথান দেখল তার মাথায় এখনো রেড-সক্স ক্যাপটা আছে, আর অন্যকোন পোশাক নেই।শরীরের নিচের অর্ধেকটা ঢাকা আছে ছোট একটা কম্বল দিয়ে যেটা ক্ষতস্থান পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে বুকের অংশটা খোলা। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সেখানে কি এঁকে দেয়া হয়েছে । গাঢ় লাল রঙের সর্পিল আকারের একটা ছবি, আর মাঝে নীল রঙের হাতের ছাপ। “জেগে দেখি এই অবস্থা,” ফ্রাঙ্ক বলল নাথানের দৃষ্টি খেয়াল করে রাতের বেলা ঘুমের মধ্যে যখন ছিলাম তখনই এঁকেছে এটা, ব্যান-আলির চিহ্ন।”
শামানটি নাথানের পাশে এসে দাঁড়াল। “তুমি..উইশাওয়া কার্লের সন্তান?”
নাথান তার দিকে ঘুরে মাথা নেড়ে সায় দিল। তাদের গাইড দাখি নিশ্চিত একথা বলে দিয়েছে শামানকে।“হা, কার্ল আমার বাবা।
শামান তার কাঁধে হাত রেখে চাপড় মারল ।“সে খুব ভাল মানুষ।”
নাথান ঠিক বুঝে উঠে পারল না এ কথার কিরকম সাড়া দেবে । সে দেখল শামানের এই কথায় সে শুধু মাথা নাড়িয়ে গেল কিন্তু মনে মনে চাইছে এই পুঁচকে মানুষটিকে ছিড়ে খেয়ে ফেলতে। তার বাবা যদি ভাল মানুষই হয়ে থাকে তবে তাকে কেন মেরে ফেলা হল?
কিন্তু সে জানে এই প্রশ্নের কোন সন্তোষজনক উত্তর সে পাবে না, এই বন্য গোত্র ও তার মানুষগুলোকে নিয়ে নাথানের দীর্ঘদিনের গবেষণা এটাই বলে। এই গোত্রগুলোর মাঝে একজন ভাল মানুষকেও মেরে ফেলা হতে পারে কোন একটা নিষিদ্ধ কাজ করার জন্য, আবার কাউকে সম্মান দেখান হয় তাকে গাছের সার বানিয়ে দেবার মাধ্যমে।
ফ্রাঙ্ককে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা শেষ হল কেলির। তার ক্ষতগুলো একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন কোষের জন্ম-হারটাও অবিশ্বাস্য।”
তার এই খুশির অভিব্যক্তি সহজেই বুঝতে পারল শামানটি।
“ইয়াগা সুস্থ করেছে তাকে। জন্ম নেবে, জন্ম নেবে-” ভ্রু কুঁচকাল সে, বোঝা যাচ্ছে সঠিক শব্দটা মনে করতে পারছে না। অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে নিচের দিকে ঝুঁকে নিজের পায়ে চড় মেরে দেখাল।
কেলি শামানের দিকে অপলক চেয়ে থাকার পর নাথানের দিকে তাকাল। “তোমার কি মনে হয় এটা সম্ভব?ফ্রাঙ্কের পা-গুলো কি আবার জন্ম নেবে?”
“জেরাল্ড ক্লার্কের হাত তো গজিয়েছিল,” বলল নাথান। “তার মানে এখন আমরা জানি এটা সম্ভব।”
ঝুঁকে এল কেলি। “এই বিশেষ রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি যদি আধুনিক পরীক্ষাগারে থেকে পর্যবেক্ষণ করা যেত…”
শামানের পেছন থেকে নিচুকণ্ঠে বলল জেন, “মনে রেখ, আমরা কিন্তু একটা মিশনে এসেছি এখানে।
“কিসের মিশন?” জিজ্ঞেস করল ফ্রাঙ্ক।
খুব চুপিসারে সেটা ব্যাখ্যা করল কেলি । উজ্জ্বল হয়ে উঠল ফ্রাঙ্কের মুখ । “জিপিএসটা কাজ করছে। তাহলে তো এখনো আশা আছে।”
মাথা নাড়ল কেলি। এতক্ষণে শামান তাদের কথাবার্তায় আগ্রহ হারিয়ে অন্যদিকে সরে গেল। “সুযোগ পাওয়া মাত্রই,” ফিসফিস করে বলল জেন, “এই গাছের আঠা নিতে হবে আমাদের।”
“আমি জানি কোথা থেকে আসে ওটা,” কেলি বলল দেয়ালের গায়ে গভীর একটা চ্যানেলকে দেখিয়ে, যে চ্যানেলে আঠাটা আসে। জেন এবং নাথানকে সাথে নিয়ে কেলি একটা ফলের খোসা তুলে নিল যেগুলো তার ভাই খাবার পর ফেলে রেখেছে পাশে। তারপর সেটার ভেতরকার খড়ের নলটা ফেলে দিয়ে দেয়ালের কাছে গিয়ে কাঠের ছিপিটি সরালো চ্যানেলের মুখ থেকে। ঘন থক থকে লালচে আঠা আসতে শুরু করল ওখান থেকে। সে একটু ঝুঁকে চ্যানেলের মুখে পাত্রটা ধরল কাজটা বেশ ধীরগতির বোঝা গেল।
“দেখি, আমার কাছে দাও পাত্রটা,” বলল কেলি “তুমি ভায়ের দিকে খেয়াল রাখ।”
কেলি আপত্তি না করে নাথানের দিকে এগিয়ে গেল। “স্ট্রেচারটা এখনো এখানেই আছে দেখছি,” বলল সে, একটা হাত দিয়ে বাঁশ আর পামপাতায় বানানো স্ট্রেচারের দিকে দেখাল সে। আমরা যদি কোন সিগন্যাল ধরতে পারি, খুব দ্রুত বাকি কাজগুলো সারতে হবে।”
“আমাদের খুব…….
একটা বিস্ফোরণের শব্দ কাঁপিয়ে দিল সবাইকে। তীব্র শব্দ প্রতিফলিত হয়ে মিলিয়ে যাবার আগে ভয়ে জমে গেল সবাই। দেয়ালের উঁচু অংশের ছিদ্রগুলোর একটা দিয়ে বাইরে উকি দিল নাথান। না, এটা কোন বজ্রপাতের শব্দ নয়। আকাশ একেবারে পরিস্কার নীল । তারপর আরও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল পরপর। তীব্র গর্জনে কেঁপে উঠল গোটা এলাকা, তীক্ষ্ণ আর্তনাদ ভেসে এল দূর থেকে। সাথে শুরু হল চেঁচামেচি।
“আক্রমণ করেছে আমাদেরকে!” বিস্ময়ে হতবাক নাথান। পেছনে ঘুরে দাঁড়াতেই সে দেখল একটা পিস্তল তাক করা তার দিকে।
“কেউ নড়বে না,” বলল জেন, দেয়ালে হেলান দিয়ে। তার চোখেমুখে কাঠিন্য এবং ভয়ের অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। হাতের পাত্রটা উঁচু করে ধরল সে, আঠা ভরে উপচে পড়ছে এখন। পাত্রটা একহাতে আর অন্য হাতে বেরেটা পিস্তল । “কেউ নড়বে না।”
“তুমি কি…” মুখ খুলল কেলি।
বাধা দিল নাথান, তার আর বুঝতে বাকি রইল না কিছু। “তুমি!” কাউয়ির সন্দেহের কথা মনে পড়ল তার : অন্যদল পিছু নিয়েছে আমাদের, একজন গুপ্তচরও কাজ করছে আমাদের দলে। “তুমি একটা বাস্টার্ড । এভাবে বেঈমানি করলে আমাদের সাথে!”
ধীরে উঠে দাঁড়াল জেন। “পেছনে সরে যাও,” দৃঢ়ভঙ্গিতে পিস্তলটা ধরা তাদের দিকে।
ওদিকে ঘরের বাইরে বিস্ফোরণ অব্যাহত থাকল। সবগুলোই গ্রেনেডের শব্দ। জেনের উঁচিয়ে রাখা অস্ত্রের সামনে থেকে কেলিকে সরিয়ে নিল নাথান। তাদের পেছনে শামানটি হঠাৎ দৌড় শুরু করল দরজার দিকে, বাইরের বিস্ফোরণের শব্দে হতবিহবল সে, চোখের সামনের বিপদটা বেশি গুরুত্ব পেল না তার কাছে। একটা বিপদের সংকেত বেজে উঠল তার মুখে ।
“থাম!” ইন্ডিয়ানটার উদ্দেশ্যে চিৎকার দিল জেন।
ঘটনায় এতটাই ভড়কে গেছে সে আগন্তুকের কথাটা ভাল করে শুনতেই পেল না। একটুও থামল না। জেন অস্ত্রটা তার দিকে ঘুরিয়েই ট্রিগার চাপল। বদ্ধ জায়গায় শব্দ হল প্রচণ্ড, কানে তালা লাগার মত । কিন্তু এত তীব্রতার মাঝেও শামানের আর্তনাদ আর কান্না ঠিকই কানে এল । মাথা ঘুরিয়ে দেখল নাথান । একপাশে পড়ে আছে শামান, পেট চেপে ধরে হাফাচ্ছে সে। চেপে রাখা হাতের আঙুলের ফাক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে । ক্রোধে পুড়ছে নাথান, জেনের দিকে তাকাল সে। “বাস্টার্ড । সে তোমার কথা বুঝতেই পারে নি।”
বন্দুকটা আবারো তাক করা হল তাদের দিকে ধীরে তাদের চারপাশে একটা চক্কর দিল সে, অন্ত্র স্থির হয়ে আছে এখনো। এমনকি ফ্রাঙ্কের বিছানা থেকেও এটা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলছে, কোন ঝুঁকি নেওয়ার মধ্যে যাবে না জেন। “তুমি সারাটা জীবনই বোকা থেকে গেলে,” টেলাক্স কর্মকর্তা জেন বলল। “ঠিক তোমার বাবার মত। তোমরা দু-জনেই এটা বোঝো নি, অর্থ এবং ক্ষমতাই সব কিছু।”
“তুমি কার জন্য কাজ করছ?” থুতু ফেলে জিজ্ঞেস করল নাথান। জেন এখন দাঁড়িয়ে আছে দরজার দিকে পিঠ দিয়ে। একপাশে গুটিসুটি মেরে পড়ে আছে শামান, কাতরাচ্ছে যন্ত্রণায়।
অস্ত্র উঁচিয়ে বলল জেন, এক এক করে অস্ত্রগুলো জানালা দিয়ে ফেলে দাও সবাই।”
ঘোৎ করে উঠল নাথান, কোন কথাই শোনার ইচ্ছে নেই তার। গুলি চালাল জেন, নাথানের দু-পায়ের মাঝের কাঠ টুকরো হয়ে ছিটকে গেল এদিক সেদিক ।।
“সে যা বলল তা-ই কর,” হ্যামোক থেকেই বলল ফ্রাঙ্ক ।
ক্ষুব্ধ দৃষ্টি নিয়ে ফ্রাঙ্কের কথামত কাজ করল কেলি । সে কোমর থেকে পিস্তলটা এক টানে ছাড়িয়ে নিয়ে জানালা দিয়ে ফেলে দিল নিচে।
নাথান এখনো বুঝে উঠতে পারছে না কি করবে । শীতল একটা হাসি হাসল জেন। “পরের বুলেটটা যাবে তোমার প্রেমিকার বুকের ভেতর দিয়ে!”
“নাথান…” সতর্ক করে দিল ফ্রাঙ্ক তার বিছানা থেকে।
দাঁতে দাঁত চেপে দেয়ালের দিকে এগিয়ে গেল নাথান, দ্রুত হিসাব কষে দেখল কোনভাবে জেনের দিকে গুলি ছোড়া যায় কিনা । কিন্তু এমন কিছু করাটা এই পরিস্থিতিতে অবিবেচকের মত হবে। কেলির জীবন যেহেতু বিপদের মুখে এখন। সে বন্দুকটা ছাড়িয়ে নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিল।
মাথা নেড়ে সায় দিল জেন, সন্তুষ্ট সে । তারপর বিজয়ীর ভঙ্গিতে আরও একটু এগিয়ে গেল দরজার দিকে। “তোমরা কিছু মনে কোরো না, কেমন? আমার একটু তাড়া আছে। আমার পরামর্শ হল তোমরা তিনজন এখানেই থাক। এই মুহূর্তে এটাই উপত্যকার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। এই ধরনের বিদ্রুপাত্মক কথা শেষে জেন ছুটে গেল টানেলের ভেতর দিয়ে, মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে গেল সে।
সকাল ৮:১২
জঙ্গলের গভীরে ম্যানুয়েল দৌড়াচ্ছে প্রাইভেট ক্যারেরাকে সাথে নিয়ে টর-টর দৌড়াচ্ছে তাদের পাশেই, কান দুটো ভাঁজ হয়ে মিশে আছে মাথার খুলির সাথে । বিস্ফোরণের শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে সকালের আলো ভেদ করে, ধোঁয়ার কুণ্ডলী, ওপরে উঠে যাচ্ছে গাছপালা ছাড়িয়ে। কসটস দৌড়াচ্ছে সবার সামনে, চিৎকার করছে রেডিও মাইক্রোফানটা মুখে লাগিয়ে। “সবাই ঘরের কাছে চলে এসো, এক্ষুণি। এখানেই সবাই অপেক্ষা কর।”
“ওরা কি আমাদের লোক?” জিজ্ঞেস করল ম্যানুয়েল । “জিপিএস সিগন্যালে সাড়া দিয়ে উদ্ধার করতে এসেছে?”
ভ্রু-কুঁচকে তার দিকে তাকাল ক্যারেরা। “এত তাড়াতাড়ি সেটা আশা কর কিভাবে? আমাদেরকে ঘিরে ফেলা হয়েছে চারপাশ থেকে।”
তার কথাটা নিশ্চিত করতেই যেন তিনজনের একটা দলকে দেখা গেল সামনে, চোখে ফাঁকি দেয়া কেমোফ্লেজ পোশাক পরা সবার, একে-৪৭ ও গ্রেনেড লাঞ্চার সবার হাতে।
এক ইন্ডিয়ান ছুটে গেল দলটির দিকে, তার হাতে উদ্যত বর্শা। মুহূর্তেই সে যেন অর্ধেক মানবে পরিণত হল স্বয়ংক্রিয় বন্দুকের গুলির আঘাতে।
টর-টর এত কাছ থেকে গুলির শব্দ শুনে কৌতুহলি হয়ে উঠল, এগিয়ে গেল সামনে।
“টর-টর, ফিসফিস করে বলল ম্যানুয়েল, এক হাঁটুতে ভর দিয়ে জাগুয়ারটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল সে । কি দেরি হয়ে গেছে, বন্দুকধারীদের একেবারে সামনে গিয়ে পড়ল জাগুয়ারটা। প্রাণীটাকে দেখে তিনজনের একজন স্প্যানিশ ভাষায় চিৎকার করে বাকিদেরকে দেখাল। আরেকজন মুখ বেঁকিয়ে হাতের অস্ত্রটা তাক করল জাগুয়ারটার দিকে ।
ম্যানুয়েলও তার অস্ত্র তাক করল কিন্তু তার ট্রিগার চাপার আগেই কসটস তাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল সামনে, কাঁধের এম-১৬ হাতে নিয়েছে ততক্ষণে, মুহূর্তের মাঝেই তিনটা গুলির শব্দ হল।
ধুম! ধুম! ধুম! তিনজনেই ঢলে পড়ল পেছনে, মাথাগুলো বিস্ফোরিত হয়ে ছিটকে গেল তরমুজের মত। জমে গেল ম্যানুয়েল। আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গেছে।
“জলদি! তাড়াতাড়ি গাছের কাছে ফিরতে হবে, এক্ষুণি,” তাড়া দিয়ে বলল কসটস। “বাকি সবাই কোন সাড়া দিচ্ছে না কেন?”
সকাল ৮:২২
একটা ফার্নের ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে আছে কাউয়ি, আনাকে আড়াল করে রেখেছে সে। তাদের ইন্ডিয়ান গাইড দাখি হামাগুড়ি দিয়ে আছে তাদের পাশেই। চারজন ভাড়াটে গুন্ডার একটি দল দাঁড়িয়ে আছে তাদের থেকে কয়েক মিটার দূরেই । লোকগুলো জানে না কাছ থেকে তাদের ওপর কেউ নজর রাখছে । সার্জেন্টের কাছ থেকে নাইট-ক্যাপ গাছের কাছে ফিরে যাবার আদেশ পাওয়া সত্ত্বেও কাউয়ির সাহস হল না শত্রুদের অত কছে গিয়ে রেঞ্জারের কথার জবাব দেওয়ার। তাদের এখন কোণঠাসা অবস্থা। বদমাশগুলো দাঁড়িয়ে আছে কাউয়িদের বর্তমান অবস্থান ও গন্তব্য, ও গাছের ঠিক মাঝখানে ওদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সামনে এগোনো অসম্ভব।
কাউয়ির পেছনে দাখি উপুড় হয়ে আছে, একেবারে পাথরের মত শান্ত, কিন্তু উত্তেজনার যে প্রতিফলন চোখেমুখে দেখা গেল তা সাংঘাতিক। লুকিয়ে থাকা সময়টুকুর মাঝেই সে দেখল তার গোত্রের এক ডজনেরও বেশি নারী-পুরুষ-শিশুকে মেরে ফেলেছে হামলাকারীরা।
দূর জঙ্গল থেকে বিস্ফোরণের আরও শব্দ শোনা গেল। মানুষের চিৎকার আর গাছের ওপরের ঘর-বাড়ি ভেঙে পড়ার শব্দ ধ্বনিত হল বাতাসে। গুন্ডাগুলো পুরো গ্রামটিকেই চষে ফেলেছে। কাউয়ির দলটির এখন একটাই আশা, যদি তারা আরও গভীর জঙ্গলের ভেতরে পালিয়ে যায় তবে দূর থেকে সব কিছু পর্যবেক্ষণ করতে পারবে।
একজন সৈন্য রেডিওতে কথা বলে উঠল স্প্যানিশ ভাষায় । “ট্যাঙ্গো টিম জায়গা মতই পৌছে গেছে। চৌদ্দ নম্বর ঘাটি আমাদের দখলে এখন।” কাউয়ি অনুভব করল হাটুর নিচে কিছু একটা নড়ে উঠছে। পেছনে তাকাল সে। দাখি পাশ থেকে সরে তার জায়গায় আসতে চাইছে। মাথা নেড়ে সম্মতি দিল কাউয়ি। ইন্ডিয়ানটা একেবারে নিঃশব্দে আর দ্রুততায় জায়গা করে নিল। একটা পাতাও নড়ল না। দাখি একজন টেশারি-রিন, যার অর্থ ভুতুড়ে স্কাউট ! কোথাও যাওয়া, গোপনে নজরদারি করা এমন সব কাজ করতে হয় তাকে, আর এসবই করতে হয় একেবারে নিঃশব্দে । এখন যেমনটি করছে সে। এমনকি তার গায়ে এখন কোন রঙ মাখা না থাকলেও চারপাশের ছায়ার সাথে একেবারেই মিশে আছে সে । ইন্ডিয়ানটা এক স্থান থেকে আরেক স্থানে জায়গা বদল করতে থাকল। যেন ছায়াঢাকা এক অবয়ব ছোটাছুটি করছে নিঃশব্দে। কাউয়ি জানে, সে কি দেখছে চোখের সামনে। দাখি এখন বিভিন্ন মন্ত্র পড়ে ইয়াগার সাহায্য কামনা কছে। দলটির চতুর্দিকে একবার ঘুরে এল সে, তারপর হঠাৎই অদৃশ্য হয়ে গেল, এমনকি কাউয়িও হারিয়ে ফেলল তাকে ।
তার হাত শক্ত করে চেপে ধরল আনা ফঙ। আমাদের কি একা রেখে চলে যাওয়া হল? প্রশ্নটি যেন ভেসে উঠল মেয়েটির চোখে। কাউয়ি নিজেও জানে না উত্তরটা, তবে আবারও উদয় হল দাখি। সে হামাগুঁড়ি দিয়ে আছে। আসলে সে বসে আছে কাউয়ি এবং আনার একেবারে নাক বরাবর তবে চার আক্রমণকারীদের দৃষ্টির বাইরে। পেছন দিকে হেলে গেল দাখি, তারপর ওপরের দিকে, একেবারে শূন্যে, হাতের ছোট তীরটা তাক কল। কাউয়ি খেয়াল করল তার টার্গেটটা কোথায়। তারপর দৃষ্টি নামিয়ে আনল লোকগুলোর দিকে। তার উদ্দেশ্যটা মুহুর্তেই বুঝতে পেরে মাথা নাড়ল কাউয়ি, তারপর আনার দিকে ফিরে অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিল ইশারায় । মাথা নেড়ে সায় দিল মেয়েটি, একবার উপরে তাকিয়ে দেখে নিল খুনিগুলোকে। বুঝতে পেরেছে কি করতে হবে।
কাউয়ি সংকেত দিল দাখিকে। ইন্ডিয়ানটা সাথে সাথেই ধনুক থেকে মুক্ত করে দিল তীরটাকে। টাং করে একটা শব্দ হল, তবে শব্দটা ছাপিয়ে গেল তীরটার পাতা ভেদ করে যাবার শব্দে। লোকগুলোর সবাই ঘুরে দাখির অবস্থানের দিকে অস্ত্রগুলো তাক করল।
সেদিকে খেয়াল দিল না কাউয়ি, তার দৃষ্টি এখন আটকে আছে উপরে । বেশ উপরে ডালের ওপর ইন্ডিয়ানদের পরিত্যাক্ত ঘরের সাথেই লাগানো আছে ইন্ডিয়ানদের অন্যতম সেরা আবিষ্কার তাদের হাতে বানানো সাদামাটা এলিভেটরটি দাখির তীরের ধারাল ফলাটি এলিভেটরের লিভার হিসেবে রাখা ভারি বস্তুটার দড়িটা কেটে দিল, সাথে সাথেই আলগা হয়ে গেল বিশাল আকৃতির গ্রানাইট পাথরটি। বস্তুটা নেমে এল সশব্দে, একেবারে সরাসরি মানুষগুলোর দিকে। ওটার নিচে একজন চাপা পড়ল, মুখটা একেবারে মিশে গেল মাটির সাথে । ওপর থেকে শব্দ আসতেই সেদিকে তাকিয়েছিল সে, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
কাউয়ি এবং আনা দাঁড়িয়ে গেছে এরইমধ্যে। শত্রুদের এত কাছে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে একটা বুলেটও কারো ফসকাল না। দু-জনেই বন্দুক খালি করে ফেলল অবশিষ্ট তিনজনের জন্যে। দাখি ছুটে এল তাদের দিকে। হাতে একটা বড় ছুরি । যে-ই একটু নড়ে উঠছে তার গলাটাই কেটে ফেলছে সে। কাজটা চোখের পলকে হয়ে গেলেও বেশ বীভৎস । একটা হাত দিয়ে আনাকে নাড়া দিল কাউয়ি, ধাতস্থ করলো তাকে। দু-জনেই ফ্যাকাশে হয়ে গেছে এই ঘটনায় ।
“বাকিদের সাথে যোগ দিতে হবে আমাদের।”
সকাল ৯:০৫
অনেক উঁচুতে ঘাপটি মেরে আছে লুই, নিচের উপত্যকাটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে। এক জোড়া বায়নোকুলার গলায় ঝোলান কিন্তু তা ব্যবহারের প্রয়োজন মনে করছে না।
সামনের জঙ্গলজুড়ে ধোয়া উড়ছে, আগুন জ্বলছে অসংখ্য জায়গায়। সংকেত দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা ফ্লেয়ারও পুড়ছে সমানতালে। মাত্র একঘন্টার মাঝেই তার বাহিনী সমগ্র গ্রামটিকে ঘিরে ফেলেছে এবং ধীরে ধীরে সবাইকে কোণঠাসা করে গ্রামের মাঝখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর যেখানে তাদেরকে ধাওয়া করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেখানেই লুইর মূল টার্গেট লুকিয়ে আছে, অপেক্ষা করছে পুরস্কারও।
জ্যাক নিখোঁজ হবার পর তার জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হয়েছে লেফটেন্যান্ট ব্ৰেইল, কথা বলল লইর পায়ের কাছ থেকে। একটা ম্যাপের ওপর ঝুকে বেশ কিছু জায়গায় ক্রস চিহ্ন দিচ্ছে সে। তার দলের সদস্যরা গ্রামের একেকটা জায়গা নিরাপদে দখল করামাত্রই তাকে জানাচ্ছে আর সে ম্যাপের ঐ জায়গাটায় চিহ্ন দিয়ে দিচ্ছে। “সব আমাদের দখলে, ডক্টর । এখন শুধু শেষ কাজগুলো বাকি।”
লুই জানে স্নায়ু চাপের কারণে তার এই লেফটেন্যান্ট নিজের সীমা অতিক্রম করে ফেলছে।“রেঞ্জারগুলোর কি অবস্থা? আমেরিকানগুলোর খবরও চাই।”
‘সবাই এক জায়গায় আসছে, ঠিক যেমনটি আপনি আদেশ দিয়েছিলেন।”
“চমৎক্তার,” লুই তার পাশে অপেক্ষমান স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। সুইয়ের হাতে ছোট একটা ব্লো-গান। তার বুকের মাঝে ঝুলছে কর্পোরাল ডি-মারটিনির কুঁচকানো মাথা, ওটা ঝোলানো হয়েছে রেঞ্জারের সৈনিক নম্বর যে চেইন দিয়ে আটকানো ছিল সেই চেনের সাথে।
“তাহলে এবার সবার সাথে যোগ দেওয়া যাক, সে তার প্রিয় অস্ত্র মিনি উজি দুটো হাতে তুলে নিল। ওগুলো হাতে নিতেই কেমন যেন আরও বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মনে হল নিজেকে । “নাথান রান্ডের সাথে দেখা করার উপযুক্ত সময় এসে গেছে এখন।”
সকাল ৯:১২
“তোমার ভাই আর শামানের দিকে খেয়াল রাখ,” নাথান বলল কেলিকে। বুঝতে পারছ যে সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। “আমি জেনকে ধরছি।”
“তোমর কাছে তো কোন অস্ত্র নেই।” হাটু ভাঁজ করে বসে পড়ল সে শামানের পাশে। নাথান এবং সে ধরাধরি করে শামানকে একটা হ্যামোকে এনে শুইয়ে দিয়েছে। কেলি একটা মরফিনের সবটুকুই তার রক্তের সাথে মিশিয়ে দিয়েছে, যন্ত্রণা আর ছটফটানি থামাতে বিকল্প আর কিছুই ছিল না। পেটের ক্ষত খুব পীড়াদায়ক হয়। আর কোন উপায়ন্তর না দেখে সে এখন ক্ষতের সামনে ও পেছনে ইয়াগার আঠা দিয়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করছে।
ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠল নাথানের ভেতরটা, যেন একটা গুলি তার পেটেও ঢুকেছে। “প্রথমে আমার বাবার সাথে বেঈমানি করল সে, এখন করল আমাদের সাথে ।” রাগেক্ষোভে তার গলা কাঁপছে। সে শুধুমাত্র একটা জিনিসই চায়-এই বেঈমানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিশোধ নেবার একটা সুযোগ।
ফ্রাঙ্ক কথা বলল তার হ্যামোক থেকে। “কি করতে চাচ্ছ তুমি এখন?” মাথা ঝাকাল নাথান। “চেষ্টা করতেই হবে আমাকে।”
বেরুবার দরজার দিকে পা বাড়াল সে। দূরের বিস্ফোরণের শব্দ কমে এসেছে অনেকটাই, তবে সেখানে জায়গা করে নিয়েছে গোলাগুলির শব্দ। গুলির শব্দের সংখ্যা যত কম হবে ততই স্পষ্ট হবে, গ্রামের মানুষ খুব দ্রুতই কমে আসছে। নাথান ভালই জানে, এর বদলা নেওয়া সব নয় যদি বিশেষ কিছু না করতে পারে তারা । কিন্তু কি করবে? দরজা দিয়ে বের হয়েই প্রথমে চারপাশটা ভাল করে দেখে নিল সে, তারপর ছোটা শুরু করল। দ্রুত গতিতে ঘুরে দেখছে প্রতিটি বাঁক। নাথানের মনে পড়ে গেল ব্যান-আলিদের সর্পিল আকৃতির প্রতীকটার কথা। এই পেঁচানো সুড়ঙ্গটা কি ঐ প্রতীকটাকেই নির্দেশ করে? নাকি এটা কেলির দেখানো সেই বিশেষ পেচানো প্রোটিনের মডেল যেটাকে বলা হয়েছিল বিশেষ এক ধরনের প্রিয়ন? যদি প্রিয়নের গঠনটা এই ইয়াগার টানেলকেই নির্দেশ করে তবে প্রতিটি পেঁচানো বাঁকের শেষে যে হেলিক্সগুলো আছে সেগুলো ঠিক কিসের নির্দেশ করে? হেলিক্সগুলোর একটা কি বোঝাচ্ছে হাসপাতালের ঘরটিকে? তাই যদি হয়, তাহলে বাকি হেলিক্সগুলো কি বোঝাচ্ছে? আর নীল রঙের হাতের ছাপটিরই বা অর্থ কি? নাথানের মনে পড়ল এই সুড়ঙ্গে ঢোকার পথে দেয়ালে হাতের কিছু ছাপ দেখেছিল সে। মাথা দোলাল সে। এসবের অর্থ কি?
একটা বাঁক দৌড়ে পার হতেই এক ইন্ডিয়ানের লাশের সাথে পা লেগে গেল তার। কোনমতে ভারসাম্য বজায় রেখে করে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পেল। নিজেকে সামলে নিয়ে ভাল করে দেখতেই মৃত মানুষটার বুকে বুলেটের একটা গর্ত দেখতে পেল সে। দ্বিতীয় গুলিটা মাথার পেছনে করা হয়েছে। সামনে তাকাল নাথান, সেখানে আরও একজন পড়ে আছে, বাঁকের মাঝে থাকার জন্য শুধু নিথর পা জোড়াই চোখে পড়ল তার।
“জেন।”
নাথানের রক্ত ফুটছে টগবগ করে । বেঈমানটা নিরস্ত্র মানুষগুলোকে এক এক করে মেরেছে, শামানের সেবা যারা করতে পারত তাদের সবাইকেই শেষ করে দিয়ে বেরিয়ে গেছে বাইরে। শালার কাপুরুষের বাচ্চা!
সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে ছুটছে নাথান, সাথে হিসাব রাখছে বাঁ-দিকের খোলা মুখগুলোর। যখন একেবারে শেষের অংশে পৌছাল, একটা ছোট ঘরের ভেতর দিয়ে বাইরে আসতে হল তাকে। নিজেকে আবিষ্কার করল প্রায় পাঁচটি পুরু একটা শাখার ওপর । আবার ছুটতে শুরু করার আগে নিচের পরিস্থিতিটা একটু দেখে নিতে চাইল সে। এখানে আগুন জ্বলছে, ধোঁয়ায় ভরে গেছে খোলা জায়গাটা। গাছটার চারপাশ থেকে বেশ কিছু ইন্ডিয়ান ছুটে আসছে, তাদের কাছে মায়ের মত এই ইয়াগার দিকে, নিরাপদ আশায় । কিছুক্ষণের মধ্যে ভয়ঙ্কর এক নিরবতা নেমে এল গ্রাম জুড়ে।
গাছের বিশাল শাখাটির প্রান্ত ধরে কিছুটা এগোলো নাথান, কিন্তু তাদের অস্থায়ী ক্যাম্প ধরে রাখা নাইট-ক্যাপ ওক গাছটাকে দেখা গেল না ভাল করে। শাখাটা আসলে অন্যদিকে, নাথানের ক্যাম্পের প্রায় বিপরীত দিকে । এমনকি ওপর থেকে ইয়াগায় ঢাকার মূল প্রবেশ পথটিকে ভালভাবে দেখতে পেল না সে। ধ্যাত! নিচ থেকে পিস্তলের গুলির শব্দ এল । জেন! গাছটির একপাশ থেকে চিৎকার ভেসে এল এবার । কাপুরুষটা সম্ভবত টানেলের শেষপ্রান্তে ঘাপটি মেরে আছে, কাছে আসা মাত্রই হত্যা করছে কোন ইন্ডিয়ান । নাথান জানে হারামিটার কাছে যে পরিমাণ গোলা-বারুদ আছে তা দিয়ে মানুষগুলোকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে অনেকটা সময় পর্যন্ত । নাথান দেখল নিচের কিছু মানুষ দৌড়ে পালাচ্ছে ঘন জঙ্গলের দিকে।
মোটা ডালের ওপর দিয়ে সাবধানে হাটার সময় তার পায়ের পাতায় কুণ্ডলী পাকানো দড়ি আটকে গেল। দড়িটা শাখার ওপরেই রাখা। নিচু হয়ে দেখল ভাল করে নাথান । কোন দড়ি না ওটা-একটা আঙ্গুর লতার মই । আগুন লাগলে জরুরি নির্গমনের ব্যবস্থা এটা, আপন মনে বলল সে। একটা বুদ্ধি ঝলক দিয়ে উঠল মনে, একটা পরিকল্পনা দানা বাঁধল তার মাথায়। উত্তেজনা মিলিয়ে যাবার আগেই লতানো মইটা ফেলে দিল ওপর থেকে। হুস করে সেটা নেমে গেল দ্রুত, যখন থামল তখন ওটার শেষ প্রান্তটি মাটি থেকে তিন ফিট ওপরে মাত্র । ভ্রমণটা বেশ দীর্ঘই হবে, কিন্তু জেন যদি নিচে থেকে থাকে তাহলে তার চোখ ফাঁকি দিয়ে তার কাছে পৌছান যেতে পারে। আর কোন পরিকল্পনা না করে নাথান ঝুলে পড়ল মই ধরে, নামছে দ্রুতগতিতে মাটির দিকে। তার দল এবং অবশিষ্ট ইন্ডিয়ানরা যদি এখান থেকে পিছু হটে যায় তবে তারা আরও রক্ষণাত্মক অবস্থানে চলে যাবে। তবে তেমন কিছু ঘটে যাবার আগেই জেনকে শেষ করে দিতে হবে। মইয়ের শেষপ্রান্তে পৌছে লাফিয়ে মাটিতে নামল নাথান। লম্বা শেকড়গুলো তার চারপাশজুড়ে ওপরে উঠে গেছে। তার একমুহূর্ত সময় লাগল চারপাশটাকে বুঝতে। জলের ধারাটা তার ঠিক পেছনে বাঁ-দিকে বয়ে গেছে। মনে হল টানেলে ঢোকার পথটা যদি মিনিটের কাঁটা হয় তবে সে এখন আছে চার-এর ঘরে। ফোর-ও-ক্লক পজিশন প্রবেশপথটা এখন তার থেকে চার ধাপ দূরে। সে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে ঘোরা শুরু করল গুঁড়ির চারপাশে।
থ্রি-ও-ক্লক……টু-ও-ক্লক ।
জঙ্গলের কোন এক স্থান থেকে স্বয়ংক্রিয় বন্দুকের গুলি ছোঁড়ার শব্দ ভেসে এল। আরও একটা গ্রেনেড ফাটল। বোঝাই যাচ্ছে, গ্রামের কিছু অংশে মারামারি এখনো শেষ হয় নি।শব্দগুলোকে কাজে লাগিয়ে গুঁড়িটার গা ঘেঁষে আরও একটু দ্রুত এগোলো নাথান। অবশেষে প্রবেশমুখে ছড়িয়ে থাকা পেঁচানো শেকড়গুলো চোখে পড়ল তার। গুঁড়ির গায়ে মিশে দাঁড়াল নাথান । শেকড়ের অপর প্রান্তে অবস্থান করছে জেন কিন্তু এখান থেকে ঐ পর্যন্ত পৌছানোটাই সবচেয়ে কঠিন। আরও একটা গুলি ছোঁড়ার শব্দ এল জেনের ঘাটি থেকে। ভ্রু কুঁচকে নিজের শূন্য হাত দুটোর দিকে তাকাল সে।
“এবার কি করবে, মি. হিরো?”
সকাল ৯:৩৪
এক হাটুতে ভর দিয়ে বসে আছে জেন, পিস্তলটা তাক করা বাইরের দিকে। এতগুলো মানুষ মারার পর একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, তাই পিস্তলটা এক হাত থেকে অন্য হাতে চালান করল, তবু হাল ছাড়বে না সে। বিশেষ করে বিজয় যেহেতু একেবারেই নিকটে এসে পড়েছে এখন । আর অল্প কিছুক্ষণ অপেক্ষা, তারপর এই মিশনে তা হয়ে যাবে।
চোখের কোণা দিয়ে বিস্ময়কর আঠাভরা পাত্রটা দেখে নিল । শত-শত কোটি ডলারের ব্যবসা হবে ওটা দিয়ে। যদিও সেই সেভিস ফার্মাসিউটিক্যাল এরইমধ্যে জেনের সুইস ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে বেশ মোটা অংকের টাকা জমা করে দিয়েছে তার সহযোগীতার জন্য, তারপরও চূড়ান্তভাবে তার দলের সাথে বেঈমানি করার বিনিময়ে তাকে সামগ্রিক ব্যবসার এক চতুর্থাংশ লভ্যাংশ দিতে রাজি হয়েছে তারা। ইয়াগার আঠার যে অবিশ্বাস্য ক্ষমতা আছে তাতে ডলারের বন্যা বয়ে যাবে তার জীবনে। জিহ্বা দিয়ে ঠোট দুটো ভেজাল সে। তার নির্ধারিত ভূমিকার ইতি টানা হবে খুব শীঘ্রই। কয়েকদিন আগে তাদের দলের যোগাযোগ করার কম্পিউটাৱে ভেতর ভাইরাস ঢুকিয়ে দিয়েছিল সফলভাবে। এখন খেলার চূড়ান্ত অংশটুকু বাকিগতরাতের শেষে, লুই ফ্যাভ্রি তাকে নির্দেশ দিয়েছে জীবন দিয়ে হলেও ইয়াগার আঠার নমুনা সংগ্রহ করে রাখতে।
“ইন্ডিয়ানদের যদি দেখ, ওরা কাউকে দিয়ে আত্মঘাতী কিছু করাচ্ছে,” বলেছিল লুই, “যেমন ধর নিজেদের গোপন বিষয়গুলো ছাড়া না করার জন্য দেখা গেল ইয়াগাতে আগুন লাগিয়ে ওটাকে শেষ করে দিতে চাইল, এমনটা যদি হয় সেক্ষেত্রে তুমি আমাদের একমাত্র ভরসা।”
সম্মত হয়েছিল জেন তবে অপরিচিত এই ভাড়াটে খুনির দৃষ্টি এড়িয়ে জেন তার নিজের জন্যেও একটা অংশ সরিয়ে রাখছে । আশেপাশে একটু চোখ বুলিয়ে খোলস থেকে কিছু আঠা বের করে একটা কনডমের ভেতর ঢুকাল জেন, তারপর এটার মুখ ভালভাবে বন্ধ করে মুখে পুরে গিলে ফেলল! নিজের জন্য অতিরিক্ত একটা ইস্যুরেন্স, ভাবল সে।
যেকোন রকমের বিশ্বাসঘাতক এবং টেলাক্সের মত প্রতিযোগী ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এই বিস্ময়কর ক্ষমতাসম্পন্ন বস্তুটাকে নিজের করে নিতে চাইবে সেন্ট সেভিসকে পেছনে ফেলে। দূর জঙ্গলের ভেতরে কিছু গোলাগুলি হল। কিছু বন্দুকের মুখ জ্বলে উঠতে দেখল সে। ফাঁসের দড়িটা টানা শুরু করেছে লুইসের বাহিনী। আর বেশি বাকি নেই খেলা শেষ হতে । এটা সত্য প্রমাণ করতেই যেন একটা গ্রেনেড বিস্ফোরণ হল কাছেই। বিশাল একটা গাছের মাথায় একটা ঘর উড়ে গেল মুহূর্তে। ডাল আর লতাপাতা ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। জেন একটু হাসল, ঠিক তখনই গ্রেনেডের শব্দ মিলিয়ে যাবার আগেই একটা চিৎকার ভেসে এল কানে। খুব কাছ থেকেই।
“সাবধান, গ্রেনেড!”
কিছু একটা উড়ে এসে গুড়িটার ওপরে, জেনের মাথা থেকে একটু উপর দিয়ে এসে পড়ল পেচানো শেকড়ের মধ্যে।
গ্রেনেড! বুকটা কেঁপে উঠল তার। একটা চিৎকার দিয়ে লাফ দিল সে একপাশে। মেঝেতে পড়েই গড়িয়ে দিল শরীরটা, হাত দুটো দিয়ে মাথাটা ঢেকে দিল। উত্তেজনার কয়েকটি সেকেন্ড পার হবার পরও কাঙ্খিত বিস্ফোরণ হল না। খুব সতর্কতার সাথে মাখা থেকে হাত সরালো জেন, দাঁতে দাঁত চেপে আছে সে। উঠে বসল অবশেষে, ধীরে ধীরে হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশমুখের দিকে এগিয়ে এল, চারপাশে চোখ বুলাতেই চোখে পড়ল মাটির ওপর ছোট নারকেল আকৃতির একটা ফল পড়ে আছে। এই গাছেরই অপরিপক্ক ফল এটা। হয়তো ওপরের কোন ডাল থেকে পড়েছে। “ধ্যাত্ শালা!”এটাকে ভয় পেয়ে নিজেই লজ্জা পেল সে। সোজা হয়ে বসল জেন, অন্ত্র তাক করল সামনে, তারপর আগের জায়গায় ফিরে গিয়ে বসে পড়ল পজিশন নিয়ে । একটা ছায়া সরে গেল। শক্ত কিছু একটা এসে তার কজিতে আঘাত করল। মুহূর্তেই ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠতেই হাত থেকে পিস্তলটা ছিটকে সরে গেল দূরে। পেছনের দিকে পড়তে শুরু করল সে কিন্তু তার আগেই তার হাত ধরে ফেলল সম্পূর্ন আড়াল থেকে ছুটে আসা মানুষটি। জোরে ধাক্কা দিয়ে দরজার বাইরে ছুড়ে ফেলা হল তাকে। তার কাঁধ আছড়ে পড়ল মাটিতে। একটু ঘুরে পেছনে তাকাল সে। যা দেখল তা এক্কোরেই অসম্ভব। “রান্ড? কিভাবে?”
নাথান তার দিকে এগিয়ে গেল, যেন উঁচু কোন স্তম্ভ ঢেকে ফেলতে চাইছে দরজার মুখে পড়ে থাকা মানুষটিকে, তার একহাতে একটা মোট ভাঙা ডাল, ওটা সে উঁচু করে ধরল ভয়ঙ্করভাবে। ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে একটু পেছনে সরে গেল জেন।
“কিভাবে?” জিজ্ঞেস করল সে। “আমার ইন্ডিয়ান বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া ছোট্ট একটা শিক্ষা-পাওয়ার অফ সাজেশন এটার নাম,” অপরিপক্ক ফলটায় একটা লাথি দিয়ে জেনের দিকে ঠেলে দিল সে। “কোন কিছুকে গভীরভাবে বিশ্বাস কর, দেখবে অন্যরাও বিশ্বাস করতে শুরু করবে।”
নিজের পায়ে ভর দিয়ে সোজা হতে চাইল জেন সঙ্গে সঙ্গে শপাং করে ব্যাট চালানোর মত বাড়ি বসিয়ে দিল তার কাঁধে। ধপ করে উপুড় হয়ে পড়ে গেল সে।
“এটা দিলাম শামানকে কুকুরের মত গুলি করার জন্য,” হাতের লাঠিটা আবারো ওপরে তুলল নাথান। “আর এটা দিলাম-”
নাথানের পেছনে উঁকি দিল জেন “কেলি! থ্যাংক গড।”
চমকে উঠে পেছনে ঘুরে দেখল নাথান। তার এই একমুহূর্তের দৃষ্টি সরে যাবার সুযোগ নিয়ে এক ঝটকায় পায়ের ওপর ভর দিয়ে সামনের দিকে দৌড় দিল জেন । একটা শব্দ শুনে পেছনে তাকাতেই নাথান দেখতে পেল ততক্ষণে জেন দৌড়ে পালাচ্ছে মোটা শেকড়ের জংলার ভেতর দিয়ে।
“দৌড়াবি না, বানচোত!” লাঠি হাতে নিয়েই দৌড় দিল নাথান তার পিছু। রাগে পুড়ে যাচ্ছে ভেতরটা। জেন গাছের গুড়ির পাশ দিয়ে দৌড়ে পেঁচানো শেকড়ের দিকে যাচ্ছে । বেঈমানটা সহজেই ওখান থেকে পালিয়ে যেতে পারবে। নাথান একবার ভাবল ফিরে গিয়ে জেনের অস্ত্রটা নিয়ে আসবে, কিন্তু তা করতে গেলে দেরি হয়ে যাবে । বদমাশটাকে আর পাওয়া যাবে না।
ওদিকে জেন শেকড়ের ভেতর দিয়ে একেবেঁকে, হাঁচড়ে পাঁচড়ে ছুটে চলেছে। তার ভাগ্যটাও বলতে গেলে দারুণ । নিজের শরীরটা হালকা-পাতলা আর আকারে খাটো হওয়ায় খুব সহজেই একেবেঁকে শেকড়গুলোর মাঝ দিয়ে যেতে পারছে। বেগ পেতে হচ্ছে নাখানকে। একটু কাছে আসামাত্রই সে খুব চেষ্টা করছে জেনকে ধরার, কখনো হামাগুড়ি দিয়ে, কখনো লাফিয়ে, কখনো নিচু হয়ে কি জেন হাত ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছে বার বার পেঁচানো গোলকধাধা থেকে।
অবশেষে শেকড়গুলো শেষ হল। দু-জনেই হুমড়ি খেয়ে পড়ল খোলা এক পথের মাঝখানে। দৌড় দিল জেন, রাস্তাটা ধরে। একটা গালি দিয়ে তার পিছু নিল নাথানও। একটু এগোতেই পানিপ্রবাহ চোখে পড়ল । আঁকাবাকা পথ ধরে আরও একটু দৌড়াতেই নাথান দেখল পথটা গিয়ে মিশেছে একটা বড়সড় জলাশয়ে, রাস্তাটা এখানেই শেষ।
হাসল নাথান। তোর খেলা শেষ, জেন। জলাধারের কাছে আরও । সামনে থাকা মানুষটাও বুঝল নাথান তাকে কোণঠাসা করে ফেলছে, প্রায় ধরে ফেলেছে তাকে কিন্তু পরাজয়ের আর্তনাদের পরিবর্তে নাথান শুনতে পেল বিজয়ীর হাসি।
একপাশে একটু সরে গিয়ে জেন মাটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার খুব কাছেই নাথান। দ্রুত ঘুরে গেল জেন তার দিকে, হাতে একটা বন্দুক। একটা নাইন এমএম বেরেটা। হতবিহ্বল হয়ে গেল নাথান, একটু সময় লাগল তার এই অবিশ্বাস্য ব্যাপারটা হজম করতে। তার পরেই নিজের শটগানটাও দেখতে পেল, খুব কাছেই শেকড়ে ওটার ফিতাটা আটকে ঝুলছে । জেনের হাতের পিস্তলটা আসলে কেলির। গাছের ওপর থেকে নাথান ও কেলিকে ওগুলো ফেলে দিতে বাধ্য করেছিল জেন। আর্তনাদ করে উঠল নাথান । সৃষ্টিকর্তা সহায় হচ্ছে না তার । শটগানটার দিকে এক পা বাড়াল সে, কিন্তু জিহ্বা দিয়ে চুকচুক একটা শব্দ করল জেন।
“আর এক ইঞ্চি এগোলেই কপালে তিন নম্বর চোখ বানিয়ে দেব।”
সকাল ৯:৪৬
আনাকে এক রকম নিজের পেছনে তাড়িয়ে নিয়ে ছুটছে কাউয়ি। চারপাশে রাইফেলের গুলির শব্দ কমে এসেছে। ভাবলেশহীন মুখে নেতৃত্ব দিচ্ছে দাখি, একেবারে একজন স্কাউটের মতই। এক নিরব নিশ্চয়তা ফুটে উঠেছে তার অভিব্যক্তিতে, অভিভাবকের মত তাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নাইট-ক্যাপ ওক গাছের দিকে। বাকি রেঞ্জারদের সাথে দেখা করা দরকার তাদের। যতটা সম্ভব ভাল কোন পরিকল্পনা করতে হবে সবাই মিলে।
কাউয়ি এরইমধ্যে কসটসের সাথে যোগাযোগ করতে পেরেছে, জানিয়ে দিয়েছে তাদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে । সে এটাও জেনেছে একা রেখে আসা অলিনও যোগাযোগ করেছে কসটসের সাথে । রাশান রেঞ্জারটা নিজেকে নিরাপদেই লুকিয়ে রাখতে পেরেছে গাছের ওপর ঘরগুলোর মাঝে। কিন্তু এখন পর্যন্ত নাথানের দলের কাছ থেকে কোন সাড়া-শব্দ পাওয়া যায় নি। মনে মনে প্রার্থনা করল সে তাদের জন্য।
অবশেষে সূর্যের আলো দেখতে পেল কাউয়ি। সেই খোলা জায়গা। তার দলটি গাছটিকে প্রদক্ষিণ করছে দক্ষিণ দিক থেকে, ঝোপ-ঝাড়ের আড়ালে থেকে। কসটসের বার্তা অনুযায়ী তারা উত্তর দিক থেকে ফিরে আসছে।
গতি কমিয়ে দিল দাখি, নিচু হয়ে এগুচ্ছে সে। আনা এবং কাউয়ি যোগ দিল তার সাথে। ঝোপের আড়াল থেকে কাঠের ছোট ঘরটা দেখতে পেল কাউয়ি। বুঝতে পারল, ঠিক কোন দিকে তাদের অবস্থান, কোন দিকে যেতে হবে তাদের। ইন্ডিয়ানটার দেখানো দিকে তাকাল সে। তাদের গন্তব্য নাইট-ক্যাপ ওক গাছটা তাদের থেকে সামনে মাত্র কয়েকশ ফিট দূরে । কিন্তু দাখি ঠিক এটা দেখাচ্ছে না। বিশাল ওক গাছটা ছাড়িয়ে আরও সামনে, কাউয়ি দেখল ম্যানুয়েলের জাগুয়ার টর-টর সামনের খোলা জায়গা ধরে দৌড়ে আসছে। জাগুয়ারটার গতি অনুসরণ করতেই ওটার পেছনে থাকা মানুষগুলোও দেখতে পেল সে। দু-জন রেঞ্জার, সাথে ম্যানুয়েল । ফিরে আসতে পেরেছে তারা।
আনা আর কাউয়িকে সাথে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল দাখি। খুব দক্ষতার সাথে গতি বাড়িয়ে এগিয়ে গেল ওরা তিনজন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দল দুটি গাছের নিচে মিলিত হলে সার্জেন্ট কসটস এগিয়ে এসে কাউয়ির কাঁধে চাপড় মারল। আনা জড়িয়ে ধরল ম্যানুয়েলকে।
নাথানের কোন খবর আছে?” জিজ্ঞেস করল কাউয়ি ।
মাথা দোলাল সার্জেন্ট, তারপর গাছের উপরে ঘরের দিকে দেখাল। “অলিনকে তার জিপিএসের যন্ত্রপাতি গুছিয়ে নিয়ে আমাদের সাথে যোগ দিতে বলেছি।”
“কেন? আমি তো ভেবেছিলাম ঘরে গিয়ে সবার স্বার্থে আলোচনা হবে।”
“কাজটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে । যতটা বুঝতে পারছি, আমাদের ঘিরে ফেলা হচ্ছে। সবদিক দিয়ে, তাই গাছে থাকাটাই নিরাপদ নয়।”
বিরক্তির অভিব্যক্তি করলেও কাউয়ি শেষ পর্যন্ত বুঝল হামলাকারীরা পর্যায়ক্রমে সব ঘর-বাড়িই গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। তার মানে কোন ঘরে থাকার অর্থ হল ফঁদে আটকে পড়া।
“তাহলে কি করব আমরা?”
“এখান থেকে বেরিয়ে পড়ব। তারপর ওদেরকে খব সাবধানে একবার অতিক্রম করে যেতে পারলে আমাদেরকে আর খুঁজে পাবে না ওরা।”
এক নজরে সময়টা দেখে নিয়ে সবার আরেকটু কাছে এগিয়ে এল ম্যানুয়েল। “সার্জেন্ট একটা নাপাম বোমা রেখে এসেছে পেছনের জঙ্গলে, টাইমার সেট করা হয়েছে, পনের মিনিটের মধ্যে ওটা ফাটবে।” “মনোযোগটা অন্য দিকে নেবার জন্য, সার্জেন্ট কসটস বলল । নিজের প্যাকটা পিঠে ঝুলিয়ে নিল সে। আর যদি প্রয়োজন হয় তাহলে আরও ব্যবহার করা যাবে, যথেষ্ট আছে।”
“এ-কারণেই নাথানের জন্য অপেক্ষা করতে পারছি না আমরা,” বন্ধুর চোখের ভাষা পড়ে নিয়ে বলল ম্যানুয়েল।
ইয়াগার দিকে তাকিয়ে আছে কাউয়ি। গুলির শব্দগুলো দূরে চলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, ঠিক তাদের সময়ের মত। যদি কোন সুযোগে থেকেই থাকে তবে সেটা কাজে লাগাতে হবে এখনই। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাথা নাড়ল কাউয়ি, নতুন পরিকল্পনাটি মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোন পথ নেই ওদের। মাথার ওপরে লতানো মইটা নড়ে উঠল। ওপরে তাকাল সে। অলিন নেমে আসছে নিচে, তার রেডিও প্যাকটা পিঠে ঝোলানো।
হাতের এম-১৬টা দোলাল কসটস। “লেটস গেট রেডি টু-“
বিরাট বিস্ফোরণ হল সঙ্গে সঙ্গে। বসে পড়তে বাধ্য হল সবাই। কাউয়ি মাথা ঘুরিয়ে দেখল ঘরের ছাদটা উড়ে গেছে শুকনো পাতার মত । ছিন্নভিন্ন টুকরোগুলো তীব্র বেগে ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। কাঠের বড় একটা টুকরো ছুটে গেল মাথার ওপর দিয়ে, দূর্গের ফটক ভাঙার জন্য ব্যবহার করা ব্যাটারিং র্যামের মত জঙ্গল ভেদ করে চলে গেল অনেকটা দূর পর্যন্ত। ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল বাইরে।
এটা কোন গ্রেনেড বিস্ফোরণ নয়। ধোঁয়ার ভেতর থেকে একদল সৈন্য এগিয়ে এল অস্ত্র উঁচিয়ে। পরপর দুটো বিশেষ জিনিস চোখে পড়ল কাউয়ির। প্রথমটা, সবার সামনে হাটতে থাকা এক বিবস্ত্র নারী। সে হাটছে দীর্ঘকায় এক ভদ্রলোকের হাত ধরে। লোকটার আপদমস্তক সাদা পোশাকে মোড়া। কিন্তু দ্বিতীয়টা দৃশ্যত আরও বেশি ভয়ঙ্কর, যেটা বহন করছে তাদের একজন সৈন্য । লোকটা হাঁটু ভর দিয়ে বসে লম্বা কালো নল তুলে ধরল কাঁধের ওপর। কাউয়ি এই অস্ত্রটিকে এর আগেও বহুবার দেখেছে হলিউডি ছবিতে। “রকেট লঞ্চার।” ক্যারেরা চিৎকার দিয়ে উঠল লুইর পেছন থেকে। “নিচু হও সবাই।”
সকাল ১০:০৩
প্রথম বিস্ফোরণটা জমিয়ে দিয়েছে নাথান ও জেন দুজনকেই। শত্রুর অস্ত্রের দিকে মনোযোগ নাথানের। মাত্র কয়েক ফিট দূরেই অস্ত্রটা তাক করা তার বুক বরার, তাই নড়ার সাহস হল না। তাই শাসরুদ্ধ হয়ে আছে সে। ওদিকে কি ঘটছে কে জানে?
দ্বিতীয় বিস্ফোরণটা হতেই শব্দের উৎসের দিকে ঘুরে গেল জেন । নাথান জানে এমন সুযোগ আর আসবে না তার। এখনই কিছু করতে না পারলে সে মারা পড়বে। কিছু একটা করতেই হবে…হোক সেটা বোকার মত কিছু ।
শূন্যে লাফ দিল নাথান, তবে জেনের উদ্দেশ্যে নয়, তার মনোযোগ শেকড়ের সাথে ঝুলতে থাকা শটগানটার দিকে। তার এমন নড়াচড়া দৃষ্টি এড়াল না জেনের। নাথান শুনতে পেল তার শত্রুর অস্ত্রটা গর্জে উঠেছে, সাথে সাথেই তীক্ষ কিছু একটা বিধল তার উরুতে । সে অনুভব করল, তবে পাত্তা দিল না। তার শরীরটা আছড়ে পড়ল শেকড়ের ওপর, হাত দুটো বাড়িয়ে দিল শটগানের দিকে। ওটা ছাড়িয়ে নেবার সময় নেই তার, ঝুলন্ত অস্ত্রটাই জেনের দিকে ঘুরিয়ে ট্রিগার চাপল সে। বুলেটের প্রতিঘাতের অস্ত্রটা তার হাত থেকে ছুটে যেতে চাইল। একটু সরে ঘুরে গেল নাথান । জেনকে পেছন দিকে পড়ে যেতে দেখল সে, বাহু দু-দিকে প্রসারিত হয়ে আছে। নিজেকে সামলানোর শক্তিটুকু হারিয়ে পেছনের জলাশয়ের পানিতে গিয়ে পড়ল চিৎ হয়ে। ঝপ করে একটা শব্দ হল। পাড়ের কাছে হলেও ওখানকার পানি বেশ গভীর। তীব্র যন্ত্রণা আর ভয়ে কেঁদে উঠল সে। একটা শিক্ষা জেন এখন পাচ্ছে, যেটা সে কিছুক্ষণ আগে এক নিরস্ত্র ব্যান-আলির সাথে করেছিল-কারো পেটে গুলি লাগলে সেটা তীব্র যন্ত্রণার হয়। সোজা হয়ে অস্ত্রটা ছাড়িয়ে নিল নাথান, তারপর অসহায় মানুষটির দিকে তাক করল সেটা। নাথান জানে না জেনের পিস্তলটা কোনদিকে গেছে, এবার সে আর বোকামি করবে না।
তীব্র যন্ত্রণা আর ভয়ের ছাপ পড়েছে জেনের মুখে, খুব চেষ্টা করছে পাড়ে ওঠার জন্য। তারপর হঠাৎ করেই তার শরীরটা কেঁপে উঠল, চোখ দুটো বড় হয়ে গেল আতঙ্কে। আর্তনাদ এবার পরিণত হল চিৎকারে । “নাথান…বাঁচাও!”
সহজাত সাড়া দিয়ে নাথান এক পা এগিয়ে গেল সামনে। জেনও এগিয়ে এল একটু মুখটা ফ্যাকাশে আর ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে আছে। তারপর হঠাৎ করেই তার শরীরের চারপাশের পানি ফুলে উঠল খানিকটা, একটা স্রোত তৈরি হল তাকে ঘিরে। নাথান কিছু রুপালি প্রাণী দেখতে পেল সেখানে, মনে পড়ল কোথায় দাঁড়িয়ে আছে এখন। এই সেই পুকুর যেখানে এগুলোর চাষ করা হয়। আর এটার কথাই ম্যানুয়েল বলেছিল তাদেরকে।
জেন কাঁপছে বিক্ষিপ্তভাবে, চিৎকার দিচ্ছে শরীর ঝাঁকুনি দিতে দিতে । ডুবতে শুরু করল সে, কিন্তু পারল না । মাথাটাও ডুবে গেল পানির নিচে একটা হাত পাড়ের মাটির ওপর ছিল সেটাও টেনে নিল শ্রোতটা। জলাধার থেকে ঘুরে দাঁড়াল নাথান, জেনের জন্য কোন কষ্ট হচ্ছে না। কোনমতে একটু চোখ বুলাল ঊরুর যেখানটায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে। প্যান্টে একটা ছিদ্র হয়ে রক্তপাত হচ্ছে। বুলেটটা ওপাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে, তেমন কিছু হয় নি। ভাগ্যটা অনেক ভাল তার । শটগানটা শক্ত করে ধরে ছুটতে শুরু করল সে, প্রার্থনা করল তার ভাগ্যটা যেন দীর্ঘস্থায়ী হয়।
সকাল ১০.১২
ধ্বংসস্তুপের ভেতর থকে মাথা ঠেলে বের করল ম্যানুয়েল । ধোঁয়ায় ঘিরে ধরেছে তাকে। রকেট লঞ্চার দিয়ে ঘরগুলো উড়িয়ে দেবার তীব্র শব্দ এখনো মাথার ভেতর বাজছে। চোয়ালটা নাড়াতে গিয়ে যন্ত্রণা হল বেশ। চিৎকার-চেঁচামেচির মাঝে হামাগুড়ি দিয়ে বসল সে। চিৎকারগুলোর সবই বিভিন্ন রকম আদেশ।
‘অন্ত্র ফেলে দাও নিচে।”, “তোমাদের হাত দেখাও।” ,“সরে যাও ওদিকে নইলে যে যেখানে আছ ওখানেই গুলি করে মারব।”
হুকুম মানানোর জন্য আর বেশি কিছু বলা লাগে না, এটাই যথেষ্ট। কাতরে উঠে রক্ত ভরা থুথু ফেলল ম্যানুয়েল। চোখ তুলে দেখতে চাইল কি হচ্ছে ওদিকে। সে দেখল আনা ফঙ বসে আছে হাটুতে ভর দিয়ে, হাত দুটো মাথার সাথে লাগিয়ে রেখেছে। সম্পূর্ণ অক্ষত দেখাল তাকে। প্রফেসর কাউয়ি বসে আছে তার পাশে, মাথার তালুটা গভীরভাবে কেটে গেছে তার, রক্ত গড়িয়ে পড়ছে সেখান থেকে চোখের নিচ পর্যন্ত । দাখিও আছে, রাজ্যের অবিশ্বাস আর ভয় ভয় করেছে তার চোখেমুখে। একটু ঘুরে ম্যানুয়েল দেখল টর-টর ছোট এক ঝোপের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে। সে ইশারায় ওটাকে বোঝাতে চাইল যেন ওখান থেকে বেরিয়ে না আসে। একই ঝোপের কাছে প্রাইভেট ক্যারেরাকে দেখল তার বেইলেটাকে খুব দ্রুত ওপর থেকে ভেঙে পড়া একটি কাঠের টুকরোর নিচে লুকিয়ে রাখছে।
“এই তুমি!” খেকিয়ে উঠল একজন। “উঠে দাঁড়াও!”
ম্যানুয়েল প্রথমে বুঝতে পারে নি কে কথা বলছে, যখন কানের কাছে গরম একটা বন্দুকের নল এসে ঠেকল তখন একেবারে জমে গেল সে।
“উঠে দাঁড়াও!” আবারো বলল সে। বাচনভঙ্গিতে জার্মান টান সুস্পষ্ট।
হাটুতে ভর দিয়ে আস্তে করে উঠে দাঁড়াল ম্যানুয়েল। মাথাটা একটু ঘুরে উঠল তার, শরীরটাও দুলে উঠল, কিন্তু এতে যেন খুশিই হল গুন্ডাটা।
“তোমার অস্ত্রটা,” আবারো চেঁচিয়ে উঠল সে।
চারপাশে চোখ বুলাল ম্যানুয়েল, যেন হারিয়ে যাওয়া জুতা-মোজা খুঁজছে। কাছেই সে তার পিস্তলটা পড়ে থাকতে দেখল, তারপর পা দিয়ে একটা ধাক্কা দিল ওটাকে। “এই যে এখানে।” দ্বিতীয় একজন সৈন্য হাজির হল কোথা থেকে যে এসেই তর্জন গর্জন শুরু করে দিল । “বাকিদের সাথে যোগ দাও,”অন্যদের দিকে ঘুরে গিয়ে বলল সে। হাটু ভেঙে বসে পড়ার সময় ম্যানুয়েল দেখল ক্যারেরা এবং কসটসকে ঘিরে আছে মানুষগুলো। অস্ত্র ব্যাগ কিছুই নেই কাছে। সবাইকে মাথায় হাত দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। সার্জেন্টের বাঁ-চোখটা ভীষণভাবে ফুলে আছে, নাকটাও বেকে আছে রক্ত ঝরছে সেখান থেকে। নিশ্চিত বোঝা যাচ্ছে ম্যানুয়েলের চেয়েও অনেক বেশি ধকল গেছে কসটসের উপরে।
হঠাৎ একটা বিস্ফোরণ হল দূরের জঙ্গলে, আগুনের একটা বিরাট গোলক উঠে গেল আকাশে। বিস্ফোরণের চাপা শব্দের প্রতিধ্বণিত হল, সাথে নাপাম বোমার কটু গন্ধটাও এল নাকে। কসটসের দারুণ পরিকল্পনা ‘মনোযোগ ঘুরিয়ে দিতে হবে শক্রদের’ ছোট পদক্ষেপ, কিন্তু দেরি হয়ে গেছে।
“হার ব্রেইল, এই শালাটা নড়ছে না,” পেছন থেকে একজন বলল জার্মান এবং স্প্যানিশের মিশেলে।
নাইট-ক্যাপ গাছের দিকে তাকাল ম্যানুয়েল। অলিন পড়ে আছে গাছের গোড়ায় উপুড় হয়ে। ধারাল এক কাঠের টুকরো তার কাঁধে বিধে আছে, রক্ত বেরিয়ে খাকি পোশাক ভিজিয়ে দিয়েছে পুরোপুরি। ম্যানুয়েল দেখল এখনো শ্বাস নিচ্ছে রেঞ্জারটা।
ব্রেইল নামের লোকটি পুড়তে থাকা জঙ্গলের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রেঞ্জারের দিকে দিল। “কুত্তার বাচ্চা!” হাতের পিস্তলটা উঁচু করে গুলি করে দিল অলিনের মাথার পেছনে। ভয়ে লাফিয়ে উঠল আনা, ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল সে। ধ্বংসস্তুপের মাঝ থেকে আক্রমণকারী দলের নেতৃত্বে থাকা মানুষ দু-জন এগিয়ে এল তাদের দিকে। বেটে ইন্ডিয়ান নারীটি হেটে আসছে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে যেন কোন গার্ডেন পার্টিতে আমন্ত্রিত অতিথি সে, সুন্দর গঠন, মসৃণ পা, সবই চোখে পড়ল বিপদগ্রস্ত মানুষগুলোর। গলায় একটা বড়সড় তাবিজ ঝুলছে। প্রথম দেখায় ম্যানুয়েলের কাছে মনে হল একটা চামড়ার ব্যাগ জাতীয় কিছু, কিন্তু কাছে আসতেই চিনতে পারল ওটা একটা মানুষের কুঁচকানো মাখা । চুলগুলো চেছে ফেলা হয়েছে। পাশে লম্বা এক পুরুষ, পরনে সাদা খাকি পোশাক, মাথায় পানামা হ্যাট। সে ম্যানুয়েলের মনোেযোগটি ধরে ফেলল। মহিলার গলায় ঝুলতে থাকা মুণ্ডুটি উঁচু করে ধরল সবার সামনে। সৈনিকের নাম ও নম্বর খোদাই করা ডগ-ট্যাগটি দেখতে পেল ম্যানুয়েল ।।
“প্রথমে কর্পোরাল ডি-মারটিনির সাথে পরিচয় করিয়ে দেই,” মৃদু হাসল সে, যেন মজা করছে, তারপর এটা ছেড়ে দিল।
রাগে ঘৎ করে উঠল সার্জেন্ট কসটস কিন্তু একে-৪৭ তাক করা তার দিকে, যেভাবে ছিল সেভাবেই বসে রইল হাটু ভাঁজ করে। লুই সামনের বন্দীদের ওপর চোখ বুলাল।
“সবাইকে একসাথে দেখতে পেয়ে খুব ভাল লাগছে।” কণ্ঠে ফরাসি টানটা ম্যানুয়েলের পরিচিত লাগল। লোকটা কে?
প্রফেসর কাউয়ি উত্তর দিল চাপাকণ্ঠে, “লুই ফ্যাভ্রি!” তার কণ্ঠ দূর্বল হয়ে আসছে।
ফরাসি লোকটার দৃষ্টি এবার কাউয়ির দিকে। “একটু ভুল হল বোধহয়, প্রফেসর কাউয়ি। আসলে বলা উচিত ডক্টর ফ্যাভ্রি। দয়া কত্রে আমরা সম্মান দিয়ে কথা বলতে শিখি, তাহলে অপছন্দের অধ্যায়গুলো খুব দ্রুতই সেরে ফেলতে পারব আমরা।”
একটু গরগর করে উঠল কাউয়ি। ম্যানুয়েল এই লোকটার নাম আগেও শুনেছে । লোকটা প্রাণীবিদ, কালোবাজারি ও বিলুপ্তপ্রায় ইন্ডিয়ানদের বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে ব্রাজিল থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল তাকে। এই প্রফেসরের সাথে নাথানের বাবার খুব বিচ্ছিরি এক অতীত ইতিহাস রয়েছে।
“কিন্তু তোমাদের সবাইকে দেখে মনে হচ্ছে কয়েকজন এখানে নেই,” ফ্যাভ্রি বলল, ‘বাকিরা কোথায়?”
কেউ কোন কথা বলল না ।
“আহা চুপ থেকো না, প্লিজ! এসো আমরা ব্যাপারটা বন্ধুর মত মিটিয়ে ফেলি, কি পারি না? দিনটাও কি সুন্দর আজ, দেখেছ?” বন্দীদের একে একে দেখছে সে। “এমন দিনটা আশা করি কেউ নষ্ট করে দিতে চাইবে না, নাকি দেবে? আমার প্রশ্নটা কিন্তু খুব সহজ।”
তারপরও কারো মুখে কোন কথা নেই। সবাই তাকিয়ে আছে ফাঁকা দৃষ্টিতে।
অসন্তোষে মাথা নাড়ল ফ্যাভ্রি। “তাহলে তো আর সুন্দর থাকতে দিলে না।” ইন্ডিয়ান মহিলাটির দিকে ফিরল সে। “সুই প্রিয়তমা, বেছে নাও।” সে খুব সুন্দরভাবে হাতদুটো ঝাড়া দিল যেন কাজটা খুব সহজেই হয়ে যাবে ।
মহিলা বন্দীদের সামনে দিয়ে একবার হেটে গেল, প্রাইভেট কারেরার সামনে গিয়ে একটু ইতস্তত করল সে, তারপর হঠাৎ করেই দুই ধাপ এগিয়ে বসে পড়ল আনা ফঙের সামনে। তার নাকটা অ্যাপলজিস্টের থেকে মাত্র ইঞ্চিখানেক দূরে । ভয়ে কুঁকড়ে গেল আনা কিন্তু পেছনের অস্ত্রগুলোর কারণে নড়তে পারল না।
“আমার প্রিয়তমা সৌন্দর্যের দারুণ সমঝদার।”
ক্ষিপ্রগতির সাপের মত দ্রুত হাত চালিয়ে দীর্ঘ চুলে গোঁজা একটি খাপ থেকে লম্বা হাড়ের ছুরি বের করে আনল সে। এমন খাপ শুধুমাত্র একটা গোত্রের বীর যোদ্ধারাই ব্যবহার করে-মানুয়েল চিনতে পারল-ইকুয়েডরের ওয়ার গোত্র। যাদেরকে বলা হয় ইকুয়েডরের মাথা শিকারী । সাদা রঙের ধারাল ছুরিটা সে চেপে ধরল আনার নরম কণ্ঠনালীর ওপর । কেঁপে উঠল এশিয়ান মেয়েটি। সাদা ছুরিটা বেয়ে লাল রক্ত আসতে শুরু কল ।
যথেষ্ট হয়েছে, ভাবল ম্যানুয়েল, ভেতরটা খুব দ্রুত সাড়া দিল। তার ডান হাত নেমে এল কোমরে গোঁজা ছোট চাবুকটার ওপর। একটুখানি নড়াচড়াও সে করতে পারে ইচ্ছে করলে। অনেক বছর ধরে তার জাগুয়ারকে বড় করতে গিয়ে তার শরীরে উদ্দীপণ ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। কৌশলী আঙুলগুলো চালিয়ে এক ঝটকায় চাবুকটা ছুড়ল সে। চাবুকের অগ্রভাগ ছুরিটার উপরে আঘাত হানল। ইন্ডিয়ান মেয়েটির হাত থেকে ছুটে গেল ওটা, সেই সাথে একটু কেটে গেল তার চোখের নিচে। একেবারে বাঘিনীর মতই হিস-হিস শব্দ করে পেছনে সরে গেল সে। মুহূর্তেই হাতে তুলে নিল আরেকটি ছুরি।
“আনাকে ছেড়ে দাও!” হুঙ্কার দিল ম্যানুয়েল আমি বলছি বাকিরা কোথায় আছে।”
আর কিছু বলার আগেই পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা মেরে উপুর করে ফেলে দেয়া হল তাকে। আছড়ে পড়ল সে মাটিতে । একটা পা এসে লাথি দিয়ে সরিয়ে দিল চাবুকটি, তারপর হাতের ওপর পাড়া দিয়ে আঙুলগুলো চেপে ধরল সজোরে।
“তোল ওকে!” খেকিয়ে উঠল ফ্যাভ্রি, ভদ্রতাপূর্ণ আচরণের খোলস খুলে পড়েছে এখন।
চুল ধরে টেনে তোলা হল ম্যানুয়েলকে। পাড় খাওয়া হাতটা বুকের সাথে চেপে ধরল সে । ফ্যাভ্রি ঘুরে গিয়ে ইন্ডিয়ান নারীটির রক্ত মুছে দিল তারপর ফিরল ম্যানুয়েলের দিকে । আঙুলে লেগে থাকা রক্ত চেটে খেল সে।
“এগুলোর কি কোন দরকার ছিল?” জিজ্ঞেস করেই একটা হাত বাড়িয়ে দিল পেছন দিকে। বন্দুকধারীদের একজন এসে একটা খাট নলের রাইফেল ধরিয়ে দিল তার হাতে। দেখতে উজির মত কিন্তু আকারে আরেকটু ছোট।
মানুয়েলের চুল ধরে থাকা হাতটা আরও মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল। “ছেড়ে দাও ওকে, ব্ৰেইল,” বলল ফ্রাভ্রি। হাতটি মুক্ত করে দিল তাকে ছাড়া পেয়ে কেমন ভারসাম্যহীন হয়ে গেল ম্যানুয়েল । “তাহলে বল, কোথায় তারা?” জিজ্ঞেস কল লুই।
যন্ত্রণা চেপে রাখার চেষ্টা করল ম্যানুয়েল। “ঐ গাছের ভেতর…সর্বশেষ ওখানেই দেখেছিলাম, আমাদের রেডিও বার্তায় কোন সাড়া দেয় নি ওরা।”
মাথা নেড়ে সায় দিল ফ্যাভ্রি। “এমনটাই শুনেছিলাম আমি।” খালি হাতটা দিয়ে সে মানুয়েলের কাছে থাকা রেডিওর মত আরেকটা রেডিও তুলে ধরল সামনে। “কর্পোরাল ডি-মারটিনি যথেষ্ট আন্তরিক ছিল আমাদেরকে তার স্যাবার রেডিওটা দিতে এবং সঠিক রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিটা জানাতে।”
ভ্রু কুঁচকাল ম্যানুয়েল।“যেহেতু এটা আগেই জানতে…তাহলে কেন এমন করলে?” আনার দিকে মুখ তুলে তাকাল সে।
একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল ফ্র্যাভ্রি বৈচিত্রহীন আর একঘেয়েমী ভঙ্গিতে । শুধু নিশ্চিত হতে চাইছিলাম কেউ কোন রকম ধোকাবাজির চেষ্টা করছে কিনা। আসলে তোমাদের দলে থাকা আমার এজেন্টের সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না বেশ কিছুক্ষণ হল। এ-কারণেই মনের মধ্যে নানান সন্দেহের সৃষ্টি হচ্ছে।”
“এজেন্ট?” জিজ্ঞেস করল ম্যানুয়েল ।
“গুপ্তচর,” কাউয়ি বলল সারির শেষ প্রান্ত থেকে। রিচার্ড জেন।”
“ঠিক বলেছ।” ফ্রাভ্রি গাছের দিকে ঘুরে গেল হাতের রেডিওটা তুলে ধরল মুখের সামনে। “নাথান, আমাদের কথা যদি শুনতে পাও তাহলে বলছি, যেখানে আছ সেখানেই থাক। আমরা আসছি খুব শীঘ্রই তোমার সাথে দেখা করতে।” কোন জবাব এল না। প্রার্থনা করল ম্যানুয়েল, নাথান যেন কেলিকে নিয়ে এতক্ষণে ওখান থেকে চলে গিয়ে থাকে। কিন্তু সে এটাও জানে কাজটা অসম্ভব। কেলি কখনও তার ভাইকে রেখে কোথাও যাবে না। তাদের সবাই হয়তো পুরনো গাছটার ভেতর লুকিয়ে থাকবে।
ফরাসি লোকটি সাদা গুঁড়ির বিশাল গাছটির দিকে ভাল করে তাকাতেই চোখ দুটো সরু হয়ে গেল তার। এক মুহূর্ত থমকে রইল, তারপর ঘুরে দাঁড়াল সে, দৃষ্টি নিবদ্ধ করল ম্যানুয়েলের ওপর । “তাহলে এবার আমার স্ত্রীর অপমানের বিষয়টা ফয়সালা করা যাক। ভোঁতা উজিটা আবার উঁচু করে ধরা হল তার দিকে। “খুব বেশি ভদ্রতা দেখাতে পারছি না, মি: অ্যাজভেদো।”
ট্রিগার চাপল সে, সশব্দে অন্ত্র থেকে বেরিয়ে এল বুলেট।
চোখ বুজে ফেলল ম্যানুয়েল কিন্তু কোন বুলেট আঘাত করল না তাকে । আর্তনাদের একটা শব্দ হল , তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যটার শরীরের ওপরের অংশ ঝাঁজরা হয়ে গেছে। পড়ে গেল সে। মুখটা হা করে আছে, যেন কোন মাছকে পানি থেকে ডাঙ্গায় তোলা হয়েছে। রক্ত বেরিয়ে এল নাক-মুখ দিয়ে। হাতের অস্ত্র নামাল ফ্যাত্ৰি । চোখ খুলে তার দিকে তাকাল ম্যানুয়েল ।
একটা ভ্রু উঁচু করল ফ্যাত্রি। “তোমায় কোন দোষ দেই না আমি । তোমার ব্যাপারে ব্রেইনের আরও বেশি সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। তোমার চাবুকটা ওর দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়েছে, মোটেই ঠিক হয় নি এটা। আনাড়ি, খুবই আনাড়ি কাজ।” মাথা ঝাঁকালো লুই। “দু-জন লেফটেন্যান্টকে হারাতে হল গত দু-দিনে।” ঘুরে দাঁড়িয়ে অন্ত্রটা উচু করে ধরল সে । “সবগুলোকে নিয়ে চল। ইয়াগার দিকে পা বাড়াল এবার। “কার্লের ছেলের পেছনে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে গেছি আমি। দেখি লাজুক ঐ ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে আমাদের দলে ভেড়ানো যায় কিনা।”
সকাল ১১:০৯
নাথান নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে ইয়াগার পেঁচানো শেকড়ের আড়ালে। ধোঁয়ায় ঘিরে আছে চারপাশটা । সে বিচ্ছিন্ন কিছু গোলাগুলির শব্দ আর চেঁচামেচি শুনতে পেয়েছে যেগুলো এসেছে নাইট-ক্যাপ ওক গাছের দিক থেকে। কি হচ্ছে ওদিকে?
যত দূর চোখ যায় তার মধ্যে শুধু তার বাবার কাঠের ঘরটি চোখে পড়ছে নাথানের। আতঙ্ক আর হতাশা মিলে মিশ্র এক অনুভূতি জেঁকে ধরছে তাকে। হঠাৎ কবর থেকে আত্মা উঠে আসার মত কিছু অবয়র দেখা গেল ধোয়ার ভেতর থেকে তার দিকে আসতে। সবগুলোই যেন ছায়া ঢাকা অশরীরি । আরও গাঢ় ছায়ায় নিজেকে টেনে নিল সে, শটগানটা তাদের দিকে তাক করল। ধীরে, প্রতিটি পদক্ষেপেই অশরীরিঞ্জলো যেন বাস্তব অবয়বে পরিণত হচ্ছে। ম্যানুয়েল আর কাউয়িকে দেখা গেল সবার সামনে, তাদের মাঝখানে আনা। এক ধাপ পেছনেই কসটস এবং ক্যারেরা। এমনকি দাখিওআছে তাদের সাথে । সবাই রক্তাক্ত, হাটছে পেছনে দু-হাত দিয়ে, গতি ধীর হলেই আড়ালে থাকা অবয়বগুলো ধাক্কা দিচ্ছে সামনে। আরও একটু কাছে আসতেই বাকিদের দেখা গেল। মিলিটারি এবং জঙ্গল আর্মিদের একটি দল। সবার অস্ত্র তাক কর, কাউয়ি-ম্যানুয়েলদের দিকে। শটগানের দিকে তাকাল নাথান, এই বিশাল বাহিনীর সামনে এটা একেবারেই খেলনা । আরও একটা পরিকল্পনা দরকার তার, কিন্তু এখনকার মত শুধু লুকানোর জায়গা আর ছায়া ছাড়া কিছু নেই।
তার বন্ধুদের থামান হল। আপাদমস্তক সাদা পেশাকে মোড়া এক লোক একটা মাইক তুলে ধরল মুখের সামনে। “নাথান রান্ড!” চিৎকার দিল সে, ইয়াগার একেবারে শীর্যের দিকে লক্ষ্য করে । “বেরিয়ে আসো। ভালয় ভালয় আসো নয়তো চরম মূল্য দেবে তোমার বন্ধুরা । আমি তোমাকে দুই মিনিট সময় দিলাম।”
তার দলের সদস্য এবং ইন্ডিয়ানটিকে হাটু ভেঙে বসিয়ে দেয়া হল। নিজেকে আরও একটু ছায়ার মাঝে নিয়ে গেল নাথান । নিঃসন্দেহে চিৎকার করে কথা বলেছে যে সে এই দলের নেতা, কথার টান শুনে বোঝা যাচ্ছে একজন ফরাসি। মানুষটা একবার ঘুরে দেখে নিল তারপর তাকাল গাছের মাথায়, একটা পায়ের পাতা দিয়ে মাটিতে আঘাত করল অধৈর্যের সাথে । সে ধরেই নিয়েছে নাথান গাছের ওপরে আছে। তার গুপ্তচরের দেয়া সর্বশেষ তথ্যের ওপরই নির্ভর করে আছে সে ।
সিদ্ধান্তহীনতায় পেয়ে বসল নাথানকে । দেখা দেবে নাকি পালিয়ে যাবে? জঙ্গলে পালিয়ে যাবার সুযোগটা কি তার নেওয়া উচিত? হয়তো পেছন থেকে আক্রমণ করা যাবে শত্রুদেরকে…আপন মনেই মাথা দোলাল । সে কোন গেরিলা যোদ্ধা নয়।
“ত্রিশ সেকেন্ড, নাথান। লোকটা মুখের সামনে মাইক ধরে গর্জন করে উঠল।
একটা ক্ষীণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল ওপর থেকে। নাথান এখানে নেই। সে চলে গেছে।”
কেলি কথা বলছে! হাতের মাইকটি নামাল ফরাসি লোকটি। “মিথ্যা বলছে,” নিচুস্বরে বলল সে।।
নিজের জায়গা থেকে কিছু বলল কাউয়ি, “ডা. ফ্যাভ্রি…একটা কথা বলার ছিল, দয়া করে শুনুন।”
নাথান খেয়াল করল শটগানের ট্রিগারের ওপর তার আঙুল আরও দৃঢ়ভাবে বসে গেল, তখনই নামটা চিনতে পারল সে। তার বাবার কাছ থেকে এই মানুষটার অনেক কুকীর্তি আর নৃশংসতার কথা শুনেছে। লুই ফ্যাভ্রি…আমাজনের বুকে কল্পিত ছেলেধরা, জঘন্য এক লোক। এমন একটা পিশাচকে তার বাবাই এই এলাকা ছাড়া করেছিল। কিন্তু এখন আবার সে ফিরে এসেছে।
“কি বলবেন, প্রফেসর?” বিরক্তির সাথে জিজ্ঞেস করল লুই।
“যে কথা বলল ঐ কেলি ওব্রেইন। সে তার অসুস্থ ভায়ের সাথে আছে। যেহেতু সে বলছে নাথান ওপরে নেই, তাহলে সে আসলেই ওখানে নেই।” ভ্রু কুঁচকে ঘড়ির দিকে তাকাল ফ্যাভ্রি। “আচ্ছা, দেখা যাক।” হাতে মাইকটা উঁচু কল। “দশ সেকেন্ড।” তারপর সে এক হাত বাড়িয়ে দিলে একটা ভয়ঙ্কর অস্ত্র দেওয়া হল তার হাতে। কাস্তের মত লম্বা একটি ছুরি। ধোঁয়াটে পরিবেশের মাঝেও চকচকে ধারালো প্রান্তটা স্পষ্ট দেখা গেল। ফ্যাভ্রি সামনে ঝুঁকে অস্ত্রটা আনা ফঙের গলায় ঠেকাল, অন্য হাতটা দিয়ে মাইকটা উঁচু করে ধরল সে। “সময় চলে যাচ্ছে , নাথান। প্রাথমিকভাবে দুই মিনিট সময় দিয়ে খুব ভদ্রতার পরিচয় দিয়েছি আমি। তবে এই পর্যায়ে থেকে একেবারে শেষ পর্যন্ত প্রতি মিনিটে তোমার একটা করে বন্ধুর প্রাণ হারাবে। এক্ষুণি বেরিয়ে আস, তাহলে ছেড়ে দেওয়া হবে সবাইকে । একজন ভদ্রলোক এবং একজন ফরাসি হিসেবে শপথ করে বলছি। পাঁচ.চার……”
একটা পরিকল্পনার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল নাথান। একটা কিছু মাথায় আসছে। সে জানে লুই ফ্যাদ্রির শপথের কোন মূল্য নেই।
“তিন…দুই…” আর মাত্র দুই সেকেন্ড আছে কিছু ভাবার জন্য। “এক…” কিছুই পেল না সে।
“সময় শেষ।”
উঠে দাঁড়াল নাথান তার লুকানো জায়গা থেকে। মাথার ওপর শটগানটা উচু করে ধরে বাইরে বেরিয়ে এল।তুমি জিতে গেছ,” চিৎকার করে বলল সে।
আনা ফঙের ওপর ঝুঁকে থাকা অবস্থা থেকে সোজা হল লুই, একটা ভ্রু উঁচু করল । “ওহ আমাকে একদম চমকে দিয়েছ তুমি । এই নিচে এতক্ষণ ধরে কি করছিলে?”।
অশ্রু বেরিয়ে গড়িয়ে পড়ল ভয়ে জমে থাকা আনার চোখ দিয়ে। হাতের শটগানটা ছুড়ে ফেলে দিল নাখান। “বললাম তো তুমি-ই জিতেছ,” আবারো বলল সে। সৈন্যরা এগিয়ে আসছে তাকে ঘিরে ফেলতে।
হাসল ফ্যাভ্রি। “আমি সবসময়-ই জিতি,” চোখেমুখে বিস্ময় মুছে গিয়ে সেখানে এখন হিংস্রতা। কিন্তু কেউ কোন কিছু বোঝার আগেই সাই করে ঘুরে গিয়ে হাতের ধারাল ম্যাশের্টটা সর্বশক্তি প্রয়োগ করে ঘুরিয়ে আনল পেছন থেকে। তার শিকারের মাথাটা কাঁধ থেকে কেটে নেমে গেল মসৃণভাবে। রক্তের ফোয়ারা ছুটল উপরের দিকে। ‘ম্যানু!” কেঁদে উঠল নাথান, পড়ে গেল হটু ভেঙে। তার বন্ধুর শরীরটা পেছন দিকে পড়ে গেল। চিৎকার দিল আনা, গভীর বেদনা ফুটে উঠল কণ্ঠে। ঝুঁকে গেল কাউয়ির দিকে। নাথানের দিক থেকে ঘুরে গিয়ে বাকি সবার চোখে মুখের আতঙ্কটুকু উপভোগ করছে এখন ফ্রাভ্রি।
“দয়া করে বলবে, তোমাদের মধ্যে কেউ কি ভেবেছ আমার প্রিয়তমাকে আঘাত করার শাস্তি না দিয়েই আমি ম্যানুয়েল সাহেবকে ছেড়ে দেব? আহ! নারীদের প্রাপ্য সম্মান দেখাবে না? আমার ডার্লিং কত কষ্ট পেত, ভেবে দেখ!”
বন্দীদের থেকে একটু দূরে ইন্ডিয়ান নারীটিকে দেখল নাথান, এক হাত নিজের কেটে যাওয়া স্থানে হাত বুলাচ্ছে।
ফ্যাভ্রি এবার ফিরল নাথানের দিকে। তার সাদা পোশাক মানুয়েলের রক্তে ভিজে লাল। দানবটা তার ঘড়িতে একটা টোকা দিয়ে আঙুল তুলল, আর নাথান, আমি তো শূন্য পর্যন্তই গুণেছিলাম। তুমি-ই দেরি করেছ । ফলে যা করার তাই করেছি।”
মাথাটা ঝুলিয়ে রাখল নাথান, আরও নিচু করে ছোয়াল মাটির সাথে । “ম্যানুয়েল…”
দূরে কোথাও, বাঘের গর্জনের মত এক শব্দ সকালটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিল, প্রতিধ্বনিত হল সারা উপত্যকা জুড়ে।
