আমাজনিয়া – ১৭
১৭ আগস্ট
বিকেল ৪:১৬
আমাজন জঙ্গল
সব প্রস্তুতি ঠিকঠাক চলছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করল লুই। কাদা-মাটি মাখা ফিল্ড জ্যাকেটটা এক বাহুতে গুটিয়ে রাখা, শার্টের হাতা ভাঁজ করা। দুপুরের তাপমাত্রা অনেক বেশি হলেও এখন এই স্থানটা যেন আরও বেশি গরম। পরিতৃপ্তির একটা হাসি হাসল লুই গ্রামের ধ্বংসস্তুপের দিকে তাকিয়ে।
মাস্ক নামের এক কলাম্বিয়ান সৈন্য লুইর সামনে এসে শব্দ করে দাঁড়াল তার উপস্থিতি জানান দিয়ে। ছয় ফিটেরও বেশি উচ্চতার এই মানুষটি তার দীর্ঘ দেহের মতই ভয়ঙ্কর। এর আগে মাদক চালানকারীদের এক সংগঠনের ক্যাপ্টেনের দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করেছে সে। শ্যামলা বর্ণের মানুষটির সারামুখ এসিডে ঝলসে গেছিল তার বসকে বাঁচাতে গিয়ে। মুখের চামড়া ভয়ঙ্করভাবে বিকৃত হয়ে গেছে, অসংখ্য অমোচনীয় দাগে ভারাক্রান্ত । পরে তাকে তার অকৃতজ্ঞ ক্যাপ্টেন গুলিও করে। স্মৃতিগুলো খুবই তিক্ত আর ভয়ঙ্কর, মৃত্যু যে কত কাছে আসতে পারে তা ভাল করেই জানে সে। অন্যদিকে লুই তার এই শক্তি, সাহস এবং বিশ্বস্ততার প্রতি মুগ্ধ হয়ে তাকে সম্মানিত একটি স্থান করে দিয়েছে তার দলে । ব্রেইনের বিকল্প হিসেবে অসাধারণ কাজ করছে সে।
“মাস্ক,” বলল লুই, “উপত্যকায় সব বিস্ফোরক রাখতে আর কত সময় লাগবে?”
“আধঘণ্টা ।”
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে হাতঘড়ির দিকে তাকাল লুই। সময় খুব কঠিন জিনিস তবে তার সব কিছুই চলছে বেঁধে দেয়া সময় অনু্যায়ী। রাশান রেঞ্জার যদি জিপিএস চালু না করত তবে এখনকার বিজয়টা এই রণক্ষেত্রে উপভোগ করার আরও বেশ কিছু সময় তার হাতে থাকত । একটা দম ফেলল সে। সামনের খোলা প্রান্তের দিকে তাকাল, সব মিলিয়ে আঠারো জন বন্দী, সবাই হাটু গেড়ে বসে আছে, হাত পেছনে বাধা, সাথে পা-গুলোও। বেঁধে দেওয়া দড়িগুলো থেকে একটা ফঁাস তৈরি করে সেটা প্রত্যেকের গলায় পরিয়ে দেয়া হয়েছে- স্ট্রংগলারস র্যাপ । বাঁধন খোলার জন্য হাচড়-পঁচিড় করলেই গলার ফাঁসের দড়িতে টান লাগবে আর গলায় আটকাতে থাকবে ওটা সে দেখল কয়েকজন ইতিমধ্যে মুখ দিয়ে দম নিতে শুরু করেছে গলার দড়িটা বসে যাওয়ায়। বাকিরা সবাই তপ্ত রোদে বসে রক্তাক্ত অবস্থায় পুড়ছে । লুই খেয়াল করল মাস্ক এখনো তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। “আর পুরো গ্রামটা দেখা হয়েছে ভাল করে?” জিজ্ঞেস করল সে। “ব্যান-আলির আর কেউ অবশিষ্ট নেই?”
“জীবিত কেউ নেই, স্যার।”
এই গ্রামে একশর বেশি মানুষ ছিল। আর এখন তারা আরও একটা বিলুপ্ত গোত্র। উপত্যকার কি খবর? ভাল করে দেখা হয়েছে ঐ জায়গাটা?”
“হ্যা, স্যার । পাহাড়ের ফাটল ছাড়া আর পালাবার কোন পথ নেই কারোর।”
“খুব ভাল,” বলল লুই। গতরাতে ব্যান-আলিদের নিজস্ব স্কাউটদের শেষ করে দিয়েছে সে কিন্তু তারপরও আরও নিশ্চিত হতে হবে। “শেষবারের মত জায়গাগুলো দেখে আস। পঁচটার পর এক সেকেন্ডও দেরি করব না আমি।”
মাথা নেড়ে খুব স্মার্ট ভঙ্গিতে ঘুরে গেল মাস্ক। দ্রুত বেগে হাটা শুরু করল মাঝের বিশাল গাছটার দিকে। লেফটেন্যান্টের দিকে চেয়ে আছে লুই। গাছটার গুঁড়ির কাছে স্টিলের ছোট দুটি ড্রাম রাখা। উপত্যকাটা ভাল করে দেখে নেওয়ার পর তার লোকজনেরা কুড়াল, শাবল নিয়ে গাছের ভেতর ঢোকে, তারপর সুবিধামত জায়গাগুলোতে খোঁড়াখুঁড়ি করে নল বসিয়ে সংগ্রহ করা হয়েছে মূল্যবান সেই আঠা, পরে সেগুলো জড়ো করা হয়েছে ড্রাম দুটোর ভেতর। একদল মানুষ ড্রাম দুটোকে ঠেলে বাইরের দিকে নিয়ে আসতে শুরু করেছে, অন্য একটা দল খুঁড়তে শুরু করেছে ইয়াগার গুড়ির চারপাশটা। চোখ দুটো সরু হয়ে গেল তার। সবকিছুই চলছে ঘড়ির কাঁটার সাথে সমান গতিতে। লুইর এখন শুধু অপেক্ষার পালা। ভ্রষ্ট মনে বন্দীদের লাইনের কাছে হেটে গেল সে। বিভিন্ন ভাগে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে বেঁচে থাকা মানুষগুলোকে। রেঞ্জারদের একজায়গায় বাঁধা, পুড়ছে রোদের মধ্যে। তারা বসেছে বেঁচে যাওয়া ব্যান-আলিদের থেকে একটু দূরে। নিজের বন্দীদের দিকে তাকাল লুই, কিছুটা হতাশ হয়েছে, মানুষগুলো তার জন্য কোন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে নি। রেঞ্জার দু-জন তাকিয়ে আছে খুব রুক্ষ্মভঙ্গিতে। ছোট এশিয়ান অ্যানথ্রোপলজিস্টটা শান্ত হয়ে গিয়েছে একেবারেই, চোখজোড়া বন্ধ, ঠোটজোড়া নড়ছে প্রার্থনার কারণে, আত্মসমর্পণে আপত্তি নেই তার। কাউয়ি বসে আছে ভাবলেশহীনভাবে। সর্বশেষ বন্দীর সামনে থামল লুই। নাথান রান্ডের চাহনিটা রেঞ্জারদের মতই কঠোর তবে একটা কিছুর উপস্থিতি বেশি তার মধ্যে। তার কষ্টের অভিব্যক্তির মাঝেও খুব শীতল এইট সংকল্প দেখা গেল। এই মানুষটার চোখে চোখ রেখে চলতে কষ্টই করতে হয়েছে লুইকে তবু দৃষ্টি সরাতে চায় নি সে। নাথানে মুখমণ্ডলে তার বাবার ছায়া একট। বাদামী চুল, নাকের গঠন, চোয়াল। তবে সে কার্ল রান্ড নয়। আর অবাক করার ব্যাপার হল এটাই লুইকে হতাশ করে দিচ্ছে। কার্লের ছেলাকে বন্দী করে যে সম্ভষ্টি সে উপভোগ করতে চেয়েছে মনেপ্রাণে তা যেন হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেল।
সত্যি বলতে, সে যেন এই যুবকটিকে কিছুটা সুখীই করছে। এই অভিযানের পুরো সময়টুকু জুড়েই খুব বুদ্ধিমত্তা আর সাহসের পরিচয় দিয়েছে ছেলেটা। এমনকি লুইর গুপ্তচরকেও শেষ করেছে। আর গল্পের একেবারে শেষদৃশ্যে নিজের জীবনকে বিপন্ন করে দলের বাকি মানুষগুলোকে বাঁচানোর চেষ্টা করে বিশ্বস্ততার প্রমাণও রেখেছে সে। নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় গুণ, যদিও তাদের দুজনের গতিপথ ভিন্ন তবুও মনে মনে শ্রদ্ধা করতে কার্পন্য করল না লুই। সব বাদ দিলেও এটা সত্য যে, এই পাথরের মত শক্ত চোখ দুটো যেন তাক করে রাখা অস্ত্র। তার এমন কিছু কষ্টের অধ্যায় আছে যা সে ভুলতে পারবে না কখনো। তারপরও সে এখনো বেঁচে আছে। লুইর মনে পড়ে গেল ফ্রেঞ্চ গায়ানার হোটেলে তার সেই প্রবীন বন্ধুটির কথা । ডেভিল’স আইল্যান্ড থেকে সাজা শেষে ফিরে আসা মানুষটি। লুইর চোখের সামনে ভেসে উঠল তার বন্ধুর পরিছন্ন একগ্লাস মদে চুমুক দেবার দৃশ্যটি। এই যুবকেরও সেই আগুনভরা চোখ ।
“আমাদের নিয়ে কি করবে তুমি?” নাথান বলল । কোন অনুরোধ নয়, স্বাভাবিক প্রশ্নের ভঙ্গিতে বলল সে।
পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে তাতে জমা ঘাম মুছল লুই। “আমি খুব ভদ্র লোকের মতই শপথ করে বলেছি, আমি তোমাকে বা তোমার বন্ধুদের মরাব না। আর আমি অবশ্যই আমার কথার মর্যাদা রাখব।”
চোখ দুটো সরু হল নাথানের।
“তোমাদের মারার দায়িত্ব আমি ইউএস মিলিটারির হতে দিয়ে যাব,” কৃত্রিম দুঃখের ভান করে বলল সে।
“কি বলতে চাও?” সন্দেহভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল নাথান।
মাথা ঝাঁকিয়ে দু-পা এগিয়ে সার্জেন্ট কসটসের সামনে গিয়ে দাঁড়াল লুই। “আমার মনে হয় এই প্রশ্নের উত্তর তোমার এই বন্ধুটিরই দেয়া উচিত।”
“আমি বুঝতে পারছি না কি বলছ তুমি,” গরগর করে বলল কসটস।
একটু ঝুঁকে সার্জেন্টের চোখেল দিকে তাকাল লুই। “তাই নাকি…তার মানে তুমি বলছ, ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান তার স্টাফ-সার্জেন্টকে গোপনে কিছু বলে যায় নি?”
অন্যদিকে তাকাল কসটস।
“কি বলছে সে?” সার্জেন্টকে জিজ্ঞেস করল নাথান। “সব গোপন বিষয় আমরা ভাল করেই জানি, তবু তুমি যদি কিছু জেনে থাক, কসটস…”
মুখ খুলল সার্জেন্ট, একটু ইতস্তুত আর লজ্জিত দেখাচ্ছে তাকে। “ঐ নাপাম মিনি বোমাগুলো..আসলে আমাদেরকে অর্ডার দেয়া ছিল মূল্যবান কোন উপাদান খুঁজে বের করতে…যেমন অলৌকিক ক্ষমতার আঠা পেয়েছি ইয়াগা থেকে। সাথে আরও অর্ডার দেয়া ছিল একবার ওটা সগ্রহ করার পর ওটার উৎস ধবংস করে দেবার। সম্পূর্ণভাবে যেন বিলুপ্ত হয়ে যায় ওটা।”
সোজা হয়ে দাঁড়াল লুই, তার বন্দীদের চোখ-মুখের বিস্মিত অভিব্যক্তিটা উপভোগ করছে। এমনকি নারী রেঞ্জারটিকেও হতবুদ্ধিকর দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে মিলিটারি যেন তার গোপন বিষয়গুলো অল্পকিছু বেছে নেওয়া মানুষের ভেতরেই সীমাবদ্ধ রেখেছে।
একটা হাত উঁচু করে বিশাল গাছটার চারপাশে জড়ো হওয়া মানুষের ছোট্ট দলটাকে দেখাল লুই। ওরা লুইর নিজস্ব ডেমোলিশন টিম।
সাদা গুঁড়িটার গায়ে রেঞ্জারদের লাগিয়ে রাখা অবশিষ্ট নয়টি মিনি বোমা দেখা গেল, যেন নয়টি সমতল চোখ তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। “ইউএস গভর্মেন্টকে ধন্যবাদ, তারা এতটা গোলাবারুদ সরবরাহ করেছে যে, এমন বিরাট গাছকেও উড়িয়ে দেয়া যাবে সহজেই।”
মাথাটা নিচু করে ফেলল কসটস।
“তাহলে দেখলে তো,” লুই বলল, “আমাদের উভয়ের লক্ষ্য খুব বেশি আলাদা তা কিন্তু বলা যাচ্ছে না। লাভবান কেউ একজন হচ্ছে, হয় ইউএস মিলিটারি না-হয় ফ্রেঞ্চ ফার্মাসিউটিক্যালস। এখানে অবশ্য একটা প্রশ্ন আসতে পারে, এই সম্পদ নিয়ে কে কতটা ভাল কাজে লাগাবে?” একটু কাঁধ তুলল সে, “কে-ই বা জানে? বরং উল্টো এই প্রশ্ন আমরা করতে পারি কারা বড় ক্ষতিটা করছে?” সার্জেন্টের দিকে তাকাল লুই। ‘আমার মনে হয় এই প্রশ্নের জবাবটা আমাদের সবারই জানা।”
একটা ভয়ঙ্কর নীরবতা নেমে এল দলটির ওপর। অবশেষে নাথান সেই নীরবতা ভাঙল।“কেলি এবং ফ্রাঙ্কের তাহলে কি হবে?”
“ওহ, হ্যা…দলের বিচ্ছিন্ন সদস্যরা….” লুই অবাক হয় নি এই প্রশ্নটা নাথানকে করতে দেখে। তাদের সুস্থতা নিয়ে চিন্তা কর না। ওরা আমার সাথে আসছে। আমার নিয়োগদাতাদের সাথে যোগাযোগ করেছি । মি: ওব্রেইন একটা আদর্শ গিনিপিগ হিসেবে পরীক্ষাধীন অবস্থায় থাকবে যেন তার হারান পা দুটো কিভাবে আবার বেড়ে ওঠে তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায় । সেন্ট সেভিসের বিজ্ঞানীদের তর সইছে না আর, তারা তাদের যন্ত্রপাতি তার ওপর চালানোর জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে।”
“আর কেলি?”
“মিস ওব্রেইনও তার ভায়ের সাথে আসছে যাতে গবেষণার কাজে তার ভাই ঠিকঠাক সাহায্য করে সবাইকে।”
ফ্যাকাশে হয়ে গেল নাথানের মুখ ।
কথার বিরতির সময় লুই খেয়াল করল নাথানের দৃষ্টি আটকে আছে বিরাট গাছটার দিকে। একটা হাত উঁচু করে দেখাল সে গাছটিকে। “বোমার টাইম সেট করা হয়েছে এখন থেকে তিন ঘন্টা পর, তার মানে ধর…আটটা বেজে যাবে নিশ্চিত করে বললে,” লুই বলল। সে জানে এখানকার বন্দীদের কাছে অজানা নয়, একটা নাপাম বোমা কত শক্তিশালী। আর সেখানে নয়টা একসাথে বিস্ফোরিত হলে প্রলয় ঘটে যাবে। সবার চোখেমুখে জেঁকে বসা নিরাশার ছায়া দেখতে পেল লুই।
বলে গেল সে “পাশাপাশি আমরা অসংখ্য অগ্নুৎপাদনকারী বোমা পুরো উপত্যকাজুড়ে প্লান্ট করে দিয়েছি, এখানে আসার যে রাস্তাটা, মানে পাহাড়ের সেই ফাটলটাও বাদ যায়নি, সবগুলোই বিস্ফোরিত হবে আমরা এখান থেকে বেরিয়ে যাবার পরপরই। কোন ইন্ডিয়ান দূরে কোথাও পালিয়ে থাকতে পারে, ওরা এসে তোমাদের মুক্ত করে দিতে পারে আমরা কিন্তু এই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে কোন ঝুঁকি নিতে চাই নি, তাই এতটা কষ্ট করা, বুঝলে? আর সত্যি বলতে কি, তোমরা বাঁধা থাক আর নাই থাক, পালানোর পথ তো নেই। এই বিচ্ছিন্ন উপত্যকার সবটুকুই পরিণত হবে বিশাল এক অগ্নিপুরীতে। ধ্বংস করে দেবে অলৌকিক সেই আঠার অবশিষ্ট সবটুকু, তার উৎসটাও থাকবে না আর। আর এই আগুনকে রাতের বেলা মনে হবে ক্যাম্প-ফায়ার। উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারের লোকজন দেখতে পাবে অনেক দূর থেকেও। ছুটে আসবে তারা এখানে। সবার মনোযোগ যখন আগুনের প্রদর্শনীর দিকে আমরা ততক্ষণে বাড়ির পথে থাকব।”
চরম পরাজয়ের প্রতিচ্ছবি জ্বলে উঠল সবার চোখে। লুই হাসল । “তাহলে দেখলে তো, সব কিছুই সুন্দরভাবে পরিকল্পনা করা আছে।”
তার পেছনে লুইর লেফটেন্যান্ট দৃঢ় পদক্ষেপে হেটে এসে তার কাঁধের কাছে দাঁড়াল। কলম্বিয়ান সৈন্যটি বন্দী মানুষগুলোর দিকে একটু খেয়ালও করল না, যেন ওগুলো গরুছাগল ছাড়া কিছুই নয়।
“হা, মাস্ক?”
“সব কিছুই নির্দেশমত করা হয়েছে, স্যার। আপনার আদেশ পেলেই জায়গাটা খালি করতে পারি আমরা।”
“একটু অপেক্ষা কর।”
বন্দীদের সবার ওপর চোখ বুলাল সে। “আমি দুঃখিত, কাজ আছে আমার । যাবার আগে অবশ্যই বিদায় বলে যাব সবাইকে।”
ঘুরে দাঁড়াতেই দারুণ এক পরিতৃপ্তি আচ্ছন্ন করল তার ভেতরটা, মনকে বোঝাল, সে যেন তার বাবা কার্ল-রান্ডকেই শাস্তি দিচ্ছে যে তার গর্বিত সন্তানকে তার শিকারে পরিণত করেছে, আর সেটা হয়েছে তার বাবার দেখানো পথেই…সে আশা করল তার বৃদ্ধ বাবা নরক থেকে সব দেখছে।
বিকেল ৪:৫৫
লুইর কথা শুনে আহত এবং বিধ্বস্ত নাথান বসে আছে সবার সাথে। খুব গভীরভাবে চেয়ে দেখতে লাগল শত্রুপক্ষের চলে যাবার প্রস্তুতি।
তার পাশ থেকে কথা বলল কাউয়ি। “লুই তার সম্পূর্ণ ভরসা রাখছে ইয়াগার আঠার ওপর।” গলায় বাধা ফাঁসের দিকে সতর্ক থেকে মাথা ঘোরাল নাথান। “তাতে কি আর আসে যায় এখন?”
“সে আশা করছে এটা শারীরিক ক্ষত সারানোর মত সব রোগ সারাতে পারে, কিন্তু তার কোন প্রমাণ আমরা পাই নি।”
কাঁধ ঝাঁকাল নাথান। “তুমি আমাদের কি করতে বল এখন?”
“বলে দাও সব,”কাউয়ি বলল ।
“মানে সাহায্য করব? কেন?”
“ঐ বজ্জাতটা এমন মানুষ নয় যাকে আমি সহ্য করতে চাইছি। আমি সাহায্য করতে চাইছি সারা পৃথিবীতে ওই রোগে যারা মরছে তাদের। ঐ রোগের ওষুধ এখানেই আছে। এটা আমি বুঝতে পারছি। আর ঐ খুনিটা কিনা ধ্বংস করে দিতে চাইছে ওটা। বান-আলির অভিশাপ দূর করার আর কোন উপায়ই থাকবে না তাহলে। তাকে অবশ্যই সতর্ক করার চেষ্টা করতে হবে আমাদের।
কষ্ট সরিয়ে চিন্তার অভিব্যক্তি ফুটে উঠল নাথানের মুখে। ম্যানুয়েলের মেরে ফেলার দৃশ্য চোখের সামনে ভাসছে এখনো, এটা আজীবন তার স্মৃতিতে থাকবে। কিভাবে তার বন্ধুর শরীরটা মাটিতে আছড়ে পড়েছিল..নাথান এটাও বুঝতে পারছে কাউয়ি ঠিক কি বলতে চাইছে, কিন্তু এই মুহুর্তে সেটা হজম করা তার জন্য খুব কঠিন।
“সে আমার কথায় কান দেবে না, নাথান বলল। মন ও প্রাণের মাঝে একটা সাম্যবস্থা তৈরি করে নীরব থাকা মানুষগুলোর মতামতটাও বোঝার চেষ্টা করছে সে। ‘ফ্যাভ্রি সব কিছুই সময় মেপে করছে এখন, কি কি করবে তাও আগে থেকেই ঠিক করা ছিল । উদ্ধারকারী মিলিটারিরা এখানে আসতে আর মাত্র ছয় থেকে আট ঘণ্টা বাকি। সে এখন যতটা পারে লুটপাট করে সটকে পড়বে।”
“তাকে যে করেই হোক এটা বলতেই হবে আমাদের,” জোর দিয়ে বলল কাউয়ি।
উচ্চকণ্ঠের কিছু কথা ইয়াগার দিক থেকে প্রতিফলিত হয়ে এল তাদের কাছে। দুজনেই তাকাল গাছটার সুড়ঙ্গের দিকে। দুই গুণ্ডা একটা স্ট্রেচার নিয়ে এগিয়ে আসছে। নাথান তাদের বানানো স্ট্রেচারটা চিনতে পারল ফ্রাঙ্ককে ওটার ওপর বেঁধে রাখা হয়েছে, যেন কোন শূকর বেঁধে নেয়া হচ্ছে জবাই করার জন্য। ঠিক পেছনেই কেলি, তার হাত দুটো পেছনে বাঁধা, ফ্যাভ্রি এবং সুইয়ের মাঝে হাটছে সে। তাদের সবার পেছনে আরও কিছু বন্দুকধারী।
“তুমি জান না তুমি কি করছ!” উচ্চস্বরে বলল কেলি। “আমরা এখনো জানি না এই আঠা সব রোগ সারাতে পারে কিনা।”
এই একই বিষয়ে একটু আগেই নাথানরা কথা বলেছে।
কাঁধ ঝাঁকাল লুই । “তুমি যা বলছ তা ঠিক না ভুল তা প্রমাণিত হবার অনেক আগেই সেন্ট সেভিস আমার অ্যাকাউন্টে টাকা ভরে দেবে। তারা তোমার ভায়ের পা-দুটো দেখবে অথবা যা ইচ্ছা তাই করবে আর লক্ষ-লক্ষ ডলার পরিশোধ করবে আমাকে।”
“তাহলে যে মানুষগুলো মরছে তাদের কি হবে? শিশু, বয়স্করা?”
“তাতে আমার কি যায় আসে? আমার দাদা-দাদি অনেক অনেক আগেই মারা গেছে, আর আমার নিজের কোন বাচ্চা-কাচ্চা ও নেই।” রাগে গনগনে হয়ে উঠল কেলি, তারপর তার বন্ধুদের বন্দীদশা চোখে পড়ল তার। অবিশ্বাসে চোখ জোড়া কুঁচকে গেল মেয়েটির। রাস্তার দিকে তাকাতেই লুইর দলের প্রায় ত্রিশজনের মত দলটা চোখে পড়ল।
“কি হচ্ছে এখানে?” জিজ্ঞেস করল সে।
“ওহ, হ্যা..তোমার বন্ধুরা অবশ্য এখানেই থাকছে গাছের চারপাশে লাগানো বিস্ফোরকের বৃত্তটা দেখল কেলি , তারপর বাকি মানুষগুলোকে, চোখ দুটো স্থির হল নাথানের ওপর এসে। “তুমি ওদেরকে এখানে ফেলে যেতে পার না।”
“আমি অবশ্যই পারি,” লুই বলল।
আৎকে উঠল কেলি। কণ্ঠটা নরম হয়ে চোখে পনি এসে গেল। “একবার অন্তত বিদায় নিয়ে আসতে দাও ওদের কাছ থেকে।”
নাটকীয় ভঙ্গিতে বিরক্তির ভান করল লুই। “আচ্ছা, তবে তাড়াতড়ি করবে।” কেলির বাহু ওপরের অংশ ধরে তাকে সারি থেকে বের করে আনল সে। তার চারপাশে সশস্ত্র চারজন সৈন্য, তার মিস্ট্রেসও আছে সাথে। বন্দী মানুষগুলোর দিকে ঠেলে দিল কেলিকে।
কেলিকে দেখেই নাথানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল যন্ত্রণায়। এখানে তার সামনে না এসে যদি সে স্বাভাবিকভাবে এখান থেকে চলে যেত সেটাই ভাল হত। অশ্রুধারা নামতে থাকল মেয়েটির চোখ দিয়ে। সবার সামনে দিয়ে যাবার সময় এমনভাবে সরি বলল যেন সব কিছু তার নিজের ভুলের জন্যই হয়েছে। কোনমতে সেটা শুনল নাথান, মাথা উঁচু করে তাকাল। বুঝতে পারছে এটাই তাদের শেষ দেখা। সে ঝুঁকে প্রফেসর কাউয়ির দিকে তাকিয়ে লাইনের শেষে নাথানের সামনে গিয়ে থামল । নিচের মানুষটির দিকে তাকাল, তারপর বসে পড়ল হাটু ভর দিয়ে। নাথান…”।
“শান্ত হও,” মুখে একটা দুঃখের হাসি ফুটিয়ে কথাটা বলল নাথান, যেন এই কথাটা দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিতে চাইছে গতরাতের সেই মুহূর্তটিকে, “শান্ত হও, কেলি।”
টলমলে অশ্রু ফোঁটা বেয়ে এল মেয়েটির চোখ দিয়ে । “ম্যানুয়েলের খবর শুনলাম,” বলল সে, “আমি খুবই দুঃখিত।”
চোখজোড়া বন্ধ করে মাথা নিচু করল নাথান। যদি কোন সুযোগ পাও,” খুব আস্তে করে বলল সে, “ঐ ফরাসি বাস্টার্ডটাকে খুন কোরো।”
তার দিকে ঝুঁকে গেল কেলি, তার কপোলের সাথে কপোল মেশাল সে। “কথা দিলাম আমি,” কানের কাছে ফিসফিস করল সে, যেন ভালবাসার মানুষের কাছে গোপন কথা বলা হচ্ছে, তারপর মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোটের সাথে ঠোট লাগাল, কেউ দেখল কিনা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করেই। শেষ বারের মত একটা চুমু খেল সে। তারপর লুই ফ্যাভ্রি তাকে টেনে নিল পেছনে।
“ঘটনা দেখে মনে হচ্ছে তোমাদের দুজনের মধ্যে কাজের সম্পর্কের বাইরেও আরও কিছু আছে ” তাচ্ছিল্যভরে বলল সে। এক ঝটকায় কেলিকে তার দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে জোর করে একটা চুমু খেল । এমন আকস্মিক ঘটনায় কেঁদে উঠল কেলি। লুই তাকে ছেড়ে দিয়ে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল ইন্ডিয়ান নারীটির দিকে। রক্ত ঝরছে তার ঠোট দিয়ে। কেলি তাকে কামড়ে দিয়েছে। থুতনিতে বেয়ে আসা রক্ত মুছল সে। “চিন্তা করো না, নাথান তোমার ডার্লিংকে দেখেশুনে রাখব আমি।” তার মিসট্রেস এবং কেলির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাদের সাথে তার সময়টা যেন দারুণ উপভোগ্য হয় সেটা নিশ্চিতকরব আমি আর সুই। ঠিক আছে, সুই?”
ইন্ডিয়ান ডাইনি কেলির দিকে ঝুঁকে তার লাল বাদামী চুলের মাঝে আঙুল চালাল। নাকটা এগিয়ে দিয়ে একটু ঘ্রাণ কলো পশুর মত করে।
“দেখ নাথান, দেখ। সুই এরইমধ্যে কেমন আগ্রহি হয়ে উঠেছে তার প্রতি।”
মানুষটার দিকে ছুটে যাবার জন্য গর্জে উঠল নাথান, বাঁধনগুলোর সাথে যুদ্ধ করছে। সে। “শূয়োরেরবাচ্চা!” দাঁতে দাঁত পিষে বলতে বাধ্য হল গলায় আটকে থাকা ফাঁসের জন্য।
“নিজেকে শান্ত কর, বন্ধু, কেলির বাহু ধরে পেছনে সরে গিয়ে লুই বলল। “সে ভাল জায়গায় আছে এখন।”
তীব্র হতাশা অশ্রু হয়ে ঝরল নাথানের চোখ দিয়ে । নিঃশ্বাস এখন পরিণত হয়েছে শাশা শব্দে, দড়িটা গলার মাংসে বসে গেছে আরও গভীরভাবে । তবুও চেষ্টা করে গেল সে। মরতে হবে তাকে। সেটা ফাঁস আটকে হোক আর আগুনে ঝলসে হোক, তাতে কিছুই আসে যায় না।
চোখেমুখে দুঃখের ভাব নিয়ে তার দিকে তাকাল লুই, তারপর টেনে নিয়ে গেল কেলিকে। যাবার সময় বিড়বিড় করল সে। “কি লজ্জার বিষয়, এত সুন্দর একটা ছেলে কিন্তু জীবনটা একেবারে দুঃখে ভরা।”
নাথানের অবস্থা শোচনীয় হয়ে আসছে, অন্ধকার হয়ে আসা দৃশ্যপটে ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র তারার বিন্দুগুলো নাচতে করেছে। কাউয়ি কিছু একটা বলল নাথানকে ফিসফিস করে।
“হাসফাস করা থামাও, নাথান।”
“কেন?” কষ্ট করে বলল সে।
“যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ।”
ক্ষান্ত দিল নাথান তবে সেটা যতটা না প্রফেসরের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে, তার থেকে বেশি ক্লান্তির কারণে। পরাজয়টা যেন মেনেই নিল সে। তবে স্থির হওয়ার কারণে তার শ্বাসকষ্টটা একটুখানি কমলো। মাথা তুলে খুনি দলটার চলে যাওয়া দেখল সে, তবে চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে কেলির ওপর। পেছন ফিরে একবার দেখল কেলি, জঙ্গলের মাঝে হারিয়ে যাবার ঠিক আগে। তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল সে।
বন্দী দলটার সবাই চুপ করে আছে, শুধু আনা ফঙের বিড়বিড় করা প্রার্থনটুকু কানে আসছে সবার। তাদের পেছনে বন্দী ইন্ডিয়ানদের মাঝে কয়েকজন শোক সংগীত গাইতে শুরু করেছে, আর অন্যেরা শুরু করে দিয়েছে কান্না । যার যার জায়গায় বসে রইল তারা, কোন আশা নেই কারোর, পুড়ছে সূর্যের প্রখর তাপে । প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি কান্নায় মৃত্যু এগিয়ে আসছে তাদের দিকে।
“আমাদেরকে গুলি করে কেন মারল না সে?” সার্জেন্ট কসটস বিড়বিড় করে বলল।
“ফ্রাভ্রি এমনভাবে তার শিকারকে মারে না,” জবাবে বল প্রফেসর কাউয়ি। “সে চায় আমরা মৃত্যুকে মেনে নিয়ে আলিঙ্গন করি । একটা ধীর-মাত্রার শাস্তি। এটা খুব আনন্দ দেয় ঐ বাস্টার্ডকে।”
চোখ বন্ধ করে ফেলল নাথান, যেন এখনই সে পরাজয় মেনে নিয়েছে।
একঘন্টা পর বিরাট এক বিস্ফোরণের শব্দ ঐল দক্ষিণ দিক থেকে কাঁপিয়ে দিল সব কিছু। চোখ খুলল সে, দক্ষিণ আকাশে পাথুরে ধোঁয়ার কুণ্ডলি চোখে পড়ল তার।
“পাহাড়ের সেই ফাটলটা উড়িয়ে দিয়েছে ওরা, সারির ওপর প্রান্ত থেকে বলল ক্যারেরা।
ঘুরে গেল নাথান। বিস্ফোরণের শব্দ প্রতিধ্বনিত হল কয়েক সেকেন্ড ধরে। এখন সবার অপেক্ষা শেষ আরেকটা বিস্ফোরণের জন্য, যেটা ওদের সবার জীবন কেড়ে নেবে,পুড়িয়ে দেবে এই উপত্যকাটি আবারো যখন নিরবতা নেমে এল, একটা ক্ষীণ কাশির শব্দ শুনল নাথান, শব্দটা খুবই ব্যাতিক্রমি, জঙ্গলের প্রান্ত থেকে এসেছে। পর মুহূর্তেই বুঝতে পারল নাথান । পেছনে তাকাল কাউয়ি।
“টর-টর?” জিজ্ঞেস করল নাথান, ক্ষীণ একটা আশার আলো দেখতে পেল যেন।
ঘন জঙ্গল দে করে একটা জাগুয়ার বেরিয়ে এল এমন সময়। সেই ছোপ-ছোপ দাগের প্রাণীটা নয় যেটা তাদের বন্ধু লালন-পালন করত। কালো রঙের বিরাট একটি জাগুয়ার। নিঃশব্দে হেটে এল ওটা, বাতাসে ঘ্রাণ শুকছে, ঠোট সরে গিয়ে ধারালো দাঁত বেরিয়ে আসছে, আর সেখান থেকে বের হচ্ছে বুভুক্ষার প্রতিধ্বণি।
বিকাল ৫:৩৫
কেলি তার ভাইয়ের স্ট্রেচারের পাশে হাটছে। বহনকারী দু-জন যেন ক্লান্তিহীন পেশীবহুল কোন রোবট, হেটেই চলেছে জঙ্গলের নিচু অঞ্চল দিয়ে। কেলি, যার সীমাহীন কষ্টে জর্জরিত হৃদয় ছাড়া আর কিছুই নেই, হোঁচট খাচ্ছে প্রায় প্রতিটি ডালপালার সাথেই। ফ্যাভ্রি তার এই দলটার জন্য দ্রুত একটা গতি ঠিক করে দিয়েছে। ফেলে আসা ওপরের গিরিখাদটা বিস্ফোরিত হবার আগেই সে জলাভূমিটা পার হয়ে জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে যেতে চায়।
“ঘটনার পর, মিলিটারি দলটি ওখানে উড়ে যাবে, মলের দিকে মাছির ঝাঁক যেভাবে যায় সেভাবে,” সতর্ক করে দিয়েছিল ফ্যাভ্রি। “তাই অবশ্যই ঘটনার আগেই ভালভাবে সরে পড়তে হবে আমাদের।”
কেলিও এরইমাঝে আড়ি পেতে কারো কারো কথাবার্তা শুনেছে। পর্তুগিজ আর স্প্যানিশের মিশেলে বলা কথাবার্তায় মোটামুটি একটা ধারণা পেয়েছে সে তাদের পরের গতিবিধি সম্পর্কে। লুই অন্য একটা দলকে রেডিওযোগে মোটরবোট নিয়ে তৈরি থাকতে বলেছে নদীতে, এখান থেকে একদিনের হাটাপথ দূরত্ব সেই নৌকার কাছে পৌছাতে। একবার সেখানে পৌছাতে পারলে তাদের গতি আরও বাড়াতে পারবে তারা।
কিন্তু প্রথমে তাদেরকে নদী পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে কারো চোখে ধরা না পড়ে, আর তাই গতিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ । কারো ধীরে চলা মেনে নেবে না লুই, এমনকি কেলিরও না । বজ্জাতটা ম্যানুয়েলের ছোট চাবুকটা হাতিয়ে নিয়েছে, ওটা ছুঁড়ছে কিছুক্ষণ পরপর লাইন ধরে এগুনোর সময়, যেন সবাই তার দাস আর সে হল মুনিব, মাতব্বরি করছে সবার ওপর। কেলি এরইমধ্যে ওটার তীক্ষ্ণ আঘাত হজম করেছে একবার যখন পাহাড়ের খাদে প্রথম বিস্ফোরণটা হয়েছিল। পেছনে হওয়া সেই বিস্ফোরণের শব্দের ধাক্কা সামলাতে না পেরে পড়ে গিয়েছিল সে। হতাশা আর ভয় এমনভাবে ঘিরে ধরেছিল তাকে যে একটু নড়তে পারছিল না। তারপর যেন আগুন এসে আঘাত কল তার কাঁধে। চাবুকের অগ্রভাগটা তার শার্টের কাপড় ভেদ করে চামড়ায় গিয়ে আঘাত করে। তারপর থেকে সে ভাল করেই জানে থেমে যাওয়ার পরিণতি কি হতে পারে।
ফ্রাঙ্ক তার স্ট্রেচার থেকে কথা বলল। “কেলি?” ভায়ের দিকে ঝুঁকে গেল সে। “এখান থেকে মুক্তি পাব আমরা,” জড়ানো কণ্ঠে বলল সে।
তার ভাই প্রথম দিকে বাধা দেওয়া সত্ত্বেও সে তাকে কিছু ডেমেরুল দিয়েছে ইয়াগার হাসপাতাল কক্ষ থেকে বের হবার আগে । সে চায় নি তার ভাই এই নির্দয় মানুষগুলোর টানহেঁচড়ার কারণে কষ্ট পাক।
“আমরা পারব…”
মাথা নাড়ল কেলি, কল্পনা করল তার হাতজোড় বাধা নয়, আর সে তার ভায়ের হাতে হাত রাখছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কম্বলের নিচে ফ্রাঙ্কের পা দুটোও স্ট্রেচারের সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা। ঢুলুঢুলু চোখে ফ্রাঙ্ক তার বোনকে সান্ত্বনা দিয়ে গেল। “নাথান…আর বাকি সবাই…একসাথে একটা উপায় বের করবেই…ওরা মুক্তি পাবে..উদ্ধার করবে…” তার কথাগুলো অসংলগ্ন শোনাল মরফিনের সক্রিয়তার কারণে।
পেছনের দিকে তাকাল কেলি। আকাশ প্রায় সবটুকুই ঢেকে গেছে সবুজের আছাদনে, তারপর ফাঁক-ফোকড় দিয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডুলি দেখতে পেল সে, উপত্যকার নিচু অঞ্চল থেকে উঠছে ওপরের দিকে। সে তার ভাইকে আর এটা বলল না যে, অসংখ্য বিস্ফোরক পুঁতে দেয়া হয়েছে এই প্রাচীন জঙ্গলের প্রায় পুরোটা জুড়ে। তাদের পুরনো বন্ধুদের কাছ থেকে কোন সাহায্য আসবে এমনটা প্রত্যাশা করা অবাস্তব ছাড়া কিছুই না। সামনে হাটতে থাকা ফ্যাভ্রির পেছনটা দেখল কেলি। তার সকল ভাবনাজুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে কেবল একটাই শব্দ- প্রতিশোধ। যে করেই হোক নাথানকে দেয়া প্রতিজ্ঞা সে রাখবেই। লুই ফ্যাভ্রিকে সে হয় মারবে নয়তো মারতে গিয়ে নিজে মরবে।
বিকাল ৫:৫৮
নাথান দেখল বিরাট কালো জাগুয়ারটা ধীর পদক্ষেপে হেটে আসছে খোলা জায়গাটার মাঝ দিয়ে। একাই আসছে ওটা। নাথান ওটাকে চিনতে পারল, জাগুয়ারদের যে দলটা তাদের আক্রমণ করেছিল সেটার দলপতি ছিল এই জাগুয়ারটি । এক স্ত্রী-জাগুয়ার। লুইর দেয়া বিষাক্ত খাবার থেকে কোনভাবে বেঁচে গেছে সে আর এখন আবার ফিরে এসেছে নিজের জন্মভূমিতে সহজাত আকর্ষণ।
সার্জেন্ট কসটস দম ফুরিয়ে আর্তনাদ করে উঠল “দিনটা আজকে ভাল থেকে আরও ভাল হচ্ছে।”
দৈত্যাকার প্রাণীটি চোখের সামনে বন্দী মানুষগুলোকে দেখল। পুরোপুরি প্রস্তুত খাবারের সমারোহ। সেই বিশেষ পাউডার না থাকায় স্বয়ং ব্যান-আলিরাই ঝুঁকির মুখে এখন। এই কালো দেবতা যাকে ইয়াগা তৈরি করেছিল তাদেরকে রক্ষা করার জন্য এখন পরিণত হয়েছে ভক্ষকে। প্রাণীটা এগিয়ে আসছে তাদের দিকে ধীরে ধীরে, মাথাটা নিচু রেখে, লেজটা এদিক ওদিক নাড়াতে নাড়াতে। তখনই জাগুয়ারটার পেশীবহুল কঁাধের ওপর দিয়ে এক জোড়া আগুনের ঝলক দেখা গেল। টর-টর জঙ্গলের দেয়াল ভেদ করে লাফিয়ে এসে পড়ল এটার সামনে। ভয়ের কোন লক্ষণ না দেখিয়েই টর-টর ওটাকে পাশ কাটিয়ে নাথান এবং অন্যদের দিকে ছুটে এল। ওটার প্রাণচঞ্চল আবির্ভাবের ধাক্কায় একপাশে পড়েই গেল নাথান । জাগুয়ারটার মাস্টার বেঁচে নেই এখন, তাই যেকোন সময় থেকে অনেক বেশি নিশ্চয়তা আর সান্ত্বনা খুঁজে ফিরছে তার পুরনো এই বন্ধুদের সাথে যোগ দিতে পেরে।
নাথানের শ্বাস আরও একটু রোধ হল। “ভাল…ভাল ছেলে, আমাদের টর-টর।”
বড় জাগুয়ারটা পেছন দিকে হেলে গেল, দেখছে এই অদ্ভুত দৃশ্য। টর-টর নাথনের গা ঘেষে দাঁড়াল একটু আদর পেতে, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে সবকিছু ঠিক আছে। হাতপা বাঁধা অবস্থায় নাথান ওটার আহ্বানে সাড়া দিতে পারছে না, কিন্তু একটা বুদ্ধি এল তার মাথায়। একটু ঘুরে গেল নাথান, ফাসটা আরও একটু আটকে গেল গলায়। তারপর দড়িটা তুলে ধরল জাগুয়ারটার সামনে। বাঁধনটা শুকে দেখল টর-টর।
“কামড়ে দাও ওটা,” জোর দিয়ে বলল, বাধা কজি দুটো একটু দোলাল সে। তারপর তোমাকে আদর করতে পারব, সোনা, কামড়াও…”
হাতটা চেটে দিলে টরটর তারপর তার কাঁধ শুঁকল। হতাশায় আর্তনাদ করে উঠল নাখান । তারপর ওটার কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকাল। দৈত্যাকার জাগুয়ারটা এগিয়ে এসে টর-টরকে ঠেলে একটুখানি সরিয়ে দিল, গরগর শব্দ আসছে ওটার গলা থেকে। জমে গেল নাখান। জাগুয়ারটা এসে ওর হাতের যেখানটায় টর-টর চেটেছিল ঠিক সেখানটা শুঁকল, তারপর চোখ তুলে তাকাল নাথানের দিকে। কালো চোখজোড়া যেন সব ভেদ করে দেখে নিচ্ছে। নাথান নিশ্চিত, প্রাণীটা তার পায়ের কাছে পড়ে থাকা মানুষটার অসহায়ত্বটা বুঝতে পারছে। তার আরও মনে পড়ল কিভাবে এই প্রাণীটা ফ্রাঙ্কের পা দুটো কেটে নিয়ে গিয়েছিল।
জাগুয়ারটা নাথানের হাত আর পায়ের কাছে মাথা নামিয়ে আনল । একটা গরগর শব্দ হল ওটার ভেতর থেকে। খুব তীব্র একটা টান অনুভব করল নাথান, তারপরই এক ঝটকায় টেনে ফেলে দেওয়া হল তাকে মাটিতে, আরও চেপে গেল গলার দড়িটা। এক মুহূর্তের জন্য কল্পনা করল তাকে খেয়ে ফেলার আগেই কি ফাঁস আটকে মারা যাবে সে। প্রার্থনা করল যেন অন্য জাগুয়ারটা আসে এখন। তেমন কিছু ঘটল না, নাথানকে টেনে আরও একটু ঘুরিয়ে দেওয়া হল, আরও একটু কুঁচকে গেল সে, তারপর টের পেল তার বাহুজোড়া আলগা হয়ে গেছে। সুযোগ কাজে লাগিয়ে নাথান ঘুরে গিয়ে দুটো ঝাঁকুনি দিল, তারপর বসে পড়ল সে। দেখতে পেল একটা দড়ির প্রান্ত ঝুলছে তার কব্জি থেকে। জাগুয়ারটা তাকে মুক্ত করেছে।
এক ঝটকায় গলার ফাঁসটা খুলে ফেলল সে , বড় জাগুয়ারটা দেখছে তাকে। টর-টর একটুখানি চেটে দিল জাগুয়ারটার একপাশ, তার প্রতি একটু ভালবাসা দেখাল যেন। তারপর এগিয়ে এল নাথানের দিকে। দড়িটা খুলে সে একপাশে ছুড়ে ফেলে দিল । পা দুটো এখনো বাঁধা, সেগুলো মুক্ত করার আগে এক বন্ধুকে ধন্যবাদ দেবার আছে তার ।
টর-টর এগিয়ে এসে তার লোমশ মাথাটা গুজে দিল নাথানের বুকে। সে-ও পরম স্নেহে আদর করে দিল কানের দু-পাশের বিশেষ জায়গায়। আরাম পেয়ে গরগর শব্দ করল ওটা।
“এইতো ভাল ছেলে…দারুণ করেছ তুমি। টর-টরের মাথাটা তুলে দিয়ে নাথান তাকাল জ্বলজ্বল করতে থাকা চোখ দুটোর দিকে। ম্যানুয়েলকেও অনেক ভালবাসতাম আমি,” বিড়বিড় করে বলল সে। নাকটা দিয়ে একটু ঘষা দিল নাথানের হাতে, ঘ্রাণ শুকছে ওটা। নাথানও একটু আদরের শব্দ করল ওটার প্রতি। একটুখানি সরে গেল জাগুয়ারটা। এবার নাথান তার পা-দুটো মুক্ত করতে পারবে ।
টর-টর থেকে একটু দূরেই কালো জাগুয়ারটা বসে আছে অলস ভঙ্গিতে। টর-টর ম্যানুয়েলের মৃত্যুর পর খুব সম্ভবত এই বাঘিনির কাছে চলে গিয়েছিল, তারপর পথ দেখিয়ে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছে তাকে। দু-রাত আগে জাগুয়ারদের আক্রমণের পর ম্যানুয়েল যা বলেছিল আসলে তা-ই সত্যি। এই দুই তরুণ-তরুণীর মাঝে অবশ্যই একটা ভাবের আদান-প্রদান হয়েছে। হয়তো তাদের এই বন্ধনটা উভয়ের দুঃখের জন্য আরও বেশি মজবুত হয়ে গেছে । টর-টর হারিয়েছে তার মাস্টারকে, আর স্ত্রী-জাগুয়ারটা হারিয়েছে তার দলের সবাইকে। উঠে দাঁড়িয়ে কাউয়িকে মুক্ত করল নাথান। তারপর তারা দুজনে মিলে অন্যদেরকে মুক্ত করল এক এক করে। দাখিকে মুক্ত করার সময় নাথান ভাবল এই ইন্ডিয়ানটাই প্রধানত দায়িত্ব পিরানহা এবং পঙ্গপালের ঝাঁক তাদের দলের উপর লেলিয়ে দেবার জন্য কিন্তু এখন আর তার মধ্যে এটা নিয়ে কোন ক্রোধ রইল না। ইন্ডিয়ানটা শুধু তার গোত্রের মানুষগুলোকে রক্ষা কর চেষ্টা করেছিল, যদিও বাস্তবে ঘটনা উল্টে গেছে। দাখিকে দাঁড় করাল নাথান, ধোঁয়ায় ঢাকা বিধ্বস্ত গ্রামটির দিকে চেয়ে আছে সে। এই জঙ্গলের প্রকৃত শত্রু আসলে কে?
নাথানকে আলিঙ্গন করুল দাখি।
“এখনই আমাকে ধন্যবাদ দিতে হবে না,” নাথান বলল । সমস্ত জায়গাটাজুড়ে ইন্ডিয়ানদের বাঁধন খোলা হচ্ছে কিন্তু নাথানের মনোযোগ আটকে আছে নয়টি শক্তিশালী নাপাম বোমা পুঁতে রাখা বিশাল গাছটির দিকে।
সার্জেন্ট কসটস তার পাশ দিয়ে যাবার সময় দড়ির দাগ বসে যাওয়া কজিগুলো ডলতে লাগল । “আমি যাচ্ছি বোমাগুলো নিষ্ক্রিয় করতে।”
মাথা নেড়ে সায় দিল নাথান। ক্যারেরা তার শুকিয়ে রাখা অস্ত্রটা খুঁজতে যাচ্ছে। কাছেই মুক্ত হওয়া ব্যান-আলিরা জড়ো হয়েছে জাগুয়ার দুটোর চারপাশে। দু-জনই ছায়ায় শুয়ে জিরিয়ে নিচ্ছে একটু, চারপাশের মানুষের দিকে কোন খেয়াল নেই তাদের। কিন্তু নাথান দেখল বড় জাগুয়ারটা চারপাশের সবকিছু কেমন তীক্ষ দৃষ্টি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে । তার চারপাশের এই মানুষগুলোকে হারতে দেবে না সে।
আনা এবং কাউয়ি যোগ দিল নাথানের সাথে। “মুক্তি তো পেলাম কিন্তু এখন কি করব?” জিজ্ঞেস করল প্রফেসর।
মাথা দোলাল নাথান। আনা তার বাহু দুটা আড়াআড়িভাবে ধরে আছে।
“কি হয়েছে তোমার?” জিজ্ঞেস করল নাথান তার গভীরভাবে কুঁচকে থাকা ভ্র জোড়া দেখে।
“রিচার্ড জেন। আমি যদি এই নরক থেকে বের হতে পারি বিদায় জানাব টেলাক্সকে।”
এই খারাপ পরিস্থিতিতেও হাসল নাথান। “আমিও তোমার পেছনেই থাকব আমার নিজের পদত্যাগপত্রটা নিয়ে।”
কিছুক্ষণ পর সার্জেন্ট কসটস ফিরে এল তার স্বভাবসুলভ কাঠিন্যতা নিয়ে। “বোমাগুলোর ধরণ বদলে ফেলা হয়েছে, আর কিছু স্থাপন করা হয়েছে লুকানো জায়গায় । আমি ওগুলোর বিস্ফোরণ থামাতেও পারছি না আবার সবগুলোকে খুঁজেও পাচ্ছিনা।”
“তুমি কিছুই করতে পারবে না ওগুলোর?” জিজ্ঞেস করল কাউয়ি।
মাথা দোলাল রেঞ্জার। “ঐ ফরাসি বাস্টার্ডদের দলটাকে একটু প্রশংসা না করে পারছি না। বিরাট কাজ করে ফেলেছে ওরা, ভাবতেও পারছি না।”
“কত সময় আছে আর?” জিজ্ঞেস করল আনা।
মাত্র দু-ঘন্টারও কম। ডিজিটাল টাইমারে বিস্ফোরণের সময় সেট করা হয়েছে আটটায়।”
ভ্রু কুঁচকে তাকাল নাথান গাছের দিকে। “তাহলে এখন থেকে বেরুবার অন্য কোন পথ খুঁজতে বা কোন একটা আশ্রয়ের জায়গা খুঁজতে হবে।”
“আশ্রয়ের কথা ভুলে যাও,” কসটস বলল। “ঐ ওগুলো ফাটার আগেই যত দূরে সম্ভব চলে যেতে হবে। এমনকি ফ্যাভ্রির দলের রেখে যাওয়া বোমাগুলোর কথা যদি বাদও দাও তারপরও আমাদের নয়টা নাপাম বোমাই যথেষ্ট এই অঞ্চলটা উড়িয়ে দেবার জন্য।”
“আচ্ছা, দাখি কোথায় গেল?” নাথান বলল । হয়তো এখান থেকে বের হবার অন্য কোন পথের কথা সে জানতে পারে।” কাউয়ি ইয়াগার প্রবেশপথের দিকে দেখাল। “শামানের অবস্থা পরীক্ষা করতে গেছে।”
মাথা নাড়ল নাথান, মনে পড়ে গেল বেচারা শামানের কথা জেন তার পেটে গুলি করেছে। “আচ্ছা চল, দেখা যাক দাখি দরকারি কিছু বলতে পারে কিনা।”
কাউয়ি এবং আনা অনুসরণ করল তাদের। কসটস ইশারা করে তাদের এগিয়ে যেতে বলল। “আমি বোমাগুলো আরও পরীক্ষা করে দেখছি, দেখি কিছু করা যায় কিনা।”
দ্রুত পা চালিয়ে গাছের ভেতর ঢুকতেই সেই পুরনো মিষ্টি ঘ্রাণ ঘিরে ধরল তাকে। নীল রঙের হাতের ছাপ দেয়া জায়গা পেরিয়ে গেল তারা। কাউয়ি একটু জোরে হেটে নাথানকে ধরল। “আমি জানি সবার মাথায় শুধু এখান থেকে পালাবার চিন্তা ঘুরছে কিন্তু ছড়িয়ে পড়া রোগটার কি হবে সেই খেয়াল আছে কারো?”
“যদি এখান থেকে বেরুনোর কোন পথ খুঁজে পাই,” বলল নাথান, “তাহলে যতটা পারি বেশি পরিমাণে নানা রকম গাছ-গাছড়ার নমুনা সাথে করে নিয়ে নেব। সর্বোচ্চ এটাই করতে পারি। আর এই আশা রাখতে হবে, সঠিক গাছটি খুঁজে পাব আমরা।”
আহত বোধ করল কাউয়ি। সন্তুষ্ট হতে পারল না নাথানের কথায়, কিন্তু এটা ছাড়া আর কোন মিথ্যা আশাও নেই। রোগটার কোন এক ওষুধ এখানে আবিষ্কার হলেও তাতে বাকি দুনিয়ার কাজে আসবে না যদি না তারা নিজেরাই জানে বাঁচে।
পেঁচানো রাস্তা ধরে আরও একটু ওপরে উঠতেই পায়ের শব্দ শুনতে পেল তারা । নাথান তাকাল কাউয়ির দিকে। কেউ একজন আসছে। হঠাৎ এক বাঁক থেকে হাজির হল দাখি, তাদেরকে সামনে পেয়ে চমকে গেছে খানিকটা। সে দ্রুত কথা বলতে শুরু করল নিজের ভাষায়, এমনকি কাউয়িও সবটা বুঝতে পারল না।
“ধীরে বল, ধীরে,” বলল নাথান ।
দাখি এক পা এগিয়ে নাথানের হাতটা ধরল । “উইশাওয়ার পুত্র, তুমি আসো।” নাথানকে ওপরের দিকে টেনে নিতে শুরু করল সে।
“তোমার শামান ভাল আছে?”
মাথা নাড়ল দাখি।“সে বেঁচে আছে, কিন্তু অসুস্থ…খুবই অসুস্থ।”
“আমাদেরকে নিয়ে চল তার কাছে,” বলল নাখান।
নিশ্চিত পরিত্রাণ পেল ইন্ডিয়ানটি। প্রায় দৌড়েই এগোল তারা। অল্প সময়ের মধ্যেই গাছের শীর্ষে থাকা হাসপাতাল ওয়ার্ডে ঢুকে পড়ল। নাথান দেখল শামান একটা হ্যামোকে শুয়ে আছে। বেঁচে থাকলেও তার অবস্থা ভাল দেখাচ্ছে না। শরীরের চামড়া হলদে হয়ে গেছে, ঘেমে চকচক করছে। সত্যি খুবই অসুস্থ। তাদের আসতে দেখে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা মানুষটি উঠে বসল, যদিও এটা করতে গিয়ে অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে হল তাকে। শামানটি দাখিকে কোথাও থেকে কিছু একটা আনার জন্য নির্দেশ দিল, তারপর তাকাল নাথানের দিকে। চোখজোড়া স্থির কিন্তু স্বচ্ছ। নাথান দেখল হ্যামোকের নিচ থেকে দড়ি ঝুলে মেঝেতে গিয়ে পড়েছে। এমন মরনাপন্ন মানুষকেও লুইর লোকগুলো বেঁধে রেখে গেছে।
শামান নাথানের দিকে আঙুল তুলল, “তুমি উইশাওয়া…মানে তোমার বাবার মত।” নাথান না বলার জন্য উদ্যত হল, সে অবশ্যই কোন শামান নয় কিন্তু বাধা দিল কাউয়ি। তার কথায় সায় দাও, হ্যা বল,” জোর দিয়ে বলল সে।
কাউয়ির কথা মেনে নিয়ে মাথা নেড়ে সায় দিল সে। নাথানের সম্মতি শামানকে স্বস্তি দিল অনেকখানি। “ভাল,” বলল শামানটি।
দাখি ফিরে এল চামড়ার একটা থলে এবং এক ফুটের মত লম্বা দুটো খড়ের নল নিয়ে। সব কিছু তার গোত্রপ্রধানের সামনে বাড়িয়ে দিলেও শামানের পক্ষে হাত বাড়িয়ে নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ল। বেশ দুর্বল হয়ে গেছে সে। দাখিকে ইশারা করে কিছু বোঝাল লোকটি।
বুঝতে পেরে দাখি চামড়ার ব্যাগটা তুলে ধরল নেতার সামনে।
“জাগুয়ারের অণ্ডকোষের থলি শুকিয়ে বানানো হয়েছে ওটা,” কাউয়ি বলল ব্যাগটাকে দেখিয়ে ।
“প্যারিসে এটা খুব জনপ্রিয়,” বিরক্তির সাথে বলল নাথান ।
আঙুল চালিয়ে পাউচটা খুলল শামান। ভেতরে গাঢ় লাল রঙের পাউডার। বিছানায় বসেই নির্দেশনা দিতে শুরু করল সে। ভাষান্তর করতে থাকল কাউয়ি, তবে বিচ্ছিন্ন দুএকটা শব্দ ধরতে পারল নাথান।
“সে এই পাউডারকে বলছে তল-নে-ইয়াগা।” নাথান বুঝতে পারল-মাতার রক্ত।
দাখি যখন কিছু পাউডার নল দুটোর মাঝে ঢুকাতে ব্যস্ত কাউয়ি তাকাল নাথানের দিকে। “তুমি জান কি ঘটতে যাচ্ছে, জান না?”
অনুমান করতে পারল নাথান ।“এটা ইয়ানামামো ড্রাগ এপেনার মত।”
অনেক বছর ধরে, সে বিভিন্ন ইয়ানোমামো গোত্রের মানুষের সাথে থেকেছে, তাকে অনেকবারই আমন্ত্রণ জানান হয়েছে এই এপেনার বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানে। এপেনা, যার অর্থ সূর্যের বীর্য এক রকম ভ্রম সৃষ্টিকারী মাদক, ইয়ানোমামো শামানরা এটা ব্যবহার করে পরকালের জগতে প্রবেশ করতে। বেশ শক্তিশালী জিনিস, বলা হয় এটা গ্রহণ করলে বনের ক্ষুদ্র মানুষকে ডেকে নিয়ে আসে যাদেরকে ইয়ানোমামো ভাষায় বলা হয় হেকুরা, এই কল্পিত হেকুরা-ই শামানকে চিকিৎসাবিদ্যা শিখিয়ে দেয় ঘোরের মাঝে থাকাকালীন সময়টুকুতে। কৌতুহলবশত নাথান একবার গ্রহণ করেছিল এই ড্রাগ, তবে তার শুধু তীব্র মাথা-ব্যাথা হয়েছিল, আর চোখে দেখেছিল নানান রঙের ঘুর্ণি । তাছাড়া ড্রাগটা নেবার পদ্ধতি তার পছন্দ হয় নি তাই আর ওটা নেয় নি সে। নাক দিয়ে ওটা টেনে নিতে হয় ভেতরে। পাউডার ভরা পাইপ দুটোর একটা নাথানকে এবং অপরটা শামানকে দিল দাখি। ব্যান-আলি প্রধান নাথানকে তার হ্যামোকের কাছে নিচু হয়ে বসার জন্য ইশারা করল ।
তার কথা মেনে নিল নাথান । কাউয়ি সতর্ক করে দিল তাকে। “শামান জানে তার মৃত্যু আসন্ন। সে এখন যা করছে, যা দিচ্ছে তা কিন্তু সাধারন কোন আচারাদি নয়। আমার মনে হয়, সে তোমার ভেতর তার সব বিদ্যা, ক্ষমতা আর দায়িত্ব দিয়ে দিতে চাইছে, তোমার নিজের জন্য, এই গ্রামের জন্য, এই গাছের জন্য।”
“আমি এটা নিতে পারব না,” কাউয়ির দিকে তাকিয়ে বলল নাথান ।
“অবশ্যই নিতে হবে । তুমি যখন শামান হয়ে যাবে এই গোত্রের সব গোপন বিষয় তোমার কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে। তুমি কি বুঝতে পারছ ঐটার অর্থ কি?”
লম্বা একটা দম নিয়ে মাথা নাড়ল নাথান। “প্রতিষেধক।”
“ঠিক তাই, প্রতিষেধক। যেটা আমরা খুঁজছি অগণিত মানুষের জন্য ।”
এগিয়ে এসে হ্যামোকের পাশে বসে পড়ল নাথান । শামান দেখিয়ে দিল তাকে কি করতে হবে। এটাও সেই ইয়ানোমামোদের পদ্ধতির মতই। শামান তার পাউডার ভরা নলটির একপ্রান্ত নাকের ভেতর ঢুকিয়ে দিল খানিকটা। অন্যপ্রান্তটি নাথানের মুখের কাছে এগিয়ে দিল। নাথানের কাজ হবে নলের মুখে জোরে ফু দিয়ে পাউডাটুকু নাকের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়া। আবার তার ক্ষেত্রেও একই কাজটি করবে শামান। নাথানের নাকে নলের এক প্রান্ত ঢুকিয়ে দেবার পর বাকি প্রান্তটা থাকবে শামানের মুখের কাছে। তারপর দুজন এক সাথে পাইপ দুটোয় ফু দিয়ে ভেতরের পাউডারটুকু দু-জনের নাসারন্ধ্রে ঢুকিয়ে দেবে।
একটা হাত উঁচু করে ধরল শামান। দু-জনেই লম্বা দম নিল। এবার শুরু করা যাক…ইন্ডিয়ানটি তার হাত নামিয়ে আনলে নাথান দ্রুত পাইপে ফুঁ দিয়ে ভেতরের পাউডারটুকু বের করে দিল, একই সাথে নিজের নাকের মধ্যেও বাতাসের তীব্র একটা আঁকুনি এসে লাগল। তার ফুঁ দেয়া ভালভাবে শেষ না হতেই মাদকটা তার ভেতরে আঘাত করল ।
একটু পেছনে সরে গেল নাথান। আগুনের জ্বলন্ত এক শিখা ছড়িয়ে পড়ল মাথার খুলির ভেতরে, তারপর শুরু হল অন্ধ করে দেবার মত যন্ত্রণা। মনে হল যেন তার মাথার পেছনের অংশটা কেউ উড়িয়ে দিয়েছে। চারপাশের সব যেন ঘুরছে, দমটাও বন্ধ হয়ে আসছে । অনেক উঁচু থেকে নিচে তাকালে যেমন অনুভূতি হয় তেমন একটা অনুভূতি গ্রাস করছে তাকে। মনের একটি জগত খুলে গেছে আর সে পড়ে যাচ্ছে তার ভেতর। পড়ছে তো পড়ছেই, অন্ধকারের ঘুর্ণিপাকে হারিয়ে যাচ্ছে সে, একইসাথে দেখতে পাচ্ছে আলোর ঝলকানিও।।
দূরে কোথাও কে যেন তার নাম ধরে ডাকছে, কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বের করতে হবে এটাও ভুলে গেছে সে। হঠাৎ তার পড়ন্ত শরীরটা আছড়ে পড়ল এই পরাবাস্তব জগতের শক্ত কিছুর ওপর। চারপাশের ঘিরে থাকা আঁধারের দেয়াল ভেঙে গেল কাঁচের মত। টুকরো হওয়া মাঝরাতের বিভিন্ন অংশগুলো অদৃশ্য হয়ে গেল মুহুর্তেই। দৃষ্টির মধ্যে যেটুকু আছে তা শুধু ব্যতিক্রমি এক বৃক্ষের অবয়ব। মনে হল যেন অন্ধকার কোন পাহাড়ের চূড়া ছাড়িয়ে বড় হচ্ছে ওটা। নাথান এগিয়ে গেল ওটার সামনে। ভাল করে তাকাতেই আরও কিছু চোখে পড়ল। গাছটি ধীরে ধীরে ত্রিমাত্রিক একটা আকার ধারণ করল, ছোট পাতার অবয়ব, শাখা প্রশাখার ধাপ, ছোট ফলের গুচ্ছ। ইয়াগা। তারপর পেছনে, পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ক্ষুদ্রাকৃতির অবয়ব দৃষ্টিতে এল, সবগুলো একসারিতে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠে যাচ্ছে গাছটির দিকে। হেকুরা, ঘোরের মধ্যেই ভাবল নাথান ।
কিন্তু নাথান তাদের দিকে একটু ভেসে যেতেই গাছের মতই ছোট অবয়বগুলো আস্তে আস্তে পরিস্কার হয়ে উঠল । পরমুহূর্তেই সে বুঝল ছোট অবয়বগুলো আসলে কোন হেরা বা ক্ষুদে-মানবের নয়, বরং বিভিন্ন রকম প্রাণীদের একটা সারি। ইলক, বানর, স্লথ, ইঁদুর, কুমির, জাগুয়ার এবং আরও অজানা কিছু জন্তু। ছায়াময় অবয়বগুলোর মাঝে কোথাও কিছু লম্বা কাঠামো চোখে পড়ল তার । ওগুলো নারী ও পুরুষ, কিন্তু নাথান জানে ওগুলো হেতু নয়। সমগ্র দলটি গাছের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । ছায়াময় গঠনগুলো গাছের অবয়বের সাথে মিলে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে তারা? তারও কি অনুসরণ করা উচিত ছায়াগুলোকে
তারপর গাছের অন্যপ্রান্ত হতে, অবয়বগুলো আবার সামনে ঘুরে এল, তবে এবার পরিবর্তিত রূপে। ওরা আর ছায়াঘেরা ছোট অবয়ব নেই, রূপান্তরিত হয়েছে চমৎকার
উজ্জ্বল আলোর ঝলকানিতে। উজ্জ্বল দলটি ছড়িয়ে গিয়ে গাছের চতুর্দিকে ঘিরে দাঁড়াল। মানুষ ও পশু রক্ষা করছে তাদের মা-রূপী গাছকে।
নাথান আরেকটু এগিয়ে যেতেই অনূভব করল সময় খুব দ্রুত বইতে শুরু করেছে । সে খেয়াল করল মানুষগুলোর উজ্জ্বলতা কমে এলেও তারা আর নতুন করে গাছের ভেতর ঢুকছে না। তারা এখন গাছের ফল খাচ্ছে, নতুন করে দ্যুতি পাচ্ছে সবাই, একবার তরতাজা হওয়ার পর আবার গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ইয়াগার সন্তানদের সারিতে। এমন ঘটনা বার বার ঘটতে থাকল। পুরনো রেকর্ডের মত ছবিগুলো ম্লান হচ্ছে আবার সতেজ হচ্ছে, তারপর আবার ম্লান। প্রতিবারই আগের বারের থেকে একটু বেশি আলো হারাচ্ছে অবয়বগুলো, তারপর একসময় আর মোটেই দেখা যাচ্ছে না ।
নাথান?” একটা কণ্ঠ ডাকল তাকে।
কে? প্রশ্নকারীকে খুঁজল নাথান । কিন্তু অন্ধকার ছাড়া কিছুই নেই চারদিকে। নাথান, শুনতে পাচ্ছো আমার কথা?”
হ্যা, কিন্তু তুমি কোথায়? “আমার হাতটা চেপে ধর যদি আমার কথা শুনতে পাও।” কণ্ঠের দিকে এগিয়ে গেল নাথান, আঁধার থেকে বেরুবার পথ খুঁজছে সে।
“দরুন, নাথান । এবার চোখ মেলো।” খুব সংগ্রাম করতে হল তাকে আদেশটা মানার জন্য । “খুব জোরাজুরি কর না…ধীরে ধীরে চোখ দুটো মেলো।”
আবারো অন্ধকার ভেঙে গেলে চোখ ধাধানো আলোতে নাথানের চোখ ঝলসে যাবার উপক্রম হল। মুখটা হাঁ করল সে, বুক ভরে বাতাস নিতে চাইছে। মাথার ভেতর তীব্র যন্ত্রণা অনুভব হল। পরে ভেজা চোখ দুটো একটু মেলতেই তার বন্ধুদের মুখগুলো দেখতে পেল, তার ওপর ঝুঁকে আছে সবাই।
“নাথান?” কাশল সে, তারপর মাথা নড়ল। “কেমন বোধ করছ এখন?” “তোমার কি মনে হচ্ছে আমার কেমন লাগছে?” শোয়া থেকে উঠে বসল সে।
“কি অভিজ্ঞতা হল তোমার?” জিজ্ঞেস করল কাউয়ি । তুমি কিন্তু বিড়বিড় করছিলে।”
“মুখ থেকে লালাও বের হচ্ছিল,” যোগ করল আনা,তার পাশে বসে।
মুখ মুছল নাথান। “হাইপার স্যালিভেশন..একটা অ্যালকালয়েড হেলুসিনোজেন।”
“কিছু দেখেছ তুমি?” জিজ্ঞেস করল কাউয়ি।
মাথা ঝাঁকাল নাথান । একটু ভুল হয়েছে। মাথার যন্ত্রণাটা তীব্র অনুভব হচ্ছে। কতক্ষশ এমন ছিলাম আমি?”
‘প্রায় দশ মিনিটঃ”। তার মনে হল যেন কয়েক ঘণ্টা।
“কি হয়েছিল?”
“আমার মনে হয় আমাকে দেখান হয়েছে রোগের ওষুধটা,” বলল নাথান।
চোখ দুটো বড় হল কাউয়ির। “কি?”।
নাথান বর্ণনা করে গেল যা যা সে দেখেছে। স্বপ্ন থেকে এটা পরিস্কার যে, এই গাছের ফলগুলো গোত্রের মানুষের স্বাস্থের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই প্রাণীগুলোর এটা দরকার নেই, মানুষের আছে।”
মাথা নাড়ল কাউয়ি, নাথানের কথাগুলো হজম করতে পেরে চোখ দুটো সরু হল তার। “তাহলে এই ফলের বীজই সব।” প্রফেসর একটু লম্বা সময় নিল, তারপর কথা বলল ধীরে । “তোমার বাবার গবেষণা থেকে আমরা জানি, এই গাছের আঠায় নতুন ধরণের একরকম প্রোটিন-প্রিয়ন রয়েছে প্রচুর পরিমাণে যেটা কোন প্রজাতির ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করে, যে প্রজাতিই এই গাছের সংস্পর্শে আসুক না কেন। আর স্বাভাবিকভাবে সেইসব বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন প্রাণীগুলো এই গাছকে রক্ষার চেষ্টা করে বা বলতে পারি গাছই। প্রাণীগুলোকে তার রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে প্রস্তুত করে। কিন্তু এমন একটা সুবিধা পেতে গেলে তার মূল্যটাও দিতে হবে চড়া দামে ।এই গাছ কখনোই চায় না তার সন্তানেরা তাকে ছেড়ে চলে যাক, আর তাই এমন একটা কিছু সে তৈরি করেছে যেটা মানুষগুলোকে চড়া মূল্য দেওয়ার হাত থেকে বাঁচাবে। অন্য প্রাণীগুলোর হয়তো এটার প্রয়োজন নেই, ওগুলো সহজাতভাবেই এখানে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, প্রয়োজনে ওগুলোকে নিয়ন্ত্রণও করা যায় । যেমনটা পিরানহা ও পঙ্গপালদেরকে করা হয় বিশেষ একরকম পাউডার দিয়ে। এই একটা অস্ত্রই যথেষ্ট ওদের জন্য। কিন্তু মানুষের আরও দৃঢ়ভাবে, আরও বুদ্ধিমত্তার সাথে বাঁচতে হবে গাছটিকে রক্ষা করার জন্য । আর তাই তাদেরকে অবশ্যই এই ফল খেতে হবে যাতে আঠা থেকে সৃষ্টি প্রিয়ন-প্রোটিনটি নিয়ন্ত্রণে থাকে। এই প্রোটিন সবসময় চাইছে শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মজবুত করতে, বড় করতে এবং অবশ্যই নতুন অস্থি গজাতে কিন্তু তার এই প্রক্রিয়া ডেকে আনে ক্যান্সার। আর তাই এই ফল গ্রহণ করতে হবে ছড়িয়ে পড়া প্রোটিনটার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে রাখতে। এই ফলের রসে অবশ্যই প্রিয়ন ঠেকানোর কোন উপাদান মানে অ্যান্টি-প্রিয়ন আছে, এমন কিছু যেটা ছড়িয়ে পড়া রোগটাকে থামিয়ে দেয়।”
দুর্বল দেখাল আনাকে। তার মানে ব্যান-আলিরা যে এখানে থাকছে সেটা তাদের কর্তব্যের জন্য থাকছে না, তারা থাকতে বাধ্য হচ্ছে এখানে, অনেকটা দাসের মত।”
মাথাটা একটু চুলকে নিল কাউয়ি । “ব্যান-ই। মানে দাস শব্দটা আগেও শুনেছি কিন্তু এখন বুঝতে পারছি কেন এটা ব্যবহার করা হয় এখানে আটকে পড়া মানুষের জন্য । একবার তোমার শরীরে প্রিয়ন ঢুকে গেল আর সাথে সাথেই এখান থেকে বেরুনোর সব পথ তোমার জন্য বন্ধ । তবু যদি চেষ্টা করো নির্ঘাত মৃত্যু হবে। আর এই ফল না খেলে প্রিয়নটা তোমার শরীরে ছড়িয়ে পড়ে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেবে, তারপর তীব্র ক্যান্সারে আক্রান্ত হবে তুমি।”
“জেকিল অ্যান্ড হাইড!” বিড়বিড় করল নাথান, “একই অঙ্গে দুই রপ।”
কাউয়ি এবং আনা তাকিয়ে রইল তার দিকে।
বাখ্যা করল নাথান, “কেলি এই প্রিয়নটার চরিত্র যেমন বর্ণনা করেছিল পুরো ব্যাপারটা তো সে-রকমই । একদিকে এটা খুব ভাল, উপকারী, কিন্তু এটা আবার বেঁকে বসলে হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতী, ম্যাড-কাউ রোগের মত।” সায় দিল কাউয়ি। ফলের রসটা এই প্রিয়নকে শান্ত রাখে, আর আমরা বিশেষ কিছু সুবিধাও পেতে থাকি প্রিয়নটার কাছ থেকে…কিন্তু যখনই আমরা ওটা খাওয়া বন্ধ করব, আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে প্রোটিনটা। ওটার বাহককে তো শেষ করবেই সাথে তার সংস্পর্শে আসা যেকোন মানুষকেও আক্রান্ত করবে। তখন বাধ্য হয়ে আবার সেই গাছের কাছেই ফিরে আসতে হবে নিজের সেবায়, গাছের সেবায়। পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে গাছটি তার নিজস্ব গোপনীয়তা বজায় রেখে চলতে চায় । কেউ যদি তার কাছ থেকে পালিয়ে যায় সেই ব্যক্তির ধারেকাছে যারা থাকবে তারাও আক্রান্ত হয়ে একসময় মারা যাবে, এভাবেই মৃত্যুর একটা চলমান ধারা রেখে যাবে রোগটি।”
সাবধান করে দেবার মত কেউই অবশিষ্ট থাকবে না,” বলল নাথান।
“ঠিক বলেছ।”
নাথানের এখন বেশ ভাল লাগছে, উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে কাউয়ি তাকে সাহায্য করল।
কিন্তু আসল প্রশ্নটা হল আমি কিভাবে এই স্বপ্নটা দেখলাম? এটা কি আমার অবচেতন মন থেকে সৃষ্টি হয়েছে? যেহেতু এই রোগের সমাধান নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনা করছি হয়তো ভ্রম সৃষ্টিকারী ড্রাগের প্রভাবে দেখা দিল তা স্বপ্নের মধ্যে? নাকি শামান কোনভাবে আমার চেতনার মাঝে ঢুকে এটা দেখিয়ে দিল? হতে পারে ড্রাগসৃষ্ট কোন রকম টেলিপ্যাথি?”
চোখেমুখে কাঠিন্যতা ভর করল কাউয়ির। “না,” বলল সে দৃঢ়ভাবে, হ্যামোকের দিকে আঙুল তলে দেখাল ।“ঐ শামান কিছুই দেখায় নি তোমাকে।” ইন্ডিয়ানটা শুয়ে আছে হ্যামোকে, তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে ছাদের দিকে। নাকের দুই চিড় দিয়ে বেয়ে পড়ছে রক্ত। দাখি মাথা নিচু করে তার পাশে বসে আছে। “সে তখনই মারা গিয়েছে। দেখে মনে হচ্ছিল মারাত্মক পর্যায়ের কোন স্ট্রোক, কাউয়ি তাকাল নাথানের দিকে। যা দেখলে, যা শিখলে তার কোন কিছুই শামানের কাছ থেকে আসে নি।”
ভাবতে কষ্ট হল নাথানের। তার মস্তিষ্ক মনে হল যেন দ্বিগুণ হয়ে গেছে, মাথার খুলিতে সেটা আঁটছে না, বেরিয়ে আসতে চাইছে। “তাহলে এটা অবশ্যই আমার অবচেতন মনের কারসাজি,” বলল সে। “ফলগুলোকে প্রথম যখন দেখলাম, আমার মনে পড়ছে ওগুলো দেখতে আনসেরিয়া টমেনটোসা’র মতো লাগছিল। যেগুলো ক্যাটস-কু নামে পরিচিত ইন্ডিয়ানরা এটাকে ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া তাড়াতে ব্যবহার করে, কখনো টিউমার সারাতেও। কিন্তু এতক্ষণ এটা ওই স্বপ্নের মাঝে দেখা বস্তুটার মাঝে মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম না । হয়তো ড্রাগের কারণে আমার অবচেতন মনের বিক্ষিপ্ত তথ্যগুলো জড়ো হতে শুরু করেছে।
“হয়তো তোমার কথাই ঠিক,”কাউয়ি বলল।
প্রফেসরের কণ্ঠের ইতস্তত ভাব ধরে ফেলল নাথান। “এছাড়া আর কি হতে পারে?”
ভ্রু কুঁচকাল কাউয়ি। “তুমি যখন ঘোরের মধ্যে ছিলে আমি তখন দাখির সাথে কথা বলছিলাম। আলি নে-ইয়াগা পাউডার আসে গাছটির শেকড় থেকে। শেকড়ের আঁশ শুকিয়ে তারপর গুঁড়ো করা হয়…”
“তো?”
“তাই বলছি, হয়তো স্বপ্নে যা দেখলে তা তোমার অবচেতন মনের কাজ নয়। এটা আগে থেকে রেকর্ড করা কোন মেসেজ। একটা দিক নির্দেশনা যেটা বলতে চাইছে, এই গাছের ফল খাও, সুস্থ থাক। সহজ সরল একটি বার্তা।”
“তুমি কি বুঝে বলছ কথাগুলো?”
“আসলে সব ঘটনা বিবেচনা কর একবার । এই উপত্যকায় বিভিন্ন প্রজাতির নতুন প্রাণী, অস্থির পুনর্জন্ম, গাছের কাছে মানুষের দাস হয়ে থাকা সবকিছুই কিন্তু এই গাছকেন্দ্রিক। আমি এই সব ঘটনার জন্য গাছকেই দায়ি করব, অন্য কিছুকে নয়।”
মাথা ঝাঁকালো নাথান ।
চিন্তিত দেখাল আনাকে। “প্রফেসরের একটা কথায় আমি খুব চিন্তিত। আমি এটা ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছি না, একটা গাছ কিভাবে ভিন্ন-ভিন্ন প্রজাতির ডিএনএ’র জন্য ভিন্ন-ভিন্ন প্রিয়ন তৈরি করতে পারে? এই বিষয়টাই তো সম্পূর্ণ অলৌকিক । কিভাবে এটা শিখল? কোথা থেকেই বা গাছটা এমন কিছু করার জন্য জেনেটিক উপকক্ষণগুলো পেল?”
কাউয়ি একটা হাত দিয়ে ঘরটার চারদিকে দেখাল। “এই গাছটার আদি শেকড়ে মিশে আছে প্যালেওজোয়িক যুগের মাটি, মানে বহু লক্ষ বছর আগে যখন এই ভূমিটা শুধু গাছ-গাছালিতে ভরা ছিল। এটার পূর্বের বংশধররা এখানে যখন জনেছিল তখন স্থলপ্রাণীরা সবে চলতে শুরু করেছে মাটির ওপর দিয়ে। সে-সময়ে এটা অন্য প্রজাতি বা প্রাণীর সাথে কোন টিকে থাকার লড়াইয়ে না গিয়ে বরং নিজেদের ক্ষমতার পরিধি আরও বিস্তৃত করার জন্য অন্য কোন নতুন ধরণের প্রজাতিকে সাহায্য করছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে। ঠিক আজকের যুগের আমাজনের অ্যান্ট-ট্রি গাছের মত।
প্রফেসর কাউয়ি তার তত্ত্ব নিয়ে এগিয়ে চলল কিন্তু নাথান দেখল প্রফেসরের কথায় আর মনোযোগ নেই তার। তার চিন্তা-ভাবনা আঁটকে আছে আনার শেষ প্রশ্নটায় । কোথা থেকে গাছটা জেনেটিক উপাদানগুলো পেল? খুব ভাল একটা প্রশ্ন। এটা খুব ভাবিয়ে তুলেছে নাথানকে। প্রজাতি ভেদে ভিন্ন-ভিন্ন প্রিয়ন তৈরি করাটা কিভাবে শিখল ইয়াগা? স্বপ্নের কথা মনে পড়ল তার। মানুষ এবং প্রাণীদের সারিটা হারিয়ে যাচ্ছিল গাছের ভেতর । কোথায় যাচ্ছিল তারা? এটা কি রুপক অর্থের চেয়েও বেশি কিছু বিশেষ কোথাও কি যাচ্ছিল তারা?
নাথানের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল দাখির ওপর, হ্যামোকের পাশে হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে আছে। এটা হতে পারে তার কল্পনার ফসল বা হতে পারে ড্রাগের প্রভাব, তবে যা-ই হোক, নাথানের মনে এটা নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। কোথাও কি এমন কিছু আছে যা এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকছে, এমন কোন জায়গা আছে কি যেখানে এখনো তাদের পা পড়ে নি? আর থাকলে সেটা কোথায়?
অল-নে-বাহ- ‘ইয়াগার রক্ত’ আসছে গাছটির শেকড় থেকে।
নাথানের দৃষ্টি সরু হয়ে গেল দাখির ওপর। তার মনে পড়ে গেল ইন্ডিয়ানটার বর্ণনা করা তার বাবার চূড়ান্ত পরিণতির কথা। খুব সম্ভষ্টির সাথে বলা হয়েছিল কথাগুলো । অনেকটা নিজের অজান্তেই ইন্ডিয়ানটার দিকে এগিয়ে গেল নাথান।
কথা থামিয়ে দিল কাউয়ি । “নাথান…?”
“পাজলের একটা টুকরো এখনো খুঁজে পাই নি আমরা,” দাখির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল নাথান। “সেই টুকরোটা পেলেই দৃশ্যটা পূর্ণ হবে। আর আমি জানি ওটা কার কাছে এখন।”
সে নিচু হয়ে বসে থাকা ইন্ডিয়ানটার কাছে গেল। মুখ তুলে তাকাল দাখি। তাদের নেতাকে হারিয়ে ভীষণ শোকার্ত সে। নাথান তার কাছে গিয়ে দাড়াতেই দাখিও দাড়িয়ে গেল।
“উইশাওয়া,” বলল মাথা নত করে, নতুন ক্ষমতা পাওয়া মানুষটিকে।
“তোমাদের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল, আমি দুঃখিত,” বলল নাথান, “কিন্তু আমাদের এখন কিছু কথা বলতেই হবে।” কাউয়ি এগিয়ে এল ভাষান্তরের কাজে সাহায্য করতে, কিন্তু নাথান এরইমাঝে মোটামুটি দক্ষ হয়ে গিয়েছে ইংরেজি ও ইয়ামোমামোর মিশ্রনে তার কথা বুঝিয়ে দিতে।
চোখ মুছে হ্যামোকটির দিকে দেখাল দাখি। “তার নাম দাখু,” হাতের তালু মৃত মানুষটার বুকের ওপর রাখল সে।“সে আমার বাবা।”
নাথান ঠোট কামড়ে ধরল। এটা তার আগেই অনুমান করা উচিত ছিল। দাখি এখন বলে দেবার পর সাদৃশ্যটা চোখে পড়ল । একটা হাত দাখির কাঁধে রাখল সে। বাবা হারানোর কষ্টটা সে ভাল করেই জানে। “আমি সত্যিই দুঃখিত, পুণরায় বলল নাথান, এবার আরও সহানুভূতির সাথে ।
মাথা নেড়ে সায় দিল দাখি, “ধন্যবাদ।”
“তোমার বাবা একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন। আমরা সেরই খুবই মর্মাহত তার এমন মৃত্যুতে, কিন্তু এই মুহূর্তে আরও বড় বিপদের মধ্যে আছি আমরা। তোমার সাহায্য দরকার।”
মাথা নত করল দাখি। “তুমি উইশাওয়া । তুমি বল…আমি কি করব।”
“আমি চাই তুমি আমাকে গাছের শেকড়ের কাছে নিয়ে চল, যেখান থেকে এই গাছকে খাবার দেওয়া হয়।”
দাখির মুখটা উঁচু হল, হঠাৎ সেখানে ভয় আর দুশ্চিন্তা করেছে।
“একটু ধীরে-সুস্থে বল, নাথান, খুব নিচু গলায় সতর্ক করে দিয়ে বলল কাউয়ি।”
“তুমি কিন্তু সরাসরি ওদের পবিত্রতম স্থানে যেতে চাইছ।”
প্রফেসরের সতর্কবাণী কানে না তুলে নাথান তার একটা হাত দাখির বুকে রাখল । “এখন আমি একজন উইশাওয়া। আমি অবশ্যই শেকড় দেখতে পারি।”
ইন্ডিয়ানটা মাথা নাড়ল। “আচ্ছা, আমি তোমাকে দেখাচ্ছি।” সে তার মৃত বাবার দিকে একবার তাকাল, তারপর ঘুরে দাঁড়াল দরজার দিকে । তারা সুড়ঙ্গের ভেতর ফিরে এল। নাথানের চিন্তায় ব্যাঘাত যাতে না ঘটে সেজন্যে আনা এবং কাউয়ি ফিসফিস করে কথা বলছে । আবারো তার মনে পড়ল ব্যান-আলি প্রতীক আর ইয়াগার পেঁচানো এই সুড়ঙ্গের মাঝে সাদৃশ্যের কথা। কি এটা কি আরও কোন অর্থ বহন করে? এটা কি সেই প্রিয়নটার গুরুত্বপূর্ণ আণবিক কাঠামোকেও প্রকাশ করছে, কেলি যেমনটা বলেছিল? আসলেই কি এই গাছ আর মানুষের মাঝে কোনরকম যোগাযোগ আছে? অনেকটা একসঙ্গে থাকা কোন স্মৃতির মত? ড্রাগের কারণে যে অভিজ্ঞতা অর্জন হল নাথানের তাতে সে শেষ কথাটার সম্ভাব্যতাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারছে না। হয়তো প্রমাণও পেতে পারে, প্রতীকটা উভয় দিকই প্রকাশ করছে ইয়াগার সত্যিকারের প্রাণ।
নাথান তার দলকে নিয়ে নেমে যাচেছদ্রুত। “কেউ আসছে” দাখি বলল, গতি ধীর করে দিয়ে। তারপর নাথানও শব্দ শুনতে পেল। পায়ের শব্দ, ধপ ধপ করে শব্দ হচ্ছে। একমুহূর্ত পরেই একটা বাঁকের আড়াল থেকে পরিচিত একটা মুখ দৃষ্টিতে এল ।
“প্রাইভেট ক্যারেরা!” বলল কাউয়ি।
মাথা নেড়ে সায় দিল রেঞ্জারটি, সুড়ঙ্গের ঢালু পথ দৌড়ে ওপরে ওঠার কারণে দম বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে তার। নাথান খেয়াল করল রেঞ্জার তার অস্ত্রটা খুঁজে পেয়েছে।
“তোমাদেরকে নিতে পাঠিয়েছে আমাকে। আর দেখতে বলেছে তোমরা এখান থেকে বেরুনোর কোন রাস্তা খুঁজে পেলে কিনা । বোমাগুলো এখনও নিষ্ক্রিয় করতে পারে নি কসটস, আর সে সম্ভাবনাও নেই।”
রেঞ্জারের কথা শুনে যেন সম্ভিত ফিরল নাথানের । অপ্রত্যাশিত কিছু কাজে এমনভাবে ডুবে গিয়েছিল যে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটাই করতে ভুলে গিয়েছিল দাখিকে এই উপত্যকা থেকে বেরুনোর অন্য কোন রাস্তা আছে কি?
“দাখি,” নাথান বলল। “আমাদের জানা দরকার এখান থেকে নিচের উপত্যকায় যাবার জন্য কোন গোপন রাস্তা আছে কিনা । তুমি কি জানো এমন কিছু?” এই কথাগুলো বোঝাতে বেশ অঙ্গভঙ্গির সাথে সাথে কাউয়ির সাহায্যেরও দরকার হল ।
কাউয়ি যখন দাখিকে বোঝাতে ব্যস্ত তখন ক্যারেরা নাথানের দিকে তাকাল একটা ভ্রু উঁচু করে । “তুমি এখনো এটা জানতে চাও নি তার কাছে?” নিচুস্বরে বলল সে। “এতক্ষণ তাহলে কি করছিলে?”
“ড্রাগস নিচ্ছিলাম,” বলল নাথান, সাময়িক সময়ের জন্য তার দিকে মনোযোগ দিয়ে আবারো ইন্ডিয়ানের কথপকথনে ফিরে এল।
অবশেষে দাখিকে মনে হল বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। “দূরে যাবে? কেন? থাক এখানে,” নিচের দিকে দেখাল সে।
“তা আমরা পারব না, দাখি,” একটু রাগের সাথে বলল নাথান।
তার পাশ থেকে আনা কথা বলল, “সে বোমাগুলোর ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না। সে তো আর জানে না, এই উপত্যাকা ধ্বংস হতে চলেছে। এমন কিছু একটা যে ঘটতে পারে সেটা তার মাথায়ই আসবে না।” “যেভাবেই হোক বোঝাতে হবে তাকে,”নাথান বলল, তারপর ঘুরে দাঁড়াল ক্যারেরার দিকে। আর এই সময়টুকুতে তুমি এবং সার্জেন্ট মিলে এই গাছের ফল সংগ্রহ করে ব্যাগে ভরে নাও, যতটা পার।”
“ফল?”
“পরে ব্যাখ্যা দিচ্ছি। যেমনটা বললাম কর…প্লিজ, মাথা নেড়ে ঘুরে দাঁড়াল সে। “কিন্তু মনে রেখ সবাই…টিক-টক।” খুব অর্থবহ একটা চাহনি দিল সে সবার দিকে, তারপর পা বাড়াল। দাখির দিকে তাকাল নাথান।
কিভাবে এই মানুষটাকে বলবে, তার এই জন্মস্থান, আবাসভূমি কিছুক্ষণের মধ্যেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে? সহজ হবে না কাজটা। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল নাথান। “চল, শেকড়ের দিকে যাওয়া যাক। পথে যেতে যেতে নাথান এবং কাউয়ি দু-জনে একসাথে দাখিকে আসন্ন বিপদটা বুঝিয়ে বলল। ইন্ডিয়ানটার সরল সন্দেহের অভিব্যক্তি মুছে গিয়ে সেখানে নেমে এল রাজ্যের ভয় । হাটার সময় বেশ কয়েক বার হোঁচট খেল, যেন জানতে পারাটাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশেষে টানেলের শেষ প্রান্তে চলে এল তারা, চারপাশে নীল রঙের হাতের ছাপ। খোলা মুখ থেকে দূরে বাইরের খোলা প্রান্তে সূর্যের আলোর রঙটা গাঢ় মধুর রঙে রূপ নিয়েছে, মনে করিয়ে দিচ্ছে সূর্যাস্তের কাছে চলে আসার কথা। সময় খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে।
“আর কোন রাস্তা আছে এখান থেকে বেরিয়ে যাবার?” পুণরায় জিজ্ঞেস করল নাথান । দাখি একটা উত্তল জায়গা দেখাল যেখানে টানেলটা শেষ হয়েছে। নীল হাতের ছাপ সারা দেয়ালে।
“এই শেকড়ের ভেতর দিয়ে আমরা যাই।”
“হ্যাঁ বুঝলাম, আমিও শেকড় দেখতে চাই, কিন্তু বের হবার রাস্তাটা কোথায়?”
নাথানের দিকে তাকাল দাখি। “শেকড়ে ভেতর দিয়ে,” আবারো বলল সে।
মাথা নাড়ল নাথান। এবার বুঝতে পেরেছে। তাদের দুটো মিশন এখন একটায় পরিণত হয়েছে। “আমাদেরকে দেখাও তবে।”
দেয়ালের কাছে এগিয়ে গেল দাখি, হাতের ছাপগুলোর ওপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে সবচেয়ে ভেতরের একটা অংশে হাত রেখে কাঁধ লাগিয়ে জোরে ঠেলা দিতেই সমগ্র দেয়ালটি একটা মূল অক্ষের উপর ঘুরে গেল, সামনে খুলে গেল নতুন একটি পথ, সেটা চলে গেছে মাটির গভীরে।
ওপরের দিকে অকাল নাথান, তার মনে পড়ে গেল নিচের এবং ওপরের অংশের জাইলেম ফ্লোয়েমের প্রবাহগুলো ঠিক মত মেলে নি। কেন সেটা তা এখন পরিস্কার। একটা গোপন দরজা। ধাঁধার উত্তরটা চোখের সামনেই ছিল সারাটা সময়। এমনকি দেয়ালের হাতের ছাপগুলো যেটা ব্যান-আলির প্রতীককে প্রকাশ করছে একত্রে সেটাও নির্দেশ করছে গোপন দরজাটার কথা। আর ছাপগুলোকে একইসাথে প্রহরীও বলা যেতে পারে যেগুলো দেয়ালের গায়ে পেঁচানো একটা আকৃতি তৈরি করে রক্ষা করছে লুকানো শেকড়কে।
আনা তার ফিল্ড জ্যাকেট থেকে ফ্লাশ-লাইটটা খুলে নিল । নিজের জ্যাকেটের ওপর হাত চাপড়াতে লাগল নাথান, কিন্তু কিছুই পেল না। কোথাও পড়ে গেছে তার নিজের লাইটটা। আনা তার নিজেরটা এগিয়ে দিল নাথানের দিকে, ইঙ্গিতটা স্পষ্ট, নাথানকে আগে যেতে হবে।
দরজার কাছে এগিয়ে গেল নাথান। একটা ভারি আর আদ্রতাপূর্ণ বাতাস এসে মুখে লাগল তার, যেন সমাধিতে আটকে থাকা বাতাস নিঃশ্বাসের সাথে বেরিয়ে এল । নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে খোলা জায়গাটার দিকে পা বাড়াল সে।
