আমাজনিয়া – ১৮
শেষ সময়ে
সন্ধা ৭:০১
আমাজন জঙ্গল
দলটা বিশ্রাম নেওয়ার ফাঁকে নিজের হাতঘড়িটা দেখে নিল লুই। উপরের উপত্যকা বিস্ফোরিত হয়ে আগুনের ঘূর্ণিপাকে পরিণত হতে আর এক ঘণ্টা বাকি। সে তার সব মনোযোগ দিয়ে জলাভূমিটির সামনে তাকিয়ে আছে। অস্তগামী সূর্য পানিতে একটি অনুজ্জ্বল রুপালী আভার সৃষ্টি করেছে।
তাদের অভিযানটি খুব দ্রুতই শেষ হচ্ছে। জলাভূমির দক্ষিণ-প্রান্তে যেখানে জঙ্গল খুব ঘন এবং নদী অনেক অংশে বিভক্ত সেখান থেকে খুব সহজেই তারা ঘন জঙ্গল দিয়ে পালিয়ে যেতে পারবে, তাতে তার কোন সন্দেহ নেই। সে পরিতৃপ্তির সাথে দীর্ঘশ্বাস ফেলল কিন্তু সাথে একটা হতাশার চিহ্নও আছে। এখান থেকে সব কিছু জলের মত সহজ। প্রতিটা সফল অভিযানের পর তার এমন অনুভূতি হয়, যেন প্রণয় শেষে শূন্যতার বোধ, ভাবলো সে। আগের চেয়ে আর বেশি ধনী হয়ে ফ্রান্স গায়ানায় ফিরে যাচ্ছে সে কিন্তু গত দু-দিনে যে উত্তেজনার মাঝে কাটিয়েছে তার মূল্য টাকায় হয় না। “জীবন এভাবেই চলবে,” বিড়বিড় করে বলল লুই । কোন না কোন মিশন থাকবেই তার জন্য ।
একটা ছোট কোলাহল তার মনোযোগ ফিরিয়ে আনলে সে দেখতে পেল দু-জন মানুষ কেলিকে মাটির উপর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। তৃতীয় ব্যক্তিটি কয়েক ফিট দূরে দুপায়ের মাঝে শক্ত করে ধরে গোঙাচ্ছে আর গড়াগড়ি খাচ্ছে। লুই লম্বা পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে গেল কিন্তু মাস্ক এরইমধ্যে সেখানে পৌছে গেছে। মুখে দাগসর্বস্ব এই কর্মীটি গোঙানো লোকটিকে তার পায়ের কাছে টেনে আনল।
“কি হয়েছে?” জিজ্ঞেস করল লুই।
মাস্ক লোকটির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “পেড্রো ঐ মহিলার জামার নিচে হাত দিয়েছিল তাই সে তার বিচিতে লাথি মেরেছে।”
লুই বিস্ময়ের সাথে মুচকি হাসল। কোমরে রাখা চাবুকটির উপর হাত রেখে আস্তে আস্তে হেটে গেল কেলির কাছে । দু-জন গ্রেফতারকারীর একজন তার চুল শক্ত করে ধরে রেখেছে। পেছন থেকে তার মাথা নিচের দিকে টানছে যেন মুখটা ওপরে তুলে রাখতে বাধ্য হয় সে। মানুষ দুটি তাকে জঘন্য ভাষায় কটাক্ষ করায় সেও তাদের গালিগালাজ করতে লাগল।
লুই বলল, “তাকে ওঠাও,” লোকগুলো জানে অবাধ্যতার ফল কেমন ভয়াবহ হতে পারে। টেনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হল কেলিকে। লুই তার হ্যাট খুলে ফেলল মাথা থেকে। “এখানে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটার জন্য আমি ক্ষমা চাইছি। আমি তোমায় নিশ্চিত করে বলছি, এরকম ঘটনা আর ঘটবে না।”
অন্য সবাই এসে জড়ো হল ।
আগুনের মত জ্বলে উঠল কেলি। পরেরবার লাথি দিয়ে তার বিচি দুটো পেটের ভেতর ঢুকিয়ে দেব।”
“অবশ্যই,” লুই তার লোকদের হাত নেড়ে যার যার জায়গায় চলে যেতে ইশারা করল। কিন্তু এই শাস্তি দেবার দায়িত্বটা আমার।” সে চাবুকটি হাতে তুলে নিল । কিছুক্ষণ আগে এটা দিয়েই মেয়েটিকে আঘাত করেছে, আর এখন আরেক জনের পালা। সে ঘুরে প্রচন্ড বেগে আঘাত করল চাবুক দিয়ে। একটা তীক্ষ্ণ শব্দে সন্ধ্যার আকাশ বিদীর্ন হল । পেড্রো তার বাম চোখ চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল। গলগল করে রক্ত পড়তে লাগল তার আঙুলের ফাঁক দিয়ে । লুই অন্যদের দিকে ফিরে বলল, “বন্দীদের কেউ কোন ক্ষতি করবে না। বুঝেছ?”
সম্মতির একটা আভাস পাওয়া গেল, অনেকে মাথা নেড়ে হ্যা-সূচক জবাব দিলে লুই তার চাবুকটা আগের জায়গায় রেখে দিল। “কেউ একজন পেড্রোর চোখটা দেখ।”
সে পিছনে ফিরে দেখল সুই কেলির পাশে দাড়িয়ে আছে। সে তার একটা হাত কেলির চিবুকে রেখেছে। লুই দেখল সুই তার একটা আঙুল কেলির তামাটে চুলের একটা গোছা দিয়ে পেঁচিয়ে ফেলেছে। আহ! লাল চুল, ভাবল লুই। একেবারে আনকোরা এক উপহার হবে তার মিসট্রেসের জন্য।
সন্ধা ৭:০৫
টর্চের আলোয় নাথান দেখল হাতের ছাপযুক্ত ফটকের ওপাশে পথটি প্রধান সুড়ঙ্গের মতই দেখতে। কিন্তু কাঠবেষ্টিত উপরের অংশ অমসৃণ আঁশযুক্ত। সে হাটছে, গাছের গন্ধটি এখন আরো ভারি আর দুর্গন্ধযুক্ত। দাখি তার পাশে, অ্যানা এবং কাউয়িকে পথ দেখিয়ে আনছে। সুড়ঙ্গটি দ্রুত সংকীর্ণ হচ্ছে আর পাক খেয়ে ক্রমেই আঁটসাট হয়ে গেছে। ফলে দলটি একত্রে জড়ো হল ।
“আমরা অবশ্যই গাছের প্রধান শেকড়ের কাছে চলে এসেছি,” নাথান বিড়বিড় করে বলল। আর কিছুটা পাকানো জায়গায় পর সুড়ঙ্গটি কাঠের তলদেশ হতে বাইরে বের হয়ে গেছে। পায়ের নিচে পাথর এবং অন্যান্য জিনিসের সাথে মাটির কালো দাগ বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো ছিটানো । সুড়ঙ্গটা খাড়াভাবে নিচের দিকে নেমে গেছে। পেঁচানো শেকড়ের সাথে সমান্তরালভাবে নিচে নামছে তারা। দাখি সামনের দিকে দেখিয়ে এগিয়ে গেল । ইতস্তত বোধ করতে লাগল নাথান। অদ্ভুত কিছু লাইকেন লেগে আছে দেয়ালজুড়ে, ঝুলছে ম্লানভাবে। ঘ্রাণটা এখন তীব্র, আরও উর্বরা শক্তিসম্পন্ন। এগিয়ে গেল দাখি। নাথান তাকাল কাউয়ির দিকে, কাঁধ উচুঁ করল মানুষটা । এতটুকু উৎসাহই যথেষ্ট।
আরও একটু সামনে এগোনোর পর তারা দেখল শেকড়গুলো মাথার উপর দিয়ে বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে আরও বেশকিছু সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে। ছাদ থেকে শেকড়ের তন্তুগুলো ঝুলছে, মৃদুভাবে কাপছেও। খুব একটা ছন্দের সাথে দুলছে ওগুলো যেন এখানে মৃদুভাবে বাতাস বইছে। কিন্তু বহমান বাতাস সেখানে নেই। সুড়ঙ্গটা আরও সরু হয়ে আসতেই নাথানের মাথা ছাদে ঠেকল । শেকড়ের সরু আঁশগুলো চুলের সাথে আটকে যেতে চাইছে। মনে হচ্ছে যেন পেছন থেকে কেউ টেনে ধরছে। একদমে নিজেকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে নাথান। ফ্লাশ-লাইটের আলো ওপরে ফেলল, কোন কিছুতেই বিশ্বাস নেই এখন।
“কি হল আবার?” জিজ্ঞেস করল কাউয়ি ।
“শেকড়গুলো আমায় টেনে ধরছে।”
কাউয়ি একটা হাত তুলে শেকড়গুলো ধরল। ছোট আঁশগুলো আঙুলটাকে পেঁচিয়ে ধরল ঝুলন্ত অবস্থায়। অবিশ্বাসের চাহনি দিয়ে হাতটা এক ঝটকায় ছাড়িয়ে আনল সে। নাথান এর আগেও কিছু উদ্ভিদ দেখেছে যেগুলো উদ্দীপনায় সাড়া দেয়। স্পর্শ করলে গুটিয়ে যায় পাতা, ঘষা দিলে বা নাড়া দিলে বন্ধ হয়ে যায় ফুলের পাপড়ি। কিন্তু এগুলো আরও বেশি ভয়ঙ্কর বলে মনে হচ্ছে। ফ্লাশ-লাইটের আলো ফেলে রাস্তার চারপাশটা ভাল করে দেখে নিল সে। এই মুহূর্তে দাখি কয়েক মিটার সামনে এগিয়ে আছে, অপেক্ষা করছে দাঁড়িয়ে। বাকি সবাইকে দ্রুত পা চালাতে বলল নাথান । একবার দাখির কাছে পৌছানোর পর চারপাশটা আরও ভাল করে দেখতে লাগল সে। বিভক্ত হয়ে যাওয়া শেকড়গুলো এখানে আরও বেশি শক্তিশালী একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, অসংখ্য শেকড় একটা আরেকটার ওপর নিচ বা মাঝ দিয়ে অতিক্রম করে চলে গেছে প্রায় প্রতিটি দিকেই । খুবই জটিল একটি জাল যেটার শুরু বা শেষের দেখা পাওয়াটা অসম্ভব বলে মনে হয়। অনেক রাস্তার দু-পাশের দেয়ালের গায়ে কিছু গর্ত চোখে পড়ল যেগুলো পেঁচানো মোটা-সরু বিভিন্ন রকমের শেকড়ের সাথে যুক্ত, ওপরটাও ঢেকে আছে শেকড় আর চিকন অর আবরণে। এই ছোট গর্তগুলো নাথানকে মনে করিয়ে দিল নাইট্রোজেন বাল্বের কথা, অনেক উদ্ভিদের শেকড়ের মাঝে গোলাকৃতির এমন শেকড় দেখা যায়, যেগুলোর ভেতর সার সংরক্ষিত থাকে।
এমন একটা গর্তের সামনে থামল দাখি। নাথান আলো ফেলল ওটার ভেতর। বেশ একটু ভেতরে কিছু একটা দেখা যাচ্ছে যেটাকে শেকড়গুলো বিভিন্ন দিক থেকে পেঁচিয়ে ধরে আছে। আরও একটু ঝুঁকে গেল, অল্প কিছু স্পর্শ করল তার শরীরের বিভিন্ন অংশ। ওগুলোকে পেছনে সরিয়ে দিল সে। পেঁচানো শেকড় ও তা শাখার আড়ালে কিছু একটা আটকে আছে মাকড়সার জালে আটকানো শিকারের মতুষ্টি স্থির করে আর একমুহূর্ত দেখার পর বোঝা গেল বটা একটা বাদুর, আরও পরিষ্কারভাবে দেখতেই বোঝা গেল একটা ফলখেকো বাদুর। আকারে বেশ বড় । সোজা হল নাথান, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না সে।
কাউয়ি ঝুঁকে গিয়ে দেখতেই অবাক হল। “এটা কি বাদুর খেয়ে বেঁচে থাকে?”।
“আমার তা মনে হয় না। এদিকে এসে দেখ,“পেছন থেকে জবাব দিল আনা। দু-জনই ঘুরে গেল তার দিকে। একটা গর্তের সামনে বসে আছে এশিয়ানটা।
আকারে এটা অনেক বড় হলেও পেঁচানো শেকড়ের উপস্থিতি এখানে আরও বেশি পরিমাণে। গভীরে তাকাতে তাদেরকে বলল সে। আলো ফেলল নাথান, দেখতে পেল শেকড়-সমাধিতে একটা বড় বাদামী রঙের বাঘ।
“একটা পুমা!” কাউয়ি বলল নাথানের কাঁধের ওপর দিয়ে।
“ভাল করে দেখ,” আনা বলল।
তাকিয়ে আছে সবাই, জানে না কি দেখবে তারা। তারপর হঠাৎ সবাইকে হতবাক করে দিয়ে বড় বাঘটা নড়ে উঠল, বোঝা গেল শ্বাস নিচ্ছে। ওটার বুক প্রসারিত হল দম নেবার সময় । পরিস্কার দেখা গেল সব, কিম্ভ এই নড়াচড়াটা স্বাভাবিক লাগল না বরং যান্ত্রিক বলে মনে হল তাদের কাছে।
বাকিদের দিকে ফিরে তাকালো আনা, “এটা জীবিত!”
“আমি কিছুই বুঝতে পারছি না,” বলল নাথান।
একটা হাত বাড়িয়ে দিল আনা, “ফ্লাশ-লাইটটা একটু দেবে?”। অ্যাপলজিস্ট দ্রুত আশেপাশের আরও কিছু গলি এবং গর্ত দেখে এল। অনেক রকমের প্রাণীর বিশাল সমারোহ চারদিকে। টাউক্যান, মারমোজেট, ট্যামারিন, অ্যান্ট-ইটার এমনকি সাপ আর গিরগিটিও আছে, এবং খুবই অবাক হবার মত বিষয় হল জঙ্গলের ট্রাউট মাছও রয়েছে একটা গর্তে । প্রতিটি প্রাণীকেই শ্বাস নিতে দেখা গেল অথবা বোঝা গেল প্রাণের স্পন্দন আছে সবার মাঝেই, জীবিত আছে মাছটিও, ওটার ছোট্ট ফুলকা দুটো প্রসারিত হচ্ছে। আবার বন্ধ হচ্ছে ।
“প্রতিটি প্রাণী আলাদা গোত্রের,” আনা বলল, এমন গোলকধাধার অলিগলিতে ঘুরে আসায় চোখ দুটো চকচক করছে তার। আর সবগুলোই জীবিত। যেন শীত নিদ্রায় আছে সবাই।”
“তার মানে তুমি কি বোঝাতে চাইছো?”
আনা ঘুরে দাঁড়াল। “আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি একটা বায়োলজিক্যাল স্টোরহাউসে। জেনেটিক কোডের বিশাল এক লাইব্রেরি । আমি হলফ করে বলতে পারি এটাই সেই উৎস যেখান থেকে গাছটা বিভিন্ন প্রিয়ন উৎপাদন করে।”
ছোট্ট একটা বৃত্তাকার পথ ঘুরে এল নাথান, চোখ দুটো আটকে আছে প্রতিটি বাঁকের গোলকধাঁধায়। পুরো বিষয়টা এতটাই জটিল যে বুঝে উঠতে বেগ পেতে হচ্ছে। গাছটা এই প্রাণীগুলো এখানে সংরক্ষণ করছে যেন আলাদাভাবে প্রাণীগুলোর ডিএনএ বিশ্লেষণ করে ভিন্ন ধরণের প্রিয়ন তৈরি করতে পারে, আর নির্দিষ্ট প্রিয়ন দিয়ে নির্দিষ্ট প্রজাতিকে গাছের অধীনে বেঁধে ফেলতে পারে । এটা একটা জীবন্ত জেনেটিক ল্যাবরেটরি ।
কাউয়ি একটা হাত রাখল নাথানের কাধে। “তোমার বাবা।”
নাথান সন্দেহের চোখে তাকাল। “আমার বাবার!?” তখনই বিষয়টা যেন তার মাথায় আঘাত করল হাতুড়ির মত। দম বন্ধ হয়ে আসছে যেন। তার বাবাকে শেকড়ের খাবার বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল তবে সার হিসেবে নয়। বুঝতে পারল নাথান, একটুখানি দুলে উঠে। শরীরের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হল। তার বাবাকে এই ল্যাবে গবেষণার
উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
“সাদা চামড়া এবং অদ্ভুত আচরণের জন্য তোমার বাবা ছিল স্বতন্ত্র,” নিচু কণ্ঠে কাউয়ি বলল । “ব্যান-আলি অথবা ইয়াগা এমন জেনেটিক নমুনা হারাতে চায় নি।”
নাথান ঘুরে দাঁড়াল দাখির দিকে, আবেগে গলা ধরে আসছে, কথা বলার শক্তি নেই তার। “আমার, আমার বাবা! তুমি জান সে কোথায়?”
মাথা নাড়ল দাখি, একটা হাত তুলে ধরল।“এই শেকড়ে!”
“হ্যাঁ, কিন্তু কোথায়?” নাথান কাছের একটা গর্ত দেখল যেটার ভেতর একটা কাল মুখ । “কোনটা?”
চিন্তা করছে এমন একটা ভঙ্গিতে চারপাশের অলিগলির ওপর চোখ বুলাল দাখি রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে নাথান। রাস্তা হবে কয়েকশ আর চেম্বারের সংখ্যা অগণিত। তার পক্ষে সবগুলো খুঁজে দেখা সম্ভব নয়, বিশেষ করে বিস্ফোরণের চিন্তা মাথায় নিয়ে তো নয়ই। সময় ফুরিয়ে আসছে দ্রুত। কিন্তু তার বাবা এখানে কোথাও আছে এটা জানার পর কিভাবে সে এখান থেকে চলে যেতে পারে?
হঠাৎ করে দাখি একটা গলির দিকে পা বাড়াল, অন্যদেরও তার পিছু আসতে বলল।
দ্রুত পা চালাল তারা, আরও নিচে, আরও গভীরে নেমে যাচ্ছে সবাই আঁকাবাকা পথে । শ্বাস নেওয়াটা আরও কঠিন মনে হল নাথানের কাছে, কিন্তু সেটা চারপাশ থেকে চেপে ধরা গন্ধের কারণে নয়। এটা হচ্ছে তার বাড়তে থাকা উদ্বেগের কারণে। এই অভিনের শুরু থেকেই তার বাবার বেঁচে থাকা নিয়ে কোন সত্যিকারের আশা মনের মধ্যে ছিল না। কিন্তু এখন..আশা আর হতাশার দোলাচালে দুলছে সে, সাথে চেপে আছে ধেয়ে আসা বিপদের আতঙ্ক। কি আছে সামনে? কী-ই বা পেতে চলেছে সে?
আড়াআড়িভাবে অতিক্রম করা দুটো রাস্তার মাঝে থামল দাখি, তারপর বা-দিকের রাস্তায় হাটা শুরু করল সে। কিন্তু দু-পা এগোতেই আবারো থেমে গেল, মাথা দুলিয়ে একটু পেছনে এসে ডান দিকের রাস্তাটা ধরল এবার। একটা চিৎকার ঘনীভূত হচ্ছে নাথানের বুকের ভেতর। নতুন রাস্তাটা ধরে হেটে চলেছে দাখি, বিড়বিড় করছে নিচুস্বরে। অবশেষে একটা বড় চেম্বারের পাশে থামল সে। “বাবা।”
ফ্লাশ-লাইটটা আনার হাত থেকে নিয়ে নিল নাথান, বসে পড়ল হাটু ভর দিয়ে, আলো ফেলল চেম্বারের ভেতর। হাতের কজি পেঁচিয়ে ধরছে শেকড় আর তন্তুর বাঁক, কিন্তু সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল করল না। শেকড়ের জঞ্জালের আড়ালে একটা অবয়ব দেখা গেল শোয়ানো অবস্থায়। আলোটা ঘুরিয়ে সম্পূর্ণ কাঠামোটা দেখল সে। জরায়ুর মাঝে থাকা সন্তানের মত গুটিসুটি মেরে একটা মানুষ নরম তন্তুর আস্তরণ দেয়া মেঝেতে পড়ে আছে, শরীরে কোন কাপড় নেই, রঙটা ফ্যাকাশে হয়েগেছে। ঘন দাড়িতে মুখটা ঢেকে আছে, চুলগুলো পেঁচিয়ে আছে শেকড়ের সাথে । নাথান খুব চেষ্টা করল দাড়ির আড়ালের মুখটা ভালভাবে দেখার। সে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নয়, এই মানুষটাই তার বাবা কিনা। আরও একটু স্থির হয়ে দেখার পর মানুষটাকে শ্বাস নিতে দেখা গেল যান্ত্রিকভাবে, তারপর শ্বাস ছাড়ল, ঠোটের ওপরে তন্তুগুলো একটু দূরে সরে গেল বাতাসে। এখনো জীবিত!
ঘুরে দাঁড়াল নাথান। “তাকে ওখান থেকে বের করতে হবে।”
“ইনিই তোমার বাবা?” জিজ্ঞেস করল আনা।
“আমি…আমি আসলে ঠিক নিশ্চিত নই।” নাথান প্রফেসর কাউয়ির কোমরে গোঁজা হাড়ের ছুরিটার দিকে দেখাল। প্রফেসর ওটা ছাড়িয়ে এগিয়ে দিল নাথানের দিকে। উঠে দাঁড়িয়ে এলোপাথারিভাবে শেকড়গুলো কাটতে শুরু করল নাথান । চিৎকার দিল দাখি। তাকে থামতে উদ্যত হল সে, কিন্তু কাউয়ি পথ আগলে দাঁড়াল ইন্ডিয়ানটার । “দাখি, না! নাথানকে বাধা দিও না।”
নাথান বাইরের শেকড়ের মজবুত বাধনগুলো কেটে ফেলছে দ্রুত। কাজটা নারকেলের খোসা ছাড়ানোর মত। শক্ত আবরণের নিচে তুলনামুলক নরম শেকড় তন্তুর মত ঘিরে ধরেছে অবয়বটাকে। আরও ভেতরে ঢুকে গিয়ে সে দেখল শেকড়ের তন্তুগুলো মানুষটার শরীর ভেদ করে গিয়েছে, ওখান থেকে গজিয়ে উঠেছে, যেন শরীরটা মাটি এটা নিশ্চয়ই ইয়াগার বিভিন্ন নমুনা সংরক্ষণ পদ্ধতি, এভাবেই প্রাণীগুলোকে খাবার দেয়, ভেতরের অন্ত্রগুলো পরিচালনা করে, প্রয়োজনীয় পুষ্টির যোগান দেয়। ইতস্তত বোধ করল নাথান। শরীরের সাথে লেগে থাকা অসংখ্য শেকড় কেটে ফেললে মানুষটার যদি কোন ক্ষতি হয়? বা মারা যায়? যদি এটা শতভাগ গাছটাই নিয়ন্ত্রিত করে থাকে? আর যদি সেই নিয়ন্ত্রনে বাঁধা পড়ে তাহলে কি কোন কর্মপ্রক্রিয়া ব্যাপক বাঁধাগ্রস্ত হবে? ওটা থেমে যাবে? মাথা নাড়িয়ে সব ভাবনা ঝেড়ে ফেলল নাথান। তারপর আবারো কাটতে শুরু করল শেকড় আর অর জঞ্জাল। সুযোগটা কাজে লাগাতেই হবে। তাছাড়া এভাবে থাকতে থাকতে একদিন তো মানুষটা ঠিকই মারা যাবে। একবার সব অর জাল কেটে ফেলার পর ছুরিটা একপাশে সরিয়ে রাখল সে, মানুষটার কাঁধের নিচে হাত দিয়ে টেনে তুলল তাকে, তারপর উঁচু করে বাইরে নিয়ে এল । ঝুলতে থাকা শেষ শেকড়টাও ছুটে গেল, মুক্ত করে দিল তার শিকারকে।
সুড়ঙ্গ থেকে বের হবা পর লোকটার পাশে বসে পড়ল নাথান। বিবস্ত্র মানুষটি একটু কেশে তারপর দম নিল মুখ দিয়ে । লেগে থাকা শেকড়ের অনেকগুলোই ঝরে পড়ে গেল রক্ত খাওয়া জেঁকের মত। মোটা শেকড় শরীরের যেসব জায়গায় ঢুকেছিল সেখান থেকে রক্ত আসতে শুরু করল। হঠাৎ খিচুনি দিয়ে উঠল মানুষটা, সামনে ঝুঁকে গিয়ে আবার পেছনে হেলে গেল তার শরীর, মাথাটা আছড়ে পড়ল মেঝেতে নাথান দুই বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরল মানুষটিকে, ঠিক বুঝে উঠে পারছে না কী করবে । বিক্ষিপ্ত নড়াচড়াটা পুরো এক মিনিট ধরে চলল। কাউয়ি হাত-পা-গুলো স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে, যেন ব্যাথার পরিমাণ না বাড়ে। শরীরটা শেষবারের মত একটা ঝাঁকুনি দিল, তারপর বড় করে একটা শ্বাস নিল মুখ দিয়ে। নাথান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল যখন দেখল মানুষটার বুক স্বাভাবিকভাবে ওঠা-নামা করছে। তারপর চোখ দুটো খুলে গেল ধীরে ধীরে, তাকাল তার দিকে। নাথান খুব ভাল করে চেনে চোখ দুটোকে । ওগুলো যেন তার নিজেরই চোখ।
“নাথান?” একটা শুষ্ক আর চাপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল মানুষটি।
নাথান শরীরটার ওপর আছড়ে পড়ল। “বাবা!”
“আমি…আমি কি স্বপ্ন দেখছি?” তার বাবা জিজ্ঞেস করল জোরে।
আবেগাপ্লুত নাথান কোন কথা বলতে পারছে না। সে তার বাবাকে উঠে বসতে সাহায্য করল। শরীরটা বালিশের মত হালকা হয়ে গেছে, একেবারে হাড্ডিসার অবস্থা । এই গাছ তাকে দেখাশোনা করেছে ঠিকই কিন্তু সেটা পর্যাপ্ত নয়।
কাউয়ি তাকে সাহায্য করতে সামনে ঝুঁকে এল। “কার্ল, এখন কেমন লাগছে?”
নাথানের বাবার মুখের মাংসপেশীগুলো সংকুচিত হল প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে, তারপরই আবার প্রসারিত হল, চিনতে পেরেছে সে। “কাউয়ি? হায় ঈশ্বর! কি হচ্ছে এসব?”
“সে এক লম্বা গল্প, বন্ধু, সে নাথানকে সাহায্য করল তার বাবাকে দাঁড় করাতে । নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মত সামর্থ্য নেই তার, নাথান ও কাউয়ির কাঁধে ভর দিয়ে এক রকম ঝুলেই রইল। “সবার আগে এই নরক থেকে আগে বের করতে হবে তোমাকে।”
নাথান তাকিয়ে আছে তার বাবার দিকে, অশ্রু বেয়ে আসছে চোখ দিয়ে। “বাবা…!”
“আমি জানি, বাবা,” ওর বাবা বলল খসখসে গলায়, একটু কাশল সে।
পুণর্মিলন হওয়ার উষ্ণতাটুকু উপভোগ করার সময় এটা নয়, কিন্তু তার বাবা এই অভিযানে আসার পর থেকে যে কথাটা নাথান বুকে নিয়ে ঘুরছে সেটা না বলে আর এক মুহূর্তও হারাতে চায় না সে। “আমি তোমায় ভালবাসি, বাবা।”
কাঁধের ওপর থাকা তার বাবার হাতটা আরও একটু চেপে এল তার দিকে, ভালবাসা আর মমতার একটি ছোঁয়া। পরিচিত একটি অনুভূতি মনে করিয়ে দিল পরিবারের কথা।
‘বাকি সবাইকে ডেকে আনা উচিত, আনা বলল। “তারপর বেরিয়ে পড়ব এখান থেকে।”
‘নাথান, তুমি বরং তোমার বাবাকে নিয়ে এখানে অপেক্ষা কর,” পরামর্শ দিল কাউয়ি। “বিশ্রাম নাও। ফিরে এসে তোমাদের দুজনকে সঙ্গে নিয়ে নেব।”
মাথা ঝাঁকালো দাখি। “না । আমরা এই পথে ফিরে যাই না, একটা হাত উঁচু করল সে। “অন্য পথে যাই।”
ভ্রু কুঁচকাল নাথান । “যা-ই হোক, সবাইকে একসাথে থাকতে হবে।”
“আমি নিজেকে সামাল নিতে পারব, কোন সমস্যা নেই,” শুকনো কণ্ঠে বলল কার্ল । পেছনের বড় চেম্বারটার দিকে তাকাল সে। “আর তাছাড়া, আমি এখানে দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্রামে আছি।”
মাথা নেড়ে সায় দিল কাউয়ি । বিষয়টি ঠিক হবার পর সবাই আবার ফেরার পথ ধরে হাটা শুরু করল। কাউয়ি তাদের বর্তমান অবস্থার একটা খন্ডচিত্র তুলে ধরল সামনে। নাথানের বাবা শুধু শুনেই গেল। হাটার সময়ে প্রতিটি মুহুর্তে তাদের দিকে ঝুঁকে সব শোনার চেষ্টা করল। সব ঘটনা শোনার সময় যখন লুই ফ্যাভ্রির নাম আসল আর সে যা করেছে তা বলা হল শুধু তখনই নাথানের বাবার মুখ থেকে কিছু শব্দ বের হল। “শালার বাস্টার্ড।”
একটু হাসল নাথান, তার বাবার কষ্ঠে পুরনো আগুন জ্বলতে শুনে। মূল প্রবেশমুখে ফিরে এসে রেঞ্জার দু-জনকে প্রত্যাশিতভাবে ব্যস্ত পাওয়া গেল। ব্যান-আলির বাকি সবাইকে জড়ো করেছে তারা। প্রত্যেকের কাছেই গাছের ফল এবং নিজস্ব অস্ত্র রয়েছে । নাথান এবং তার বাবা প্রবেশমুখেই অপেক্ষা করল, আর কাউয়ি এগিয়ে গিয়ে তাদের দলে যোগ দেয়া নতুন মানুষটির কথা ও শেকড়ের মাঝে যা যা দেখেছে তা বর্ণনা করল ।
“দাখি বলেছে এই শেকড়ের সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে এখান থেকে বের হবার একটা রাস্তা আছে।”
“তাহলে আর দেরি নয়, এখনই রওনা দিতে হবে,” বলল সার্জেন্ট কসটস। “ত্রিশ মিনিটেরও কম সময় হাতে আছে আমাদের, এর মধ্যেই এখান থেকে যতটা সম্ভব দূরে চলে যেতে হবে।”
ক্যারেরা এসে যোগ দিল তাদের সাথে, তার অস্ত্রটা কাঁধে ঝোলালো। “সব কাজ শেষ। কয়েক ডজন ফল আর চার ক্যান্টিন ভরে আঠা নিয়েছি।”
“তাহলে যাত্রা শুরু করা যাক,”বলল কসটস।
রাত ৭:৩২
শেকড়ের সুড়ঙ্গ দিয়ে যাবার সময়ে কাউয়ি কিছুক্ষণ পরপর পেছনে আসতে থাকা ইন্ডিয়ান এবং আমেরিকানদের দলটাকে দেখছে, তার পাশে দাখি। সার্জেন্ট কসটস নাথানের বাবাকে এগিয়ে নেবার জন্য সাহায্য করছে নাথানকে। এটা দেখে কাউয়ি ভাবল আরেকটু সময় থাকলে সে একটা স্ট্রেচার বানিয়ে দিতে পারত কিন্তু এখন প্রতিটা মিনিটই খুব মূল্যবান। যদিও সার্জেন্ট কসটস বিশ্বাস করে, এই গভীর সুড়ঙ্গটা শক্তিশালী নাপাম বোমার আগুন ঝরানো বিস্ফোরণকে ঠেকিয়ে দেবে বর্মের মত, তারপরও এত বেশি অলিগলি দেখে ভয় পাচ্ছে ।
“এখানকার পাথরগুলো অসংখ্য গর্তে ভরা আর শেকড়গুলো পাথর ও মাটিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। বিস্ফোরণের কারণে ওপরের পাথুরেমাটি আমাদের মাথার ওপর ধ্বসে পড়তে পারে অথবা আশেপাশের কোথাও ধ্বসে পড়লেও আমরা এখানে আটকা পড়ে যাব। এই জন্য বোমাগুলো ফাটার আগেই একেবারে নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে হবে আমাদের।” তাই সবাই দ্রুত এগোচ্ছে, এটা শুধু নিজেদের জন্য নয়, বাকি পৃথিবীর জন্যেও বটে। তাদের ব্যাগের মধ্যে তারা বহন করছে লক্ষ না হলেও হাজার মানুষের ভাগ্য। ইয়াগার এই ফল দ্রুত অসুস্থ মানুষের কাছে পৌছে দেওয়াটাই আসল কথা, যে ফল যুদ্ধ করবে মানুষের জন্য ভয়ঙ্কর সংক্রামক প্রিয়নের বিরুদ্ধে, যুদ্ধ করবে মহামারি প্রতিরোধে । তাই এই মানুষগুলোর কোনভাবেই এখানে আটকা পড়া চলবে না।
পেছনে তাকিয়ে দলটিকে আবারো দেখে নিল কাউয়ি । অন্ধকার সুড়ঙ্গ, টিমটিম করে জ্বলতে থাকা লাইকেন, আটকে থাকা প্রাণীর অসংখ্য চেম্বার…সব মিলিয়ে কাউয়ি বেশ অস্বস্তি বোধ করছে। এত গভীরে দু-পাশের দেয়াল ও ছাদের পুরোটা জায়গাজুড়ে শেকড় আর শেকড়, একটা আরেকটার ওপর দিয়ে, নিচ দিয়ে ভেদ করে, পেঁচিয়ে, আরও নানানভাবে ছড়িয়ে আছে আঁকাবাঁকা পথে । আর সবখানেই চিকন তুম্বুর আস্তরণ ছেয়ে আছে, দুলছে আর অতিক্রম করতে থাকা যেকোন কিছুই আকড়ে ধরতে চাইছে। এই
গুলোর জন্য দেয়ালগুলোকে পশমি মনে হচ্ছে, যেন জীবন্ত কোন প্রাণী শরীরের লোমগুলো নাড়াচ্ছে।
কাউয়ির পেছনে অন্যদেরকেও সমান উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে, এমনকি ইন্ডিয়ানদেরকেও। নারী-পুরুষের দলটা আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে আসছে, পেছন থেকে দৃষ্টির আড়ালে তারা এখনো। সবার পেছনে আসছে প্রাইভেট কারেরা। পেছন থেকে নজর রাখছে সবার ওপর, তার সামনেই টরটর এবং কালো জাগুয়ারটা। এই প্রাণী দুটোকে সুড়ঙ্গের মধ্যে আনতে একটু কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে। প্রথমে কোনটাই জায়গা থেকে নড়ছিল না কিন্তু পরে টরটরকে বশ করে ফেলেছিল নাথান।
ম্যানুয়েলের পোষাটাকে এখানে ফেলে রেখে মরতে দেব না,” যুক্তি দেখিয়েছিল নাথান। “এটা আমার জীবন বাঁচিয়েছে। আমি এরজন্য আমার বন্ধুর কাছে ঋণী, একে কোনভাবেই আমি ফেলে যাব না।”
একবার যখন টর-টর সুড়ঙ্গে ঢুকল, বড় জাগুয়ারটাও অনুসরণ করল তাকে।
এখন ক্যারেরা সজাগ দৃষ্টি রাখছে ওদুটোর ওপর, অস্ত্র সর্বদা প্রস্তুত আছে তার, যদি বন্যপ্রাণীটার ভ্রমন চলাকালীন নাস্তা করার ইচ্ছে জেগে ওঠে। দাখি একটা জায়গায় থামল, রাস্তাটা এখান থেকে বেশ কিছু দিকে ভাগ হয়ে গিয়েছে। সার্জেন্ট কসটস বিরক্ত হল ফুরিয়ে আসা সময়ের কথা ভেবে কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়ো করাটা আরও বেশি পেছনে ফেলে দিতে পারে সবাইকে, এমন জায়গায় হারিয়ে যাওয়াটা খুবই সহজ। তারা সবাই নির্ভর করে আছে দাখির স্মৃতিশক্তির ওপর। এই ইন্ডিয়ানটি একটা পথ বেছে নিলে অন্যেরা তাকে অনুসরণ করল। সুড়ঙ্গটা বেশ ঢালুভাবেই নেমে গিয়েছে। গভীরতা বোঝার জন্য নিচে তাকাল কাউয়ি। তারা এরইমধ্যে প্রায় শ-খানেক মিটার নিচে চলে এসেছে আর এখন আরো নিচে যাচ্ছে। কিন্তু অবাক করার মত বিষয় হল, বাতাসটা এখানে ভারি হবার পরিবর্তে বেশ
কয়েক মিনিট পর টানেলটা ভূমির সাথে সমান্তরালে চলতে শুরুকরল। ওটা বেশ কঠিন একটা বাঁক নিয়ে চলে গেছে অন্যদিকে, তারপর মিশেছে বিরাট এক গুহার সাথে । সুড়ঙ্গের খোলা মুখটা অনেকখানি আগে থেকে প্রসারিত হয়ে হায় গিয়ে মিশেছে। সরু একটা পথ চলে গেছে সবচেয়ে কাছের দেয়াল ঘেঁষে। পাথরের মত মজবুত রাস্তাটা গুহার মেঝে থেকে অনেক ওপরে। রাস্তা ধরে হাটা শুরু করল দাখি। খোলা জায়গাটার দিকে তাকিয়ে কাউয়ি অনুসরণ করল তাকে। চেম্বারটা দৈর্ঘ্য আধ-মাইল হবে । ওটার একেবারে মাঝখানে বিরাট এক শেকড়ের কলাম ওপরের পাথুরে মাটি ভেদ করে নেমে এসে নিচের মাটির ভেতর দিয়ে গভীরে চলে গেছে। কাউয়ি ভালভাবে দেখল শেকড়টাকে, একটা বিরাট রেডউড গাছের মত মোটা।
“এটা সেই ইয়াগার মূল শেকড়, তাদের কাছে আসতে আসতে নাথান বলল ।
“আমরা ওটার চারপাশ দিয়েই নিচে নামছি।”
প্রধান শেকড়টা থেকে হাজার-হাজার শাখা-প্রশাখা প্রতিটি টানেলের মাঝ দিয়ে সবদিকে ছড়িয়ে গেছে । “মাইলের পর মাইলজুড়ে টানেলগুলো চলে গেছে,” বলল কাউয়ি। প্রধান শেকড়টা ভালভাবে দেখছে সে। মাটির ওপরে রেখে আসা গাছের দৃশ্যমান অংশটুকু আসলে মূল কাঠামোর একটা ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। কল্পনা করতে পার কত প্রজাতির প্রাণী আটকা পড়ে আছে নিচে? কালের থেকে বিছিন্ন হয়ে?”
“গাছটি নিশ্চিতভাবেই শত শত বছর ধরে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে আসছে, নাথানের বাবা বিড়বিড় করে বলল ছেলের পাশ থেকে।”
“হয়তো তারও আগে থেকে,” বলল কাউয়ি। “হয়তো এই ভূ-খণ্ড যখন প্রথম গঠিত হয়েছে তখন থেকেই।”
“প্যালেওজয়িক যুগ থেকে, নাথান যোগ করল । যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে এই বিশাল বায়োলজিক্যাল স্টোরহাউসে আরও কত রকম প্রাণী আছে ভাবতে পার?”
“আর তার ভেতরে কতগুলো আবার এখনো জীবিত!” যোগ করল আনা।
আঁতকে উঠল কাউয়ি। এটা একই সাথে বিস্ময়ের এবং ভীতিকর ব্যাপার। সে দাখিকে ইশারা করল সামনে চলার জন্য। দৃশ্যটা এতই ভয়ঙ্কর যে, বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। তার অনুসন্ধিৎসু মন ডালপালা মেলে ধরতে চাইছে এই শেকড়ের মতই, খুঁজে বের করতে চাইছে শত-সহস্র বা তারও বেশি বছর আগে থেকে আজ অবধি কি কি লুকানো আছে এই পাতালপুরীতে। কিন্তু বড় বাধাটা হল সময়, দ্রুত ফুরিয়ে আসছে সেটা তাদের জন্য, সারা পৃথিবীর জন্য।
সরু পথ ধরে বিরাট চেম্বারটা চক্রাকারে ঘুরে রাস্তাটা শেষ হল নতুন এক সুড়ঙ্গে, যেখান থেকে আবারো শুরু হল অসংখ্য অলিগলি, গোলক ধাঁধা । চেম্বারটা যদিও তারা পেছনে ফেলে এল, কাউয়ির চিন্তা-ভাবনা পড়ে রইল এখানকার রহস্যটার মাঝে। পা দুটো ধীর হয়ে এল তার, নিজেকে আবিষ্কার করল, সে হাটছে নাথান আর কার্লের পাশে।
“আমি যখন অ্যাপলজি নিয়ে পড়তাম,” কাউয়ি বলল, “তখন গাছ-পালা নিয়ে অনেক কল্পকথা, প্রাচীন গল্পও পড়েছিলাম। গাছ যেন মায়ের মত অভিভাবক, একজন রক্ষণাবেক্ষণকারী, সকল জ্ঞানের এক ভাণ্ডার। এ-কারণে ইয়াগার বিষয়টা আমাকে ভাবিয়ে তুলছে। মানুষ কি এর আগেও এই গাছের দেখা পেয়েছে?”
“ঠিক কি বলতে চাইছ?” জিজ্ঞেস করল নাথান।
“ঠিকভাবে বলতে গেলে এই গাছটাই তো এই প্রজাতির একমাত্র গাছ নয়। এর পূর্বসূরীরা অবশ্যই অতীতেও ছিল। হতে পারে এই কাহিনীগুলো আসলে সেই বহুকাল আগে থেকে চলে আসা টুকরো-টুকরো স্মৃতির সমন্বিত রূপ, যে স্মৃতিগুলো বহন করেছে প্রথম যুগের মানুষ, তারপর পরের প্রজন্ম শুনেছে তাদের কাছ থেকে আর এভাবেই আজকের দিন পর্যন্ত চলে এসেছে।” নাথানের চোখে সন্দেহের ছায়া দেখতে পেয়ে আবারো বলা শুরু করল সে। “একটা উদাহরণ দেই, বেহেশতের বাগানে একটা জ্ঞানের বৃক্ষ ছিল। এমন এক গাছ যেটার ফল খেলে পৃথিবীর সব জ্ঞান অর্জন করা যেত কিন্তু যারা খাবে তারা অভিশপ্ত হয়ে যাবে। এবার এই ঘটনার সমান্তরালে তুমি ইয়াগার ঘটনাটা চিন্তা করে দেখ। এমনকি যখন আমি কার্লকে শেকড়ের মাঝে আটকে থাকতে দেখলাম, এটাও আমাকে বাইবেলের একটা ঘটনাকে মনে করিয়ে দিল। তেরশ শতকে এক সন্ন্যাসি নিজেকে দীর্ঘদিন অনাহারে রেখেছিল । কেন জান? সে ইশ্বরকে দেখার চেষ্টা করছিল । পরে তার কাহিনীতে সে লিখে যায়, তাকে স্বর্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যেখানে সে আদমের পুত্র সিথের দেখা পায়। সেখানে যুবক সন্ন্যাসিটি সেই জ্ঞান বৃক্ষটিও দেখে, যেটার রঙ এখন সাদা হয়ে গিয়েছে। গাছটা তার শেকড়গুলো দিয়ে সিথের ভাই কাবিলকে চেপে ধরে আছে। কিছু শেকড় কাবিলের শরীর ভেদ করে ঢুকে গেছে ভেতরে।”
চিন্তিত দেখাল নাথানকে। “এই দুই ঘটনার সাদৃশ্য কিন্তু ব্যাপক,” কথা শেষ কল কাউয়ি।
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর নাথানকে মনে হল প্রফেসরের কথাগুলো যেন বুঝতে পারছে, তারপর মুখ খুলল সে। হয়তো তোমার চিন্তাটা ঠিক। ইয়াগার এই সুড়ঙ্গগুলো মানুষের বানানো নয়, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই গাছটা কেন এমন আচরণ করবে যদি না এটার আগের প্রজাতিগুলো মানুষের দেখা না পেয়ে থাকে? আর মানুষ যদি এটার আগের প্রজাতির সংস্পর্শে না-ই এসে থাকে তাহলে এমন বৈশিষ্ট্যই বা কেন হবে ওটার মাঝে? মানুষ অবশ্যই অনেক আগে থেকেই এর আদি বংশধরের সাথে সম্পর্কিত ছিল।”
“পিপড়া-গাছের মত?” যোগ করল কাউয়ি, “এক্ষেত্রেও একই রসায়ন কাজ করছে। পিপড়ার কলোনি হিসেবে যে গাছটা দেখেছিলাম ওটাই কিন্তু ঐ বৈশিষ্ট্যের প্রথম গাছ নয়। বহুকাল আগে থেকেই ওটার আগের প্রজন্মের গাছগুলোর সংস্পর্শে পিপড়ারা আসতে শুরু করে, তারপর সবরকম সুবিধার কথা বিবেচনা করে গাছকেই তাদের আবাসস্থল বানিয়ে নেয়। আর গাছও একটু একটু করে তার অভ্যন্তরীণ গঠন পরিবর্তন করে এই ছয়পেয়ে সৈন্যদের গ্রহণ করার জন্য । যার ফল আমাদের দেখা পিপড়া-গাছটা।”
এবার শোনা গেল নাথানের বাবার কণ্ঠ। “আর এখানে ব্যান-আলিদের যে বিবর্তন, তাদের জেনেটিক পরিবর্তন, দম নিল কার্ল, “এমন পরিবর্তনের ঘটনা আগেও কি ঘটেছে? এই গাছ বা তার বংশধরেরা কি এমনভাবেই মানুষের বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে? এ-কারণেই কি গাছকে ঘিরে এমন সব কাহিনী আমাদের লোককথায় জায়গা করে নিয়েছে?” কাউয়ির ভ্রু জোড়া সংকুচিত হল। এভাবে সে ভেবে দেখে নি এখনো। পেছন দিকে তাকিয়ে মানুষগুলোকে দেখল সে, জাগুয়ার দুটোও হাটছে তাদের পিছু । ইয়াগা যদি এই প্রাণীগুলোর বুদ্ধিমাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে তবে এই ঘটনা এই গাছ বা এটার পূর্ব প্রজন্মেরা অতীতেও কি ঘটিয়ে থাকতে পারে না? মানুষেরা কি তাদের বুদ্ধিমত্তার জন্য কোন না কোনভাবে এই গাছের পূর্ব-প্রজন্মের কাছে ঋণী? এমন চিন্তা করলে সব যেন শীতল হয়ে আসে। একটা নীরবতা নেমে এল সবার ওপর। মাথার ভেতর ইয়াগার ইতিহাস পর্যালোচনা করছে কাউয়ি।
এই গাছটি এখানেই জন্মেছে তাতে সন্দেহ নেই, আর শত শত বছর ধরে বিভিন্ন প্রাণীর নমুনা সংগ্রহ করছে ওটার শেকড়ের ভেতর ছোট-বড় কুরিতে। প্রথমে প্রাণীগুলোকে বিভিন্ন রকম সুবিধা দিয়েছে, আশ্রয় দিয়েছে তারপর তাদেরকে বন্দী করে রেখেছে অসংখ্য গর্তের মাঝে। কোন এক সময়ে ইয়ানোমামোদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া কোন মানুষের দল হয়তো এখানে এসে পড়ে, ইয়াগার বিস্ময়কর আঠার ক্ষমতা আবিষ্কার করে আর প্রাকৃতিক আশ্রয় হিসেবে গাছটার অসংখ্য চেম্বার ব্যবহার শুরু করে। একবার ওটার ফাঁদে মানুষগুলো যখন পড়ে যায় তখন আর বেরিয়ে আসার কোন পথ থাকে না, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অন্যান্য প্রাণীর মত গাছের সাথেই থাকতে হয় এবং ধীরে ধীরে পরিণত হয় ব্যান-আলিতে। ইয়াগার মনুষ্য-দাস। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত এই ব্যান-আলিরা বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীকে ব্যবহার করে আসছে শেকড়ের খাবার হিসেবে, যেন ইয়াগা তার জৈবিক তথ্যভান্ডার আরও প্রসারিত ও সমৃদ্ধ করতে পারে। আর যদি ওগুলোকে এভাবেই ছেড়ে যাওয়া হয়, কোথায় নিয়ে যাবে এটা? মানুষের নতুন কোন প্রজাতি সৃষ্টি করবে জেরাল্ড ক্লার্কের মৃত বাচ্চাটার মত? নাকি আরও খারাপ কিছু, হাইব্রিড পিরানহা এবং পঙ্গপালের মত?
পেঁচানো সুড়ঙ্গের দিকে চোখ মুখ কুঁচকে তাকাল কাউয়ি, হঠাৎ করেই আবার প্রশান্তি অনুভব হল যখন ভাবল পুরো গাছটা খুব শীগগিরই ধ্বংস হতে চলেছে। সামনে থেকে দাখি চিকার দিল। পাশের দিকে চলে যাওয়া একটা সুড়ঙ্গকে দেখাল সে । ঐ সুড়ঙ্গ থেকে আবছা আলো আসছে। একটা চাপা গর্জন ধ্বনিত হল পেছন থেকে।
“এটাই বের হবার রাস্তা,” কাউয়ি বলল।
রাত ৭:৪৯
বাবাকে নিয়ে যতটা দ্রুত পারা যায় এগিয়ে যাচ্ছে নাথান। সার্জেন্ট কস্টস অব্যাহতভাবে হুংকার দিচ্ছে চাপাস্বরে আর সময় গুনছে বোমাগুলো বিস্ফোরিত হবার কত মিনিট বাকি। বাকিটা পথ এবং সময় হিসেব করে ভাবল কসটস। দলটি এগিয়ে চলল সামনের চাঁদের আলোর দিকে। গর্জনের শব্দটা আরও একটু জোরে হল, তার একটু পরেই সেটা বেড়ে হয়ে গেল বজ্রপাতের শব্দের মত। সামনের
এককোনে সুড়ঙ্গটার শেষপ্রান্ত দেখা যাচ্ছে। শব্দের উৎসটা আরও পরিষ্কার হল । একটা ঝর্ণা আছড়ে পড়ছে সুড়ঙ্গের শেষপ্রান্তে, চাঁদের আলোতে ঝর্ণাটাকে আলোর ঝর্ণা বলে মনে হচ্ছে।
“টানেলটা অবশ্যই একটা পাহাড়ের খোলা ফাটলে গিয়ে শেষ হবে, যেটা নিচু উপত্যকায় গিয়ে মিশেছে,”কাউয়ি বলল ।
দাখিকে অনুসরণ করে টানেলের ভেজা মুখের শেষপ্রান্তের কাছে পৌছাল সবাই। সবার সামনে দিয়ে ওপর থেকে নিচে তীব্র বেগে পানি পড়ছে । নিচের দিকে দেখাল ইন্ডিয়ানটি। ঝর্ণা আর পাহাড়ের মাঝে সরু একটা জায়গা খাড়া নেমে গেছে নিচে, পাথুরে সেই জায়গার গায়ে সিঁড়ির মত ধাপ খোদাই করা, ভিজে চকচক করছে চাঁদের আলোয় । সিঁড়িটা আগ-পিছু করে অনেকটা ঘুরিয়ে কাটা হয়েছে পাহাড়ের গায়ে, নেমে গেছে ওটা নিচের উপত্যকায়।
“সবাই..মাথা নিচু কর!” চিৎকার দিল সার্জেন্ট কসটস। দ্রুত নামবে সবাই, কিন্তু চিৎকার দিলে থেমে যাবে, আর নিচু হয়ে শক্ত করে মাটি ধরে থাকবে।”
দাখি সার্জেন্ট কটসের কাছেই, নিজ গোত্রের মানুষগুলোকে সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেল। কাউয়ি নাথানকে সাহায্য করছে তার বাবাকে এগিয়ে নিতে । খুব দ্রুত নিচে নামছে তারা ভেঁজা আর পিচ্ছিল সিঁড়ি বেয়ে । তাড়াহুড়ো এবং সতর্কতা এ দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য রাখতে হচ্ছে তাদেরকে। পেছনে বাকিরাও নেমে আসছে দ্রুত।
সবার পেছনে জাগুয়ার দুটোকে দেখা গেল, আবদ্ধ সুড়ঙ্গের মাঝ থেকে বেরুতে পেরে আনন্দিত মনে হল ওদেরকে। খোলা সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নামতে দেখে ওদের ধারাল নখরযুক্ত থাবাগুলোর জন্য হিংসা হল নাথানের।
“এক মিনিট,” কাউয়ি বলল কার্লের শরীরের ভার সামলে নিয়ে।
দ্রুত পা চালাল মানুষগুলো। নিচ থেকে এখনো কমপক্ষে চারতলা উঁচুতে সবাই । একবার পা পিছলে গেলে নিশ্চিত মৃত্যু। তারপরই একটা চিৎকার ভেসে এল পানির শব্দ চাপা দিয়ে।
“এখনি নিচু হও! নিচু হও।”
বাবাকে সিঁড়ির ওপর শক্ত করে বসিয়ে দিয়ে নিজেও নিচু হল নাথান ওপরে তাকিয়ে দেখল বাকি সবাই সিঁড়িটার সাথে মিশে আছে। তারপর মুখটা নিচু করে প্রার্থনা করল সে। বিস্ফোরণটা যখন হল মনে হল যেন নরক নেমে এসেছে পৃথিবীর বুকে। শব্দটা খুব বেশি হল না, ৪ঠা জুলাইর স্বাধীনতা দিবসের রাতে আতশবাজির শব্দের চেয়ে কম, তবে প্রভাবটা আতশবাজির চেয়ে অনেক বেশি। পাহাড়ের শীর্ষবিন্দু ছাড়িয়ে আগুনের একটা ফোয়ারা আকাশপানে উঠে গেল প্রায় আধমাইলের মত, তারপর ছড়িয়ে পড়ল খোলা আকাশের চারদিকে তিনগুন দূরত্বে। বাতাসের ঝাপটা এসে আঘাত করল তাদের গায়ে, স্রোতের মত আগুনের ঢেউ বৃত্তাকার পথে ছড়িয়ে পড়ছে সবদিকে । ঝর্ণার প্রতিবন্ধকতাটা যদি তাদের সামনে না থাকত তবে এখানেই ছাই হয়ে যেত সবাই।তারপরও কিছু অসুবিধার সৃষ্টি হল ঝর্ণার কারণে। জলের প্রবাহটা বিস্ফোরণের ধাক্কায় মারাত্মকভাবে কেঁপে উঠে জলের বিশাল এক ঝাপটা এসে পড়ল তাদের ওপর। কিন্তু শক্ত করে ধরে থাকল সবাই।
খানিক পরেই ওপর থেকে ধ্বংস হয়ে যাওয়া গাছপালার জ্বলন্ত টুকরো নিচে পড়তে শুরু করল, কিছু খাড়াভাবে, কিছু ছড়িয়ে পড়ল আনুভূমিকভাবে । সৌভাগ্যক্রমে তাদের দিকে ছুটে আসা বেশিরভাগই দ্রুত বেগে পড়তে থাকা জলের ধারায় ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল নিচে। তবুও এত গাছপালা মুহূর্তের মাঝে বিস্ফোরিত হয়ে তুলোর মত উড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখাটাও ভয়ঙ্কর ব্যাপার।
তাপের প্রবাহটা অতিক্রম হয়ে যাবার পর, চিৎকার দিল কসটস । “চলতে থাক, কিন্তু পড়ন্ত টুকরোগুলোর দিকে খেয়াল রেখ।”
মাথা উঁচু করে সব দেখে আবার নামার প্রস্তুতি নিল নাথান । সবাই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল পায়ে ভর দিয়ে, হতভম্ব যেন মানুষগুলো। অবশেষে পেরেছে তারা। নিচের দিকে একবার দেখে নিয়ে বাবার দিকে এগিয়ে গেল সে। “চল বাবা, এখান থেকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে।”
বাবার হাতটা নিজের হাতে নিতেই নাথানের মনে হল পায়ের তলার মাটি কাঁপছে । একটা গুড়গুড় শব্দও কানে এল তার। সাথেই সাথেই বুঝতে পারল লক্ষণ খারাপ। “হায় হায়!” মুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়ল বাবার শরীরের উপর, ঠোঁটে একটা চিৎকার, “নিচু হও সবাই, এক্ষুণি।”
দ্বিতীয় বিস্ফোরণে কানে তালা লেগে গেল সবার । চিৎকার দিল নাথান। এমন ঝাঁকুনি দিয়ে বিস্ফোরণটা হল যে, নাথান নিশ্চিত, পাহাড়ের চূড়াটা ভেঙে পড়বে তাদের উপরে। ওপরের সুড়ঙ্গের মুখ থেকে আগুনের উদগীরণ হল তীব্র বেগে, আছড়ে পড়ল জলের গায়ে। তরল বাষ্প নেমে এল তাদের দিকে । গলাটা বাড়িয়ে নাথান দেখল আগুনের দ্বিতীয় উদগীরণটা হল সুড়ঙ্গ থেকে, তারপর তৃতীয় । ছোট আরও কিছু অগ্নিশিখা ছুট বের হল পাহাড়ের অন্যান্য সরু ফাঁটল দিয়ে, যেন শত-শত আগুনের জিহ্বা বের করে দিচ্ছে। পাহাড়টা। আগুনের সবগুলো শিখাই অদ্ভুত নীল রঙের। পুরোটা সময়জুড়ে মাটি কাঁপছে আর চাপা গর্জন হচ্ছে নিচ থেকে ।
নাথান তার বাবাকে আগলে রাখল তার শরীরের নিচে। পাথর আর মাটি চূর্ণ হয়ে বেরিয়ে এল ফাঁটলগুলোর মুখ দিয়ে। শেকড়সহ উপড়ে যাওয়া গাছগুলো জ্বলন্ত মিসাইলের মত আকাশের দিকে উঠে গিয়ে আবার আছড়ে পড়ল নিচের উপত্যকায় । তারপর একটা সময় সব শান্ত হয়ে এল । একটা ছোট পাথর গড়িয়ে এসে তাদেরকে অতিক্রম করে পড়ে গেল নিচে।
সবাই চুপ, কেউই নড়ল না একচুল। ঝর্ণাটা আবারো রক্ষা করল তাদেরকে। ছুটে আসা ধ্বংসাবশেষের বেশিরভাগ ঠেকিয়ে দিয়েছে ওটা। গাছের কিছু টুকরো অবশ্য তাদেরকে স্পর্শ করে গেছে কিন্তু সেগুলোর ভয়ঙ্কর গতি জলের দেয়াল ভেদ করতে গিয়ে থেমে গিয়েছে।
বেশ কয়েক মিনিট পর নাথান মাথাটা অনেকখানি উঁচু করে ধ্বংসযজ্ঞের দিকে তাকাল । সে দেখল কাউয়ি তার বাবার থেকে একধাপ উপরে। প্রফেসরকে খুব হতভম্ব আর আহত দেখাচ্ছে নাথানের দিকে তাকাল সেমুখটা ফ্যাকাশে হয়ে আছে একেবারে ।
“তুমি যখন চিৎকার দিলে…আমি খুবই ধীরে আসছিলাম…বিস্ফোরণটা হল…তাকে সময় মত ধরে ফেলতে পারি নি, তার চোখ দুটো গভীর খাদের দিকে স্থির হল, “আনা পড়ে গেছে।”
চোখ বন্ধ করে ফেলল নাথান, “হায় ঈশ্বর!” ওপর ও নিচের মানুষগুলোর মাঝ থেকে চাপা কান্নার শব্দ ভেসে এল। যেন আনা একাই মারা যায় নি। গায়ে শক্তি পেল না নাথান, হাটুতে ভর দিয়ে নিজের দেহটাকে কোনমতে উঁচু করে রাখল সে। তার বাবা একটু কাশল তারপর ঘুরল তার দিকে, পাংশুবর্ণ হয়ে গেছে সে-ও। কিছুক্ষণ সবাই চুপ থাকার পর ধীরে সবাই নামতে শুরু করল পাথরের সিঁড়ি বেয়ে। রক্তাক্ত এবং স্তম্ভিত তারা ।। ঝর্ণার নিচে জড় হল সবাই। শীতল পানির ঝাপটায় ভিজে একাকার। তিনজন ব্যান-আলিও বিস্ফোরণের সময় সিঁড়ি থেকে ছিটকে পড়ে গেছে নিচে। বেঁচে থাকার কোন সম্ভাবনাই নেই তাদের।
“দ্বিতীয় বিস্ফোরণটা কিসের হল?” জিজ্ঞেস করল কসটস।
নাথানের মনে পড়ল সেই অদ্ভুত নীলচে আগুনের কথা। সে ইয়াগার আঠা ভরা ক্যান্টিন থেকে একটা তুলে নিল তারপর একফোঁটা আঠা নিচে ফেলে ক্যারেরার লাইটার দিয়ে ওটাতে আগুন ধরিয়ে দিল । একটা দীর্ঘ নীল আগ্নিশিখা জ্বলে উঠল আঠা থেকে। কপারের মত জলছে,” বলল নাথান, “বেশ দায়। পুরো গাছটা শেকড়-বাকড়সহ রোমান ক্যান্ডল আতশবাজির মত উড়ে গেছে। মাটি যেভাবে কাপছিল তাতে এমনই মনে হয়েছে। আমার।”
একটা শোক-ভরা নীরবতা নেমে এল ছোট দলটির ওপর। নীরবতা ভাঙল ক্যারেরা। “এবার কি করব?”
উত্তর দিল নাথান, কষ্ঠে আগুন ঝরছে তার, “এবার ঐ বাস্টার্ডকে মূল্য চুকাতে হবে, ম্যানুয়েলের জন্য, অলিনের জন্য, আনার জন্য, ব্যান-আলির সব মানুষের জন্য।”
“ওদের অনেক গোলা-বারুদ আর অত্র আছে,” সার্জেন্ট কসটস বলল। “আমাদের আছে একটা বেইলে। আর সংখ্যায়ও আমাদের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি ওরা।”
“তাতে কিছু যায় আসে না, কণ্ঠটা শীতল রাখল নাথান, “আমাদের কাছে এমন। কার্ড আছে যা দিয়ে সবগুলোকে টেক্কা দেয়া যাবে।”
“কি সেটা?” কসটস জানতে চাইল। “তারা জানে আমরা বেঁচে নেই, মরে গেছি।”
