আমাজনিয়া – ১৯
নিশুতি আক্রমণ
রাত ১১:৪৮
আমাজন জঙ্গল
চোখ দুটো এখন ভিজে উঠছে কেলির। হাত দুটো পেছনে বাঁধা থাকায় একটুও মুছতেও পারছে না। একটা শক্ত খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে তাকে। মাথার ওপর পামপাতায় বোনা একটি একচালা ছাউনি একটু আগে শুরু হওয়া ঝিরঝিরে বৃষ্টিকে ঠেকিয়ে দিচ্ছে। রাত বাড়ার সাথে সাথে উপরের আকাশটা ঘন মেঘে ঢেকে গেছে, ফলে তার অপহরণকারীদের জন্য বেশ সুবিধাই হয়ে গেছে। “যত অন্ধকার ততই ভাল,” ফ্যাভ্রি বলেছিল আনন্দের সাথে। খুব দ্রুত এগিয়ে গিয়ে এখন তারা অবস্থান করছে জলাভূমির দক্ষিণ পাশে, গভীর জঙ্গলের আড়ালে। কিন্তু এত আঁধার ও দূরত্ব সত্ত্বেও উত্তর-আকাশ লাল গনগনে হয়ে আছে, যেন সূর্যটা ওদিক থেকে উঠতে চাচ্ছে। যে বিস্ফোরণটা হয়েছিল সেটা শুরু হয়েছিল অভূতপূর্ব এক অগ্নিগোলক দিয়ে, ওটা প্রথমে ছুটে গেল সোজা আকাশের দিকে তারপর বিস্ফোরিত হয়ে আগুনের টুকরোগুলো নেমে এল নিচে। ভয়াবহ এই দৃশ্য তার সমস্ত আশা পুড়ে ছাই করে দিয়েছে । সে নিশ্চিত, তার দলের সবাই এখন মৃত। ছোটার গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল ফ্যাভ্রি তারপর, নিশ্চিত ছিল সে আগুন আর ধোঁয়া দেখতে পেয়ে সরকারি হেলিকপ্টারগুলো তাদের সর্বোচ্চ গতিতে এগিয়ে যাবে ঘটনাস্থলে । কিন্তু এখন পর্যন্ত আকাশে কিছুই দেখা যায় নি। মিলিটারিদের আকাশযানের বাতাস ফুঁড়ে আসার কোন শব্দ কানে আসে নি এখন পর্যন্ত। কিছুক্ষণ পরপর আকাশের দিকে খেয়াল রাখছে ফ্যাভ্রি । কিছুই দেখতে পাচ্ছে না সে। হয়তো অলিনের পাঠানোর সিগন্যালটা কাজে দেয়নি অথবা হেলিকপ্টারগুলো সম্ভবত রওনা দিয়েছে।
যা-ই হোক না কেন, কোন ঝুঁকি নেয় নি ফ্যাভ্রি। কোন আগুন জ্বালানি বা আলো জ্বালান চলবে না, শুধু নাইট-ভিশন চশমা ব্যবহার করতে হবে। স্বভাবতই কেলিকে কোন চশমা দেয়া হয়নি। অন্ধকারে চলতে গিয়ে তার হাটুর একটু নিচে কেটে গিয়েছে কাটার খোঁচায়। তার হোঁচট খাওয়াগুলো অবাক করে দিয়েছে তার প্রহরীদেরকে। হুমরি খেয়ে পড়ার সময় হাত দিয়ে না ঠেকাতে পারায় প্রতিবারই একটু একটু করে রক্তাক্ত হয়েছে তার হাটু। সারা পায়ে যন্ত্রণা করছে তার । মশা এবং মাছি ছুটে এসেছে তার ক্ষতস্থানের দিকে, ভনভন করছে চারপাশে। এমনকি সে একটু তাড়িয়েও দিতে পারছে না ওগুলোকে। তবে বৃষ্টি যেন একটু পরিত্রাণ দিয়েছে। পুরো এক ঘণ্টা বসে আছে কেলি, তাকিয়ে আছে উত্তরের লালচে আকাশের দিকে, প্রার্থনা করছে তার বন্ধুরা যেন বেঁচে থাকে।
তার কাছেই গুন্ডাদলটি তাদের বিজয় উপভোগে মত্ত অ্যালকোহলের ফ্লাস্কগুলো ঘুরছে একহাত থেকে অন্যহাতে। পানপাত্রগুলো উঁচু করে প্রতিটি অর্জনকে স্মরণ করা হচ্ছে, গর্বভরে আলাপচারিতা চলছে সবার মাঝে। অনেকে নিচুস্বরে পরিকল্পনাও করছে কিভাবে তাদের টাকাগুলো খরচ করবে। ওদের কথা শুনে বোঝাই যাচ্ছে বেশিরভাগ খরচই হবে পতিতালয়ে।
ফ্যাভ্রি দলটির চারপাশে চক্রাকারে ঘুরছে । এই পার্টিতে তার কোন আপত্তি নেই, তবে নিশ্চিত করতে চাইছে তারা যা অর্জন করেছে তা যেন হাতছাড়া না হয়ে যায় । যেখানে তাদের জন্য মোটর-বোটগুলো অপেক্ষা করছে সেই গন্তব্য থেকে এখনো বেশ কয়েক মাইল পেছনে আছে ।
তাই এই মুহূর্তে কেলি নিজেও কিছু সময় পেয়েছে একান্তভাবে । ফ্রাঙ্ককে ক্যাম্পের মাঝখানে অন্য একটা অস্থায়ী ছাউনির নিচে রাখা হয়েছে। এখন তার একমাত্র সঙ্গী ফ্যাভ্রির বিকৃত লেফটেন্যান্ট, যার নাম মাস্ক। সে দাঁড়িয়ে দলের আরেক জনের সাথে কথা বলছে, ফ্লাস্ক আদান-প্রদান হচ্ছে তাদের মাঝেও।
বৃষ্টি ভেদ করে একজন এগিয়ে আসছে। ফ্যাভ্রির সেই ইন্ডিয়ান মেয়ে সুই। বৃষ্টির কারণে তাকে প্রায় বোঝাই যাচ্ছে না। কাপড়হীন শরীরেও অস্ত্রটা তার গলায় ঝুলছে সারাটা সময়। তবে কর্পোরাল ডি-মারটিনির সেই ঝুলন্ত মাথাটা এখন দেখা যাচ্ছে না। হয়তো বিচ্ছিরি ঐ জিনিসটা বৃষ্টিতে ভেজাতে চায় না, বিরক্তির সাথে ভাবল কেলি।।
মাস্কের সঙ্গী আস্তে করে ওখান থেকে সরে পড়ল মেয়েটিকে আসতে দেখে। এই গুণ্ডাদলের প্রায় সবার ওপরই তার তীব্র প্রভাব আছে। সবাই তাকে মারাত্মক ভয় পায় । এমনকি মাস্ক নিজেও ছাউনি থেকে বেরিয়ে পাশের আরেকটিতে আশ্রয় নিল। ইন্ডিয়ান নারীটি মাথা নিচু করে ছাউনির নিচে ঢুকে কেলির পাশে বসল । তার হাতে একটি র্যাকসাক। ওটা মাটির ওপর রেখে ভেতরে হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা খুঁজতে লাগল সে। অবশেষে আস্তে করে বের করে আনল ছোট একটি মাটির পাত্র। তারপর পায়ের বাঁধন খুলে দিল সে। পাত্রটার ভেতর গলানো মোমের মত তেলতেলে একটি পদার্থ। ডাইনিটা একটা আঙুল পাত্রের ভেতর চুবিয়ে নিল, তারপর কেলির কাছে এগিয়ে আসতেই এক ঝটকায় একটু সরে গেল সে। ইন্ডিয়ান্টা কেলির টাখনু ধরে ফেলল হাত দুটো যেন লোহার তৈরি। আঙুলের ডগায় তৈলাক্ত কটা কেলির কেটে যাওয়া জায়গাগুলোতে লাগিয়ে দিতে শুরু করল সে। সাথে সাথেই জ্বালাপোড়াকেমে এল ক্ষতস্থানগুলোতে । হাসফাস করা বন্ধ করে দিল কেলি। মেয়েটিকে তার চিকিৎসা করতে দিল ।
“ধন্যবাদ,” কেলি বলল, যদিও সে জানে না কেন তাকে এত যত্ন করা হচ্ছে। শুধুমাত্র তার আরামের জন্য নাকি ব্যাথা কমলে আবার যেন হাটা শুরু করতে পারে সেজন্যে? যে কারণেই হোক, বেশ ভাল লাগছে এখন।
ইন্ডিয়ানটা আবারো তার ব্যাগ থেকে তাঁতে বোনা লিলেন কাপড়ে মোড়ানো একটি পোটলা বের করল। খুব সাবধানে ওটা খুলে ছড়িয়ে রাখল ভেজা মাটির ওপর। ওটার ভেতরে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি নানারকম যন্ত্রপাতি, কিছু তৈরি করা হয়েছে হলুদ হাড় থেকে, প্রতিটাই সমান কয়েকটি সারিতে আলাদা আলাদা পাউচের মাঝে ঢুকিয়ে রাখা। সুই সেখান থেকে ঘাসকাটা কাস্তের মত দীর্ঘ একটি ছুরি টেনে বের করে নিল, আরও চারটা একই রকম যন্ত্র আছে ওখানে। ছুরিটা নিয়ে কেলির দিকে ঝুঁকে গেল সে। আবারো একটু সরে গেল কেলি, কিন্তু মেয়েটি কেলির কাঁধের পেছনের চুলগুলো শক্ত করে মুঠোতে ধরে স্থির হয়ে থাকল এক মুহূর্ত, তারপর চুলগুলো নিচের দিকে টান দিতেই মাথাটা পেছন দিকে হেলে মুখটা উপরে উঠে গেল তার । ভয়ঙ্কর শক্তি ইন্ডিয়ানটার গায়ে।
“কি করছ তুমি?”
সুই কখনো কোন কথা বলে না। হাতের ছুরিটার বাকানো অংশ নামিয়ে আনল কেলির কপালের ওপর, মাথার চুল যেখানে থেকে শুরু হয়েছে ঠিক সেখানে। তারপর ওটা আবার ব্যাগের ভেতর রেখে দিয়ে প্রায় একই রকম আরেকটা ছুরি বের করে কপালের আগের জায়গাতে রাখল । আতঙ্কের সাথে কেলি বুঝতে পারল ভীতিকর একটি ব্যাপার । ডাইনিটা আমার মাপ নিচ্ছে।
সুই খুব মনোযোগের সাথে সঠিক মাপের ছুরিটা বাছাই করছে যেটা দিয়ে সবচেয়ে নিখুঁতভাবে কেলির মাথার খুলি থেকে সম্পূর্ন চামড়াটা খুলে নেয়া যাবে। ইন্ডিয়ান মেয়েটি মাপজোখ করেই চলল, আঙুল দিয়ে পরীক্ষা করল ধারাল প্রান্তগুলো, ওগুলো কেলির থুতনি, মুখ আর নাকে ছুঁইয়ে বিভিন্ন কোণ থেকে পরীক্ষা করে দেখল সে। বাছাই করা সঠিক যন্ত্রগুলো একটা একটা করে সাজিয়ে রাখল এবার লম্বা ছুরি, ধারাল বড় সুঁচ, হাড়ের তৈরি কর্কস্ক্রু, এগুলো যোগ হল বাছাই করা তালিকায়।
গলা খাকারি দেবার শব্দে উভয় নারীর মনোযোগ চলে গেল ছাউনির বাইরে। ছেড়ে দেয়া হল কেলির মাথাটা ! ছুট পেয়ে পা দিয়ে মাটি ধাক্কা দিয়ে ঘুরে গেল কেলি, ডাইনিটার থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকতে পারে ততই স্বস্তি । ঘুরতে ঘুরতে তার পা গিয়ে লাগল মাটির ওপর রাখা ভয়ঙ্কর যন্ত্রপাতির সারিতে।বাইরে দাঁড়িয়ে আছে ফ্যাসিস্ট।
“মনে হচ্ছে সুই তোমার জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা করছে । খুব ভাল লাগছে আশা করি, মিস ওব্রেইন।” ছাউনিতে ঢুকল সে। “তোমার ভাইয়ের কাছ থেকে সিআইএ’র বিষয়ে কিছু তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছি আমি। ব্যবসার পূর্ণ হিসেবে ছেলেটা কিন্তু দারুণ, আর একটু কাঠ-খড় পুড়িয়ে তার কাছ থেকে যদি কিছু তথ্য বের করে নেইও, আমার মনে হয় না তাতে সেন্ট সেভিস কোন আপত্তি কবে কি সমস্যাটা হয়েছে আরেক জায়গায়, বুঝলে? যেহেতু তোমার ভাই এখন আমার নিয়োগদাতাদের সম্পত্তি তাই তাকে কোনরকম আঘাত বা ক্ষতি করতে পারব না, আর এটা আমার নিয়োগদাতা মেনে নেবে না, জানই তো এমন একটা সুস্থ-সবল গিনিপিগকে তাদের কাছে হস্তান্তরের জন্য অনেক বড় অঙ্কের টাকা পাচ্ছি।”
হাঁটু ভর দিয়ে কেলির পাশে বসে পড়ল ফ্যাত্রি।
“কিন্তু মাই ডিয়ার, তোমার ব্যাপার আলাদা। একটু কষ্ট হলেও বলতে হচ্ছে, আমি তোমার ভাইকে সুই’র হাতের সুনিপুন কাজের একটা প্রদর্শনি দেখাতে চাচ্ছি। না না, এতে ভয় বা সংকোচের কিছু নেই, আর কিসের ভয়? ফ্রাঙ্ককে তোমার চিৎকারটা একটু শোনাব মাত্র । দয়া করে না কর না। কাজ শেষে সুই যখন তোমার একটা কান তোমার ভায়ের হাতে তুলে দেবে, আমি নিশ্চিত, সে আরও সুন্দরভাবে প্রশ্নগুলোর জবাব দেবে।” উঠে পড়াল ফ্যাভ্রি। “কিন্তু আমায় একটু ক্ষমা করতে হবে। আমি আসলে এগুলো দেখে খুব একটা সহ্য করতে পারি না।” মাথা নুইয়ে বো করে বৃষ্টি ভেজা রাতে বাইরে পা বাড়ল ফ্যাভ্রি।
ভয়ে রক্ত জমে আসছে কেলির। খুব বেশি সময় নেই তার হাতে। আঙুলের মাঝে একটা ছোট্ট ছুরি শক্ত করে ধরে আছে সে। কিছুক্ষণ আগে ছড়িয়ে রাখা যন্ত্রপাতির মাঝ থেকে তুলে নিয়েছে এটা । এখন সে প্রানপণ চেষ্টা করছে হাতের বাঁধনগুলো কেটে ফেলতে। কাছেই সুই তার ব্যাগ থেকে ব্যান্ডেজ করার উপকরণ বের করল কানটা কেটে নেওয়ার পর সেখানে ব্যান্ডেজ করার জন্য । সন্দেহ নেই, তারা তাকে এভাবেই একটু একটু করে নির্যাতন করতে থাকবে তার ভায়ের কাছ থেকে শেষ তথ্যটুকুও বের করে নেয়ার জন্য। আর প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে তাকে ছুঁড়ে ফেলা হবে আবর্জনার মত। এমনটা ঘটতে দিতে পারে না কেলি। কষ্ট পেয়ে মরার চেয়ে একেবারে মরা অনেক ভাল । আর সে মরেও যদি যায় তবুও ফ্রাঙ্কের কোন ক্ষতি করতে পারবে না ফ্যাভ্রি। অন্তত ফ্রাঙ্ককে সেন্ট সেভিসের বিজ্ঞানীদের হাতে নিরাপদে তুলে দেওয়ার আগ পর্যন্ত তো নয়ই। এলোপাথারিভাবে কেলি পোচ দিয়ে যাচ্ছে বাঁধনগুলোর ওপর, তার শরীরের নাড়াচড়াগুলো সে ঢেকে দিচ্ছে মুখ দিয়ে বিভিন্ন রকম শব্দ আর আর্তনাদ করে, যেগুলোর আংশিক অন্তত সত্যি।
কেলির দিকে ফিরল সুই, বড়শির মত আকৃতির একটা ছুরি তার হাতে। দড়িগুলো এখনো আটকে রেখেছে কেলির দু-হাত। ডাইনিটা ঝুঁকে এসে তার চুলগুলো ধরল শক্ত করে, তারপর এক টানে নামিয়ে ফেলল মাথাটা পেছন দিকে । ছুরিটা উঁচু করল সে।
ইন্ডিয়ান মেয়েটির অলক্ষ্যে ছুরিটা নিয়ে সংগ্রাম করে যাচ্ছে কেলি । অশ্রুঝরছে চোখ দিয়ে। একটা গা ঠাণ্ডা করা চিঙ্কার ভেসে এল আঁধার চিরে। খুব তীক্ষ আর বন্য শব্দ, যেন ক্রোধ ঝরে পড়ছে। হাতের ছুরিটা কেলির কানের ঠিক ওপরে ধরতেই সেই জমে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে অন্ধকার জঙ্গলের দিকে তাকাল ডাইনিটা। সুযোগটা হারাতে চাইল না কেলি । দ্রুত শেষ দড়িটা থেকেও মুক্ত করে নিল হাত দুটো। সুই তার দিকে ঘুরতেই হাতের ছুরিটা ঘুরিয়ে এনে সজোরে বসিয়ে দিল ওর কঁাধে । চিৎকার দিয়ে পেছনে সরে গেল ইন্ডিয়ান মেয়েটি। নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না সে।
অ্যাড্রেনালাইনের প্রভাব তীব্রমাত্রায় শরীরে পৌছেছে, নিজের পা দুটোয় ভর দিয়ে জঙ্গলের দিকে ছুটে গেল কেলি দ্রুত গতিতে দৌড়াচ্ছে কিন্তু হঠাৎ ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল,
গাছের পেছন থেকে সামনে এসে দাঁড়ান একটা শরীরের সাথে। দু-হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে। মুখ তুলে দেখল ভয়ঙ্কর বিদঘুটে একটি মুখ- মাস্ক! আতঙ্কে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে এই প্রহরীর কথা ভুলে গিয়েছিল সে। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল কিন্তু নিরস্ত্র সে, শক্তিও অনেক কম। লোকটা কেলিকে একটু ঘুরিয়ে উঁচু করে ধরল, একটা হাত গলার চারপাশে চেপে আছে। মাটি থেকে কিছুটা উপরে তুলে ফেলল তাকে, পা দুটো শূন্যে ছোড়াছুড়ি করল কেলি। মাটিতে বসে আছে সুই, কাঁধের ক্ষতস্থানে একটা পট্টি বাধা যেটা কেলির কান কেটে ফেলার পর ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। তীব্র ক্রোধের দৃষ্টিতে পুড়িয়ে দিতে চাইছে সে কেলিকে। মেয়েটি শূন্যে লাথি ছোড়া বন্ধ করতেই অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটল। মাস্ক এক ঝাকুনি দিয়ে কেলিকে ছেড়ে দিল । হঠাৎ ছেড়ে দেয়ার মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে গেল সে। মুখ তুলে পেছনে তাকানোর আগেই পেশীবহুল মানুষটা ধপাস করে পড়ে গেল উপুড় হয়ে । মাথার পেছনে কিছু একটা কচক করে উঠল, বস্তুটা তার মাথার খুলিতে গভীরভাবে গেঁথে আছে।
একটা চক চকে রুপালি ডিস্ক।
তৎক্ষণাত বুঝতে পারল কেলি। সারা ক্যাম্পজুড়ে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হতেই অন্ধকার জঙ্গলের দিকে তাকাল সে, দেখল বেশ কিছু মানুষ ঢলে পড়ে যাচ্ছে, কেউ দাঁড়ান। থেকে বসে পড়ছে আর বসে থাকা মানুষগুলো লুটিয়ে পড়ছে মাটিতে। ছোট ছোট সূঁচালো ডার্ট গেঁথে আছে পড়ে যাওয়া মানুষগুলোর বুক আর গলায়। কয়েকজন কাঁপছে বিক্ষিপ্তভাবে, বিষ মিশে গেছে তাদের শরীরে। কেলি আরও একবার ফ্যাভ্রির সাবেক এই লেফটেন্যান্টের নিথর দেহের দিকে তাকাল, তারপর তাকাল রুপালী ডিস্কের দিকে । আশা জেগে উঠল তার ভেতরে।
ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, ওরা এখনো বেঁচে আছে!
কেলি ছাউনির দিকে তাকিয়ে দেখল সুই সেখানে নেই, মনে হচ্ছে দৌড়ে পালিয়েছে ক্যাম্পের মাঝখানে, যেখানে ফ্যাভ্রি আছে। কেলির ভাই ফ্রাঙ্ক এখনো আটক আছে সেখানে। এরইমধ্যে ক্যাম্পজুড়ে হাঙ্গামা শুরু হয়ে গেছে, গুলি ছোড়ার শব্দ শোনা গেল, নানান আদেশ দেয়া হচ্ছে চিৎকার করে, কিন্তু এখন পর্যন্ত একজন আক্রমণকারীকেও দেখা যায় নি, মনে হচ্ছে যেন তাদেরকে ভুত-পেত্নী আক্রমণ করেছে। চারদিকে মানুষ লুটিয়ে পড়ছে অব্যাহতভাবে। মাস্কের পড়ে থাকপিস্তলটি তুলে নিল কেলি। উদ্ধারকারী দলটি এতক্ষণে তার ভায়ের কাছে না-ও পৌছে থাকতে পারে, তাই তাদের জন্যে বসে থাকতে চায় না সে।দ্রুত পা চালাল ক্যাম্পের দিকে।
নাথান দেখল কেলি একটা পিস্তল হাতে ছুটে যাচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে তার ভাইকে বাঁচাতে যাচ্ছে সে। আর অপেক্ষা করা যায় না। প্রাইভেট ক্যারেরাকে একটা সংকেত দিল শিষ বাজিয়ে, সাথে সাথে ইন্ডিয়ানদের কণ্ঠে একটা উলুধ্বনি বেজে উঠল পুরো ক্যাম্পজুড়ে। শরীর হিম করা একটি শব্দ। উঠে দাঁড়াল নাথান। তারা সবাই কালো রঙে ঢেকে নিয়েছে নিজেদের শরীর। সবাই মিলে একসাথে ছোটা শুরু করল ক্যাম্পের মাঝখানে । ওদের সবার কাছে অস্ত্র বলতে তীর, ব্রো-গান আর হাঁড়ের ছুরি। যারা আধুনিক অস্ত্রের সাথে পরিচিত তারা মৃতদেহগুলোর পাশ থেকে পছন্দমত অস্ত্র তুলে নিল হাতে। বা দিকে আছে কসটস, তার হাতের এ-কে-৪৭ গর্জে উঠেছে। ডান দিকে ক্যারেরা তার বেইলেটাকে অটোমেটিক মোডে রেখে বিভিন্ন দিকে ধরে রাখছে শুধু, বাকি কাজ অস্ত্রটা নিজেই করছে, রুপালি চাকতিগুলো সাই-সাই করে বেরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত, সামনের সব কিছু খণ্ড বিখণ্ড করে দিয়ে। অ্যামুনিশেন খালি হবার পর এটাকে ফেলে দিল ক্যারেরা, তারপর পড়ে থাকা একটা এম-১৬ তুলে নিল মাটি থেকে। এটা সম্ভবত রেঞ্জারদেরই অস্ত্র ফ্যাভ্রির দল কোনভাবে হাতিয়ে নিয়েছিল।
একটা মৃতদেহের হাত থেকে পিস্তল তুলে নিয়ে মূল ক্যাম্পের দিকে ছুটে গেল নাথান । শত্রুপক্ষ এখনো সবকিছু বুঝে উঠে পারে নি ঘটনাটা আসলে কি। শুধু এতটুকুই বোঝা গেল, তারা এখন রক্ষণাত্মক হতে চাইছে। ভেঁজা মাটির ওপর দিয়ে ছুটছে নাথান, লোকগুলো মজবুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করার আগেই পৌছাতে চাইছে । আরও একটু এগিয়ে যেতেই একটা মানুষ এসে পড়ল তার সামনে, নিরস্ত্র মানুষটি ভয়ে কাঁপছে । নাথানকে দেখেই হাত দুটো মাথার পেছনে নিয়ে গেল পুরোপুরি আত্মসমর্পনের ভঙ্গিতে। লোকটিকে অতিক্রম করে গেল নাথান। তার মাথায় একটাই চিন্তা এখন, কোন ক্ষতি হবার আগেই কেলি এবং তার ভাইকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে হবে।
ক্যাম্পের অপর প্রান্ত থেকে ছুটে আসছে কাউয়ি, তার সাথে আছে দাখি, পেছনে আরও কিছু ইন্ডিয়ান। একটু থেমে পড়ে থাকা আরেক জনের পাশ থেকে বড় একটা ছুরি তুলে নিয়ে এক ইন্ডিয়ানের দিকে ছুঁড়ে দিল সে। কাউয়ি নিজের জন্য তুলে নিল একটা রাইফেল । দ্রুত এগিয়ে চলল সবাই । প্রতিরোধ যারা করছিল তারা পিছু হটছে, এগিয়ে যাচ্ছে ক্যাম্পের কেন্দ্রের দিকে। কিন্তু হঠাৎ গতি কমাল কাউয়ি, একটা সহজাত সতর্কতা নাড়িয়ে দিল তাকে। চারপাশটায় একটু চোখ বুলাতেই একটা ইন্ডিয়ান নারীকে দেখতে পেল সে, ঝোপের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে মেয়েটা। ওর ত্বকও তাদের মত কাল রঙে ঢাকা । আমাজনের বিভিন্ন গোত্রের মাঝে থেকে বেড়ে ওঠা কাউকে বোকা বানান যাবে না এত সহজে। নারীটি যদিও তাদের মতই কালো রঙের কেমোফ্লেজ ধারণ করেছে তবু শুয়ার গোত্রের বিশেষ কিছু পার্থক্য কাউয়ির অভিজ্ঞ চোখে ঠিকই ধরা পড়ল। হাতের রাইফেল তুলে নারীটির দিকে তাক করল সে।
“একটুও নড়বি না, ডাইনি!”
সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘন জঙ্গলে নিরাপদে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছে ফ্যাভ্রির প্রিয়তমা। এটা কখনোই হতে দেবে না কাউয়ি। কর্পোরাল ডি-মারটিনির চূড়ান্ত পরিণতির কথা মনে পড়ে গেল তার। কাউয়ির কথায় থামল নারীটি, তারপর ধীরে ঘুরে দাঁড়াল তার দিকে। পেছনে সরে গেল দাখি, কিন্তু কাউয়ি তাকে সামনে এগিয়ে যেতে বলল। সামনের যুদ্ধ এখনো শেষ হয়ে যায় নি। দাখি তার মানুষগুলো নিয়ে চলে গেল সেখানে। কাউয়ি এখন একা মেয়েটার সাথে, চারপাশে মৃতদেহ পড়ে আছে। খুব সতর্কতার সাথে তার দিকে এগোলো সে, ভাল করেই জানে, ডাইনিটা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানেই ওকে গুলি করে মারা উচিত । সে যেমন সুন্দরী তেমনি ভয়ঙ্কর। কিন্তু কাউয়ি অন্যকিছুর আদেশ দিল ।
“বসে পড়,” স্প্যানিশ ভাষায় হুকুম দিল সে। “হাত ওপরে তোল।”
তার কথামতই কাজ করল মেয়েটি। শান্তভাবে নিচু হয়ে, খুব ধীরে, সাপের মত এঁকেবেঁকে । চোখ তুলে তাকাল কাউয়ির দিকে। চোখ দুটোয় আগুন ভরা, ঘায়েল করে দেবে যেন সব কিছু…তবে রাতের কারণে কাউয়িকে তা দেখতে হল না ।
মুহূর্তেই আক্রমণ করে বসল মেয়েটি। এতই ক্ষিপ্র গতিতে যে কাউয়ির এক মুহূর্ত সময় লাগল প্রতিক্রিয়া দেখাতে । ট্রিগার টানল সে, কিন্তু শুধু ব্লক করে একটা শব্দ হল রাইফেল থেকে। ম্যাগজিনে গুলি নেই! সুই ঝাপ দিল তার দিকে, ওর দুই হাতেই ছুরি, ওগুলো যে বিষাক্ত তাতে কোন সন্দেহ নেই কাউয়ির ।
কেলি তাকিয়ে আছে ফ্যাভ্রির দুই দুটো মিলি উজি’র দিকে। একটা তাক করা তার ভায়ের মাথায়, অপরটা সোজাসুজি তার বুকে। “পিস্তল ফেলে দাও, মিস। নয়তো দুজনেই মরবে।”
ফ্রাঙ্ক চিৎকার দিল কেলির উদ্দেশ্যে, “পালাও, কেলি পালাও”
ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ফ্যাভ্রি বসে পড়ল ফ্রাঙ্কের শরীরের আড়ালে, যেন শুয়ে থাকা মানুষটি তার বর্ম । কিছুই করার নেই কেলির। সে তার ভাইকে এমন উন্মাদের হাতে ছেড়ে যেতে পারবে না। বন্দুকটা নামিয়ে এক পাশে ছুঁড়ে দিল সে। ফ্যাভ্রি খুব দ্রুত এগিয়ে এল তার দিকে। হাতের একটা উজি ফেলে দিয়ে অন্যটা সে চেপে ধরল কেলির পিঠে । “আমরা এখান থেকে বের হচ্ছি এখন।” নিচু স্বরে কেলিকে বলল সে। “আমার কাছে অনেকখানি আঠা আছে, ঠিক এমন কোন পরিস্থিতিতে যেন কোন ঝামেলা না করতে হয় তাই নিজের কাছেও কিছু রেখেছি।” আঠার প্যাকটা কাঁধে ঝোলাল সে, তারপর কেলির শার্টের পেছনটা খামচে ধরল শক্ত করে ।
একটা কণ্ঠ বেজে উঠল তাদের পেছনে।“ওকে ছেড়ে দাও”
পেছনে ঘুরল দু-জনেই । সতর্ক ফ্যাভ্রি ঘুরুল তবে দাঁড়ালো কেলির আড়ালে। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি নাথান, খোলা বুক, শুধু শর্টস পরা, সারা শরীরে কালো রঙ।
“আমরা সবাই এখন ইন্ডিয়ান, তাই না, মি: রান্ড।”
নাথান একটা পিস্তল তাক করে আছে তার দিকে। “পালানোর কোন সুযোগ নেই তোমার। অস্ত্রটা ফেলে দাও, প্রাণে বেঁচে যাবে।”
নাথানের দিকে তাকিয়ে আছে কেলি। চোখজোড়া স্থির হয়ে আছে তার । চারপাশে গোলাগুলির শব্দ, চিৎকার চেঁচামেচি চলছে বিরামহীন।
“তুমি আমাকে বাঁচতে দেবে?” হাসল ফ্যাভ্রি, “কোথায়? জেলের ভেতর? প্রস্তাবটাপছন্দ হল না। আমার বরং স্বাধীনতাই ভাল লাগে।”
একটা গুলি ছুটল খুব কাছ থেকে, যতটা বিস্মিত হল কেলি যন্ত্রণা হল তার চেয়েও বেশি। সে দেখল নাথান পেছন দিকে ছিটকে পড়েছে চিৎ হয়ে, সেই সঙ্গে হাতের অস্ত্রটাও ছুটে গেল। তারপর সে নিজেও পড়ে গেল মাটিতে, ব্যাথা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল ভায়ের মতই দ্রুত গতিতে। নিজের পেটের দিকে তাকাল। রক্তে ভিজে উঠছে শার্টটা, পেটের গর্তটা দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে। ফ্যাভ্রি তার পেটের ভেতর দিয়ে নাথানকে গুলি করেছে। এমন নিখাদ বর্বরতা কেলিকে যতটা যন্ত্রণা দিল তার চেয়ে হতবাক করল বেশি। নিজের রক্তটুকুও যেন তার মনোেযোগ নিজের দিকে ফিরিয়ে আনতে পারছে না। নাথানের দিকে তাকাল কেলি। ক্ষণিকের জন্য চোখে চোখ পড়ল দু-জনের। কথাবলার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে দু-জন । তারপর বাকি শক্তিটুকু শেষ হয়ে আসতেই সব কিছু অন্ধকার হয়ে এল। রাতের আঁধার ছাপিয়ে গভীর আঁধার গ্রাস করল তার জগৎটা, মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে।
কাউয়ির দিকে ছোঁড়া প্রথম ছুরিটা রাইফেলের আঘাতে বেহাত হয়ে গেল । কিন্তু ডাইনিটা তার চেয়েও ক্ষিপ্র। সঙ্গে সঙ্গে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেই পেছন দিকে পড়ে গেল কাউয়ি, খুব জোরের সাথে আছড়ে পড়ল সে। দ্বিতীয় ছুরিটা তার মুখের সামনে একেবারে । ঝটকা মেরে তাকে তার শরীরের ওপর থেকে সরিয়ে দিতে চাইল সে কিন্তু ডাইনিটা আটকে আছে তার সাথে, পা দুটো দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে একেবারে সঙ্গমরত প্রণয়িনীর মত। তার অন্য হাতটা কাউয়ির চোখের নিচ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ধারাল নখগুলো যেন উপড়ে ফেলতে চাইছে তারা চোখদুটো। মুখ যতটা সম্ভব সরিয়ে নিল কাউয়ি। মেয়েটার ছুরির অগ্রভাগ তার গলার আরও কাছে নেমে এল। যথেষ্ট তারুণ্য ও শক্তি তার মধ্যে। তবে কাউয়িও কম যায় না, শুআর গোত্র সম্পর্কে ভালই জানে সে । তারা নিজেদের গোপন অস্ত্র-ভান্ডায় লুকিয়ে রাখে চুলের ভঁজে, কোমরে পেঁচানো ছোট কাপড়ের আড়ালে, দেখলে মনে হয় কাপড়টি যেন শুধুই সাজ-সজ্জার জন্য এমন করে রাখা হয়েছে। সে এটাও জানে নারীরা যৌন নীপিড়ন ও ধর্ষণের হাত থেকে বাচার জন্য বিশেষ একটি অস্ত্র রাখে নিজেদের কাছে।
ডাইনিটা তার দিকে আরও একটু ঝুঁকে আসতেই কাউয়ি তার।অপর হাতটা চালিয়ে দিল মেয়েটার দু-পায়ের মাঝে। তার আঙুলগুলো পৌছে গেল গোপনস্থানে লুকিয়ে রাখা ধারাল ছুরিটার হাতলের কাছে। আর দেরি না করে একটানে ওটাকে খাপ থেকে বের করে আনল সে। ঠোটের মাঝ দিয়ে একটা চিৎকার বেরিয়ে এল সবচেয়ে গোপন অস্ত্রটি চুরি হয়ে যাওয়ায়। দাঁতগুলো বেরিয়ে এল ক্রোধে ঘুরে গিয়ে নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইল কিন্তু তার কজিটা এখনো ধরে আছে কাউয়ি। একটু গড়িয়ে যেতেই কাউয়িও তার সাথে গড়িয়ে গিয়ে তাকে তার দু-পায়ের মাঝে আটকে ফেলল। আরও একটু গড়াল দু-জন, কোনভাবেই কজিটা ছাড়ছে না কাউয়ি । ডাইনিটার চোখে চোখ পড়ল তার । চোখে ভেসে ওঠা ভয়ের স্রোত স্পষ্ট দেখতে পেল সে।
“দয়া কর,” ফিসফিসিয়ে বলল সে, “প্লিজ!”
কাউয়ি কল্পনা করল সেই মানুষগুলোর কথা যারা একইভাবে দয়া চেয়েছিল ডাইনিটার কাছে…তবে কাউয়ি এত পাষাণ নয় । “ঠিক আছে, ক্ষমা করলাম তোমায়…”
মেয়েটি সামান্য একটু স্বস্তি পেল যেন । ঠিক তখনই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে এক ঝটকায় তাকে ফেলে দিয়ে তীক্ষ ছুরিটা একেবারে বসিয়ে দিল তার বুকের মাঝখানে। ব্যাথা ও বিস্ময়ে হা হয়ে গেল ডাইনিটা ।
“…খুব দ্রুত মৃত্যু দান করে?” নিজের কথাটা শেষ করে বলল কাউয়ি ।
ছুরির বিষটা দ্রুতই কাবু করল তাকে । মেয়েটার শরীর এমনভাবে কাঁপতে থাকল যেন মাথা থেকে পা পর্যন্ত বিদ্যুৎ প্রবাহ বইছে । কাউয়ি তাকে দূরে সরিয়ে দিল, একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল সুইর মুখ থেকে শরীরটা মাটিতে আছড়ে পড়ার আগেই মারা গেল ইন্ডিয়ান ডাইনি। ঘুরে গেল কাউয়ি, হাতের বিষাক্ত ছুরিটা ছুড়ে ফেলল এক পাশে। “তোমার পাওনা থেকে অনেক বেশিই দিলাম তোমায়।”
গোলাগুলি এরইমধ্যে থেমে গেছে, কিছুক্ষণ পর পর দু-একটা শব্দ আসছে জঙ্গলের ভেতর থেকে। আর এখনই লুইর এখান থেকে সরে পড়তে হবে তার বাকি সৈন্যগুলো মরার আগেই। মাটি থেকে দ্বিতীয় উজিটা তুলে নিয়ে নাথানের দিকে তাকাল । এখনো মরে নি, কঁনুইতে ভর দিয়ে কোঁকাচ্ছে শুধু। কষ্টের তীক্ষ একটা প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে তার মুখে। নাথানকে একটা স্যালুট দিল ফ্যাভ্রি, তারপর ঘুরে হাঁটা শুরু করতেই আবার জমে গেল সে। কয়েক মিটার সামনে এমন এক দৃশ্য তার চোখে পড়ল যার কোন সংজ্ঞাই তার কাছে নেই। একটা ফ্যাকাশে, ছিপছিপে অবয়ব দাড়িয়ে আছে গাছের সাথে হেলান দিয়ে ।
“লুই…”ভয়ে এক পা পেছনে সরে এল সে। যেন ভুত দেখেছে।
“বাবা, পেছনে সরে যাও,” চিৎকার দিল নাথান ব্যাথাভরা কণ্ঠে। একটু কেঁপে উঠে সম্বিত ফিরল লুইর । তাহলে এটা কোন ভুত নয়। কার্ল রান্ড জীবিত! কি অলৌকিক কাণ্ড! নিয়তি কোথায় এনে দাঁড় করাল তাকে? হাতের উজিটা শীর্ণকায় মানুষটার দিকে তাক করল ফ্যাভ্রি। দূর্বল অবয়বটি একটা হাত উঁচু করে তার বাঁ-দিকটা দেখালে লুইও তাকাল সেদিকে।
ঝোপের আড়ালে একটা জাগুয়ার বসে আছে, শরীরে ছোপ ছোপ দাগ, মাংসপেশীগুলো দুলে উঠছে মাঝে মাঝে। লুইর চোখ দুটো প্রসারিত হবার আগেই বাঘটা ঝাঁপ দিল তার দিকে। লুইও দ্রুতগতিতে অস্ত্রটা উঁচু করে ট্রিগার চেপে ধরল উড়ন্ত জাগুয়ারের দিকে। ঠিক তখনই অপর পাশ থেকে দৃষ্টির আড়াল থেকে বিশাল দেহের কিছু একটা উড়ে এসে লুইকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল কয়েক মিটার দূরে, তারপর আছড়ে ফেলল মাটিতে। যন্ত্রণা ছাপিয়ে বিস্ময় গ্রাস করল মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে থাকা মানুষটিকে । তার শরীরটাকে প্রকাণ্ড কিছু একটা চেপে রাখায় নড়ার শক্তিটুকুও রইল না।
কে..কি…? গলাটা ঘুরাল সে দেখার জন্য। একটা কালো জাগুয়ার দাঁত খিচে শব্দ করছে তার দিকে তাকিয়ে। ধারাল নখগুলো গেঁথে আছে পিঠে, প্রতিটা যেন একেকটা বিষ মাখানো বর্শা । হায় ঈশ্বর?
প্রথম জাগুয়ারটা দৃষ্টিসীমায় এল, হেটে আসছে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটানোর প্রস্তুতি নিয়ে । হাতের উজিটা ঘুরিয়ে আনার জন্য খুব চেষ্টা করল লুই, বাহুটা একটু উঁচুও হল কিন্তু ট্রিগার চাপার আগেই হাতের হাঁড় মট করে ভেঙে গেল। বড়-বড় ধাঁরালো দাঁত বসে আছে মাংসপেশিতে। জাগুয়ারটা মুখ দিয়ে এক টান দিতেই কাঁধের কাছ থেকে হাতটা খুলে চলে এল, মট করে শব্দ হল আবারো । চিৎকার দিয়ে উঠল লুই।
“মজা করে খাও!” জাগুয়ার দুটোর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল নাথান। দৃশ্যের শেষাংশটুকু দেখার ইচ্ছে নেই তার।
একবার সে কালো তিমিদের নিয়ে একটা প্রামান্যচিত্র দেখেছিল যেখানে একটা তিমি একটা সিলের বাচ্চাকে নিয়ে খেলা করছিল ওটাকে খাবার আগে, শিকারকে ছুঁড়ে দিচ্ছিল তারপর ধরছিল মুখ দিয়ে, কামড়ে মাংস ছিড়ে নিয়ে আবারো ছুঁড়ে দিচ্ছিল শূন্যে। নৃশংস আর নির্দয় এক খেলা। স্বাভাবগত আচরণ ছিল ওটা। একই ঘটনা ঘটছে এখানেও। জাগুয়ার দুটো তাদের আদি এবং আসল বন্যরূপ দেখাচ্ছে লুইকে। তার মৃত্যুটা যে শুধু তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য তা নয় বরং প্রতিশোধের খেলাটা রোমাঞ্চকর করাটাও সমান উপভোগের বিষয় ওদের কাছে ।
নাথানের মনোযোগ এবার কেলির দিকে ফিরল । নিজেকে অনেক কষ্টে টেনে মেয়েটার কাছে নিয়ে গেল সে। তার যে-পাশটা সুস্থ সেই পাশটা ব্যবহার করে মাটিতে গড়িয়ে এগোতে বেশ কষ্ট করতে হল তাকে। নিতম্বে তীব্র যন্ত্রণা হল। দৃষ্টি অন্ধকার হয়ে আসছে কিন্তু তাকে পৌছাতেই হবে কেলির কাছে।
গুটিসুটি মেরে পড়ে আছে কেলি, রক্তের ধারা বইছে তার পেট থেকে। অবশেষে তার পাশে গিয়ে পৌছাল নাথান। “কেলি…” তার কণ্ঠস্বর শুনে একটু নড়ে উঠল কেলি । আরও কাছে এগিয়ে গেল নাথান, দূর্বল বাহু দুটো দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল ।
“আমরা পেরেছি তাই না?” তার কণ্ঠটা নেমে গেছে সবচে নিচু খাদে ।
“রোগের ওষুধটা?”
“আমরা ওটা পৃথিবীর জন্য নিয়ে যাব, জেসির জন্য নিয়ে যাব।” এবার তার বাবা হুমড়ি খেয়ে পড়ল আহত মানুষ দুটির পাশে, তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বসে পড়ল হাটুর ওপর ভর দিয়ে । “সাহায্য আসছে..একটু ধৈর্য ধর…তোমরা…”
নাথান তার বাবার পেছনে প্রাইভেট ক্যারেরাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেশ অবাক হল।
“সার্জেন্ট কসটস এই গুন্ডাদের রেডিওটা খুঁজে পেয়েছে,” বলল সে । “হেলিকপ্টারগুলো আধঘণ্টার মধ্যেই এসে যাবে।”
কেলিকে আরও একটু জড়িয়ে ধরে মাথাটা নাড়ল নাথান । চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেছে মেয়েটার। নাথানের চোখেও আঁধার নেমে আসছে দ্রুত। দূরে কোথাও ফ্রাঙ্কের কণ্ঠটা বেজে উঠল ।
“কেলি! কেলি, ঠিক আছ তুমি?”
আট মাস পর
বিকেল ৪:৪৫
ল্যাংলে, ভার্জিনিয়া
ওব্রেইনের বাড়ির দরজায় নক করল নাথান। আজকে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে ফ্রাঙ্ক। তার জন্য একটা উপহার এনেছে নাথান। বোস্টন রেডসক্স ক্লাবের নতুন একটি ক্যাপ, যেটায় দলের সব খেলোয়াড়ের স্বাক্ষর করা। দরজার সামনে দাড়িয়ে অপেক্ষা করছে সে, দৃষ্টি আটকে আছে সুন্দর করে ছাঁটা লনের সবুজ ঘাসের দিকে।
কালো মেঘের দল ভিড় করছে দক্ষিণ-আকাশে, পূর্বাভাস দিচ্ছে ঝড়ের। আবারো নক করল নাথান ।ফ্রাঙ্ক কে দেখার জন্য গত সপ্তাহে ইন্সটার ইন্সটিটিউটে গিয়েছিল । তার নতুন পা-দুটো এখনো বেশ নরম আর দূর্বল, তবে ক্রাচে ভর দিয়ে চলতে পারছে ভাল করেই।
“ফিজিক্যাল থেরাপি বিচ্ছিরি একটি ব্যাপার, অভিযোগ করেছিল ফ্রাঙ্ক । “আর গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত সাদা পোশাকের এই ভূতগুলো তো আছেই। কী বিপদে যে আছি।” শুনে হেসেছিল নাথান। গত কয়েক মাসজুড়ে গবেষক এবং ডাক্তাররা মিলে খুব সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করেছে পা-দুটোর বেড়ে ওঠা। লরেন বলেছিল, তার ছেলের পা প্রিয়নের প্রভাবে ঠিক কিভাবে জন্ম নিচ্ছে তা এখানে একটা বিস্ময়। প্রথমে জানা গিয়েছিল প্রিয়নটা প্রাণঘাতি রোগের সৃষ্টি করে শিশু আর বেশি বয়স্কদের মাঝে, যাদের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে একটু কম, আর সুস্থ দেহের কমবয়সীদের মাঝে এটার কোন প্রভাব দেখা যায় নি। তবে এখন ভাল করে পর্যবেক্ষণ করার পর প্রিয়নটার আরও একটা ক্ষমতা দেখা গিয়েছে। এই প্রিয়ন প্রয়োজনে কারে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ন বদলে দিতে পারে আর তখন শরীরে প্রয়োজনীয় এজেন্টগুলো খুব দ্রুতহারে বাড়ার সুযোগ পায়, যেটা সুস্থতার জন্য বা নতুন করে কোন অঙ্গ জন্মাতে প্রধান ভূমিকা পালন করে।
এমন অলৌকিক প্রভাব ফ্রাঙ্কের মাঝেও দেখা গিয়েছে তবে বিপদও ছিল তার সাথে । তাকে সবসময় সেই বিশেষ ফলের রস খেতে হয়েছে ওষুধ হিসেবে, এটা তার শরীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকা ক্যান্সার সৃষ্টিকারী এজেন্টগুলোকে নষ্ট করে দেয়। যেমনটা ছড়িয়ে পড়েছিল জেরাল্ড ক্লার্কের দেহে। এত কিছুর পর ফ্রাঙ্কের পা-দুটো বেড়ে উঠেছে পূর্ণমাত্রায়। এখন তাকে আরও নিয়মিত ও সতর্কতার সাথে রস খাওয়ানো হচ্ছে যাতে প্রিয়নটা শরীর থেকে সম্পূর্ন দূরে হয়ে যায়। এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়াটা খুবই জরুরি।
প্রিয়নটা যতক্ষণ তার শরীরে থাকবে তার শরীরে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেবে যাতে অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা যেমন বেড়ে যাবে তেমনি বেড়ে যাবে অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির সম্ভাবনা, যেমন টিউমার, যেটা পরে ক্যান্সারে রূপ নেয়। তাই প্রিয়নটা এতদিন বন্ধুর মত কাজ করলেও ওটা শক্র হয়ে ওঠার আগেই ওটা থেকে মুক্তি পেতে হবে। আর তখনই শুধুমাত্র তার স্বাভাবিক রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থাটা কাজ করতে থাকবে আগের মত । ফ্রাঙ্ককে একরকম গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করার পরও প্রিয়নটা কিভাবে এত সব কিছু করে তার বেশির ভাগই অব্যাখ্যাত থেকে গেছে।
“এই রহস্যের কোন কিনারা আমরা এখন করতে পারব না, আর তার চেয়েও কঠিন হল এই গাছের মত কোন গাছ জন্ম দেওয়া, দুঃখের সাথে বলেছিল লরেন। “গাছটা যদি সত্যিই প্যালেওজয়িক যুগের হয়ে থাকে তবে আমি বলব আমাদের থেকে ওটা একশ মিলিয়ন বছর এগিয়ে আছে। একদিন হয়তো ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে তবে সেটা বর্তমানে সম্ভব নয়। আমরা আমাদের বৈজ্ঞানিক অর্জনগুলো অগ্রগতির কাজে লাগাতে পারি মাত্র, তবে সত্যি বলতে এই উচ্চপর্যায়ের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার কাজে আমরা এখনো শিশু ।”
“এমন শিশু যে খেলারছলে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছিল আর একটু হলেই,” যোগ করেছিল নাথান।
সময়মত রোগটার প্রতিষেধক না পেলে পরিণতি কত ভয়ঙ্কর হত তা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে তার। ব্যর্থতার আগুনে পুড়তে হত সবাইকে। কিন্তু ভাগ্য ভাল, ফলটা দারুণভাবে রোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করেছে। ওটার রসে কাঙ্ক্ষিত অ্যান্টিপ্রিয়ন’টা পাওয়া গেছে যেটা প্রিয়নটাকে নষ্ট করে দেয়। এই অ্যান্টি-প্রিয়নটা মূলত এক প্রকার অ্যালকালয়েড যেটাকে সহজেই পরীক্ষাগারে তৈরি করা যায়। অ্যান্টি-প্রিয়নের স্যাম্পল এবং গঠনশৈলি দ্রুত সারা আমেরিকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নিয়ে। এটাও আবিষ্কার হয়েছে যে, একমাস এই অ্যালকালয়েড শরীরে গ্রহণ করলে রোগটা সম্পূর্ন দূর হয়ে যাবে শরীর থেকে, এমন কি প্রিয়নটারও কোন অস্তিত্ব থাকবে না। এই সহজ তথ্যটা অজানা ছিল ব্যান-আলিদের কাছে। তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম দাস হয়ে থাকতে হয়েছে তাদেরকে। সৌভাগ্যবশত পরীক্ষাগারে তৈরি করা অ্যান্টি-প্রিয়নটাও খুব দ্রুত সমাধান হিসেবে পৌছে গেছে পৃথিরীর সর্ব প্রান্তে, যেটা খুবই প্রয়োজন ছিল এই মহামারি থেকে বাঁচতে। সবাই এখন রোগটা থেকে মুক্ত।
অন্যদিকে প্রিয়নটার কোন নকল তৈরি করা যায় নি বর্তমান বিজ্ঞানের সমস্ত কৌশল প্রয়োগ করেও । প্রিয়ন-ঠাসা আঠার সবটুকুই ঘোষনা কয়েছে চতুর্থ মাত্রার ভয়ঙ্কর বস্তু হিসেবে, তার অর্থ হল এটা প্রাণীদের জন্য রীতিমত প্রাণঘাতী। মাত্র অল্প কয়েকটা গবেষণাগারে স্যাম্পলগুলো নিরাপদ সংগ্রহে রাখা হয়েছে।
ওদিকে আঠার মূল উৎস ব্যান-আলি উপত্যকার ইয়াগা ধ্বংস হয়ে গেছে একেবারে । ওটার বিশাল কাঠামোটার ধ্বংসস্তুপ আর ছাইয়ের আস্তরণে ছেয়ে আছে সমগ্র অঞ্চল।
তাতে আমার কিছু যায় আসে না, আমি ভালই আছি এখন, নাথান ভাবল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। দৃষ্টি এখন ডুবতে থাকা মার্চের সূর্য আর দক্ষিণের মেঘের দিকে।
ওদিকে দক্ষিণ-আমেরিকায় কাউয়ি এবং দাখি বেঁচে যাওয়া ডজনখানেক ব্যানআলিদেরকে সাহায্য করছে নতুন পরিবেশে নতুনভাবে জীবন শুরু করার কাজে। এই মানুষগুলোই এখন আমাজনের বুকে সবচেয়ে সমৃদ্ধ। নাথানের বাবা সেন্ট সেভিল ফার্মাসিউটিক্যালের বিরুদ্ধে মামলা করেছে ব্যান-আলিদের ঘর-বাড়ি ধ্বংস এবং মানুষজন হত্যার অভিযোগে। কোম্পানিটির একেবারে বেহালদশা করে ছেড়েছে সে। পাশাপাশি এটাও পরিস্কার, লুই ফ্যাভ্রির সাথে ফ্রান্সের এই ওষুধ কোম্পানিটির সরাসরি যোগাযোগ ছিল। কোর্টে আপিল করলে তার নিষ্পত্তি হতে যদিও কয়েক বছর লেগে যাবে কিন্তু এরইমাঝে কোম্পানিটি দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। সাথে এর কার্যনির্বাহী পরিষদের সবার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে অপরাধের অভিযোগ।
এত কিছু করার মাঝেও তার বাবা দক্ষিণ-আমেরিকায় ব্যান-আলিদের পূর্ণর্বাসন কাজে যথেষ্ট সহযোগীতা করে যাচ্ছে। নাথানও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার বাবার সাথে যোগ দেবে, তবে সে একা যাচ্ছে না সেখানে। জিন বিশেষজ্ঞের একটা দল যাচ্ছে তার সাথে ব্যান-আলিদের পরিবর্তিত ডিএনএ’র গঠন পরীক্ষা করতে, পাশাপাশি এটাও বোঝার চেষ্টা করবে যে, কিভাবে এমন পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব, আর কিভাবে ইয়াগার সৃষ্ট এই পরিবর্তনটা দূর করে স্বাভাবিক জৈবিক গঠন ফিরিয়ে আনা যায় । নাথানের ধারণা, যদি কোন সমাধান কখনো আসে তবে সেটা আসবে কয়েক প্রজন্ম পর।
তার বাবার কাজে আরও যারা সহযোগীতা করছে তাদের মধ্যে দুই রেঞ্জার কসটস এবং ক্যারেরাও রয়েছে। পদমর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে দু-জনেরই । ব্যান-আলিদের মৃতদেহগুলো একজায়গায় জড়ো করার কাজেও তদারকি করেছে এই সৈন্য দু-জন । কাজটা খুবই কঠিন আর হৃদয়বিদারক।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল নাথান । অনেক জীবন হারিয়েছে তারা…কিন্তু আরও অনেকগুলো জীবন বেঁচেও গিয়েছে তাদের রক্তের বিনিময়ে কেনা প্রতিষেধকটার কল্যাণে । তারপরও মূল্যটা অনেক বেশিই হয়ে গেছে। দরজার দিকে এগিয়ে আসা পায়ের শব্দ নাথানের মনোযোগ ফিরিয়ে আনল বর্তমানে।
অবশেষে খুলে গেল দরজাটা মুখে হাসি এসে গেল তার। “এত দেরি হল তোমার? মনে হয় পাঁচ মিনিট ধরে অপেক্ষা করছি।”ভ্রু জোড়া একটু কুঁচকে নাথানের দিকে তাকাল কেলি একটা হাত কোমরের পেছনে রাখা ।
“এমন ভারি পেট দেখেছ কখনো?” নাথান এক পা এগিয়ে একটা হাত রাখল আর বাগদত্তার স্ফিত হয়ে ওঠা পেটের ওপর । আর কয়েক সপ্তাহ পরই তাদের সন্তানের জন্ম নেওয়ার কথা। কেলির পেটে গুলি লাগার পর চিকিৎসা নেবার সময়ে গর্ভধারণের বিষয়টি জানতে পারে। সম্ভবত কেলি নিজেও ছোঁয়াচে রোগটায় আক্রান্ত হয়েছিল মানাউসে জেরাল্ড ক্লার্কের মৃতদেহ পরীক্ষা করার সময়ে । জেসিকে জন্ম দিতে গিয়ে কেলির সন্তান জন্মানোর ক্ষমতা প্রায় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল কিন্তু দু-সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা আমাজনের অভিযানের সময়টুকুতে প্রিয়নটা তার সেই ক্ষতিগ্রস্ত অংশটুকু সারিয়ে তুলেছে অজান্তেই । বিষয়টা একেবারে সময়মত ধরা পড়েছে। প্রিয়নটা যদি আর কয়েক সপ্তাহ তার শরীরে থাকত তবে সেটা মারাত্মক ক্যান্সারে রূপ নেয়া শুরু করত। তবে তার ভায়ের সাথে তাকেও ফলের রসটা নিয়মিত দেয়া হয়েছে। প্রিয়নটা কোন ক্ষতি করার আগেই দূর হয়ে গেছে তার শরীর থেকে।
এই ঘটনা নাথান ও কেলির জন্য একটা সুসংবাদ বয়ে এনেছে। লুইর আক্রমণের ঠিক আগের রাতে গাছের ওপর তাদের ভালবাসাবাসার একটা বীজ রোপিত হয় কেলির গর্ভে, ফলে জেসি পেতে যাচ্ছে ফুটফুটে একটী ভাইকে। একটা নামও ঠিক করে ফেলেছে তারা-ম্যানুয়েল।
একটু ঝুঁকে আলতো করে চুমু খেল নাথান । দূরের আকাশটা গর্জে উঠল আসন্ন ঝড়ের কথা মনে করিয়ে দিয়ে।
“সবাই অপেক্ষা করছে,”ফিসফিস করে বলল কেলি।
“আরে করুক অপেক্ষা,”চাপাস্বরে কথা বলল নাথান।
বৃষ্টির বড় বড় ফোটা পড়তে শুরু করেছে, আছড়ে পড়ছে খোলা রাস্তার ওপর। মেঘ গর্জে উঠল আবারো, বাতাসের ঝাপটা বয়ে নিয়ে এল বৃষ্টির জলকণাগুলোকে।।
“কিন্তু সবাইকে বসিয়ে রেখে…” পিছুটান আর সুখ এ-দুইয়ের মাঝে কেলি।
তাকে আরও কাছে টেনে নিল নাথান, মুখের সাথে মুখটা চেপে ধরল, “চুপ কর, ডার্লিং ।”
* * *
আমাজনের গভীরে প্রকৃতি চলছে তার নিজের নিয়মেই, সবার দৃষ্টির আড়ালে, সবার নাগালের বাইরে। ছোপ ছোপ দাগ দেওয়া জাগুয়ারটা তার বাচ্চাগুলোকে নিয়ে গুহার ভেতর শুয়ে আছে, আদর করছে সদ্য হাটতে শেখা শাবকগুলোকে। তার কালো রঙের সঙ্গিনীটি অনেকক্ষণ হল বাইরে গিয়েছে। বাতাসের গন্ধ শুকল জাগুয়ারটি । একটা পরিচত গন্ধ ভেসে এল বাতাসে। উঠে দাঁড়িয়ে গুহার মুখে এগিয়ে গেল ওটা।
জঙ্গলের ছায়া থেকে একটা অবয়ব হেটে আসছে তার দিকে। পুরুষটা তার কাছে পৌছে একটু শব্দ করল। দু-জনেই একে অপরের শরীর ঘষা দিল যেন জড়িয়ে ধরতে চাইছে একে অপরকে। স্ত্রী-জাগুয়ারটার শরীর থেকে একটা খারাপ গন্ধ আসছে।
আগুনে পুড়ে যাওয়া, চিৎকার এগুলো যেন সাথে নিয়ে এসেছে তার সঙ্গিনীটি। এই গন্ধটা তার মেরুদণ্ড দিয়ে ভয়ের,একটা স্রোত বইয়ে দিল। গরগর শব্দ করল সে।
বড় জাগুয়ারটা হেটে একপাশে সরে গেল, তারপর সামনের হাত দুটো দিয়ে জঙ্গলের উর্বর মাটি সরাতে শুরু করল । ছোট একটা গর্ত করার পর মুখ থেকে একটা বীজ ফেলে দিল ওটার মাঝে তারপর পা দিয়ে মাটি সরিয়ে ঢেকে দিল অমসৃন বীজটাকে। কাজ শেষে স্ত্রী-জাগুয়ারটা তার বাচ্চাগুলোর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কালো ছোপ দেওয়া বচ্চাগুলো দুধ খাওয়ার জন্য মায়ের পাশে ঘুরঘুর করছে। বাচ্চাগুলোকে একটু আদর করে সে ঘুরে দাঁড়াল সঙ্গীর দিকে। রোপিত বীজটার কথা এরইমধ্যে ভুলে গিয়েছে সে। ওটা নিয়ে তার আর মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। এখন সময় এগিয়ে যাওয়ার। তার বাচ্চা আর সঙ্গীকে এক জায়গায় করে গভীর জঙ্গলের দিকে পা বাড়াল সবাই। পেছনে পড়ে আছে বীজ বোনা গর্তটি, মাঝে দুপুরের তপ্তরোদে উঠে যাচ্ছে মাটির সোঁদা গন্ধটুকু। সবার দৃষ্টি ছাড়িয়ে, সবার নাগালের বাইরে।
বিস্মৃত এক জগৎ।
***
