আমাজনিয়া – ২
অধ্যায় ২
রিপোর্ট
আগস্ট ৬, রাত ৯:১৫
সাও গ্যাব্রিয়েল দা চিচিরিদ
ম্যানুয়েলের এফইউএনএআই (FUNAI) অফিস অতিক্রম করে নাথান এগুচ্ছে ব্রাজিলিয়ান আর্মি বেস-ক্যাম্পের দিকে। তার সাথে আছে এক ব্রাজিলিয়ান বায়োলজিস্ট প্রফেসর কাউয়ি। প্রফেসর যাত্রাপথে হাসপাতাল থেকে একটু ঘুরে এসেছে। তার কাছে থেকেই ধীরে ধীরে টামার ভাল হয়ে ওঠার খবর শুনে নাথান এখন কিছুটা চিন্তামুক্ত।
সুন্দরভাবে গোসল করার সাথে পরিস্কার কাপড়-চোপড়, নাথানের নিজেকে আর কোনভাবেই সেই মানুষটার মত মনে হচ্ছে না যে কয়েক ঘণ্টা আগে ছোট্ট এক মেয়েকে নিয়ে এই সাও গ্যাব্রিয়েলে এসেছিল। তার মনে হচ্ছে যেন ঘাম, ময়লার সাথে সাথে শরীর থেকে পুরো জঙ্গলকেও ধুয়ে মুছে ফেলেছে পুরোদমে। সদ্য ইয়ানেমামো সদস্য হওয়া নাথান কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুরোপুরি এক আমেরিকান নাগরিকে রূপ নিল। আইরিশ স্প্রিং ডিওডরান্ট সাবানের বিস্ময়কর রূপান্তর করার ক্ষমতা এটা। সে নাক দিয়ে শব্দ করে শরীরের সাথে লেগে থাকা বাকি ঘ্রাণটুকু নিতে থাকল।
“দীর্ঘ সময় জঙ্গলে থাকার পর এই ঘ্রাণে একটু বমি বমি লাগছে, তাই না?” মুখের পাইপ থেকে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললো প্রফেসর কাউয়ি। প্রথম যখন আমি ভেনিজুয়েলার জঙ্গল ছেড়ে শহরে আসি, কি বলব তোমায়, আমার জাগতিক সব অনুভুতির উপর যেন বোমাবর্ষন হচ্ছিল-গন্ধ, শব্দ, ভয়ঙ্কর গতিতে ছুটে চলা সভ্যতা। অনেক সময় লেগেছিল এসব জিনিসের সাথে নিজেকে ধাতস্থ করতে।”
‘সত্যিই অবাক করার মত, কত সহজেই আপনি জঙ্গল ছেড়ে বাইরের এই স্বাভাবিক জীবনে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন,” বলল নাথান। “কিন্তু আমি আপনাকে এমন একটি জিনিসের কথা বলতে পারি যেটা এই সভ্য জগতের সব ঝামেলাকে সহজ করে দিয়েছে।”
“কি সেটা?” জিজ্ঞেস করলো ম্যানুয়েল ।
‘টয়লেট পেপার।”
নাক দিয়ে শব্দ করে জোরে হেসে উঠলো কাউয়ি, “তোমার কি মনে হয় আমি জঙ্গল ছেড়ে দিয়েছি?”
আলোয় ঝলমল করা বেস-ক্যাম্পের গেট অতিক্রম করলো তারা। দশ মিনিটের মধ্যে মিটিং শুরু হওয়ার কথা। নাথানের কাছে দেবার মত কোন তথ্য আছে হয়তো। আরেকটু হেটে সামনে এগোতেই নাথানের দৃষ্টি গেলো ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়তে থাকা শান্ত শহরটার দিকে। নতুন করে আবার চিনতে চাইলো ক্রমে বেড়ে ওঠা এই নগরীকে।
নদীর ওপারে পূর্ণিমার চাঁদ ঝুলে আছে আকাশে, প্রতিফলিত হচ্ছে নদীর চকচকে পানিতে, রাতের কুয়াশা এই দৃশ্যকে অস্পষ্ট করতে করতে ভেসে চলেছে শহরের দিকে। শুধুমাত্র রাতেই সাও-গ্যাব্রিয়েলের জঙ্গল জেগে ওঠার সুযোগ পায়। সূর্য ডোবার পর শহরের সব শব্দ ধীরে ধীরে ম্লান হতে থাকে আর সেই জায়গায় স্থান করে নেয় আশেপাশের গাছ থেকে ভেসে আসা সোয়ালো পাখির কর্কশ সঙ্গীত। সাথে থাকে ব্যাঙের ডাক, বন কাঁপানো পঙ্গপালের চিৎকার আর ঝিঝির ডাক। এমনকি পথেঘাটে বাদুরের পাখা দাপানো, রক্তচোষা মশার ঝাঁকের ভনভন শব্দে ঢাকা পড়ে যায় গাড়ি-ঘোড়ার হর্ন আর মানুষের কথাবার্তা । যখন কেউ এখানকার খোলা পানশালা অতিক্রম করে, নিশাচরের মত রাতজাগা কাস্টমারের হৈ-হুল্লোড়, হাসির শব্দ শোনে তখনই শুধু মনে হবে মানুষের এসব কোলাহল, এই উপস্থিতি কতটা বেমানান এই জঙ্গলে । অন্যদিক দিকে রাতে এই জঙ্গলই শাসন করে সবকিছু। নাথান আরেকটু জোরে হেটে ম্যানুয়েলের সাথে তাল মেলালো।
“আমার কাছে সম্ভাব্য কি চাইতে পারে ইউএস সরকার?”
মাথা ঝাঁকালো ম্যানুয়েল, “আমি নিশ্চিত নই কিন্তু এটা কোনভাবে তোমার পৃষ্ঠপোষককে জড়িয়ে ফেলেছে।”
“টেলাক্স ফার্মাসিউটিক্যালস?”
“হু, তারা কয়েকজন কর্পোরেট লেভেলের লোকজন নিয়ে এসেছে। দেখে মনে হল কিছু আইনজীবিও আছে।”
“যেখানে টেলাক্স এটার সাথে জড়িত সেখানে আইনজীবিরা আসবে কেন?” ক্রোধ ঝরে পড়লো নাথানের কণ্ঠে।
“তাদের কাছে ইকো-টেক বিক্রি করা উচিত হয় নি তোমাদের,” কাউয়ি বললো তার পাইপের ধোয়ার আড়াল থেকে।
দীর্ঘশ্বাস ফেললো নাথান, “প্রফেসর…”
শামান বিনয়ীভাবে হাত তুললো, “দুঃখিত, আমি জানি..এটা কষ্টকর একটি অধ্যায়।”
কষ্ট। নাথান হলে এই শব্দটা ব্যবহার করতো না। বারো বছর আগে ইকো-টেক ছিল তার বাবার খুব বড় একটি পরিকল্পনা। শামানদের প্রজ্ঞাকে পুঁজি করে সেগুলোর সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন-নতুন ভেষজ ঔষধ আবিস্কারের জন্য একটি উপযুক্ত ফার্মাসিউটিক্যালস ছিল এই ইকো-টেক । মেডিকেলের উপর যাদের এত দক্ষতা আমাজনের বুক থেকে সেই সব মানুষদের হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে চেয়েছিলো নাথানের বাবা। আর এটাও নিশ্চিত করতে চেয়েছিলো, শামানরা যেন তাদের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞানের বিনিময়ে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হতে পারে বৈধ-বাসস্থানের অধিকার আদায়ের মাধ্যমে। এটা যে শুধুমাত্র তার বাবার স্বপ্ন ও জীবনের উদ্দেশ্য ছিল তা নয়, তার মা সারাহও এই একই জায়গায় পৌঁছানোর প্রতিজ্ঞায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল।
পিস কো-এর একজন মেডিকেল ডাক্তার হিসেবে কাজ করার সময়টাতেই সারাহ নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলো স্থানীয় এইসব মানুষের জন্য। তাদের প্রতি তার এই তীব্র ভালবাসা ছিল সংক্রামক যা নাথানের বাবাকেও খুব দ্রুত আক্রান্ত করে। পরবর্তিতে সেও তার স্ত্রীর পদাঙ্ক অনুসরন করার জন্য প্রতিজ্ঞা করে, ফলে বছরখানেক পরই চমৎকার সম্ভাবনাময় ব্যবসায়ীক মডেল এবং এক অলাভজনক কর্মপরিধির সংমিশ্রন হয়ে ওঠে এই ইকো-টেক। কিন্তু এখন উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সে-সবই হারিয়ে গেছে। সুচতুর পরিকল্পনা করে নাথানের কাছ থেকে গিলে খেয়েছে টেলাক্স।
“দেখে মনে হচ্ছে আমরা গার্ড পেতে যাচ্ছি,” নাথানের চিন্তার দেয়াল ভেঙে দিয়ে বললো ম্যানুয়েল ।
স্টেশনের মেইনগেটে বিচলিত এক সৈন্যের পেছনে হলদে-বাদামি রঙের চ্যাপ্টা টুপি পরা দু-জন রেঞ্জার দাঁড়িয়ে পড়ল শক্তভাবে। খুব সতর্কতার সাথে নাথান রেঞ্জারদের কোমরে ঝোলানো অস্ত্রের দিকে চোখ বুলিয়ে পুণরায় ডুবে গেল আজকের মিটিং কি নিয়ে সে বিষয়ে।
তারা গেটের কাছে পৌছাতেই ব্রাজিলিয়ান গর্ডটি তাদের পরিচয়পত্র চেক করল। চেক শেষ হতেই দু-জন রেঞ্জারদের একজন এগিয়ে এল সামনে, “আমরাই আপনাদের মিটিঙের জন্য নিয়ে যাবো। আমাদের সাথে আসুন, প্লিজ।” একথা বলেই খুব সুচারুভাবে গোড়ালির ওপর ভর করে ঘুরে হাটতে শুরু করলো।
নাথান তার সঙ্গীদের দিকে একটু তাকিয়ে গেট দিয়ে প্রবেশ করলো । তাদের পিছনে দ্বিতীয় রেঞ্জারটি খুব কৌশলের সাথে হাটছে। গার্ডদের দেখানো পথে হাটতে হাটতে ক্যাম্পের ফুটবল মাঠে থামানো চারটি হেলিকপ্টার চোখে পড়লো তার। ওগুলো দেখেই তীব্র ভয়ে পেট গুলিয়ে উঠলো নাথানের। এসবের কোন কিছুই প্রফেসর কাউয়ির দৃষ্টি কাড়ছে না। সে খুব স্বাভাবিকভাবে গা ছেড়ে দিয়ে গার্ডের পিছু পিছু পাইপ ফুকতে ফুকতে হাটছে। এমনকি ম্যানুয়েলের চোখেমুখেও সতর্কতার কোন ছাপ নেই ।
দুই কক্ষবিশিষ্ট একটি টিনশেড ঘরের ভেতর দিয়ে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই ঘরটা ব্রাজিলিয়ান সৈন্যদের ব্যারাক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নাথান দেখলো সামনেই জরাজীর্ণ অবস্থায় কাঠের ফ্রেমের উপর একটি ওয়্যারহাউজ দাঁড়িয়ে আছে, কিছু জানালায় কালো রঙ করা। সামনের সৈন্যটি মরিচা ধরা একটি দরজা খুলে ইশারা করতেই নাথান প্রথমে ঢুকলো সেখান দিয়ে। ভেতরে মাকড়সার জালেভরা অপরিচ্ছন্ন একটি পরিবেশ-এমনটি ভেবে ভেতরে ঢুকে সে যা দেখলো তা অবিশ্বাস্য হ্যালোজেন এবং ফ্লোরোসেন্ট বাতির আলোয় চকচক করছে ওয়্যারহাউজের ভেতরটা, সিমেন্টের মেঝেতে বিভিন্ন রকমের তারের গুচ্ছ একটা আরেকটাল উপর দিয়ে চলে গেছে বিভিন্নদিকে। তারগুলো বেশ মোটা, প্রায় নাথানের কব্জির মত, হাউসের শেষ-অর্ধেক অংশে সারি দেওয়া তিনটি অফিস ঘরের একটা থেকে জেনারেটরের শব্দ শোনা যাচ্ছে। হা-করে দেখছে নাথান। ঘরটা আধুনিক যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত-কম্পিউটার, রেডিও, টেলিভিসন এবং মনিটরে ভরপুর। সুসংগঠিত এই কর্মযজ্ঞে ব্যবহৃত হওয়া বিভিন্ন রকম জিনিসপত্র ঘিরে আছে ঘরের ঠিক মাঝখানে রাখা বিশাল একটি কনফারেন্স টেবিলকে যেটার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রিন্ট করা কাগজ, ম্যাপ, গ্রাফ এমনকি কতোগুলো খবরের কাগজও। সামরিক ও বেসামরিক উভয় পোশাকের বেশ কিছু নারী-পুরুষ পুরো ঘরজুরে ছোটাছুটি করতে ব্যস্ত। কয়েকজন মনোযোগসহকারে কিছু কাগজ পড়ছে, তাদের মধ্যে কেলি ওব্রেইন আছে।
“কি হচ্ছে এখানে?” বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করলো নাথান ।
“আমি দুঃখিত, এখানে ধুমপান নিষেধ,” জ্বলন্ত পাইপের দিকে তাকিয়ে প্রফেসর কাউয়িকে বললো এক গার্ড।
“ও,” কাউয়ি খুব দ্রুত তার পাইপের জ্বলন্ত তামাক অফিসের প্রবেশপথের ঠিক পাশেই ফেলে দিল।
গার্ডটি এসে তার পায়ের বুট জুতো দিয়ে আগুন নিভিয়ে বলল, “ধন্যবাদ।”
সামনের অফিসসারির একটার দরজা খুলে গেলে তা দিয়ে লালচুলের সেই লোকটি কে কেলির ভাই বলে মনে হয়েছিল, বেরিয়ে এল । তার পাশে আরেকজনকে দেখা গেলো যাকে নাথান খুব ভাল করেই চেনে তীব্র ঘৃণা করার সুবাদে। লোকটার পরনে নেভি স্যুট এবং হাতে একটা রোল করা কোট। নাথান নিশ্চিত এই কোটটিতে টেলাক্সের লোগো আছে। তার তেল দেয়া ঘন-বাদামি চুল সেই পরিচিত স্টাইলে আঁচড়ানো। বাদ যায় নি তার থুতনিতে লালন করা স্মার্ট কিছু দাড়িও। নাথান তার সঙ্গীদের সাথে নিয়ে লোকটার খুব কাছে পৌছাতেই সে সবার উদ্দেশ্যে একেবারে তেলতেলে একটা হাসি নিল।
অন্যদিকে লালচুলের লোকটি তার সঙ্গীকে অতিক্রম করে একহাত নাথানের দিকে প্রসারিত করে দিয়ে নির্ভেজাল ও দৃঢ়ভাবে স্বাগতম জানাল।
“ড, রান্ড, এখানে আসার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। সম্ভবত ড, রিচার্ড জেনের সাথে আপনার পরিচয় আছে?”
“আমাদের দেখা হয়েছে,” শান্ত গলায় বলে হাত বাড়িয়ে দিল নাথান। লালচুলের লোকটি এত জোরে নাথানের সাথে হাত মেলালো যে মনে হলো এই হাতে পাথরও গুড়ো হয়ে যাবে।
“আমি ফ্রাঙ্ক ওব্রেইন। এই অপারেশনের লিডার। আমার বোনের সাথে ইতিমধ্যেই আপনার পরিচয় হয়েছে। সে কেলিকে দেখিয়ে বললো। কেলিও তার টেবিল থেকে এক হাত তুলে তাকে সম্ভাষন জানালো। “সবাই এসে গেছি আমরা, তাহলে মিটিং শুরু করা যাক।”
নাথান, প্রফেসর কাউয়ি এবং ম্যানুয়েলকে টেবিলের দিকে নিয়ে গেল ফ্রাঙ্ক, তারপর অন্যদেরকে ইশারা করল যার যার আসনে বসে পড়ার জন্য। শক্ত-সামর্থ চেহারার একলোক নাথানের ঠিক বিপরীতে বসে পড়লো। তার গলার লম্বা কাটা দাগ । সেই লোকের একপাশে বসল এক রেঞ্জার। তার পোশাকে লাগানো সিলভারের দুটো বরই বলে দিচ্ছে সে-ই এখানকার মিলিটারি ফোর্সের ক্যাপ্টেন। টেবিলের একেবারে শেষমাথায় ফ্রাঙ্ক এবং কেলি দুই ভাই-বোন দাঁড়ানো, তাদের মাঝে বসেছে ড. রিচার্ড জেন।
বামদিকে টেলাক্সের এক কর্মকর্তাও আছে, নীল রঙের কিছুটা রক্ষণশীল পোশাকে আবৃত এক এশিয়ান মহিলা। সারাঘর ঘরজুড়ে ছড়ানো সব অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দেখে বিস্ময়ে তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। নাথানের চোখে চোখ পড়তেই খুব ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটিয়ে মাথা নাড়াল সে। সবাই ঠিকঠাকমত বসে পড়ার পর ফ্রাঙ্ক গলা খাকারি দিয়ে বলতে শুরু করল, “প্রথমেই ড, রান্ড, আপনাকে অপারেশন আমাজনিয়ার কমান্ড সেন্টারে স্বাগত জানাচ্ছি। এটা হলো সিআইএ-এর এনভায়রনমেন্টাল সেন্টার এবং স্পেশাল ফোর্সেস কমান্ডের যৌথ উদ্যোগ। আলতো করে সায় দিয়ে সিলভার রাঙ্ক এর মানুষটিকে দেখিয়ে দিল সে। “আমাদের আরও সহায়তা করছে ব্রাজিলিয়ান সরকার, আর সহকারী দল হিসেবে থাকছে টেলাক্স ফার্মাসিউটিক্যালসের রিসার্চ ডিভিশন।” হাত তুলে কেলি তার ভায়ের কথা থামিয়ে দিল। নাথানের চোখে-মুখে ফুটে ওঠা বিভ্রান্তি ধরতে পেরেছে সে। “ড, রান্ড, আমি নিশ্চিত আপনার মনে আনেক প্রশ্ন জাগছে, তবে সবচেয়ে বেশি জানতে চাইছেন আপনাকে কেন এই মিশনের সাথে জড়ানো হলো।”
সায় দিল নাথান ।
উঠে দাঁড়াল কেলি, অপারেশন আমাজনিয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো আমাজনের বুকে হারিয়ে যাওয়া আপনার বাবার গবষণামূলক অভিযানের শেষ পরিণতি খুঁজে বের করা।”
নাথানের চোয়াল ঝুলে পড়ল, যেন সে অন্ধকার দেখছে। তার কাছে মনে হল কেউ বুঝি তার মাথায় তীব্রভাবে আঘাত করেছে। প্রথমে তোতলালো সে, কিছুক্ষশ পর কঠে জোর পেয়ে বলল, “কি-কিন্তু…সেটা তো চারবছর আগেই শেষ হয়ে গেছে…”
“আমরা সেটা বুঝতে পারছি, তবে”
“না!” দাঁড়িয়ে গেল নাথান, তার চেয়ারটা সিমেন্টের মেঝে থেকে কিছুটা পেছনে সরে গেল। “এটা হতে পারে না, তারা মৃত, তারা সবাই মারা গেছে।”
ওকে শান্ত করতে প্রফেসর কাউয়ি একটা হাত রাখল ওর কাঁধে, “নাথান…”
ঝাড়া দিয়ে ওর হাত সরিয়ে দিল সে। তার মনে পড়ে গেল সেই কলটার কথা, যেন গতকালই তার জীবনে এটা ঘটেছে। সে তার চিকিত্সা বিষয়ক থিসিস মাত্র শেষ করেছে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে। আমাজনে একটি দল হারানোর খবর তার কাছে পৌছামাত্রই পরের ফ্লাইটেই সে আমাজনে চলে আসে উদ্ধারকারী দলের সাথে যোগ দিতে। আজ এই ওয়্যারহাউজে বদ্ধঘরে থাকার ভীতি, টেলাক্সের উপর ক্রোধ, হতশ্রী, নাথানের ফেলে আসা স্মৃতির ডালপালাকে মেলে ধরেছে। নাথান যেন ভাসছে স্মৃতির সাগরে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর কারো কোন হদিস না পেয়ে যখন অভিযান বন্ধ করতে বলা হলো, নাথান তাতে রাজি হয় নি। সে তখন শরণাপন্ন হয় টেলক্সিফার্মের। অনেক মিনতি করে জানায় ব্যক্তিগতভাবে তাকে যেন অনুসন্ধান কাজ চালাতে সাহায্য করে তারা। টেলাক্সের সাথে একো-টেকের একটি চুক্তি ছিল । দশবছর মেয়াদী এই চুক্তি অনুযায়ি তাদের লক্ষ্য ছিল আমাজনে বসবাসকারী মানুষের সবগুলো গোত্রের সংখ্যা নিরুপন, আদমশুমারি এবং চিকিৎসাশাস্ত্রে শামানদের যে পদ্ধতিগত জ্ঞান তা চিরতরে হারিয়ে যাবার আগেই তার একটি ক্যাটালগ তৈরি করা। কিন্তু টেলাক্স নাথানের সেই প্রস্তাবে সাড়া দেয় নি। উপর তাকে বলে যে, দলটি সম্ভবত ভয়ঙ্কর কোন গোত্রের মানুষের হাতেই শেষ হয়েছে, অথবা মাদক চোরাচালানকারিদের খপ্পরে পড়েছে।
তারপরও নাথান দমে যায় নি। পরের বছরজুড়ে নাথান লক্ষ-লক্ষ টাকা খরচ করেছে এর অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে, তার বাবার শেষ পরিণতি কি হয়েছে তা জানার জন্য চষে বেড়িয়েছে সব ঝোপ-ঝাড়, যদি কোন চিহ্ন বা কোন ক্লু পাওয়া যায়। এক সময় পুরো অভিযানটি টাকা গিলে খাওয়ার কৃষ্ণগহরে রূপ নিল । ওটার পেটে ইকো-টেকের সম্পত্তিগুলো গিলিয়ে দিতে হয় নাথানকে । ওয়ালস্ট্রিটে ইতিমধ্যে ইকো-টেকের পতন হয়েছে। আমাজনে ইকো-টেকের সিইও হারিয়ে যাবার পর এটার মজুদও কমে গেছে দ্রুত। ফলে আশার জল শুকিয়ে গেল দ্রুত। টেলাক্স তখন কৌশলে ইকো-টেক অধিগ্রহন করার মাধ্যমে তার বাবার জন্য কিছু করতে চাইলো। এমনিতেই নাথান অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, তার উপর তাদের আচরণে নাথান এতটাই মর্মাহত ও কষ্ট পেল যে, সে টেলাক্সের সাথে কোনরকম লড়াইয়ে গেল না। পরিণতিতে তার সমস্ত সম্পত্তি একটি বহুজাতিক কর্পোরেশনে রূপ নিল, আর নাথান সেই কর্পোরেশনেরই অধীনস্থ এখন ।
এই ঘটনা তার জীবনের সবচেয়ে কালো অধ্যায়ের সূচনা করল। ঐ সময়ে সে বুঁদ হয়ে থাকতো মদে, নিত ড্রাগস এবং আরো অনেক কিছুই যা সাময়িকভাবে তার জাগতিক দুঃখ-কষ্টকে ভুলিয়ে রাখতো। প্রফেসর কাউয়ি ও ম্যানুয়েল অাজভে হল সেই দু-জন ব্যক্তি যারা তাকে সেই দুঃসহজীবন থেকে ফিরিয়ে আনে। এই দু-জনের হাত ধরে নাথান হয়ে ওঠে এক নতুন মানুষ। সে খেয়াল করে তার ভেতরের মৌলিক কিছু পরিবর্তন। জঙ্গলে তার মনোকষ্ট অনেক কম হচ্ছে, আবিষ্কার করে অন্যদের চেয়ে সে আরও বেশিদিন জঙ্গলে টিকতে পারছে। সে তখন ইন্ডিয়ানদের নিয়ে তার বাবার রেখে যাওয়া কাজ শুরু করে দিল নতুনভাবে। টেলাক্স এককালীন যে সামান্য টাকা দিয়েছিল । দিয়েই ধীর গতিতে তীর যাত্রা শুরু।
‘তারা মারা গেছে,” টেবিলের উপর খানিকটা ঝুঁকে পড়ে বললো সে। ‘আমার বাবার ভাগ্যে কি ঘটেছিল এত দীর্ঘ সময় পর তা আবিষ্কারের কোন আশাই থাকতে পারে না।”
নাথান আবারও অনুভব করল কেলির সেই অন্তর্ভেদী চোখ জোড়া তার উপর স্থির হয়ে আছে, অপেক্ষা করছে নাথান কতক্ষনে নিজেকে গুছিয়ে নেয় তার জন্য । অবশেষে কেলি মুখ খুলল । “আপনি কি জেরাল্ড ওয়ালেস ক্লার্ককে চেনেন?”
না বলার জন্য মুখ খুলতে গিয়েও থেমে গেল সে, হঠাৎ মনে হলো নামটা চিনতে পারছে। লোকটা তার বাবার টিমের সদস্য ছিল। “ত্যা, সে একজন সাবেক সৈন্য ছিল, অভিযানে অংশ নেওয়া পাঁচজন সশস্ত্র দলের একজন।”
লম্বা করে দম নিল কেলি। “বারো দিন আগে জেরাল্ড ওয়ালেস ক্লার্ক জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে।
কথাটি শুনে নাথানের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো।
“ধ্যাত,” পাশ থেকে বললো ম্যানুয়েল ।।
প্রফেসর কাউয়ি ছিটকে পড়া নাথানের চেয়ারটা ঠিকঠাক জায়গায় রেখে তাকে বসতে সাহায্য করল।
বলে চললো কেলি, “দুঃখজনকভাবে জেরাল্ড ক্লার্কের কাজ থেকে জানা যায় নি সে কোথায় ছিল বা কিভাবে ফিরে এল। স্থানীয় মিশনারিতে আসায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সে মারা যায়। আমরা এখন আশা করছি কার্ল রান্ড এর সন্তান হিসেবে আপনি আমাদের এই অনুসন্ধানে আগ্রহভরেই সাহায্য করবেন।”
আলোচনার টেবিলে নেমে এল গভীর এক নিরবতা।
ফ্রাঙ্ক তার গলা পরিস্কার করে আরো যোগ করলো, “ড. রান্ড, আপনি শুধুই যে এই জঙ্গল ও তার আদিবাসী সম্পর্কে অভিজ্ঞ তা নয়,আপনার বাবা এবং তার টিম সম্পর্কেও যেকারো চেয়েও আপনি বেশি জানেন। এই জ্ঞান গভীর জঙ্গলে আমাদের অনুসন্ধান চালাতে বেশ সাহায্য করবে।”
নাথান এখনো বাকশক্তিহীন। শান্ত প্রফেসর কাউই স্থির
ভাবে বললো, “এবার পরিস্কার বুঝতে পারছি এ বিষয়ে টেলক্স এর আগ্রহ দেখাবার কারণ।” মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখা রিচার্ড জেনের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সায় দিল প্রফেসর। অন্যের দুর্দশা থেকে নিজদের ফায়দা লোটার সুযোগ কখনোই হাত ছাড়া করে না এরা
হাসিটা একটু ম্লান হয়ে গেল জেনের। বলেই চললো কাউই
, এবার দৃষ্টি কেলি ও ফ্রাঙ্কের দিকে। কিন্তু এতে সিআইএ’র এনভিরণমেন্টাল সেন্টার আগ্রহ দেখাচ্ছে কেন? এই মিশনে আর্মি রেঞ্জার্স নিযুক্ত করাই বা কতুটুকু যৌক্তিক? “সে এবার এক ভ্রু উচু করে মিলিটারি প্রধানের দিকে তাকালো। “আমাদের কেউ অথবা ক্যাপ্টেন, ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করবেন কি?”
ফ্রাঙ্কের ভ্রু কুচকে গেল প্রফেসরের তড়িৎ গতির এ মন্তব্য শুনে। জ্বলজ্বল করে উঠলো কেলির চোখও। মুখ খুললো কেলি,
“একজন সাবেক সৈন্য ও বিশেষজ্ঞ হওয়ার পাশাপাশি জেরাল্ড ক্লার্ক সিআইএর সক্রিয় সদস্য ছিল।”
মেইন-ফরেস্টের মধ্য দিয়ে কোকেন আনা-নেওয়ার যে রুটগুলো ব্যাবহৃত হত তার সম্পর্কে বিশদ জানার জন্যই তাকে এই অভিযানে পাঠানো হয়েছিল। এ দিকে এমনভাবে তাকালো যেন সে অনেক বেশিই বলে ফেলেছে। ভয়ের দৃষ্টি উপেক্ষা করে কেলি বলে চললো, “যেকোন তথ্যই দেয়া যেতে পারে, যদি ড, রান্ড আমাদের সাথে অপারেশনে যেতে রাজি হন, তা না হলে বিস্তারিত বলার কোনো দরকার নেই।
প্রফেসর কাউয়ি সতর্কতাপূর্ণ চোখে নাথানএর দিকে তাকাল। নাথান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আমার বাবার ভাগ্যে কি ঘটেছিল তা জানার কোন আশা যদি এই মিশনে থেকে থাকে তবে এই সুযোগ আমি হাতছাড়া করতে পারিনা।” তার দুই বন্ধুর দিকে ফিরলো এবার, “তোমরাও সেটা জানো।” নাথান দাড়িয়ে সবার দিকে তাকালো।
“আমি যাবো।”
ম্যানুয়েলও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়াল, ” তাহলে আমিও যাচ্ছি তোমার সাথে।”।
সবার উপর থেকে একটু চোখ বুলিয়ে নিয়ে আবারো বলতে শুরু করলো কেউ কোন ‘আপত্তি জানানোর আগেই, “আমি ইতিমধ্যেই ব্রাসিলিয়ায় আমার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছি। এখানকার এফইউএনএআই (FUNAI)-এর একজন প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে এই মিশনে যেকোন ধরনের সীমাবদ্ধতা বা সুবিধা যোগ করার ক্ষমতা আমি রাখি।”
সায় দিল ফ্রাঙ্ক। এজন্যেই ঘণ্টাখানেক আগে আমাদেরকেও জানানো হয়েছে । ঠিক আছে, এটা এখন আপনার ইচ্ছের উপর নির্ভরশীল । আমার দিক থেকে কোন আপত্তি নেই। আপনার ফাইল আমি পড়েছি। বায়োলজিস্ট হিসেবে আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড আমাদের কাজে আসতে পারে।”
এরপর দাঁড়ালো প্রফেসর কাউয়ি, একটা হাত রাখলো নাথানের কাঁধে। “তাহলে তো ভাষাতত্ত্বের উপর একজন বিশেষজ্ঞেরও দরকার হবে আপনাদের।”
“আপনার প্রস্তাবকে স্বাগত জানাই।” ফ্রাঙ্ক ছোটখাটো এশিয়ান মহিলাকে দেখিয়ে বলল, “কিন্তু আমাদের সেই কোটা পূরণ হয়ে গিয়েছে। ড, আনা ফঙ একজন আনথ্রোপোলজিস্ট, সেই সাথে স্থানীয় বিভিন্ন গোত্রের উপর তার জ্ঞানও রয়েছে। তিনি ডজনখানেক স্থানীয় ভাষায় কথা বলতে পারেন।
“ড. ফঙের ব্যাপারে কোন আপত্তি নেই,” নাথান বললো ফ্রাঙ্কের কথা উড়িয়ে দিয়ে, “কিন্তু প্রফেসর কাউয়ি কথা বলতে পারেন একশো পঞ্চাশটিরও বেশি ভাষায়। এই ফিল্ডে তার মত দ্বিতীয় কেউ নেই।”
আনা এই প্রথম কথা বললো, তার কণ্ঠ কোমল ও মিষ্টি। “ডা: রান্ডের কথাই ঠিক। প্রফেসর কাউয়ি সারাবিশ্বে খুবই সুপরিচিত আমাজনের সব ধরনের গোত্রের উপর তার সম্যক জ্ঞানের কারণে। তার সহচার্য বিশাল সুবিধা দেবে আমাদের।”
“তাছাড়া,” কেলি খুব শ্রদ্ধাভরে প্রফেসরের দিকে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললো, “এই জ্ঞানী প্রফেসর বিভিন্নরকম লতাপাতার ভেষজ ঔষধ ও জঙ্গলের নানারকম রোগের উপর খুব বড় ধরনের অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তি।
প্রফেসর কেলির দিকে ফিরে একটু বো করলো। কেলি তার ভায়ের দিকে ফিরলো এবার। “একজন মেডিকেল ডাক্তার হিসেবে তাকেও এই অভিযানে আমাদের সঙ্গে নেয়া যেতে পারে।”
কাঁধ ঝাকালো ফ্রাঙ্ক।“আর কি চাই?” নাথানের দিকে ফিরলো সে, “ঠিক আছে?”
“অবশ্যই”, নাথান বললো দুই বন্ধুর উপর চোখ বুলিয়ে।
মাথা ঝাকিয়ে গলার স্বর উঁচু করলো ফ্রাঙ্ক, ঠিক আছে, তাহলে কাজ শুরু করে দেয়া যাক। ড, রান্ডকে এই শহরেই খুঁজে পাওয়ায় আমাদের কাজের সময়সূচি অনেক এগিয়ে গেছে। সকালে রওনা হওয়ার আগে আমাদের বেশ কিছু কাজ পড়ে আছে।
সবাই যে যার মত কথা শুরু করে দিতেই ফ্রাঙ্ক নাথানের দিকে ফিরলো, “তাহলে এখন দেখা যাক আপনার আরো কিছু প্রশ্নের উত্তর দেয়া যায় কিনা।” সে তার বোনকে নিয়ে অন্য আরেকটি অফিসের দিকে এগিয়ে গেলো। তাদের অনুসরণ করলো নাথান ও তার দুই বন্ধু।
ম্যানুয়েল নাথানের কাধের উপর দিয়ে উকি দিয়ে কর্মব্যস্ততায় ভরা ঘরটার দিকে তাকালো, “স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে আমরা করলামটা কি?”
“আছে, অবাক করার মতই কিছু আছে।” অফিসের দরজাটা খুলে ধরে রেখে উত্তর দিল কেলি। “ভেতরে আসুন, আপনাকে দেখাচ্ছি আমি।”
নাথানের হাতে শক্ত করে রাখা এজেন্ট ক্লার্কের ছবিগুলো পাশেরজনকে দিয়ে দিল সে। মানে আপনি বলছেন, এই লোকটার হাত আবার নতুন করে গজিয়েছিল?” ফ্রাঙ্ক ডেস্কের চারপাশে ঘুরে এসে একটা সিটে বসলো। “দেখে তাই মনে হচ্ছে। তার রেকর্ডকৃত পূর্বের ফিঙ্গারপ্রিন্টের সাথেও মিলে গেছে। লোকটার লাশ মানাউসের মর্গ থেকে আজকে আনা হয়েছে। এখান থেকে যাবে স্টেটসে, তার দেহাবশেষ পরীক্ষা করে দেখা হবে আগামীকাল একটি প্রাইভেট রিসার্চ ফ্যাসিলিটিতে, যেটার পৃষ্ঠপোষকতা করছে মিডিয়া।”
“মিডিয়া?” জিজ্ঞেস করল ম্যানুয়েল। “নামটা পরিচিত মনে হচ্ছে কেন?”
“মিডিয়া। এটার প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৯২ সালে। রেইনফরেস্ট সংরক্ষনের জন্য সক্রিভাবে কাজ করে যাচ্ছে এটা।” দেয়ালে লাগানো টপোগ্রাফিক মানচিত্র পড়তে পড়তে জবাব দিল কেলি।
“এই মিডিয়াটাকেই তো চিনলাম না,” হাতের ছবিগুলো ডেস্কের উপর রাখতে রাখতে বলল নাথান ।
“তাহলে তো পেছনের দিকে যেতে হয়। ১৯৮৯ সালের ঘটনা। কংগ্রেসের এক সভায় কথা ওঠে, বিশ্বব্যপী অপরাধী-সন্ত্রাসীদের ওপর নজর রাখার জন্য সিআইএ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যে তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো খুব কাজে আসতে পারে, আবার নাও আসতে পারে বৈশ্বিক পরিবেশগত পরিবর্তনের উপর গবেষণা ও মনিটরিং করার জন্য। ফলে ১৯৯২ সালে মিডিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। সিআইএ এই সংস্থায় আট জনেরও বেশি লোক নিয়োগ করে যারা পরিবেশের বিভিন্ন বিষয়ের উপর অভিজ্ঞ। এই লোকগুলোই সিআইএ থেকে পাওয়া পরিবেশ বিষয়ক তথ্য-উপাত্তগুলো বিশ্লেষণ করে থাকে।
“ও আচ্ছা,” বলল নাথান।
“আমাদের মা ছিলেন এই মিডিয়ার একজন প্রতিষ্ঠাতা,” বলে উঠলো ফ্রাঙ্ক, “তিনি মেডিসিন এবং বিভিন্ন রকম দূষিত বর্জ্যের উপর অভিজ্ঞ। আমার বা সিআইএ’র ডেপুটি ডিরেক্টর থাকাকালীন মাকে মিডিয়াতে নিয়োগ দেন। এজেন্ট ক্লার্কের পোস্টমর্টেম তিনিই করবেন।”
ভ্রু কুচকালো ম্যানুয়েল। “আপনার বাবা সিআইএর একজন ডেপুটি ডিরেক্টর?”
“ছিলেন,”মুখে কিছুটা তিক্ততা ফুটিয়ে বলল ।
কেলি ম্যাপ রেখে ঘুরে দাঁড়ালো। “তিনি এখন সিআইএ’র এনভায়রনমেন্টাল সেন্টারের ডিরেক্টর। এই ডিভিশনটি মিডিয়ার নির্দেশে ১৯৯৭ সালে ভাইস-প্রেসিডেন্ট আল গোর প্রতিষ্ঠা করেন । ফ্রাঙ্কও ঐ একই ডিভিশনে কাজ করে।”
‘আর আপনি?” জিজ্ঞেস করল নাথান, “আপনিও কি সিআইএ’তে আছেন?”
“সে মিডিয়ার সরচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য,” কেলি প্রশ্নটার জবাব দেবার আগেই ফ্রাঙ্ক বলে উঠল। তার কণ্ঠে কিছুটা গর্ব ঝরে পড়ল যেন। “তার এই সম্মান চোখে পড়ার মত।
এই কারণেই এই মিশনে আমাদের নির্বাচিত করা হয়েছে। আমি সিআইএ’র প্রতিনিধিত্ব করছি আর কেলি করছে মিডিয়ার।”
“এই ব্যাপারটা তো একটি পারিবারের মধ্যে আটকে থাকছে বলে মনে হচ্ছে না?” নাক টেনে বলল কাউয়ি ।
“এই মিশন সম্পর্কে যত কম মানুষ জানবে ততই ভাল,” যোগ করল ফ্রাঙ্ক ।
“তাহলে এখানে টেলাক্স ফার্মাসিউটিক্যালসের ভূমিকাটা কি?” ওব্রেইনরা কিছু বলার আগেই উত্তর দিলো কাউয়ি, “ব্যাপারটা কি পরিস্কার মনে হচ্ছে না? তোমার বাবার ঐ অভিযানে আর্থিক সহায়তা করেছে ইকো-টেক এবং টেলাক্স । এখন কিন্তু এরা আর দুটি সংস্থা নয়, একটি । এই অভিযানে লাভজনক যা-ই অর্জিত হোক না কেন সেগুলোর স্বত্ত্বাধিকারী হবে টেলাক্স । তোমার বাবা যদি এমন কোন যৌগ আবিষ্কার করে থাকে যা দিয়ে মন্দা কাটিয়ে নতুন করে লাভের মুখ দেখা যায় তাহলে টেলাক্স তার সিংহভাগ ভোগ করার অধিকার রাখবে।”
কেলির দিকে তাকাল নাথান, মেয়েটি মাথা নীচু করে রেখেছে । খুব স্বাভাবিকভাবে মাথা ঝাকালো ফ্রাঙ্ক । “প্রফেসর ঠিকই বলেছেন। কিন্তু এমনকি ট্রেলাক্সের হাতেগোনা অল্প কিছু মানুষ জানে আমাদের মিশনের সত্যিকারের উদ্দেশ্য।”
এবার মাথা ঝাকালো নাথান। “ভাল, খুবই ভাল।” কাউয়ি সহমর্মিতার একটি হাত রাখলো নাথানের কাঁধে।
“ওসব থাক,” ম্যানুয়েল বলল, “আমাদের প্রথম কাজটা কি?”
“আমি দেখাচ্ছি আপনাদের, কেলি আবারো তার পিছেনের দেয়ালে ঝোলানে ম্যাপের দিকে ফিরলো। ম্যাপের প্রায় মাঝামাঝি একটা জায়গায় আঙুল রাখলো সে, “আমি নিশ্চিত ড. রান্ড এই ম্যাপটির সাথে পরিচিত।”
ম্যাপের দিকে তাকিয়ে খুব সহজেই নাথান চিনতে পারলো ওটা ।মাপের রেখাগুলো যেন নিজেরই হাতের রেখা, এতটাই পরিচিত তার। “আমার বাবার টিমের ব্যবহার করা সেই রাস্তা, চার বছর আগেরকার।”
“ঠিক তাই,” বলল কেলি, ম্যাপের উপর দিয়ে বয়ে চলা একসারি ডট লাইনের দিকে আঙুল চালাতে চালাতে, “যে লাইনটা মানাউসের বিক্ষিপ্তভবে গড়ে ওঠা শহরের মধ্য দিয়ে ম্যাডেইরা নদীর দক্ষিণ তীর ঘেঁষে মিশেছে শহরে এখান থেকে লাইনটা উত্তর দিকে মোড় নিয়ে সোজা চলে গেছে আমাজনের প্রাণকেন্দ্রে, যেখান থেকে টিমটা উত্তর-আমাজন ও দক্ষিণ-আমাজনের মধ্যবর্তী তুলনামুলক কম আবিষ্কৃত একটি জায়গা অতিক্রম করে আড়াআড়িভাবে।” লাইনটার শেষপ্রান্তে ছোট্ট একটা ক্রসের উপর এসে আঙুল থামল কেলির। এই হলো সেই জায়গা যেখান থেকে তাদের সাথে সকল রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। আবার এখান থেকেই সবরকম অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল, যে অনুসন্ধানের টাকা দিয়েছে ব্রাজিলিয়ান সরকার এবং অন্যান্য বেসরকারী সংস্থা।” খুব তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টিতে নাথানের দিকে তাকালো কেলি, “ঐ অনুসন্ধান সম্পর্কে আপনি আমাদের কিছু বলবেন কি?”
ডেস্ক ঘুরে এসে ম্যাপের উপর দৃষ্টি হানল নাথান। ধীরে বয়ে চলা এক হতাশার স্রোত তার ভেতরের সত্তাকে বিদ্ধ করল যেন। “সময়টা ছিল ডিসেম্বর মাস, সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের সময়।” অলস ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলল সে। “খুব বড় দুটো জলোচ্ছাস ঐ এলাকাটা ডুবিয়ে দিয়ে যায়। প্রাথমিকভাবে কাউকে খুঁজে না পাওয়ার এটাও একটা কারণ। কিন্তু সপ্তাহখানেক পরে পানির স্রোত কমে এলে টিমের কাছ থেকে তাদের কাজের আপডেট যখন এল তখন একটা বিপদসংকেতও ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রথম প্রথম এটা নিয়ে কেউ দুশ্চিন্তা করে নি। এই মানুষগুলো তো সারাজীবন জঙ্গলেই কাটিয়েছে, কীইবা সমস্যা হতে পারে তাদের? কিন্তু সার্চটিম যখন প্রাথমিকভাবে অনুসন্ধান শুরু করল তখন ব্যাপারটা খুব সহজেই বোঝা গেল যে হারানো টিমকে সনাক্ত করার জন্য যাই থাকুক না কেন সবই ধুয়ে মুছে গেছে বৃষ্টি আর বন্যার পানিতে। যখন প্রথম অনুসন্ধান কারী দলটি ওখানে পৌছায় তখন এই জায়গাটা-” একটা আঙুল ম্যাপের উপর কালো রঙের X চিহ্নিত জায়গায় রেখে বললো নাথান, “পানির নিচে তলানো ছিল।”
নাথান ঘুরে দাঁড়াল অন্যদের দিকে। এরপর একসপ্তাহ গেল, তারপর আরও একসপ্তাহ । কিছুই পাওয়া গেল না । না কোন সূত্র না কোন কণ্ঠস্বর সর্বশেষ আতঙ্ক সাহায্যের আবেদনের আগপর্যন্ত। সাহায্য পাঠাও…বেশিক্ষণ টিকতে পারছি না । ওহ গড, তারা আমাদের চারপাশ ঘিরে আছে। ” গভীর করে দম নিল নাখান। ভেসে আসা এই শব্দগুলো এখনও আহত করে তাকে । “রেডিও সিগন্যালটা বেশ অস্পষ্ট ছিল তাই এটা সনাক্ত করা অসম্ভব ছিল কথাগুলো কে বলেছে। হতে পারে এটা ছিল এজেন্ট ক্লার্ক।” কিন্তু নাথান ভেতরে ভেতরে ঠিকই জানত কণ্ঠটা ছিল তার বাবার । সে বহুবার এই মেসেজটা শুনেছে-তার বাবার শেষ কথাগুলো । ডেস্কের উপর ছড়ানো ছিটানো ছবিগুলোর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নাথান। পরবর্তী তিনমাস উদ্ধারকারী দল পুরো এলাকাটা চষে ফেলল কিন্তু ঝড় ও জলোচ্ছাস সব কাজে বাধা হয়ে দাঁচ্ছিল। কেউ কিছুই বলতে পারলো না বাবার টিমটা কোন দিকে গেছে। পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর নাকি দক্ষিণে।” কাঁধ ঝাকালো সে, “এটা অসম্ভব ছিল, আমরা টেক্সাস শহর থেকেও বড় একটা অঞ্চলজুড়ে খোঁজাখুঁজি করলাম। কোন লাভ হলো না, তাই এক সময় সবাই ক্ষান্ত দিল।”
“আপনি ছাড়া, নরম কণ্ঠে বলল কেলি।
মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল নাথানের এক হাত। এতে করে ভালই হয়েছিলো, আমার সাথে কোন যোগাযোগই রইল না আর পরবর্তীতে ।”
“এখন পর্যন্ত,” কেলি বলল, সে নাথানের দৃষ্টিকে ধীরে ম্যাপের উপর নিয়ে গেল, লাল রঙের একটা বৃত্তের উপর যেটা আগে সে খেয়াল করে নি। জায়গাটা সাও-গ্যাব্রিয়েল থেকে দু-শত মাইল দূরের জারুরা নদীর তীরবর্তী একটি অঞ্চল। নদীটা সলিমোস নদীর একটি শাখা যেটা গিয়ে মিশেছে দক্ষিণে বয়ে চলা বিশাল আমাজনের সাথে। এ হলোএ-ওয়ের মিশনারি, যেখানে এজেন্ট ক্লার্ক মারা যান, এ-জায়গাতেই আগামীকাল রওনা হচ্ছি আমরা।”
“তারপরের কাজ?” জিজ্ঞেস করল ম্যানুয়েল ।
“আমরা জেরাল্ড ক্লার্কের পথ অনুসরণ করব। আমাদের অবশ্য একটা সুবিধা আছে যেটা প্রথম অনুসন্ধান শুরু করা দলের ছিল না।”
“কি সেটা?” ম্যানুয়েল জানতে চাইল। দেয়ালে ম্যাপের দিকে একটু ঝুঁকে বলল নাথান, “গ্রীষ্মের একেবারে শেষ মুহূর্তে আমরা। গত একমাসের মধ্যে বড় কোন ঝড়-বৃষ্টি হয় নি এখানে।” সবার দিকে ফিরে তাকাল, “জেরাল্ড ক্লার্কের ব্যবহার করা পথ খুঁজে পাব আমরা সহজেই।”
উঠে দাঁড়িয়ে ফ্রাঙ্ক দেয়ালের ম্যাপের দিকে ইঙ্গিত করে বলতে শুরু করল, “তাই জরুরি ভিত্তিতে এবং দ্রুততার সাথে এই মিশন সমম্বয় করলে আমরা আশা করছি জেরাল্ড ক্লার্কের ব্যবহৃত পথটা খুঁজে পাব, আর সেটা বর্ষাকালের বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যাবার আগেই । আমরা আরো আশা করছি, তার চেতনা যথেষ্ট সক্রিয় ছিল সে সময়ে, হয়তো সে তার ব্যবহৃত পথ ধরে আসার সময় গাছের গায়ে বা পাথরের ওপর কোন চিহ্ন রেখে এসেছে যেগুলো ধরে আমরা তার চার বছর ধরে গুম হয়ে থাকা জায়গাটা খুঁজে পেতে পারি।” ফ্রাঙ্ক ডেস্কের দিকে ফিরে সেখান থেকে বড় একটা ভঁজ করা কাগজ টেনে বের করল। কাগজটা স্কেচ করা । “সাথে যেহেতু আমরা আনা ফঙের মত একজনকে নিযুক্ত করেছি, যেকিনা নিম্ন বর্ণের ইন্ডিয়ান, মিশরিয় বা যে কারো সাথেই ভাবের আদান প্রদান করতে পারবে, সেহেতু তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আমরা জানতে পারব শরীরে এরকম চিহ্নঅঙ্কিত কাউকে তারা দেখেছে কিনা।” হাতের কাগজটার ভাঁজ খুলে ডেস্কের উপর মেলে ধরল সে। হাতে স্কেচ করা একটি ড্রয়িং বেরিয়ে পড়ল। “এই ট্যাটুগুলো আঁকা ছিল এজেন্ট ক্লার্কের পুরো বুক আর পেট জুড়ে । আমরা আশা করছি এমন কোন মানুষকে খুঁজে পাব, হোক তারা ছোটখাট বা বিচ্ছিন্ন কোন গোত্রের, যারা এরকম চিহ্ন আঁকা কাউকে দেখেছে।”
তীব্র আতঙ্কে কেঁপে উঠলো প্রফেসর কাউয়ি। তার এরকম প্রতিক্রিয়া ঘরের কারো দৃষ্টিই এড়ালো না।
“কি হলো?” জানতে চাইল নাথান ।
কাউয়ি স্কেচ করা কাগজটার দিকে দেখাল। সর্পিল আকারের পেঁচানো ও জটিল এক রেখাশৈলী একটি হাতের ছাপকে কেন্দ্র করে ঘুরছে যেন।
“এটা খারাপ, সত্যিই খুব খারাপ।” কিছুটা বেখেয়ালি সুরে কথাটা বলে পকেট হাতড়ে পাইপটা বের করে আনল কাউয়ি। অনুমতি পাবে কিনা এমন প্রশ্নবিদ্ধ একটি দৃষ্টি দিল ফ্রাঙ্কের দিকে চেয়ে। তাকে হতাশ না করে মাথা নেড়ে সায় দিল সে। কাউয়ি একটা পাউচ বের করে সেখান থেকে স্থানীয়ভাবে জন্মানো কিছু তামাক পাইপের মধ্যে ঢুকিয়ে তাতে আগুন জ্বালালো। নাথান দেখলো প্রফেসরের হাত কাঁপছে, এমনটা সে এর আগে কখনো দেখে নি।
“ছবিটা কিসের?”
মুখের পাইপ থেকে ধোয়া ছেড়ে কথা বলতে শুরু করল কাউয়ি, ধীরে ধীরে। “এই সিম্বলটা ব্যান-আলির । এরা হল ব্লাড জাগুয়ার।”
“আপনি চেনেন এই গোত্রকে?” প্রশ্ন করল কেলি।
মুখ থেকে ধোয়ার দীর্ঘ একটা কুণ্ডলি বের করতে করতে কাঁধ ঝাঁকালো কাউয়ি । “এই গোত্র সম্মন্ধে কেউ কিছুই জানতে পারে না। এটা হলো এক ভয়াল গল্পের ফিসফিসানি, যে গল্প এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে চলে আসছে গ্রামের বয়োবৃদ্ধদের হাত ধরে। এই ক্ষেত্র সম্পর্কে প্রচলিত মিথ আমাদের বলে, এই গোত্রের অনেকে জাগুয়ারের সাথে শারীরিকভাবে মেলামেশা করে, এরফলে যারা জন্ম নেয় তারা বাতাসে অদৃশ্য হতে পারে। তারা এতটাই ক্ষমতা অর্জন করে যে এদের বিপক্ষে যে কারোর মৃত্যু এরা ডেকে আনতে পারে। কথিত আছে এরা এই জঙ্গলের মতই প্রাচীন, পুরো জঙ্গলই এই ক্ষমতাধর সত্তার ইচ্ছার কাছে নত থাকে।”
“কিন্তু আমি তো এরকম কোন গোত্রের কথা কোনদিন শুনি নি,” নাথান বলল, “আমি কিন্তু পুরো আমাজনজুড়ে বিভিন্ন গোত্রের সাথেই কাজ করেছি।”
“আর ড. ফঙ, যিনি টেলাক্সের অ্যানথ্রোপলজিস্ট,” ফ্রাঙ্ক বলল, “তিনিও তো এটা চিনতে পারে নি।”
“আমি এতে মোটেও অবাক হচ্ছি না। আমাজনিয়রা তোমাকে যত ভালভাবেই গ্রহণ করুক না কেন তাতে কিছুই যায় আসে না। গোত্রের বাইরের কাউকে সব সময় একজন
নানাকিরি অর্থাৎ শত্রু হিসেবেই বিবেচনা করে এরা। তারা তোমার সামনে ব্যান-আলি সম্পর্কে কখনোই মুখ খুলবে না।”
নাথান খুব অপমানিত বোধ করল।“কিন্তু আমি-”
না, নাথান, আমি তোমার কাজ বা সামর্থকে খাটো করে দেখছি না। কিন্তু অনেক গোত্রের কাছেই কিন্তু এই নামটা বেশ ক্ষমতাধর । হাতেগোণা কিছু মানুষ হয়তো ব্যানআলির নাম বলতে পারে । তারা আসলে তাদের মনোযোগ ব্লাড-জাগুয়ারদের দিকে নিয়ে যেতেই ভয় পায়।” ড্রইংটার দিকে নির্দেশ করল কাউয়ি । “এই সিম্বল নিয়ে তুমি যদি চলাচল কর তবে যথেষ্ট সতর্কতার সাথেই তা প্রদর্শন করতে হবে অনেক ইন্ডিয়ান তোমাকে মেরেও ফেলতে পারে এই ধরনের কাগজ নিজের কাছে রাখার জন্য। কোন গ্রামের মধ্যে এই সিম্বল প্রবেশ করানোর মত নিষিদ্ধ কাজ আর একটিও নেই।”
ভ্রু কুচকালো কেলি। “তাহলে তো এজেন্ট ক্লার্কের কোন গ্রামের মধ্য দিয়ে আসার ব্যাপারে সন্দেহ থেকে যাছে।”
“যদি এসেও থাকে সে জীবিত হেটে আসতে পারেনি।”
একটা চিন্তাযুক্ত দৃষ্টি বিনিময় হলো কেলি ও ফ্রাঙ্কের মাঝে । তারপর কেলি নাথানের দিকে ঘুরল, “আপনার বাবার অভিযান ছিল আমাজনিয় গোত্রদের একটা তালিকা করা । যদি তিনি এই রহস্যময় ব্যান-আলি গোত্রের কথা শুনে থাকেন বা কোন ক্লু যা এদের অস্তিত্ত্বের প্রমান করে, আমার মনে হয় তিনি তাদের অনুসন্ধান করেছিলেন।”
“এবং সম্ভবত তিনি তাদের খোজ পেয়েছিলেন।” স্কেচ করা কাগজটি ভাজ করে রাখতে রাখতে বলল ম্যানুয়েল।
“প্রার্থনা কর ঈশ্বরের কাছে, যেন সে না পেয়ে থাকে,” হাতেধরা পাইপের চকচকে শেষ প্রান্তের দিকে গভীর দৃষ্টি দিয়ে বলল প্রফেসর কাউয়ি।
কিছু সময় পরে, প্রায় সবকিছু বিস্তারিতভাবে ঠিকঠাক করে কেলিকে ছোট ছোট তিনটি কাজের মধ্যে দিয়ে যেতে হলো। একজন রেঞ্জরের পিছু পিছু হেটে, রুমটা অতিক্রম করে ওয়্যারহাউস থেকে বেরুতে হলো তাকে। তার ভাই ইতিমধ্যে নিজের ল্যাপটপের উপর ঝুঁকে পড়েছে, যেটার সাথে যুক্ত আছে ছোট একটি পোর্টেবল স্যাটেলাইট ডিভাইস। সে এখন ব্যস্ত, সারাদিনের কর্মকান্ডের রিপোর্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে। আপলোড করার কাজে, যাদের মধ্যে তাদের বাবাও আছেন। তবে কেলির দৃষ্টি নাথানকে অনুসরণ করে যাচ্ছে। ওর কাছে হাসপাতালে এদের বৈরি পরিচয়পর্বের পর এখন পর্যন্ত নাথানের আচার-আচারন পছন্দ হচ্ছে না। যদিও এখনকার নাথানের বাহ্যিক অনেক পরিবর্তন হয়েছে, তেল চিটচিটে চুল নেই, নেই শরীরের সেই দূর্গন্ধও, স্ট্রেচারে শোয়ানো একটি মেয়েকে নিয়ে ছোটাছুটি করার সময় তার যে হাবভাব ছিল তাও নেই। শেভ করে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন কাপড় পরেছে সে। ছেলেটা আসলেই সুপুরুষ। চকচকে সোনালী চুল, শ্যামলা গায়ের রং, তীক্ষ্ণ নীল চোখ, এমনকি সে যখন চিন্তিত বা কৌতুহলি হয়ে তার ভ্রু উঁচু করছিল তাকে অন্যরকম আকর্ষনীয় লাগছিল । চিন্তিত বা কৌতুহলি অবস্থায় তার এক ভ্রুর ওঠা-নামাটাও দারুণ।
“কেলি, তার ভাই ডাকল, “কেউ একজন তোমাকে হাই’ বলতে চাচ্ছে।”
ক্লান্তির নিঃশ্বাস ফেলে কেলি তার ভায়ের সাথে টেবিলে যোগ দিল। পুরো ঘরজুড়ে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি শেষবারের মত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। দু-হাতের তালুর উপর ভর করে টেবিলের উপর ঝুঁকলো কেলি । তার চোখ ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে। খুব পরিচিত দুটো মুখ তার নজরে আসতেই একটা উষ্ণ হাসি ছড়িয়ে পড়ল মুখে।
“মা, জেসির তো এত রাতঅবধি জেগে থাকার কথা নয়?” সে একনজর হাতঘড়িটা দেখে দ্রুত হিসেব কষে নিল । “এখন তো মনে হয় প্রায় মাঝরাত।”
“আসলে মাঝরাত পার হয়ে গেছে, সোনা।”
কেলির মা যেন কেলিরই এক বোন। দু-জনের চুল একই রকম লালচে বাদামী, বয়সের চিহ্ন বলতে চোখের কোনের ছোট ভাঁজগুলো আর নাকের উপর বসে থাকা চশমাটা। মাত্র বাইশ বছর বয়সে কেলি ও ফ্রাঙ্ক তার গর্ভে আসে। তিনি তখন মেডিকেলের ছাত্রি। আলাদা দুটি ডিম্বানু থেকে সৃষ্ট ফ্রাটেরনাল যমজ জন্ম দেয়াটাই যথেষ্ট ছিল একজন মেডিকেলের ছাত্রি ও তরুণ নেভি সারভিল্যান্স ইঞ্জিনিয়ারের পক্ষে । কেলির বাবা-মা আর কোন সন্তান নেয় নি।
কিম্ভ কেলিকে কোন কিছুই থামাতে পারে নি তার মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করা থেকে। জর্জ টাউনের মেডিকেল কলেজের ছাত্রি থাকাকালীন সময়ে তার গর্ভে সন্তান আসে। সে তখন চতুর্থ বর্ষে কিন্তু তার মা যেমন বিয়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত স্বামী সন্তান নিয়েই আছে, কেলির ভাগ্যে তেমন কিছুই ঘটে নি। ড্যানিয়েল নিকারসন নামের লোকটিকে ডিভোর্স দেয় সে। রেসিডেন্সিতে প্রশিক্ষণরত এক সহকর্মীকে শয্যাসঙ্গী করেছিল ড্যানিয়েল, আর এটা দেখে ফেলে কেলি। এরপর সেই লোক অনেক চেষ্টা করেছে বিয়েটা টিকিয়ে রাখার জন্য। তাদের ভালবাসার ফসল এক বছরের ফুটফুটে কন্যা জেসিকাই ছিল এর কারণ। জেসিকার উপর কেলির কর্তৃত্বকে সে পুরোপুরি ইতিবাচকভাবেই দেখতে চেয়েছিল। জেসির বয়স এখন ছয়। সে এখন দাঁড়িয়ে আছে তার নানীর কাঁধের উপর। পরনে হলুদ ফ্লানেলের নাইটগাউন যেটার সামনে ডিজনির পোকহান্টসের ছবি। তার লাল চুলের মধ্যে দিয়ে সে এমনভাবে হাত চালাচ্ছে যেন এইমাত্র বিছানা থেকে উঠেছে। সে স্ক্রিনের দিকে চেয়ে হাত নাড়ল।
“হাই মাম।”
“হাই সুইটহার্ট । নানা-নানীর সাথে সময় ভাল কাটছে তোমার?”
খুব জোরে মাথা নাড়ল সে, “আমরা আজকে চাক-ই-চিজে গিয়েছিলাম।”
হাসিটা প্রসারিত হল কেলির। “খুব আনন্দ করেছ মনে হচ্ছে। ইশ, আমি যদি তোমাদের সাথে থাকতে পারতাম!”
“আমরা তোমার জন্য একটু পিজ্জা রেখে দিয়েছি।”
পাশে কেলির মায়ের চোখে রাজ্যের বিরক্তি ফুটে উঠল চাক-ই-চিজের কথা মনে উঠতেই। শুধু তার কেন, যেকোন নানা-নানীরই এমনটা হবে যারা চাক-ই-চিজে গিয়ে ইদুর ঝাঁকের সাথে যুদ্ধ করেছে।
“মাম, তুমি কোন সিংহ দেখেছ?”
ছোট একটা হাসির খোরাক দিল কথাটা । “না, এখানে কোন সিংহ নেই, সোনা ওটা আফ্রিকায় থাকে, বুঝলে?”
“তাহলে গেরিলা?” ‘না, কারণ ওটাও আফ্রিকায় পাওয়া যায় । তবে আমরা কিছু বানর দেখেছি।”
চোখ জোড়া গোল হয়ে গেল জেসিকার। “একটা বানর ধরে বাড়িতে আনবে, মাম? আমি সবসময় একটা বানর পুষতে চেয়েছি।”
“আমার মনে হয় না বানর এটা পছন্দ করবে। তারও এখানে নিজের মাম রয়েছে।”
কেলির মা একটা হাত দিয়ে জেসিকাকে জড়িয়ে ধরল। আমার মনে হয় তোমার মাকে এখন একটু ঘুমাতে দেয়া উচিত আমাদের । তোমার মত তাকেও খুব সকালে উঠতে হবে ঘুম থেকে।”
গাল ফোলালো জেসি। স্ক্রিনের দিকে আরও একটু ঝুঁকে পড়ল কেলি আই লাভ ইউ, জেসি।”
হাত নাড়ল সেও। “বাই মাম।”
কেলি হাসল তার দিকে তাকিয়ে। “সাবধানে থেকো, সোনা। আশা করছি খুব তাড়াতাড়িই ফিরে আসবো তোমার কাছে। তোমার অনেক কাজ জমে আছে। ওটা কি…মা..মানে প্যাকেজটা কি পৌছে গেছে ঠিকঠাক মত?”
খুব সিরিয়াস একটা ভাব ফুটে উঠল কেলির মায়ের চোখেমুখে। মিয়ামির কাস্টমস্ থেকে ওটা ছয়টার দিকে খালাস হয়ে এই ভার্জিনিয়ায় পৌঁছেছে দশটার দিকে। তারপর ট্রাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ইন্সটার ইন্সটিটিউটে । তোমার বাবা অবশ্য ওখানে কালকেন্দ্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার সব ঠিকঠাক আছে কিনা সে বিষয়ে তদারকি করছে।”
মাথা ঝাঁকাল কেলি। ক্লার্কের লাশ নিরাপদে স্টেটসে পৌছেছে জেনে ভেতরে খানিকটা স্বস্তিবোধ করল সে। “জেসিকে ঘুমাতে নিয়ে যাচ্ছি এখন, তবে কাল রাতে সন্ধ্যার দিকে আপলিংকের সময় সব জানাব। সাবধানে থাকবে ওখানে, ঠিক আছে?”
“চিন্তা করো না, আমাদের বডিগার্ড হিসেবে দশজন আর্মি রেঞ্জারের একটি চৌকস দল রয়েছে এখানে। ওয়াশিংটনের যেকোন পথঘাটের চেয়ে বেশি নিরাপদে থাকব।
“সবসময় তোমরা দুজন দুজনকে চোখে চোখে রাখবে।”
ফ্রাঙ্কের দিকে তাকাল, সে এখন রিচার্ড জেনের সাথে কথা বলছে। “আচ্ছা রাখবো।”
একটা চুমু ভাসিয়ে দিয়ে বলল কেলির মা, “আই লাভ ইউ।”
“লাভ ইউ টু, মাম।” ক্রিন থেকে ছবিটা উধাও হয়ে গেল।
ল্যাপটপ বন্ধ করে টেবিলের পাশে রাখা একটি চেয়ারে গা ছেড়ে দিয়ে বসে পড়ল কেলি । হঠাৎ করেই খুব ক্লান্ত লাগছে তার। অন্যদেরকে দেখে নিল সে। তার জিনিসপত্র গোছগাছ করে হেলিকপ্টারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ইতিমধ্যে । সকল দায়-দায়িত্বে কথা বাদ দিয়ে তার চিন্তা-ভাবনা মোড় নিলো অন্যদিকে । সর্পিল আকারের রক্তিম বর্ণের সেই ট্যাটু, যাকে বলা হচ্ছে ব্যান আলির সিম্বল। ব্যান-আলি, আমাজনের ভুতুড়ে গোত্র। দুটি প্রশ্ন তাকে তাড়া করছে। এমন কোন অলৌকিক ক্ষমতাধর গোত্রের আদৌ অস্তিত্ব আছে কি? আর যদি থেকেই থাকে তবে দশজন রেঞ্জার্স কি যথেষ্ট তাদের বিপক্ষে?
