আমাজনিয়া – ৩
ডাক্তার ও ডাইনি
৬ই আগস্ট, রাত ১১:৪৫
কেইয়ান, ফ্রেঞ্চ গায়ানা
লুই ফ্যাব্রিকে প্রায়ই বাস্টার্ড এবং মাতাল বলে ডাকা হয়। তবে সেটা আড়ালে-আবডালে, কখনো তার সামনে নয়, কখনই না। ঝুঁকি নিয়ে চলা দূর্ভাগা এই মাতাল লোকটি এখন বসে আছে হোটেল সেইনের পেছনে এক সরু গলিতে । ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া এই হোটেলটি একসময় ঔপনিবেশিক স্থাপত্যরীতিতে গড়া বিশাল একটি কমপ্লেক্স ছিল। পাহাড়ের উপর স্থাপিত বনটি উপর থেকে রাজধানী ফ্রেঞ্চ গায়ানার দিকে তাকিয়ে আছে যেন।
কিছুক্ষণ আগে হেটেলের অন্ধকার বারে দাঁড়িয়ে এই লোকটি কয়েকজনের সাথে কি একটা বিষয় নিয়ে খুব বাজেভাবে কথা কাটাকাটি করছিল। লোকগুলোর মধ্যে একজন সামরিক সদস্য, ডেভিস আইল্যান্ড থেকে পালিয়ে আসা সাজাপ্রাপ্ত আশি বছরের এক বৃদ্ধ কয়েদিও ছিল। লুই অবশ্য বৃদ্ধ লোকটির সাথে কোন কথা বলে নি কিন্তু বার-কিপারের কাছে তার কাহিনী শুনেছে ফ্রান্স থেকে পাঠানো অনেক কয়েদির মতই সেও দুইভাবে দণ্ড পেয়েছে-দশ মাইল দূরের ডেভিল আইল্যান্ডের মত নরকে একবছর এবং পরের বছর থাকতে হয়েছে এই ফ্রেঞ্চ গায়ানায় । এই কলোনিতে ফরাসিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতেই এমনটা করা হয়। সরকার অবশ্য আশা করে, হতভাগ্য এই মানুষগুলো এখানে থাকাকালীন সময়েই পৃথিবী ত্যাগ করবে। কিন্তু যারা সাজা ভোগ করে আবার ফ্রান্সে ফিরে যাবে এই দীর্ঘ সময় পর তাদের জন্য কি রকম জীবন অপেক্ষা করবে?
লুই এই লোককে প্রায়ই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে । লোকটি যেন তারই জ্ঞাতিভাই । তারই মত দেশান্তরিত । লোকটি যখন তৃপ্তির সাথে তার পছন্দের হুইস্কিতে চুমুক দিতো লুই খুব ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করত তার আশাহীন মুখের উপর দিয়ে বয়ে চলা অসংখ্য বয়সের দাগগুলো । লুই এই শান্ত মুহূর্তগুলোকে খুব মূল্যবান মনে করত। তাই এমন একটি মুহূর্ত যখন এক আধ-মাতাল লোক নষ্ট করে দিল, ভেতরে ভেতরে সে তেতে উঠল। ইংরেজ মাতালটি হোঁচট খেয়ে পড়তেই বৃদ্ধের হাতের ড্রিঙ্কস পড়ে গেল। মাতাল সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করেই খুব স্বাভাবিকভাবে হেলে-দুলে হাটা শুরু করল। যেহেতু মাতালটি বৃদ্ধের কাছে কোন রকম ক্ষমা চাইল না কিংবা নিদেনপক্ষে দুটো ভাল কথাও বলল না, তাই নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না লুই। মাতালটার মুখোমুখি দাঁড়াল
সে ।
“সরে দাঁড়াও সামনে থেকে, ফ্রেঞ্চি,” জড়ানো কণ্ঠে কথাগুলো বলল ইংরেজ ।
লোকটাকে বার থেকে বের হওয়ায় বাধা দিয়ে বলল লুই, “আমার বন্ধুকে আরেকটা ড্রিকস কিনে দাও নয়তো তোমার কাছ থেকে তা আদায় করে নেয়া হবে, মিস্টার।”
“সরে দাঁড়াও বলছি, নির্বোধ মাতাল কোথাকার।” লুইকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে চাইল লোকটি।
লম্বা করে দম নিল লুই, তারপরই সজোরে একটা ঘুষি চালিয়ে দিল লোকটার নাক বরাবর। এক ঘুষিতেই নাকের ঝোল বের হয়ে গেল তার। এরপর ওর স্যুটের ল্যাপেন জোড়া ধরে পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে এলো লোকটাকে। অন্যান্য কাস্টমাররা যে যার ড্রিঙ্কসে মন দিল। তাকে টানতে টানতে বারের পেছনের দরজা দিয়ে সরু গলিতে নিয়ে এলো লুই। সারারাত মদে ডুবে থাকা এবং বিশাল এক ঘুষি খাওয়ার কারণে কোনরকম প্রতিক্রিয়া দেখতে পারছে না লোকটি। এর কাছ থেকে একটা ক্ষমাসুলভ আচরন পাবার জন্যই ক্যালরি খরচ করেছে লুই। ইতিমধ্যে সে অনেক আঘাত করে ফেলেছে লোকটাকে। প্রসাব ও রক্ত, এই দুই রকম তরলের সাথে তাদের দাড়িয়ে থাকার জায়গাটার কাদা-পানি মিশে একেবারে বিচ্ছিরি এক পরিবেশের সৃষ্টি হল। খুব জোরে নির্মমভাবে বুকে একটা লাথি দিয়ে ক্ষান্ত হল লুই। পাজরের হাড় ভঙ্গার শব্দ সন্তুষ্ট করল তাকে। মাথাটা একটু ঝাকি দিয়ে পাশের ডাস্টবিনের উপর পরে থাকা তার পানামা হ্যাটটা তুলে মাথায় দিতে দিতে গায়ের লিলেনের কোটটা ঠিক করে নিল। পায়ের আইভরি পেটেন্ট চামড়ার জুতো জোড়ার দিকে তাকিয়ে কুচকালো সে। পকেট থেকে নতুন একটা রুমাল বের করে জুততার সামনে লেগে থাকা রক্ত মুছে তীব্র ক্রোধে আরও একটা লাথি মারতে উদ্যত হয়েও শেষ মুহূর্তে নিজেকে সংযত করে নিল মাত্রই পালিশ করা জুতোর কথা ভেবে। হ্যাটটা ঠিকভাবে বসিয়ে পা বাড়াল ধোয়াটে বারের দিকে। ভেতরে ঢুকেই বৃদ্ধ লোকটিকে দেখিয়ে বারম্যানকে সংকেত দিল লুই, “আমার বন্ধুর গ্লাসটা ভরে দিন, প্লিজ।”
মাথা নেড়ে স্প্যানিস বার-কিপার এক বোতল হুইস্কি আনতে গেল। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা বৃদ্ধের চোখে চোখ পড়তেই লুই তার দিকে তাকিয়ে আঙুল নাড়লো । বারম্যান তার ঠোঁট কামড়ে ধরে আছে। লুইর আচারণ বেখাপ্পা লেগেছে তার কাছে। ও সবসময় সেরা ড্রিঙ্কসটাই নিয়ে থাকে, এমনকি তার বন্ধুদেরকে সার্ভ করার সময়েও। মনে মনে ভৎসনা করে সে এক বোতল প্লেননিভেট নিয়ে এল এটাই তার ঘরের সরচেয়ে পুরনো এবং সবচেয়ে সেরা ।
“ধন্যবাদ,” সব ঠিকঠাক করে হোটেল লবির প্রধান দরজার দিকে হাটা ধরল লুই।
প্রায় দৌড়েই গেল কেয়ারটেকার তার কাছে। খাটো আকৃতির লোকটা গভীর শ্রদ্ধার সাথে মাথা নত করল, “ড, ফ্যাভ্রি, আমি ঠিক আপনাকেই খুঁজছিলাম,”এক দমে বলল সে, “আপনার জন্য জরুরি এক খবর এসেছে বিদেশ থেকে।” একটা ভাঁজ করা নোট এগিয়ে দিল লুইর দিকে। “তারা আমার মাধ্যমে কোন মেসেজ দিতে রাজি হয় নি, বলেছে আপনার সাথে সরাসরি কথা বলাটা খুব জরুরি।”
হাতের ভাঁজ করা কাগজটি খুলল লুই, সেখানে ঝকঝকে প্রিন্ট করা একটি নাম দেখে পড়ল সে: সেন্ট স্যাভিন বায়োকেমিক কোম্পানি। একটি ফরাসি ড্রাগস কোম্পানি এটি। সে কাগজটা আবার ভাঁজ করে বুক পকেটে রেখে দিল। “আমি কথা বলব।”
“কাছেই একটি প্রাইভেট স্যালুন আছে”।
“আমি জানি কোথায় সেটা,” বলল লুই । তার অনেক বিজনেস কল ওখান থেকেই করে সে। কেয়ারটেকারকে পেছনে রেখে লম্বা পা ফেলে হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কের কাছে একটা ঘরে ঢুকলো। একটা নরম আবরনযুক্ত চেয়ারে বসতেই ছাতাপড়া গন্ধ নাকে এল । আরেকটু নড়েচড়ে বসতেই সেন্টার টয়লেট ওয়াটার ও ঘামের গন্ধের মিশ্রনে সৃষ্ট এক উৎকট গন্ধও টের পেল সে।
কোনমতে নিজের শরীরকে চেয়ারে এলিয়ে দিয়ে ফোনের রিসিভারটা তুলে নিল। “ড. লুই ফ্যাভি।” বেশ প্রভাবে বলল কথাটা।
“হ্যালো ড, ফ্যাভ্রি।” লাইনের অপরপ্রান্তের কণ্ঠস্বরটি বলে উঠল । “আমরা আপনার সেবা পেতে ইচ্ছুক।”
“যেহেতু আমার নাম্বার আপনার কাছে আছে সেহেতু আমি ধরে নিতে পারি আমার কাজের রেটও আপনি জানেন।”
“আমরা জানি।”
“আমি জানতে পারি কি কোন ধরণের সেবা আপনারা পেতে চাইছেন?” “প্রিমিয়ার।”
এক শব্দের এই উত্তরটা লুইকে বাধ্য করলো রিসিভারটা আরও শক্ত করে ধরতে । চমৎকার, প্রিমিয়ার ক্লাস। তার মানে পেমেন্টটার ফিগার হবে ছয় সংখ্যার ।
“লোকেশন?”
“ব্রাজিলের রেইনফরেস্ট।”
“আর কাজটা?”
লোকটি দ্রুত বলে গেল, কোন নোট নেয়া ছাড়াই সুই শুনে গেল সবটা। প্রত্যেকটি সংখ্যা, প্রত্যেকটি নাম মনে গেঁথে যাচ্ছে তার। বিশেষ করে একজনের নাম শুনে তার চোখ সরু হয়ে গেল। সোজা হয়ে বসল সে। বিরতি নিল লোকটি। “ইউএস টিমটাকে অবশ্যই খুঁজে পেতে হবে, আর তারা যাই কিছু আবিষ্কার করুক না কেন সবই নিজেদের দখলে নিতে হবে।”
“আর অন্য দলটা?” কোন উত্তর পাওয়া গেল না, অন্য একটা লাইনের খসখস শব্দ ছাড়া।
“আমি বুঝেছি। এই প্রস্তাবে রাজি আছি আমি, লুই বলল । চুক্তির অর্ধেক টাকা আগমীকাল বিজনেস আওয়ার শেষ হওয়ার আগেই আমার একাউন্টে দেখতে চাই। ইউএস টিমের বাদ যাওয়া যেকোন তথ্য এবং বিস্তারিত সবকিছুই আমার ব্যক্তিগত ফ্যাক্সে পাঠাতে হবে যত দ্রুত সম্ভব ।” সে তাড়াতাড়ি নাম্বারটা দিল ।
“এক ঘণ্টার মধ্যেই সব হয়ে যাবে।”
“ক্রেস বন।”
লাইনটা খট করে কেটে গেল । ডিলটা পাকাপাকি হয়েছে । রিসিভারটা জায়গায় রেখে হেলান দিল লুইস। তার নিজের দল গঠনের বিশাল কর্মযজ্ঞ এবং মোটা অংকের পারিশ্রমিকের ভাবনা, কোনটাই তার মাথায় নেই এখন। তার পুরো কল্পনাজুড়ে ঠিক এই মুহুর্তে একটি নাম জ্বলন্ত ম্যাগনেসিয়ামের মত জ্বলজ্বল করছে। তার নতুন নিয়োগদাতার কাছে এই নামের তাৎপর্য না থাকার কারণে ব্যাপারটা সে এড়িয়ে গেছে। যদি সে এ বিষয়ে কিছু জানত তবে সেন্ট স্যাভিনের পক্ষ থেকে প্রাপ্য সম্মানির পরিমাণও কমে যেত অবধারিতভাবে। প্রকৃতপক্ষে লুই এই কাজটি সামান্য এক বোতল সস্তা ওয়াইনের দামেই করে দিত। নামটা ফিসফিস করে বলল সে, নিজের জিহ্বা দিয়ে চেখে দেখছে যেন ওটা ।
“কার্ল রান্ড।”
সাত বছ আগে, এক বায়োলজিস্ট হিসেবে ফ্রান্সের বিখ্যাত সায়েন্স ফাউন্ডেশনবেইস বায়োলজিক ন্যাশনেইল দ্য রিসার্চে-এ কাজ করত লুই। রেইনফরেস্টের ইকোসিস্টেমের উপর বিশেষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বায়োলজিস্ট লুই বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তেই কাজ করেছে অস্ট্রেলিয়া, বনিও, মাদাগাস্কার, কঙ্গসহ অনেক জায়গায়। কিন্তু আমাজন জঙ্গলে তার কাজের অভিজ্ঞতা পনের বছরের । এই দীর্ঘ সময়জুড়ে আমাজনের প্রায় পুরোটাই সে চষে ফেলেছে, অর্জন করেছে আন্তর্জাতিক খ্যাতি। ব্যাস, এতটুকুই । জঘন্য চরিত্রের রূপধারণকারী ডা: কার্ল রান্ডের সাথে বিরোধ হওয়ার আগ পর্যন্তই ছিল ড. লুই ফ্যাভ্রির খ্যাতি বাড়াবার নেশা।
লুইর গবেষণা পদ্ধতি কিছুটা সন্দেহজনক মনে হয়েছিল আমেরিকান ফার্মাসিউটিক্যালসের অর্থলগ্নীকারি ডা: রান্ডের কাছে। লুইর সাথে কথা হয়েছে এমন একজন স্থানীয় শামানের কাছে সবকিছু শোনার পর ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যায়। একের পর এক আঙুল কেটে শামানদের কাছ থেকে চিকিৎসা পাওয়ার নামে তথ্য সংগ্রহ করত লুই। কিন্তু একগুয়ে এই ইন্ডিয়ানদের কাছ থেকে আঙুল কেটে ছাড়াছাড়াভাবে তথ্য সংগ্রহ করার পদ্ধতিটা ভাল ঠেকলো না ডা: রান্ডের, আবার অন্যদিকে টাকা-পয়সা দিয়েও এই ইন্ডিয়ানদের বাগে আনা যায় না। তাছাড়াও সে-সময়ে গ্রামের এক জায়গায় কিছু বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির কালো কুমিরের মৃতদেহ আর জাগুয়ারের চামড়া পাওয়া গিয়েছিল। আর এই ঘটনা অবধারিতভাবে লুইর কর্মক্ষেত্রে বিরাট সমস্যার সৃষ্টি করল। এদিকে ড, রান্ড এটা বুঝতে অক্ষম ছিল যে, কালোবাজারের মাধ্যমে যে বিশাল অর্থ উপার্জনের সুযোগ তৈরি হয় সেটা গ্রহণ করা জীবন চালানোর জন্য খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।
দুর্ভাগ্যবশত কার্ল র্যান্ড এবং তার ব্রাজিলিয়ান ফোর্সের লোকসংখ্যা অনেক বেড়ে যায় সে-সময়। গ্রেপ্তার করা হয় লুই ফ্যাভ্রিকে, ব্রাজিলিয়ান আর্মি ক্যাম্পের জেলখানায় রাখা হয় তাকে। কি সৌভাগ্যক্রমে সেখান থেকে সটকে আসার জন্য যা যা দরকার সবই তার ছিল । একদিকে ছিল ফ্রান্সের সাথে ভাল যোগাযোগ আর অন্যদিকে পকেট ভরা টাকা, যা দিয়ে দূর্নীতিগ্রস্ত কিছু ব্রাজিলিয়ান অফিসারকে কিনে নিয়েছিল খুব সহজেই।
কিন্তু এই ব্যবস্থাই বিষাক্ত হুল হয়ে ফুটলো তার ক্যারিয়ারে । আমাজনের এই ঘটনা তার সুনামকে এতটাই কলংকিত করল যে সে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারল না। একেবারে শূন্য হাতে তাকে ব্রাজিল থেকে ফ্রেঞ্চ গায়ানায় পালিয়ে যেতে হয়। প্রচুর সম্ভাবনাপূর্ণ আমাজনের যেসব কালোবাজারীদের সাথে তার যোগাযোগ ছিল তার উপর ভিত্তি করে সে তার নিজস্ব জঙ্গল ফোর্স গঠন করে ফেলল। যাদের কাজ ছিল লুটপাট করা, কখনো নিজেরা, কখনো অন্যের ভাড়াটে হয়ে । গত পাঁচ বছরে তার দল কলাম্বিয়া থেকে আসা মাদকের বড় একটি চালানকে আটকে দেয়, হত্যা করে বিরল প্রজাতির বিভিন্ন রকম প্রাণী ব্যক্তিগত সংগ্রাহকদের জন্য, সরিয়ে দেয় পথেরকাটা হয়ে দাঁড়ানো ব্রাজিলিয়ান সরকারের বেশ কিছু পদস্থ কর্মকর্তাকে। এমনকি কিছু ছোট গ্রামও নিশ্চিহ্ন করে দেয় আমাজনের বুক থেকে যেগুলোর অধিবাসীরা তাদের গ্রামে কাঠ কাটতে আসা দস্যুদেরকে বাধা দিয়েছিল। পুরো জায়গা জুড়েই ব্যবসাটা ছিল জমজমাট। আর এখন তার কাছে সর্বশেষ এই প্রস্তাব, ইউএস মিলিটারি এক টিমকে খুঁজে বের করা। টিমটা যেহেতু কার্ল রান্ডের দলকে খুঁজে বের করবে, তাদের সব কিছু হাতিয়ে নেবে তাই ওটা খুঁজে বের করাই হবে লুইর লক্ষ্য। তারপর সে হাতিয়ে নেবে সেই রিজেনারেটিভ কমপাউন্ড, যেটার জন্যই এতকিছু। সবার বিশ্বাস কার্ল রান্ড অবশ্যই এমন কিছু রিজেনারেটিভ কমপাউন্ড আবিষ্কার করে থাকবে যার মূল্য হবে অকল্পনীয়।
এটা পাওয়া খুবই স্বাভাবিক। গত কয়েক বছরে রেইনফরেস্টে ড্রাগসের নতুন এই ব্যবসা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, হয়ে উঠেছে শতশত কোটি ডলারের কারবার । আগামি দিনের নতুন এই রেইনফরেস্ট ড্রাগস যেন সবুজ সোনা। আর এটা খুঁজে বেড়ানো মানেই পুরো আমাজনজুড়ে সোনা খুঁজে বেড়ানো। এই বিস্তৃত সীমাহীন সবুজের বুকজুড়ে লক্ষ-লক্ষ ডলারের বাণিজ্য করা হচ্ছে হতদরিদ্র কৃষক আর অসভ্য ইন্ডিয়ানদের মাথার উপর বসেই। বেঈমানি এবং হিংস্রতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিদিন দেখে আলোর মুখ, গুপ্তচরের কোন দৃষ্টিসীমা পৌছায় না ওখানে, ওখানকার হিংস্রতা বর্ণনা করার মত এমন কেউ থাকে না। বিভিন্ন রকম রোগ, আক্রমণ কিংবা বিভিন্নরকম অসুস্থতার সাহায্যে প্রতিবছর এই জঙ্গল উদরপূর্তি করে হাজারো মানুষ। সেখানে আরো কিছু মানুষ ওটার পেটে গেলে ক্ষতি কি? একজন বায়োলজিস্ট, একজন এথনোবোটানিস্ট আর একজন ড্রাগ গবেষক। এই খেলা সবার জন্য উন্মুক্ত। টাকার ঘ্রাণ ভালবাসে এরকম যে কেউ অংশ নিতে পারে এতে।
লুই ফ্যাত্রি এই খেলায় যোগ দিতে প্রস্তুত । তার পেছনে শক্তিশালী ফ্রেঞ্চ ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি। একটু হেসে উঠে দাড়ালো সে। চার বছর আগে কার্ল রান্ডের নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ শুনে খুব আনন্দিত হয়েছিল, সে-রাতে মদে বুদ হয়েছিল খুশিতে, রান্ডের এমন দূর্ভাগ্য তার নিজের জন্য চরম আনন্দের হওয়ায় পানপাত্র উঁচু করে ফুর্তি করেছিল। আর এখন সুযোগ এসেছে তার শত্রুর কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়ে তারই সমাধির উপর আরো কিছু লাশ ফেলে তার সব আবিষ্কার হাতিয়ে নেয়ার।
সেলুনের দরজা খুলে বাইরে এল লুই। “আশা করি সব কিছুই ঠিকঠাক মত হয়েছে, ড. ফ্যাভ্রি,” নিজের ডেস্ক থেকে খুব নম্রভাবে জিজ্ঞেস করল কেয়ারটেকার।
“খুব ভাল, খুবই সন্তোষজনক, ক্লদ।”
লুই হোটেলের ছোট্ট এলিভেটরের কাছে গেল রটআয়রন আর কাঠ দিয়ে গড়া পুরাতন একটি কুঠুরি। দু-জনের একসাথে চড়াও কষ্টকর ওটাতে।’ আর ‘ বাটনে প্রেস করল সে, গন্তব্য সাততলায়, ওখানেই তার নিজের অ্যাপার্টমেন্ট স্যুট আজকের খবরটা কাউকে না-বলা পর্যন্ত তার উদ্বেগ কাটছে না যেন।
এলিভেটরটি ঘড় ঘড় শব্দ করে উপরে উঠতে উঠতে গন্তব্যে এসে হাঁফ ছাড়ল অবশেষে। ওটার দরজা খুলতেই সরু হল রুম ধরে দ্রুত পা চালাল লুই। তার দৃষ্টি একেবারে শেষ প্রান্তের রুমের দিকে। খুব সীমিত সংখ্যক অতিথি যারা হোটেল সিনেইকে স্থায়ী আবাস হিসেবে বেছে নিয়েছে, লুই তাদের মধ্যে একজন। কয়েকটি রুম নিয়ে তার অ্যাপার্টমেন্ট । দুটি শোবার ঘর, ছোট্ট একটি রান্না ঘর, একটা বেশ খোলামেলা বসার ঘর, যেটা মুখ করে আছে রটআয়রনের ব্যালকনির দিকে। ছোটখাট পড়ার ঘরও আছে একটা। সারি-সারি বইয়ের তাক দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। তার অ্যাপার্টমেন্ট স্যুটটা বেশি বিন্যস্ত না হলেও তার প্রয়োজন মিটে যায় ভালভাবেই। অতিথিদের খামখেয়ালী আচরনের সাথে বেশ ভালই পরিচিত এখানকার স্টাফরা, সাথে সতর্কও বটে। চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দুটি জিনিস দৃষ্টিগ্রাহ্য হল তার। প্রথমটি, ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়া খুবই পরিচিত একটি ঘ্রাণ, উত্তেজক এই ঘ্রাণটি আসছে ছোট্ট গ্যাস স্টোজ্ঞে উপর রাখা পট থেকে। ওটার ভেতর সেদ্ধ করা হচ্ছে আয়াহুয়াসকা পাতা যা দিয়ে তৈরি হয় শক্তিশালী ভ্ৰমসৃষ্টিকারী চা-ন্যাটেম। দ্বিতীয়টি, স্টাডি রুমের ফ্যাক্স মেশিন থেকে ভেসে আসা শব্দ। তার নতুন নিয়োগদাতারা আসলেই দক্ষ।
‘সুই!” ডাক দিল লুই।
সে কোন উত্তর আশা করে নি কিন্তু তাকে ডাকতে হল। আর গোত্রের রেওয়াজ অনুযায়ী একজন মানুষ অবশ্যই তার উপস্থিতি জানান দিয়ে ঘরে ঢুকবে।লুই লক্ষ্য কল তার শোবার ঘরের দরজা কিছুটা খোলা। একটু হেসে পড়ার ঘরে অন্ধ্যাতে রাখা ফ্যাক্স মেশিনটার কাছে গেল। একটা কাগজ মেশিনটার ভেতর থেকে শব্দ করতে করতে বেরিয়ে জমে থাকা আরও কিছু কাগজের উপর পড়ল। আসন্ন মিশনের যাবতীয় তথ্যাবলী । “সুই, দারুণ একটা খবর আছে।”
জমে থাকা কাগজের স্তুপ থেকে সবচেয়ে উপরের কাজটা তুলে চোখ বুলাল সে। যাদের নিয়ে ইউএস টিমটা গঠিত হবে তাদের তালিকা এটি।
১০:৪৫ বেইস স্টেশন আনফা থেকে আপডেট।
অপারেশন আমাজনিয়া: সিভিলিয়ান ইউনিটের সদস্য
১. কেলি ওব্রেইন, এমডি, এমইডিইএ।
২.ফ্রান্সিস কে, ওব্রেইন, এনভায়রনমেন্টাল সেন্টার, সিআইএ।
৩. অলিন পাস্তারনায়েক সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ডিরেক্টরেট,সিআইএ।
৪. রিচার্ড জেন, পিএইচডি, টেলাক্স ফার্মাসিউটিক্যালস রিসার্চ হেড।
৫. আনা ফঙ, পিএইচডি, টেলাক্স ফার্মাসিউটিক্যালস এমপ্লয়ি।
অপারেশন আমাজনিয়া মিলিটারি সাপোর্ট: ৭৫ আর্মিরেঞ্জার ইউনিট ক্যাপটেন ক্রেইগ ওয়াক্সম্যান, কর্পোরালস: ব্রেইন কন্সার, জেমস ডি-মারটিনি, রডনি গ্রেইভস, ডেনিস জার্গেনসেন, কেনেথ ওকামোটো, নোলান ওয়ার্কজাক এবং সামাদ ইয়ামির।
অপারেশন আমাজনিয়া : স্থানীয় রিক্রুট
১.ম্যানুয়েল অ্যাজভেদো-ফুনাই, ব্রাজিলিয়ান ।
২.রেশ কাউয়ি, পিএইচডি-ফুনাই, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি।
৩.নাথান রান্ড-ইথনো বোটানিস্ট, ইউএস নাগরিক।
শেষের নামটা প্রায় মিস হয়েই যাচ্ছিল লুইর। কাগজটা আরও শক্ত করে ধরল সে। নাথান রান্ড, কার্ল রান্ডের ছেলে। আচ্ছা, ব্যাপারটা খুব পরিষ্কার, তার বাবার অনুসন্ধানকারী দলের সাথে নিজেকে যুক্ত না করে এমন সুযোগ হারাতে চাইবে না সে। চোখ জোড়া বন্ধ করল লুই, তার আত্মা ব্যাপারটা তীব্রভাবে উপভোগ করতে চাইছে। অন্ধকার জঙ্গলের দেবতারা যেন তার দিকে সুদৃষ্টি দিয়েছে। ব্যাপারটাকে এমনই মনে হচ্ছে তার। বুকে জমে থাকা প্রতিশোধের আগুনের পুরোটাই সে খরচ করতে পারে নি কার্ল রান্ডকে পোড়ানের জন্য। কিছুটা জমা ছিল তার ভেতরে, যেটা ভোগ করবে শুধু একজনই নাথান রান্ড কার্ল রান্ডএর ছেলে। পিতার কৃতকর্মের ফল সন্তানের কাঁধেও পড়ে, বাইবেলের এই বাণী লুই আরও একবার সত্য হতে দেখবে।
পাশের মাস্টার বেডরুম থেকে একটা আওয়াজ ভেসে এল ওর কানে। কারো যেন নড়াচড়ার শব্দ। হাতে ধরা কাগজটা আলতো করে ছেড়ে দিল জমে থাকা কাগজের পের উপর। মিশনের সবকিছু পরে খুঁটিয়ে দেখে একটা পরিকল্পনা করা যাবে, আর আগে এই মুহূর্তে সে তার অপ্রত্যাশিত সুযোগপ্রাপ্তির এই সময়টাকে উপভোগ করতে চাচ্ছে।
“সুই!” আরও একবার ডেকে সে বেডরুমের দিকে গেল।
আলতো করে দরজা খুলে ঘরে ঢুকল সুই। ঘরের একপাশে কিছু মোমবাতি জ্বলছে, আর জ্বলছে একটি ধূপদানী । তার স্ত্রী শুয়ে আছে বিছনায়। কুইন সাইজের বিশাল বিছানাটা ঢেকে আছে সাদা সিল্কের চাদরে। মশারিটা ভাজ করে রাখা বিছানার উপরে। মোলায়েম চাদরের উপর আধশোয়া অবস্থায় রয়েছে, আর মেয়েটি। শরীরের গাঢ় তামাটে রঙ মোমবাতির আলোয় রক্তিম আভা ছড়াচ্ছে। মাথার দীর্ঘ কালো চুল একটা বৃত্ত তৈরি করেছে মাথার চারপাশে। মোহসৃষ্টিকারি ন্যাটেম টি এবং ভেতরের তীব্র আবেগ আচ্ছাদিত করে রেখেছে চোখদুটো, বিছানার ঠিক পাশেই ছোট্ট নাইটস্ট্যান্ডটির উপর দুটো কাপ রাখা, একটি খালি, অপরটি পূর্ণ।
বরাবরের মত এবারও শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এল তার ভালবাসার মানুষটির দিকে তাকিয়ে। এই সুন্দরীর সাথে তার প্রথম দেখা হয় তিন বছর আগে ইকুয়েডরে। আর গোত্রের দলীয় প্রধানের স্ত্রী ছিল সে। কিন্তু নির্বোধ লোকটার অস্বস্তি তীব্রভাবে ক্রোধান্বিত করে দিয়েছিল সুইকে। সুই নিজের স্বামীকে হত্যা করে নিজের ছুরি দিয়েই। যদিও এমন অসততা এবং খুনোখুনি উভয়ই খুব স্বাভাবিক ছিল হিংস্র শুআর গোত্রে তবুও সুইকে গোত্র থেকে বের করে দেয়া হয়, বিবস্ত্র অবস্থায় ছেড়ে দেয়া হয় জঙ্গলে, তার কাছে ঘেষা বা তাকে স্পর্শ করার দুঃসাহস কারও ছিল না, এমনকি তার মৃত স্বামীর কোন আত্মীয়স্বজনেরও নয়। পুরো অঞ্চলজুড়ে সে পরিচিত ছিল ওয়াওয়েক ও কালো জাদুতে প্রশিক্ষণ পাওয়া দূর্লভ এক নারী হিসেবে। বিভিন্নরকম বিষাক্ত পদার্থ, নানারকম নির্যাতন দেয়া ও হারিয়ে যাওয়া আর্ট স্যানজা এসব বিষয়ের উপর তার যে ব্যাপক দক্ষতা সেটাকে একই সাথে শ্রদ্ধা আর মানুষের কাছে অন্যরকম করে তুলেছিল, সেটা ছিল তার আরেকটা দুঃসাহসী কাজ। মানুষকে মেরে তার মাথা ভয়ানকভাবে কুঁচকে দিতে পারত মেয়েটি। এই কাজটিই সে করেছিল তার স্বামীকে মারার পর । গ্রাম ত্যাগ করার সময় তার বিবস্ত্র দেহে শুধুমাত্র একটি জিনিসই ছিল তার স্বামীর কুঁচকানো মাথা যেটা সে পাকানো দড়ির সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে দিয়েছিল তার বুকের ওপর। এইভাবেই লুই মেয়েটিকে পেয়েছিল-বন্য সৌন্দর্যমণ্ডিত এক হিংস্রপ্রাণী । ফ্রান্সে, লুইর যদিও বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া এক স্ত্রী আছে তারপরও সে এই বন্য মেয়েটিকে নিজের করে নিয়েছে। মেয়েটিও প্রত্যাখান করতে পারে নি লুইকে, বিশেষ করে একটি ঘটনার পর যখন লুই তার দলবল নিয়ে মেয়েটির গ্রাম আক্রমণ করে, হত্যা করে নারী-পুরুষ-শিশু সবাইকে। মেয়েটি এত বড় প্রতিশোধ একা নিতে পারত না তাই নিজেকে লুইর হাতে সপে দিতে দ্বিধা করে নি। সেদিন থেকেই তারা অবিচ্ছেদ্য জুটি। জঙ্গলের ভেতর-বাহির সব জায়গার হিংস্রতা ও বিচক্ষণতার মিশেলে চমৎকার এক সঙ্গী হিসেবে প্রতিটি অভিযানেই লুইর পাশে থেকেছে সুই । আর প্রতিটি অভিযান থেকেই সে পুরস্কার অর্জন করছে নিয়মিতভাবে। ঘরের চার দেয়ালে লাগানো সবগুলো শেলফজুড়ে শোভা পাচ্ছে তেতাল্লিশটা স্যানজা কুঁচকানো মাথা। এর কোনটাই একটা শুটকো আপেলের চেয়ে বড় হবে না। চোখ আর ঠোট জোড়া খুব কাছাকাছি সেলাই করে আটকে দেয়া, মাথার চুলগুলো ব্যবহৃত হয়েছে ঝোলানোর দড়ি হিসাবে ,মাথাগুলো ঝুলছে শেল্ফগুলোর উপরের প্রান্ত থেকে একটু নিচে । মাথা কুঁচকে দেয়ার এই বিদ্যা অসাধারনভাবে রপ্ত করেছে সে। পুরো প্রক্রিয়াটা একবার দেখেছিল লুই। একবার দেখাই যথেষ্ট ছিল। প্রথমে সুই তার শিকারের মুখমন্ডলসহ পুরো মাথার চামড়াটা খুলে নেয়, এ কাজটা সে করে একেবারে অভিজ্ঞ সার্জেনের মত। কোন কোন শিকারের তখনও প্রাণ থাকে, এমন কি চিৎকার করে অনেক নারী-পুরুষ। সুই আসলেই এক অসাধারন শিল্পী। চামড়াটা ছাড়িয়ে নিয়ে চুলসহ সেটাকে সেদ্ধ করার পর গরম ছাইয়ের ওপর শুকোতে দেয়। এরপর হাড়ের তৈরি একটা সূঁচ দিয়ে ওটার মুখ ও চোখ সেলাই করে আটকে দিয়ে ওটার ভেতর গরম নুড়ি পাথর আর বালি ভরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। ঠিক যে মুহূর্তে চামড়াটা সংকুচিত হতে শুরু করে তখনই সে শুরু করে তার শৈল্পিক হতের ছোঁয়া দিতে। অবিশ্বাস্য সুন্দরভাবে চামড়াটার উপর হাত চালাতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাতের বস্তুটি একটা মানুষের মুখ হয়ে ওঠে।
লুই তাকালো তার স্ত্রীর সুনিপুণ হাতেগড়া সর্বশেষ স্যানজাটার দিকে। একটা টেবিলের পাশে ঝুলছে ওটা। এক বলিভিয়ান আর্মি অফিসার এক কোকেন-ব্যবসায়িকে ব্ল্যাকমেইল করছিল, আর এ-কাজটা সুই আর লুইর ব্যাকরণ অনুযায়ী খুবই খারাপ কাজ, ফলে সেই আর্মি অফিসারের শরীরের একাংশ এখন তাদের ঘরে শোভা পাচ্ছে। ছেটে রাখা ছোটগোঁফ থেকে শুরু করে সরাসরি কপালের ওপর ঝুলতে থাকা চারকোনা করে ছাটা চুল পর্যন্ত, পুরোটা কাজই অবিশ্বাস্যরকম সুন্দরভাবে করেছে সু। তার এই কাজগুলো সেরা জাদুঘরগুলোতে জায়গা পাওয়ার যোগ্যতা রাখে। হোটেল সিনেই-এর স্টাফরা অবশ্যই লুইকে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপলজির শিক্ষক বলেই মনে করে। তার ঘরের এই জিনিসগুলো আসলে একটি জাদুঘরের জন্য সংগ্রহ করছে সে। তবে তাদের মাথায় যদি এগুলো নিয়ে অন্য কোনো চিন্তা এসেও থাকে তারা ভাল করেই জানে কিভাবে চুপ থাকতে হয়।
“মাই ডালিং” বলল লুই তার হারানো দমটুকু ফিরে পেয়ে । “খুশির খবর আছে।”
সুই কিছুটা ঝুঁকে এল লুইর দিকে, তার পর ছোট্ট একটা শব্দ করল সে। যেন তার মাঝে ডুব দেয়ার জন্য লুইকে উৎসাহ দিচ্ছে। সুই কোন কথা বলে না বললেই চলে। ছাড়া ছাড়াভাবে কখনও দু-একটা শব্দ ব্যবহার করে হয়ত । একজন মানবী হয়েও সে অন্যদিকে একটা হিংস্র বাঘের মত যার দৃষ্টি সবদিকে নিবন্ধিত, গতিতে ক্ষিপ্রতা আর কন্ঠে চেপে রাখা সুখানুভূতির মৃদু শব্দ। আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না লুই। এক ঝটকায় ক্যাপটা খুলে ফেলল মাথা থেকে, তারপর কোটটা। তার মাথায় সুই ছাড়া আর কেউ নেই এখন। মুহূর্তের মাঝেই তারা দুজনই হয়ে গেল প্রকৃতির সন্তান। লুইর পেশীবহুল কিছুটা ঋজু দেহজুড়ে ছড়িয়ে আছে কাঁটাছেড়ার দাগ। তুলে নিল ন্যাটেমটি নামক চা। গলা ছিড়ে নামাতে শুরু করল সেটা। এদিকে সুই আলতো করে হাত বুলাচ্ছে লুইর তলপেটে, উরুতে থাকা দাগগুলোর উপর। আগুন জ্বালানো অমন স্পর্শ পেয়ে ভেতরের শীতল উঠে গেল চা গিলতে থাকা লুইর। ন্যাটেমটি খুব কড়া মাদক হিসেবেই নেওয়া হয়, যুব দ্রুতই কাজ করে ওটা। তাই চা শেষ হতে না হতেই তার ভেতরের সমস্ত অনুভূতি এক হয়ে লুইকে জাগিয়ে তুলল, ঝাঁপিয়ে পড়ল সে ঠিক সুইমিংপুলে ঝাঁপ দেয়ার মত। তবে লুই সেখানে পেল না দেহশীতলকারী জল, পেল এক উষ্ণতার আধার। নিজেকে পুরো মেলে ধরুল সুই আর তাতেই পুরোপুরি নিমজ্জিত হল লুই। গভীর মমতায় চুমু খেতে লাগল সে, আর সুই তার সঙ্গীর পিঠে তীক্ষ নখের আচঁড়ে কামনার আগুন ছড়িয়ে দিতে লাগল সারাদেহে। মুহূর্ত পরেই লুইর দৃষ্টিজুড়ে খেলা করতে লাগল শত-সহস্র আলোর বর্ণালী। তাদের ঘরটাও যেন দুলছে একটু। লুই অনুভব করতে পারল তার সদ্য পান করা ন্যাটেম চায়ের অ্যালকালয়েড কাজ শুরু করে দিয়েছে পুরোদোমে। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হল প্রণয়ের এই দৃশ্য উপভোগ করছে ঝুলিয়ে রাখা কুঁচকানো মাথাগুলো, তাকিয়ে আছে লুইর দিকে তৃষ্ণার্ত চোখে, ঠিক যেমন তাকিয়ে আছে লুই তার নিচের মানুষটির দিকে। চারপাশের দর্শকেরা আরও একটু জেগে উঠতেই সে তার সম্পূর্ণ মনোযোগ সুইর দিকে দিল। অসংখ্য ছন্দময় ওঠা-নামা তার বুকের ভেতরে একটা শীর্ষ অনুভুতির জন্ম দিল, যে অনুভূতি শিকার হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে তার বুক থেকে। চারপাশের ছোটছোট মুখগুলো তাকিয়ে আছে তাদের দিকে অন্ধ দৃষ্টি নিয়ে। লুই তার অনুভূতির চূড়ান্ত বিস্ফোরণের আগে অন্য একটি বিষয়ে কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে গেল। ভাবল একটা বিশেষ পুরস্কারের কথা। এটা সে যোগ করতে চায় তার সংগ্রহে-একজনের মাথা, যার বাবা তার জীবনটাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। নাথান রান্ডের মাথা। সন্দেহ নেই এটাই হবে তার সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন।
