আমাজনিয়া – ৪
ওয়াওয়ে
আগস্ট ৭, দুপুর ১২টা ,
আমাজন জঙ্গলের অভিমুখে
হেলিকপ্টারের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে নাথান। কানে শব্দরোধী ইয়ারফোন। পাখার গর্জন এতই তীব্র যে সাউন্ডপ্রুফ হেডফোন থাকা সত্ত্বেও প্রত্যেক যাত্রির কানে তালা লেগে যাচ্ছে। নিচে, সবুজের সীমাহীন সাগর বিস্তৃত হয়ে আছে চতুর্দিকে, একেবারে দিগন্ত রেখা পর্যন্ত। উপর থেকে এমন দৃশ্য দেখে মনে হবে পুরো পৃথিবীটাই যেন একক সবুজে ঢাকা বিশাল জঙ্গল । দেখতে একঘেয়ে লাগা বিশাল সবুজের চাদরে ঢাকা এই বনের কিছু জিনিস আলাদাভাবে চোখে পড়ে ওপর থেকে। ওগুলো আছে বলেই বনটাকে বেশি একঘেয়ে লাগছে না। এসব জিনিসের মধ্যে আছে বিশাল মুকুট মাথায় নিয়ে সহোদর ছোট গাছগুলোকে ছাড়িয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল দৈত্যাকারের গাছগুলো। এইসব দৈত্যাকার গাছগুলোতে নিজের বাসস্থান করে নিয়েছে বড় বড় হার্পি ঈগল ও টুকান পাখিরদল । আরও কিছু জিনিস উল্লেখ করার মত, সেটা হল ছোট-বড় অসংখ্য নদী। কখনও কিছুটা সবুজের আড়ালে থেকে আবার কখনও নিজেদের প্রকাশ করে সপিলপথে বয়ে চলেছে পুরো আমাজন জুড়ে। এই জিনিসগুলো বাদ দিলে পুরো আমাজনই মাহাত্মপূর্ণ, অভেদ্য আর সীমাহীন এক সবুজ।
নাথান জানালা দিয়ে নিচে তাকাল। কোথাও কি আছে তার বাবা? আর যদি নাও থাকে কোন উত্তরও কি পাবে তারা? বুকের অনেক গভীরে বেদনা আর তিক্ততায় ভরা এক অনুভূতি আচ্ছন্ন করল তাকে। তার বাবার আবিষ্কার কি সে দেখে যেতে পারবে? সময় সব ক্ষতই সারিয়ে দেয় কিন্তু রেখে যায় কিছু কুৎসিত, অমচোনীয় দাগ। আজ এই চারবছর পর নাথান এটা ভালই বুঝতে পারছে।
তার বাবা নিরুদ্দেশ হওয়ার পর নাথান নিজেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল জগৎ-সংসার থেকে। প্রথমে স্থান করে নিল জ্যাক ড্যানিয়েলসের বোতলের তলায়, তারপর আরও শক্তিশালী মাদকের বাহুডোরে। আমেরিকায় ফেরার পর চিকিৎসক তার সমস্যাগুলোকে আখ্যায়িত করল অ্যান্ডনমেষ্ট ইসট্রাস্ট কনফ্লিক্টস’ এবং ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন হিসেবে কিন্তু নাথান জানত এগুলো তার জীবনে আস্থাহীনতা ছাড়া আর কিছুই সৃষ্টি করতে পারে নি। সে-সময়টাতে নাথান কারও সাথে কোনও গভীর সম্পর্ক গড়তে পারে নি শুধুমাত্র ম্যানুয়েল ও কাউয়ি ছাড়া। তার ভেতরের কাঠিন্য, আসাড়তা ও কষ্টের দাগ তাকে এক অন্যমানুষে রূপান্তরিত করেছিল। শুধুমাত্র জঙ্গলে প্রত্যাবর্তনের পরেই সে কিছুটা শাভি খুঁজে পায়।কিন্তু এই মুহূর্তে সেই শান্তি তাকে কোথায় নিয়ে চলেছে সে জানে না।
সে কি প্রস্তুত তার ঢেকে রাখা পুরনো ক্ষতগুলোকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে? তীব্র যন্ত্রণার মুখোমুখি হতে? কানে লাগানো হেডফোনের ছোট্ট স্পিকারগুলো সচল হয়ে উঠল। প্রথমে খসখস শব্দ তারপর ভেসে এল পাইলটের কণ্ঠ যেটা সাময়িকভাবে পাখার শব্দকে স্নান করে দিল।
“আমরা ওয়াওয়ে থেকে বিশ কিলোমিটার দূরে আছি, কিন্তু ওখান থেকে ধোয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে। সামনের দিকে চেয়ে কিছু দেখার চেষ্টা করল নাথান । কিন্তু কালচেসবুজ জঙ্গল ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না কোথাও। ওয়াওয়ে ব্যবহৃত হবে দলটির দ্বিতীয় ঘাটি। দুই ঘন্টা আগে তিনটি হিউইজ হেলিকপ্টার চকচকে ব্ল্যাক কমানচিকে সাথে নিয়ে সাও-গ্যাব্রিয়েল ছেড়েছে। যেগুলো বহন করছে প্রয়োজনীয় রসদ, ক্যাম্পিং গিয়ার অস্ত্রসস্ত্র এবং টিমের অন্যান্য সদস্যদের। জঙ্গল অভিমুখে অভিযানটি নেওয়ার পর আজকে থেকে হিউইজ কপ্টারগুলো ব্যবহৃত হবে প্রয়োজনীয় জিনিস আনা-নেওয়ার পরিবহণ হিসেবে যাদের ওড়াউড়ি সীমাবদ্ধ থাকবে ওয়াওয়ে এবং সাও-গ্যাব্রিলের মধ্যে। এসময়টাতে কমানচিটাকে স্ট্যান্ডবাই রাখা হবে ওয়াওয়েতে জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য। যটার সাথে সংযুক্ত অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র এবং দূরপাল্লার যাত্রা করার ক্ষমতা খুব প্রয়োজন হতে পারে এই টিমটাকে অনাহুত কোন বিপদ থেকে রক্ষা করার কাজে। মূল পরিকল্পনাটা এরকমই করা হয়েছে।
“আমাদের গন্তব্যস্থল থেকেই ধোয়াটা আসছে মনে হচ্ছে,” বলে চললো পাইলট। “গ্রামটা আগুনে পুড়ছে।”
জানালার পাশ থেকে সরে গেল নাথান। আগুনে পুড়ছে সে কেবিনটা একনজর দেখে নিল। ওব্রেইন ভাই-বোনদের সাথে সে তার জায়গাটা ভাগ করে নিয়েছে প্রফেসর কাউয়ি রিচার্ড জেন এবং আন ফঙের সাথে। তাদের সঙ্গে সপ্তম ও সর্বশেষ যে ব্যক্তি সে হল কঠিন মুখের সেই লোকটা যে ক্যাম্পে ব্রিফ চলাকালীন সময়ে টেবিলের অপরপ্রান্তে বসে ছিলো, গলায় কুৎসিত একটা কাটা দাগ আছে তার। আজ ভোরে তাঁর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে, নাম অলিন পাস্তারনায়েক। সিআইএ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। নাথান খেয়াল করল লোকটার শীতল নীল চোখজোড়া পেছন থেকে তার উপরেই নিবদ্ধ ছিল এতক্ষণ। আরও খেয়াল কাল, লোকটার মুখ যেন পাঠোদ্ধারের অযোগ্য আর খসখসে একটি মুখোশ সে দেখতে পেল তার ঠিক পাশেই ফ্রাঙ্ক একটি মাইক্রোফোন টেনে মুখের সাথে লাগাল।
“তবু আমরা ল্যান্ড করতে পারব?”
“এত দূর থেকে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না, স্যার, উত্তর দিল পাইলট।
পরিস্থিতিটা সরেজমিনে দেখার জন্য ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান দেখল তাদের সাথের আরেকটি হেলিকপ্টার সামনের দিকে উড়ে গেল। তাদের হেলিকপ্টারের গতিও কমিয়ে দেয়া হয়েছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর তাদের সামনে উড়তে থাকা হেলিকপ্টারটি একটু কাত হয়ে মোড় নিতেই নাথান উড়তে থাকা শিখা দেখতে পেল । সবুজের চাদর ভেদ করে যেন লাল বজ্রের উর্ধমুখী অভিঘাত দিগন্তের নীল আকাশের গায় বেয়ে উঠছে। অন্যান্য যাত্রীরা যার যার বাম পাশের জানালা দিয়ে বাইরে উকি দিতে শুরু করল। কেলি ওব্রেইন বেশ খানিকটা ঝুঁকে এল নাথানের কাঁধের উপর । সে দেখল মেয়েটার ঠোট নড়ছে কিন্তু ব্লেডের শব্দে ও কানে হেডফোন থাকায় কিছুই বুঝতে পারল না। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই নাথানের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল তার। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিল সে। কিছুটা লাজুকতার হালকা লাল আভা ফুটে উঠেছে তার মুখে। রেডিওতে আবারও পাইলটের কণ্ঠ শোনা গেল।
‘সুন সবাই, ক্যাপ্টেন সব দেখেছেন, আমাদের এগিয়ে যেতে কোন সমস্যা নেই । ল্যান্ডিং-ফিল্ডটা আগুনের কাছেই একেবারে গরম বাতাসের মধে। ল্যান্ডিঙের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নিন সবাই, প্লিজ।”
সবাই নিজের জায়গায় ঠিকঠাক বসে যার যার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিল। কিছুক্ষনের মধ্যে হেলিকপ্টারগুলো গ্রামের উপর চক্রাকারে ঘুরতে লাগলো । প্রত্যেক পাইলট খুব সতর্কভাবে চালাতে থাকল পাছে পাখার তীব্র বাতাসের কারণ আগুন ল্যান্ডিং-ফিল্ডের দিকে না ধাবিত হয়। এখন পর্যন্ত আগুনের উৎস খুঁজে পেল না নাথান , কিন্তু কিছু মানুষকে দেখতে পেল যারা সারি করে দাঁড়িয়ে থেকে একজন আরেকজনের হতে পানিরপাত্র এগিয়ে দিচ্ছে। পানি তোলা হচ্ছে নদী থেকে । হেলিকপ্টারগুলো নামতে দেখেই তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ল আগুন নেভানোর কাজে।
হেলিকপ্টারগুলো আরো নিচে নামতেই সাদা রঙ করা চার্চটা চোখে পড়ল। আগুনের উৎস উপাসনালয়ের পাশেই। চার্চের ছাদের উপর একজন পানি দিয়ে ছাদ ভেজাতে ব্যস্ত।
হেলিকপ্টারের স্কিডগুলো ফিল্ডের মাটি স্পর্শ করতেই একটু ঝাঁকুনি খেল সবাই। ফ্রাঙ্ক সবাইকে দ্রুত নেমে পড়ার নির্দেশ দিল। কানে হেডফোন খুলে ফেলতেই তীব্র শব্দে নাথানের জ্ঞান হারানোর উপক্রম হল। কাঁধে লাগানো বেল্ট খুলে নিচে নেমে এল সে। কপ্টার থেকে একটু দূরে এসে চারপাশে চোখ বোলাল। মাঠের অন্যপ্রান্তে শেষ হেলিকপ্টারটি ল্যান্ড করা আছে। সারি করে কাটা আলগা মাটি দেখে বোঝা যাচ্ছে এই ল্যান্ডিং-ফিল্ডটা এক সময় গ্রামের ক্ষেত ছিল।
সমগ্র খোলা জায়গাটাজুড়ে রেঞ্জার্সরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে এর মধ্যেই, মাত্র কয়েক জন আছে হেলিকপ্টারের কাছে। তারা সব মালামাল নামাতে আর বাকি সবাই স্থানীয় লোকদের সাথে হাত লাগিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে এখন।
ধীরে ধীরে হেলিকপ্টারের পাখার গর্জন থেমে যেতেই মানুষজনের কথা আবার শোনা যেতে লাগল। কেউ চিৎকার করে কোন আদেশদিচ্ছে, আবার কারও কান্না ভেসে আসছে চার্চের ওপাশ থেকে, কখনও শোনা যাচ্ছে রেঞ্জার্সদের মালামাল নামানোর শব্দ। কেলি ও ফ্রাঙ্ক একসাথে নাথানের পাশে এসে দাঁড়াল।
“প্রথমে ঐ পাদ্রিকে খুঁজতে হবে যে এজেন্ট ক্লার্ককে সেবা করেছিল। তাকে দ্রুত জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে যাতে মূল কাজে সরাসরি নামতে পারি আমরা।”
ফ্রাঙ্ক সায় দিলে দু-জন পা বাড়াল চার্চের পেছনের দরজার দিকে। কে যেন পেছন থেকে নাথানের কাঁধে হাত রাখতেই সে ঘুরে দেখে প্রফেসর কাউয়ি।
“চলো, ওদের একটু সাহায্য করি,” বৃদ্ধ লোকটি বললো আগুনের দিকে ইঙ্গিত করে।
মাঠ অতিক্রম করে প্রফেসরের পেছন হাটতে হাটতে চার্চের চারপাশ ভাল করে দেখল নাথান । সে দেখল মানুষ চিৎকার চেঁচামেচি করছে, অনেকে পানির পাত্র নিয়ে ছোটাছুটি করছে, ধোয়া ছড়িয়ে পড়ছে সব দিকে, সাথে আগুনও।।
“হায় ঈশ্বর,” বলল সে।
শ’খানেক ছোট ছোট ঘরের ছোট গ্রামটির তিন-চতুর্থাংশই পুড়ছে আগুনে। একপাশে নদী অন্যপাশে চার্চ। আর মাঝখানে যেন সৃষ্টি হয়েছে একখণ্ড নরক। সে এবং প্রফেসর দ্রুত এগিয়ে গিয়ে পানি বহনকারীদের সাথে যোগ দিল। তাদের সাথে যারা কাজ করছে তাদের মধ্যে আছে কিছু বাদামি চামড়ার ইন্ডিয়ান, শ্বেতাঙ্গ মিশনারিজ আর ইউনিফর্ম পরা রেঞ্জার্স । প্রায় একঘণ্টা ঘাম ঝরানোর পরও সবকিছু একই রকম থাকল, কোন পরিবর্তন হলো না। কালি ও কাদায় একাকার হয়ে গেছে উদ্ধারকারীরা। নাথান পানির পাত্র নিয়ে দৌড়াতে লাগল আগুনের আশেপাশে। আগুনটাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য প্রাণপন চেষ্টা করে যাচ্ছে সে। সবাই তার সাথে একই গতিতে কাজ করতে থাকল। আগুনের সীমানার মধ্যে যত কুড়েঘর ছিল সবই পুড়ে যাচ্ছে চোখের পলকে। এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকে ধিকি ধিকি করে জ্বলছে আর ধোয়ার আন্ন করে রাখছে ধ্বংস হয়ে যাওয়া পুরো জায়গাটা। এমন সংকটের মধ্যে নাথান আবিষ্কার করল প্রফেসর কাউয়ি তার পাশে নেই। সেখানে জায়গা করে নিয়েছে লম্বা গড়ন আর চওড়া কাঁধের এক ব্রাজিলিয়ান। তাকে দেখে মনে হল সে কাদছে। নাথান খেয়াল করল তার ঠোটও নড়ছে, কিছু বলছে সে স্প্যানিশ ভাষায় যেটা শুনে মনে হল কোন প্রার্থনা, নাথান ধারনা করল লোকটা মিশনারির হবে। “আমি দুঃখিত, স্প্যানিশ ভাষায় বলল নাথান জামা-কাপড় আর নাকে-মুখে লেগে থাকা ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করতে করতে । “কেউ মারা গেছে?”
“পাঁচজন, সবাই শিশু,” কণ্ঠ যেন আরেকটু ভেঙে পড়ল তার। কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশি আক্রান্ত হয়েছে ধোয়ায়।”
“কি হয়েছিল এখানে?”
মিশনারির লোকটি রুমাল দিয়ে মুখের কালি মুছল টা…এটা আমারই ভুল ছিল । আমার বোঝা উচিত ছিল।” সে তার কাঁধের উপর দিয়ে এক নজর চার্চটাকে দেখল । একটা পাশ ছাই এবং ধোয়ার আচ্ছাদিত হলেও চাৰ্চটা অক্ষতই দাঁড়িয়ে আছে। চোখ জোড়া আবারও বন্ধ করল সে। কঁধিজোড়া কেপে উঠল। কিছুটা সময় লাগল তার পুণরায় কথা বলতে। “লোকটার লাশ মানাউসে পাঠানোর সিদ্ধান্তটা আমারই ছিল।”
নাখান সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারল সে কার সাথে কথা বলছে। “পাদ্রি বাতিস্তা?” ইনিই মিশনারি সেই প্রধান ব্যক্তি যিনি জেরান্ড ক্লার্ককে শেষ সময়ে সেবা দিয়েছিলেন।
দীর্ঘকায় ব্রাজিলিয়ান মাথা নাড়ল। “ঈশ্বর আমায় ক্ষমা করুন।”
গার্সিয়া লুই বাতিস্তাকে সঙ্গে নিয়ে হাটতে শুরু করল নাথান। প্রথমে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া জায়গাটি পার হয়ে প্রাণবন্ত সবুজ মাঠের ভেতর নিয়ে এল । তাদের গন্তব্য চার্চ। এই অল্প সময়ের মধ্যে নিজের পরিচয় দিল নাথান । তারপর চার্চের কাছে আসতেই কালি ও ঘামে একাকার হয়ে যাওয়া এক রেঞ্জারকে নির্দেশ দিল ওব্রেইনদেরকে চার্চে পাঠিয়ে দেবার জন্য।
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে রেঞ্জারটা চলে গেল।
পাদ্রিকে নিয়ে কাঠের সিঁড়ি-ভেঙে উপরে উঠে দুটো দরজা অতিক্রম করে ভেতরে ঢুকল নাথান। চার্চের ভেতরটা অন্ধকার এবং ঠাণ্ডা। বার্নিশ করা কাঠের বেঞ্চগুলো দুপাশে সারি করে রাখা। মাঝখানের রাস্তাটা সোজা বেদীতে গিয়ে শেষ হয়েছে। মেহগনির বিশাল এক জুশিফিক্স বেদীর ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে। পুরো ঘরটা খালিই বলা চলে। কিছু ইন্ডিয়ান ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হয়ে শুয়ে আছে এদিক-ওদিক। কয়েকজন বেঞ্চে, কয়েকজন মেঝেতে নাথান তাদের একেবারে সামনে নিয়ে গিয়ে প্রথম বেঞ্চটায় বসালো। লোকটা শরীরের সব ভর ছেড়ে দিয়ে বসেই তার চোখ দুটো স্থির করল জিশুর বিশাল ক্রুশের উপর। “সব আমার ভুল,” মাথা নিচু করে হাত দুটো প্রার্থনার ভঙ্গিতে নিয়ে এল সে।
নাথান নিজেকে শান্ত রাখল, লোকটাকে একান্ত কিছু সময় দেয়া উচিত । হঠাৎ চার্চের দরজা খুলে গেলে সে দেখল ফ্রাঙ্ক আর কেলি আসছে। প্রফেসর কাউয়িও আছে তাদের সাথে । ওদের সবার আপাদমস্তকজুড়ে ছাই আর কালি। নাথান হাত ইশারা করে বসতে বললো সবাইকে।
ওদের আসার শব্দে পাদ্রি বাতিস্তার মনোযোগে ছেদ পড়ল। নাথান সবার সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দিল প্রথমে, তারপর বসে পড়ল তার পাশেই।
“কি ঘটেছিল আমাকে বলুন, আগুন লাগল কিভাবে?”
গার্সিয়া সবার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে রাখল। “এটা একেবারেই আমার নিজের অদূরদর্শিতার ফলাফল।”
কেলি বসে পড়ল লোকটার অপরপাশে। “আপনি ঠিক কি বলতে চাচ্ছে?”
মুহূর্তকাল পরে মুখ খুলল পাদ্রি। “ঐ রাতে মানুষটা বন থেকে এখানে চলে এলে আমি তাকে মিশনারিতে ঠাঁই দেই ।গ্রামের এক ইয়ানোমামো শামন আমাকে তীব্র ভসনা আর তিরস্কার করেছিল লোকটাকে মিশনারিতে আনার জন্য সে আমাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিল যেন তার মৃতদেহটা পুড়িয়ে ফেলা হয়।
নাথানের দিকে তাকাল পাদ্রি, “কিন্তু আমার পক্ষে সেটা কিভাবে করা সম্ভব, বলুন নিশ্চিতভাবেই তার কোন পরিবার থাকবে, এমন কি হতে পারে সে একজন খৃস্টান।
নাথান হাত নাড়ল। “অবশ্যই।”
“কি ইন্ডিয়ানটার ঐ অন্ধবিশ্বাসকে কুসংস্কার ভেবে উড়িয়ে দেয়া উচিত হয় নি আমার । ইন্ডিয়ানরা ক্যাথলিকে রুপান্তরিত হওয়ার কারণে ওদের ওপর আমি অনেক আস্থা রেখেছিলাম। এমনকি ওদের ব্যাপ্টাইজও করা হয়েছিল।”
কথাটা বুঝতে পারল নাথান। “আপনি তো কিছু ভুল করেন নি। কিছু বিশ্বাস এতটাই দৃঢ়ভাবে স্থাপিত হয়ে যায় মনের ভেতর যে ব্যাপ্টিজমেও তা ধুয়েমুছে যায় না।
একটু ঝুঁকে পড়ল পাদ্রি। “প্রথম প্রথম সব ঠিক আছে বলেই মনে হচ্ছিল। তার মৃতদেহটা না পোড়ানোর সিদ্ধান্তে শামান তখনও আমার প্রতি ক্ষুব্ধ থাকলেও শেষ পর্যন্ত সে এই শর্তে রাজি হয়েছিল, মৃতদেহটা অন্তত গ্রাম থেকে সরিয়ে ফেলা হবে। এতে সে কিছুটা শান্ত হয়েছিল বটে।”
“তাহলে ঝামেলাটা করল কিসে?” কেলি জিজ্ঞেস করল ।
“সপ্তাহখানেক পর দু-জন শিশু জ্বরে আক্রান্ত হয়। এটা অবশ্য নতুন কিছু না। এই ধরনের ছোটখাট রোগ হরহামেশাই দেখা যায় এখানে। কিন্তু সেই শামান ঘোষণা দিল এই রোগ-ব্যাধি হল সেই অভিশাপের লক্ষন যে অভিশাপ মৃত মানুষটাকে দেয়া হয়েছিল।”
মাথা ঝাকাল নাথান, সে তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই জানে বেশিরভাগ ইন্ডিয়ান গোত্রের মাঝে এটা প্রচলিত। এখানে কারো কোন অসুস্থতাকে কোনরকম আঘাত বা রোগের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না শুধুমাত্র, সাথে এটাও ধরা হয় যে, এই রোগের পেছনে অন্য গ্রামের শামানরাও দায়ি, যারা কোনরকম খারাপ মন্ত্র জপ করে পাঠিয়ে দিয়েছে তাদের উদ্দেশ্যে। আর এসব কাজকে তারা পুঁজি করে বাধিয়ে দেয় যুদ্ধ। যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। তাকে সারানোর মতো কোন কিছুই করার ছিল না আমার। কয়েক দিনের মধ্যেই আরও তিনজন শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ল। তাদের মধ্যে একজন ছিল ইয়ামোমামো শাবানো গোত্রর। পুরো গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। ভয়ে সবাই গ্রাম ছাড়া শুরু করল একেবারে তল্পিতল্পাসহ। প্রতিরাতে ঢোলের বাজনা ও মন্ত্র আওড়ানোর শব্দ শোনা যেত দূর থেকেও,” চোখ বন্ধ করল গার্সিয়া। “আমি মেডিকেল অ্যাসিসটেন্স চেয়ে পাঠালাম রেডিওর মাধ্যমে । কিন্তু চারদিন পর এক ডাক্তার যখন এখানে পৌছাল, একজন ইন্ডিয়ানও তাকে তাদের সন্তানদের পরীক্ষা করতে দিল না। কারণ সেই শামান ততক্ষণে শিশুগুলোর বাবা-মাকে কব্জা করে নিয়েছিল। তাদের কাছে আকুতি জানালাম আমি কিন্তু তারা কোন ধরনের চিকিৎসা নিতে অসম্মতি জানাল। বরং তারা তাদের ছোট বাচ্চাগুলোর চিকিৎসার দায়িত্ব সেই শামানের হাতেই তুলে দিল।”
একথা শুনে নাথানের ক্রোধ বেরিয়ে আসতে চাইল । প্রফেসরের দিকে তাকাল সে, বেচারা একটু মাথা নাড়ল কেবল, বোঝাতে চাইল নাথানের চুপ আঁকা উচিত।
বলে চলল পাদ্রি। “গত রাতে ঐ শিশুগুলোর ভেতর থেকে মারা যায় একজন । হাহাকার পড়ে যায় সারা গ্রাম। নিজের ব্যার্থতা ঢাকতে শামান ঘোষণা দিল, পুরো গ্রামেই অভিশাপ লেগেছে, সে সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে গ্রাম ছাড়ার কথা বলল। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলাম পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য কিন্তু শামান তো সবাইকেই বশে এনে ফেলেছে। সূর্য ওঠার আগেই সে ও তার সহযোগীরা মিলে আগুন ধরিয়ে দেয় তাদের নিজেদের ঘরেই । তারপর পালিয়ে যায় জঙ্গলে।” শব্দ করে কাঁদতে শুরু করল গার্সিয়া এবার। রাক্ষসটা…অসুস্থ বাচ্চাগুলোকে ঘরেই ফেলে যায়। জীবন্ত পুরিয়ে মেরেছে সবাইকে।”
পাদ্রি তার মুখ ঢেকে ফেললো হাত দিয়ে । “খুব সামন্য যে কয়জন গ্রামে ছিল সবাই মিলে আমরা আগুনের পেছনে লাগলাম কিন্তু আগুন ছড়িয়ে পড়ছিল দ্রুত গতিতে। কুড়ে ঘরগুলো ছাই হতে থাকল একের পর এক । আপনারা সবাই এসে যদি হাত না বাড়াতেন। সবকিছুই হারাতাম আমরা। আমার চার্চ, আমার ঘর ।” নাথান একটা হাত রাখল লোকটার কাঁধে। “এতটা ভেঙে পড়বেন না, আমরা তো আছি। সব নতুন করে শুরু করতে সাহায্য করব আমরা।” কথাটা বলেই সে কেলির ভায়ের দিকে তাকাল প্রতিশ্রুতি রক্ষার নিশ্চয়তা পাবার জন্য।
একটু কেশে নিল ফ্রাঙ্ক । “অবশ্যই। বেশ কয়েকজন গবেষক ও রেঞ্জার্সের বড় একটি দল এখানে আসছে খুব শীঘ্রই, আমরা জঙ্গলের দিকে রওনা দেবার ঠিক পর পরই। তারা এখানে থাকবে বেশ কিছুদিন। আর আমি নিশ্চিত এখানে অতিথি হিসেবে থাকাকালীন সময়ে তারা অন্য যে-কারো থেকে অনেক বেশি আন্তরিক হবে, যা যা করা দরকার সবই করবে তারা। আবার সোজা হয়ে দাড়াতে আমার মনে হয় খুব বেশি সময় লাগবে না আপনাদের।”
লোকটার কথাগুলো পাদ্রির ভেতরে শক্তি সঞ্চয় করল যেন। ঈশ্বর আপনাদের মঙ্গল করুক,”হাতের রুমালটা দিয়ে চোখ ও নাক মুছল সে। “আমরা যতটুকু পারি তার সবটাই করব,” কেলিও আশ্বস্ত করল তাকে, “কিন্তু পাদ্রি, সময় আমাদের কাছেও মূল্যবান। আমরা খুব তাড়াতাড়িই ক্লার্কের ব্যবহৃত পথটা খোজা শুরু করতে চাই। আর সেটা শীত আসার আগেই।
“নিশ্চয়, নিশ্চয়…” ক্লান্ত গলায় কথাটা বলে উঠে দাঁড়াল গার্সিয়া। “আমি যা জানি সবই বলব আপনাদের। কথাবার্তা খুব সংক্ষিপ্তই হল। সরু রাস্তা ধরে চার্চের কমনরুমে যেতে যেতেই সব বর্ণনা করে ফেলল সে। চার্চের ডাইনিং রুমটাকে এরইমধ্যেই এক অস্থায়ী হাসপাতাল বানিয়ে ফেলা হয়েছে তীব্র ধোয়ায় আক্রান্তদের জন্য। কিন্তু বড় রকমের আক্রান্ত কাউকে চোখে পড়ল না সেখানে।
গার্সিয়া জানাল ক্লার্কের সাথে আরও কেউ ছিল কিনা সেটা খতিয়ে দেখতে কয়েকজন ইন্ডিয়ানকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে রাজি করিয়েছিলো সে। তারা পথ অনুসরণ করে দেখে ওটা শেষ হয়েছে হরুরা নদীর এক শাখায় গিয়ে । তবে সেখানে কোন নৌকা পাওয়া যায় নি। পথটা মনে হয়েছে নদীর পাড় ঘেষেই চলে গেছে পশ্চিমে, আমাজন রেইনফরেস্টের সবচেয়ে দূরের অঞ্চলে। ইন্ডিয়ান ট্র্যাকাররা আর সমনে এগোতে চায় নি ভয়ে। কমন রুমের জানালা দিয়ে চার্চের পেছনে বাগানের দিকে তাকাল কেলি। “ঐ নদী পর্যন্ত কেউ আমাদের নিয়ে যেতে পারবে?”
মাথা ঝাঁকাল গার্সিয়া । হাত-মুখ ধুয়েছে তাকে দেখ মনে হচ্ছে কিছুটা ধাতস্থ এখন। প্রাথমিক ধাক্কা কেটে যেতেই তার কষ্ঠ ও আচরনে ফুটে উঠল সহজাত গাম্ভীর্য। “আমার সহকারী হেনাউইকে দিয়ে দিচ্ছি আপনাদের সাথে। ছোটখাট এক ইন্ডিয়ানকে দেখিয়ে দিল সে।
নাথান বেশ অবাক হল ইয়ামোমামো গোত্রের একজন মানুষকে দেখে।
“তার গোত্রের মধ্যে সে-ই শুধু এখানে পড়ে আছে, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল গার্সিয়া। “প্রভু যিশুর ভালবাসা অন্তত এই একজনকে রক্ষা করেছে।”
পাদ্রি তার সহকারীকে ইশারা করে কাছে ডেকে নিয়ে ইয়ানোমামো ভাষায় কথা বলতে লাগল খুব দ্রুত।
নাথান বেশ বিস্মিত হল আঞ্চলিক ভাষার উপর পাদ্রির অসামান্য দখল দেখে। সব বুঝতে পেরেছে এবং সম্মতি আছে এমনভাবে মাথা নাড়তে থাকল হোনাউয়ি। কিন্তু তার চোখে ভীতিকর দিকটা বেশ স্পষ্টই দেখতে পারছে নাথান। প্রভু জিশুর ভালবাসা তাকে বাঁচিয়ে রাখুক আর নাই রাখুক লোকটা এখনও গভীর কুসংস্কারের মাঝেই আছন্ন।
নাথানের দল চার্চের বাইরে চলে এলে গুমোট গরম তাদেরকে চেপে ধরল ভেজা উলের কম্বলের মত । সবাই হেলিকপ্টারের কাছে পৌছাতেই দেখতে পেল রেঞ্জাররা সবাই ব্যস্ত। জিনিসপত্রে ঠাসা একসারি কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ পড়ে আছে মাটিতে। প্রতিটা ব্যাগের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে একজন রেঞ্জার ।
ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান সবাইকে দিক নির্দেশনা দিছে। “যেকোন সময় যাত্রা করতে আমরা প্রস্তুত। চল্লিশোর্ধ ওয়াক্সম্যান একজন পুরোদস্তুর মিলিটারি । কঠিন মুখ, চওড়া কাধ। তার ফিল্ড ইউনিফর্মটার কয়েক জায়গায় ভাঁজ পড়েছে। মাথার উপর খোঁচাখোচা বাদামী চুল।
“আমরা প্রস্তুত,”ফ্রাঙ্ক বললো। “একজনকে পেয়েছি যে আমাদেরকে সঠিক ট্রেইলটা দেখাতে পারবে। সে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে ছোটখাট ইন্ডিয়ানটাকে দেখাল।
ক্যাপ্টেনও সায় দিয়ে সাই করে ঘুরে দাঁড়াল। “মালপত্র তোলো!” রেঞ্জারদের উদ্দেশ্যে বলল সে।
কেলি অন্য একটি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছে, যে দলের একেকটা ব্যাগ আকৃতিতে রেঞ্জার্সদের ব্যাগের অর্ধেক হবে। ঐ দলে এই অভিযানের সর্বশেষ সদস্যদেরকে দেখতে পেল নাথান। আনা ফঙ গভীর আলোচনায় মগ্ন রিচার্ড জেনের সাথে এ উভয়েই খাকি আউটফিট পরা যেগুলোর কাঁধে টেলাক্সের লোগো জ্বলজ্বল করছে। তাদের পাশেই দাঁড়ান আছে অলিন পাস্তারনায়েক। ধূসর রঙের পরিস্কার ওভারল পরে ফিটফাট দাড়িয়ে আছে সে, পায়ে কালো বুট । সে নিচু হল তার পায়ের কাছে রাখা সবচেয়ে বড় ব্যাগটা তোলার জন্য। নাথান জানে তার ব্যাগে যোগাযোগ করার জন্য সালোইট কমিউনিকেশন ডিভাইস
আছে।
ভঙ্গুর জিনিসপত্রে ভরা তার ব্যাগটা সে তুলছে ঠিকই কিন্তু তার মনোযোগ অন্যদিকে। এই অভিযানের সর্বশেষে ও সবচেয়ে দূরের সদস্যদের দিকে। নাথান হাসল। সাও-গ্যাব্রিয়েল ছাড়ার পর ম্যানুয়েলকে দেখেছিল সে। এই ব্রাজিলিয়ান বায়োলজিস্টকে অন্য একটা কপ্টারে তোলা হয়েছে। এর কারণটাও পরিস্কার। নাথানের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল ম্যানুয়েল। তার একহাতে একটা চাবুক ধরা, অন্য হাতে চামড়ার দড়ি।
“তো ফ্লাইটটা কেমন লাগল টর-টরের?” জিজ্ঞেস করল নাথান।
হাতের চাবুকটা দিয়ে মৃদু আঘাত করল ম্যানুয়েল দুশ পাউন্ডের জাগুয়ারটাকে। “একেবারে বিড়াল ছানার মত, মর্ডান কেমিস্ট্রি ওটাকে দমিয়ে রেখেছিল সামান্য।”
নাথান দেখল স্নায়ুচাপ দূর করা ট্রাংকুলাইজারের প্রভাবে এখনো কিছুটা টালমাটাল অবস্থায় নড়াচড়া করেছে জাগুয়ারটা। নাথানের দিকে কিছুটা ঝুঁকে এসে তার প্যান্টের গন্ধ শুকতে লাগল ওটা। টর-টরকে দেখে মনে হল নাথানকে যেন চিনতে পেরেছে। একটু দুলতে দুলতে নাক দিয়ে নাথানের পা ঠেলা দিতে থাকল মৃদুভাবে। নাথান নিচু হয়ে এক হাটুর উপর ভর করে বসল । হাত বাড়িয়ে গলায় একটু আদরমাখা হাত বুলিয়ে দিতেই কেমন একটু আহ্লাদ ফুটে উঠল জাগুয়ারটার আচরণে।
“হায় ঈশ্বর, সে তো বেশ বড় হয়ে গেছে, অনেক দিন আগে যেমনটি দেখেছিলাম তেমন আর নেই।”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অলিন পাস্তারনায়েক জাগুয়ারের দিকে তাকিয়ে ভ্রুকুটি করে বিড়বিড় করে কী যেন বলতে বলতে চলে গেল। তাদের দলের নতুন এই সংযুক্তিতে সে যে বেশ বিরক্ত স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। নাথান সোজা হয়ে দাঁড়াল। টরটরকে দলে ভেড়ানোর কাজটা বেশ কঠিন ছিল কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অটল ম্যানুয়েল সবাইকে রাজি করিয়েছে অবশেষে। পূর্ণ যৌবনে পা দিতে বেশি বাকি নেই টর-টৱের। সেজন্য জঙ্গলে আরও বেশি পরিমাণে ভ্রমন করা প্রয়োজন ওটার। এই অভিযান তার অনেক উপকারে আসবে। পাশাপাশি ম্যানুয়েলের সূচারু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত টর-টর নিরাপত্তা ও অনুসন্ধান উভয়রকম কাজেই লাগতে পারে। নাথানও তার নিজের সমর্থন নিয়ে এগিয়ে এসেছিল । তাদের দলটার যদি কোনও রকম সাহায্যের প্রয়োজন হয় কোনও ইন্ডিয়ানদের কাছ থেকে তবে টর-টরের উপস্থিতি সেই কাজকে আরও সহজ করে দেবে। সব ইন্ডিয়ানই জাগুয়ারকে গভীর শ্রদ্ধা করে। তাই এমন একটা প্রাণীর উপস্থিতি তাদের অভিযানকে আরও বাড়তি সুবিধা দিতে পারবে।
প্রথমে রাজি হয় আনা ফঙ। তারপর ধীরে ধীরে ফ্রাঙ্ক এবং ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান নমনীয় হলে টর-টর এই অভিযানে অংশ নেয়ার অনুমতি পেয়ে যায়। নিরাপদ দূরত্ব থেকে জাগুয়ারটাকে দেখছে কেলি । মাথা নেড়ে সায় দিয়ে নাথান তার ছোট প্যাকটা তুলে নিল। ওটার ভেতর প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস আছে শুধু। দড়ির একটা বিছানা, মশারি, কিছু শুকনো খাবার, জামা-কাপড়, ধারালো দা, পানির বোতল এবং ফিল্টার পাম্প। এসব দিয়েই মাসের পর মাস জঙ্গলে কাটাতে পারে সে । জঙ্গলে প্রচুর পরিমাণ খাবার বিভিন্ন রকম ফল আর আঙ্গুর থেকে শুরু করে নানা প্রকারের গাছেরশাসসবখানেই পাওয়া যায়, পাশাপাশি খাওয়া যায় এমন গাছ-পাতা আর অসংখ্য পরিমাণে বিভিন্ন রকম পশু-পাখি আর মাছ তো আছেই। তাই কষ্ট করে বাড়তি খাবার বয়ে-নেয়ার কোন মানেই হয় না। এসব ছাড়াও আরো একটা জিনিস নাথানের সাথে আছে তার শর্ট-ব্যারেল শটগান। এটা সে ঝুলিয়ে নিয়েছে তার কাঁধে। তাদের টিমটা যদিও ভারি অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত রেঞ্জার্স সদস্যে তবুও নিজের আগ্নে়াস্ত্রটা সাথে রাখাতেই স্বস্তি বোধ করে নাথান।
এবার যাত্রা শুরু করা যাক। পুরো সকাল ব্যয় হল আগুন নেভাতে গিয়ে। হালকা পাতলা মহিলা নিজের ভারি ব্যাগটি কাঁধে ঝোলাল। নাথান মেয়েটার লম্বা পা দুটোর দিকে
তাকিয়ে না থেকে পারল না। সে কষ্ট করে তার দৃষ্টি উপর দিকে নিবিষ্ট করল। নাথান দেখল মেয়েটার ব্যাগে রেড ক্রশের বড় একটা চিহ্ন, যেটা জানান দিচ্ছে এই টিমের জরুরি ঔষধ সরবরাহের কথা । ফ্রাঙ্ক নিজের দল ছেড়ে সিভিলিয়ানদের দলে চলে এল সব কিছু ঠিকঠাক আছে কিনা দেখতে। সে নাথানের কাছে এসে পেছনের পকেট থেকে রঙ জ্বলে যাওয়া বেসবল ক্যাপ বের করে যথাস্থানে বসিয়ে দিল।
নাথান ক্যাপটা চিনতে পারল। ঠিক এই রকম, কিংবা এটাই সে দেখেছিল সাওগ্যাব্রিয়েলে যখন তাকে প্রথম দেখে । “সমর্থক নাকি?” জিজ্ঞেস করল নাখান। বোন্টন রেড সক্স ক্লাবের লোগোটি দেখিয়ে ।
“হুম, সেইসাথে সৌভাগ্যের চিহ্নও বটে,” মাথা নেড়ে যোগ করল ফ্রাঙ্ক । তারপর তার দলটির দিকে ঘুরে দাঁড়াল। “ও-কে, এবার যাওয়া যাক।”
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে দলটি জঙ্গলের ভেতর ঢুকে গেল। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে ছোটখাট গড়নের সরু চোখা এক ইন্ডিয়ান।
কেলি এর আগে কোন দিন জঙ্গলে ঢোকে নি তবে প্রস্তুতি হিসেবে বেশ কিছু বই আর প্রবন্ধ পড়ে নিয়েছে। কিন্তু রেইনফরেস্টের প্রকৃত চেহারা সে যেমনটা দেখছে তেমনটা আশা করে নি মোটেই। চারজন রেঞ্জার সামনে নিয়ে কেলি যতই হাটছে ততই বিস্মিত হচ্ছে। তার দেখা বন-জঙ্গলের উপর নির্মিত মুভিগুলোর সাথে কোন মিল দেখছে না। না আছে কোন ঝোপ-ঝাড়, লতা-পাতা, না আছে এলোমেলোভাবে বেয়ে ওঠা কোন গাছগাছড়া। উপরন্তু মনে হচ্ছে তারা যেন কোন সবুজ ক্যাথেড্রালের ভেতর দিয়ে হাটছে। মাথার উপর সবুজের পুরু ছাউনি শত সহস্র ডাল-পালার উপর ভর করে ছাড়িয়ে গেছে সবদিকে; শুষে নিচ্ছে সূর্য থেকে আসা প্রায় সটুকু আলো; নিচে ছড়াচ্ছে সবুজাভ আভা। কেলি পড়েছিল, সূর্য থেকে আসা আলোর দশ শতাংশেরও কম পরিমাণ আলো এই সবুজের ছাউনি ভেদ করে নিচে আসতে পারে। এ-কারণে জঙ্গলের নিম্নাংশ, যেখান দিয়ে তারা হাটছে, অবিশ্বাস্য রকমের পরিস্কার, কোন গাছপালা নেই। এখানকার জঙ্গলে রাজত্ব করে চলেছে কীট-পতঙ্গ, ছত্রাক আর জালের মত বিছানো শেকড় ঝোপ-ঝাড় না থাকলেও রাস্তাবিহীন এই জঙ্গলে হাটা-চলা মোটেও সহজ হচ্ছে না। গাছের পঁচে যাওয়া বাকল আর ডাল-পালা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সর্বত্র, যেগুলো ঢেকে আছে হলদে ছত্রাক আর সাদা মাশরুমে কেলির জুতোর নিচে পঁচে যাওয়া পাতার পুরু আস্তরণ জমে গেছে, হাটতে কষ্ট হচ্ছে তার। পাতার পুরু আস্তরণের নিচে জালের মত ছড়ানো বিশাল গাছের শেকড়গুলোও বিপদের কারণ হতে পারে, যেকোন সময় মচকে যেতে তার পা। নিচের অংশে ঝোপঝাড় খুবই সামান্য পরিমাণে হলেও একেবারেই যে কিছুর অস্তিত্ব নেই তা নয়। পাখার মত দেখতে এক রকম ফার্ন, কাঁটাযুক্ত ব্রোমেলিডা, সুন্দর-সুন্দর অর্কিড, চিকন পামগাছ সজ্জিত করে রেখেছে জঙ্গলের মেঝেটাকে। আর প্রায় সব গাছেই লিয়ানা নামের লতানো এক প্রকার আঙ্গুর গাছ পেঁচিয়ে রয়েছে সাপের মত হঠাৎ একটা চড়ের শব্দ তার চিন্তাকে অন্যদিকে নিয়ে গেল ।
“শালার মাছি!”
সে দেখল তার ভাই ঘাড়ে হাত ডলছে। তারপর একরকম মলম বের করে তার শরীরের যেসব অংশ ঢাকা নেই সেসব জায়গায় মেখে নিচ্ছে। নাথান কেলির পাশ দিয়ে হেটে এগিয়ে গেল। তার মাথায় অস্ট্রেলিয়ান বুশহ্যাট। তাকে দেখতে অর্ধেক ইন্ডিয়ানা জোন্স ও অর্ধেক ক্রোকোডাইল ডানডির নায়কের মত লাগছে। তার নীল চোখ জোড়া জঙ্গলের এই আবছায়া পরিবেশে আনদের দুতি ছড়াচ্ছে যেন।
“এই বিরক্তিকর জিনিসের পেছনে আপনি শুধু শুধু সময় নষ্ট করছেন,” সে বললে ফ্রাঙ্ককে। “যা কিছুই লাগান না কেন আপনার শরীরের ঘামে ত মিনিটখানেকের ভেতরেই ধুয়ে যাবে।” কেলি এই পনের মিনিটের ভ্রমনেই ঘেমে একাকার। সবুজ-সমুদ্রে বাতাসের আদ্রতা প্রায় একশ ভাগের কাছাকাছি। তাহলে এই পোকা-মাকড়ের হাত থেকে বাঁচার সমাধান কি?” বাঁকা হাসি দিয়ে কাঁধ তুলল নাথান। “আত্মসমর্পন করুন। এরা এমনই যে এদের সাথে যুদ্ধ করে পারবেন না আপনি। খাও অথবা খাবার হও—এমন জগতে টিকে থাকতে হলে মাঝেমাঝে আপনাকে কিছুটা মূল্য দিতেই হবে।”
“তাই বলে আমার নিজের রক্ত দিয়ে? বিস্মিত ফ্রাঙ্ক।
“এ নিয়ে আফসোস করবেন না। এটা বেশ সস্তা মূল্যই বলা চলে। এর থেকেও আরও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর পোকা-মাকড় আছে এখানে। যদিও বড় কোনকিছুর কথা বলতে চাচ্ছি না, যেমন পাখি ধরে খাওয়া মাকড় অথবা ফুটখানেক লম্বা বিছু। এগুলোর চেয়ে অনেক ছোট জাতের কাছেই আপনি ধরাশায়ী হতে পারেন। হ্যাসাসিন বাগের নাম শুনেছেন?”
“না, শুনি নি বোধহয়,”ফ্রাঙ্ক বললো। কেলিও কাঁধ ঝললো। সেও শোনে নি।
“এই ছোট্ট পতঙ্গটার বিচ্ছিরি এক অভ্যেস আছে। এটা যখন কাউকে কামড়ায় তখন একই সাথে সে-জায়গায় মলত্যাগ করে। পরে যখন ক্ষতস্থানটি ভিক্টিম চুলকায় সে নিজের অজান্তেই ফেলে যাওয়া বর্জ্য তার নিজের রক্তের সাথে মিশিয়ে দেয়। ঐ বর্জে পূর্ণমাত্রায় প্রোটোজোয়া ট্রাইপ্যানোজোম থাকে। এরফলে কামড়ানোর পর এক থেকে বিশ বছরের ভেতর যেকোন সময় মস্তিষ্ক অথবা হৃৎপিণ্ড অকেজো হয়ে ভিক্টিমের মৃত্যু হবে।”
এটা শুনে ফ্রাঙ্কের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, সেইসাথে থামিয়ে দিল চুলকানো। ‘আরো আছে। এখানে একরকম কালো মাছি উড়ে বেড়ায় যেগুলো আপনার শরীরে এমন জীবাণু ঢুকিয়ে দেবে যা আক্রান্ত করবে আপনার চোখকে, ফলে রিভার ব্লাইন্ডনেস নামের চোখের একটি মারাত্মক রোগ আপনাকে পেয়ে বসবে। তারপর স্যান্ড-ফ্লাই নামের আরেক প্রজাতির মাছি আছে যা আপনার শরীরে লিশমানাইসিস প্রবেশ করিয়ে দেবে। এরফলে ত্বক এবং স্নায়ূ দীর্ঘ মেয়াদীভাবে আক্রান্ত হবে।”
কেলি তার ভাইকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলা বোটানিস্টের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“এখানকার সংক্রামক ব্যাধি সম্পর্কে ভাল করেই জানি আমি। ইয়েলো ফিভার, ডে ফিভার, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড,” কাঁধে ঝোলানো মেডিকেল ব্যাগটা উঁচু করে ধরল সে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিও মেকাবেলা করতে প্রস্তুত আমি।”
“ক্যানডিরু ঠেকাতেও প্রস্তুত আপনি?” ভ্রু কুঁচকে গেল কেলির ।
“এটা আবার কি ধরনের রোগ?”
“এটা কোন রোগ নয়। এখানকার পানিতে হরহামেশা পাওয়া যায় একরকম মাছ। কেউ কেউ বলে টুথপিক ফিশ। মাছটা চিকন আর ছোট। বড়জোড় দুই ইঞ্চি লম্বা হবে । বাস করে বড়বড় মাছের শ্বাসতন্ত্রের নিচে পরজিবী হিসেবে। এটার বিচ্ছিরি এক অভ্যেস আছে। সুযোগ পেলে ওটা পুরুষাঙ্গের ভেতর দিয়ে মূত্রথলিতে পৌছে ওখানেই আস্তানা গাড়ে।”
“আস্তানা গাড়ে? ওখানে?” চোখমুখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল ফ্রাঙ্ক।
“কিছুক্ষণের মধ্যেই ওটার শ্বাসতন্ত্রের নিচের সুক্ষ কাঁটাওয়ালা শুড়গুলো চারপাশে ছড়িয়ে নিজেকে ওখানে আটকে ফেলে। এতে মূত্রথলির মূত্র নিসঃরণের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। আক্রান্ত ব্যক্তি তীব্র যন্ত্রণায় ভুগে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই মারা যায়।”
“এমনটা হলে চিকিৎসা কি?” এতক্ষনে কেলির মনে পড়ল এই মাছ ও তাদের বিদঘুটে অভ্যেসের কথা। সে এটা কোথাও পড়েছে। ভাইয়ের দিকে ফিরে আসল ব্যাপারটা খুলে বললো এবার। “এই সমস্যার একমাত্র সমাধান হল আক্রান্ত ব্যক্তির লিঙ্গ কেটে ফেলে মাছটা বের করে ফেলা।”
ভয়ে শিউরে উঠল ফ্রাঙ্ক। “লিঙ্গটা কেটেই ফেলতে হবে?”
কাঁধ তুলল নাথান “জঙ্গলে স্বাগতম।”
কেলি রেগে ভ্রু কুঁচকে নাথানের দিকে তাকাল। লোকটা ইচ্ছে করে তাদেরকে ভয় দেখাতে চাইছে। কিন্তু তার দাঁত বের করা হাসি দেখে সে বুঝতে পারল, এগুলো সত্যি হলেও লোকটা সবাইকে মজা দেবার জন্যই বলেছে।
“তারপর আসা যাক এখানকার সাপ-খোপের বিষয়ে,” বলে চলল নাথান।
“আমার মনে হয় যথেষ্ট হয়েছে, প্রফেসর কাউয়ি পেছন থেকে বলল। ওব্রেইন ভাই-বোনদেরকে নাথানের পরবর্তী লেকচারের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিতে চাইল সে। নাথান যেরকম মারাত্মকভাবে জঙ্গলটাকে তুলে ধরেছে তাতে এটার প্রতি ভয় জাগারই কথা, তবে এটাও মনে রাখা দরকার, এটা শুধুমাত্র ভীতিকর জায়গা নয়। সীমাহীন সৌন্দর্যও আছে এখানে। যে সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে বিপদের খোলসে। এই জঙ্গল একদিকে যেমন অসুস্থ করে দিতে পারে তেমনি সরিয়ে তোলার ক্ষমতাও আছে এর।”
“আর এ-কারণেই আমরা আজ এখানে,” পেছন থেকে অন্য একটি কষ্ঠের উদয় হল। ঘুরে দাঁড়াল কেলি। কথাটা বলেছে রিচার্ড জেন। কেলি লোকটার কাঁধের উপর দিয়ে দেখতে পেল আনা ফণ্ড এবং অলিন পাস্তারনায়েক গভীর আলোচনায় মগ্ন। তাদের থেকে খানিক দূরে ম্যানুয়েল অ্যাজভেদো রেঞ্জারদের পাশে তার জাগুয়ারটাকে শান্ত রাখতে ব্যস্ত।
সে ঘুরে নাখনের দিকে তাকাতেই দেখল তার মুখ থেকে হাসি উধাও, সেখানে ভর করেছে কাঠিন্য। এর কারণ টেলাক্স প্রতিনিধির অনাহুতভাবে তাদের কথায় ঢুকে পড়া।
“জঙ্গল সম্পর্কে আপনি কিভাবে জানেন?” জিজ্ঞেস করল নাথান। শিকাগোতে টেলাক্সের প্রধান অফিসের বাইরে তো আপনার পা পড়েনি গত চারবছর ধরে। চার বছর…আমি যদ্দুর মনে করতে পারি আমার বাবা হারিয়ে যাওয়ার পর থেকেই।”
রিচার্ড জেন তার থুতনীতে ছোট করে ছাঁটা দাড়িগুলোর উপর হাত বুলাতে বুলাতে চেষ্টা করল যতদূর সম্ভব মুখের ভাবভঙ্গি স্বাভবিক রাখতে। কিন্তু তার অগ্নিদৃষ্টি ঠিকই ধরা পড়ল কেলির চোখে। “আমি জানি আমাকে তুমি কি মনে কর, ডা, রান্ড। আমার এই অভিযানে অংশগ্রহণ করার এটাও একটা কারণ। তুমি জান আমি তোমাদের বন্ধুই ছিলাম।”
নাথান দ্রুত লোকটার সামনে এসে দাঁড়াল। একহাত মুষ্ঠি পাকিয়ে বলল, “খবরদার এটা বলবেন না!” কণ্ঠে শক্রতা ঝরে পড়ল তার । “এটা বলবেন না আপনি আমার বাবার বন্ধু ছিলেন! যখন সরকার বন্ধ করতে চাইল তখন আমি আপনার কাছে গিয়েছিলাম অনুসন্ধানটা চালিয়ে নেবার জন্য। কিন্তু আপনি প্রত্যাখ্যান করলেন। ব্রাজিল থেকে আমেরিকায় আপনার পাঠান মেমোটা পড়েছি আমি। খোঁজাখুঁজির জন্য নতুন করে টেলাক্স-এর অর্থ ব্যয়ের মধ্যে কোন লাভ দেখছি না আমি । ডা, কার্লের অনুসন্ধান একটি ব্যর্থ মিশনে পরিণত হয়েছে। আমাদের অর্থ আরও ভাল কোন কিছু পেছনে ব্যয় করা উচিত।’ কথাগুলো মনে পড়ে আপনার? এই কথাগুলোই আমার বাবাকে শেষ করে দিয়েছিল?”
‘দতে দাঁত চেপে বললো জেন, “বেশ অপরিপক্ক ছিলে তুমি সে-সময়ে। সার্চ-মিশন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত আমার নিজের রিপোর্ট পাঠানোর আগেই নেয়া হয়ে গিয়েছিল।”
“বাজে কথা,” রেগেমেগে বললো নাথান।
“টেলাক্সে তিনশোরও বেশি মামলায় জর্জরিত হয়েছিল জঙ্গলে এক্সপিডিশনটা হারানোর পর। মামলা করে হারিয়ে যাওয়া লোকগুলোর পরিবার, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, ব্রাজিলিয়ান সরকার, এমনকি এনএসএফ । চারদিকের চাপে একটা ভয়াবহ অবস্থায় পড়ে যায় টেলাক্স। এই কারণেই ইকো-টেকের সম্পত্তির দিকে হাত বাড়াতে হয়েছিল, যার উপর ভর করেই আমরা কোনরকম টিকে ছিলাম ক্ষুধার্থ কিছু ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির পেটে না গিয়ে। কোম্পানিগুলো আমাদের চারপাশে ঘুরছিল যেন রক্তের গন্ধ পেয়ে হাঙ্গরের দল ছুটে এসেছে। তাই এরকম অনুসন্ধান, যেখান থেকে আশার আলো দেখার কোন সম্ভানাই নেই, আমাদের পক্ষে চালিয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তার উপর সে-সময়ে আমাদেরকে অন্যরকম এক যুদ্ধেও নামতে হয়েছিল
ক্রোধের আগুন নাথানের চোখেমুখে রয়েই গেল, প্রশমিত হল না। “সুতরাং সিদ্ধান্ত যা নেবার তা নেয়া হয়ে গিয়েছিল।” “টেলাক্সের জন্য আমি যদি চোখের পানি না ফেলি তবে ক্ষমা করবেন আমায়।” “যে যুদ্ধে নেমেছিলাম আমরা তাতে যদি না জিততে পারতাম তাহলে হাজার-হাজার লোকের চাকরি চলে যেত। সিদ্ধান্তটা বেশ কঠিনই ছিল কিন্তু আমি তার জন্যে কোন অনুশোচনা করব না।”
একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল নাথান এবং জেন। প্রফেসর কাউয়ি এগিয়ে এল মধ্যস্থতা করতে। “এখনকার জন্য হলেও অতীতকে মাটি চাপা দিয়ে রাখ। এই অভিযানে সফল হতে হলে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে, আর সেক্ষেত্রে তোমাদের আভ্যন্তরীণ যুদ্ধের একটা বিরতি প্রয়োজন বলে মনে করি আমি।”
কয়েক মুহূর্ত বাদেই জেন একহাত বাড়িয়ে দিল নাথানের দিকে। লোকটার হাতের তালুর দিকে একনজর তাকিয়েই ঘুরে দাঁড়াল নাথান। “এবার যাওয়া যাক।”
হাতটা চট করে সরিয়ে নিয়ে প্রফেসরের দিকে তাকাল জেন। “চেষ্টা করার জন্য অনেক ধন্যবাদ।।
নাথানের চলে যওয়া দেখল কাউয়ি । তাকে কিছুটা সময় দিল সে। এখনও তীব্র কষ্টে ভুগছে বেচারা। যদিও নিজের কষ্টগুলোকে সবসময় আড়াল করে রাখতে চায় ছেলেটা।
কেলি চেয়ে আছে নাথানের দিকে।কাধজোড়া কেমন যেন পেছনে হেলিয়ে দিয়ে কিছুটা এলামেলোভাবে হাটছে সে । কেলি কল্পনা করার চেষ্টা করল নাথানের মায়ের কথা, যাকে প্রথম হারায় সে, তারপর বাবাকে। কি নাখানের এই অপূরণীয় ক্ষতির কথা সম্পূর্ন বোঝা সম্ভব নয় কেলির পক্ষে। কেলি এবার নিজের কথা ভাবল। এ-ধরনের কষ্টের তীব্রতা এমন যে, তার পক্ষে সব ভুলে গিয়ে নতুন করে বেঁচে থাকার শক্তি হয়তো সে পেত না, বিশেষ করে তার যদি নাথানের মতই একাকীত্বেভরা জীবন থাকত।
সে তার ভায়ের দিকে তাকাল । সৌভাগ্যবশত সে তার পাশেই এসে দাঁড়িয়েছে। বেশ কিছুটা সামনে থেকে চিৎকার করে বললো একজন রেঞ্জার : “নদীর কাছে পৌছে গেছি আমরা।
নদীর তীর ধরে হেটে যাচ্ছে দলটি। নাথান দেখতে পেল সবার থেকে অনেকটাই পেছনে পড়ে গেছে সে। তার ডানদিকে বয়ে চলা নদীটি কেমন একটা দৃষ্টি দিচ্ছে যেন। ওপারের সবুজের ঘন আবরণ বাদামী এই নদীকে সীমানা বেঁধে দিয়েছে তারা এই নদী ধরে হাটছে প্রায় চার ঘণ্টা হল। নাথান অনুমান করল তারা প্রায় বারো মাইলের মত হেটেছে। বেশ ধীরেই হাটছে তারা। নদীর কাছে পৌছাতেই ছোটখাট ইন্ডিয়ান লোকটি আর সামনে এগোতে চাইল না। নদীর পাড়ে গভীর জঙ্গলের দিকে চলে যাওয়া পরিস্কার পায়ের ছাপের দিকে ইঙ্গিত করল সে। “আপনারা এটা অনুসরণ করে এগিয়ে যান পর্তুগীজ ভাষায় বলল সে। “আমি পাদ্রি বাতিস্তার কাছে ফিরে যাব।”
তাই তাদেরকে একরকম একাই চলতে হল এবার। রাত আসার আগেই যতটা সম্ভব পথ পাড়ি দেয়ার পরিকল্পনা তাদের। কিন্তু কর্পোরাল ওয়ারিক জ্যাক খুব সতর্ক ট্রেকার হওয়ায় পুরো দলটাকে এগিয়ে নিচ্ছে ধীরে, একেবারে শম্বুকগতিতে। ফলে এই ধীরগতির কারণেই নাথান যথেষ্ট সময় পেল রিচার্ড জেনের সাথে বাক-বিতণ্ডার ঘটনাটাকে
পর্যালোচনা করার। নিজেকে ধাতস্থ করে লোকটার কথাগুলো বিবেচনা করতে অনেক সময় লেগে গেল তার। নাথান ভাবল, হয়তো লোকটা বেশ সঙ্কীর্ণ মনের, তাই সে ওই বিপদের সময়টাতে সবকিছু সঠিকভাবে বিবেচনা করতে পারে নি। তার বামপাশে শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ হলে ফিরে তাকাল সে। ম্যানুয়েল তার টরটরকে সাথে নিয়ে নাথানের কাছে চলে এসেছে। জাগুয়ারটাকে নিয়ে কিছুটা দূরে দূরেই থাকছে অন্যদের থেকে। জাগুয়ারটাকে রেঞ্জারদের কাছে দেয়ার সময় সবার ভেতরেই একটা আতঙ্ক ভর করেছিল। নিজের অজান্তেই তাদের হাতের আঙুল চলে গিয়েছিল এম-১৬ রাইফেলে ট্রিগারে। শুধুমাত্র কর্পোরাল ডেনিস জারগেনসেনই জাগুয়ারটার বিষয়ে কৌতুহল দেখিয়েছিল, সে-ই তাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এখন আর মাঝেমাঝে প্রশ্ন করছে জাগুয়ারটার বিষয়ে।
প্রতিদিন কি পরিমান খাবার লাগে এটার?” লম্বা কর্পোরালটা মাথা থেকে ক্যাপ খুলে কপালের ঘাম মুছে বলল। অস্বাভাবিকরকম সাদা চুল মাথায় তার । চোখজোড়া হালকা নীল, যা দেখে সহজেই বোঝা যায় সে একজন নরডিক ।
ম্যানুয়েল তার পোষা বাঘটাকে হালকা আঘাত করল। “প্রায় দশ পাউন্ডের মত মাংস লাগে। ও আমার সাথে একরকম মানবেতর জীবন যাপন করছে। তবে জঙ্গলে ছাড়া অবস্থায় এখনকার থেকে প্রায় দ্বিগুন পরিমাণ খাবার লাগবে ওর।”
“এখানে, এই জঙ্গলে কিভাবে খাওয়াবেন ওটাকে?”।
নাখান তাদের সাথে যোগ দিতেই মাথা নেড়ে সায় দিল ম্যানুয়েল। শিকার করে খাবে। আর এই কারণেই সাথে নিয়ে এসেছি ওকে।”
“যদি সে শিকার করতে ব্যর্থ হয়?”
পেছনের সৈন্যগুলোর দিকে তাকাল ম্যানু। “তাতেও সমস্যা নেই, এখানে আরো মাংসের উৎস আছে।”
কিছুটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল জারগেনসনের মুখমণ্ডল। তবে সাথে সাথেই বুঝতে পারল ম্যানুয়েল মজা করে বলেছে।“বেশ মজার ব্যাপার।”
ম্যানুয়েল আলতো করে কনুই দিয়ে খোঁচা দিতেই নিজের গতি কমিয়ে দিয়ে অন্যদের সাথে যোগ দিল কর্পোরাল। ম্যানুয়েলের মনোযোগ এবার নাথানের দিকে,“ওখানে কি নিয়ে ঝামেলা বাধাচ্ছিলে? জেনের সাথে ঝগড়া-ঝাটি কানে এল আমার ।
“তেমন কিছু না, নাথান বললো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। টর-টর তার লোমশ মুখ দিয়ে নাথানের পা ঘষছে। নাথানও ওটার মাথার উপর হাত রেখে আদর করতে লাগল । “ভেতরে ভেতরে নিজেকে খুব বোকা মনে হচ্ছে।”
“বোকা ভাবার কিছু নেই এখানে। তুমি দেখে নিও ওকে আমি টরটরকে দিয়ে ধাওয়া করে খাওয়াবো। বিশ্বাস কর, এটা খুব বেশি দূরে নয়।” সে হাত তুলে সামনের দিকে দেখাল সে। “দেখেছ, কেমন একটা বেখাপ্পা জামা পরেছে লোকটা? বাস্তবে কোন দিন জঙ্গলে পা দিয়েছে সে?”
বন্ধুর এই মজার কথায় হেসে ফেললো নাথান। “এবার ডা, ফঙকে দেখ । তাকে কিন্তু তার আউটফিটে ভালই মানিয়েছে। এক ভ্রু উঁচু করে নাথানের দিকে তাকাল ম্যানুয়েল। “সে যদি আমার বিছানায় শুয়ে শব্দ করে ক্র্যাকারও খায় তবুও তাকে আমি লাথি দেব না। আর কেলি ওব্রেইন”।
একটা শোরগোলের শব্দে কথা থামিয়ে দিল ম্যানুয়েল। দলের সবাই এক জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে আছে। ঝুঁকে পড়ে কী যেন দেখছে আর উচ্চস্বরে কথা বলছে। ম্যানু এবং নাথান সামনে এগিয়ে গেল দ্রুত। ভীড়ের ভেতরে ঢুকতেই নাথান দেখল আনা ফঙ এবং প্রফেসর কাউয়ি ঝুঁকে আছে একটা ডিঙ্গি নৌকার উপর। মনে হচ্ছে গাছের গুড়ি দিয়ে বানানো হয়েছে ওটা নদী থেকে এত দূর টেনে আনার দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে । আনার পর তড়িঘড়ি করে পাম পাতা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল ওটা ।।
“ট্রেইলটা তাহলে এখান থেকেই,” বলল কেলি ।
নাথান দেখতে পেল মেয়েটার সারা মুখ ঘেমে আছে। তার মাথার চুলগুলো পেছনে রোল করে বাধা একটা সবুজ রঙের রুমাল দিয়ে, যেটা মাথার ব্যান্ড হিসেবেও কাজ করছে।
প্রফেসর কাউয়ি একটা হেঁড়া পাম পাতা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। “এগুলো মুয়াপু পামগাছ থেকে ছেড়া।” সে পাতাগুলো উল্টে ধরে প্রান্তগুলো দেখালো। কাটা না, ছেড়া হয়েছে।”
সায় দিল কেলি। এজেন্ট ক্লার্ককে যখন পাওয়া গিয়েছিল কোন ছুরি ছিল না তার সাথে ।
প্রফেসর কাউয়ি পাতার প্রান্ত বরাবর আঙুল চালাতে লাগল ধীরে ধীরে। “ক্ষয়ে যাওয়ার পরিমাণ থেকে বোঝা যাচ্ছে, এগুলো কমপক্ষে দু-সপ্তাহ আগে ছেড়া।” ফ্রাঙ্কও একটু ঝুঁকে এল। “এজেন্ট ক্লার্ক গ্রামে এসেছিলেন যতদিন আগে ঠিক ততদিন আগের এগুলো।”
“ঠিক তাই।”
কেলির কণ্ঠে উত্তেজনা ভর করল। “তাহলে তো এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় উনি এই নৌকা ব্যবহার করেই এখানে এসেছিলেন।”
নদীটাকে ভালে করে দেখলো নাথান। ওটার দু-পাশেই ঘন জুতার দেয়াল। পরগাছা, মস, ফার্ন, লতানো আঙ্গুরসহ অসংখ্য গাছপালা আর ঝোঁপঝড়ে ছেয়ে আছে। বৈচিত্রহীন ছোট্ট নদীর দু-কূল। ত্রিশ ফুটের মত প্রশস্ত হবে ওটার পানিও বেশ পরিস্কার । নদীর কর্দমাক্ত পাথুরে তলদেশটাও দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট, শুধুমাত্র কয়েক ফুট জায়গা ছাড়া। কি থাকতে পারে ওখানে? ভাবল নাথান । শিকারী কোন প্রাণী ওৎ পেতে থাকতে পারে। সাপ, গিরগিটি বা পিরানহা এরকম কোন কিছু। এমনকি বড় বড় মাগুর মাছও থাকতে পারে যেগুলো অসতর্ক কোন সাঁতারুর পায়ে কামড় বসিয়ে দেবে, আর এ-কাজে ওরা বিখ্যাত।
ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান সবাইকে ঠেলে সামনে এগিয়ে গেল। “তাহলে এখান থেকে কোথায় যাওয়া যায় প্রথমে? প্লেনে করে আমাদের জন্য নৌকা আনালাম, কিন্তু তারপর কি কব?”
আনা ফঙ হাত উঁচু করল। আমার মনে হয় উত্তরটা আমার জানা আছে। সে নৌকার উপর রাখা পাম পাতার স্তুপের ভেতর হাত চালিয়ে দিল। তার ছোট আঙুলগুলো নৌকার ভেতরের অংশে ঘুরে বেড়াল। “কাঠ কেটে যে পদ্ধতিতে এটা বানানো হয়েছে সেটা এবং প্রান্ত বরাবর লাল রঙের নক্সা দেখে বোঝা যাচ্ছে নৌকাটা ইয়ানোমামো গোত্রের কারোর। একমাত্র তারাই এরকম নক্সা করে নৌকা বানায়।”
নাথানও হাটু গেঁড়ে বসে পড়ল, তারপর সেও দেখতে লাগল হাত দিয়ে। তিনি ঠিকই বলেছেন। জেরাল্ড ক্লার্ক খুব সম্ভবত এটা বানিয়েছে অথবা হতে পারে ঐ গোত্রের কারো কাছ থেকে চুরি করেছে। আমরা যদি নদী বেয়ে একটু ওপারের অঞ্চলের দিকে যেতে পারি তবে ইয়ানামামো ইন্ডিয়ানদেরকে জিজ্ঞেস করতে পারব তারা কোন শ্বেতাঙ্গকে যেতে দেখেছে কি না, কিংবা তাদের কারো কোন নৌকা চুরি হয়েছে কিনা।” সে ফ্রাঙ্ক এবং কেলির দিকে ঘুরে দাঁড়াল। “এখান থেকেই অনুসন্ধান শুরু করতে পারি আমরা।”
দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ল ফ্রাঙ্ক । “আমি বেইস-ক্যাম্পে আমাদের অবস্থান জানিয়ে দিচ্ছি। ওখান থেকে হেলিকপ্টারে করে নৌকা দিয়ে যাবে এখানে। এগুলো পেতে পেতে দিনের বাকি সময়টুকু লেগে যাবে। তাই আলো থাকতেই আজকের মত ক্যাম্প করে ফেলতে হবে আমাদের।” পরিকল্পনামাফিক কাজ শুরু হয়ে যেতেই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল নদী থেকে সামান্য দূরে অস্থায়ী ঘর বানানোর কাজে। আগুন জ্বালানো হল। কাউয়ি কিছু আলুবোখরা ও সাওয়ারি বাদাম সংগ্রহ করল পাশের জঙ্গল থেকে। ওদিকে ম্যানুয়েল তার টর-টরকে শিকার করতে জঙ্গলে ছেড়ে বড়শি দিয়ে ট্রাউট নামের ছোট জাতের কিছু স্যামন মাছ ধরল। পরের এক ঘন্টাজুড়ে অনেক কাজ করা হল। প্রয়োজনীয় দ্রব্য বহনকারী হেলিকপ্টারগুলোর পাখার তীব্র শব্দে পাখির ঝাঁক, বানরের দল আরও নানা রকম পশুপাখি চিৎকার-চেঁচামেচি করে পুরো জঙ্গল সরগরম করে তুলল । তিনটি বড় কন্টেইনার দড়ি বেধে হেলিকপ্টার থেকে ঝুলিয়ে দেয়া হল নদীর উপর। তারপর পানিতে পড়তেই দড়ি টেনে সেগুলো তীরে ওঠানো হল । কন্টেইনারের ভেতরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফুলে উঠতে পারে এমন কয়েকটা পন্টুন আছে। যেগুলোর সাথে ছোট মোটর লাগানো। এই নৌকাগুলোকে রেঞ্জার্সরা রাবার-রাইডারস’ বলে ডাকে।
সূর্য ডুবতে বসেছে, কালো রঙের তিনটি নৌকা পাড়েই গাছের সাথে বেধে রাখা হল পরের দিনের ভ্রমনের জন্য প্রস্তুত করে। রেঞ্জার্সদের পাশাপাশি কাজে নেমে গেল নাথানও। সে তার নিজের বিছানা তৈরি করে খুব দক্ষতার সাথে মশারি টানাতে লাগল বিছানার চারপাশে। সে দেখল কেলি তার নিজের বিছানা করতে পেরে উঠছে না। তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেল সে। ‘মশারিটাকে যতটা সম্ভব চারদিকে প্রসারিত করে টানাতে হবে যেন কোন কিছুই আপনার বিছানার ধারেকাছে ঘেষতে না পারে । নয়তো নিশাচরেরা গায়ের চাদর ভেদ করে আক্রমণ করতে দেরি করবে না।”
“আমি করতে পারব,” বলল সে কিন্তু তার ভ্রু জোড়া হতাশায় কুঁচকে আছে।
“আচ্ছা, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি। কিছু পাথর আর শক্ত ডাল-পালার ছোটছোট অংশ দিয়ে মশারিটা যতদূর সম্ভব বিছানা থেকে উঁচু করে দিল নাখান। মনে হচ্ছে যেন পাতলা রেশমী কাপড়ে বিছানাটা আচ্ছাদিত হয়ে আছে ।।
তাদের পাশে ফ্রাঙ্ককেও তার নিজের মশারিটা নিয়ে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি না, এতসব না করে স্লিপিংব্যাগে ঘুমাতে সমস্যা কোথায়? যতবারই আমি ক্যাম্পিং করেছি সব সময়ই ওগুলোতে শুয়েছি।”
“এটা জঙ্গল, বুঝলেন?” বলল নাথান। “আপনি যদি মাটিতে ঘুমান তবে সকাল না হতেই সবরকম বিদঘুটে প্রাণীদেরকে শয্যাসঙ্গী হিসেবে আবিষ্কার করবেন। সাপ, গিরগিটি, বিচ্ছু, মাকড়সা আরও কত কি। তারচেয়ে বরং আমার অতিথি হোন, সব দায়দায়িত্ব আমার উপরে ছেড়ে দিন।”
ফ্রাঙ্ক তখনও রাগে গজগজ করতে করতে তার বিছানার সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। “বেশ, ঐ অসহ্য বিছানাতেই ঘুমাবো কিন্তু মশারির আবার কি দরকার? সারাটা দিন ধরে মশার যন্ত্রণা তো ভোগ করলামই।”
“রাতে ওগুলো হাজারগুণ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে। যদি কোন পোকা-মাকড় কামড়ে আপনার রক্ত না-ও বের করে ভ্যাম্পায়ার ব্যাট সেটা করবে। এখানে সব জায়গায় ওরা আছে। উষ্ণ রক্তের যেকোন প্রাণীকেই আক্রমণ করে ওরা। এমনকি রাতে চুপিসারে টয়লেটে যাবার সময়ও সতর্ক থাকতে হবে।”
কেলির চোখজোড়া সরু হয়ে গেল।
“আপনার তো জলাতঙ্কের টিকা দেয়া আছে, তাই না?” জিজ্ঞেস করল নাথান। আলতো করে মাথা নেড়ে সায় দিল কেলি। “ভাল!”
নাথানের পেতে দেয়া বিছানাটার দিকে একনজর চোখ বুলিয়ে কেলি ঘুরে দাঁড়াল তার দিকে। মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে তার মুখ । ধন্যবাদ। নাথান আবারো ধাক্কা খেল এমেরাল্ড পাথরের মত কেলির সবুজ চোখের সৌন্দর্যে । কিছুটা গোলাপী আভাও দেখা যাচ্ছে তাতে। “ইউ আর ওয়েলকাম।” সে আগুনের দিকে ঘুরে দাঁড়াল, দেখ বাকি সবাই সেখানে জড় হয়েছে সান্ধ্যকালীন খাবারের জন্য।“দেখি ডিনারে
ক্যাম্পফায়ারের চারপাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তাপের উৎস শুধুমাত্র আগুনের শিখা নয়, নাথান দেখল ম্যানুয়েল এবং রিচার্ড জেন কথা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত। “লগিং ইন্ডাস্ট্রিতে বাধা দেওয়ার বিপক্ষে আপনি যাচ্ছেন কিভাবে ঠিক বুঝলাম না, ফ্রাইংপ্যানে মাছগুলো নেড়ে দিতে দিতে বলল ম্যনুয়েল।
“সারা বিশ্বজুড়ে এই কমার্শিয়াল লগিং একভাবে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বন ধ্বংস করছে, এখানে এই আমাজনে প্রতি সেকেন্ডে এক একর বন হারাচ্ছি আমরা।”
রিচার্ড জেন একটা গাছের গুড়ির উপর বসা। গায়ের খাকি জ্যাকেট খুলে রাখা হয়েছে। লম্বা হাতা ভঁজ করে উপরে তোলা। দেখে মনে হচ্ছে মারামারি করতে প্রস্তুত। “এই পরিসংখ্যানগুলো আসলে পরিবেশবাদীরা অতিরঞ্জিত করে ফেলেছে। বিজ্ঞানের অপব্যবহার করে এই ধারণীগুলো প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে আর এগুলো মানুষকে শিক্ষাদানের চেয়ে আতঙ্কিত করানোর কাজেই বেশি ছড়ানো হচ্ছে। এদিকে স্যাটেলাইট আমাদেরকে যে বাস্তবচিত্র পাঠাচ্ছে সেগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে আমাজনের নব্বই শতাংশ এখনও অক্ষত আছে।”
সহ্যের বাধ এবার ভেঙে যাবার উপক্রম হরো ম্যানুয়েলের। “বুঝলাম ঐ রিপোর্টগুলো আপনি যেমন বললেন, একটু বাড়াবাড়ি করে দেখানো হয়েছে। যদি তাও হয়, তবু বন উজাড়ের কারণে যা হারাচ্ছি তা চিরতরেই হারাচ্ছি। এর কি ব্যাখ্যা দেবেন? প্রত্যেক দিন শতশত প্রজাতির গাছ-পালা, প্রাণী হারাচ্ছি আমরা চিরকালের জন্য।
“সত্যি বলতে কি,” শান্ত গলায় বলল রিচার্ড জেন, “উজাড় হয়ে যাওয়া বনে নতুন করে কোন গাছ-পালা জন্মায় না এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল, কি বলব, বলা যায় অতি পুরনো একটি মিথ্যা। ইন্দোনেশিয়ার রেইনফরেস্ট কমার্শিয়াল লগিং হয়েছিল একবার, তার আটবছর পর সেখানে গিয়ে যা দেখা গেল তা প্রত্যাশার চাইতেও বেশি। গাছপালা এবং বিভিন্ন প্রাণীর সবকিছু কাটিয়ে ওঠার হারটা ছিল অবিশ্বাস্য। আর এখানে, আপনার নিজের এই রেইনফরেস্টেও এর সত্যতা পাওয়া গেছে। পশ্চিমব্রাজিলে খনি শ্রমিকরা রেইনফরেস্টের বেশ বড় একটা অংশ ধ্বংস করে ফেলেছিল। ঘটনাটা ১৯৮২ সালের। তার ঠিক পনের বছর পর বিজ্ঞানীরা সেখানে আবিষ্কার করে তাদের আসলে আবিষ্কার করার কিছুই নেই। অর্থাৎ নতুন করে জন্মানো জঙ্গলের সাথে চারপাশের জঙ্গলের চোখে পড়ার মত কোন পার্থক্য নেই। এই ঘটনাগুলোই বলে দেয়, সাসটেইনেবল লগিং খুবই সম্ভব এখানে আর মানুষ এবং প্রকৃতি একত্রে টিকে থাকতে পারে।”
এই আলোচনায় নাথান বেশ ত্যক্ত-বিরক্ত । রেইনফরেস্ট ধ্বংসের পক্ষে লোকটা সাফাই গাইছে কি করে? ‘কৃষকেরা যে বনভুমি পুড়িয়ে কৃষিজমি বের করে নিচ্ছে, গবাদি পশু চারণ করাচ্ছে। এগুলোর কি হবে? আমার মনে হয়ে এটাও সমর্থন কবেন আপনি, নাকি?”
“অবশ্যই,” জেন বলল। “পশ্চিম-আমেরিকার বনগুলোতে নির্দিষ্টি সময় পর পর আগুন জ্বালিয়ে দাবানলের মত সৃষ্টি করা হয়, আমরা মনে করি এটা খুবই ফলপ্রসূ একটি পূর্ণবয়স্ক বনের জন্য। এটা সবকিছুর ভেতর সবকিছুর যোগান দেয় অর্থাৎ মাটির প্রাণশক্তি সব জায়গায় পৌছায়। তাহলে এই আমাজনে এটা করতে দোষ কোথায়? লগিং অথবা বার্নিংয়ের কারণে বড় প্রজাতিরা সাময়িকভাবে বিলুপ্ত হয়। আর তখন সবচেয়ে প্রয়োজনীয় গাছ-গাছড়া যেগুলোর নাম দেয়া হয়েছে সাপেড স্পিশিজ, বাড়তে পারে পূর্ণমাত্রায়। আর প্রকৃতপক্ষে এই ছোটছোট গাছ-গাছরালতা-গুলুরাই সবচেয়ে বেশি ঔষধিগুণ ধারণ করে। তাই সামান্য পরিমাণ বার্নিং এবং লগিঙে ক্ষতি কোথায়? সবদিক থেকেই বিবেচনা করলে এটা ভাল।”
মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকা কেলি মুখ খুলল এবার। “কিন্তু পুরো ব্যাপারটার সাথে যে বৈশ্বিক সংশ্লিষ্টতা আছে সেটা আপনি এড়িয়ে যাচ্ছেন। যেমন ধরুন গ্রিনহাউজ এফেক্ট। রেইনফরেস্টগুলো কি পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন সরবরাহ করে না? এগুলোকে প্রবাদস্বরুপ ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ বলা হয়ে থাকে তা জানেন আশা করি।”
” প্রবাদস্বরুপ” শব্দটার ব্যবহার যথার্থই হয়েছে আমার মনে হয়,” কণ্ঠে কিছুটা গভীর্য ফুটিয়ে বলল জেন। “আবহাওয়া স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সম্প্রতি দেখা গেছে, এক্ষেত্রে সব রেইনফরেস্ট খুব কম পরিমাণেই অক্সিজেন সরবরাহ করে। পুরো ব্যাপারটা একটা ক্লোজড-সিস্টেমের মত। যে মুহূর্তে এই সবুজ গাছপালা প্রচুর পরিমাণ অক্সিজেন উৎপন্ন করেছে তখনই তার পুরোটা ব্যয় হয়ে যাচ্ছে পচনের কাজে। প্রতি মুহূর্তে সমগ্র বনজুড়ে শতশত গাছপালা, লতা-পাতা ও নানান জাতের মৃত প্রাণীরা পচনের প্রধান রসদ অক্সিজেন পাচ্ছে এই গাছ থেকেই। ফলে বাইরের জগতে সরবরাহকৃত অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্য। এরপরও যে অক্সিজেন্টুকু আসে তা কিন্তু ঐ সেকেন্ডারি ফরেস্ট থেকেই যেখানে লগিং বা বার্নিঙের কারণে বড় গাছের পরিবর্তে থাকে নতুন জন্ম নেয়া বৃক্ষরাজি। তাই প্রকৃতপক্ষে নিয়ন্ত্রিত ডিফরেস্টেশন সমগ্র বিশ্বের বায়ুমণ্ডলের জন্যই লাভজনক।”
নাথান শুনছিল এতক্ষণ ধরে। অবিশ্বাস এবং ক্রোধের মাঝে থেকেও নিজেকে নিয়ন্ত্রনে রেখেছে সে। “যারা এই বনে বসবাস করে তাদের নিয়ে কি বলবেন? গত পাঁচশ বছরে স্থানীয় নানা গোত্রের মানুষের সংখ্যা এক কোটি থেকে ধীরে ধীরে কমে দুই লাখে নেমে গেছে। আমার মনে হয় এটাও ভাল, নাকি?”
মাথা দোলাল রিচার্ড জেন। “না, তা হবে কেন। এটাই সবচেয়ে দুঃখজনক যে একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ তার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা আরেক প্রজন্মের হতে তুলে দেবার আগেই মারা যাচ্ছে। এতে করে সমগ্র বিশ্ব এক অপূরনীয় শক্তির আধার হারিয়ে ফেলছে চিরতরের জন্য। আর এ-কারণেই আমি পর্যাপ্ত তহবিল সরবরাহ করে যাচ্ছি যাতে এরকম বিলুপ্তপ্রায় গোত্রদের মাঝে গবেষণা চালিয়ে যেতে পার তুমি। কাজটার মূল্য অপরিসীম।”
সন্দেহভরা নাথানের চোখ দুটো সরু হয়ে গেল । “জঙ্গল আর জঙ্গলের মানুষ মিলেমিশে একাকার এখানে। আপনি যা বললেন তা যদি সত্যিও হয় তবু বলব। ডিফরেস্টেশন কিছু প্রজাতিকে চিরতরের জন্য ধ্বংস করছে। এর বিরুদ্ধে যুক্তি দেখাতে পারবেন না আপনি।”
“হ্যা, তা ঠিক, কিন্তু যা হারাচ্ছি তার প্রকৃত সংখ্যাটা পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে।”
“সংখ্যাটা যাইহোক না কেন, একক কোন প্রজাতিও কিন্তু খুবই মূল্যবান হতে পারে । যেমন ধরুন মাদাগাস্কান পেরিউইঙ্কল।”
জেনের মুখ লাল হয়ে গেল। “আসলে ব্যাপারটা পুরোপুরি ভিন্ন। খুব দূর্লভ প্রজাতি এটা। এরকম কিছুর আবিষ্কারের কথা চিন্তাও করা যায় না।”
“মাদাগাস্কান পেরিউইঙ্কল?” জিজ্ঞেস করল কেলি, তার চোখে-মুখে সন্দেহ।
“গোলাপী রঙের মাদাগাস্কান পেরিউইঙ্কল, ভিব্রাস্টিন এবং ভিনক্রিসটিনের উৎস। এগুলো ক্যান্সারের শক্তিশালী দুটি প্রতিষেধক।”
চিনতে পারায় কেলির কপালে ভাঁজ পড়ল। “হজকিনস ডিজিজ, লিমফোমাস আর শিশুদের নানা রকমের ক্যান্সার সারায় এটা।”
সায় দিল নাথান। “প্রতিবছর হাজার-হাজার শিশুর জীবন বাচায় এই ড্রাগস। কিন্তু যে গাছ এই জীবন বাঁচানো ওষুধ দিচ্ছে আমাদের তা এখন মাদাগাস্কার দ্বীপে বিলুপ্তির মুখে। এই মূল্যবান সম্পদ যদি সময়মত আবিষ্কার করা না হত তবে কি হত ভাবা যায়? কত শিশু অকালে মারা যেত?”
“আমি তো বললামই, পেরিউইঙ্কল আসলেই একটি দূর্লভ আবিষ্কার।”
“তা কিভাবে বুঝবেন আপনি? যে পরিসংখ্যান আপনি দিলেন, যে স্যাটেলাইট ফটোগ্রাফির কথা বললেন তার সবই কিন্ত তথ্যনির্ভর। কিন্তু এই তথ্য কি আপনাদের কাছে নেই, প্রত্যেক প্রজাতির গাছেই রোগ সারানোর কিছু উপাদান থাকে? প্রত্যেক প্রজাতিই অপরিসীম মূল্যবান। বনের যে-সব জায়গায় এসব গবেষণা করা হয় নি সে-সব জায়গায় ডিফরেস্টেশনের কারণে কখন কোন ঔষধি গাছ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তা কে বলতে পারে? কে বলতে পারে কোন দূর্লভ গাছ এইডস-এর প্রতিষেধক ধারণ করছে? কোনটা ধারণ করছে ডায়াবেটিসের? হাজারো রকমের ক্যান্সার যা মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে সেই ক্যান্সারের?”
“কিংবা কোন গাছের কারণে নতুন করে জন্মাতে পারে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ?” যোেগ করল কেলি ।
ভ্রু কুঁচকে আগুনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রিচার্ড জেন।“কে বলতে পারে এটা?”
“আমিও ঠিক এটাই বলতে চাচ্ছি,” থামল নাথান।
ফ্রাঙ্ক এগিয়ে এল । তাকে দেখে মনে হচ্ছে বাকযুদ্ধে ক্যাম্প-ফায়ারের আশপাশ যে গরম হয়ে উঠেছে সে বিষয়ে কোন ধারণাই নেই তার। “আপনি তো দেখছি মাছ পুড়িয়ে ফেলছেন,” বলল সে। কালো ধোঁয়া উড়তে থাকাফ্রাইংপ্যানটির দিকে ইঙ্গিত করল।
বুঝতে পেরে সাথে সাথেই প্যানটা আগুনের ওপর থেকে সরিয়ে ফেলল ম্যানুয়েল। একটু হেসে তাকাল ফ্রাঙ্কের দিকে। “থ্যাঙ্কস ওব্রেইন, আপনি তো বেশ সজাগ, ভুলেই গিয়েছিলাম ওগুলো চুলার উপর। আপনি না দেখলে তো রাতের খাবারের বারোটা বেজে যেত।”
কেলিকে ইশারা করল ফ্রাঙ্ক। “স্যাটেলাইটের সাথে ল্যাপটপের কানেকশন দেয়া প্রায় শেষ,” ঘড়ি দেখল সে। ঘণ্টাখানেকের ভেতরে স্টেটসের সাথে যোগাঁযোগ করতে পারব।”
“দারুণ,” কেলি একনজর দেখে নিল অলিন পাস্তারনায়েক ছোট্ট স্যাটেলাইট ডিশ অ্যান্টেনা আর ল্যাপটপের চারপাশে ছোটাছুটিতে ব্যস্ত সম্ভবত জেরাল্ড ক্লার্কের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট থেকে কিছু পাওয়া যাবে। হয়তো এমন কিছু যা আমাদের কাজে আসবে।” নাথান শুনল চুপচাপ, কিছুটা অন্যমনস্কভাবেই হয়তো আগুনের দিকে তাকিয়ে আছে এই কারণে কিন্তু কেমন যেন পরাবাস্তব এক আতঙ্ক আচ্ছন্ন করল তার ভেতরটা। তার অবচেতন মন বলে উঠল, হয়তো লোকটার মৃতদেহ ইয়ামোমামো শামানের কথামত পুড়িয়ে ফেলাই উচিত ছিল। রিচার্ড জেন যেমনটা বলেছে।
