আমাজনিয়া – ৫
স্টেম সেল রিসার্চ আগস্ট ৭,
বিকেল ৫:৩২ ইন্সটার ইন্সটিটিউট,
ল্যাঙ্গলে, ভার্জিনিয়া
লরেন ওব্রেইন তার মাইক্রোস্কোপে চোখ লাগিয়ে ঝুঁকে আছে। এমন সময় কলটা এল মর্গ থেকে । “ধ্যাত্!” কাজে বাধা পড়ায় বিরক্ত হল সে । কপালে লাগানো রিডিং গ্লাসটা নাকের ডগায় নামিয়ে আনতে আনতে সোজা হয়ে দাঁড়াল, তারপর অন করল স্পিকার।
“হিস্টলজি থেকে বলছি,” বলল সে।
“ডা, ওব্রেইন, আমার মনে হয় এখানে একবার আসা দরকার আপনার,” কণ্ঠটা স্ট্যানলি হিবার্টের । জন হপকিনস হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্যাথলজিস্ট এবং এমইডিইএ-র সহকর্মী । জেরাল্ড ক্লার্কের ময়নাতদন্তের কাজে পরামর্শ দেয়ার জন্য আনা হয়েছে তাকে। “আমি কিছুটা ব্যস্ত রয়েছি টিস্যুর স্যাম্পল নিয়ে। এইমাত্র ওগুলোর রিভিউ করা শুরু করেছি।”
“মুখের ক্ষতস্থান নিয়ে কাজ করছ, ঠিক?” শ্বাস ফেলল লরেন ।
“তোমার অনুমান ঠিক আছে। স্কুয়েইমাস টিস্যু ক্যান্সার। উচ্চমাত্রায় কোষ বিভাজন হওয়ার ছড়িয়েছে চরম মাত্রায় । আমি এটাকে টাইপ-ওয়ান শ্রেণীতেই ফেলবো। আমার দেখা সবচেয়ে খারাপ ম্যালিগন্যানসিগুলোর একটি।”
“তাহলে লোকটার জিহ্বা কাটা হয় নি, ক্যান্সারে খেয়ে নিয়েছে।”
ভয়ের একটি কম্পন সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়লেও দৃঢ়তার সাথে তা চেপে রাখল লরেন। তার পেশার সাথে এমন আচরণ যায় না। মৃত লোকটির সারা মুখে টিউমারে ভরা। জিহ্বাটা ছোট্ট একটা নরম রক্তের পিণ্ডের চেয়ে বেশি বড় হবে না। কারসিনোমা ক্যান্সারে খেয়ে নিয়েছে পুরোটা । রোগের উপস্থিতি শুধু তার মুখের ভেতরেই নয়, পোস্টমর্টেমের সময় তার সারা শরীরে প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যান্সার সনাক্ত সুয়েছে, ফুসফুস, কিডনি, লিভার, প্লিহা, প্যানক্রিয়াস সবকিছুই ক্যান্সারে ছেয়ে আছে।হিস্টলজি ল্যাবের জন্য প্রস্তুত করে রাখা সারি সারি স্লাইডগুলোর দিকে তাকাল লরেন। প্রত্যেকটা স্লাইডে রয়েছে বিভিন্ন রকম টিউমারের অংশবিশেষ অথবা অস্থিমজ্জা।
“মুখের ঐ বিদঘুটে ক্যান্সারের বয়স কত তা বোঝা গেল?” জিজ্ঞেস করল প্যাথলজিস্ট।
“নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন তবে আমার মনেহয় ছয় থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে এটা শুরু হয়েছে।”
একটা শিষ দেয়ার মত শব্দ ভেসে এল ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে। “ভয়ঙ্কর দ্রুতগতি!”
“হুম । এখন পর্যন্ত যতগুলো স্লাইড আমি রিভিউ করেছি তার বেশিরভাগই ঐ একই পর্যায়ের। মানে উচ্চপর্যায়ের ক্যান্সার দেখাচ্ছে। এমন একটা ক্যান্সারও এখন পর্যন্ত পাইনি যেটার বয়স তিন মাসের বেশি।” সামনে রাখা কিছু স্লাইডে হাত বুলালো সে। “অবশ্য এখনও কিছু স্লাইড দেখা বাকি আছে।”
“টেরাটোমা টিউমারগুলোর কি অবস্থা?”
“ঐ একই। সবগুলোই এক থেকে তিন মাসের মধ্যে, কিন্তু
বাধা দিল ডা, হিবার্ট, “মাই গড়, এর আগাগোড়া তো কিছুই বুঝতে পারছি না। একই দেহে এত রকম ক্যান্সার আমি জীবনে দেখি নি, বিশেষ করে এই টেরাটোমাস।”
ফোনের অপর প্রান্তের মানুষটার উৎকণ্ঠার কারণ বুঝতে পারল লরেন। টেরাটোমা হল পুঁজভরা টিউমার যেগুলো শরীরের ভ্রূণ কোষের অংশ, আর এই বিরল প্রজাতির আক্রান্ত কোষগুলো শরীরের যেকোন ধরণের টিসু, পেশী, চুল এবং হাঁড়ের ভেতর পরিপক্ক হতে পারে। এসব কোষের টিউমারগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু অঙ্গ যেমন থাইমাস অথবা টেসটিসের ভেতরে দেখা যায়, কিন্তু জোরাল্ড ক্লার্কের সারা শরীর জুড়েই এগুলো ছেয়ে আছে যা নিশ্চিতভাবেই অন্য কিছুকে নির্দেশ করে।
“স্ট্যানলি, এগুলো শুধুমাত্র টেরাটোমাস নয়, এরা টেরাটোকারসিনোমাস।”
“কি বললে? সবগুলোই?”
মাথা নেড়ে সায় দিল সে, সাথে সাথে বুঝতে পারল ফোনের অপরপ্রান্তে যে আছে সে এটা দেখছে না । “ওগুলোর প্রত্যেকটাই।” টেরাটোমা ক্যান্সারে রূপ নিয়ে চরম অবস্থায় পৌছালে সেটা হয় টেরাটোকারসিনোমাস। বুনো জাতের এই ক্যান্সার মাংসপেশী, চুল, দাঁত হাঁড় এবং স্নায়ুতে শাখা-প্রশাখা ছড়ায়। “এ-ধরনের স্যাম্পল আগে দেখি নি কখনো। লোকটার লিভার, অণ্ডকোষ এমনকি স্নায়ুগ্রন্থিও আক্রান্ত হয়েছে এই ক্যান্সারে।”
“তাহলে তো এটা আমার এখানের ঘটনাকে ভালই ব্যাখ্যা করতে পারবে,” বলল স্ট্যানলি ।
“কি বলছ, বুঝলাম না?” “তোমাকে ফোন দিয়ে তাই তো বললাম, এখানে আসার কথা। এক্ষুনি চলে এস।”
“ঠিক আছে,”বিরক্তিভরা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল সে। “আসছি
ফোনটা রেখে মাইক্রোস্কোপ টেবিল ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল্ লরেন। দু-ঘণ্টা ধরে টানা কাজ করে ঘাড়ের উপর দ্বিধা-দ্বন্দের যে পাহাড় জমেছে তা থেকে মুক্তি পেল যেন। সে একবার ভাবল তার স্বামীকে ডাকবে কিনা কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল সে এখন নিশ্চয় সিআইএ’র হেডকোয়ার্টারে ব্যস্ত। তারচেয়ে বরং ফ্রাঙ্ক ও কেলির সাথে স্টেটসের কনফারেন্সের পরই তার সাথে যোগাযোগ করা যায়। ল্যাব পোশাকটা হাতে ঝুলিয়ে লরেন দরজা ঠেলে বাইরে এসে সিঁড়ি ধরে নামতে শুরু করল। তার গন্তব্য ইন্সটিটিউটের মর্গ। অনাকাঙ্খিত বা অপ্রত্যাশিত কিছু একটা ঘটতে পারে এমন চিন্তা আচ্ছন্ন করুল তাকে। ইমার্জেন্সি রুম ক্লিনিশিয়ান হিসেবে সে দশ বছর ধরে কাজ কছে কিন্তু এখনও পোস্টমর্টেম করার সময় তার ভেতরে অদ্ভুত রকমের ভয়, উদ্বেগ কাজ করে। মর্গের মৃতদেহ, শরীরের কাটা অংশ, হাড় কাটার যন্ত্র, স্টেইনলেন্স স্টিলের টেবিলে এসব কিছুর চেয়ে হিস্টলজির চেম্বার তার কাছে অনেক প্রিয়। তবে আজ নিজের পছন্দের কোন মূল্যই নেই।
নিচের লম্বা হলরুম অতিক্রম করে দুই পাল্লার দরজা দেয়া একটা ঘরের দিকে এগোতেই হঠাৎ করে জেরাল্ড ক্লার্কের ঘটনার রহস্যময়তা তার চিন্তা-ভাবনাকে অন্য দিকে নিয়ে গেল। লোকটা চারবছর ধরে নিখোঁজ, তারপর একদিন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল, সাথে নতুন গজান হাত! অলৌকিক কোন চিকিৎসা পেয়েছিল সে? কিন্তু অন্যদিকে তার সারা শরীরে কিলবিল করছে টিউমার। ক্যান্সার ছিন্ন-ভিন্ন করেছে পুরো শরীর, যে ক্যান্সারের জন্য তিন মাসের মধ্যে। তাহলে এই এত অল্পসময়ে ক্যান্সার অতিরিক্ত মাত্রায় ছড়াল কিভাবে? কিভাবে ওগুলো রুপ নিল ভয়ঙ্কর টেরাটোকারনিনোমাস-এ? আর সাথে এটাও প্রশ্ন, এই চার বছর কোন জাহান্নামে আটকে ছিল জেরাল্ড ক্লার্ক?
মাথাটা ঝাঁকালো সে। এতসব প্রশ্নের উত্তর এত তাড়াতাড়ি আশা করা ঠিক না। তবে আধুনিক বিজ্ঞানে বিশ্বাস আছে তার। একদিকে নিজের গবেষণা অন্যদিকে আমাজনে তার সন্তানদের অনুসন্ধান—এই দুয়ে মিলে এই রহস্যের সমাধান করা সম্ভব হবে হয়ত।
দরজা ঠেলে লকার রুমের ভেতরে ঢুকল লরেন । বিশেষ এক ধরনের কাগজের তৈরি নীল রঙের একজোড়া জুতোর ভেতর জুতাসহ পা ঢুকালো সে, তারপর একটুখানি ভিক্স ভ্যাপোরাব জেলি নাকের ছিদ্রের নিচে মেখে নিল। লাশের উৎকট গন্ধ ঠেকাতে সাহায্য করে এটা। সবশেষে পরল সার্জিক্যাল মাস্ক। প্রস্তুতি শেষে ল্যাবে চুল সে। ভেতরে ঢুকে যা দেখল তার সাথে তুলনা করা যেতে পারে অতিমাত্রায় ভৌতিক কোন ছবির দৃশ্যের । জেরাল্ড ক্লার্কের দেহটা চিড়ে মেলে রাখা হয়েছে বায়োলজি ক্লাসের ব্যাঙের মত করে । বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কিছু রাখা হয়েছে লাল কমলা রঙের বিপজ্জনক চিহ্ন দেয়া কিছু ব্যাগে। আর কিছু রাখা হয়েছে স্টিলের নিক্তির উপর । সারা ঘরজুড়ে বিভিন্ন রকমের স্যাম্পল ফরমাল ডিহাইড ও তরল নাইট্রোজেনের ভেতর চুবিয়ে প্রস্তুত করা হচ্ছে। এই কাজের পরিণতি নিশ্চিতভাবেই কল্পনা করতে পারছে লরেন। সে জানে এই স্যাম্পলগুলো প্রস্তুত করে সেগুলো স্লাইডে করে সবগুলো স্লাইড একসাথে হিস্টলজিতে লরেনেরর কাছে পাঠানো হবে। ঠিক এভাবেই যেভাবে লরেন তার রিভিউয়ের উপকরণগুলো পেতে চায়।
ঘরে ঢুকতেই তীব্র গন্ধ নাকে লাগল মেনথোলেট জলি ভেদ করে । ব্লিচিং পাউডার, রক্ত, নাড়ী-ভুড়ি, সাথে মৃতদেহের পঁচা গ্যাস ধ্রুব গন্ধ তৈরি করছে। সে চেষ্টা করল যতটা সম্ভব মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার। তার চারপাশে পুরুষ ও মহিলারা ছোটাছুটি করছে পুরো ল্যব জুড়ে। পরনের অ্যাপ্রনগুলো রক্তে মাখামাখি হয়ে একটা ভয়ঙ্কর দৃশ্যের সূচনা করেছে যেদিকে কারোরই বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। এই অপারেশন তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ন, তাই ভয়ঙ্কর এক নৃত্যে একাগ্রচিত্তে মেতে উঠেছে মেডিকেল প্রফেশনালরা। লম্বা গড়নের বেশ পাতলা একজন পুরুষ তাকে হাত নেড়ে স্বাগত জানাল। লরেন মাখা নেড়ে সায় দিয়ে তাকে পাশ কাটিয়ে এক মহিলার দিকে এগুলো। মহিলা একটা ট্রে কাত করে ধরে জেরাল্ড ক্লার্কে যকৃতটা ওয়েস্ট ব্যাগে ঢুকাচ্ছে।
“কি পেলে, স্ট্যানলি?” তার ওয়ার্কটেবিলের কাছে পৌছে জিজ্ঞেস করল লরেন ।
একটা জিনিস দেখিয়ে কথা বলে উঠল ডা. হিবার্ট স্ট্যানলি । মুখে মাস্ক লাগানো থাকায় তার কথা আস্তে শোনা গেল। “আমি চাই এটা কেটে বের করার আগে তুমি একবার দেখ।”
সবাই একটা ঢালু ঠেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। টেবিলে জেরান্ড ক্লার্কের ছিন্নভিন্ন শরীরটা রাখা।
পিত্তরস, রক্ত আর বিভিন্ন রকমের তরল শরীর থেকে বেয়ে আসছে, ওগুলো টেবিলের ঢালু প্রান্তে রাখা বালতিতে গিয়ে পড়ছে । দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর হাতের খুব কাছেই জেরাল্ড ক্লার্কের মাথা, যেটার উপরের অংশ কেটে ফেলা হয়েছে।
“তার মস্তিষ্কটা দেখ,” রক্তিম মস্তিষ্কের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলল স্ট্যানলি।
একটা চিমটা দিয়ে প্যাথলজিস্ট খুব সতর্কতার সাথে বাইরের পাতলা মিনিনজিল ঝিল্লিটা উপরের দিকে সরিয়ে নিল। দেখে মনে হল যেন একটা পর্দা সরে যাচ্ছে । ঝিল্লির ঠিক নিচেই সেরিব্রেল করটেক্সের উঁচুভাঁজের জাইরাসগুলো পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। পুরো করটেক্সজুড়ে শাখা-প্রশাখার মত ছড়িয়ে আছে গাঢ় রঙের অসংখ্য ধমনী আর শিরা।
“খুলি থেকে ব্রেইনটা আলাদা করতে গিয়ে এটা পেলাম,” মস্তিষ্কের ডান ও বাম অর্ধাংশ আলাদা করল ডা, হিবার্ট । আর এই দুই অংশের মাঝে কিছুটা ভেতরের দিকে একটা মাংসপিণ্ড দেখা গেল। আকৃতিতে একটা আখরোটের মত। দেখে মনে হল ওটা করপাস ক্যালোসাম স্নায়ুগুচ্ছের ঠিক ওপরে বাসা বেধেছে। একটু খেয়াল করলেই ওটা থেকে বের হয়ে আসা সাদা স্নায়ুতন্ত্রগুলো দেখা যায় যেগুলো ওটাকে মস্তিষ্কের দুই অংশের সাথে যুক্ত করেছে। স্ট্যানলি এক নজর লরেনের দিকে তাকাল। “এটাও আরেকটা টেরাটোমা…কিংবা টেরাটোকারসিনোমা, যদি না এটাও অন্য টিউমারগুলোর মত হয় । কিন্তু এদিকে দেখো, এরকমটা এর আগে দেখি নি।” আঙুলের সাথে লাগানো চিমটার অগ্রভাগ দিয়ে মাংসপিণ্ডটা স্পর্শ করল সে।
‘ডিয়ার গড!” লরেন লাফিয়ে উঠল যখন দেখল টিউমারটা চিমটার অগ্রভাগ থেকে খানিকটা দূরে সরে গেল।“এটা…এটা দেখি নড়ছে!”
“অবাক করার মতই, তাই না? এ-কারণেই আমি চাইছিলাম তুমি একবার এটা দেখ।”
“কিছু টেরাটোমিক টিউমারের এ-রকম বৈশিষ্টের কথা পড়েছি আমি। বাইরে থেকে আন্দোলিত করলে তার সাড়া দিতে পারে। এই ধরনের টিউমারের ভেতর একরকম টিউমার আবার বেশি সুসংবদ্ধ যেগুলোর মধ্যে হৃৎপিতে কার্ডিয়াক মাংসপেশী থাকে যার কারণে স্পন্দনও সৃষ্টি করতে পারে একেবারে হৃৎপিণ্ডের মতই।” নিজের কণ্ঠটা আবশেষে খুঁজে পেল লরেন । “কিন্তু জেরাল্ড ক্লার্ক তো দুই সপ্তাহ ধরে মৃত।” শ্রাগ করল স্ট্যানলি। “টিউমারটার অবস্থান বিবেচনা করে আমার মনে হচ্ছে ওটা স্নায়ুকোষে পরিপূর্ণ। এই কোষগুলোর বেশ বড় একটা অংশ এখনও কর্মক্ষম অর্থাৎ উদ্দীপনায় সাড়া দিতে সক্ষম, সেটা দূর্বলভাবে হলেও। আমি আশা করি এসব সক্ষমতা খুব তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে আসবে, ওদিকে যেহেতু স্নায়ুগুলো তার রস হারাচ্ছে, সাথে বের হচ্ছে এই মাংসপেশীর ভেতর জমে থাকা ক্যালসিয়ামও।”
লরেন বার কয়েক লম্বা করে শ্বাস নিল তার বিচ্ছিন্ন চিন্তাগুলোকে গুছিয়ে নিতে। “তা সত্তেও টিউমারটা খুব দ্রুত সাড়া দেওয়ার মত সুসংবদ্ধ এখনও।”
“নিঃসন্দেহে…বেশ ভালই কর্মক্ষম ওটা। যতদ্রুত সম্ভব ওটা কেটে কয়েকটা স্লাইড তৈরি করব আমি।” সোজা হয়ে দাঁড়াল স্ট্যানলি। কিন্তু ভাবলাম, কেটে ফেলার আগে ওটা কিভাবে কাজ করছে তা নিজে এসে একবার দেখলে ভাল হয়, তাই তোমাকে আসতে বলা।”
ধীরে মাথা নেড়ে সায় দিল লরেন। ব্রেনের খোঁজে গেঁড়ে বসা টিউমারটির উপর থেকে তার দৃষ্টি সরে গেল মৃতদেহটার হাতের দিকে। হঠাৎ একটা চিন্তা মাথায় এল তার।
“আমার মনে হয়…” বিড়বিড় করে বলল সে।
“কি?”
“সারা দেহের এই টেরাটোমাসগুলো এবং ব্রেইনের এই বিশেষ টিউমারটি ক্লার্কের গজিয়ে ওঠা হাতের রহস্যের সূত্র হতে পারে।”
সরু হয়ে গেল প্যাথলজিস্টের চোখ দুটো । “তোমার মত করে ভাবছি না আমি।”
সরাসরি মুখের দিকে তাকাল লরেন। ছিন্নভিন্ন মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে থাকার চেয়ে ভাল কিছুর দিকে দৃষ্টি দিতে পেরে কিছুটা স্বস্তি পেল সে। “আমি যেটা বলতে চাচ্ছি সেটা একটা অনুমানমাত্র। আচ্ছা, এমন কি হতে পারে না লোকটার হাতটাও একটিা টেরাটোমা টিউমার? যেটা পূর্ণমাত্রায় সক্রিয় অস্থির মতই বড় হয়েছে?”
স্ট্যানলির ভ্রু দুটো উঁচু হয়ে গেল । “মানে নিয়ন্ত্রিত ক্যান্সার বৃদ্ধির মত? অথবা জীবন্ত ও কর্মক্ষম টিউমারের মত?”
“কেন নয়? আমরা নিজেরাও তো একইভাবেই বেড়ে উঠেছি, প্রথমে নিষিক্তি হওয়া একটি কোষ, তারপর সেটা থেকে দ্রুত অসংখ্য কোষের জন্ম, একসময় গঠন হয়ে যায় আমাদের শরীর, ঠিক ক্যান্সারের মতই তবে পার্থক্য হল শরীরের কোষগুলো বেড়ে ওঠে নিয়ন্ত্রিত ও সঠিক মাত্রায়। আর আমাদের এই স্টেম সেল রিসার্চ সেন্টারের লক্ষ্যও তো ঐ একটাই-কোষগুলো নিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে ওঠার ক্রিয়াকৌশল খুঁজে বের করা, তাই না? কি কারণে একটি স্বাভাবিক কোষ রুপান্তরিত হয় হাড়ের কোষেপেশী কোষে?” তারপর ছড়িয়ে রাখা জেরাল্ড ক্লার্কের দেহটার দিকে তাকাল সে।এবার তার চোখে-মুখে কোন ভয় নেই, সেখানে এখন বিস্ময়। “এই অপার রহস্যটা সম্ভবত আমরা সমাধান করতে চলেছি।”
“আর যদি এই মেকানিজমটা আবিষ্কার করতে পারি আমরা…” “এটার আবিষ্কার মানে ক্যান্সারের চিরসমাপ্তি, সেই সঙ্গে পুরো চিকিৎসাক্ষেত্ৰই আমূল পাল্টে যাবে।”
মাথা ঝাঁকাল স্ট্যানলি, তারপর ঘুরে আবারও ব্যস্ত হয়ে পড়ল তার রক্তাক্ত জগতে। “এখন ভালয় ভালয় তোমার ছেলে-মেয়েরা অনুসন্ধান কাজে সফল হলেই হয়। সেই প্রার্থনাই কর।”
লরেন মাথা নেড়ে সায় দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল, বেরোবার আগে হাতঘড়িতে সময়টা দেখে নিল একবার । ফ্রাঙ্ক ও কেলির সাথে নির্ধারিত কনফারেন্স কলের সময়টা এগিয়ে আসছে দ্রুত। নোটগুলোও মিলিয়ে নিতে হবে । শেষবারের মত একবার পেছন ফিরে তাকাল জেরাল্ড ক্লার্কের দেহাবশেষের দিকে। কিছু একটা আছে জঙ্গলে,” ফিসফিসিয়ে বলল সে। কিন্তু সেটা কি?”
আগস্ট ৭, রাত ৮:৩২
আমাজন জঙ্গল
সবার থেকে কিছুটা দূরে একা এক জায়গায় বসে আছে কেলি, তার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া রিপোর্টটা হজম করার চেষ্টা করছে সে প্রাণপনে। তার চারপাশ শব্দে মুখরিত হয়ে আছে পঙ্গপাল ও ব্যাঙের ডাকে। যেন রাতের সঙ্গীতে উন্মত্ত ওরা। আগুন থেকে ঠিকরে আসা আলো এই ঘন আধারঘেরা জঙ্গল ভেদ করতে পারে নি বেশিদূর পর্যন্ত। বড়জোর কয়েক মিটার হবে, তার পরেই রহস্যের আঁধারে ঢেকে থাকা জঙ্গল।
একটু দূরেই কয়েকজন রেঞ্জার্স হাটু গেড়ে বসে মোশন-সেন্সর সিস্টেম স্থাপন করছে। এটাই তাদের নিরাপদ সীমারেখা। লেজার-গ্রিড স্থাপন করা হয়েছে মাটি থেকে কয়েক ফিট উপরে, জঙ্গল আর ক্যাম্পের ঠিক মাঝখানটায় । এই গ্রিড বড় কোন পরভোজী বা হিংস্র প্রাণীকে ধারেকাছে ঘোরাঘুরি করা থেকে দূরে রাখবে, এমন কি ওগুলো দৃষ্টিসীমার ভেতর আসার আগে থেকেই।
রেঞ্জার্সদের পরিশ্রমী কাজ ছাপিয়ে কেলির দৃষ্টি দূরের ঘন জঙ্গলের দিকে। কি হয়েছিল জেরাল্ড ক্লার্কের এই জঙ্গলে?
এমন সময় তার পেছন থেকে একটা কণ্ঠ তাকে প্রায় চমকে দিয়ে বলে উঠল, “খবরটা আসলেই ভয়ঙ্কর।”
কেলি পেছন ফিরতেই দেখল প্রফেসর কাউয়ি দাঁড়িয়ে আছে। কতক্ষণ ধরে সে এখানে? বনের মাঝে নিচুপভাবে চলাফেরা করার সহজাত ক্ষমতাটা এই শামান যে এখনো হারায় নি তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। “উমম…হ্যা,” একটু তোতলাটে,সে। “খুবই বিরক্তিকর খবর।”
মুখ থেকে পাইপটা হাতে নিয়ে তাতে কিছু তামাক ভরল কাউয়ি, তারপর খুব আকর্ষনীয় ভঙ্গিতে আগুন জ্বালালো তাতে । “তোমার মায়ের বিশ্বাস ঐ ক্যান্সারগুলো এবং নতুন জন্মান হাতটার মধ্যে সম্পর্ক আছে?”
“এটা খুবই কৌতুহলোদ্দীপক…আর সম্ভবত এটা বেশ ভাল রকম ভিত্তিও আছে।”
“যেমন?”
নাকের ডগাটা একটু চুলকে চিন্তা ভাবনাগুলোকে গুছিয়ে নিল কেলি। “স্টেট থেকে এখানে আসার আগে এই রিজেনারেশন নিয়ে কিছু পড়াশোনা করেছিলাম আমি । খুঁজে খুঁজে এই বিষয়ের উপর কিছু লেখালেখি সংগ্রহ করেছিলাম। ভেবে ছিলাম আমাজনে এটা খুব কাজে আসবে।”
“হুমম…বেশ ভাল, কি ব্যাপারটা যখন জঙ্গল নিয়ে তখন জ্ঞান এবং প্রস্ততির মানে জীবন আর মৃত্যুর মাঝের পার্থক্য ছাড়া আর কিছুই নয়।” মাথা নেড়ে সায় দিল কেলি। তার চিন্তাগুলোকে এখনো একই সুতোয় বাঁধতে চেষ্টা করছে সে, সাথে কিছুটা সন্তুষ্টও যে নিজের ভাবনাগুলোকে জোরেশোরে, সাহসিকতার সাথে কারো সামনে প্রকাশ করতে পারছে।
“এই গবেষণা চলাকালীন সময়ে আমি বেশ মজার একটি প্রবন্ধ হতে পাই, এটা প্রকাশিত হয়েছিল ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের মুখপত্র প্রসিডিংস-এ। ওখান থেকে জানতে পারি ১৯৯৯ সালে ফিলাডেলফিয়ার একদল গবেষক রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়া কিছু ইঁদুর নিয়ে গবেষণা করেছিল। গবেষণাটি ছিল বিভিন্ন ধরণের ধমনীর টিসুর শক্তিবৃদ্ধি এবং এইডসের উপরে। কিন্তু ঐসব রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়া ইঁদুরগুলো নিয়ে কাজ শুরু করতেই অপ্রত্যাশিত একটি ঘটনা ঘটে।”
কাউয়ির একটি ভ্রু উঁচু হয়ে গেল । “কি সেটা?”
“গবেষকেরা ইদুরগুলোর কানে ছোট ছোট ছিদ্র করেছিল পরীক্ষার প্রাণীগুলোকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার জন্য, পরে তারা আবিষ্কার করে ছিদ্রগুলো খুব দ্রুতই সেরে গেছে, কোন রকম ক্ষতস্থানের দাগও নেই সেখানে। শুধু যে দাগগুলোই মুছে গেছে তা নয়, সেখানে পূণরায় জন্ম নিয়েছে কার্টিলেজ, রক্তনালী, ত্বক, এমন কি স্নায়ু কোষ।” এই বিস্ময়কর তথ্যটি হজম করার জন্য একটু সময় দিল কেলি, তারপর আবার শুরু করল সে।
“এই আবিষ্কারের পর দলের প্রধান গবেষক ডু, এলেন হেবার-কটজ আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালালেন ওগুলোর উপর । তিনি কয়েকটার লেজ কেটে দিলেন, সেখানে আবারো লেজ গাজালো। এরপর তিনি অপটিক-নার্ভ কেটে নিলেন, সেটাও সেরে উঠল। এমনকি স্পাইনাল কর্ডের একটা অংশ কেটে নেয়ার পরও দেখা গেল মাত্র একমাসের মধ্যেই সেটা পূরণ হয়ে গেছে। এর আগে এরকম অপ্রত্যাশিত রিজেনারেশন আর কোন স্তন্যপায়ীর মধ্যে দেখা যায় নি।”
মুখ থেকে পাইপটা সরিয়ে ফেলল কাউয়ি। “কি কারণে এমন হল?”
মাথা ঝাঁকাল কেলি । “সেরে ওঠা ঐ উঁদুরগুলোর সাথে সাধারণ ইদুরের পার্থক্য একটাই-তাদের নষ্ট হয়ে যাওয়া রোগ-প্রতিরোধের ব্যবস্থা।”
“এর তাৎপর্যটা কি?”
আনন্দের হাসি চেপে রাখল কেলি । সে চাইছে ব্যাপারটায় আরও উষ্ণতা ছড়াক, বিশেষ করে শ্রোতা যেখানে শোনার জন্য এমন উন্মুখ হয়ে উঠেছে। “প্রাণীদের উপর গবেষণায় এটা প্রমাণিত হয়েছে, বেশ কিছু প্রাণী, যেমন স্টারফিশ, বিভিন্ন রকম উভচর এবং সরীসৃপেরা এক বিশেষ ধরণের ক্ষমতা ধারণ করে যার ফলে তারা তাদের হারানো অস্থি আবারো জন্ম দিতে পারে । আমরা ভাল করেই জানি, ঐসব প্রাণীর রোগ-প্রতিরোধক ব্যবস্থা প্রাথমিকভাবে খুব ভাল পর্যায়ে থাকে। তাই ডা. হেবার-কটজ ব্যাপারটাকে নিয়ে আরও একটু গবেষণা করে একটা তত্ত্ব খাড়া করলেন। তিনি অনুধাবন করলেন, অনেক আগে, মানে সৃষ্টির শুরুর দিকে দীর্ঘ বিবর্তনের পথে একটা বিশেষ ক্ষমতা অর্জনের জন্য স্তন্যপায়ীদের একটা বাঁক নিতে হয়েছিল। বিনিময়ে বিসর্জন দিতে হয়েছিল আরেকটা মূল্যবান সক্ষমতাকে। ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়ার ক্ষমতা অর্জন করতে গিয়ে আমাদের ত্যাগ করতে হল শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের পূণর্জনের ক্ষমতা। আপনি দেখুন আমাদের জটিল রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাটি এমনভাবে ডিজাইন করা যে শরীরের অপ্রয়োজনীয় বা অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধিকে এই প্রতিরোধ-ব্যবস্থা দূর করে। যেমন ক্যান্সার, ব্যাপারটা আমাদের জন্য ভাল নিঃসন্দেহে, কিন্তু এমন গুনসম্পন্ন প্রতিরোধ ব্যবস্থাই কিন্তু অন্যদিকে বাধা হয়ে দাঁড়ায় নতুন করে কোন অঙ্গ জন্ম নেওয়ার ক্ষেত্রে। যেমনটা বাধা হয়ে দাঁড়ায় ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও। কারো শরীরে নতুন করে কোন অস্থি বা অঙ্গ জন্ম নেওয়ার অতি প্রাথমিক ও দূর্বল পর্যায়েই ওটা বাধার সম্মুখীন হয় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কারণে । এই কোষ জননকে অস্বাভাবিক ও অনাকাঙ্খিত মনে করে এই সিস্টেম তা দূর করে দেয়।”
“তাহলে এই জটিল প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা একই সাথে আমাদের বাঁচায় আবার ভোগায়ও?” ভ্রু কুচকে ফেলল কেলি। তার চিন্তা-ভাবনা আরও কেন্দ্রীভূত হল এখন। “যদি না কেউ এই প্রতিরোধ-ব্যবস্থাকে নিরাপদভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেয়, ঠিক ইদুরগুলোর বেলায় যেমন হয়েছিল।”
‘অথবা যেমনটা হয়েছিল জেরাল্ড ক্লার্কের বেলায়?”
কেলির দিকে আড়চোখে তাকাল কাউয়ি। “তাহলে তুমি বলছ যে কোন কারণে জেরাল্ডের ইমিউন-সিস্টেম বন্ধ বা নষ্ট করে দেয়া হয়েছিল যে কারণে তার নতুন করে হাত গজিয়েছে । কিন্তু এই ব্যাপারটাই আবার তার সারা শরীরে রাজত্ব ক্যান্সারের জন্য দায়ি।”
“হতে পারে, তবে মূল ব্যাপারটা এর থেকেও আরো জটিল । কিভাবে এটা হল? কি তার ক্রিয়া-কৌশল? কেন সব ক্যান্সারগুলো হঠাৎ করেই এভাবে আক্রমণ করবে?” মাথা ঝাঁকালো সে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপারটা তা হলো, কি এমন সেই জিনিস যার কারণেই এতকিছু হল?”
গভীর জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল কাউয়ি। “যদি এমন কিছুর অস্তিত্ব থেকে থাকে তবে তার খোঁজ পাওয়া যাবে এখানে। বর্তমানে সব রকমের ক্যান্সার ওষুধের তিন-চতুর্থাংশই আসে রেইনফরেস্টের গাছ-গাছড়া থেকে। তাহলে এমনকিছু পাওয়া কি খুবই অসম্ভব যেটা সারিয়ে না তুলে বরং ক্যান্সারের জন্ম দেয়?”
‘কারসিনোজেন?”
“হ্যা। তবে সাথে সুবিধাজনক পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াও থাকতে হবে, যেমন অঙ্গের পূণর্জন্ম হওয়া।”
“এটা অবাস্তব মনে হচ্ছে, কিন্তু জেরাল্ড ক্লার্কের অবস্থা বিবেচনা করলে যেকোন কিছুই সম্ভব। আমার অনুরোধে পরবর্তী কয়েকদিন ধরে এমইডিইএ-এর গবেষকেরা জেরাল্ড ক্লার্কে ইমিউন সিস্টেম নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করবে, তার ক্যাশারগুলোও পরীক্ষা করে আরও নিবিড়ভাবে। হয়তো তারা কিছু খুঁজে পাবে।”
মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল কাউয়ি। “চুড়ান্ত ফলাফল যা-ই আসুক না কেন সেটা ল্যাব থেকে আসবে না। এব্যাপারে আমি নিশ্চিত।
“তাহলে কোথা থেকে আসবে?”
কোন উত্তর দেবার পরিবর্তে জ্বলন্ত তামাক পাইপটা দিয়ে অন্ধকার জঙ্গলের দিকে ইঙ্গিত করল কাউয়ি।
কয়েক ঘণ্টা পর, জঙ্গলের আরও গভীরে, ক্যাম্পফায়ারের আলো সীমানার বাইরে একটি নগ্ন অবয়ব নিঃশব্দে সামনের দিকে কুঁজো হয়ে হাঁটতে লাগল গাঢ় অন্ধকারের দেয়াল ভেদ করে। তার হালকা-পাতলা শরীরটা রঙ করা । মেহনু ফল এবং ছাই মেশানো সেই রঙ তাকে দিয়েছে নীল-কালো রঙের জটিল এক বর্ণ, রুপান্তরিত করেছে জীবন্ত এক ছায়ায়।
অন্ধকার নামতেই ঐ আগন্তুকদের উপর চোখ রেখে আসছে সে। জঙ্গল তাকে শিখিয়েছে কিভাবে ধৈর্য ধরতে হয়। অনুসন্ধানী স্বভাবের টেলারি-রিন গোত্রের সবাই জানে সফলতা দুই পদক্ষেপের মাঝের নিরবতার উপর যতটা নির্ভর করে তার থেকে অনেক কম নির্ভর করে ছুটে চলার মধ্যে।
সারা রাতজুড়ে তার উপর আরোপিত দায়িত্ব সে পালন করেছে । আধারে ডুবন্ত এক প্রহরী হয়ে চোখ রেখেছে ক্যাম্পের উপর । ঘুরে ঘুরে দীর্ঘকায় মানুষগুলোকে দেখেছে সে, তাদের কাছ থেকে আসা বিদেশী গন্ধের সাথে পরিচিত হয়েছে। তাদের ভাষা অদ্ভুত লেগেছে তার কাছে, যেমনটা লেগেছে তাদের পোশাক-আশাক দেখে । এখনও সে দেখে চলেছে, খুঁজে ফিরছে স্মৃতিতে রাখার মত কিছু শেখার চেষ্টা করছে তার নতুন শত্রুদের ব্যাপারে।
মানুষটা চার পেয়ে জন্তুর মত বসে আছে কাদার ভেতর হাত উপুড় করে দিয়ে। একটা ঝিঝিপোকা তার ভর দিয়ে রাখা হাতের পাঞ্জার উপরে বসে পড়ল। ডেকে চলছে স্বভাবসুলভ সুরে । লোকটার দৃষ্টি ক্যাম্পের দিকে নিবদ্ধ থাকলেও পোকাটাকেও চোখেচোখে রাখছে।
সকাল হবে হবে করছে।
আর অপেক্ষা করতে চাইল না সে। যা বোঝার বুঝে ফেলেছে। নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। তারপর ছোটা শুরু করল দ্রুত গতিতে। তার দ্রুততা এবং নিঃশব্দতা এমন পর্যায়ের যে ঝিঝিপোকা তখনও তার দৃঢ় হাতের উল্টোপিঠে লেগে আছে রাতের শেষ গান গেয়ে চলেছে এখনও। সে তার হাতটা ঠোট পর্যন্ত উচু করে ফুঁ দিয়ে ঝিঝিপোকাটাকে উড়িয়ে দিল । শেষ বারের মত ক্যাম্পটাকে দেখে নিল সে, তারপর হারিয়ে গেল জঙ্গলে । সে দৌড়াবে কিন্তু একটা পাতাও নড়বে না, এমনভাবেই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে তাকে। কেউ জানতেও পারবে না তার আগমনের কথা, তবে এই অন্ধকারের মানুষটা ঠিকই জানে কি তার চুড়ান্ত দায়িত্ব।
মৃত্যু সবার কাছেই আসবে, শুধু বেছে নেয়া ব্যক্তিটি ছাড়া।
