আমাজনিয়া – ৬
আমাজন ফ্যাক্টর আগস্ট ১১,
বিকেল ৩:১২
আমাজন জঙ্গল
ট্রিগারের উপর আঙুল রেখে শটগানটা সামনের দিকে তাক করে আছে নাথান। কুমিরটা বড়জোর বিশ ফিট দূরে হতে পারে। কৃষ্ণকায় মেলানোসুকুস গোত্রের বিশাল একটি নমুনা। কালো রঙের এই কুমির সকল দৈত্যাকার কুমিরের রাজা । আমাজন নদীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরভোজী। নদীপাড়ের কাদার ভেতর শুয়ে ভরদুপুরে রোদ পোহাচ্ছে। কাদা লেগে থাকার কারণে বর্মসদৃশ গায়ের কালো আশটেলুলো বেশি আলো প্রতিফলিত করছে না। চোয়াল দুটো একটুখানি হা-করা। হলদে রঙের তীক্ষ দাঁতগুলো নাথানের গোটা তালুর চেয়েও বড় হবে। দাঁতের গর্তগুলোও দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। ফোলানো চোখ দুটো যেন শীতল কৃষ্ণগহ্বর, সেখানে উঁকি দিচ্ছে মৃত্যু। নিশ্চল এই দৈত্যটা দেখে কোনভাবেই বোঝা যাচ্ছে না তিনটি নৌকা ওর কাছ ঘেষে যাচ্ছে।
‘আক্রমণ করবে নাকি আমাদের?” নাথানের পেছন থেকে ফিসফিসিয়ে বলল কেলি ।
পেছনে না তাকিয়েই কাঁধ তুলল নাথান । “ওদের ভাবসাব আগে থেকে বোঝা যায় না, তবে আমরা ওকে না ঘাটালে ও কিছু করবে না।”
নাথান কুঁজো হয়ে ফোলানো নৌকাটার সামনের দিকে এগিয়ে গেল। তার নৌকায় ওব্রেইন সহোদরের সাথে আরও আছে রিচার্ড জেন এবং আনা ফও। একজন মাত্র রেঞ্জার কর্পোরাল ওকামটো ছোট্ট নৌকাটা চালাচ্ছে একেবারে পেছনে বসে। গাট্টাগোট্টা এশিয়ান কর্পোরাল বিরতিহীনভাবে শিষ দেয়ার অভ্যেস করে ফেলেছে। এই চারদিন ধরে এটা শুনতে শুনতে এখন অত্যাচার বলেই মনে হচ্ছে সবার কাছে। কি নদীপাড়ে বিশ্রাম নেয়া ঐ কালো কুমিরটা অদ্ভুত তার এই তাল-লয়হীন সুরের প্রতিক্রিয়া জানাল কাদার ভেতর হাত-পা নেড়ে প্যাচপাচ শব্দ করে। সবচেয়ে সামনের নৌকোটা খুব ধীরে কুমিরটাকে অতিক্রম করুন, যতটা সম্ভব নদীর অপরপাশ ঘেষে। নৌকাটার ডান পাশে অনেকগুলো এম-১৬ রাইফেল, সবগুলোই তা করা কালো কুমিরটার দিকে। প্রত্যেক নৌকায় ছয়জন করে আছে। সবচেয়ে সামনের নৌকায় আছে তিনজন রেঞ্জার এবং তিনজন ব্র্যাজিলিয়ান-প্রফেসর কাউয়ি, অলিন পাস্তারনায়েক এবং ম্যানুয়েল অ্যাজভেদো। ম্যানু তার পোষা জাগুয়ারটা নিয়ে নৌকার মাঝ বরাবর হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে । টরটর এর আগেও নৌকায় চড়েছে, মনে হয় ভ্রমণটা বেশ ভালই উপভোগ করছে সে। লেজ নাড়াচেছ অলস ভঙ্গিতে, শব্দ পেলেই কান দুটো খাড়া হয়ে যাচ্ছে, চোখদুটো আধখোলা, দেখে বোঝা যায় ঘুম পাচ্ছে ওর।
সবচেয়ে পেছনের নৌকায় আছে ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানসহ বাকি ছয়জন রেঞ্জার্স। “শালার কুমিরটাকে তো ওদের গুলি করা উচিত,” বলল ফ্রাঙ্ক।
নাথান শীতল দৃষ্টি হেনে বলল, “এটা বিপদাপন্ন প্রজাতি। গত শতকে এগুলো বিপুল পরিমাণে অবৈধশিকার করা হয় যে প্রায় বিলুপ্তির মুখে পড়েছিল ওরা। সম্প্রতি তাদের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে।”
“কিন্তু এই ভাল খবরটায় আনন্দিত হতে পারছি না, দুঃখিত, বিড়বিড় করে বলল ফ্রাঙ্ক তার চারপাশের পানির দিকে তাকিয়ে। তারপর মাথায় লাগানো বেসবল ক্যাপটা টেনে একটু নিচে নামিয়ে দিল, মনে হল যেন ক্যাপের পেছনে লুকাতে চাইছে সে।
“এই কেইমানরা প্রতিবছর শতশত মানুষ মারে,” মাথা নিচু করে খানিকটা সামনে ঝুঁকে আস্তে করে বলল জেন। “নৌকা ডুবিয়ে দেয়, ইচ্ছা হলে যেকোন কিছুই আক্রমণ করে। খবর পড়েছিলাম, একটা ব্ল্যাক কেইমান মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল, ওটার পেট কেটে নৌকার দুটো মোটর-ইঞ্জিন বের করা হয়েছিল। ভাবা যায়? পুরো দুটো মোটর গিলে নিয়েছে! ওব্রেইনের সাথে আমিও একমত, তাই বলছিলাম ঠিক জায়গামত যদি কয়েকটা গুলি লাগানো যায়…”
এরইমধ্যে সামনের নৌকাটা কুমিরের রোদ পোহানো সীমানা পার হয়ে গেছে, এবার নাথানদের পালা, ধীরে ধীরে ঘোলা পানির স্রোত বেয়ে দৈত্যটা পার হতেই গর্জে উঠল তাদের নৌকার মোটর । “চমৎকার,” বলল নাখান। কুমিরটার দিকে তাকাল সে, ওটার অবস্থান ত্রিশ মিটারের বেশি দূরে হবে না। দেখতে বেশ ভয়ঙ্কর ওটা, মনে হয় যেন অন্যকোনো হিংস্র জগতের। “এটা তো বিচ্ছিরি রকমের সুন্দর।”
“একটা পুরুষ, তাই না?” কৌতুহলপূর্ণ চোখে জিজ্ঞেস করল আনা ফঙ। “আঁশটেগুলোর সরু প্রান্ত আর নাক দেখে তো সেরকমই মনে হয়।”
“শশশ!” কেলি শব্দ করে উঠল। “ওটা তো নড়ছে!” প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল সে। খুব দ্রুত নৌকার অপর প্রান্ত গিয়ে বসল। রিচার্ড জেনও অনুসরন করল তাকে। শক্ত খোলসে ঢাকা মাথা আস্তে করে উপরে তুলল দৈত্যটি, তারপর নাথানদের নৌকাটা দেখতে লাগল । ‘ঘুম ভাঙছে ওটার,” বলল ফ্রাঙ্ক।
“এটা মোটেও ঘুমিয়ে ছিল না,” নৌকাটা আরেকটু নিরাপদ দূরত্ব যেতেই শুধরে দিল নাখান। “আমরা ওটা নিয়ে ঠিক যতটা কৌতুহলি, ঔটাও আমাদের নিয়ে ততটাই কৌতুহলি।”
“ঐ জিনিসটা মোটেও কৌতুহলি নয়, আমি নিশ্চিত, পুরোপুরি ওটাকে অতিক্রম করে যেতেই খুশিমনে বলল ফ্রাঙ্ক। “আসলে ওটা ভাবছে সুযোগ পেলেই আমার মাথাটা…” দৈত্যাকার কুমিরটা হঠাৎ চারপায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল, সাথে সাথেই দ্রুত গতিতে কয়েক পা সামনে এগিয়ে ঝাঁপ দিল নদীর ঘোলা-পানিতে । মুহূর্তেই নদীর বাদামী জলে
উধাও হয়ে গেল। কিছু গুলি ছুড়ল রেঞ্জার নৌকা থেকে কিন্তু কুমির হঠাৎ এমন চলতে শুরু করায় ও ক্ষিপ্রতার কারণে সবাই হতবাক হয়ে গেছে। ট্রিগার টিপতে দেরি হয়ে গেছে ততক্ষনে। কিছু বুলেট নদী পাড়ের কাদায় গিয়ে বিধলো।
“থামো!” চিৎকার দিল নাথান। “ওটা পালিয়ে যাচ্ছে। আত্মরক্ষার কিছু না থাকায় কেইমানদের প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো ওরা অপরিচিত পরিস্থিতি থেকে দৌড়ে পালাতে চায় তবে যদি না কেউ ওদেরকে ক্ষেপিয়ে তোলে।
রডনি গ্রেপ্স নামের এক কালো কর্পোরাল রেঞ্জার বেশখানিকটা এগিয়ে গেল, পানিতে খুঁজছে কিছু, তার বন্দুক তা করা। আমি দেখছি না।”
ব্যাপারটা ঘটল খুব দ্রুত । একেবারে পেছনের নৌকোটা শূন্যে লাফিয়ে উঠল প্রায় তিন ফিটের মত । নাথান একঝলক কুমিরটার পুরু এবড়ো-খেবড়ো লেজ দেখতে পেল। দাঁড়িয়ে থাকা রেঞ্জারের মাথা নিচের দিক দিয়ে পানিতে পড়ে গেল।
ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেল নৌকার ইঞ্জিনের দিকে । “গ্রেইভস!”
পড়ে যাওয়া কর্পোরাল হঠাৎ পানির ভেতর থেকে মাথা তুলল। নৌকাগুলো থেকে মাত্র দশ মিটারের মত দূরে সে। মাথার হ্যাটটা ভেসে গেলেও তার অস্ত্রটা বেহাত হয় নি। সে স্রোতের উল্টো দিকে থাকায় বেশ জোরে পা দিয়ে মাটি আঘাত করে করে সাঁতরাতে কাছের নৌকায় উঠতে চাইছে। তার ঠিক পেছনে, সাবমেরিনের ভেসে ওঠার মত করে কুমিরটার মাথাটা পানির উপর জেগে উঠল। ওর চোখ দেখে মনে হচ্ছে দুটো পেরিস্কোপ।
রেঞ্জার্সরা সবাই দ্রুত নিজেদের অস্ত্র হাতে নিয়ে গুলি করতে উদ্যত হল কি গুলি ছোড়ার আগেই কেইমানটা আবার ডুব দিল পানিতে।
নাথান একমুহূর্ত কল্পনা করে নিল কুমিরটার কথা-পুরু লেজ নেড়ে সামনের দিকে আগাতে থাকবে ওটা, খুঁজতে থাকবে পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করতে থাকা একজন মানুষকে। “ধ্যাত!” বলল সে, তারপর গলার সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল, “কর্পোরাল গ্রেইস! নড়বেন না! লাথি দেবেন না” তার কথা করেলের কান পর্যন্ত পৌছাল না । এরইমধ্যে সবাই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে, সবাই তাকে তাড়াতাড়ি করতে বলছে। ভয়ের কারণে পা দুটো আরও দ্রুত নাড়াতে থাকল সে। ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান নৌকাটা একটু পেছনে নিতে থাকল ভীতসন্ত্রস্ত সাঁতারুকে তোলার জন্য। আবারও চিৎকার করে উঠল নাথান : “সাঁতার দেবেন না” এবারও ব্যর্থ হল তার চিৎকার । অবশেষে সে যা করার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল, আর এটা করার জন্য প্রয়োজন প্রচুর সাহসের কিন্তু তার নিজের ভেতর সাহসের পরিবর্তে জেগে উঠল হতাশা। সে দ্রুত শটগানটা পাশে ছুড়ে দিয়ে ঝাঁপ দিল পানিতে সাঁতারুর মত সাঁতরাতে থাকল। চোখদুটো খোলা কিন্তু অন্ধকারের মত ঘোলা পানির কারণে কয়েক ফিটের দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছে না। মাটিতে সজোরে একটা ধাক্কা দিয়ে হাত দুটো সামনে নিয়ে এল সে, তারপর পানির স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে নিয়ে এগোতে থাকল। টের পেল শেষের নৌকোটা তাকে পাশ কাটিয়ে বা-দিকে চলে যাচ্ছে । একটুখানি জেগে উঠতেই তার থেকে কয়েক মিটার দূরে রডনি গ্রেইভকে দেখতে পেল সে। “কর্পোরাল গ্রেইভ! লাথি মারা বন্ধ করুন! তা-না হলে আপনি কিন্তু মরবেন!” নাথান নিজের হাত-পাও নাড়ছে না, চিৎ হয়ে অর্ধনিমজ্জিত অবস্থায় ভেসে রেঞ্জারের দিকে এগুচ্ছে।
কর্পোরাল নাথানের দিকে ঘুরতেই তার চোখদুটো প্রশস্ত হয়ে গেল, তীব্র আতঙ্ক গ্রাস করল তাকে। “হায় ঈশ্বর!” চিৎকার করে উঠল সে রুদ্ধশ্বাসে, পা দিয়ে মাটি আঘাত করতে থাকল আগের চেয়েও দ্রুত গতিতে। তার কাছের নৌকাটি তার থেকে মাত্র তিন মিটার দূরে। সবাই এরইমধ্যে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তাকে তোলার জন্য।
নাথান খুব কাছেই কিছু একটার উপস্থিতি অনুভব করল যেটা স্রোতের বিপরীতে চলে গেল তারপর কর্পোরাল এবং তার মাঝখানে জেগে উঠল ওটা। বিশাল শরীর, ক্ষিপ্রগতি। হায় ঈশ্বর! “গ্রেইভ!” শেষবারের মত কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে চিৎকার দিয়ে বলল সে।
আরেকজন রেঞ্জার, পানিতে পড়া রেঞ্জারের ভাই টমাস গ্রেইভ নৌকা থেকে সামনের দিকে ঝুঁকে আছে। তার হাত দুটো প্রসারিত করা ভাইকে তোলার জন্য। পেছন থেকে দুজন রেঞ্জার তার বেল্ট শক্ত করে ধরে আছে যাতে তুলতে গিয়ে সে নিজে পড়ে না যায় । সে তার হাত দুটো আরও সামনের দিকে এগিয়ে দিল, শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে। অন্যদিকে তার মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে আছে ভয়ে। রডনি আরেকটু এগিয়ে গেল, তার আঙুলগুলো ব্যাকুল হয়ে উঠল ভায়ের হাত ধরার জন্য।
ঠিক তখনই একটা হাত ধরে ফেলল টমাস। “তাকে ধরেছি!” চিৎকার দিল সে। হাতের মাংসপেশীগুলো লোহার মত শক্ত হয়ে উঠল।
দু-জন সৈন্য তাকে পেছন দিকে টানছে। তার আরেকটা হাত রডনির ভেঁজা জ্যাকেটটা ধরে ফেলল। তার ভায়ের শরীরের উপরের অংশ নৌকার উপরে এখন। রডনিও আরেকটু জোর খাটাল এবার। পানি থেকে ধীরে নৌকার উপর উঠতে থাকল সে। প্রথমে বুক, তারপর পেট। সে বুকের ভেতর আটকে থাকা দম ছাড়লে তারা হাসল।
“শালার কুমির।”
কিন্তু যেইনা পা দুটো শূন্যে তুলেছে নৌকার উপরে তোলার জন্য ঠিক তখনি চোখের পলকে কুমিরটা বিশাল হা-করা মুখ নিয়ে পানির উপর উঠে রডনির বুটপরা পা-দুটো মুখে পুরে নিল, একেবারে উরু পর্যন্ত। তারপর চোখের পলকে বিশাল চোয়াল দুটোর মাঝে শিকারকে আটকে নিয়ে পানিতে ফিরে গেল ওটা । বিশাল দৈত্যের সাথে যুদ্ধ করার মত কোন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই রডনিকে ওর ভাইয়ের হাত থেকে একরকম ছিড়েই নিয়ে গেল কুমিরটা। একটা কান্নার শব্দ ঠোটে নিয়েই ডুবে গেল সে। রডনি চলে গেলেও তার শেষ আর্তচিৎকারটা পুরো বনজুড়ে প্রতিফলিত হতে থাকল। রেঞ্জাররা সবাই হাটু গেঁড়ে বসে জলের দিকে অস্ত্র তাক করে আছে। গুলি ছুঁড়ল না কেউ, নিশ্চুপ সবাই । গুলি চালালে এলোপাথাড়িভাবেই চালাতে হবে, আর সেটা কুমিরের পরিবর্তে রডনির শরীরেও লাগতে পারে, তার মৃত্যুর কারণ হতে পারে । তাদের অভিব্যক্তি দেখে নাথান বেশ ভালই বুঝতে পারল, রডনি গ্রইভস আর নেই।
তারা সবাই দৈত্যটার বিশালাকৃতি দেখেছে। দেখেছে রাক্ষুসে চোয়াল দুটো। নাথানও ভাল করেই জানে গুলি না করে রেঞ্জাররা ঠিকই করেছে।
কুমিরটা প্রথমে গভীরে নিয়ে যাবে রডনিকে, তারপর পুরোপুরি ডুবে যাবার আগপর্যন্ত শুধু কামড় বসিয়েই পড়ে থাকবে ওটা। এরপর হয়তো ওকে ছিড়ে খাবে অথবা জলমগ্ন কোন এলাকার গাছের শেকড়ের মাঝে সংরক্ষণ করবে পচে যাবার জন্য, তখন ছিড়ে খেতে সুবিধা হবে না ওটার । পুরো ব্যাপারটা এমনভাবে ঘটল কারো কিছুই করার থাকল না। নাথান তখনো পানিতে ভাসছে হাত-পা স্থির করে দিয়ে। কুমিরটা হয়তো খুশি মনে তার শিকারকে নিয়ে ব্যস্ত কিন্তু এখানে একটা কুমির যেহেতু আছে সেহেতু আরও পরভোজীর বসবাস করাটা অবান্তর নয় । আর বিশেষ করে এই মুহুর্তে জায়গাটা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে রডনির রক্ত নদীতে ছড়িয়ে পড়ায়। নিজেকে শরীরটা আবার স্রোতের ধারায় ভাসাতে থাকল সে যতক্ষণ না নৌকা থেকে বাড়িয়ে দেয়া কোন হাত ধরতে পারল । কয়েকজন তাকে ধরে টেনে ওঠাল নৌকায় । উঠেই তার চোখে পড়ল বিধস্ত মুখে দাঁড়িয়ে থাকা টমাস গ্রেইভসের দিকে। কপোরাল নিজের দু-হাতের দিকে চেয়ে আছে অপলক চোখে। যেন তার ভাইকে ধরে রাখার মত যথেষ্ট শক্তি না থাকায় নিজের হাত দুটোকেই দোষ দিছে।
“আমি খুবই দুঃখিত, কোমল কণ্ঠে বলল নাথান ।
মুখ তুলে তাকাল লোকটা। তার চোখে চোখ পড়তেই নাথান অবাক হয়ে লক্ষ্য করল মানুষটার চোখে ক্রোধের আগুন জ্বলছে। তার ভাই চলে গেলও নাথান যে বেঁচে গিয়েছে সেই কারণে ক্ষুব্ধ । একটু অমার্জিতভাবে ঘুরে দাঁড়াল টম।
ইউনিটের আরেকজন ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান কথা বলে উঠল । সেও ক্ষুব্ধ। “ঈশ্বরের দোহাই লাগে, বল তে কি করতে চাচ্ছিলে তুমি? তুমি কি জানো তুমি একটা মাথামোটা টাইপের লোক? আরেকটুর জন্যে তুমিও মরতে বসেছিলে!”
নাথান মাথার ভেঁজা চুলগুলো হাত দিয়ে ঝাড়া দিতে লাগল। চলতি সপ্তাহে এটা নিয়ে দু-বার আমাজনের নদীতে ঝাপ দিল কাউকে বাঁচানোর জন্য। নিঃসন্দেহে এটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। আমি তাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম,” বিড়বিড় করে বলল সে। ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানের কণ্ঠের আগুন আর নেই। এরইমধ্যে নাথানের নিজের নৌকাটা তার পাশেই এসে থেমেছে। একটা নৌকা পার হয়ে নিজেরটায় ফিরে গিয়ে বসে পড়ল তার আগের জায়গায়। সবাই যার যার জায়গায় বসার পর ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান হাত নেড়ে আবার যাত্রা শুরু করতে বলল । নাথান শুনতে পেল টম গ্রেইভস ওয়াক্সম্যানকে বাধা দিয়ে কিছু বলছে।
“ক্যাপ্টেন…আমার ভাই…ওর লাশটা?”
“সে আর নেই, কর্পোরাল…সে আর নেই!”
এরপর তিনটি নৌকার বহরটি আবার চলতে শুরু করল সামনে। অন্য নৌকায় বসে থাকা প্রফেসর কাউয়ির চোখে চোখে পড়ল নাথানের । দুঃখের সাথে মাথা নাড়ল সে। জঙ্গলে যত সংখ্যক মিলিটারিই থাকুক, যত গোলাবারুদই থাকুক, কোন কিছুই তোমাকে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারবে না। জঙ্গল যদি তোমাকে চায়, তোমাকে সে নেবেই। একেই বলে আমাজন ফ্যাক্টর। বিপুল সবুজের এই অরণ্যে যারাই আসে সবাইকেই এই অরণের অনুকম্পা ও পাগলামি দুটোই দেখতে হয় ।
নাথান তার হাটুতে কিছু একটার স্পর্শ অনুভব করতেই ঘুরে দেখল কেলি তার পাশে এসে বসেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল সে।
“বেশ বোকার মতই কাজ করছিলে তুমি, আসলেই বোকার মত, তবে…” নাথানের দিকে তাকাল মেয়েটি, “তুমি যে চেষ্টা করেছ সেটা দেখে আমার খুব ভাল লেগেছে ।”
মর্মান্তিক এই ঘটনায় নাথান এতটাই মুষড়ে পড়েছে যে আলতো করে মাথা নেড়ে সায় দেয়া ছাড়া আর কিছুই বলার শক্তি নেই তার। তবে কেলির কথাগুলো নাথানের ভেতরে জমে থাকা শীতলতাকে উষ্ণ করে দিল। হাটুর উপর থেকে হাতটা সরিয়ে নিল সে দিনের বাকি ভ্রমনটুকু কাটল নীরবতায়। সবাই চুপ, এমনকি কর্পোরাল ওকামাটোর মুখেও কোন শিষ নেই, নৌকাটা চালিয়ে গেল চুপচাপ । দিগন্তে সূর্য হেলে পড়ার আগপর্যন্ত তাদের ভ্রমণটা এরকম নীরবই রইল। যেন সবাই যতটা পারে নিজেকে রডনির মৃত্যু থেকে দূরে রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছে। ক্যাম্প তৈরির পর পরই এই নিদারুশ সংবাদটি ওয়াওয়ের বেস-স্টেশনে পাঠিয়ে দেয়া হল। রাতের খাবারে থাকল মাছ, ভাত আর বড় এক প্লেট গাছআলু, যেগুলো ক্যাম্পের পাশেই কোন একজায়গা থেকে সংগ্রহ করেছে প্রফেসর কাউয়ি। খাবারের সময়টাতেও থমথমে ভাব বিরাজ করল। একটা বিষয়ে কিছু আলোচনা হল আর সেটা মিষ্টি স্বাদের গাছ আলু নিয়ে। নাথান জিজ্ঞেস করল এগুলো কোথা থেকে এসেছে। “এত রকমের গাছ একসাথে তো এমন দেখা যায় না।”
প্রফেসর কাউয়ি ফিরে এল সাথে পাম পাতায় বানানো বেশ মজবুত একটি ব্যাকপ্যাক নিয়ে, যেটা কাণায় কাণায় বুনোআলুতে ঠাসা। কাউয়ি গভীর জঙ্গলের দিকে দেখিয়ে মাথা নেড়ে সায় দিল। আমার অনুমান, যেখান থেকে এগুলো আনলাম সেটা একটা পুরনো ইন্ডিয়ান বাগান ছিল । কিছু অ্যাভোক্যাডো এবং ছোটছোট কয়েকটি আনারস গাছ দেখলাম ওখানে।”
কেলি সোজা হয়ে বসল।” ইন্ডিয়ান বাগান?”
গত চারদিনে একজনের ছায়াও দেখে নি তারা। জেরাল্ড ক্লার্ক যদি তার ব্যবহৃত নৌকাটা কোন ইয়ানোমামো গ্রাম থেকে নিয়েও থাকে তবু নাথানদের কাছে তার কোন সূত্রই নেই সে কোথা থেকে ওটা নিয়েছে। “অনেক আগেই এটা পরিত্যাক্ত হয়েছে, কেলির চোখে যে আশার আলো ফুটে উঠেছিল তা নিভিয়ে দিয়ে বলল কাউয়ি। “এরকম জায়গা পুরো আমাজনজুড়ে অনেক আছে। প্রায় সবগুলোই নদীর আশেপাশের অঞ্চলে। এখানকার গোত্রের মানুষেরা বিশেষ করে ইয়ানামামোরা যাযাবর গোছের। তারা ঘর বানায়, বাগান করে, এক দু-বছর থাকে তারপর চলে যায় অন্যখানে। আমার মনে হয় না এমন একটা বাগানের উপস্থিতি বিশেষ কোন তাৎপর্য বহন করে।”
“কিন্তু এটা নিদেনপক্ষে কিছু একটা তো বটেই,” বললো কেলি, এখনো চেষ্টা করছে। জেগে ওঠা আশাটাকে বাঁচিয়ে রাখতে। “কেউ যে এখানে আছে বা ছিল তার একটা চিহ্ন অন্তত দেখা গেল।”
“আর সেইসাথে চমকার এই আলুগুলোও। ভাত খেতে খেতে তো প্রায় ক্লান্তই হয়ে গিয়েছিলাম,” বলল ফ্রাঙ্ক।
হাসল ম্যানুয়েল, জাগুয়ারটার গলায় আঙুল বোলাচ্ছে। বিশাল বড় এক মাগুরমাছ খাওয়ানো হয়েছে ওটাকে। এখন বসে আগুন পোহাচ্ছে।
একটু দূরে, রেঞ্জার্সদের দ্বিতীয় ক্যাম্প-ফায়ারটা জলছে । সূর্যাস্তের সময় তারা ছোট্ট পরিসরে তাদের হারানো কমরেডের জন্যে স্মরণসভা করেছে। এখন আবার মনমরা সবাই। দু-একটা কথাবার্তা চললো তাদের মধ্যে কিন্তু আগের রাতের মত নয়। গতরাতে রেঞ্জাররা সবাই মিলে হাসি-ঠাট্টা আর মজার-মজার সব কৌতুক দিয়ে মাতিয়ে রেখেছিল। আজ রাতে তার কিছুই নেই।
“সবারই এখন ঘুমানো দরকার, কেলি উঠে দাঁড়িয়ে বললো। “কালকেও আরেকটা লম্বা দিন কাটাতে হবে আমাদের।” সবাই তার কথায় সায় দিয়ে উঠে দাঁড়াল, কেউ কেউ হাই তুলল। তারপর চলে গেল যার যার হ্যামোকে । ল্যাট্রিন থেকে ফিরে নাথান দেখল প্রফেসর কাউয়ি তার হ্যামোকে র কাছে দাঁড়িয়ে পাইপ টানছে। “প্রফেসর?” নাথান বললো, বুঝতে পারল কাউয়ি তাকে আলাদাভাবে কিছু বলতে চায়। “আসুন, একটু হাটি। রেঞ্জাররা মোশন-সেন্সর অ্যাকটিভ করুক ততক্ষণে।” শামান তাকে নিয়ে কিছুটা জঙ্গলের ভেতর চলে গেল ।
“কি হয়েছে?” পেছনে হাটতে হাটতে জিজ্ঞেস করল নাথান। চুপ চাপ হাটছে কাউয়ি, বেশ অন্ধকারে গিয়ে তবেই থামল সে। ক্যাম্পে দু-জায়গায় জ্বলতে থাকা আগুন দুটো দেখে মনে হচ্ছে দুটো সবুজ বাতি । পাইপে লম্বা একটা টান দিল কাউয়ি।
“এখানে নিয়ে এলে যে?” ছোট্ট একটা ফ্লাশ-লাইট জ্বালালো কাউয়ি।
চারপাশে তাকালো নাথান। বেশ পরিস্কার কিছুটা জায়গা। শুধু কিছু গাছ ছাড়া সবই কেটে ফেলা হয়েছে। কিছু রুটি গাছ, কমলাগাছ ও কিছু ডুমুরগাছ দাঁড়িয়ে আছে। ঝোপঝাড় ও ছোটছোট গাছে বনের মেঝেটা ঢেকে আছে তবে তার ঘনত্বটাকে প্রাকৃতিক বলে মনে হচ্ছে না। নাথান বুঝতে পারল সে কি দেখছে। ইন্ডিয়ানদের পরিত্যাক্ত কোন বাগান এটা। নিশ্চিত হওয়ার মত আরও একটা জিনিস চোখে পড়ল তার । দুটো বাঁশের খুঁটি বাগানের মাঝখানে পেতা, দুটোর মাথাই পেড়ানো। সাধারণত এই ধরণের আলোর ব্যবস্থা করা হয় টক-টক পাউডার ব্যবহার করে। ওগুলো বাশের ফঁাকে পুরে তারপর জ্বালানো হয়। এটা করা হয় ফসল কাটার সময় । ঐ সময় পোকার উপদ্রব বেশি হয় তাই পাউডার পোড়ানো হয়। এটার ধোঁয়ার বিচ্ছিরি গন্ধে ক্ষুধার্ত পোকা-মাকড়েরা কাছে আসে না । কোন সন্দেহ নেই, ইন্ডিয়ানরা এক সময় চাষবাস করেছিল এখানে। আমাজনে চলা-ফেরার সময়ে এর আগেও নাথান অনেক চাষ-জমি দেখেছে কিন্তু আজ রাতে যা দেখছে তা পুরোপুরি আলাদা। আবাদি জমিটুকুতে ফসল হয়ে উপচে পড়ছে, জায়গায় জায়গায় জঙ্গলে ছেয়ে গেছে। পুরো ব্যাপারটায় যেন ভৌতিকতার ছাপ আছে। কাউয়ি যে এতক্ষণে তার দিকে শীতল দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তা বুঝতে পারল নাথান।
“আমাদেরকে ফলো করা হচ্ছে, বলল কাউয়ি। কথাটা প্রকম্পিত করল নাথানকে।
“কি বলছ তুমি?”
কাউয়ি তাকে বাগানে নিয়ে গেল । হাতের ফ্লাশ-লাইট ফলেভরা একটি গাছের দিকে ধরে আলোটা নামিয়ে আনল নিচের একটা ডালে। “এই ডাল থেকে ফল পেড়ে নেওয়া হয়েছে।” কাউয়ি এবার ঘুরে দাঁড়াল। “আমি বলব, আমরা যখন নৌকাগুলোকে টেনে পাড়ে তুলছিলাম ঠিক সেই সময়টাতে এটা করা হয়েছে। ভেঙে নেয়া কিছু ডালপালায় এখনও ওগুলোর আঠা লেগে আছে।”
“তুমি খেয়াল করেছ এটা?” ‘আমি লক্ষ্য করছিলাম এগুলো । গত দুইদিন সকালবেলায় আমি যখন ফল আনতে বনে ঢুকেছিলাম, খেয়াল করেছিলাম আগের রাতে আমার ব্যবহার করা রাস্তাটা একটু অন্যরকম হয়ে গেছে। কয়েকটা ছোট ডাল ভাঙা, তারপর দেখলাম একটা হগপ্লাম গাছের অর্ধেক ফল এক রাতের ভেতরেই সাবাড়।”
“বনের জীব-জন্তুও তো হতে পারে, রাতে যেগুলো খাবার খুঁজে বেড়ায়?”
মাথা নেড়ে সায় দিল কাউয়ি। আমিও এমনটাই ভেবেছিলাম প্রথমে। তাই চুপ ছিলাম। কোন পায়ের ছাপ বা সুনির্দিষ্ট কোন প্রমাণ ছিল না আমার কাছে। কি এই ঘটনাগুলো আমাদের চারপাশে এত নিয়মিত ঘটছে যে এগুলোকে আর কাকতালীয় বলে চালিয়ে নিতে পারছি না। আমাকে অন্যভাবে ভাবতে হচ্ছে। তাই বলছি, কেউ আমাদের পেছনে লেগেছে।”
“কে?”
“খুব সম্ভবত ইন্ডিয়ানরা । এই জঙ্গলটা তাদের, ওরা ভালো করেই জানে কিভাবে অদৃশ্য থেকে কাউকে অনুসরন করতে হয়।”
“ইয়ানোমামো?”
“খুব সম্ভবত,” বলল কাউয়ি। নাথানের কাছে মনে হল যেন কাউয়ির কণ্ঠে কিছুটা সন্দেহের আভাস ফুটে উঠছে। এছাড়া আর কে হতে পারে? চোখ দুটো সরু হয়ে গেল তার।
“ঠিক জানি না আমি। তবে যে ব্যাপারটায় আমার সন্দেহ হচ্ছে, আমাদেরকে যারা অনুসরন করছে তাদেরকে কিন্তু খুব বেশি সতর্ক মনে হচ্ছে না। আসলে এরকম কাজ যারা করে তারা কখনও নিজেদের উপস্থিতি চাউর হয়ে যাবে এমন কিছু করবে না।”
“কিন্তু তুমি তো একজন ইন্ডিয়ান, সাদাচামড়ার কারোর চোখেই এগুলো পড়বে না, এমনকি আমি রেঞ্জারদেরও না।”
“হয়তোবা,” বললো কাউয়ি । নাথানের কথায়ও সন্দেহ যায় নি মনে হচ্ছে । “ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানকে বলা উচিত আমাদের।”
“এজন্যেই তোমাকে আলাদা ডেকে নিয়ে এলাম, বুঝেছ?”
“মানে বুঝলাম না, কি বলতে চাইছ তুমি?”
“যদি তারা ইন্ডিয়ান হয়ও তবুও আমি মনে করি না এটা রেঞ্জারদের কানে দেয়া উচিত । ওরা এটাকে একটা ইস্যু বানিয়ে পুরো জঙ্গল চষে বেড়াবে ইন্ডিয়ানদের খোঁজে। তাছাড়া ওরা ইন্ডিয়ান হোক আর যে-ই হোক, কিছু সময় পর এমনিতেই হারিয়ে যাবে। এখন যদি তাদের সাথে আমরা যোগাযোগ করতে চাই তবে তাদেরই আমাদের কাছে আসতে দেয়া উচিত বলে মনে করি আমি। ওদেরকে আমাদের স্বভাব-চরিত্রের সাথে পরিচিত হতে দাও। যা করার ওরাই করুক প্রথমে আমরা আগ বাড়িয়ে কিছু করতে গেলে বিপত্তি বেধে যাবার সম্ভাবনাই বেশি। স্বাভাবতই, এমন সতর্কবার্তার বিরুদ্ধে নাখান আপত্তি জানাতে চাইল। এই অভিযান সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে দৃঢ়ভাবে কাজে নেমেছে সে। ভেতরে অনেক উদ্বিগ্নতা তার। এই উদ্বেগ জঙ্গলে টিকে থাকার, এই উদ্বেগ এত বছর পর তার বাবার নিরুদ্দেশের রহস্যের সমাধানের। ধৈর্য আর কতই বা রাখা যায় । সঁাতস্যাতে সময়টা এগিয়ে আসছে, বৃষ্টিও শুরু হবে খুব তাড়াতাড়ি। আর তখন জেরাল্ড ক্লার্কের ব্যবহৃত পথ পানিতে ধুয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ধুয়ে যাবে তাদের সমস্ত আশা। তারপরও কথা থেকে যায় । নাথানের বেশ ভালই মনে আছে, আজকের কুমিরের আক্রমণের কথাটা । ঐ একটি ঘটনাই সবাইকে এটা মনে করিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট, আমাজন বন হল রাজা । রাজাকে রাজার মতই চলতে দিতে হয়, তার নিজস্ব গতিতে। যুদ্ধে, অত্যাচারে, সবসময় পরাজিতরাই আমন্ত্রিত হয় তার কাছে। বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হল চারপাশের চলমান ধারায় নিজেকে ভাসিয়ে দেয়া। যা হচ্ছে হতে থাক-এমন মনোভাব বজায় রাখা।
“আমার মনে হয় এটাই সবচেয়ে ভাল হয় যদি আরও কয়েকটা দিন দেখি আমরা, বলল কাউয়ি। “দেখা যাক আমার অনুমান সঠিক কিনা। হয়ত তোমার কথাই ঠিক। ওগুলো জঙ্গলের কোনো প্রাণী-ই হবে। যদি আমার কথাই ঠিক হয় তবে ইন্ডিয়ানদেরকে নিজ থেকে এগিয়ে আসার একটা সুযোগ দিতে চাই আমি। ভয় দেখিয়ে বা অস্ত্রের মুখে ফেলেও কাজটা করা যায় তবে সেক্ষেত্রে সব পণ্ড হয়ে যাবে, কোন তথ্যই পাওয়া যাবে না ওদের কাছ থেকে। অবশেষে হার মানল নাথান। তবে শর্তসাপেক্ষে। তাহলে আমরা আর দুটো দিন দেখবো তারপর বলে দেব ওদেরকে।”
কাউয়ি মাথা নেড়ে সায় দিয়ে ফ্লাশ-লাইটটা বন্ধ করল । “এখন তাবুতে ফেরা উচিত।” ওরা দু-জন অন্ধকার জঙ্গল ছেড়ে আলোকিত জঙ্গলে ফিরে এল । শামানের কথাগুলো নাথান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে থাকল। ওর কাথার ভাঁজে আরও কিছু লুকানো আছে যেন। নাথান মনে করতে পারল শামানের কথা বলার ভঙ্গিটা। চোখ দুটো সরু করে একটা
সন্দেহপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল সে। তার মানে সেও সন্দিহান, এরা আসলেই ইন্ডিয়ান কিনা। ইন্ডিয়ান না হলে আর কারা হতে পারে? তাবুতে ফিরে নাথান দেখল প্রায় সবাই যার যার হ্যামোকে ফিরে গেছে। কয়েকজন রেঞ্জার পেরিমিটার ঠিক করছে। কাউয়ি তাকে শুভরাত্রি জানিয়ে নিজের মশারিঘেরা হ্যামোকে গিয়ে শুয়ে পড়ল। পায়ের বুট জোড়া খুলে ফেলতেই নাথান শুনতে পেল পাশের হ্যামোক থেকে ফ্রাঙ্কের গোঙানির শব্দ, কী যেন বলছে বিড়বিড় করে । আজকের ট্র্যাজেডির পর কারোর ঘুমই দুঃস্বপ্ন ছাড়া হওয়ার কথা নয়। নিজের হ্যামোকে শুয়ে পড়ল নাথান। একটা বাহু দিয়ে চোখ জোড়া ঢেকে দিল। ক্যাম্পফায়ারের আলো চোখে লাগছে খুব। ভাবনায় পেয়ে বসল তাকে । আমাজনের সাথে যুদ্ধ করার মত কিছুই নেই, ভাল লাগুক বা না-লাগুক, এটাই সত্যি। নিজের স্বতন্ত্র গতিতে চলে এটা, আছে নিজস্ব ক্ষুধা। তুমি সর্বোচ্চ যেটা করতে পার তাহল প্রার্থনা। প্রার্থনাটা নিজেকে বাঁচানোর জন্য নয়, জঙ্গলের পরবর্তী শিকার না হওয়ার জন্য । এসব চিন্তা করতে করতে ঘুমাতে অনেক দেরি হয়ে গেল তার । একটি মোক্ষম প্রশ্ন উঁকি দিল তার মনে : পরবর্তী শিকারটা কে?
কর্পোরাল জিম ডি-মারটিনির কাছে জঙ্গলটা অসহ্য লাগতে শুরু করেছে। চারদিনের নদীপথের ভ্রমনে সে ক্লান্ত। ভ্যাপসা আবহাওয়া, হুল ফুটানো মাছি, বড়বড় মশা, বাঁদর আর পাখির বিরতিহীন ডাকাডাকি পুরো ভ্রমণটাকে বিষিয়ে তুলেছে যেন, সাথে বিরক্তির মাত্রা বাড়িয়ে যোগ হয়েছে ছত্রাক। তাদের সবার জামা-কাপড়, হ্যামোক, কাধে ঝুলানো ব্যাগে সাদা সাদা ছত্রাকে ছেয়ে গেছে। ঘামে ভেঁজা মোজা মাসখানেক লকারে আটকে রাখলে যেমন গন্ধ হয় তেমন গন্ধ হয়েছে সবকিছুতে। আর এসব কিছুই হয়েছে মাত্র গত চারদিনে ।
চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে একটা গাছে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল ডি-মারটিনি । খুব কাছেই অস্থায়ী ল্যাট্রিনটা। তার কাঁধে এম-১৬ রাইফেল ঝুলানো। জারগেনসেনের রাতের এই শিফটটা ভাগাভগি করে নিয়েছে তার সাথে। তবে ডি-মারটিনির সাথে যোগ দেয়ার আগে সে একবার ল্যাট্রিনে ঢুকল। কয়েক মিটার দূরেই ওটা । মারটিনি তার বন্ধুর জিপার নামানোর শব্দও শুনতে পেল।
“কাজ সারার জন্য ভাল সময়ই বেছে নিয়েছ,” গজগজ করতে করতে বললো সে। তার কথা শুনতে পেল জারগেনসেন। “ধ্যাত, এত বিচ্ছিরি পানি।”
“জলদি কর।” ঝাঁকি দিয়ে সিগারেটের ছাই ফেললো ডি-মারটিনি। তার চিন্তাভাবনাজুড়ে আছে সহকর্মী রডনি গ্রেইভস, যাকে আজ তারা হারিয়েছে। মারটিনি সবচেয়ে সামনের নৌকায় থাকলেও কালো দৈত্যটাকে যথেষ্ট কাছ থেকে দেখেছে সে। পানি থেকে মাথা জাগিয়েই চেখের পলকে হতভাগা রডনিকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল । নিজের অজান্তেই কেঁপে উঠেছিল তখন, যদিও সে কোন আনাড়ি মিলিটারি নয়। এর আগেও চোখের সামনে অনেককেই মরতে দেখেছে, গুলি খেয়ে, হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে, পানিতে ডুবে, কিন্তু আজ যা দেখলো তার সাথে কোন কিছুরই তুলনা চলে না। দুঃস্বপ্ন থেকেও ভয়াবহ ছিল এটি।
মাথা ঘুরিয়ে পেছনে একবার দেখে নিল সে। মনে মনে অভিশাপ দিতে লাগল জাগারসেনকে। ল্যাট্রিন এত সময় ধরে কি করছে? “শেষ কর,” বিড়বিড় করে বলল সতীর্থের উদ্দেশ্যে । তারপর সিগারেটে লম্বা একটা টান দিল । জারগেনসেনের দেরি হলেও একদিক থেকে দোষ দেয়া যায় না। একা দাড়িয়ে থাকার সুবাদে সে খুব ভালভাবেই ফ্যান্টাসি করতে পারছে তাদের টিমের দু-জন নারীকে নিয়ে । আজকের ক্যাম্পে তৈরির পর থেকেই সে এশিয়ান নারী বিজ্ঞানীর উপর গোপনে নজর রেখে চলেছে। খাকি পোশাক ছেড়ে নতুন পোশাকেও তাকে খুব ভাল লাগছিল তার। সে এসব নষ্টচিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে রাখল। আরও কয়েক টান দিয়ে সিগারেটটা মাটিতে ছুড়ে মেরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে অন্ধকার জঙ্গলের দিকে তাকাল। অন্ধকার দূর করী একমাত্র আলোর উৎসটা হলো তার রাইফেলে লাগানো ফ্লাশ-লাইট। সে ওটা কিছুক্ষণ পরপর সামনে-পেছনে আর নদীর দিকে ফেলছে।
আরও একটু গভীর জঙ্গলে, মোশন-সেন্সর ছাড়িয়ে অনেকদূরে অসংখ্য জোনাকি মিটমিট করছে । ডি-মারটিন বড় হয়েছে দক্ষিণ-ক্যালিফোর্নিয়ায়, যেখানে এ-ধরনের কোন পোকা-মাকড় নেই। তাই এসব আলোর খেলা তাকে অন্যমনস্ক করে তুলল। মিটমিটে আলো একদিকে তাকে অনড় করে রেখেছে, অন্যদিকে শুকনো পাতা ঝরার শব্দকে মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে থাকা জঙ্গলের শ্বাস-প্রশ্বাস। গাছের বড় বড় ডালের মটমট শব্দ যেন আসছে বৃদ্ধের অস্থির সংযোগস্থল থেকে। সব বিশ্লেষণ করে তার মনে হচ্ছে জঙ্গলটা যেন জীবন্ত কোন প্রাণী, আর সে আছে এই প্রাণীটার পেটের ভেতরে।
ডি-মারটিনি চারপাশে একবার আলো ফেলে দেখে নিল । সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে বাডি-সিস্টেম বিশেষ করে এ-মুহূর্তে অভিশপ্ত অন্ধকার এই জঙ্গলে সর্বোচ্চস্তরে গিয়ে ঠেকেছে। রেঞ্জারদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে : বেঁচে থাকার জন্য বডি সিস্টেম অপরিহার্য। শত্রুকে ঠেকাতে সঙ্গে কোন একজনকে পাওয়া যাবেই। তার নিজের পাশে বডি সিস্টেম না থাকায় কিছুটা ভয় গ্রাস করল তাকে। আবারও ডাক দিল সে : “কী হল জারগেনসেন!” মারটিনি পেছনে ঘুরতেই কিছু একটা ফুটলো তার গলায় । সাথে সাথে ওই জায়গাটা চেপে ধরল হাতের তালু দিয়ে । কাঁটা থেকেও ভয়ঙ্কর কিছু ফুটেছে তার গলায়, চোয়ালের ঠিক নিচে। বিরক্তিতে হাত দিয়ে ডলা দিল, কিন্তু তার মনে হল ভিন্নরকম কিছু ফুটেছে, চামড়া থেকে এখনও সেটা ঝুলছে! ভড়কে গিয়ে সস্তে সঙ্গে ওটা টেনে খুলে ফেলল।
“শালার এটা কি!” ফিসফিসিয়ে বলে এক পা পেছনে সরে গেল মারটিনি। “শালার রক্তচোষার দল!” ।
ল্যাট্রিন থেকে জারগেনসেন হেসে বলল, “তোমার পাছা উদোম নেই বলে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতে পার?”
বিরক্তিপূর্ণ চোখে চারপাশের জঙ্গলটা দেখে নিয়ে জ্যাকেটের কলার উচু করে দিল মারটিনি। রক্তলোলুপ পোকাগুলো যেন আরও কম আক্রমণের জায়গা পায়। পেছনে ঘুরতেই তার ফ্লাশ-লাইটের আলোতে অপরিচিত কিছু একটা চোখে পড়ল। উজ্জ্বল রঙের বস্তুটা তার পায়ের কাছে মাটিতে পড়ে আছে। নিচু হয়ে তুললো সে। একটা ডার্ট! তীক্ষ একটা কাঁটার চারপাশে একগুচ্ছ পালক-শক্ত করে বাধা। কাঁটার অগ্রভাগ রক্তে ভেজা, তার নিজের রক্ত। ওহ! হাটু গেড়ে বসে পড়ল সে, চিৎকার দিতে চাইল কিন্তু শত চেষ্টা করেও জিহ্বাটা একটু নাড়ানো ছাড়া কোন শব্দ করতে পারল না। লম্বা করে শ্বাস নিয়ে সামনের দিকে হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে চাইলো, বুঝতে পারছে অসাড় হয়ে আসছে সে।
কে যেন পাথর বেঁধে দিয়েছে কেউ। একবিন্দুও এগোতে পারল না। হাত-পা ভারি হয়ে এল, শরীরের সমস্ত বল যেন শুষে নিল মুহূর্তের মধ্যে। কাত হয়ে পড়ে গেল সে। বিষ ঢুকছে তার দেহে..পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে শরীরটা । বেঁচে থাকা চেতনাটুকু দিয়ে অনুধাবন করল সে। তার হতের আঙুলগুলো এখনো কিছুটা নাড়াতে পারছে। তার এম-১৬ রাইফেলের ব্যারেলের উপর আঙুল বুলাল মাকড়সার পায়ের মত। খুব চেষ্টা করলো ট্রিগারটা খুঁজে পাওয়ার। যদি কিছু গুলি ছোড়া যেত…যদি সতর্ক করা যেত জারগেনসেনকে।
সে টের পেল গভীর জঙ্গল থেকে কেউ একজন তাকে দেখছে। মাথা ঘুরিয়ে দেখতে পেল না কিন্তু ফোটানো কাটাটা তার শরীরের ভেতরে যে এক আদিম সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছে তা বেশ বুঝতে পারছে। আতঙ্ক আরও একটু পেয়ে বসল তাকে। ট্রিগারটা হাতে পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল সে। প্রার্থনা করছে প্রাণপনে, চেতনার সবটুকু দিয়ে। অবশেষে একটু আঙুল পৌছাল ট্রিগারে । মুখ দিয়ে যদি একটিবার বুক ভরে দম নিতে পারত তবে পরিত্রাণের সাথেই কাজটি করতে পারত। শরীরের অবশিষ্ট শক্তি দিয়ে ট্রিগারের উপর রাখা আঙুলে চাপ দিল। কিন্তু কিছুই ঘটল না। হতাশায় ডুবে যাওয়া মারটিনি বুঝতে পারল রাইফেলটার সেফটি-লক অন করা। একফোটা অশ্রু বেয়ে পড়ল পরাজিত মানুষটার চিবুক বেয়ে। সম্পূর্ণ অসাড় হয়ে গেল তার শরীর, এমন কি চোখের পাতা জোড়াও বন্ধ করতে পারল না। ওঁৎ পেতে থাকা ব্যক্তি অবশেষে মারটিনির দেহটাকে মাড়িয়ে একপাশে গিয়ে দাঁড়াল। রাইফেলে লাগানো টর্চের আলোতে সে যা দেখল তার কোন অর্থ খুঁজে পেল না।
একটা নরী..নগ্ন অবস্থায় তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সারা শরীরে এক অশরীরি সৌন্দর্য, চিকন গড়ন, মসৃণ পা, কোমরের মৃদুবাকটা প্রান্ত পশ্চাদদেশে গিয়ে শেষ হয়েছে। বক্ষ দৃঢ় । কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে গেল তার প্রভীর কালো চোখ জোড়ার হস্যময়তায়। যেখানে প্রতিফলিত হচ্ছে সীমাহীন ক্ষুধা আর এটাই মারটিনির সমস্ত মনোযোগ হরণ করল। দম নিতে না পেরে মারা যাচ্ছে সে। মহিলা ঝুঁকে এল তার উপর। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল যেন সে তার ভেতরে শ্বাস-প্রশ্বাস চালান করছে। অনুভব করল কিছু একটা তার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, উষ্ণ-ধোঁয়াময় কিছু একটা। তারপর লে হারিয়ে গেল। অন্ধকার গ্রাস করল তাকে।
* * * *
কেঁপে উঠে জেগে গেল কেলি। চারপাশে চিৎকার চেঁচামেচি। সে দ্রুত উঠে বসে চট করে হ্যামোকের বাইরে আসার জন্য দৌড় দিতেই হাটু ভেঙে উপুড় হয়ে পড়ে গেল। “ধ্যাত্!” বাইরে তাকাল সে ।। ক্যাম্পফায়ার দুটোতে আরও ডাল-পালা দেয়া হয়েছে, আগুন জ্বলছে দাউদাউ করে। লেলিহান শিখা অনেক দূরের কতোগুলো ফ্লাশ-লাইটের আলোয় পুরো বনকে আলোকিত করে ফেলেছে। কারোর অনুসন্ধান চলছে। বিভিন্ন রকম চিৎকার আর আদেশের ধ্বনি প্রতিফলিত হচ্ছে পুরো জঙ্গল জুড়ে। পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে মশারি থেকে বেরুবার পথ খুঁজতে গিয়ে যুদ্ধ করতে হল কেলিকে। নাথান এবং ম্যানুয়েলকে ধারে-কাছেই পেয়ে গেল সে। দু-জনেই খালি পায়ে, পরনে বক্সার শর্টস ও টি-শার্ট । জাগুয়ারটা দু-জনের মাঝে বসা। “কি হচ্ছে এখানে?” কিছুটা চেঁচিয়ে বললো সে, মশারি থেকে বের হয়ে এল। বাকি সিভিলিয়ানরাও এক এক করে জড় হতে শুরু করেছে। একেক জনের ভাবভঙ্গি যেমন ভিন্ন তেমনি ভিন্ন তাদের পোশাক-আশাক। কেলি লক্ষ্য করল রেঞ্জারদের সবগুলো হ্যামোকই খালি, একজনমাত্র কর্পোরাল দুটো ক্যাম্পায়ারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বন্দুক তাক করে আছে।
নাথান সামনে ঝুঁকে বলল, “পাহারায় থাকা এক রেঞ্জার হারিয়ে গেছে। এই জায়গাটা নিরাপদ করা না পর্যন্ত এখানেই থাকতে হবে আমাদের সবাইকে।
“হারিয়ে গেছে? কে? কিভাবে?” কর্পোরাল ডি-মারটিনি।”
কেলির মনে পড়ে গেল লোকটাকে । তেল দেয়া চকচকে চুল, চ্যাপ্টা নাক, চোখ সন্দেহে ভরা । “কি হয়েছে ওর?”
মাথাটা এদিক ওদিক নাড়াল নাথান । “কেউ কিছু জানে না এখনো। হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে গেছে সে।”
নদীর দিক থেকে একটা তীক্ষ্ণ চিকার ভেসে এলে সবগুলো ফ্লাশ-লাইটের আলো ওদিকটায় নিক্ষেপ করা হল একসঙ্গে। এতক্ষনে প্রফেসর কাউয়ি এসে যোগ দিয়েছে নাথানদের সাথে। কেলি লক্ষ্য করল তাদের দুজনের মধ্যে একটা অদ্ভুত দৃষ্টি বিনিময় হল । নির্বাক থেকেই কিছু একটা ভাব বিনিময় করল মানুষ দুটো। হঠাৎ আবির্ভূত হল নদীর দিক থেকে, হাতে ফ্লাশ-লাইট নিয়ে দৌড়ে এল তাদের দিকে। তার মেছতায় ঢাকা গলার উপর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখটা দেখতে অদ্ভুত লাগছে।
‘নিখোঁজ রেঞ্জারের অস্ত্রটা পাওয়া গেছে।” একে একে সে তাকাল নাথান, ম্যানুয়েল ও কাউয়ির দিকে। “এই জঙ্গলের ব্যাপারে আমাদের থেকে ভাল কেউ জানে না। অবশ্যই এখানে কিছু আছে যে-বিষয়ে আপনাদের মতামত আমরা কাজে লাগাতে পারি। ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান আপনাদেরকে একটু আসতে বলেছেন জায়গাটী দেখার জন্য।” দেরি না করে সবাই যাবার জন্য উদ্যত হল। হঠাৎ একটা হাত উচু করে ধরল ফ্রাঙ্ক। “শুধু এই তিনজন আসবে আমার সঙ্গে, আর কেউ না।”
সামনে এগিয়ে গেল কেলি। “মানুষটা যদি আহত হয়ে থাকে তাহলে আমি সাহায্য করতে পারব।”
খানিকটা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে শেষে সম্মত হল সে। রিচার্ড জেনও পা বাড়াল। সঙ্গে যাওয়ার সপক্ষে কিছু বলতে চায় সে কিন্তু মাথা নাড়ল ফ্রাঙ্ক। “প্রয়োজনের চেয়ে বেশি লোক নিয়ে গিয়ে ঝামেলা পাকাতে চাই না।”
ফ্রাঙ্ক তার দলবল নিয়ে নদীর দিকে রওনা হল । জাগুয়ারটা তার মালিকের পাশে নিঃশব্দে হাটছে। তারা গভীর জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে গেল যেটা নদীর তীর ঘেষে চলে গেছে । আসল রুপকথার জঙ্গল এটাই। ঝাকে ঝাকে বুনো আঙ্গুর, ঝোপ-ঝাড়, গাছপালা ছেয়ে আছে সবখানে। বিচ্ছিন্ন দলটা জঙ্গলের গভীরতা ভেদ করে এগুচ্ছে সামনে, জড় করে রাখা ফ্লাশ-লাইটের আলো তীব্র হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। কেলি হাটছে নাথানের পিছু পিছু । এই প্রথম সে খেয়াল করল কেমন করে নাথান তার কাঁধটা প্রশস্ত করে রেখেছে আর কত দক্ষতার সাথে লতা-পাতা পাশ কাটিয়ে এগুচ্ছে সামনে। ঝুলে আসা একটা লিয়ানা লতাকে অতিক্রম করল সে মাথা নিচু করে, কেলিও তাকে অনুসরণ করতে গেল কিন্তু পারল না, হোঁচট খেল লতায় জড়িয়ে। তার পায়ের হিল পিছনে যেতেই পা থেকে ওটা খুলে গেল। ভারসাম্য হারিয়ে কাত হয়ে পড়ে যেতেই নাথানের হাত তাকে ধরে ফেললো। “সাবধানে!”
“থ্যা…থ্যাঙ্কস,” লজ্জা পেল সে। উঠে দাঁড়ানোর জন্য এক হাত বাড়িয়ে দিল ঝুলে থাকা একটি আঙ্গুর লতার দিকে কিন্তু ওটা ছুতেই নাথান তাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিল।
“আউ! কি করছ!” তার আঙুলের ডগাগুলো জ্বলাপোড়া করছে। সে তাড়াতাড়ি হাতটা শার্টের ঝুলে থাকা অংশে মুছে নিল কিন্তু এতে করে যন্ত্রণা আরও বেড়ে গেল। হাতে ফোঁটা সুক্ষ কাঁটাগুলো আরও দৃঢ়ভাবে গেঁথে গেলে তার মনে হল হাতটা যেন আগুনে পুড়ে যাচ্ছে। “ওভাবেই ধরে রাখো,” বললো কাউয়ি। “ডলাডলি করলে ওটা বেশি ছড়ায়।” একটা লম্বা গাছ থেকে এক মুঠো মোটা পাতা ছিড়ে সেগুলো তার হাতের তালুতে পিষে নিল। সাবধানে কেলির কজিটা ধরে পাতার তেলতেলে রসটুকু ওখানে লাগিয়ে দিল সে। প্রায় সাথে সাথেই কাটা-কাটা ভাবটা অনেক কমে এল । অবাক বিস্ময়ে হাতের পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল কেলি।
“কু-রান-ইয়েহ,” পেছন থেকে বললো নাথান । ভায়োলেটা শ্রেণীর উদ্ভিদ। খুবই শক্তিশালী ব্যাথানাশক।” যন্ত্রণা দূর হওয়া পর্যন্ত ওটা ভালভাবে ডলতে থাকল কেলি। তার ভাই ফ্লাশ-লাইটের আলো ফেলতেই সে দেখল দু-তিনটে ফোস্কা পড়েছে আঙুলের ডগায়।
“তুমি ঠিক আছ তো?”ফ্রাঙ্ক জিজ্ঞেস করল। মাথা নেড়ে সায় দিল সে। খুব বোকা বোক লাগছে নিজেকে।
“ওটা ডলতে খাক, কু-রান-ইয়েহ খুব দ্রুত কাজ করে। তার হাতে আস্তে করে পিতৃস্নেহপূর্ণ এক চাপ দিল কাউয়ি।
কেলিকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল নাথান। সে ধূসর রঙের আঙ্গুরগুলো দেখালো । “এগুলোর নাম ফায়ার লিয়ানা।” বলার পেছনে কারণ হল প্রচুর পরিমাণে আঙ্গুর গাছতলায় পড়ে আছে। আর কেলি হোঁচট খেয়ে ওগুলোর উপরেই পড়তে বসেছিল। নাথান সময়মতো হাতটা না ধরে ফেললে কী যে হত! “আঙ্গুরগুলো একরকম পদার্থ নিঃসরন করে আর এই জ্বালাময়ী পদার্থের কারণেই পোকা-মাকড় ধারে কাছে আসে না।”
“বলতে পার এটা ওদের একরকম রাসায়নিক যুদ্ধ,”কাউয়ি যোগ করল।
“ঠিক তাই,” আবার হাটা শুরু করার জন্য ফ্রাঙ্কের দিকে চেয়ে ইশারা করল নাথান । “তোমার চারপাশে সবজায়গায় সব সময় এমনটা ঘটে চলেছে। আর সেজন্যেই এই জঙ্গলটা বিশাল এক মেডিকেল স্টোরহাউজ। যে পরিমাণে বিশুদ্ধ ও বৈচিত্রময় কেমিকেল কম্পাউন্ডের যুদ্ধ চলে এখানে তা গোটা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা একত্রে কাজ করেও ল্যাবে আবিষ্কার করতে পারবে না।”
কেলি শুনে গেল চুপচাপ, এই কেমিকেল যুদ্ধে তার মত এক আনাড়ির কী-ই বা বলার থাকতে পারে, চুপচাপ দেখা ছাড়া? আরও কয়েক মিটার এগোতেই তারা রেঞ্জারদের দলটার কাছে পৌছাল। সবাই একটা জায়গা ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দু-জন রেঞ্জার তাদের থেকে একটু সরে জঙ্গলের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হাতে অস্ত্র, চোখ ঢেকে আছে নাইট-ভিশন গগলসে।
কর্পোরাল জারগেনসেন দাঁড়িয়ে আছে তাদের ইউনিট ক্যাপ্টেনের সামনে একেবারে সোজা হয়ে । “স্যার, আমি তো বলেছি আমি তখন ল্যাট্রিনে ছিলাম । ডি-মারটিনি খুব কাছেই একটা গাছের পাশে দাঁড়িয়েছিল।”
“আর এগুলো?” ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান একটি সিগারেটের শেষঅংশ তুলে ধরল জারগেনসেনের নাকের সামনে।
“ও আচ্ছা, আমি ওকে এটা জ্বালাতে শুনেছিলাম কিন্তু বুঝতে পারি নি সে চলে গেছে। আমি চেইন টেনে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখি সে নেই । কিছু বলেও যায় নি নদীর কাছে কোথাও হাটতে যাচ্ছে কিনা।”
“সিগারেটের ধোঁয়াই কপাল পুড়িয়েছে,” গড়গড় করে বললো ওয়াক্সম্যান। তারপর একটা হাত নাড়ল, “তুমি যেতে পার, কর্পোরাল।”
“জি, স্যার।”
লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান এগিয়ে এল তাদের দিকে, চোখে এখনও জ্বলজ্বল করছে আগুন। আপনাদের দক্ষতা এখানে কাজে লাগাতে চাই আমি,” বলল ক্যাপ্টেন। তার চোখ নাথান, কাউয়ি এবং মানুয়েলের উপর একে একে ঘুরে বেড়াল। হাতের টর্চের আলো সামনের একটি জায়গায় ফেললো সে। ওখানকার কিছু জায়গায় ঘাস আর লতাগুলো চ্যাপ্টা হয়ে মাটির সাথে মিশে আছে। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে কেউ হেটে গেছে ওখানে। “ডি-মারটিনির ফেলে যাওয়া অঙ্কটা এখানে পেয়েছি আমরা, সাথে এই সিগারেটের অংশটা। কিন্তু মানুষটার কি হল তার কোন সূত্র পাচ্ছি না । ছাপগুলো এখান থেকে কোন দিক গেছে সেটা দেখার জন্য কর্পোরাল ব্ল্যাকজ্যাক আশেপাশের এলাকাটা
চষে ফেলেছে কিন্তু কিছু পাওয়া যায় নি। কোথাও কোন চিহ্ন নেই। চোখে পড়ার মত শুধু এই জায়গার ঘাসগুলো আছে। এরকম ট্রেইল চলে গেছে নদীর দিকে।”
কেলি লক্ষ্য করল এই জায়গাটার এলোমেলো অংটুকু নিশ্চিতভাবেই নদীপ্রান্ত গিয়ে মিশেছে। পাড়ের লম্বা ঘাসগুলোর কিছু ভেঁড়া আর কিছু চাপ খেয়ে মাটিতে মিশে আছে।
“আরেকটু ভালভাবে দেখতে চাই আমি,” বললো প্রফেসর কাউয়ি ।
ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান মাথা নেড়ে সায় দিয়ে নিজের ফ্লাশ-লাইটটা কাউয়ির হাতে তুলে দিল। নাথান এবং কাউয়ি সামনে এগিয়ে গেল কিছুটা, পেছনে অনুসরন করছে ম্যানুয়েল । কিন্তু জাগুয়ারটা ঐ জায়গার একপ্রান্তে এসে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল । ঘাসগুলো কে গভীর একটা শব্দ করছে গলার ভেতর থেকে।
চাবুকে হাত রেখে ভয় দেখাতে চাইল ম্যানুয়েল। “চলো, টর-টর।”
জাগুয়ার সেটা তো শুনলই না উপরন্তু এক পা পিছিয়ে গেল আরও। পেছন ফিরে তাকাল কাউয়ি। সে-ও কুঁজো হয়ে কি যেন একটা দেখছে। বড় ঘাসগুলোর ভেতরে কিছু একটা নেড়ে-চেড়ে দেখে তারপর আঙুলগুলো নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ কলো।
“কি এটা? নাথান জিজ্ঞেস করল ।
‘কুমিরের বিষ্ঠা,” ঘাসে হাত মুছল সে, তারপর গরগর করতে থাকা টর-টরের দিকে তাকিয়ে সায় দিল। “টর-টরও একমত হবে আমার মনে হয়।”
“কি বলছেন, ঠিক বুঝলম না?”
উত্তর দিতে মুখ খুললো ম্যানুয়েল। “জাগুয়ারের মত বন্যপ্রাণীদের দারুণ এক ক্ষমতা আছে। এরা কোন প্রাণীর আকৃতি কত বড় হবে সেটা বুঝতে পারে সেই প্রাণীর বিষ্ঠা অথবা প্রস্রাবের গন্ধ শুকে। আসলে এ-কারণেই পুরো পশ্চিম-আমেরিকাজুড়ে হাতির প্রস্রাব বিক্রি হয় বব-ক্যাট আর পুমাদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে । ওগুলো যদি কোথাও ঐ প্রস্রাবের গন্ধ পায় তবে তার ধারেকাছে যাবে না!”
ওদিকে, কাউয়ি খুব সতর্কতার সাথে লম্বা ঘাসের আগাগুলো পরীক্ষা করতে করতে নদীর দিকে গেল। ভেঙে যাওয়া কিছু ডগা খুব সাবধানে একপাশে সরিয়ে রাখল সে, তারপর হাত নেড়ে ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানকে ডাকল, কেলিও গেল তার পিছু পিছু। কাউয়ি হাতের লাইটটা কর্দমাক্ত নদী পাড়ের উপর ফেলল। তীক্ষ্ণ নখযুক্ত হাতের ছাপ পরিস্কার গেঁথে আছে সেখানকার কাদায়।
“কুমির।”
কেলি শুনতে পেল কাউয়ির কণ্ঠে কেমন এক পরিত্রাণের শব্দ । খুব অদ্ভুত ঠেকল তার কাছে ব্যাপারটি, আবারো প্রফেসর এবং নাথানের মধ্যে রহস্যময় দৃষ্টি বিনিময় হল। সোজা হয়ে দাঁড়াল কাউয়ি । ব্যাখ্যা করার জন্য প্রস্তুত সে।
“কেইমানরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নদীপাড়েই শিকার করে থাকে। তাপির এবং বন্য শূকরেরা যখন পানি খেতে আসে তথনই সুযোগ বুঝে আক্রমণ করে ওদেরকে। তোমার কর্পোরালও নিশ্চিতভাবেই নদীর খুব কাছে চলে এসেছিল, আর তখনই ওটা ওকে ধরেছে।”
“এটা কি ঐ পুরুষ কুমিরটা হতে পারে যেটা রডনিকে আক্রমণ করেছিল?” জিজ্ঞেস করল ওয়াক্সিম্যান।
কাঁধ তুলল কাউয়ি। ব্ল্যাক কেইমানরা সাধারণত বুদ্ধিমান হয়। আমাদের নৌকাগুলো যে খাবারের বেশ ভাল উৎস সেটা বোঝার পর হয়তো আমাদের পিছু নিয়েছে ওটা। আর পানিতে শব্দ বহুদূর পর্যন্ত যায়। নৌকার মোটরের শব্দ ধরে আমাদের অবস্থান জেনে কোথাও হয়তো ঘাপটি মেরে ছিল, তারপর অপেক্ষা করেছে রাত নামা পর্যন্ত।
“নরকে যাক ঐ হারামিটা!” হাতটা মুঠিবদ্ধ করে ভয়ঙ্করভাবে কথাটা বললো ওয়াক্সম্যান। “দু-জন, এক দিনেই!”
স্টাফ সার্জেন্ট কস্টস এগিয়ে এল । শ্যামলা বর্ণের লম্বামত রেঞ্জারটা শক্ত হয়ে দাঁড়াল ওয়াক্সম্যানের সামনে। তার চোখে-মুখে কাঠিন্য। “স্যার, আমি জনবল পাঠানোর কথা বেইস-ক্যাম্পে জানাতে পারি, হুইয়াস-এ করে আরও দু-জন সকালের মধ্যে চলে আসবে।”
“আচ্ছা জানাও।” সে আঙুল তুললো রেঞ্জারদের দিকে। আর এখন থেকে প্রতি শিফটে দুটো করে পাহারা চাই আমি, প্রত্যেক পাহারায় দু-জন করে থাকবে! জঙ্গলে কোন সিভিলিয়ান অথবা রেঞ্জারের একা চলাফেরা করতে পারবে না। একদমই না। আমি চাই প্রত্যেকটা ক্যাম্পের নদীর দিকটায় মোশন-সেন্সর বসানো হোক, শুধু জঙ্গলের দিকে নয়।”
‘ইয়েস, স্যার।”
ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান নাথানদের দিকে ঘুরল। কোন উষ্ণতা নেই তার কথায়, আছে শুধু আলোচনাটা শেষ করার আভাস । “সাহায্যের জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।” বনের পথ ধরে ফিরে আসছে দলটি। হাটা শুরু করতেই নিজেকে আবারো অসাড় মনে হল কেলির। আরও একজন গেল…এত তাড়াতাড়ি! ফায়ার লিয়ানা গাছের পাশ দিয়ে যাবার সময় খুব সতর্ক চোখে তাকাল লতাগুলোর দিকে। এই বনে শুধুমাত্র রাসায়নিক যুদ্ধই চলছে না চলছে খাবারের জন্য বন্য-বর্বর আক্রমণও। যেখানে শক্তিশালীরা খাচ্ছে দূর্বলকে ।।
ক্যাম্পে ফিরে আগুনের কুণ্ডুলির উষ্ণতা আর আলো পেয়ে ভাললাগলো তার । ক্ষণিকের জন্যে হলেও এ আগুন জঙ্গলের আধারময় হৃৎপিণ্ডটা দুরে সরিয়ে রাখছে, দেখাচ্ছে নতুন দিনের আশা। সে দেখল ক্যাম্পে থেকে যাওয়া টিম-মেটরা তাদের দিকে তাকাচ্ছে। তাদের চোখে-মুখে কৌতুহল । আনা ফং দাড়িয়ে আছে রিচার্ড জেনের পাশে। ফ্রাঙ্কের সঙ্গি অপারেটিভ অলিন পাস্তারনায়েক আগুনের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে হাত দুটো গরম কছে।
ম্যানুয়েল খুব দ্রুত বর্ণনা করল সবকিছু। কিছুক্ষণ তার কথা শুনেই আনা ফঙ হাত দিয়ে তার মুখ ঢেকে ফেললো, সহ্য করতে না পেরে ঘুরে চলে গেল সে। রিচার্ড জেন সব শুনে মাথা নাড়ল কেবল । আর অলিন পাস্তারনায়েক তার স্বভাবসুলভ নির্বিকার ভঙ্গিতে কথাগুলো শুনে গেল। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে আগুনের উপর। তাদের প্রতিক্রিয়ায় কেলির কোন আগ্রহ নেই। তার সমস্ত চিন্তাজুড়ে আছে দু-জন মানুষ নাথান এবং কাউয়ি ।। ক্যাম্পফায়ারের পাশে বসে কেলি দু-জনের উপর নজর রাখছে । কাউয়ি নাথানকে নিয়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল। আড়চোখে কেলি দেখছে তাদের। কোন বাক্য-বিনিময় হলো না তাদের মধ্যে কিন্তু কাউয়ির চোখে-মুখে যে অনুসন্ধানী অভিব্যক্তি তা ঠিকই ধরা পড়ল তার চোখে। একটা না-বলা প্রশ্ন ছুড়ে দিল প্রফেসর, নাথানও উত্তর দিল মাথাটা একটুখানি নেড়ে । নিঃশব্দে তাদের মধ্যে কিছু একটা বিনিময়ের পর কাউয়ি তার পাইপটা নিয়ে কয়েক পা দূরে গিয়ে দাঁড়াল, যেন কিছুটা সময় একা থাকতে চাইছে সে।
কেলি মুখ সরিয়ে নিল। বৃদ্ধ লোকটির ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ব্যাঘাত ঘটাতে চায় না সে। ঘুরতেই সে দেখল নাথান তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে চোখ ফিরিয়ে নিল আগুনের দিকে। নিজেকে বোকা বোকা আর অনেক ভীত মনে হচ্ছে। একটা ঢোক গিলে নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরল। তার মনে পড়ল লোকটার শক্ত-সামর্থ হাত দুটো হঠাৎ ধরে ফেলেছিল তাকে বাঁচিয়েছিল পড়ে যাওয়া থেকে। সে টের পেল নাথান এখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টি যেন সূর্যের তাপ হয়ে ওর চামড়ায় এসে লাগছে । উষ্ণ, গভীর আর তীক্ষ এক অনুভুতি হলো, কিন্তু আগের চিন্তাটা ফিরে আসতেই এই অনুভুতি ম্লান হয়ে গেল। কি লুকাচ্ছে মানুষটা?
