আমাজনিয়া – ৭
তথ্য সংগ্রহ আগস্ট ১২,
সকাল ৬:২০
ল্যাংলে, ভার্জিনিয়া
লরেন ওব্রেইনের কাজে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। “জেসি!” জোরে ডাক দিয়ে বানানো স্যান্ডউইচটা পাশে রেখে লাঞ্চ-বক্সের ঢাকনা আটকে দিল। “তাড়াতাড়ি নেমে এস, সোনা।” ডে-কেয়ার সেন্টারটা বিশ মিনিটের পথ । ওখানে যেতে হলে ল্যাংলের গাড়িবহরের সাথে রীতিমত যুদ্ধ করতে হয়। ঘড়িতে সময় দেখে চোখ কপালে ওঠার উপক্রম হলো তার। “মার্শাল!”
“এই তো আসছি আমরা,” একটা দঢ় কঠে জবাব দিল
লরেন ডাক দিয়ে ঘরের কোণার দিকে গিয়ে দাঁড়াল । তার স্বামী তাদের একমাত্র নাতনীটিকে সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে আনছে। খুব সুন্দর একটা জামা পরানো হয়েছে জেসিকে, যদিও তার মোজাগুলো জামার সাথে ম্যাচ করে নি তবুও এতেই চলবে। এতদিন পর সে ভুলেই গেছে ছোট বাচ্চা লালন করার অনুভুতিটা। হিসেব-নিকেশ, পরিকল্পনা সব পরিবর্তন করতে হবে আবার।
“ডে-কেয়ার সেন্টারে ওকে নিয়ে যেতে পারব আমি,” সিঁড়ির শেষ ধাপটা অতিক্রম করে বলল মার্শাল। নয়টার আগে কোন মিটিং নেই আমার।”
“না, আমিই পারব।”।
“লরেন…” সে তার কাছে গিয়ে গলায় আলতো করে চুমু খেল । “তোমায় একটু সাহায্য করতে দাও।”
সে ঘুরে কিচেনে ছুটল, লাঞ্চ-বাক্সটা ঠিকমত আটকানো হয়েছে কিনা দেখে দাঁড়াল কিছুক্ষণ। “যত তাড়াতাড়ি পার তোমার অফিসে যাওয়া উচিত।” কষ্ট থেকে চিন্তার ছাপ দূরে রাখতে চাইলো সে।
কিন্তু স্ত্রীর কথাটা কানেই তুলল না মার্শাল। “জেসি, তুমি সোয়েটার নাওনি কেন?”
“নিচ্ছি, গ্র্যান্ড-পা,” সে বড় দরজাটার দিকে ছুটল।
মার্শাল ঘুরে দাঁড়াল লরেনের দিকে। “ফ্রাঙ্ক আর কেলি ভাল আছে। কোন রকম কিছু হলে সাথে সাথেই জানতে পারব আমরা।”
মাথা নাড়ল লরেন । এখনও সে স্বামীর দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। সে চায় না তার ভয়ের কান্না মার্শাল দেখুক । গতরাতে তারা খবর পেয়েছে কুমিরের আক্রমণে পড়া প্রথম রেঞ্জারটার কথা, তারপর কয়েক ঘণ্টা বাদেই ফোনটা আবার বেজে ওঠে। মার্শাল কথা বলতেই ওর কণ্ঠটা কেমন যেন ঠেকছিল আর তা থেকেই লরেন বুঝতে পেরেছে এবারের খবরটা আরও ভয়াবহ। এত রাতে ফোন করে খবরটা দেয়ার অর্থই হল খারাপ কিছু একটা ঘটনা ঘটেছে। হয়ত কেলি অথবা ফ্রাঙ্কেরই। সে পুরোপুরি নিশ্চিত। কথা বলা শেষে ফোন রেখে মার্শাল যখন দ্বিতীয় রেঞ্জারটার ঘটনা বর্ণনা করল, লরেন ভেঙে পড়েছিল স্বার্থপরতাপূর্ণ পরিত্রাণের কান্নায় । কিন্তু এখনও তার ভেতরটা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে একটা ভয় যেটাকে কোনভাবেই মুছে ফেলতে পারছে না। দু-জন মরেছে, আরও কতজন মরবে? বাকি রাতটা একফোটাও ঘুমাতে পারে নি সে। “আরও দু-জন রেঞ্জার পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে আমাজনে, ওদের সাথে আরও শক্তিশালী প্রটেকশান ব্যবস্থা রয়েছে।”
সে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে চোখের পানি মুছল। অবুঝ হয়ে পড়ছিল যেন। এই তো গত রাতেই তার যমজ সন্তান দুটোর সাথে কথা হয়েছে। ঘটনার নির্মমতা ওদেরকে নাড়িয়ে দিয়েছে সত্যি কিন্তু তারপরও ওরা যথেষ্ট সংকল্পবদ্ধ অভিযাটি এগিয়ে নিতে। “বাচ্চা দুটো খুব শক্তমনের,” বললো মার্শাল, “প্রাণশক্তিতে তারা আর বেশ সতর্ক। বোকার মত কোন সিদ্ধান্ত তারা নেবে না।”
লরেন এখনও তার স্বামীর দিকে পেছন ফিরে আছে।
“বোকার মত মানে?” বিড়বিড় করে বললো সে।
“তারা তো ঐ জঙ্গলেই, তাই না? এটাই কি যথেষ্ট বোকামি নয়?”
মার্শাল তার কাঁধে হাত রাখল। পেছনের চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে মৃদু একটা চুমু খেল ঘাড়ে। তারা ভালই থাকবে,” কানের কাছে ফিসফিস করে বলল সে । এই চুয়ান্ন বছর বয়সেও মার্শাল এখনও চোখে পড়ার মত সুদর্শন ও শক্ত-সামর্থ। শরীরে আইরিশ রক্ত। কপালের দু-পাশের চুলগুলোই শুধু কালো থেকে রুপালী হতে শুরু করেছে। শক্ত চোয়াল দুটো মিশেছে কোমল দুটি ঠোটে। চোখ দুটো নিলচে-বাদামী । যে চোখ এখন সম্পূর্ণ নিবদ্ধ লরেনের উপর।
“কেলি এবং ফ্রাঙ্ক দু-জনেই ভাল থাকবে,” ছোট্ট করে বলল সে। “তোমার মুখ থেকে এটা একবার শুনতে চাই।”
সে নিচের দিকে তাকাতে চাইল কিন্তু মার্শালের আঙুলগুলো তার মুখটাকে উপরের দিকে তুলতে বাধ্য করল যেন। “বল…প্লিজ, আমার জন্যে হলেও একবার বল । আমিও তো চাই এটা।”
স্বামীর চোখেও বেদনার শিখা জ্বলতে দেখল লরেন “কেলি এবং ফ্রাঙ্ক..ভাল থাকবে।” কথাগুলো যদিও অস্পষ্টভাবে বলল তারপরও-জোরেসোরে বলার কারণে মনের ভেতরে এক নিশ্চয়তাপূর্ণ প্রশান্তি অনুভব করল সে। “অবশ্যই ভাল থাকবে। ওরা তো আমাদেরই সন্তান, আমরাই বড় করেছি ওদের, তাই না?” সে হালকা একটু হাসল লরেনের দিকে তাকিয়ে । দুঃখের দ্বীপ্তি ম্লান হতে শুরু করেছে তার চোখ থেকে ।
“হ্যা, তা তো অবশ্যই।” বাহুডোরে স্বামীকে জড়িয়ে ধরল ।
কিছুক্ষণ এভাবে অতিবাহিত হওয়ার পর মার্শাল তার কপালে চুমু খেল। আমি জেসিকে ডে-কেয়ার সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছি।”
আপত্তি করল না সে। বড় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নাতনীকে গভীরভাবে আলিঙ্গন করে সে-ও নিজের বিএমডব্লিউ গাড়িটিতে চড়ে বসল । ইন্সটার ইন্সটিটিউটে পৌছতে যে চল্লিশ মিনিট খরচ হল তা একরকম অস্বস্তিতে তাই গন্তব্যে পৌঁছে ব্রিফকেসটা হাতে নিয়ে পাসওয়ার্ড পাঞ্চ করে মেইন-দরজাটা অতিক্রম করে মূল ভবনে ঢুকতেই খুব স্বস্তি লাগল তার । অমন বিদঘুটে এক রাতের পর নিজেকে ব্যস্ত রাখাটা খুবই জরুরি, বিশেষ করে তার দুশ্চিন্তাগুলো দূরে রাখতে পারবে অন্তত। সে তার অফিসের দিকে এগোতেই কয়েকজন পরিচিত মানুষের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করল । হাই-হ্যালো-গুড মর্নিং বলতে বলতে এগিয়ে চলল সে । ইমিউনলজি বিষয়ক রিপোর্টটা আজকেই সম্পন্ন করতে হবে। জেরাল্ড ক্লার্কের ইমিউন-সিস্টেমের পরিবর্তন নিয়ে কেলি যে তত্ত্ব দিয়েছে তা নিয়েও বেশ উদ্বিগ্ন লরেন। প্রাথমিক ফলাফল এবং দেহ খণ্ডগুলো সে-রকম কোন কাজে আসে নি। ক্যান্সার ওর শরীরটাকে এমনভাবেই আক্রমণ করেছে যে কোন রকম ফলাফল বের করে আনা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। অফিসে পৌছে লরেন দেখলো এক আগন্ত্রক তার দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
“গুড মর্নিং, ডা, ওব্রেইন,” একটা হাত বাড়িয়ে দিল লোকটি। বয়স পঁচিশের বেশি হবে না, হালকা-পাতলা গড়ন, শেভ করা মাথা, গায়ে নিল রঙের সার্জিক্যাল অ্যাপ্রন।
লরেন এমইডিইএ-এর প্রজেক্টের প্রধান হবার সুবাদে রিসার্চ টিমের সবার নামই জানে । কিন্তু এই লোকটা কে? “ত, আপনি?”
“আমি হ্যাংক অ্যানভিসো।”
নামটা অস্পষ্টভাবে মনে পড়ল তার, তবুও মাথা ঝাঁকাল সে। মনে করার চেষ্টা করল লোকটা তার পরিচিত কিনা।
“মহামারী বিভাগ,” বললো সে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলার দ্বিধান্বিত হাবভাব পরিস্কার বুঝতে পারছে সে।
মাথা নেড়ে সায় দিল লরেন । “ও, হ্যা, মনে পড়ছে, আমি দুঃখিত, ডা. অ্যানভিসো।”
এই তরুণ একজন এপিডেমিওলজিস্ট, কাজ করে স্ট্যানফোর্ডে। সামনাসামনি কখনো তাকে দেখে নি লরেন । রোগ কিভাবে ছড়ায় এবং মহামারীতে রূপ নেয় সে-বিষয়ে কাজ করে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে সে। “আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?”
সে একটা ম্যানিলা ফোল্ডার তুলে ধরল। “আমি খুব খুশি হব যদি এগুলো একটু দেখেন।”
লরেন ঘড়ি দেখল। “ইমিউনলজিতে দশ মিনিটের ভেতর আমার একটি মিটিং আছে।”
“ওসব কিছুর চেয়েও আপনার এটা দেখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
লরেন তার অফিসের দরজাটা ম্যাগনেটিক আইডি-কার্ড দিয়ে খুলে ভেতরে নিয়ে গেল অ্যানভিসোকে । বাতি জ্বালিয়ে নিজের চেয়ারে বসে অতিথিকেও বসতে বলল সে। “বলুন, আপনি কি পেলেন?”
“এটার উপরেই কাজ করে আসছি আমি বেশ কিছু দিন ধরে, সে ফোল্ডারের ভেতরে হাত ঢোকাল। “আমি কিছু তথ্য খুঁজে পেয়েছি যেগুলো বেশ বিদঘুটে কিংবা বলতে পারেন অপ্রত্যাশিত, সঙ্গত কারণেই এগুলো আপনাকে দেখাতে চাইছি।”
“কি তথ্য?”
“আমি ব্রাজিলিয়ান মেডিকেল রেকর্ডগুলো ঘেঁটে দেখেছি, জেরাল্ড ক্লার্কের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কোন ঘটনা পাওয়া যায় কিনা।”
“অন্য কারো এমন বিস্ময়কর রিজেনারেশন হয়েছে কিনা?”
লাজুকভাবে হাসল সে। “আসলে সেটা নয়, তবে আমি চেষ্টা করছিলাম আমাজন রেইনফরেস্টে বসবাসকারীদের মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হারটা নিরুপনের মাধ্যমে জেরাল্ড ক্লার্ক ঠিক যে জায়গাটায় মারা গিয়েছিল সেই জায়গাটাকে এক সূতোয় বাধতে । আমি ভেবেছিলাম পরক্ষভাবে হলেও আমরা সে-সব অঞ্চল সনাক্ত করতে পারব যে-সব অঞ্চল দিয়ে জেরাল্ড ক্লার্ক ভ্রমন করেছে।”
নড়েচড়ে বসল লরেন। ব্যাপারটাকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাটা বেশ কৌতুহলোদ্দীপক, এমন কি এভাবে দেখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে ডা.আলভিসোকে এই কাজে নিযুক্ত করা হয়েছে। যদি সে জেরাল্ড ক্লার্কে ক্যান্সারের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কোন ক্যান্সারের খোজ আমাজনের কোথাও আবিষ্কার করতে পারে তবে অনুসন্ধান কাজের পরিধিটা অনেক ছোট হয়ে আসবে। ফলে কেলি ও ফ্রাঙ্ককে বেশি সময় জঙ্গলে অবস্থান করার দরকার হবে না।“তো কি পেলেন অবশেষে?”।
“ঠিক যা আশা করেছিলাম তা অবশ্য পাই নি,” চিন্তিত মুখে বলল সে। “জঙ্গলের ও আশেপাশের প্রত্যেকটি সিটি হাসপাতাল, মেডিকেল ফ্যাসিলিটি ও ছোট-ছোট ফিল্ড ক্লিনিকগুলোর সাথে যোগাযোগ করেছি আমি, তারাও আমাকে আমার চাহিদা অনুযায়ী বিগত এক দশকের সকল মেডিকেল রেকর্ড পাঠিয়ে যাচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ তথ্য কম্পিউটার দিয়ে বিশ্লেষণ করে অবশেষে কিছু তথ্য জড়ো করেছি আমি।
“কিছু কি পেয়েছেন ঐসব এলাকায় ক্যান্সারের প্রাদূর্ভব নিয়ে?” কণ্ঠে আশা নিয়ে জিজ্ঞেস করল লরেন। মাথাটা একটু নাড়ল সে।
“পেয়েছি তবে একটাও জেরাল্ডের মত নয়। তার বিষয়টা একেবারেই আলাদা।”
লরেন তার হতাশা চেপে রাখলেও কণ্ঠে বিরক্তি ভাব ঠিকই ফুটে উঠলো। “তাহলে আর কী এমন পেলেন?”
ডা, অ্যালভিসো একটা কাগজ বের করে ঐগয়ে দিলে কাগজটা হাতে নিয়ে রিডিং গ্লাসটা পরে নিল লরেন। এটা উত্তর-পশ্চিম ব্রাজিলের একটা ম্যাপ। নদীগুলো সাপের মত একেঁবেঁকে ঐ অঞ্চলের ভেতর দিয়ে আমাজন নদীতে গিয়ে মিশেছে। নগর ও শহরগুলোকে ছোট-ছোট বিন্দু দিয়ে দেখানো হয়েছে, সবগুলোই গড়ে উঠেছে নদীর আশেপাশে। সাদা-কালো ম্যাপটার কয়েকটি জায়গায় লাল রঙের ক্রস চিহ্ন দেয়া।
“এই যে…এই জায়গাগুলোই আমাকে তথ্য সরবরাহ করেছে। তাদের সাথে কাজ করার সময় বার্সেলো সিটির এক হাসপাতালের একদল ডাক্তারের আমার যোগাযোগ হয়।” তার কলমটি আমাজনের কাছে একটি শহরের দিকে নির্দেশ করল। জায়গাটা মানাউস থেকে নদী পথে দুই মাইলের মত হবে। “এক অজানা ভাইরাস থেকে সৃষ্ট রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল ওখানকার শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠদের মাঝে । শুনে প্রথম দিকে মনে হয়েছিল ওটা কোন একধরনের হেমোরিজিক ফিভার। শরীরে জর, জন্ডিস, বমি করা, মুখের ভেতর ঘা হওয়া এই সব আর কি। আমাকে যখন জানানো হয় ততদিনে এক ডজনেরও বেশি শিশু মারা গেছে ঐ রোগে। বার্সেলোর এক ডাক্তার বললো, এমন রোগ সে আগে কখনো দেখে নি। পরে সে এ বিষয়ে সাহায্য করতে অনুরোধ করলে আমি রাজি হয়ে যাই।”
ভ্রু-কুঁচকালো লরেন, কিছুটা বিরক্তও সে। এই মহামারী বিশেষজ্ঞকে পয়সা দিয়ে ভাড়া করে উড়িয়ে আনা হয়েছে শুধুমাত্র এই নির্দিষ্ট বিষয়টির উপর কাজ করার জন্য? কিন্তু সে কোন কথা না বলে তাকে আরো বলে যেতে দিল।
“যেহেতু ঐ অঞ্চলের সব রকম মেডিকেল টিমের সাথেই আমার নিজস্ব কাজটি নিয়ে যোগাযোগ তৈরি হয়েই ছিল সেহেতু আমি ঐ নেটওয়ার্ককেই কাজে লাগালাম। আমি তাদের সবার কাছেই একটা জরুরি অনুরোধ পাঠালাম, এরকম কোন রোগের সাথে তারা পরিচিত কিনা সেটা যাচাই করে আমার কাছে রিপোর্ট পাঠাতে।” ডা, অ্যানভিসো দ্বিতীয় কাগজটি বের করে এগিয়ে দিল। এটাও মনে হলো আগের ম্যাপটার মতই-নদীগুলো, ক্রস চিহ্ন, সব ঠিক জায়গাতেই আছে। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাপটিতে কয়েকটি ক্রসের চারপাশে নীলবৃত্ত আঁকা, আর প্রত্যেকটার পাশেই আলাদা আলাদা তারিখ দেয়া। “এই সার্কেল দেয়া জায়গাগুলোতেও ঐ রোগের উপস্থিতি দেখা গেছে।”
লরেনের চোখ প্রসারিত হলো। “সার্কেল দেয়া জায়গার সংখ্যা অনেক। কমপক্ষে এক ডজনেরও বেশি মেডিকেল টিম এই কেসগুলো দেখেছে।”
“আপনার এখানে কি এ-রোগের কোন লক্ষণ দেখা গেছে?”।
লরেন তাকিয়ে থাকল কয়েক মুহুর্ত, তারপর মাথা নাড়ল। এপিডেমিওলজিস্ট একটা সার্কেল দেয়া ক্রস দেখাল তাকে।
“প্রত্যেকটি রিপোর্টেরই তারিখ দিয়েছি আমি। এটাই রিপোর্ট করা সর্বশেষ জায়গা।” সে জায়গাটার উপর টোকা দিল। “এটাই ওয়াওয়ের মিশনারি ।
“জেরাল্ড ক্লার্ককে যেখানে পাওয়া গিয়েছিল?”
মাথা নেড়ে সায় দিল ডক্টর। এখন তার মনে পড়েছে আমাজনে ফ্রাঙ্করা পৌছানোর প্রথম দিনেই যে ফিল্ড রিপোর্টটা পাঠিয়েছিল তার কথা ওতে বলা হয়েছিল ওয়াওয়ের মিশনারি ও তার আশপাশ এলাকা ধ্বংস করে ফেলেছে বেশ কিছু কুসংস্কারাচ্ছন্ন ইন্ডিয়ান। কোন এক অজ্ঞাত রোগগ্রামের কিছু শিশু মারা যাবার পর তারা খুব ভয় পেয়ে যায়। “স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহায়তায় আমি জায়গাগুলো পরীক্ষা করে দেখেছি,” বলে চলল আলভিসো । নীল রঙের বৃত্তগুলোর উপর দিয়ে কলম টেনে নিচের দিকে আসতে শুরু করল সে। “যে ছোট স্টিমবোটটা জেরাল্ড ক্লার্কে লাশ বহন করেছে সেটা ঠিক এই বন্দরগুলিতেই থেমেছিল। নদীর আশেপাশের শহরগুলো দেখালো সে। “এসব জায়গা দিয়ে জেরান্ডের লাশটা নিয়ে যাবার পর পরই ঐ অজ্ঞাত রোগ ওসব এলাকায় ছড়িয়েপড়ে।”
‘মাই গড,” বিড়বিড় করে বলল লরেন। আপনি মনে করছেন লাশটা রোগ সৃষ্টিকারী কিছু প্যাথোজেন বহন করেছে?”
“প্রথমে এমনটাই চিন্তা করেছিলাম। ভেবেছিলাম এটাও একটা সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। মৃতদেহটাকে ওয়াওয়ে থেকে বহন করার কাজে তো একাধিক ক্যারিয়ার ব্যবহার করা হয়েছে। আর প্রায় সবরকম পরিবহণই করা হয়েছে বিভিন্ন নদীপথে তাই যেকোন ধরণের ছোঁয়াচে রোগ খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে রোগটা যে পদ্ধতিতে ছড়াল সেটাই কিন্তু সর্বশেষ প্রমাণ নয় যে, জেরাল্ডের বডিটা ছোঁয়াচে রোগের ভাইরাসের উৎস ছিল।”
লরেন যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। “লাশটা রোগের উৎস ছিল না ।ব্রাজিল থেকে ওটা পাঠানোর আগেই আমার মেয়ে সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেছে। রোগ সৃষ্টিকারী কোনধরণের প্যাথোজেন আছে কিনা তাও পরীক্ষা করা হয়েছিল। কলেরা, ইয়োলো ফিভার, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, যক্ষ্মা এসব পরিচিত প্যাথোজেন খোজ করা হয়েছিল কিন্তু কিছুই পাওয়া যায় নি, পুরো লাশটাই ক্লিন ছিল।” কিন্তু আমার তা মনে হয় না। সে তার ফোল্ডারের ভেতর থেকে সর্বশেষ কাগজটি বের করে আনল। মিয়ামির সিডিসি রিপোর্ট এটা। “ক্লার্কের লাশটা মিয়ামির ইন্টারন্যশনাল কস্টামসে অফিসিয়ালভাবেও একবার পরীক্ষা করা হয়েছিল। ওই রিপোর্ট বলছে স্থানীয় তিন শিশু এ রোগে আক্রান্ত। সবগুলো শিশুই ঐ এয়ারপোর্টে কর্মরত মানুষজনের।”
লোকটার মুখ থেকে এমন ভীতি জাগানো কথা শুনে লরেনের মনে হল সে যেন তার চেয়ারে ডুবে যাচ্ছে। তাহলে রোগটা যা-ই হোক না কেন সেটা এখন এখানে চলে এসেছে। আমরাই ওটা এখানে এনেছি। আপনি এখন এটাই বলতে চাচ্ছেন, তাইনা?”
মাথা নেড়ে সায় দিল ড, অ্যানভিসো ।
“এটা কতটা ছোঁয়াচে?কতটা ক্ষতিকর?”
লোকটার কণ্ঠ যেন হঠাৎ করেই যান্ত্রিক হয়ে উঠল। “নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।”
লরেন এই ব্যক্তি সম্পর্কে ভালই জানে। বয়সে তরুণ হলেও তার কর্মজগতে সে-ই সেরা, তা-না হলে তাকে একাজে জড়ানো হতো না।
“আপনার অনুমাণ কি বলে? কি হতে পারে বলে মনে করছেন? আমার মনে হয় কিছু একটা পেয়েছেন আপনি, তাই না?”
বড়সড় একটা ঢোক গিললো সে। “রোগ পরিবহণের হার ও পরিপূর্ণ মাত্রায় এটা সক্রিয় হওয়ার সময়কে প্রাথমিকভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এটা সাধারণ ঠাণ্ডাকাশির ভাইরাস থেকে শতগুন বেশি ছোঁয়াচে..আর এটা ইবোলা ভাইরাসের মতই মারাত্মক।”
লরেনের মনে হল তার মুখমণ্ডলজুড়ে রক্তের ধারা বয়ে যাচ্ছে। আর মৃত্যুর হার?” ডা, অ্যানভিসো নিচের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল কেবল।
“হ্যাঙ্ক?” ভগ্নস্বরে বলল লরেন, ভয়ে তার কণ্ঠ চেপে আসছে যেন।
মুখ তুলল অ্যালভিসো “এখন পর্যন্ত একজনকেও বাঁচানো যায় নি।”
১২ আগস্ট,
ভোর ৬:২২
আমাজন জঙ্গল
লুই ফ্যাভ্রি তার ক্যাম্পের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, উপভোগ করছে সূর্যদয়ের সময়টাতে নদীর সৌন্দর্য দেখতে। দীর্ঘ এক কর্মময় রাতের শেষে খুব শান্ত এক মুহূর্ত। শক্রর ক্যাম্পের একেবারে নাকের ডগা দিয়ে এক কর্পোরালকে অপহরণের পরিকল্পনা করে সেটাকে বাস্তবে রুপ দিতে গিয়ে বেশ কয়েক ঘন্টা সময় পার হয়ে গেছে। ফলাফলটা বরাবরের মতই, কোন রকম ব্যর্থতা ছাড়াই কাজটা সম্পাদন করেছে তার দল।
এখন এই চারদিন পর অন্য দলের উপর গোপনে নজরদারি করার কাজটি রুটিনের ছকে বেঁধে ফেলা হয়েছে। প্রতি রাতে নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যক মানুষ রানারের কাজ করে। রেঞ্জারদের থেকে বেশ খানিকটা পথ সামনে এগিয়ে থেকে অবস্থান করে তারা। গভীর জঙ্গল মাড়িয়ে সুবিধামত কোন জায়গায় পৌছে তারা শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত লম্বা গাছগুলোতে চড়ে বসে। তারপর সেখানে ডাল-পালার আড়ারে চমষ্কারভাবে গা ঢাকা দিয়ে ঘাপটি মেরে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে থাকে নিচের রেঞ্জারদের ওপর । গোপনে প্রহরা চলাকালীন সময়ে তারা বাকি সদস্যদের সাথে যোগাযোগ রাখে রেডিওর মাধ্যমে। সারাটা দিনজুড়ে লুই তার বাকি সৈন্য-সামন্ত নিয়ে প্যাডেল-নৌকার এক কাফেলাযোগে এগিয়ে গেছে সামনে। অন্যদের থেকে দশ কিলোমিটার পেছনে অবস্থান করছিল তারা। শুধুমাত্র রাতেই একটু কাছাকাছি এসেছে সবাই।
নদীর দিক থেকে ঘুরে গভীর জঙ্গলের দিকে হাটা শুরু করল লুই। অসংখ্য গাছের আড়ালে তাদের ক্যাম্পটা এমন এক জায়গায় যে বাইরে থেকে সেটা বোঝা কঠিন। দেখতে হলে উপর থেকে দেখতে হবে। সে আশেপাশে এলাকাটা একটু ঘুরে দেখল। তার চল্লিশ জনের দলটি ক্যাম্প গুটিয়ে নিতে শুরু করেছে। দল বৈচিত্রময়। তামাটে চামড়ার ইন্ডিয়ানদের সগ্রহ করা হয়েছে বিভিন্ন গোত্র থেকে দীর্ঘকায় কৃষ্ণাঙ্গ মারুনদের আনা হয়েছে ডাচ-গায়ানা থেকে। শ্যামলবর্ণের কলম্বিয়ানদের ভাড়া করা হয়েছে মাদক-ব্যবসা থেকে। তবে এত পার্থক্য থাকার পরও একটা দিক থেকে সবারই মিল আছে-সবাই প্রচুর পরিমাণে কষ্টসহিষ্ণু। রক্তাক্ত ছায়াময় জঙ্গল তাদেরকে ভেঙে-চুড়ে গড়ে দিয়েছে নতুন করে, ছাপ রেখেছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে । রাইফেল এবং বন্দুকগুলো নৌকার পালের কাপড়ে পেঁচিয়ে ঘুমানোর জায়গার ঠিক পাশেই সারি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আগ্নেয়াত্রগুলোও তার দলের লোকজনের মতই বৈচিত্রময় । জার্মান হেকলার এবং এমপিএস, চেক স্করপিয়ন, ছোট আকৃতির সাবমেশিন গান, ইসরাইলে বানানো উজি, এমনকি বহু পুরনো কিছু ব্রিটিশ স্টেনগানও আছে তাদের কাছে।প্রত্যেকেই নিজের পছন্দমত অস্ত্র রেখেছে যেমনটা রেখেছে লুই নিজেও।
লুইয়ের পছন্দের হল কমপ্যাক্ট মিনি উজি। এটার ক্ষমতা এর সহোদরদের মতই কিন্তু দৈর্ঘ্যে মাত্র চৌদ্দ ইঞ্চি। এটার কার্যকারী নক্সার কারণে লুই খুব সস্তুষ্ট। ছোটখাট কিন্তু প্রাণঘাতি । ঠিক তার মতই!
তাদের এতসব অস্ত্রের পাশে আরেকটি জিনিস যোগ হয়েছে। টিমের কিছু সদস্য বেশ কতগুলো ম্যাশেট চাপাতি ধার দিচ্ছে। পাথরের উপর স্টিলের ঘর্ষণের শব্দ মিশে যাচ্ছে ভোরের পাখির ডাক আর বানরের চিৎকারের সাথে । হাতে-হাতে যুদ্ধ একটা ভাল ধাঁরালো ছুরি বন্দুকের চেয়েও বেশি কাজে দেয়।
ক্যাম্পের সব কিছু ঘুরে দেখা শেষ হতেই তার সেকেন্ড-ইন-কমান্ড তার দিকে এগিয়ে এল । লোকটা লম্বা ও কৃষ্ণকায়, মারুন গোত্রের বাসিন্দা। নাম জ্যাক। মাত্র তের বছর বয়সে তারই প্রতিবেশী এক গোত্রের মেয়েকে ধর্ষণ করার অপরাধে গ্রাম থেকে বের করে দেয়া হয় তাকে। বাল্যজীবনটা জঙ্গলেই কেটেছে। আর তারই সাক্ষ্য বহন করে চলেছে সে এখনো তার নাকের একটা পাশ নেই, পিরানহা মাছের আক্রমণের শিকার হয়েছিল ছোটবেলায়। সে খুব ভদ্রতার সাথে মাথা নেড়ে সায় দিল, “ডক্টর।”
“হা, জ্যাক, বলো।” “মিসট্রেস টুসি বোঝাতে চাইছেন, তিনি আপনার জন্য প্রস্তুত।”
হাফ ছাড়ল লুই। অবশেষে বন্দি এতক্ষণে প্রমান করেছে সে যথেষ্ট কঠিন। পকেটে হাত দিয়ে একটা ডগ-ট্যাগ বের করে এনে হাতের তালুতে এটা দিয়ে কয়েকবার আঘাত করে ক্যাম্পের একেবারে প্রান্তে কিছুটা নির্জনতায় বানানো এক তাবুর দিকে এগিয়ে গেল সে। চোখে ধুলা দেয়ার মত এই বিশেষ তাবুটি সাধারনত লুই এবং টুসি একসঙ্গে ব্যবহার করে। কিন্তু গতরাতে এমনটা হয় নি। সারারাত টুসি তার নতুন অতিথির মনোরঞ্জন করেছে।
লুই নিজের উপস্থিতি জানান দিল । “টুসি ডার্লিং, আমাদের মেহমান কি সাহায্য করতে প্রস্তুত?” সে ঢোকার মুখের কাপড়টা তুলে মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকল।
ভেতরটা অসহ্য গরম। একটা ছোট্ট ব্রেইজিয়ার জ্বলছে ঘরের এক কোণে, যেটার সামনে হাটু গেড়ে বসা তার মিসট্রেস। একগুচ্ছ কলাপাতা পোড়াছে সে ছোট্ট স্টোভটার আগুনে। সুগন্ধী ধোঁয়া উপরে উঠছে কুণ্ডুলি পাকিয়ে। উঠে দাঁড়াল সে আগুনের সামনে থেকে । তার কফি বর্ণের ত্বক চকচক করে উঠল হালকা ঘামের কারণে।
লুই তাকিয়ে রইল তার দিকে, যেন ভেতরে টেনে নিচ্ছে তাকে। দ্রুত ছুটে গিয়ে তাকে জাপটে ধরতে ইচ্ছে হলো তার কিন্তু নিজেকে সংযত রাখল। তাদের মাঝে আজ সকালে এক অতিথি উপস্থিত আছে। সে তার মনোযোগ আগন্তুকের দিকে দিল। নগ্নদেহে হাত-পাণ্ডলো চার দিকে ছড়িয়ে মাটিতে পড়ে আছে। সারা শরীরে পোশাক বলতে শুধু মুখের ভেতর দলা পাকানো এক টুকরো কাপড়। লুই কর্পোরালের রক্তাক্ত শরীর থেকে চোখ ফিরিয়ে নিল। তার হাতে এখন ডগট্যাগটি। সে একটি ফোল্ডিং ক্যাম্প-চেয়ারে বসল। হাতের ডগট্যাগে খোদাই করা নামটা পড়ল শব্দ করে : “কর্পোরাল জেমস ডি মারটিনি। আমি খুব নির্ভরযেগ্য মাধ্যম থেকে জানতে পেয়েছি তুমি আমাদেরকে সাহায্য করতে রাজি হয়েছ।”
একটু গোঙানির মাত শব্দ করল লোকটি। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে এল তার।
“এটাকে কি হ্যা হিসেবে ধরে নেব?”
সীমাহীন অত্যাচারে নিঃশেষ রেঞ্জার মাথা নেড়ে সায় দিল। ব্যাথার অপমানে পুরো চুপসে গেছে সে । কিসে তাকে বেশি কষ্ট দিয়েছে-ভাবল লুই । তার উপর করা নির্যাতন? নাকি ঠিক এই মুহূর্তটা যখন সে মুখ খুলতে যাচ্ছে? ক্লান্তির এক শ্বাস ফেলে মুখ থেকে কাপড়টা টেনে বের করল লুই। তার দরকার তথ্য। বছরের পর বছর ধরে সে শিখেছে, সফলতা ও ব্যর্থতার ভেতর যে পার্থক্য তা লুকিয়ে থাকে তথ্যের মধ্যে। তার শত্রুপক্ষের টিম সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ তথ্য তার কাছে আসছে। তার টিমের সেট সেভিন নামের এক সদস্য সরাসরি তথ্য পাঠায় তার কাছে। সেভিন ছাড়াও আরও অনেক বিশ্বস্ত সুত্রের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করছে সে। কিন্তু এতেও লুইর মন ভরছে না পুরোপুরি । সে এই তরুণ কর্পোরালকে অপহরণ করেছে তার কারণ হলো তার কাছে সরবরাহ করা অন্য সূত্রগুলোর পাঠানো তথ্যে খুঁটিনাটি বিষয় সম্বন্ধে অনেক কিছুই ব্যাপকভাবে অনুপস্থিত। আর্মি রেঞ্জারদের অস্ত্রের মজুদ কেমন, তাদের রেডিও কোড, টাইমটেবিল, এসব তথ্য তারা দিতে ব্যর্থ হয়েছে । সাথে আরও যে জিনিসটা জানা দরকার সেটা মিলিটারিদের এই জঙ্গলে আসার উদ্দেশ্য কি। তারা মুখে তো এটা বলাবলি করে না । আর অর্ডার বলতে তাদের যা দেওয়া হয় সেটা শুধু মিলিটারিরাই বোঝে। গুপ্তচরদের কান পর্যন্ত পৌছায় না সে-সব । আর সবশেষে লুই এই অপহরণটাকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছুড়ে দিয়েছিল তার দলের প্রতি। একটু পরখ করে দেখল তার সঞ্চিত শক্তির সামর্থ্য ।
অপহরণকারী দলটিা কাজ করল একেবারে নির্ভুলভাবে । নাইটভিশন গ্লাস চোখে দিয়ে ছোটদলটি নদী বেয়ে সবার অলক্ষ্যে রেঞ্জারদের ক্যাম্পের কাছে পৌছায়। তারপর অপেক্ষা। ঠিক উপযুক্ত সুযোগটি আসার সাথে সাথেই এক রেঞ্জারকে ডার্ট এ বিদ্ধ করে ঘায়েল করে। কুরারি নামের একরকম বিষ দিয়ে ডার্টগুলো বানিয়ে দিয়েছিল টুসি।। শিকারকে করায়ত্ত করার পর তাকে নিয়ে ফেরত আসার সময় আবারও বুদ্ধির খেলা। তাদের ব্যবহৃত পথটা ঢেকে দিয়ে সেখানে আরেকটি ভুলপথ একেঁ দেয়া হয়। খুব কৌশলের সাথে ধোঁকা দেয়া পথটাকে নদীর তীরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে জায়গায় জায়গায় কুমিরের বিষ্ঠা এবং পায়ের ছাপ তৈরি করে ওরা ও তার মিসট্রেস অপহৃত ব্যক্তিকে ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনা পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখার জন্য মুখের সাথে মুখ লাগিয়ে এক রকম এ্যান্টিডোট ঢুকিয়ে দিয়েছিল শরীরের ভেতরে।
কিন্তু টুসি তার মেধার প্রকৃত স্বাক্ষর রেখেছে গতকাল রাতে। সারারাতজুড়ে তার শৈল্পিক অত্যাচারের পদ্ধতিটা ছিল বড়ই বিচিত্র। যন্ত্রণা ও আনন্দের প্রয়োগ একই সাথে, এক অদ্ভুত সম্মোহনীময় ছন্দে চলেছে পুরো রাতজুড়ে, একেবারে মুখ খুলতে রাজি হওয়ার আগ পর্যন্ত।
“প্লিজ, আমায় মেরে ফেলুন, খসখসে গলায় খুব বিনয়ের সাথে বলল রেঞ্জার। রক্ত বেয়ে আসছে তার ঠোট থেকে ।।
“খুব তাড়াতাড়িই সেটা করব, বন্ধু…তবে কিছু প্রশ্ন করতে চাই।” লুই কিছুটা পেছন দিক হেলে টুসিকে সামনে দিয়ে হেটে যাবার জায়গা করে দিল। ধোঁয়া উড়তে থাকা পাতার আঁটি হাতে নিয়ে সে কর্পোরালের চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করেছে। ধোয়া ছড়িয়ে পড়ছে সারা ঘরময় । লুই লক্ষ করল হতভাগ্য কর্পোরাল যতটা সম্ভব নিজেকে গুটিয়ে রাখতে চাইছে মেয়েটির কাছ থেকে। তার ভীতসন্ত্রস্ত চোখ ওর প্রত্যেকটি নড়াচড়া গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
ব্যাপারটা খুব উত্তেজনারকর ঠেকল লুইর কাছে কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখল শেষ পর্যন্ত। প্রথমেই মানুষজনের সংখ্যা নিয়ে কথা বলা যাক।” পরবর্তী কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে কর্পোরালের পেট থেকে সব তথ্যই বের করে নিল। আর্মিদের সব কোড, কাজের সময়সূচী সবই বললো কর্পোরাল, কোন কিছুই লিখে নেওয়ার দরকার হলো না লুইর। সব রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ও নাম্বারগুলো মাথায় সাজিয়ে নিয়েছে সে। এই তথ্যগুলো অন্যদলের যোগাযোগে আড়িপাততে দারুণ কাজে আসবে। এগুলো শোনার পর রেঞ্জারদের শক্তিমাত্রা কতটুকু সে বিষয়ে তথ্য আদায় করল লুই। কত ধরনের ও কি পরিমাণে অস্ত্র আছে, রেঞ্জারদের দক্ষতা কোন পর্যায়ের, দূর্বলতা কি কি, আকাশপথে সাহায্যের পরিমাণ কেমন-সবই জেনে নিল সে।
মানুষটাও সব বলে দিল বাচালের মত। গড়গড় করে বলে যাচ্ছে একের পর এক, যতটুকু জানতে চাওয়া হয়েছে তার চেয়েও বেশি।
“..স্টাফ সার্জেন্ট কসটসের রাকস্যাকের ভেতর একটা পকেটে হুইস্কি আছে…দুই বোতল, ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানের নৌকার ভেতরে এক জায়গায় কাঠের এক ঝুড়ি মিনি নাপাম বোমা আছে…কর্পোরাল কঙ্গারের একটা পেস্থাউস ম্যাগা” দাঁড়াও, ভাই । সোজা হয়ে বসল লুই।“কি বললে এইমাত্র? নাপাম বোমা?”
“ছোট সাইজের…এক ডজনের মত…”
“বোমা কেন?” দ্বিধাগ্রস্ত দেখাল কর্পোরালকে। “জেম্স,” কঠিন গলায় বলল লুই।
“আমি..আমি জানি না। আমার মনে হয় জঙ্গলে চলার পথে আটকে থাকা কোন জিনিস অপসারণ করার জন্য।”
“একটা বোমা কি পরিমাণ জায়গা পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারে?”
“আমি..” একটু ফুপিয়ে উঠল লোকটি, “..আমি নিশ্চিত নই, হয়তো এক একর…আমি ঠিক জানি না।”
হাতের কনুই দুটো দু-হাটুর উপর ভর দিয়ে সামনে ঝুঁকে এল লুই। কৌতুহলে এক ভুরু উচু হয়ে গেছে তার। আমার কাছে সত্যি বলছ তো, জেমস?” সে একটা আঙুল নেড়ে টুসিকে ইশারা করল । বিরক্তিকর আলোচনায় মন না দিয়ে ঘরের এক কোণীয় আসন গেড়ে বসে কিছু নতুন যন্ত্রপাতি বের করায় ব্যস্ত সে। সংকেত পেয়েই হাতের কাজ ফেলে জঙ্গল ক্যাটের মত চার হাত পায়ে ভর দিয়ে নগ্ন কর্পোরালের কাছে চলে এল।
“না,” চাপাকণ্ঠে কেঁদে উঠল সে। “না, আমি আর কিছুই জানি না।” চেয়ারে আবারো হেলান দিয়ে বসল লুই।
“আমি কি তোমাকে বিশ্বাস করতে পারি?”
“দয়া করেন আমার উপর।”
“আমার মনে হয় আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে পারি,” উঠে দাঁড়িয়ে সে তার মিসট্রেসের দিকে ঘুরল । “আমাদের এখানকার কাজ শেষ, ডার্লিং। সে এখন পুরোপুরি তোমার।” একটু এগিয়ে এসে গালটা এগিয়ে দিল তার দিকে একটা চুমু পাবার আহ্বান চোখেমুখে।
“না,” আকুতিভরা কণ্ঠে অনুরোধ করল মাটিতে পড়ে থাকা মানুষটি।
“সময় নষ্ট করো না,” টুসিকে বলল লুই। সূর্য প্রায় মাথার উপর উঠে গেছে, খুব তাড়া তাড়িই নৌকায় চড়তে হবে আমাদের।” একটু হাসল সে। চোখেমুখে ধোয়াটে লালসার উপস্থিতি। তা থেকে বেরুনোর জন্য পা বাড়াতেই এক নজর তার মিসট্রেসকে দেখে নিল । এরইমধ্যে সে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তার কাজের প্রাথমিক ধাপটি শেষ করার জন্য। হাড়ের সূচ, সুতা হাতে নিয়ে প্রস্তুত করছে। সম্প্রতি মাথা কুঁচকানোর এই খেলায় এক নতুন-মাত্রা যোগ করার চেষ্টা করছে টুসি। সে তার শিকারের চোখজোড়া জীবিত অবস্থায়ই সেলাই করতে পছন্দ করে এখন। ভেতরের সত্ত্বাটা যেন পালাতে না পারে শিকারের। শুআর গোত্রের শামানরা চোখকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়ে থাকে। তাদের কাছে চোখ হলো আত্মার কাছে পৌছানোর রাস্তা। পেছন থেকে তীক্ষ্ণ এক চিৎকার ভেসে এল ।
“টুসি, লোকটার মুখে কাপড় খুঁজে নিতে ভুল না,” বকুনির সুরে বলল লুই। কথাটা বলতে গিয়ে একটা ভুল করে বসল সে, তাদের দিকে এক নজর তাকাতে হল তার। কর্পোরালের উপর বসে আছে টুসি, তার দুই উরু দিয়ে মাথার দু-পাশ চেপে ধরে আছে। আর হাত দুটো ব্যস্ত সুই-সুতো প্রস্তুত করতে। দুই উরুর মাঝে আটকে থেকে চিৎকার দিচ্ছে রেঞ্জার। আরেকটু ঝুঁকে গেল টুসি। বিস্ময়ে একটি ভুরু উঁচু হয়ে গেল লুইর। তার কাছে মনে হল নতুন কিছু করতে যাচ্ছে মেয়েটি।
“আমায় ক্ষমা কর, ডার্লিং,” বলল লুই তাবু থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে। বকুনিটা একটু তাড়াতাড়িই দেয়া হয়ে গেছে আসলে। মুখে কাপড় গোঁজার কোন প্রয়োজনই নেই। কর্পোরালের ঠোট জোড়া এরইমধ্যেই সেলাই করে দিয়েছে টুসি ।
