আমাজনিয়া – ৮
গ্রাম
১৩ই আগস্ট, দুপুর বেলা
আমাজন জঙ্গল
ছুঁড়ে দেয়া দড়িটা ধরে ফেললো নাথান, তারপর সেটাকে একটা শাল গাছের সাথে বেঁধে দিল সে। তার ভ্রুজোড়া কুঁচকে আছে। “সাবধান,” সহযাত্রীদেরকে সতর্ক করল । “জায়গাটা জলমগ্ন, সাবধানে পা ফেলতে হবে সবাইকে। সে কেলিকে নৌকার উপর থেকে নামিয়ে পাড়ের সবচেয়ে শক্ত মাটির জায়গায় যাওয়া পর্যন্ত সাহায্য করল। তার হাটু পর্যন্ত কাদা-পানিতে মাখামাখি, সারাশরীর ভিজে গেছে। মুখটা মেঘ আকাশের দিকে তুলে ধরল সে। ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে। সারারাত ঝড়ের শেষে তুমুল বর্ষণ শুরু হয়। এখন এই ঘণ্টাখানেক হল মুষলধারে বর্ষণ হচ্ছে। অতিক্ষুদ্র বৃষ্টি কণার বিশাল এক চাদর কুয়াশার মত আছড়ে পড়ছে পুরো জঙ্গলের উপর । আজকের ভ্রমনটা এখন পর্যন্ত বেশ অসহ্যকর বলা চলে। সারা সকালজুড়ে তাদের সবাইকে হস্তচালিত পাম্প দিয়ে নৌকার ভেতর থেকে পানি সেঁচতে হয়েছে। অবশেষে একটু আগে ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান দুপুরের খাবারের জন্য থামতে বললে নাথান খুব খুশি হয়। সবাইকে নৌকা থেকে নামতে সাহায্য করার পর নদীপাড়ের কাদা ভেঙে একটা উঁচু জায়গায় গিয়ে পৌছাল সে। তার চারপাশের পুরো জঙ্গল কাঁদছে, মাথার উপর সবুজের চাদর থেকে ফোটা-ফোটা জল এক হয়ে নিচের দিকে নেমে আসছে অসংখ্য ছোট বড় ধারায় । এমন প্রতিকূল অবস্থায়ও প্রফেসর কাউয়িকে নিরুদ্বেগ মনে হচ্ছে। পাম-পাতা দিয়ে ঝটপট একটা থলে বানিয়ে জঙ্গলের দিকে খাবার সংগ্রহ করতে ছুটল সে। তার সাথে আছে কর্পোরাল জারগেনসেন। সে-ও ভিজে গেছে। তার খিটমিটে চেহারা দেখে মনে হচ্ছে জঙ্গলে ঢুকতে বিন্দুমাত্রও আগ্রহ নেই দীর্ঘকায় এই সুইডিশ কর্পোরালের কিন্তু ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানের কড়া নির্দেশ, এই জঙ্গলে কেউ কোথাও একা যেতে পারবে না, এমন কি অভিজ্ঞ কাউয়িও নয়।
পুরো ক্যাম্পজুড়ে সবাই ডুবে আছে বিষন্নতায়। জেরাল্ড ক্লার্কের শরীর থেকে ছড়িয়ে পড়তে থাকা ছোঁয়াচে জীবাণুটা সম্ভাব্য কি রোগের কারণ হতে পারে সে-সম্পর্কিত তথ্য গতকাল তাদের কাছে পৌঁছেছে। আক্রান্তদেরকে সুস্থদের থেকে আলাদা করে রাখার জন্য কোয়ারেন্টাইন-সেল তৈরি করা হয়েছে মিয়ামিতে এবং জেরাল্ডের লাশ যে ইন্সটিটিউটে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করা হচ্ছে তার আশপাশ জুড়ে পাশাপাশি ব্রাজিলিয়ান সরকারকেও এই বিষয় সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। একাধিক কোয়ারেন্টাইন-সেল তৈরি করা হচ্ছে পুরো আমাজন জুড়ে। এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র শিশু, বৃদ্ধ এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দূর্বল তাদেরকেই ঝুঁকির মুখে ধরা হচ্ছে। আর প্রতিরোধ ক্ষমতাসন্ন হিসেবে ধরা হচ্ছে স্বাস্থ্যবান পূর্ণবয়স্কদের। তবে এখনো অনেক কিছুই জানার বাইরে রয়ে গেছে। এই রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ধরণ, চিকিত্সা-পদ্ধতি সবকিছুই এখনো অজানা । ওদিকে ইউনাইটেড স্টেটসে একটি চতুর্থ লেভেলের কনটেইনমেন্ট স্থাপন করা হয়েছে ইন্সটার ইন্সটিটিউটের ভেতর এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য ।
নাথান ঘুরে তাকাল ফ্রাঙ্ক এবং কেলির দিকে। একটা হাত দিয়ে বোনকে ধরে রেখেছে ফ্রাঙ্ক। এখনো ফ্যাকাশে হয়ে আছে মেয়েটি। তার ছোট্ট মেয়েটাসহ তাদের পরিবারকে ইন্সটার ইন্সটিটিউটের কোরেন্টাইন এ অন্যসব বিজ্ঞানী এবং কর্মজীবিদের সাথে রাখা হয়েছে। তাদের কারোর মধ্যে এখনো রোগের কোন লক্ষণ দেখা যায়নি কিন্তু নেতিবাচক কিছু ঘটার শঙ্কা কেলির চোখে-মুখে ফুটে উঠছে স্পষ্ট। ঘুরে দাঁড়াল নাথান, তাদের ব্যক্তিগত সময়টুকুতে ব্যঘাত না ঘটিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে।
গত আট চল্লিশ ঘণ্টার ভেতর তাদের দলের কাউকে এই জঙ্গল শিকার বানাতে পারে নি আর এটাই একমাত্র আশাব্যঞ্জক ঘটনা। দুদিন আগে কর্পোরাল ডি-মারটিনিকে হারানোর পর থেকে সবাই খুব সতর্ক হয়ে গেছে। জঙ্গলের ভয়ঙ্কর প্রাণী ও তাদের স্বাভাবসুলভ আচরণ সম্পর্কে নাথান এবং কাউয়ির সতর্কবার্তাগুলো সবাই মনে রেখেছে। এখন নৌকা থেকে নামা বা গোসলের আগে প্রত্যেকে জায়গাটা পরীক্ষা করে নেয়, কাদার ভেতর ডুবে থাকা স্টিংরে অথবা লুকিয়ে থাকা ইলেকট্রিক ইল আছে কিনা। কাউয়ি তাদের শিখিয়েছে কিভাবে সাপ এবং বিছুদের থেকে দূরে থাকতে হয়। সকালে বুট পায়ে দেবার সময় কেউ-ই ওগুলো ভালভাবে না ঝেড়ে পায়ে দেয় না। নাথান ক্যাম্পের আশপাশ ঘুরে তাদের ক্যাম্পের সীমানাটুকু দেখে নেয়, ভয়ঙ্কর কিছু আছে কিনা তা খুঁজে বেড়ায় সতর্কতার সাথে। ফায়ার লিয়ানা, পিপড়ার বাসা, লুকানো সাপের আস্তানা এগুলো পরীক্ষা করে একেবারে রুটিন মাফিক একটি কাজ হিসেবে। তাদের দলের সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন দুই সদস্য, এরা হারিয়ে যাওয়া দু-জনের জায়গায় এসেছে। ওই দু-জন মনোযোগ দিয়ে কাঠ সংগ্রহ করছে। ওদেরকে ভাল করে দেখল নাথান। দু-জনেই প্রথম শ্রেণীতে স্থান পাওয়া সৈনিক, উভয়েই নতুন কমিশন পেয়ে রেঞ্জার-ইউনিটে যোগ দিয়েছে। তাদের একজন ট্যাংক-যোদ্ধা, কথায় ব্রনক্সের টান আছে, নাম এডি জোন্স। অপরজন বিস্ময়করভাবে একজন নারী, তাদের রেঞ্জার দলের প্রথম নারী রেঞ্জার নাম মারিয়া ক্যারেরা। ছয়মাস আগে সংবিধানের দশ নম্বর অধ্যায় দেশের সীমাবদ্ধতাপূর্ণ একটি আইন সংশোধন সংক্রান্ত এক বিল কংগ্রেসে পাস হয়, তারপর থেকে রেঞ্জারদের মত স্পেশাল ফোর্সেও নারীরা অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায়। তবে এই নতুন নারী রিক্রুটরা স্পেশাল ফোর্সগুলোতে যোগ দিয়েই প্রথম সারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করতে পারে না। অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য আমাজনের এই মিশনের মত বিভিন্ন মিশনে পাঠানো হয় ওদেরকে।
রাতে এক রেঞ্জার হারানোর দিন সকালেই নতুন দু-জনকে ওয়াওয়ের বেসস্টেশন থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছে এখানে। মাথার উপর স্থির হয়ে থাকা একটা হুয়ি কপ্টার থেকে দড়ি বেয়ে নিচে নামে ওরা, তারপর পরই ছোট কয়েকটি ট্যাংক জ্বালানী ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কিছু সরঞ্জাম নামানো হয় ওপর থেকে। এবারের পণ্য সরবরাহটা ছিল একই সাথে কঠিন ও সর্বশেষ । গতকাল সকাল থেকে তাদের টিম জঙ্গলের আরও গভীরে প্রবেশ করতেই হুয়ির উড়ে আসার সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করেছে নাথানেরা, ফেলে এসেছে আকাশপথ থেকে আসা সাহায্যের পরিধিও। আসলে আজ অবধি তারা প্রায় চারশ মাইলের মত ভ্রমণ করে ফেলেছে। তারপরও তাদের কাছে আসতে সক্ষম দূরপাল্লার একমাত্র যে কপ্টারটি আছে সেটা হলো কালো রঙের কম্যানচি । চকচকে কালো রঙের এই যোদ্ধা দানবটিকে শুধুমাত্র জরুরি প্রয়োজনেই ব্যবহার করা হবে। যেমন দূরের আহত কোন সদস্যকে উড়িয়ে নিতে অথবা উপর থেকে শক্রদের উপর হামলা চালাতে। অন্যথায় আজকের পর থেকে ভ্রমণের একেবারে শেষ পর্যন্ত তাদেরকে একলাই পথ চলতে হবে।
সব কিছু ঘুরে ফিরে দেখা শেষ হতেই ক্যাম্পের মাঝখানে ফিরে এল নাথান। কর্পোরাল কঙ্গার এক স্তূপ ছোট ডাল-পালার উপর ঝুঁকে আছে। স্তুপের নিচে কয়েকটি পাতা রেখে তাতে দেয়াশলাই দিয়ে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করছে সে। একটা কাঠি জ্বালাতেই উপর থেকে কয়েক ফোটা পানি পড়ে নিভিয়ে দিল শিখাটা ।
“ধুরা!” তরুণ কর্পোরাল বেশ বিরক্তির সাথে হাতের দেয়াশলাইটা ছুড়ে ফেলে দিল। “শালার সবকিছুই পানিতে ভেঁজা। দাঁড়াও, ম্যাগনেসিয়াম ফ্লেয়ার দিয়ে তোমাদের কপালে আগুন দিচ্ছি।”
“ওগুলো বাঁচিয়ে রাখ, ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান খুব কাছ থেকে আদেশ দিলেন। “আজকের লাঞ্চের জন্য একটা কোল্ড-ক্যাম্পই করা হোক।” পাশ থেকে ম্যানুয়েল একটু কাতরে উঠল, তার সারা শরীর ভেঁজা। তবে দলের যে সদস্যকে সবচেয়ে হতভাগা মনে হচ্ছে সে হলো টর-টর। জাগুয়ারটি গোমড়ামুখে তার মাস্টারের চারপাশে ধীর ও সন্ত্রস্ত পদক্ষেপে হাটছে, গায়ের লোমগুলো পানিতে চুই-চুই, কান দুটো নিচের দিকে ভাজ হয়ে ঝুলে আছে। একটা ভেজা বেড়ালের চেয়ে হতভাগা আর কে হতে পারে। এমন কি সেটা দুশ পাউন্ডেরও হয় তবুও।
“মনে হয় আমি সাহায্য করতে পারব,” নাথান বললো। সবার চোখ তার উপর এখন। “ইন্ডিয়ানদের পুরনো একটি কৌশল আমি জানি।” সে ঘুরে জঙ্গলের দিকে হাটা শুরু করল। কিছুক্ষণ আগে চারপাশ ঘুরে দেখার সময় একটা বিশেষ ধরনের গাছ নজরে আসে তার, সেটাই এখন খুঁজছে। তার পিছুপিছু আসছে ম্যানুয়েল ও ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান । খুব দ্রুতই সে খুঁজে পেল ওটা। লম্বা গাছটার ধূসর বহিরাবরণ চোখে পড়ার মত অমসৃণ। কোমরে গোঁজা চাপাতিটা হাতে নিয়ে গাছের ছালের ভেতর ঢুকিয়ে দিল সে। লৌহবর্ণের ঘন এক প্রকার আঠা বেরিয়ে এল সাথেসাথে সে একটা আঙুলে খানিকটা আঠা লাগিয়ে ওয়াক্সম্যানের নাক বরাবর তুলে ধরল ।
ক্যাপ্টেন ঘ্রাণ শুকে বলল, “তাৰ্পিন তেলের মত লাগছে।”
নাথান গাছটায় চাপড় মারল। “এটার নাম কোপাল, শব্দটা এসেছে অ্যাজটেক সভ্যতা থেকে। তারা ভার্নিশকে বলত কোপালি । সেখান থেকে আজকের এই কোপাল । এ-ধরণের গাছ পাওয়া যায় সেন্ট্রাল ও সাউথ আমেরিকার সব রেইনফরেস্টে। এটা এখন বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। ক্ষত সারানোর কাজে, ডায়রিয়া চিকিৎসায়, ঠাণ্ডার রোগ কমাতে, এমনকি বর্তমানে এটা দাঁতের আধুনিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে।”
‘দাঁতের চিকিৎসায়?” জিজ্ঞেস করল ম্যানুয়েল।
আঠা লাগানো চটচটে আঙুলটা তুলে ধরল নাথান। “যদি তুমি তোমার দাঁতে কখনো ক্যাভিটি পূরণ করে থাক তবে ধরে নাও এই কোপালির কিছু অংশ মুখে নিয়ে ঘুরছ।”
“বুঝলাম, কিন্তু এটা আমাদের কাজে আসবে কিভাবে?” ওয়াক্সম্যান জিজ্ঞেস করল।
নাথান ঝুঁকে পড়ে গাছের গোড়ায় পড়ে থাকা কিছু আধা-পচা পাতা এক জায়গায় জড় করল। “কোপালে প্রচুর পরিমাণে হাইড্রোকার্বন থাকে। সত্যি বলতে, সম্প্রতি এটা নিয়ে এখন গবেষণা চলছে, এটাকে জ্বলানীর উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যায় কিনা । কোন ইঞ্জিন এই কোপাল দিয়ে চালালে তা গ্যাসোলিন থেকে আরও নিখুঁত ও কার্যকরভাবে চলবে।” নাথান যা খুঁজছিল তা পেয়ে গেল অবশেষে। “তবে ইন্ডিয়ানরা এই কোপালির গুণাগুণ বহুকাল আগেই জেনে বসে আছে।” সে উঠে দাঁড়াতেই সবাই দেখল তার হাতে একদলা থকথকে কোপাল আঠা। একটা লাঠির সূঁচালো ভাগে হাতের আঠাটুকু লাগাল, ঠিক হাওয়াই মিঠার মত করে। “একটা দেয়াশলাই দেয়া যায়?”
ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান পানিরোধি একটি কনটেইনার থেকে দেয়াশলাই বের করে দিল।
নাথান কাঠিটা জ্বালিয়ে আঠার বলটার একপ্রান্তে ধরল, সাথে সাথেই উজ্জ্বল নীলশিখা জ্বলে উঠল তাতে। সে জ্বলন্ত লাঠিটা মশালের মতো করে ধরে নিভে যাওয়া ক্যাম্পফায়ারের কাছে চলে এল। ইন্ডিয়ান শিকারীরা শতশত বছর ধরে বৃষ্টি-বাদলের দিনে ক্যাম্পফায়ার জ্বালানোর কাজে এটা ব্যবহার করে আসছে। ঘন্টাখানেক জ্বলবে এটা, ভেঁজা কাঠগুলো শুকনো করার জন্য সময়টা যথেষ্ট, তারপর বাকিগুলো এমনিতেই জ্বলবে।”
সবার চোখ অগ্নিশিখার দিকে। নাথানের আঠার বলটা ডালপালা আর পাতার মাঝখানে বসানো শেষ হতেই কেলি ও ফ্রাঙ্ক তাদের সাথে যোগ দিল । অল্পকিছুক্ষণের মধ্যেই ছোট ডাল ও কাঠগুলোতে আগুন ছড়াতে থাকল ধীরে ধীরে।
“দারুণ,” হাত দুটো আগুনে গরম করতে করতে ফ্রাঙ্ক বলল।
নাথান খেয়াল করুল কেলি মুখে একটা হাসির রেখা ফুটিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। গত চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে এটাই তার প্রথম হাসি।
গলাটা পরিস্কার করে নিল নাথান। “আমাকে ধন্যবাদ দেবেন না । ধন্যবাদ দিতে হলে ইন্ডিয়ানদের দিন।”
“আমারও মনে হয় ওটা করতে পারব,” প্রফেসর কউয়ি হঠাৎ কথা বলে উঠল পেছন্ন থেকে। সবাই ঘুরে দাঁড়াল। কাউয়ি এবং কর্পোরাল জারগেনসেন দ্রুত হেটে এল তাদের দিকে। “একটা গ্রাম পেয়েছি আমরা,” জারগেনসেন বললো প্রসারিত চোখে। সে হাত দিয়ে জঙ্গলের একটা দিক দেখাল, যেদিকে তারা খাবার সংগ্রহ করতে গিয়েছিল। “আধা কিলোমিটারেরও কম হবে এখান থেকে। পুরো গ্রামটাই ফাঁকা।”
“অথবা হতে পারে দেখে তেমনটাই মনে হচ্ছে,” নাথানের দিকে খুব তৎপর্যপূর্ণ একটা দৃষ্টি দিয়ে বলল কাউয়ি।
নাথানের চোখ দুটো প্রসারিত হল । এরাই কি সেই একই ইন্ডিয়ান যারা তাদের উপর গোপনে নজর রাখছে? আশা জেগে উঠল তার ভেতর। আজ যখন ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়েছিল খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিল নাথান। পাছে জেরাল্ড ক্লার্কের ব্যবহৃত পথ পানিতে ধুয়ে না যায় । আমাজনিয়া অঞ্চলের বর্ষার সময়টা যে শুরু হতে যাচ্ছে ঝড়টা তার লক্ষণমাত্র । সময় কমে আসছে দ্রুত । কিন্তু এখন…
“আমাদের এক্ষুণি এটা অনুসন্ধান করা উচিত,” বলল ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান। তবে সবার আগে তিনজন রেঞ্জারের একটা দল গ্রামটাকে রেকি করে আসবে।”
একটা হাত উঁচু করল কাউয়ি। “আমার মনে হয় এটাই ভাল হয় যদি আমরা কম আক্রমণাত্মকভাবে সামনে আগাই। এরইমধ্যে ইন্ডিয়ানরা কিন্তু জেনে গেছে আমরা এখানে আছি। আমার বিশ্বাস এ-কারণেই ওরা গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে।”
ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান বাধা দেওয়ার জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছিল কিন্তু এক হাত উচু করে তাকে থামিয়ে দিল ফ্রাঙ্ক। “তাহলে আপনার পরামর্শটা কি?”
কাউয়ি নাথানের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সায় দিল। প্রথমে আমরা দুজন যাবো, আর কেউ না।”
“অসম্ভব!” চিন্তা-ভাবনা না করেই বলে ফেলল ওয়াক্সম্যান। “আমি চাই না আপনারা ঝুঁকি নিয়ে ওখানে যান।”
ফ্রাঙ্ক তার মাথার রেডসক্স ক্যাপটা খুলে ভ্রুতে জমে থাকা পানি মুছল। “আমার মনে হয় প্রফেসরের কথা আমাদের শোনা উচিত। ভারি অস্ত্র-সস্ত্রের দলবল নিয়ে গেলে ইন্ডিয়ানরা শুধু আমাদেরকে ভয়ই পাবে। কিন্তু তাদের সহযোগীতার দরকার আছে আমাদের। পাশাপাশি আপনাদের একা যাওয়ার ব্যাপারে ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানের কথাটাও মাথায় রাখতে চাই আমি।”
“তাহলে শুধু একজন রেঞ্জার আসুক, নাথান বলল । “হাতের রাইফেলটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে হাঁটবে আমাদের সাথে। এই ইন্ডিয়ানরা হয়তো বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করে কিন্তু তাদের বেশিরভাগই রাইফেলের সাথে পরিচিত।”
“আমিও যেতে চাই,” আনা ফঙ বলল। তার দীর্ঘ কাল চুলগুলো কপালের দু-পাশ দিয়ে কাঁধের উপর গিয়ে পড়েছে। “দলের সাথে একজন মহিলা থাকলে তুলনামূলকভাবে অনেক কম আক্রমণাত্বক মনে হবে। এ কারণে ইন্ডিয়ানরা কোথাও আক্রমণ করার সময় কোন মহিলা সঙ্গে রাখে না।”
নাথান মাথা নেড়ে সায় দিল। “ডা. ফঙ ঠিকই বলেছেন।”
ভ্রু কুচকালো ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান। পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে বেসামরিক কাউকে অচেনা লোকালয়ে পাঠাতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই তার।
“সেক্ষেত্রে আমি যেতে পারি তাদের ব্যাকআপ হিসেবে।” সবার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল সদ্য যোগ দেয়া নারী রেঞ্জার ক্যারেরার উপর । মেয়েটা চোখে পড়ার মত সুন্দরী, শ্যামলা-বর্ণের ল্যাটিন আমেরিকান। মাথার চুলগুলো ছোট করে ছাঁটা। সে ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানের দিকে ঘুরল। “স্যার, নারীদের যদি কম ভয়ঙ্কর মনে হয় তবে আমি মনে করি এখনকার মিশনের জন্য আমিই সবচেয়ে উপযুক্ত।”
চোখেমুখে অনিচ্ছা ভাব থাকা সত্ত্বেও অবশেষে রাজি হল ওয়াক্সম্যান। “বেশ, এবারের মত প্রফেসর কাউয়ির সিদ্ধান্তের উপর আস্থা রাখছি আমি। তবে আমি চাই বাকি সৈন্যরা তাদের থেকে একশ মিটার পেছনে থাকবে। পাশাপাশি সামনের দলটির সথে আমাদের নিরবিচ্ছিন্ন রেডিও যোগাযোগ থাকবে।”
ফ্রাঙ্ক তাকাল নাথান ও কাউয়ির দিকে। মাথা নেড়ে সায় দিল তারা। সম্ভষ্ট চিত্তে গলাটা পরিস্কার করে নিল ফ্রাঙ্ক। “তাহলে যাওয়া যাক।”
কেলি দেখল ওদের পুরো টিমটা কিছুক্ষণের ভেতরেই কয়েকটি ছোটদলে ভাগ হয়ে গেল। নাথান, কাউয়ি, আনা ফঙ এবং প্রাইভেট ক্যারেরা এরইমধ্যে তাদের পন্টুনে চড়ে যাত্রা শুরু করে দিয়েছে। সেই সময়টাতে ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান ব্যস্ত রইল তার নিজের দলটি নিয়ে। তিনজন রেঞ্জারকে নিয়ে দ্বিতীয় নৌকাতে চড়ে বসল সে। দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য নাথানদের থেকে শ-খানেক মিটারের মত নিরাপদ দূরত্বে বজায় রেখে সামনে আগাতে থাকবে ওদের পিছুপিছু। পাশাপাশি আরও তিনজন রেঞ্জার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কর্পোরাল জারগেনসেনের নেতৃত্বে এগোতে থাকবে গ্রামের দিকে। এই দলটা গ্রাম থেকে একশ মিটার দূরে পজিশন নেবে। প্রস্তুতি হিসেবে সারা মুখে রঙ মেখে ক্যামোফ্লেজ করেছে তারা। ম্যানুয়েলও প্রস্তুতি নিয়েছিল সর্বশেষ দলটির সাথে যাবার জন্য কিন্তু ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান ধমকের সুরে থামিয়ে দিয়েছে তাকে। বাকি সব সিভিলিয়ানরা থাকবে এখানে।।
সব ঠিকঠাক হয়ে গেলে কেলি চুপচাপ দেখল তাদের চলে যাওয়া। দু-জন রেঞ্জার কর্পোরাল টম গ্রেইভস ও সদ্য যোগ দেয়া প্রাইভেট এডি জোন্স-ক্যাম্পের গার্ড হিসেবে কাজ করছে। বাকি সবাই যে যার কাজে রওনা দিতেই জোন্স বিড়বিড় করে অশ্লীল ভঙ্গিতে রডনিকে কিছু বলল । ঘটনাচক্রে কেলি শুনে ফেলল তা । “আমাদের কি বেকুব গাধা মনে করে আঙুল চুষতে এখানে রেখে গেল?”
কোন কথা বলল না কর্পোরাল গ্রেইভস। সে একমনে তাকিয়ে আছে ঝিরঝির বৃষ্টির দিকে। পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে ,তার ভাই রডনির শোকে এখনো কাতর সে। চারপাশে কেউ নেই কেলির। সে ফ্রাঙ্কের দিকে এগিয়ে গেল। তার ভাই এই মিশনে নামে মাত্র লিডার হলেও ছোটদল তিনটির যেকোন একটিতে যোগ দেবার অধিকার তার আছে কিন্তু সে এখানে থেকে যেতেই মনস্থির করেছে কেলি জানে এটা সে ভয়ের কারণে করে নি, করেছে তার যমজ বোনটির কথা মাথায় রেখে।
“স্যাটেলাইটের সাথে সংযোগ দিয়েছে অলিন,” একটা বাহু তার বোনের কাধের উপর রেখে বলল ফ্রাঙ্ক। “এখন তুমি রেডি থাকলে স্টেটসের সাথে যোগাযোগ করতে পারি আমরা।”
মাথা নেড়ে সায় দিল কেলি। আগুনের খুব কাছেই পানিরোধি একটা ত্রিপলের নিচে ল্যাপটপের উপর ঝুঁকে আছে অলিন। তার পাশেই স্যাটেলাইট ডিশ। সামনে রাখা কিবোর্ডে দ্রুত হাত চালিয়ে যাচ্ছে সে। গভীর মনোযোগে সমস্ত মুখ-মন্ডল শক্ত হয়ে আছে তার । রিচার্ড জেন পেছন থেকে তার কাধের উপর দিয়ে ঝুঁকে তার কাজ দেখছে।
হাতের কাজ শেষ করে তাদের দিকে ফিরে মাথা নেড়ে সায় দিল অলিন। “সব রেডি।”
কেলি তার কণ্ঠে রাশিয়ান টানটা ধরতে পারল । এটা এতই সূক্ষ্ম যে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তার কথা না শুনলে ধরাই যাবে না। এর আগে সে কাজ করেছে রাশিয়ার স্টেট সিকিউরিটিতে । সারা দুনিয়ায় অবশ্য একে কেজিবি নামেই সবাই চেনে। সে কম্পিউটার সারভিল্যান্স শাখার এক সদস্য হিসেবে কাজ করত কমিউনিজমের পতনের আগপর্যন্ত । তারপর বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলার এক মাস আগে স্বপক্ষ ত্যাগ করে আমেরিকায় যোগ দেয় সে। রাশিয়াতে থাকাকালীন প্রযুক্তির পরিমণ্ডলে দীর্ঘদিন কাজ করার ফলে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল সেটার জোরেই আজ সিআইএ’র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অধিদপ্তরের একজন লো-লেভেল-সিকিউরিটি পদে নিযুক্ত হয়েছে। ফ্রাঙ্ক কেলিকে কম্পিউটারের সামনে রাখা একটি ক্যাম্প-চেয়ারের কাছে নিয়ে গেল । ছোঁয়াচে রোগটা ছড়িয়ে পড়ার খবর জানার পর থেকে কেলি দিনে দুবার তথ্যগুলো আপডেট করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে । সে যুক্তি দেখিয়েছিল, এতে করে স্টেটস এবং তারা, উভয় পক্ষের কাছেই সবরকম তথ্য থাকবে। কিন্তু বাস্তবে তার পরিবারের সবাই ঠিক আছে কিনা এটা জানার জন্যই উদগ্রীব থাকে সে। তার বাবা-মা আর তার মেয়ে এখন গ্রাউন্ড জিরোতে।
একটা ক্যাম্প-চেয়ারে বসে পড়ল কেলি । অলিন একপাশে সরে যেতেই আড়চোখে তাকে দেখে নিল। লোকটার আশেপাশে থাকাকালীন সে কখনোই স্বস্তি বোধ করে না। হতে পারে এই কারণে, সে নিজে এমন এক বাবার কাছে লালিত হয়েছে যে সিআইএ’র একজন সদস্য, কিংবা একারণেও যে, লোকটা সাবেক কেজিবি অথবা লোকটার এক কান থেকে আর এক কান পর্যন্ত গলার উপরে কাটা দাগটিও হতে পারে কেলির এই অস্বস্তির কারণ। অবশ্য অলিনের দাবি সে রাশিয়ান কেজিবির একজন, সামান্য কম্পিউটার অপারেটর ছাড়া বেশি কিছু ছিল না। কিন্তু তার কথা যদি সত্যিই তাহলে অমন ভয়ঙ্কর কাটাদাগ তার হল কি করে?
“ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে কানেকটেড হয়ে যাব আমরা।”
কেলি দেখল স্ক্রীনে ছোট একটি ঘড়ি কাউন্ট-ডাউন করছে। ঘড়িটা উল্টো চলে ত্রিশ সেকেন্ড থেকে শূন্যে পৌছাতেই তার বাবার মুখ ভেসে উঠল স্ক্রিনে। তার শরীরে সাধারণ পোশাক, গলার টাই অর্ধেক ঢিলা করা, কোন জ্যাকেট নেই।
“তোমাকে তো ভেঁজা ইদুরের মত লাগছে,” কাঁপা কাঁপা ছবি থেকে প্রথম কথা ভেসে এলো।
মৃদু হেসে এক হাত দিয়ে ভেঁজা চুলগুলো নাড়া দিল কেলি। “বৃষ্টি শুরু হয়েছে।”
“তাই তো দেখছি,” তার বাবাও হাসল । “এখন বল, ওদিকে খবর কি?”
ফ্রাঙ্ক সামনে ঝুঁকে ক্যামেরার রেঞ্জের ভেতর চলে এল। তারপর এ-পর্যন্ত তাদের যাবতীয় সব খুঁটিনাটি বিষয়ের এক সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে গেল সে। ওরা যখন কথা বলছে কেলি তখনও নাথানের নৌকার শব্দের প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছে স্পষ্ট। এখানকার নদীর পানি এবং মাথার উপর ছেয়ে থাকা বিস্তৃত জঙ্গল একসাথে ভ্রম সৃষ্টিকারী এক শব্দতরঙ্গের খেলা খেলছে। মনে হচ্ছে যেন নৌকাগুলো খুব কাছেই কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সব শব্দ থেমে গেল। তারা নিশ্চয় গ্রামে পৌছে গেছে এরইমধ্যে।
“তোমার বোনকে দেখে রেখ, ফ্রাঙ্ক,” তার বাবা কথা শেষে বলল ।
“অবশ্যই, স্যার।”
এবার কেলির পালা। মা আর জেসি কেমন আছে?”
আশ্বস্ত করে হাসি দিল তার বাবা। “দু-জনেই খুব ভাল আছে। সবাই ভাল আছি আমরা। পুরো ইন্সটিটিউটই। এখন পর্যন্ত আমাদের এখানে আক্রান্ত কাউকে পাওয়া যায় নি। সংক্রমিত করতে পারে এমন যেকোন কিছুই আলাদা করে ফেলা হয়েছে, আর এই ইন্সটিটিউটের পশ্চিম-পার্শ্বের পুরোটাই আমরা অস্থায়ী ফ্যামিলি হাউজিংয়ে রুপান্তর করে ফেলেছি। এমইডিইএ’র অসংখ্য সদস্যের সাথে আছি আমরা, তাই ডাক্তার পাই চব্বিশ ঘণ্টাই।”
“জেসি কেমনভাবে নিচ্ছে ব্যাপারটা?”
“তার বয়স তো মাত্র ছয়, কাঁধ তুলল বাবা। “প্রথম দিকে সে একটু ভীত হয়ে পড়েছিল চেনা জায়গা ছেড়ে একেবারে নতুন এক জায়গায় আসায়। পরে দেখা গেছে সে অন্য স্টাফদের ছেলে-মেয়েদের সাথে বল খেলায় ব্যস্ত। আচ্ছা দাঁড়াও, তুমি নিজেই কেন জিজ্ঞেস করছ না ওকে?”
নড়েচড়ে বসল কেলি। তার মেয়ের ছবি ভেসে উঠতেই ছোট্ট একটা হাত আন্দোলিত হল।
“হাই, মামি?”
অশ্রুসিক্ত হল তার চোখ। “হাই, সুইটহার্ট। মজা করছ খুব, তাই না?”
ভয়ঙ্করভাবে মাথা নাড়ল তার মেয়ে, নানার কোল বেয়ে উঠতে উঠতে “আমরা। চকোলেট কেক খেয়েছি তারপর ঘোড়ায় চড়েছি।”
হাসি চেপে তার বাবা জেসির মাথার উপর দিয়ে কথা বলে উঠল, কাছেই ছোট্ট একটি খামার আছে, আমাদের সীমানার মধ্যেই। ওখান থেকেই একটা ঘোড়া এনেছিল ওরা বাচ্চাদের আনন্দ দিতে।”
“অনেক মজা করছ মনে হচ্ছে, সোনা। ইশ, তোমার সাথে যদি থাকতে পারতাম!”
জেসি তার আসনে বসে নড়েচড়ে উঠল যেন। “আর জান কি হয়েছে? একটা ক্লাউন এসেছে এখানে, অ্যানিমেল বেলুন বানিয়ে দেবে আমাদের।”
“ক্লাউন?” তার বাবা ফিসফিসিয়ে পাশ থেকে কথা বলল, “হিস্ট-প্যাথলজিস্ট ডা. এমরি, দারুণ ভাঁড়ও সাজতে পারে লোকটা।”
“আমি তাকে একটা বানর বানিয়ে দিতে বলব,” জেসি বলল ।
“দারুণ হবে,” আরও একটু সামনে ঝুঁকে গেল কেলি। তার বাবা ও মেয়ের ছবি থেকে সবচেয়ে উষ্ণতাটুকু উপভোগ করছে সে। ভাঁড় এবং ঘোড়া নিয়ে আর কিছুক্ষণ কথা বলার পর জেসিকে তার নানার কোল থেকে নামিয়ে দেয়া হল।
“মিস গ্রামেরসি’র সাথে আবার ক্লাসে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে তোমার”। প্রথমে একটু গাল ফুলিয়ে উঠলেও মেনে নিল সে অবশেষে।
“বাই হানি,” বলে উঠল কেলি ।
“আই লাভ ইউ।” আবারো হাত নাড়ল মেয়েটি। “বাই মাম! বাই, আঙ্কলফ্রাঙ্কি।”
আবেগাপ্লুত কেলি খুব কষ্টে নিজেকে সংযত রাখল সামনের স্ক্রিনটা স্পর্শ করা থেকে।
জেসি চলে যাবার পর তার বাবার মুখে গুরু-গম্ভীর ভাব ফুটে উঠল । “সব খবর কিন্তু আশানুরূপ নয়।”
“কি?” বলে উঠল কেলি।
“এ-কারণেই তোমার মা এখানে নেই এখন। আমরা এখানে বিপজ্জনক কোন কিছু নিরাপদ স্থানে আটকে রাখলেও ফ্লোরিডায় কিন্তু এটা ছড়িয়ে পড়ছে বেশ জোরেসোরেই। এক রাতেই মিয়ামি হাসপাতালে ছয়টা কেইস রিপোর্ট করা হয়েছে, আর অন্যান্য কাউন্টি হাসপাতালগুলোতে হয়েছে আরও ডজনখানেক। আক্রান্তদের যে-সব কোয়ারেন্টাইন এলাকাতে আলাদা করে রাখা হচ্ছে সেগুলোর পরিধি বাড়াতে হচ্ছে প্রতিনিয়তই। কিন্তু আমাদের মনে হচ্ছে না সময়মত কাজটা করতে পারছি আমরা। তোমার মা এবং আরও কয়েকজন মিলে সারা দেশের আক্রান্তদের রিপোর্টগুলো মনিটরিং করছে।”
“মাই গড।” শাসরুদ্ধ হয়ে এল কেলির।
“গত বারো ঘণ্টায় আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা বাইশে গিয়ে ঠেকেছে, মারা গেছে আট জন। দেশের সেরা মহামারী-রোগ বিশেষজ্ঞদের হিসেব অনুযায়ী প্রতি বারো ঘন্টায় আক্রান্তদের সংখ্যা দ্বিগুন হচ্ছে। সত্যি বলতে, আমাজনেও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে খুব দ্রুত। ইতিমধ্যেই সেই সংখ্যা পাঁচশ’র কাছাকাছি চলে গেছে।
মাথার ভেতর হিসেবটা দ্রুত করে নিতেই মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল কেলির । তার কাঁধের উপর রাখা ফ্রাঙ্কের হাতজোড়া আরও শক্ত হয়ে গেল কয়েক দিনের মধ্যেই আক্রান্তদের সংখ্যা দশ হাজারে গিয়ে ঠেকবে, শুধুমাত্র আমেরিকাতেই।
“প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি একটি বিল পাশ করেছেন ফ্লোরিডাতে আরও ন্যাশনাল গার্ড পাঠানোর জন্য। আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছে এই রোগ হলো দক্ষিণ-আমেরিকান ভিরুলেন্ট ফ্লু। কিভাবে এটা এখানে এসেছে তার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো উন্মোচন করা হয় নি। কেলি কিছুটা পেছন দিকে হেলে গেল, যেন এই দুরত্ব ঘটনার ভীতি কিছুটা কমাবে। “চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা করা হয়েছে?”
“এখনো না। অ্যান্টিবায়েটিক এবং অ্যান্টিভাইরাসগুলো কোন কাজে আসছে বলে মনে হয় না। সর্বোচ্চ যা করতে পারছি তা হল রোগের লক্ষণ অনুযায়ী রোগীর শিরায় ফ্লুইড, জ্বরের ওষুধ এবং ব্যাথানাশক সরবরাহ করা । কিন্তু যতক্ষণ না জানতে পারছি কি কারণে এই রোগ ছড়াচ্ছে, যুদ্ধটা চালানো অনেক কঠিন।” স্ক্রীনের দিকে আরও একটু ঝুঁকে এল তার বাবা। “এ-কারণে এখানে তোমার ফিল্ডের কাজটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জেরাল্ড ক্লার্কের কি হয়েছিল তা যদি খুঁজে বের করতে পার তবে এই রোগের সমাধানটা খুঁজে পাব হয়তো।”
মাথা নেড়ে সায় দিল কেলি। কথা বলতে মুখ খুলল ফ্রাঙ্ক। তার কণ্ঠ ফ্যাসফ্যাসে হয়ে গেছে। আমরা আমদের সাধ্যমত চেষ্টা করব।”
“তাহলে বরং তোমরা যে যার কাজে ফিরে যাও,” নিরস ভঙ্গিতে বিদায় জানানোর পর কানেকশনটা কেটে দিল তার বাবা।
কেলি তার ভাইয়ের দিকে তাকাল। সে দেখল তার একপাশে ম্যানুয়েল এবং অন্যপাশে রিচার্ড জেন দাঁড়িয়ে আছে।
“এ কি করলাম আমরা?” জিজ্ঞাসা ম্যানুয়েলের। “হয়তো সেই ইন্ডিয়ান শামানটার কথা শোনা উচিত ছিল। ক্লার্কের মৃত্যুর পর ওয়াওয়ের ঐ শামান মৃতদেহটাকে পুড়িয়ে ফেলতে বলেছিল।”
মাথা ঝাঁকাল জেন, কিছু বলল বিড়বিড় করে। এতে কিছুই হতো না। রোগটা ঠিকই জঙ্গল থেকে ছড়িয়ে পড়তো শেষমেষ । ঠিক এইডসের মত।”
“ঠিক কি বলতে চাচ্ছেন আপনি?” জিজ্ঞাসা করল কেলি।
“এইডস শুরু হয়েছিল আফ্রিকান জঙ্গলের ভেতরে একটা মহাসড়ক তৈরির পর থেকে। এই প্রাচীন ইকো-সিস্টেমকে আমরা খুঁচিয়ে দিয়েছি, এনেছি পরিবর্তন কিন্তু তখনও জানতে পারি নি কোন জিনিসকে আমরা জাগিয়ে দিলাম।
কেলি উঠে দাঁড়াল ক্যাম্প-চেয়ার ছেড়ে । “তাহলে এটা থামানোও আমাদের কাজ। এইডস এই জঙ্গলের তৈরি হতে পারে কিন্তু এই জঙ্গলই এই রোগের সবচেয়ে সেরা চিকিৎসা সরবরাহ করছে। সত্তর-শতাংশ এইডস ড্রাগস আসছে গ্রীষ্মমন্ডলীয় গাছ-পালা থেকে। তাহলে নতুন এই রোগটার জন্ম যদি এই জঙ্গলেই হয়ে থাকে তবে তার সমাধানও কেন এখানে থাকবে না?”
“তাই যেন পাই আমরা,” জেন বলল ।
অপর একপ্রান্তে জাগুয়ারটা গলা দিয়ে ঘরঘর শব্দ করে উঠল হঠাৎ। মাথা নিচু করে দিয়ে সামনে পিছনে নড়াচড়া করছে ওটা। কান দুটো খাড়া, চোখজোড়া পেছনের জঙ্গলের দিকে নিবদ্ধ।
“কি হয়েছে ওটার?” এক পা পেছনে সরে গিয়ে জিজ্ঞেস করল জেন ।
টর-টরটা আরও গভীরভাবে শব্দ করা শুরু করতেই ছায়াঘেরা জঙ্গলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল ম্যানুয়েল। “কোন ঘ্রাণ পেয়েছে সে…কিছু একটা আছে ওখানে।”
* * * *
সরু রাস্তাটা ধরে ইন্ডিয়ানদের গ্রামের কাছে চলে এল নাথান ।বিশাল গোলাকৃতি একটি ঘর দেখা যাচ্ছে, যেটার ছাদের মাঝ বরাবর খোলা। ঘরটির কাছে আসতেই নাথান আশা করল পরিচিত কোন শব্দ শোনার কিন্তু শাবানোটা থেকে শব্দ পেল না সে। কোন হুইয়াস
তর্ক করছে না। চিৎকার করছে না কোন নারী আরও খাবারের জন্য। হাসছে না কোন শিশুও। ঘরটা অতিমাত্রায় নিশ্চুপ। একই সাথে সাহসটুকুও শুষে নিচ্ছে যেন ওটা ।
ঘরের গঠনশৈলী নিশ্চিতভাবেই ইয়ানোমামাদের,” আনা ফঙ এবং কাউয়িকে আস্তে করে বলল নাথান। “তবে বেশ ছোট। ত্রিশ জনের বেশি মানুষ ধরবে না এটাতে।”
তাদের পেছনে হাটছে প্রাইভেট ক্যারেরা। দু-হাতেই এম-১৬ রাইফেল। মাটির দিকে তাক করা । সে তার রেডিও মাইক্রোফোনে ফিসফিস করে কথা বলে যাচ্ছে।
শাবানো ঘরটার ছোট দরজা দিয়ে মূল গ্রামে ঢুকতে যেতেই তাকে বাধা দিল নাথান । “ইয়ানোমামোদের সাথে ওঠা-বসা হয়েছে কখনো আপনার?”
মাথা ঝাকাল আনা।
মুখের অগ্রভাগটা সূচালো করল নাথান। “ক্লক, ক্লক, ক্লক,” চিৎকার দিল সে। তারপর আনার দিকে ফিরে ব্যাখ্যা করল বিষয়টা। গ্রামটাকে পরিত্যাক্ত মনে হোক বা না হোক ইয়ানোমানোদের কাছে আসার আগে প্রথমেই নিজের উপস্থিতি জোরেসোরে জানান না দিয়ে আসবেন না কখনোই। নইলে তীরটা অন্তত পেছনে বিধবে আপনার। ইয়ানোমামাদের বৈশিষ্ট অনুসারে তারা আগে আপনাকে আঘাত করে নেবে। পরে জিজ্ঞেস করবে কি বৃত্তান্ত।”
“কৌশালটা তো খারাপ না,” পেছন থেকে বিড়বিড় করে বলল ক্যারেরা।
প্রবেশমুখে দাড়িয়ে থাকল তারা পুরো এক মিনিট। তারপর মুখ খুলল কাউয়ি । “কেউ নেই এখানে।” পেছনে ফিরে একটা হাত নাড়ল সে। “নদীতে কোন নৌকা দেখছি না, মাছ ধরার জাল বা অন্যান্য সরঞ্জামাদিও নেই । আগন্তুকদের দেখে কোন ইয়েবিও ডাকাডাকি করছে না।
“ইয়েবি?” তাদের রেঞ্জার দেহরক্ষী জিজ্ঞেস করল।
“ধূসর ডানার ট্রাম্পেটার,” নাথান বলল। “দেখতে কদাকার মুরগির মত। আসলে পাখনাওয়ালা এই প্রাণীগুলোকে ইন্ডিয়ানরা প্রহরী-কুকুরের মত ব্যবহার করে। যখন কেউ কাছে আসে ওদের দল বেধে উচ্চস্বরে হাঁক-ডাক শুরু করে দেয় ওরা।”
রেঞ্জারটা মাথা নেড়ে সায় দিল। “তাহলে ঐ মুরগি নেই তো কোন ইন্ডিয়ানও নেই।” সে অল্প একটু জায়গাজুড়ে চক্রাকারে ঘুরে এল। চারপাশের জঙ্গলটা দেখে নিল ভাল করে, হাতে ধরে রাখা অস্ত্রটা নিচু করে ধরে রাখতে চাইছে না সে। “আমিই যাচ্ছি আগে।”
অস্ত্র উঁচিয়ে মূল-দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল নিচু হয়ে মাথাটা গলিয়ে দিল ভেতরে। কিছুক্ষণ পর বাঁশ দিয়ে বানানো দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল পুরোপুরি। কলাপাতা দিয়ে ঘেরা দেয়ালের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিল নাথানদের উদ্দেশে।
“সব ঠিক আছে। কিন্তু আমার পেছনেই থাকুন সবাই।”
গোলাকৃতি ঘরটার মাঝ বরাবর এগিয়ে গেল ক্যারেরা। হাতেধরা অস্ত্র প্রস্তুত তার কিন্তু নাথানের নির্দেশনা অনুযায়ী সেগুলোর সম্মুখভাগ মাটির দিকে তাক করে রাখা । ইয়াননামামোদের মধ্যে কেউ কারো দিকে তীর তাক করে রাখা মানে যুদ্ধের ডাক দেওয়া।
যেহেতু নাথান নিশ্চিত নয় আধুনিক সমরাস্ত্রের সাথে বিচ্ছিন্ন এই ইন্ডিয়ানরা পরিচিত কিনা সেহেতু সে চায় না দু-দলের ভেতর কোন ভুল বোঝাবুঝি হোক। দলগতভাবে নাথান, কাউয়ি এবং আনা একসাথে প্রবেশ করল শাবানোতে। তাদের চারপাশজুড়ে প্রত্যেক পরিবারের আলাদা আলাদা থাকার জায়গাগুলো বড় বড় তামাকপাতার দেয়ালে ঘেরা । শুকনো লাউয়ের খোলস দিয়ে বানানো পানির পাত্র। হাতেবোনা হ্যামোক বিছানাগুলো শূন্যে ঝুলে আছে উপরের বাঁশ থেকে। পাথরের দুটি বাটি পড়ে আছে ঘরের মাঝ বরাবর। ওগুলোর ঠিক পাশেই পাথরের একটা যাতা-কল। কাসাভার ময়দা ছড়িয়ে আছে মাটিতে।
হঠাৎ একটি টিয়াপাখি ডানা মেলতেই তার বাহারী রঙের পাখা দেখে সবাই সচকিত হয়ে পড়ল । পাখিটা বাদামি রঙের এক কাদি কলার উপর বসে কলা খাচ্ছিল।
“খুব সুবিধার ঠেকছে না ব্যাপারটা আমার কাছে,” বলল কাউয়ি। মাথা নেড়ে সায় দিল নাথান । সে ভাল করেই জানে প্রফেসর কি বলতে চাইছে।
“কেন?” প্রশ্ন ক্যারেরার।
“যখন ইয়ানোমামোরা জায়গা বদল করে নতুন কোথাও যায়, হয় তাদের পুরনো শাবানোটা পুড়িয়ে ফেলে অথবা প্রয়োজনীয় সব দ্রব্যাদী সঙ্গে নিয়ে নেয়। কাউয়ি তার চারপাশের দিকগুলোতে ইঙ্গিত করল। “বাস্কেটগুলোর দিকে দেখ, তারপর বিছানা, পালকের স্তুপগুলো এসব কিছু তো এভাবে ফেলে যাওয়ার কথা নয়।”
“তাহলে কিজন্যে তারা এত তাড়াহুড়ো করে নিজের বাসস্থান ছাড়তে বাধ্য হল?” জিজ্ঞেস করল আনা।
খুব ধীরে মাথা ঝাঁকাল কাউয়ি। “কোন কিছু তাদেরকে আতঙ্কিত করে দিয়েছিল অবশ্যই।”
“আমরা?” সবার দিকে তাকিয়ে বলল আনা। আপনার কি মনে হয় তারা জানত আমরা আসছি?”
“জায়গাটা ইন্ডিয়ানদের হয়ে থাকলে আমি নিশ্চিত তারা আমাদের গতিবিধি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল। জঙ্গলের উপর সুক্ষ দৃষ্টি রাখে তারা সবসময়। কিন্তু আমার মনে হয় আমাদের দলটির কারণেই তারা তড়াহুড়ো করে তাদের শাবানো ছেড়ে পালিয়েছে।”
“এটা কেন বলছ তুমি?” জিজ্ঞেস করল নাথান।
মানুষজন থাকার জায়গাগুলোর সামনে গেল কাউয়ি। “আগুন জ্বালানো জায়গাগুলো পুরো ঠাণ্ড।” যে কলার কাদির উপর বসে টিয়াপাখিটা কলা খাচ্ছিল সেটা একটা মৃদু ধাক্কা দিল সে। “এগুলো অর্ধেকটাই পচে গেছে। ইয়ামোমাসোঁরা কখনোই এভাবে খাবার অপচয় করে না।”
বুঝতে পারল নাথান। “তাহলে তুমি বলছ এরা আরো আগেই গ্রামটা ছেড়ে চলে গেছে?”
‘অন্তত সপ্তাহখানেক আগে তো হবেই।”
“কোথায় গেছে তারা?” আনা জিজ্ঞেস করল ।
জায়গাটা এক চক্কর দিয়ে দেখে নিল কাউয়ি। “এটা বলা কঠিন তবে আরও একটা জিনিস এখানে আছে ওটাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।” নাথানের দিকে তাকাল সে-ও ব্যাপারটা ধরতে পেরেছে কিনা। ভ্রু কুঁচকে চারপাশের খুপরি ঘরগুলোর দিকে অনুসন্ধানী চোখে তাকাল নাথান, তারপরই সেটা ধরা পড়ল তার চোখে। “একটা অন্ত্রও নেই।” ফেলে যাওয়া পাত্র বা থলেগুলোর কোনটার ভেতরেই কোন তীর-বর্শা বা কোন ছুরি-নেই। “যা-ই তাদেরকে পালাতে বাধ্য করুক না কেন, কাউয়ি বলল, “তারা তাদের জীবন নিয়ে শঙ্কায় ছিল।”
প্রাইভেট ক্যারেরা আরও কাছে এসে দাঁড়াল তাদের। যদি আপনার কথা ঠিক হয়, যদি এই জায়গাটা অনেক আগেই পরিত্যাক্ত হয়ে থাকে তবে আমি আমার দলটাকে নিশ্চিন্তে এখানে আসতে বলতে পারি?”
মাথা নেড়ে সায় দিল কাউয়ি । এক পাশে সরে গেল রেঞ্জার । রেডিওতে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে। কাউয়ি আস্তে করে নাথানকে ইশারা করল । গোপনে কিছু কথা বলতে চায় সে তার সঙ্গে।
আনা ফঙ ব্যস্ত ইন্ডিয়ানদের আলাদা আলাদা থাকার জায়গাগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে। ফেলে যাওয়া জিনিসগুলোও নেড়ে-চেড়ে দেখছে সে।
ফিসফিস করে কথা শুরু করল কাউয়ি, “এরা সেই ইয়ানোমামা নয় যারা আমাদেরকে অনুসরণ করছে।”
“তাহলে কারা?”
“অন্যকোন দল, আমি এখনো সন্দিহান আদৌ এরা কোন ইন্ডিয়ান কি না। আমার মনে হয় ফ্রাঙ্ক এবং ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানকে এক্ষুনি এটা জানানো উচিত।”
“তোমার কি মনে হচ্ছে যে বা যারা এই ইন্ডিয়ানদের তাড়িয়েছে তারাই আমাদের পিছু নিয়েছে?”
“নিশ্চিত নই, তবে সেটা যাইহোক না কেন, ইয়ানোমামোদেরকে যেহেতু তাদের বাসস্থান ছাড়তে বাধ্য করেছে সে-কারণে আমাদেরও এটা গুরুত্বের সাথেই দেখা উচিত।”
এরইমধ্যে অবিরাম ঝরতে থাকা গুড়িগুড়ি বৃষ্টি থেমে গেছে। মেঘের স্তরগুলোও ভাঙতে শুরু করেছে। বিকালের কোমল আলো দীর্ঘসময় পর আবারো পথ খুঁজে পেয়েছে বনের উপর আছড়ে পড়ার। বৃষ্টির ধোঁয়াটে চাদর সরে যেতেই উজ্জ্বল আলোয় ভেসে গেল চারদিক। দূর থেকে ইঞ্জিনের গর্জন শুনতে পেল নাথান । ওয়াক্সম্যান এবং তার রেঞ্জাররা আসছে।
“তুমি পুরোপুরি নিশ্চিত তাদেরকে এগুলো বলা উচিত?” জিজ্ঞেস করল নাথান ।
কাউয়ি মুখ খোলার আগেই আনা ফঙ হাজির হল। দক্ষিণ আকাশের দিকে কিছু একটা দেখাচ্ছে সে।“দেখুন, কত পাখি!”
সেদিকে তাকাল নাথান। বৃষ্টি থেমে যেতেই পাখিগুলো নিজের বাসা ছেড়ে আবারো আকাশে ডানা মেলেছে ভিজে যাওয়া ডানাগুলো শুকাতে আর খাবারের খোজে। কিন্তু আধমাইল দূরেই কালো পাখির বিশাল একঝাক গাছ ছেড়ে আকাশে উড়তেই মনে হল যেন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে দক্ষিণের আকাশ। সংখ্যায় হাজার হাজার।
“হায় ঈশ্বর,” নাথান দ্রুত প্রাইভেট কর্তা ক্যারের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। “আপনার বায়নোকুলারটা একটু দিন তো।”
রেঞ্জারের চোখজোড়াও পাখির ঝাঁকের মোহনীয় নৃত্যের দিকে নিবদ্ধ। সে একটানে তার জ্যাকেট থেকে বায়নোকুলারটা খুলে নাথানের দিকে বাড়িয়ে দিল । একটু দম নিয়ে সে ওটার ভেতর দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। পাখিগুলোর দিকে ফোকাস করতে এক মুহুর্ত লাগল তার। লেন্সের ভেতর দিয়ে দেখতেই পাখিগুলো বর্ণ ও আকারে ভাগ হয়ে গেল। খালি চোখে সবগুলোকে এক রকম মনে হলেও আসলে দলটা ছোট-বড় নানা রকমের পাখির ঐক্যতান। অনেকগুলো আবার নিজেদের ভেতরে মারামারি করছে বাতাসে ভেসে থেকেই। তবে তাদের বাহ্যিক পার্থক্য থাকলেও সবগুলো পাখির একটা আচরণগত মিল আছে। “শকুন, বায়নোকুলারটা নামিয়ে রেখে নাথান বললো। কাছে এসে দাঁড়াল কাউয়ি। “অসংখ্য…”
“টার্কি-শকুন, ইয়োলো-হেড এমন কি রাজসিক-শকুনও আছে।”
“বিষয়টা খোঁজ নিয়ে দেখা উচিত, কাউয়ি বলল । তার চোখেমুখের উদ্বেগ নাথানসহ কারোর দৃষ্টিই এড়ালো না। একদিকে হারিয়ে যাওয়া ইন্ডিয়ান…অন্যদিকে শকুনের দল…ঘোরতর বিপদের সংকেত এটা। “ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যানের ইউনিটটা এখানে না পৌঁছা পর্যন্ত কোথাও যাওয়া যাবে না,” সতর্ক করে বলল প্রইভেট ক্যারেরা।
তাদের পেছনে ইঞ্জিনের শব্দ এবং নৌকা একই সাথে আসতে আসতে গন্তব্যে পৌছেই থেমে গেল। কয়েক মিনিটের ভেতরে তিনজন রেঞ্জার নিয়ে শাবানোতে প্রবেশ করল ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান। যা যা ঘটেছে দ্রুত বর্ণনা করে গেল প্রাইভেট ক্যারেরা ।
“যে রেঞ্জারগুলোকে আপনাদের পিছুপিছু আসতে বলেছিলাম তাদেরকে ক্যাম্পে ফেরত পাঠিয়েছি আমি,” বলল ক্যাপ্টেন। “ওরা বাকি সবাইকে এখানে নিয়ে আসবে, এই সময়ের ভেতর আমরা খুঁজে দেখব ওখানে কিছু আছে কিনা।” তার ইউনিটের তিনজন রেঞ্জারকে সংকেত দিল সে : প্রাইভেট ক্যারেরা, কর্পোরাল কঙ্গার এবং স্টাফ সার্জেন্ট কসটস, এরাই শকুনের বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করতে যাবে।
“আমিও ওদের সাথে যেতে চাই,” বলল নাথান। “ওদের চেয়ে জঙ্গলটা ভাল করে চিনি আমি।” একমুহূর্ত থেমে শ্বাস ফেলল ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান। তা আপনি এরইমধ্যে প্রমাণ করেছেন। সে হাত নেড়ে যাত্রা শুরু করার আদেশ দিল নাথানদেরকে। “রেডিও-কন্ট্যাক্ট রাখবে সবাই।”
রওনা দিতেই নাথান আড়চোখে দেখল কাউয়িকে ওয়াক্সম্যানের কাছে যেতে। “ক্যাপ্টেন, আমার মনে হয় আপনাকে একটা বিষয় জানানো উচিত…”
নাথান খুব দ্রুত শাবানোর ছোট দরজাটা দিয়ে বের হয়ে গেল । পালিয়ে বাঁচল যেন সে। মনে মনে কল্পনা করল, ওয়াক্সম্যান তার এবং কাউয়ির রাতের বেলায় চুপিসারে ক্যাম্পের চারপাশে ঘুরঘুর করে বেড়ানোর কাহিনীটা শুনে খুশি হবে না মোটেই । প্রফেসরের চাতুর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা শোনার আগেই ওখান থেকে কেটে পড়তে পেরে খুব খুশি সে।
গাছ-পালার ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলল তারা। পুরুষ রেঞ্জার কঙ্গার এবং কসটস সবার সামনে, মাঝখানে নাথান এবং সবার পেছনে ক্যারেরা, সে পেছন দিককার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে আছে। ভেজা গাছ-পালার ভেতর দিয়ে দ্রুতপায়ে হেটে চলেছে। তারা। কর্দমাক্ত পিচ্ছিল পথ, ঝরাপাতার পুরু স্তরের উপর দিয়ে সাবধানে হাটতে হচ্ছে তাদেরকে । তাদের ঠিক পেছনেই পানির ছোট্ট একটি ধারা বৃষ্টির পানি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে নদীতে । মনে হচ্ছে যেন তাদের পথই অনুসরণ ওটা। পায়ে হাটা পুরনো একটা পথ চোখে পড়ল তাদের, যেটা পানির ধারার সাথে সমান্তরাল হয়ে চলে গেছে। পথটাজুড়ে কিছু পায়ের ছাপ লক্ষ করল সে। ছাপগুলো পুরনো। বৃষ্টিতে প্রায় অস্পষ্টই হয়ে গেছে । সবগুলোই নগ্ন-পায়ের ছাপ। সে একটা ছাপ প্রাইভেট ক্যারেরাকে দেখাল।
ইন্ডিয়ানরা এই রাস্তা দিয়েই পালিয়েছে, আমি নিশ্চিত।” মাথা নেড়ে সায় দিল ক্যারেরা, তারপর সামনে এগিয়ে যেতে নির্দেশ দিল নাথানকে । ব্যাপারটা অস্বাভাবিক, গভীরভাবে ভাবল সে। যদি তারা ভয়ই পেয়ে থাকবে তবে কেন পায়ে হেটে পালাবে? কেন নদীপথ ব্যবহার করল না? পানির ধারাটা অনুসরণ করে ছাপগুলো দেখতে দেখতে এগিয়ে চলল নাথানেরা। একটু ধীরে চললেও কিছুটা সামনে এগিয়ে রেঞ্জারদের দলটার সাথে দুরত্ব কম রেখে হাটছে ওরা। তাদের চারপাশের বন অস্বাভাবিকভাবেই শান্ত। প্রায় নিশ্চুপ। ব্যাপারটা অদ্ভুত, এবং ভয়ঙ্করও।ঠিক এমন সময় নাথানের মনে পড়ে গেল সে তার নিজের শটগানটা ক্যাম্পে ফেলে এসেছে। তাই সে প্রতিটি পদক্ষেপ খুব সাবধানে ফেলছে । চোখ দুটোও ব্যস্ত লুকিয়ে থাকা কোন বিপদ আছে কিনা তা খুঁজতে। কোন কিছুই দৃষ্টির বাইরে রাখতে চায় না সে। হঠাৎ হোচট খাওয়ার মত করে থেমে গেল নাথান । দম বন্ধ হয়ে আসছে তার প্রাইভেট ক্যারেরা প্রায় ধাক্কা দিতে বসেছিল তাকে পেছন থেকে।
“ধ্যাত্তারি! থামার আগে সংকেত দেবেন না?” অপর দু-জন রেঞ্জার বুঝতে পারল না তারা থেমে গেছে, হেটে গেল তাদেরকে পেছনে রেখেই।
“বিশ্রাম দরকার?” ক্যারোর কণ্ঠে পরিহাসের সুর ।
“না,” কয়েকটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল নাথান।” এদিকে দেখুন।”
ছোট একটা গাছের এক ডালে রংচটা হলদেরঙের বস্তু গেঁথে আছে। বস্তুটা পুরোপুরি ভেঁজা । আকারে একটা তাসের অর্ধেক হবে । প্রান্তগুলো অমসৃণ। নাথান ডাল থেকে মুক্ত করে নিল ওটা ।
“কি এটা?” ক্যারেরা তার কাঁধের উপর দিয়ে দেখে বলল। “ইন্ডিয়ানদের কোন কিছু নাকি?”
“না, সেরকম কিছু না।” বস্তুটার উপর আঙুল বুলাল সে। “এটা পলেস্টার, আমার মনে হচ্ছে। মানে কৃত্রিম কিছু একটা।” সে ঐ ডালটা পরীক্ষা করে দেখল যেটাতে ওটা গেঁথে ছিল। চিকন ডালটার অগ্রভাগ কাটা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে ভাঙা নয় । সুঁচালো প্রান্তটা ভাল করে দেখা শুরু করতেই গাছের গুঁড়িতে আঁকা কিছু চিহ্ন নাথানের দৃষ্টি আকর্ষণ করল । “এটা আবার কি?” সে দ্রুত গাছের গুড়ির উপর ঝুকে জমে থাকা পানি সরিয়ে দিল । “হায় ঈশ্বর!”
“কি হল?”
নাথান সরে দাঁড়াল যাতে রেঞ্জার ভাল করে দেখতে পারে । গাছের গুড়ির বাকে যেটা খোদাই করা হয়েছে সেটা গোপন কোন মেসেজ।
প্রাইভেট ক্যারেরা আনন্দের অভিব্যক্তি ফুটিয়ে শিস দিয়ে উঠল। তারপর ঝুঁকে গেল সামনের দিকে। এই G এবং C দিয়ে…”।
“জেরাল্ড ক্লার্ক,” চট করে বলে উঠল নাথান । “সে-ই লিখেছে এটা। এই তীরচিহ্নটা নিশ্চিতভাবেই সে-দিকটা নির্দেশ করছে যেদিক দিয়ে জেরাল্ড ক্লার্ক এসেছিল, অথবা অন্তত তীরচিহ্নটা এটা বলছে, পরবর্তী চিহ্নষ্টা কোথায় বা কোন দিকে পাওয়া যাবে।”
ক্যারেরা তার কবজিতে লাগানো রিস্ট-কম্পাসটা দেখল। “তীরটা দক্ষিণ-পশ্চিমে দেখাচ্ছে। আমরাও তো ওদিকটাতেই যাচ্ছি।”
“কিন্তু সংখ্যাগুলো দিয়ে কি বোঝাচ্ছে? ১৭ এবং ৫?”
রেঞ্জার খুব দ্রুত মুখটা উঁচু করল। “সম্ভবত কোন তারিখ, মিলিটারিদের মত করে লেখা । প্রথমে দিন তারপর মাস।”
“তাহলে এটা ১৭ই মে? প্রায় তিন মাস আগে।” ঘুরে দাড়িয়ে নাথান আরও কিছু প্রশ্ন করতে যাবে এমন সময় একটা হাত উচু করে তাকে থামিয়ে দিল ক্যারেরা। বাকি হাতটা কানে লাগানো রেডিও এয়ারপিসের উপর । দৃঢ়ভাবে চেপে আছে কানের সাথে ।
অপরপ্রান্তের কথা শেষ হতেই কথা বলল সে, “রজার দ্যাট,..বুঝতে পেরেছি। আমরা পথেই আছি এক্ষুণি আসছি।”
নাথান কৌতুহলের সাথে তাকাল। “কঙ্গার এবং কসটস,” সে বলল, “তারা কিছু মৃতদেহ পেয়েছে ওখানে।” কথাটা শুনে পেটের ভেতরটা মুচড়ে উঠল নাথানের। “জলদি চলুন,” শক্ত গলায় বলল ক্যারেরা । “তারা আপনার মতামত জানতে চায়।”
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে হাটতে থাকল নাথান। তার পেছনে প্রাইভেট ক্যারেরা এ-পর্যন্ত আবিষ্কার হওয়া সব কিছু বলে চলেছে তার ক্যাপ্টেনকে।
আরও দ্রুত হাটা ধরতেই নাথান খেয়াল করল সে এখনো হলদে রঙের কাপড়টা হাতে ধরে আছে । স্মরণ করল জেরাল্ড ক্লার্কের ফিশারিতে হাজির হওয়ার কথা। লোকটা নগ্ন পায়ে পোশাকহীন অবস্থায় জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসেছিল। শুধু একটা প্যান্ট ছিল তার পরনে। লোকটা কি তাহলে নিজের জামা ছিড়ে এমন ফ্ল্যাগ বানিয়ে গাছে গাছে টানিয়ে দিয়েছিল? যেন রাস্তাজুড়ে রুটির টুকরো ছড়িয়ে বোঝাতে চাইছিল কোথা থেকে সে এসেছে। দু-আঙুলের মাঝে কাপড়ের টুকরোটা নিয়ে একটু ঘষল নাথান। দীর্ঘ চারবছর পর আজ তার হাতে দেখানোর মত প্রমাণ উপস্থিত যে তার বাবার দলের কেউ না কেউ এখনো বেঁচে আছে। তার বাবার বেঁচে থাকা নিয়ে আজ অবধি এমন কোন আশা সে জিইয়ে রাখে নি মনে। এমনকি বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও প্রত্যাখ্যান করে গেছে দৃঢ়ভাবে। আর এতদিন পর, যখন বাবার মৃত্যু-শোকটা কাটিয়ে উঠেছে তখনই সেই হারানোর শোকটা দ্বিতীয়বারের মত পেয়ে গেলে তা সহ্য করা নাথানের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে। আরও একবার ভাল করে ফিকে হলুদ রঙের কাপড়টা দেখল সে, তারপর পকেটে চালান করে দিল ওটা।
রাস্তা ধরে যেতে যেতে সে ভাবল এমন কাপড়ের ফ্ল্যাগ আরও আছে কি না। যদিও জানার কোন উপায় নেই তবু একটা বিষয় সে ভাল করেই জানে : সে তার অনুসন্ধান থামাবে না যতক্ষণ না এই সত্যটা আবিষ্কার করতে পারছে যে, তার বাবার ভাগ্যে কি ঘটেছিল।
পেছন থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ করে উঠল প্রাইভেট ক্যারেরা । সেদিকে তাকাল নাথান। ক্যারেরা তার হাত দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রেখেছে। ঠিক তখনই নাথান বুঝতে পারল পচাগন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। মাংসপচা গন্ধ।
“এদিকে!” কণ্ঠটা সার্জেন্ট কসটসের। পথের শেষপ্রান্ত থেকে মিটার দশেক দূরে দাড়িয়ে আছে বয়স্ক রেঞ্জার । রঙচঙ মেখে এমন কেমোফ্লেজ নিয়েছে যে তার আশেপাশের পরিবেশ থেকে তাকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়েছে । নাখান তার কাছে যেতেই যে দৃশ্যটি দেখল তাতে প্রচণ্ড এক ধাক্কা খেল সে।
“হায় ঈশ্বর!” বিস্ময়ে পেছন থেকে বলে উঠল ক্যারেরা।
তরুণ কর্পোরাল কঙ্গার আরও কিছুটা দূরে দাঁড়ানো, একটা রুমাল দিয়ে মুখ বাধা, দাঁড়িয়ে আছে হত্যাযজ্ঞের মাঝে। হাতের এম-১৬ নাড়িয়ে শকুনগুলো উড়িয়ে দিতেই অগণিত মাছি তার চারপাশ ঘিরে ধরল । দেহগুলো এখানে-সেখানেভাবে ছাড়ানোছিটানো। পথে, গাছের বাঁকে, আবার কিছু পড়ে আছে পানির ধারাটার মাঝ বরাবর । নারীপুরুষ, শিশু, সবরকম মানুষই আছে, দেখে বোঝা যায় এরা সবাইন্ডিয়ান কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। পুরো মুখমণ্ডল কিছুতে চিবিয়ে খেয়েছে, হাতপাগুলোর মাংস বেশির ভাগই খাওয়া, হাঁড় দেখা যাচ্ছে, ভেতরের অন্ত্রগুলো পেট চিরে বের করা। পঁচা মাংসভূকেরা দ্রুত ক্ষেয়ে নিয়েছে বেশিরভাগ অংশ। বাকিটুকু দিয়েছে অসংখ্য মাছি, কীট-পতঙ্গ আর কেঁচোদেরকে । মৃতদেহগুলোর খর্বাকৃতিই শুধু বলে দিচ্ছে এরা ইয়ানোমামো, নিরুদ্দেশ হওয়া গ্রামবাসী। আর সংখ্যাটা বলে দিচ্ছে পুরো গ্রামটাই এখানে রয়েছে সম্ভবত।
চোখ বন্ধ করে ফেললো নাথান। কল্পনা করুল তার ফেলে আসা এইসব গ্রামবাসীদের কথা যাদের সাথে সে কাজ করেছে অতীতে । ছোট্ট টামা, মহৎ তাকাহো। হঠাৎ কেমন যেন করে উঠল নাথান, দৌড়ে পানির-ধারাটার কাছে গিয়ে পানির উপর ঝুঁকে পড়ল। গভীরভাবে শ্বাস নিল সে। খুব চেষ্টা করল পাকস্থলি থেকে উগড়ে আসা খাবারগুলো চেপে রাখতে কিন্তু ব্যর্থ হল। একটা চাপা আর্তনাদ করে বমি করে দিল। সামনের দিকে ঝুঁকে থাকল সে। হাত দুটো হাটুর উপর রেখে গভীর করে দম নিচ্ছে। পেছন থেকে চিৎকার দিয়ে উঠল কসটস।
“দিন ফুরাতে বেশি বাকি নেই, রান্ড । আপনার কি মনে হয়, এখানে কি হয়েছিল? অন্যকোন গোত্রের আক্রমণ?”। নাথান নড়ল না একটুও। পাকস্থলীর উপর বিশ্বাস নেই তার।
কাছে এসে প্রাইভেট ক্যারেরা সহানুভূতির একটা হাত রাখল তার কাঁধে। “যত তাড়াতাড়ি এখানকার কাজ শেষ হবে আমাদের, কোমল কণ্ঠে বললো সে, “তত তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে পারব আমরা।”
মাথা নেড়ে সায় দিল নাথান। শেষবারের মত লম্বা করে শ্বাস নিয়ে জোর করে মৃতদেহগুলোর কাছে এগিয়ে গেল।
“কি মনে হয় আপনার?”
উগড়ে আসা পিত্তরস ঢোক গিলে পাকস্থলিতে ফেরত পাঠিয়ে খুব নিচুস্বরে কথা বলল সে। “তারা রাতের বেলয় পালাতে চেয়েছিল।
“কিভাবে বুঝলেন এটা?” জিজ্ঞেস করল কসটস।
নাথান সার্জেন্টের দিকে তাকিয়ে কাছেই পড়ে থাকা একটি মৃতদেহের দিকে দেখাল । “ঐ দেখুন, একটা মশাল পুড়ে কয়লা হয়ে আছে। গভীর অন্ধকারে যাত্রা শুরু করেছিল ওরা।” সে দেহগুলো ভাল করে পর্যবেক্ষণ ও হত্যার ধরণটা বিশ্লেষন করল। কিছু লাশের দিকে আঙুল তুলে দেখাল সে। “যখন আক্রমণটা হয়েছিল, এই পুরুষগুলো নারী ও শিদেরকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু যখন তারা ব্যর্থ হয় নারীরা হয়ে দাঁড়ায় দ্বিতীয় সারির প্রতিরক্ষার দেয়াল। শিশুগুলো নিয়ে পালাতে চেয়েছিল ওরা। গাছের বাঁকে পড়ে থাকা একটা নারী-মৃতদেহকে দেখাল সে। একটা মৃত-শিশুকে জড়িয়ে পড়ে আছে। ঘুরে দাঁড়াল নাথান। “আক্রমণ করা হয়েছিল নদী থেকে।” কঁপা হাতে বেশ কয়েকটি পুরুষমৃতদেহের দিকে দেখাল সে। কিছু পড়ে আছে পানির কাছে, কিছু পানিতে। “বেশ অপ্রত্যাশিতভাবেই আক্রমণের শিকার হয় তারা। এতই দ্রুত যে কোনরকম পাল্টা আক্রমণ করার সুযোগও পায় নি ওরা।”
” কিভাবে ওদেরকে হত্যা করা হয়েছে তাতে কিছু যায় আসে না আমার,” কস্টস বলল, “কোন হারামির বাচ্চারা ওদেরকে এভাবে মারল সেটা জানতে চাইছি।”
“আমি জানি না,” নাথান বললো। “একটা শরীরেও কোন অস্ত্র বা বর্শার আঘাত দেখাতে পাচ্ছি না। তবে এটাও হতে পারে, শত্রুরা আক্রমণের পর তাদের অস্ত্রগুলো আবার ফেরত নিয়ে গেছে, নিজেদের অস্ত্রের মজুদ ঠিক রাখা এবং কোন প্রমাণ না রাখার জন্য। দেহগুলো যেভাবে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে আছে এতে বলা অসম্ভব কোনটা অস্ত্রের আঘাতের কারণে হয়েছে আর কোনটা মাংসভুক পোকার কারণে হয়েছে।”
“তাহলে অন্যভাবে বলতে গেলে, আপনার কাছে কোন সূত্রই নেই,” মাথা ঝাঁকাল কসটস তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে একপাশে সরে গিয়ে রেডিওতে কথা বলতে থাকল সে।
ঘামে ভেঁজা কপাল মুছল নাথান, এখনো কাঁপছে সে।কি ঘটল এখানে? কথা শেষ করে সামনে এগিয়ে এল কসটস। “নতুন আদেশ এসেছে। একটা লাশ নিতে হবে ডা. ওব্রেইনের পরীক্ষা করার জন্য, কণ্ঠে আওয়াজ তুলল সে। “সবচেয়ে কম নষ্ট হওয়া একটা লাশ নিয়ে যেতে হবে । কেউ কি আছে একটা বেছে নিতে সাহায্য করতে পারে?” কেউ কোন উত্তর দিল না। এতে কিছুটা অপমানিত হয়ে বাঁকা হাসি দিল সার্জেন্ট । “ঠিক আছে, কসটস বলল। “আমি অবশ্য ভাবি নি কেউ রাজি হবে।” প্রাইভেট ক্যারেরার দিকে তাকাল সে।
“দুর্বল ডক্টরকে ক্যাম্পে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন না কেন আপনি? এটা পুরুষের কাজ, বুঝলেন?”
“জি, স্যার।”
নাথানকে সঙ্গে আসার জন্য ইশারা কল ক্যারেরা। তারপর দু-জনে গ্রামের দিকে হাটা শুরু করল একসাথে। সার্জেন্টের শ্রবণসীমার বাইরে আসতেই বিড়বিড় করে উঠল ক্যারেরা। “কি জঘন্য একটা লোক।”
সায় দিল নাথান তবে সত্যি বলতে সে-ই একমাত্র আনন্দিত ব্যক্তি অমন রোমহর্ষক পরিস্থিতি থেকে সরে আসতে পারায়, সার্জেন্ট কসটস কি মনে করল তা নিয়ে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করে না সে। তবে ক্যারেরার রাগের কারণটা বুঝতে পারছে সে ঠিকই। বাকি সব পুরুষ-সহকর্মীদের কাছ থেকে যে এই নারীকে অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণের শিকার হতে হয় তা ভাল করে জানে নাথান। এইমাত্র সঞ্চিত তিক্ত অভিজ্ঞতাটুকু ফিরে আসার সময়টুকুতে তাদের দুজনকেই নিচুপ রাখল।
শাবানোর কাছে পৌছাতেই মানুষজনের কণ্ঠস্বর শোনা গেল। গতি বাড়িয়ে দিল নাথান। প্রাণের মাঝে যত দ্রুত ফিরে আসা যাবে প্রাণহীনদের কথা ভোলা যাবে তত দ্রুত। প্রাইভেট এডি জোন্সের কাছে চলে এল সে। শাবানোর মূল প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে পাহারার কাজে ব্যস্ত সৈনিকটি। তার থেকে খানিকটা দূরে নদীপাড়ে দু-জন রেঞ্জার দাঁড়িয়ে আছে। ওখানেই পাহারা দেবার দায়িত্ব পড়েছে তাদের। নাথান এবং ক্যারেরা গোলাকৃতি শাবানোর দরজার কাছে পৌছাতেই এডি জোন্স তাদেরকে স্বাগত জানিয়েই হুট করে খবরটা জানাল। “আপনারা একটুও বিশ্বাস কবেন না, জঙ্গল থেকে কি ধরে এনেছি আমরা।”
“কি ধরে এনেছেন?” ক্যারেরা জিজ্ঞেস করল। জোন্স আঙুল তুলে দরজার দিকে দেখাল । “যান, নিজের চোখে দেখে আসুন।”
ক্যারেরা তার বন্দুকের ব্যারেলটা দুলিয়ে নাথানকে প্রথমে যাওয়ার ইশারা করল । শাবানোতে ঢুকে নাথান দেখল একদল মানুষ জড়োহয়ে আছে ঘরটার ঠিক মাঝখানে। ওখানে কোন ছাদ না থাকায় দিনের শেষ আলোটুকু প্রবেশ করছে ভেতরে। ম্যানুয়েল সবার থেকে একটু দূরে টরটরকে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। নাথানকে দেখামাত্রই একটা হাত উঁচু করল সে, কিন্তু তার মুখে কোন হাসি নেই। সবাই কম বেশি আলোচনায় মগ্ন ।
“একে ধরেছি আমরা?” উচ্চস্বরে বলল ওয়াক্সম্যান। তিনজন রেঞ্জার কিছু একটার দিকে অস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু অন্য সিভিলিয়ানদের জন্য সেটা দেখা যাচ্ছে না।
“কজির বাধনটা অন্তত খুলে দিন, অভিযোগের সুরে বলল কেলি। “তার পা-দুটো তো বাধাই আছে । আর লোকটা বেশ বৃদ্ধ।”
‘আপনি যদি লোকটার কাছ থেকে কোন সহযোগীতা আশা করেন, যোগ কল কাউয়ি, “তবে এভাবে কাজ করলে কোন লাভ হবে না।”
“আমাদের প্রশ্নের সামনে মুখ খুলতেই হবে তাকে,” হুমকির সুরে বলল ওয়াক্সম্যান।
ফ্রাঙ্ক এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল। “এই অপারেশনটা কিন্তু এখনও আমার, ক্যাপ্টেন। এই বন্দী লোকটাকে কোনরকম অত্যাচার হোক তা আমি চাই না।”
এরইমধ্যে নাথান খোলা জায়গাটা পার হয়ে সবার সাথে যোগ দিয়েছে। আনা ফঙ এক নজর দেখল তাকে, চোখে তার আতঙ্ক ভর করেছে । রিচার্জ জেন একটু সরে দাঁড়াল তাকে দেখে, সন্তুষ্টির এক হাসির রেখা ফুটে উঠল তার ঠোঁটের কোণায়। মাথা নেড়ে সায় দিল সে নাথানকে দেখে।
‘জঙ্গলে ঘাপটি মেরে থাকার অবস্থায় লোকটাকে ধরেছি আমরা। ম্যানুয়েলের জাগুয়ার এ-কাজে সাহায্য করেছে। মনে হয় তুমি ওর চিৎকারও শুনেছ, জাগুয়ারটা বুড়োকে গাছের সাথে জোরে চেপে ধরেছিল।”
জেন আরও এক-পা সরে যেতেই নাথান দেখতে পেল কাকে ধরেছে তারা। ছোটখাট এক ইন্ডিয়ান, মাটিতে বসা, হাত-পা প্লাস্টিকের মোটা দড়ি দিয়ে বাধা। তার কাঁধ পর্যন্ত সাদাচুল পরিস্কারভাবেই বোঝাচ্ছে লোকটা একজন বৃদ্ধ। সবার সামনে জবুথবু হয়ে বসে কি যেন বলছে বিড়বিড় করে। তার চোখজোড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে তার দিকে তাক করা রাইফেল আর পাশে থাকা টর-টরের উপরে। তার ইয়ানোমামো ভাষায় বিড়বিড় করে বলতে থাকা কথাগুলো শুনলো নাথান । সে আরো ঝুঁকে গেল বৃদ্ধটির কাছে। শামানদের মন্ত্র এগুলো, শয়তান দূর করার সময় পাঠ করা হয়। নাথান অনুধাবন করল লোকটা নিশ্চয়ই একজন শামান হবে। সে কি এই গ্রামের? হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া কেউ?
ইন্ডিয়ানটার চোখদুটো হঠাৎ নাথানের উপর স্থির হল, নাকের অগ্রভাগটা নড়ছে । “মৃত্যু লেগে আছে তোমার সাথে,” সতর্ক করল সে তার নিজস্ব ভাষায়। “তুমি এটা জান। তুমি এটা দেখেছ।” নাথান বুঝতে পারল তার শরীরে ও পোশাকে লেগে থাকা মড়াপচা গন্ধ নাকে গেছে শামানটার।
সে আরও কাছে গিয়ে ইয়ানোমামোতে বলতে শুরু করলো “এই যে দাদু, আপনি কে? আপনি কি এই গ্রামের কেউ?”
বৃদ্ধের চেহারায় ফুটে উঠল ক্ষোভ। মাথা ঝাঁকাল সে। “এই গ্রামে শাওয়ারির দুষ্টু আত্মার ছায়া পড়েছে। এখানে এসেছিলাম নিজেকে ব্যান-আলির কাছে উৎসর্গ করতে কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
নাথানের চারপাশজুড়ে সব তর্ক-বিতর্ক থেমে গেল বৃদ্ধ লোকটার সাথে তার ভাবের আদান-প্রদান হতে দেখে। পেছন থেকে কেলি ফিসফিস করে উঠল। “সে কারো সাথেই কোন কথা বলে নি, এমনকি প্রফেসর কওয়ির সাথেও না।”
“ব্লাড জাগুয়ার ব্যান-আলির খোঁজ করছেন কে আপনি?”
“আমার নিজের গ্রামটাকে বাঁচাতে। আমরা তাদের কথায় কান দেই নি। আমরা শ্বেতাঙ্গ লোকটির মৃতদেহ পোড়াই নি…লোকটা ব্যান-আলিদের দাস ছিল।”
সঙ্গে সঙ্গেই নাথান বুঝতে পারল ব্যান-আলির ছাপ দেয়া শ্বেতাঙ্গ লোকটি জেরাল্ড ক্লার্ক ছাড়া আর কেউ নয়। যদি তাই হয়, তাহলে তার অর্থ…“আপনি ওয়াওয়ে থেকে এসেছেন?”
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে মাটিতে থুথু ফেলল সে। “অভিশাপ দাও ঐ নামটাকে! অভিশাপ দাও ঐ দিনটাকে যেদিনটায় ঐ অশুভশক্তি গ্রামে ঢুকেছিল!”
নাথান এবার বুঝতে পারল এই শামানই ওয়াওয়ের মিশনারির আশপাশের সব আক্রান্ত শিশুদেরকে চিকিৎসা দিতে চেয়েছিল, তারপর তাতে কাজ না হওয়ায় তাদের গ্রামে আগুন লাগিয়ে দেয় বাকিদেরকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু তার নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী সে যে ব্যর্থ হয়েছে তা বোঝাই যাচ্ছে। ছোঁয়াচে রোগটি এখনও ইয়ানোমামো শিশুদের মাঝে ছড়াচ্ছে।
“এখানে এসেছিলেন কেন? কি করেই বা এলেন?”
“ঐ শ্বেতাঙ্গ লোকটির ব্যবহার করা পথ খুঁজে পেয়েছিলাম আমি, তারপর নৌকাটা পেলাম। নৌকাটার রঙ আর কারুকার্য দেখে বুঝতে পেরেছিলাম ওটা এই গ্রামেরই হবে । আর এখানকার পথ-ঘাটও ভাল করে চিনি আমি । তাই এখানে এসেছি ব্যান-আলিদের খোজে, তাদের কাছে নিজেকে সপে দেবার জন্য। তাদের দেয়া অভিশাপ তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানানোর জন্য । কিন্তু আমার অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। মাত্র একজন নারী জীবিত পেয়েছিলাম এই গ্রামে। যে দিকটায় হত্যাযজ্ঞ হয়েছিল সেদিকটায় তাকাল সে। ‘আমি তাকে পানি দিলাম, সে আমাকে সব খুলে বলল তাদের গ্রামে কি হয়েছে।”
সোজা হয়ে দাড়াল নাথান। “কি বলেছে সে?” জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান।
তার প্রশ্ন কানেই তুলল না নাথান।“কি হয়েছিল, বলুন তো?”
“তিন মাস আগে শ্বেতাঙ্গ লোকটি এ-গ্রামের শিকারীদের হাতে পড়ে । তার অবস্থা তখন খুব খারাপ। দুর্বল আর হাড্ডিসার । ইন্ডিয়ানরা তার শরীরে আঁকা চিহ্নগুলো দেখে ভয় পেয়ে তাকে একটা জায়গায় বন্দী করে রাখে। তাদের ভয় ছিল, লোকটা তাদের গ্রামে আবার না চলে আসে। তার কাছে যা যা ছিল সব নিয়ে তাকে একটা গুহায় বন্দী কারে রাখে তারা । গভীর জঙ্গলে একা ফেলে আসে যেন ব্লাড-জাগুয়াররা এসে তাকে নিয়ে যায় । শিকারী দলটি তাকে খাবার দিত, যত্ন নিত কারণ ব্যান-আলির অধীনে থাকা কোন কিছুর তিল পরিমাণ ক্ষতি করার সাহস তাদের ছিল না। কিন্তু বন্দী লোকটার অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হতে থাকল। তারপর মাসখানেক পর এক শিকারীর ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
মাথা নেড়ে সায় দিল নাথান। ছোঁয়াচে রোগটা ছড়িয়ে পড়ার কথা বলছে সে। “এখানকার শামান ঘোষণা দিল গ্রামের সবাই অভিশপ্ত । বন্দি লোকটাকে মেরে ফেলার দাবিও জানাল সে। ব্যান-আলির তীব্র ক্রোধকে প্রশমিত করার জন্যই তাকে পুড়িয়ে ফেলল । কিন্তু পরের দিন সকালে যখন তারা গুহার কাছে পৌছাল দেখল লোকটা নেই। তারা ভাবল ব্যান-আলি এসে তাকে নিয়ে গেছে, তাদেরকে মুক্তি দিয়ে গেছে। তার একদিন পর তারা আবিষ্কার করল তাদের একটা নৌকা নেই। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। একটু থামল ইন্ডিয়ান। “তারও কয়েকদিন পর সেই শিকারীর অসুস্থ ছেলেটি মারা যায়, তারপর আক্রান্ত হয় আরো কয়েকজন। এক সপ্তাহ আগে এ-গ্রামের এক মহিলা বাগান থেকে কলা সংগ্রহ করে ফেরার সময় এই শাবানোর বাইরের দেয়ালে একটা চিহ্ন আঁকা দেখতে পায়। কেউ জানে না এটা কিভাবে এখানে এল।” ইন্ডিয়ান শামান গেলাকৃতি ঘরটার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকটা দেখিয়ে মাথা নেড়ে সায় দিল। “এটা এখনও আছে ওখানে। ব্যান-আলির চিহ্ন।”
নাথান তার কথা থামিয়ে অন্যদের দিকে ফিরল। সে এতক্ষণ ধরে যা যা শুনেছে তা বলে দিল ওদের । তার কথা শুনে সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। নাথানের কথা থামতেই ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান জারগেনসেনকে বাইরে পাঠাল, শামান বর্ণিত চিহ্নটি শাবানোর দেয়ালে আছে কিনা দেখতে। তার ফিরে আসার সময়টুকুতে সবাই যখন অপেক্ষা করছে, নাথান সে-সময়ে ব্যস্ত ওয়াক্সম্যানকে বুঝিয়ে শামানের হাতের বাঁধনটা খোলার কাজে। বন্দী ব্যক্তিকে সাহায্য করতে দেখে ওয়াক্সম্যান রাজি ।
শামান এখন পানির বোতল হাতে নিয়ে মাটিতে বসে আছে। সন্তুষ্টির সাথে চুমুক দিছে তাতে। কেলি হাটু ভেঙে বসে পড়ল নাথানের পাশে। তার বলা কাহিনী শুনে একটা জায়গায় আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে শামানের চিকিৎসা পদ্ধতির বেশ মিল পাচ্ছে সে। এই গ্রামের সবাই জেরাল্ড ক্লার্ককে জঙ্গলের ভেতর এক জায়গায় আলাদা করে রেখেছিল অন্যদের থেকে, ঠিক এখন স্টেটসসহ এবং অন্যান্য জায়গায় যেমন আক্রান্তদেরকে কোয়ারেন্টাইন করে অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখা হচ্ছে। ইন্ডিয়ানরা জেরাল্ড ক্লার্ককে আলাদা করতে সক্ষম হলেও ক্লার্কের রোগের মাত্রাটা যখন বাড়তে শুরু করে তখন গোত্রের অন্যেরা একে একে আক্রান্ত হয়…অথবা সেই শিকারীটি যার সন্তান আক্রান্ত হয়েছিল, কোন না কোনভাবে নিজেকেই ঐ অজানা রোগের বাহক করে ফেলেছিল। মোটামুটি এভাবেই রোগটা ছড়িয়ে পড়েছে এখানে।
“পুরো গোত্রই আতঙ্কিত হয়ে উঠল।”
ওদিকে জারগেনসেন মাথা নিচু করে শাবানোতে ঢুকেই তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “বৃদ্ধ ঠিকই বলেছে। বাইরের দেয়ালে আনড়িহাতে একটা চিহ্ন আঁকা। ঠিক জেরাল্ড ক্লার্কের শরীরে যেমনটা আঁকা ছিল।” মুখ অভিব্যক্তি ফুটিয়ে নাক কুঁচকালো সে।
“কিন্তু ঐ জিনিসটা দিয়ে যে বিচ্ছিরি গন্ধ আসছে তাতে মনে হচ্ছে ওটা শূকরের বিষ্ঠা বা ওরকম কিছু দিয়ে আঁকা। তীব্র নাক-জালানো গন্ধ।”
ভুরু কুঁচকে নাথানের দিকে ফিরল ফ্রাঙ্ক। “শামান আর কি কি জানে দেখুন না বের করতে পারেন কিনা।”
নাথান মাথা নেড়ে সায় দিয়ে শামানের দিকে ঘুরল। “ঐ চিহ্নটা দেখার পর কি হল?”
মুখ ঢেকে ফেলল শামান। “ঐ রাতেই সবাই পলিয়ে যায়…কি…কিন্তু তাদেরকে ধরে ফেলে।”
“কি ধরে ফেলে?”
ভুরু কুঁচকালো ইন্ডিয়ান । “যে মহিলা আমার সাথে কথা বলেছিল সে ছিল মৃতপ্রায়। তার জবান বন্ধ হয়ে আসছিল। নদী থেকে কিছু একটা উঠে এসে তাদেরকে খেতে আসছিল। তারা শুয়ে পড়ে কিন্তু ওটা তাদেরকে পানিরধারা পর্যন্ত অনুসরণ করে ধরে ফেলে।”
“কি? কিসে ধরল তাদেরকে? ব্যান-আলি?” আরও এক ঢোক পানি গিলল শামান। “না । তবে ওই মহিলা আর কিছু বলে নি।”
“তাহলে কি সেটা?”
নাথানের চোখের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল বৃদ্ধ। সে বোঝাতে চাইছে যা বলছে সত্যিই বলছে। “জঙ্গল!” চাপাকণ্ঠে বলল সে। নদী থেকে জঙ্গলটা উঠে এসে তাদেরকে আক্রমণ করেছিল!”
নাথানের কপালে ভাঁজ পড়ল।
কাঁধ তুলল শামান। “আর কিছু জানি না আমি। ওই অভিশপ্ত মহিলা মারা গেলে তার আত্মা গোত্রের বাকি সবার আত্মার সাথে যোগ দিল। পরের দিন, মানে আজকে আমি আপনাদের নদী দিয়ে আসার শব্দ শুনেছিলাম। দেখতে গিয়েছিলাম আপনারা কারা ?” সে ম্যানুয়েলের জাগুয়ারটার দিকে তাকাল। “কিন্তু ওর কাছে ধরা পড়ে যাই। মৃত্যু আমার পিছু নিয়েছে, ঠিক যেমনটা নিয়েছে আপনাদেরও।”
পেছন দিকে হেলে বসল নাথান, তাকাল ম্যানুয়েলের দিকে। বায়োলজিস্ট টর-টরকে চামড়ার একটা দড়ি দিয়ে বেধে রেখেছে কিন্তু শান্ত রাখতে পারছে না ওটাকে। বিরক্তির ভাব-ভঙ্গি মুখে ফুটিয়ে এদিক-ওদিক হাটছে, কাঁধের লোমগুলো খাড়া, কিছুটা ভয়ও পেয়েছে বোধহয়।
শামানের কথাগুলো সবাইকে ভাষান্তর করার কাজটা শেষ করল কাউয়ি। “সে এতটুকুই জানে।”
জারগেনসেনকে লোকটার পায়ের বাধনও কেটে দেবার হুকুম দিল ওয়াক্সম্যান। “তার কথা শুনে কি বুঝলে?” কেলির প্রশ্ন। এখনও সে হাটু গেড়ে বসে আছে।
“বুঝতে পারছি না,” বিড়বিড় করল নাথান ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মৃতদেহগুলোর কথা মনে পড়ল তার। সে ভেবেছিল নদীর অপরপ্রান্ত থেকে কোন কিছু আক্রমণ করেছিল তাদেরকে, কিন্তু ওই মহিলার কথা যদি সত্যি হয় তাহলে নদীটা নিজেই উঠে এসে তাদেরকে আক্রমণ করেছিল।
তাদের সাথে যোগ দিল কাউয়ি। ঘটনাটা ব্যান-আলিকে নিয়ে প্রচলিত বিশ্বাসের রূপকথার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। বলা হয়ে থাকে তারা, মানে ব্যান-আলি ইচ্ছেমত যেকোন কিছুতেই রূপ নিতে পারে।”
“কিন্তু নদী থেকে কী-ই বা আসতে পারে, আর মানুষ মারতে পারে এভাবে? কল্পনাও করতে পারছি না।”
শাবানোর দরজার কাছে একটা ছোট শোরগোল উঠলে তাদের মনোযোগ সেদিকে চলে গেল। স্টাফ সার্জেন্ট কসটস ভেতরে এল দরজা ঠেলে, পেছনে একটা ট্রাভয়েস ট্রে টেনে আনছে সে। ভি-আকৃতি ট্রে-টার উপর একটি মৃতদেহ রাখা। হত্যাযজ্ঞের জায়গা থেকে তুলে আনা হয়েছে ওটাকে। তাদের পেছনে তীক্ষ্ণ চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠল শামান। ঘুরে দাঁড়াল নাথান।।
ইন্ডিয়ানটার চোখদুটো ভয়ে কাঁপছে । “ঐ অভিশপ্তকে এখানে এনো না। ব্যানআলিকে আমাদের উপর ডেকে আনছ তুমি!”
জারগেনসন এগিয়ে গিয়ে তাকে শান্ত করতে চাইল কিন্তু ঐ বয়সেও ভালই পেশীশক্তি দেখাল শামান। সে রেঞ্জারের হাত গলে বেরিয়ে গেল। তারপর এক দৌড়ে একটা ঘরে গিয়ে, ছাদ থেকে ঝুলিয়ে দেয়া হ্যামোকটি মইয়ের মত বেয়ে গোলাকৃতি ছাদের খোলা অংশ বরাবর উঠে গেল ।
এ দৃশ্য দেখে এক রেঞ্জার রাইফেল তা করল তার দিকে। “গুলি করো না!” চিৎকার দিল নাথান। “তোমার অন্ত্র নামাও, কর্পোরাল!” আদেশ দিল ওয়াক্সম্যান।
ছাদের উপরে উঠেই বৃদ্ধ শামান থামল, তারপর নিচের মানুষদের দিকে ফিরে তাকাল সে। “এই লাশটা ব্যান-আলির সম্পত্তি । তাদের জিনিস তারা নিতে আসবেই!”
এ কথা বলেই ছাদ থেকে জঙ্গলের দিকে ঝাঁপ দিল শামান। “তাকে ধরে আন,”দুই রেঞ্জারকে আদেশ দিল ওয়াক্সম্যান।
“ওরা ওকে কখনোই খুঁজে পাবে না,” বলল কাউয়ি। “যে রকম ভয় পেয়েছে সে, জঙ্গলে হারিয়ে যাবে চোখের পলকেই।” প্রফেসরের ভবিষ্যত্বাণীই সত্যি হল। খুঁজে পাওয়া গেল না ইয়ানোমামো শামানকে। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই কেলি শাবানোর এক কোণায় নিরাপদ ও আরামজায়ক একটি জায়গা খুঁজে নিল নিজের জন্য। ব্যস্ত হয়ে পড়ল লোকগুলোর মূত্যুর কারণ খুঁজে বের করতে। ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যান আর ফ্রাঙ্ককে জেরান্ড ক্লার্কের চিহ্ন দেয়া গাছটা দেখতে নিয়ে গেল নাথান।
‘ইন্ডিয়ানদের হাতে ধরা পড়ার আগে এটা লিখেছিল সে,” ফ্রাঙ্ক বলল। “কি দূর্ভাগ্যের ব্যাপার! লোকালয়ের কত কাছে এসে পড়েছিল সে তারপর ধরা খেয়ে বন্দী হল।” মাখা ঝাঁকাল ফ্রাঙ্ক । “প্রায় তিন মাস ধরে বন্দী থাকল।”
শাবনোতে ফিরে আসতেই টিমের বাকি সদস্যরা রাতের আনুষঙ্গিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল তারা। আগুন জ্বালান হল। রাত্রে প্রহরী নির্ধারণ করা হল। রাতের খাবার তৈরি করার পর আগামীকালের জন্য কাজের পরিকল্পনাও করে নিল তারা। নদীপথ ধরে এগুনো হবে না আপাতত, আগামীকাল থেকে জেরাল্ড ক্লার্কের ব্যবহৃত পথটা ধরেই ভ্রমন করবে টিমটা।
সূর্যাস্তের পর, রাতের খাবার ভাত-মাছ রান্না হতেই কেলি তার অস্থায়ী মর্গ ছেড়ে বেরিয়ে এল। একটা ক্যাম্প-চেয়ারে নিজের ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। তারপর জ্বলতে থাকা আগুনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে তার পরীক্ষার ফলাফল জানাল সবাইকে ।
“আমি যতটুকু বুঝতে পারছি, তার শরীরে বিষাক্ত কিছু ঢোকানো হয়েছিল। মৃতদেহে ভয়ঙ্কর কিছু নমুনা পেয়েছি আমি । জিহ্বাটা ছিড়ে নেয়া হয়েছে। এর মানে দেহে এমন কিছু প্রবেশ করানো হয়েছিল যাতে শরীরের অভ্যন্তরীন নালীগুলো সংকুচিত হয়ে যায়, মেরুদণ্ড এবং অন্যান্য অস্থিও বাদ যায় নি এই রোগ থেকে।”
“কি ধরনের পয়জন এটা?” জিজ্ঞেস করল ফ্রাঙ্ক।
“এটা বের করতে ল্যাবরেটরির সাহায্য লাগবে আমার। এমনকি পরীক্ষা ছাড়া এটাও বলতে পারছি না, ঠিক কিসের মাধ্যমে বিষটা ছড়িয়েছিল। হয়তো বিষমাখা তীর, বর্শা বা ডার্ট। মৃতদেহটা মাংস খাওয়া পোকার আক্রমণে এতই নরম হয়ে গেছে যে ঠিক করে বলা প্রায় অসম্ভব।”
সূর্যাস্ত দেখে নাথান তাদের আলোচনাটা শুনে গেল চুপচাপ তার মনে পড়ল অদৃশ্য হয়ে যাওয়া শামানের শেষকথাগুলো তাদের জিনিস তারা নিতে আসবেই! তারপর আবারো ঘুরে ফিরে সেই ভয়ঙ্কর হত্যাযজ্ঞের ছবি ভেসে উঠল তার চোখে । তার আশেপাশে এবং পুরো আমেরিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অজ্ঞাত রোগটির কথাও ভাবল গুরুত্বের সাথে। এগুলোর ভেতর দিয়ে যেতেই নাথানের বোধ তাকে জাগিয়ে তুলল আবারো, জানান দিয়ে গেল খুবই সত্যি একটা কথা-সময় তাদের কাছ থেকে খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে।
