আমাজনিয়া – ৯
নিশুতি আক্রমণ
আগস্ট ১৪, রাত ১২:১৮
আমাজন জঙ্গল
একটা দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠল কেলি। ঝড়ের বেগে উঠে বসল বিছানায়। স্বপ্নটাকে পরিস্কারভাবে মনে করতে পারল না, শুধু আবছাভাবে কিছু মৃতদেহের ছবি ভেসে ওঠা ছাড়া। একটা দৌড়-ঝাপের মুহূর্তও ছিল স্বপ্নে। ঘড়ি দেখল সে। রেডিয়াম কাঁটাগুলো মাঝরাতের পরের সময়কে দেখাচ্ছে।
পুরো শাবানোজুড়ে বেশির ভাগ মানুষই ঘুমিয়ে আছে এখন। এক রেঞ্জার আগুনের পাশে দাঁড়ান, তার সহকর্মী পাহারা দিচ্ছে দরজাটা।কেলি জানে আরও দু-জন রেঞ্জার এই গোলাকৃতি ঘরটার বাইরে পাহারা দিচ্ছে। অন্যদিকে, বাকি সবাই যার যার আরামদায়ক, উষ্ণ হ্যামোকে ঘুমিয়ে আছে। দীর্ঘ ও ভয়ঙ্কর একটা দিন গেছে সবার। একদিকে মরা মানুষের স্তুপ, অন্যদিকে তার পরীক্ষা করা ছিন্ন-ভিন্ন দেহ, সাথে আছে চলমান দুশ্চিন্তা এগুলোই যথেষ্ট দুঃস্বপ্ন দেখার জন্য। তাই জেগে গিয়ে অবাক হল না কেলি। এত সব ছাপিয়ে একটি চিন্তা সব সময় তার মাথায় ঘুরছে ভার্জিনিয়াতে ফেলে আসা তার পরিবারকে নিয়ে যে দুশ্চিন্তা সেটা কিছুতেই মাথা থেকে নামিয়ে রাখতে পারছে না সে। তার অবচেতন মনে জমে থাকা অসামান্য চিন্তার খোরাকটুকু নিয়ে তার মস্তিষ্ক সেগুলো বিশ্লেষন করেছে ঘুমটা অগভীর স্তরে থাকার সময়ে। টেল থেকে আসা গত কাল দুপুরের খবরের থেকে রাতের খবরটা আরও বেশি ভয়াবহ। ঐ অল্প সময়ের ভেতরেই আরও বারোটা কেস রিপোর্ট করা হয়েছে আমেরিকায়। মারা গেছে দুই শিশু আর বয়স্ক এক নারী। এরা সবাই পাম বিচের বাসিন্দা। এদিকে, এই আমাজন জুড়ে রোগ ও মৃত্যু ছড়াচ্ছে শুকনো কাঠের ভেতর দিয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ার মত, খুব দ্রুত গতিতে। মানুষজন ভয়ে নিজেদেরকে হয় গৃহবন্দী করে রাখছে অথবা শহর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। মৃতদেহগুলো পোড়ানো হচ্ছে মানাউসের রাস্তায় রাস্তায়।
কেলির মা জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত তাদের ইন্সটার রিসার্চ সেন্টারে কেউ আক্রান্ত হয়নি। কিন্তু এত তাড়াতাড়িই বলা যাচ্ছে না তারা পুরোপুরি বিপদমুক্ত। আমাজনের কেসগুলো বিশ্লেষণ করে সর্বশেষ যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, রোগটা সর্বনিম্ন তিনদিন ও সর্বোচ্চ সাতদিন পর্যন্ত সময় নিচ্ছে পুরোপুরিসক্রিয় হতে । এটা আসলে নির্ভর করছে আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্য কোন পর্যায় আছে তার উপর। পুষ্টিহীন ও কম রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাসম্পন্ন শিশুই অসুস্থ হচ্ছে দ্রুত। রোগের কারণ হিসেবে একটা ব্যাকটেরিয়াল প্যাথোজেনকে দৃঢ়ভাবে আলাদা করেছে সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল। কিন্তু আরও বিভিন্ন রকম ভাইরাসের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে নিয়মিত । এখন পর্যন্ত এ রোগের জন্য দায়ি ভাইরাসটিকে সনাক্ত করা যায় নি।
এই রিপোর্ট যত ভয়াবহ-ই হোক না কেন এর থেকেও ভয়ঙ্কর একটা ব্যাপার ঘটেছে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কথা বলার সময় তার মাকে খুব ফ্যাকাশে লাগছিল দেখতে। আমরা জানি রোগটা আকাশপথেও এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে তাই আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে ওঠা-বসা না করলেও রোগটা ঠিকই ছড়িয়ে পড়ছে অন্যভাবে।”
কেলি জানে এ-কথার অর্থ কি। খুব সহজেই যেখানে রোগটা ছড়ানোর সুযোগ আছে সেখানে এরকম প্যাথোজেনকে কোয়ারেন্টাইন করে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব কাজ। সাথে, এটার রয়েছে উচ্চমাত্রায় মৃত্যুর হার।
“একটাই আশা আছে এখন, তার মা বলেছিল সবশেষে। “একটা সমাধান চাই আমরা।”
কেলি তার হ্যামোকের পাশে রাখা পানির বোতল থেকে লম্বা এক ঢোক পানি পান করল। এক মুহূর্ত বসে থাকল সে, ঘুম যে আর আসবে না তা বুঝতে পারছে। নিঃশব্দে হ্যামোক থেকে নেমে এল। আগুনের পাশে দাঁড়ানো রেঞ্জারটা তার নড়াচড়া দেখে তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। গতকালকের পর একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার এখনো পরে আছে। কেলি। বুট জোড়া আস্তে করে পায়ে ঢুকিয়ে নিয়ে প্রায় নিঃশব্দে দরজার দিকে হাটা ধরল। ঘুমিয়ে থাকা অন্য সদস্যদেরকে জাগানোর কোন ইচ্ছে নেই তার। তাকে দেখে মাথা নেড়ে সায় দিল রেঞ্জার। ধীরে হেটে শাবানোর দরজাটার কাছে এল কেলি। মাথা নিচু করে বাইরে বের হতেই দেখল প্রাইভেট ক্যারেরা পাহারা দিচ্ছে।
“এই একটু ফ্রেশ হওয়া দরকার, ফিসফিস করে বলল কেলি। নারী রেঞ্জার মাথা নেড়ে সায় দিয়ে হাতের অস্ত্রটা নদীর দিকে তাক করল। আপনি একা নন।”
কেলি দেখল কয়েক মিটার দূরে নদীপাড়ে একজন দাঁড়িয়ে আছে । ছায়ামূর্তিটার অবয়ব দেখেই কেলি চিনতে পারল নাথান রান্ডকে। একা দাঁড়িয়ে আছে, শুধু দু-জন রেঞ্জার একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে পাহারায়। হাতের ফ্লাশ-লাইটের কারণে সহজেই চোখে পড়ছে তাদের।
“পানি থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকবেন,” সতর্ক করে দিল প্রাইভেট ক্যারেরা। “পর্যাপ্ত পরিমাণ মোশন-সেন্সর না থাকার কারণে নদী এবং জঙ্গলের দিকগুলো পুরোপুরি সিকিউর কতে পারিনি।”
“আচ্ছা, দূরে থাকব নদী থেকে।” কেলির ভালই মনে আছে কর্পোরাল ডি-মারটিনির ঘটনাটি।
শাবানো ছেড়ে হাটা শুরু করতেই কেলি শুনল জঙ্গলের গুঞ্জন-সঙ্গিত, এই সঙ্গিতে অংশ নিয়েছে অসংখ্য ঘাসফড়িং, ঝিঝি পোকা ও ব্যাঙের দল। সঙ্গীতটা বেশ শান্তই মনে হল তার কাছে। একটু দূরে, অসংখ্য জোনাকি নৃত্য করছে গাছের শাখায় আর নদীর উপর। আলোক-বিন্দুর মোহনীয় দৃশ্য এক।
কেলির আসার শব্দ পেয়ে ঘুরে দাঁড়াল নাথান । একটা সিগারেট ঝুলে আছে তার ঠোঁটে । রাতের অন্ধকারে ছোট্ট একটা লাল-দিপ্তী ছড়াচ্ছে ওটার অগ্রভাগ থেকে।
“আমি জানতাম না তুমি সিগারেট খাও,” তার পাশে এসে দাড়িয়ে উঁচু পাড় থেকে নদীর দিকে তাকিয়ে বলল কেলি।
“খুব একটা খাই না, একটু হেসে বলল সে। লম্বা একটা ধোঁয়ার স্রোত মুখ থেকে বের করে। “মানে বেশি না। এটা কর্পোরাল কঙ্গারের কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছি। সে বুড়ো আঙুল দিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রেঞ্জার দু-জনকে দেখাল। “গত চার-পাঁচ মাসে একটাও ধরি নি, কিন্তু…আমি জানি না…আসলে ভাবলাম বাইরে আসার জন্য আমার একটা অজুহাত দরকার । একটু হাটা হাটি করলে ভালই লাগবে, তাই এটা চেয়ে নিলাম আর কি।”
“আমি জানি তুমি কি বলতে চাচ্ছ। আমিও বাইরে এসেছি লোক দেখানো ফ্রেশ বাতাস নিতে।” সে হাতটা বাড়িয়ে দিলে সিগারেটটা এগিয়ে দিল নাথান । কেলি ওটা নিয়ে লম্বা একটা টান দিয়ে ধোয়া বের করে দিল। দুশ্চিন্তাও যেন খানিকটা বেরিয়ে গেল সেই সাথে। “ফ্রেশ বাতাসের মত না এটা।”সিগারেটটা তাকে ফিরিয়ে দিল আবার।
নাথান শেষ একটা টান দিয়ে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে ফেলল ওটা। “এগুলো তো মেরে ফেলবে তোমাকে।”
নদীটা শান্ত বয়ে যাচ্ছে, তারাও দাঁড়িয়ে আছে নীরবতায় । একজোড়া বাদুড় উড়ে গেল নদীর উপর দিয়ে, মাছ ধরছে ওরা দূরে কোথাও। একটা পাখি করুণ সুরে ডাক দিল।
“মেয়েটা ভাল থাকবে,” অবশেষে কথা বলল নাথান, প্রায় ফিসফিসিয়ে । তার দিকে তাকাল কেলি।
“কি?”
“জেসি, তোমার মেয়ে…ও ভালই থাকবে।”
স্তব্ধ হয়ে গেল কেলি এক মুহূর্তের জন্য। দম ছাড়তে পারছে না সে।
“আমি দুঃখিত,” বিড়বিড় করে বলল সে। “অনধিকার চর্চা করে ফেললাম বোধহয়।”
তার কনুই স্পর্শ করল কেলি। “না না, ঠিক আছে। আসলে আমি আমার দুশ্চিন্তাগুলোকে হালকাভাবে নিতে পারি না।”
“তুমি বড় একজন চিকিৎসক হতে পার, কিন্তু সবার আগে তুমি একজন মা।”
কিছু সময়ের জন্য চুপ থাকল কেলি, তারপর নরম গলায় বলল, “এটা তার থেকেও বেশি কিছু। জেসি একমাত্র সন্তান আমার। এক মাত্র…সারা জীবনের জন্য।”
“কি বলতে চাচ্ছ তুমি?”।
কেলির কাছে এটার কোন সঠিক ব্যাখ্যা নেই, কেন এই ব্যাপারটা নিয়ে সে নাথানের সাথে আলোচনা করছে তবে এতে অন্তত তার ভেতরের ভয়গুলো জোরেসোরে বের করে দেবার সাহস পাচ্ছে সে। “জেসির জন্মের সময় আমার কিছু রোগ ধরা পড়ে…ফলে ইমারজেন্সি একটা অপারেশন করাতে হয় আমাকে।” নাথানের দিকে তাকাল, তারপর দূরে। “ডাক্তার বলেছে এরপর আর কোন সন্তান ধারন করতে পারব না আমি।”
“ওহ্, দুঃখিত।”
ক্লান্তভাবে হাসল সে। “এটা অনেক দিন আগের কথা। এত দিনে এটা আমি মেনেও নিয়েছি, কিন্তু এখন চিন্তা হচ্ছে জেসিকে নিয়ে। ঝুঁকির ভেতরে আছে সে।”
একটা শ্বাস ফেলল নাথান, তারপর পড়ে থাকা একটি গাছের উপর বসল সে। “সব বুঝি আমি, ভাল করেই । তুমি এখানে জঙ্গলে পড়ে আছ। দুশ্চিন্তা কর এমন একজনকে নিয়ে যাকে তুমি প্রচন্ড ভালবাস কিন্তু তার কাছে যেতে পারছ না, সামনে এগিয়ে যেতে হচ্ছে তোমাকে বড় একটা সমস্যা সমাধানের জন্য।”
কেলিও বসে পড়ল তার পাশে। “এটা অনেকটাই তোমার মতই..মানে প্রথমবার যখন তোমার বাবা হারিয়ে গিয়েছিল…সেই অনুভূতির কথা বলছি।”
নদীর দিকে তাকিয়ে ধীর গতিতে কথা বলল নাথান। “তোমার ব্যাপারটায় যে শুধু দুশ্চিন্তা আর ভয় লুকিয়ে আছে তা নয়, একটা ভুলও করা হচ্ছে এখানে।” কেলি ভাল করে জানে আসলে কি বলতে চাইছে নাথান । জেসিকে এভাবে বিপদের মাঝে রেখে এখানে কি করছে সে? জঙ্গলে হাওয়া খেয়ে বেড়াচ্ছে? তার তো বাড়িতে যাওয়ার জন্য প্রথম ফ্লাইটটা ধরা উচিত।
নিরবতা আবারো নেমে এল দু-জনের মাঝে, কিন্তু উভয়ের যন্ত্রণাই বাড়ছে ক্রমশ।
অবশেষে একটা প্রশ্ন করল কেলি যেটা নাথানকে প্রথম দেখার পর থেকেই তার মথায় ঘুরছে। “তাহলে তুমি এখানে কেন?”
“কি বলতে চাও?”
“তোমার বাবা-মা, দু-জনকেই হারিয়েছ এই আমাজনে। তাহলে এখানে কেন ফিরে এসেছ তুমি? এটাও কি যথেষ্ট কষ্টদায়ক নয়?”
হাতে হাত ঘষল নাথান, তাকিয়ে আছে মাটির দিকে, মুখে কোন কথা নেই। “আমি দুঃখিত। আমার নাক গলানো উচিত না এতে।”
“না, ঠিক আছে,” বলল সে দ্রুত । একনজর তার দিকে তাকিয়ে আবার সরিয়ে নিল চোখদুটো। “আমার…আমার আসলে সিগারেটটা নিভিয়ে ফেলে খারাপ লাগছিল । এটা এখনো ব্যবহার করা যাবে।”
একটু হাসল কেলি। “আলোচনার বিষয় পরিবর্তন করা উচিত আমাদের।”
“না না, কোন সমস্যা নেই এতে। আসলে হয়েছে কি আমি সিগারেটটা নিয়ে ভাবছিলাম ঠিক তখনই তুমি প্রশ্নটা করেছ, ভেবেছ বিষয়টা আমার পছন্দ নয়। যাইহোক, তোমার যে প্রশ্ন তার উত্তর দেয়াটা কঠিন, এমনকি এর অনুভূতিগুলো কোন শব্দে প্রকাশ করা আরও কঠিন।” নাথান পেছনে হেলে গেল খানিকটা । “যখন বাবাকে হারালাম তখন একটা সময় পর তাকে খোঁজাখুঁজিও বন্ধ করে দিলাম, জঙ্গলও ছাড়লাম আমি, আর প্রতিজ্ঞা করলাম এখানে আর কখনো ফিরে আসব না। কিন্তু স্টেটসেও দুঃখ আমার পিছু ছাড়ল না। দুঃখগুলো অ্যালকোহলে ডুবাতে চাইলাম, ড্রাগসও নিলাম নিজেকে বোধহীন করার জন্য কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। অ্যালকোহল বা ড্রাগস আমার বিচ্ছিরি কথাগুলোকে আমার থেকে দূরে নিতে পারল না। তারপর বছরখানেক আগে নিজেকে আবিষ্কার করলাম একটা বিমানে বসে আছি এখানে আসার জন্য। আমি ঠিক জানতাম না কেন এমনটা করলাম। কেন এয়ারপোর্টে গেলাম, কেন টিকিট কাটলাম ভেরিগ-এর কাউন্টার থেকে । কেমন একটা ঘোরের ভেতর ছিলাম আমি যেটা কাটার আগেই মানাউসে এসে নামলাম আমি।” একটু থামল নাথান। কেলি তার পাশে বসে থাকা মানুষটার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। ভারি এবং গভীর আবেগে ভরা। সে একটা হাত রাখল নাথানের হাটুর উপর, সংকোচ লাগছে তার । কোন কথা বলল না নাথান, সে নিজের হাত দিয়ে তার হাটুকে আড়াল করে ফেলল। “জঙ্গলে ফিরে এসে আমি লক্ষ্য করলাম কষ্টগুলো অনেক কম অনুভূত হচ্ছে, অনেক হালকা লাগছে নিজেকে। আমি জানি না কেন, তবে এজন্য হয়তো, আমার বাবা এখানেই মারা গেছে, এখানেই থাকত তারা, এটাই তাদের স্বপ্নের ঠিকানা ছিল।” মাথা ঝাঁকাল নাথান। “আমি ঠিক বোঝাতে পারছি না তোমাকে।”
“আমার মনে হয় বোঝাতে পারছ, নাথান । এই জঙ্গলই একমাত্র জায়গা যেখানে থাকলে তোমার মনে হবে বাবা-মার সবচে কাছে আছ তুমি।”
দীর্ঘ সময় চুপ মেরে রইল নাথান । কেলিও অনেকক্ষণ কোন কথা বলল না।
“নাথান?” অবশেষে নিরবতা ভাঙল সে।
খসখসে গলায় কথা বলল নাথান। “আগে কখনো এই অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে পারি নি। কিন্তু তোমার কথাই ঠিক। এখানে, এই জঙ্গলে আমার চারপাশ জুড়েই তারা আছে, আমার মা আমাকে শিখিয়েছে কিভাবে ম্যানিয়ক থেকে আটা তৈরি করতে হয়…বাবা শিখিয়েছে কিভাবে শুধুমাত্র পাতা দেখেই গাছ চিনতে হয়…” সে ঘুরল কেলির দিকে, চোখ জোড়া জ্বলজ্বল করছে তার। এটাই আমার বাড়ি।” আনন্দ ও বেদনার মিশ্র অভিব্যক্তি ফুটে উঠল নাথানের চোখেমুখে।
কেলি নিজেকে আরও একটু ঘনিষ্ঠ আবিষ্কার করল । ডুবে গেছে সে বাবা-মা হীন ছেলেটার আবেগের সাগরে। নাথান…”।
পানিতে ছোট্ট একটা বিস্ফারনের মত হল । কেঁপে উঠল দু-জনেই। নদীপাড় থেকে কয়েক মিটার দূরে পানির সরু একটা ধারা শূন্যে উঠে গেল প্রায় তিন ফুটের মত। যখন পানির অগ্রভাগটা শব্দ করে ছড়িয়ে পড়ল সবদিকে, বড় সড় কিছু একটা পানির ভেতর দিয়ে আঁকা-বাঁকা হয়ে চলতে চলতে অদৃশ্য হয়ে গেল।
“কি ওটা?” জানতে চাইল কেলি। উত্তেজিত হয়ে উঠলো
নাথান তার কাঁধের উপর একটা হাত রেখে তাকে বসিয়ে দিল আস্তে করে। “ওতে ভয় পাবার কিছু নেই। এটা একটা বোটা মাত্র, স্বচ্ছ পলির ডলফিন। সংখ্যায় প্রচুর পরিমাণে ওরা, কিন্তু বেশ লাজুক। বেশির ভাগ সময় নির্জন জায়গায় ওদের দেখা যায়। ছোট ছোট দলে ঘুরে বেড়ায় ওরা।” । তার কথা সত্যি করে দিয়ে আরও একজোড়া পানির ধারা উপরে ঠেলে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল সবদিকে । এবার কেলি বেশ ধাতস্থ এবং কম আতঙ্কিত। ডলফিনগুলোর পিঠের খড় কাটাগুলো পানি থেকে কিছুটা জেগে আছে, ভেসে বেড়াচ্ছে দ্রুত গতিতে, তার পর ডুব দিল আবার পানিতে। সবগুলোই ছুটছে খুব দ্রুততার সথে।
“ওরা তো খুব ফাস্ট,” বলল কেলি। “শিকার করছে সম্ভবত।”
তারা আবারো গাছের গুড়িটার ওপর ভাল করে বসতেই ডলফিনের ঝাঁকটা ছোটাছুটি শুরু করে দিল । কোনটা লাফিয়ে, কোনটা সাঁতরিয়ে, পুরো নদীজুড়ে। বিক্ষিপ্ত শব্দে আর শিসের ধ্বনি প্রতিফলিত হচ্ছে ভয়ঙ্করভাবে। মুহূর্তেই পুরো নদী ভরে উঠল ডলফিনে। ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটছে স্রোতের সাথে পাল্লা দিয়ে।
ভ্রু-কুঁচকে উঠে দাঁড়াল নাথান।
“কি হল?” জিজ্ঞেস করল কেলি ।
“আমি জানি না।”
একটা ডলফিন পানি থেকে লাফিয়ে এসে তাদের পায়ের কাছে পড়ল। কাদার সাথে আটকে গিয়েছিল প্রায়। ঠিক তখনই লেজ দিয়ে পেছন দিকে আঘাত করে আবারো পানিতে গিয়ে পড়ল। তলিয়ে গেল গভীরজলে।
“কোন কিছু ওদেরকে তাড়া করেছে।
কেলি উঠে দাঁড়াল সঙ্গে সঙ্গে।“কি?”
মাথা ঝাঁকাল মাথান। “তাদের এমন আচরণ এর আগে আমি দেখি নি।” সে পাহারায় থাকা রেঞ্জার দু-জনের দিকে তাকাল। ওরাও ডলফিনদের এমন কুঁচকাওয়াজ দেখছে। আরো আলো দরকার আমার।” নাথান দৌড় শুরু করল দাঁড়িয়ে থাকা রেঞ্জারদের দিকে। কেলি অনুসরন করল তাকে। তার রক্তও জেগে উঠেছে যেন। গার্ডরা দাঁড়িয়ে আছে যে জায়গায় সেখানে পানির একটা ধারা নদীতে গিয়ে শেষ হয়েছে।
“কর্পোরাল কঙ্গার, আপনার ফ্লাশ-লাইটটা একটু দেবেন?” তাড়া দিয়ে বলল নাথান।
“ওগুলো সামান্য ডলফিন,” অপর রেঞ্জার বলে উঠল। লোকটা সার্জেন্ট কস্টস। শ্যামলা বর্ণের এই রেঞ্জার তাদের দিকে রেগেমেগে তাকাল । “রাতে টহল দেবার সময় ঝাঁকে ঝাঁকে দেখেছি ওদের। ও, ভুলেই গেছিলাম, তখন তো আপনারা আরামে ঘুমিয়ে ছিলেন নিজেদের বিছানায়!”
তবে অন্য রেঞ্জার কর্পোরাল কঙ্গার কিছুটা সাহায্যপূর্ন মনোভাবের এই নিন, ডা, রান্ড,” ফ্লাশ-লাইটটা এগিয়ে দিয়ে বলল সে। বিড়বিড় করে ধন্যবাদ জানিয়ে লাইটটা হাতে তুলে নিয়ে দ্রুত নদীর দিকে নেমে গেল নাথান। হাতের লাইটটা জ্বালিয়ে পানিতে ফেলল সে। ডলফিনের ঝাঁক এখনো যাচ্ছে তবে সংখ্যায় আগের মত অত বেশি নয়। কেলিও নদীর দিকে তাকাতেই নাথান লাইটের পাওয়ার বাড়িয়ে দিল, আলোয় ভেসে গেল নদীর উপরিভাগ।
“ধ্যাত,” বলল নাথান। আলো প্রায় শেষপ্রান্তে নদীর উপরিভাগ দেখে মনে হচ্ছে আন্দোলিত হচ্ছে যেন। অমসৃণ পথরের উপর দিয়ে দ্রুত বয়ে চলা সাদাপানির মত। ফেনা উঠছে, শব্দ হচ্ছে ঘরঘর করে। পানির এই স্রোত নদী বেয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে দ্রুত। আরও একটা ডলফিন লাফিয়ে উঠল ডাঙ্গায়। পেটে ভর দিয়ে পানিতে ফিরে যাবার চেষ্টা কছে কাদার ভেতর দিয়ে। কিন্তু আগেরটার মত সহজে মুক্তি পেল না এটা। কাদায় আটকে হাঁসফাঁস করছে আর তীক্ষ্ণ আর্তনাদ করছে মুখ দিয়ে । ডলফিনটার উপর আলো ফেলল নাথান । দম আটকে কয়েক পা পেছনে সরে গেল কেলি। ডলফিনের লেজটার শেষ প্রান্ত নেই। পেটটা চিড়ে ফাক হয়ে আছে। পাকস্থলি থেকে মলদ্বার পর্যন্ত টেনে বের করা। নদীর একটা স্রোত এসে হতভাগা ডলফিনটাকে পনিতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল।
একটু দূরে আলো ফেলল নাথান। উথাল-পাথাল সাদা-পানির স্রোতটা এরইমধ্যে অনেক কাছে চলে এসেছে তাদের।
“কি এটা?” জিজ্ঞেস করল কর্পোরাল কঙ্গার, কণ্ঠে টেক্সাসের টানটা ভারি শোনাল।
নদীর অপরপ্রান্তে একটা শূকরের কানফাটা আর্তনাদে রাতের নিস্তব্ধতা বিঘ্নিত হল । পাখির ডানা মেলল নিজেদের বাসা ছেড়ে ! ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে জেগে উঠল বানরের দল । চিৎকার করতে থাকল তারস্বরে।
“কি হচ্ছে এখানে?” টেক্সান রেঞ্জারটা প্রশ্ন করল আবারো । “আপনার নাইট-ভিশন গগলসটা আমায় দিন,” চট করে বলল নাখান। কেলি দাঁড়িয়ে আছে তার পেছনে।
“কি ওটা?”
নাথান রেঞ্জারের হাত থেকে অনেকটা ছোঁ মেরেই গগলসটা নিয়ে নিল । “নদীর এমন স্রোত আমি আগেও দেখেছি কিন্তু এত বেশি কখনো দেখি নি।”
“কিসের জন্য এমনটা হচ্ছে?” জিজ্ঞেস করল কেলি।
গগলস পরে নদীর দিকে তাকাল নাখান। পিরানহা মাছ…মাংসখেকোরা শিকারের প্রতিযোগীতায় মেতেছে।” নাইট-ভিশনের লেন্সের ভেতর দিয়ে আলো-আধারের জগৎটা সবুজাভ সাদা-কালোতে দেখা যাচ্ছে। পানির স্রোতটার দিকে ফোকাস করতে নাথানের এক মুহূর্ত লাগল। গগলসের টেলিস্কোপিক লেন্সগুলো টিউন করে ছবিটা জুম করে কাছে আনল সে। স্রোতের ঘোলা পানিতে বড় ডানার একটি ডলফিন দেখতে পেল, ওটাকে ধারালো দাঁতের পিরানহার দল ঘিরে ধরেছে। এক পলকেই ওটা রুপালী রঙের ভয়ঙ্কর মাছগুলোর মাঝে হারিয়ে গেল । খাবার নিয়ে নিজেদের ভেতরে হাঙ্গামা শুরু করে দিল মাছগুলো।
“ভয়ের কি আছে এতে?” তাচ্ছিল্যের সাথে বলল কসটস। ঐ শালার মাছেরা ডলফিনগুলোকে চিবিয়ে খাক। পানি ছেড়ে শুকনো ডাঙ্গায় আর উঠে আসবে না ওরা।”
সার্জেন্টের কথা ঠিক আছে, তবে নাথানের মনে পড়ল সেই মৃত ইন্ডিয়ানদের কথা। মৃতদেহগুলোর অবস্থা..আর বেঁচে যাওয়া একজনের বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে নদীর উঠে আসার কথা। এটাই কি ওদের সেই ভয়ের কারণ এখানকার পানি কি পিরানহায় গিজগিজ করছে যে কারণে রাতের বেলা ইন্ডিয়ানর পালাতে ভয় পাচ্ছিল? এই কারণেই কি পায়ে হেটে পালাচ্ছিল তারা? এদিকে ডলফিনকে যেভাবে আক্রমণ করছে ওরা…হিসেবটা যেন ঠিক মিলছে না। এমন শিকারের কথা কখনো শোনে নি সে। গগলসের ভেতর দিয়ে কিছু একটা নড়ে উঠতে দেখে সেদিকে খেয়াল করল নাথান। পানির স্রোত থেকে সরে এসে পাড়ে তাকাল সে। একটা মৃতদেহ পড়ে আছে। চশমার ভেতর দিয়ে ওটাকে দেখে মনে হচ্ছে একটা বুনোশূকর। এটাই কি সেই শূকর, যেটা কিছুক্ষণ আগে চিৎকার দিয়ে উঠেছিল?
কিছু ছোটছোট প্রাণী লাফাতে শুরু করুল মৃতদেহটার পাশে। দেখতে বিশালাকৃতির কোলাব্যাঙের মত। কিন্তু পার্থক্য হল ওগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে মৃতদেহটাকে ছিড়ে খাচ্ছে, ওটাকে টেনে পানির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
“এ…কি…অবস্থা…” বিড়বিড় করে বলল নাথান ।
“কি?” জিজ্ঞেস করল কেলি। “কি দেখছ তুমি?”
নাথান টেলিস্কোপিক লেন্সে কয়েকটা ক্লিক করল আরও ভাল করে দেখার জন্য। সে দেখল কোলাব্যাঙের মত দেখতে প্রাণীগুলো আবারও পানি থেকে উঠে এসে ঝাপিয়ে পড়ছে মৃত শূকটার উপর। অন্যরাও যোগ দিল। ঠিক সেই সময়ে একটা বড়সড় কাঠবিড়ালি জঙ্গলের ভেতর থেকে লাফিয়ে পড়ল পাড়ের কাদায় তারপর দৌড় দিল কাদার ভেতর দিয়েই কিন্তু কাদায় পিছলে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে পানি থেকে ব্যাঙসদৃশ প্রাণীগুলো উঠে এসে লাফাতে থাকল ওটার চারপাশে, তারপর ঝাপিয়ে পড়ল নতুন খাবারের উপর। নাথানের হঠাৎ মনে পড়ল সে কি দেখছে। এগুলোই ইন্ডিয়ানরা দেখেছিল । শামানের কথাগুলো মনে পড়ল তার । জঙ্গলটা নদী থেকে উঠে এসে আক্রমণ করেছিল তাদের। নদীপাড়ে পড়ে থাকা কাঠবিড়ালিটা শেষ বারের মত একটু নড়ে উঠল মারা যাবার আগে । কেলি কি মৃতদেহটা পরীক্ষা করার সময় এমন ভয়ানক কোন কিছুর চিহ্ন দেখে নি? চোখ থেকে গগলসটা নামিয়ে রাখল সে। পানির স্রোতটা মাত্র ত্রিশ মিটারের মত দূরে আছে এখন।
“নদী থেকে আমাদের সবার দূরে সরে যেতে হবে। সব রকম পানিপথ থেকে দূরে।”
“কি আবোল-তাবোল বলছেন! পাগল হয়েছেন নাকি?” অবজ্ঞার সাথে বলল সার্জেন্ট কস্টস।
কর্পোরাল কঙ্গার গগল্সটা নিয়ে যথাস্থানে রাখল। “সম্ভবত ডক্টরের কথা আমাদের শোনা উচিত-” হঠাৎ কিছু একটা বাঁকা হয়ে ছুটে এসে কাপোৰ্বলের হেলমেটে এসে লাগলতেই ভেঁজা কিছুতে বাড়ি দেবার মত শব্দ হল। “হায় ঈশ্বর!”
নিচের দিকে আলো ফেললো নাথান। কাদার ভেতরে এক অদ্ভুত প্রাণী পড়ে আছে অনেকটা স্থবির হয়ে। দেখতে ব্যাঙাচির মত তবে আকারে বেশ বড়, পেছনে একজোড়া শক্ত-সামর্থ পা আছে।
কারো কোন প্রতিক্রিয়া হবার আগেই আবার লাফ দিল প্রাণীটা। এবার গিয়ে পড়ল কর্পোরালের উরুতে তারপর খুব দ্রুত শক্ত চোয়াল দিয়ে কামড়ে ধরে ঝুলে থাকল ওটা। কেঁপে উঠে কপোরাল তার অস্ত্রের বাট দিয়ে আঘাত করল ওটাকে। পড়ে যেতেই কয়েক পা পেছনে সরে গেল সে। “শালার দাঁতও আছে দেখছি!”
কস্টস এগিয়ে বুটপরা পা দিয়ে চেপে ধরল ওটাকে। এক পাড়া খেয়েই নাড়ি-ভুড়ি বেরিয়ে গেল ওটার। দাঁতে দাঁত চেপে লাথি দিয়ে দূরে ফেলে দিল সে। “দাঁতের কারুকাজ আর দেখানো লাগবে না তোমার?”
সবাই মিলে নদী থেকে খুব দ্রুত সরে এল । কঙ্গার ক্ষতস্থান হাত দিয়ে চেপে ধরে একপায়ে লাফিয়ে চলছে। ভাল করে ওখানে আঙুল চালাতেই দেখতে পেল তার ইউনিফর্মটা ছিড়ে গেছে সামান্য। হাতটা চোখের সামনে তুলে ধরতেই নাথান দেখল কর্পোরালের আঙুলের মাথায় রক্তের ছাপ। “আসলে আমার থেকেই খানিকটা কামড়ে নিয়েছে,”দূর্বল একটা হাসি দিয়ে বলল কঙ্গার ।।
ইতিমধ্যে তারা শাবানোর মূল দরজার কাছে পৌছাল। “কি হচ্ছে ওদিকে?” জিজ্ঞেস করল প্রাইভেট ক্যারেরা।
নদীর দিকে দেখাল নাথান। “ইন্ডিয়ানদেরকে যারা আক্রমণ করেছিল তারা এখন আমাদের পিছু নিয়েছে । জায়গাটা এখনই ছাড়তে হবে।”
“আপাতত তুমি তোমার পজিশনে থাক, প্রাইভেট কারেরাকে আদেশ দিল কসটস। “কঙ্গার, তুমি তোমার পা-টা ভাল করে দেখ, ততক্ষনে আমি ক্যাপ্টেনকে রিপোর্ট করে আসি।”
“আমার মেডিকেলের ব্যাগটা ভেতরে আছে “বলল কেলি।
একটা বাঁশের খুঁটির সাথে হেলান দিল কঙ্গার। “সার্জেন্ট, আমার ভাল লাগছে না।” সবার চোখ গিয়ে পড়ল কর্পোরালের উপর।“সবকিছু ঝাপসা লাগছে।”
তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেল কেলি । নাথান দেখল তার ঠোঁটের কোণ দিয়ে লালা বেরিয়ে আসছে। এরপরই মাথাটা নিচু হয়ে পেছনে হেলে গেল । তার সারা শরীর কাঁপছে।
সার্জেন্ট কস্টস দ্রুত ধরে ফেলল তাকে। “কঙ্গার!”
“ভেতরে নিয়ে যাও ওকে,” কেলি দ্রুত শাবানোর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।
কঙ্গারকে টেনে ভেতরে নিতে থাকল কস্টস কিন্তু বার বার বিক্ষিপ্তভাবে তার সারা শরীর কেঁপে ওঠায় টেনে নিয়ে যেতে কষ্ট হল খুব । প্রাইভেট ক্যারেরা সাহায্য করার জন্য নিচু হতেই চিৎকার দিয়ে উঠল কসটস। “তুমি তোমার পজিশনে থাক, প্রাইভেট।” তারপর তাকাল নাথানের দিকে, “পা দুটো ধর।। হাটুগেড়ে বসে কঙ্গারের পা দুটো তুলে ধরল নাথান । তার কাছে মনে হল সে যেন শক্তিশালী কিছু ধরে আছে। তার সারা শরীর প্রবলভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠছে। “চলুন।”
তারা দু-জনে সরু দরজা দিয়ে কঙ্গারকে ভেতরে নিয়ে এল। অন্যরাও ছুটে এল এ সময় চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনে ।
“কি হয়েছে?” জিজ্ঞেস করল জেন। “সবাই সরে যাও!” ভারি রেঞ্জারকে টেনে নিতে নিতে চিৎকার দিল কসটস।
“এদিকে আসুন,“বলল কেলি। এতক্ষণে সে তার মেডিকেল ব্যাগ খুলে হাতে একটা সিরিঞ্জ নিয়ে নিয়েছে।“ওকে শুইয়ে দিয়ে শক্ত করে ধরে রাখুন।
কঙ্গারকে মাটিতে নামিয়ে রেখে একপাশে সরে গেল নাথান। তার জায়গায় দু-জন রেঞ্জার এসে পা-দুটো চেপে ধরল মাটির সাথে । হাটুতে ভর দিয়ে কসটস কঙ্গারের কাঁধটা শক্ত করে ধরে রাখল । কিন্তু রেঞ্জার তার মাথা উদভ্রান্তের মত নড়াচড়া করছে, মনে হচ্ছে যেন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলেছে সে। তার মুখ দিয়ে ফেনা বেরিয়ে আসল, সাথে রক্ত। কটস দেখল রক্তটা আসছে তার ঠোট থেকে যেখানে সে জোরে কামড়ে ধরেছে। “হায় ঈশ্বর!”
কেলি একটা রেজর-ব্রেড দিয়ে রেঞ্জারের জামার হাতা ছিড়ে দ্রুত সূচটা ঢুকিয়ে ইনজেক্ট করে দিল বাহুতে। ইনজেকশ শেষে হাটুর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল কি প্রতিক্রিয়া হয় । শক্ত করে রেঞ্জারের একটা হাত ধরল সে। “এই তো…এই তো সব ঠিক হয়ে যাবে।”
হঠাৎ করেই শান্ত হয়ে গেল রেঞ্জার। “ওহ, ঈশ্বর,” হাফ ছেড়ে বলল কস্টস। “থ্যাঙ্কস।”
কিন্তু কেলি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারল না। “ওফ !” দ্রুত তার দিকে ঝুঁকে গলায় হাত দিয়ে পালস দেখল সে। তারপর রেঞ্জারকে শুইয়ে দিয়ে তার বুকে কার্ডিও পালমোনারি-রিসাসিটেনশন শুরু করল। “কেউ মুখ দিয়ে শ্বাস দিতে শুরু কর, এক্ষুণি!”
রেঞ্জাররা হতভম্ব হয়ে আছে, বুঝতে পারছে না কী করতে হবে। নাথান কটসকে সরিয়ে দিয়ে কঙ্গারের মুখের লালাটুকু মুছে নিল, তারপর তার বুকে কেলির চাপ-দেয়ার সাথে তাল মিলিয়ে ওর মুখের সাথে মুখ লাগিয়ে বাতাস প্রবেশ করতে থাকল সে। মাথানের মনোযোগ একটু অন্যদিকে গেল । অস্পষ্টভাবে শুনতে পেল, সবাই কি যেন বলাবলি করছে। ‘ব্যাঙের মত দেখতে এক রকম প্রাণী, কিংবা মাছ,” বর্ণনা করল কসটস। “লাফিয়ে এসে কঙ্গারের পা কামড়ে ধরে…”
“বিষাক্রান্ত হয়েছে সে,”হাফিয়ে উঠে বলল কেলি। “প্রাণীগুলো বিষাক্ত ছিল।”
“এমন কোন জীবের কথা শুনিনি কখনো,” কাউয়ি বলল।
ওর কথায় সায় দিতে চাইল নাথানও কিন্তু মরতে বসা রেঞ্জার এর মুখে শ্বাস চালু করতে ব্যস্ত এখন।
“তারা সংখ্যায় হাজার হাজার, কসটস বলে চলেছে, “সামনে যাচ্ছে সব সাবাড় করতে করতে তেড়ে আসছে এদিকে।”
“তাহলে আমরা এখন কি করব?” জিজ্ঞেস করল
ক্যাপ্টেন ওয়াক্সম্যনের কণ্ঠ থামিয়ে দিল সবার উদ্বেগ “সবার আগে যেটার দরকার, আমরা একদমই আতঙ্কিত হব না। কর্পোরাল গ্রেইভ এবং প্রাইভেট জোন্স পাহারায় যোগ দেবে ক্যারেরার সাথে।” ।
“থামুন,”দুই দমের মাঝে বলল নাথান। ওয়াক্সম্যান ঘুরে দাড়াল তার দিকে।
“কি?”
নাথান হাফাচ্ছে। জ্ঞান ফেরানোর জন্য কারের মুখে বাতাস প্রবেশ করিয়ে পুণরায় দম নেবার সময়টুকুতে বলে উঠল সে, “আমরা পানির খুব কাছে আছি। শাবানোর ঠিক পেছন দিয়েই বয়ে গেছে ওটা।”
“তো?”
“ওরা ঐ পানি বেয়ে আমদের এখানে চলে আসবে…ঠিক যেভাবে ইন্ডিয়ানদের কাছে এসেছিল।” দ্রুততার সাথে দম নেওয়া ও ছাড়ার জন্য মাথাটা ঝিম ঝিম করছে নাথানের । একবার কর্পোরালের মুখে দম ছাড়ছে আবার মুখ তুলে দম নিছে। আমাদেরকে দূরে যেতে হবে। এখান থেকে অনেক দূরে। নিশাচর…” আবারো নিচু হল সে দম দেয়ার জন্য। কি বলতে চাইছেন?”
উত্তর দিল প্রফেসর কাউয়ি। “ইন্ডিয়ানদের আক্রমণ করা হয়েছিল রাতে। আবার এখনো আক্রমণ হল রাতেই। নাথানের বিশ্বাস এই প্রাণীগুলো নিশাচর। যদি এখন আমরা ওদের থেকে দূরে থাকতে পারি তাহলে কাল সূর্য ওঠা পর্যন্ত নিরপদে থাকব।”
“কিন্তু এখানে তো আমাদের থাকার জায়গা আর নিরাপত্তা আছে…তাছাড়া ওগুলো নিছক মাছ কিংবা ব্যাঙ..অথবা অন্যকিছু..”।
নাথানের মনে পড়ল নাইট-ভিশন গগলসের ভেতর দিয়ে দেখা দৃশ্যের কথা । প্রাণীগুলো লাফিয়ে আসছে পানি থেকে উঁচু গাছ বেয়ে উঠছে। “আমরা এখানে নিরাপদ নই!” রুদ্ধশ্বাসে বলল সে। আবারো নিচু হতেই তার কাঁধের উপর রাখা একটা হাত তাকে থামিয়ে দিল।
“এটার আর দরকার নেই,” বলল কেলি। “ও মরে গেছে। অন্যদের দিকে ফিরল সে, “আমি দুঃখিত । বিষটা খুব দ্রুত ছড়িয়েছে। অ্যান্টিভেনম ছাড়া এটা সারানো সত্যি…” বিমর্ষ হয়ে মাথা ঝাঁকাল কেলি।।
নাথান তরুণ রেঞ্জারের নিথর দেহের দিকে তাকাল। “ওহ!” উঠে দড়াল সে । “আমাদেরকে সরে যেতে হবে…পানি থেকে অনেক দূরে। আমি জানি না এরা নদী-নালা থেকে ডাঙ্গায় কত দূর পর্যন্ত চলতে পারে, কিন্তু আমি যেটা দেখেছি ওটার ফুলকা দেখা যাচ্ছিল । সেক্ষেত্রে মনে হয়, পানি থেকে দূরে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না ওরা।”
“তাহলে আপনার পরামর্শ কি?” জিজ্ঞেস করল ফ্রাঙ্ক।
“আরও উঁচু কোন জায়গায় চলে যাওয়া উচিত আমাদের। নদী এবং যেকোন ধরনের পানির নালা থেকে দূরে থাকতে হবে। আমার মনে হয় ইন্ডিয়ানরা বিশ্বাস করেছিল শুধুমাত্র নদীর কাছাকাছি থাকলেই বিপদ হবে কিন্তু ঐ পরভোজীরা পানির সরু ধারাটা দিয়ে উঠে এসে ওদের আক্রমণ করে।”
“আপনি এমনভাবে বলছেন, মনে হচ্ছে ঐ প্রাণীগুলো বুদ্ধিমান!”
“না, আমি মনে করি না ওরা বুদ্ধিমান।” নাথানের মনে পড়ল ডলফিনরা কেমন করে পালাচ্ছিল যেখানে নদীর অন্যান্য বড় মাছের একটাকেও কোন বিরক্ত করা হয় নি। তার আরও মনে পড়ল শূকর আর কাঠবিড়ালিটার কথা। একটা যুক্তি ধীরে ধীরে দৃঢ় হয়ে উঠল তার মাথার ভেতর। “হয়ত, ওরা উষ্ণ-রক্তের প্রাণীদেরকেই বেশি পছন্দ করে। আমি জানি না…হয়তো শরীরের তাপমাত্রা বা অন্য কিছুর সাহায্যে ওরা ওদের শিকারকে অন্যদের থেকে অলাদা করতে পারে-হোক সেটা পানি কিংবা নদীর তীরবর্তী এলাকায়।”
ফ্রাঙ্ক ঘুরে দাড়াল ওয়াক্সম্যানের দিকে। “আমার মনে হয়, ডা, রান্ডের কথা শোনা উচিত আমাদের।”
“আমিও তাই মনে করি,” কেলি বলল। সে কর্পোরাল কারের দিকে তাকাল। “এক কামড়েই যদি এমন অবস্থা হতে পারে তাহলে এখানে থাকার ঝুঁকি নেয়াটা ঠিক হবে না।” ফ্রাঙ্কের দিকে তাকাল ওয়াক্সম্যান। “আপনি এই অপারেশনের প্রধান হতে পারেন কিন্তু ব্যাপারটা যখন নিরাপত্তা নিয়ে তখন আমার কথাই শেষ কথা।
প্রাইভেট ক্যারেরা মাথা নিচু করে গোল ঘরটায় ঢুকল। “বাইরে কিছু একটা হচ্ছে। নদী থেকে ভয়ঙ্কর কিছু একটা উঠে আসছে মনে হয়। একটা নৌকা চুরমার হয়ে গেছে।”
শবানোর বাইরে জঙ্গলটা জেগে উঠেছে বানরের চিৎকার আর পাখিদের চেঁচামেচিতে ।
“সুযোগ কমে আসছে দ্রুত, ভীত-সস্ত হয়ে বলল নাথান। “যা করার এখনই করতে হবে। পানির ধারাটা বেয়ে যদি ওরা উঠে এসে উপর থেকে ঝাপিয়ে পড়ে আমাদের …ইন্ডিয়ানদের মত আরও অনেককেই মরতে হবে।” নাথান এবার সমর্থন পেল সবচেয়ে কম সমর্থন পাওয়া জায়গা থেকে। “ডক্টর ঠিকই বলেছেন,” বলল সার্জেন্ট কসটস। “ঐ হারামিগুলোকে দেখেছি আমি। কোন কিছুই ওদেরকে আক্রমণ করা থেকে বিরত করতে পারবে না।” একটা হাত নাড়াল সে। “এই ঠুনকো ঘর তো পারবেই না। বোকার মত আমরা এখানে বসে আছি, স্যার।”
একটু সময় নিয়ে মাথা নেড়ে সায় দিল ওয়াক্সম্যান, মালপত্র গোছানো হোক।” ‘বাইরে লাগানো মোশন-সেন্সরগুলোর কি হবে?” কসটস জানতে চাইল।
“ওগুলো থাকুক ওখানে, এ মুহূর্তে ওগুলো রেখেই যেতে হবে। আমি চাই না বাইরে আর কেউ যাক।”
কসটস ক্যাপ্টেনের আদেশ মেনে ঘুরে দাঁড়াল। কিছুক্ষণের মধ্যেই যার যার ব্যাগগুলো ঘাড়ে ঝুলিয়ে নিল সবাই। দু-জন রেঞ্জার অগভীর একটা কবর খুড়ল কর্পোরাল কঙ্গারের জন্য। ক্যারেরা নিচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে। সে চোখে নাইট-ভিশন গগলস পরে নদী ও জঙ্গলের দিকে লক্ষ্য রাখছে।
“নদীর উত্তাল ভাবটা নেই এখন, কিছু গাছপালার ভেতর থেকে কেমন যেন শব্দ শুনতে পাচ্ছি আমি।” শাবানো থেকে দূরের জঙ্গলটা থমথমে হয়ে আছে ।দরজার কাছে এগিয়ে নাথান এক হাটুর উপরে ভর দিয়ে বসে পড়ল প্রাইভেট ক্যারেরার ব্যাগে। তার সবকিছু গোছগাছ করা হয়ে গেছে এরইমধ্যে, খাটো নলের শটগানটাও ডানহাতে ধরা । “কিছু দেখতে পাচ্ছেন আপনি?”
গগলস জোড়া অ্যাডজাস্ট করে নিল ক্যারেরা। “কিছুই না, কিন্তু জঙ্গলটা এত ঘন যে বেশি দূর পর্যন্ত দেখা যায় না।”
দরজা দিয়ে বাইরে উকি দিল নাথান । ছোট্ট একটা ভাল ভাঙার শব্দ পেল সে। তারপর গায়ে ফোটা দেয়া একটা ছোট হরিণ লাফিয়ে জঙ্গলের বাইরে থেকে এসে দ্রুত দৌড়ে গেল নাথান ও রেঞ্জারের সামনে দিয়ে । কোন বিপদ আছে কিনা এখানে তা বোঝার আগ পর্যন্ত ঘাপটি মেরে রইল দু-জনে। “হায় ঈশ্বর, ক্যারেরা দম ছেড়ে একটু হেসে বলল । হরিণটা গোল ঘরের একপ্রান্তে গিয়ে থামল । কান দুটো এদিক সেদিক নাড়ছে।
“ভাগ!” হাতের এম-১৬ রাইফেল নাড়িয়ে ভয় দেখিয়ে বলল রেঞ্জার ।
ঠিক তখনই গাছ থেকে হরিণের উপরে কিছু একটা পড়ে আটকে থাকল । ব্যথা ও আতঙ্কে চিৎকার দিয়ে উঠল হরিণটা।
“ভেতরে চলে আসুন,” নাথান আদেশ দিল ক্যারেরাকে।
দরজার ভেতর দিয়ে নিচু হয়ে ভেতরে আসতেই নাথান হতের শটগান দিয়ে তাকে আড়াল করে ফেলল। আরও একটা প্রাণী উপর থেকে ঝাপিয়ে পড়ল সেই হরিণের উপর। তৃতীয়টা লাফিয়ে এল গাছের নিচ থেকে। বিক্ষিপ্তভাবে একটু দৌড়ে এক পাশে পড়ে গেল শাবকটি। পাগুলো শুন্যে লাথি মারছে।
পানির ধারার দিকে স্থাপন করা মোশন-সেন্সরটি বেজে উঠল কর্কশ শব্দে । “ওরা এসে পড়েছে এখানে,”চাপাকণ্ঠে বলল নাথান ।
তারপাশে নাইট-ভিশন গগলসটা খুলে ফ্লাশ-লাইটটা জ্বালাল ক্যারেরা। উজ্জ্বল আলো জঙ্গলের পথ ঘড়িয়ে গিয়ে পড়ল নদী অবধি। দু-পাশের জঙ্গল অন্ধকারই থাকল,আলোকরশ্মি তা ভেদ করতে পারছে না। “আমি দেখছি না।”
উপর থেকে কিছু একটা পড়ল ধপ করে, তাদের থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে। প্রাণীটাকে দেখা যাচ্ছে পায়ে ভর দিয়ে দাড়িয়ে আছে, পেছনে লম্বা লেজ নড়ছে এদিকওদিক। ওটা ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে এগিয়ে এল নাথানদের দিকে। এক জোড়া কালো চোখের নিচে মুখটা হা-করা। দাঁতগুলো চকচক করে উঠল উজ্জ্বল আলোতে। অদ্ভুত এই প্রাণীটি দেখতে বড় ব্যাঙাচি আর পিরানহার সঙ্কর বলে মনে হচ্ছে ।
“এটা কি?”? ফিসফিস করে বলল ক্যারেরা। সাথে সাথে তার দিকে লাফিয়ে আসতে শুরু করল ওটা।
দেরি না করে শটগানের ট্রিগার টেনে ধরল নাথান। মুহূর্তেই ছোটছোট গুলির ঝাঁক প্রাণীটিকে ছিন্ন-ভিন্ন করে উড়িয়ে দিল। এ-কারণেই নাথান জঙ্গলে থাকার সময় শটগান রাখতে বেশিই পছন্দ করে। নিখুঁতভাবে তা করতে হয় না বলে বড় জায়গা নিয়ে আঘাত হানতে পারে। বিষাক্ত সাপ, বিচ্ছু, মাকড় এবং নিশ্চিতভাবেই বিষাক্ত উভচরের মত ক্ষুদ্রাকৃতির ভয়ঙ্কর প্রাণীর বিরুদ্ধে শটগান সবচেয়ে জুতসই অস্ত্র। “পেছনে সরে যান, নাথান দরজা বন্ধ করে দিল সাই করে। সামান্য কলাপাতা দিয়ে ঢাকা দরজা ঐ প্রাণীগুলোকে আটকে রাখতে পারব খুবই অল্প সময়ের জন্য। “বেরুনোর তো এই একটাই পথ,”ক্যারেরা বলল।
উঠে দাঁড়িয়ে প্যান্টে গোঁজা বড় ছুরিটা হাতে নিল নাথান। শাবানোতে এমন নিয়ম নেই।” সে একটু দূরে দেয়ালে ঝোলানো একটা তলোয়ার দেখাল, দেয়ালটা নদী এবং জলরাশির বিপরীত দিকে। “যেখানে ইচ্ছে সেখানেই দরজা বানাতে পারবেন আপনি। নাথান ঘরের মাঝখানে যেতেই ফ্রাঙ্ক এবং ওয়াক্সম্যান যোগ দিল সাথে। ওয়াক্সম্যান একটা ফিল্ড-ম্যাপ ভঁজ করছে ।
“ওগুলো এসে পড়ছে এখানে,” বলল নাথান। সে দেয়ালের কাছে পৌছে হাতের ছুরিটা উঁচু করে পাম আর কলা পাতায় বানানো দেয়াল বরাবর কোপ বসাল দ্রুত গতিতে। “এক্ষুণি আমাদেরকে পালাতে হবে এখান থেকে।”
সায় দিল ওয়াক্সম্যান, হাত নেড়ে চিৎকার দিল সে। “সবাই প্রস্তুত হও! এখনই!” ।
নাথান এরইমধ্যে বড় একটা ছিদ্র করে ফেলেছে দেয়ালে। ছুরির বদলে এখন পা দিয়ে আঘাত করে জায়গাটা আরও বড় করে ফেলছে।
ওয়াক্সম্যান কর্পোরাল ওকামোটোকে কিছু একটা ইশারা দিতেই সে এগিয়ে গেল নাথানের দিকে। তার হাতে অপরিচিত একটি অস্ত্র দেখল নাথান। “ফ্রেমথ্রোয়ার, ওকামোটো ওটা একটু উপরে তুলল। “প্রয়োজন হলে ঐ বাস্টার্ডগুলোকে পুড়িয়ে রাস্তা পরিস্কার করব আমরা।” ট্রিগার চাপতেই কমলা রঙের আগুনের এক ফোয়ারা বেরিয়ে এল অটার নল দিয়ে । আগুনের শিখাটা দেখতে কম্পনরত সাপের জিহ্বার মত।
“অসাধারণ!” কর্পোরালের পিঠে চাপড় মারল নাথান। নদীতে এতদিন একসাথে চলার সুবাদে এই বোটম্যানের প্রতি অন্যরকম একটি ভালবাসা তৈরি হয়ে গেছে তার। যদিও এই এশিয়ান কর্পোরালের বেসুরো শিস বাজানোটা এখনো মেজাজ নষ্ট করে দেয়। নাথানকে চোখ টিপে নির্ধিায় সে বেরিয়ে গেল দরজা দিয়ে। সে এগিয়ে যেতেই নাথান দেখল কর্পোরালের পিঠে ছোট্ট একটি ফুয়েল ট্যাঙ্ক।
বাকি চার রেঞ্জার ওয়ারকজ্যাক, গ্রেই, জোন্স এবং কটসও অনুসরন করল তাকে। প্রত্যেকের কাছে এম-১৬ রাইফেল আর গ্রেনেড-লঞ্চার। তারা বের হয়েই দু-জন বামে এবং দু-জন ডান পাশে দাঁড়াল। মাঝখানে ওকামোটো। ঐ দিকটাতে বসানো মোশন-সেন্সরের লেজারে রেঞ্জারের পা পড়তেই উচ্চস্বরে অ্যালার্ম বেজে উঠল।
“এবার সিভিলিয়ানরা বের হবে,” অর্ডার দিল ওয়াক্সম্যান। কাছাকাছি থাকবেন সবাই। একজন রেঞ্জার রাখবেন সবসময় জঙ্গল আর নিজেদের মধ্যবর্তী জঠয়ায়।”
রিচার্ড জেন এবং আনা বের হয়ে এল দ্রুত, তারপর তাদের অনুসরন করল অলিন আর ম্যানুয়েল, তার সাথে টর-টর। সবশেষে কেলি, ফ্রাঙ্ক এবং কাউয়ি। “জলদি কর, নাথানকে বলল কেলি।
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে পেছনে তাকাল সে। ওয়াক্সম্যান শেষ রেঞ্জারদের দিকে তাকিয়ে আছে, এর পেছন থেকে পাহারা দিচ্ছে ওদের রেঞ্জার দু-জন ঘরের মাঝ বরাবর কি একটা কাজে ব্যস্ত।
“এবার চল!” আদেশ দিল ওয়াক্সম্যান।
উঠে দাঁড়াল রেঞ্জাররা, তাদের মধ্যে সামাদ ইয়ামির নামের এক কর্পোরাল বুড়ো আঙুল তুলে সংকেত দিল ওয়াক্সম্যানকে । এই কর্পোরাল কথা বলে না বললেই চলে, আর যখন বলে কণ্ঠে থাকে পাকিস্তানি টান । নাথান ইয়ামির সম্পর্কে আরেকটি তথ্য জানে : সে তাদের ইউনিটের ডেমোলিশন এক্সপার্ট । কোন কিছু ধবংস করার কাজে সিদ্ধহস্ত। রেঞ্জার দু-জনের পেছনে মাটিতে রাখা বস্তুটিকে সন্দেহের চোখে দেখতে লাগল নাথান।
নাথানকে তাকিয়ে থাকতে দেখল ওয়াক্সম্যান। ক্যাপ্টেন তার রাইফেল উচিয়ে ধরল পুড়িয়ে ফেলা দেয়ালটার দিকে। বাইরে থেকে নিমন্ত্রণ পাবার অপেক্ষা করছেন নাকি, ডা. রান্ড”
ঠোঁট কামড়ে ধরল নাথান। তারপর ঘর থেকে বেরিয় গেল ফ্রাঙ্ক ও কেলির পিছুপিছু। প্রাইভেট ক্যারেরাকে আবারো তার পেছনে আসতে দেখল। সে-ও ফ্রেম থ্রোয়ারের পোশাক পরেছে । চারপাশের গভীর ও অন্ধকার জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে আছে সে চোখ সরু করে। তার থেকে আরো পেছনে, ওয়াক্সম্যান আর ইয়ামির হেটে আসছে। তারাই শাবানো ত্যাগ করা সর্বশেষ সদস্য।
“কাছাকাছি থাকুন সবাই!” হাঁক দিল ওয়াক্সম্যান। “বিপদ দেখলেই আক্রমণ হবে…হয় গুলি, না-হয় আগুন।”
নাথানের পেছন থেকে কথা বলে উঠল ক্যারেরা। “আমরা একটা পাহাড়ে উঠতে যাচ্ছি..প্রায় কিলো মিটার সামনে।”
“আপনি কিভাবে জানেন ওটা ওখানে আছে?
টপোগ্রাফিক ম্যাপে দেখেছি,” অনিশ্চয়তাপূর্ণ কণ্ঠে বলল সে। নাথান তার দিকে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকিয়ে পড়ল। গলার স্বর নিচু করে মাথা নেড়ে সায় দিল ক্যারেরা। “পানির এই ধারাটা ম্যাপে নেই, তাই পাহাড়টার ব্যাপারেও নিশ্চিত হতে পারছি না।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলল নাথান। ম্যাপে এমন ভুল থাকে বলে আবাক হল না। ঘন জঙ্গলজুড়ে এই পানি-পথগুলোকে ছকে বাধা অসম্ভব যেখানে বৃষ্টির সাথে সাথে হ্রদ এবং জলাভূমির গতিপথও পরিবর্তিত হয়। তুলনামূলক ছোটনদী ও পানির ধারাগুলো আরও বেশি হারে গতিপথ পরিবর্তন করে। এ-কারণে, ওদের বেশির ভাগেরই কোন নাম নেই, উল্লেখ থাকে না কোন তালিকায়ও। কিন্তু পাহাড়ের বিষয়টা আলাদা। ওটা নিশ্চয় ম্যাপে আছে।
“চলতে থাকুন সবাই,” ওয়াক্সম্যান তাড়া দিল পেছন থেকে ।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই ঘন জঙ্গলে ঢুকে পড়ল। চারপাশে চোখ বুলাল নাথান, কান খাড়া করে রেখেছে, বিপজ্জনক কিছু যদি শোনা যায়। একটু দূরেই পানি ছুঁয়ে যাওয়ার শব্দ কানে এল। ইন্ডিয়ানদের কথা মনে পড়ে গেল তার। কাছের রাস্তাটা দিয়েই ওরা পালাচ্ছিল, পাশেই ছিল পানির ধারা। একটুও জানত না বিপদ কত কাছেই ঘাপটি মেরে আছে। জানত না সামনে অপেক্ষা করতে থাকা মৃত্যুর কুঞ্চ। ফ্রাঙ্ক এবং কেলির পেছনে দীর্ঘ পদক্ষেপে হাটছে নাখান। আগুনের একটা শিক্ষা ঝলকানি দিয়ে উঠল একেবারে সামনে। কর্পোরাল ওকামোটো সবাইকে পথ দেখাচ্ছে। নদী থেকে দূরে, সামান্য ঢালু জায়গা দিয়ে হাটতে হাটতে নিজেদের ভেতরে কিছু কথাবার্তা হল। তবে সবার চোখ চারপাশের জঙ্গলের দিকে ।।
বিশ মিনিটের মত হাটার পর ওয়াক্সম্যান তার পাশের রেজারকে আদেশ দিল, “মোমবাতি জ্বালাও, ইয়ামির ”
ঘুরে দাঁড়াল নাথান, তার কাছে মনে হল ওয়াক্সম্যান অন্য কিছু করতে বলছে রেঞ্জারকে। সই করে ঘুরে দাঁড়াল ইয়ামির, যে-পথ দিয়ে হেটে এসেছে সেদিকে মুখ করে। হাতের এম-১৬ রাইলেফল কাঁধে ঝুলিয়ে কিছু একটা হাতে নিল সে।
“রেডিও ট্রান্সমিটার,” বলল ক্যারেরা।
ইয়েমি উঁচু করে ধরল হাতের যন্ত্রটা তারপর পিটপিট করে লাল আলো জ্বলতে থাকা একটা সুইচে চাপ দিল।
ভ্রু কুচকালো নাথান। “এটা কি?”
বুম করে একটা চাপা শব্দ হল সঙ্গে সঙ্গে। বনের একটা অংশ উড়ে গেল শূন্যে! বিশাল আকৃতির আগুনের কুণ্ডুলি উঠে গেল রাতের আকাশে। হতভম্ব হয়ে নাথান একপা পেছনে সরে গেল। বিস্ময়ে চিৎকার ভেসে এল সিভিলিয়ানদের কাছ থেকে। নাথান দেখল, আগুনের উর্ধ্বমুখি কুণ্ডুলি মিইয়ে যেতে শুরু করেছে। তবে এরইমধ্যে জ্বালিয়ে দিয়েছে বনের অনেকখানি জায়গা। লাল রঙের ভয়ঙ্কর লেলিহান শিখার ভেতর দিয়ে বনের পরিস্কার হয়ে যাওয়া অংশটি দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। প্রতিটি গাছের ডাল-পালা আর পাতা পুড়ে গেছে। অন্তত এক একর জায়গাজুড়ে তো হবেই। শাবানোর কোন চিহ্নই নেই ওখানে। এমনকি কর্কশ শব্দে বাজতে থাকা মোশন-সেন্সরগুলোও থেমে গেছে, পুড়ে গেছে আগুনের তীব্রতায় । নাথান এতটাই নির্বাক হয়ে পড়ল যে কোন কথা বলতে পারল না। কিন্তু ক্রোধে উন্মত্ত চোখ দুটো দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইল ওয়াক্সম্যানকে।
ওয়াক্সম্যানও তাকাল তার দিকে। তারপর সবার উদ্দেশ্যে হাত নাড়ল সে। “হাটতে থাকুন ।”
ক্যারেরা সামনে এগিয়ে যাবার জন্য ইশারা করল নাথানকে। “ফেইল-সেইভ পদ্ধতি এটা । পেছনে যা আছে জ্বালিয়ে দাও সব-এটাই এই পদ্ধতির আসল কথা।”
“কি বিস্ফোরিত হল?” জিজ্ঞেস করল কাউয়ি। “নাপাম বোমা,” কর্পোরাল জবাব দিল নিরস ভঙ্গিতে। “জঙ্গলের নতুন অস্ত্র।”
“কেন আমাদেরকে আগে বলা হল না…অন্তত একটা সংকেত?” পেছন থেকে হনহন করে হেটে সামনে এসে ফ্রাঙ্ক বেশ জোরেই বলল কথাটা।
“ওটা আমার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমি-ই আদেশ দিয়েছি। উত্তর দিল ওয়াক্সম্যান। “এ ব্যাপারে কাউকে কোন কৈফিয়ত দিতে চাই না আমিনিরাপত্তার বিষয়টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে।”
“আমি সাধুবাদ জানাই এটাকে, ক্যাপ্টেন,”লাইনের সামনের দিক থেকে বলে উঠল রিচার্ড জেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি আপনার কাজের প্রশংসা করছি। আশা করি, ঐ বিষাক্ত প্রাণীগুলো সব মরেছে এবার।”
“এতে কাজ হবে বলে মনে হচ্ছে না,” অলিন বলল সরু চোখে। তারপর পাশের একটা দিক দেখাল সে । আগুন থেকে ছড়িয়ে পড়া আলোতে দেখা যাচ্ছে ওটা। পানির একটা ধারা তাদের থেকে সামান্য একটু দূর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, ওখানকার পানি আন্দোলিত হচ্ছে লাফিয়ে চলা একধরণের ছোটখাট প্রাণীর ছোটাছুটিতে। সংখ্যায় হাজারহাজার । ঘোলা পানির একটা উদগীরণ উঠে এল নিচ থেকে। স্যামন মাছের ডিম ছাড়ার মত। “জোরে জোরে হাটুন!” চিৎকার দিল ওয়াক্সম্যান। “উঁচু কোন জায়গায় উঠতে হবে আমাদেরকে।”
হাটার গতি বেড়ে গেল দলটির। ঢালু জায়গা বেয়ে খুব দ্রুত পা চালাতে লাগল সবাই। চারপাশের জঙ্গলের দিকে খেয়াল বাদ দিয়ে মনোযোগ এখন হাটার গতির দিকে। প্রাণীগুলোও এগিয়ে চলেছে তাদের ডানপাশ দিয়ে। আগুনের ঝলকানিতে কিছু একটা দেখে চিল্কার দিয়ে উঠল সবার সামনের লোকটি।
আবারো পানি পেয়েছি এখানে!” বলল ওকামোটো । সবাই ছুটে গেল তার দিকে। “হায় ঈশ্বর,” বলল কেলি।
প্রায় চল্লিশ মিটার সামনে পানির আরেকটি ধারা তাদের পথে বাধা হয়ে চলে গেছে। দশ মিটারের মত চওড়া হবে ধারাটা, কিন্তু ওটার পানি ভয়ঙ্কর রকমের অন্ধকার আর শান্ত । অপর প্রান্ত থেকে বনটা সোজা গিয়ে মিশেছে সামনের ছোট পাহাড়টায়, ওটাই তাদের গন্তব্য।
“এটাও কি ঐ একই পানির ধারা?” জিজ্ঞেস করল ফ্রাঙ্ক।
রেঞ্জারদের মধ্যে জারগেনসেন সবাইকে ঠেলেঠুলে সামনে এগিয়ে গেল। তার নাইট-ভিশন গগলস জোড়া হাতে। “আমি জায়গাটা ভাল করে দেখেছি। এটা আরেকটা বড় ধারার শাখা, এখান থেকে বয়ে গিয়ে মিশেছে আরেকটার সাথে ।”
“ধ্যাত!” তীব্র ক্রোধে মুখ থেকে কথাটা বেরিয়ে গেল ওয়াক্সম্যানের। “শালার এই জায়গাটার সবদিকেই পানি!” “যদি পারি তো পার হয়ে যাওয়াই উচিত,” বলল কাউয়ি। “ঐ প্রাণীগুলো খুব জলদি এ-পথ ধরে চলে আসবে।”।
ওয়াক্সম্যান শঙ্কিত চোখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বয়ে চলা জলরাশির দিকে। সে ওকামোটোর দিকে ঘুরল। “আলোটা জ্বালাও।”
রেঞ্জার ফ্রেমথ্রোয়ারের ট্রিগার টেনে ধরল পানির দিকে তাক করে। এতে অবশ্য অন্ধকার পানির তলায় কিছু আছে কিনা তা বোঝা গেল না খুব একটা। “স্যার, প্রথমে আমিই যাই,” বলল ওকামোটো। “দেখি নিরাপদে পার হওয়া যায় কিনা।”
“সাবধানে, বাবা।
“অবশ্যই, স্যার।” লম্বা একটা দম নিয়ে বুকে কপালে ক্রুশ করে নেমে গেল পানিতে । একটু হেটে সামনে এগোল ধীরে ধীরে। তার অস্ত্রটা বুক সমান উঁচু করে রেখেছে। “স্রোতটা খুব ধীরে যাচ্ছে, আস্তে করে বলল। “কিন্তু জায়গাটা গভীর।” অর্ধেকটা যেতেই কোমর পর্যন্ত ডুবে গেল সে। “জলদি!” বিড়বিড় করে বলল ফ্রাঙ্ক।
অবশেষে পানি ছেড়ে ডাঙ্গায় উঠে গেল রেঞ্জার। মুখে বড় একটা হাসি ফুটিয়ে সবার দিকে ঘুরল সে। “এটা নিরাপদই মনে হচ্ছে।”
“এখন পর্যন্ত,” বলল কাউয়ি। “তাড়াতাড়ি করতে হবে আমাদের।” “শুরু করা যাক!” আদেশ দিল ওয়াক্সম্যান।
দল বেধে পানিতে নামল সবাই ফ্রাঙ্ক ধরে আছে কেলির হাত, আনা ফঙকে সাহায্য করছে নাথান।
“আমি ভাল সাঁতারু নই কিন্তু,” বিড়বিড় করে বলল আনা।
রেঞ্জাররা সাবার পেছনে। অস্ত্রগুলো মাথার উপর উঁচু করে জলরাশি পার হচ্ছে । সবার সামনের দলটি ঢালু পাড়ে উঠে গেছে ইতিমধ্যে। একদিকে ভেঁজা বুট, অপর দিকে গতকালের বৃষ্টি, সব মিলিয়ে কর্দমাক্ত আর পিচ্ছিল জায়গাটা দিয়ে হাটা বেশ বিপজ্জনক।
অন্ধকার ফুড়ে এগিয়ে এল জারগেনসেন, হাতে নাইটভিশন। “ক্যাপ্টেন,” বলল সে, “আরও একটা পানির ধারা দেখেছি আমি পাশেই, ওটার পানিও খুব শান্ত মনে হল। আর একটাও প্রাণী দেখলাম না কোথাও।”
“তারা অবশ্যই ধারেকাছে কোথাও আছে,” নাথান বলল । “হয়তো শিকার ধরার খেলাটা খেলছে না, এই যা।”
“অথবা হতে পারে আগুনের কারণে ওগুলো নদীতে ফিরে গেছে, কণ্ঠে আশা ফুটিয়ে জারগেনসেন বলল।
ওয়াক্সম্যান ভ্রু কুঁচকালো। আমি মনে করি না আমদের উচিত হবে।”
একটা তীক্ষ চিৎকারে বাধা পড়ল ক্যাপ্টেনের কথা। তাদের বা-পাশে পিচ্ছিল ও কাদাময় ঢালে পড়ে গেল এক রেঞ্জার এডি জোন্স । পড়ে যাওয়াটা ঠেকাতে হাত দিয়ে বাধা দিতেই মুচড়ে গেল সেটা।
“ধ্যাত!” তীব্র হতাশায় চিৎকার দিল সে। একটা ছোট গাছ ধরে সামনে এগোতে চাইল কিন্তু একটু টান দিতেই শেকড়সহ ওটা উঠে এল নরম মাটির কারণে। ধপ করে ঢালু পাড়ে পড়ে গিয়ে গড়াতে থাকল নিচের দিকে। তার হাত থেকে অস্ত্রটাও ছিটকে গেল। তারপরই সে পড়ে গেল পানিতে। ব্ল্যাক জ্যাক এবং দ্ৰেইস নামের দু-জন রেঞ্জার দৌড়ে গেল তাকে সাহায্য করতে । দ্রুত নিজের ভারসাম্য খুঁজে পেয়ে উঠে দাঁড়াল সে। কিন্তু তার আগেই পানি খেয়ে নিয়েছে কিছুটা। ফলে খকখককরকাশছে।
“অসহ্য!” বেশ কষ্ট করে পাড় পর্যন্ত নিজের শরীরটা টেনে আনল। “শালার জঙ্গল একটা!” মাথার হেলমেটটা সোজা করতে করতে আরও বৈচিত্রপূর্ণ কিছু গালি দিল সে।
“ধীরে জোন্স…খুব ধীরে,” রাকজ্যাক বলল হাঁতের লাইটটা ভেজা রেঞ্জারের দিকে এগিয়ে দিল। “জঙ্গলে স্কি খেলা হলে সে খেলায় আমি দশে পুরোপুরি দশ দিতাম তোমায়।”
“নম্বর তোমায় পাছায় ভরে রাখ,” রেগেমেগে বলল জোন্স। নিচু হয়ে ঝুঁকে প্যান্টে লেগে থাকা দড়ির মত লম্বা আঠালো শৈবাল ছাড়াতে লাগল এবার। তার বিরক্তি এখন চরম পর্যায়ে পৌছে গেছে।
ঠিক তখনই কিছু একটা ভেজা রেঞ্জারের ব্যাকপ্যাকের উপর দিয়ে বেয়ে উঠতে লাগলে সবার আগে গ্রেউত্সই ওটা দেখল। “জোন্স!” কুঁজো অবস্থাতেই মাথা তুলল সে, “কি?”
প্রাণীটা লাফ দিয়ে জোন্সের চোয়ালের নিচের নরম মাংসে কামড় বসিয়ে দিল। সাথে সাথে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল জোন্স। “এটা আবার কি?” প্রাণীটাকে গলা থেকে টান দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে এল সে। সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ছুটল ফিনকি দিয়ে। “আ…হ..!”
আরও ডজনখানেক লাফানো প্রাণীর আগমনে পানির ছোট ধারাটা জীবন্ত হয়ে উঠল যেন । ওরা পানি থেকে লাফিয়ে জোন্সের পায়ের উপর এসে পড়ল। পেছন দিকে পড়ে গেল জোন্স। তীব্র যন্ত্রণায় বেঁকে গেল তার মুখ । জোরে শব্দ করে পানিতে পড়ে গেল সে।
“জোন্স!” রাকজ্যাক এগিয়ে গেল আরেকটু।
পানি থেকে আরও একটা প্রাণী লাফিয়ে এসে কর্পোরালের পায়ের কাছে এসে পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে সরে গেল গ্রেইডস। অগভীর পানিতে জোনস ছটফট করতে লাগল । উদভ্রান্তের মত হাত-পা ছুড়ছে সে।
“পেছনে সরে যাও!” চিকার দিল ওয়াক্সম্যান।“দৌড়াও সবাই!”
রাকজ্যাক এবং গ্রেই পানির কাছ থেকে দৌড়ে চলে যেতে শুরু করল। আরও প্রাণী আসতে থাকল লাফিয়ে-ঝাপিয়ে। দলের সবাই পড়িমড়ি করে ছুটতে শুরু করে দিল উপরের দিকে। কেউ কেউ চার হাত-পা দিয়ে আগাচ্ছে পিচ্ছিল জায়গাটা বেয়ে ওঠার জন্য। এমন সময় হঠাৎ কেলির কর্দমাক্ত হাতটা ছুট গেল তার ভাইয়ের হাত থেকে, সঙ্গে সঙ্গে পা ফসকে পড়ে যেতেই ঢালু জায়গা দিয়ে গড়িয়ে নিচে নামতে করল সে।
“কেলি!” চিঙ্কার দিল ফ্রাঙ্ক।
নাথান মেয়েটা থেকে মাত্র দুই মিটার দূরে। সে বিদ্যুৎগতিতে ঝুঁকে ওর কোমরটা ধরে ফেলল একহাতে। অন্যহাতে শটগানটা নিয়ে সে-ও পড়ে গেল কেলির উপর। ম্যানুয়েল এগিয়ে এল সাহায্য করতে। সে নিচু হয়ে দু-জনের পা ধরে টানতে থাকল উপরের দিকে। টর-টরটা উদ্বিগ্ন হয়ে এদিক-সেদিক ছোটাচ্ছুটি করছে তার পেছনে। ব্রাজিলিয়ান তার জাগুয়ারকে ইশারা করল : “সরে যাও ওখানে থেকে সবাই কম-বেশি দূরে চলে যাওয়ায় তারা তিনজনই পেছনে এখন। ফ্রাঙ্ক কয়েক মিটার দূরে অপেক্ষা করছে তাদের জন্য । শুধুমাত্র প্রাইভেট ক্যারেরা আছে তাদের সাথে। পেছনে দাঁড়িয়ে ফ্লেম-থ্রোয়ার থেকে আগুনের লেলিহান শিখছড়াচ্ছে সব দিকে।
“তাড়াতাড়ি উঠতে হবে,” একটু ঢালুতে নেমে তাদের উপর সতর্ক নজর রেখে চিন্তিত গলায় বলল সে।
“ধন্যবাদ,”বলল কেলি। দলের বাকি সদস্যের দিকে তাকাল। ফ্রাঙ্ক এগিয়ে এসে বোনের হাতটা আবার ধরল।“এমনটা আর করো না।” “আমি তো ইচ্ছে করে করি নি।” নাথান পেছনে তাকাল। ক্যারেরা তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখেমুখে ভয়। যা ঘটছে তা দেখে ভীত হয়ে পড়েছে সে। হঠাৎ একটা প্রাণী ঝোপ থেকে লাফ দিল তার উপরে। আগুনের শিখা ঠেকাতে পারল না ওটাকে। পেছনে পড়ে গেল ক্যারেরা । আগুনের শিখা উঠে গেল উপরের দিকে। প্রাণীটা ক্যারোর বেল্টের সাথে লেগে আছে কিন্তু জায়গাটা কামড় বসানোর উপযোগী না হওয়ায় শরীরটা বেঁকিয়ে ধরল মাংসবহুল কোন জায়গা পাবার জন্য। কারো কোনরকম প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই সপাং করে একটা শব্দ হতেই প্রাণীটা দু-টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল দু-দিকে। ক্যারেরা ও নাথান দু-জনেই ঘুরে দাঁড়াল, দেখল ম্যানুয়েল তার ছোট চাবুকটা ব্যবহার শেষে আবারো ছোড়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে।
“এখনও কি বোকার মত ওখানে বসে থাকবেন?” চট করে বলল ম্যানুয়েল । নাথানের সাহায্যে উঠে দাঁড়াল কেলি। এখন সবাই দ্রুত পাহাড় বেয়ে উঠছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পৌছে গেল চুড়ায়। নাথান আশা করল হিংস্র প্রাণীগুলো আর তাদের মধ্যেকার ঢালু পথের এই দূরত্বটা ভালভাবেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে।
“আমাদের আরো এগিয়ে যাওয়া উচিত,” বলল সে। তাদের সাথে যতটা দূরত্ব রাখা যায় ততই ভাল।”
“তত্ত্বটা বেশ ভাল,” বলল কাউয়ি। “কিন্তু সেটাকে বাস্তবে রূপ দেয়া সম্পূর্ন ভিন্ন বাপার।” শামান দূরে, পাহাড়ের পাদদেশের দিকে আঙুল তুলে দেখাল।
সেদিকে তাকাল নাথান । এরকম উচ্চতা থেকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে পানির আরেকটি ধারা প্রবাহিত হচ্ছে পাহাড়ের অপরপ্রান্ত দিয়ে। নাথান তাদের ঘোরতর বিপদের কথা বুঝতে পারছে বেশ ভাল করেই। মারাত্মক একটা ভুল করে ফেলেছে তারা। পানির ছোট যে ধারাটি তারা পার হয়ে এসেছে সেটা বড় কোন নদীতে গিয়ে শেষ হয় নি, ওটা আসলে এই ধারাটারই একটি অংশ।
“একটা দ্বীপের উপর আমরা এখন,” কেলি বলল আতঙ্কের সাথে ।
নাথান উপর থেকে পানির ধারাটি দেখল ভাল করে । পাহাড়ের একটি পাদদেশ পর্যন্ত এটা একটা ধারা হিসেবেই বয়ে যাচ্ছে কিন্তু তারপরই ধারাটা দুটো শাখায়ভাগ হয়ে বয়ে গেছে পাহাড়ের দু-পাশ দিয়ে। কিছুটা পথ গিয়ে আবার ওরা মিলিত হয়ে রুপ নিয়েছে একক ধারায় । দলটি আক্ষরিক অর্থেই একটা দ্বীপের উপর এখন চারপাশে মৃত্যু-ভয়ঙ্কর জলধারা। অসহায় অনুভব করল সে।
“আমরা ফাঁদে আটকা পড়ে গেছি।”
* * * *
দুপুর ০২:০২
ইন্সটার ইন্সটটিউিটের ওয়েস্ট-উইঙ্গ ল্যাঙ্গলে,
ভার্জিনিয়া
লরেন ওব্রেইন এক কাপ কফি নিয়ে বসে আছে কমিউনাল গ্যালের ছোট্ট একটি টেবিলে। কর্মব্যস্ততা শেষে এই জায়গাটা লরেনের একেবারে নিজস্ব। এখন কোয়ারেন্টাইনে থাকা
বাকিসব এমইডিইএ সদস্যরা হয়তো তাদের অস্থায়ী বেডরুমে ঘুমাচ্ছে অথবা কেউ কেউ কাজ করছে মূল ল্যাবরেটারিতে। এমনকি মার্শালও কাজে ক্ষান্ত দিয়ে নিজের রুমে চলে গেছে জেসিকে নিয়ে। আগামীকাল খুব সকালে তার একটা কনফারেন্স কল-এ বসতে হবে সিডিসি, দুই ক্যাবিনেট প্রধান এবং সিআইএর ডিরেক্টরদের সাথে। সে সুন্দরভাবে মিটিটাকে আখ্যায়িত করেছে রাজনৈতিক দলাদলি ছড়িয়ে পড়ার আগেই আঘাত হানার ব্যবস্থা হিসেবে। এই হল সরকারের অবস্থা। শক্তহাতে সমস্যা মোকাবেলা করার দিকে মনোযোগ না দিয়ে তারা ব্যস্ত আছে একে অপরকে দোষ দিয়ে নিজের দোষ ঢাকতে । আগামীকাল মার্শালের উদ্দেশ্য হল জনগনের ধ্যাণ-ধারণায় ব্যাপক একটি পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করা । একটা নিস্পত্তিমূলক কর্ম-পরিকল্পনা দরকার। এখন পর্যন্ত পনেরটি অঞ্চলে রোগ ছড়িয়ে পড়েছে, আর সেগুলো ম্যানেজ করা হয়েছে পনেরটি ভিন্ন ভিন্ন পন্থায়। ব্যাপারটা বেশ বিভ্রান্তিকর।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেবিলের উপর স্তুপকৃত ফাইল ও প্রিন্ট করা কাগজগুলোর দিকে তাকাল লরেন। তার দলটি খুব সহজ একটি প্রশ্নের জবাব খুজে যাচ্ছে এখনো-কিসের কারণে রোগটা হচ্ছে?
পরীক্ষা এবং গবেষণা এখনো অব্যাহত আছে পুরো দেশজুড়ে। আটলান্টার সিডিসি থেকে একেবারে স্যান ডিয়েগোর সল্ক ফ্যাসিলিটি পর্যন্ত। কিন্তু ইন্সটার ইন্সটিটিউট হয়ে উঠেছে এই রোগ বিষয়ক সব কাজের প্রাণকেন্দ্র। ডা. শেলবির করা একটি রিপোর্ট ঠেলে সরিয়ে রাখল লরেন। রিপোর্টটি কৃত্রিম উপায়ে কোষ বিভাজনের মাধ্যম হিসেবে বানরের কিডনি-কোষ ব্যবহারবিষয়ক । ব্যর্থ হয়েছে সে। এখনো পর্যন্ত এই ছোঁয়াচে রোগটি সবরকম সনাক্তকরন থেকে দূরে আছে। অ্যারোবিক এবং অ্যারোবিক কালচার, পলিমারেইজ চেইন রিঅ্যাকশন, সবরকম পরীক্ষাই ব্যর্থ হয়েছে। আজকের দিন পর্যন্ত কোন সফলতা পায় নি কেউ প্রতিটি গবেষণাই একই রকম মন্তব্য দিয়ে শেষ হয়েছে : নেতিবাচক ফলাফল । শূন্য মাত্রার বৃদ্ধি। অসম্পূর্ন গবেষণা। ব্যর্থতা প্রকাশে যতসব বাহারি উক্তি!
এতক্ষণে ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া কফি মগের পাশে রাখা তার বিপরিটা গুঞ্জন করে ভাইব্রেট করতে লাগলো । ছো মেরে এটা নিয়ে সে নিল টেবিলের ওপর থেকে।
“এত রাতে আমায় ডাকছে কোন পাগলে?” বিড়বিড় করল বিপারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। কলারের নাম্বারের জায়গায় উঠেছে এক নাম লার্জ-স্কেল বায়োলজিক্যাল ল্যাবস। লরেন এই সংস্থাটি চেনে না তবে এরিয়া-কোড দেখে মনে হচ্ছে উত্তর-ক্যালিফোর্নিয়ার কোখাও হবে। কলটা হয়তো কোন টেকনিশিয়ান করেছে, তাদের ফ্যাক্স নাম্বারটা চাইবে হয়তো, কিংবা কোন রিপোর্টের বিষয়ে খসড়া পাঠাবে।
উঠে দাঁড়াল লরেন, পকেটে রাখল বিপারটা, দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা ফোনের কাছে গেল সে। রিসিভারটা তুলতেই তার পেছনের দরজা খোলার শব্দ পেল। মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখতে পেলো জেসিকে। খুব অবাক হল সে । গায়ে নাইটড্রেস, ভেজা চোখ দুটো ডলছে।
নানু…”
রিসিভারটা রেখে মেয়েটির কাছে গেল লরেন। “সোনা, তুমি এখানে কি করছ? তোমার তো বিছানায় থাকার কথা।”
“আমি তোমায় খুঁজে পাচ্ছি না।”
সে হাটু গেঁড়ে ছোট মেয়েটার সামনে বসে পড়ল। “কি হয়েছে? স্বপ্নে ভয়ের কিছু দেখেছ আবারো?” এখানে প্রথম কয়েকটা রাত দূঃস্বপ্ন দেখে দেখে জেগে উঠেছে জেসি। অপরিচিত জায়গায় এমন আবদ্ধ থাকার কারণে হয়েছিল ওটা। কিন্তু খুব দ্রুতই সে মানিয়ে নিয়েছে, বন্ধুত্ব করে নিয়েছে অন্য শিশুদের সঙ্গে।
“আমার পেট ব্যাথা করছে,” সে বলল। তার চোখজোড়া ছলছল করছে ভয়ের অশ্রুতে।
“ওহ সোনামনি, এ-কারণে এত রাতে আইসক্রিম খেতে চলে এসেছ,” লরেন আরো কাছে গিয়ে মেয়েটিকে টেনে জড়িয়ে ধরল।“একগ্লাস পানি খাও, তারপর তোমাকে আবার বিছানায়…..
লরেনের কণ্ঠ রোধ হয়ে এল যখন বুঝল মেয়েটার শরীর কি পরিমাণ গরম ।সে এক হাতের তালু রাখল জেসির কপালে। “ওহ, ঈশ্বর!” অস্ফুটস্বরে বলে উঠল সে। জ্বরে পুড়ে যাছে মেয়েটা।
* * * *
রাত ২:৩১
আমাজন জঙ্গল
লুই তার তাবুর পাশে দাঁড়িয়ে আছে, এমন সময় জ্যাক লম্বা পা ফেলে নদীর দিক থেকে চলে এল । তার লেফটেন্যান্ট ভেঁজা কম্বলে জড়ানো কিছু একটা বহন করছে। জিনিসটা যা-ই হোক একটা তরমুজের থেকে বড় হবে না ওটার আকার।
“ডক্টর,” মারুন গোত্রের লোকটি বলল কঠিন গলায় ।
“জ্যাক, কি আবিষ্কার করলে?” সে এই লোকটাকে সাথে আরও দু-জনকে দিয়ে পাঠিয়ে ছিল মাঝরাতের ঠিক পর পর হওয়া বিস্ফোরণের ব্যাপারে তদন্ত করতে । রাতে বনের মধ্যে ক্যাম্প করে প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর বিস্ফোরণের তীব্র শব্দে আবার জেগে ওঠে তারা। এর আগে সূর্যাস্তের সময় ইন্ডিয়ান শাবানো ও তার অধিবাসীদের করুণ পরিণতির কথা জানতে পেরেছে লুই। তার কয়েক ঘণ্টা পরই এই বিস্ফোরণ….
কি ঘটে চলেছে ওখানে?
“স্যার, গ্রামটা আগুনে পুড়ে গেছে…সাথেটার আশ-পাশের বেশ খানিকটা জঙ্গলও। তখনও যে আগুনটুকু ছিল তা বেশ তীব্র হওয়ায় খুব বেশি কাছে যেতে পারি নি। সম্ভবত কাল সকালের ভেতর…”
অন্য দলটার কি খবর?” মাথা নিচু করে পায়ের দিকে তাকাল জ্যাক। “চলে গেছে, স্যার। আমি ওদের পিছু পিছু যাওয়ার জন্য ম্যালাকিম এবং টডিকে নদীপাড়ের কাছাকাছি রেখে এসেছি।” একটা হাত মুষ্টিবদ্ধ করল লুই, অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাস দেখানো ঠিক হয়নি তার। একজন সৈন্যকে সফলভাবে অপহরণ করার পর নিজের শিকার নিয়ে যথেষ্ট আত্মতুষ্টিতে ছিল সে, কিন্তু এই হল অবশেষে। নিশ্চিতভাবেই ওদের উপর নজরদারি করতে থাকা কাউকে দেখে ফেলেছে ওরা। আর এখন, শেয়াল পরিণত হয়েছে শিকারী কুকুরে। লুইর মিশনটা আরও অনেক কঠিন হয়ে গেল। বাকি সবাইকে জড়ো কর। রেঞ্জাররা যদি কিছু টের পেয়ে আমাদের থেকে সরে গিয়ে থাকে তবে কোনভাবেই ওদেরকে খুব বেশি দূরে যেতে দেওয়া যাবে না।”
“জি, স্যার। কিন্তু আমি ঠিক নিশ্চিত নই, ওরা আমাদের থেকে পালিয়ে যাচ্ছে কিনা।”
“কি কারণে এমনটা ভাবছ?”
“আমরা নদী ধরে আগুন জ্বলতে থাকা জায়গাটায় যখন গেলাম দেখলাম পাশের আরেকটা পানির ধারা দিয়ে একটা মৃতদেহ ভেসে যাচ্ছে।”
“মৃতদেহ?” লুই ভয় পেল। ওটা তারই কোন গুপ্তচরের হবে, যাকে মেরে পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে ওদেরকে সতর্ক বার্জ দেবার জন্য।
জ্যাক হাতে মুড়িয়ে রাখা ভেঁজা কম্বলটা খুলে ওটার ভিতরের জিনিসটা পাতা বিছানো জঙ্গলের মাটিতে ফেলল-একটা মানুষের মাথা। “আমরা এটা পেয়েছি, শরীরের অন্যান্য অংশের কাছেই ভাসছিল এটা।” ঐ কুঁচকে হাটু গেড়ে বসল লুই । মাথাটা ভাল করে পরীক্ষা করুল। খুব সামান্যই বাকি আছে ওটার। মুখের সবটুকুই ছিড়ে নেয়া, কিন্তু মাথার শেভ করা উপরিভাগটা দেখে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে ওটা কোন রেঞ্জারের।
“লাশের বাকি অংশও এরকমই,” বলল জ্যাক। “অল্প কিছু হাঁড় অবশিষ্ট আছে।” উপরের দিকে তাকাল লুই। কি হয়েছিল ওর?”
“কামড়ানোর ক্ষত দেখে মনে হচ্ছে পিরানহা ।”
“নিশ্চিত তুমি?”
“তা বলতে পারেন।” জ্যাক মুণ্ডুটার ক্ষত-বিক্ষত নাকের অর্ধেক অংশের উপর আঙুল বুলাল। লুইয়ের মনে পড়ে গেল, বালক বয়সেই তার এই লেফটেন্যান্ট নদীর এসব ভয়ঙ্কর পরভোজী প্রাণীদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
“ওরা কি লোকটা মারা যাবার পর ছিড়ে খাচ্ছিল?”
কাঁধ তুলল জ্যাক। “তা যদি না-হয়ে থাকে তবে হতভাগাটার জন্য দুঃখই হচ্ছে আমার।”
সোজা হয়ে দাঁড়াল লুই, তারপর তাকাল নদীর দিকে।“শালার হচ্ছেটা কি ওদিকে?”
