খামখেয়ালি সভা
প্রথম জীবনের বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে এখনও মনে আছে খামখেয়ালি সভার কথা।[১] ঘনিষ্ঠজনদের নিয়ে অনেকটা অপ্রাতিষ্ঠানিক ধরনের এ ক্লাবটির মূল উদ্যোক্তা ছিলেন বাবা ও চাচাত ভাই বলেন্দ্রনাথ। এর কোনো গঠনতন্ত্র বা কোনো নিয়মনীতি দ্বারা বাঁধাধরা সদস্যপদ ছিল না। যাঁরা খামখেয়ালি সভার অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকে একটি ডিনার পার্টির আয়োজন করতেন এবং অন্যদেরকে সেখানে দাওয়াত দিতেন। খামখেয়ালি সভার সদস্য কুড়িজনের বেশি ছিল না। সংখ্যায় অল্প হলেও তাঁদের মধ্যে হরেক রকমের প্রতিভার সমাবেশ ঘটেছিল। কবি, লেখক, বিজ্ঞানী, অভিনেতা, সংগীতশিল্পী — কে ছিল না সেখানে! কার বাড়ির আয়োজন কত ভালো হবে, সে রকম প্রতিযোগিতা না থাকলেও, ডিনারগুলোতে হরেক রকমের খাবারের আয়োজন থাকত। আয়োজকরা ভোজনরসিকদের রসনা বিলাসের কথা মাথায় রাখতেন না। তাঁরা ভাবতেন পুরো বিষয়টিতে যেন রুচির ছাপ থাকে। ফলে প্রত্যেকটি ডিনারেরই আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকত, যা রসনার জন্য যেমন তৃপ্তিদায়ক হতো, তেমনি হতো দৃষ্টিনন্দন।
আমাদের বাড়িতে যেবার আসর বসে তার কথা ভালোভাবেই মনে আছে। সামান্য উঁচু করে বানানো একটি মঞ্চকে মাঝখানে রেখে টেবিল-চেয়ার সাজানো হয়েছিল। আমার এক চাচাত ভাই মঞ্চটিতে গ্রামবাংলার জীবন ও প্রকৃতি ফুটিয়ে তুলেছিলেন। ছোট ছোট কুঁড়েঘর ও গ্রামীণ নারী-পুরুষের মূর্তি তৈরি করার জন্য কৃষ্ণনগর থেকে কারিগর ভাড়া করে আনা হয়েছিল। মঞ্চটির চারদিকে নিচু নিচু টেবিলে খাবার পরিবেশন করা হয়। এজন্য জয়পুর থেকে ফরমায়েশ দিয়ে সাদা মার্বেলের থালা-বাসনও আনা হয়েছিল। নতুন খাবার রান্নার জন্য মাকে সামর্থ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হতো। এসব অনুষ্ঠানে বাবার কল্পনা পাগলা ঘোড়ার মত দৌড়াত। তিনি রাজ্যের যত অদ্ভুত খাবারের কথা বলতেন, আগে সেগুলো কখনোই রান্না করা হয়নি। তার পছন্দ করা খাবার কীভাবে রান্না করা যায় সেটা বের করতে মাকে যারপরনাই মাথা ঘামাতে হতো। পূর্বে কখনও করা হয়নি এরূপ খাবার মানসম্মত করে রান্না তো সহজ নয়। খাবার ছাড়া খামখেয়ালি সভার আরও নানান দিক ছিল। বরং আসল ব্যাপার শুরু হতো খাবার শেষ হবার পর। অতিথিরা বৈঠকখানায় আরাম করে বসলে চলত কবিতা আবৃত্তি, গল্প থেকে পাঠ আর সুমধুর সংগীত পরিবেশনের পালা। প্রায়শ একাঙ্ক নাটকের অভিনয় হতো। সবচেয়ে মজার অংশ ছিল এসবের ফাঁকে ফাঁকে বুদ্ধিদীপ্ত ও রসিকতাপূর্ণ আলাপ-আলোচনা। খামখেয়ালি সভার পুরো বিষয়টিই ছিল যেন একটা শিল্প, যে শিল্প কালের করাল গহ্বরে হারিয়ে গেছে।
বাবা গান ধরতেন—আজি মম মন চাহে… এস্রাজ বাজাতেন অবনীন্দ্র ঠাকুর আর নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ সুর তুলতেন পাখোয়াজে। এ সময়েই বাবার কণ্ঠের গান সবচেয়ে ভালো লাগত। তাঁর পরবর্তী জীবনের গানগুলোর অধিকাংশই ছিল জনপ্রিয় ঘরানার। যাঁরা কেবল এগুলোই শুনেছেন তাঁরা বুঝতেই পারবেন না পাখোয়াজের তালে তালে বাবার গাওয়া রাগাশ্রয়ী ধ্রুপদগুলো শুনতে কী চমৎকারই না লাগত! আর মহারাজা যন্ত্রটিকে জানতেন, বাজাতেনও খুব ভালো। কেবল গানের সঙ্গেই নয়, বাবা যখন সোনার তরী বা মানসী কাব্যগ্রন্থ থেকে আবৃত্তি করতেন, তখনও তাঁকে পাখোয়াজে সুর তুলতে হতো।
প্রত্যেকেরই নিজস্ব পছন্দের গান ছিল, এবং সেগুলো শোনানোর জন্য বাবাকে তারা বারংবার অনুরোধ করতেন। স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর খুব পছন্দের গান ছিল “এসো এসো ফিরে এসো…”। তিনি যে এ গানটি কতবার শুনতে চেয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই।
এ সময়েই বাবা তাঁর গল্পগুচ্ছ সিরিজের ছোটগল্পগুলো লিখতে শুরু করেছেন। তিনি কিছুদিনের জন্য শিলাইদহ বা পতিসর যেতেন। ফিরে আসতেন নতুন নতুন গল্প নিয়ে। তাঁর সর্বশেষ লেখা শুনবার জন্য খামখেয়ালি সভা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত। আমার ধারণা বিনি পয়সার ভোজ ও বৈকুণ্ঠের খাতা নামক হাসির নাটক দুটি এ সময়েই লেখা হয়েছিল। দ্বিতীয় নাটকটির অভিনয় হয়েছিল গগনেন্দ্রনাথের বাড়িতে। এতে বাবা, গগনেন্দ্র, সমরেন্দ্র, অবনীন্দ্র এবং ছোট অক্ষয়বাবু যথাক্রমে অবিনাশ, বৈকুণ্ঠ, কেদার, তিনকড়ি এবং বুড়ো চাকর ঈশানের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। নাটকটি এতটাই জমেছিল যে হাসতে হাসতে দর্শকদের পেটে খিল ধরে গিয়েছিল। এরূপ নিখুঁত অভিনেতাদের সমারোহ আর মাত্র একবারই ঘটেছিল, বহু বছর পর বিচিত্রা ক্লাবে ডাকঘর নাটক অভিনয় হবার সময়।
বয়স্ক মানুষদের জীবন ও কার্যাবলি সম্পর্কে এতটা বিস্তারিতভাবে আমার লিখতে পারার কথা নয়। এটা পারছি কারণ আমি সমবয়সী বাচ্চাদের কাছ থেকে কিছুটা দূরে থাকতাম। বড়দের সঙ্গে থাকাই ছিল আমার অধিক পছন্দের। বিশেষ করে লেগে থাকতাম বলেন্দ্র ও নীতীন্দ্রর সঙ্গে। তাঁরা আমাকে তাদের শিষ্য মনে করতেন এবং যেখানেই যেতেন আমাকে নিয়ে যেতেন। তাঁদের সঙ্গে থেকে থেকে আমার সাহস বেড়ে গিয়েছিল। আমার বোঝার সাধ্য নেই এমন বিষয়েও যখন বড়রা আলোচনা করতেন তখনও আমি তাঁদের সঙ্গে থাকতাম। খামখেয়ালি সভার অনুষ্ঠানগুলো আমাকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করত। আমি এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে থাকতাম এবং আমাকে যেন না দেখা যায় সে চেষ্টা করতাম। এভাবেই অতি অল্প বয়স থেকে আমার শিক্ষার শুরু হয় এবং নিজের অজান্তেই মনের ভিতর শিল্প ও সাহিত্যের উচ্চতর বিষয়গুলোর প্রতি টান ও মূল্যবোধ তৈরি হয়ে যায়।
খামখেয়ালি সভায় আমাদের পরিবারের সদস্যরা ছাড়া আর যারা আসতেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কজন হলেন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, নাটোরের মহারাজা, অক্ষয় কুমার চৌধুরী, ছোট অক্ষয়বাবু, প্রিয়নাথ সেন, চিত্তরঞ্জন দাশ, সন্তোষের প্রমথনাথ রায় চৌধুরী, প্রমথ চৌধুরী (যিনি পরবর্তীতে ‘বীরবল’ ছদ্মনামে লিখতেন)। এছাড়া আরও কয়েকজন ছিলেন যাদের আমি সে সময় চিনতাম না। এক সময় অতুল চন্দ্র সেনও আসা শুরু করেন। তিনি তখন যুবক, অনভিজ্ঞ ব্যারিস্টার। হাতে মামলাও তেমন একটা নেই। গোবেচারা ধরনের দেখতে এ নবাগত সভ্যটিকে নিয়ে অন্যরা প্রায়ই হাসি-তামাশা করতেন। আর ছিলেন ডিএল রায়। অননুকরণীয় ভঙ্গিতে মজার মজার গান গেয়ে তিনি খামখেয়ালি সভার আনন্দের খোরাক যোগাতেন। বাবা কোলকাতা ছেড়ে সপরিবারে শিলাইদহ চলে এলে খামখেয়ালি সভা হঠাৎ করেই ভেঙে যায়।
.
১. ১৮৯৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি এ সভা স্থাপিত হয়। পরবর্তী দুবছরে এর ছয়-সাতটি সভা হয়।
