শিলাইদহে
নদীয়ার একেবারে উত্তর সীমানা ঘেঁষে শিলাইদহ অবস্থিত। এর উত্তরে পদ্মা নদী, তারপর পাবনা জেলা। পদ্মা দুই জেলার মধ্যে সীমানা হিসেবে কাজ করে। উত্তর ভারতে, বিশেষত এলাহাবাদ ও বেনারসের মত পবিত্র শহরগুলোর পাশ দিয়ে বয়ে যাবার সময় গঙ্গার আচরণ যেন শান্ত সুবোধ বালকের মত। কিন্তু বাংলাদেশে পৌঁছুনোর পরই তার চেহারা পাল্টে যায়। এ দেশের পলল ভূমিতে সে প্রমত্তা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসতে আসতে এর পানি হয়েছে ঘোলা, আকার হয়েছে বিশাল আর স্বভাব হয়েছে দুর্বিনীত। অবশ্য যত বিশালই হোক পদ্মা আসলে চপলমতি। আজ এখানে তার ভাঙনের শব্দ শোনা যায় তো কাল ওখানে, যেন দুপাড়ের অসংখ্য গ্রামকে নিয়ে খেলছে। কয়েক বছর না ভাঙায় যখনি পাড়ার কোনো গ্রাম একটু নিরাপদ ও স্বস্তি অনুভব করল, অমনি সে হয়ত তার ওপর নিষ্ঠুরতা আর দূরের অন্য কোনো গ্রামের ওপর দয়া দেখাতে শুরু করল।
সে সময় পদ্মা ও গড়াই নদীর মাঝে শিলাইদহ বেশ নিরাপদেই ছিল। বহু বছর ধরে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দর হিসেবে গড়ে উঠেছিল। বাংলার অন্যতম ধনী এ এলাকাটিতে নানা ধরনের নৌকার আগমন ঘটত। কোনোটা আসত মাল খালাস করতে, কোনোটা আবার ধান, পাট, তেলবীজ বা অন্য কোনো ফসল বোঝাই করে নিয়ে যেত। বিহার থেকে যেমন আসত বিশাল বিশাল জবরজং নৌকা, তেমনি ঢাকা থেকে আসত সুন্দর সুন্দর হালকা পানসি। নদীকে প্রাণবন্ত করে তুলত শত শত জেলে-নৌকা। দিনরাতই সেগুলো ইলিশ ধরায় ব্যস্ত থাকত। কাছের কুষ্টিয়া রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে করে কোলকাতায় ইলিশ পাঠানো হতো।
শিলাইদহে আমাদের জীবন ছিল কোলকাতা থেকে একেবারেই আলাদা। সেখানে সমাজ-বিচ্ছিন্ন বন্দিদশায় আমাদের দিন কেটেছে। এটা এক দিক থেকে উপকারী হয়েছিল। পরিবারের সম্পর্ক বেড়েছিল। আমরা পাঁচ বাচ্চা বাবা-মাকে আরও কাছ থেকে দেখার, আরও অন্তরঙ্গভাবে জানার সুযোগ পেয়েছিলাম। তাছাড়া পেয়েছিলাম প্রকৃতির নিবিড় সংসর্গ। বাবা আমাদের শিক্ষার বিষয়ে খুব মনোযোগী ছিলেন। গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থায় তাঁর আস্থা ছিল না। নিজের মাইনর স্কুলের তেতো স্মৃতি তাঁর ভিতরে ভালোই কাজ করছিল। বলে নেয়া ভালো যে আমাদের দেশে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে সমালোচনা করে প্রথম জীবনেই তিনি একটি প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। ১৮৯২ সালে সাধনা পত্রিকায় প্রকাশিত শিক্ষার হেরফের নামক প্রবন্ধটিতে যথেষ্ট যুক্তি-তর্ক দিয়ে মাতৃভাষায় শিক্ষা দেয়ার কথা বলেছিলেন। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভারতীয় উপাচার্য স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়সহ অনেক শিক্ষাবিদের মনেই প্রবন্ধটি আগ্রহের সৃষ্টি করেছিল। নিজের ছেলেমেয়েরাও না তৎকালীন অস্বাস্থ্যকর জড় শিক্ষাব্যবস্থার শিকার হয়, বাবা তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। বাড়িতেই শিক্ষক রাখা হল। আমাদের পড়ানোর আগে বাবা তাঁদেরকে শেখালেন। ছেলেমেয়েদের পড়ানোর জন্য তিনি নিজস্ব পদ্ধতি বের করেছিলেন। সে পদ্ধতিতেই আমাদের পড়ালেখা চলছিল। অনেক সময় তিনি নিজেই আমাদের পড়াতেন।
শিক্ষকদের কাছে আমরা ইংরেজি, অঙ্ক আর সংস্কৃত শিখতাম। বাবা বাংলা পড়াতেন। সে সময় তিনি কথা ও কাহিনীর কবিতাগুলো লিখছিলেন। তিনি কোনো একটা কবিতা অথবা নির্বাচিত কিছু গদ্য অনুচ্ছেদ নিয়ে তার প্রত্যেকটা বাক্য ব্যাখ্যা করে বেলাদি ও আমাকে বোঝাতেন। আমার বাংলা জ্ঞানের তুলনায় সেসকল বেশ কঠিন ছিল। কিন্তু বাবার সেদিকে খেয়াল ছিল না। বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক তিনি কখনোই ব্যবহার করেননি। তিনি গোড়াতেই ভালো সাহিত্য দিয়ে আমাদের পড়াতে শুরু করেছিলেন। বাচ্চাদের মানসিকতা বা ক্ষমতা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই এমন লোকেরাই সাধারণত ছোটদের জন্য বই লিখতেন। বাবা চাইতেন আমাদেরকে যেন এ ধরনের বই পড়তে না হয়। তিনি অনেক যত্ন করে প্রত্যেকটি শব্দ ব্যাখ্যা করতেন, বারবার করে বোঝাতেন। পড়া শেষ হলে দেখা যেত পুরো বিষয়টি আমাদের মনে গেঁথে গেছে। তখন সেটা মুখস্থ করা অনেক সহজ হয়ে যেত। এ পদ্ধতিতে আমরা খুব দ্রুতই কোনো কাব্যের সব কবিতা আবৃত্তি করতে কিংবা বিখ্যাত লেখকদের গদ্যের অংশ বুঝতে শিখে যেতাম। আমরা কখনোই ব্যাকরণ শিখিনি। সেটার দরকারও ছিল না। ইংরেজির ক্ষেত্রে তিনি তাঁর প্রিয় বই অ্যামিয়েল’স জার্নাল[১] থেকে পড়া দিতেন। উপনিষদের যে স্তোত্রগুলো ব্রাহ্মসমাজে ব্যবহৃত হতো, সংস্কৃতের বেলায় সেগুলো ছিল প্রথম পছন্দ। কয়েক বছর পর, তিনি আমাকে ধম্মপদের পুরোটা পালি ভাষায় মুখস্থ করিয়েছিলেন।
বাবা চাইতেন ছেলেমেয়েরা যেন ভারতীয় ধ্রুপদী সাহিত্য, বিশেষ করে, রামায়ণ ও মহাভারত পড়ে। আগেকার দিনে দাদিমাদের কাছে গল্প শুনে শুনে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ সম্পর্কে জানার সুযোগ পেত, এমনকি দর্শনের সঙ্গেও তাদের পরিচয় ঘটত। ভারতের প্রাচীন লোককথা বা পুরাণ সম্পর্কে এ যুগের দাদিমারা জানেন না। আর হাঁটতে শিখতে না শিখতেই বাচ্চাদেরও স্কুলের দিকে দৌড়াতে হয়। রামায়ণ আর মহাভারত বই দুটিও এমন বড় আর অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে ঠাসা যে সেগুলো ছোটদের কোনো কাজেই লাগে না। এমনকি পাতার পর পাতা উল্টিয়ে যেতে বড়দেরও কষ্ট হয়। বাবা মাকে রামায়ণ-এর একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ তৈরি করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। অতিকথন ও অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিয়ে এটা করতে হবে, মূল গল্পটা যেন একটানে পড়া যায়। বাবা বলে দিয়েছিলেন বাংলা অনুবাদের ওপর নির্ভর না করে সংস্কৃত রামায়ণ অনুসরণ করে সংক্ষিপ্তরূপ তৈরি করতে। মায়ের জন্য তা কঠিন ছিল, কিন্তু তিনি পিছপা হননি। একজন পণ্ডিতের সাহায্য নিয়ে তিনি সংস্কৃতেই রামায়ণ পড়েছিলেন এবং আমাদের জন্য সংক্ষিপ্ত করে লিখতে শুরু করেছিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে কাজটি শেষ করার পূর্বেই তিনি মারা যান। তাঁর পাণ্ডুলিপিটিও হারিয়ে গিয়েছে। আমার মনে আছে কী আগ্রহের সঙ্গেই না আমরা তাঁর তৈরি করা সংক্ষেপিত রামায়ণ-এর গল্প পড়তাম!
একই সঙ্গে মহাভারত-এর সংক্ষিপ্ত পাঠ তৈরি করতে বাবা কাজে লাগিয়েছিলেন সুরেন্দ্রনাথকে। তিনি যখনই শিলাইদহে আসতেন সঙ্গে করে তাঁর পাণ্ডুলিপি নিয়ে আসতেন। নতুন অংশের সবটুকু না পড়া পর্যন্ত বেলাদি ও আমি তাকে ছাড়তাম না। সুরেন্দ্র সংক্ষিপ্তকরণের কাজ শেষ করলে বাবা পাণ্ডুলিপিটা শান্তিনিকেতনে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি প্রতি সন্ধ্যায় ছাত্রদের ওটা থেকে মহাভারত-এর গল্প পড়ে শোনাতেন। সে ১৯০৩ সালের কথা। আমি সেবার এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছি। বাবা ছাত্রদের নিয়ে পাঠাগারের বারান্দায় বসে মজা করে পড়াতেন। আর আমি ও আমার বন্ধু সন্তোষ তখন ঐ দালানেরই অন্য একটি কক্ষে সংস্কৃত পণ্ডিত হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ভর্তৃহরির কঠিন কঠিন পদ পড়ছি। আমরা পণ্ডিতের সামনে বসে থাকলেও আমাদের মন চলে যেত বারান্দার দিকে, বাবা আর তাঁর ছাত্রদের দিকে। বিষয়টি বুঝতে পেরে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় একদিন বাবাকে অনুযোগ করলেন যে এভাবে মহাভারত পাঠ চলতে থাকলে তাঁর নিজের ছাত্র দুটির পরীক্ষা পাসের আশা বৃথা। বাবা হেসে বললেন, “আপনি যদি তাঁদেরকে আমার ক্লাসে আসতে দেন তাতে অন্তত ওদের মহাভারতটা শেখা হবে।” সেদিন থেকে আমরাও ওখানে যোগ দিলাম। শিক্ষকদেরকে অবাক করে দিয়ে আমরা সংস্কৃতে পাসও করলাম। কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত-এর পুরোটাই সুরেন্দ্র সংক্ষিপ্ত করেছিলেন। সংক্ষিপ্ত রূপটিও বেশ বড় ছিল। প্রথম সংস্করণ সেভাবেই বের হয়েছিল। পরবর্তী মুদ্রণের আগে আবারও কাট-ছাঁট করে বাবা আরও ছোট সংস্করণ বের করেছিলেন। এটির নাম ছিল কুরু-পাণ্ডব।
বাবা আমাদের একাডেমিক শিক্ষার দিকটা দেখতেন, আর মা দিতেন ব্যবহারিক জীবনের দীক্ষা। প্রতি রোববার তিনি চাকরদের ছুটি দিয়ে দিতেন। সেদিন বেলাদি ও আমাকে সংসারের সকল কাজ করতে হতো। অনুজ তিন ভাই-বোন তখন এতই ছোট যে ওদের কোনো কাজে লাগানো যেত না। আমি রান্না করতে মজা পেতাম। প্রত্যেক পদ রান্না করার সঙ্গে সঙ্গেই সেটা চেখে দেখা রাঁধুনির দায়িত্ব নয় কি? সে কর্তব্য আমি বেশ নিষ্ঠার সঙ্গেই পালন করতাম! একদিন দৈত্যাকৃতির এক শিখ এল কাজের সন্ধানে। তাকে দারোয়ান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হল। কদিন পর সে এসে মাকে বলল যে তাকে যথেষ্ট খাবার দেয়া হচ্ছে না। মা জিজ্ঞেস করলেন, সে কী খেতে চায়। সে মিনমিন করে বলল যে চাপাতি, ডাল আর দই হলেই চলবে, তবে পরিমাণে একটু বেশি হতে হবে, যেন পেট ভরে। সে কতটুকু খেতে পারে মা সেটা বুঝতে চাইলেন। আমরা কয়েক পাত্র দই আর অনেক চাপাতি নিয়ে এলাম। মায়ের সামনেই সে খেতে শুরু করল। যা-ই দেয়া হচ্ছে তা-ই সে গপাগপ গিলে ফেলছে। অন্তত আধমণখানেক খেয়ে তবেই সে থামল। পরদিন মা বাবাকে দারোয়ানের বেতন বাড়িয়ে দিতে বললেন।
*
১. হেনরি ফ্রেডরিক অ্যামিয়েল নামক সুইশ দার্শনিক, কবি ও সমালোচকের দি জার্নাল ইনটিমে। ফরাসি ভাষা থেকে প্রাইভেট জার্নাল নামে এর ইংরেজি অনুবাদ করেন মেরি এ. ওয়ার্ড।
