শিলাইদহের অতিথিরা
শিলাইদহে প্রায়ই মেহমান আসতেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, যিনি ডিএল রায় হিসেবে অধিক পরিচিত, কুষ্টিয়ায় ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। অবসর পেলেই তিনি আমাদের এখানে আসতেন। একবারের কথা মনে পড়ে। অনেকেই হয়ত জানেন না যে কবি ও নাট্যকার ডিএল রায় জীবন শুরু করেছিলেন প্রশিক্ষিত কৃষিবিদ হিসেবে। সরকার একবার আগ্রহভরে চারজন ছাত্রকে বৃত্তি দিয়ে ইংল্যান্ডের সিরেনস্টার কলেজে কৃষিবিজ্ঞান পড়তে পাঠায়। চারজনের একজন ছিলেন ডিএল রায়। তাঁরা যখন পড়াশুনা শেষ করে ফিরে আসলেন, কৃষি বিভাগ তখনও গড়ে ওঠেনি। ফলে সরকার বুঝতে পারছিল না তাঁদেরকে কোথায় কাজে লাগানো যায়। অবশেষে তাঁদেরকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। শিলাইদহে আসতে শুরু করার আগেই তাঁর কয়েক বছর ডেপুটিগিরি করা হয়ে গেছে। ততদিনে প্রশাসনিক কাজকর্মের ভারে তাঁর কৃষি বিষয়ক জ্ঞানের ওপর ধুলো জমেছে। কিন্তু তিনি যখন দেখলেন যে বাবা বিশাল এক বাগান তৈরি করছেন তখন তাঁর পুরনো জ্ঞান মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তিনি জমির এক অংশে গোলআলুর চাষ করতে বললেন। বাংলার লোকেরা তখনও গোলআলুর কথা প্রায় জানতই না। বাবা এজন্য একটি জমি তৈরি করলেন এবং পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলেন। কেবল যে পরামর্শই পাওয়া গেল তা নয়, সঙ্গে আনুর বীজও এল। চাষি ছিল খুব অভিজ্ঞ। সে শুরু থেকেই বলল যে এ পরামর্শে কাজ হবে না। কিন্তু বিশেষজ্ঞের মতামত পেলে কে আর গ্রাম্য চাষির কথা শোনে! ডিএল রায়ের পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে বাবা অতি যত্নে আলুর চাষ করলেন। শেষ পর্যন্ত চাষির কথাই ঠিক হল। ফসল উঠলে দেখা গেল, যে পরিমাণ বীজ লাগানো হয়েছিল ফলনও হয়েছে ওটুকুনই! এর পর থেকে বাবা আর কখনোই তাঁর নিকট থেকে কৃষি বিষয়ক পরামর্শ নিতেন না।
জগদীশচন্দ্র বসুও নিয়মিত আসতেন। বিশেষ করে শীতকালে। সে সময় আমরা বাড়ি ছেড়ে দিয়ে পদ্মার বুকে হাউজবোটে বাস করতে চলে যেতাম। শুকনো মৌসুমে পদ্মা শুকিয়ে সরু হয়ে যায়, মাইলের পর মাইল চর পড়ে। বালি ছিল পরিষ্কার, চোখ ধাঁধিয়ে যাবার মত সাদা। ঢেউ খেলানো বালিয়াড়িতে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ সামনে পড়ত কাচের মত স্বচ্ছ পানির হ্রদ বা আঁকাবাঁকা শাখানদী ভর্তি হাজারো হাঁসের জলকেলি। আর ছিল ছোট ছোট কাশবন, যেখানে শেয়াল আর শূকর আস্তানা গাড়ত। নির্জন দেখে একটি বালুর চর ঠিক করা হতো। সেখানে নৌকার বহর নিয়ে আমরা হাজির হতাম। হাউজবোট, দেশি নৌকা, সবুজ নৌকা, সব ধরনের নৌযান ব্যবহার করা হতো আমাদের পরিবার, চাকর-বাকর আর বেশ কিছুদিন থাকার মত মালামাল ঐ চরে বয়ে নিয়ে যেতে। নদীর তীরে চাকর-বাকরদের জন্য সার ধরে বাঁশের কুঁড়ে বানানো হতো! আমাদের ভালো লাগত গোসলখানা। সেটা এমনভাবে তৈরি করা হতো যেন হঠাৎ গিয়ে নদীর মধ্যে পড়েছে। শীতের কয়েক মাস আমরা এখানেই ক্যাম্প করে থাকতাম। গরমের শুরুতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি আর কালবোশেখির মৌসুম শুরু হলে পুনরায় শিলাইদহের বাটিতে ফিরে আসতাম।
জগদীশচন্দ্র বসু আমাদের সঙ্গে নদীতে সপ্তাহান্তের ছুটি কাটাতে ভালোবাসতেন। তিনি পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরেছেন। তিনি বলতেন যে পদ্মার চরের সঙ্গে আর কোনো স্বাস্থ্যনিবাস বা আনন্দনিবাসের তুলনা হয় না। কচ্ছপের পায়ের ছাপ ধরে ধরে কীভাবে লুকানো ডিম বের করতে হয় তা তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন। কচ্ছপ ডিম পেড়ে অনেক চেষ্টাচরিত্র করে বালি দিয়ে ঢেকে রাখে। তারা এটা করে শেয়ালের হাত থেকে ডিমগুলোকে বাঁচাতে। কিন্তু এ অসহায় প্রাণীগুলো পায়ের ছাপ লুকাতে পারে না। বালিতে স্পষ্ট তাদের পায়ের চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়। রেলপথের মত সমান্তরাল লাইনে চলতে থাকা পায়ের ছাপ ধরে ধরে তাদের ডিমের হদিস বের করা ছিল আনন্দের অভিজ্ঞতা। কখনও এমন হতো যে একটি কাছিমের পথের উপর দিয়ে অন্য কোনো কাছিম হেঁটে গিয়েছে। তখন প্রকৃত পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হতো। কঠিন বলেই মজাও হতো বেশি। জগদীশ বসু নাস্তায় কচ্ছপের ডিম খেতেন। আমি তার জন্য প্রতিদিন এক ব্যাগ ভর্তি ডিম কুড়িয়ে নিয়ে আসতাম। তিনি আরও খুশি হতেন জ্যান্ত কচ্ছপ ধরে আনতে পারলে। কচ্ছপের নরম মাংস তাঁর খুবই প্রিয় ছিল। কচ্ছপ ধরাও সহজ। কেবল উল্টে দিলেই হল। তখন আর এরা নড়তে চড়তে পারে না। জগদীশচন্দ্র বসুর আরও একটি শখ ছিল। তিনি আমাদেরকে দিয়ে বালিতে গর্ত খোঁড়াতেন। তারপর মাথায় ভেজা তোয়ালে জড়িয়ে তিনিসহ আমরা সেসকল গর্তে শুয়ে থাকতাম। রোদে যখন চামড়া পুড়ে যায় যায়, তখন সকলে নদীর ঠান্ডা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তাম।
জগদীশচন্দ্রের ঝুলি মজার মজার গল্পে ভরা ছিল। তিনি বহু দেশ ঘুরেছেন, বহু লোকের সঙ্গে মিশেছেন। তাদের নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চমকদার গল্প করতে পারতেন। তাঁর রসবোধ যেমন চমৎকার ছিল, তেমনি ছিল খুব তুচ্ছ জিনিসকেও রসালো করে বর্ণনার ক্ষমতা। ফলে লম্বা সময় ধরে তাঁর কথা শুনেও শ্রোতাদের ক্লান্তি আসত না। তিনি হাসাতে যেমন পারতেন, তেমনি হাসতেও পারতেন। ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় হাসতে পারাটাও একটা গুণ, যা খুব বেশি লোকের নেই। তিনি চলে গেলে আমার খারাপ লাগত। মনে জেগে উঠত তাঁর মতই বড় মাপের বৈজ্ঞানিক হবার বাসনা।
জগদীশচন্দ্র তখন জীব ও জড়ের ওপর বিভিন্ন ধরনের উদ্দীপকের প্রভাব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। তিনি মনে করতেন তাঁর আবিষ্কারের ফলে জীবনের প্রকৃতি নিয়ে সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের ধারণাই পাল্টে যাবে। এ বিষয়ে সিস্টার নিবেদিতা তাঁকে খুব উৎসাহ দিতেন। বাবারও বেশ আগ্রহ ছিল। জগদীশচন্দ্র যখন বুঝতে পারলেন যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ যোগাড় হয়েছে তখন তাঁর গবেষণা সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জানাতে ও পরীক্ষা করে দেখাতে ইংল্যান্ড যেতে মনস্থ করলেন। বাবা ত্রিপুরার মহারাজাকে অনুরোধ করলেন খরচ বহন করতে। মহারাজা কেবল যাতায়াত খরচই দিলেন না, উপরন্তু তাঁর গবেষণাগারের জন্য যন্ত্রপাতি কেনার টাকাও দিলেন।
একজন বিজ্ঞানী আর অন্যজন সাহিত্যিক। জগদীশচন্দ্র বসু আর বাবার মধ্যে বন্ধন ছিল বন্ধুত্বেরও বেশি। দুজন সব সময়ই ভাবনা বিনিময় করতেন। একজন হয়ত জানাতেন নতুন কোনো গল্প লিখতে যাচ্ছেন, অন্যজন জানাতেন গবেষণাগারের পরীক্ষায় নতুন কী কী ফল পেয়েছেন। তাঁরা একে অন্যের সমালোচনাকে সাদরে গ্রহণ করতেন এবং পারস্পরিক আলোচনা থেকে অনুপ্রাণিত হতেন। শিলাইদহে এসেই জগদীশ বসু বাবাকে আগের সপ্তাহে লেখা গল্প পড়ে শোনাতে অনুরোধ করতেন এবং পরের সপ্তাহের জন্য নতুন গল্প লেখার প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিতেন। কেবল সাধনা বা ভারতী পত্রিকায় লেখা দেয়ার তাড়না থেকেই বাবার এতগুলো গল্প সৃষ্টি হয়নি। তাঁর বৈজ্ঞানিক বন্ধুর নিরন্তর তাগাদাও এ বিষয়ে যথেষ্ট অবদান রেখেছে। অনেক সময় বাবা যথেষ্ট সময় ও পেতেন না। গল্পগুচ্ছের কয়েকটি গল্পে তাড়াহুড়ো করে লেখার সুস্পষ্ট ছাপ রয়েছে।[১]
জগদীশ বসু এবং দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ছাড়া আরও অতিথি আসতেন। তবে এ দুজনের মত নিয়মিত নয়। তাঁদের একজন ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্র। তিনি রাজশাহীর একজন আইনজীবী ছিলেন। কিন্তু তাঁর মূল আগ্রহ ছিল ইতিহাস, বিশেষত বাংলার ইতিহাস নিয়ে গবেষণায়। তিনি অনেক দুর্লভ ছবি ও পুরাতাত্ত্বিক নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। বাংলার ইতিহাস বুঝতে এগুলো অনেক সাহায্য করেছিল। তিনি বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি নামে একটি সংগঠনও গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর সংগৃহীত নিদর্শনসমূহকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে বরেন্দ্র মিউজিয়াম গড়ে ওঠে। অবশ্য তাঁর পাণ্ডিত্য ও পেশা উভয়কে ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছিল রেশম চাষের নেশা। তিনি যখনই শিলাইদহে আসতেন সঙ্গে করে রেশম পোকার ডিম নিয়ে আসতেন এবং কীভাবে পোকার লালন-পালন করতে হয় ও রেশম সুতা বুনতে হয় তা শেখাতেন। লরেন্স সাহেবকেও তাঁর এ নেশায় ধরেছিল। মাত্র এক বছরে তিনি এ পরিমাণ রেশম উৎপাদন করেছিলেন যে অক্ষয় মৈত্র তাঁকে যোগ্য শিষ্য হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। মৈত্র মশায়ের মধ্যে পণ্ডিতির ভাব ছিল না, অথচ তিনি অনেক বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মত কথা বলতে পারতেন। তিনি যে কদিন থাকতেন বাবা নানান বিষয়ে আলাপ করে আনন্দ পেতেন।
অমলাদি আমাদের সঙ্গে এলেই বাবার গানের কথা মনে হতো। প্ৰায় সারাদিনই তিনি গুনগুন করে সুর বাঁধতেন আর অমলাদি পাশে বসে সে সুরে গলা সাধতেন। ভারতীয় সংগীত শেখার পদ্ধতি হল শুনে শুনে, ইউরোপীয়দের মত নোটেশন দেখে দেখে শেখা নয়। আমরা অধীর আগ্রহে সন্ধ্যা নামার অপেক্ষা করতাম। তাড়াতাড়ি রাতের খাবার শেষ করে সবাই খোলা নৌকায় চেপে বসতাম। মাঝিরা নৌকাটিকে মাঝনদীতে নিয়ে গিয়ে নোঙর ফেলত। বাবা ও অমলাদি কোনো বিরতি না দিয়ে পালাক্রমে মাঝরাত অবধি গান গাইতেন। আমি প্রায়ই আসর শেষ হবার আগেই মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়তাম। জনমানবশূন্য নদীর বুকে তখন নিঝুম রাতের স্তব্ধতা। এরই মাঝে নৌকার পাশ দিয়ে বুদ্বুদ তুলে সবেগে বয়ে যেত স্রোতের কুণ্ডলী। হাওয়ায় দোলায়িত জলের উপর প্রতিফলিত হতো রুপালি চাঁদ। কদাচিৎ দূরে আবছায়ামত দেখা যেত জেলে নৌকা নদীর ভাটিতে মিলিয়ে যাচ্ছে। নদীর কলতান, মৃদু হাওয়ার ঝিরিঝিরি আর পাশ দিয়ে যাওয়া নৌকার বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ ধ্বনির সঙ্গে একাকার হয়ে যেত ‘বেলা গেল তোমার পথ চেয়ে’ বা ‘সন্ধ্যার মেঘমালা’র মত গানগুলো। যতদূর চোখ যায় চারপাশ আলো করে ফুটেছে ধবল পূর্ণিমা। গানের আসরের জন্য এর চেয়ে রোমান্টিক আয়োজন আর কী হতে পারে!
নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ[২] এলে আমাদের ক্যাম্প যেন জীবন্ত হয়ে উঠত। সংগীতজ্ঞ ও লেখক হিসেবে তাঁর গুণের কথা সবাই জানে। আমরা পছন্দ করতাম তাঁর মিশুকতা আর রসবোধ। অন্যরা কিছু করলে, তাঁর বাস্তবিক মূল্য যা-ই থাকুক না কেন তিনি দরাজ গলায় তার প্রশংসা করতেন। বাবা যখন মহারাজার সঙ্গে সময় কাটাতেন, মা ব্যস্ত থাকতেন খাবার-দাবার তৈরির কাজে। অমলাদি তাঁকে সহায়তা করতেন। পূর্ববঙ্গের রান্নায় তিনি বিশেষ পটু ছিলেন। মহারাজা খাওয়া-দাওয়ার সমঝদার ছিলেন। তাঁকে সন্তুষ্ট করতে মা ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমরা যেমন তাঁকে পছন্দ করতাম, তিনিও সপ্তাহান্তে আমাদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন।
*
১. রবীন্দ্রনাথ তাঁর দুটি কাব্য কথা (১৯০১) ও খেয়া (১৯০৬) জগদীশ বসুকে উৎসর্গ করেন।
২. নাটোরের মহারাজ গোবিন্দচন্দ্র অপুত্রক ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর ব্রজসুন্দরী জগদীন্দ্রনাথকে দত্তক গ্রহণ করেন। তিনি শ্রুতিস্মৃতি, নূরজাহান, দারার অদৃষ্ট ও সন্ধ্যাতারা নামক গ্রন্থ রচনা করেন। সাধনা পত্রিকায় লিখতেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত পঞ্চভূত গ্রন্থটি ‘মহারাজ শ্রীজগদীন্দ্রনাথ রায় বাহাদুর সুহৃদকরকমলেষু’ লিখে তাঁকে উৎসর্গ করেন। ১৯২৬ সালে তিনি মারা যান।
