জমিদারি দেখাশুনা
লেখালেখির চাপ যতই থাক না কেন, বাবা জমিদারির কাজ নিয়মিত তদারক করতেন। প্রতিদিন সকালে উঠে হিসেবপত্তর দেখতেন, কর্মচারীদের কাছ থেকে খবরাখবর নিতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র লিখতেন। সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেতেন প্রজাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। তিনি তাদের অভাব-অভিযোগ শুনতেন এবং বিবাদ মীমাংসা করে দিতেন। জমিদাররা প্রজাদের সঙ্গে সাধারণত যেরকম ব্যবহার করেন তিনি সেরকম করতেন না। খুব সহজভাবে তাদের সঙ্গে মিশতেন। তারাও তাঁকে এতটাই আপন ভাবত যে নিজেদের জমি, সংসার এমনকি ব্যক্তিগত কথাও তাঁকে জানাতে ইতস্তত করত না। বাবা প্রচার করে দিয়েছিলেন যে, কোনো প্রজা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাইলে যেন সরাসরি তাঁর কাছে চলে আসে। এতে কোনো কর্মচারীর বাগড়া দেয়ার ক্ষমতা ছিল না। এভাবে জমিদার ও প্রজার মধ্যে ভালোবাসা ও সম্মানের সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। আমাদের জমিদারির শেষ দিন পর্যন্ত এ প্রথা অক্ষুণ্ণ ছিল।
কাজ আদায়ের ব্যাপারে বাবা ছিলেন খুব কড়া। কর্মচারীরা জানত, কোনোরকম গাফিলতি হলেই তাঁর নজরে পড়বে। তাদের সিদ্ধান্ত বা সুপারিশও তিনি যাচাই-বাছাই না করে গ্রহণ করতেন না। প্রত্যেকটা নথি দেখতেন, প্রত্যেকটা বিষয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন এবং নিজের মতামত বা আদেশ দিতেন। কিছুদিনের মধ্যেই সরকার বুঝতে পারে যে আমাদের জমিদারিতে কোনো অবিচার হবে না। ফলে তাঁরা বাবার কাজকর্মে হস্তক্ষেপ করত না। আর কোনো জমিদার এমন সম্মান পাননি। তিনি প্রজাদেরকে আদালতে মামলা করতে মানা করে দিয়েছিলেন। তাদের জন্য পঞ্চায়েত ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। পঞ্চায়েত শুধু যে দেওয়ানি বিষয়ে মীমাংসা করত তা-ই নয়, অনেক ক্ষেত্রে ফৌজদারি অভিযোগের সালিশও করত। তাদের রায়ে কেউ সন্তুষ্ট না হলে পরগনার পাঁচ প্রধান মিলে আরেক দফা বিচার করতেন। সবার ওপরে ছিল বাবার কাছে আপিল করার সুযোগ। ব্যবস্থাটি বহু বছর চলেছে। এর মধ্যে একজন প্রজাও ম্যাজিস্ট্রেট বা মুন্সেফ আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করেনি। সরকারও আমাদের বিচার ব্যবস্থায় আপত্তি করেনি। জমিদারির এক তালুকে বাবা সম্পূর্ণ স্বশাসন পদ্ধতি চালু করেন এবং তা চমৎকার কাজ করে। তিনি কবি ও স্বাপ্নিক হলেও, তাঁর ওপরে জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে মহর্ষি ঠিক কাজটিই করেছিলেন, এতে কোনো ভুল নেই।
আমাদের জমিদারি ছিল সারা বাংলাতেই। নদীয়া, পাবনা, ফরিদপুর, রাজশাহী, বগুড়া এমনকি উড়িষ্যার কটকেও আমাদের তালুক ছিল। সেগুলো তদারকি করতে বাবাকে প্রায় সবসময়ই ভ্রমণের ওপর থাকতে হতো। বাংলা নদীমাতৃক দেশ। প্রদেশ জুড়ে জালের মত বিছিয়ে থাকা নদীপথে ঘুরতে বাবা পছন্দ করতেন। অন্য কোনোভাবে ভ্রমণ করে গ্রামবাংলাকে এতটা কাছ থেকে, এতটা নিবিড়ভাবে দেখা বা জানা সম্ভব নয়। নদীগুলো যেন গরুর গাড়ির চাকার দাগের মত, কল্পনার পথ বেয়ে চলে গেছে যতদূর যাওয়া সম্ভব। পথে কোথাও বাঁক নিয়েছে, কোথাও মোচড় দিয়েছে, আবার কোথাও বা ভাঁজ খেয়ে জনপদের ভিতর দিয়ে মন্থর গতিতে এগিয়ে গেছে। নদী বুকে করে বয়ে আনে পলি, ছড়িয়ে দেয় দুপাড়ে। তারই ফলে বিস্তীর্ণ মাঠে প্রচুর পরিমাণে ধান, পাট, আখ, সরিষা আর অন্যান্য ফসল জন্মে। বজরার জানালা দিয়ে পল্লীবাংলার এ প্রাণপ্রাচুর্য দেখে কখনোই ক্লান্তি আসার কথা নয়। ঘাটে ঘাটে কলসি কাঁখে গাঁয়ের বধূরা, গোসল করতে নেমে দুরন্ত ছেলেদের এ ওর গায়ে পানি ছিটানোর খেলা, নিত্যনতুন অভিনব কৌশলে জেলেদের মাছ ধরা আর নৌকা কানায় কানায় বোঝাই করে চাষিদের ফসল নিয়ে ফেরা, লম্বা বাঁশের ডগায় বসা ধ্যানী ঋষির মত বাহারি মাছরাঙা, এই তো আমাদের পরিশ্রম, প্রশান্তি আর সুখে ভরপুর গ্রামবাংলার চিরকালীন চেহারা।
